মুনাফিক, কাজ্জাবে আ’যম, ছদ্মবেশী মোফ্তে মুবারক- ভন্ড তথাকথিত পীরে তরীক্বতের ছবি তোলা ও বে-পর্দা হওয়া সম্পর্কিত কু-কর্মের মনগড়া সাফাই গেয়ে প্রমাণ করলো, সে জলীলের ভাড়াটিয়া দালাল
আখেরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, রহমতুল্লিল আলামীন, নূরে মুজাস্সাম, ছহেবে মুত্তালে আলাল গাইব, হুজুর আকরাম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাদীস শরীফে “মুনাফিকের” যে সকল আলামত বা লক্ষণ উল্লেখ করেছেন তন্মধ্যে অন্যমত একটি আলামত হচ্ছে- “মিথ্যা কথা বলা।”
মিথ্যাবাদীকে আল্লাহ্ পাক শুধু অপছন্দই করেননা বরং সর্বদাই মিথ্যাবাদীর প্রতি লা’নত বর্ষণ করেন। তাই মহান আল্লাহ্ পাক পবিত্র কালামে পাকে ইরশাদ করেন, لعنة الله على الكاذبين.
অর্থাৎ- মিথ্যাবাদীদের উপর মহান আল্লাহ্ পাক-এর পক্ষ হতে লা’নত বা অভিসম্পাত।”
পাঠক! আপনারা হয়তো ইতোমধ্যেই জেনে গেছেন কে সেই মিথ্যাবাদী তথা কাজ্জাবে আ’যম। সে আর কেউ নয় সেই তথাকথিত ভন্ড পীরে তরীক্বত, সুন্নীয়তের খোলসে মুশাব্বিহা ফিরক্বার যোগ্য মুকাল্লিদ “عبد الذليل” তথা লাঞ্ছনার গোলাম।
ইতোপুর্বের কয়েকটি সংখ্যায় আমার লেখা “মতামতের” মাধ্যমে আপনারা প্রমাণ পেয়েছেন যে, সে একজন স্ব-ঘোষিত পীরে তরীক্বত তথা ভন্ড পীর এবং মুশাব্বিহা ফিরক্বার যোগ্য মুকাল্লিদ। আর অত্র “মতামতে” তাকে আপনারা দেখবেন একজন “মহা কাজ্জাব” তথা “চরম মিথ্যাবাদী ও হাক্বীক্বী ভন্ড রূপে।”
এই মিথ্যাবাদী ভন্ড পীর তার বিরূদ্ধে উত্থাপিত সত্য অভিযোগ গুলো খন্ডন করতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়ে অতঃপর ভিক্ষার হাত বাড়াল টঙ্গির এক ছদ্মবেশীর দিকে। তাতেও তার কলঙ্ক মোচন হলো না। অতঃপর সে স্মরনাপন্ন হলো, মাদারটেকের, নারায়ণগঞ্জের ও আড়াইহাজারের কুখ্যাত কিছু জাহিল মৌলভীর। এরপর সে আর কোন্ কোন্ মৌলভীকে ভাড়া করবে সেটাই এখন দেখার বিষয়। সে হাজারো মৌলভী ভাড়া করলেও তার কলঙ্ক মোচন তো হবেই না বরং তার লাঞ্ছনা বৃদ্ধি পাবে দিন দিন। যেমন, বৃদ্ধি পাচ্ছে ছদ্মবেশী মহা কাজ্জাব মোফতে মুবারকের কারণে।
পাঠক! এই কুখ্যাত মহা কাজ্জাব তার অখ্যাত ও অবৈধ বুলেটিনে লিখেছে, “মুহম্মদ ইবনে ইসহাক” নাকি “দরূদ শরীফের সংকেত ও সংক্ষেপের ব্যাপারে নিশ্চুপ রয়েছে।” সে যে আসলেই “মহা কাজ্জাব” এ বক্তব্যটিই তার জ্বলন্ত প্রমাণ। কারণ শুধু দরূদ শরীফের “সংকেত ও সংক্ষেপ” সংক্রান্ত বিষয়েই নয় বরং মহা কাজ্জাব মুবারকের প্রতিটি লাইনের দাঁত ভাঙ্গা জাওয়াব দেয়া হয়েছে অনেক পূর্বেই। সে তা খন্ডন করতে পারবেনা ভেবেই মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে এবং দেখেও না দেখার ভান করে বলছে, “মুহম্মদ ইবনে ইসহাক নিশ্চুপ কেন?”
পাঠক! আমি যে উক্ত জাহিল ও মহা কাজ্জাবের প্রতিটি বক্তব্যের খন্ডনমূলক জাওয়াব দিয়েছি তার প্রমাণ “মাসিক আল বাইয়্যিনাত।” আপনারা মাসিক আল বাইয়্যিনাত-এর ৮৬ ও ৮৭তম সংখ্যা দু’টো খুলে দেখুন। “মতামত বিভাগে” “ভন্ড পীর, জাহিল, অদক্ষ জলীল নিজেই প্রমাণ করলো সে কাফির” শিরোনামে একটি মতামত রয়েছে। সেখানে দরূদ শরীফের “সংকেত ও সংক্ষেপসহ” প্রতিটি বিষয়েরই জাওয়াব রয়েছে। প্রমাণস্বরূপ ৮৭তম সংখ্যার মতামত থেকে কিছু অংশ হুবহু উল্লেখ করা হলো- “……..পাঠক! ছদ্মবেশী মোফ্তে মুবারক সংক্ষিপ্তভাবে দরুদ শরীফ লিখার ক্ষেত্রে শাক দিয়ে মাছ ঢাকার অপচেষ্টা করেছে। সে “সংক্ষেপ” আর “সংকেত”-এর অজুহাত দেখিয়ে রেযা খাঁ প্রদত্ত কুফরী ফতওয়া থেকে রেহাই পেতে চেয়েছে। তার বক্তব্য হলো কুফরীবার্তায় দরুদ শরীফ সংক্ষেপে লেখা হয়না। বরং (দঃ) দিয়ে সংকেত বা ইশারা দেয়া হয়।
কিন্তু এটা যে আরো অধিক ‘সংক্ষেপ’ এ অনুভূতি কিন্ত তাদের নেই। কারণ এর দ্বারা সে সম্পূর্ণ দরুদ শরীফই তরক করলো। শুধু তাই নয়, সে সংকেতকেও সংক্ষেপ করলো, (দরুদ শরীফ) না লিখে (দঃ) লিখলো। কাজেই এটাও এক প্রকার সংক্ষেপ। কেননা উক্ত (দঃ) দ্বারা দরুদ শরীফকেই বুঝানো হয়েছে।
সে লিখেছে “দরুদ শরীফের সংক্ষেপ করা হারাম কিন্তু সংকেত দেয়া উত্তম।” তার একথার দলীল কোথায়? নির্ভরযোগ্য কোন কিতাব থেকে সে দলীল পেশ করতে পারবে কি? যদি সে সত্যবাদী হয়ে থাকে তবে যেন পরবর্তী সংখ্যায় তার দলীল পেশ করে।
সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো- ভন্ডপীর অদক্ষ জলীল ছদ্মবেশী মোফ্তে মুবারক লিখেছে- “…. একইভাবে সংক্ষিপ্তকরণ অবশ্যই দোষণীয়। কিন্তু কুফরীবার্তায় কি এরূপে কোন স্থানে লেখা হয়েছে? হয় নাই। সুতরাং ঐ ফতওয়া কুফরীবার্তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।” ……..
মোফ্তে মুবারক যে দাবী করেছে, তার সে দাবী সম্পূর্ণই মিথ্যা, আর উক্ত ফতওয়া কুফরীবার্তার ক্ষেত্রে অবশ্যই প্রযোজ্য। কারণ সুন্নীবার্তা ওরফে কুফরী বার্তার ১০-১১ নং বুলেটিনের ১৭ পৃষ্ঠায় দরুদ শরীফ “صلعم” দ্বারা সংক্ষেপে লেখা হয়েছে। আর তার রেযা খাঁর লিখিত “মজমুয়ায়ে রাসায়েল” এর বর্ণনা মতে “صلعم” দ্বারা দরুদ শরীফ সংক্ষেপ করা কুফরী। কাজেই উদোর পিন্ড বুদোর ঘাড়ে নয়, বরং রেযা খাঁর পিন্ড (ফতওয়া) জোলার (জলীলের) ঘাড়ে।
পাঠক! মিথ্যা বলতে যে অভ্যস্ত, সেই মহাকাজ্জাব অদক্ষ জলীল ছদ্মবেশী মোফ্তে মুবারক সর্বশেষ যে মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছে, তাহলো- সে লিখেছে, “আল বাইয়্যিনাত-এর ৮৩নং সংখ্যায় ৩য় পৃষ্ঠায় রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর ছাহেব ক্বিবলা নাকি কুরআনের আয়াত শরীফকে বাংলায় সংক্ষিপ্ত করেছেন (রাঃ) দ্বারা।”
অথচ মাসিক আল বাইয়্যিনাত-এর ৮৩তম সংখ্যার ৩য় পৃষ্ঠায় এ ধরণের কোন আয়াত শরীফই উল্লেখ নেই।
গন্ডমূর্খ জলীল- ছাহাবী হযরত আবু উসাইদ “রদিয়াল্লাহু আনহু”-এর নাম মুবারকের পরে ব্যবহৃত (রাঃ) কেই কুরআনের আয়াত সংক্ষিপ্তকরণ বলেছে। অথচ কুরআন শরীফের আয়াত হচ্ছে। “رضى الله عنهم” রদিয়াল্লাহু আনহুম”- আর সেখানে লেখা হয়েছে “رضى الله عنه” রদ্বিয়াল্লাহু আনহু।”
কাজেই এটা কি করে কুরআন শরীফের আয়াত হলো? তবে কি গোমরাহ জলীলের মতে “রদিয়াল্লাহু আনহু” কুরআন শরীফের আয়াত? যদি সে এটাই মনে করে থাকে তবে তো সে নাম্বারবিহীন কাফির। কারণ সে কুরআন শরীফের আয়াত শরীফই পরিবর্তন করে ফেলেছে। (৮৭তম সংখ্যার বক্তব্য শেষ)
পাঠক! মাসিক আল বাইয়্যিনাত-এর বর্তমান সংখ্যাটি হচ্ছে ৮৯তম সংখ্যা। অর্থাৎ আরো দুই সংখ্যা পূর্বেই “মহা কাজ্জাব মুবারকের” বক্তব্যের জবাব দেয়া হয়েছে। অথচ সে নির্লজ্জের মত লিখলো “মুহম্মদ ইবনে ইসহাক লা জাওয়াব।” আসলে সে আমার উক্ত খন্ডনমূলক বক্তব্য খন্ডন করতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েই মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছে এবং জনসাধারণের সাথে চরম প্রতারণা করেছে। সে প্রমাণ করেছে আসলে সে প্রতারক ও মহা কাজ্জাব। (চলবে)
-মুফতী মুহম্মদ ইবনে ইসহাক, বাসাবো, ঢাকা।
ইমামে রব্বানী, মাহবুবে সুবহানী, গাউসে সামদানী, আফজালুল আউলিয়া, হযরত মুজাদ্দিদে আলফে ছানী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার বিশ্ব বিখ্যাত কিতাব “মাকতুবাত শরীফ-এ” উল্লেখ করেছেন, “বিশ্ববাসীর জুলুম, অত্যাচার ও নিন্দাবাদ ‘সূফী’ সম্প্রদায়ের জন্য একটি সৌন্দর্য্য এবং মরিচা পরিস্কারক বা বেরীতুল্য।”
উল্লেখ্য, আউলিয়ায়ে কিরামগণ উনারা যিনি খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক উনার পক্ষ হতে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ তথা ইলহাম-ইলকা প্রাপ্ত হয়ে মুসলিম উম্মার হিদায়েতের আঞ্জাম দিয়ে যান। দুনিয়াদার আলিমদের স্বার্থে আঘাত লাগে ফলে তারা তাদের বিরোধীতায় অবতীর্ণ হয়। যদিও দুনিয়াদার আলিম সম্প্রদায় নায়েবে নবীগণ উনাদের কোন ক্ষতি করতে পারেনা বরং এই বিরোধীতার উনাদের সৌন্দর্য ও মর্যাদা বৃদ্ধি এবং সুন্নত আদায়ের কারণ হয়ে থাকে।
প্রসঙ্গত : উল্লেখ্য, আমিরুল মু’মিনীন, খলিফাতুল মুসলিমনী, সাইয়্যিদুশ শুহাদা, সুলতানুল মাশায়িখ, আওলাদে রসূল হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার বিশিষ্ট মুরীদ ও খলীফা ছহেবে কারামত, ফক্বীহুল আছর, সুলতানুল উলামা ওয়াল মাশায়িখ, হযরত মাওলানা কারামত আলী জৌনপুর রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বর্ণনা করেন, “একদা আমি জৌনপুরের কোন একটি গলির ভিতর দিয়ে পথ চলতেছিলাম। একজন বৃদ্ধা স্ত্রীলোক কতগুলো হাঁড়ি-পাতিল ধোয়ার জন্য ঘর হতে বের হলো। এমতাবস্থায় আমাকে দেখে তার একটি পাতিল আমার মাথায় ছুড়ে মারলো এবং বললো, ‘এ লোকটি তো সেই নতুন মৌলভী যে দিনের বেলায় আযান দিয়ে থাকে।”
উল্লেখ্য যে, ইতোপূর্বে জৌনপুর ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় শুধু ফযর, মাগরিব ও ইশার আযান দেয়ার প্রচলন ছিল। কিন্তু জোহর ও আছর নামাযের আযানের প্রচলন ছিল না। পরে হযরত মাওলানা কারামত আলী জৌনপুরী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি জোহর ও আছর নামাযের আযান দেয়ার ব্যবস্থা করেন। কিন্তু এ নির্বোধ লোকগুলো ধর্মীয় বিধান সম্পর্কে অজ্ঞ থাকার ফলে জিহালত বশত: উনার প্রতি নানা প্রকার মিথ্যা অপবাদ আরোপ করে উনাকে দুঃখ-যন্ত্রনা ও আঘাতে জর্জরিত করে তোলে।
প্রিয় পাঠক! উক্ত নির্বোধ ও জাহিল বৃদ্ধা মহিলার চেয়েও আহমদ রেযা খা অধিক নির্বোধ ও জাহিল। কারণ, বৃদ্ধা মহিলা ইলমের অভাবে মূর্খ হওয়ার কারণে মূর্খতাবশত: মাওলানা কারামত আলী জৌনপুরী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে বুঝতে না পেরে বিরোধীতায় লিপ্ত হয়েছিল। আর আহমদ রেযা খা আলিম দাবী করে লোকদেরকে ধোকা দিয়েছে। কারণ হযরত কারামত আলী জৌনপুরী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি যে হিদায়েতের কাজ করেছিলেন সেটা তিনি হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার থেকেই পেয়েছিলেন। আর তখনকার মানুষ দিনের আযান শুনে অভ্যস্ত ছিল না। অর্থাৎ দিনের নামায মানুষ পড়তনা। আমীরুল মু’মিনীন, হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার থেকেই পেয়েছিলেন। আর তখনকার মানুষ দিনের আযান শুনে অভ্যস্ত ছিল না। অর্থাৎ দিনের নামায মানুষ পড়তনা। আমীরুল মু’মিনীন, হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার হিদায়েতের ক্ষেত্র ছিল তার চেয়েও বেশি গোমরাহী ও শিরক-বিদয়াতপূর্ণ। আর সে রকম একটি বেশরা অবস্থা থেকে উম্মাহকে খাঁটি দ্বীনের পথে এনে বেমেছাল তাজদীদ করেছিলেন আমীরুল মু’মিনীন হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি। তা সত্ত্বেও উনাকে কাফির ফতওয়া দিয়ে উনার প্রতি গুরুতর অন্যায় ও পীড়াদায়ক আচরণ করেছে আহমদ রেযা খা। যা রেযা খাকে তাছাউফ শুন্য নাক্বেছ ও দুনিয়াদার হিসেবে প্রমাণিত করেছে। পক্ষান্তরে এই বিরোধীতা আমীরুল মু’মিনীন হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সৌন্দর্য্য বৃদ্ধি করেছে।
-মুফতী মুহম্মদ আব্দুল হালীম ত্বাহেরী, কুড়িগ্রাম।
হে সন্ত্রাসী তথা মুসলমানদের ঈমান-আমল বিধ্বংসী তরজুমান! তোমার চিঠির জবাব দেয়ার পূর্বে তোমাকে শুনাতে চাই জ্বগতখ্যাত কবি ও বুযুর্গ আল্লামা শেখ সা’দী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর অমর গ্রন্থ “গোলেস্তা” কিতাবের একখানা শে’র। যেখানে তিনি লিখেছেন
اذا يئس الانسان طال لسانه.
অর্থাৎ- “মানুষ যখন সব দিক থেকে নিরাশ হয়ে যায় তখন তার জবান দারাজ হয়ে যায়,” অর্থাৎ মুখে যা আসে তাই বলে, কলমে যা আসে তাই লিখে কিন্তু তার শেষ পরিণাম ফল চিন্তা করেনা।
তোমার অবস্থাও যে তাই হয়েছে, তোমার কথিত আ’লা হযরত(?) রেযা খাঁ কুফরীর ফান্দে পড়ে গেছে। ফান্দ থেকে ছাড়া পাওয়ার কোন রাস্তা খুজে না পেয়ে নিরাশ হয়ে জবান দারাজী শুরু করে দিয়েছো। আবোল-তাবোল লিখে নিজেদের জিহালতীর অবশিষ্টটুকুও প্রকাশ করে দিচ্ছ। আর না করেই বা তোমার উপায় কি? তুমি যে ফান্দে পড়ে গেছ। আর কথায় তো বলে “ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দে।”
তোমাকে আরো কাঁদতে হবে, কতদিন যে, কাঁদতে হবে তা আল্লাহ্ পাকই ভাল জানেন। তবে সময়মত তওবা করে যদি কুফরী থেকে ফিরে আসো তবেই শুধু সেই ফান্দ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। তোমার জন্য আমার পক্ষ থেকে এই দোয়াই রইল।
হে সন্ত্রাসী বোমাবাজ তরজুমান! তোমাকে প্রথমেই একটি কথা বলে নেয়া জরুরী, আর তা হলো-তুমি যদিও আমাকে দোস্ত বলে সন্মোধন করেছো, কিন্তু আমি তা পারছিনা, কারণ তুমি যে একজন সন্ত্রাসী ও বোমাবাজ তথা মুসলমানদের আক্বীদা-আমল বিধ্বংসী অস্ত্র হিসেবে চিহিৃত ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী হিসেবে মশহুর হয়ে গেছ। কোন ভদ্রলোক কি এধরণের একজন সন্ত্রাসীকে দোস্ত বলতে পারে? অন্য কারো পক্ষে তা সম্ভব হলেও আমার পক্ষে তা সম্ভব নয়। এবার আসো, পর্যায়ক্রমে তোমার চিঠির জবাব নাও।
প্রসঙ্গঃ ছানী আযান
(দ্বিতীয় অংশ)
ওহে সস্ত্রাসী, বোমাবাজ, ফিৎনাবাজ তরজুমান! আমি নিশ্চিত যে, ইতোমধ্যেই তোমার “খোলা চিঠির” জবাবের প্রথম অংশ তোমার হাতে পৌঁছে গেছে। জবাবের একেবারে শেষ দিকে তোমাকে একটি প্রশ্ন করেছিলাম, তুমি তা লক্ষ্য করেছ কি? ও! তোমার তো আবার স্মরণ শক্তি খুব কম। আর স্মরণ শক্তি কম বলেই তো ছাহাবীগণকে “তাবেয়ী” আর তাবেয়ীগণকে “ছাহাবী” বানিয়ে ফেলেছ! ব্যাপারটি বোধ হয় তুমি এখনো বুঝে উঠতে পারনি। তাহলে আরেকটু খোলাছা করেই বলছি, কেননা তুমিতো আবার একেবারে খোলাছা করে না বললে উল্টো বুঝে থাক। তুমি লিখেছ- “দরজার ঐ আযানটি প্রিয়নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও ইমাম আবু হানীফা ও ইমাম আবূ ইউসূফ রদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা ……।”
ওহে সন্ত্রাসী তরজুমান! তোমার জন্য আমার আফসুস হয়না, কারণ তোমার না হয় স্মরণ শক্তি কম অর্থাৎ ব্রেইন খুব ডাল, তাই তুমি বিশিষ্ট ছাহাবী আফজালূন নাছ বা’দাল আম্বিয়া হযরত আবূ বকর ছিদ্দীক রদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহুকে ইমাম আবূ হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি আর হযরত ওমর ফারুক রদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহুকে ইমাম আবূ ইউসুফ বানিয়ে ফেলেছ। কিন্তু তোমাকে যারা খুব কৌশলে সন্ত্রাসী, বোমাবাজী ও আক্বীদা-আমল বিধ্বংসী কর্মকান্ডে হর-হামেশা মদদ যোগায় তাদের জন্য আমার আফসুস হয়। কারণ তারা এতই জাহেল ও গন্ড মুর্খ যে, এতবড় মারাত্মক ভুলও তাদের নজরে পড়েনা। আর একারণেই তোমার “খোলা চিঠিতে” উক্ত ভুলসহ আরো অসংখ্য ভুলের সমাবেশ ঘটেছে। একটা একটা করে সব জানতে পারবে। কাজেই অস্থির হওয়ার কোন কারণ নেই। যাক, এবার মূল আলোচনায় আসি। তবে আমার এবারের আলোচনা সম্মানিত ও হক্বতালাশী পাঠকগণকে নিয়ে। দয়া করে পাঠকগণ এদিকে একটু মনযোগ দিবেন বলে আমি আশাবাদী। আমার চিঠির শেষ প্রান্তে বোমাবাজ-তরজুমানের প্রতি প্রশ্ন ছিল- “….. আসলে তোমার মতলবটা কি?”
পাঠক! তরজুমানের “মতলবটা” আপনারা বুঝে উঠতে পেরেছেন কি? আসলে তার মতলবটা হলো পরিস্কার পরিচ্ছন্ন পানিকে ঘোলা করে তাতে মাছ শিকার করা। আর এটা গাধারও একটা স্বভাব- তাই তো কথায় বলে, “গাধা পানি খায় তবে ঘোলা করে খায়।”
পাঠক! বিষয়টি একটু ভাল করে খেয়াল করুন। দেখুন ফিৎনাবাজ তরজুমান কিভাবে ফিৎনার জাল বিস্তার করেছে। মাসিক আল বাইয়্যিনাত-এর ৮৫ তম সংখ্যার ৩১ পৃষ্ঠায় লেখা হয়েছে। “হযরত উছমান জুননূরাইন রদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহুর পূর্বে ছানী আযান বলতে কোন আযানই ছিলনা।” অর্থাৎ বর্তমানে যেরূপ দুটি আযানের ব্যবস্থা রয়েছে একটি বাইরে ও অপরটি মসজিদের ভিতরে তদ্রুপ হযরত উছমান রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর পূর্বে ছিলনা। অথচ এই সহজ বক্তব্যটির অপব্যাখ্যা করে ‘তরজুমান’ লিখলো, আল বাইয়্যিনাত নাকি হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সময়কার আযানটিকে অস্বীকার করেছে। (নাউযুবিল্লাহি মিন যালিক) অথচ মাসিক আল বাইয়্যিনাত-এর উক্ত সংখ্যাতেই সুষ্পষ্টভাবে হাদীস শরীফের ইবারত উল্লেখ সহ লেখা হয়েছে যে, “হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আবু বকর ছিদ্দীক ও হযরত ওমর রদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা-এর সময়ে জুমুয়ার দিনেও একটি মাত্র আযান জারী ছিল।” এতস্পষ্ট করে বলে দেয়ার পরও ফিৎনাবাজ তরজুমান কি করে বলতে পারলো যে, আল বাইয়্যিনাত হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সময়কার আযানটিকে অস্বীকার করেছে?
তাছাড়া মাসিক আল বাইয়্যিনাত এর কোথাও তো একথা বলা হয়নি যে, হযরত ওছমান যুননুরাইন রদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু-এর পূর্বে কোন আযানই ছিলনা! যদি একথা বলা হতো তবেই প্রমাণিত হতো যে, আল বাইয়্যিনাত হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সময়কার আযানকে অস্বীকার করেছে। বরং আল বাইয়্যিনাতে বলা হয়েছে ……ছানী আযান বলতে কোন আযান ছিলনা।” মাসিক আল বাইয়্যিনাত-এর উক্ত বক্তব্যের সমর্থন পাওয়া যায় আবূ হানীফায়ে ছানী ইমাম ইবনে নজীম মিছরী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর জগতখ্যাত ফিক্বাহের কিতাব “বাহরুর রায়েক” এর ২য় জিঃ ১৫৬ পৃষ্ঠায়। সেখানে তিনি প্রায় একই কথা বলেছেন। যেমন তিনি লিখেছেন-
اذان الثانى الذى يكون بين يدى المنبر لانه لم يكن فى زمانه عليه السلام-
অর্থঃ- “ছানী আযান যা মিম্বরের সম্মুখে বা সন্নিকটে দিতে হবে, কেননা হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সময় তা অর্থাৎ ছানী আযান ছিলনা।”
এবার ফিৎনাবাজ গন্ডমূর্খ তরজুমানের নিকট প্রশ্ন তবে তরজুমানের মতে জগতখ্যাত ইমাম ও ফক্বীহ যাকে “আবূ হানীফায়ে ছানী” লক্ববে ভূষিত করা হয়েছে, তিনি কি হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সময়কার আযানকে অস্বীকার করেছেন? কিতাবের সাথে যাদের সম্পর্ক নেই যারা নিজ মুরুব্বীদের লিখিত লা মু’তাবার ও লা মাশহুর কিছু চটি রেসালা পড়ে ফতওয়াবাজী করে তাদের পক্ষেই সম্ভব ইমামদের প্রতি এধরণের জিহালত পূর্ণ মন্তব্য করা।
পাঠক! “হযরত উছমান রদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু-এর পূর্বে ছানী বলতে কোন আযান ছিলনা” একথার অর্থ যদি তরজুমানের মতে এটাই হয় যে, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সময় শুধুমাত্র “ইকামত” দিয়ে নামায পড়া হতো। তবে তরজুমানের বক্তব্য মোতাবিক এটাই প্রমাণিত হয় যে, হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহুমগণ “ইক্বামতকে” অস্বীকার করেছেন, কেননা ছাহাবী হযরত সাইব ইবনে ইয়াযীদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেছেন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও হযরত আবু বকর ও হযরত ওমর রদ্বিয়াল্লাহু আনহুম-এর সময় একটি মাত্র আযান ছিল। অথচ তরজুমান নিজেই স্বীকার করেছে ইক্বামতকেও আযান বলা হয়। তাহলে কি তরজুমানের মতে ছাহাবী হযরত সাইব ইবনে ইয়াযীদ রদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু “একটি মাত্র আযান ছিল” একথা বলে “ইক্বামতকে” অস্বীকার করেছেন?
সাথে সাথে তাদেরকে এটাও বলতে হবে যে, রেযা খাঁর মতে ইক্বামত মসজিদের দরজায় দেয়া সুন্নত। কারণ তারাই তরজুমানে লিখেছে-“রেযা খাঁর মতে ছানী আযান মসজিদের দরজায় দেয়া সুন্নত।” আর তারাই স্বীকার করেছে “ইক্বামত” হচ্ছে দ্বিতীয় (ছানী) আযান। তাই উছমান রদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু-এর আযানকে তৃতীয় বলা হয়েছে।
পাঠক! তরজুমানের মতে “ইক্বামত” যদি দ্বিতীয় আযান হয়। আর রেযাখাঁর মতে দ্বিতীয় আযান যদি মসজিদের দরজায় দেয়া সুন্নত হয় তবে কি এটাই প্রমাণিত হয়না যে, রেযাখাঁর মতে “ইক্বামত” মসজিদের দরজায় দেয়া সুন্নত। এমন উদ্ভট ফতওয়া কেউ কোন দিন শুনেছে কি?
কাজেই তরজুমান যদি মাসিক আল বাইয়্যিনাত-এর সহজ সরল বক্তব্যকে স্বেচ্ছায় ঘোলাটে বানিয়ে মনগড়া অপব্যাখ্যা করে বলে যে, আল বাইয়্যিনাত হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সময়কার আযানটিকে অস্বীকার করেছে। তবে তরজুমানের দেয়া ব্যাখ্যা অনুযায়ী তারা নিজেরাই প্রমান করলো যে, হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহুমগণ “ইক্বামতকে” অস্বীকার করেছেন (নাউযুবিল্লাহ)। সাথে সাথে এটাও প্রমাণ করলো যে, তাদের মুরুব্বী রেযাঁখার মতে ইক্বামত মসজিদের দরজায় দেয়া সুন্নত। আর এমতে বিশ্বাসী হওয়া নিঃসন্দেহে গোমরাহীর নামান্তর।
ওহে বোমাবাজ তরজুমান! তুমি আল বাইয়্যিনাত-এর জন্য গর্ত খুঁড়তে গিয়ে সে গর্তে নিজেই কুপোকাত। এর ফাঁকে কি আমি বলতে পারিনা? “ধরা পড়ে গেছে বেচারা তরজুমান নিজেরই পাতা জালে।” (হে সন্ত্রাসী! অপেক্ষায় থেকো)
-মুহম্মদ নুরুল ইসলাম, চিলমারী, কুড়িগ্রাম।
কাহিনীটি ‘ইটগড়দা’ কিতাবের। নামটা ভারী অদ্ভূত হলেও তা দিয়েই চমক সৃষ্টি করেছিল চতুর মাওলানা। প্রতিপক্ষ সহজ, সরল গ্রাম্য মাওলানা যখন সত্যবাহী কিছু দলীলের উদ্বৃতি দিয়ে সঠিক ফতওয়া প্রচার করছিলেন তখন স্বার্থান্বেষী চতুর মাওলানা বাহাছের কথা বলে নির্দিষ্ট দিনে হাজির হলো। আর তার পিছনে ভারবাহী গাড়ীতে আসল কাপড়ের মোড়কে বাধা ইয়া বড় এক স্তুপ। সহজ, সরল গ্রামবাসীর অবাক জিজ্ঞাসু দৃষ্টিকে অবজ্ঞা প্রদর্শন করে চতুর মাওলানা সদম্ভে ঘোষণা করতে লাগলো, এটা হচ্ছে ‘ইটগড়দা’ কিতাব। এই কিতাবে লিখা আছে, আমার কথাই সত্য আর গ্রাম্য ইমাম যা বলছে তার পুরোটাই ভুল।
সাধারণের মাঝে তৎকালে কিতাবের ওজন এবং আকৃতিই কিতাব মূল্যায়ণের একটা বড় মাপকাঠি বিবেচিত হত বিধায় সহজ সরল গ্রামবাসী তার কথায় এবং কিতাবের আকৃতি দর্শনে অভিভূত হয়ে পড়ল এবং সকলেই এক বাক্যে তার ফতওয়া স্বীকার করে নিল।
‘ইটগড়দা’ কিতাবের কাহিনীর ইতি এখানেই হতে পারত, কিন্তু সোৎসাহী জনতার উত্তাল জোয়ার স্তিমিত হবার পর দু’জন বিচক্ষণ ব্যক্তির জেরার মুখে মাওলানা অবশেষে কিতাব খুলতে বাধ্য হলেন। ‘ইটগড়দা’ কিতাবের প্রকৃতি তখন উন্মোচিত হলো। দেখা গেল বিশেষ রকমের ইট দ্বারা সেটাকে কিতাবের আকৃতি দেয়া হয়েছে। এবং চতুর মাওলানার বক্তব্য একস্থানে খোদাই আছে বটে তবে লেখকের যে নাম খোদাই করা দেখতে পাওয়া গেল তা ঐ চতুর মাওলানারই নাম বটে।
পাঠক! এই ‘ইটগড়দা’ কিতাবের বৃত্তান্তের মতই সহজ-সরল মুসলমানদের বিভ্রান্ত করে নিজেদের মনগড়া মিথ্যাকে সত্য বানানোর অপচেষ্টায় তৎপর রয়েছে কথিত আহমদ রেযা খাঁ তথা তরজুমান গং।
তের শতকের মুজাদ্দিদুয্যামান, আওলাদে রসূল, আমীরুল মু’মিনীন, মুজাহিদে আযম, হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর নামে রেযা খানী গং নিজেরা একের পর এক মিথ্যা মনগড়া কিতাব লিখে সেটাকেই বর্তমানে তার বিরুদ্ধে দলীলরূপে পেশ করে ‘ইটগড়দা’ কিতাবের কাহিনীর পুনঃদৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
এ প্রেক্ষিতে তাদের জুলাই-আগষ্ট/২০০০ ঈসায়ী সংখ্যায় উল্লেখিত “আশশেখ মুহম্মদ বিন আব্দুল ওহাব …..” কিতাবের উদ্বৃতি যে বর্ণিত বক্তব্য মোতাবিকই কত ভ্রান্ত ও স্ব-বিরোধী তা এ কলামে গত সংখ্যায় লিখা হয়েছিল।
এরপর তাদের বিবৃত প্রিন্সিপাল মৌলভী আব্দুল মান্নান মুজাদ্দেদীর লিখিত “সূফী নূর মুহম্মদ নিজামপুরীর জীবনী” থেকে উদ্বৃত “সৈয়দ আহমদ বেরেলভী (রহমতুল্লাহি আলাইহি) মক্কা হতে ওহাবী প্রেরণা লাভ করে।” এই লাইন যে তারা লিখেছে, তার প্রেক্ষিতে বলতে হয়, তারা নূর মুহম্মদ নিজামপুরী রহমতুল্লাহি আলাইহিকে বড় ওলী আল্লাহ্ জানে এবং মানে। বক্ষ্যমান বিবৃতিতেও সুফী শব্দটির সংযোজন তারই প্রমাণ। এখন কথা হচ্ছে, এই সূফীর জন্মদাতা কে? জাহিল তরজুমান গং কি এটা জানে যে, সূফী নূর মুহম্মদ নিজামপুরী রহমতুল্লাহি আলাইহি সরাসরি আমীরুল মু’মিনীন হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এরই খলীফা।
একইভাবে বলতে হয়, রেযা খানী গং এর অন্যতম হোমরা-চোমরা তথাকথিত অতি সুন্নী মাওলানা রেদওয়ানুল হক ইসলামাবাদী কৃত ‘নজ্দী পরিচয়’ গ্রন্থে আমীরুল মু’মিনীন হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি সম্পর্কে যে বিকৃত কল্পকাহিনী রচনা করা হয়েছে তা এই লিখার প্রথমে বর্ণিত ‘ইটগড়দা’ কিতাবের কাহিনীকেও হার মানায়।
অতএব, সঙ্গতকারণেই জুলাই-আগষ্টের তরজুমানে এদের বরাত দিয়ে যে দলীল দেয়া হয়েছে তা যেমন সত্যের মাপকাঠিতে টিকেনা তেমনি টিকেনা তরজুমানের অন্যান্য সংখ্যাগুলোতে একইভাবে বর্ণিত। অন্য সব কিতাবের দলীলও। সংখ্যায় সেগুলো যতই হোক না কেন মূল্যায়ণের মাপকাঠিতে সেগুলো সবই ‘ইটগড়দা’ কিতাবেরই পুনরাবৃত্তিমাত্র।
পাশাপাশি আরো উল্লেখ্য যে, রেজা খানীদের চিরন্তন অভ্যাস হলো, কিতাবের ইবারত কারচুপি এবং উদ্দেশ্যমূলকভাবে সুবিধাবাদী বক্তব্য গ্রহণ বা প্রদান। তারা শহীদে আযম হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর ব্যাপারে কারামত আলী জৌনপুরী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর “যখীরায়ে কারামতের” কথা উল্লেখ করেছে। অথচ “যখীরায়ে কারামতে” হাদীয়ে জামান, হযরত কারামত আলী জৌনপুরী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন,
“হযরত মুর্শিদে বরহক আমীরুল মুমিনীন, সাইয়্যেদ আহমদ (কুঃ রূঃ) মুজাদ্দিদ হওয়ার নিদর্শন এবং তাঁহার তরীক্বা মুহম্মদীয়া নাম রাখার কারণ এবং গুরুত্বপূর্ণ ফায়দার বর্ণনা
এই সমস্ত বিষয়গুলি আমি চারটি ফায়দার মধ্যে বর্ণনা করিব ইনশাআল্লাহ্ তায়ালা।
“………….. সুতরাং সত্য খবরদাতার সত্য খবর অনুযায়ী প্রত্যেক শতাব্দীর শেষে একজন মোজাদ্দেদ হইতেছে এবং দ্বীনকে নূতনভাবে জীবিত করিতেছে (আল্লাহ্ তাঁহাদের উপর রহমত বর্ষণ করুন)। এখন তেরশত হিজরীর মাথায় হযরত আমীরুল মুমেনীন সাইয়্যেদ আহমদ (রঃ) জন্মগ্রহণ করেন এবং দ্বীনকে নূতন ও জীবিত করেন। এই বিষয়ে সমস্ত ওলামায়ে আখেরাত এবং আরেফীন লোক খুব ভালভাবেই জ্ঞাত আছেন এবং লোকদের নিকট বর্ণনাও করিয়া থাকেন তবুও কিছু নিদর্শন এখানে বর্ণনা করা খুবই প্রয়োজন, যাহাতে সাধারণ লোক এবং বিশেষ বিশেষ লোকেরা এই ব্যাপারে জানিতে পারে। সুতরাং সাধারণ লোকদেরকে জ্ঞাত করাইবার জন্য এই কথার দিকে লক্ষ্য করাইতে হইবে যে, হযরত মুর্শিদে বরহক এই দেশকে শিরক এবং কুফরীর রুছুম এবং কাফেরদের উৎসবে অংশগ্রহণ এবং বেদ্আত, ফেছক ও ফুজুর হইতে লোকদিগকে পবিত্র করিয়াছেন।
– মুফতী মুহম্মদ নেয়ামত মাওলা।
হযরত শায়খ সোহ্রাওয়ার্দী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, “নৈকট্য দু’প্রকার, ‘কুরবুন নাওয়াফেল’ এবং ‘কুরবুল ফারায়েজ।’ ‘কুরবুন নাওয়াফেল’ দ্বারা বাশারিয়াতের সিফত দূরীভূত হয়ে আল্লাহ্ পাক-এর সিফত তার উপর প্রকাশিত হতে থাকে। এমনকি তখন সে আল্লাহ্ পাক-এর আদেশে জীবিত ও মৃত করতে পারে এবং তার সমস্ত শরীর দ্বারা দেখতে ও শুনতে পায়। তার দেখা ও শুনার কাজ শুধু চোখ ও কানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনা। তখন সে দূর হতে দেখতে ও শুনতে পায়।”
মুহম্মদ আনোয়ার কাশ্মীরী ছাহেব তাঁর কিতাব “ফায়জুল বারী”-এর ৪র্থ জিঃ ৪২ পৃষ্ঠায় উপরোক্ত বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়েছেন যে, “কুরবুন নাওয়াফেল” লাভকারী ব্যক্তির শুধু শরীর এবং অবয়ব ছাড়া আর কিছুই থাকে না, আল্লাহ্ পাক নিজেই তার কর্মকর্তা হয়ে যান। এরূপ অবস্থাকে সূফী-দরবেশগণ “ফানা ফিল্লাহ্” বলে থাকেন।”
মূলতঃ যখন কোন বান্দা “কুরবে ফারায়েজ” এবং “কুরবে নাওয়াফেল” দ্বারা আল্লাহ্ পাক-এর এরূপ নৈকট্য লাভ করে যে, আল্লাহ্ পাক-এর তাজাল্লী তার দৃষ্টি শক্তি ও শ্রবণশক্তি হয়ে যায়, তখন তার জ্ঞান লাভের পথে সৃজিত স্থান, কাল ইত্যাদি কোন কিছুর দূরত্ব কোন প্রকার অন্তরায় হতে পারে না। উদাহরণতঃ বেতার মোবাইল ফোন অথবা অন্য কোন বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ার সাহায্যে যদি সুদূর আমেরিকা, ইংল্যান্ড বা দুনিয়ার অন্যান্য স্থানের সংবাদ মুহুর্তের মধ্যে সংগ্রহ করে তা জানা যেতে পারে তাহলে আল্লাহ্ পাক-এর তাজাল্লী যার “ক্বালবের” উপর সর্বক্ষণ বিদ্যমান সে তাজাল্লীর বদৌলতে দুনিয়ার সব জ্ঞান অর্জন নিমিষেই তার পক্ষে সম্ভব। বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ার যে জ্ঞান রয়েছে তাও আল্লাহ্ পাক প্রদত্ত জ্ঞানই বটে, কিন্তু তা প্রত্যক্ষ জ্ঞান নয়। আর আল্লাহ্ পাক-এর তাজাল্লীর সাহায্যে অর্জিত জ্ঞান হলো, প্রত্যক্ষ জ্ঞান।
শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্ মুহাদ্দিস দেহলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর “তাফহীমাত” কিতাবের ২য় খন্ডের ৭৭ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন, “আমার নিকট যে জ্ঞান আছে তা আকাশ-পাতাল, সমুদ্র ও তার কুল ধারণ করতে পারেনা।” আর অনেক আউলিয়া-ই-কিরামই এরূপ উক্তি করেছেন। আবূ বায়জিদ বোস্তামী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন, “তোমরা মৃতের নিকট হতে মৃত জ্ঞান অর্জন করে থাক। আমরা চির জীবন্তের নিকট হতে জীবন্ত জ্ঞান অর্জন করে থাকি।”
উল্লেখ্য, আমীরুল মু’মিনীন, শহীদে আযম হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি মূলতঃ এ ধারাবাহিকতায় বেমেছাল জ্ঞান তথা ইল্মে লাদুন্নী সমৃদ্ধ বুযুর্গ ছিলেন আর এই ধরণের ইল্মে লাদুন্নী প্রাপ্ত ওলী আল্লাহ্দের “রাসিখুনা ফিল ইল্ম” বলা হয়। কারণ তাঁরা শুধু কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ-এর বাহ্যিক আলিম নন বরং কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ-এরও যেরূপ আলিম সেই সাথে জাহিরী, বাতিনী, শরীয়ত ও হাকীক্বতের জ্ঞানেরও পূর্ণ অধিকারী এবং বহিঃচক্ষু ও অন্তঃচক্ষু বিশিষ্ট। আল্লাহ্ পাক-এর তাজাল্লীয়ের পূর্ণ জ্যোতিতে উদ্ভাসিত, তাকওয়া পরহেযগারী, রিয়াজত-মুশাক্কাদ দ্বারা কামিয়াবী লাভে সাফল্যমন্ডিত, আল্লাহ্ পাক-এর ইশ্ক-প্রেম ও মা’রিফাতের মহা সমুদ্রে নিমজ্জিত, আপাদমস্তক গায়েবী নূরে নূরান্বিত যাবতীয় নফসানীয়ত হতে পবিত্র এবং পূর্ব বর্ণিত “কুরবুল ফরায়েজ” ও “কুরবুন্ নাওয়াফেলের” পূর্ণ ভূষনে বিভূষিত। তাঁদের প্রত্যেকটি বাণী ও জ্ঞান আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার দ্বারা পরিমার্জিত।
অতএব যারা এরূপ উচ্চতায় সমাসীন নয়- তারা তথা আহমদ রেযা খাঁ গং আমীরুল মু’মিনীন, হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর কথাকে কি করে উপলব্ধি করবে?
মূলতঃ কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ দুনিয়ার সর্বত্র একই বটে কিন্তু কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ বুঝার শক্তি তো দুনিয়ার সর্বত্র এক নয়। চশমা থাকলেও তা ব্যবহারের ক্ষেত্রে সকলের চশমার গ্লাসের পাওয়ার বা শক্তি যে একই হবে তা তো কখনও নয়। রসিখুনগণ যে বোধ শক্তি নিয়ে কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ বুঝেছেন এবং যে প্রেক্ষিতে ব্যক্ত করেছেন সেরূপ বুঝ ক’জনের আছে? কাজেই সঠিকভাবে বুঝতে হলে তাঁদের কাছে নতি স্বীকার করতেই হবে।
কারণ না বুঝা অপেক্ষা বেঠিক বুঝা যে অধিক ক্ষতিকারক। হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু যখন এরূপ বুঝ নিয়ে কথা বলতেন তখন লোকেরা বলত, “উনি কুরআন শরীফের বাইরে কথা বলেন।” তাঁর উত্তরে তিনি বলেছেন, “আমি আল্লাহ্ পাক-এর কছম করে বলছি, আমি কুরআন শরীফের বাইরে কথা বলিনা, তবে আমাকে আল্লাহ্ পাক যে বোধ শক্তি দান করেছেন তা অপরের নিকট নেই।” বলার অপেক্ষা রাখেনা এরূপভাবে মুজাহিদে আযম, সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী রহমতুল্লাহি আলাইহিকে আল্লাহ্ পাক যে বোধ শক্তি ও সূক্ষ্ম ইল্মে লাদুন্নী দিয়েছেন যা নাকেছ আহমদ রেযা খাঁর ছিল না।
হাদীস শরীফে উল্লেখ আছে, “কোন বান্দা কামিল ফক্বীহ্ হতে পারে না যতক্ষণ পর্যন্ত সে আল্লাহ্ পাক-এর জন্য সমস্ত মানুষের সাথে ভালবাসা ত্যাগ না করে এবং কুরআন শরীফের ব্যাপক ও বহুল অর্থ হৃদয়ঙ্গম করতে না পারে।” য
-মুহম্মদ আরিফুর রহমান।
প্রসঙ্গত বলা প্রয়োজন, ত্রয়োদশ শতাব্দীতে যারা আমীরুল মু’মিনীন, মুজাহিদে আযম হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর সব চাইতে অধিক বিরোধীতা করেছিল তারা হলো- পেশোয়ারের সীমান্তবর্তী কতিপয় খাঁন বংশীয় দাম্ভিক দুনিয়ালোভী আলিম সম্প্রদায়। তারা আমীরুল মু’মিনীন ও তাঁর মুজাহিদ বাহিনী সম্পর্কে আপত্তিকর বক্তব্য ও অভিযোগ তুলেছিল- “হযরত সৈয়দ ছাহেব ও তাঁর অনুসারীরা ধর্ম বিমুখতা ও নাস্তিকতার পথানুসারী। তাঁদের কোন মাযহাব ও মসলক নেই। তাঁরা নফসানিয়াতের দাস ও দৈহিক ভোগ সন্ধানী। তাঁরা জুলুম ও নির্যাতনে অভ্যস্ত। অকারণে শরীয়ত পন্থী মুসলমানদের জান-মালের উপর হাত দেন। সৈয়দ ছাহেব ইংরেজ বাহিনীর কর্মচারী ছিলেন। মাওলানা ইসমাঈল দেহলভী প্রমূখ ব্যক্তিগণ তাঁকে মাহ্দী মাউদ (প্রতিশ্রুত মাহ্দী) বলে মেনে নেন। ইংরেজরা তাঁদেরকে দেশ থেকে বিতাড়িত করে। তারা আফগান বালিকাদের জোর করে জদীদুল ইসলাম হিন্দুস্থানিদের হাতে দিয়েছেন।”
এ সমস্ত আজগুবী, মিথ্যা, বানোয়াট, পূর্ব পরিকল্পিত, পাঠানী দুনিয়াদার আলিমদের অসামঞ্জস্য বক্তব্যের জাওয়াবে আমীরুল মু’মিনীন হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি স্বয়ং বলেন, “আমি শুনতে পেয়েছি যে, অপবাদ রটনাকারীরা আমাদের সম্পর্কে এও রটিয়েছে যে, এই অধমই নয় বরং গোটা জামায়াতে মুজাহিদীন-ই ইলহাদ ও ধর্মদ্রোহিতা দোষে দুষ্ট। তারা মূল বিষয়টিকে এভাবে সর্ব সম্মুখে তুলে ধরেছে যে, এই বিদেশাগত লোকগুলো কোন মাযহাব মানে না এবং তারা কোন বিশেষ তরীক্বার অনুসারী নয়। এরা নিছক প্রবৃত্তি পুজারী। প্রবৃত্তির বশবর্তী হওয়ার কারণে তারা কিতাবুল্লাহ্র দৃষ্টিতে কি বৈধ আর কি অবৈধ সেসব দেখারও প্রয়োজন বোধ করে না। আমি এসব অপবাদ থেকে আল্লাহ্ পাক-এর কাছে প্রার্থনা করি। আমি পরিস্কার বলতে চাই যে, এই অধমের প্রতি যে সব অপবাদ আরোপ করা হয়েছে তা একান্ত অমূলক ও মিথ্যাচার ছাড়া কিছু নয়। এই অধম এবং তার খান্দানের পরিচয় ভারতবর্ষে কারো অজানা নয়। হাজার হাজার মানুষ কি সাধারণ কি অসাধারণ, এই অধম ও তার পূর্বপুরুষকে চেনে ও জানে। তারা আরও জানে যে, এই অধম তার পূর্ব পুরুষ থেকেই বংশ পরম্পরাগতভাবে হানাফী মাযহাবের অনুসারী এবং এখনও তার যাবতীয় কথা ও কাজ হানাফী মাযহাবের উসূল ও কানুন এবং রীতিনীতি মোতাবিক সম্পাদিত হয়ে থাকে। একটি কথা কিংবা কাজও এর বিরুদ্ধে নয়। তবে হ্যাঁ, সাধারণ মানবীয় দুর্বলতাজনিত কারণে আমাদের দ্বারা কোন ভুলত্রুটি হওয়াটা অসম্ভব কিছু নয়। তবে এ জাতীয় ভুলত্রুটি কেউ ধরিয়ে দিলে আমরা তা অসংকোচে স্বীকার করে নেব। কেউ এ সম্পর্কে সতর্ক করে দিলে আমরা আসল সত্যের দিকে প্রত্যাবর্তন করতে সদা প্রস্তুত। অবশ্য প্রতিটি মাযহাবেই মুহাক্কিক (বিশেষজ্ঞ) আলিমদের তরীক্বা একই হয়ে থাকে। গায়ের মুহাক্কিকদের তরীক্বা হয় অন্য রকম। কতক বর্ণনাকে শক্তিশালী প্রমাণাদির ভিত্তিতে অন্য কতক বর্ণনার উপর অগ্রাধিকার প্রদানের রেওয়াজ প্রাচীন বুযুর্গদের থেকেই চলে আসছে। পরস্পর বিরোধী বাক্য ও বিরচিত মাসয়ালা সমূহের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান ইত্যাকার ব্যাপারগুলোও সূক্ষ্ম জ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞ পন্ডিতদের চিরকালীন রীতি। এজন্য কেউ ধর্ম ও মাযহাব থেকে খারিজ হয়ে যায় না। বরং এটাকে মাযহাব অনুসারীদের সারকথা মনে করা উচিত। এরপরও যদি কোন মাসয়ালার ক্ষেত্রে কারো কোন রূপ সন্দেহ থেকে থাকে তবে তার উচিত এ অধমের নিকট এসে মৌখিকভাবে এবং সরাসরি সেসব সন্দেহের অপনোদন ঘটানো। বিষয়টিকে নিজে বুঝে নেয়া অথবা এ অধমকে বুঝিয়ে দেয়া এটাই তো বাঞ্ছনীয়।”
মুসলমানদের জান-মালের গুরুত্ব না দেয়া এবং তা ইচ্ছামত ভোগ দখল করা সম্পর্কিত অপবাদের জাওয়াবে শহীদে আযম, হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, “অপবাদ রটনাকারীদের আরো একটা মিথ্যা অপবাদ এই যে, এই অধম নাকি জুলুম-নিপীড়ন চালিয়ে থাকে। তাদের বক্তব্য হলো- ‘আমি মুসলমানদের জান-মালের উপর শরয়ী ও সঙ্গতকারণ ছাড়াই হাত বাড়িয়ে থাকি এবং এ ব্যাপারে টাল-বাহানা ও ফন্দি-ফিকিরের আশ্রয় নেই।’
সেই পবিত্র সত্তার কছম! এ তো এক বিরাট অপবাদ। শরয়ী কারণ ছাড়া এই অধম কখনো কাউকে কোড়ার একটি আঘাতও করেনি। এমনকি বিনা কারণে অহেতুক একটি কুকুরকেও আঘাত করা তার স্বভাববিরুদ্ধ। যিনি মাত্র কয়েকটি দিনও এই অধমের সংসর্গে কাটিয়েছেন তিনি নিশ্চয়ই এই বিষয়টি লক্ষ্য করে থাকবেন। বাকী যে বিষয়টি থাকলো তা হচ্ছে এই যে, আল্লাহ্ পাক এই অধমের হাত দিয়ে কতকগুলো মুনাফিক ও মুরতাদকে শাস্তি দিয়েছেন। এটাকে আমি আমার নেহায়েত সৌভাগ্য এবং আল্লাহ্ পাক-এর দরবারে আমার গ্রহণীয় হবার আলামত হিসেবে গণ্য করি। বরং প্রকৃত ব্যাপার এই যে, দ্বীনের সাহায্য-সমর্থনের ক্ষেত্রে আত্ম সম্মানবোধ রক্ষা করা এবং শত্রুকে অবমাননা ও লাঞ্ছনা করাকে আমি ঈমানের আবশ্যকীয় শর্তাবলীর অন্যতম বলে মনে করি। যার ভিতর ঈমানী গায়রত (আত্ম মর্যাদাবোধ) নেই, প্রকৃতপক্ষে তার ভিতর ঈমানই নেই।” আল্লাহ্ পাক বলেন,
يايها الذين امنوا من يرتد منكم عن دينه فسوف ياتى الله بقوم يحبهم ويحبونه اذلة على المؤمنين اعزة على الكفرين يجاهدون فى سبيل الله ولا يخافون لومة لائم.
অর্থাৎ- “হে মু’মিনগণ! তোমাদের ভিতর কেউ দ্বীন থেকে ফিরে গেলে আল্লাহ্ পাক এমন এক সম্প্রদায় নিয়ে আসবেন যাদেরকে তিনি ভালবাসেন ও যারা তাঁকে ভালবাসবে। তারা মু’মিনদের প্রতি কোমল ও কাফিরদের প্রতি কঠোর হবে। তারা আল্লাহ্ পাক-এর পথে জিহাদ করবে এবং কোন নিন্দুকের নিন্দার ভয় করবে না।” (সূরা মায়িদা/৫৪) আল্লাহ্ পাক অন্যত্র আরও বলেন,
يايها النبى جاهد الكفار والمنافقين واغلظ عليهم وماوهم جهنم.
অর্থাৎ- “হে নবী! কাফির ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করুন ও ওদের বিরুদ্ধে কঠোর হন। ওদের আবাসস্থল জাহান্নাম।” (সূরা তওবা/৭৩)
“আর যদি ধরেই নেয়া হয় যে, এই অধমের হাত দিয়ে এ ধরণের কোন অন্যায় সংঘটিত হয়েছে তাহলে তাকে ওয়াজ-নসীহতের মাধ্যমে সে বিষয়ে সতর্ক করা হোক। তা না করে প্রকাশ্য মাহ্ফিলে ও খোলা মজলিশে নিন্দাবাদ করা, গীবত করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি ঠিক নয় গরীবের কোন ভুল-ভ্রান্তিকে উপলক্ষ্য করে তাকে আক্রমণের লক্ষ্যে পরিণত করা এবং একমাত্র এই অজুহাতে জিহাদের ক্ষেত্রে তাকে সহযোগীতা প্রদান না করা ও মুজাহিদদের দলে অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত থাকা। হাদীস শরীফে উল্লেখ আছে,
الجهاد ماض الى يوم القيامة لايبطله جورجائر ولاعدل عادل.
অর্থঃ- “জিহাদ ক্বিয়ামত পর্যন্ত চলবে। কোন জালিমের জুলুম এবং কোন সুবিচারকের সুবিচার তা বাতিল করতে পারে না।” (মুহাদ্দিসীন-ই-কিরামগণের কাছে এটি একটি বিখ্যাত হাদীস শরীফ)
মোটকথা এ যুগের সমস্ত উলামা-ই-কিরামগণের নিকট এই অধমের দরখাস্ত এই যে, সাধারণভাবে সকল মুসলমান এবং বিশেষ করে এই অধমকে ভাল কাজের আদেশ দিন এবং মন্দ কাজে ফিরিয়ে রাখুন, সরল সোজা রাস্তা দেখান এবং যে সমস্ত আপত্তি ও অভিযোগ আমার অবর্তমানে অভিযোগকারীরা উত্থাপন করে থাকেন, আলোচনার মাধ্যমে সে সব সরাসরি আমার সামনে পেশ করুন এবং মুখোমুখি শরয়ী দলীলের সাহায্যে প্রমাণ করুন। আপনারা এই অধমের মোড় খোদপরস্তী (আত্মপুজা) থেকে খোদাপরস্তীর দিকে ঘুরিয়ে দিন। আমি সর্বান্তকরণে প্রস্তুত যে, আমার কথা ও কাজের ভিতর যদি আমি এমন কোন জিনিসের সন্ধান পাই যা আল্লাহ্ পাক ও তাঁর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নির্দেশের খেলাফ তাহলে আমি তৎক্ষণাত তওবা করব এবং সোজা সরল রাস্তায় ফিরে আসব। আর অভিযোগকারীরা যদি এই অধমের কথা ও কাজের ব্যাপারে কোন আপত্তি তোলেন এবং সেগুলোকে যদি তারা শরীয়ত বিরোধী মনে করেন, অথচ আমাকে সে সম্পর্কে অবহিত না করেন, এজন্য সফরের একটু কষ্ট স্বীকার না করেন এবং আমাকে খোলাখুলি বিষয়টি না বলেন, আসল সত্য প্রমাণ করে না দেখান সেজন্য তারাই দায়ী থাকবেন।
কতক মিথ্যাবাদী, নির্বোধ ও অশান্তি সৃষ্টিকারী চতুর্দিকে এও রটিয়েছে যে, উলামা-ই-কিরাম ও বুযুর্গদের ভিতর থেকে যারাই এই অধমকে ন্যায় কথা বলে এবং মন্দ থেকে বিরত রাখতে চেষ্টা করে, সে নাকি তাদের সাথে রূঢ় ও কঠোর আচরণ করে থাকে, তার জীবন ও সহায়-সম্পত্তির ক্ষতি সাধন করে এবং হাত দিয়ে ও মুখ দিয়ে তথা কথায় ও কাজে কোননা-কোনভাবে তার অনিষ্ট সাধন করে। এ অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। কাফির ও মুনাফিকদের গুপ্তচর বহুবার ধরা পড়েছে, বন্দি হয়েছে এতদসত্ত্বেও তাদের সঙ্গে ক্রোধের বশবতী হয়ে কিংবা বিরক্তিভরে কোন কথা পর্যন্ত বলা হয়নি। তাদেরকে তাক্বলীফ দেয়ার ব্যাপারটিও এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। তাদের শান্তি ও নিরাপত্তার সঙ্গে মুক্তি দেয়া হয়েছে। কাফির এবং মুনাফিকদের প্রেরিত গুপ্তচরের সঙ্গেই যখন এরূপ আচরণ করা হয়েছে তখন কোন বোধশক্তি সম্পন্ন মানুষ কি করে এ কথা বিশ্বাস করতে পারে যে, এই অধম উলামা-ই-কিরাম ও ফুযালায়ে ইজামের সঙ্গে একমাত্র সৎ কাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধের কারণে ক্রোধভরে কিংবা অভদ্রোচিত ভাষায় কথা বলবে? এ কথা ঈমানী আখলাক ও মনুষ্যজনচিত আচরণ বহির্ভূত। এসব অপবাদ থেকে আমি আল্লাহ্ পাক-এর আশ্রয় প্রার্থনা করি।”
(সাইয়্যিদ আবুল হাছান আলী নদভী কৃত সীরাতে সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ (রহমতুল্লাহি আলাইহি) ২য় খন্ড, পৃষ্ঠা/২৬৪-২৬৭, আল্লামা গোলাম রসূল মিহর কৃত মুজাহিদ বাহিনীর ইতিবৃত্ত পৃষ্ঠা/৭৩১)
-শের-ই বাংলা মুফতী মুহম্মদ শামসুল আলম, ঢাকা।
বৃটিশ গভর্মেন্টের ধর্মের প্রতি হস্তক্ষেপের কারণে হিন্দুদের তুলনায় মুসলমানরাই বেশী অসন্তুষ্ট হয়। এর কারণ হলো যে, হিন্দুরা ধর্মের অনুশাসন মেনে চলে প্রথা অনুসারে, ধর্মীয় আদেশের বশবর্তী হয়ে নয়। হিন্দু ধর্ম মতে যে সমস্ত ধর্মীয় আদেশ এবং আন্তরিক বিশ্বাসের উপর হিন্দুদের পরকালীন নিস্তার নির্ভর করে সেগুলোও তারা জানে না এবং কর্মক্ষেত্রেও তা দেখা যায় না। এজন্যই ধর্মীয় ব্যাপারে তারা অনেকটা শিথিল। তারা আচার-অনুষ্ঠান এবং খাওয়া-দাওয়ার ভেদ-বিচার ছাড়া কোন ধর্মীয় বিশ্বাসে পোক্ত ও দৃঢ় নয়। তাদের সামনে ধর্মীয় বিশ্বাসের পরিপন্থী কোন কথা বললেও রাগান্বিত বা মনক্ষুন্ন হয় না। কিন্তু মুসলমানদের বেলায় তা নয়। যে সমস্ত আক্বীদা পোষণ তাদের নাযাত দান করবে এবং যে সমস্ত ধ্যান-ধারণা তাদের জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে সেগুলো তারা ভাল করেই জানে। তাই তারা এসব আক্বীদা সংরক্ষণের ব্যাপারে দৃঢ় ও মজবুত হয়ে থাকে। অথচ বৃটিশ গভর্মেন্ট নানাভাবে মুসলমানদের সে আক্বীদা ও মূল্যবোধ ধ্বংসে পদক্ষেপ নিয়েছিল। এমনকি ব্যবস্থাপক পরিষদের মাধ্যমেও ধর্মীয় ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করা হতো। ১৮৫০ সালের এ্যাক্ট নং ২১ পরিস্কাররূপে ধর্মীয় বিধানের পরিপন্থী ছিল । এই এ্যাক্ট সম্পর্কে লোকের একটি বিরূপ ধারণা এই ছিল যে, এটি পাস করা হয়েছে কেবল খ্রীষ্টান ধর্মের প্রতি উৎসাহ দানের জন্য। এতে আরো নির্দেশ ছিল যে, কোন বিধর্মী যদি মুসলমান হয় তবে মিরাসী সম্পত্তিতে তার কোন অধিকার থাকবে না। সুতরাং নবদীক্ষিত মুসলমানের পক্ষে এ আইনটি ছিল অহিতকর। কেবল নবদীক্ষিত খ্রীষ্টানরাই এ আইনে উপকৃত হতো। এজন্যই লোকেরা মনে করতো যে, এ আইন কেবল ধর্মেই হস্তক্ষেপকারী নয় বরং এতে রয়েছে খ্রীষ্টান ধর্ম গ্রহণের প্রতি পরিস্কার উৎসাহ প্রদান।
লা-খেরাজ জমিন বাজেয়াপ্তকরণঃ লা-খেরাজ জমিনের শেষ আইন ২ নং রচিত হয় ১৮১৯ সালে। লর্ড মনরো এবং ডিউক অব্ অয়েলিংটন সত্যি বলেছেন, “নিস্কর জমিন বাজেয়াপ্ত করার মানে ভারতীয়দের সাথে শত্রুতা সৃষ্টি করা এবং তাদের পরমুখাপেক্ষী করে তোলা। এর ফলে ভারতবাসী কতটুকু অসন্তুষ্ট, বিক্ষুব্ধ এবং দারিদ্রপীড়িত হয়েছে তা আমি ভাষায় বর্ণনা করতে পারি না। শত শত বছর ধরে অনেক লা-খেরাজ জমিন ভারতীয়দের ভোগ দখলে ছিল। যৎসামান্য ছুতা-নাতায় সেগুলো বাজেয়াপ্ত করা হয়। ভারতীয়গণ মনে করতো সরকার আমাদের প্রতিপালন করেনি অধিকন্তু আগেকার বাদশাহ্গণ আমাদের এবং আমাদের পূর্ব পুরুষদের যে জায়গীর দিয়ে গেছেন সেগুলোও তারা আমাদের নিকট থেকে কেড়ে নিয়েছেন। সুতরাং আমরা এ গভর্মেন্টের কাছে কি আর আশা করতে পারি? (ভারতে বিদ্রোহের কারণ)
মূলতঃ কেবল এরূপ বিবিধ জুলুমই নয় বরং সে জুলুমের বিরূদ্ধে যিনি জিহাদী জজবা জাগ্রত করেছিলেন সেই আমীরুল মু’মিনীন, মুজাহিদে আযম হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি সম্পর্কে অবমূল্যায়ণ এবং বিকৃত তথ্য পরিবেশন ছিল তাদের আরো কুকীর্তি। আর এ ব্যাপারে অগ্রগণ্য ছিল ডড ঐঁহঃবৎ সে তার কুট তথ্য পরিবেশনের পরিচয় দেয় ‘দি ইন্ডিয়ান মুসলিমে’-
“পাঞ্জাব সীমান্তে বিদ্রোহী শিবিরের গোড়াপত্তন করেন সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী(রহমতুল্লাহি আলাইহি)। অর্ধ শতাব্দী আগে আমরা পিন্ডারী শক্তিকে নির্মূল করার ফলে যে কয়জন তেজস্বী পুরুষ ভারতের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েছিল,সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী(রহমতুল্লাহি আলাইহি) তাদের অন্যতম। কুখ্যাত এক দস্যুর (আমীর খান পিন্ডারী, পরবর্তীকালে টংকের নওয়াব) অশ্বারোহী সৈনিক হিসেবে সে জীবন আরম্ভ করে এবং বহু বছর যাবৎ মালওয়া অঞ্চলের আফিম সমৃদ্ধ গ্রামসমূহে লুটতরাজ চালায়। রঞ্জিত সিংহের নেতৃত্বে উদীয়মান শিখ শক্তি তাদের মুসলমান প্রতিবেশীদের উপর যে কঠোর নির্দেশ জারী করে তার ফলে মুসলমান দস্যুদের কার্যকলাপ বিপদসংকুল হয়ে পড়ে এবং লাভজনক থাকে না। পক্ষান্তরে শিখদের গোড়া হিন্দুয়ানীর দরুণ উত্তর ভারতের মুসলমানদের উৎসাহে ইন্ধন সৃষ্টি হয়। সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রহমতুল্লাহি আলাইহি) অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করেন। দস্যুবৃত্তি ত্যাগ করে ১৮১৬ খৃষ্টাব্দ নাগাদ তিনি দিল্লীতে চলে যান মুসলমানী আইনের একজন সুবিখ্যাত পন্ডিত হযরত শাহ্ আব্দুল আজীজ মুহাদ্দিস দেহলভী (রহমতুল্লাহি আলাইহি)-এর নিকট পবিত্র শাস্ত্র অধ্যায়নের জন্য। তিন বছর সেখানে শিক্ষানবিশীর পর তিনি নিজেই একজন প্রচারক হিসেবে কাজ শুরু করেন।
১৮২০ খৃষ্টাব্দে ধর্মীয় নেতা ধীরে ধীরে দক্ষিণ অভিমুখে অগ্রসর হতে থাকেন। আধ্যাত্মিক মর্যাদার স্বীকৃতি স্বরূপ শিষ্যরা এই ভ্রমনকালে তাঁর সেবা যত¦ করতে থাকে। সম্ভ্রান্ত এবং বিদ্বান লোকরা পর্যন্ত সাধারণ ভৃত্যের মত নগ্ন পদে তাঁর পালকীর পাশে পাশে দৌঁড়ে অগ্রসর হয়। পাটনায় দীর্ঘ যাত্রা বিরতি কালে তাঁর অনুগামীর সংখ্যা এত বেড়ে যায় যে, তাদের নিয়ন্ত্রনের জন্য রীতিমত একটা সরকার গঠনের প্রয়োজন হয়ে পড়ে।
যাত্রাপথে অবস্থিত বড় বড় শহরে ব্যবসায়ীদের মুনাফার উপর কর আদায়ের জন্য তিনি প্রতিনিধি নিয়োগ করে কাফেলার আগে তাদের পাঠিয়ে দেন। তদুপরি তিনি মুসলমান সম্রাটদের প্রাদেশিক গভর্ণর নিয়োগের অনুকরণে আনুষ্ঠানিক ফরমান জারী করে চারজন খলীফা (হযরত বেলায়েত আলী রহমতুল্লাহি আলাইহি, হযরত এনায়েত আলী রহমতুল্লাহি আলাইহি, হযরত মরহুম আলী রহমতুল্লাহি আলাইহি ও হযরত ফরহাত হোসেন রহমতুল্লাহি আলাইহি) নিয়োগ করেন।
এভাবে পাটনায় একটি স্থায়ী আস্তানা স্থাপনের পর তিনি কলকাতা অভিমুখে অগ্রসর হতে থাকেন। গঙ্গার গতিপথ অনুসরণ করে অগ্রসর হওয়ার সময় তিনি বহু লোককে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করেন এবং পথিপার্শ্বের সমস্ত বড় বড় শহরে তাঁর প্রতিনিধি নিয়োগ করেন। কলকাতায় এত অধিক সংখ্যক লোক তাঁর চারপাশে সমবেত হয় যে, প্রত্যেকের সঙ্গে আলাদা করে মুছাফা করা তাঁর পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে মাথার পাগড়ী খুলে লম্বা করে জড়িয়ে দিয়ে তিনি ঘোষণা করেন যে, পাগড়ীর যে কোন অংশ স্পর্শ করলেই সে ব্যক্তি তার শিষ্যত্ব লাভ করবে। ১৮২২ খৃষ্টাব্দে তিনি হজ্ব করতে মক্কা শরীফ গমণ করেন। এভাবে হজ্বের পবিত্র আবরণে তিনি তাঁর প্রাক্তন দস্যু চরিত্রকে সম্পূর্ণরূপে আচ্ছাদিত করে পরবর্তী বছর অক্টোবর মাসে বোম্বে হয়ে ফিরে আসেন। বোম্বে শহরেও ধর্ম প্রচারক হিসেবে তিনি কলকাতার মতই বিরাট সাফল্য অর্জন করেন। কিন্তু ইংরেজদের একটি প্রেসিডেন্সি শহরের শান্তিপূর্ণ অধিবাসীবৃন্দ অপেক্ষাও উপযুক্ত ক্ষেত্র এই দস্যু দরবেশের সম্মুখ্যে বিরাজমান ছিল। উত্তর ভারতে প্রত্যাবর্তনের পথে তাঁর নিজের জিলা বেরেলভীতে তিনি বহু সংখ্যক অশান্ত প্রকৃতির প্রধানতঃ ইউসুফজাই ও বাবাকজাই উপজাতি লোকদেরকে শিষ্য তালিকাভুক্ত করে নেন।” (দি ইন্ডিয়ান মুসলমান)
পাঠক! এই বক্তব্যে দেখা যায় কুখ্যাত হান্টার গং আমীরুল মু’মিনীন হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী রমতুল্লাহি আলাইহি-এর বুযুর্গীর, জনপ্রিয়তার এবং খিলাফতের কার্যক্রমকে অস্বীকার করতে না পারলেও তাকে উল্লেখ করেছে দস্যু হিসেবে। (নাউযুবিল্লাহ্) আর আহমক আহমদ রেযা খাঁ সে কুখ্যাত মুসলিম বিদ্বেষী ঐতিহাসিক হান্টারকে গুরু মেনে সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর নামে অহেতুক অপবাদ গেয়ে তার চরম জিহালতির পরিচয় দিয়েছে।
-মুহম্মদ আরিফুর রহমান।
আল্লাহ্ পাক-এর রসূল সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, রহমতুল্লিল আলামীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “আয় আল্লাহ্ পাক! আমাকে হিংসাকৃত করুন কিন্তু হিংসাকারী করেন না।”
বলা বাহুল্য আল্লাহ্ পাক-এর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এই দোয়া যথাযথভাবেই কবুল হয়েছে। তিনি আজীবনই এ দোয়ার মেছদাক ছিলেন। আর বলার অপেক্ষা রাখে না বর্তমান জামানায় সে ধারাবাহিকতায় কায়েম মোকাম হচ্ছেন, ইমামুল আইম্মা, কুতুবুল আলম, মুহ্ইস্ সুন্নাহ্, মুজাদ্দিদুয্যামান, আওলাদে রসূল, ঢাকা রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর ছাহেব ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলী। কি ইল্মে জাহির, কি ইল্মে বাতিন, কি সুন্নতের আমল, কি ব্যক্তিত্ব, কি বংশগত পরিচয়, কি কার্যক্রম সব বিষয়েই তিনি নাক্বেছদের প্রবল হিংসার পাত্র। বলা বাহুল্য, যার এই বুযির্গীর পিছনে আল্লাহ্ পাক-এর তরফ থেকে বেমেছাল মনোনয়ন এবং মদদ ছাড়াও আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো যে, “তিনি চরম খালিছভাবে আল্লাহ্ পাককে চেয়েছেন।”
সাইয়্যিদুত্ ত্বয়েফা হযরত জুনায়েদ বাগদাদী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন, “জুনায়েদের সাথে অনেকেই ডুব দিয়েছিল কিন্তু শেষ পর্যন্ত জুনায়েদকেই আল্লাহ্ পাক কিনারায় এনে পৌঁছিয়েছেন।” (সুবহানাল্লাহ্)
বলা বাহুল্য, বর্তমান জামানার মুজাদ্দিদ রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর ছাহেব ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলীও মূলতঃ একক কৃতিত্বের দাবীদার। তাই সুন্নত পালন এবং তা প্রচলনে তাঁর যে বেমেছাল ভূমিকা সেখানে ঠাঁই না পাওয়ায় ওহাবীরা তো বটেই সাথে নামধারী সুন্নীরাও শুরু থেকেই প্রচন্ড হিংসা করে আসছে এবং বর্তমানে স্বার্থান্বেষী কারণে এর মাত্রা আরো বেড়েছে। বিশেষ করে সুন্নীদের মুখপত্র একটি মাসিকে পাঠকের কথামালার অন্তরালে জনৈক নেজামউদ্দীন এই বিষয়টি আরো পরিস্কার রূপে প্রকাশ করেছে।
রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর ছাহেব ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহু আলী-এর সুন্নত পালন সম্পর্কিত অহেতুক, অসংলগ্ন এবং অযৌক্তিক কথাবার্তা সে বিষয়টিকেই ফাঁপিয়ে তুলেছে। “…. তিনি কতগুলো সুন্নতের আশ্রয় নেন। এমনকি তার একটি সুন্নতি মসজিদও দেখা যায়। যা নাকি খেজুর গাছের খুঁটি ও পাতা দিয়ে নির্মিত। …. সুন্দর ও মনোরম পাকা মসজিদ তৈরী করা কি সুন্নতের পরিপন্থী?…. সুন্নতি মসজিদের অস্তিত্ব নেই তা পত্রিকার প্রচ্ছদ কভারে ছাপিয়ে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে প্রচার করার অর্থ সুন্নতের নামে মানুষকে ধোকা দেয়া নয় কি? … সুন্নত পালনের আরো কিস্সা শুনা যায় কাঠের পেয়ালা ও বর্তনে পানাহার করা … কাঠের পেয়ালায় চায়ের প্রদর্শনী … দু’একটা সুন্নতের রং তামাশা দেখিয়ে …।”
পাঠক! রাজারবাগ শরীফের বিরোধীতা করতে গিয়ে তারা আল্লাহ্ পাক-এর রসূল সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সম্মানিত সুন্নতের সাথে “আশ্রয়, রং তামাশা, কিস্সা” ইত্যাদি যে অপ্রাসঙ্গিক, অশোভন ও অশালীন শব্দগুলো যোগ করেছে তাই প্রমাণ করে যে, তারা সুন্নতের মর্যাদা ও গুরুত্ব সম্পর্কে কত বড় জাহিল এবং শেষ স্তরের বেয়াদব।
আক্বীদার কিতাবে বর্ণনা করা হয়েছে, “যদি কারো সামনে বলা হয় যে, কদু খাওয়া সুন্নত। আর শ্রবণকারী যদি বলে যে আমি কদু খাওয়া পছন্দ করি না। তাহলে সে সাথে সাথে কাফির হয়ে যাবে। কারণ হিসেবে সমুদয় আক্বীদার কিতাবে বলা হয়েছে, “কোন সুন্নতের সাথে বিন্দু পরিমাণ ইন্কার জনিত শব্দ যোগ করা কুফরী।”
সেখানে সুন্নত পালনের ক্ষেত্রে রাজারবাগ শরীফের ধারে-কাছে তো নয়ই বরং রাজারবাগ শরীফের বিরোধীতা করতে গিয়ে, রাজারবাগ শরীফে আমলকৃত সুন্নত নিয়ে সুন্নী নামধারী তরজুমান গং রীতিমত যেরূপ বেয়াদবী, ধৃষ্টতাপূর্ণ, ঔদ্ধত্যমূলক, অশালীন ও অশোভনীয় শব্দ সংযোজন করেছে সেটা তাদেরকে কোন স্তরের কুফরীর পর্যায়ে নিয়ে যায়, সেটা কি তারা ভেবে দেখবে?
আর সুন্নত পালন এবং প্রকারভেদ সম্পর্কে বহু কথা রয়েছে। যেখানে তরজুমান গং নিজেই বলেছে, “মনোরম ও পাকা মসজিদ করা কি সুন্নতের পরিপন্থী?” যদি তাই হয় তবে ফের আমাদেরই বলতে হয় তবে রাজারবাগ শরীফে বর্তমানে যে মসজিদ রয়েছে সেটাও কি সুন্নতের পরিপন্থী? আর বর্তমানে খেজুর পাতার মসজিদ না থাকা সত্ত্বেও তার প্রচ্ছদ কভারে ছাপিয়ে প্রচার করা সুন্নতের নামে মানুষকে যদি ধোকা দেয়া হয় তাহলে বলতে হয় যে, “তরজুমান গং তাদের জন্মলগ্ন হতে এ পর্যন্ত বহু মসজিদের ছবি তাদের প্রচ্ছদে ছাপিয়ে আসছে। কিন্তু সেগুলোর কোনটির অস্তিত্ব তাদের ক্যাম্পাসে নেই। তাহলে কি তারাই বড় ধোকাবাজ নয়?
আর সুন্নতি মসজিদের প্রচ্ছদের বিবরণ আল বাইয়্যিনাতে লেখা আছে। সেখানে লেখা আছে, প্রচ্ছদঃ সুন্নতি জামে মসজিদের ভেতরের দৃশ্য। এবং এই লাইনটির উপরে নীচে দাগ দেয়া আছে। যার দ্বারা এই বোঝা যায় না যে, এটি ৫ নং আউটার সার্কুলার রোড, রাজারবাগ ঠিকানায়ই অবস্থিত। তা বোঝানোর উদ্দেশ্য থাকলে এই লেখার নীচের দাগটি তুলে দেয়া হত। যে দাগের নীচেই আছে ৫ নং আউটার সার্কুলার রোড, রাজারবাগ, ঢাকা।
মূলতঃ রাজারবাগ শরীফের বিরোধীতা করতে গিয়ে যারা সুন্নতকে ইন্কার করে কুফরী করে তারা যে স্বীয় হিংসায় জ্বলে এরূপ দিকবিদিক জ্ঞানশুন্য হবে সেটা তাদের স্বাভাবিক পরিণতি। এভাবে সুন্নত ইন্কারকারীদের সম্পর্কে আল্লাহ্ পাক বলেন, “তারা কুফরীসূচক কথা বলেছে এবং তজ্জন্য ইসলাম লাভের পরও তারা কাফির হয়ে গেল।”
অন্য আয়াতে বলেন, “তোমরা আল্লাহ্, আল্লাহ্ পাক-এর কুরআনের আয়াত ও তাঁর রসূল (ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি ঠাট্টা কর? তোমাদের কোন ওজর চলবেনা। তোমরা ঈমান লাভের পর কাফির হয়ে গেছ।”
-মুহম্মদ এন ইসলাম।
এরপর মৌলভী বদিউল আলম রেযভী পরশ্রীকাতরতা ও আক্রোশবশতঃ আমীরুল মু’মিনীন, হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর জিহাদী আন্দোলনের গতিধারাকে ইংরেজ ও শিখদের বিরুদ্ধ থেকে মুসলমানদের বিপক্ষে ঘুরিয়ে দেয়ার যথেষ্ট চেষ্টা চালিয়েছে। কিছু কিছু কিতাবের ইবারত আগে-পিছে করে এবং মূল বক্তব্য পরিসমাপ্তির আগেই মাঝখান থেকে অসমাপ্ত বাক্য তুলে দিয়ে পুরো বক্তব্যকেই এবড়ো থেবড়ো বানিয়ে ফেলেছে। এতদ্বভিন্ন সন্দিহান বাক্য বা ঘটনার পর লিখকের প্রকৃত মন্তব্য কি ছিল তা সে তুলেনি। যার দরুণ তার পুরো লিখাটিই পুকুর চুরির ঘটনার মত ঘটেছে।
যেমন, সে লিখেছে, “ইংরেজরা সৈয়দ সাহেবের কর্ম তৎপরতার ব্যাপারে নিশ্চিত ছিল যে, এ সব যা কিছু হচ্ছে তা ইংরেজদের বিরুদ্ধে নয়। প্রকৃতপক্ষে ইংরেজদের সাথে সৈয়দ সাহেবের সম্পর্ক বা ঘনিষ্ঠতা শিখদের সাথে জিহাদের প্রস্তুতির অনেক পূর্ব থেকেই ছিল। যখন থেকে সৈয়দ সাহেব আমীর খানের সৈন্য দলে সৈনিক হিসেবে কর্মরত ছিলেন (যাকে পরবর্তীতে নওয়াব টংকু বলা হয়েছে)।”
এর দ্বারা সে বুঝাতে চেয়েছে আমীরুল মু’মিনীন হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি ইংরেজদের বিরুদ্ধে কোন যুদ্ধই করেননি বরং ইংরেজরা তাঁকে সহযোগীতা করেছে।
এর জবাবে আব্দুল মওদুদ ছাহেব তার “ওহাবী আন্দোলন” কিতাবের ১১২ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, “হযরত সৈয়দ আহমদ শহীদ রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর নেতৃত্বে পাক ভারতের যে জিহাদী আন্দোলন বেড়ে উঠে তার প্রথম আক্রমন উদ্যত হয়েছিল, রনজিৎ সিং-এর শিখ রাজ্যের উপরে। পরে বৃটিশ সরকার এই আন্দোলনকে সন্দেহের চোখে দেখতে থাকে এবং ক্রমে ক্রমে ইংরেজদের সাথে মুজাহিদদের সংঘর্ষ বাধে।”
উক্ত কিতাবের ১২০ পৃষ্ঠায় আমীরুল মু’মিনীন হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর একটি মকতুবের বিশেষ অংশে তাঁর বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে এভাবে- “আমার প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে, জিহাদ কায়েম করা ও হিন্দুস্থানে সশস্ত্র আন্দোলন শুরু করা … যে সব বিধর্মী খৃষ্টান ভারত অধিকার করেছে তারা অত্যন্ত ধূর্ত ও প্রবঞ্চক … দুষ্ট প্রকৃতির ইংরেজরা ও হতভাগ্য মুশরিকরা ভারতের বিভিন্ন অংশে কর্তৃত্ব স্থাপন করেছে।” সৈয়দ আহমদের চিঠি-পত্রের এসব উদ্বৃতাংশ হতে আর বিন্দুমাত্র সন্দেহ থাকে না যে, তাঁর প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল ইংরেজ বিতাড়ন।”
এরপর “মাকাতিবে শাহ্ ইসমাইল শহীদ” গ্রন্থের ৪০-৪১ পৃষ্ঠায় বর্ণিত আছে, “যে বিদেশীরা বহু দূর দেশ থেকে আগত তারা এখানে রাজত্ব কায়েম করেছে, যে বণিকরা পণ্য বিক্রয় করতো তারা কায়েম করে বসেছে, সালতানাত।”
বিদগ্ধ পাঠকবর্গ! একটু চিন্তা করুন। উনবিংশ শতাব্দীতে ভারতে যে বিদেশী বণিকরা সালতানাতের মালিক হয়ে বসেছিল তারা কারা? তারা কি ইংরেজ ব্যতীত অন্য কোন জাতি?
এরপর আল্লামা গোলাম রসূল মিহির তার “হযরত সৈয়দ আহমদ শহীদ” গ্রন্থের ১৯১ পৃষ্ঠায় হযরত আমীরুল মু’মিনীন সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি বোখারার বাদশাহ্কে যে মকতুব বা চিঠি পাঠিয়েছিলেন এবং তাতে যা লিখা ছিল তা তিনি তুলে ধরেছেন এভাবে- “নাসারা এবং মুশরিকরা সিন্ধু নদী হতে সাগর তীর পর্যন্ত সমস্ত শহরগুলো জোর করে দখল করেছে। ইহা এত বড় একটা এলাকা যে, এক ব্যক্তি পায়ে হেঁটে ছয় মাসেও এক প্রান্ত হতে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত পৌঁছতে পারবে না।”
আমরা বলি এখানে মুশরিক দ্বারা মারাহাট্টা এবং শিখকে বোঝানো হয়েছে। কিন্তু নাসারা শব্দ দ্বারা এখানে ইংরেজ ব্যতীত আর কাকে বুঝানো হয়েছে? মুসলমানদের চিরশত্রু উইলিয়াম হান্টার স্বয়ং তার “দি ইন্ডিয়ান মুসলিম” গ্রন্থে মুজাহিদদের ইংরেজদের উপর মারমূখী আক্রমণের কঠোর সমালোচনা করে অবশেষে সত্য বলতে বাধ্য হয়েছে, তার মতে- “ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের মধ্যে ফাটল সৃষ্টির নিমিত্ত “মুজাহিদদের ওহাবী বলা” ভারত বিপ্লবীদের মাথায় সুপরিকল্পিত ভাবে আমরাই চাপিয়েছি।”
বিশিষ্ট গবেষক, ক্ষুরধার লিখক গোলাম মর্তুজা ছাহেব তার “চেপে রাখা ইতিহাস” গ্রন্থের ২০৫ পৃষ্ঠায় বলেন, আলীগড়ের সৈয়দ আহমদ আর বেরেলীর সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ রহমতুল্লাহি আলাইহি দু’জনই ইতিহাস প্রসিদ্ধ ছিলেন। তবে আলীগড়ের আহমদ ছাহেব ইংরেজদের পক্ষ থেকে পেয়েছেন স্যার উপাধি, প্রচুর সম্মান আর বেরেলীর সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি ইংরেজদের পক্ষ থেকে পেয়েছেন অত্যাচার ও আহত হবার উপহার। ভারতবাসীকে শেষ উপহার হিসেবে দিয়ে গেছেন তিনি তাঁর রক্ত মাখা মাথা মোবারক।”
-মাওলানা, মুফতী মুহম্মদ নূরুল আমীন, ঢাকা।
(ধারাবাহিক)
এরপর আল্লামা ইহ্সান ইলাহী জহীর তাঁর আরবী গ্রন্থ “আল বেরেলীবিয়াহ্ আকাঈদ ওয়া তারিখ” কিতাবের ৪৫ পৃষ্ঠায় আহমদ রেযা খাঁর ওসীয়ত সম্বলিত হাসনাঈন রেযার সংকলিত “ওসায়া” কিতাবের উদ্বৃতি দিয়ে তার অন্তিম মুহূর্তে নিজের ফাতিহা সম্পর্কে সে যা বলেছিল, তা তুলে ধরেছেন এভাবে,
واخر ماقال ان أمكن فارسلوا فى الاسبوع مرتين او ثلاثا فى الفاتحة (يعنى النذر) هذه الاشياء المحلبية المثلجة ولو كانت من لبن الجاموس والارز البريانى والاز البخارى والكباب والكوفة والمطبق والق شطة والفول والسمبوسة وعصير التفاح وعصير الرمان والقارورة الفازية والحليب المثلج فان أمكن فارسلوا كل يوم منها ولو شيئا واحدا والا فكما ترون.
অর্থঃ-“(আমার মৃত্যুর পর) যদি সম্ভব হয় সপ্তাহে দু’ তিনবার নিম্ন বর্ণিত বস্তুসমূহ আমার ফাতিহার জন্য প্রেরণ করবে। সদ্য দোহনকৃত দুধের আইসক্রিম যদিও তা মহিষের দুধের হয়, বিরিয়ানী, পোলাও, কাবাব, কোপতা, কালিয়া, আতাফল, চানাবুট, ছামুচা, সেব ফলের রস, ডালিমের রস, সোডার বোতল এবং দুধের আইসক্রিম অতঃপর যদি সম্ভব হয় তাহলে তোমরা প্রতিদিন ঐ সমস্ত বস্তু পাঠাবে যদিও একটা হয়, তবে তোমাদের সামর্থানুযায়ী।”
এখন বলুন, এই আরবী এবারত কি ভুল? আপনাদের তথা কথিত খাঁ ছাহেব মৃত্যু মুহূর্তে যে সু-স্বাদু খাদ্যের ফিরিস্তি তার ফাতিহার জন্য দিয়েছিলেন তা কি আপনারা মিথ্যা বলে উড়িয়ে দিতে চান? আর যদি আপনাদের খাঁ ছাহেবকে মরণ ফাঁদ থেকে বাঁচাবার জন্য আপনারা বলেন, “এ সমস্ত জিনিস তিনি নিজে খাবার জন্য বলেননি বরং ফাতিহা হিসেবে গরীব-মিসকীনদের খাওয়ানোর জন্য বলেছেন।”
এর জবাবে বলতে চাই, মৃত্যুর মত এক কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলার সময় যে ব্যক্তি কুরআন শরীফ তিলাওয়াত, যিকির-আযকার, তাসবীহ্-তাহ্লীল, দোয়া-দরূদ, রোনাজারী বাদ দিয়ে নিজের ফাতিহাখানীর জন্য সু-স্বাদু খাদ্যের তালিকা (ফর্দ) দিতে ব্যস্ত থাকে সে ব্যক্তির মধ্যে যে বুযুর্গীয়াতের নাম গন্ধও নেই এটাই তার বাস্তব প্রমাণ। কারণ মানুষ সারাজীবন যা করবে, যে কাজে ব্যস্ত থাকবে, মৃত্যুর সময় ঠিক ঐ হালেই সে দুনিয়া থেকে বিদায় নিবে। অতএব বুঝা গেল, আপনাদের তথাকথিত আলা হযরত সারাজীবন এ সমস্ত খাদ্য খাওয়া ও চৌর্য্যবৃত্তির মধ্যে মশগুল থেকেছেন, বিধায় তার মৃত্যুও ঐ অবস্থার মধ্যে হয়েছে।
এবার আসুন সলফে সালেহীন, বিশিষ্ট বেলায়েতধারী বুযুর্গদের অন্তিম মুহুর্তকালীন অবস্থার সময় তারা কি হালে ছিলেন দেখা যাক-
হযরত বায়েজীদ বোস্তামী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর জীবনীতে তাঁর অন্তিম মুহুর্তের অবস্থা বর্ণিত আছে এভাবে, “যখন তাঁর মৃত্যু যন্ত্রনা শুরু হলো তখন তিনি আল্লাহ্ আল্লাহ্ যিকির করতে লাগলেন। অতঃপর বললেন, “পরওয়ার দিগার! আমি কখনও গাফলত অমনোযোগীতা ভিন্ন আপনাকে স্মরণ করিনি। আর এখন প্রাণ বায়ু বের হওয়ার পথে এখনও আমি গাফিল। জানিনা আমার অন্তকরণ আপনার দরবারে হাজির হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করবে কি-না?”
“তাযকেরাতুল আউলিয়া” ২য় খন্ড ৭৮ পৃষ্ঠায় হযরত র্সারী সাকতী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর ইন্তিকালের পূর্ব মুহুর্তটির অবস্থা বর্ণিত আছে এভাবে- “হযরত র্সারী সাকতী রহমতুল্লাহি আলাইহি ইন্তিকালের পূর্ব মুহুর্তে বললেন, “আমার আশংকা হয় যে, যমীন আমাকে কবুল করবে না। তখন আমি লাঞ্ছিত হবো। আর যারা আমার প্রতি ভাল ধারণা পোষণ করেছে তাদের ধারণা আমার প্রতি তখন খারাপ হয়ে যাবে।” “তাযকিরা” কিতাবের ২য় খন্ডের ১৮১-১৮২ পৃষ্ঠায় হযরত জুনাইদ বাগদাদী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর ওফাতকালীন ঘটনা বর্ণিত আছে এভাবে, “তাঁর ওফাত নিকটবর্তী হলে তিনি সিজদায় গিয়ে জার জার হয়ে কাঁদতে লাগলেন। বলা হলো, “এই অন্তিম মুহুর্তে সিজদায় গিয়ে কাঁদার কারণ কি?” তিনি বললেন, ‘এই মুহুর্তের চেয়ে অধিক ইবাদতের মুহতাজ জুনাইদ আর কোন সময়েই ছিল না।’ এই বলে তিনি কুরআন শরীফ তিলাওয়াত করতে লাগলেন ….।”
“সীরাতে গাউসুল আযম” কিতাবে বিলায়েত সম্রাট গাউসুল আযম হযরত বড় পীর ছাহেব রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর বেসাল শরীফের অন্তিম মুহুর্তের অবস্থা বর্ণিত আছে এভাবে, “গাউসুল আযম হযরত বড় পীর ছাহেব রহমতুল্লাহি আলাইহি ইশার নামায আদায়ের পর দীর্ঘ মুনাজাত করে বলেন, “আমি আল্লাহ্ পাক-এর সাহায্য প্রার্থনা করছি। তিনি ব্যতীত কোন মাবুদ নেই। তিনি চিরঞ্জীব, তাঁর মৃত্যু নেই। তিনি কাউকেই ভয় করেন না। আমি তাঁর পবিত্রতা বর্ণনা করতেছি। হযরত মুহম্মদ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর প্রেরিত রসূল।” এ বাক্যগুলো বলার সাথে সাথে তাঁর প্রাণ বায়ু বের হয়ে জান্নাত মুখে প্রস্থান করে।”
হযরত ফরিদুদ্দীন মাসউদ গঞ্জে শোকর রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর জীবনীতে উল্লেখ আছে, “তাঁর ইন্তিকালের সময় তিনি সিজদায় গিয়ে ইয়া হাইয়্যু, ইয়া কাউয়্যূম বলে যিকির করতে লাগলেন এবং এ অবস্থায় তাঁর প্রাণ বায়ু বের হয়ে যায়।”
“তাযকিরা” কিতাবের ৫ম খন্ডের ১৯২-১৯৩ পৃষ্ঠায় বর্ণিত আছে, “হযরত মুজাদ্দিদে আল্ফে ছানী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর ইন্তিকালের কিছু সময় পূর্বে তিনি বললেন, ‘আমাকে শুইয়ে দাও।’ অতঃপর তাঁকে ক্বিবলা মুখী করে শুইয়ে দেয়া হলো। তিনি শায়িত অবস্থায় ডান হাত চেহারার নিচে রেখে যিকির করতে লাগলেন। আল্লাহ্ পাক-এর যিকির করতে করতে অল্প সময়ের মধ্যে তাঁর পবিত্র প্রাণ বায়ু আল্লাহ্ পাক-এর দরবারে চলে গেলো।” (সুবহানাল্লাহ্)
অতএব, বুঝা গেল, সল্ফে সালেহীন ও বিশিষ্ট বিলায়েতধারী বুযুর্গ, ওলীগণের ওফাতের অবস্থা এবং আহমদ রেযা খাঁর মৃত্যুর অবস্থা ভিন্নতর ছিলো। কাজেই মিথ্যাবাদী ইউসুফ জিলানী তাদের তথাকথিত আলা হযরতের অগ্রিম ফাতিহার কথা অস্বীকার করে মাসিক আল বাইয়্যিনাত-এর উপর আক্রোশবশতঃ
لعنة الله على الكاذبين.
(মিথ্যাবাদীদের উপর আল্লাহ্ পাক-এর লা’নত বর্ষিত হোক) বলেছে।
এখন আরবী ইবারত, কিতাবের পৃষ্ঠা, মুছান্নিফের নাম উল্লেখসহ বিস্তারিতভাবে আমরা প্রমাণ করে দিলাম যে, আসলে মাসিক আল বাইয়্যিনাত নয় বরং সুন্নীয়তের অন্তরালে ওহাবী পত্রিকা তরজুমানের উপরই প্রকৃতপক্ষে
لعنة الله على الكاذبين.
(মিথ্যাবাদীদের উপর আল্লাহ্ পাক-এর লা’নত বর্ষিত হোক) বর্তাবে।
এজন্য “প্রকৃত ওহাবী কারা” কিতাবের লিখক হাফিজ মুহম্মদ তাজুল ইসলাম আহমদ রেযা খাঁর অন্তিম মুহুর্তে ফাতিহার ফিরিস্তি দেখে মন্তব্য করেছেন, “আহমদ রেযা খাঁ আসলে একজন পেটের মুজাদ্দিদ ছিলেন।”
-মুহম্মদ মনিরুল ইসলাম (মুনির), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
আওলাদে রসূলগণের ফযীলত সম্পর্কে মহান আল্লাহ্ পাক পবিত্র কালামুল্লাহ্ শরীফে ইরশাদ করেন,
قل لااسئلكم عليه اجرا الا المودة فى القربى.
অর্থঃ- “হে হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আপনি বলুন, (হে বিশ্ববাসী) আমি তোমাদের নিকট নুবুওয়াতের দায়িত্ব পালনের কোন প্রতিদান চাইনা। তবে আমার আত্মীয়-স্বজনদের সাথে সদাচরণ করবে।” (সূরা শূরা/২৩)
অর্থাৎ সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মহান আল্লাহ্ পাক প্রদত্ত নুবুওয়াতের দায়িত্ব পালনের কোন বিনিময় উম্মতের কাছে চাননি। তবে তাঁর সম্মানিত বংশধর বা আওলাদগণের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করার, তাঁদের তাযীম-তাকরীম করার, তাঁদের অনুসরণ-অনুকরণ করার তাক্বীদ দিয়েছেন।
উপরোক্ত আয়াত শরীফের তাফসীরে কিতাবে উল্লেখ করা হয়েছে, হযরত ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বর্ণনা করেন, যখন এ আয়াত শরীফ নাযিল হয় তখন হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ জিজ্ঞাসা করেছিলেন, হে আল্লাহ্ পাক-এর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! তাঁরা কারা, যাদের প্রতি আল্লাহ্ পাক সম্মান প্রদর্শনের নির্দেশ দিয়েছেন? হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, তাঁরা হলেন- হযরত ফাতিমা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা ও তাঁর আওলাদগণ।” (তাফসীরে ইবনে আবি হাতিম, ইবনে কাসীর/৭/১৭৯, মাযহারী/৭/৩১৮)
উপরোক্ত আয়াত শরীফ ও হাদীস শরীফ দ্বারা এটাই প্রতীয়মান হয় যে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বংশধর যা হযরত ফাতিমা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা ও হযরত ইমাম হাসান ও হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমা-এর মাধ্যমে জারি রয়েছে তথা যারা “সাইয়্যিদ বা আওলাদে রসূল” তাঁদের তাযীম-তাকরীম করা, তাঁদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা ফরজ-ওয়াজিবের অন্তর্ভূক্ত।
এ সম্পর্কে কিতাবে উল্লেখ করা হয়েছে, “নিঃসন্দেহে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি সম্মান রক্ষা করা ও তাঁর আত্মীয়-স্বজন তথা বংশধরগণের প্রতি সম্মান রক্ষা করা আবশ্যকীয়ভাবে ফরজ।” (তাফসীরে মাজহারী-৮/৩১৮)
আর এ কারণেই সমস্ত হক্কানী-রব্বানী আলিম-ওলামা তথা ইমাম-মুজতাহিদগণ আওলাদে রসূলগণকে বর্ণনাতীত তাযীম-তাকরীম ও সম্মান প্রদর্শন করেছেন।
এ সম্পর্কে ইমামুল আইম্মা, ইমামুল আ’যম, হাকিমুল হাদীস হযরত ইমাম আবু হানীফা রহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর জীবনী মুবারকের একটি ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। একবার তিনি একস্থানে বসে স্বীয় ছাত্রদেরকে র্দস দিচ্ছিলেন। তখন তিনি কিছুক্ষণ পর বারবারই র্দস বন্ধ করে দঁড়িয়ে যেতেন। যার কারণে ছাত্রদের পড়া বুঝতে ও ধরতে অসুবিধা হতো। যখন র্দস শেষ হলো, তখন ছাত্ররা প্রশ্ন করল, “হে ইমামে আ’যম রহমতুল্লাহি আলাইহি! বেয়াদবী ক্ষমা করবেন, আমরা লক্ষ্য করেছি যে, আপনি বারবার র্দস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে যেতেন এর পিছনে কি কারণ রয়েছে?” উত্তরে তিনি বললেন যে, “তোমরা নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছ যে, আমাদের র্দস গাহের পাশেই কিছু ছোট ছেলেরা দৌঁড়াদৌঁড়ি করতেছিল। তন্মধ্যে অমুক ছেলেটি বার বার আমার নিকটবর্তী হলেই আমি দাঁড়িয়ে যেতাম।” ছাত্ররা বললো যে, “হ্যাঁ, আমরা তা লক্ষ্য করেছি। তবে এ ছোট ছেলেটি আপনার নিকটবর্তী হলে কেন দাঁড়িয়ে যেতেন অনুগ্রহ করে তার কারণ আমাদেরকে জানিয়ে দিন?” তখন ইমামে আ’যম হযরত আবূ হানিফা রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন যে, “দেখ এ ছেলেটি আওলাদে রসূল বা আল্লাহ্ পাক-এর রসূলের বংশধর। তাঁর সাথে আল্লাহ্ পাক-এর রসূলের রক্তের সম্পর্ক রয়েছে। সেজন্য যখনই তিনি আমাদের দরসগাহের নিকটবর্তী হন তখনই আমি তাঁর সম্মানার্থে দাঁড়িয়ে যাই। কেননা আল্লাহ্ পাক-এর রসূলের আওলাদগণকে তা’যীম-তাকরীম ও সম্মান প্রদর্শন করা ঈমানের অঙ্গ তথা আল্লাহ্ পাক ও হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নির্দেশ।” (সুবহানাল্লাহ্)
অথচ আহমদ রেযা খাঁ ও তার অনুসারীরা সেই আওলাদে রসূল, মুজাহিদে আযম, ছহেবে ইলমুল্লাদুন্নী হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী রহমতুল্লাহি আলাইহিকে নানা প্রকার গালি-গালাজ, অপবাদ ও কুফরীর ফতওয়া দিয়ে নিজেদেরই হাক্বীক্বত ফুটিয়ে তুলেছে।
-মাওলানা, মুফতী মুহম্মদ রুহুল আমীন, নেছারাবাদ, পিরোজপুর
নামাজ মানুষকে গুণাহ্মুক্ত করে। হাদীস শরীফে আছে, “কারো বাড়ীর সামনে যদি একটি কুয়ো থাকে আর সে যদি তাতে দৈনিক পাঁচবার গোসল করে তবে যেমন তার গায়ে কোন ময়লা থাকেনা তেমনি কেউ যদি দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়ে তাহলেও তার আমলনামায় কোন গুণাহ্ থাকেনা।” অন্য হাদীস শরীফে এসেছে, “ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু এক ব্যক্তি সম্পর্কে আরজ করলো, ইয়া রসূলাল্লাহু ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! অমুক ব্যক্তি নামাযও পড়ে আবার গুণাহ্ও করে। শুনে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, সত্যিই যদি সে ব্যক্তি নামায পড়ে তবে এই নামাযই তাকে গুণাহ্ থেকে ছাড়িয়ে আনবে।”(সুবহানাল্লাহ)
পাঠক! এই হাদীস শরীফের আলোকে এটাই ছাবেত হয় যে নামায মানুষকে গুণাহ্ মুক্ত করে। কিন্তু আফসুস যে মুসলমানের জন্য নামাযের মাধ্যমে গুণাহ্ মাফের মত সে মহৎ বিষয়টিকেও মাহিউদ্দীন তার মদীনা পত্রিকায় কলঙ্কিত করেছে।
মাসিক মদীনা জুন ও আগষ্ট/৯৩ ঈসায়ী সংখ্যায় বলেছে, “মেয়েরা মসজিদে গিয়ে পুরুষদের জামায়াতে শরীক হয়ে নামায আদায় করতে পারবে।” (দলীল- নেই)
মাসিক আল বাইয়্যিনাতঃ মহিলাদের জামায়াতে নামায পড়া মাকরূহ্ তাহরীমী।” (দলীল- মিরকাত, দুররুল মুখতার, ওমদাতুল ক্বারী, গায়াতুল আওতার ইত্যাদি)
পাঠক! মহিলারা নামায পড়তে গেলে তাদের দ্বারা বেপর্দা হয়ে যাওয়ার কারণে, ঘর-সংসার, স্বামী-ছেলে পালন ইত্যাদির দারুণ ব্যাঘাত ঘটার ফলে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা, হযরত ওমর ফারুক রদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু সে যুগেই মহিলাদের জামায়াত নিষিদ্ধ করেছেন। উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহা একথা পরিপূর্ণভাবে গ্রহণ করেছেন এবং এটা ইজ্মায়ে আযীমত হয়ে গেছে। যা অস্বীকার করা কুফরী। আর জাহিল মাহিউদ্দীন শুধু যে কুফরী কাজ করে নিজেরই ক্ষতি করছে তা নয় বরং এর দ্বারা সে বর্তমান ফিৎনা-ফাসাদের জামানায় নেকীর ছুরতে পাপের প্রচলন করতে চাইছে। যে নামায দ্বারা মুছল্লীরা গুণাহ্মুক্ত হত সে নামাযের দ্বারাই সে মহিলাদের বেপর্দা করতে চাইছে, ঘর ছাড়া করতে চাইছে-এর পেছনে মূল কারণ হল মাহিউদ্দীন গং বাহ্যতঃ এন,জি,ও বিরোধী আন্দোলন করলেও, নারীবাদী আন্দোলনের বিরুদ্ধে বললেও আসলে স্বার্থান্বেষী কারণে তাদের সাথে আঁতাত করেছে। যে কারণে অন্যভাবে না পেরে এখন মসজিদে মহিলা জামায়াতের নামে ঈদ, জুমুয়া ইত্যাদির দোহাই দিয়ে মহিলাদের ঘর ছাড়া করে ইবলিসের দোসর সাজছে (আউযুবিল্লাহি মিনাশ্ শাইত্বনির রজীম)।
– মুহম্মদ লিসানুল্লাহ্।
“মামা, মামা! দেখেন, দেখেন বাইয়্যিনাত-এর বিরোধীতা করতে গিয়ে তরজুমানের অবস্থা কি হয়েছে!” দশ বছর বয়সী স্বীয় ভাগ্নের বিস্মিত বক্তব্যে আমি অপ্রস্তুত হলাম। আমাকে ধাতস্থ করার জন্য সে তরজুমানের নভেম্বর/২০০০ সংখ্যাটি সামনে মেলে ধরলো। পত্রিকার প্রচ্ছদে চোখ বুলিয়ে ব্যাপারটা আচ করতে পারলাম বটে। তবুও তার বক্তব্যটা শোনার জন্য বললাম, “কেন, কি হয়েছে?” সে জবাব দিলো, “বুঝতে পারলেন না। এই প্রচ্ছদে সিঁড়ি দেয়া আছে আর সিঁড়ির উপরে মসজিদ আছে। আর প্রতিটি সিড়িতে খোদাইকরা আছে তরজুমান।”
সুতরাং মসজিদে যেতে হলে যদি সিড়ি মাড়াতে হয় তবে কি ব্যাপারটা এই প্রকাশ পায়না যে, তরজুমান এখন এতই কুফরী প্রকাশ করেছে যে, মসজিদে ঈমানদার হয়ে প্রবেশ করতে হলে, মসজিদের বাইরের সিড়িতে তরজুমানকে পায়ে মাড়িয়ে অতপর মসজিদে প্রবেশ করতে হবে। বিষয়টি ন্যাক্কারজনক হলেও প্রচ্ছদ চিত্র তাই প্রমাণ করে, বিধায় আমি চুপ হয়ে গেলাম।
-মুহম্মদ রহমতুল্লাহ, চান্দাইশ, চট্টগ্রাম।
রেযাখানী তরজুমান গংদের ইল্মের পরিধি ও জিহালতির আরেক নমুনা
ইল্ম ও সহীহ্ সমঝের স্বল্পতাই সমাজে ফিৎনা বিস্তারের মূল কারণ। ৭২টি বাতিল ফিরক্বাসহ কাদিয়ানী, বাহাই ইত্যাদির উৎপত্তির মূলেও সেই একই কারণ।
আর তারই বাস্তব নমুনা আমরা দেখতে পাচ্ছি রেযাখানী তরজুমান গংদের মাঝে। জাতি নূর, ছানী আযান, নফল নামাযের জামায়াত, দুই সিজ্দার মাঝখানে হাদীস শরীফে বর্ণিত সম্পূর্ণ দোয়া পড়া, ইক্বামতের সময় দাঁড়ানো, বাইয়াত হওয়া, ছবি তোলা, ধুমপান করা সহ আরো অনেক বিষয়ে হাদীস, তাফসীর ফিক্বাহ ও ফতওয়ার কিতাবে সুস্পষ্ট বর্ণনা থাকার পরও মনগড়া বক্তব্য প্রদান করে তারা এটাই প্রমাণ করেছে যে, আসলে তারা চরম স্তরের জাহিল।
তাদের জিহালতীর অনেকটাই তারা প্রকাশ করে দিয়েছে নভেম্বর/২০০০ঈঃ সংখ্যার “খোলা চিঠিতে।” তাহলে দেখুন তাদের ইল্মের পরিধি ও জিহালতীর নমুনা।
তারা নভেম্বর” ২০০০ঈঃ সংখ্যার ২৮ পৃষ্ঠায় লিখেছে- ইমামুল হুদা হযরত আব্দুল হাই রহমতুল্লাহি আলাইহি নাকি “ওমদাতুর রেয়ায়া” কিতাব লিখেছেন। হায়রে! জাহিল কাকে বলে!
আসলে জাহিলদের জন্যে এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। আর স্বাভাবিক বলেই তারা “রদ্দুল মুহতার” কিতাবকে বার বার “রদ্দুল মুখতার” লিখছে। পূর্বের একটি সংখ্যায় তো তারা লিখেছেই, বর্তমান ডিসেম্বর’ ২০০০ঈঃ সংখ্যার ৬০ পৃষ্ঠাতেও يرد المختار -“রদ্দুল মুখতার” লিখেছে। কাজেই যারা “রদ্দুল মুহ্তার” কিতাবকে রদ্দুল মুখতার লিখতে পারে, তারা এটাও লিখতে পারে যে, “ওমদাতুর রেয়ায়ার” লেখক ইমামুল হুদা আব্দুল হাই রহমতুল্লাহি আলাইহি।
পাঠক! মাসিক আল বাইয়্যিনাত-এর ৮২ তম সংখ্যায় যাকে “ইমামুল হুদা’ লক্ববে সম্বোধন করা হয়েছে, তিনি আমীরুল মু’মিনীন, মুজাহিদে আযম, আওলাদে রসূল হযরত সাইয়্যিদ শহীদ আহমদ বেরেলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর খলীফা এবং ইমামুল মুফাসসিরীন, ফখরুল ফুক্বাহা, মুজাদ্দিদে মিল্লাত, শায়খুল মাশায়েখ হযরত শাহ আব্দুল আযীয রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর জামাতা ঠিকই, কিন্তু তিনি “ওমদাতুর রেয়ায়া” কিতাবের “মুছান্নিফ বা লেখক” নন। বরং “ওমদাতুর রেয়ায়া” কিতাবের লেখক হচ্ছেন- মাওলানা আব্দুল হাই লাখনবী ছাহেব। জাফরুল মুয়াস্সেরীন ও ফতওয়ায়ে আব্দুল হাই লাখনবীর মুকাদ্দামাটি একটু ভাল করে পড়ে দেখুন। উক্ত কিতাবের ৫ পৃষ্ঠায় স্পষ্ট উল্লেখ আছে যে,
উর্দূ কম্পোজ করতে হবে
অর্থঃ- “(মাওলানা আব্দুল হাই লাখনবী) অতঃপর ওমদাতুর রেয়ায়া নামে একটি হাশিয়া লিখেন।”
পাঠক! মাওলানা আব্দুল হাই লাখনবী ছাহেবের জন্ম হলো ১২৬৪ হিজরী সনের ২৬শে জিলক্বদ। আর ইমামুল হুদা হযরত আব্দুল হাই রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর ইন্তিকাল হলো ১২৪৩ হিজরী সনের ৮ই শা’বান। অর্থাৎ ইমামুল হুদা হযরত আব্দুল হাই রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর ইন্তিকালের ২১ বৎসর ৩ মাস ১৮ দিন পরে, “ওমদাতুর রেয়ায়া” কিতাবের লেখক মাওলানা আব্দুল হাই লাখনবী সাহেব জন্ম গ্রহণ করেন। আর তারই লেখা কিতাব “ওমদাতুর রেয়ায়া” কে তরজুমান গং চালিয়ে দিল ইমামূল হুদা হযরত আব্দুল হাই রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর নামে!
যারা কিতাবের নাম ও লেখকের পরিচিতিই জানেনা তারা আবার কোন মুখে নিজেদেরকে আলিম বলে প্রচার করে? আর যারা একজনের কিতাবকে আরেকজনের নামে চালিয়ে দিয়ে স্বার্থ হাছিল করতে চায় তারা যে চরম স্তরের জাহিল ও গোমরাহ্ তাও কি বলার অপেক্ষা রাখে?
-মুহম্মদ আব্দুল্লাহিল মামুন, চট্টগ্রাম।
এতদিন জানতাম যে, হাত-পায়ের রগ কাটা ইসলামের নামধারী একটি স্বার্থান্বেষী দলই সন্ত্রাসের ধারক। কিন্তু হালে দেখা যায় যে তরজুমান গং নিজেরাই স্বীকার করছে যে তারা বোমাবাজ। বিচিত্র কিছু নয় যে, এই বোমাবাজদের আতঙ্কে ও অব্যাহত হুমকীতে মুনিরীয়া সিলসিলার জনৈক ছাহেবজাদা আল বাইয়্যিনাত অফিসে এসে ওদের সম্পর্কে দিয়ে যাওয়া তথ্য ও মন্তব্য অবশেষে নিরূপায় হয়ে বদলাতে বাধ্য হয়েছে।
বলাবাহুল্য, ফুরফুরা, জৈনপুরী, আযমগড়ী, আরকানিয়া, মুনিরীয়া, গারাঙ্গিয়া, সোনাকান্দা, ছারছীনা ইত্যাদি আমানত শাহ্ রহমতুল্লাহি আলাইহি, বায়তুশ শরফ সিলসিলাগুলোর এমনকি দেওবন্দী সিলসিলার পূর্ব-পুরুষ হাজী ইমদাদুল্লাহ্ মুহাজেরে মক্কী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এরও পূর্ব-পুরুষ তথা প্রাণপুরুষ, তের শতকের মুজাদ্দিদ, আমীরুল মু’মিনীন, শহীদে আযম, সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি। কিন্তু জাহিল, জালিম তরজুমান গং শতাধিক সিলসিলার প্রাণ পুরুষকেই কাফির ফতওয়া দিয়ে বসে আছে। এতে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখতে না পারলেও ভিতরে ভিতরে ফুঁসছিলেন অনেকেই।
আর যখন আল বাইয়্যিনাতে সে প্রতিবাদ পত্রস্থ হল তখন বাধ-ভাঙ্গা জোয়ারের মত হৃদয়ের আবেগ প্রকাশ করলেন সবাই। আর তেমনই তরজুমান গং এর বিরুদ্ধে জমে থাকা দীর্ঘদিনের সে ক্ষোভ আরো প্রকাশ করতে এসেছিলেন মুনিরীয়া সিলসিলার এক ছাহেবজাদা।
সেদিন ছিল এক বিয়ের অলীমা। যথারীতি অন্য অনেক মেহমানের সাথে তারাও মেহমান সেজে বসেছিলেন। আপ্যায়ণ পর্বের পর আল বাইয়্যিনাত অফিসে এসে জানালেন তরজুমান গং সম্পর্কে নিজের অনেক ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া। বললেন তরজুমান সম্পর্কে তাদের অনেকেরই ক্ষোভ দীর্ঘ দিনের। এখন যখন আল বাইয়্যিনাতে তরজুমান গং এর ভিত্তিহীন কথার জবাব এসেছে আমীরুল মু’মিনীন, সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী রহমতুল্লাহি আলাইহিকে তাদের অবৈধভাবে দেয়া কাফির ফতওয়ার প্রতিবাদ এসেছে তখন তারা বিমোহিত, আনন্দে আপ্লুত।
তারা আরো ব্যক্ত করলেন যে, আল বাইয়্যিনাত যখন তরজুমানের বিরুদ্ধে লেখা শুরু করেছে তখন তরজুমান এবার বঙ্গোপসাগরে ভেসে যাবে। তারা আল বাইয়্যিনাত কর্তৃপক্ষকে ফটিকছড়িতে মাহ্ফিলের আমন্ত্রণ জানালেন এবং দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে জানালেন যে, “তরজুমান গং সম্পর্কে আমাদের কাছে আরো অনেক তথ্য আছে আপনারা লিখতে থাকুন।” কিন্তু এখন সে বক্তব্যকে বিকৃত করে উপস্থাপন করা হচ্ছে যে, “সাইয়্যিদ আহমদ বেরেলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি সম্পর্কে আমাদের কাছে আরো অনেক তথ্য আছে, আপনারা প্রকাশ করুন।”
সমঝদার মাত্রই একথার অন্তরালে অসারতা অনুভব করতে পারেন। কারণ আমীরুল মু’মিনীন, মুজাহিদে আযম, সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি সম্পর্কে অভূতপূর্ব অনেক তথ্য আল বাইয়্যিনাত অফিসে সমৃদ্ধ আছে বলেই আল বাইয়্যিনাত তার সম্পর্কে অনেক কিছু লিখতে পেরেছে। তাঁর সম্পর্কে লেখার চেয়ে রেযা খানী তথা তরজুমান গং সম্পর্কে হাক্বীক্বত প্রকাশ করাটাই আলোচ্য ও প্রাসঙ্গিক বিষয়। সুতরাং তিনি যে তরজুমান গং সম্পর্কেই বলেছেন তা এমনিতেই বোঝা যায়।
আর পরিশেষে যা বিশেষ বলার বিষয় তাহলো, মু’নিরীরা সিলসিলার উক্ত ছাহেবজাদার বক্তব্য তার সামনেই সংরক্ষণ করা হয় । এমনকি তার সামনে লেখাও হয়। এছাড়া আরো অনেক স্পষ্ট দলীল ও সাক্ষ্য প্রমাণ রয়েছে। কেবল সময়ের প্রেক্ষিতেই তা প্রকাশ করা হবে (ইন্শাআল্লাহ্)।
-মুহম্মদ আলাউদ্দীন আল আজাদ, রাজারবাগ, ঢাকা।
“হাসনাইন রেযা খা প্রণীত ওসায়া শরীফ”-এ পাওয়া গেল, “রেযা খা মৃত্যুর ২ ঘণ্টা ১৭ মিনিট আগে ওসীয়ত করেছিলেন, “তার বেছাল প্রাপ্তির স্থান হতে সকল ছবি সম্বলিত কার্ড, মুদ্রা ও খাম অপসারণ করতে হবে।” আরো বর্ণিত আছে যে, “রেযা খা ছবি সম্বলিত টাকা-পয়সাগুলোও কাছে রাখতে চাননি।”
সুতরাং তরজুমানের অনেক অনেক কপি এবং বর্তমানে ডিসেম্বর/২০০০ ঈসায়ী কপি যে রেযা খা ছুড়ে ফেলত তা কি বলার অপেক্ষা রাখে? কারণ এর ৬১ পৃষ্ঠায় রয়েছে, “জলজ্যান্ত জেব্রার ছবি।” আর এভাবে কেবল জেব্রার ছবি সম্বলিত তরজুমানই নয় বরং অহরহ ছবি তোলার কারণে ব্যক্তি তাহের শাহ যে কোন আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হয় তাও বলার অপেক্ষা রাখেনা।
-মাওলানা মুহম্মদ আব্দুর রহমান, রাজারহাট, কুড়িগ্রাম।
অদক্ষ জলীল তাহার অব্যাহত প্রতারণার দ্বারা বুলেটিনের নামে যে অবৈধ মাসিকটি প্রকাশ করিতেছে উহাতে জাকারিয়া খান নামক জনৈক মাওলানার নাম দেখিতে পাওয়া গিয়াছে। উহার নিবাস লিখা হইয়াছে রাউজান, চট্টগ্রাম। রাউজান চট্টগ্রামের অনেকগুলি থানার মধ্যে একটি। বিশ্বের ঘনবসতিপূর্ণ দেশ বাংলাদেশ। থানা হিসেবে রাউজানেও লোকসংখ্যা কম নয়। লক্ষ লক্ষ লোকের মধ্যে মাওলানা জাকারিয়া খানের আবাস কোথায়? তাহা অন্ধকারে পিঁপড়া খুঁিজবার মতই দুস্কর বটে। আর এইভাবে বাহাসের নামে আঁধারে লুকোচুরি খেলিবার মতই নূতন এক অদ্ভুত প্রতারণার আশ্রয় লইয়াছে অদক্ষ জলীল গং। অজ্ঞাত কুলশীল এই জাকারিয়াকে প্রতারণামূলকভাবে দাড় করানো হইয়াছে আল বাইয়্যিনাত-এর বাহাস গ্রহণকারী হিসাবে। বাংলায় একটা প্রবাদ আছে,
“হাতি ঘোড়া গেল তল
পিপীলিকা বলে কত জল (পানি)”
কিন্তু ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় ইহা নূতন কিছু নহে। নমরূদ, ফিরআউন খোদ খোদা পর্যন্ত দাবী করিয়াছে। নমরূদ আকাশে তীর নিক্ষেপ করিয়া, রক্তমাখা তীর ফেরত পাইয়া আকাশের খোদাকে হত্যা করিবার (নাউযুবিল্লাহ্) মত হঠকারিতা মূলক আনন্দে বিভোর হইয়াছে। মুসায়লামাতুল কাযযাব, খতামুন্নাবিয়্যীন, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সমকক্ষ হইবার তথা মিথ্যা নবী দাবী করিবার মত দুঃসাহস দেখাইতেছে। কাফির কাদিয়ানী গং এখনো পর্যন্ত নূতন নবী দাবীতে অটল রহিয়াছে। সুতরাং একটা কিছু করিয়া ফেলিয়া অথবা বলিয়া ফেলিলে যদি খুব কিছু হইত তবে তাহারাই বড় হইত। কিন্তু ভিত্তিহীনভাবে উদ্দেশ্যমূলকভাবে কিছু বলা মূলতঃ দূরভিসন্ধিতার লক্ষণ। যুগে যুগে বাহাসের নামে প্রতারণাকারীরা এই ধরণের হঠকারীতারই আশ্রয় লইয়াছে। তাহারা ইল্ম-কালাম বা যোগ্যতা দ্বারা নয় বরং ছলনা, ধূর্ততা আর শঠতার দ্বারা বাহাসে প্রতিপক্ষকে কিরূপে নিশ্চুপ রাখা যায় সেই ধরণের কুটকৌশলই অন্বেষণ করিয়াছে। এই ধরণের বাতিল পন্থীরা যে কত কুটকৌশলের আশ্রয় নিতে পারে তাহার একটি উদাহরণ বর্ণিত আছে, “এক ধূর্ত ব্যক্তি গ্রামে গিয়া চিন্তা করিলো কোন উপায়ে এলাকার আলিমদের পাততাড়ি উঠাইয়া দিতে হইবে। সে এক পন্থা অবলম্বন করিলো। সমস্ত আলিমদিগকে প্রশ্ন করিতে লাগিলো। সে সকলকে জিজ্ঞাসা করিতে লাগিলো, বলুন তো “نمى دانم” বাক্যের অর্থ কি? যদি কেহ ইহার অর্থ বলিতে না পারিতেন তবে তো অপদস্থ হইতেনই আবার অর্থ জানিলেও তাহাকে এইটাই বলিতে হইতো যে, “আমি জানিনা।” কেননা, “نمى دانم” বাক্যের অর্থ এইটাই। অনেকটা ইংরেজীতে ও ফড়হঃ শহড়ি এর বাংলা অর্থ “আমি জানিনা’র মত। তখন সে জনতাকে লক্ষ্য করিয়া বলিতো, তোমাদের আলিম নিজেই স্বীকার করিলো যে, ইহার অর্থ সে জানেনা। নিজের মূর্খতা সে নিজেই স্বীকার করিয়াছে। গ্রামবাসীরা তাহাতে বুঝিত যে, বাস্তবিকই তাহাদের আলিম মূর্খ।”
অজ্ঞাতকুলশীল জাকারিয়াও এই ধরণের কিছু প্রতারণার আশ্রয় গ্রহণ করিতে চাহিয়াছে বটে। সে বলিয়াছে, রাজারবাগ শরীফের তরফ হইতে বাহাসের চ্যালেঞ্জ সে গ্রহণ করিয়াছে। অথচ রাজারবাগ শরীফের পক্ষ হইতে চ্যালেঞ্জের যে ঘোষণা দেওয়া হইয়াছে উহা যে অদ্যাবধি পড়িয়া দেখে নাই অথবা পড়িলেও তাহাতে শঠতার আশ্রয় লইয়াছে। নচেৎ সেইখানে রাজারবাগ শরীফের বাহাসের ঘোষণায় স্পষ্টতঃ আক্বীদা আমলের কথা বলা হইয়েছে সেইখানে সেই আক্বীদা-আমল সম্পর্কে সে নেহায়েত চুপটি মারিয়া রহিয়াছে। যে কুফরী আক্বীদা ও শরীয়তবিরোধী আমল ও বক্তব্য নিয়া তাহাদের সাথে দ্বন্দ। যেমন, আল্লাহ্ পাক-এর নূর। অর্থাৎ আলো বা জ্যোতি, আল্লাহ্ পাক-এর হাবীব আল্লাহ্ পাক-এর জাতের অংশ, ছানী আযান মসজিদের ভিতরে দেয়া ফরয নামাযে দু’সিজদার মাঝখানে হাদীসে বর্ণিত দোয়াটি পড়া চারজন মুক্তাদিসহ নফল নামায জামায়াতে পড়া, ছবি তোলা ও প্রকাশ্য বেপর্দা মহিলার সাহিত সাক্ষাত, আমীরুল মু’মিনীন, শহীদে আযম, হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর প্রসঙ্গ” সেই ব্যাপারে তাহাদের কোন রা নাই।
বরং কাফিররা যেমন প্রশ্ন করিত, “উনি কেমন রসূল, যিনি বাজারে যান, খাদ্য খান।” ঠিক সেই কায়দায়ই যেন জাকারিয়া প্রশ্ন করিয়াছে, উনি কেমন আওলাদে রসূল, কুতুবুল আলম, দাস্তগীর, ইত্যাদি। ব্যাপারটি এইরকম যে, কেহ দাবী করিতেছে যে, নামায পড়া সম্পর্কে কুরআন শরীফের কোথায় কোথায় আছে তাহা দেখাইয়া দিতে হইবে। অথচ আলিফ, বা, তা, ছা অক্ষর তাহার চেনা নাই! মূলতঃ এইগুলি হইতেছে, ইল্মে তাছাউফের বিষয়। যাহার সাথে জড়িত পাছ-আনফাছ যিকির, দশ লতিফার যিকির, কাশফ-কারামত, বেলায়েত-কামালত হাছিলের বিষয়।
এই সমস্ত বিষয় নামধারী অতি সুন্নীদের জন্য আকাশ কুসুম কল্পনা হইলেও- আলহামদুলিল্লাহ্, ঢাকা রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর ছাহেব ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলী-এর বেমেছাল রূহানী ফয়েজের উছীলায় অনেক শিশু-কিশোররা পর্যন্ত সেই সমস্ত মাকাম, যোগ্যতা হাছিল করিতেছে। অজ্ঞাত কুলশীল মাওলানা জাকারিয়ার মূর্খতাসূচক বক্তব্য শুনিয়া আল্লাহ্ পাক-এর রহমতে এই ধরণের যোগ্যতাধারী এক কিশোর যে “মুহম্মদিয়া জামিয়া শরীফ”-এর ছাত্র নাম- মুহম্মদুল্লাহ্ সে আমার লিখার পাশে আসিয়া বিনীতভাবে আরজ করিলো যে, মাওলানা জাকারিয়ার সহিত সে-ই বাহাসে বসিতে প্রস্তুত। এমনকি মাওলানা জাকারিয়া যেই সব প্রশ্ন করিয়াছে তাহার উত্তর দিতেও প্রস্তুত। তবে তাহার আগে অবশ্যই জাকারিয়াকে নিম্নোক্ত প্রশ্নের উত্তর দিতে হইবে।
১. আল্লাহ্ পাক-এর রসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে তাহার অনেকবার জিয়ারত হইয়াছে। কথোপকথন হইয়াছে। কিন্তু অজ্ঞাত কুলশীল জাকারিয়ার তাহা হইয়াছে কি? কথোপকথন হইয়াছে কি? হইলে জাকারিয়া রসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞাসা করিয়াই জানিতে পারিত।
২. তাহার সবগুলি লতিফার যিকিরই জারি আছে। মাওলানা জাকারিয়ার তাহা জারি আছে কি?
৩. থাকিলে কোন লতিফার যিকিরের কি হাল জাকারিয়া উদ্বৃত করুক।
৪. কোন লতিফার নূর কি রং অজ্ঞাত কুলশীল জাকারিয়া তাহা বিবৃত করুক।
৫. তাহার কাশ্ফ আল্লাহ্ পাক-এর রহমতে খোলা। কিন্তু মাওলানা জাকারিয়ার কাশ্ফ কি খোলা? থাকিলে তাহা বলুক।
৬. আর এই সবকিছু হাছিল হইয়া থাকিলে তাহা কাহার মাধ্যমে হইয়াছে তাহা পেশ করুক।
৭. যদি কাহারো মাধ্যমে হইয়া থাকে তাহা ইহলে যাহার মাধ্যমে হইয়াছে সে পীর ছাহেবই যে তদ্রুপ যোগ্যতাধারী ব্যক্তি তাহার সুস্পষ্ট প্রমাণও অজ্ঞাত কুলশীল জাকারিয়াকে দিতে হইবে।
৮. সেই পীর ছাহেবের বংশ কি তাহাও অজ্ঞাত কুলশীল জাকারিয়াকে পেশ করিতে হইবে এবং জাকারিয়ার ধারণা অনুযায়ী তাহার প্রমাণও দিতে হইবে।
৯. আর অজ্ঞাত কুলশীল জাকারিয়া যে নিজের নামের পিছনে খান শব্দটি সংযোজন করিয়াছে এই খান বংশের প্রতিভু হিসাবে তাহাকে ও তাহার প্রমাণ পেশ করিতে হইবে এবং খান বংশের প্রবর্তকের সাথে জাকারিয়া খানের সংযোজক সিলসিলার বিস্তারিত প্রমাণ দেখাইতে হইবে।
১০. রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর ছাহেব ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলী তাঁহার ওয়াজ শরীফে অভূতপূর্বরূপে যেইরূপ অনেক অনেক হাদীস শরীফের উদ্বৃতি, প্রজ্ঞাপূর্ণ ব্যাখ্যা দিয়া থাকেন সেই তুলনায় অজ্ঞাত কুলশীল জাকারিয়া তাহার ওয়াজে কয়টি হাদিস শরীফ উচ্চারণ করিয়া থাকে তাহার তুলনামূলক তালিকা দিতে হইবে। এবং হাদীসে রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর ছাহেব ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলী-এর বেমেছাল দখল, যাহা তাঁহার ওয়াজ, লিখনীতে দিনের সুর্যালোকের মত স্পষ্ট, তাহা সত্ত্বেও অজ্ঞাত কুলশীল জাকারিয়া তাহা দেখিতে না চাহিয়া পেঁচার মত অহেতুক ভাবে রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর ছাহেব ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহল আলী-এর হাদীস শরীফের ইল্ম সম্পর্কে, প্রশ্ন করিল তাহারও সদুত্তর দিতে হইবে।
এই পর্যন্ত বলিয়া উক্ত কিশোরটি তাহার প্রত্যয় দীপ্ত কক্তে ব্যক্ত করিলো, “এই দশটি প্রশ্নের উত্তর দিলে আমি অজ্ঞাত কুলশীল জাকারিয়া কেন উহাদের অদক্ষ জলীল তথা তাহের শাহ্র সহিতও বাহাসে বসিতে হিম্মত রাখি ইনশাআল্লাহ্ ।”
কিশোরের প্রত্যয়দ্বীপ্ত কক্ত, প্রজ্ঞাপূর্ণ কথা আমাকে বিমোহিত করে। সঙ্গতকারণেই অদক্ষ জলীলের অবৈধ প্রকাশনায় পত্রস্থ অজ্ঞাত কুলশীল মাওলানা জাকারিয়ার বাহাসের চ্যালেঞ্জ গ্রহণের জবাবে কিশোরের এই বক্তব্য জানাইয়া পাঠকের সাথে আমিও অপেক্ষা করিতে থাকিলাম।
-মাওলানা মুহম্মদ আব্দুল্লাহিল মাসুম, গোড়ান, ঢাকা।