মুহম্মদ নজমুল ইসলাম
গ্রাম+ডাকঃ নিশ্চিন্ত, গোপালগঞ্জ, সিলেট।
সুওয়ালঃ মাসিক মদীনা নভেম্বর/২০০০ ঈসায়ী সংখ্যায় প্রশ্নোত্তর বিভাগে ৭২নং প্রশ্নোত্তরে এবং ঢাকা মুহম্মদপুর জামেয়া রাহমানিয়া থেকে প্রকাশিত একটি অখ্যাত পত্রিকার এপ্রিল/২০০১ ঈসায়ী সংখায় জিজ্ঞাসার-জবাব বিভাগে ৭৯২নং জিজ্ঞাসার-জবাবে এবং হাটহাজারী মাদ্রাসা থেকে মৌলভী আহমদ শফীর সম্পাদনায় প্রকাশিত অখ্যাত পত্রিকার এপ্রিল/২০০১ ঈসায়ী সংখ্যায় জিজ্ঞাসা-সমাধান বিভাগে ৩২৫১নং জিজ্ঞাসার-সমাধানে, “মীলাদ শরীফ-এর ক্বিায়ামকে নাজায়েয ও বিদ্য়াত বলে কয়েকটি হাদীস শরীফ উল্লেখ করেছে।”
এখন আমার সুওয়াল হলো- মীলাদ শরীফ-এর ক্বিয়ামকে নাজায়েয বলে উক্ত পত্রিকাত্রয় যে কয়েকটি হাদীস শরীফ উল্লেখ করেছে, তা কতটুকু সঠিক হয়েছে? আর সত্যিই কি উল্লিখিত হাদীস শরীফ দ্বারা মীলাদ শরীফ-এর ক্বিয়াম নাজায়েয ও বিদ্য়াত প্রমাণিত হয়?
দয়া করে উল্লিখিত হাদীস শরীফের ব্যাখ্যা দলীল-আদিল্লাহ্সহ উল্লেখপূর্বক সঠিক জাওয়াব দানে বাধিত করবেন।
জাওয়াবঃ “মীলাদ শরীফ-এর ক্বিয়াম” সম্পর্কে উল্লিখিত পত্রিকাত্রয়ে যে কয়েকটি হাদীস শরীফ উল্লেখ করা হয়েছে তা মোটেও সঠিক হয়নি বরং ভূল ও অশুদ্ধ হয়েছে। কারণ “মীলাদ শরীফ-এর ক্বিয়াম”-এর সাথে উক্ত হাদীস শরীফ-এর কোনই সম্পর্ক নেই। কেননা, মীলাদ শরীফ-এর যে ক্বিয়াম করা হয়, সেই ক্বিয়ামের অর্থ হলো, আল্লাহ্ পাক-এর রসূল সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বরকতময় বিলাদত বা জন্ম বৃত্তান্ত শ্রবণ করতঃ দাঁড়িয়ে সালাম পাঠ করা।”
অথচ উল্লিখিত পত্রিকায় বর্ণিত হাদীস শরীফসমূহে দাঁড়িয়ে সালাম করতে নিষেধ করা হয়নি। শুধু তাই নয় বরং আমভাবে সমস্ত ক্বিয়ামকেও নিষেধ করা হয়নি।
আমরা পর্যায়ক্রমে উক্ত পত্রিকাত্রয়ে বর্ণিত হাদীস শরীফ-এর সঠিক ব্যাখ্যা দলীল-আদিল্লাহ্সহ বর্ণনা করবো ইনশাআল্লাহ্। আর সেই সাথে আমরা এটাও প্রমাণ করবো যে, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে আমভাবে সমস্ত ক্বিয়ামকে বা দাঁড়ানোকে নিষেধ করেননি বরং হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বয়ং নিজেও দাঁড়িয়েছেন এবং হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণকে দাঁড়ানো বা ক্বিয়াম করার ব্যাপারে নির্দেশও দিয়েছেন। আর হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণও একে অপরের জন্যও দাঁড়িয়েছেন।
তারা বলে থাকে যে, “প্রচলিত মীলাদ শরীফ আল্লাহ্ পাক-এর রসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যামানায় ছিলনা।”
যদি তাদের এ বক্তব্যকেই সঠিক ধরে নেয়া হয়, তাহলে তাদের বক্তব্য মোতাবিক এটাই প্রমাণিত হয় যে, হাদীস শরীফে “মীলাদ শরীফ-এর ক্বিয়াম” নিষিদ্ধ ও নাজায়েয হওয়ার বিষয়টি ভুল ও মিথ্যা।
অতএব প্রমাণিত হলো, হাদীস শরীফে “মীলাদ শরীফ-এর ক্বিয়ামকে” নিষেধ করা হয়নি।
নিম্নে পত্রিকাত্রয়ের বর্ণিত হাদীস শরীফসমূহের সঠিক ব্যাখ্যা করা হলো-
শুরুতেই যে বিষয়টি জেনে রাখা জরুরী তাহলো “রদ্দুল মুহ্তার ও হুজ্জাতুল্লাহিল বালেগাহ্” নামক কিতাবে উল্লেখ আছে যে, ক্বিয়াম তিন প্রকার-
(১) ক্বিয়ামে তাকাব্বুরীঃ যেমন, হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, لا تقوموا كما يقوم الاعاجم.
অর্থাৎ “তোমরা আজমীদের মত (মাথা নীচু করে নমস্কারের ছূরতে) দাঁড়াইওনা।” এরূপ ক্বিয়াম শরীয়তে সম্পূর্ণ হারাম ও নাজায়েয।
(২) ক্বিয়ামে হুব্বীঃ যেমন, “হযরত ফাতেমা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হুজরা শরীফে আসলে, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (মুহব্বতে) দাঁড়িয়ে কপাল মুবারকে চুম্বন করে বসতেন ও বসাতেন। একে ক্বিয়ামে হুব্বী বলে।”
(৩) ক্বিয়ামে তা’যীমীঃ যেমন, “হযরত ফাতেমা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা ও হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর তা’যীমের জন্যে দাঁড়াতেন।”
মুলতঃ ক্বিয়ামে তাকাব্বুরী শরীয়তে হারাম ও নাজায়েয। আর ক্বিয়ামে হুববী ও তা’যীমী শরীয়তে জায়েয ও সুন্নত।
ক্বিয়াম বিরোধীদের বক্তব্য খন্ডন
উল্লেখ্য যে, তারা বলেছে, “একাধিক ছহীহ্ হাদীসে মীলাদে ক্বিয়াম নিষিদ্ধ ও নাজায়েয।”
প্রথম দলীল হিসেবে নিম্নোক্ত হাদীস শরীফটি উল্লেখ করেছে যা হুবহু উল্লেখ করা হলো- “হযরত আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হযরত(সাঃ)-এর চেয়ে অধিক প্রিয়পাত্র তাঁদের নিকট আর কেহই ছিলেন না। এতদসত্ত্বেও তাঁরা যখন নবী করীম (সাঃ) কে কোথাও হতে আগমন করতে দেখতেন, তাঁরা দাঁড়াতেন না। কেননা, তাঁরা জানতেন যে, হুজুর পাক (সাঃ) এটা নিতান্ত অপছন্দ করেন। এর জবাবে প্রথমত বলতে হয় যে, উক্ত হাদীস শরীফে মীলাদ শরীফ-এর ক্বিয়াম সম্পর্কে কোনই বর্ণনা নেই। যদি আমরা মীলাদ শরীফ-এর ক্বিয়াম ব্যতীত সাধারণ ক্বিয়ামকে ধরে নেই, সেক্ষেত্রেও বলতে হয় যে, উক্ত হাদীস শরীফটি ব্যাখ্যা স্বাপেক্ষ।
উক্ত হাদীস শরীফটির সঠিক ব্যাখ্যা ঃ সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হলেন, “বিশ্ববাসীর জন্য রহমত স্বরূপ।”
এ প্রসঙ্গে কালামুল্লাহ্ শরীফে ইরশাদ হয়েছে,
وما ارسلنك الا رحمة للعلمين.
অর্থঃ- “আর আমি আপনাকে তামাম আলমের জন্য রহমত স্বরূপ পাঠিয়েছি।” (সূরা আম্বিয়া/১০৭)
অন্য আয়াত শরীফে ইরশাদ হয়েছে,
وكان بالمؤمنين رحيما.
অর্থঃ- “এবং তিনি (হুজুর পাক ছল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মু’মিনদের জন্য পরম দয়ালু।” (সূরা আহ্যাব/৪৩)
সেহেতু হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সবসময়ই চাইতেন যেন উম্মতের কোন কষ্ট না হয়। তাই বার-বার দাঁড়ানোকে তিনি ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ-এর জন্যে কষ্টকর মনে করে দাঁড়াতে নিষেধ বা অপছন্দ করেছেন। শরীয়তের খেলাফ মনে করে নিষেধ বা অপছন্দ করতেননা।
আর কষ্ট সম্পর্কে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
انا واتقياء امتى براء من التكلف.
অর্থঃ- “আমি এবং আমার মুত্তাকী উম্মতগণ কষ্ট দেয়া থেকে মুক্ত।” (মিশকাত শরীফ ৪০৩ পৃষ্ঠা ৫নং হাশিয়া, মিরকাত, মুযাহেরে হক্ব।)
অথবা নিজের বিনয় প্রকাশ করার লক্ষ্যে কিংবা হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু আনহুমগণকে বিনয় শিক্ষা দেয়ার উদ্দেশ্যে দাঁড়াতে নিষেধ বা অপছন্দ করেছেন।
উক্ত হাদীস শরীফের ব্যাখ্যায় “মিশকাত শরীফে” ৪০৩ পৃষ্ঠার ৫নং হাশিয়ায় বলা হয়েছে,
قوله لذلك اى لقيامهم تواضعا لربه.
অর্থঃ- “অর্থাৎ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বীয় রবের প্রতি বিনয়ের কারণেই হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণকে ক্বিয়াম বা দাঁড়ানোকে অপছন্দ করেছেন।”
এ হাদীস শরীফের ব্যাখ্যায় থানভী ছাহেবের “ইমদাদুল ফতওয়ায়” “মিরকাত শরীফের” বরাত দিয়ে লেখা হয়েছে যে,
উর্দূ কম্পোজ করতে হবে
অর্থঃ- “হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বীয় বিনয, সরলতা ও ভদ্রতা প্রকাশে দাঁড়ানো পছন্দ করেননি বা নিষেধ করেছেন। যেমন, মিরকাত শরীফে স্পষ্ট বর্ণিত হয়েছে।”
“তা’লীকুছ ছবীহ”্ কিতাবের ৫ম খন্ডের ১২৮ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,
قوله من كراهيته لذلك اى بقيامهم تواضعا لربه.
অর্থঃ- “হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বীয় রবের প্রতি বিনয়ের কারণে হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ দাঁড়ানোকে অপছন্দ করেছেন।”
“মিরকাত শরীফ”-এর ৯ম খন্ডের ৮৪ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে, اى لقيامهم تواضعا لربه.
অর্থঃ- “অর্থাৎ আল্লাহ্ পাক-এর রসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বীয় রবের প্রতি বিনয়ের কারণে হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ-এর ক্বিয়াম বা দাঁড়ানোকে অপছন্দ করেছেন।”
উক্ত হাদীস শরীফের ব্যাখ্যায় “মিশকাত শরীফের” বিখ্যাত শরাহ্ “মুযাহিরে হক্ব” কিতাবের চতুর্থ খন্ডের ৬৫ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,
উর্দূ কম্পোজ করতে হবে
অর্থঃ- “আল্লাহ্ পাক-এর রসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিনয়ের কারণেই দাঁড়ানোকে অপছন্দ করেছেন।”
এ প্রকার বিনয় বা শিষ্টতা ইত্যাদির উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে যে, আমাদের ঘরে কোন মেহ্মান আসলে তাঁকে মেহ্মানদারী করাতে গিয়ে যখন কোন খাদ্যদ্রব্য তাঁর দিকে বাড়িয়ে দেয়া হয়, তখন ঐ মেহ্মান যেমন সৌজন্য ও ভদ্রতাসূচক “থাক, থাক” বা “না, না, আর দরকার নেই” ইত্যাদি বলে থাকেন। যার প্রকৃত অর্থ এই নয় যে, তাঁর খাওয়া শেষ হয়েছে, বরং তা শিষ্টাচার বা ভদ্রতাজনিত অনিচ্ছা মাত্র। এমতাবস্থায় আমরা কেউই তাঁর অনিচ্ছার প্রতি গুরুত্ব প্রদর্শন করিনা, বরং অধিক আগ্রহ সহকারে তাঁর খাওয়ার প্রতি যত¦বান হই। কেননা, মেহ্মানের সৌজন্য তাঁরই তরফ হতে এবং মেজবানের ভদ্রতা ও কর্তব্য তার তরফ হতে।
এখানে উল্লেখ্য যে, হুজুরে কায়েনাত ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যে সকল আদেশ বা নিষেধ এরূপ সৌজন্য এবং ভদ্রতা প্রকাশক ছিল হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ অনেক ক্ষেত্রে সে সকল আদেশ ও নিষেধ তার শব্দগত অর্থ গ্রহণ না করে হাক্বীক্বী অর্থ গ্রহণ করে তার উপর আমল করেছেন। শুধু তাই নয় বরং হাক্বীক্বী অর্থের উপর আমল করা মুস্তাহাবও মনে করেছেন।
যেমন, “বুখারী শরীফ”-এর ১ম খন্ডের ৯৪ পৃষ্ঠায় বর্ণিত আছে যে, “একদা রসূলুল্লাহ্ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বণী ওমর ইব্নে আওফের কোন (বিবাদ) মীমাংসা করতে যাওয়ায় নামাযের জন্য মসজিদে উপস্থিত হতে কিছুটা বিলম্ব হয়েছিল সেহেতু হযরত আবূ বকর ছিদ্দীক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ইমাম হয়ে নামায পড়াতে শুরু করলেন। ইতিমধ্যে হুজুরে আক্রাম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তথায় এসে পৌঁছলেন। হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আগমণ অনুভব করে, হযরত আবূ বকর ছিদ্দীক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু পিছনে আসতে চাইলে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইশারা করে তাঁকে স্ব-স্থানে থাকার নির্দেশ দিলেন। কিন্তু তা সত্বেও তিনি পেছনে সরে আসলেন। অতঃপর নামাযান্তে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে বললেন,
يا ابا بكر ما منعك ان تثبت اذ امرتك.
অর্থঃ- “হে আবূ বকর! আমি নির্দেশ দেয়া সত্বেও তুমি স্ব-স্থানে থাকলে না কেন?”
উত্তরে হযরত আবূ বকর ছিদ্দীক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বললেন,
ما كان لابن ابى قحافة ان يصلى بين يدى رسول الله صلى الله عليه وسلم-
অর্থঃ- “আবূ কুহাফার পুত্রের জন্য রাসূলুল্লাহ্ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সম্মুখে দাঁড়িয়ে নামায পড়া আদৌ শোভনীয় নয়।” (আবু কুহাফা তাঁর পিতার নাম, সেজন্য তিনি নিজেকে আবূ কুহাফার পুত্র বলে উল্লেখ করেছেন)
লক্ষণীয় যে, এখানে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নির্দেশ সত্বেও হযরত আবূ বকর ছিদ্দীক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু যিনি নবীদের পরে আল্লাহ্ পাক-এর যমীনে সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ তিনিও শব্দগত অর্থ গ্রহণ না করে আদেশের হাক্বীক্বী অর্থ গ্রহণ করে আমল করলেন। কারণ তিনি জানতেন যে, তা সৌজন্যসূচক নির্দেশ মাত্র- প্রকৃত আদেশ নয়। সেক্ষেত্রে হাক্বীক্বী অর্থ পালন করাই শিষ্টতা বা ভদ্রতার পরিচায়ক। নতুবা, প্রকৃত আদেশসূচক কোন নির্দেশ পালনার্থে তিনি নিজের জীবন, ধন-সম্পদ ইত্যাদি সমস্তই নিতান্ত তুচ্ছ জ্ঞান করতেন। সেজন্য তাঁর উত্তর শুনে, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অসন্তুষ্ট হননি বরং তাঁর এরূপ শিষ্টাচারপূর্ণ ব্যবহার ও জবাবে তিনি সন্তুষ্টই হয়েছিলেন।
হযরত ইবনে হাজার রহমতুল্লাহি আলাইহি তদ্বীয় “আদ্দুররুল মানদুদ” কিতাবে উক্ত হাদীস শরীফের ব্যাখ্যায় বলেছেন,
فيه دليل اى دليل على ان سلوك الادب اولى من امتثال الامر الذى علم عدم الجزم بقضيته.
অর্থঃ- “যে আদেশ বাধ্যকর নয়, তা পালন করা অপেক্ষা আদব রক্ষা করাই যে উত্তম, এই হাদীস শরীফই তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ।”
অতএব, যে হাদীস শরীফে স্বকীয় সৌজন্য, নম্রতা ও শিষ্টতা বশতঃ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর জন্য ক্বিয়াম করা নিষেধ করেছিলেন, তা পালন করা অপেক্ষা আদব রক্ষা করা এবং বিনীত হওয়াই অধিক উত্তম। এজন্যই ফিক্বাহ্র কিতাবসমূহে ক্বিয়ামে তা’যীমীকে এক বাক্যে মুস্তাহাব বলে উল্লেখ করা হয়েছে।”
উপরোক্ত আলোচনা ও ব্যাখ্যা দ্বারা এটাই প্রমাণিত হলো যে, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণকে শুধুমাত্র নিজের বিনয়, ভদ্রতা ও শিষ্টতা প্রকাশেই ক্বিয়াম করতে নিষেধ করেছিলেন। শরীয়ত বিরোধী, নাজায়েয বা বিদ্য়াত হিসেবে নয়।
আর হযরত আনাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর উক্ত হাদীস শরীফের ব্যাখ্যায় “শরহুত ত্বীবী” ও “মিরকাত শরীফে” উল্লেখ আছে,
ولعل الكراهية بسبب المحبة.
অর্থঃ- “নিশ্চয়ই মুহব্বতের কারণেই দাঁড়ানোকে অপছন্দ করেছেন। আর হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিাল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ যে অধিক মুহব্বত ছিল তার প্রমাণ উক্ত হাদীস শরীফেই রয়েছে যে, তাঁরাই হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সবচেয়ে বেশী মুহব্বত করতেন।
আর “আলমাদখাল কিতাবের” ১ম খন্ডের ১৩৩ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে যে,
ولا يصح الاحتجاج بهذا الحديث …… وقاموا بحضرته صلى الله عليه وسلم ولم يكره قيام بعضهم لبعض وانه عليه الصلاة والسلام قد قام لبعضهم.
অর্থঃ- “ক্বিয়াম না করার ব্যাপারে হযরত আনাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর বর্ণিত হাদীস শরীফটি দলীল হিসেবে গ্রহণ করা শুদ্ধ হবেনা। ………. কেননা হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ আল্লাহ্ পাক-এর রসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপস্থিতিতে দাঁড়িয়েছেন অথচ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁদের পরস্পরের ক্বিয়াম করাকে অপছন্দ করেননি। এমনকি স্বয়ং হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোন কোন ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণের জন্য দাঁড়িয়েছেন। যার বর্ণনা পরে আসছে।
উপরোক্ত দলীল ভিত্তিক আলোচনা থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো যে, রহমতুল্লিল আলামীন আখিরী রসুল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ-এর জন্যে কষ্টকর মনে করে বা বিনয় প্রকাশ করার লক্ষ্যে বা বিনয় শিক্ষা দেয়ার উদ্দেশ্যে বা মুহব্বতের কারণে দাঁড়ানোকে অপছন্দ করছেন।
দ্বিতীয়তঃ তারা বলেছে, একাধিক ছহীহ্ হাদীসে মীলাদে ক্বিয়াম নিষিদ্ধ ও নাজায়েয।
দ্বিতীয় দলীল হিসেবে তারা নিম্নোক্ত হাদীস শরীফটি উল্লেখ করেছে। হাদীস শরীফটি হলো- “হযরত আবূ উমামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, একদিন হুযুর (সাঃ) লঠির উপর ভর দিয়ে বাড়ী থেকে বের হয়ে আসলেন, আমরা সকলেই তাঁর জন্য দাঁড়িয়ে গেলাম। অতঃপর নবী করীম (সাঃ) বললেন, অনারবরা যেরূপ একে অপরের সম্মানার্থে দাঁড়িয়ে যায়, তোমরা সেইরূপ দাঁড়াইবে না।
এর জবাবে বলতে হয় যে, উক্ত হাদীস শরীফেও “মীলাদ শরীফ-এর ক্বিয়ামকে” নিষেধ করা হয়নি এবং সাধারণ ক্বিয়ামকেও নিষেধ করা হয়নি। বরং এ হাদীস শরীফ দ্বারা ক্বিয়াম করার পদ্ধতি, নিয়ম, তর্জ-ত্বরীকা শিক্ষা দেয়া হয়েছে যে,
لا تقوموا كمايقوم الاعاجم.
অর্থঃ- “তোমরা আজমীদের মত (মাথা নিচু করে নমস্কারের ছুরতে) দাঁড়াইও না।”
অর্থাৎ এ হাদীস শরীফ দ্বারা এটাই বুঝানো হয়েছে যে, তোমরা সম্মানার্থে দাঁড়াবে তবে আজমীদের মত নমস্কারের ছুরতে নয়। আমরাও উক্ত হাদীস শরীফের ভিত্তিতে বলে থাকি যে, আজমীদের মত নমস্কারের ছুরতে দাঁড়ানো বা ক্বিয়াম করা শরীয়তে হারাম ও নাজায়েয।
উক্ত হাদীস শরীফের ব্যাখ্যায় “মিরকাত শরীফ”-এর ৯ম খন্ডের ৮৫ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে,
لاشك انهم انما قاموا لله وتعظيما لرسول الله ولعل الوجه ان يقال انهم قاموا متمثلين فنهاهم عن ذلك.
অর্থঃ- “কোন সন্দেহ নেই। নিশ্চয় তাঁরা (অর্থাৎ হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ) আল্লাহ্ পাক-এর জন্য এবং আল্লাহ্ পাক-এর রসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সম্মানার্থে দাঁড়িয়েছেন।”
তবে আজমীদের মত দাঁড়ানোকে নিষেধ করার কারণ হলো, নিশ্চয়ই তারা আজমীদের মত দাঁড়িয়েছিলেন। তাই তাঁদেরকে আজমীদের মত দাঁড়াতে নিষেধ করেছেন।
উক্ত হাদীস শরীফের ব্যাখ্যায় “মুযাহিরে হক্ব” কিতাবের ৪র্থ খন্ডের ৬৬ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে,
উর্দূ কম্পোজ করতে হবে
অর্থঃ- “উক্ত হাদীস শরীফে ক্বিয়াম নিষেধ করার কারণে মুল ক্বিয়াম নিষিদ্ধ নয়। যেমন, অন্যান্য হাদীস শরীফে ক্বিয়াম করার ব্যাপারে বর্ণনা এসেছে। বরং যে ক্বিয়াম তাকাববুরী তথা বড়ত্ব প্রকাশ করার জন্য করা হয় উক্ত হাদীস শরীফে সেই ক্বিয়ামকে নিষেধ করা হয়েছে।”
কিন্তু “মীলাদ শরীফের ক্বিয়াম” আজমীদের মত নমস্কারের ছুরতে নয়। বরং “মীলাদ শরীফে সালাম পেশ করার জন্যই ক্বিয়াম করা হয়। তাহলে মীলাদ শরীফের ক্বিয়াম কি করে নাজায়েয হতে পারে।
সুতরাং উক্ত হাদীস শরীফে মীলাদ শরীফের ক্বিয়ামকে নিষেধ করা হয়নি এবং আমভাবে সমস্ত ক্বিয়ামকেও নিষেধ করা হয়নি। বরং ক্বিয়ামে তাকাববুরীকে নিষেধ করা হয়েছে যা বিধর্মী আজমীরা করে থাকে।
তৃতীয়তঃ তারা মীলাদ শরীফ-এর ক্বিয়ামকে নাজায়েয বলে পরবর্তীতে যে হাদীস শরীফটি দলীল হিসেবে পেশ করেছে তা হলো- “হযরত মুয়াবিয়া (রাঃ) থেকে বর্ণিত, হুযুর (সাঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তি এ কথার উপর খুশী হয় যে, লোকেরা তাকে দাঁড়িয়ে সম্মান করে সে যেন তার ঠিকানা দোযখে বানিয়ে নেয়।”
এর জবাব হলো, উক্ত হাদীস শরীফেও “মীলাদ শরীফ-এর ক্বিয়ামকে” এবং সাধারণভাবে সমস্ত ক্বিয়ামকে নিষেধ করা হয়নি। বরং বলা হয়েছে,
من سره ان يتمثل له الرجال قياما.
অর্থাৎ- “মানুষ তার সামনে মূর্তির মত দাঁড়িয়ে থাকুক এটাই যদি সে পছন্দ করে তাহলে সে জাহান্নামী।”
মূলতঃ এ হাদীস শরীফ দ্বারাও ক্বিয়ামে তাকাববুরীকে বুঝানো হয়েছে যা মুতাকাব্বির ও মুতাজাবিবর (গর্বকারী ও অহংকারী) লোকদের স্বভাবগত অভ্যাস। এধরণের ক্বিয়ামও শরীয়তে হারাম।
কিন্তু উক্ত হাদীস শরীফে সমস্ত ক্বিয়ামকে নিষেধ করা হয়নি। যেমন, উক্ত হাদীস শরীফের ব্যাখ্যায় “মিশকাত শরীফে” ৪০৩ পৃষ্ঠায় ৭নং হাশিয়ায় “মিরকাত শরীফে” ৯ম খন্ডের ৮৫ পৃষ্ঠায় এবং “তা’লিকুছ ছবীহ” কিতাবের ৫ম খন্ডের ১২৯ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে,
واما اذا لم يطلب ذلك وقاموا من تلقاء انفسهم طلبا للثواب او لارادة التواضع فلاباس به.
অর্থাৎ- “মানুষ তার সামনে মূর্তির মত দাঁড়িয়ে থাকুক এটা যদি পছন্দ না করে বা এটা তার উদ্দেশ্য না হয় এবং পরস্পরের সাক্ষাতে ছওয়াবের উদ্দেশ্যে অথবা বিনয়ের উদ্দেশ্যে দাঁড়ায় তাহলে এতে কোন অসুবিধা নেই।”
“মিশকাত শরীফে” উক্ত হাশিয়ায়, “মিরকাত শরীফ”-এর উক্ত পৃষ্ঠায় এবং “শরহুত ত্বীবী” কিতাবের ৯ম খন্ডের ৪৫ পৃষ্ঠায় আরো বলা হয়েছে,
ان قيام المرء بين يدى الرئيس الفاضل والوالى العادل وقيام المتعلم للمعلم مستحب.
অর্থাৎ- “নিশ্চয় নেতৃস্থানীয় মর্যাদাবান ব্যক্তির ও ন্যায় পরায়ন শাসকের সামনে দাঁড়ানো এবং উস্তাদ, শিক্ষকের জন্য ছাত্রদের দাঁড়ানো মুস্তাহাব।”
সুতরাং উক্ত হাদীস শরীফের ব্যাখ্যায় এটাই প্রমাণিত হলো যে, আলিম, ফাজিল, উস্তাদ, ন্যায় বিচারক, সম্মানিত ব্যক্তি, পিতা-মাতা, পরহেযগার আল্লাহ্ওয়ালা ব্যক্তির আগমন এবং সম্মানে দাঁড়ানো বা ক্বিয়াম করা মুস্তাহাব ও ছওয়াবের কাজ। যদি তাই হয় তাহলে “মীলাদ শরীফ-এর ক্বিয়াম” করতে নিষেধ কোথায়? বরং “মীলাদ শরীফ-এর ক্বিয়াম করাই মুস্তাহাব, সুন্নতে উম্মত মুস্তাহাসান।
অতএব, প্রমাণিত হলো উক্ত হাদীস শরীফেও “মীলাদ শরীফের ক্বিয়ামকে” নিষেধ করা হয়নি। ববং উক্ত হাদীস শরীফের ব্যাখ্যায় ক্বিয়াম করাকেই মুস্তাহাব ও ছওয়াবের কাজ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
চতুর্থতঃ তারা মীলাদ শরীফ-এর ক্বিয়ামকে নিষিদ্ধ ও নাজায়েয বলে সর্বশেষ যে হাদীস শরীফটি দলীল হিসেবে পেশ করেছে তাহলো- “নবী করীম (সাঃ) এরশাদ করেন যে, তোমরা নামাযের মধ্যে যেভাবে আল্লাহ্র জন্য দাঁড়াও, সেরূপ আমার জন্য দাঁড়াইবে না।
এর জবাবে বলতে হয় যে, উক্ত হাদীস শরীফেও “মীলাদ শরীফ-এর ক্বিয়ামকে” নিষেধ করা হয়নি। বরং এ হাদীস শরীফ দ্বারা হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে ক্বিয়াম করার নিয়ম পদ্ধতি, তর্জ-তরিকা শিক্ষা দিয়ে বলেছেন যে, “তোমরা যেরূপভাবে (অত্যন্ত বিনয়ের সহিত সিজ্দা করার উদ্দেশ্যে) নামাযের মধ্যে আল্লাহ্ পাক-এর জন্য দাঁড়াও অনুরূপ ভাবে আমার জন্য দাঁড়াবে না।
তাছাড়া নামাযে যেভাবে দাঁড়ানো হয়, “মীলাদ শরীফ-এর ক্বিয়ামে” সেভাবে দাঁড়ানো হয়না।
যেমন, নামাযে ক্বিয়াম করা ফরয। অথচ মীলাদ শরীফে ক্বিয়াম করা সুন্নতে উম্মত মুস্তাহ্সান।
নামাযে ক্বিবলা মুখী হয়ে দাঁড়াতে হয়। যা ফরয। অথচ মীলাদ শরীফে ক্বিবলামুখী হওয়া ফরয নয়। বরং মীলাদ শরীফে বিভিন্ন মুখী হয়ে ক্বিয়াম করা হয়।
নামাযে কাঁতার বন্দী হয়ে, কাঁতারে ফাক বন্ধ করে, কাঁতার সোজা করে দাঁড়াতে হয়। যা ওয়াজিব। অথচ মীলাদ শরীফে নামাযের মত কাঁতার বন্দী হয়ে, কাঁতারের ফাঁক বন্দ করে কাঁতার সোজা করে, দাঁড়ানো হয় না।
নামাযে এদিক-ওদিক তাকানো নিষেধ। অথচ মীলাদ শরীফ তা নিষেধ নয়।
নামাযে আল্লাহ্ পাককে সিজ্দা করার উদ্দেশ্যে দাঁড়ানো হয়। অথচ মীলাদ শরীফে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সিজ্দা করার উদ্দেশ্য দাঁড়ানো হয় না। বরং হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি সালাম পেশ করার উদ্দেশ্য মীলাদ শরীফে ক্বিয়াম করা হয়।
অতএব, উপরোক্ত আলোচনা থেকে এটাই প্রমাণিত হলো যে, নামাযে যেভাবে দাঁড়ানো হয় মীলাদ শরীফে সেভাবে দাঁড়ানো বা ক্বিয়াম করা হয়না। সুতরাং “মীলাদ শরীফের ক্বিয়ামের” সাথে উক্ত হাদীস শরীফের কোন সম্পর্ক নেই।
পরিশেষে তারা “আল মাদখাল, জাদুল মায়াদ ও ফতওয়ায়ে রশিদীয়া” কিতাবের দলীল দিয়েছে।
অথচ উক্ত কিতাবগুলোতে ক্বিয়ামের স্বপক্ষেই বলা হয়েছে। এমনকি মাওলানা রশীদ আহ্মদ গাংগুহী তদীয় “ফতওয়ায়ে রশীদিয়া” কিতাবের ৪৫৯ পৃষ্ঠায় বলেছেন,
উর্দূ কম্পোজ করতে হবে
অর্থঃ- “দ্বীনদার লোকের তা’যীমের জন্য দন্ডায়মান হওয়া জায়েয, এরূপ লোকের পদ চুম্বন করাও জায়েয। এ কথা হাদীস শরীফ দ্বারা সাব্যস্ত।”
আরো উল্লেখ্য যে, তারা বলেছে, “হাদীস শরীফে ক্বিয়াম করার ব্যাপারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা বর্ণিত রয়েছে।”
এর জবাব আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি যে, হাদীস শরীফে যে ক্বিয়ামকে নিষেধ করা হয়েছে তাহলো, ক্বিয়ামে তাকাববুরী যা বিধর্মী আজমীরা মাথা নীচু করে নমস্কারের ছুরতে দাঁড়িয়ে থাকে। আর এ ধরণের ক্বিয়ামকে নিষেধ করে আল্লাহ্ পাক-এর রসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
لا تقوموا كما يقوم الاعاجم.
অর্থাৎ- “তোমরা আজমীদের মত (মাথা নীচু করে নমস্কারের ছুরতে) দাঁড়াইও না।”
কিন্তু “মীলাদ শরীফ-এর ক্বিয়ামকে” এবং আমভাবে সমস্ত ক্বিয়ামকে নিষেধ করা হয়নি। আর তাই যদি হতো তাহলে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেও ক্বিয়াম করতেন না।
যেমন, এ প্রসঙ্গে হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে যে,
عن عائشعة رضى الله عنها. كانت اذا دخلت عليه قام اليها فاخذ يدها فقبلها واجلسها فى مجلسه وكان اذا دخل عليها قامت له فاخذت بيده فقبلته واجلسته فى مجلسها.
অর্থঃ- হযরত আয়েশা ছিদ্দীকা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হযরত ফাতেমা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা যখন সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট যেতেন, তখন তিনি দাঁড়িয়ে যেতেন এবং হাতে বুছা দিয়ে নিজের স্থানে বসাতেন। আর সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন হযরত ফাতেমা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা-এর নিকট যেতেন তখন তিনি দাঁড়িয়ে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাত মুবারক বুছা দিয়ে নিজের স্থানে বসাতেন।” (আবু দাউদ, মিশকাত)
আর হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ক্বিয়াম করার জন্য হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমদেরকে নির্দেশও দিয়েছেন।
যেমন, “মিশকাত শরীফ”-এর ৪০৩ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,
عن ابى سعيدن الخدرى قال لما نزلت بنوقريظة على حكم سعد بعث رسول الله صلى الله عليه وسلم اليه وكان قريبا منه فجاء على حمار فلما دنا من المسجد قال رسول الله صلى الله عليه وسلم للانصار قوموا الى سيدكم-
অর্থঃ- “হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, বনু কুরাইযা গোত্র যখন হযরত সা’দ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এর বিচারকে মেনে নেয়ার শর্তে দুর্গ থেকে অবতরণ করলো। তখন আল্লাহ্ পাক-এর রসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত সা’দ রদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহুকে ডেকে পাঠালেন। তিনি হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকটেই ছিলেন। অতঃপর হযরত সা’দ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু যখন গাধার পিঠে আরোহন করে মসজিদের নিকটবর্তী হলেন, তখন আল্লাহ্ পাক-এর রসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আনছার ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণকে বললেন, তোমরা তোমাদের সর্দারের সম্মানে দাঁড়াও।”
হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জন্যও দাঁড়িয়েছেন। যেমন, হাদীস শরীফে উল্লেখ আছে যে,
عن ابى هريرة رضى الله تعالى عنه قال كان رسول الله صلى الله عليه وسلم يجلس معنا فى المسجد يحدثنا فاذا قام قمنا قياما حتى نراه قد دخل بعض بيوت ازواجه.
অর্থঃ- “হযরত আবু হুরয়রা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন, একদা সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের মাঝে বসে আমাদেরকে নছীহত করছিলেন। যখন তিনি উঠলেন বা দাঁড়ালেন, আমরাও সাথে সাথে দাঁড়িয়ে গেলাম, ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষন আমরা তাঁকে দেখতে পাচ্ছিলাম। এমনকি তাঁর স্ত্রীদের ঘরে প্রবেশ না করা পর্যন্ত আমরা দাঁড়িয়ে রইলাম।” (বায়হাক্বী ফী শোয়াবিল ঈমান, মিশকাত শরীফ)
এছাড়া হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ একে অপরের জন্যও দাঁড়িয়েছেন। যেমন-
عن عبد الرحمن بن عبد الله بن كعب بن مالك عن ابيه عن جده كعب رضى الله عنه …….. وانطلقت الى رسول الله صلى الله عليه وسلم حتى دخلت المسجد واذا برسول الله صلى الله عليه وسلم جالس حوله الناس فقام الى طلحة بن عبيد الله يهرول حتى صافحنى.
অর্থঃ- “হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আব্দুল্লাহ তাঁর দাদা হযরত কা’ব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণনা করেন যে, হযরত কা’ব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন, আমি আল্লাহ্ পাক-এর রসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দরবার শরীফে গেলাম, এমনকি মসজিদে নববীতে প্রবেশ করলাম, তখন হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ, আল্লাহ্ পাক-এর রসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে চতুর্দিকে বসা ছিলেন, অতঃপর ত্বলহা ইবনে উবায়দুল্লাহ আমার জন্য দাঁড়ালেন, এমনকি দ্রুতগতিতে এসে আমার সাথে মুছাফাহা করলেন ….।”
উপরোক্ত হাদীস শরীফ থেকে প্রমাণিত হলো যে, হযরত কা’ব রদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু-এর সম্মানার্থে হযরত ত্বলহা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু দাঁড়িয়েছেন।
উপরোক্ত হাদীস শরীফের প্রেক্ষিতে “মিশকাত শরীফ”-এর ৪০৩ পৃষ্ঠায় ৭নং হাশিয়ায়, “মিরকাত শরীফ”-এর ৯ম খন্ডের ৮৫ পৃষ্ঠায়, “শরহুত ত্বীবী” কিতাবের ৯ম খন্ডের ৪৫ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে যেটা ইমাম বাইহাক্বী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন,
وقال البيهقى هذا القيام يكون على وجه البر والاكرام كما كان قيام الانصار لسعد وقيام طلحة لكعب بن مالك.
অর্থঃ- “ইমাম বাইহাক্বী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন, এই ক্বিয়াম সদ্ব্যবহার এবং সম্মানের কারণে হবে। যেমন, হযরত আনছার ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ হযরত সা’দ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর সম্মানে ক্বিয়াম করেছেন এবং হযরত কা’ব ইবনে মালিক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর সম্মানে হযরত ত্বলহা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ক্বিয়াম করেছেন।”
অতএব, উপরোক্ত দলীল-আদিল্লাহ্ভত্তিক বিস্তারিত আলোচনা থেকে প্রমাণিত হলো যে, উল্লিখিত পত্রিকাত্রয় মীলাদ শরীফ-এর ক্বিয়াম সম্পর্কে যে বক্তব্য পেশ করেছে তা সম্পূর্ণ ভুল, মিথ্যা ও জালিয়াতি।
কারণ, “মীলাদ শরীফ-এর ক্বিয়াম” তো অবশ্যই জায়েয বরং সুন্নতে উম্মত মুস্তাহ্সান এবং “মীলাদ শরীফের ক্বিয়াম” ছাড়াও আলিম, ফাজিল, বুযুর্গ, উস্তাদ, শিক্ষক, সর্দার, ন্যয় পরায়ন ব্যক্তি, সম্মানিত ব্যক্তি, নেক্কার, পরহেযগার, আল্লাহ্ওয়ালা ব্যক্তি, পিতা-মাতা, মুরুব্বী ইত্যাদি ব্যক্তিদের জন্য ক্বিয়াম করাও মুস্তাহাব-সুন্নত।
কেননা, আল্লাহ্ পাক-এর রসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বয়ং নিজেই ক্বিয়াম করেছেন, ক্বিয়াম করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন এবং হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ পরস্পর পরস্পরের জন্য ক্বিয়াম করেছেন।
{দলীলসমূহঃ (১) বুখারী, (২) আবূ দাউদ, (৩) মিশকাত, (৪) বাইহাক্বী ফী শুয়াবিল ঈমান, (৬) ফতহুল বারী, (৭) উমদাতুল ক্বারী, (৮) আউনুল মা’বুদ, (৯) মিরকাত, (১০) আশয়াতুল লুময়াত, (১১) লুময়াত, (১২) শরহুত্ ত্বীবী, (১৩) তালীকুছ্ ছবীহ্, (১৪) মুযাহিরে হক্ব, (১৫) আহ্মদ, (১৬) আদ্ দুররুল মানদুদ, (১৭) রদ্দুল মুহ্তার, (১৮) হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা, (১৯) তাছাউফ তত্ত্ব, (২০) দুররুল মুনাজ্জাম, (২১) ইবাদুল জাওয়াহির, (২২) মুলাখ্খাছ, (২৩) ইশবাউল কালাম, (২৪) সীরাতে হালাবিয়া, (২৫) হাফতে মাসায়েল, (২৬) মরকুমাতে ইমদাদিয়া (২৭) ইমদাদুল ফতওয়া, (২৮) ফতওয়ায়ে রশীদিয়া, ইত্যাদি।}
{বিঃ দ্রঃ অতি শীঘ্রই মাসিক আল বাইয়্যিনাতে “মীলাদ শরীফ-এর ক্বিয়াম” সম্পর্কে ফতওয়া প্রকাশ করা হবে ইনশাআল্লাহ্}
সাইয়্যিদ মুহম্মদ মোক্তাদুল ইসলাম (মিলন)
সুবহানী ঘাট, সিলেট।
সুওয়ালঃ রেযাখানী মাযহাবের মুখপত্র ডিসেম্বর/২০০০ঈঃ সংখ্যায় “তাফসীরে রুহুল বয়ান, বুখারী, গুনিয়াতুত তালেবীন, রেযভীয়া” কিতাবের বরাত দিয়ে বলেছে, “সহীহ্ মুসলিম শরীফসহ” অনেক নির্ভরযোগ্য কিতাবে নফল নামায বিশেষতঃ ক্বদর ও বরাতের নফল নামায জামাত সহকারে আদায় করা বৈধ …..।”
জাওয়াবঃ রেযাখানী মুখপত্রের উক্ত বক্তব্য সম্পূর্ণ ভুল, জিহালতপূর্ণ ও প্রতারণামূলক যা শরীয়তে গ্রহণযোগ্য নয়। তারা “তাফসীরে রুহুল বয়ান, বুখারী, গুণিয়াতুত্ তালেবীন” ইত্যাদি কিতাবের নাম দিয়ে যে বক্তব্য প্রদান করেছে আসলে উক্ত কিতাবসমূহের বক্তব্য সে রকম নয়। বরং তার সম্পূর্ণ বিপরীত।
তারা “তাফসীরে রুহুল বয়ান”-এর ইবারতের অর্থে “শরহে নেকায়া ও মুহিত” কিতাবের বরাত দিয়ে নফল নামায বিশেষতঃ “শবে বরাত, শবে ক্বদরের” নফল নামায আযান ইক্বামত ছাড়া জামায়াত সহকারে আদায় করা যে বৈধ বলেছে, তা আমরা আমাদের “মাসিক আল বাইয়্যিনাত”-এর গত সংখ্যাগুলোতে বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করে প্রমাণ করেছি যে, তাদের বক্তব্য সম্পূর্ণই ভুল, জিহালতপূর্ণ, জালিয়াতী ও প্রতারণামূলক।
কারণ তারা কিতাবের ইবারত, সঠিক অর্থ ও ব্যাখ্যা অনুধাবনে ব্যর্থ হয়েই নিজ হাতে ইবারত লিখে “তাফসীরে রুহুল বয়ানের” নামে চালিয়ে দিয়ে কিতাবের নাম ব্যবহার করে প্রতারণা করেছে। সুতরাং রেযাখানীরা কিতাবের নাম ব্যবহার করে যে প্রতারণা করেছে “মাসিক আল বাইয়্যিনাত”-এর গত সংখ্যাগুলোর আলোচনা দ্বারাই তা প্রমাণিত হয়েছে। এরপরেও যদি বিশেষ প্রয়োজন পরিলক্ষিত হয় তাহলে পরবর্তীতে আরো বিস্তারিতভাবে দলীল আদিল্লাহ্সহ “তাফসীরে রুহুল বয়ানের” বক্তব্য ধারাবাহিকভাবে পর্যালোচনা করা হবে ইনশাআল্লাহ্।
(ধারাবাহিক)
বর্তমান সংখ্যায় বুখারী শরীফের বক্তব্য
বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করা হলো
উল্লেখ্য রেযাখানীরা “বুখারী শরীফের” ১ম খন্ডের ১৫৮ পৃষ্ঠার বরাত দিয়ে আযান ইক্বামত ছাড়া নফল নামায বিশেষতঃ “শবে বরাত, শবে ক্বদরের” নফল নামায জামায়াত সহকারে আদায় করা বৈধ বলে “বুখারী শরীফের” ১ম খন্ডের ১৫৮ পৃষ্ঠার বাব বা পরিচ্ছদ সম্পর্কিত যে ইবারতটুকু তাদের মুখপত্রে উল্লেখ করেছে, উক্ত ইবারতটুকুর পরবর্তী ইবারতকে তারা প্রতারণামূলকভাবে করে উল্লেখ করা হতে বিরত রয়েছে। বরং এখানেও তারা ইবারত কারচুপি করে জালিয়াতী ও প্রতারণা করেছে।
কারণ, উক্ত ইবারতটুকুর পরবর্তী ইবারত উল্লেখ করলে তাদের হাক্বীক্বত ধরা পড়তো এবং তাদের মুখোশ জনসাধারণের সম্মুখে উন্মোচিত হতো এবং সেই সাথে এটাও প্রমাণিত হতো যে, তারা “বুখারী শরীফের” বরাত দিয়ে কিতাবের নাম ব্যবহার করে যেটা বলতে চেয়েছে আসলে “বুখারী শরীফের” বক্তব্য সে রকম নয়।
উল্লেখ্য যে, উক্ত ইবারতটুকুর পরবর্তী ইবারতে বলা হয়েছে, “নফল নামায জামায়াতে আদায় করা সম্পর্কিত হাদীস শরীফ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে দু’জন ছাহাবী বর্ণনা করেছেন। একজন হলেন, হযরত আনাছ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এবং অপরজন হলেন, হযরত আয়েশা ছিদ্দীকা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা।”
আর হযরত আয়েশা ছিদ্দীকা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা-এর বর্ণিত হাদীস শরীফে উল্লেখ আছে যে, “নফল নামায জামায়াতে আদায় করা বলতে ছলাতুল কুসূফ বা সূর্যগ্রহণের নামাযকে বুঝানো হয়েছে।”
যেমন, রেযাখানীদের মুখপত্রে উল্লিখিত বাব বা পরিচ্ছদ সম্পর্কিত ইবারতটুকু হলো,
باب صلوة النوانل جماعة الخ.
অথচ উক্ত ইবারতটুকুর পরবর্তী ইবারত যা রেযাখানীরা কারচুপি করে উল্লেখ করেনি। তাহলো,
ذكره انس وعائشة عن النبى صلى الله عليه وسلم.
অর্থাৎ- “নফল নামায জামায়াতে আদায় করা সম্পর্কিত হাদীস শরীফ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে হযরত আনাছ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এবং হযরত আয়েশা ছিদ্দীকা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা বর্ণনা করেছেন।”
আর হযরত আনাছ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর বর্ণিত হাদীস শরীফ, “মুসলিম শরীফের” পর্যালোচনায় বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হবে ইনশাআল্লাহ।
কারণ রেযাখানীরা হযরত আনাছ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর বর্ণিত হাদীস শরীফ খানা-ই পৃথকভাবে মুসলিম শরীফের বরাত দিয়ে উল্লেখ করেছে।
এখানে শুধুমাত্র হযরত আয়েশা ছিদ্দীকা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা-এর বর্ণিত হাদীস শরীফ আলোচনা করা হবে। আর তাতেই প্রমাণিত হবে যে, “বুখারী শরীফে” নফল নামায জামায়াতে আদায় করা সম্পর্কিত যে হাদীস শরীফ বর্ণিত হয়েছে তাদ্বারা মূলতঃ “ছলাতুল কুসূফ” বা “সূর্যগ্রহণের নামাযকে” বুঝানো হয়েছে।
যেমন, “বুখারী শরীফের” বিখ্যাত ব্যাখ্যাগ্রন্থ “উমদাতুল কারী” কিতাবের ৭ম খন্ডের ২৪৭ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,
عن عائشة انها قالت خسفت الشمس فى عهد رسول الله صلى الله عليه وسلم فصلى رسول الله صلى الله عليه وسلم بالناس.
অর্থঃ- “হযরত আয়েশা ছিদ্দীকা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা থেকে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, একবার আল্লাহ্ পাক-এর রসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সময়ে সূর্যগ্রহণ হলো তখন আল্লাহ্ পাক-এর রসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লোকদের নিয়ে নামায পড়েছিলেন।”
উপরোক্ত দলীলভিত্তিক আলোচনা থেকে এটাই প্রমাণিত হলো যে, “বুখারী শরীফে” নফল নামায জামায়াতে আদায় করা সম্পর্কিত হাদীস শরীফ দু’জন ছাহাবী বর্ণনা করেছেন। একজন হযরত আনাছ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এবং অপরজন হযরত আয়েশা ছিদ্দীকা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা। আর হযরত আয়েশা ছিদ্দীকা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা-এর বর্ণিত হাদীস শরীফখানাই দিবালোকের ন্যায় সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করলো যে, “বুখারী শরীফের নফল নামায জামায়াতে আদায় করা সম্পর্কিত হাদীস শরীফ দ্বারা “ছলাতুল কুসূফ” বা “সূর্যগ্রহণের নামাযকে” বুঝানো হয়েছে।
দ্বিতীয়তঃ রেযাখানীরা আযান ইক্বামত ছাড়া নফল নামায বিশেষতঃ “শবে বরাত, শবে ক্বদরের” নফল নামায জামায়াত সহকারে আদায় করা বৈধ বলে “বুখারী শরীফের” ১ম খন্ডের ১৫৮ পৃষ্ঠার বরাত দিয়ে যে হাদীস শরীফখানা উল্লেখ করেছে উক্ত হাদীস শরীফে “শবে বরাত ও শবে ক্বদরের” নামায জামায়াত সহকারে আদায় করার কোন বর্ণনাই নেই।
তৃতীয়তঃ তারা “বুখারী শরীফের” ১ম খন্ডের ১৫৮ পৃষ্ঠার বরাত দিয়ে হাদীস শরীফখানার যে অর্থ তাদের মুখপত্রে উল্লেখ করেছে তা ১৫৮ পৃষ্ঠার হাদীস শরীফের হুবহু অর্থ নয়।
চতুর্থতঃ তারা صلى الله عليه وسلم কে এভাবে (ص) সংক্ষেপে লিখেছে। অথচ হাদীস শরীফে সংক্ষেপে লেখা নেই। বরং হাদীস শরীফে এভাবে صلى الله عليه وسلم সম্পূর্ণটাই লিখা আছে। আরصلى الله عليه وسلم কে সংক্ষেপে এভাবে (ص) লিখা মাকরূহ।
নিম্নে রেযাখানী মুখপত্রের বক্তব্য হুবহু উল্লেখ করার পর বুখারী শরীফের ইবারতসহ সঠিক অর্থ তুলে ধরা হলো-
যেমন, রেযাখানী মুখপত্রের হুবুহু বক্তব্য হলো, “হযরত ইতবান ইবনে মালিক আনসারী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু যিনি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা এর সাহাবী ছিলেন আর যিনি বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তিনি একদা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা এর দরবারে উপস্থিত হয়ে আরজ করলেন। ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমার দৃষ্টিশক্তি কমে গেছে এবং আমার ঘর ও গোত্রের মসজিদের মাঝখানে যে উপত্যকা রয়েছে তাতে যখন বৃষ্টি হয় প্রবল বেগে পানি প্রবাহিত হয়, তখন আমার পক্ষে মসজিদে যাওয়া অসম্ভব হয়ে উঠে। তাই আমার একান্ত আশা যে, আপনি আমার ঘরে তাশরীফ এনে কোন স্থানে নামায পড়ুন। যে স্থানকে আমি নামাযের স্থান হিসেবে নির্ধারণ করব। তখন রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন আমি তাই করব। পরদিন সকালে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আবু বকর ছিদ্দীক রদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে সাথে নিয়ে আমার ঘরে তাশরীফ আনলেন, প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (ঘরে প্রবেশের) অনুমতি প্রার্থনা করলেন। আমি তাঁকে (প্রিয় নবীকে) আসতে বললাম। তিনি ঘরে প্রবেশ করে বসার পূর্বে বললেন, তোমার ঘরে কোন স্থানে নামায পড়াকে ভাল মনে কর? আমি ঘরের একদিকে ইঙ্গিত করলাম যেখানে তিনি নামায পড়াকে আমি ভাল মনে করি।
فقام رسول الله صلى الله عليه وسلم فكبر وصففنا وراءه فصلى ركعتين ثم سلم فسلمنا حين سلم الخ-
অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দাঁড়িয়ে তাকবীর বললেন, আমরা সবাই তাঁর পেছনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে গেলাম তিনি দু’রাকাত নামায পড়ে সালাম ফিরালেন আমরাও তাঁর সাথে সালাম ফিরালাম। (সহীহ্ বুখারী- ১ম খন্ড, ১৫৮ পৃষ্ঠা)
আর “বুখারী শরীফের” ১ম খন্ডের ১৫৮ পৃষ্ঠার ইবারত ও সঠিক অর্থ হলো-
حدثنى اسحاق قال اخبرنا يعقوب بن ابراهيم قال حدثنا ابى عن ابن شهاب قال اخبرنى محمود بن الربيع الانصارى انه عقل رسول الله صلى الله عليه وسلم وعقل مجة مجها فى وجهه من بير كانت فى دارهم فزعم محمود انه سمع عتبان بن مالك الانصارى وكان ممن شهد بدرا مع رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول كنت اصلى لقومى بنى سالم وكان يحول بينى وبينهم واد اذا جاءت الامطار فيشق على اجتيازه قبل مسجدهم فجئت رسول الله صلى الله عليه وسلم فقلت له انى انكرت بصرى وان الوادى الذى بينى وبين قومى يسيل اذا جاءت الامطار فيشق على اجتيازه فوددت انك تأتى فتصلى من بيتى مكانا اتخذه مصلى فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم سافعل فغدا على رسول الله صلى الله عليه وسلم وابوبكر بعد مااشتد النهار فاستأذن رسول الله صلى الله عليه وسلم فاذنت له فلم يجلس حتى قال اين تحب ان اصلى من بيتك فاشرت له الى المكان الذى احب ان يصلى فيه فقام رسول الله صلى الله عليه وسلم فكبر وصففنا وراءه فصلى ركعتين ثم سلم فسلمنا حين سلم …….
অর্থঃ- “হযরত ইমাম বুখারী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমার নিকট ইসহাক বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আমাদের নিকট ইয়াকুব ইবনে ইব্রাহীম খবর দিয়েছেন। তিনি বলেন, আমাদের নিকট আমার পিতা ইবনে শিহাব থেকে বর্ণনা করেছেন। হযরত ইবনে শিহাব রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, মাহমূদ ইবনে রাবী আনছারী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু আমাকে খবর দিয়েছেন যে, নিশ্চয় তিনি আল্লাহ্ পাক-এর রসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে স্মরণ করে রেখেছেন এবং তাদের বাড়ীতে যে কূপ ছিল সেই কূপ থেকে পানি মুখে নিয়ে যে কুলি হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর মুখে নিক্ষেপ করেছিলেন তাও তার স্মরণ আছে। মাহমূদ বলেছেন যে, নিশ্চয়ই তিনি ইতবান ইবনে মালিক আনসারী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে বলতে শুনেছেন এবং তিনি অর্থাৎ ইতবান ইবনে মালিক আনছারী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু আল্লাহ্ পাক-এর রসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সহিত বদর যুদ্ধে উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, আমি আমার ক্বওম বণী সালেমের নামাযে ইমামতি করতাম। আমার এবং তাদের (আমার কওমের) মাঝে একটি উপত্যকা অন্তরায় সৃষ্টি করতো। বৃষ্টি হলে সেটা অতিক্রম করে তাদের মসজিদে যাওয়া আসা আমার জন্য কষ্টকর হয়ে পড়ত। তাই আমি আল্লাহ্ পাক-এর রসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে আসলাম এবং হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললাম, (ইয়া রসূলাল্লাহ্, ইয়া হাবীবাল্লাহ্, ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম!) আমি আমার দৃষ্টি শক্তির কমতি অনূভব করছি। নিশ্চয়ই আমার এবং আমার ক্বওমের মাঝে যে উপত্যকাটি রয়েছে সেটি বৃষ্টি হলে প্লাবিত হয়ে যায়। সুতরাং তা অতিক্রম করা আমার জন্য কষ্টকর হয়ে পড়ে। সেজন্য আমি চাই যে, আপনি আমার বাড়ীতে গিয়ে একটি জায়গায় নামায আদায় করবেন, আমি সে জায়গাটি (স্থায়ীভাবে আমার) নামাযের জায়গা করে নিব। আল্লাহ্ পাক-এর রসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (সবশুনে) বললেন, ঠিক আছে, শীঘ্রই আমি তা করবো। পরদিন সকালে সূর্য তাপে দিনের প্রখরতা বেশ কিছু বেড়ে গেলে আল্লাহ্ পাক-এর রসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং হযরত আবূ বকর ছিদ্দীক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু আমার কাছে (আমার বাড়ীতে) গিয়ে উপস্থিত হলেন। আল্লাহ্ পাক-এর রসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাড়ীতে প্রবেশের অনুমতি চাইলে আমি তাঁকে অনুমতি দিলাম। তিনি না বসেই আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমার বাড়ীতে কোন জায়গায় আমার নামায আদায় করা তুমি পছন্দ কর?” যে জায়গায় তাঁর নামায আদায় করা আমার পছন্দনীয় ছিল আমি তাঁকে ইশারা করে সেই জায়গা দেখিয়ে দিলাম। আল্লাহ্ পাক-এর রসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেখানে দাঁড়ালেন এবং তাকবীর বললেন। আর আমরা তাঁর পিছনে কাতার বেধে দাঁড়ালাম। তিনি সেখানে দু’রাকায়াত নামায আদায় করে সালাম ফিরালেন। আমরাও সালাম ফিরালাম …..।”
উপরোক্ত হাদীস শরীফ দ্বারা এটাই প্রমাণিত হলো যে, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত ইতবান ইবনে মালিক আনছারী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর বাড়ীতে বরকত স্বরূপ নামায পড়েছেন এবং পরবর্তীতে হযরত ইতবান ইবনে মালিক আনছারী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বরকত স্বরূপ সেই স্থানকেই নামাযের জন্য নির্দিষ্ট করেছেন।
এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, উক্ত হাদীস শরীফ দ্বারা এটাও প্রমাণিত হলো যে, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পিছনে মুক্তাদী হিসেবে দু’জন ছাহাবী ইক্তিদা করেছিলেন। একজন হলেন, হযরত আবূ বকর ছিদ্দীক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এবং অপরজন হলেন, হযরত ইতবান ইবনে মালিক আনছারী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু। আর আমরা এরই প্রেক্ষিতে বলেছি যে, “যদি ইমামের পিছনে একজন অথবা দু’জন মুক্তাদী ইক্তিদা করে, তবে মাকরূহ্ হবেনা, আর তিনজন মুক্তাদী ইক্তিদা করার মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে, অর্থাৎ কেউ কেউ বলেছেন মাকরূহ হবে না। আর কেউ কেউ বলেছেন মাকরূহ হবে। তবে যদি চারজন মুক্তাদী ইমামের পিছনে ইক্তিদা করে নফল নামায জামায়াতের সহিত পড়ে তাহলে সকল ইমাম মুজতাহিদ ও ফুক্বাহা-ই-কিরাম-এর সর্বসম্মত মতে মাকরূহ্ তাহ্রীমী।”
যেমন, “শরহে ইলিয়াসে” উল্লেখ আছে,
التطوع بالجماعة انما يكره اذا كان على سبيل التداعى اما لو اقتدى واحد بواحد او اثنان بواحد لايكره وان اقتدى ثلثة بواحد اختلف فيه وان اقتدى اربعة بواحد كره اتفاقا-
অর্থঃ- “নফল নামায জামায়াতে পড়া মাকরূহ্ তাহ্রীমী, যখন ঘোষণা দিয়ে পড়া হবে। সুতরাং যদি (বিনা ঘোষণায়) ইমামের সাথে একজন অথবা দু’জন মুক্তাদী ইক্তিদা করে, তবে মাকরূহ্ হবেনা, আর তিনজন মুক্তাদী ইক্তিদা করার মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে, অর্থাৎ কেউ কেউ বলেছেন মাকরূহ হবে না। আর কেউ কেউ বলেছেন মাকরূহ হবে। তবে যদি চারজন মুক্তাদী ইমামের সহিত ইক্তিদা করে নফল নামায জামায়াতের সহিত পড়ে তাহলে সকল ইমাম মুজতাহিদ ও ফুক্বাহা-ই-কিরাম-এর সর্বসম্মত মতে মাকরূহ্ তাহরীমি।” (চলবে)
মুহম্মদ বাবুল হুসাইন
এফ, এস, এস, এ পি, নাজিরপুর, পিরোজপুর।
সুওয়ালঃ বরাবর, সম্পাদক, মাসিক আল বাইয়্যিনাত। জনাব, সালাম নিবেন। আমি প্রায় দুই বৎসর যাবৎ আপনার মাসিক আল বাইয়্যিনাত নিয়মিত পড়িতেছি। দেশের ইসলামী পত্রিকার মধ্যে আপনার মাসিক আল বাইয়্যিনাত পত্রিকাটি আমার খুব ভাল লাগে। নাজিরপুর ইসলামিক ফাউন্ডেশনে আমি অন্যান্য পত্রিকাও পড়ি। আপনার পত্রিকার প্রচারে আমি যথা সাধ্য চেষ্টা করি। কিন্তু অতীব দুঃখের বিষয় বিগত মার্চ/২০০০ ইং আপনার পত্রিকায় একটি প্রশ্ন পাঠিয়েছিলাম কিন্তু উত্তর পাইনি। তারপর হতে মাসিক আল বাইয়্যিনাত পত্রিকা নিয়মিত পড়িতেছি কিন্তু আর কোন প্রশ্ন পাঠাইনি। প্রশ্নটি মাসিক মদীনা ও মাসিক পৃথিবী পত্রিকায় পাঠিয়েছিলাম তবে মাসিক পৃথিবী পত্রিকায় জুন/২০০০ ইং মাসে উক্ত প্রশ্নটির উত্তর দিয়েছে কিন্তু সম্পূর্ণ উত্তর দিতে ব্যর্থ হয়েছে। আমি মাসিক মদীনা পত্রিকায় উক্ত প্রশ্নটি তিনবার পাঠিয়েছিলাম। তার মধ্যে দুইটি চিঠি রেজিষ্ট্রি করে দিয়েছিলাম বিধায় প্রশ্ন মাসিক মদীনা পত্রিকায় পৌঁছা সত্ত্বেও উত্তর দেয়নি বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। উত্তর না দেয়ায় মাসিক মদীনার প্রতি আমি রাগ করেছি যে, আর প্রশ্ন পাঠিয়ে উত্তর পাওয়ার সম্ভাবনা নাই। উত্তর দিতে না পারলেও তো তা বলা উচিৎ কিন্তু মাসিক মদীনা তাও করেনি। তবে মাসিক পৃথিবী পত্রিকা উত্তর দেয়ায় আমি খুশি হয়েছি বটে কিন্তু সম্পূর্ণ উত্তর না পেয়ে আমি আবারও আপনাদের সরনাপন্ন হলাম। আশা করি এবারে আপনি আপনার পত্রিকায় আমার প্রশ্নের উত্তর দিবেন।
প্রশ্নটি হলো- বাবুল নামের অর্থ কি? আমার নাম মুহম্মদ বাবুল হোসেন। নামটি ইসলামী নাম হয়েছে কি? যদি না হয়ে থাকে, তবে পরিবর্তন করতে হবে কিনা? যেহেতু আমি সরকারী চাকুরী করি, সুতরাং কিভাবে নাম পরিবর্তন করতে পারি। (সকল সার্টিফিকেটে ও কাগজপত্রে তো ঐ নামটিই আছে।)
মাসিক পৃথিবীর উত্তরঃ আপাতত ‘বাবুল’ শব্দের অর্থ খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে নাম ইসলামী সংস্কৃতির প্রতিফলন ঘটানোর মতো হওয়া প্রয়োজন। বর্তমান অসচেতন মুসলমানরা নাম রাখার অপ-সংস্কৃতির শিকার হচ্ছে। নাম তার ধর্মের পরিচয় বহন করে। আব্দুল হাই বললেই আমরা বুঝতে পারি লোকটি মুসলমান। ‘চিরঞ্জীব দাস’ বলতেই আমরা বুঝতে পারি লোকটি হিন্দু। অথচ আব্দুল হাই শব্দের অর্থ চিরঞ্জীব দাস। রেকর্ডপত্রে আপনার নাম বদলানোর প্রয়োজন নাই, তবে হোসেন নামে পরিচিত হওয়ার চেষ্টা করুন।
এখন আমার সুওয়াল হলো- মাসিক পৃথিবীর উপরোক্ত উত্তর ঠিক হয়েছে কিনা? দলীলসহ জানাবেন।
জাওয়াবঃ মাসিক পৃথিবী আপনার নাম সম্পর্কিত প্রশ্নের যে উত্তর প্রদান করেছে তা সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক এবং অশুদ্ধও হয়েছে। যা উক্ত পত্রিকা কর্তৃপক্ষকে চরম জাহিল হিসেবে প্রমাণ করেছে।
যেমন, “বাবুল হুসাইন” দু’শব্দের নামটির সুন্দর সহজ অর্থ প্রায় সব “লুগাতে” থাকা সত্ত্বেও উক্ত পত্রিকা কর্তৃপক্ষ তা খুঁজে পায়নি। এরপর “আব্দুল হাই” এই সুন্দর ও উত্তম মুসলিম নামটির অর্থ করেছে “চিরঞ্জীব দাস” এর অর্থও ভুল হয়েছে। সঠিক অর্থ হয়, চিরঞ্জীব-এর দাস। এমন উদ্ভট, জিহালতপূর্ণ অর্থ ও ব্যাখ্যা কোন ইসলামী পত্রিকার প্রকাশকারী তো দূরের কথা কোন নূন্যতম আরবী জ্ঞান সম্পন্ন ব্যক্তিও করতে পারে বলে আমাদের জানা নেই।
উল্লেখ্য, “আব্দুল হাই” নামটি “আব্দুল্লাহ্, আব্দুর রহমান, আব্দুর রহীম” নাম সমূহের মতই একটি নাম এবং এ ধরণের নাম রাখার ব্যাপারে হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ পাক-এর জাতি ও ছিফতি নামের সাথে ইযাফত বা সম্বন্ধ করে যে নাম রাখা হয় সে নামই প্রকৃতপক্ষে উত্তম নাম।
عبد الحى (আব্দুল হাই) বাক্যাংশে عبد শব্দটি الحى শব্দটির সাথে ইযাফত বা সম্বন্ধ হয়েছে। عبد (আব্দুন) অর্থ বান্দা আর الحى (আল হাইয়্যূ) আল্লাহ্ পাক-এর একটি ছীফত বা গুণবাচক নাম। যার অর্থ যিনি চিরজীবি। আব্দ এবং হাই শব্দ দুটি যখন একত্রে মিলিত হবে তখন তার অর্থ হবে “চিরজীবি (আল্লাহ্ পাক)-এর বান্দা।”
মূলতঃ সাধারণ বিষয়েই সমাধান দিতে গিয়ে যারা এত মারাত্মক ভুল করে তাদের নিকট মাসয়ালা জিজ্ঞাসা করা কুরআন-সুন্নাহ্র সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
কালামুল্লাহ্ শরীফে ইরশাদ হয়েছে,
فسئلوا اهل الذكر ان كنتم لا تعلمون.
অর্থঃ- “যদি তোমরা না জান তাহলে যারা আহ্লে যিক্র (খালিছ আল্লাহ্ পাক-এর ওলী) তাঁদেরকে জিজ্ঞাসা কর।”
হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে, سل الحكماء.
অর্থঃ- “যারা হাকীম তথা বিজ্ঞ আলিম তাঁদেরকে জিজ্ঞাসা কর।”
আর যারা আহ্লে যিক্র এবং বিজ্ঞ আলিম নয় তাদেরকে জিজ্ঞাসা করা যাবেনা। কারণ তাদেরকে জিজ্ঞাসা করলে তারা ইল্ম-আক্বল হীনতার কারণে মনগড়া, ভুল ও দলীলবিহীন ফায়সালা দিয়ে মানুষের ঈমান-আমল নষ্ট করে দিবে এবং এ কারণে সমাজে ফিৎনা-ফ্যাসাদও সৃষ্টি হতে পারে। এই জন্য কিতাবে এসেছে,
نيم حكيم خطره جان – نيم ملا خطره ايمان.
অর্থঃ- “আধা ডাক্তার জীবন নাশ করে। আর আধা মৌলভী ঈমান নষ্ট করে।”
সুতরাং ব্যক্তি হোক, পত্রিকা হোক, কিতাবাদি হোক, শরীয়তের উসূল কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াসের বিপরীত দলীল বিহীন, মনগড়া, ভুল মাসয়ালা প্রদান করলে তাকে সম্পূর্ণরূপে পরিহার করতে হবে।
একমাত্র ছহীহ্, নির্ভূল দলীল-আদিল্লাহ্ভিত্তিক ফতওয়া দানকারী ব্যক্তি, পত্রিকা ও কিতাবাদির অনুসরণ করতে হবে। কেননা, মুসলমানের যিন্দেগীর কোন আমলই দলীল ব্যতীত গ্রহণযোগ্য নয়।
এজন্য আল্লাহ্ পাক ইরশাদ করেছেন,
قل هاتوا برهانكم ان كنتم صدقين.
অর্থঃ- “হে হাবীব (ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম!) বলুন, যদি তোমরা সত্যবাদী হও তাহলে দলীল পেশ কর।”
কাজেই মাসিক পৃথিবী এবং তৎসমর্থিত মাসিক মদীনা এছাড়া অন্যান্য যে সেকল মাসিক ইসলামী পত্রিকার মুখোশ ধারণ করে মুসলমানদের আক্বীদা-আমলের দলীলবিহীন, ভুল মাসয়ালা প্রদানে অভ্যস্ত এসব পত্রিকা ইসলামী পত্রিকা নামের কলঙ্ক। এসব পত্রিকা পাঠ করা হতে সম্পূর্ণরূপে বিরত থাকতে হবে।
প্রশ্নটির ছহীহ্ জাওয়াব
“মুহম্মদ বাবুল হোসেন” নামটি ইসলামী নাম। নামটির আরবী লিখলে হয় এরূপ, محمد باب الحسين.
উচ্চারণঃ- “মুহম্মদ বাবুল হুসাইন।”
নামটির তাহ্ক্বীক বা বিশ্লেষণঃ আখিরী রসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মুবারক মুহম্মদ এবং আহ্মদ নামদ্বয়ের বরকত লাভের জন্য মুসলমান সন্তানদের নামের আগে কিংবা পরে “মুহম্মদ” (চরম প্রশংসিত) অথবা “আহমদ” (সর্বাধিক প্রশংসাকারী) নাম ব্যবহার করা হয়।
“বাবুল হুসাইন” এ বাক্যাংশে দু’টি শব্দ। একটি হচ্ছে باب (বাবুন) অর্থ- “দরজা।” অপরটি হচ্ছে الحسين (আল হুসাইনু) অর্থ- “ছোট সুন্দর।” তবে নামের ক্ষেত্রে কেবল শাব্দিক অর্থ উদ্দেশ্য নয় বরং আল হুসাইন দ্বারা এখানে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রিয় দৌহিত্র হযরত ইমাম হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উদ্দেশ্য যিনি বেহেশ্তের যুবকদের সর্দার।
সুতরাং باب الحسين (বাবুল হুসাইন) বাক্যাংশের একত্রে অর্থ হচ্ছে হুসাইনের দরজা।
উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ্য, হাদীস শরীফে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন,
انا دارالحكمة وعلى بابها.
অর্থঃ- “আমি ইল্ম বা হিক্বমতের ঘর এবং হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু সেই ঘরের দরজা।”
অন্য রেওয়াতে ইরশাদ হয়েছে,
انا مدينة العلم وعلى بابها-
অর্থঃ- “আমি ইল্মের শহর, হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তার দরজা।” অর্থাৎ হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর লক্বব বা উপাধী হলো باب العلم. বাবুল ইল্ম বা ইল্মের দরজা। অর্থাৎ যার দ্বারা ইল্মের সিলসিলা অব্যাহত থাকবে। যে কারণে আমরা দেখতে পাই যে, ইল্মে ফিক্বাহ্র পাশাপাশি ইল্মে তাছাউফের প্রায় সকল তরীক্বাই তার মাধ্যম দিয়ে চলে এসেছে। তদ্রুপ “বাবুল হুসাইন” নামের কারণে হযরত হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর যে ছীফত বা গুণাবলী রয়েছে তা তার দ্বারা জাহির হওয়া বা প্রকাশ পাওয়া সহজতর। অর্থাৎ উক্ত ছীফত তার চরিত্রের মাঝে প্রভাব বিস্তার করবে। এক কথায় কোশেশ করলে সে সহজে হযরত ইমাম হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর কায়েম মোকাম হতে পারবে।
আরো উল্লেখ্য যে, হতে পারে এ নামের উছীলায় আল্লাহ্ পাক তাকে ক্ষমা করে কবুল করে নিবেন।
উক্ত নামের বিশ্লেষণ দ্বারা এটাই ছাবিত হলো যে, উক্ত নাম খুবই সুন্দর এবং তার অর্থও খুবই সুন্দর ও তাৎপর্যমন্ডিত।
অতএব প্রত্যেক ব্যক্তির উচিৎ স্বীয় নামের হাক্বীক্বতে পৌঁছার কোশেশ করা।
{দলীলসমূহঃ (১) আহ্কামুল কুরআন জাস্সাস, (২) কুরতুবী, (৩) মাযহাবী, (৪) রুহুয় মায়ানী, (৫) রুহুল বয়ান, (৬) তিরমিযী, (৭) মিশকাত, (৮) মিরকাত, (৯) আশয়াতুল লুময়াত, (১০) লুময়াত, (১১) কামূছ আল মুহীত, (১২) ওয়াসীত, (১৩) জাদীদ, (১৪) লিসানুল আরব, (১৫) মুনজিদ আরবী, (১৬) মুনজিদ উর্দূ (১৭) মিছবাহুল লুগাত, (১৮) লুগাতে হীরা, (১৯) গিয়াছুল লুগাত, (২০) লুগাতে সাঈদী, (২১) বয়ানুল লিসান, (২২) আল কামূসুদ দরসী, (২৩) মিছবাহুল মুনীর, (২৪) নেহায়া, (২৫) আল মু’জামুল ওয়াজীয়, (২৬) মু’জামু মাক্বায়ীসুল লুগাত, (২৭) মাগরিব, (২৮) আল মু’জামুল বুলদান, (২৯) আল মুহীত ফিল লুগাত, (৩০) আল মানার ইত্যাদি।}
হাফিজ রেজাউল করিম
স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস্ লিঃ, পাবনা।
সুওয়াল ঃ চট্টগ্রামস্থ মেখল মাদ্রাসার “তাজুল ইসলাম” নামক একজন ছাত্র এ অপপ্রচার করছে যে, “রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর ছাহেব ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলী নাকি বলেন যে, হযরত জিব্রাঈল আলাইহিস্ সালাম ওহী নাযিল করতে ভুল করেছেন, ওহী নাযিল হওয়ার কথা ছিল হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর উপর, কিন্তু হযরত জিব্রাঈল আলাইহিস্ সালাম ভুল বশত, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর ওহী নাযিল করেন।”
অথচ আমাদের বিশ্বাস রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর ছাহেব ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলী কস্মিন কালেও এরূপ কথা বলতে পারেননা। কারণ তিনি একজন হক্কানী অলী আল্লাহ্ ও যামানার মুজাদ্দিদ।
এখন আমার সুওয়াল হলো- মেখল মাদ্রাসার উক্ত ছাত্রের উল্লিখিত বক্তব্য সঠিক কিনা? আর যারা উল্লিখিত আক্বীদায় বিশ্বাসী শরীয়তে তাদের ফায়সালা কি? বিস্তারিত জানিয়ে বিভ্রান্তি থেকে হিফাযত করুন।
জাওয়াবঃ মেখল মাদ্রাসার উক্ত ছাত্রের উল্লিখিত বক্তব্য শুধু অপপ্রচারই নয় বরং সম্পূর্ণই দলীলবিহীন, মনগড়া, বিভ্রান্তিকর ও ডাহা মিথ্যা। সে যদি এ ব্যাপারে সত্যবাদী হয়ে থাকে তবে তাকে বলুন এর প্রমাণ পেশ করতে। কেননা, মহান আল্লাহ্ পাক পবিত্র কালামে পাকে ইরশাদ করেন,
هاتوا برهانكم ان كنتم صدقين-
অর্থঃ- “যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাকো, তবে দলীল প্রমাণ পেশ কর।” (সূরা বাক্বারা/১১১)
কাজেই মেখল মাদ্রাসার উক্ত ছাত্র যদি নিজেকে সত্যবাদী বলে দাবি করতে চায় তবে তাকে অবশ্যই উক্ত অপপ্রচারের প্রমাণ দিতে হবে। নচেৎ সে কাজ্জাব বা মিথ্যাবাদী হিসেবেই গণ্য হবে। আর এধরণের মিথ্যাবাদীদের সম্পর্কে আল্লাহ্ পাক তাঁর কালামুল্লাহ্ শরীফে ইরশাদ করেন,
لعنت الله على اكذبين.
অর্থঃ- “মিথ্যাবাদীদের উপর আল্লাহ্ পাক-এর অভিসম্পাত।” (সূরা আলে ইমরান/৬১)
মূলতঃ উল্লিখিত বক্তব্যটি হচ্ছে ৭২টি বাতিল ফিরকার মধ্যে অন্যতম ফিরক্বা শিয়া ফিরক্বার আক্বীদা, শিয়ারাই বলে ও বিশ্বাস করে থাকে যে, “হযরত জিব্রাইল আলাইহিস্ সালাম ওহী নাযিল করতে ভুল করেছেন … ইত্যাদি।” (নাউযুবিল্লাহ্)
আমাদের আহ্লে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের ফতওয়া মোতাবিক, শিয়ারা মুসলমানের অন্তর্ভূক্ত নয়। আর তারা উল্লিখিত কুফরী আক্বীদা ছাড়াও আরো বহু কুফরী আক্বীদায় বিশ্বাসী।
মুজাদ্দিদে যামান, আওলাদুর রসূল, রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর ছাহেব ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলী তাঁর প্রায় প্রতিটি মাহ্ফিলেই শিয়াদের উল্লিখিত কুফরী আক্বীদার ব্যাপারে জনসাধারণকে সতর্ক করেছেন। সাথে সাথে বাতিলের আতঙ্ক, হক্বের অতন্দ্র প্রহরী “মাসিক আল বাইয়্যিনাত”-এর ৩৩তম সংখ্যার “সুওয়াল-জাওয়াব” বিভাগে শিয়াদের কুফরী আক্বীদা সমূহের দলীল ভিত্তিক দাঁত ভাঙ্গা জবাব দিয়ে শিয়াদের মুখোশ উম্মোচন করে দিয়েছেন।
তাই শুধু মেখল মাদ্রাসার ছাত্র নয়, বরং সকলেই একথা ভাল ভাবে জানে যে, রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর ছাহেব ক্বিবলা মুদ্দাজিল্লুহুল আলী ইসলামের প্রতিটি বিষয়ে আহ্লে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের আক্বীদায় পরিপূর্ণভাবে বিশ্বাসী। কোন বিষয়ে আহ্লে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের খেলাফ কোন আক্বীদা পোষণ করেন এরূপ একটি প্রমাণও কেউ পেশ করতে পারবেনা ইন্শা আল্লাহ্।
এরপরও যামানার মুজাদ্দিদগণের জন্য বাতিল বা নাহক্ব গোষ্ঠী কর্তৃক মিথ্যা অপপ্রচারযুক্ত বা অপবাদের সম্মুখীন হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কেননা যিনি পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ আলেমে দ্বীন, যিনি হাকীমুল হাদীস, যাঁর নিকট সমস্ত আলিমগণ সন্তান তূল্য, যিনি বিশ্ববাসীকে একটি শ্রেষ্ঠতম মাযহাব উপহার দিয়েছেন এবং যাকে সমস্ত ইমামগণ “ইমামে আ’যম” হিসেবে মেনে নিয়েছেন সেই ইমাম আবূ হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর প্রতি অপবাদ দেয়া হয়েছিল যে, “তিনি মুতাযিলাহ, তিনি শরীয়তের বিরুদ্ধে ফতওয়া দেন, তিনি হাদীস শরীফের অপব্যাখ্যা করেন।” (নাউযুবিল্লাহ)
মূলকথা হলো, মেখল মাদ্রাসার উল্লিখিত ছাত্রের উক্ত বক্তব্য সম্পূর্ণই ভুল, মনগড়া, বিভ্রান্তিকর ও মিথ্যা অপবাদ ও অপপ্রচারের শামিল। তার উচিৎ অনতিবিলম্বে এর থেকে খালিছ তওবা ইস্তিগ্ফার করা। আর উল্লিখিত আক্বীদাটি হচ্ছে বাতিল ফিরক্বা শিয়া সম্প্রদায়ের আক্বীদা। যারা এ আক্বীদায় বিশ্বাসী হবে তারা চির জাহান্নামী হবে।
আহমদুর রহমান
হরিরামপুর, মানিকগঞ্জ।
সুওয়ালঃ আমরা জানি, নামাযের দোয়া বা মুনাজাতে হাত তুলতে হয়, আযানের মুনাজাতেও হাত তুলতে হয় ইত্যাদি।
কিন্তু আমার প্রশ্ন হচ্ছে খানা-পিনা, ঘুম, ওযু-ইস্তিঞ্জা ইত্যাদি অনেক কাজের পূর্বে ও পরে যে দোয়া রয়েছে তাতে হাত তুলতে হবে কিনা?
জাওয়াবঃ আহ্লে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের দলীল হচ্ছে কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ, ইজ্মা ও ক্বিয়াস। এ ৪টি হচ্ছে শরীয়তের উছূল। এ সব উছূলের ভিত্তিতে মুসলমানদের প্রতিটি আমল করতে হবে। অন্যথায় তা গ্রহণযোগ্য হবে না। আর যে আমল যেভাবে করার জন্য শরীয়ত হুকুম দিয়েছে সে আমল সেভাবেই করতে হবে।
সুতরাং নামাযের দোয়া বা মুনাজাতে, আযানের মুনাজাতে হাত তুলতে হবে এটাই শরীয়তের মাসয়ালা তথা সুন্নতের অন্তর্ভূক্ত। আর চলা-ফেরা, খাওয়া-দাওয়া, উঠা-বসা, ওযু-গোসল, ইস্তিঞ্জা, ঘুমের পূর্বে, ঘুম থেকে উঠার পর, পোশাক-পরিচ্ছদ পরিধানের সময় ইত্যাদি অনেক স্থানেই দোয়া পাঠ করতে হয়। অর্থাৎ একজন মুসলমানকে ঘুম থেকে উঠার পর থেকে পুনরায় ঘুমানো পর্যন্ত অনেক স্থানে অনেক সময় দোয়া পাঠ করতে হয় যা আদইয়ায়ে মসনুনা নামে মশহুর। এ আদইয়ায়ে মসনুনাতে হাত তোলা শরীয়তের বিধান কিংবা সুন্নতের অন্তর্ভূক্ত নয়।
অতএব, কুরআন-সুন্নাহ্র দৃষ্টিতে যে আমল যেভাবে করার আদেশ দেয়া হয়েছে, সে আমল সেভাবেই করতে হবে। এটাই শরীয়তের ফায়সালা। শরীয়তের কোন ফায়সালার ক্ষেত্রে কোনরূপ কারণ তালাশ করা শরীয়তসম্মত নয়।
এ প্রসঙ্গে হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে,
عن معاذة العدوية انها قالت لعائشة مابال الحائض تقضى الصوم ولاتفضى الصلوة قالت عائشة كان يصيبنا ذالك فنؤمر بقضاء الصوم ولا نؤمر بقضاء الصلوة-
অর্থঃ- “মহিলা তাবেয়ী হযরত মুয়াজাহ আদভিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি একদা উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়েশা ছিদ্দীকা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহাকে জিজ্ঞাসা করলেন, অসুস্থ স্ত্রীলোক রোযা কাযা করে কিন্তু নামায কাযা করেনা তার কি কারণ? তখন উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়েশা ছিদ্দীকা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা বললেন, আমাদের কাছে এরূপই পৌঁছেছে যে, আমরা রোযা কাযা করার জন্য আদিষ্ট হয়েছি কিন্তু নামায কাযা করার জন্য আদিষ্ট হইনি। (যখন যেরূপ আদিষ্ট হয়েছি তখন সেরূপই আমল করেছি, কোন কারণ তালাশ করিনি)।” (মুসলিম, মিশকাত)
মাওলানা মুহম্মদ আফজালুল হক
নাজিমখান, কুড়িগ্রাম।
সুওয়ালঃ যারা কট্টর জাতি হিন্দু গান্ধীকে অনুসরণ করে হরতাল করে তারা কার উম্মত? আর যারা কাট্টা নাস্তিক, লক্ষ লক্ষ মুসলমানকে শহীদকারী, মাওসেতুংকে অনুসরণ করে লংমার্চ করে তারা কার উম্মত?
জাওয়াবঃ ছহীহ্ ‘তিরমিযী ও মিশকাত শরীফের’ হাদীস শরীফে বর্ণিত রয়েছে- “সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, রহমতুল্লিল আলামীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, ليس منا من تشبه بغيرنا.
অর্থঃ- “যে ব্যক্তি আমাদের ভিন্ন অন্য জাতির অনুসরণ করে সে আমাদের দলভুক্ত নয়।”
অর্থাৎ যে ব্যক্তি আক্বীদা ও আমলে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অনুসরণ ব্যতিরেকে অন্য জাতি তথা ইহুদী, নাছারা, হিন্দু, বৌদ্ধ, মজুসী, মুশরিক, নাস্তিক ইত্যাদির অনুসরণ করবে সে উম্মতে মুহম্মদী থেকে খারিজ হয়ে যাবে।
সুতরাং যারা কট্টর জাতি হিন্দু গান্ধীকে অনুসরণ করে হরতাল করে তারা প্রকৃতপক্ষে গান্ধীরই উম্মত বলে বিবেচিত হবে।
অনুরূপ যারা কাট্টা নাস্তিক মাওসেতুংকে অনুসরণ করে লংমার্চ করে তারা প্রকৃতপক্ষে মাওসেতুংয়ের উম্মত বলে বিবেচিত হবে।
এ প্রসঙ্গে হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে। হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ইরশাদ করেন,
من تشبه بقوم فهو منهم.
অর্থঃ- “যে ব্যক্তি যে ক্বওম বা সম্প্রদায়ের সাথে মিল রাখবে সে তাদেরই অন্তর্ভূক্ত হয়ে যাবে।” (আবূ দাউদ, মুসনাদে আহমদ)
কাজেই যে ব্যক্তি মু’মিন-মুসলমান হবে তার জন্য কোন অবস্থাতেই বেদ্বীন-বদ্দ্বীনদের সাথে সাদৃশ্য বা মিল হয় এমন কোন আক্বীদা পোষণ করা এবং আমল করা সম্পূর্ণরূপে হারাম ও কুফরী।
মুসলমান তথা উম্মতে মুহম্মদী-এর জন্য একমাত্র অনুসরণীয় বা আদর্শ হচ্ছেন আখিরী রসূল, হাবীবুল্লাহ, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। এ প্রসঙ্গে কালামুল্লাহ্ শরীফে ইরশাদ হয়েছে,
لقد كان لكم فى رسول الله صلى الله عليه وسلم اسوة حسنة.
অর্থঃ- “তোমাদের জন্য তোমাদের রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।” (সূরা আহ্যাব/২১)
অর্থাৎ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামই একমাত্র অনুসরণীয় ও অনুকরণীয় মুসলমানদের জন্য। কাজেই যারা হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অনুসরণ না করে কট্টর জাতি হিন্দু গান্ধীকে অনুসরণ করে ও কাট্টা নাস্তিক মাওসেতুংকে অনুরসণ করে উপরোক্ত আয়াত শরীফ ও হাদীস শরীফ-এর দৃষ্টিতে তারা হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উম্মত না হয়ে পর্যায়ক্রমে কট্টর জাতি হিন্দু গান্ধী এবং কাট্টা নাস্তিক মাওসেতুংয়ের উম্মত বলেই বিবেচিত হবে।
অতএব, প্রত্যেক মুসলমানের উচিত কুফরী আক্বীদা ও আমল থেকে বেঁচে থাকা।
{বিঃ দ্রঃ- বিস্তারিত জানতে হলে মাসিক আল বাইয়্যিনাত- ৯, ১৬ ও ৯১তম সংখ্যা পাঠ করুন।}
{দলীলসমূহঃ (১) আল্ ফিকহুল আক্বার, (২) শরহে আক্বাঈদে নছফি, (৩) আক্বাঈদে হাক্কা, (৪) তাক্মিলুল ঈমান, (৫) তাফসীরে মাযহারী, (৬) রুহুল বয়ান, (৭) রুহুল মায়ানী, (৮) খাযেন, (৯) বাগবী, (১০) ইবনে কাছীর, (১১) তাবারী, (১২) বুখারী, (১৩) আবূ দাউদ, মিশকাত, (১৪) মিরকাত, (১৫) আশয়াতুল লুমুয়াত, (১৬) লুমুয়াত, (১৭) ত্বীবী, (২৩) তালীক্ব, (১৮) মোযাহেরে হক্ব, (১৯) ফতহুল বারী, (২০) উমদাতুল কারী, (২১) বযলুল মাযহুদ (২২) ইরশাদুস্ সারি, (২৩) মসনদেআহমদ, (২৪) বায়হাক্বী, (২৫) আউনুল মা’বুদ (২৬) যথাশব্দ- হাবীবুর রহমান, (২৭) বাংলা অভিধান, (২৮) Encyclopedia Britanica, (২৯) Encyclopeadia Americana. (৩০) world book, (৩১) Lexicon Encyclopedia, (৩২) Macmillan Encyclopedia, (৩৩) New book of knowledge, (৩৪) Grollir Encyclopedia, (৩৫) Funk and Wagnalls Encyclopedia, (৩৬) Wordsworth Encyclopedia, ইত্যাদি।}
মুহম্মদ খোরশেদ আলম
জহুরুল হক হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
সুওয়ালঃ আমাদের প্রিয় নূরনবী মুহম্মদুর রসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বিশ্ব নেতা, মহামানব, আল্লাহ্ পাক-এর দাস ইত্যাদি শব্দ দ্বারা সম্বোধন করা যায় কিনা? কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফের আলোকে জানালে খুশি হব।
জাওয়াবঃ ‘বিশ্বনেতা, মহামানব, আল্লাহ্ পাক-এর দাস’ এ ধরণের কোন শব্দ দ্বারা আল্লাহ্ পাক-এর হাবীব হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্বোধন করা জায়েয নেই। এ সকল শব্দ দিয়ে তাঁকে সম্বোধন করা তাঁর শান ও মর্যাদার খেলাফ। কেননা “বিশ্বনেতা” বলতে সাধারণত বিশ্বের মধ্যে যে সব চেয়ে বড় নেতা বা সমকালীন কোন বড় নেতাকে বুঝানো হয়। সে মুসলমানও হতে পারে আবার ইহুদী, নাছারা, হিন্দু, বৌদ্ধ, মজুসী, মুশরিক, নাস্তিকও হতে পারে।
অনুরূপ “মহামানব” শব্দটিও মুসলমান, অমুসলমান সবার ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এক বা একাধিক বিষয়ে কোন ব্যক্তি বিশেষ যোগ্যতা অর্জন করলে তাকেই “মহামানব” বলে অভিহিত করা হয়।
সাধারনভাবে “আল্লাহ্র দাস” এ শব্দের মাঝে “দাস” কথাটি তুচ্ছার্থে ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
উল্লেখ, কাফিররাও আল্লাহ্ পাক-এর দাস। সুতরাং এ কথাটি কোনভাবেই হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শানে ব্যবহার করা যাবেনা। তবে কুরআন শরীফে যে ‘আবদ’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে তার অর্থ হলো, যিনি আল্লাহ্ পাক-এর প্রতি হাক্বীক্বীভাবে পরিপূর্ণ অনুগত। যা একমাত্র আল্লাহ্ পাক-এর রসূল সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পক্ষেই সম্ভব। তিনি খালিছভাবে আবদ। আবদ শব্দটি সাধারন দাস অর্থে তা ব্যবহৃত হবেনা। মানুষ অতীতে আবদিয়াতের মর্যাদা হাছিল করার কোশেশ করেছে বর্তমানেও করছে এবং ভবিষ্যতেও করবে ইনশাআল্লাহ্।
সুতরাং উল্লিখিত শব্দগুলো দিয়ে আল্লাহ্ পাক-এর হাবীব হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্বোধন করা কুরআন ও সুন্নাহ্র সম্পূর্ণ পরিপন্থী। কালামুল্লাহ্ শরীফে ইরশাদ হয়েছে,
لا تجعلوا دعاء الرسول بينكم كدعاء بعضكم بعضا.
অর্থঃ- “তোমরা পরস্পর পরস্পরকে যেভাবে সম্বোধন করে থাকো সেভাবে আল্লাহ্ পাক-এর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্বোধন করনা।” (সূরা নূর/ ৬৩)
তার কারণ এই যে, আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর রিসালতের প্রতি স্বীকৃতি না দেয়া পর্যন্ত কোন নবী ও রসূল আলাইহিস্ সালামকে নুবুওওয়াত বা রিসালত পর্যন্ত দেয়া হয়নি। তাই হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হলেন, আল্লাহ্ পাক-এর খাছ বান্দা এবং খাছ রসূলের অন্তর্ভূক্ত।
আরো উল্লেখ্য, অন্যান্য নবী-রসূল আলাইহিমুস্ সালাম-এর বিশেষ মর্যাদা ও ফযীলতের কারণে তাঁদের নাম মুবারক উচ্চারণের সাথে সাথে “আলাইহিস্ সালাম” কালামটিও উচ্চারণ করা শরীয়তের নির্দেশ। কিন্তু আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নাম মুবারক উচ্চারণের ক্ষেত্রে তার সম্পূর্ণ বিপরীত। তাঁর নাম মুবারক উচ্চারণের পর উক্ত কালামটি উচ্চারণ করলে যথার্থ ও ছহীহ্ হবেনা বরং আদবের খেলাফ হবে। কারণ উক্ত কালামে শুধু সালাম পাঠ করা হয়। বরং হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নাম মুবারক উচ্চারণের সাথে সাথে “ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম” যা ছলাত ও সালাম-এর সমষ্টি, উচ্চারণ করতে হবে। এ প্রসঙ্গে কালামুল্লাহ শরীফে ইরশাদ হয়েছে,
ان الله وملئكته يصلون على النبى يايها الذين امنوا صلوا عليه وسلموا تسليما.
অর্থঃ- “নিশ্চয়ই আল্লাহ্ পাক এবং তাঁর ফিরিশ্তাগণ নবী পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি ছলাত (দরূদ) পাঠ করেন। হে ঈমানদারগণ তোমরা তাঁর প্রতি পাঠ কর ছলাত এবং সালাম।” (সূরা আহ্যাব/৫৬)
হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ্ পাক-এর খাছ রসূল, এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক তারঁ কালাম পাকে ইরশাদ করেন,
وما محمد الا رسول.
অর্থঃ- “মুহম্মদ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রসূল ব্যতীত অন্য কিছু নন।” (সূরা আলে ইমরান/১৪৪)
তিনি আল্লাহ্ পাক-এর খাছ বান্দা, এ সম্পর্কে আল্লাহ্ পাক তাঁর কালাম পাকে ইরশাদ করেন,
سبحن الذى اسرى بعبده ليلا من المسجد الحرام الى المسجد الاقصا.
অর্থঃ- “সেই আল্লাহ্ পাক-এর পবিত্রতা যিনি তাঁর খাছ বান্দা অর্থাৎ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মি’রাজ রাত্রিতে স্বল্প সময়ে কা’বা শরীফ থেকে বাইতুল মুকাদ্দাস শরীফে ভ্রমন করিয়েছেন।” (সূরা বণী ইসরাঈল/১)
হাদীস শরীফে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন,
انا حبيب الله – انا سيد المرسلين – انا خاتم النبين.
অর্থঃ- “আমি হচ্ছি “হাবীবুল্লাহ্” অর্থাৎ আল্লাহ্ পাক-এর হাবীব, “সাইয়্যিদুল মুরসালীন” অর্থাৎ রসূলগণের সাইয়্যিদ, “খতামুন্নাবিয়্যীন” অর্থাৎ সর্বশেষ নবী।” (মিশকাত শরীফ)
মূলতঃ সকল নবী-রসূল, সকল উম্মত, সকল জ্বীন-ইনসান হতে তাঁর মাক্বাম, শান-শওকত, বুযুর্গী ও ফযীলত সম্পূর্ণ ভিন্ন। এজন্য “মুসলিম শরীফের” ছহীহ্ হাদীস শরীফে তিনি ইরশাদ করেছেন,
لست كاحدكم.
অর্থঃ-“আমি তোমাদের কারো মত নই।”
অতএব, উম্মতগণ পরস্পর পরস্পরকে যেভাবে ডেকে থাকে সেভাবে ডাকা এবং যে সকল শব্দ দ্বারা সম্বোধন করলে নবী-রসূল আলাইহিস্ সালামগণের শানের খেলাফ হয় সে সকল শব্দ দিয়ে তাঁদেরকে সম্বোধন করা সম্পূর্ণ রূপে হারাম ও নাজায়েয।
{দলীলসমূহঃ কুরতুবী, আহকামুল কুরআন, রুহুল মায়ানী, রুহুল বয়ান, মাযহারী, ইবনে কাছীর, খাযেন, বাগবী, তাবারী, কবীর, বুখারী শরীফ, মুসলিম শরীফ, মিশকাত শরীফ, ফতহুল বারী, ওমদাতুল ক্বারী, মিরকাত, আশয়াতুল লুময়াত, লুময়াত, তালীকুছ ছবী, ত্বীবী ইত্যাদি।}