সুওয়াল-জাওয়াব

সংখ্যা: ৯৫তম সংখ্যা | বিভাগ:

মুহম্মদ আব্দুল ক্বাদির বাদল

বাসাবো, ঢাকা।

সুওয়াল: ঢাকা মুহম্মদপুর জামিয়া রাহমানিয়া থেকে প্রকাশিত অখ্যাত পত্রিকার জুন/২০০১ ঈসায়ী সংখ্যায় জিজ্ঞাসার-জবাব বিভাগে ৮৩৩ নং জিজ্ঞাসার-জবাবে বলা হয়েছে “বেতের নামাযের পর দুই রাকআত নফল নামায দাড়িয়ে পড়লেই ছাওয়াব বেশী হয়।” (আদদুররুল মুখতার ২ঃ ৩৭, ইমদাদুল ফাতাওয়া ১ঃ ৪৫৯, ৪৬১)

          আর হাটহাজারী মাদ্রাসা থেকে মৌলভী আহমদ শফীর সম্পাদনায় প্রকাশিত অখ্যাত পত্রিকার জুন’ ২০০১ ঈসায়ী সংখ্যায় জিজ্ঞাসা-সমাধান বিভাগে ৩৩৩৯ নং জিজ্ঞাসার সমাধানে বলা হয়েছে, “ফিক্বাহ শাস্ত্রের ভাষ্যমতে প্রতীয়মান হয় যে, বিত্রি নামাযের পর নির্দিষ্ট করে দুই রাক্আত নফল পড়া কোন ইমামের মতেই মুস্তাহাব নয়।” ….. “মালাবুদ্দায় বর্ণিত অভিমত ফুক্বাহায়ে কিরামদের রায় সম্মত নয়।”

          এখন আমার সুওয়াল হলো- “বিত্র নামাযের পর দু’রাকায়াত নফল নামায বসে আদায় করা” সম্পর্কে উক্ত অখ্যাত পত্রিকাদ্বয়ের বক্তব্য সঠিক হয়েছে কি? দয়া করে দলীল আদিল্লাহসহ বিস্তারিত জানিয়ে আমাদের সন্দেহ দূর করবেন।

জাওয়াবঃ   বিত্র নামাযের পর দু’রাকায়াত নফল নামায যাকে “হালক্বী নফল” বলা হয়, তা বসে আদায় করা সম্পর্কে উল্লিখিত পত্রিকাদ্বয়ের উক্ত বক্তব্য সম্পূর্ণই ভুল ও অশুদ্ধ হয়েছে।

          যেমন, জামিয়া রাহমানিয়া থেকে প্রকাশিত পত্রিকায় বলা হয়েছে “বেতের নামাযের পর দুই রাক্আত নফল নামায দাড়িয়ে পড়লেই ছাওয়াব বেশী হয়।”

অথচ, “ইবনে মাযাহ্ শরীফের” ৮৫ পৃষ্ঠায় বর্ণিত আছে,

عن ام سلمة رضى الله تعالى عنها ان النبى صلى الله عليه وسلم كان يصلى بعد الوتر ركعتين خفيفتين وهو جالس.

অর্থঃ- “উম্মুল মু’মিনীন হযরত উম্মে সালমা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা হতে বর্ণিত আছে যে, আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিত্র নামাযের পর সংক্ষিপ্তাকারে দু’রাকায়াত নফল নামায বসেই আদায় করতেন।”

          উপরোক্ত হাদীস শরীফ দ্বারা সুস্পষ্টভাবে এটাই প্রমাণিত হলো যে, আখিরী রসূল, হাবীবুল্লাহ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম “বিত্র নামাযের পর দু’ রাকায়াত নফল নামায বসেই আদায় করেছেন। আর হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা করেছেন তার মধ্যেই অর্থাৎ ইত্তিবায়ে রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মধ্যেই বেশী ছওয়াব ও সর্বাধিক ফযীলত নিহিত রয়েছে।

          উল্লেখ্য যে, জামিয়া রাহমানিয়া থেকে প্রকাশিত অখ্যাত পত্রিকাটি তার বক্তব্যের স্বপক্ষে দলীল হিসেবে দু’টি কিতাবের বরাত দিয়েছে।

 প্রথমটা হচ্ছে, “আদদুররুল মুখতার” ২ঃ ৩৭।

          এর জবাবে বলতে হয় যে, তারা “আদ্ দুররুল মুখতার” কিতাবের ২য় খন্ডের ৩৭ পৃষ্ঠার বরাত দিয়ে বলেছে যে, “বেতের নামাযের পর দুই রাকআত নফল নামায দাঁড়িয়ে পড়লেই ছাওয়াব বেশী হয়।”

          তাদের এ বক্তব্য সম্পূর্ণই ভুল, মিথ্যা ও ধোকাপূর্ণ। কারণ বিত্র নামাযের পর দু’রাকায়াত নফল নামায যাকে হালক্বী নফল বলা হয় তা দাঁড়িয়ে পড়লেই যে ছাওয়াব বেশী হয় তাদের এ বক্তব্যের স্বপক্ষে কোন উদ্ধৃতি, কোন ইবারত “আদ্ দুররুল মুখতার” কিতাবের ২য় খন্ডের ৩৭ পৃষ্ঠায় উল্লেখ নেই।

          সুতরাং প্রমাণিত হলো জামিয়া রাহমানিয়ার হদসগংদের উক্ত বক্তব্য সম্পূর্ণই মনগড়া, মিথ্যা ও ধোকাপূর্ণ। আরো প্রমাণিত হলো যে, তারা “আদ্ দুররুল মুখতার” কিতাবের ২য় খন্ডের ৩৭ পৃষ্ঠার বরাত দিয়ে সাধারণ মানুষকে ধোকা দিয়েছে।

          দ্বিতীয়টা হচ্ছে “ইমদাদুল ফতওয়া” ১ঃ ৪৫৯, ৪৬১।

          এর জবাবে বলতে হয় যে, তারা তাদের বক্তব্য পেশ করে দ্বিতীয় দলীল হিসেবে “ইমদাদুল ফতওয়ার” বরাত দিয়েছে। প্রকৃতপক্ষে “ইমদাদুল ফতওয়ায়” বর্ণিত বিত্র নামাযের পর দু’ রাকায়াত নফল নামায সম্পর্কিত ফতওয়াটি ভুল ও অশুদ্ধ। কারণ উক্ত কিতাবের লিখক হাদীস শরীফের সঠিক ব্যাখ্যা অনুধাবনে ব্যর্থ হয়েছে যার ফলশ্রুতিতে তার সাথে সংশ্লিষ্ট সকলের ফতওয়াই ভুল হয়েছে। কারণ তাতে বর্ণিত রয়েছে, আম ও খাছ লোকদের মাঝে হালক্বী নফল সম্পর্কে যে খিলাফ আমল প্রচলিত আছে তার কোন দলীল নেই এবং উর্দু ও ফারসী কিতাবে যা বিবৃত আছে তা নির্ভরযোগ্য কোন বর্ণনা থেকে উল্লেখ করা হয়নি।

          অথচ “ইমদাদুল ফতওয়ার” লিখক থেকে অনেক বেশী মুহাক্কিক, মুদাক্কিক, বুযুর্গ, ইমাম-মুজতাহিদগণ হাদীস শরীফের পরিপ্রেক্ষিতে লিখেছেন যে, “বিত্রের পর দু’রাকায়াত হালক্বী নফল নামায বসে পড়া মুস্তাহাব অর্থাৎ মুস্তাহাব-সুন্নত।”

          যেমন, বিশিষ্ট ইমাম ও মুজতাহিদ এবং বিশিষ্ট ফক্বীহ্ ও সূফী সর্বজনস্বীকৃত, সর্বজনমান্য ও বিশ্বখ্যাত তাফসীরগ্রন্থ “তাফসীরে মাযহারীর” সম্মানিত মুফাস্সিরে আ’যম আল্লামা হযরত কাজী ছানাউল্লাহ্ পানি পথী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর ফার্সী ভাষায় রচিত “মালাবুদ্দা মিনহু” কিতাবে বিত্রের পর দু’রাকায়াত হালক্বী নফল নামায সম্পর্কে লিখেছেন, “বিত্রের পর দু’রাকায়াত হালক্বী নফল নামায বসে পড়া মুস্তাহাব অর্থাৎ মুস্তাহাব-সুন্নত।”

          হাদীয়ে বাঙ্গাল, আল্লামা হযরত কারামত আলী জৌনপুরী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর উর্দু ভাষায় লিখিত “মেফতাহুল জান্নাত” কিতাবে উল্লেখ করেছেন, “হালক্বী নফল নামায বসে পড়া সুন্নত।”

          ফক্বীহুল আছার, মুফতীউল আ’যম আল্লামা হযরত সাইয়্যিদ আমীমুল ইহ্সান মুজাদ্দেদী বরকতী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর উর্দু ভাষায় লিখিত “হাদিয়াতুল মুছল্লীন” কিতাবে বর্ণনা করেছেন, “বিত্রের পর দু’রাকায়াত হালক্বী নফল নামায বসে পড়া মুস্তাহাব-সুন্নত।”

          এছাড়া ফিক্বাহ্র বিশিষ্ট কিতাব “বাজ্জার” কিতাবেও অনুরূপ ফতওয়া বর্ণিত হয়েছে।

          উল্লেখ্য, হাদীস শরীফে স্পষ্ট বর্ণনা থাকার পর এবং হাদীস শরীফ থেকে দলীল দেয়ার পরও কি করে বলা যেতে পারে, “কোন নির্ভরযোগ্য দলীল নেই।” তাহলে কি হাদীস শরীফ দলীল হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়?

          তাহলে আশরাফ আলী থানভী ছাহেবের বর্ণনা মুতাবিক “মালাবুদ্দা মিনহু, মিফতাহুল জান্নাত ও হাদিয়াতুল মুছল্লীন” কিতাবগুলো ফার্সী ও উর্দু ভাষায় লিখিত হওয়ার কারণে হাদীস শরীফের দলীল থাকার পরও যদি গৃহীত না হয়ে থাকে, তাহলে আশরাফ আলী থানভী ছাহেবের “ইমদাদুল ফতওয়ার” বর্ণনা যা হাদীস শরীফের বর্ণনার খিলাফ তা তো আরো বেশী গ্রহণযোগ্য হবেনা। কারণ উক্ত কিতাবও উর্দু ভাষায় লিখিত এবং তা নির্ভরযোগ্য হাদীস শরীফের খিলাফ।

          অতএব, “মালাবুদ্দা মিনহু, মিফতাহুল জান্নাত ও হাদিয়াতুল মুছল্লীন, বাজ্জার” কিতাবের মুকাবিলায় আশরাফ আলী থানভী ছাহেবের “ইমদাতুল ফতওয়ার” বক্তব্য সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাজ্য, যা কস্মিনকালেও গ্রহণযোগ্য নয়।

          আর হাটহাজারীর মৌলভী আহমক শফী বলেছে, “ফিক্বাহ শাস্ত্রের ভাষ্যমতে প্রতীয়মান হয় যে, বিতির নামাযের পর নির্দিষ্ট করে দুই রাকআত নফল পড়া কোন ইমামের মতেই মুস্তাহাব নয়। …..”

          এর জবাবে বলতে হয় যে, কোন্ কোন্ ফিক্বাহ শাস্ত্রের ভাষ্য মতে এবং কোন্ কোন্ ইমামের মতে “বিত্র নামাযের পর দু’রাকায়াত নফল পড়া মুস্তাহাব নয় তা মৌলভী আহমক শফী তার মুখপত্রে উল্লেখ করেনি। আর আহমক শফী তার বক্তব্যের স্বপক্ষে নির্ভরযোগ্য একটি ফিক্বাহর কিতাব থেকে দলীলও পেশ করেনি এবং একজন ইমামের নামও উল্লেখ করেনি।

          সুতরাং মৌলভী আহমক শফীর মনগড়া ও দলীল বিহীন বক্তব্য মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়।

          কেননা, বিত্র নামাযের পর দু’রাকায়াত নফল নামায বসেই আদায় করা যে খাছ সুন্নত তা বর্ণনার জন্য অন্য কারো মতের অপেক্ষা রাখেনা। কারণ যিনি আখিরী রসুল, হাবীবুল্লাহ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি স্বয়ং নিজেই বিত্র নামাযের পর ছোট সূরা দিয়ে সংক্ষিপ্তাকারে দু’রাকায়াত নফল নামায বসেই আদায় করে উম্মতদের দেখিয়ে দিয়েছেন। আর এটাই চুড়ান্ত মত, চুড়ান্ত ফায়সালা।

          আর আহমক শফী ও তার সমজাতীয়রা একটি হাদীস শরীফ উল্লেখ করতে পারবে কি? যে, আখিরী রসূল, হাবীবুল্লাহ্ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিত্র নামাযের পর দু’রাকায়াত হালক্বী নফল নামায ছোট-ছোট সূরা দিয়ে সংক্ষিপ্তাকারে দাঁড়িয়ে আদায় করেছেন?

          অথবা তারা কি একটি হাদীস শরীফ দ্বারা প্রমাণ করতে পারবে যে, আখিরী রসূল, হাবীবুল্লাহ্ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিত্র নামাযের পর দু’রাকায়াত হালক্বী নফল নামায বসে আদায় করতে নিষেধ করেছেন? কস্মিনকালেও তা তারা পারবে না।

          তৃতীয়তঃ মৌলভী আহমক শফী বলেছে, “মালাবুদ্দায়” বর্ণিত অভিমত ফুক্বাহায়ে কিরামদের রায় সম্মত নয়।”

          এর জবাবে বলতে হয় যে, হানাফী মাযহাবের বিশিষ্ট ইমাম ও মুজতাহিদ, বিশিষ্ট ফক্বীহ, মুজাদ্দিদিয়া ত্বরীকার বিশিষ্ট সুফী, বিশ্ববিখ্যাত মা’রিফাত তত্ত্ববিদ আউলিয়া হযরত মির্জা মাযহার জানে জানান শহীদ রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর বিশিষ্ট খলীফা ইলমুল হুদা, বাইহাক্বীয়ে ওয়াক্ত বিস্ময়কর প্রতিভার অধিকারী, সর্বজনমান্য, সর্বজনস্বীকৃত ও বিশ্বখ্যাত তাফসীর গ্রন্থ “তাফসীরে মাযহারীর” সম্মানীত লিখক মুফাস্রিরে আ’যম, আল্লামা হযরত কাজী ছালাউল্লাহ্, হানাফী, মুজাদ্দিদী পানিপথী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর ফার্সী ভাষায় রচিত বিখ্যাত কিতাব যা প্রায় তিনশত বছর ধরে অত্যন্ত আদব ও মুহব্বতের সঙ্গে পঠিত “মালাবুদ্দা মিনহু” কিতাবের ৭৪-৭৫ পৃষ্ঠায় বর্ণিত রয়েছে,

بعد وتر دو ركعت نشسته خواندن مستحب ست.

অর্থাৎ- “বিত্র নামাযের পর দু’রাকায়াত নফল নামায বসে আদায় করা মুস্তাহাব।”

          “মালাবুদ্দা মিনহু” কিতাবের বর্ণিত এই অভিমতটি কোন্ কোন্ ফুক্বাহা-ই-কিরামদের রায় সম্মত নয়, তা মৌলভী আহমক শফী দলীলসহ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেনি।

          সুতরাং মৌলভী আহমক শফীর মনগড়া, দলীলবিহীন ও অস্পষ্ট বক্তব্য মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়।

          অথবা মৌলভী আহমক শফী “মালাবুদ্দা মিনহু” কিতাবের অনুরূপ তিনশত বছর পূর্বের একটি নির্ভরযোগ্য কিতাবের ইবারত দ্বারা প্রমাণ করে দিক যে, “মালাবুদ্দা মিনহু” কিতাবে ‘বিত্র নামাযের পর দু’রাকায়াত নফল  নামায বসে আদায় করা মুস্তাহাব’ সম্পর্কে বর্ণিত অভিমতটি ফুক্বাহা-ই-কিরামদের রায় সম্মত নয়।

          অতএব, আবারো প্রমাণিত হলো যে, বিতর নামাযের পর দু’রাকায়াত নফল নামায ছোট ছোট সূরা দিয়ে সংক্ষিপ্তাকারে (যাকে হালক্বী নফল বলা হয়) তা বসেই আদায় করা খাছ সুন্নত এবং অধিক ফযীলত ও বুযুর্গীর কারণ।

          কাজেই যারা বিত্রের পর দু’রাকায়াত নফল নামায দাঁড়িয়ে পড়ার পক্ষে বলে থাকে, তাদের বক্তব্য দলীল বিহীন, মনগড়া, বিভ্রান্তিকর ও কুরআন-সুন্নাহ্র খিলাফ।

          সুতরাং আহমক শফী, হদস ও তার সমজাতীয়দের বক্তব্য সম্পূর্ণরূপে ভুল বলে প্রমানিত হলো।

          (বিঃ দ্রঃ এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হলে “মাসিক আল বাইয়্যিনাত” ৫৮তম সংখ্যা পড়ুন)।

মুহম্মদ মঈনুদ্দীন

সভাপতি- আঞ্জুমানে আল বাইয়্যিনাত

উত্তরা, ঢাকা।

সুওয়াল:  মাসিক মদীনা জুন/২০০১ ঈসায়ী সংখ্যায় নিম্নোক্ত প্রশ্নোত্তর ছাপা হয়।

প্রশ্নঃ লোকমুখে শুনা যায় বিবাহিত ব্যক্তির দু’রাকায়াত নামায অবিবাহিত ব্যক্তির নিরানব্বই রাকায়াত নামাযের সমান সওয়াব হয়। জিজ্ঞাসা হলো এটা কি হাদীস সমর্থিত কথা?

উত্তরঃ  এ জাতীয় কথা কোন সহীহ হাদীসে পাওয়া যায়নি। এটা নিতান্ত মনগড়া উক্তি, বিবাহের অনেক ফযিলত হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। হাদীসে এসেছে বিবাহের মধ্যে রয়েছে অর্ধ দ্বীন, এ দ্বারা হাত, পা, চক্ষু, ও লজ্জাস্থান, গুনা থেকে সংযমে থাকতে পারে।

          এখন আমার সুওয়াল হলো- সত্যিই কি বিবাহিত ব্যক্তির নামাযের আলাদা ফযীলত সংক্রান্ত এরূপ কোন হাদীস নেই। যদি এ জাতীয় কোন হাদীস শরীফ থাকে তবে তাকে “নিতান্ত মনগড়া উক্তি” বলার ফায়সালা কি?

জাওয়াব: মাসিক মদীনার উপরোক্ত উত্তর সম্পূর্ণই ভুল, অশুদ্ধ ও কুফরীমূলক হয়েছে। কারণ মাসিক মদীনার সম্পাদক নিতান্ত মূর্খ হওয়ায় হাদীস সমর্থিত কথাকে নিতান্ত মনগড়া উক্তি বলেছে।

          মূলতঃ এ বিষয়ে সওয়াবের সংখ্যার বিভিন্নতায় অনেক হাদীস শরীফ বর্ণিত হয়েছে। অর্থাৎ অবিবাহিত ব্যক্তির নামাযের চেয়ে বিবাহিত ব্যক্তির নামাযের ফযীলত ৪০, ৭০, ৮২ গুণ বেশী বলে বিভিন্ন বর্ণনা রয়েছে।

          যেমন, হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে- আখিরী রসূল, হাবীবুল্লাহ্ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন,

صلاة متزوج افضل من اربعين صلاة من أعزب وركعتان من متختم افضل من سبعين ركعة بغير خاتم.

অর্থঃ “বিবাহিত ব্যক্তির নামায অবিবাহিত ব্যক্তির নামাযের চেয়ে ৪০ গুণেরও বেশী ফযিলত পূর্ণ। আর বিবাহিতা মহিলার দু’রাকায়াত নামায অবিবাহিতা মহিলার ৭০ রাকায়াতের চেয়েও শ্রেষ্ঠ।” (ফিরদাউস ২/৩৯০)

          অন্য হাদীস শরীফে উল্লেখ রয়েছে- আখিরী নবী, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, রহমতুল্লিল আলামীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন,

ركعتين من المتزوج افضل من سبعين ركعة من العزب.

অর্থঃ “বিবাহিত ব্যক্তির দু’রাকায়াত নামায অবিবাহিত ব্যক্তির ৭০ রাকায়াতের চেয়েও শ্রেয়।” (মিশকাতুল আনওয়ার)

          এ ছাড়াও আরো অনেক হাদীস শরীফ রয়েছে যাতে অবিবাহিত ব্যক্তির নামাযের চেয়ে বিবাহিত ব্যক্তির নামাযের বেশী ফযীলত উল্লেখ করা হয়েছে।

          অতএব, শরীয়তের ফতওয়া হচ্ছে, যা হাদীস শরীফ নয়  তাকে হাদীস শরীফ বলা যেমন কুফরী অনুরূপ যা হাদীস শরীফ বা যা হাদীস শরীফে রয়েছে তাকে মনগড়া উক্তি বলে অভিহিত করা কিংবা অস্বীকার করা বা এ জাতীয় কোন কথা হাদীস শরীফে নেই বলাও স্পষ্টতঃই কুফরী। কারণ এরূপ বলার দ্বারা আল্লাহ পাক-এর হাবীব, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, রহমতুল্লিল আলামীন, নূরে মুজাস্সাম, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতি মিথ্যারোপ করা হয়।    অথচ হাদীস শরীফে রয়েছে

من كذب على متعمدا فليتبوأ مقعده من النار.

অর্থঃ- “যে আমার প্রতি মিথ্যারোপ করে সে যেন দুনিয়ায় থাকতেই তার স্থান জাহান্নামে নির্ধারণ করে নেয়।” (বুখারী শরীফ)

          মূলতঃ যারা হরদম হারাম কাজে মশগুল, ফরয পর্দা তরক করে বেগানা মহিলার সাথে মিছিল-মিটিং ও আন্দোলন করে, অহরহ হারাম ছবি তোলায় ব্যস্ত তাদের পক্ষেই সম্ভব এরূপ ছহীহ হাদীস শরীফ দ্বারা অকাট্য বিষয়কে “নিতান্ত মনগড়া উক্তি” বলা।

কারণ হাদীস শরীফে রয়েছে,

فما اخرج العلم من قلوب العلماء قال الطمع.

অর্থঃ “কোন জিনিষ আলিমের অন্তর থেকে ইল্মকে বের করে দেয়? তিনি বলেন, দুনিয়ার লোভ।” (দারেমী, মিশকাত/৩৭)

          মাসিক মদীনার সম্পাদকের অবস্থাও তাই। দুনিয়ার মোহে মোহগ্রস্ত হয়ে হারাম নাজায়েয কাজে মশগুল থাকার কারণে তার অর্জিত ইল্মটুকুও ছলব হয়ে গেছে। যার কারণে সে প্রায়শঃই তার পত্রিকায় দলীলবিহীন, মনগড়া ও কুফরীমূলক বক্তব্য পেশ করে থাকে।

          অতএব, বিবাহিত ব্যক্তির নামায অবিবাহিত ব্যক্তির নামাযের চেয়ে বেশী ফযীলতপূর্ণ। এ সম্পর্কে বর্তমান সংখ্যায় মাত্র দু’টি হাদীস শরীফ বর্ণনা করা হলো। এ সম্পর্কে আরো অনেক হাদীস শরীফ রয়েছে যা প্রয়োজনে আলোচনা করা হবে। (ইনশাআল্লাহ্)

          {দলীলসমূহঃ বুখারী, ইবনে মাযাহ্, মিশকাত, ফিরদাউস লিদ্ দায়লামী, ফতহুল বারী, উমদাতুল ক্বারী, মিরকাত, মিশকাতুল আনওয়ার, আশয়াতুল লুময়াত, তিরমিযী, তালিক্ব, মুযাহেরে হক্ব, তীবি ইত্যাদি}

সাইয়্যিদ মুহম্মদ মোক্তাদুল ইসলাম (মিলন)

সভাপতি- ছাত্র আঞ্জুমানে আল বাইয়্যিনাত

সুবহানী ঘাট, সিলেট।

সুওয়ালঃ রেযাখানী মাযহাবের মূখপত্র ডিসেম্বর/২০০০ঈঃ সংখ্যায় তাফসীরে রুহুল বয়ান, বুখারী, গুনিয়াতুত তালিবীন, রেজভীয়া কিতাবের বরাত দিয়ে বলেছে, “সহীহ্ মুসলিম শরীফ সহ অনেক নির্ভরযোগ্য কিতাবে নফল নামায বিশেষতঃ ক্বদর ও বরাতের নফল নামায জামাত সহকারে আদায় করা বৈধ…….।”

          আর আপনারা মাসিক আল বাইয়্যিনাতে লিখেছেন তারাবীহ, ছলাতুল কুছুফ, (সূর্য গ্রহণের নামায) ছলাতুল ইস্তেস্কা, (বৃষ্টির নামায) এইতিন প্রকার নামায ব্যতীত যেমন লাইলাতুল ক্বদর, লাইলাতুল বরাত, তাহাজ্জুদ, চাশ্ত, আওয়াবীন ইত্যাদি নফল নামায সমূহ ইমামের সহিত চারজন মুক্তাদীসহ জামায়াতে আদায় করা মাকরূহ তাহ্রীমী ও বিদ্য়াতে সাইয়্যিয়াহ্। কোনটি সঠিক?

          আর বুখারী, মুসলিম শরীফে কি ক্বদর ও বরাতের নফল নামায জামায়াতের সাথে আদায় করার কথা উল্লেখ আছে? দয়া করে জানাবেন।

জাওয়াবঃ রেযাখানী মুখপত্রের উক্ত বক্তব্য সম্পূর্ণ ভুল, জিহালতপূর্ণ ও প্রতারণামূলক; যা শরীয়তে গ্রহণযোগ্য নয়। তারা “তাফসীরে রুহুল বয়ান, বুখারী, গুনিয়াতুত্ তালেবীন” ইত্যাদি কিতাবের নাম দিয়ে যে বক্তব্য প্রদান করেছে আসলে উক্ত কিতাবসমূহের বক্তব্য সে রকম নয়। বরং তার সম্পূর্ণ বিপরীত।

          তারা “তাফসীরে রুহুল বয়ান-এর ইবারতের অর্থে “শরহে নেকায়া ও মুহিত” কিতাবের এবং “বুখারী ও মুসলিম শরীফের” বরাত দিয়ে নফল নামায বিশেষতঃ “শবে বরাত, শবে ক্বদরের” নফল নামায আযান ইক্বামত ছাড়া জামায়াত সহকারে আদায় করা যে বৈধ বলেছে, তা আমরা আমাদের “মাসিক আল বাইয়্যিনাত” এর বিগত সংখ্যাগুলোতে বিস্তারিত ভাবে বিশ্লেষণ করে প্রমাণ করেছি যে, তাদের বক্তব্য সম্পূর্ণই ভুল, জিহালতপূর্ণ, জালিয়াতী ও প্রতারণামূলক।

          কারণ তারা কিতাবের ইবারত, সঠিক অর্থ ও ব্যাখ্যা অনুধাবনে ব্যর্থ হয়ে ইবারত কারচুপি করে “তাফসীরে রুহুল বয়ান, বুখারী ও মুসলিম শরীফের” বরাত দিয়ে যেটা বলতে চেয়েছে আসলে উক্ত কিতাবসমূহের বক্তব্য সে রকম নয়।

          কেননা, রেযাখানীরা “বুখারী ও মুসলিম শরীফের” ১ম খন্ডের বরাত দিয়ে যে হাদীস শরীফ দু’খানা উল্লেখ করেছে উক্ত হাদীস শরীফদ্বয়ে “শবে বরাত ও শবে ক্বদরের” নামায জামায়াত সহকারে আদায় করার কোন বর্ণনাই নেই। সুতরাং রেযাখানীরা কিতাবের নাম ব্যবহার করে যে প্রতারণা করেছে “মাসিক আল বাইয়্যিনাত”-এর বিগত সংখ্যাগুলোর আলোচনা দ্বারাই তা প্রমাণিত হয়েছে। এর পরেও যদি প্রয়োজন হয় তাহলে পরবর্তীতে আরো বিস্তারিত ভাবে দলীল আদিল্লাহ্সহ “তাফসীরে রুহুল বয়ান, বুখারী ও মুসলিম শরীফের” বক্তব্য ধারাবাহিকভাবে পর্যালোচনা করা হবে ইন্শাআল্লাহ্।

(ধারাবাহিক)

বর্তমান সংখ্যায় “গুনিয়াতুত্ তালেবীন”-এর

 বক্তব্য বিস্তারিত ভাবে পর্যালোচনা করা হলো-

          উল্লেখ্য, রেযাখানীরা আযান-ইক্বামত ছাড়া নফল নামায বিশেষতঃ “শবে বরাত, শবে ক্বদরের” নফল নামায জামায়াত সহকারে আদায় করা বৈধ বলে।

          পীরানে পীর দাস্তগীর, গাউসুল আযম হযরত বড় পীর ছাহেব রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর “গুনিয়াতুত্ তালেবীন” কিতাবের বরাত দিয়ে যে উর্দূ ইবারতটুকু উল্লেখ করেছে, তাতে বলা হয়েছে,

উর্দূ কম্পোজ করতে হবে

অর্থঃ- “আগের বা পূর্বের জামানা বা যুগের নেককার লোকেরা এই নামায জামায়াতের সাথে আদায় করতেন।”

          প্রথমতঃ আফসুস! এই সমস্ত বক্তব্য কাটছাটকারী রেযাখানী মৌলভীদের জন্য যে, তারা উক্ত সামান্য ইবারতটুকু উল্লেখ করতে গিয়ে কিতাবের মূল ইবারত থেকে كيا শব্দটি বাদ দিয়ে তাদের মুখপত্রে উল্লেখ করেছে।

          দ্বিতীয়তঃ রেযাখানীরা আযান-ইক্বামত ছাড়া নফল নামায বিশেষতঃ “শবে বরাত, শবে ক্বদরের” নফল নামায জামায়াত সহকারে আদায় করা বৈধ বলে যে উর্দূ ইবারতটুকু উল্লেখ করেছে উক্ত ইবারতে শবে ক্বদরের নামাযের কোনই উল্লেখ নেই।

          তৃতীয়তঃ উক্ত উর্দূ ইবারত দ্বারা এটাও প্রমাণিত হয় না যে, হযরত বড় পীর ছাহেব রহমতুল্লাহি আলাইহি “শবে বরাত, শবে ক্বদরের” নামায নিজেই জামায়াতে আদায় করেছেন।

          চতুর্থতঃ উক্ত ইবারতে একথা বলা হয়নি যে, “হযরত বড় পীর ছাহেব রহমতুল্লাহি আলাইহি নিজেই উক্ত নামায জামায়াতের সাথে আদায় করেছেন।” বরং উক্ত ইবারতে বলা হয়েছে, “আগের যুগের লোকেরা পড়তেন।”

          পঞ্চমতঃ আগের যুগের কোন মাযহাবের লোকেরা এ নামায জামায়াতের সহিত আদায় করেছেন সেটা উক্ত ইবারতে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি।

          ষষ্ঠতঃ  আগের যুগের লোকেরা উক্ত নামায জামায়াতে আদায় করলেও পরবর্তী ফক্বীহ্গণ এটা অস্বীকার করেছেন। যা ‘মৌলভী রেযা খাঁও’ স্বীকার করেছে যে,

 উর্দূ কম্পোজ করতে হবে

          সুতরাং পরবর্তী ফক্বীহ্গণ তা অস্বীকার করায় সেটা দলীল হিসেবে গ্রহণযোগ্য হতে পারেনা।

          সপ্তমতঃ কতজন মুক্তাদী নিয়ে জামায়াতে আদায় করতেন উক্ত ইবারতে তার ব্যাখ্যা উল্লেখ করা হয়নি।

          অষ্টমতঃ তাছাড়া আরো আশ্চর্যের বিষয় এই যে, “গুনিয়াতুত্ তালেবীন”-এর উর্দূ অনুবাদ কিতাবেও উল্লেখ আছে যে, নফল নামায জামায়াতের সহিত আদায় করা মাকরূহ। অথচ রেযাখানীরা “গুনিয়াতুত্ তালেবীন”-এর উর্দূ অনুবাদ কিতাবটি থেকে ইবারত কারচুপি করে নফল নামায জামায়াতে আদায় করা মাকরূহ সম্পর্কিত ইবারত উল্লেখ করেনি। যেমন, “গুনিয়াতুত্ তালেবীন”-এর উর্দূ অনুবাদ কিতাবটিতে উল্লেখ আছে,

 উর্দূ কম্পোজ করতে হবে

অর্থঃ- “নফল নামায জামায়াতের সহিত আদায় করা মাকরূহ।”

          নবমতঃ আগের যুগের লোকেরা জামায়াতে আদায় করলেও আমাদের হানাফী মাযহাবে তা পড়া যাবেনা। কারণ এটা মাযহাবী মাসয়ালা। অন্য মাযহাবে জায়েয হলেও আমাদের হানাফী মাযহাবে জায়েয নেই।

          দশমতঃ আমানুল্লাহ্ ছাহেবের অনুদিত “গুনিয়াতুত্ তালেবীন”-এর উর্দূ অনুবাদের মাসয়ালা আর আমাদের হানাফী মাযহাবের মাসয়ালায় কিছু পার্থক্য রয়েছে। যেমন, আমানুল্লাহ্ ছাহেবের অনুদিত “গুনিয়াতুত্ তালেবীন”-এর উর্দূ অনুবাদ কিতাবটির ৫৬৩ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

 উর্দূ কম্পোজ করতে হবে

অর্থঃ- “ঈদের নামায ফরযে ক্বিফায়া।”

আবার উক্ত কিতাবের ৫৬৭ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

 উর্দূ কম্পোজ করতে হবে

অর্থঃ- “কুসূফের নামায (সূর্যগ্রহণের নামায) সুন্নতে মুয়াক্কাদা।”

          অথচ আমাদের হানাফী মাযহাবে ঈদের নামায ওয়াজিব এবং কুসূফের নামায (সূর্যগ্রহণের নামায) সুন্নতে যায়েদাহ্ বা নফল।

          এখন রেযাখানীরা যদি “গুনিয়াতুত্ তালেবীন”-এর উর্দূ অনুবাদের বরাত দিয়ে নফল নামায জামায়াতে আদায় করা জায়েয বলে, তাহলে রেযাখানীদের উক্ত “গুনিয়াতুত্ তালেবীন”-এর উর্দূ অনুবাদ কিতাবের ভিত্তিতে ঈদের নামায ফরযে ক্বিফায়া এবং কুসূফের নামায সুন্নতে মুয়াক্কাদা বলে ফতওয়া দেয়া উচিত।

          অতএব, প্রমাণিত হলো যে, “গুনিয়াতুত্ তালেবীন”-এর উর্দূ অনুবাদের মাসয়ালা আর আমাদের হানাফী মাযহাবের মাসয়ালায় অনেক পার্থক্য রয়েছে।

          সুতরাং যে ইবারত দ্বারা হযরত বড় পীর ছাহেব রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর শবে বরাত, শবে ক্বদরের” নামায জামায়াতে আদায় করা প্রমাণিত হয় না সেক্ষেত্রে হযরত বড় পীর ছাহেব রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর উপর “শবে বরাত, শবে ক্বদরের” নামায জামায়াতে আদায় করার অপবাদ আসে কি করে? আর আমরাও এ কথা বলিনি যে, “হযরত বড় পীর ছাহেব রহমতুল্লাহি আলাইহি ‘শবে বরাত, শবে ক্বদরের’ নামায জামায়াতে আদায় করেছেন।”

          বরং “মাসিক আল বাইয়্যিনাত”-এর বিগত সংখ্যাগুলোতে এরই ব্যাখ্যায় সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করে প্রমাণ করা হয়েছে যে, হানাফী মাযহাবের বিশ্বখ্যাত, নির্ভরযোগ্য ফিক্বাহ্ ও ফতওয়ার কিতাবসমূহে যেমন, “বাহরুর রায়েক, ফতওয়ায়ে আলমগীরী, খুলাছাতুল ফতওয়া, আদদুররুল মুখতার, গায়াতুল আউত্বার, রদ্দুল মুহতার, শামী, আল কুহেস্তানী, শরহুল মুনিয়া, শরহুন নিক্বায়া, শরহে ইলিয়াস, মিনহাতুল খলিক্ব, ফতওয়ায়ে তাতারখানিয়া, হাশিয়ায়ে তাহতাবী আলা মারাকিউল ফালাহ্, আইনী শরহে হিদায়া, হাশিয়ায়ে শরহে বেকায়া লি চলপী, ফতওয়ায়ে মা’দিয়াহ, ইলমুল ফিক্বাহ” ইত্যাদি কিতাবে বলা হয়েছে যে,  নফল নামাযে একজন অথবা দু’জন মুক্তাদী যদি ইমামের সাথে ইক্তিদা করে তাহলে মাকরূহ হবে না। আর যদি তিনজন মুক্তাদী ইমামের সাথে ইক্তিদা করে তাহলে মাকরূহ হওয়ার ব্যাপারে মতবিরোধ রয়েছে অর্থাৎ কেউ কেউ বলেছেন মাকরূহ হবেনা। আর কেউ কেউ বলেছেন মাকরূহ হবে। তবে যদি চারজন মুক্তাদী ইমামের সাথে ইক্তিদা করে নফল নামায জামায়াতের সহিত পড়ে তাহলে সকল ইমাম ও ফুক্বাহা-ই-কিরাম মাকরূহ তাহরীমী।

          যেমন, “ফতওয়ায়ে তাতারখানিয়া” কিতাবের ১ম খন্ডের ৬৩৬ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

ان التطوع بالجماعة انما يكره اذا كان على سبيل التداعى اما لو اقتدى واحد بواحد او اثنان بواحد لايكره واذا اقتدى ثلاثة بواحد اختلف فيه وان اقتدى اربعة بواحد كره اتفاقا.

অর্থঃ- “নিশ্চয় নফল নামায জামায়াতে পড়া মাকরূহ্ তাহ্রীমী, যখন ঘোষণা দিয়ে পড়া হবে। সুতরাং যদি (বিনা ঘোষণায়) ইমামের সাথে একজন অথবা দু’জন মুক্তাদী ইক্তিদা করে, তবে মাকরূহ্ হবেনা, আর তিনজন মুক্তাদী ইক্তিদা করার মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে, অর্থাৎ কেউ কেউ বলেছেন মাকরূহ হবে না। আর কেউ কেউ বলেছেন মাকরূহ হবে।  তবে যদি চারজন মুক্তাদী ইমামের সাথে ইক্তিদা করে নফল নামায জামায়াতের সাথে পড়ে তাহলে সকল ইমাম মুজতাহিদ ও ফুক্বাহা-ই-কিরাম-এর সর্বসম্মত মতে মাকরূহ্ তাহ্রীমী।

          আর আমানুল্লাহ্ ছাহেবের অনুদিত “গুনিয়াতুত্ তালেবীন”-এর উর্দূ অনুবাদ কিতাবটিতেও উল্লেখ আছে যে, “নফল নামায জামায়াতে আদায় করা মাকরূহ।” (বিস্তারিত দলীলের জন্য অপেক্ষায় থাকুন)

          অতএব, প্রমাণিত হলো যে, রেযাখানীরা হযরত বড় পীর ছাহেব রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর নামে সাধারণ মানুষকে ধোকা দেয়ার জন্যই এ অপবাদ দিয়েছে। আর রেযাখানীরা যে, হযরত বড় পীর ছাহেব রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর নামে অপবাদ দিবে এটাই স্বাভাবিক। কারণ তারা গাউসুল আযম হযরত বড় পীর ছাহেব রহমতুল্লাহি আলাইহিকে খালিছ ওলী বা মুজ্জাদ্দিদ হিসেবে মানে না। তার প্রমাণ তাদের মুখপত্র ডিসেম্বর/২০০০ ঈঃ সংখ্যা। উক্ত সংখ্যার ৪৪পৃষ্ঠায় এ পর্যন্ত যত মুজাদ্দিদ পৃথিবীতে আগমণ করেছেন তাদের তালিকা তারা দিয়েছে। কিন্তু সেখানে গাউসুল আযম হযরত বড় পীর আব্দুল ক্বাদীর জ্বিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর নাম মুবারক মুজাদ্দিদের তালিকায় নেই।  (চলবে)

মুহম্মদ বেলাল হুসাইন

চরদুঃখীয়া, ফরিদগঞ্জ, চাদঁপুর।

সুওয়ালঃ  মাসিক রাহমানী পয়গাম জুন/২০০১ ঈসায়ী সংখ্যায় এক জিজ্ঞাসার জবাবে বলা হয়েছে যে, অল্প বয়সে দাঁড়ি লাল ও বিবর্ণ হলে দাঁড়িতে কালো খেজাব বা কালো কলপ ব্যবহার করা জায়েয। তাদের এ বক্তব্য কতটুকু ছহীহ্ দয়া করে জানাবেন।

জাওয়াবঃ মাসিক রহমানী পয়গাম পত্রিকার উপরোক্ত বক্তব্য মোটেও ছহীহ্ নয়। সম্পূর্ণ মনগড়া এবং শরীয়তের খেলাফ। কারণ কালো খেযাব তা পুরুষ-মহিলা, ছেলে-বুড়ো কারো জন্যই শরীয়ত সম্মত নয় এবং তা ব্যবহারের ক্ষেত্রে মাজুরতার অজুহাতও গ্রহণযোগ্য নয়।

          বর্ণিত আছে যে, কালো খেযাব সর্বপ্রথম ফেরাউন ব্যবহার করেছিল। আর স্বয়ং হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কালো খেযাব বা কলপ ব্যবহার করতে নিষেধ করেছেন।

এ প্রসঙ্গে হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে,

عن جابر قال اتى بابى قحافة يوم فتح مكة ورأسه ولحيته كالثغامة بياض فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم غيروا هاذا بشئ واجتنبوا السواد.

অর্থঃ- “হযরত জাবির রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন, হযরত আবূ বকর ছিদ্দীক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তাঁর পিতা আবূ কুহাফা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর সাথে মক্কা বিজয়ের দিন হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট আসেন এমতাবস্থায় যে, তাঁর চুল ও দাড়ী মুবারকগুলো সাদা হয়ে গিয়েছিল। তাকে দেখে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “সাদা রংকে অন্য কোন রং দ্বারা পরিবর্তন কর, তবে কালো রং থেকে বেঁচে থাক।” (মুসলিম শরীফ)

          হাদীস শরীফে আরো ইরশাদ হয়েছে যে,

قال رسول الله صلى الله عليه وسلم يكون فى اخر الزمان قوم يخضبون بالسواد كحواصل الحمام لايجدون رائحة الجنة.

অর্থঃ-“সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আখেরী যামানায় এমন কিছু লোক বের হবে, যারা কবুতরের পালকের ন্যায় কালো খেযাব ব্যবহার করবে, তারা জান্নাতের ঘ্রাণও পাবেনা।” (আবূ দাউদ, নাসাঈ শরীফ)

          হাদীস শরীফে আরো ইরশাদ হয়েছে,

قال رسول الله صلى الله عليه وسلم من خضب بالسواد سود الله وجهه يوم القيامة.

অর্থঃ-“সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি কালো খেযাব ব্যবহার করবে, আল্লাহ্ পাক ক্বিয়ামতের দিন তার চেহারাকে কালো করে দিবেন।” (তিবরানী শরীফ)

          কালো খেযাব সম্পর্কে বিখ্যাত মুহাদ্দিস হযরত মুল্লা আলী ক্বারী রহমতুল্লাহি আলাইহি “শরহে শামায়েলে তিরমিযীতে” উল্লেখ করেন,

ذهب اكثر العلماء الى كراهة الخضاب بالسواد ورجح الثورى الى انها كراهة تحريم.

অর্থঃ- “অধিকাংশ আলিমগণের মতে কালো খেযাব ব্যবহার করা মাকরূহ। ইমাম সুফিয়ান ছাওরী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর মতে মাকরূহ্ তাহ্রীমী।”

          “মিশকাত শরীফের শরাহ্ আশয়াতুল লুময়াতে” উল্লেখ আছে,

خضاب بحناء باتفاق جائزاست ومختار در سواد حرمتاست.

অর্থঃ- “মেহেদী দ্বারা খেযাব দেয়া সর্বসম্মতিক্রমে জায়েয। আর গ্রহণযোগ্য মতে কালো খেযাব ব্যবহার করা হারাম।”

          অতএব, দাড়ী বা চুল রঙ্গিন করার জন্যে মেহেদী পাতার খেযাব ব্যবহার করা জায়েয ও সুন্নতে ছাহাবা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু। কিন্তু কালো খেযাব ব্যবহার করা আমাদের হানাফী মায্হাব মোতাবেক মাকরূহ্ তাহ্রীমী।

          উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা প্রমাণিত হলো যে, চুল বা দাড়ীতে কালো রংয়ের খেযাব ব্যবহার করা আমাদের হানাফী মায্হাব মোতাবেক মাকরূহ্ তাহ্রীমী।

          তবে কালো খেযাব বা কলপ দু’ধরণের হয়ে থাকে-

(১) যেটা ব্যবহার করলে আবরণ বা প্রলেপ পড়েনা কিন্তু কালো হয়, এ ধরণের কালো রংয়ের খেযাব ব্যবহার করা মাকরূহ্ তাহ্রীমী।

(২) যেটা ব্যবহার করলে চুল বা দাড়ীতে নেইল পালিশের ন্যায় একটি আবরণ পড়ে যায়, যার কারণে মূল দাড়ী বা চুলে পানি পৌঁছেনা এ ধরণের খেযাব ব্যবহার করা সম্পূর্ণরূপে হারাম। কারণ এ ধরণের খেযাব ব্যবহার করলে মূল দাড়ী বা চুলে পানি পৌঁছেনা। যে কারণে এরূপ খেযাব ব্যবহারকারীর  ওজু ও গোসল কিছুই দুরস্ত হবে না। সুতরাং যতদিন সে উক্ত খেযাব বা কলপ ব্যবহার করবে ততদিন সে পবিত্র হবে না। আর এ অবস্থায় যদি সে মারা যায় তবে তার জানাযার নামায পড়াও শুদ্ধ হবে না। কারণ জানাযার নামায ছহীহ্ হওয়ার জন্য পবিত্রতা শর্ত। এরূপ ব্যক্তির জানাযার নামায পড়তে হলে তার চুল-দাড়ী  মুন্ডন করে গোসল দিতে হবে।  অথচ মৃত ব্যক্তির চুল-দাড়ী মুন্ডন করা হারাম।

          {দলীলসমূহঃ- (১) মুসলিম (২) তিরমিযী, (৩) আবূ দাউদ, (৪) নাসাঈ, (৫) তিবরানী, (৬) মিশকাত, (৭) মিরকাত, (৮) আশয়াতুল লুমুয়াত, (৯) শামায়েলে তিরমিযী, (১০) জামউল ওসায়েল, (১১) Manufacture of Beauty Products, By SBP Board of Consultants & Engineers, (১২) Yahoo search engine P- Phenylenediamine all related files. ইত্যাদি।

মুহম্মদ আব্দুল্লাহিল মামুন

রাজারহাট, কুড়িগ্রাম।

সুওয়াল ঃ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাধারণত যে পোশাক পরিধান করতেন, সেই পোশাক পরিধান করেই কি ঘুমাতেন? না অন্য কোন পোশাক পরিধান করে ঘুমাতেন? দয়া করে জানিয়ে বাধিত করবেন।

জাওয়াবঃ সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, রহমতুল্লিল আলামীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাধারণত যে পোশাক পরিধান করতেন সে পোশাক পরিধান করেই ঘুমাতেন। তবে কখনো কখনো জরুরতবশতঃ কোর্তা মুবারক খুলে চাদর মুবারক গায়ে দিয়ে ঘুমাতেন। হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কখনো খালি গায়ে ঘুমাতেন না।

          অতএব, কাপড় পরিধান করে ঘুমানোই সুন্নত।

          {দলীলসমূহঃ (১) বুখারী শরীফ, (২) শামায়েলে তিরমিযী, (৩) জামউল ওসায়েল,(৪) ফতহুল বারী, (৫) ওমদাতুল ক্বারী, (৬) মাদারিজুন্ নুবুওওয়াত, (৭) সীরাতুন্ নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইত্যাদি।}

মাওলানা মুহম্মদ নূরুল আবছার

সভাপতি- আঞ্জুমানে আল বাইয়্যিনাত

লালদিঘী, চট্টগ্রাম।

সুওয়াল: বর্তমান বাজারে “কালি মেহেন্দী” নামে এক প্রকার মেহেদী বের হয়েছে যা ব্যবহারে পাকা চুল ও দাড়ি কালো রং ধারণ করে। এ মেহেন্দী এবং প্রাকৃতিক মেহেন্দী কি এক রকম? এ মেহেন্দী ব্যবহার করলে চুলে প্রলেপ পড়ে কিনা এবং এ মেহেন্দী ব্যবহারে শরীরে কোন ক্ষতি করে কিনা? তথ্য ও দলীল ভিত্তিক বিস্তারিত জানার জন্য অনুরোধ করছি।

জাওয়াব: “কালি মেহেন্দী” বলতে বাজারে যা প্রচলিত রয়েছে তা প্রকৃতপক্ষে কোন মেহেদী নয়।

          পাকা চুল, দাড়ি রঙ্গীন করতে মেহেদীর ব্যবহার সেই প্রাচীনকাল থেকেই। মেহেদীর ব্যবহারের পর সাদা চুলের মধ্যে যে বর্ণের ছটা আসে তাকে সামান্য একটু গাঢ় করার জন্যে অনেকেই কাতম মিশিয়ে চুল-দাড়িতে ব্যবহার করেন। আর এ রকম ব্যবহারতো ছিল হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণের মধ্যেও। জানা যায়, আফযালুন্ নাস বা’দাল আম্বিয়া হযরত আবূ বকর ছিদ্দীক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু কাতম মিশ্রিত মেহেদী ব্যবহার করতেন। কিন্তু সে রকম কোন ধারণার সাথে কালি মেহেন্দীর সামান্যতম মিল নেই। যদিও প্যাকেটটির উপরে স্পষ্ট লেখা আছে কালি মেহেন্দী এবং এক পার্শ্বে বড় করে  লেখা HERBAL অর্থাৎ ভেষজ। কালি মেহেন্দীকে ইংরেজীতে বলে BLACK HENNA (ব্লাক হেন্না), আর আরবীতে বলে আসওয়াদ হেন্না, কালি মেহেদী হচ্ছে একটি A30 dye গ্রুপের উপাদান এবং সম্পূর্ণটাই Chemical। এই উপাদানটির পুরো নাম হচ্ছে P-phenylenediamine। তবে শুধুমাত্র ভারতে এবং আফ্রিকার কিছু দেশেই এই P-phenylenediamine BLACK HENNA বা কালি মেহেন্দী নামে পরিচিত। আপাতদৃষ্টিতে চুলের কলপ হিসেবে এটি অনন্য। কারণ সাদা চুল-দাড়ি সহজেই কালো হয়ে উঠে এবং থাকেও অনেকদিন। কালো মেহেদীর এই গুণ গুলো একটু ভিন্ন দৃষ্টিকোন থেকে ব্যাখ্যা করলে ধরা পড়বে এর আসল চেহারাটা। যদিও একে বলা হয় কালি মেহেন্দী কিন্তু আসলে এতে প্রাকৃতিক মেহেদীর কোন গন্ধও নেই। এটা হচ্ছে সম্পূর্ণই রাসায়নিক উপাদান। দ্বিতীয়ত প্যাকেটের গায়ে লেখা থাকে HERBAL অর্থাৎ ভেষজ, কিন্তু এটা আসলে Chemical substance মাথার চুলের সাথে অনেকদিন লেগে থাকার কারণ হচ্ছে এর মধ্যে রয়েছে, Coating properties. যেমন, P-phenylenediamine, Urethane Coating এ ব্যবহার হয়। Urethoan হচ্ছে এন্টি-নিওপ্লাষ্টিক এবং হিপনোটিক ড্রাগস। চুলের চতুর্দিকে এটা একটি আবরণ সৃষ্টি করে। চুলের চতুর্দিকের এই আবরণ সরে যেতে দীর্ঘ সময় লাগার পিছনে সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে পানিতে এর দ্রবণীয়তা। ১০৪০ ফারেনহাইট (৮০° সেলসিয়াস) তাপমাত্রায় P-phenylenediamine বা কালি মেহেন্দী পানিতে দ্রবীভূত হয়। কিন্তু আমাদের গোছলের পানির তাপমাত্রা তার চাইতেও অনেক কম। সুতরাং পানিতে দ্রবীভূত হতে সময় লাগে বেশী এবং চুলে থাকেও বেশীদিন।

          এবার আমরা কালি মেহেদীর কয়েকটি মন্দ দিক উল্লেখ করছি। প্রাকৃতিক মেহেদী কখনই চুলের গোড়া দিয়ে রক্ত স্রোতের সঙ্গে মিশে যায় না। আবার কোন কারণে মিশে গেলেও তা শরীরের উপর কোন ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে না। কিন্তু কালি মেহেদী বা চ-ঢ়যবহুষবহবফরধসরহব চুলের গোড়া দিয়ে রক্ত স্রোতের সঙ্গে মিশে যায় এবং তা আমাদের শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ কিডনী, লিভার এবং হৃৎপিন্ডের ক্ষতি করে। এ ছাড়াও অনেকের ক্ষেত্রেই মারাত্মক এলার্জিক রিয়েকশন করে থাকে। (এ তথ্য প্যাকেটের গায়েও অনেক ক্ষুদ্রাকারে লেখা রয়েছে এবং তার কি কি ক্ষতিকর দিক আছে সেখানে তারও উল্লেখ আছে) নীচে তা উল্লেখ করা হলঃ-

POISON: FOR EXTERNAL USE ONLY SENSITIVITY TEST PARA- PHENYLENEDIAMINE CONTAINING PREPARATIONS MAY CAUSE SERIOUS INFLAMMATION OF THE SKIN IN SOME CASES AND SO A PRELIMINARY TEST SHOULD ALWAYS BE CARRIED OUT TO DETERMINE WHETHER OR NOT SPECIAL SENSITIVITY EXISTS. FOR CARRYING OUT THE TEST, CLEANSE A SMALL AREA OF SKIN BEHIND THE EAR OR UPON THE INNER SURF ACE OF THE FOREARM, USING EITHER SOAP AND WATER OR ALCOHOL, APPLY A SMALL QUANTITY OF THE PREPARED KALI MEHANDI AND ALLOW IT TO DRY. AFTER 24 HOURS WASH THE AREA GENTLY WITH SOAP AND WATE IF NO IRRITATION OR INFLAMMATION IS APPARENT, THIS KALI MEHANDI CAN BE USED SAFELY. CAUTION: THIS PREPARATION SHOULD ON NO ACCOUNT BE USED FOR DYEING EYEBROWS OR EYELASHES AS SEVERE INFLAMMATION OF THE EYE OR EVEN BLINDNESS MAY RESULT. P-phenyl enediamine শরীরের উপর যে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে তাতো অবশ্য কিন্তু এ ছাড়াও শরীয়তগত দিক থেকে এর ক্ষতিকর দিকটা আরও মারাত্মক।

          প্রথমেই আসা যাক Coating property র দিকটায়। যদিও এটা পানিতে সহজে দ্রবণীয় কিন্তু তাপমাত্রার প্রয়োজন হয় ১০৪০ ফারেনহাইট (৮০০ সেলসিয়াস) কিন্তু আমাদের গোছলের/ওজুর পানির তাপমাত্রা এর চাইতে অনেক কম এবং সে তাপমাত্রায় P-phenylenediamin দ্রবীভূত হয়না ফলে ফরয গোছলের যে শর্ত চুলের মধ্যে পানি পৌঁছানো সে শর্ত পালন না হওয়াতে ফরয গোছল আদায় হয়না। শুধু তাই নয়, এরকম অবস্থায় একজন মৃত ব্যক্তির গোসল দিতে হলে তার সমস্ত চুল-দাড়ি মুন্ডিয়ে পানি পৌঁছাতে হবে। দ্বিতীয়তঃ P-phenylenediamin বা কালি মেহেন্দির water resistance ক্ষমতা বেশী থাকায় চুলে সর্বোচ্চ ২০ দিন পর্যন্ত লেগে থাকে। তাহলে একবার ব্যবহারের পর এ রকম লম্বা সময় ধরে ব্যবহারকারী নাপাক অবস্থার মধ্যে থাকে।  ইসলাম হচ্ছে সবদিক থেকেই পূর্ণাঙ্গ। সেখানে সবকিছুর বর্ণনা রয়েছে। যা আমাদের জন্য ক্ষতিকর ইসলাম কোনদিনই তা আমাদের ব্যবহারের অনুমতি দেয়না। যেখানে P-phenylenediamine যখন রক্তের মাধ্যমে প্রবেশ করে আমাদের শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ লিভার, হার্ট, কিডনী প্রভৃতির ক্ষতি করে সে রকম জিনিসের ব্যবহার শুধুমাত্র Cosmatic quality জন্য জায়েয হতে পারেনা। অতএব বিবেচ্য বিষয় যে, যেহেতু কালি মেহেদী কোন প্রাকৃতিক মেহেদী নয়। বাজারে পাওয়া এ ধরণের প্যাকেটে Herbal লেখা দেখে বিশ্বাস করা হচ্ছে প্রতারণার স্বীকার হওয়া। এটা সম্পূর্ণ রাসায়নিক দ্রব্য যা শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতি বয়ে আনে। এছাড়াও এর রয়েছে Coating property যার জন্যে চুলের গোড়ায় পানি পৌঁছেনা। সুতরাং ব্যবহারকারীর ফরয গোসল আদায় হয়না। অতএব, কালি মেহেদীর নামে এই কলপ বা খেজাব ব্যবহার করা শরীয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণই হারাম।

          {দলীলসমূহঃ- (১) মুসলিম শরীফ, (২) তিরমিযী শরীফ, (৩) আবূ দাউদ শরীফ, (৪) নাসাঈ শরীফ, (৫) তিবরানী শরীফ, (৬) মিশকাত শরীফ, (৭) মিরকাত, (৮) আশয়াতুল লুময়াত, (৯) শামায়েলে তিরমিযী, (১০) জামউল ওসায়েল, (১১) Manufacture of Beauty Products, By SBP Board of Consultants & Engineers, (১২) Yahoo search engine P- Phenylenediamine all related files. ইত্যাদি।

মুহম্মদ কাওছার জামান বাবলা

সভাপতি- আঞ্জুমানে আল বাইয়্যিনাত

মাহিগঞ্জ, রংপুর।

সুওয়ালঃ আজকাল অনেককে দেখা যায় গায়েবানা জানাযা নামায পড়ে থাকে। গায়েবানা জানাযা নামায পড়া জায়েয আছে কিনা? এর মাসয়ালা দয়া করে জানাবেন।

জাওয়াবঃ যারা গায়েবানা জানাযা নামায পড়ে থাকে তারা মাসয়ালা না জানার কারণে পড়ে থাকে। আমাদের হানাফী মাযহাবে গায়েবানা জানাযার নামায পড়া জায়েয নেই। যদি কেউ পড়ে তবে সে নেকীর পরিবর্তে গুণাহ্র ভাগী হবে।

          অনেকে বলে থাকে যে, “আখিরী রসূল, হাবীবুল্লাহ্ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবিসিনিয়ার বাদশাহ্ নাজ্জাশী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর গায়েবানা জানাযার নামায পড়েছেন।”

          এ হাদীস শরীফের ব্যাখ্যায় শাফেয়ী মাযহাবের ইমাম, হযরত ইমাম শাফেয়ী রহমতুল্লাহি আলাইহি গায়েবানা জানাযার নামায পড়া জায়েয বলে ফতওয়া দিয়েছেন।

          কিন্তু আমাদের হানাফী মাযহাবের ইমাম, হযরত ইমামে আ’যম আবূ হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি হাদীস শরীফের ব্যাখ্যায় বলেছেন, “এটা হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জন্য খাছ। যেহেতু তিনি নিকটে ও দূরে, সামনে ও পিছনে সমান দেখতে পান। এছাড়াও এটা হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জন্য খাছ আমল ছিল, যা উম্মতের জন্য জায়েয নয়।”

          অতএব, আমাদের হানাফী মাযহাবে গায়েবানা জানাযার নামায পড়া জায়েয নেই। কারণ হানাফী মাযহাবে জানাযার নামাযের জন্য মাইয়্যেত সামনে থাকা শর্ত; যেমন মাইয়্যেতের জন্য পবিত্রতা শর্ত।

          {দলীলসমূহঃ (১) আলমগীরী, (২) শামী, (৩) হেদায়া, (৪) বেক্বায়া, (৫) ফতহুল ক্বাদির, (৬) গায়াতুল আওতার, (৭) আইনুল হেদায়া, (৮) শরহে বেক্বায়া, (৯) বাহরুর রায়েক, (১০) দুররুল মুখতার, (১১) রদ্দুল মুহ্তার, (১২) এনায়া, (১৩) নেহায়া, (১৪) কাফী, (১৫) যাদুল আখিরাত ও সমূহ সীরাত গ্রন্থ ইত্যাদি।]

মুহম্মদ আশরাফুল হক

হাসপাতাল রোড, হবিগঞ্জ।

সুওয়ালঃ স্ত্রীকে তালাক দেয়ার পরে পূনঃরায় ফিরিয়ে আনার জন্য যে হিলা পদ্ধতির অবলম্বন করা হয়, তা শরীয়তসম্মত কিনা? দয়া করে দলীল-আদিল্লাহ্সহ জানিয়ে বাধিত করবেন।

জাওয়াবঃ তালাক সাধারণতঃ দুই প্রকার (১) ছরীহ্ ও (২) কেনায়া। প্রত্যেক প্রকার তালাক আবার দুই ভাগে বিভক্ত। (১) রেজয়ী ও (২) বাইন।

          রেজয়ী তালাক হলো- “কোন স্বামী যদি স্ত্রীকে রেজয়ী তালাক দেয় অতঃপর যদি ফিরিয়ে নিতে চায়, তাহলে বিনা বিবাহে গ্রহণ করতে পারবে। যদি স্ত্রীর ইদ্দত শেষ না হয়ে থাকে। তা এক তালাকে রেজয়ী হোক বা দুই তালাকে রেজয়ী হোক।”

          উল্লেখ্য, তালাকে রেজয়ী দুই তালাক পর্যন্তই হয়। আর যদি স্ত্রীর ইদ্দত পার হয়ে যায় তাহলে বিনা বিবাহ্ স্ত্রীকে গ্রহণ করতে পারবে না।

          আর বাইন তালাক হলো- “যা প্রয়োগ করলে বিবাহ ব্যতীত স্ত্রীকে গ্রহণ করা যায়না। যদি তা এক তালাক বাইন বা দুই তালাক বাইন হয়।”

          আর যদি তিন তালাক বাইন দেয়, যাকে তালাকে মুগল্লাজাও বলা হয়। তাহলে সাধারণভাবে বিবাহ দোহরিয়েও স্ত্রীকে গ্রহণ করা যাবেনা।

          আল্লাহ্ পাক কালামুল্লাহ শরীফের “সূরা বাক্বারার” ২২৯ নং আয়াত শরীফে বলেন,

الطلاق مرتن.

অর্থঃ- “তালাক হচ্ছে দুই বার অর্থাৎ দুই তালাক স্ত্রীকে দেয়ার পরও বিনা তাহলিলে দুই তালাক প্রাপ্তা স্ত্রীকে নিয়ে ঘর সংসার করতে পারবে।”

এরপর আল্লাহ্ পাক ২৩০ নং আয়াত শরীফে বলেন,

فان طلقها فلا تحل له من بعد حتى تنكح زوجا غيره.

অর্থঃ- “অতঃপর স্বামী যদি (দুই তালাক প্রাপ্তা স্ত্রীকে তৃতীয়) তালাক দেয় তাহলে তিন তালাক প্রাপ্তা স্ত্রী উক্ত তালাক দাতা স্বামীর জন্য বিনা তাহলিলে হালাল হবেনা। অর্থাৎ যতক্ষণ পর্যন্ত অন্য স্বামী গ্রহণ না করবে।”

এরপর আল্লাহ্ পাক বলেন,

فان طلقها فلا جناح عليهما ان يتراجعا.

অর্থঃ- “অতঃপর দ্বিতীয় স্বামী যদি উক্ত স্ত্রীকে তালাক দেয় তখন প্রথম স্বামী ও উক্ত স্ত্রী যদি পূনঃরায় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয় তাতে কোন গুণাহ্ হবেনা।”

          এর ব্যাখ্যায় তাফসীরে উল্লেখ করা হয়েছে, যদি কোন স্বামী তার স্ত্রীকে তিন তালাক দেয় তাহলে তালাক প্রাপ্তা স্ত্রী তালাকদাতা স্বামীর জন্য সম্পূর্ণ হারাম হয়ে যায়। এখন যদি তালাকদাতা স্বামী তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে গ্রহণ করতে চায় তাহলে শরীয়তের ফয়সালা হলো, তালাক প্রাপ্তা স্ত্রী তার ইদ্দত পালন করবে অতঃপর অন্যত্র বিবাহ্ বসবে। বিবাহ্রে পর যদি দ্বিতীয় স্বামী উক্ত স্ত্রীকে স্ত্রী হিসেবে ব্যবহার করে তালাক দিয়ে দেয় এরপর তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রী ইদ্দত পালন করে তখন প্রথম স্বামীর জন্য এই স্ত্রীকে বিবাহ্রে মাধ্যমে গ্রহণ করা জায়েয বা হালাল হবে। এ পদ্ধতিকেই অনেকে হিলা বলে উল্লেখ করে থাকে। এটা কুরআন-সুন্নাহ সম্মত।

          হিলা শব্দের অর্থ হলো, হালাল হওয়া। এ শব্দটি কুরআন শরীফে সূরা বাক্বারার ২৩০ নং আয়াত শরীফের تحل (তাহিল্লু) শব্দ থেকে এসেছে। এটা বাবে ضرب থেকে এসেছে। যার মাদ্দা বা মূল হচ্ছে, حلا  (হাল্লান) বা حل (হিল্লুন)। যার অর্থ হচ্ছে, হালাল হওয়া।

          সূরা বাক্বারার ২৩০ নং আয়াত শরীফের تحل শব্দের ব্যাখ্যায় ‘নূরুল আনওয়ার’ কিতাবে محللية (মুহাল্লিলিয়াতুন) محلل (মুহাল্লিলুন) ইত্যাদি শব্দ উল্লেখ করা হয়েছে। যার অর্থ হলো, দ্বিতীয় স্বামী (প্রথম স্বামীর জন্য) হালালকারী।

          এই হিলা পদ্ধতির উপরে বর্ণিত নিয়মই বিশুদ্ধ পদ্ধতি। এর আরো দুটি ছূরত হতে পারে।

          প্রথম ছূরত হচ্ছে- যদি কোন স্বামী তার স্ত্রীকে একাধিক সন্তান হওয়ার পর তিন তালাক দিয়ে দেয় তখন স্ত্রী সন্তান ব্যতীত থাকার কারণে চরম অশান্তিতে অবস্থান করে। আর বিপরীত দিকে স্বামীও স্ত্রী ব্যতীত সন্তানদেরকে নিয়ে চরম কষ্টে দিনাতিপাত করে। এ অবস্থায় যদি কোন লোক স্বামী-স্ত্রী ও সন্তানদের উপকারার্থে উক্ত তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে ইদ্দতের পর বিনা শর্তে বিবাহ্ ও ব্যবহার করে তালাক দিয়ে দেয় যাতে প্রথম স্বামী বিবাহ্ করতে পারে। কারণ এতে প্রথম স্বামী-স্ত্রী ও সন্তানদের শান্তির কারণ হবে। তাহলে উক্ত লোক নিয়ত অনুযায়ী নেকী লাভ করবে।

          আর দ্বিতীয় ছূরত হচ্ছে- তৃতীয় কোন ব্যক্তি অথবা স্বামী নিজে তাদের এই অশান্তি দূর করার লক্ষ্যে অন্য কোন ব্যক্তির সাথে তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীর ইদ্দতের পর এই শর্তে বিবাহ্ দেয় যে উক্ত ব্যক্তি তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে বিবাহ্ করে স্ত্রী হিসাবে ব্যবহার করে অতি সত্তর তালাক দিয়ে দিবে। যদি উক্ত ব্যক্তি শর্ত মোতাবিক কাজ সম্পাদন করে তাহলে উক্ত তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রী প্রথম স্বামীর জন্য হালাল হবে।

          এ অবস্থায় প্রশ্ন আসতে পারে যে, শর্ত দিয়ে বিবাহ করা জায়েয রয়েছে কিনা? কারণ সময় নির্দিষ্ট করে বিবাহ্ করাকে নিকাহ্ েমুতা বলা হয়। যা আমাদের আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ হারাম। যা শিয়াদের আক্বাঈদ মতে জায়েয।

          এছাড়াও হাদীস শরীফে উল্লেখ করা হয়েছে,

لعن الله المحلل والمحلل له.

অর্থঃ- “আল্লাহ্ পাক লা’নত বর্ষণ করেন, যে হালাল করেছে ও যার জন্য হালাল করা হয়েছে”। (দারেমী, ইবনে মাজাহ)

          এর জবাবে বলতে হয়, মুতা বিবাহ আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ হারাম হওয়ার কারণে বিবাহ্ েকোন শর্ত আরোপ করলে শর্ত বাতিল হয়ে বিবাহ্ শুদ্ধ হিসেবে শরীয়তে গ্রহণযোগ্য হয়ে থাকে।

          সুতরাং কোন ব্যক্তি যদি কোন তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে কোন শর্ত দিয়ে বিবাহ ও ব্যবহার করে তালাক দেয় তাহলে উক্ত তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রী প্রথম স্বামীর নিকট পূনরায় বিবাহ বসতে পারবে। অর্থাৎ বিবাহ্ পড়িয়ে দিলেই প্রথম স্বামীর জন্য হালাল হয়ে যাবে। যা সম্পূর্ণ রূপে শরীয়তসম্মত।

          হ্যাঁ, তবে যে ব্যক্তি শর্ত দিয়ে বিবাহ্ করেছে বা দিয়েছে সে ব্যক্তি শর্তের কারণে গুণাহ্গার হবে তবে তার বিবাহ্ েকোন ত্রুটি হবে না বরং তার বিবাহ সম্পূর্ণ রূপেই শরীয়ত সম্মত হবে।

          উপরোক্ত লা’নতের হাদীস শরীফের ব্যাখ্যায় বলতে হয়, প্রকৃত পক্ষে এ হাদীসের উদ্দেশ্য সকলের প্রতি লা’নত বর্ষণ নয় বরং যারা এ কাজে উৎসাহিত করবে বা এ কাজকে ব্যবসা অথবা পেশা হিসেবে গ্রহণ করবে তাদের জন্যই লানত বর্ষিত হবে। আর যদি কেউ কারো উপকারার্থে বিনা শর্তে এ কাজ করে দেয় তাহলে  সে অবশ্যই নেকী লাভ করবে। এটা তার জন্য লা’নতের কারণ হবেনা বরং রহমতের কারণ হবে। তবে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে যাতে এ কাজে কেউ কাউকে অথবা পরস্পর পরস্পরকে উৎসাহিত না করে। বরং নিরুৎসাহিত করবে এবং খেয়াল রাখবে যেন কেউ এ কাজকে ব্যবসা ও পেশা হিসেবে গ্রহণ না করে।

          মানুষের প্রতি ইহ্সান ও উপকার করা সম্পর্কে আল্লাহ্ পাক বলেন,

واحسنوا ان الله يحب المحسنين.

অর্থঃ- “তোমরা (মানুষের প্রতি) ইহ্সান করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ পাক ইহ্সানকারীদের ভালবাসেন।” (সূরা বাক্বারা/১৯৫)

এর ব্যাখ্যায় হাদীস শরীফে বলা হয়েছে,

خير الناس من ينفع الناس.

অর্থঃ- “মানুষের মধ্যে ঐ ব্যক্তি উত্তম যে পরোপকার করে।”

আল্লাহ্ পাক অন্যত্র বলেন,

هل جزاء الاحسان الا الاحسان.

অর্থঃ- “ইহ্সানের বদলা কি ইহ্সান ব্যতীত অন্য কিছু হয়?” (সূরা আর রহ্মান/৬০)

এর ব্যাখ্যায় হাদীস শরীফে উল্লেখ করা হয়েছে,

ارحموا من فى الارض يرحمكم من فى السماء.

অর্থঃ- “তাদের প্রতি দয়া কর যারা যমীনে রয়েছে। তাহলে যিনি আকাশে রয়েছেন (আল্লাহ্ পাক) তিনিও তোমাদের প্রতি দয়া করবেন।”

আল্লাহ্ পাক আরো বলেন,

ان احسنتم احسنتم لانفسكم.

অর্থঃ- “যদি তোমরা ইহ্সান কর তাহলে প্রকৃতপক্ষে নিজের জন্যই ইহ্সান করলে।” (সূরা বণী ইসরাঈল/৭)

          অতএব, উপরোক্ত দলীল-আদিল্লাহ্ ও প্রমাণাদি দ্বারা এটাই ছাবেত হয় যে, হিলা জায়েয নেই একথা বলা শুদ্ধ নয়। কারণ হিলা শব্দের অর্থ হচ্ছে- হালাল হওয়া। তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রী যদি প্রথম স্বামীর জন্য হালাল না হয় তাহলে কি করে প্রথম স্বামী তার তিন তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে বিবাহ্ করবে? তাই হিলা জায়েয নেই বলা শুদ্ধ নয় বরং বলতে হবে হিলার জন্য শর্ত-শারায়েত আরোপ করা জায়েয বা শুদ্ধ নয় বরং গুণাহ্রে কারণ।

          এরপরেও শরীয়তের ফয়সালা হলো, শর্ত-শারায়েত আরোপ করা সত্ত্বেও বিবাহ্ শুদ্ধ হবে এবং দ্বিতীয় স্বামী প্রথম স্বামীর জন্য হালালকারী হবে।

          বিশেষভাবে স্মরণীয় যে, এর মূল কারণ হলো, আল্লাহ্ পাক-এর আদেশ পালন করা এবং তালাকদাতা ও তালাকপ্রাপ্তা স্বামী-স্ত্রী ও তাদের সন্তানদের এত্মিনান ও শান্তি দেয়া।

          {দলীলসমূহঃ- (১) কুরতুবী, (২) আহকামুল কুরআন, (৩) রুহুল মায়ানী, (৪) তাফসীরে মাযহারী, (৫) আহমদী, (৬) তাফসীরে তাবারী, (৭) ইবনে কাসীর, (৮) মা’রেফুল কুরআন, (৯) তাফসীরে ইবনে আব্বাস, (১০) যাদুল মাসির, (১১) রুহুল বয়ান, (১২) নিশাপুরী, (১৩) খাযেন, (১৪) বাগবী, (১৫) মুনিরী, (১৬) ইবনে আবি হাতিম, (১৭) শায়খ যাদাহ্, (১৮) কাসেমী, (১৯) ইবনে মাযাহ্, (২০) দারেমী, (২১) বুখারী, (২২) মুসলিম, (২৩) মিশকাত, (২৪) ফতহুল বারী, (২৫) উমদাতুল ক্বারী, (২৬) মিরকাত, (২৭) আশয়াতুল লুমুয়াত, (২৮) লুমুয়াত, (২৯) তালিকুছ্ ছবীহ্, (৩০) ত্বীবী, (৩১ মোযাহেরে হক্ব, (৩২) আলমগীরী, (৩৩) শামী, (৩৪) আইনুল হেদায়া, (৩৫) দুররুল মুখতার, (৩৬) বাহরুর রায়েক, (৩৭) হেদায়া, (৩৮) শরহে বেকায়া, (৩৯) কানযুদ্দাকায়েক্ব, (৪০) নেহায়া, (৪১) এনায়া, (৪২) নূরুল আনওয়ার, (৪৩) রদ্দুল মুহতার, (৪৪) গায়াতুল আওতার, (৪৫) কাযিখান, (৪৬) জামিউর রুমুজ, (৪৭) বায্যাযিয়া, (৪৮) ফতহুল ক্বাদীর, (৪৯) কেফায়া, (৫০) মা’দানুল হাক্বায়েক, (৫১) ফতওয়ায়ে আমিনীয়া ইত্যাদি।}

মুহম্মদ রিয়াদুজ্ জামান

বরগুনা।

সুওয়ালঃ তালাক দেয়ার শরীয়তসম্মত পদ্ধতি কি? এক সাথে তিন তালাক দিলে তার ফায়সালা কি? রাগের সহিত তালাক দিলে তালাক হবে কিনা? অনুগ্রহ করে জানাবেন।

জাওয়াবঃ তালাক শব্দের অর্থ হচ্ছে, জুদা, বর্জন, ত্যাগ, পৃথক ইত্যাদি। অর্থাৎ স্বামী থেকে স্ত্রীকে কিছু নির্দিষ্ট শব্দ দ্বারা আলাদা করে দেয়া বা বিবাহ্ ভঙ্গ করে দেয়াকে তালাক বলে।

          স্ত্রীর উপর তালাক আরোপিত হওয়া সম্পর্কে শরীয়তে তিনটি ছূরত বর্ণিত হয়েছে। (১) তালাকে আহ্সান, (২) তালাকে হাসান বা সুন্নত এবং (৩) তালাকে বেদ্য়ী বা বিদ্য়াত।

          তালাকে আহসান হলো, বিবাহ্তিা স্ত্রীকে এক তুহুর বা পবিত্রতাকালে (যাতে জেমা ও ওতি হয়নি) এক তালাক দিয়ে ইদ্দত পর্যন্ত রেখে দেয়াকে তালাকে আহসান বলে।

          তালাকে হাসান বা সুন্নত তালাক হলো বিবাহ্তিা স্ত্রীকে তিন তুহুরে তিন তালাক দেয়া আর নাবালেগা, ছন্নে আয়েছা, হামেলদার বা গর্ভবতী স্ত্রীকে তিন মাসে তিন তালাক দেয়া। এটাকেও হাসান তালাক বলে।

          আর যে স্ত্রীর সাথে জেমা ও ওতি করা হয়নি তাকে তুহুরে অথবা অপবিত্রাবস্থায় এক তালাক দেয়াকে হাসান তালাক বলে। তালাকে সুন্নত শব্দের অর্থ হলো, তালাকে বিদ্য়াত নয়।

          তালাকে বেদয়ী হলো, এক কথায় তিন তালাক দেয়াকে তালাকে বিদয়ী বলে। আর এক তহুর বা এক অপবিত্রতার মধ্যে তিন তালাক দেয়াকে তালাকে বেদয়ী বলে।

হাদীস শরীফে রয়েছে,

ابغض الحلال الى الله الطلاق.

অর্থঃ- “আল্লাহ্ পাক-এর নিকট হালালের মধ্যে সবচেয়ে অপছন্দনীয় হালাল হচ্ছে তালাক দেয়া।” (মিশকাত শরীফ)

          অতএব, শরীয়ত কখনো কাউকে তালাক দেয়ার জন্য উৎসাহিত করেনা। হ্যাঁ, যদি স্বামী এবং স্ত্রীর মধ্যে কোন অবস্থাতেই একত্রে বসবাস করা সম্ভব না হয় তাহলে পরস্পর পরস্পর থেকে আলাদা বা জুদা হবে। এই জুদা হওয়াকেই তালাক বলা হয়। এই তালাকের মধ্যে উত্তম হচ্ছে আহসান তালাক দেয়া অথবা হাসান তালাক দেয়া যা তালাকে বেদ্য়ী নয়।

          হ্যাঁ, এক সঙ্গে তিন তালাক দিলে তিন তালাক পতিত হবে। চাই তা গোস্বা হয়ে দিক বা খুশি হয়ে দিক অথবা ইচ্ছায় অনিচ্ছায় দিক।

এ সম্পর্কে হাদীস শরীফে উল্লেখ করা হয়েছে,

ثلث جدهن جد هزلهن جد النكاح والطلاق والرجعة.

অর্থঃ- “তিনটি বিষয় এমন রয়েছে যা গোস্বায় হোক বা হাসি ঠাট্টায় হোক সর্বাবস্থায় কার্যকরী হয়ে থাকে। বিবাহ্, তালাক ও রাজয়াত।” (তিরমিযী, আবূ দাউদ, মিশকাত শরীফ/২৮৪

এ বিষয়ে চার ইমামই একমত পোষণ করেছেন।

          অনেকে বলে থাকে যে, গোস্বা হয়ে তালাক দিলে তালাক হয়না।

এর জবাবে বলতে হয়, কোন ব্যক্তি তার স্ত্রীকে কখনোই খুশি হয়ে তালাক দেয়না। কারণ কেউ যখন বিয়ে করে তখন সে খুশি মনেই করে। আর তালাক দেয়ার নিয়তে কেউ বিয়ে করেনা। কারণ হাদীস শরীফে রয়েছে, “তালাক দেয়ার নিয়তে বিয়ে করলে তার প্রতি আল্লাহ্ পাক-এর লা’নত বর্ষিত হয়।”

          কাজেই কেউ যখন তার স্ত্রীকে  তালাক দেয় তখন সে গোস্বা হয়েই তালাক দিয়ে থাকে। অর্থাৎ মনমালিন্য হওয়ার কারণেই তালাক দিয়ে থাকে।

          তাই এ কথা বলার অবকাশ রাখেনা যে, গোস্বা হয়ে তালাক দিলে তালাক বর্তাবেনা।

          আমাদের আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের ফতওয়া হচ্ছে, তিন তালাক দিলেই তিন তালাক পতিত হবে। তা যে কোন অবস্থাতেই হোক।

          {দলীলসমূহঃ- (১) তাফসীরে তাবারী, (২) রুহুল মায়ানী, (৩) ইবনে কাছীর, (৪) কবীর, (৫) খাযেন, (৬) বাগবী, (৭) কুরতুবী, (৮) মাযহারী, (৯) আহকামুল কুরআন, (১০) আহমদী, (১১) বায়যভী, (১২) শায়খ যাদাহ্, (১৩) মা’আরেফুল কুরআন, (১৪) বুখারী, (১৫) মুসলিম, (১৬) মিশকাত, (১৭) ফতহুল বারী, (১৮) ওমদাতুল ক্বারী, (১৯) মিরকাত, (২০) আশয়াতুল লুমুয়াত, (২১) লুমুয়াত, (২২) তালিকুছ্ ছবীহ্, (২৩) ত্বীবী, (২৪) মুযাহেরে হক্ব, (২৫) মাবসুত, (২৬) ফতহুল ক্বাদীর, (২৭) বেনায়া, (২৮) আলমগীরী, (২৯) শামী, (৩০) আইনী, (৩১) বাহ্রুর রায়েক, (৩২) কুদুরী, (৩৩) হেদায়া, (৩৪) আইনুল হেদায়া, (৩৫) নেহায়া, (৩৬) এনায়া, (৩৭) গায়াতুল আওতার, (৩৮) শরহে বেকায়া, (৩৯) কানযুদ্ দাক্বায়েক্ব, (৪০) ফতওয়ায়ে আমিনী ইত্যাদি।}

সুওয়াল-জাওয়াব বিভাগ

সুওয়াল-জাওয়াব বিভাগ

সুওয়াল-জাওয়াব

সুওয়াল-জাওয়াব বিভাগ

সুওয়াল-জাওয়াব