সমস্ত প্রশংসা যিনি খালিক-মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার। যিনি সবকিছু সম্পর্কে অবগত, যা মানুষ গোপন করে অথবা প্রকাশ করে। সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার প্রতি অনন্ত কালের জন্য অফুরন্ত দরূদ ও সালাম। যাঁকে যিনি খালিক-মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক তিনি সমস্ত ইতিবৃত্তান্ত বা কাহিনী তথা ইতিহাস অবগত করিয়াছেন। “আমি আপনার নিকট উত্তম কাহিনী তথা ইতিহাস বর্ণনা করেছি।” (সূরা ইউসুফ/৩)
কুরআনে কারীমায় মহান আল্লাহ পাক তিনি হযরত আদম আলাইহিস সালাম উনার থেকে আরম্ভ করে হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম উনার পর্যন্ত অনেক আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম, আসহাবে কাহফ, রাণী বিলকিস, হারুত-মারুত, বালয়াম বিন বাউর, ইয়াজুজ-মাজুজ ইত্যাদির ইতিহাস বর্ণনা করেছেন।
মূলতঃ ঈমানদাররাই কুরআনে কারীমায় বিবৃত কাহিনী সম্ভার তথা ইতিহাস ভা-ার থেকে ফায়দা লাভে সক্ষম। “উনাদের কাহিনীতে বুদ্ধিমানদের জন্য রয়েছে, প্রচুর শিক্ষণীয় বিষয়। এটা কোন মনগড়া কথা নয়।” (সূরা ইউসুফ/১১১) কাজেই এটি নসীহত যে, মু’মিনের জীবনে সহীহ ইতিহাসের গুরুত্ব অপরিসীম। যে কারণে অপরাপর বিকৃত আসমানী কিতাবে যেসব ভ্রান্ত ইতিহাসের মিশ্রণ ঘটেছে, এ ধরণের একটি ধারা, ইসরাঈলী রেওয়াতে সম্পর্কে হাদীছ শরীফ-এ বলা হয়েছে, “ইসলামী মূল্যবোধের সাথে যেগুলো খাপ খায়, সেগুলো তোমরা গ্রহণ করবে। আর যেগুলো বিসদৃশ সেগুলো ত্যাগ করবে।” হযরত দাউদ আলাইহিস সালাম মেয়ে লোকের প্রতি আসক্ত হয়েছিলেন, হারুত-মারুত ফেরেশতাদ্বয়ও মেয়ে লোকের প্রতি ঝুঁকে ছিলেন, এগুলো ইসরাঈলী রেওয়ায়েত এবং তা পরিত্যজ্যও বটে।
ইতিহাস একটা বহতা নদীর নাম। অতীতের মানবগোষ্ঠীর কার্যকলাপ সম্পর্কীয় চিন্তন। মূলতঃ অতীত সম্পর্কে পুরোপুরি জ্ঞান লাভ দুস্কর। ইতিহাস গবেষণার বিষয়ে তাই ক্ষেত্র নির্বাচন ও কাল বিভাজনের প্রতি গুরুত্বারোপ বাঞ্ছনীয়।
১৮০৩ সালে মুঘল সা¤্রাজ্যের পতনের পর ১৮২৭ সালে অমিত তেজা জিহাদী জজবা নিয়ে খিলাফত আলা মিনহাজুন নবুওয়াহ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন, আওলাদে রসূল, মুজাহিদে আ’যম, খলীফাতুল্লাহ, আমীরুল মু’মিনীন হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি।
ইতিহাসের সিঁড়িতে ধূর্ত ইংরেজ জাত, কৃত্রিম উপায়ে ধর্মীয় চেতনার বিভাজন তৈরি করে, সেটিকে নিজেদের কায়েমী স্বার্থবাদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে বরাবর। এ প্রেক্ষাপটে সুদীর্ঘ দেড়শ দু’শ বছরের পরাধীন ভারতবর্ষে পাশ্চাত্যমুখী শিক্ষা ও পাশ্চাত্য লেখকের ইতিহাস অনুসরণ করার ফলে কেউ কেউ ইংরেজদের শেখানো বুলি মুতাবিক আমীরুল মু’মিনীন হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে অন্যায়ভাবে ওহাবী বলে আখ্যা দিয়েছে। নাকেছ আহমদ রেযা খান তাদের হোতা।
মূলতঃ এরূপ ঘটনার রূপায়ন ঘটেছে সর্বত্র। মুসলিম ঐতিহ্যকে গর্ব করার জন্যই প্রকৃত ইসলাম দরদীদের চরিত্র হনন করা হয়েছে। আওরঙ্গজেবের চরিত্রে বিকৃতি এবং আকবরের চরিত্রে উজ্জ্বলতা দেয়া হয়েছে, একই ধারাবাহিকতায়। এলগিন, হ্যামিলটন, কিম্বার্লি, রিজলি, লর্ড হার্ডিঞ্জ, টমসন, জন মিল্কস, মিঃ কর্নাটকস, লর্ড এলেনবরা প্রমুখ ঐতিহাসিক ভারতে মুসলিম শ্রদ্ধাভাজনদের বিপরীতে অপবাদ রচনা করে। অনুরূপভাবে, উইলিয়াম মূর, ডাঃ স্প্রেঙ্গার, বসওয়ার্থ স্মিথ, লর্ড এলফিন ষ্টোন, মিঃ ওয়েল, হোটাঙ্গার, লিসিঙ্গ, রডওয়েল পামর প্রমুখ ঐতিহাসিকগণ সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদের সম্পর্কে বিকৃত তথ্য দিয়ে ইসলামের অপপ্রচার করে। আর আমাদের দেশের কতিপয় অর্বাচীন ঐতিহাসিক তাদের তথ্যকেই গ্রহণ করে বলে, “হযরত মুয়াবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি হক্বের উপর ছিলেন না।” নাউযুবিল্লাহ!
এক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য, আমাদের সতর্কতার সাথে মনে রাখতে হবে যে, ইসলাম সম্পৃক্ত ইতিহাস রচনা সাধারণ ইতিহাসের মত অবাধ নয়। প্রাচীন ঐতিহাসিকদের বরাত থাকলেই তার উপর ভিত্তি করে নিজস্ব চিন্তনের মাধ্যমে ইসলামের ইতিহাস রচনা করার ক্ষমতা কারো নেই। বরং ইহা সর্বোতরূপেই কুরআন শরীফ, হাদীছ শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াস-এর মানদ- দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।
হযরত আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম মা’ছূম। হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনারা ভুল-ত্রুটি তথা সমালোচনার উর্ধ্বে। তাই হযরত মুয়াবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি সহ যে কোন ছাহাবা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনারই সমালোচনামূলক ঐতিহাসিক তথ্যকে সম্পূর্ণই ভুল বলে গণ্য করতে হবে। আর এও মনে রাখতে হবে যে, হযরত আউলিয়ায়ে কিরাম উনারা হচ্ছেন, মাহফুজ। কাজেই কোন মকবুল ওলীআল্লাহ উনার বিরুদ্ধে কোন অজ্ঞ ও ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তির কোন মিথ্যা মন্তব্য থাকলেও তা মোটেও গ্রহণ করা যাবে না। যেমনটি করা যাবেনা, আমীরুল মু’মিনীন, হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার ক্ষেত্রেও। করলে সেটি হবে প্রকৃত ইতিহাস সম্পর্কে তাদের অজ্ঞতারই বহিঃপ্রকাশ।
উল্লেখ্য, বর্তমানে যে সমস্ত ওলামায়ে “ছূ”রা লংমার্চ, হরতাল, মৌলবাদ, ব্লাসফেমী, নির্বাচন, গণতন্ত্র ইত্যাদি হারাম কাজ করছে তারাও মূলতঃ সংশ্লিষ্ট বিজাতীয় ইতিহাস সম্পর্কে বড়ই অজ্ঞ।
বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এই অজ্ঞতা থেকে উত্তরণ লাভ করতে হলে ইলমে লাদুন্নী সমৃদ্ধ হক্কানী-রব্বানী ওলীআল্লাহগণ উনাদের মজলিস তথা ছোহবতই একমাত্র মাধ্যম।
অগণিত পাঠকের দীর্ঘ আবেদন-নিবেদনের প্রেক্ষিতে এ সংখ্যা থেকে যিনি খালিক-মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার অশেষ রহমতে বর্ধিত কলেবরে প্রকাশিত হলো, মাসিক আল বাইয়্যিনাত। সঙ্গতকারণেই মূল্য খানিক বৃদ্ধি পেলেও আগের চেয়ে অনেক বেশি লেখা পেয়ে সম্মানিত পাঠকগণ আরো তৃপ্তি লাভ করবেন বলে আমাদের বিশ্বাস। তাজদীদী মুখপত্র মাসিক আল বাইয়্যিনাত-এর এ মুবারক অগ্রযাত্রায় আমরা জানাই যিনি খালিক-মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার অশেষ শুকরিয়া।