হাররার ঘটনা এবং ইয়াযীদ লা’নাতুল্লাহি আলাইহির কুফরী কাজের ফিরিস্তি

সংখ্যা: ২৯৩তম সংখ্যা | বিভাগ:

হাররার ঘটনা কি?

হযরত আব্দুল হক্ব মুহাদ্দিছ দেহলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, “কারবালায় সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুছ ছালিছ মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে শহীদ করার পরে মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র মদীনা শরীফ-এ ইয়াযীদ লা’নাতুল্লাহি আলাইহির নির্দেশে যে লোমহর্ষক ও মর্মান্তিক ঘটনা সংঘটিত হয় এটাই ‘হাররার ঘটনা’ নামে অভিহিত। এই স্থানটি মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র মদীনা শরীফ থেকে এক মাইল দূরে অবস্থিত। এই ঘটনা সংঘটিত হয়- ৬৩ হিজরী শরীফ উনার ২৭ বা ২৮ যিলহজ্জ শরীফ ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার)।” (জযবুল কুলূব)

কারণ ও প্রেক্ষাপট:

১. ইয়াযীদ লা’নাতুল্লাহি আলাইহি কতৃর্ক সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুছ ছালিছ মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে শহীদ করার স্বীকৃতি এবং সম্মানিত ওহী মুবারক অস্বীকার: সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুছ ছালিছ মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে উনার পরিবারের সমস্ত পুরুষগণকে একজন ব্যতিত কারবালার প্রান্তরে শহীদ করার পর ইয়াযীদ লা’নাতুল্লাহি আলাইহি প্রকাশ্যে অনেক কুফরী করে। সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুছ ছালিছ মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র সির বা মাথা মুবারক নিয়ে যখন ইয়াযীদ লা’নাতুল্লাহি আলাইহির সামনে রাখা হয়, তখন সে তার হাতের লাঠি দিয়ে মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র সির মুবারক উনার মধ্যে আঘাত করে বলে-

لَيْتَ اَشْيَاخِىْ بِبَدْرٍ شَهِدُوْا … وَقْـعَةَ الْـخَزْرَجِ مِنْ وَقْعِ الْاَسَلْ

قَدْ قَـتَـلْـنَا القَرْنَ مِنْ سَادَاتِـهِمْ … وَعَدَلْـنَاهُ بِبَدْرٍ فَاعْتَدَلْ

“বদর প্রান্তরে নিহত আমার পূর্বপুরুষরা যদি দেখতে পেত, মস্তক্বসমূহ দেহচ্যুত হচ্ছে দেখে খাযরাজ গোত্র শোক ও বিলাপ করছে। আমরা তাদের পূর্বপুরুষদের বংশধর থেকে প্রধান (সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুছ ছালিছ মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উনাকে শহীদ করেছি। আমরা বদর যুদ্ধের প্রতিশোধ গ্রহণ করেছি, তাই এ প্রতিশোধ গ্রহণ হয়েছে ন্যায়সংগত!” না‘ঊযুবিল্লাহ! (তাযকিরাতুল খাওয়াছ ৫৩৯ নং পৃষ্ঠা)

ইয়াযীদ লা’নাতুল্লাহি আলাইহি উক্ত পংক্তিগুলোতে আরো বৃদ্ধি করে বলে-

لَعِبَتْ هَاشِمٌ بِالْمُلْكِ فَلَا … خَبْـرٌ جَاءَ وَلَا وَحْىٌ نَـزَلْ وَلَسْتُ مِنْ خَنْدَفٍ اِنْ لَّـمْ اَنْـتَقِمْ….. مِنْۢ بَـنِـىْ اَحْـمَدَ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَا كَانَ فَـعَلْ

অর্থ: “বনী হাশিম রাজত্ব নিয়ে খেল-তামাশা করেছে, না (অদৃশ্য জগত থেকে) এসেছে কোনো বার্তা, না অবতীর্ণ হয়েছেন কোনো ওহী মুবারক। না‘ঊযুবিল্লাহ! না‘ঊযুবিল্লাহ! না‘ঊযুবিল্লাহ! নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার কৃতকর্মের জন্য উনার বংশধর উনাদের থেকে যদি আমি প্রতিশোধ না নেই, তাহলে তো আমি খান্দাফের বংশধর নই।” না‘ঊযুবিল্লাহ! (তাযকিরাতুল খাওয়াছ ৫৩৯ পৃষ্ঠা, তারীখে ত্ববারী)

নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার প্রতি যে মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র ওহী মুবারক নাযিল হতেন এখানে ইয়াযীদ লা’নাতুল্লাহি আলাইহি তা সুস্পষ্টভাবে অস্বীকার করেছে এবং সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুছ ছালিছ মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে এবং মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র হযরত আহলু বাইত শরীফ আলাইহিমুস সালাম উনাদেরকে যে সে শহীদ করেছিলো, সেটাও স্বীকার করেছে। না‘ঊযুবিল্লাহ! তাহলে এর চেয়ে বড় কুফরী আর কি হতে পারে?

২. স্বয়ং মহান আল্লাহ পাক উনাকে অস্বীকার এবং উনার বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করা: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর রদ্বিয়াল্লাহু তা‘য়ালা আনহু উনাকে উদ্দেশ্য করে ইয়াযীদ লা’নাতুল্লাহি আলাইহি লিখে-

اُدْعُوْ اِلٰـهَكَ فِـى السَّمَاءِ فَاَنَّنِـىْ .. اَدْعُوْ عَلَيْكَ رِجَالَ عَكَّ وَاَشْعَرْ

كَـيْفَ النَّجَاةُ اَبَا خُبَـيْبٍ مِنْـهُمْ .. فَاحْتَلْ لِنَـفْسِكَ قَـبْلَ اَتَى الْعَسْكَـرْ

অর্থ: “আপনি আপনার ইলাহ্ উনাকে ডাকুন যিনি আসমানে আছেন। আর আমি আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য আক ও আশআর গোত্রের যোদ্ধাদের ডাকি। আবূ খুবাইব (হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর রদ্বিয়াল্লাহু তা‘য়ালা আনহু) তিনি কিভাবে তাদের থেকে মুক্তি পাবেন? কাজেই সৈন্য আসার পূর্বে আপনি নিজের উপর দখলদারিত্ব করুন।” না‘ঊযুবিল্লাহ! (মরূজুয যাহাব ৩৭৮ নং পৃষ্ঠা)

৩. সম্মানিত দ্বীন ইসলাম উনাকে অস্বীকার, মদকে হালাল ঘোষণা এবং মদের প্রশংসা করা: ইয়াযীদ লা’নাতুল্লাহি আলাইহি মদকে হালাল ঘোষণা করে এবং মদের প্রশংসায় সে বলে- “পাত্রের মধ্যে মদভাণ্ডার রূপার ন্যায়। আর মদের সাথে প্রিয় সাকী (মদ পরিবেশনকারী তরুণী) তারকারাজির ন্যায়। মদ হচ্ছে দয়ার সূর্য আর তার কক্ষপথ হচ্ছে পাত্রের তলানী। তার উদয়স্থল হচ্ছে সাকী (মদ পরিবেশনকারী তরুণী) এবং তার অস্তস্থল হচ্ছে আমার মুখ।

فَاِنْ حَرُمَتْ يَـوْمًا عَلـٰى دِيْنِ اَحْـمَدَ (صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ) … فَخُذْهَا عَلـٰى دِيْنِ الْمَسِيْحِ بْنِ مَرْيَـمَ

‘যদি কোনো দিন নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সম্মানিত দ্বীন উনার মধ্যে মদ হারাম হয়ে থাকে, তাহলে হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম আলাইহিস সালাম উনার দ্বীনের উপর ভিত্তি করে তুমি তা গ্রহণ করো’।” না‘ঊযুবিল্লাহ! (তাফসীরে মাযহারী  ৫/২৭১)

৪. হালালকে হারাম ও হারামকে হালাল ঘোষণা করা এবং প্রকাশ্যে বিভিন্ন অনৈতিক কার্যকলাপে জড়িয়ে যাওয়া: ইয়াযীদ লা’নাতুল্লাহি আলাইহি হালালকে হারাম ও হারামকে হালাল ঘোষণা করে এবং প্রকাশ্যে বিভিন্ন অনৈতিক কার্যকলাপে জড়িয়ে যায়। যেমন- সে আপন মা, বোন ও মেয়েকে বিবাহ করা বৈধ ঘোষণা করে, মদকে হালাল করে, প্রকাশ্যে মদ পান করে, নামায ত্যাগ করে, নাচ-গান করে, গায়িকা, নর্তকী ও বিনতুল হাওয়াদের (চরিত্র নষ্টকারী মহিলাদের) সঙ্গ দেয়, কুকুর ও বানর নিয়ে খেলতামাশায় মগ্ন থাকে, যিনা-ব্যভিচারে লিপ্ত হয়ে যায়। না‘ঊযুবিল্লাহ! (তারীখুল খুলাফা, ইবনে সা’দ, ত্ববারী, ইবনে জাওযী, মুরূজুয যাহাব, আনসাবুল আশরাফ, তাযকিরাতুল খাওয়াছ ইত্যাদি)

৫. ইয়াযীদ লা’নাতুল্লাহি আলাইহির কুফরী কাজের প্রতিবাদ এবং তার বায়াত ভঙ্গ: পবিত্র মদীনা শরীফবাসী হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তা‘য়ালা আনহুম উনারা এবং হযরত তাবিয়ী রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনারা ইয়াযীদ লা’নাতুল্লাহি আলাইহির এই সকল কুফরী ও হারাম-নাজায়িয কাজের প্রতিবাদ করেন এবং তার বায়াত ভঙ্গ করেন। আল্লামা হযরত ইমাম ইবনে জাওযী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, “৬২ হিজরীতে ইয়াযীদ লা’নাতুল্লাহি আলাইহি তার চাচাতো ভাই উছমানকে পবিত্র মদীনা শরীফ উনার শাসক পদে নিয়োগ করে। উছমান ইয়াযীদ লা’নাতুল্লাহি আলাইহির নিকট পবিত্র মদীনা শরীফ থেকে একটি প্রতিনিধি দল প্রেরণ করে। কিন্তু প্রতিনিধি দল ফিরে এসে ইয়াযীদ লা’নাতুল্লাহি আলাইহির সকল অপকর্ম প্রকাশ করে দেন। উনারা বলেন-

قَدِمْنَا مِنْ عِنْدِ رَجُلٍ لَيْسَ لَهٗ دِيْنٌ يَشْرَبُ الْـخَمْرَ ويَـعْزِفُ بِالطَّــنَابِـيْـرِ وَيَـلْعَبُ بِالْكِلَابِ وَاِنَّا نُشْهِدُكُمْ اَنَّا قَدْ خَلَعْنَاهُ وَقَالَ حَضْرَتْ اَلْمُنْذِرُ رَحْـمَةُ اللهِ عَلَيْهِ اَمَا وَاللهِ لَقَدْ اَجَازَنِـىْ مِائَةَ اَلْفِ دِرْهَمٍ وَلَا يَـمْنَـعُنِـىْ مَا صَنَعَ اَنْ اَصْدُقَكُمْ عَنْهُ وَاللهِ اِنَّهٗ يَشْرَبُ الْـخَمْرَ وَاِنَّهٗ لَـيَسْكَـرُ حَتّٰـى يَدَعَ الصَّلَاةَ

‘আমরা এমন এক লোকের সাথে সাক্ষাৎ করে এসেছি যার কোনো দ্বীন নেই। সে মদ পান করে, গান-বাজনা করে ও কুকুরের সাথে খেল-তামাশা করে। নিশ্চয়ই আমরা আপনাদেরকে সাক্ষ্য রেখে তার বায়াত ভঙ্গ করছি।’ আর হযরত মুনযির ইবনে যুবাইর রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, ‘সাবধান! মহান আল্লাহ পাক উনার ক্বসম! ইয়াযীদ লা’নাতুল্লাহি আলাইহি আমাকে ১ লক্ষ দিরহাম উপহার হিসেবে দিয়েছিল। কিন্তু তার এই উপহার তার সম্পর্কে আপনাদের নিকট সত্য প্রকাশ করা থেকে আমাকে বিরত রাখতে পারবে না। মহান আল্লাহ পাক উনার ক্বসম! নিশ্চয়ই সে মদ খায় এবং মদ খেয়ে মাতাল হয়ে নামায ছেড়ে দেয়’।” না‘ঊযুবিল্লাহ! (ওয়াফাউল ওয়াফা ১/১০৩)

১০ম হিজরী শতকের মুজাদ্দিদ হযরত ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূত্বী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, “পবিত্র মদীনা শরীফবাসী উনারা যেই কারণে ইয়াযীদ লা’নাতুল্লাহি আলাইহির বায়াত ভঙ্গ করেছিলেন, তা হলো- সে অত্যধিক পাপাচারে লিপ্ত ছিল। হযরত ইমাম ওয়াকিদী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বিভিন্ন সূত্রে বিশিষ্ট ছাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে হানযালা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘য়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন,

وَاللهِ مَا خَرَجْنَا عَلـٰى يَزِيْدَ (لَعْنَةُ اللهِ عَلَيْهِ) حَتّٰـى خِفْنَا اَنْ نُّـرْمِىَ بِالْـحِجَارَةِ مِنَ السَّمَاءِ اِنَّهٗ رَجُلٌ يَـنْكِحُ اُمَّهَاتِ الْاَوْلَادِ وَالْـبَـنَاتِ وَالْاَخَوَاتِ وَيَشْرَبُ الْـخَمْرَ وَيَدَعُ الصَّلَاةَ

‘মহান আল্লাহ পাক উনার ক্বসম! আমরা ইয়াযীদ লা’নাতুল্লাহি আলাইহির বিরুদ্ধে তখন রুখে দাঁড়িয়েছি যখন আমরা নিশ্চিত হয়েছি যে, তার অপকর্মের প্রতিবাদ না করলে আমাদের প্রতি আসমান থেকে পাথর নিক্ষেপ করা হবে। কেননা ইয়াযীদ লা’নাতুল্লাহি আলাইহি (হচ্ছে এমন নিকৃষ্ট লোক যে,) আপন মা, বোন ও মেয়েদেরকে বিয়ে করা বৈধ করেছে। আর সে প্রকাশ্যে মদ পান করে এবং নামায তরক করে’।” না‘ঊযুবিল্লাহ! (তারীখুল খুলাফা)

পবিত্র মদীনা শরীফবাসী উনাদেরকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার শপথ এবং উনাদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার সৈন্য প্রেরণ:

আল্লামা ইয়া’কূবী রহমতুল্লাহি আলাইহি (বিছাল শরীফ ২৯২ হিজরী শরীফ উনার পর) তিনি ‘তারীখে ইয়া’কূবীতে’ বলেন, যখন ইয়াযীদ লা’নাতুল্লাহি আলাইহির নিকট পবিত্র মদীনা শরীফবাসী উনাদের বায়াত ভঙ্গের সংবাদ পৌঁছলো, তখন সে মুসরিফ ইবনে উক্ববা লা’নাতুল্লাহি আলাইহির নিকট লোক প্রেরণ করে তাকে ফিলিস্তীন থেকে তার নিকট নিয়ে আসে। তখন ইবনে উক্ববা লা’নাতুল্লাহি আলাইহি অসুস্থ ছিলো। ইয়াযীদ লা’নাতুল্লাহি আলাইহি ইবনে উক্ববা লা’নাতুল্লাহি আলাইহিকে তার কামরায় প্রবেশ করায়। তারপর তার কাছে ঘটনা খুলে বলে। তখন সে বলে-

يَا اَمِيْـرَ الْمُؤْمِنِـيْـنَ وَجِّهْنِـىْ اِلَـيْهِمْ فَـوَاللهِ لَاَدَعُّنَّ اَسْفَلَهَا اَعْلَاهَا يَـعْنِـىْ مَدِيْـنَةَ الرَّسُوْلِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَـوَجَّهَهٗ

“হে আমীরুল মু’মিনীন! আমাকে পবিত্র মদীনা শরীফবাসী উনাদের নিকট প্রেরণ করুন। মহান আল্লাহ পাক উনার ক্বসম! অবশ্যই অবশ্যই আমি পবিত্র মদীনাতুর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে অর্থাৎ পবিত্র মদীনা শরীফবাসী উনাদেরকে বিনাশ করে দিবো। না‘ঊযুবিল্লাহ! তখন ইয়াযীদ লা’নাতুল্লাহি আলাইহি ইবনে উক্ববা লা’নাতুল্লাহি আলাইহিকে (বিশাল সৈন্যবাহিনীসহ) পবিত্র মদীনা শরীফ প্রেরণ করে।” না‘ঊযুবিল্লাহ! (তারীখে ইয়া’কূবী ২০৯ নং পৃষ্ঠা)

ইয়াযীদ লা’নাতুল্লাহি আলাইহি পবিত্র মদীনা শরীফবাসী উনাদের ব্যাপারে বলে-

لَيْسَ لَـهُمْ اِلَّا هٰذَا الْغَشْمَةُ وَاللهِ لَاَقْـتُـلَـنَّـهُمْ

অর্থ: “উনাদের জন্য শুধু ঐ যালিমটিরই (ইবনে উক্ববা লা’নাতুল্লাহি আলাইহিরই) প্রয়োজন। না‘ঊযুবিল্লাহ! মহান আল্লাহ পাক উনার ক্বসম! আমি অবশ্যই অবশ্যই উনাদেরকে শহীদ করবো।” না‘ঊযুবিল্লাহ! (বিদায়াহ্-নিহায়াহ্ ৮/২৩৯)

ইয়াযীদ লা’নাতুল্লাহি আলাইহি ইবনে উক্ববা লা’নাতুল্লাহি আলাইহিকে বলে, ‘যদি পবিত্র মদীনা শরীফ উনার মধ্যে প্রবেশে বাধাপ্রাপ্ত হও এবং বায়াত গ্রহণে পবিত্র মদীনা শরীফবাসী উনারা রাজি না হন, তাহলে তুমি ছোট-বড় নির্বিশেষে সকলকে শহীদ করবে। ৩ দিন পর্যন্ত এই কাজ চালিয়ে যাবে। কাউকে বাদ দেবে না। আর উনাদের ধন-সম্পদ লুটপাট করে নিবে।’ না‘ঊযুবিল্লাহ! (জযবুল কুলূব) অন্য বর্ণনায় রয়েছে, ‘যদি তুমি উনাদের উপর বিজয় লাভ করো, তাহলে পবিত্র মদীনা শরীফ উনাকে ৩ দিন হালাল ঘোষণা করবে।’ না‘ঊযুবিল্লাহ! (বিদায়াহ্-নিহায়াহ্ ৮/২৩৯)

আল্লামা যারক্বানী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন,

فَـبَـعَثَ اِلَـيْهِمْ عَسْكَـرًا عِدَّتُهٗ سَبْـعَةٌ وَّعِشْرُوْنَ اَلْفَ فَارِسٍ وَخَـمْسَةُ عَشَرَ اَلْفَ رَاجِلٍ

অর্থ: “তারপর ইয়াযীদ লা’নাতুল্লাহি আলাইহি পবিত্র মদীনা শরীফবাসী উনাদের বিরুদ্ধে ২৭ হাজার অশ্বারোহী এবং ১৫ হাজার পদাতিক বাহিনী (মোট ৪২ হাজার সৈন্য) প্রেরণ করে।” না‘ঊযুবিল্লাহ! (শারহুয যারক্বানী ১০/১৪২)

আর ইয়াযীদ লা’নাতুল্লাহি আলাইহি প্রত্যেক সৈন্যকে ১০০ দীনার করে উপহার প্রদান করে। না‘ঊযুবিল্লাহ! (বিদায়াহ্-নিহায়াহ্ ৮/২৩৯)

ইয়াযীদ বাহিনীর তাণ্ডবলীলা:

১. খুন-হত্যা: ইয়াযীদ লা’নাতুল্লাহি আলাইহির নির্দেশে ইবনে উক্ববা লা’নাতুল্লাহি আলাইহি ৪২ হাজার সৈন্য নিয়ে পবিত্র মদীনা শরীফ আক্রমন করে এবং পবিত্র মদীনা শরীফ উনাকে ৩ দিনের জন্য হালাল ঘোষণা করে। না‘ঊযুবিল্লাহ! এ সময় ইয়াযীদ বাহিনী শিশু এবং মহিলা ব্যতীত সর্বমোট ১২,৪৯৭ জন পবিত্র মদীনা শরীফবাসী উনাদেরকে শহীদ করে। না‘ঊযুবিল্লাহ! উনাদের মধ্যে হযরত মুহাজির ও আনছার ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তা‘য়ালা আনহুম, হযরত তাবেয়ীন রহমতুল্লাহি আলাইহিম ও আলিম-উলামা মিলে ছিলেন ১৭০০ জন, সাধারণ লোক ছিলেন ১০০০০ জন, হাফিযে কুরআন ছিলেন ৭০০ জন এবং কুরাইশ ছিলেন ৯৭ জন। (জযবুল কুলূব) কেউ কেউ এর চেয়ে বেশিও বলেছেন। হযরত ইমাম মালিক রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন,

قُتِلَ يَوْمَ الْحَرَّةِ سَبْعُمِائَةِ رَجُلٍ مِّنْ حَمَلَةِ الْقُراٰنِ مِنْهُمْ ثَلَاثِمِائَةٍ مِّنَ الصَّحَابَةِ رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُمْ

অর্থ: “হাররার দিন ৭০০ হাফিযে কুরআন উনাদেরকে শহীদ করা হয়। উনাদের মধ্যে ৩০০ জন ছিলেন হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তা‘য়ালা আনহুম উনাদের অন্তর্ভূক্ত।” না‘ঊযুবিল্লাহ! (শরহুয যারক্বানী ১০/১৪১)

হযরত ইবনে হাজার আসক্বালানী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন,

قُـلْتُ يَـوْمَ الْـحَرَّةِ قُتِلَ فِيْهِ مِنَ الْاَنْصَارِ مَنْ لَّا يُـحْصٰى عَدَدُهٗ وَنُـهِبَتِ الْمَدِيْـنَةُ الشَّرِيْـفَةُ وَبُذِلَ فِـيْـهَا السَّيْفُ ثَلَاثَةَ اَيَّامٍ

অর্থ: “আমি বলি- হাররার দিন হযরত আনছার ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তা‘য়ালা আনহুম উনাদের মধ্য থেকে অসংখ্য হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তা‘য়ালা আনহুম উনাদেরকে শহীদ করা হয়েছে, পবিত্র মদীনা শরীফ উনার মধ্যে ব্যাপক লুটপাট করা হয়েছে এবং সেখানে ৩ দিন তরবারী চালানো হয়েছে।” না‘ঊযুবিল্লাহ! (ফাতহুল বারী লি ইবনে হাজার ৩/১৭৭)

এছাড়াও ইয়াযীদ বাহিনী সমস্ত প্রকার অত্যাচার, অনাচার ও ধৃষ্টতাপূর্ণ অপকর্মে লিপ্ত হয় এবং ব্যভিচারের মতো ঘৃণ্য অপরাধ করতেও তারা বিরত থাকেনি। না‘ঊযুবিল্লাহ!

২. ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়া ও পবিত্র কুরআন শরীফ উনার অবমাননা করা: হযরত আব্দুল মালিক ইবনে হুসাইন ইবনে আব্দুল মালিক শাফিয়ী আছিমী মাক্কী রহমতুল্লাহি আলাইহি (বিছাল শরীফ ১১১১ হিজরী শরীফ) তিনি বলেন,

وَافْـتَضَّ فِـيْـهَا اَلْفُ عَذْرَاءَ وَاِنَّ مُفْتَضَّهَا فَـعَلَ ذٰلِك اَمَامَ الْوَجْهِ الشَّرِيْفِ وَالْـتَمَسَ مَا يَـمْسَحُ بِهِ الدَّمَ فَـلَمْ يَـجِدْ فَـفَتَحَ مُصْحَفًا قَرِيْـبًا مِّنْهُ ثُـمَّ اَخَذَ مِنْ اَوْرَاقِهٖ وَرَقَةً فَـتَمَسَّحَ بِـهَا نَـعُوْذُ بِاللهِ مَا هٰذَا اِلَّا صَرِيْحَ الْكُفْرِ وَانْـتَـنَهٗ

অর্থ: “তখন সেখানে ১ হাজার কুমারী মেয়ে উনাদের কুমারীত্ব নষ্ট করা হয়। না‘ঊযুবিল্লাহ! নিশ্চয়ই কুমারিত্ব নষ্টকারীরা পবিত্র মসজিদে নববী শরীফ উনার সামনে ঐ জঘন্য কাজ করে। রক্ত মুছার জন্য কিছু খঁুজে না পেয়ে পবিত্র কুরআন শরীফ খুলে পবিত্র কুরআন শরীফ উনার পাতা দিয়ে রক্ত মুছেছে। না‘ঊযুবিল্লাহ! নিঃসন্দেহে এটা সুস্পষ্ট কুফরী। আর পবিত্র মসজিদে নববী শরীফ উনাকে নষ্ট ও দূর্গন্ধময় করেছে।” না‘ঊযুবিল্লাহ! (সিমতুন নুজূম ৩/২০৪)

ইয়াযীদ বাহিনীর ব্যভিচারের কারণে এক হাজার অবৈধ সন্তান জন্ম গ্রহণ করে। না‘ঊযুবিল্লাহ! অন্য বর্ণনায় রয়েছে, ১০ হাজার অবৈধ সন্তান জন্ম গ্রহণ করে। না‘ঊযুবিল্লাহ! (তাযকিরাতুল খাওয়াছ)

৩. পবিত্র মসজিদে নববী শরীফ ও পবিত্র রওযা শরীফ উনাদের অবমাননা: ইয়াযীদ বাহিনী পবিত্র মসজিদে নববী শরীফ উনার অমার্জনীয় অবমাননা করে। এই স্থান মুবারক উনাকে তারা ঘোড়ার আস্তাবলে পরিণত করে। না‘ঊযুবিল্লাহ! নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র রওযা শরীফ এবং পবিত্র মিম্বর শরীফ উনাদের মধ্যবর্তী স্থান মুবারক ঘোড়ার মলমূত্র দ্বারা কলুষিত করে। না‘ঊযুবিল্লাহ! (জযবুল কুলূব)

আল্লামা হযরত সামহূদী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনিসহ আরো অনেকে লিখেন,

وَجَالَتِ الْـخُيُـوْلُ فِـىْ مَسْجِدِ رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَبَالَتْ وَرَاثَتْ بَـيْـنَ الْقَـبْـرِ وَالْمِنْۢـبَـرِ

অর্থ: “পবিত্র মসজিদে নববী শরীফ উনার মধ্যে ঘোড়াগুলো ঘুরে বেড়িয়েছিলো আর পবিত্র রওযা শরীফ এবং পবিত্র মিম্বর শরীফ উনাদের মধ্যবর্তী স্থান রওদ্বতুম মির রিয়াদ্বিল জান্নাহ্ মুবারক উনার মধ্যে মলমুত্র ত্যাগ করেছিলো।” না‘ঊযুবিল্লাহ! (খুলাছাতুল ওয়াফা ১/২৯০)

৪. পবিত্র মদীনা শরীফ উনাকে জনশূন্য করে দেয়া: হযরত ইমাম কুরতুবী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, “ঐতিহাসিকরা লিখেছেন যে, পবিত্র মদীনা শরীফ তখন জনশূন্য হয়ে যান। মরুর পশুপাখিরা সেখানে মলমুত্র ত্যাগ করে। না‘ঊযুবিল্লাহ! পবিত্র মসজিদে নববী শরীফ কুকুরের বাসস্থানে পরিণত হয়।” না‘ঊযুবিল্লাহ! (জযবুল কুলূব)

৫. পবিত্র মিম্বার শরীফ উনার অবমাননা: কিতাবে বর্ণিত রয়েছে,

فَـلَمْ يُـمَكِّنْ اَحَدًا دُخُوْلَ مَسْجِدِهَا حَتّٰـى دَخَلَتْهُ الْكِلَابُ وَالذِّئَابُ وَبَالَتْ عَلـٰى مِنْۢـبَـرِهٖ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ

অর্থ: “(ঐ সময়) পবিত্র মসজিদে নববী শরীফ উনার মধ্যে কেউ প্রবেশ করতে পারেননি। যার কারণে সেখানে কুকুর ও হিংস্র প্রাণী প্রবেশ করেছে এবং পবিত্র মিম্বার শরীফ উনার মধ্যে ইস্তিঞ্জা (প্রস্রাব) করেছে।” না‘ঊযুবিল্লাহ! (ফতহুল আলিয়্যিল মালিক ২/৩৫২)

৬. পবিত্র মসজিদে নববী শরীফ-এ জামায়াত নিষিদ্ধ: পবিত্র মসজিদে নববী শরীফ উনার মধ্যে ৩ দিন জামায়াত বন্ধ ছিলো। কেউ সেখানে প্রবেশ করতে পারেননি। যাঁরাই প্রবেশ করতে চেয়েছেন, উনাদের প্রত্যেককেই শহীদ করা হয়েছে। না‘ঊযুবিল্লাহ! হযরত মুজাহিদ রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন,

اِلْـتَجَاَ النَّاسُ اِلـٰى حُجْرَةِ رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَمِنْۢـبَـرِهٖ وَالسَّيْفُ يَـعْمَلُ

অর্থ: “লোকজন নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র হুজরা শরীফ এবং পবিত্র মিম্বার শরীফ-এ আশ্রয় নিয়েছিলো; কিন্তু উনাদেরকে তরবারী দ্বারা টুকরো টুকরো করা হয়েছিলো।” না‘ঊযুবিল্লাহ! (তাযকিরাতুল খাওয়াছ ৫৭৬ নং পৃষ্ঠা)

৭. পবিত্র রওযা শরীফ ও পবিত্র মসজিদে নববী শরীফ রক্তে পরিপূর্ণ হওয়া: ‘তাযকিরাতু খাওয়াছ’ কিতাবের ৫৭৬ নং পৃষ্ঠায় উল্লেখ রয়েছে,

وَخَاضَ النَّاسُ فِـى الدِّمَاءِ اِلـٰى قَـبْـرِ رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَامْتَلَاَتِ الرَّوْضَةُ وَالْمَسْجِدُ

অর্থ: “নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র রওযা শরীফ পর্যন্ত মানুষ রক্তে হাবুডুবু খেয়েছিলো। আর পবিত্র রওযা শরীফ এবং পবিত্র মসজিদে নববী শরীফ রক্তে পরিপূর্ণ হয়ে গিয়েছিলো।” না‘ঊযুবিল্লাহ!

৮. ইয়াযীদ লা’নাতুল্লাহি আলাইহির দাস-দাসী হিসেবে বায়াত; অন্যথায় শাহাদাত: ইমাম ইবনে হাজম রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন,

وَاَكْـرَهَ النَّاسُ عَلـٰى اَنْ يُّـبَايِعُوْا يَزِيْدَ (لَعْنَةُ اللهِ عَلَيْهِ) عَلـٰى اَنَّـهُمْ عَبِيْدٌ لَهٗ اِنْ شَاءَ بَاعَ وَاِنْ شَاءَ اَعْتَقَ وَذَكَرَ لَهٗ بَـعْضُهُمْ اَلْبَـيْـعَةُ عَلـٰى حُكْمِ الْقُرْاٰنِ وَسُنَّةِ رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَاَمَرَ بِقَتْلِهٖ فَضَرَبَ عُنُـقَهٗ

অর্থ: “ইয়াযীদ বাহিনীর সেনাপতি ইবনে উক্ববা লা’নাতুল্লাহি আলাইহি পবিত্র মদীনা শরীফবাসী উনাদেরকে এই শর্তের উপর জোরপূর্বক বায়াত করিয়েছে যে, উনারা হচ্ছেন ইয়াযীদ লা’নাতুল্লাহি আলাইহির দাস-দাসী। ইয়াযীদ লা’নাতুল্লাহি আলাইহি ইচ্ছা করলে উনাদেরকে বিক্রি করতে পারবে, ইচ্ছা করলে উনাদেরকে আযাদ করে দিতে পারবে। না‘ঊযুবিল্লাহ! তখন একজন তাকে বলেন, বায়াত হতে হবে পবিত্র কুরআন শরীফ এবং পবিত্র সুন্নাহ শরীফ উনাদের হুকুমের উপর। তখন ইবনে উক্ববা লা’নাতুল্লাহি আলাইহির নির্দেশে ঐ ব্যক্তি উনার মস্তক দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয় অর্থাৎ উনাকে শহীদ করা হয়।” না‘ঊযুবিল্লাহ! (রাসাইলে ইবনে হাজম, ফতহুল আলিয়্যিল মালিক)

৯. পবিত্র মদীনা শরীফ লুটপাট: ইয়াযীদ বাহিনী পবিত্র মদীনা শরীফবাসী উনাদের সমস্ত ধন-সম্পদ লুটপাট করে। তাদের চাহিদা মুতাবিক ধন-সম্পদ না পেলে বাচ্চা শিশু ও মহিলাদেরকেও শহীদ করে। না‘ঊযুবিল্লাহ! যেমন- তারা একজন আনছার মহিলা ছাহাবী রদ্বিয়াল্লাহু তা‘য়ালা আনহা উনাকে উদ্দেশ্য করে বলে- আমাদেরকে স্বর্ণ দিন, অন্যথায় আপনাকে ও আপনার কোলের শিশুকে শহীদ করবো। ইতিমধ্যে উনার কাছে ধন-সম্পদ যা কিছু ছিলো ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে। তিনি উনার পরিচয় তুলে ধরেন। কিন্তু  তারা উনার কথায় কর্ণপাত না করে তাদের চাহিদা মুতাবিক স্বর্ণ না দিতে পারায় উনার কোল থেকে দুগ্ধপোষ্য শিশুকে নিয়ে দেয়ালের সাথে অত্যন্ত জোরে আঘাত করে। ফলে উক্ত শিশু উনার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে মগজ যমীনে ছিটকে পড়ে। তিনি শাহাদাতী শান মুবারক প্রকাশ করেন। না‘ঊযুবিল্লাহ! (সিমতুন নুজূম)

মূলত ইয়াযীদ বাহিনী পবিত্র মদীনা শরীফবাসী উনাদের উপর যে সীমাহীন যুলুম-নির্যাতন করেছে, সেটা ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব।

মুসরিফ ইবনে উক্ববা লা’নাতুল্লাহি আলাইহির উক্তি:

মুসরিফ ইবনে উক্ববা লা’নাতুল্লাহি আলাইহি বলে,

اَللّٰهُمَّ اِنْ عَذَّبْـتَنِـىْ بَـعْدَ طَاعَـتِـىْ لِـخَلِـيْـفَتِكَ يَزِيْدَ (لَعْنَةُ اللهِ عَلَيْهِ) وَقَـتْلِ اَهْلِ الْـحَرَّةِ فَاِنِّـىْ اِذًا لَشَقِىٌّ

অর্থ: “আয় বারে এলাহী, মহান আল্লাহ পাক! আপনার খলীফা ইয়াযীদ লা’নাতুল্লাহি আলাইহির পরিপূর্ণ ইতায়াত এবং পবিত্র মদীনা শরীফবাসী উনাদেরকে শহীদ করার পরও যদি আপনি আমাকে শাস্তি দেন, তাহলে নিশ্চয়ই আমি অত্যন্ত হতভাগা।” না‘ঊযুবিল্লাহ! (তারীখে ইয়া’কূবী ২০৯ নং পৃষ্ঠা)

সম্মানিত শহীদ উনাদের সির বা মাথা মুবারক দেখে ইয়াযীদ লা’নাতুল্লাহি আলাইহির আনন্দ-উল্লাস:

আল্লামা হযরত ইবনে কাছীর রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি উল্লেখ করেন,

اَنَّ يَزِيْدَ (لَعْنَةُ اللهِ عَلَيْهِ) لَمَّا بَـلَغَهٗ خَبَـرُ اَهْلِ الْمَدِيْـنَةِ وَمَا جَرٰى عَلَيْهِمْ عِنْدَ الْـحَرَّةِ مِنْ مُسْرِفِ بْنِ عُقْبَةَ (لَعْنَةُ اللهِ عَلَيْهِ) وَجَيْشِهٖ فَرِحَ بِذٰلِكَ فَـرَحًا شَدِيْدًا

 অর্থ: “পবিত্র মদীনা শরীফবাসী উনাদের উপর মুসরিফ ইবনে উক্ববা লা’নাতুল্লাহি আলাইহি কর্তৃক অত্যাচার, অবিচার, ব্যভিচার, খুন, লুটপাট ইত্যাদির সংবাদ যখন ইয়াযীদ লা’নাতুল্লাহি আলাইহির নিকট পেঁৗছলো, তখন সে অত্যন্ত আনন্দ-উল্লাস করতে থাকে।” না‘ঊযুবিল্লাহ! (আল বিদায়াহ্ ওয়ান নিহায়াহ্)

আল্লামা হযরত আবূ উমর শিহাবুদ্দীন আহমদ ইবনে মুহম্মদ ইবনে আবদু রব্বিহী আন্দালুসী রহমতুল্লাহি আলাইহি (বিছাল শরীফ ৩২৮ হিজরী শরীফ) তিনি লিখেন,

بَـعَثَ مُسْرِفُ بْنُ عُقْبَةَ (لَعْنَةُ اللهِ عَلَيْهِ) بِرُءُوْسِ اَهْلِ الْمَدِيْـنَةِ اِلـٰى يَـزِيْدَ (لَعْنَةُ اللهِ عَلَيْهِ) فَـلَمَّا اُلْقِيَتْ بَـيْـنَ يَدَيْهِ جَعَلَ يَـتَمَثَّلُ بِقَوْلِ حَضْرَتْ اِبْنِ الزِّبَـعْرٰى رَضِىَ اللهُ تَـعَالـٰى عَنْهُ يَـوْمَ اُحُدٍ

لَيْتَ اَشْيَاخِىْ بِبَدْرٍ شَهِدُوْا … جَزَعَ الْـخَزْرَجِ مِنْ وَقْعِ الْاَسَلْ

لَاَهَلُّوْا وَاسْتَـهَلُّوْا فَـرَحًا … وَلَقَالُوْا لِـيَزِيْدَ لَا فَشَلْ

فَـقَالَ لَهٗ رَجُلٌ مِّنْ اَصْحَابِ رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اِرْتَدَدْتَّ عَنِ الْاِسْلَامِ يَا يَـزِيْدَ (لَعْنَةُ اللهِ عَلَيْهِ) قَالَ بَـلـٰى

অর্থ: “মুসরিফ ইবনে উক্ববা লা’নাতুল্লাহি আলাইহি পবিত্র মদীনা শরীফবাসী উনাদের কর্তিত সির মুবারকসমূহ ইয়াযীদ লা’নাতুল্লাহি আলাইহির নিকট প্রেরণ করে। যখন সেই কর্তিত সির মুবারকসমূহ তার সামনে রাখা হয়, তখন হযরত ইবনে যিবারা রদ্বিয়াল্লাহু তা‘য়ালা আনহু (তিনি পবিত্র দ্বীন ইসলাম গ্রহণ করার পূর্বে) উহুদের জিহাদের দিন যেই কবিতা পাঠ করেছিলেন, উনার সেই কবিতা দ্বারা ইয়াযীদ লা’নাতুল্লাহি আলাইহি দৃষ্টান্ত দেয়। আর তা হচ্ছে- ‘বদর প্রান্তরে নিহত আমার পূর্বপুরুষরা যদি দেখতে পেত, মস্তক্বসমূহ দেহচ্যুত হচ্ছে দেখে খাযরাজ গোত্র শোক ও বিলাপ করছে। তাহলে তারা আনন্দে ফেটে পড়ত। এরপর অবশ্যই তারা ইয়াযীদ লা’নাতুল্লাহি আলাইহিকে বলত- কাপুরুষ হয়ো না।’ তখন একজন হযরত ছাহাবী রদ্বিয়াল্লাহু তা‘য়ালা আনহু তিনি বলেন, হে ইয়াযীদ! তুই মুরতাদ হয়ে গেছিস। জবাবে ইয়াযীদ লা’নাতুল্লাহি আলাইহি বলে, হঁ্যা।” (ইক্বদুল ফরীদ ৫/১৩৯)

এতো জঘন্যতম নিষ্ঠুরতা, বর্বরতা, পাপাচার, নাফরমানী সবকিছুই সংঘটিত হয়েছে মাল‘ঊন ইয়াযীদ লা’নাতুল্লাহি আলাইহির নির্দেশে। তাহলে এই ইয়াযীদ লা’নাতুল্লাহি আলাইহির চেয়ে বড় কাফির এবং চরম মাল‘ঊন আর কে হতে পারে? লা’নত ইয়াযীদ লা’নাতুল্লাহি আলাইহির উপর, তার সাহায্যকারীদের উপর এবং তার সমর্থনকারীদের উপর অনন্তকালের জন্য।

খ্বালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক তিনি আহলু বাইতি রসূলিল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, ক্বায়িম মাক্বামে হাবীবুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, রহমাতুল্লিল আলামীন মামদূহ মুর্শিদ ক্বিবলা সাইয়্যিদুনা হযরত সুলত্বানুন নাছীর আলাইহিস সালাম উনার সম্মানার্থে আমাদের সবাইকে হাক্বীক্বী বিশুদ্ধ আক্বীদাহ্, হুসনে যন ও ছহীহ সমঝ নছীব করুন। আমীন!

-মুহাদ্দিছ মুহম্মদ আমীন।

খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক স্বয়ং নিজেই সর্বপ্রথম ঈদে মীলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উপলক্ষে ঈদ উদযাপন করেন

সাইয়্যিদুল মুরসালীন, সাইয়্যিদুল কাওনাইন, সাইয়্যিদুল ফারীক্বাইন হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বয়ং নিজেই নিজের বিলাদত শরীফ পালন করে খুশি প্রকাশ করেন

হযরত খুলাফায়ে রাশিদীন আলাইহিমুস সালাম উনারা উনাদের খিলাফতকালে নাবিইয়ুর রহমাহ, নাজিইয়ুল্লাহ, নূরুম মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিলাদত শরীফ উপলক্ষে খুশি প্রকাশ করেছেন এবং এ উপলক্ষে ব্যয় করার ফযীলতও বর্ণনা করেছেন

হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনারা উৎসাহ-উদ্দীপনার সাথে সাইয়্যিদুল আ’ইয়াদ, সাইয়্যিদুল ঈদিল আ’যম, সাইয়্যিদুল ঈদিল আকবার ঈদে মীলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উপলক্ষে ঈদ উদযাপন করেছেন

বান্দা-বান্দী ও উম্মতের জন্য সাইয়্যিদুল আ’ইয়াদ, সাইয়্যিদুল ঈদিল আ’যম, সাইয়্যিদুল ঈদিল আকবার ঈদে মীলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালন করা ফরয হওয়ার প্রমাণ