-হযরত মাওলানা মুফতী সাইয়্যিদ শোয়াইব আহমদ
আল্লাহ্ পাক বান্দাকে ক্ষমা করে কবুল করে নেয়ার জন্য যে বিশেষ মাস ও দিন নির্ধারণ করেছেন তন্মধ্যে শা’বান মাস এবং এতে অবস্থিত শবে বরাতের দিনটি উল্লেখযোগ্য। বলা যায়, এ মাসটি আল্লাহ্ তায়ালার পক্ষ হতে বান্দার প্রতি, বিশেষ করে উম্মতে মুহম্মদীর প্রতি এক মহান ইহ্সান। তাই উম্মতের কান্ডারী হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ মাসটিকে নিজের মাস হিসেবে উল্লেখ করেছেন যে, শা’বান হচ্ছে আমার মাস।”
শা’বান শব্দের অর্থ শাখা-প্রশাখা। এবং এ অর্থের সাথে মাসটির নাম করণের হুবহু মিল খুজে পাওয়া যায়। যেমন, বর্ণিত আছে যে, শা’বান মাসকে শা’বান হিসেবে নামকরণের কারণ হলো, যেহেতু এ মাসে নেক আমলের অনেক শাখা-প্রশাখা বৃদ্ধি হয়।”
এ মাসের ফযীলত-সম্মান কারোরই অজানা নয়। প্রত্যেকেই কম-বেশী ফযীলত সম্পর্কে অবহিত। মূলতঃ সম্মান ও ফযীলতের দিক থেকে পবিত্র রমাদ্বান মাসের পরই পবিত্র শা’বান মাসের স্থান।
স্বয়ং আল্লাহ্ পাক তাঁর কালামে পাকে এ মাসের ফযীলত বর্ণনা প্রসঙ্গে এরশাদ করেন,
انا انزلنه فى ليلة مبركة انا كنا منذرين فيها يفرق كل امر حكيم.
অর্থঃ- “নিশ্চয়ই আমি কুরআন শরীফ নাযিল করেছি এক বরকতময় রাত্রিতে। নিশ্চয়ই আমি ভীতি প্রদর্শনকারী। উক্ত রাত্রিতে প্রতিটি প্রজ্ঞাসম্পন্ন বিষয়ের ফায়ছালা করা হয়।” (সূরা দুখান/৩-৪)
আয়াত শরীফে ليلة مباركة বা বরকতময় রাত্রি বলতে হযরত মুফাস্সিরীন-ই-কিরামগণ লাইলাতুন্ নিছফি মিন শা’বান তথা শবে বরাতকে উল্লেখ করেছেন। এ রাত্রিতে প্রতিটি প্রজ্ঞাসম্পন্ন বিষয়ের ফায়ছালা করা হয় তার ব্যাখ্যায় হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে, “নিশ্চয়ই বরাতের রাত্রিতে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নামায আদায় করেন এবং বলেন, এ রাত্রিতে লিপিবদ্ধ করা হয় (আগামী এক বছরে) যে সকল আদম সন্তান জন্মগ্রহণ করবে এবং যারা ইন্তেকাল করবে এবং এ রাত্রিতে তাদের আমলনামা আল্লাহ্ পাক-এর নিকট পেশ করা হয় এবং তাদের রিযিকের ফায়ছালা করা হয়।” (বায়হাক্বী শরীফ) অর্থাৎ আল্লাহ্ পাক শবে বরাতে ফায়ছালাকৃত বিষয়সমূহের ফায়ছালা করে অতঃপর লাইলাতুল ক্বদরে তা জারী করে থাকেন।
তাই দেখা যায়, এ মোবারক দিন ও মাসে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, রহমতুল্লিল আলামীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খুব বেশী ইবাদত-বন্দেগীতে নিজেকে নিয়োজিত রাখতেন।
এ প্রসঙ্গে হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে, “হযরত উসামা বিন সায়েদ রদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, আমি আরজ করলাম, ইয়া রসূলুল্লাহ্, ইয়া হাবীবাল্লাহ্ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! শা’বান মাসের ন্যায় এত অধিক রোযা রাখতে আপনাকে দেখিনি। তিনি বললেন, এ মাসে আল্লাহ্ পাক-এর দরবারে আমলসমূহ পেশ করা হয়। তাই আমি চাই আমার আমল যেন রোজা অবস্থায় পেশ করা হয়। তিনি আরো বলেন, যে ব্যক্তি শা’বান মাসে তিন দিন রোজা রাখবে আল্লাহ্ পাক তাকে বেহেশ্তী উটে আরোহন করিয়ে ক্বিয়ামত দিবসে হাজির করাবেন।” (ইবনু নুবাতা)
অপর এক হাদীস শরীফে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন, “যখন শা’বান মাসের ১৫ই তারিখ উপস্থিত হয় তখন ঐ রাত্রিতে তোমরা নামায পড় এবং দিনে রোজা রাখ। কেননা আল্লাহ্ তায়ালা ঐ দিন সূর্যাস্তের পর থেকে পৃথিবীর আসমানে অবতরণ করে ঘোষণা করতে থাকেন, “তোমাদের মধ্যে কেউ ক্ষমাপ্রার্থী আছ কি? তাকে আমি ক্ষমা করে দিব। কেউ রিযিকপ্রার্থী আছ কি? তাকে রিযিক দান করব। কেউ বিপদগ্রস্থ আছ কি? তার বিপদ দূর করে দিব। আল্লাহপাক ফজর পর্যন্ত এভাবে প্রত্যেক হাজতমান্দকে ডেকে বলতে থাকেন।” (ইবনে মাযাহ্ শরীফ)
অপর রেওয়াতে এসেছে, “যে ব্যক্তি ইফতার কালীন হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি তিনবার দরূদ শরীফ পাঠ করবে আল্লাহ্ পাক তার পূর্বের সমস্ত গুণাহ্ ক্ষমা করে দিবেন এবং তার রিযিকে বরকত দান করবেন।”
হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন, আল্লাহ্ পাক শা’বানের ১৫ই তারিখে বনি-কল্ব, বনি-নজর, বনি-রবি এই তিন বংশের বকরী ও ভেড়ার পশমের সমতূল্য আমার বে-শুমার গুণাহ্গার উম্মতকে ক্ষমা করে দিবেন। বর্ণিত আছে, উহাদের প্রত্যেক বংশের ২০ হাজারেরও অধিক বকরী ও ভেড়া ছিল। অর্থাৎ আল্লাহ্ পাক সকল উম্মতে মুহম্মদিকেই ক্ষমা করে দিবেন যারা উক্ত রাত্রিতে খালেছভাবে এস্তেগফার করবে।
শবে বরাতের আমল
এ মোবারক ও ক্ষমার রাত্রিতে যত বেশী ইবাদত-বন্দেগী করা যাবে তত বেশী ফযীলত হাছিল হবে। তাই সকলের উচিত এই মোবারক রাত্রিটি ইবাদত-বন্দেগীতে কাটিয়ে দেয়া।
রাত্রির শুরু ভাগে ওযু-গোসল ও মেসওয়াক করে পাক-ছাফ কাপাড় পরিধান করে আতর-সুরমা মেখে ইবাদতের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা যেতে পারে।
ইবাদতসমূহঃ (১) শবে বরাতের চার, আট, বার রাকায়াত নামায অন্যান্য সুন্নত ও নফল নামাযের নিয়মে আদায় করবে।
(২) ১০০-৩০০ বার নিন্মোক্ত দরুদ শরীফ পাঠ করবে-
اللهم صلى على سيدنا محمدن النبى الامى واله وسلم.
উচ্চারণঃ “আল্লাহুম্মা ছল্লি আলা সাইয়্যিদিনা মুহাম্মাদিনিন নাবিয়্যিল উম্মিয়্যি ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লিম।”
অর্থ ঃ- আয় আল্লাহ পাক, আপনি ছালাত ও সালাম (খাছ রহ্মত ও শান্তি) নাযিল করুন আমাদের রসূল, হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর, যিনি হচ্ছেন নবীয়ে উম্মী এবং তাঁর আল আওলাদ,আজওয়াজ ও আসহাবগণের উপর।
(৩) কিছু সময় আল্লাহ্ পাক-এর যিক্র করবে। যিক্র হচ্ছে- আল্লাহ্ আল্লাহ্ এবং লা-ইলাহ্ াইল্লাল্লাহ্।
(৪) মীলাদ-ক্বিয়াম তৎসঙ্গে ছওয়াব রেছানী করে সম্মিলিত দোয়া বা মুনাজাত করবে।
ছওয়াব রেছানী বা নিয়মঃ
এস্তেগ্ফার তিন বার-
استغفر الله رب من كل ذنب واتوب اليه.
উচ্চারণঃ- “আস্তাগ্ফিরুল্লাহা রব্বি মিন কুল্লি যাম্বিউঁ ওয়া আতুবু ইলাইহি।”
আ’উযুবিল্লাহ্ ও বিস্মিল্লাহ্সহ সূরা ফাতিহা (আল্ হামদু শরীফ) একবার।
বিস্মিল্লাহ্সহ সূরা ইখ্লাস (কুল হুয়াল্লাহ্ শরীফ) তিনবার।
উপরোক্ত দরূদ শরীফ পাঁচবার। এরপর দোয়া করবে।
(৫) কিছু সময় কুরআন শরীফ তিলাওয়াত করবে বা শ্রবণ করবে।
(৬) স্থানীয় বা নিকটবর্তী কোন কবরস্থান যিয়ারত করবে। (৭) বিশেষভাবে ছালাতুত্ তছবীহ্-এর নামায আদায় করবে।
(৮) চার, আট, বার রাকায়াত তাহাজ্জুদ নামায আদায় করবে। অতঃপর বিত্র নামায ও তৎপরবর্তী দু’রাকায়াত হালকী নফল নামায আদায় করবে এবং ছওয়াব রেছানী করে ছুব্হে ছাদিকের পূর্বেই আখেরী মুনাজাত করবে।
(৯) এরপর দিনে রোজা রাখার উদ্দেশ্যে সেহ্রী খেয়ে নেবে। অতঃপর ফজর পর্যন্ত দোয়া-এস্তেগফার, তছবীহ্-তাহলীল পাঠে মশগুল থাকবে।
বিঃ দ্রঃ- তাবারুক বা রটি-হালুয়া পাকাতে এত ব্যস্ত থাকা বা এমন পরিশ্রম করা যাতে রাতের মুল ইবাদত করতে ক্লান্তবোধ করা কিংবা কবরস্থান জিয়ারতে অধিক সময় ব্যয় করা আদৌ ঠিক নয়। আর বিশেষতঃ বোমাবাজি ও আতশবাজি করা সম্পূর্ণ নাজায়েয ও হারাম।॥