হিন্দুরা অন্তর থেকে মুসলমানদেরকে ঘৃণা করে ও অস্পৃশ্য মনে করে। আবুল মনসুর আহমদ, বঙ্গবন্ধুর আত্মকথা, মীর মোশাররফসহ অনেক সাহিত্যিকের লেখনীতেই এর প্রমাণ রয়েছে। বিশেষত রবীন্দ্র বঙ্কিম শরৎসহ হিন্দু সাহিত্যিকদের রচনায় এর প্রমাণ বিস্তর। কিন্তু বর্তমানে তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা ও হিন্দু তোষণকারী প্রশাসন পারলে হিন্দুদের মাথায় তুলে রাখে। হিন্দুরা যে মুসলমানদের শত্রু জ্ঞান করে- সে কথা অস্বীকার করে। পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে মুশরিক-হিন্দুদের বড় শত্রু বলা হয়েছে। অতএব, ওদের থেকে সাবধান।

সংখ্যা: ২৩২তম সংখ্যা | বিভাগ:

[ইতিহাসবিদ জয়া চ্যাটার্জী (পিএইচডি) বেশ কিছুদিন ক্যাম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রিনিটি কলেজ ও উলফসন কলেজ এবং লন্ডন স্কুল অব ইকোনোমিক্সে যথাক্রমে ফেলো ও সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ছিল এবং বর্তমানে আন্তর্জাতিক ইতিহাসের লেকচারার।

তার ‘Bengal Divided’ হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে বহুল আলোচিত ও পঠিত একটি গ্রন্থ। এই গ্রন্থ সহ আরো অনেক মুসলমান রাজনীতিক, সাহিত্যিক এবং হিন্দু সাহিত্যিকের গ্রন্থে ও বর্ণনা ও প্রমাণ পাওয়া যায় যে হিন্দুরা মুসলমানদের কতটা নীচ মনে করতো, ঘৃণা করতো এবং যুলুম করতো। নাউযুবিল্লাহ!

প্রসঙ্গত দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড থেকে প্রকাশিত জয়া চ্যাটার্জীর “Bengal Divided”- এর বঙ্গানুবাদক আবু জাফর-এর ‘বাঙলা ভাগ হল’ হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা ও দেশ-বিভাগ ১৯৩২-১৯৪৭ গ্রন্থ থেকে এখানে উল্লেখ করা গেল।]

পরিশিষ্ট-১, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

[১৯২৬ সালে অনুষ্ঠিত বাঙলা প্রাদেশিক সম্মেলনে প্রদত্ত ভাষণ। পরে ওই মূল ভাষণ প্রবন্ধ হিসেবে হিন্দু সংঘ পত্রিকায় ছাপা হয়, ১৯শে আশ্বিন ১৩৩৩।]

কোনো একটা কথা বহু লোকে মিলিয়া বহু আস্ফালন করিয়া বলিতে থাকিলেই কেবল বলার জোরেই তাহা সত্য হইয়া উঠে না। অথচ এই সম্মিলিত প্রবল কণ্ঠসরের একটা শক্তি আছে এবং মোহও কম নাই। চারিদিক গমগম করিতে থাকে- এবং এই বাষ্পাচ্ছন্ন আকাশের নীচে দুই কানের মধ্যে নিরন্তর যাহা প্রবেশ করে, মানুষ অভিভূতের মতো তাহাকেই সত্য বলিয়া বিশ্বাস করিয়া বসে। Propraganda বস্তুত GB-B|

বিগত মহাযুদ্ধের দিনে পরস্পরের গলা কাটিয়া বেড়ানই যে মানুষের একমাত্র ধর্ম ও কর্তব্য, এই অসভ্যকে সত্য বলিয়া যে দুই পক্ষের লোকেই মানিয়া লইয়াছিল, সে তো কেবল অনেক কলম এবং অনেক গলার সমবেত চীৎকারের ফলেই। যে দুই-একজন প্রতিবাদ করিতে গিয়াছিল, আসল কথা বলিবার চেষ্টা করিয়াছিল, তাহাদের লাঞ্ছনা ও নির্যাতনের অবধি ছিল না। কিন্তু আজ আর সেদিন নাই। আজ অপরিসীম বেদনা ও দুঃখ ভোগের ভিতর দিয়া মানুষের চৈতন্য হইয়াছে যে, সত্য ব¯‘ সেদিন অনেকের অনেক বলার মধ্যেই ছিল না।

বছর কয়েক পূর্বে, পাপাত্মার অহিংস অসহযোগের যুগে এমনি একটা কথা এদেশে বহু নেতায় মিলিয়া তার সরে ঘোষণা করিয়াছিলেন যে, হিন্দু মুসলিম মিলন চাই-ই। চাই শুধু কেবল জিনিসটা ভালো বলিয়া নয়, চাই-ই এই জন্য যে, এ না হইলে সরাজ বলো, স্বাধীনতা বলো, তাহার কল্পনা করাও পাগলামি। কেন পাগলামি এ কথা যদি কেহ তখন জিজ্ঞাসা করিতো, নেতৃবৃন্দেরা কি জবাব দিতেন তাহারাই জানেন, কিন্তু লেখায়, বক্তৃতায় ও চিৎকারের বিস্তারে কথাটা এমনি বিপুলায়তন ও স্বতঃসিদ্ধ সত্য হইয়া গেলো যে, এক পাগল ছাড়া আর এতো বড় পাগলামি করিবার দুঃসাহস কাহারও রহিলো না।

তার পরে এই মিলন ছায়াবাজীর রোশনাই যোগাইতেই হিন্দুর প্রাণান্ত হইলো। সময় এবং শক্তি কত যে বিফলে গেলো তাহার তো হিসাবও নাই। ইহারই ফলে পাপাত্মাজীর খিলাফৎ আন্দোলন, ইহারই ফলে দেশবন্ধুর প্যাক্ট। অথচ এতবড় দুটো ভুয়া জিনিসও ভারতের রাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে কম আছে।

প্যাক্টের তবু বা কতক অর্থ বুঝা যায়; কারণ, কল্যাণের হউক, অকল্যাণের হউক, সময় মতো একটা ছাড় রফা করিয়া কাউন্সিলর ঘরে বাঙলা সরকারকে পরাজিত করিবার একটা উদ্দেশ্য ছিল, কিন্তু খিলাফৎ আন্দোলন হিন্দুর পক্ষে শুধু অর্থহীন নয়, অসত্য। কোনো মিথ্যাকে অবলম্বন করিয়া জয়ী হওয়া যায় না এবং যে মিথ্যার জগদ্দল পাথর গলায় বাঁধিয়া এতো বড় অসহযোগ আন্দোলন শেষ পর্যন্ত রসাতলে গেলো, সে এই খিলাফৎ। স্বরাজ চাই, বিদেশীর শাসন পাশ হইতে মুক্তি চাই, ভারতবাসীর এই দাবির বিরুদ্ধে ইংরাজ হয়তো একটা যুক্তি খাড়া করিতে পারে, কিন্তু বিশ্বের দরবারে তাহা টিকে না।

পাই বা না পাই, এই জন্মগত অধিকারের জন্য লড়াই করায় পুণ্য আছে, প্রাণপাত হইলে অন্তে স¦র্গবাস হয়। এই সত্যকে অস্বীকার করিতে পারে জগতে এমন কেহ নাই। কিন্তু খিলাফৎ চাই- এ কোন কথা?

যে দেশের সহিত ভারতের সংস্রব নাই, যে দেশের মানুষে কি খায়, কি পরে, কি রকম তাদের চেহারা, কিছুই জানি না, সেই দেশ পূর্বে তুর্কীর শাসনাধীন ছিল, এখন যদি, তুর্কী লড়াইয়ে হারিয়াছে তথাপি সুলতানকে তাহা ফিরাইয়া দেওয়া হউক, কারণ, পরাধীন ভারতীয় মুসলমান সমাজ আবদার ধরিয়াছে। এ কোন স¦গত প্রার্থনা? আসলে ইহাও একটা প্যাক্ট। ঘুষের ব্যাপার। যেহেতু আমরা স¦রাজ চাই, এবং তোমরা চাও খিলাফৎ- অতএব, এস, একত্র হইয়া আমরা খিলাফতের জন্য মাথা খটুড়ি এবং তোমরা স¦রাজের জন্য তাল ঠুকিয়া অভিনয় শুরু কর। কিন্তু এদিকে বৃটিশ গভর্নমেন্ট কর্ণপাত করিল না, এবং ওদিকে যাহার জন্য খিলাফত সেই খলিফাকেই তুর্কীরা দেশ হইতে বাহির করিয়া দিলো।

সুতরাং এইরূপ খিলাফত আন্দোলন যখন নিতান্তই অসার ও অর্থহীন হইয়া পড়িল, তখন নিজের শূন্য গর্ভতায় সে শুধু নিজেই মরিল না ভারতের সরাজ আন্দোলনেরও প্রাণবধ করিয়া গেল। বস্তু‘ত এমন ঘুষ দিয়া, প্রলোভন দেখাইয়া, পিঠ চাপড়াইয়া কি সদেশের মুক্তি সংগ্রামে লোক ভর্তি করা যায়, না করিলেই বিজয় লাভ হয়? হয় না, এবং কোনো দিন হইবে বলিয়াও মনে করি না।

এই ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি খাটিয়াছিলো গান্ধীজী নিজে। এতখানি আশা বোধ করি কেহ করে নাই, এতবড় প্রতারিতও বোধ করি কেহ হয় নাই। সেকালে বড় বড় মুসলিম পা-াদের কেহবা হইয়াছিলেন তাহার দক্ষিণ হস্ত, কেহবা বাম হস্ত, কেহবা চক্ষু কর্ত, কেহবা আর কিছু- হায়রে! এতবড় তামাশার ব্যাপার কি আর কোথাও অনুষ্ঠিত হইয়াছে।

পরিশেষে হিন্দু- মুসলমান মিলনের শেষ চেষ্টা করিলো সে দিল্লীতে- দীর্ঘ একুশ দিন উপবাস করিয়া। ধর্মপ্রাণ সরলচিত্ত সাধু মানুষ সে, বোধ হয় প্রাণটা তাহার টিকিয়া গেল। ভ্রাতার অধিক, সর্বক্ষেত্রে পিয় মিঃ মহম্মদ আলিই বিচলিত হইলেন সবচেয়ে বেশি। তাহার চোখের উপরেই সমস্ত ঘটিয়াছিল, – অশ্রুপাত করিয়া কহিলেন, আহা! বড় ভালো লোক এই গান্ধীজীটি। ইহাই সত্যকার উপকার কিছু করাই চাই।

অতএব, আগে যাই মক্কায়, গিয়া পীরের সিন্নি দিই, পরে ফিরিয়া আসি কলমা পড়াইয়া কাফের ধর্ম ত্যাগ করাইয়া তবে ছাড়িব। শুনিয়া গান্ধীজী কহিলো, পৃথিবী দ্বিধা হও।

ব¯‘ত মুসলমান যদি কখনও বলে- হিন্দুর সহিত মিলন করিতে চাই, সে যে ছলনা ছাড়া আর কি হইতে পারে, ভাবিয়া পাওয়া কঠিন।

একদিন মুসলমান লুণ্ঠনের জন্যই ভারতে প্রবেশ করিয়াছিল, রাজ্য প্রতিষ্ঠা করিবার জন্য আসে নাই। সেদিন কেবল লুঠ করিয়াই ক্ষান্ত হয় নাই, মন্দির ধ্বংস করিয়াছে, প্রতিমা চূর্ণ করিয়াছে, নারীর সতীত্ব হানি করিয়াছে, বস্তুত অপরের ধর্ম ও মনুষ্যত্বের উপরে যতখানি আঘাত ও অপমান করা যায়, কোথাও কোনো সঙ্কোচ মানে নাই।

কট্টর হিন্দু শরৎচন্দ্রের উপরোক্ত লিখায় বুঝা গেল, শরৎচন্দ্র কেমন মাত্রার মুসলিমবিদ্বেষী ছিল। সে তার স¦জাতির হিন্দু-মুসলিম মিলনের চেষ্টাকেও মেনে নেয়নি; বরং সেটাকে পাগলামি ও ছলনা হিসেবে তুলনা করেছে। মুসলমানদেরকে সে লুণ্ঠনকারী হিসেবে চিহ্নিত করেছে। মুসলমানদের পাণ্ডা বলে গালি দিয়েছে।

সে চিত্তরঞ্জন দাসের ‘বেঙ্গল প্যাক্ট’ বাঙলা সরকারকে পরাজিত করিবার একটা কৌশল হিসেবে মেনে নিতে মত দিয়েছে কিন্তু কোনোভাবেই খিলাফৎ আন্দোলন তার পক্ষে মেনে নেয়া সম্ভব নয়। বরং সে বলেছে, খিলাফৎ হিন্দুর পক্ষে শুধু অর্থহীন নয়, বরং মিথ্যা আন্দোলন। সে খিলাফৎ আন্দোলনকে সমর্থন করায় গান্ধীকেও সমালোচনা থেকে বাদ দেয়নি। খিলাফৎ এবং মুসলমানদেরকে তাচ্ছিল্য করতেও ছাড়েনি সে।

বলাবাহুল্য, হিন্দুরা এখনও মুসলমানদের প্রতি সে ঘৃণা বোধ থেকে বেরিয়ে আসেনি। এমনকি ভারতেরা হিন্দুরা মনে করে স্পেন যেমন মুসলমানদের থেকে ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে তেমনি অতি শীঘ্রই বাংলাদেশও মুসলমানদের থেকে ছিনিয়ে নেয়া হবে। পবিত্র কোরআন শরীফ উনার মধ্যে ইহুদীদের পর মুশরিক বা হিন্দুদেরই সবচেয়ে বড় শত্রু বলা হয়েছে। কাজেই এ কঠিন ও ঘৃণ্য শত্রু থেকে সাবধান ও সতর্ক থাকা প্রতিটি মুসলমানের জন্য ফরয-ওয়াজিব।

-০-

“দেশের রাজা হইয়াও তাহারা (মুসলমানরা) এই জঘন্য প্রবৃত্তির হাত হইতে মুক্তিলাভ করিতে পারে নাই। ঔরঙ্গজেব প্রভৃতি নামজাদা সম্রাটের কথা ছাড়িয়া দিয়াও যে আকবর বাদশাহের উদার বলিয়া এত খ্যাতি ছিল, সেও কসুর করে নাই। আজ মনে হয়, এ সংস্কার উহাদের মজ্জাগত হইয়া উঠিয়াছে। পাবনার বীভৎস ব্যাপারে অনেককেই বলিতে শুনি, পশ্চিম হইতে মুসলমান মোল্লারা আসিয়া নিরীহ ও অশিক্ষিত মুসলমান প্রজাদের উত্তেজিত করিয়া এই দুষ্কার্য করিয়াছে।

কিন্তু এমনিই যদি পশ্চিম হইতে হিন্দু পুরোহিতের দল আসিয়া, কোন হিন্দুপ্রধান স্থানে এমনি নিরীহ ও নিরক্ষর চাষাভুষাদের এই বলিয়া উত্তেজিত করিবার চেষ্টা করে যে, নিরপরাধ মুসলমান প্রতিবেশীদের ঘরদোরে আগুন ধরাইয়া সম্পত্তি লুঠ করিয়া মেয়েদের অপমান অমর্যাদা করিতে হইবে, তাহা হইলে সেই সব নিরক্ষর হিন্দু কৃষকের দল উহাদের পাগল বলিয়া গ্রাম হইতে দূর করিয়া দিতে এক মুহূর্ত ইতস্তত করিবে না।

কিন্তু কেন এইরূপ হয়? ইহা কি কেবল শুধু অশিক্ষারই ফল? শিক্ষা মানে যদি লেখাপড়া জানা হয়, তাহা হইলে চাষী মজুরের মধ্যে হিন্দু মুসলমানে বেশি তারতম্য নাই। কিন্তু শিক্ষার তাৎপর্য যদি অন্তরের প্রসার ও হৃদয়ের কালচার হয়, তাহা হইলে বলিতেই হইবে উভয় সম্প্রদায়ের তুলনাই হয় না।

হিন্দু নারীহরণ ব্যাপারে সংবাদপত্রওয়ালারা প্রায়ই দেখি প্রশ্ন করে, মুসলমান নেতারা নীরব কেন? তাহাদের সম্প্রদায়ের লোকেরা যে পুনঃ পুনঃ এতবড় অপরাধ করিতেছে, তথাপি প্রতিবাদ করিতেছেন না কিসের জন্য? মুখ বুজিয়া নিঃশব্দে থাকার অর্থ কি? কিন্তু আমার তো মনে হয় অর্থ অতিশয় প্রাঞ্জল। তাহারা শুধু অতি বিনয়বশতই মুখ ফুটিয়া বলিতে পারেন না, বাপু, আপত্তি করব কি, সময় এবং সুযোগ পেলে ও কাজে আমরাও লেগে যেতে পারি।

মিলন হয় সমানে সমানে। শিক্ষা সমান করিয়া লইবার আশা আর যেই করুক আমি তো করি না। হাজার বৎসরে কুলায় নাই, আর হাজার বৎসরে কুলাইবে না। এবং ইহাকেই খিলাফত করিয়া, প্যাক্ট করিয়া, ডান ও বাঁ- দুই হাতে মুসলমানের পুচ্ছ চুলকাইয়া সরাজ যুদ্ধে নামাইতে পারিবে, এ দুরাশা দুই-একজনার হয়তো ছিল, কিন্তু মনে মনে অধিকাংশেরই ছিল না।

তাহারা ইহাই ভাবিত- দুঃখ-দুর্দশার মত শিক্ষক তো আর নাই, বিদেশী বুরোক্রেসীর কাছে নিরন্তর লাঞ্ছনা ভোগ করিয়া হয়তো তাহাদের চৈতন্য হইবে, হয়তো হিন্দুর সহিত কাঁধ মিলাইয়া স¦রাজরথে ঠেলা দিতে সম্মত হইবে। ভাবা অন্যায় নয়, শুধু ইহাই তাহারা ভাবিলো না যে, লাঞ্ছনাবোধও শিক্ষাসাপেক্ষ। যে লাঞ্ছনার আগুনে স্বর্গীয় দেশবন্ধুর হৃদয় দগ্ধ হইয়া যাইত, আমার গায়ে তাহাতে আঁচটুকুও লাগে না।

এবং তাহার চেয়েও বড় কথা এই যে, দুর্বলের প্রতি অত্যাচার করিতে যাহাদের বাধে না, সবলের পদলেহন করিতেও তাহাদের ঠিক ততখানিই বাধে না। সুতরাং এ আকাশকুসুমের লোভে আত্মবঞ্চনা করি আমরা কিসের জন্য?

হিন্দু-মুসলমান মিলন একটা গালভরা শব্দ, অতিরিক্ত সে আর কোনো কাজেই আসে নাই। এ মোহ আমাদিগকে ত্যাগ করিতেই হইবে। তোমরা হিন্দু ছিলে; সুতরাং রক্ত সম্বন্ধে তোমরা আমাদের জ্ঞাতি। জ্ঞাতি বধে মহাপাপ। অতএব, কিঞ্চিৎ করুণা কর। এমন করিয়া দয়াভিক্ষা মিলন প্রয়াসের মতে অগৌরবের বস্তু‘ আমি ত আর দেখিতে পাই না।

স্বদেশে বিদেশি ক্রীশ্চান বন্ধু আমার অনেক আছে। কাহারও বা পিতামহ, কেহ বা সয়ং ধর্মান্তর গ্রহণ করিয়েছে, কিন্তু নিজে হইতে তাহারা নিজেদের ধর্ম বিশ্বাসের পরিচয় না দিলে বুঝবার জো নাই যে, সর্বদিক দিয়া তাহারা আজও আমাদের ভাইবোন নয়। একজন মহিলাকে জানি, অল্প বয়সের সে ইহলোক হইতে বিদায় গ্রহণ করিয়াছে, এতবড় শ্রদ্ধার পাত্রীও জীবনে আমি কম দেখিয়াছি আর মুসলমান?

আমাদের একজন পাচক ব্রাহ্মণ ছিল। সে মুসলমানীর প্রেমে মজিয়া ধর্ম ত্যাগ করে। এক বৎসর পরে দেখা। তাহার নাম বদলাইয়াছে, পোশাক বদলাইয়াছে, প্রকৃতি বদলাইয়াছে, ভগবানের দেওয়া যে আকৃতি, সে পর্যন্ত এমনি বদলাইয়া গিয়াছে যে আর চিনিবার জো নাই। এবং এইটিই একমাত্র উদাহরণ নয়। বস্তির সহিত যাহারই অল্প বিস্তর ঘনিষ্ঠতা আছে, এ কাজ যেখানে প্রতিনিয়তই ঘটিতেছে- তাহারই অপরিজ্ঞাত নয় যে- এমনিই বটে। উগ্রতায় পর্যন্ত ইহারা বোধ হয় কোহাটের মুসলমানকে লজ্জা দিতে পারে।

অতএব, হিন্দুর সমস্যা এ নয় যে, কি করিয়া এই অস্বাভাবিক মিলন সংঘটিত হইবে; হিন্দুর সমস্যা এই যে, কি করিয়া তাহারা সংঘবদ্ধ হইতে পারিবে এবং হিন্দুধর্মাবলম্বী যে কোনো ব্যক্তিকেই ছোট জাতি বলিয়া অপমান করিবার দুর্মতি তাহাদের কেমন করিয়া এবং কবে যাইবে। আর সর্বাপেক্ষা বড় সমস্যা হিন্দু অন্তরের সত্য কেমন করিয়া তাহার প্রতিদিনের প্রকাশ্য আচরণে পুষ্পের মতো বিকশিত হইয়া উঠিবার সুযোগ পাইবে। যাহা ভাবি তাহা বলি না, যাহা বলি তা করি না, যাহা করি তাহার স্বীকার পাই না। আত্মার এতো বড় দুর্গতি অব্যাহত থাকিতে সমাজগাত্রের অসংখ্য ছিদ্রপথ ভববান স্বয়ং আসিয়াও রুদ্ধ করিতে পারিবে না।

ইহাই সমস্যা এবং ইহাই কর্তব্য। হিন্দু মুসলমানের মিলন হইল না বলিয়া বুক চাপড়াইয়া কাদিয়া বেড়ানই কাজ নয়। নিজেরা কান্না বন্ধ করিলে তবে অন্য পক্ষ হইতে কাদিবার লোক পাওয়া যাইবে।”

আলোচ্য লিখায় কট্টর মুসলিমবিদ্বেষী যবন শরৎচন্দ্র মুসলমানদের হেন অপমান করতে বাকী রাখেনি। তার ভাষায় মুসলমান মানে লুঠেরা, অশিক্ষিত, বর্বর। শাসকরা জঘন্য প্রবৃত্তির অধিকারী। মুসলমান নেতারা সুযোগ পেলে হিন্দু নারীহরণ বাদ দেয় না। মিলন হয় সমানে সমানে। মুসলমানরা তো জাতে, শিক্ষায় কোনো দিক দিয়েই হিন্দুদের সমান নয়। হিন্দু-মুসলমান মিলন একটা গালভরা শব্দ। দয়া ভিক্ষার এই মিলন প্রয়াস হিন্দুদের জন্য এক অগৌরবের বস্তু। মুসলমানরা ব্রাহ্মণ পাচকের সমানও নয়।

বলাবাহুল্য, হিন্দুরা এখনও মুসলমানদের প্রতি সে ঘৃণা বোধ থেকে বেরিয়ে আসেনি। এমনকি হিন্দুরা মনে করে স্পেন যেমন মুসলমানদের থেকে ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে তেমনি অতি শীঘ্রই বাংলাদেশও মুসলমানদের থেকে ছিনিয়ে নেয়া হবে। পবিত্র কোরআন শরীফ উনার মধ্যে ইহুদীদের পর মুশরিক বা হিন্দুদেরই সবচেয়ে বড় শত্রু বলা হয়েছে। কাজেই এ কঠিনও ঘৃণ্য শত্রু থেকে সাবধান ও সতর্ক থাকা প্রতিটি মুসলমানের জন্য ফরয-ওয়াজিব।

“হিন্দুস্থান হিন্দুর দেশ। সুতরাং এ দেশকে অধীনতার শৃঙ্খল হইতে মুক্ত করিবার দায়িত্ব এটা হিন্দুরই। মুসলমান মুখ ফিরাইয়া আছে তুরস্ক ও আরবের দিকে, এদেশে চিত্ত তাহার নাই। যাহা নাই তাহার জন্য অপেক্ষা করিয়াই বা লাভ কি এবং তাহাদের বিমুখ কর্ণের পিছু পিছু ভারতের জলবায়ু ও খানিকটা মাটির দোহাই পাড়িয়াই বা কি হইবে। আজ এই কথাটাই একান্ত করিয়া বুঝিবার প্রয়োজন হইয়াছে যে, এ কাজ শুধু হিন্দুর আর কাহারও নয়। মুসলমানের সংখ্যা দেখিয়া চঞ্চল ইহবারও আবশ্যকতা নাই। সংখ্যাটাই সংসারে পরম সত্য নয়। ইহার চেয়েও বড় সত্য রহিয়াছে যাহা এক দুই তিন করিয়া মাথা গণনার হিসাবটাকে হিসেবের মধ্যে গণ্য করে না।

হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কে এতক্ষণ যাহা বলিয়াছি তাহা অনেকের কানেই হয়তো তিক্ত ঠেকিবে, কিন্তু সেজন্য চমকাইবারও প্রয়োজন নাই; আমাকে দেশদ্রোহী ভাবিবারও হেতু নাই। আমার বক্তব্য এই নয় যে, এই দুই প্রতিবেশী জাতির মধ্যে একটা সদ্ভাব ও প্রীতির বন্ধন ঘটিলে সে ব¯‘ আমার মনঃপুত হইবে না। আমার বক্তব্য এই যে, এই জিনিস যদি নাই-ই হয় এবং হওয়ার যদি কোনো কিনারা আপাতত চোখে না পড়ে তো ইহা লইয়া অহরহ আর্তনাদ করিয়া কোনো সুবিধা হইবে না। আর না হইলেই যে সর্বনাশ হইয়া গেলো, এ মনোভাবের কোনো সার্থকতা নাই। অথচ উপরে নিচে, ডাইনে বামে চারিদিক হইতে একই কথা বারংবার শুনিয়া ইহাকে এমনিই সত্য বলিয়া বিশ্বাস করিয়া বসিয়াছি যে- জগতে ইহা ছাড়া যে আমাদের আর কোনো গতি আছে, তাহা যেন আর ভাবিতেই পারি না। তাই করিতেছি কি?

না, অত্যাচার ও অনাচারের বিবরণ সমস্ত স্থান হইতে সংগ্রহ করিয়া এই কথাটাই কেবল বলিতেছি- তুমি এই আমাকে মারিলে, এই আমার দেবতার হাত পা ভাঙ্গিলে, এই আমার মন্দির ধ্বংস করিলে, এই আমার মহিলাকে হরণ করিলে এবং এই সকল তোমার ভারী অন্যায়, ইহাতে আমরা যারপরনাই ব্যথিত হইয়া হাহাকার করিতেছি। এই সকল তুমি না থামাইলে আমরা আর তিষ্ঠিতে পারি না। বাস্তবিক ইহার অধীন আমরা কি কিছু বলি, না করি? আমরা নিঃসংশয়ে স্থির করিয়াছি যে, যেমন করিয়াই হউক মিলন করিবার ভার আমাদের এবং অত্যাচার নিবারণ করিবার ভার তাহাদের। কিন্তু বস্তুতঃ হওয়া উচিত ঠিক বিপরীত। অত্যাচার থামাইবার ভার গ্রহণ করা উচিত নিজেদের এবং হিন্দু-মুসলমান মিলন বলিয়া যদি কিছু থাকে তবে উহা সম্পন্ন করিবার ভার দেয়া উচিত মুসলমানদের উপরে।

কিন্তু দেশের মুক্তি হইবে কি করিয়া? কিন্তু জিজ্ঞাসা করি, মুক্তি কি হয় গোঁজামিলে? মুক্তি অর্জনের ব্রতে হিন্দু যখন আপনাকে প্র¯‘ত করিতে পারিবে, তখন লক্ষ্য করিবারও প্রয়োজন হইবে না, গোটা কয়েক মুসলমান ইহাতে যোগ দিলো কিনা। ভারতের মুক্তিতে ভারতীয় মুসলমানের মুক্তি মিলিতে পারে, এই সত্য তাহারা কোনো দিনই অকপটে বিশ্বাস করিতে পারিবে না। পারিবে শুধু তখন, যখন ধর্মের প্রতি মোহ তাহাদের কমিবে, যখন বুঝিবে যে কোনো ধর্মই হউক তাহার গোঁড়ামি লইয়া গর্ব করার মতো এমন লজ্জাকর ব্যাপার, এতবড় বর্বরতা মানুষের আর দ্বিতীয় নাই। কিন্তু উহা বুঝার এখনও অনেক বিলম্ব। এবং জগৎসুদ্ধ লোক মিলিয়া মুসলমানদের শিক্ষার ব্যবস্থানা করিলে ইহাদের চোখ খুলিবে কিনা সন্দেহ। আর দেশের মুক্তি সংগ্রামে কি দেশসুদ্ধ লোকেই কোমর বাঁধিয়া লাগে? না ইহা সম্ভব, না তাহার প্রয়োজন হয়? আমেরিকা যখন স্বাধীনতার জন্য লড়াই করিয়াছিল, তখন দেশের অর্ধেকের বেশি লোকে তো ইংরেজের পক্ষে ছিল। আয়ারল্যান্ডের মুক্তিযজ্ঞে কয়জনে যোগ দিয়েছিল? যে বলশেভিক গভর্নমেন্ট আজ রুশিয়ার শাসনদ- পরিচালনা করিতেছে- দেশের লোক সংখ্যায় অনুপাতে সে তো এখন শতকে একজনও পৌঁছে নাই। মানুষ তো গরু ঘোড়া নয়, কেবলমাত্র ভীড়ের পরিমাণ দেখিয়াই সত্যাসত্য নির্ধারিত হয় না, হয় শুধু  তাহার তপস্যার একাগ্রতার বিচার করিয়া। এই একাগ্র তপস্যার ভার রহিয়াছে দেশের ছেলেদের উপরে। হিন্দু-মুসলমান মিলনের ফন্দি উদ্ভাবন করাও তাহার কাজ নহে এবং যে সকল প্রধান রাজনীতিবিদের দল এই ফন্দিটাকে ভারতের একমাত্র ও অদ্বিতীয় বলিয়া চিৎকার করিয়া ফিরিতেছে তাহাদের পিছনে জয়ধ্বনি করিয়া সময় নষ্ট করিয়া বেড়ানোও তাহার কাজ নহে। জগতে অনেক বস্তু আছে তাহাকে ত্যাগ করিয়াই তবে পাওয়া যায়। হিন্দু-মুসলমান মিলনও সেই জাতীয় বস্তু। মনে হয়, এই আশা নির্বিশেষে ত্যাগ করিয়া কাজে নামিতে পারিলেই হয়তো একদিন এই একান্ত দুষ্প্রাপ্য নিধির সাক্ষাৎ মিলিবে। কারণ মিলন তখন শুধু কেবল একার চেষ্টাতেই ঘটিবে না, ঘটিবে উভয়ের আন্তরিক ও সমগ্র বাসনার ফলে।”

{সূত্র : হরিপদ ঘোষ (সম্পাদনা), শরৎ রচনা সমগ্র, খণ্ড৩, কোলকাতা, ১৯৮৯।}

উল্লেখ্য, কট্টর মুসলিমবিদ্বেষী, ম্লেচ্ছ, যবন শরৎচন্দ্র মনে করে হিন্দুস্থান মানে হিন্দুর দেশ। অথচ হযরত সাহাবায়ে ক্বিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদের সময় থেকেই পাক-ভারতসহ এ অঞ্চলে মুসলমান উনাদের আগমন। হযরত মুহম্মদ বিন কাশেম রহমতুল্লাহি উনার সময় থেকেই এ অঞ্চল মুসলমান উনাদের অধীন ছিল। আর তখন এদেশের নাম ভারত ছিল না। সে চায় মুসলমানরা আরব বা তুরস্কের ইসলামী সংস্কৃতি নয়, বরং তাদের মূর্তি পূজারী হিন্দু সংস্কৃতি গ্রহণ করুক। তার মতে, ভারতকে মুসলমানদের অধীনতার শৃঙ্খল হইতে মুক্ত করিবার দায়িত্ব এটা হিন্দুরই। এ কাজ শুধু হিন্দুর, আর কাহারও নয়। মুসলমানের সংখ্যা গণনা করিয়া চঞ্চল ইহবারও আবশ্যকতা নাই। তার আরো সন্দেহ, জগৎসুদ্ধ লোক মিলিয়া মুসলমান উনাদের শিক্ষার ব্যবস্থাকরিলেও মুসলমান উনাদের চোখ খুলিবে না।

বলাবাহুল্য, হিন্দুরা এখনও মুসলমানদের প্রতি সে ঘৃণা বোধ থেকে বেরিয়ে আসেনি। এমনকি ভারতের হিন্দুরা মনে করে- স্পেন যেমন মুসলমানদের থেকে ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে তেমনি অতি শীঘ্রই বাংলাদেশও মুসলমানদের থেকে ছিনিয়ে নেয়া হবে। পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে ইহুদীদের পর মুশরিক বা হিন্দুদেরই সবচেয়ে বড় শত্রু বলা হয়েছে। কাজেই এ কঠিন ও ঘৃণ্য শত্রু থেকে সাবধান ও সতর্ক থাকা প্রতিটি মুসলমানের জন্য ফরয-ওয়াজিব।

-আল্লামা মুহম্মদ আরিফুর রহমান

যুগের আবূ জাহিল, মুনাফিক ও দাজ্জালে কায্যাবদের বিরোধিতাই প্রমাণ করে যে, রাজারবাগ শরীফ-এর হযরত মুর্শিদ ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলী হক্ব। খারিজীপন্থী ওহাবীদের মিথ্যা অপপ্রচারের দাঁতভাঙ্গা জবাব-৬৭

ভ্রান্ত ওহাবী মতবাদ প্রচারের নেপথ্যে-১৬

চাঁদ দেখা ও নতুন চন্দ্রতারিখ নিয়ে প্রাসঙ্গিক আলোচনা-৩৫

বাতিল ফিরক্বা ওহাবীদের অখ্যাত মুখপত্র আল কাওসারের মিথ্যাচারিতার জবাব-২৫ হাদীছ জালিয়াতী, ইবারত কারচুপি ও কিতাব নকল করা ওহাবীদেরই জন্মগত বদ অভ্যাস ওহাবী ফিরক্বাসহ সবগুলো বাতিল ফিরক্বা ইহুদী-নাছারাদের আবিষ্কার! তাদের এক নম্বর দালাল

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ‘সংবিধানের প্রস্তাবনা’, ‘মৌলিক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা’ ‘জনস্বাস্থ্য ও নৈতিকতা’ এবং ‘জাতীয় সংস্কৃতি’ শীর্ষক অনুচ্ছেদের সাথে- থার্টি ফার্স্ট নাইট তথা ভ্যালেন্টাইন ডে পালন সরাসরি সাংঘর্ষিক ও সংঘাতপূর্ণ’। পাশাপাশি মোঘল সংস্কৃতির দান পহেলা বৈশাখ পালনও প্রশ্নবিদ্ধ।সংবিধানের বহু গুরুত্বপূর্ণ ও বিশেষ স্পর্শকাতর অনুচ্ছেদের প্রেক্ষিতে ৯৫ ভাগ মুসলমানের এদেশে কোনভাবেই থার্টি ফার্স্ট নাইট ও ভ্যালেন্টাইন ডে পালিত হতে পারে না।পারেনা গরিবের রক্ত চোষক ব্র্যাকের ফজলে আবেদও ‘নাইট’ খেতাব গ্রহণ করতে। পারেনা তার  নামের সাথে ‘স্যার’ যুক্ত হতে। পাশাপাশি মোঘল সংস্কৃতির দান পহেলা বৈশাখ পালনও প্রশ্নবিদ্ধ।