সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহ পাক উনার জন্য। যিনি আসমান ও যমীনের সার্বভৌমত্বের মালিক। আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, রহমতুল্লিল আলামীন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার প্রতি অফুরন্ত দরূদ ও সালাম। যিনি সব কুরআন শরীফ উনার মধ্যে সব সময়ের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ।
পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে মহান আল্লাহ পাক তিনি স্বীয় বান্দাদের, দুনিয়ার কল্যাণ এবং আখিরাতের কল্যাণ কামনার দোয়া শিক্ষা দিয়েছেন। যদ্বারা প্রতিভাত হয়, মানুষ দুনিয়া ও আখিরাতে সুস্থ, স্বাভাবিক, সুন্দর ও সমৃদ্ধ জীবন-যাপন করবে- এটাই তার স্বতঃস্ফুর্ত অধিকার। কিন্তু অধিকার বারে বারে ক্ষুন্ন হয় মানব জাতির স্বীয় কর্মকা-ের প্রেক্ষিতেই।
বান্দার সাথে রবের সম্পর্ক বহুমাত্রিক। তন্মধ্যে একটি মাত্রা চুক্তিভিত্তিক। মহান আল্লাহ পাক তিনি বান্দার জীবন-জীবিকা, বেহেশত, সামাজিক সম্প্রীতি, ভারসাম্য, খিলাফত ইত্যাদি সবকিছুরই জিন্মাদারী ঘোষণা করেছেন, পরিবর্তে বান্দাকে দিয়েছেন স্বীয় হুকুম তথা দ্বীন ইসলাম পালনের নির্দেশ। সামাজিক ভারসাম্য, সুসম বণ্টন, মানব সম্পদ উন্নয়ন, অবক্ষয়, দুর্নীতি ও শোষণ মুক্ত সমাজ ইত্যাদি সবকিছুই নির্ভর করে নৈতিকতার উপর। বলা নিস্প্রয়োজন যে, নৈতিকতা আর ইসলামী আদর্শ পালন অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত।
অতি সম্প্রতি জনস্বাস্থ্য বিষয়ে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের প্রথম পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে এই সত্যটিই জোরালোভাবে প্রমাণিত হয়েছে। ১৮৯টি দেশের অংশ নেয়া এই বিশেষ অধিবেশনে জানানো হয় যে, প্রায় ১৩ কোটি মানুষ অধ্যুষিত বাংলাদেশে মাত্র ১৫৭ জন এইডস রোগী রয়েছে। এ তথ্য অধিবেশনে যোগদানকারী বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং এনজিও প্রতিনিধিদের বিস্মিত করে। অথচ এর কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এদেশের পারিবারিক বন্ধন, সামাজিক মূল্যবোধ ও গভীর ধর্মীয় অনুভূতির কথা। সহজ কথায় ইসলামিক আদর্শ অনুসরণের ধারাবাহিকতাই এইডস নামক বিপর্যয়ের ভয়াবহতা থেকে এ জাতিকে রক্ষা করেছে কিন্তু এর সংযুক্ত কথা হিসেবে যা বলতে হয়- নৈতিক স্খলনের এ চরম দিকটির ক্ষেত্রে ব্যাপকতা ততটা দেখা না দিলেও অন্যান্য ক্ষেত্রে নৈতিক অবক্ষয়ের অবস্থা বিশেষ আশঙ্কাজনক।
সম্প্রতি জার্মানভিত্তিক দুর্নীতি বিরোধী বেসরকারি আর্ন্তজাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেসি ইন্টারন্যাশনাল কর্তৃক মন্তব্য করা হয়েছে- বিশ্বের ৯১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্থ দেশ এবং রাজনীতিক ও আমলারা দুর্নীতির শীর্ষে। বলা হয়েছে, এটা না হলে এদেশবাসীর জীবন মান অনেক উন্নত হত। পাশাপাশি অপর এক গবেষণায়, স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সেক্টরে দুর্নীতির পরিমাণ পেশ করা হয়। এতে জানা যায়, দুর্নীতির কারণে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ, পাউবো, নদী গবেষণা, বিএসইসি, এলজিইডি, বিসিআইসি ও জনস্বাস্থ্য, সওজ, এলজিআরডি ইত্যাদি মাত্র কয়েকটি সেক্টরে দুর্নীতির পরিমাণ ৫২, ৩৭২ কোটি টাকা।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ধরা হয়েছে বার্ষিক ৩৮৬ ডলার বা ২২, ১৯৫ টাকা। কিন্তু এই আয়েরও অনেক নীচে অর্থাৎ দারিদ্র সীমার নীচে বাস করে ৪৪.৭% লোক। এই দারিদ্র পীড়িত লোকদের জন্য এ যাবত পর্যন্ত যে একবারেই বরাদ্দ হয়নি তা নয়, বর্তমান বাজেটেরও ২৬ শতাংশ দারিদ্র বিমোচনে রন্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এ বরাদ্দের পরিমাণ ১০ হাজার ৮শ’ ৬৭ কোটি টাকা। কিন্তু প্রাপ্ত তথ্য মতে আমরা জেনেছি, স্বাধীনতা উত্তর এ পর্যন্ত গুটি কয়েক খাতেই দুর্নীতি হয়েছে অর্ধ লক্ষাধিক কোটি টাকা। কাজেই বিগত বছরগুলোতে অন্যান্য খাতে যেমন দুর্নীতি করা হয়েছে তেমনি এই দারিদ্র বিমোচন খাতেও যে দুর্নীতি হয়নি এবং বর্তমানেও যে হবেনা তা আমরা বলতে পারিনা।
যার ফল এই যে, দরিদ্রদের জন্য স্বাধীনতা উত্তর লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা বরাদ্দ হলেও আজও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অগণিত মানুষ রয়েছে, যারা সারাদিনে একবেলা পেট পুরে খেতে পায়না। সরকারি হিসেব মতে খাদ্যশস্য উদ্বৃত্ত হলেও বাস্তবতা এই যে, দারিদ্রপীড়িত লোকদের সেই খাদ্যক্রয়ের ক্ষমতাও নেই। যেহেতু অবিশ্বাশ্য হলেও সত্য যে, তাদের কর্মক্ষম, সবল পুরুষরাই সারাদিনে আয় করে ১৫/২০ টাকা।
স্বাধীনতা উত্তর দুর্নীতি বিস্তারে রাজনৈতিক দলগুলো পরস্পর পরস্পরকে দোষারোপ করেছে। কিন্তু এক্ষেত্রে যে কথাটি বিশেষ প্রনিধানযোগ্য যে, দুর্নীতিকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে মুকাবিলা করা যাবেনা। মূলতঃ দুর্নীতিকে মুকাবিলা করা যাবে নৈতিক আদর্শের প্রতিফলন তথা ইসলামী মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটিয়ে।
স্মর্তব্য, দুর্নীতি একটি সামাজিক ব্যাধি। সমাজের কর্তাব্যক্তিরাই যখন এতে জ্বরাগ্রস্থ হয়ে পড়ে তখন তা গণব্যাধিতে পরিণত হয়। হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে এ বিষয়টিকে আজকের প্রেক্ষাপটে কিয়ামতের আলামত হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়েছে যে, মানুষ জনগণের সম্পদ, অন্যের সম্পদকে ব্যক্তি সম্পদরূপে ব্যবহার করবে।
অভিজ্ঞ মহল মনে করেন যে, বর্তমানে আমরা হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে উল্লিখিত কিয়ামত নিকটবর্তী সময়টিতেই বসবাস করছি। সমাজে আজ অনুপযুক্তরা নেতা হচ্ছে। ইসলামের লেবাছধারীরাও দুনিয়াবী রাজনীতিকদের মত দল বদল, দলগঠন, স্বীয় ফতওয়া পরিবর্তন, নারী নেতৃত্ব অনুমোদন, কুখ্যাত, দুর্নীতিবাজ ও লম্পটের আশ্রয় গ্রহণ ইত্যাদি মহা নোংরামী শুরু করে দিয়েছে। দুর্নীতির করাল ¯্রােতে ভেসে মানুষও যেন খেই হারিয়ে ফেলছে। ইসলামের নামধারী ঐসব ব্যবসায়ী, বিদয়াতী ও বিপথগামী আলিমরা যে কত নিকৃষ্ট কাজ করছে তার মূল্যায়ণ করতে তারা কার্যতঃ ব্যর্থ হচ্ছে। ইসলামের নামে তারা যে লংমার্চ, হরতাল ছবি তোলা, মৌলবাদ, ব্লাসফেমী, নির্বাচন ইত্যাদি বিধর্মী ও বিজাতীয় কর্মসূচী দিচ্ছে তদপ্রেক্ষিতে তাদের গোমরাহ ও বাতিল মালুম করতে দিশেহারা হচ্ছে।
মূলতঃ সমাজের রন্ধ্র রন্ধ্রে দুর্নীতি ও নীতিহীনতা যখন বিস্তার লাভ করে তখন, ইসলাম নামধারীদের প্রতি মানুষের এই নিষ্ক্রয়তাই স্বাভাবিক। কিন্তু কথা ছিল যারা ইসলামের দাবীদার হবেন তারা সাধারণ মানুষকে শুধু নসীহত নয় বরং তাদের শুভ্র, স্বচ্ছ ব্যক্তিত্বের দ্বারা দুর্নীতিমুক্ত করবেন। শোষণ, অবক্ষয় ও অসমবণ্টন মুক্ত সমাজের ভিত্তি স্থাপন করবেন।
মহান আল্লাহ পাক তিনি বলেন, “আর আপনি তাদের অনেককে দেখবেন যে, দৌঁড়ে দৌঁড়ে পাপে, সীমালঙ্ঘনে এবং হারাম ভক্ষণে পতিত হয়। তারা অত্যন্ত মন্দ কাজ করছে। (নামধারী) দরবেশ ও আলিমরা কেন তাদেরকে পাপ কথা বলতে এবং হারাম ভক্ষণ করতে নিষেধ করেনা? তারা খুবই মন্দ কাজ করছে।” (সূরা মায়িদা-৬)
মূলতঃ এরা হল মন্দ আলিম বা উলামায়ে ‘সূ’। এদের মন্দ সংসর্গেই সাধারণ মানুষের মাঝে দুর্নীতি এত বিস্তার লাভ করেছে। কাজেই মন্দ আলিমের পরিবর্তে চাই উলামায়ে হক্কানী-রব্বানীর ছোহবত। যাদের তাছিরে দুর্নীতি ও নৈতিকতাবিহীন শোষণমুক্ত সমাজ পাওয়া সম্ভব।