মতামত

সংখ্যা: ২৪৮তম সংখ্যা |

যুগের আবূ জাহিল, মুনাফিক ও দাজ্জালে কাযযাবদের বিরোধিতাই প্রমাণ করে যে, রাজারবাগ শরীফ উনার হযরত মুর্শিদ ক্বিবলা আলাইহিস সালাম তিনি হক্ব।

খারিজীপন্থী ওহাবীদের মিথ্যা অপপ্রচারের দাঁতভাঙ্গা জবাব-১১৯

মূলত, যুগে যুগে মিথ্যাবাদী আর মুনাফিকরাই হক্বের বিরোধিতা করেছে, হক্বের বিরুদ্ধে অপপ্রচার করেছে। তাই মহান আল্লাহ পাক রব্বুল আলামীন তিনি পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে মুনাফিকদেরকে ‘কাযযাব’ বা মিথ্যাবাদী বলে উল্লেখ করেছেন। যেমন- পবিত্র কালামুল্লাহ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে, “মহান আল্লাহ পাক তিনি সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, নিশ্চয়ই মুনাফিকরাই মিথ্যাবাদী।” (পবিত্র সূরা মুনাফিকুন শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ১)

উক্ত পবিত্র আয়াত শরীফ দ্বারা এটাই প্রমাণিত হয় যে, যারা মুনাফিক তারা অবশ্যই মিথ্যাবাদী। আবার যারা মিথ্যাবাদী তারাই মুনাফিক। কেননা পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে মুনাফিকের যে আলামত বা লক্ষণ উল্লেখ করা হয়েছে, তন্মধ্যে একটি হলো- মিথ্যা কথা বলা।

মুজাদ্দিদে আ’যম রাজারবাগ শরীফ উনার মামদূহ হযরত মুর্শিদ ক্বিবলা আলাইহিস সালাম উনার বিরোধিতাকারীরা উক্ত পবিত্র আয়াত শরীফ ও পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদেরই পূর্ণ মিছদাক। অর্থাৎ তারা একই সাথে মুনাফিক ও কাট্টা মিথ্যাবাদী। তাই তারা মানুষদেরকে বিভ্রান্ত করার জন্যে স্মরণিকা-বার্ষিকী, পত্র-পত্রিকা ও বক্তৃতার মাধ্যমে মিথ্যা ও প্রতারণার আশ্রয় নেয়। তাদের সেসকল মিথ্যাচারিতার দাঁত ভাঙ্গা জবাব নিম্নে প্রদত্ত হলো-

পূর্ব প্রকাশিতের পর

 

অবৈধ সন্তান, মুনাফিক গোষ্ঠীর অবৈধ লিফলেটের দফাওয়ারী দাঁতভাঙ্গা জবাব

 

তবে হ্যাঁ, যারা ফাসিক বা বদআক্বীদা সম্পন্ন। যেমন- জেনে-শুনে অহরহ ফরয, ওয়াজিব ও সুন্নত তরক করে, হামেশা হারাম নাজায়িয ও বিদয়াতের মধ্যে মশগুল এবং হারামকে হালাল, হালালকে হারাম, সুন্নতকে বিদয়াত ও বিদয়াতকে সুন্নত ফতওয়া দেয়া অর্থাৎ যারা সম্মানিত ইসলাম উনার নামে বেপর্দা হয়, ছবি তোলে, টিভি দেখে, টিভিতে অনুষ্ঠান করে, হরতাল, লংমার্চ, গণতন্ত্র, ভোট নির্বাচন করে এবং এগুলোকে জায়িয মনে করে, তাদের পিছনে রাজারবাগ শরীফ উনার অনুসারীরা নামায পড়েন না। আর এটা মূলত সম্মানিত শরীয়ত উনারই বিধান। কেননা সকল ফিক্বাহ ও ফতওয়ার কিতাবেই উল্লেখ আছে যে, যারা হারাম ও বিদয়াত কাজ করে তারা ফাসিক। ফাসিকের পিছনে নামায পড়া মাকরূহ তাহরীমী। উক্ত নামায দোহারানো ওয়াজিব। আর যারা হারামকে হালাল ও হালালকে হারাম বলে বা মনে করে তারা কাফির, কাফিরের পিছনে নামায পড়া হারাম। যেমন- কাদিয়ানীরা কাফির তাদের পিছনে নামায পড়া হারাম।

“মুজাদ্দিদে আ’যম, রাজারবাগ শরীফ উনার হযরত মুর্শিদ ক্বিবলা আলাইহিস সালাম ও উনার অনুসারীরা অন্য সকলকে কাফির মনে করে” তাদের একথাটিও ডাহা মিথ্যা। ক্বিয়ামত পর্যন্ত চেষ্টা করলেও ইনশাআল্লাহ তারা প্রমাণ করতে পারবে না যে, আমাদের কোনো বক্তব্য বা লিখনীতে এ ধরনের কোনো কথা উল্লেখ আছে।

বরং সত্য কথা হলো, পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদের দৃষ্টিতে যারা কাফির প্রমাণিত শুধুমাত্র তাদেরকেই আমরা কাফির মনে করি। এর প্রমাণ আমাদের লিখিত পত্রিকা ও কিতাবাদিতেই রয়েছে।

২. প্রসঙ্গ: সমালোচনা ও বিরোধিতা করা-

সম্মানিত শরীয়ত উনার ফতওয়া হলো বাহ্যিকের উপর। অন্তরের উপর নয়। কাজেই মুনাফিকের দল নিজেরাই প্রমাণ ও স্বীকার করলো যে, রাজারবাগ শরীফ উনার অনুসারীরা তাদের মুর্শিদ ক্বিবলা উনাকে নবী মনে করেন না। দ্বিতীয়ত, মুনাফিকের দল নিজেদেরকে মহান আল্লাহ পাক উনার সমকক্ষ বলে দাবি করলো। কারণ তাদের বক্তব্যে বুঝা যায়, তারাও মানুষের অন্তরের খবর জানে। নাউযুবিল্লাহ!

রাজারবাগ শরীফ উনার হযরত মুর্শিদ ক্বিবলা আলাইহিস সালাম উনার সমালোচনা বা বিরোধিতাকারীরা কাফির। হুবহু এধরনের কোনো বক্তব্য বা লিখনী যদি তারা প্রমাণ করতে পারে, তবে তাদেরকে পুরস্কৃত করা হবে। ইনশাআল্লাহ ক্বিয়ামত পর্যন্ত তারা তা প্রমাণ করতে পারবে না। তবে হ্যাঁ, এ ব্যাপারে আমাদের বক্তব্য হলো হক্কানী-রব্বানী ওলীআল্লাহ, পীর-মাশায়িখ ও আলিম-উলামা তিনি যেই হোন না কেন তার সমালোচনা করা বা বিরোধিতা করা কুফরী। কারণ উনার সমালোচনা বা বিরোধিতা করার অর্থই হলো হক্ব তথা পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র সুন্নাহ শরীফ, ইজমা শরীফ ও ক্বিয়াস শরীফ উনার বিরোধিতা করা। সুতরাং যে ব্যক্তি পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র সুন্নাহ শরীফ, পবিত্র ইজমা ও পবিত্র ক্বিয়াস শরীফ উনাদের বিরোধিতা করবে সে ব্যক্তি অবশ্যই কাফির।

এ কারণেই মহান আল্লাহ পাক তিনি পবিত্র হাদীছে কুদসী শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক করেন, “যে আমার ওলী উনার বিরোধিতা করে আমি তার বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করি।” (বুখারী শরীফ)

মহান আল্লাহ পাক তিনি স্বয়ং যার বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেন, সে কি মুসলমান? কাজেই ‘নবী ব্যতীত কারো বিরোধিতা করলে কাফির হয় না’ এটা শুধু মিথ্যাই নয়, বরং চরম জাহেলী কথা। কারণ পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদের মধ্যে স্পষ্টই উল্লেখ আছে, ‘যারা হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ উনাদের বিরোধিতা করে তারা কাফির।’ অথচ হযরত ছাহাবায়ে রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ নবী নন বরং ওলী। মিথ্যাবাদী মুনাফিক গোষ্ঠী এর কি জাওয়াব দিবে?

৩. প্রসঙ্গ: ‘ক্বদম বুসী ও সিজদা’-

ছিহাহ সিত্তার পবিত্র হাদীছ শরীফসহ অসংখ্য পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদের মধ্যে উল্লেখ আছে যে, হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ আখিরী রসূল, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ক্বদম বা পা মুবারকে সরাসরি চুমু খেয়েছেন। অনুরূপ এক ছাহাবী অপর ছাহাবী উনার এবং আলিম অপর আলিমের পা সরাসরি চুমু খেয়েছেন অর্থাৎ ক্বদমবুসী করেছেন। আর সরাসরি পায়ে চুমু খেলে মাথা নিচু হওয়াই স্বাভাবিক। তাই বলে কি মুনাফিক গোষ্ঠী বলবে যে, হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লহু তায়ালা আনহুমগণ ক্বদমবুসীর নামে সিজদা করেছেন? নাউযুবিল্লাহ!

মূলত, মাথা নিচু করার সাথে সিজদার কোনো সম্পর্ক নেই। সিজদার সম্পর্ক হচ্ছে নিয়তের সাথে। সুতরাং ক্বদমবুসীকে সিজদা বলা কুফরীর অন্তর্ভুক্ত। মানুষ মানুষকে সিজদা করা যে হারাম ও শিরক এ সম্পর্কিত বহু লেখাই মাসিক আল বাইয়্যিনাত শরীফ উনার মধ্যে রয়েছে। কাজেই তারা যে চরম পর্যায়ের মিথ্যাবাদী তা বলার অপেক্ষাই রাখে না।

৪. প্রসঙ্গ: ‘অন্য সকলকে নাহক্ব মনে করা’-

সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুল উমাম আলাইহিস সালাম উনার অসংখ্য ওয়াজ শরীফের ক্যাসেট প্রমাণস্বরূপ পেশ করা যাবে। যাতে তিনি সুস্পষ্টভাবেই বলেছেন যে, আমরা কখনোই একথা বলি না যে, শুধু আমরাই হক্ব; বরং আমরা বলি- যারা পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র হাদীছ শরীফ, পবিত্র ইজমা ও পবিত্র ক্বিয়াস শরীফ উনাদের উপর আছে বা চলে তারাই হক্ব। আর যারা এর খিলাফ তারা না হক্ব। এরূপ মনে করার মধ্য সম্মানিত শরীয়তবিরোধী কিছু আছে কি? তবে কি মুনাফিক গোষ্ঠী যারা পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র ইজমা শরীফ ও পবিত্র ক্বিয়াস শরীফ উনাদের খিলাফ চলে তাদেরকেও হক্ব বলবে? কাজেই প্রমাণিত হলো যে, মুনাফিক গোষ্ঠীর এবক্তব্যটিও ডাহা মিথ্যা।

৫. ‘নিজ পিতা-মাতার উপর প্রাধান্য ও হজ্জ’-

মুনাফিক গোষ্ঠীর এ বক্তব্যটিও ডাহা মিথ্যা, বানানো ও কাল্পনিক। তাদের প্রতি চ্যালেঞ্জ: তারা কোনো দিনও প্রমাণ করতে পারবে না যে- তিনি এ ধরনের কোনো কথা বলেছেন। বরং রাজারবাগ শরীফ উনার হযরত মুর্শিদ ক্বিবলা আলাইহিস সালাম যেভাবে পিতা-মাতার হক্ব সম্পর্কে নছীহত মুবারক করে থাকেন, তদ্রূপ দ্বিতীয় কেউ করে বলে আমাদের জানা নেই। তিনি মাসিক আল বাইয়্যিনাত শরীফ উনার ৫৬তম সংখ্যা থেকে ৯৫তম সংখ্যা পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদের অসংখ্য দলীল দ্বারা পিতা-মাতার খিদমত বা হক্ব আদায় করার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন।

তবে হ্যাঁ, মুরীদ সর্বক্ষেত্রে তার শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনাকে প্রাধান্য দিবে, সম্মান ও মুহব্বত করবে এটা সম্মানিত শরীয়ত ও তরীক্বতেরই ফায়ছালা। কেননা, দাইলামী শরীফের পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে- “শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার মুরীদদের মাঝে এরূপ, যেরূপ হযরত নবী আলাইহিমুস সালাম উনারা উনাদের উম্মতের মাঝে।” অর্থাৎ হযরত নবী আলাইহিস সালাম উনার উম্মতগণ তাদের নবী আলাইহিস সালাম উনাকে সর্বক্ষেত্রে প্রাধান্য দিয়েছেন। সম্মান ও মুহব্বত করেছেন তদ্রূপ মুরীদগণও তাদের শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনাকে সর্বক্ষেত্রে প্রাধান্য দিবে, সম্মান ও মুহব্বত করবে। এটা পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদেরই ফায়ছালা। তাছাড়া ইলমে তাছাওউফ বা তরীক্বতের একটি মাশহূর ও গুরুত্বপূর্ণ উছূল হলো- মুরীদ স্বীয় মুর্শিদ ক্বিবলা উনাকে সবক্ষেত্রে প্রাধান্য দিবে সবার চেয়ে বড় জানবে, সবার চেয়ে বেশি সম্মান ও মুহব্বত করবে। নচেৎ সে তরীক্বতের পথে উন্নতি লাভ করতে পারবে না।

-আল্লামা মুফতী মুহম্মদ ইবনে ইসহাক, ঢাকা

অ্যাংলো-স্যাক্সন যুগের আইন প্রথা তথা প্রচলিত ফৌজদারী ও দেওয়ানী উভয় দ-বিধি সঙ্গতকারণেই পরিবর্তন হওয়া দরকার।

মামলার জট কমাতে ব্রিটিশ আদলে ছুটি কমানো দরকার।

পাশাপাশি দরকার পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র সুন্নাহ শরীফ উনাদের আলোকে সব আইন প্রয়োগ করা

দেশের আদালতগুলোতে মামলার পাহাড় জমছে। বছরে বছরে মামলার সংখ্যা বাড়ছে। বর্তমানে বিচার বিভাগে ৩০ লাখেরও বেশি মামলা নিষ্পত্তির অপেক্ষায় (পেন্ডিং) আছে। সূত্র জানায়, চলমান অবরোধ ও বিক্ষিপ্ত হরতালের কারণে পেন্ডিং মামলার সংখ্যা বাড়ছেই। বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি চালু, বিচারক নিয়োগ, হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগে অতিরিক্ত বেঞ্চ গঠন, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার, বিচারিক আদালতে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি, অধিক মামলার নিষ্পত্তি কোনো ব্যবস্থায়ই খুব একটা ফলপ্রসূ হচ্ছে না।

জানা গেছে, ৩০ লাখ ৭ হাজার ৮৬০টি পেন্ডিং মামলা নিয়ে ২০১৫ সালে যাত্রা শুরু করে বিচার বিভাগ। এর মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে বিচারের অপেক্ষায় আছে ৩ লাখ ৬১ হাজার ৩৮টি মামলা। আপিল বিভাগে জমে থাকা মামলার সংখ্যা ১৫ হাজার ৩৪৬। এছাড়া দেশের বিভিন্ন বিচারিক আদালতে (নিম্ন আদালত) ঝুলে থাকা মামলার সংখ্যা ২৬ লাখ ৩১ হাজার ৪৭৬টি।

সুপ্রিম কোর্ট সূত্রে জানা জানায়, বিচারিক আদালতের মধ্যে দেশের সব জেলা ও দায়রা জজ আদালত এবং বিভিন্ন ট্রাইব্যুনালে মোট ১৬ লাখ ৪৫ হাজার ৯৬৭টি মামলা বিচারাধীন। এছাড়া সব ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বিচারাধীন ৯ লাখ ৮৫ হাজার ৫০৯টি মামলা।

এদিকে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে পেন্ডিং মামলাগুলোর মধ্যে ফৌজদারি মামলা ২ লাখ ৯ হাজার ৫৫১টি, দেওয়ানি মামলা ৮৪ হাজার ৪২৬টি, রিট ৬১ হাজার ২৬৭টি ও আদিম দেওয়ানি ৫ হাজার ৮০৪টি মামলা। অন্যদিকে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে দেওয়ানি পিটিশন ৭ হাজার ৯৬১টি, দেওয়ানি রিভিউ ৩২৩টি, দেওয়ানি বিবিধ পিটিশন ২ হাজার ৩৮৪টি, দেওয়ানি আপিল ১ হাজার ৭৪৯টি, ফৌজদারি পিটিশন ১ হাজার ২৩৭টি, ফৌজদারি রিভিউ ২৪টি, জেল পিটিশন ৮৯৯টি, ফৌজদারি বিবিধ পিটিশন ৫৬০টি, ফৌজদারি আপিল ১০০টি, জেল আপিল ২২টি ও কনটেম্পট পিটিশন ৫৭টি বর্তমানে পেন্ডিং আছে।

এদিকে দ্রুত মামলা নিষ্পত্তির জন্য কিছুদিন পরপরই বেঞ্চ পরিবর্তন করা হচ্ছে, পেপারবুকের জট কমাতে কেনা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সরঞ্জামাদি, বাড়ানো হয়েছে বিচারকের সংখ্যা। মামলাজট কমাতে আপিল বিভাগেও বেঞ্চ বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু প্রতিদিন যে হারে নতুন মামলা যোগ হচ্ছে সে তুলনায় এ পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়। তাই বিশাল এ মামলাজট রয়েই যাচ্ছে। এদিকে শুধু বিচারকের সংখ্যা বাড়িয়ে মামলাজট কমানো সম্ভব কিনা তা নিয়ে সংশয়ে রয়েছে দেশের শীর্ষ আইনজীবীরা।

বর্তমানে হাইকোর্ট বিভাগে বিচারক আছে ৯১ জনের মতো, কিন্তু তার পরও মামলাজট বেড়ে তিন লাখ ১৬ হাজারেরও উপরে দাঁড়িয়েছে। উভয় বিভাগে জমে থাকা মামলা নিষ্পত্তির জন্য বর্তমানে ৫০টি বেঞ্চ রয়েছে।

প্রসঙ্গত, বিচারাধীন ২৬ লাখ মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে সান্ধ্যকালীন কোর্ট বসানোর সুপারিশ করেছে আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি।

মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হলে দুই আদালতেই দ্বিতীয় শিফট বা সান্ধ্যকালীন কোর্ট চালু করতে হবে। এজন্য প্রয়োজনে অবসরপ্রাপ্ত বিচারকদের পুনরায় নিয়োগ করতে হবে। এজন্য উচ্চ আদলতের ক্ষেত্রে আইন সংশোধন প্রয়োজন হবে।

পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ও ব্যাংককের উদাহরণ টেনে বলা যায়, ওই সব দেশে দুই শিফট চালু আছে। আমাদেরকেও পুরনো অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। পাশাপাশি উল্লেখ্য, বাংলাদেশের হাইকোর্টে ১৮৬ দিন ছুটি থাকে। এ অবস্থার প্রতি আইনজীবী বিচারক উভয়েরই অনাস্থা আনা প্রয়োজন। একজন বিচারক যদি বছরে ছয় মাস ছুটি ভোগ করে তাহলে বিচারকের সংখ্যা বাড়ালেও মামলা জট কমবে না।

তবে যে কথাটি বিশেষ প্রণিধানযোগ্য তাহলো- আমাদের বর্তমান বিচারব্যবস্থা ইংল্যান্ডের অ্যাংলো-স্যাক্সন বিচার ব্যবস্থার অনুরূপ। মামলা জট কমাতে, মানুষের দুর্ভোগ কমাতে এর সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই।

এক্ষেত্রে বর্তমানে দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং লক্ষ লক্ষ মামলার জটের কারণে অবিলম্বে যেমন হাইকোর্ট মাসকে মাস বন্ধের বিপরীতে খোলা রাখা দরকার। তার পাশাপাশি বিশেষ করে ১৮৯৮ সালের সিআরপি (ফৌজদারী দন্ডবিধি) এবং ১৯০৮ সালের সিপিসি (দেওয়ানী কার্যবিধি) বর্তমানে সমাজে প্রযোজ্য হতে পারে না। সে বিষয়টিও গভীরভাবে আমলে নেয়া দরকার। তবে এ সংস্কার প্রচলিত প্রথায় করলে স্বভাবতই তা আগের মতোই অসুবিধা বয়ে আনবে।

প্রসঙ্গত, মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, “সমগ্র বিশ্ব মহান আল্লাহ পাক উনার এবং মহান আল্লাহ পাক তিনিই উৎকৃষ্ট হুকুমদাতা।”

মহান আল্লাহ পাক তিনি অন্যত্র ইরশাদ মুবারক করেন, “যারা মহান আল্লাহ পাক উনার হুকুম অনুযায়ী আইন প্রয়োগ করে না তারা যালিম, ফাসিক, কাফির।”

বলাবাহুল্য, ‘পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র সুন্নাহ শরীফ উনাদের বিরোধী কোনো আইন পাস করা হবে না’- এই নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বর্তমান সরকারের রয়েছে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা। সেক্ষেত্রে তারা খুব সহজেই পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র সুন্নাহ শরীফ উনাদের আলোকে সব আইন প্রবর্তন করে রাষ্ট্রধর্ম পবিত্র দ্বীন ইসলাম উনার মর্যাদা সমুন্নত করতে পারেন। প্রাণাধিক প্রিয় ধর্ম পবিত্র দ্বীন ইসলাম উনার প্রতি সম্মান দেখিয়ে সম্মানিত ইসলামী আইন প্রয়োগ করে ৯৮ ভাগেরও বেশি এদেশের মুসলমান জনগোষ্ঠীর অন্তরের অন্তঃস্থল খুশি করতে পারেন। পারেন এদেশের ৯৮ ভাগ মুসলিম জনগোষ্ঠীর অন্তরে গেঁথে যেতে।

-আল্লামা মুহম্মদ আরিফুল্লাহ

স্বদেশের প্রতি মুহব্বতের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে পাঠদানে রাষ্ট্রপতির আহ্বান।

পবিত্র দ্বীন ইসলামে স¦দেশের প্রতি মুহব্বতের গুরুত্ব ও মুসলমান দাবিদারদের নিষ্ক্রিয়তা এবং স¦দেশের প্রতি আঘাত।

 

রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ‘সবার জন্য নিরাপদ আবাসস্থল’ হিসেবে একটি সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ গড়তে স্বদেশের প্রতি মুহব্বতের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ছাত্রদের পাঠদান করার প্রয়োজনীয়তার উপর গুরুত্বারোপ করেছেন।

তিনি গত ৭ নভেম্বর-২০১৫ ঈসায়ী তারিখে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দশম সমাবর্তন অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন। তিনি বলেন, স্বদেশের প্রতি মুহব্বতের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে পাঠদান করতে হবে।

উল্লেখ্য, শতকরা ৯৮ ভাগ মুসলমান অধ্যুষিত এদেশে একথা অনিবার্য। কারণ স¦দেশের প্রতি মুহব্বত শুধু মহান-ই নয়; বরং অতি আবশ্যকীয় একটি গুণ। এই গুণের অধিকারী হলেন হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালামগণ উনারা ও হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ উনারা। উনাদের দেশাত্মবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে আমাদেরকেও উনাদের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করা উচিত।

স¦দেশকে মুহব্বত করা ও দেশের কল্যাণ কামনা করা মুসলিম উম্মাহর পিতা হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম উনার আদর্শ ছিল। পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে মহান আল্লাহ পাক তিনি হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম উনার কল্যাণ কামনাকে এভাবে প্রকাশ করেছেন, “স্মরণ করুন, যখন হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম তিনি বলেছিলেন যে, হে আমার প্রতিপালক, এ ভূখণ্ডকে নিরাপদ শহরে পরিণত করুন এবং অধিবাসীদেরকে নানাবিধ ফলমূল দ্বারা জীবিকা দান করুন।” (পবিত্র সূরা বাক্বারা শরীফ : পবিত্র আয়াত শরীফ ২৬)

নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি স¦দেশের প্রতি মুহব্বতকে গ্রহণ করেছেন বলেই মহান আল্লাহ পাক তিনি পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে নিজেও দেশের শপথ করেছেন। পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে, “আমি শপথ করছি সে নগরীর, যে নগরীর আপনি অধিবাসী। (পবিত্র সূরা বালাদ শরীফ : পবিত্র আয়াত শরীফ ১-২)

নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি স্বীয় মাতৃভূমিকে বিশেষভাবে গ্রহণ করেছিলেন। একারণে ঐতিহাসিক হিজরত মুবারকের প্রাক্কালে তিনি বিশেষ রহমতভরে স¦দেশকে সম্বোধন করে বলেছেন, “কত চমৎকার শহর আপনি, হে পবিত্র মক্কা শরীফ! আমি আপনাকে কত মুহব্বত করি।” সুবহানাল্লাহ! সুবহানাল্লাহ! সুবহানাল্লাহ!

এই মুহব্বতের প্রতি সম্মান জানিয়ে মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, “যিনি আপনার জন্য পবিত্র কুরআন শরীফ উনাকে বিধান করেছেন, তিনি (মহান আল্লাহ পাক) আপনাকে অবশ্যই স¦দেশে (পবিত্র মক্কা শরীফ উনার মধ্যে) ফিরিয়ে আনবেন।” (পবিত্র সূরা কাসাস শরীফ : পবিত্র আয়াত শরীফ ৮৫)

স্বদেশের প্রতি মুহব্বত মানুষকে দায়িত্বসচেতন করে তোলে, স্বদেশের উন্নতি সাধনে সজাগ রাখে, দেশের জাতীয় সম্পদ সংরক্ষণে উদ্বুদ্ধ করে। স¦দেশের প্রতি মুহব্বতে উদ্বুদ্ধ হয়ে যারা দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করবে এবং দেশের সার্বিক তত্ত্বাবধানে নিয়োজিত থাকবে, তাদের প্রতি বিশেষ পুরস্কারের আশ্বাসবাণী ও প্রতিশ্রুতি রয়েছে। নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, “এক দিন এক রাতের প্রহরা ক্রমাগত এক মাসের নফল রোজা এবং সারা রাত ইবাদতে কাটিয়ে দেয়া অপেক্ষাও উত্তম।” (মুসলিম শরীফ)

যারা স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশমাতৃকাকে গভীর ভালোবাসে এবং মাতৃভূমির পাই ইঞ্চি সীমানা রক্ষার জন্য ত্যাগ স্বীকার করে, তাদের সম্মানজনক মর্যাদা সম্পর্কে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি আরও ইরশাদ মুবারক করেছেন, “এক দিন ও এক রাতের সীমান্ত প্রহরা ধারাবাহিকভাবে এক মাসের সিয়াম সাধনা ও সারা রাত নফল ইবাদতে কাটানো অপেক্ষা উত্তম।” সুবহানাল্লাহ! (মুসলিম শরীফ)

স¦দেশের প্রতি মুহব্বতকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি ও জান্নাত লাভের উপায় হিসেবে উল্লেখ করে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, “যারা দেশরক্ষার উদ্দেশ্যে সীমান্ত পাহারায় বিনিদ্র রজনী যাপন করে, তাদের জন্য জান্নাত।” সুবহানাল্লাহ! “দুই প্রকারের চক্ষুকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে না। প্রথমত, সেই চক্ষু, যা মহান আল্লাহ পাক উনার ভয়ে ক্রন্দন করে; দ্বিতীয়ত, যে চক্ষু মহান আল্লাহ পাক উনার পথে (সীমান্ত) পাহারাদারি করতে করতে রাত কাটিয়ে দেয় বা বিনিদ্র রজনী যাপন করে।” সুবহানাল্লাহ! সুবহানাল্লাহ! সুবহানাল্লাহ! (তিরমিযী শরীফ)

স্বদেশের প্রতি মুহব্বত বা স্বদেশের সম্পদ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা তথা সীমান্ত প্রহরায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের পরকালীন অশেষ প্রতিদান সম্পর্কে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি আরো ইরশাদ মুবারক করেন, “মৃত ব্যক্তির সব আমল বন্ধ হয়ে যায়, ফলে তার আমল বৃদ্ধি পেতে পারে না। তবে ওই ব্যক্তির কথা ভিন্ন, যে ব্যক্তি কোনো ইসলামী সাম্রাজ্যের সীমান্ত প্রহরায় নিয়োজিত থাকা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, তার আমল ক্বিয়ামত পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে থাকবে এবং কবরের প্রশ্নোত্তর থেকেও সে বেঁচে থাকবে।” সুবহানাল্লাহ! সুবহানাল্লাহ! সুবহানাল্লাহ! (তিরমিযী শরীফ ও আবু দাউদ শরীফ)

নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার অনুসরণে স¦দেশের প্রতি মুহব্বত এক ধরনের পরিশুদ্ধ ভাবাবেগ; যা মুসলমানদের কর্তব্যপরায়ণ ও দায়িত্বসচেতন করে তোলে। দেশের স¦াধীনতা ও সম্পদ সুরক্ষায় যে কোনো ত্যাগ স্বীকারে উদ্বুদ্ধ করে দেশের স্বার্থবিরোধীদের সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিহত করতে নিবেদিত করে।

প্রসঙ্গত আমরা মনে করি, সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত রাষ্ট্রদ্বীন ইসলাম উনার এই দেশের সরকার নাগরিকদের মাঝে স্বদেশের প্রতি মুহব্বতের ক্ষেত্রে পবিত্র দ্বীন ইসলামের শিক্ষা নাগরিকদের দেয়নি এবং এ ধরনের কোনো তৎপরতাও সরকারের কর্মকাণ্ডে নেই; যা অতীব দুঃখজনক। তবে মুসলমান হিসেবে দেশের শতকরা ৯৮ ভাগ জনগোষ্ঠী মুসলমান তাঁদের ঈমান রক্ষার্থে স¦দেশের প্রতি মুহব্বত তথা দায়িত্ব কর্তব্যকে অস্বীকার করে মুসলমান থাকতে পারে না।

উল্লেখ্য, সীমান্তে প্রতিদিনই আমাদের দেশের লোকদের বিএসএফ নির্বিচারে গুলি করে মারছে। কিন্তু তার বিপরীতে দেশবাসীর প্রতিবাদ কই? সম্প্রতি ভারত আন্তঃসংযোগ নদী প্রকল্পের দ্বারা এদেশের ৫৪টি নদীর পানি শুঁষে নেয়ার পাঁয়তারা করছে। কিন্তু তার বিরুদ্ধে জিহাদ কই? ভারত হিন্দি সিরিয়ালের দ্বারা এদেশের শিশু-কিশোরদের মুখে হিন্দু সংস্কৃতি ও হিন্দিভাষা তুলে দিয়েছে। কিন্তু তার বিরুদ্ধে ১৯৫২-তে ভাষার জন্য রক্ত দানকারী এদেশবাসীর তীব্র রোষ কই? এদেশের মা-বোন, নারী সমাজকে পরকীয়া, চরিত্রহীনতায় নিমজ্জিত করে দিচ্ছে তার বিরুদ্ধে চরম ক্ষোভ কই? ঈদের পোশাক থেকে মসলা সব জায়গায় ভারতীয় পোশাকের নির্লজ্জ আগ্রাসন। কিন্তু তার বিপরীতে স্বদেশের পণ্য কিনে ধন্য হওয়ার মানসিকতা কই? খুলনার রামপালে সুন্দরবন ধ্বংস করে ভারতের স্বার্থে তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র করা হচ্ছে। তার বিরুদ্ধে কাঙ্খিত জনসচেতনতা কই? এদেশে দশকোটি লোক মহা দরিদ্র অথচ এদেশ থেকে লাখ লাখ, কোটি কোটি টাকা পাচার হচ্ছে কীভাবে? স¦দেশের প্রতি যদি মুহব্বতই থাকে তাহলে মালয়েশিয়ায় হাজার হাজার বাংলাদেশী সেকেন্ড হোম করে কী করে?

দেশের দুটি বৃহৎ দলের নেত্রীই পরস্পর পরস্পরের বিরুদ্ধে দেশের সম্পদ বিদেশীদের হাতে তুলে আঁতাতের অভিযোগ করেছে। দেখা যাচ্ছে, শীর্ষ পর্যায়েই স্বদেশের প্রতি মুহব্বতের ঘাটতির অভিযোগ গুরুতর। তবে এ অভিযোগ থেকে রেহাই নেই সাধারণ মানুষেরও। কারণ পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার ভাষ্যানুযায়ী ঈমানদার তথা মুসলমান থাকতে হলে কোনো অন্যায় দেখলে তথা স্বদেশের প্রতি কোনো অবিচার দেখলে স¦দেশের সম্পদ ও সার্বভৌমত্বের প্রতি কোনো অনাচার দেখলে হাত দিয়ে বাধা দিতে হবে, মুখে বলতে হবে।

কিন্তু এদেশের শতকরা ৯৮ ভাগ জনগোষ্ঠী মুসলমান বাংলাদেশের প্রতি যেসব অন্যায় করা হচ্ছে তার বিরুদ্ধে গর্জে উঠছে কি? অথচ তারা দাবি করছে তারা মুসলমান। কিন্তু স¦দেশের প্রতি মুহব্বত তথা হক্ব আদায় না করা পর্যন্ত কেউই মুসলমান হতে পারে না, থাকতে পারে না, দাবি করতে পারে না। এখন দেশের সব মুসলমানকে ঠিক করতে হবে তারা কি ঈমান বিসর্জন দিবে? না-কী ঈমান রক্ষার্থে স¦দেশের প্রতি মুহব্বতে সক্রিয় ও সোচ্চার হবে।

-আল্লামা মুহম্মদ ওয়ালীউল্লাহ।

 

ব্যবসাকে মুনাফাখোরী নয়; ইবাদত মনে করতে হবে ॥

দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকার ও ব্যবসায়ী উভয়েরই দায়বদ্ধতা ও কর্তব্য আছে

 

ব্যবসা হলো মানুষের সেবা করার একটা সুযোগ। দেশে ব্যবসা প্রসার, ব্যবসায়ীদের সংখ্যা বৃদ্ধি ও ব্যবসায়ে অতিরিক্ত মুনাফা অর্জনের সাথে সাথে এখন মানব সেবার দৃষ্টিভঙ্গী আর নেই। অথচ নিকট অতীতে ব্যবসাবৃত্তিকে ও ব্যবসায়ীকে শ্রদ্ধার সাথে দেখা হতো।

পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে, “রিযিকের ১০ ভাগের ৯ ভাগ ব্যবসার মধ্যে নিহিত।”

অন্য পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে, “সৎ, সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত ব্যবসায়ী ক্বিয়ামতের দিন হযরত নবী আলাইহিমুস সালামগণ, হযরত ছিদ্দীক্ব ও শহীদ রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনাদের সাথে থাকবেন।”

অর্থাৎ পবিত্র দ্বীন ইসলাম উনার দৃষ্টিতে ব্যবসা এক বড় ইবাদত। কিন্তু ব্যবসাকে এখন ইবাদত হিসেবে না দেখে শুধুমাত্র মুনাফা অর্জনের ও দ্রুত বড়লোক হওয়ার পথ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ফলে কষ্ট বাড়ছে ভোক্তাদের।

বলাবাহুল্য, আমাদের দেশে দ্রব্যমূল্য অনেকাংশে নির্ভর করে ব্যবসায়ীদের ইচ্ছার উপর। সরকার নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্যের আমদানি শুল্ক হ্রাস করলেও মূল্য কমেনা বা সাময়িকভাবে কমলেও পুনরায় বৃদ্ধি পায়। যদিওবা আন্তর্জাতিক বাজার মূল্য, জ্বালানি বাবদ খরচ, বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, পরিবহন সমস্যা, চাঁদাবাজি, সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে যোগাযোগ বা সমন্বয়ের অভাব, মূল্য পরীক্ষা না করা, ইত্যাদি কারণে দ্রব্যমূল্য বেড়ে যায়।

উল্লেখ্য, বিগত চারদলীয় জোট সরকার আমলে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়ে পরপর দুই মন্ত্রীকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করতে হয় এবং পরবর্তী মন্ত্রী এসে বিবেকবর্জিত বণিক, সিন্ডিকেট ও মজুদদারদের রুখতে মজুদবিরোধী আইন প্রণয়ণের পরামর্শ দিয়েছিলেন। মহাজোট সরকারও বাণিজ্যমন্ত্রী পরিবর্তন করেছে। কিন্তু দ্রব্যমূল্য কমেনি। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির মূল কারণ সিন্ডিকেট ও মূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকারের ব্যর্থতাসহ রাজনীতিবিদদের দুর্নীতি।

অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা সরকার থেকে কতটুকু সহযোগিতা পেয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে, বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীবৃন্দ। তাদেরকে আকাশচুম্বী মূল্যে ব্যবসা-স্থান, দোকানঘর ক্রয়, বন্ধক বা ভাড়া করতে হয়। ব্যাংক থেকে উচ্চ সুদে টাকা ধার নিতে হয়। সেই সাথে আছে ট্যাক্স আর ভোক্তাদের থেকে ভ্যাট আদায়। আর চাঁদাবাজি তো আছেই। বড় ধরনের মার্কেটগুলোতে এখন সবজি বিক্রির জন্য ছোট্ট একটা দোকান ভাড়া করলেও বছরে লক্ষ টাকা দিতে হয়, অগ্রিম তো আছেই। এই দোকানে দশ টাকার বেগুন পঁচিশ টাকায় বিক্রি না করলে দোকানির পোষায় না।

সাধারণ নিয়মে প্রক্রিয়াজাত, বাজারজাত ও গুদামজাতকরণের সুবিধা ও যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকলে দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল থাকা উচিত। কিন্তু বাংলাদেশে এ নিয়ম চলছে না। সম্প্রতি দেশে প্রচুর রাইস মিল হয়েছে। অনেকগুলোই আধুনিক প্রযুক্তির ও উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন। মিল সংলগ্ন বড় বড় গুদাম নির্মাণ করা হয়েছে। গুদাম ভরে ধান রাখা হয় যেন সারা বছর মিল চলতে পারে। এরপরেও হঠাৎ করে বছরে কয়েকবার চালের মূল্য বেড়ে যায়। মূল্য বৃদ্ধির সাথে সাথে বাজারে চাল এসে ভরে যায়। ভোক্তারাও বেশি করে কিনতে থাকেন, যদি আরো দাম বাড়ে।

বর্তমান যুগে বিশ্বের কোনো সভ্য দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের এ ধরনের মূল্য বৃদ্ধি আছে বলে মনে হয় না। বিশেষ করে খাদ্য দ্রব্যের। যদি কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ থাকে অন্য কথা। দ্রব্যমূল্য যদি স্থিতিশীল না থাকে, আয়ের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ না হয়, হঠাৎ করে কোনো কারণ ছাড়াই উর্ধ্বগতি হয়, তাহলে সরকার ও ভোক্তা উভয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অতিরিক্ত মূল্য বহন করতে হয় সরকারকে (আমদানি শুল্ক হ্রাস বা মওকুফ করে) অথবা ভোক্তাকে (বেশি দামে কিনে) অথবা উভয়কে। এতে সরকার বঞ্চিত হয় কর থেকে। আর ভোক্তা অতিরিক্ত মূল্য বাবদ বেশি খরচ করে টানাটানির বা অভাবের শিকার হতে হয়। সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নির্ধারিত ও সীমিত আয়ের ভোক্তারা। যাদের সংখ্যা আমাদের দেশে বেশি।

দ্রব্যমূল্যের বৃদ্ধির পেছনে যৌক্তিকতা থাকলে মেনে নেয়া যায়। কিন্তু সরবরাহ যথেষ্ট অথচ মূল্যবৃদ্ধি এতে ভোক্তাদের অবাক হতে হয়। Laws of Supply Demand নীতির কোন্টি বাংলাদেশে কার্যকর তা বোঝা মুস্কিল। দ্রব্যের চাহিদা, মূল্য ও সরবরাহ সবই বেশি। বাজারে কোনো জিনিসেরই অভাব নেই, কিন্তু দাম বেশি। তবে বেশি দাম বলে বিক্রি থেমে নেই। ঈদের আগে বাজারে প্রচুর সরবরাহ বজায় রেখেই প্যাকেট দুধের, চিনির, মসলার দাম বাড়িয়ে দেয়া হয়। সরবরাহের তুলনায় চাহিদা বেশি বলে মূল্য বৃদ্ধি পেয়ে থাকে তা নয়। এ ব্যাপারে সরকার থাকে নির্বিকার।

অন্যদিকে আমরা দেখতে পাই- কোনো জিনিসের মূল্য বৃদ্ধির ফলে ভোক্তারা যখন দিশেহারা, তখন ব্যবসায়ীদের পোয়াবারো। ব্যবসা করে সবাই দ্রুত ধনী হয়ে পড়ছে। নতুন নতুন ব্যবসায়ী, ব্যবসা ও ঝকঝকে দোকনপাট বাড়তে থাকে। ক্রেতারাও ভিড় করে, নির্বিচারে কিনতে থাকে। একশ্রেণীর লোকদের হাতে প্রচুর কালো টাকা। জিনিস পেলেই তারা কিনছে। মূল্য কোনো বিষয় নয়। এইভাবে ব্যবসায়ীদের সুযাগ করে দেয়া হচ্ছে। আর ব্যবসায়ীরাও সুযোগটা নিচ্ছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র মজুদ করে ইচ্ছামতো দামে বিক্রি করছে। ধনী হচ্ছে, ব্যবসার প্রসারতা বৃদ্ধি করছে, খবরের কাগজ বের করছে, স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল খুলছে, সংসদ সদস্য হচ্ছে এবং নীতি নির্ধারণ করছে।

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ঠেকাতে হলে প্রয়োজন সরকারের সদিচ্ছা ও ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা। সেই সাথে প্রয়োজন কার্যকরী মূল্য নির্ধারণ বা স্থিতিশীল রাখার নীতিমালা প্রণয়ন। দেশে উৎপাদিত দ্রব্যের পরিমাণ, আমদানির পরিমাণ, চাহিদা, ক্রয় ক্ষমতা ইত্যাদির সাথে সঙ্গতি রেখে এই নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। উৎপাদন বা আমদানি খরচের উপর ভিত্তি করে দ্রব্যের মূল্য নির্ধারিত হবে। কোনো অজুহাতে এই মূল্যের বৃদ্ধি হবে না, হলে কঠিন ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান ও প্রয়োগের পথ খোলা রাখতে হবে। এক্ষেত্রে মূলত পবিত্র দ্বীন ইসলাম উনার আদর্শ, ইহসান করা ও হক্কুল ইবাদের ধারণার প্রচার ও বিস্তার করতে হবে। তা না হলে দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি কেউ ঠেকাতে পারবে না।

-আল্লামা মুহম্মদ আশরাফুল মাহবূবে রব্বানী

 

 

 

 

 

 

ইসলামের দৃষ্টিতে ভারত দেহ-বাণিজ্য করে চলছে।

ভারত বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন চালাচ্ছে এবং সংস্কৃতির নামে বিবস্ত্র দেহ-প্রদর্শনী বিস্তার করে চলছে।

অতিসত্বর এর অবসান হওয়া দরকার।

 

সংস্কৃতির নামে ভারত ইসলামের দৃষ্টিতে একচেটিয়া দেহ-বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। ভারতের দেহ-বাণিজ্যের খপ্পড়ে পড়ছে বাংলাদেশসহ প্রায় সব মুসলিম দেশ। এমনকি ভারতেও এই দেহ-বাণিজ্যের জয়-জয়কার। ভারতে দেহ-বাণিজ্য কত তুঙ্গে তার একটি উদাহরণ ইন্টারনেটের এক হেডিংয়ে। এতে বলা হয়েছে- “১০ মিনিটেই এক কোটি”।”

খবরে বলা হয়: “অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, মাত্র ১০ মিনিট র‌্যাম্পে হাঁটার জন্য পারিশ্রমিক হিসেবে এক কোটি রুপির প্রস্তাব পেয়েছে ক্যাটরিনা কাইফ। কালক্ষেপণ না করে সেও প্রস্তাবটি লুফে নেয়। সম্প্রতি কোচির একটি ফ্যাশন শোতে মাত্র ১০ মিনিটের জন্য অংশ নিতে অনুরোধ জানানো হয় হালের এই বলিউড সেনসেশনকে। এর বিনিময়ে ক্যাটরিনাকে এই বিশাল অঙ্কের অর্থ দেয়ার ঘোষণা দেয় কর্তৃপক্ষ।”

মূলত, দেহ-প্রদর্শনী তথা দেহ-বাণিজ্য মানুষকে মনুষত্বের অনুভূতি থেকে ভোগবাদী পশুতে পরিণত করে। মানুষে মানুষে সহানুভূতি, সহমর্মিতা, সহযোগিতার বিপরীতে প্রত্যেকটা মানুষ তখন হয় একটা ভোগবাদী পশুতে। বাইরের খোলসটা থাকে সংস্কৃতির নামে। কিন্তু ভেতরে থাকে পশুবৎ প্রবণতা। নারীদেহ তখন পণ্যের মতো বিক্রি হয়। নারীদেহ প্রদর্শনী তখন লাভজনক শিল্পে পরিণত হয়। নাঊযুবিল্লাহ!

ইদানীংকালে ভারতীয় নায়ক-নায়িকারা কনসার্টের নামে তাদের বিবস্ত্রপনা ও বেহায়াপনার মাধ্যমে এ বিষয়টিই স্পষ্ট করে তুলেছে।

মূলত, ভারতীয় সংস্কৃতির আগ্রাসনে বিপর্যস্ত হচ্ছে বাংলাদেশ। সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইট ফেসবুকে তিন হাজারেরও বেশি তরুণ-তরুণীর প্রোফাইল ঘেটে জানা গেছে, যে দেশটি বাংলাভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার জন্য রক্ত দিয়েছে, সে দেশের নতুন প্রজন্মের প্রিয় সিনেমার তালিকায় হিন্দির আধিপত্য। একই সাথে প্রিয় টিভি শোয়ের জায়গায় দু’চারজন বাদে সবারই প্রিয় ভারতীয় টিভি চ্যানেলে সিরিয়াল ও রিয়্যালিটি শো। আর এর সুবাদে বাংলাদেশে গড়ে উঠেছে ভারতীয় শিল্পীদের নিয়ে বাণিজ্য। তাদের টিভি চ্যানেলের অনুষ্ঠান উপভোগ করতে বছরে প্রায় হাজার কোটি টাকা চলে যাচ্ছে বাংলাদেশের মানুষের।

দেশে বর্তমান সরকারের সময় অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি ভারতীয় শিল্পী এসেছে। এমনকি বিশ্বকাপ ক্রিকেট উপলক্ষে যে কনসার্টের আয়োজন করা হয়, সেখানেও ছিল ভারতীয় শিল্পীদের আধিপত্য। এর দুই মাসের মাথায় ভারতীয় শিল্পীদের এক দিনে দুটি অনুষ্ঠান হয়েছে ঢাকায়। এমনকি বিপিএল-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানেও একচেটিয়া প্রাধান্য ছিল ভারতীয় শিল্পীদের।

বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া খবরে জানা গেছে,  গত ৩ বছরে বাংলাদেশে পাঁচ শতাধিক ভারতীয় শিল্পী এসেছে। সেজন্য তাদের পেছনে খরচ হয়েছে প্রায় ৫ শত কোটি টাকা। এ অর্থের যোগান হয়েছে দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের স্পন্সর এবং দর্শকদের কাছে টিকিট বিক্রি থেকে। সাধারণ দর্শকের জন্য এসব আয়োজনের বাইরেও নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রফতানিকারকদের সমিতি বিকেএমইএ, তৈরী পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতি বিজিএমইএ, টেক্সটাইল মিল মালিকদের সংগঠন বিটিএমএ তাদের বার্ষিক অনুষ্ঠানগুলোতে ভারত থেকে শিল্পী নিয়ে আসে। এসব অনুষ্ঠানের উপস্থাপক পর্যন্ত ভারত থেকে এসেছে। ভারতীয় মোবাইল হ্যান্ডসেট প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান মাইক্রোম্যাক্সের উদ্বোধন করতেও ঢাকায় এসেছিল  বলিউড অভিনেত্রী।

বাংলাদেশের কোনো টিভি চ্যানেল ভারতে দেখানো হয় না। অথচ তাদের প্রায় সব টিভি চ্যানেলই টাকা দিয়ে দেখে বাংলাদেশীরা। একই সাথে সে দেশের পণ্যের বিজ্ঞাপন। এর মধ্য দিয়ে এদেশে ভারতের একটি বড় বাজার তৈরি হচ্ছে।

ন্যাশনাল মিডিয়া সার্ভে সূত্রে পাওয়া তথ্য মতে, বাংলাদেশে টেলিভিশনের দর্শক ৯ কোটি ১২ লাখের মতো। এসব দর্শকের বয়স ১৫ বছরের উপরে, শিশুদের যাদের বয়স ১৪-এর নিচে তাদের হিসাব নিলে দর্শক সংখ্যা ১১ কোটির মতো হতে পারে। এ দর্শকরা তাদের সময় ব্যয় করে হিন্দি চ্যানেলের পেছনে।

এতে পরিশোধ করতে হয় হাজর হাজার কোটি টাকা। দেশে ২৭২টির মতো চ্যানেল দেখা যায় বলে ক্যাবল টিভি ব্যবসায়ীরা জানিয়েছে। এসব চ্যানেলের প্রায় সবই ভারতীয়। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের চ্যানেল এইচ.বি.ও এখন ভারত থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হয় বলে এর জন্য পেমেন্টও সেখানে করতে হয়।

মূলত, কী বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ, কী রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম অথবা দেশে ৯৮ ভাগ মুসলমানের অবস্থান- কোনো প্রেক্ষিত থেকেই এদেশে এভাবে ভারতীয় সংস্কৃতির আগ্রাসন চলতে পারে না। চলতে পারে না সংস্কৃতির নামে নারীদেহ প্রদর্শনী অথবা নারীদেহ ব্যবসা। চলতে পারে না ভোগবাদীদের বিত্তবিলাস। থাকতে পারে না ধনী-গরিবে বিশাল বৈষম্য। সুষম বণ্টনের মাধ্যমে স্বাধীনতার সুফল সবার হাতে তুলে দেয়াই রাষ্ট্রযন্ত্রের একান্ত কর্তব্য।

-আল্লামা মুহম্মদ আরিফুর রহমান

 

চিহ্নিত জামাতী যুদ্ধাপরাধীদের মৃত্যুদণ্ড দিলেই হবে না। জীবিত জামাতীরা ইসলামের অবমাননা করে দেশবাসী মুসলমানদের ধর্মানুভূতিতে যে চরম আঘাত হানছে, তা যুদ্ধাপরাধের চেয়েও বেশি। তারও শক্তদ- দিতে হবে।

জামাত নিষিদ্ধকরণের সব সুযোগ অবিলম্বে কাজে লাগাতে হবে

 

পবিত্র দ্বীন ইসলাম উনার নাম ভাঙিয়ে চলা ধর্মব্যবসায়ী দল জামাতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুজাহিদকে মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দেয়া মৃত্যুদ-ের রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন খারিজ করে ফাঁসির দ- বহাল রাখে সুপ্রিম কোর্ট। ফলে তার ফাঁসি কার্যকর হয়।

প্রসঙ্গত, যুদ্ধাপরাধীদের মৃত্যুদণ্ডে স্বজনরা কিছুটা শান্তি ও স্বস্তি পেলেও ধর্মপ্রাণদের ধর্মানুভূতিতে আঘাতের বিষয়টি কিন্তু থেকেই যায়।

জামাত-শিবির যে শুধু ১৯৭১-এ যুদ্ধপরাধের মতো ঘৃণ্য ও পৈশাচিক কাজ করেছে তাই নয়; বরং এখনো তারা মওদুদীবাদী ওহাবী আক্বীদা বহন ও বিস্তার করে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের ধর্মানুভূতিতে চরম আঘাত হেনে চলছে। মহান আল্লাহ পাক উনার, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার, হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ উনাদের এবং হযরত আউলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণ উনাদের সাথে অকল্পনীয় ও অমার্জনীয় বেয়াদবী ও কুফরীমূলক মন্তব্য ও বক্তব্য দিয়ে পবিত্র দ্বীন ইসলাম উনার নামে হারামকে হালাল করে ও হালালকে হারাম করে তারা অদ্যাবধি ধর্মপ্রাণদের ধর্মানুভূতিতে যে আঘাত হানছে তা ১৯৭১-এ স্বজনহারাদের বেদনার চেয়ে কম নয়; বরং তার চেয়েও বহু বহুগুণে বেশি। সুতরাং শুধু যুদ্ধাপরাধী জামাতীদের মৃত্যুদ- দিলেই হবে না; বরং জীবিত মওদুদীবাদীদেরও দণ্ড দিতে হবে। বিশেষত মওদুদী-জামাতীদের জামাতকেই নিষিদ্ধ করতে হবে।

প্রসঙ্গত আমরা মনে করি, জামাত নিষিদ্ধ করার ক্ষেত্রও তৈরি হয়েই আছে। একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য গঠিত ট্রাইব্যুনালের পাঁচটি রায়ে জামাতকে ‘অপরাধী সংগঠন’ (ক্রিমিনাল অর্গানাইজেশন) হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এছাড়া ২০১৩ সালে হাইকোর্টে জনস্বার্থে দায়ের করা এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশনের রাজনৈতিক দল হিসেবে জামাতের নিবন্ধন বাতিল করে রায় দেয়। সেই রায়ের বিরুদ্ধে জামাত আপিল করেছে। এটি বর্তমানে আপিল বিভাগে বিচারাধীন রয়েছে। এ অবস্থায় আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে দলটিকে দ্রুত নিষিদ্ধ করার সুযোগ আছে।

অপরদিকে ৩৮ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘জনশৃঙ্খলা ও নৈতিকতার স্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ সাপেক্ষে সমিতি বা সংঘ গঠন করিবার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকিবে।’ ‘তবে শর্ত থাকে যে, কোনো ব্যক্তির উক্তরূপ সমিতি বা সংঘ গঠন করিবার কিংবা উহার সদস্য হইবার অধিকার থাকিবে না, যদি (ক) উহা নাগরিকদের মধ্যে ধর্মীয়, সামাজিক এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করার উদ্দেশ্যে গঠিত হয়; (খ) উহা ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষ, জন্মস্থান বা ভাষার ক্ষেত্রে নাগরিকদের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করিবার উদ্দেশ্যে গঠিত হয়; (গ) উহা রাষ্ট্র বা নাগরিকদের বিরুদ্ধে কিংবা অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কার্য পরিচালনার উদ্দেশ্যে গঠিত হয়; বা (ঘ) উহার গঠন ও উদ্দেশ্য এই সংবিধানের পরিপন্থী হয়।’

উল্লেখ্য, জামাতকে নিষিদ্ধ করতে চাইলে তাদের বিরুদ্ধে এই চারটির যেকোনো একটি অথবা সবগুলো অভিযোগই আনতে পারে সরকার। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য গঠিত ট্রাইব্যুনালের পাঁচটি রায়ে জামাতকে ‘অপরাধী সংগঠন’ (ক্রিমিনাল অর্গানাইজেশন) হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। গো’আযমকে সাজা দিয়ে ঘোষিত রায়ে ‘সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের নেতৃস্থানীয় পদ থেকে জামাতের সদস্যদের সরিয়ে দিতে সরকারের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া উচিত’ বলে অভিমত দেয়া হয়। অভিমত দিয়ে বলা হয়, ওই সব জায়গায় স্বাধীনতাবিরোধী লোক থাকা উচিত হবে না। এর জন্য সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারে। এছাড়া এ রায়ে জামাতকে ‘ক্রিমিনাল অর্গানাইজেশন’ বলা হয়। রায়ে আরো বলা হয়, নতুন প্রজন্ম মনে করে, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জন্মলগ্নে গো’আযমের নেতৃত্বে জামাত ও তাদের অঙ্গসংগঠনের সদস্যদের ভূমিকা এবং এখনো তাদের স্বাধীনতাবিরোধী ও সাম্প্রদায়িক মনোভাবের পরিবর্তন হয়নি। এটি জাতির জন্য উদ্বেগজনক। রায়ে বলা হয়, ৩০ লাখ শহীদের জীবনের বিনিময়ে অর্জিত এদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রতি ওই দলটির সদস্যদের মনোভাব পরিবর্তনের কোনো প্রমাণ নেই।

আইনজীবীরা মনে করেন, ১৯৭৪ সালে প্রণীত বিশেষ ক্ষমতা আইনেও জামাতকে নিষিদ্ধ করার সুযোগ রয়েছে। এই আইনের ২০ ধারায় বলা হয়েছে, ‘কোনো ধর্মের নামে বা ধর্মের উপর ভিত্তি করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে গড়া কোনো সংগঠন, ইউনিয়ন বা গোষ্ঠীর সঙ্গে কেউ যুক্ত হতে পারবে না। এ ধরনের সংগঠনকে সরকার গেজেটের মাধ্যমে নিষিদ্ধ করতে পারবে। সরকার ওই সংগঠনের সমূহ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে পারবে। নিষিদ্ধ হওয়ার পর এ ধরনের কার্যক্রমে আবার কেউ যুক্ত হলে তাকে ৩ বছরের জেল অথবা জরিমানা বা দুটিতেই দ-িত করা যাবে’।

এর বাইরে আছে সন্ত্রাসবিরোধী আইন-২০০৯ (২০০৯ সালের ১৬ নাম্বার আইন)। এই আইনের ১৮ ধারায় বলা হয়েছে, ‘সরকার কোনো সংগঠনকে সন্ত্রাসী কাজের সঙ্গে জড়িত আছে মর্মে যুক্তিসঙ্গত কারণের ভিত্তিতে, আদেশ দ্বারা, তফসিলে তালিকাভুক্ত করে নিষিদ্ধ করতে পারবে।’ ট্রাইব্যুনাল জামাতকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। কাজেই এক্ষেত্রে সন্ত্রাসবিরোধী আইন প্রয়োগে কোনো বাধা নেই।

এদিকে একাত্তরে স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধিতাকারী দল হিসেবে জামাতের বিচারেরও সুযোগ রয়েছে। ২০০৯ সালে সংশোধিত ট্রাইব্যুনাল আইনে ব্যক্তির বিচার করার সুযোগ সৃষ্টি হলেও কোনো সংগঠনের বিচারের সুযোগ ছিল না। এজন্য ২০১১ সালে সংবিধানের ৪৭(৩) অনুচ্ছেদ সংশোধনের মাধ্যমে ব্যক্তির পাশাপাশি সংগঠনকেও বিচারের আওতায় আনা হয়। এরপর ১৮ আগস্ট থেকে জামাতের বিরুদ্ধে তদন্ত সংস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্ত শুরু করে। যদিও সে তদন্ত আজো আলোর মুখ দেখেনি।

সঙ্গতকারণেই আমরা মনে করি, সরকারের সামনে এক্ষুনি মওদুদীবাদী জামাতকে নিষিদ্ধ করার অনেক সুযোগ রয়েছে। এসব সুযোগ তো সবসময়ের জন্য। সরকার চাইলে তা যেকোনো সময়ে কাজে লাগাতে পারে। তবে সরকার সেটা চাইছে বলে মনে হচ্ছে না। কিন্তু জনগণ এটা ভালো চোখে দেখছে না। সরকার যদি নিজেদেরকে জনগণের অভিভাবক মনে করে, তবে সরকারের উচিত ধীরে চলো নীতি না নিয়ে এক্ষনি সক্রিয় হয়ে শক্ত পদক্ষেপে জামাত-শিবির নিষিদ্ধ করা।

-আল্লামা মুহম্মদ মাহবুবুল্লাহ

 

ভারতে বর্তমানে বিজেপি নয়, বিজেপি’র সাইনবোর্ডের আড়ালে আরএসএস তথা সঙ্ঘপরিবার ক্ষমতায় বসেছে।

নামসর্বস্ব সেকুলার সরকারের দুর্বলতা ও কাপুরুষতার ও কট্টর মুসলিমবিদ্বেষ পরায়ণতার কারণে ভারতে শিবসেনা, নবনির্মাণসেনা, রামসেনা ও আজকের হিন্দু রাষ্ট্রসেনার মতো উগ্রবাদী সংগঠনগুলো ফুলে ফেঁপে জেগে উঠেছে।

তারা তাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের লক্ষ্য বানাচ্ছে নিরপরাধ ও নিরীহ মুসলমানদেরকে

 

ভারতীয় পুলিশের সাথে দুইজন মুসলিম তরুণের কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে ভারতীয় পুলিশ সেই দুই তরুণকে বেধড়ক পিটিয়েছে। তাদের পিটানোর সময় ভারতীয় পুলিশ তাদেরকে পাকিস্তানে গিয়ে এজেন্ট হবার কথা বলেছে। মুম্বাই শহরতলির বান্দ্রায় পুলিশ স্টেশনে এ ঘটনা ঘটেছে।

এদিকে গত ৯ই অক্টোবর-২০১৫ তারিখে ভারতে একটি মৃত গরুর চামড়া ছিলতে গিয়ে গণপিটুনি খেয়েছে ৪ মুসলিম। এ নিয়ে তৈরি হয় দাঙ্গা। পুড়িয়ে দেয়া হয় এক ডজনেরও বেশি দোকান। পুলিশের গাড়ি ভাংচুর করে তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়।

জানা যায়, ওই দিন সকাল ৮টায় একদল উগ্রবাদী হিন্দু ৪ জনকে একটি গরুর চামড়া ছড়াতে দেখে। এরপর তাদের সাথে আরো অনেকে যুক্ত হয়ে ওই ৪ জনকে ধরতে অগ্রসর হয় এবং তাদের ধরে মারধর করতে থাকে। এক পর্যায়ে ৪ জনের ২ জন পালাতে সক্ষম হলেও অন্য ২ জন বেধড়ক পিটুনির শিকার হন।

তদন্তের রিপোর্ট অনুযায়ী, বিষাক্ত কোনো কিছু খেয়ে মারা গিয়েছিল গরুগুলি। কিন্তু গো-হত্যা করা হয়েছে গুজব রটিয়ে বিক্ষোভ করা হয় উধমপুরে। সকাল ৯টার মধ্যেই ৫০০ উগ্র হিন্দু সেখানে জড়ো হয়। ওই উগ্র হিন্দুরা বলতে থাকে- গো-হত্যাকারীকে তারা নিজেরাই শাস্তি প্রদান করবে। পুলিশ তাদেরকে বাধা দিলে তারা পুলিশের উপরও চড়াও হয়। কিছক্ষণের মধ্যেই উগ্রবাদী হিন্দুরা বাঁশ, লাঠি, রড ও বন্দুক নিয়ে পুলিশকে ঘিরে ফেলে দাঙ্গা শুরু করে।

উল্লেখ্য, এ ঘটনার মাত্র দুই সপ্তাহ আগে উত্তরপ্রদেশে এমনিভাবে গরুর গোশত খাওয়ার গুজবে আখলাক (৫২) ও তার ছেলে মোহাম্মদ দানিস সাইফকে (২২) হত্যা করা হয়।

ইতোমধ্যে জম্মু-কাশ্মীরের এক নির্দলীয় এমপি ইঞ্জিনিয়ার রশিদের বিফ-পার্টি নিয়েও ক্ষোভ জমা হয়েছিল উগ্রপন্থী হিন্দুদের মধ্যে। ঘটনার প্রতিবাদে পথে নেমে পড়ে তারা। রাস্তার ধারে দাঁড় করানো ছিল একটি ট্রাক। সেটিকে লক্ষ্য করে পেট্রোল বোমা ছোড়ে বিক্ষোভকারী হিন্দুরা। গুরুতর জখম হন বছর পঁয়ত্রিশের ট্রাকচালক শওকত আহমেদ দার ও ২৩ বছর বয়সি জাহিদ রসূল বাট। ৭০ শতাংশ দগ্ধ অবস্থায় সফদরজঙ্গের হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন জাহিদ। রোববার সেখানেই মৃত্যু হয়েছে তার।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, গত ২০ অক্টোবর-২০১৫ ঈসায়ী তারিখে এক দৈনিক পত্রিকায় প্রথম পৃষ্ঠায় বড় করে হেডিং হয়, “অসাম্প্রদায়িক ভারতের চরিত্র কী পাল্টে যাচ্ছে”

খবরে বলা হয়, অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক ভারতের চরিত্র কী পাল্টে দিতে যাচ্ছে সাম্প্রতিক দাদরি ঘটনা? সংখ্যার বিচারে একটি মানুষের মৃত্যু, কিন্তু প্রেক্ষাপট বিচারে তা যেন পুরো ভারতের মুখে উগ্র সাম্প্রদায়িকতার কালি লেপন। বিশ্লেষকদের মতে, ভারতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা কোনো নতুন ঘটনা নয়। শতাব্দী ধরেই দাঙ্গায় হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। ভারতের উত্তরপ্রদেশের গ্রাম দাদরিতে গরুর গোশত খাওয়ার গুজবে এক মুসলমানকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা, প্রতিবাদে সাহিত্য একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্তদের পুরস্কার ফিরিয়ে দেয়া, স্বয়ং রাষ্ট্রপতির ক্ষোভ প্রকাশ, সঙ্গে সাধারণ মানুষের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ভারতকে বিশ্ব মানচিত্রে অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে আর পরিচয় দেবে কীনা তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

বিবিসি, আনন্দবাজার পত্রিকা, আজকাল, রেডিও তেহরান’সহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে ভারতের এই সাম্প্রদায়িক উগ্র চেহারার কঠোর সমালোচনার সংবাদ ও প্রতিক্রিয়া প্রকাশ পেয়েছে। সেসব ঘটনায় গণমাধ্যমে হিন্দুত্ববাদী চেতনার ক্ষমতাসীন দল বিজেপি’র উস্কানি এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নীরবতাকে দায়ী করা হয়েছে। একাধিক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ভারতে ২০১৪ সালের তুলনায় চলতি ২০১৫ সালের প্রথম ৬ মাসে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঘটনা বেড়েছে। চলতি ২০১৫ সালের জুন পর্যন্ত ৩৩০টি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঘটনায় ৫১ জনের মৃত্যু হয়েছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ৩৩০টি দাঙ্গার ঘটনা ঘটেছে। ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সময়ে দাঙ্গার ঘটনা ছিল ২৫২টি।

বহুমতের উপর আক্রমণের প্রতিবাদে ভারতের বিভিন্ন ভাষার ৪১ জন লেখকের সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার ফিরিয়ে দেয়ার সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেছে বিদেশী সাহিত্যিকরাও। ভারতীয় সাহিত্যিকদের পাশে দাঁড়ালো আরো ১৫০টি দেশের কয়েকশ’ সাহিত্যিক। কালবুর্গি, নরেন্দ্র দাভোলকার, গোবিন্দ পানসারের হত্যাকারীদের শাস্তির দাবি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেদ্র মোদিকে চিঠি লিখেছে বিশ্বসাহিত্যিকদের সংগঠন প্যান অ্যাসোসিয়েশন। ভারতে ক্রমেই কথা বলা এবং ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা হারাচ্ছে শিল্পী, সাহিত্যিক থেকে সাধারণ মানুষ- এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ করার আর্জি জানিয়ে রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি এবং সাহিত্য একাডেমিকেও চিঠি লিখেছে এই সংগঠন। সম্প্রতি কানাডার কিউবেক শহরে আয়োজিত হয় প্যান অ্যাসোসিয়েশনের ৮১তম সম্মেলন। সেখানেই ভারতে যুক্তিবাদীদের হত্যা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন বিদেশী সাহিত্যিকরা।

সংবাদ বিশ্লেকদের মতে, কিন্তু এখন হিন্দু মৌলবাদী সংঘ পরিবারের অপতৎপরতায় ভারতীয় জনগোষ্ঠীর মাঝে সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। ভারতে খ্রিস্টান আর মুসলমানের সংখ্যা ৬৫ কোটি।

দেখে মনে হচ্ছে, বিজেপি ক্ষমতাসীন হওয়ায় সঙ্ঘপরিবারের সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো লাগামহীন হয়ে পড়েছে। ভয়ের কথা হলো, এমন কিছু নতুন ও মারাত্মক সন্ত্রাসী দলের আবির্ভাব ঘটছে, যাদের নাম আগে শোনা যায়নি। এমনই একটি সংগঠন হিন্দু রাষ্ট্রসেনা, যারা সম্প্রতি পুনেতে এক সম্ভাবনাময় মুসলমান যুবককে নৃশংস ও বর্বরোচিতভাবে হত্যা করেছে। ২৮ বছরের মহসিন শায়েখ পুনের এক আইটি কোম্পানির প্রকৌশলী ছিলেন। তিনি ছিলেন শোলাপুরে বসবাসরত তার পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তি। মহসিন শায়েখের অপরাধ শুধু এতটুকু ছিল, তার মুখে ছিল দাড়ি, আর মাথায় ছিল টুপি। তিনি তার বন্ধুর সাথে ইশা নামায আদায় করার পর মোটরসাইকেলে ঘরে ফিরছিলেন। হঠাৎ হিন্দু রাষ্ট্রসেনার ১৫ জন সন্ত্রাসী আক্রমণ করে বসে। তারা মহসিন শায়েখের উপর এমন নৃশংস ও বর্বরোচিত হামলা করে যে, তাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতেই তিনি মারা যান।

মহসিন শায়েখকে অন্যায়ভাবে হত্যার বিরুদ্ধে এখনো দেশে কোনো হইচই হয়নি। মিডিয়াও এদিকে কোনো দৃষ্টিপাত করেনি। মানবাধিকারের জন্য কাজ করা সংগঠনও মহসিন শায়েখের মৃত্যুতে কোনো কর্মসূচি গ্রহণ করেনি। চারদিকে শুধু অবজ্ঞা, আর অবহেলা। মহসিন শায়েখকে হত্যার পর হিন্দু রাষ্ট্রসেনার কর্মীদের দুঃসাহস এতই বেড়েছে যে, তারা মোবাইলে এ মেসেজটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিয়েছে, ‘একটি উইকেট পড়লো’। প্রকাশ থাকে যে, সম্প্রতি সোস্যাল নেটওয়ার্কিং সাইট ফেসবুকে শিবাজি ও বালঠাকরের বিতর্কিত ছবি আপলোড করা হয়েছে বলে বেশ প্রচারণা চালানো হয়। কোনো যাচাই ছাড়াই ক্ষোভ সৃষ্টিকারী ছবি আপলোডের দায় মুসলমানদের ঘাড়ে চাপানো হয়। ফেসবুকে মুসলিমবিদ্বেষী মন্তব্য বৃদ্ধি পেতে থাকে। অথচ এ ছবি এক বছর আগেই ফেসবুকে প্রদর্শন করা হয়। পুলিশের তদন্তে জানা যায়, ক্ষোভ সৃষ্টিকারী এ ঘটনার পেছনে নিখিল নামে এক যুবকের কারসাজি রয়েছে। সে ফেসবুকে নিহাল আহমদ নামে এক ফেক আইডি দিয়ে এ ছবি পোস্ট দেয়। এ কারণে হিন্দু রাষ্ট্রসেনার কর্মীরা কোনো যাচাই ছাড়াই এর দোষ মুসলমানদের ঘাড়ে চাপিয়ে তাদের উপর হামলা চালায়। পুনেতে কর্মরত আইটি ইঞ্জিনিয়ার মহসিন শায়েখ হিন্দু রাষ্ট্রসেনার বর্বরোচিত পাশবিক হামলার প্রথম শিকার হন। বিস্ময়কর তথ্য হচ্ছে, চূড়ান্ত আইনবিরুদ্ধ, নৃশংস ও বর্বরতার বিরুদ্ধে সরকারিভাবে চরম নিষ্ক্রিয়তা প্রকাশ করা হয়। মহসিন শায়েখের মৃত্যুতে শাসকগোষ্ঠীর চেহারায় দুশ্চিন্তা ও অস্থিরতার কোনো নিশানাই দেখা যায়নি। বরং পুনে থেকে নবনির্বাচিত বিজেপি’র পার্লামেন্ট সদস্য অটল শিরুনি চরম আক্রমণাত্মক বক্তৃতা করে মজলুমের ঘা’য়ে নুনের ছিটা দিয়েছে। সে বলেছে, যা কিছু হয়েছে, তা অবশ্যই দুঃখজনক। তবে ফেসবুকে পোস্ট দেয়ার পর পাল্টা আক্রমণ স্বাভাবিক ব্যাপার। মূলত, ভারতের শাসকগোষ্ঠীর এ ধরনের যুলুমবাজি চিন্তাধারা সন্ত্রাসী ও উগ্রবাদী গোষ্ঠীর মনোবলকে আরো চাঙ্গা করেছে।

অনেকের আশা ছিল, কেন্দ্রীয় সরকার তাদের ভাবমর্যাদা ঠিক রাখার জন্য সংখ্যালঘুদের প্রতি ন্যায়বিচার করবে। কিন্তু এ সরকার তাদের পূর্বস্বভাব অনুযায়ী ওই সব বিষয়কে হাওয়া দিচ্ছে, যা সংখ্যালঘুদের সাংবিধানিক অধিকার ও তাদের মৌলিক পরিচয়ের উপর মারাত্মক আঘাত হানছে। মুসলমানের অধিকারকে অস্বীকার করা, কিংবা দেশে একই সিভিল কোড জারি করা, ৩৭০নং ধারাকে বিলুপ্ত করার উপর তর্ক-বিতর্ক বা আবার রামমন্দির বানানোর ইচ্ছা- এসব বিষয় সংখ্যালঘুদের মৌলিক সাংবিধানিক অধিকারের উপর মারাত্মকভাবে আঘাত করছে। এ সরকারের শুরুতেই দেশব্যাপী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার যে ঢেউ সৃষ্টি হয়েছে, তা দেখে মনে হচ্ছে, ওই গোষ্ঠীর উপর বিজেপি নেতৃবৃন্দের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, যারা উগ্রতা, অত্যাচার ও বর্বরতাকে নিজেদের পরিধেয় বস্ত্র মনে করে। প্রকাশ থাকে যে, যারা সঙ্ঘপরিবারের উগ্রপন্থীদের হাতে প্রতিপালিত হয়েছে, তাদের কাছে কোনো ভালো আশা করা বাতুলতা মাত্র।

বিস্ময়কর কথা হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও তার কোনো মন্ত্রী এখন পর্যন্ত পুনেতে এক সম্ভাবনাময় মুসলিম যুবককে পাশবিকভাবে হত্যার নিন্দা করেনি। নবগঠিত সংগঠন হিন্দু রাষ্ট্রসেনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে কোনো নির্দেশ জারি করেনি। এ ব্যাপারে মহারাষ্ট্রে কংগ্রেস ও এনসিপি’র যৌথ সরকারের কাছে আমাদের কোনো আশা এজন্য নেই যে, তারা সর্বদা সাম্প্রদায়িক ও যালিমদের সাথে হাত মিলিয়ে চলে। মহারাষ্ট্রে আইনের পরিবর্তে প্রাইভেট বাহিনীর শাসন চলছে। তারা যখন ইচ্ছা, যেখানে ইচ্ছা নির্ভয়ে রাষ্ট্রীয় আইন লঙ্ঘন করে চলেছে, অথচ সরকার হাতের উপর হাত রেখে বসে আছে। নামসর্বস্ব সেক্যুলার সরকারের দুর্বলতা ও কাপুরুষতার ফলে মহারাষ্ট্রে শিবসেনা, নবনির্মাণসেনা, রামসেনা ও আজকের হিন্দু রাষ্ট্রসেনার মতো সংগঠনগুলো ফুলে ফেঁপে জেগে উঠছে। পাশাপাশি তারা তাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের নিশানা বানাচ্ছে মুসলমানদের।

বিজেপি’র এই সঙ্ঘপরিবারে রয়েছে সন্ত্রাসবাদী হিসেবে চিহ্নিত আরএসএস (রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবকসংঘ), শিবসেনা ও বিশ্ব হিন্দুসভা ইত্যাদি। ভারতের এবারের নির্বাচনে প্রকৃতপক্ষে বিজেপি ক্ষমতায় আসেনি; এসেছে সঙ্ঘপরিবার। তাদের নির্দেশেই নরেন্দ্র মোদি নির্বাচনের আগেই দলে এল.কে আদভানী, যশোবন্ত সিং প্রমুখ বর্তমানের কথিত উদারপন্থীদের কোণঠাসা করে ফেলে এবং চারপাশে কট্টরপন্থীদের স্থান দেয়। বর্তমানেও মন্ত্রিসভা গঠনে সে আরএসএসে’র পরামর্শই গ্রহণ করছে বলে জানা গেছে।

মূলত, ভারতে বর্তমানে বিজেপি নয়, বিজেপি’র সাইনবোর্ডের আড়ালে আরএসএস তথা সঙ্ঘপরিবার ক্ষমতায় বসেছে। বাবরি মসজিদ ভাঙ্গা, সেখানে রামমন্দির তৈরি, ভারত থেকে বাংলাদেশী ছাপ মেরে মুসলমান বিতাড়ন তাদের ঘোষিত এজেন্ডা।

তাদের উগ্র হিন্দুত্ববাদ শুধু মুসলমানদের জন্যই নয়; বরং গোটা ভারতের জন্যই বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়াবে। মুসলমানের জন্য কুয়া খুঁড়তে গিয়ে তারা নিজেরাই কুয়ার গর্তে পড়বে।

-আল্লামা মুহম্মদ ওয়ালীউর রহমান

 

 

 

 

 

 

ক্ষুদ্রঋণের সুদের বেড়াজালে দেশের সাড়ে ৩ কোটি মানুষ।

গ্রহীতাদের ৯০ শতাংশই দারিদ্র্যসীমা পেরোতে পারছে না।

ড. ইউনূসের ক্ষুদ্রঋণের মরণ ফাঁদ দারিদ্র্য বিমোচনে সম্পূর্ণ ব্যর্থ।

দেশের তৃণমূল পর্যায়ে সুদের বিস্তৃতি।

 

ক্ষুদ্রঋণের সুদের বেড়াজালে জড়িয়ে গেছে দেশের সাড়ে ৩ কোটি দরিদ্র মানুষ। যুগ যুগ ধরে ক্ষুদ্রঋণ নিয়েও সমাজের এই সাড়ে ৩ কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচেই রয়ে গেছে, যা মোট ক্ষুদ্রঋণ গ্রহীতার ৯০ শতাংশ। বিভিন্ন উৎস থেকে ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে তা পরিশোধে ব্যর্থতার তালিকাও দীর্ঘ হচ্ছে বছরের পর বছর। ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে পৃথক তিনটি গবেষণা সংস্থার প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

বছরের পর বছর ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে নেয়া গরিব মানুষের ১০০ জনের মধ্যে ১০ জন দারিদ্র্যসীমার উপরে উঠতে পেরেছে। বাকি ৯০ জন ঋণগ্রহীতা দারিদ্র্যসীমার নিচেই রয়ে যাচ্ছে।

১৯৯৭ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত ৩ কোটি ৪০ লাখেরও বেশি মানুষ ক্ষুদ্রঋণ নিয়েছে। এদের মধ্যে ২ কোটি ৬০ লাখই বাস করে দারিদ্র্যসীমার নিচে। তবে ক্ষুদ্রঋণ নেয়ার প্রবণতা আগের তুলনায় কমে আসছে। বর্তমানে ঋণগ্রহীতা কমে ২ কোটি ৬ লাখে দাঁড়িয়েছে। এটা একটি ইতিবাচক দিক। এ দেশের গরিব মানুষ দারিদ্র্য থেকে মুক্তির আশায় ঋণ নিলেও তারা সফলতার মুখ খুব কমই দেখে।

মূলত, দেশে প্রাচীন সুদখোর মাড়োয়ারীদের নয়া সংস্করণ ‘এনজিও’র ক্ষুদ্রঋণ ব্যবসার বেড়াজালে আটকে গেছে গ্রামগঞ্জের নারী-পুরুষ। ‘গরিবী হটাও’ আর ‘স্বাবলম্বী’র নামে বিদেশী টাকায় শত শত এনজিও মাকড়সার জালের মতো সারাদেশে ক্ষুদ্রঋণের জাল ছড়িয়ে দিয়েছে। এ ঋণের বেড়াজালে আটকে গেছে লাখ লাখ অসহায় নারী-পুরুষ। নারীকে স্বাবলম্বী এবং আত্মকর্মসংস্থানের নামে এনজিওগুলো গ্রামের মানুষের মধ্যে ঋণ বিতরণ করেছে। চড়া সুদে সে ঋণের সাপ্তাহিক কিস্তির যোগান দিতে গিয়ে বিপর্যয়কর অবস্থায় পড়ছে ঋণ গ্রহীতারা।

স্বাবলম্বী হওয়া তো দূরের কথা ক্ষুদ্রঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে গিয়ে ভিটা-মাটি, ঘটি-বাটি, গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি বিক্রি করতে হচ্ছে। ঋণের কিস্তির যন্ত্রণা থেকে বাঁচতে আত্মহত্যা এবং কিডনী বিক্রির ঘটনাও ঘটছে। এমনকি বংশ পরম্পরায় ক্ষুদ্রঋণের সুদের ঘানি টানতে হচ্ছে। ঋণের কিস্তি নিয়ে বিরোধে পারিবারিক অশান্তি, সামাজিক অবক্ষয় এবং ঘর-সংসার ভেঙে যাওয়ার মতো ঘটনাও ঘটছে।

সম্প্রতি বগুড়ার ধনুটের গোসাইবাড়ী ইউনিয়নের যমুনার চরের কয়েকজন ঋণ গ্রহীতা জানান, কাজ নেই, ঘরে খাবার নেই, ছেলেমেয়ে নিয়ে অনাহারে-অর্ধাহারে থাকতে হয়। তারপরও কিস্তির জন্য চাপ দেয়া হচ্ছে। ফলে এনজিও’র মাঠকর্মীদের দেখলেই তারা বাড়ি থেকে পালিয়ে থাকতে বাধ্য হন।

জয়পুরহাট যেলার কালাই গ্রামের আখতার আলম নামের এক ব্যক্তি এনজিও’র ঋণের কিস্তি নিয়মিত দিতে পারেনি। অতঃপর একপর্যায়ে ঋণের দায় মেটাতে কিডনী বিক্রি করেছে। কালাই গ্রামেরই আরেক বাসিন্দা মুকাররম হোসাইনও ক্ষুদ্রঋণের চক্করে পড়ে কিডনী বিক্রি করেছে।

রংপুর, দিনাজপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, রাজশাহী, নাটোর, জয়পুরহাট, পাবনাসহ ২০/২২টি যেলার শতাধিক গ্রামের অভিন্ন চিত্র জানা গেছে। গ্রামীণ ব্যাংক, প্রশিকা, ব্রাক, আশা’র মতো বড় বড় এনজিও ছাড়াও জেলা-উপজেলা পর্যায়ে ও স্থানীয় পর্যায়ের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র এনজিও জনগণের ভাগ্যের উন্নয়নের নামে ক্ষুদ্রঋণ দানের চটকদার ব্যবসায় নেমে পড়েছে।

এদিকে ইউরোপ থেকে পাওয়া কোটি কোটি ডলার গ্রামীণ ব্যাংক থেকে নিজের অন্য এক প্রতিষ্ঠানে সরিয়ে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে কথিত শান্তিতে কথিত নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ও গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা এবং ক্ষুদ্রঋণ নামক গরিবের রক্তচোষা পদ্ধতির জনক প্রফেসর ড. ইউনূসের বিরুদ্ধেও। নরওয়ের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এক প্রামাণ্যচিত্রে এ অভিযোগ উপস্থাপন করা হয়। ক্ষুদ্র ঋণের ফাঁদে (ঈধঁমযঃ রহ গরপৎড় ফবনঃ) নামে প্রামাণ্যচিত্রটির ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার হয় নরওয়ের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে (এনআরকে) ডেনমার্কের টম হেইনমানের নির্মিত ওই প্রামাণ্যচিত্রে ক্ষুদ্রঋণ বিষয়টিকে ক্রিটিক্যালি দেখার চেষ্টা করা হয়েছে। পাশাপাশি দারিদ্র্য দূর করার জন্য ভর্তুকি হিসেবে গ্রামীণ ব্যাংককে ১৯৯৬ সালে নরওয়ে, সুইডেন, নেদারল্যান্ডস ও জার্মানির দেয়া ৬০৮ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনার (৬১৩ কোটি ১৪ লাখ টাকা) অর্থ ইউনূস ‘গ্রামীণ কল্যাণ’ নামে নিজের অন্য এক প্রতিষ্ঠানে সরিয়ে নেয় বলে অভিযোগ করা হয়।

এছাড়া গ্রামীণ ব্যাংকের মাধ্যমে গ্রামের বহু দরিদ্র নারীকে ৩০ ভাগ সুদের হারে ঋণ দিয়ে ঋণের জালে জড়িয়ে ফেলার অভিযোগ আনা হয়। প্রামাণ্যচিত্রে ক্ষুদ্রঋণ চালু হওয়ার পরবর্তী ৩৫ বছরে এখনো কোনো গরিব মানুষকে দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পাওয়ার কোনো প্রমাণ মেলেনি বলেও ওই প্রামাণ্যচিত্রে উল্লেখ করা হয়। নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জোনাথন মরডাকের তথ্য অনুযায়ী, গত শতকের ৯০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে শেষ পর্যন্ত গ্রামীণ ব্যাংক ১৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার বিদেশী অর্থ পায়। ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমের মাধ্যমে বাংলাদেশের গরিব মানুষদের দারিদ্র্যসীমার নিচ থেকে তুলে আনাই ছিলো ওই তহবিলের লক্ষ্য।

উল্লেখ্য, রিভলবিং ফান্ড থেকে কোনো অর্থ ব্যয়ের পর তার বিনিময়ে পাওয়া অর্থ আবার একই কাজে ব্যবহার করা যায়। এই তহবিলের ক্ষেত্রে অর্থবছর বিবেচ্য হয় না। অর্থ সরিয়ে নেয়ার ঘটনা জানাজানির পর ঢাকার নরওয়ের দূতাবাস, নরওয়ের দাতাসংস্থা-নোরাড এবং বাংলাদেশ সরকারের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ এ অর্থ গ্রামীণ ব্যাংকে ফেরত নেয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু তারা সেটা পারেনি। এরপর গ্রামীণ কল্যাণের কাছে ওই অর্থ ঋণ হিসেবে নেয় গ্রামীণ ব্যাংক।

উল্লেখ্য, ১৯৭৬ সালে গবেষণা কার্যক্রম হিসেবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন জোবরা গ্রামে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম শুরু করে ড. ইউনূস। সে তখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতো। ১৯৮৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে গ্রামীণ ব্যাংক। ২০০৬ সালে যৌথভাবে কথিত শান্তিতে কথিত নোবেল পুরস্কার পায় ড. ইউনূস ও তার নির্মিত প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ ব্যাংক। প্রামাণ্যচিত্রে আরো উল্লেখ করা হয়, ড. ইউনূস তার কোটি কোটি ডলার আত্মসাতের এ ঘটনা যাতে প্রকাশ না পায় সে বিষয়েও সতর্ক ছিলো। এ নিয়ে নোরাডের তখনকার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে চিঠিও লেখে সে।

প্রামাণ্যচিত্রে ঋণের ফাঁদে পা দেয়া গ্রামীণ দুস্থ মহিলাদের সাক্ষাৎকার এবং ঋণ গ্রহণের পর তাদের বর্তমান দুর্দশার চিত্রও তুলে ধরা হয়। আর এজন্য নির্মাতারা গ্রামীণ ব্যাংকের সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে সংশ্লিষ্ট গ্রামগুলোতে যায় বেশ কয়েকবার। তারা গ্রামীণ ব্যাংক থেকে প্রথম ঋণ নেয়া জোবরা গ্রামের সুফিয়ার মেয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। যশোরের হিলারি পল্লীতে তাদের দেখা হয় ওইসব গরিব মানুষদের সঙ্গে যারা গ্রামীণ ব্যাংক থেকে ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছে। ক্ষুদ্রঋণের কারণে তাদের জীবনযাত্রার কোনোও মানোন্নয়ন হয়নি; উল্টো ঋণের বোঝাই শুধু বেড়েছে।

ক্ষুদ্রঋণের নামের সুদের ব্যবসায়ী সংস্থা নানা প্রলোভন ও মিথ্যা স্বপ্ন দেখিয়ে দরিদ্র জনগণকে ঋণ নিতে উদ্বুদ্ধ করে থাকে। ঋণের টাকা কোথায় ব্যয় হয় সে খবর কেউ রাখে না। অনেকে ঋণের টাকায় যৌতুক, সন্তানের পড়া-লেখা, ধার-দেনা শোধ ও গৃহস্থালী আসবাবপত্র কেনায় খরচ করে ফেলে। পরবর্তীতে সুদে-আসলে ঋণের টাকা পরিশোধ করতে গিয়ে তারা সর্বস্বান্ত হয়ে যায়। ঋণগ্রহীতার জীবন যাত্রার মানে উন্নয়ন ঘটেনি। স্বামীর অগোচরে ঋণ নেয়ায় তালাক ও আত্মহত্যার ঘটনা পর্যন্ত ঘটেছে। যারা হাঁস-মুরগি পালন করতো তারা বড় খামার করতে পেরেছে এমন নজির নেই। বরং ঋণ গ্রহীতার উপকারের চাইতে চূড়ান্ত পর্যায়ে ক্ষতি ডেকে নিয়ে আসে। ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে বিভিন্ন সংস্থা জমজমাট ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে এবং সুদের বিস্তৃতি ঘটছে তৃণমূল পর্যায়ে। একা গ্রামীণ ব্যাংক ২৫৬৪টি শাখার মাধ্যমে দেশের ৮১ হাজার ৩১৭টি গ্রামে ৮৩ লাখ সদস্যকে ক্ষুদ্রঋণের সুদের জালে আটকে ফেলেছে। এ খাতে গ্রামীণ ব্যাংকের বিনিয়োগের পরিমাণ ৮ হাজার ৮শ’ কোটি টাকা। গ্রামীণ ব্যাংকের সুদের উচ্চ হার বাণিজ্যিক ব্যাংকের চাইতেও বেশি।

চালু হওয়ার ৩৫ বছর পরও এমন কোনো প্রমাণ নেই, যাতে মনে হতে পারে ক্ষুদ্রঋণ গরিব মানুষকে দারিদ্র্য থেকে মুক্তি দিতে পারে। তবে এটা প্রমাণিত সত্য যে, গলা ফাটিয়ে যারা এদেশের গরিব মানুষের দারিদ্র্য দূর করতে মাঠে নেমেছে, তারা শত শত কোটি টাকার মালিক বনে গেছে। ক্ষুদ্রঋণ যদি সফল হতো তাহলে আজো কেন ৭ কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে রয়েছে? গ্রামীণ ব্যাংকের প্রথম ঋণ গ্রহীতা চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার জোবরা গ্রামের সুফিয়া খাতুন বিনা চিকিৎসায় মারা গেছে। চিকিৎসার টাকা যোগাতে তার পরিবারের সদস্যরা মানুষের দুয়ারে দুয়ারে ভিক্ষা করেছে। কিন্তু গ্রামীণ ব্যাংক সহায়তা করেনি।

বাংলাদেশের হতদরিদ্র মানুষ ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে ৬৭ শতাংশই ব্যয় করে অনুৎপাদনশীল খাতে, যা দারিদ্র্যবিমোচনে কোনো ভূমিকাই রাখে না। তাই ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে দারিদ্র্যবিমোচন সম্ভব নয়। সম্প্রতি দেশের দুর্যোগপ্রবণ ৮ জেলার খাদ্য নিরাপত্তা পরিস্থিতির উপর বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডঋচ) পরিচালিত এক জরিপের প্রতিবেদনে এ তিক্ত সত্য ফুটে উঠেছে। সম্প্রতি দেশের দুর্যোগপ্রবণ রংপুর, গাইবান্ধা, বগুড়া, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জ জেলায় এ জরিপ চালানো হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) আর্থিক সহায়তায় পরিচালিত এ জরিপ প্রতিবেদন ‘দারিদ্র্যবিমোচনে দরিদ্র ব্যক্তিদের সম্পদ প্রদানে’র উপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, হতদরিদ্র ব্যক্তিদের ৫০ থেকে ৭৫ শতাংশই ঋণগ্রস্ত। এদের মধ্যে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ দেনাগ্রস্ত শুধু স্থানীয় মুদি দোকানগুলোর কাছে। ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে ২৯ শতাংশ হতদরিদ্র চিকিৎসা বাবদ খরচ করে ও ১৭ শতাংশ দৈনন্দিন খাবার কেনে। এছাড়া ক্ষুদ্রঋণের ১৩ শতাংশ অর্থ ব্যয় হয় মৃতের দাফন-কাফন, বিয়ে ও বিবাহ বিচ্ছেদের মতো পারিবারিক অনুষ্ঠান এবং জরুরী সঙ্কট উত্তরণে। হতদরিদ্রের ঋণের উৎস সম্পর্কে প্রতিবেদনে বলা হয়, ৬০ শতাংশ মানুষ আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের কাছ থেকে ঋণ নেয়। দাদনের ঋণ নেয় ১০ শতাংশ। এছাড়া ১৪ শতাংশ গ্রামীণ ব্যাংক থেকে, ৭ শতাংশ ব্রাক থেকে, ১২ শতাংশ বিভিন্ন এনজিও থেকে ও মাত্র ১ শতাংশ সাধারণ ব্যাংক থেকে।

এনজিও’দের অর্থের যোগানদাতা হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি। পৃথিবীর সর্বত্র তাদের নেটওয়ার্ক সক্রিয়। পাশ্চাত্য সংস্কৃতির বিকাশ, খ্রিস্টধর্ম প্রচার, পবিত্র দ্বীন ইসলাম উনার বিরুদ্ধে বিষোদগার, অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ, নতুন মুৎসুদ্দী শ্রেণী তৈরি করে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির পুঁজি পাহারা দেয়া তাদের লক্ষ্য। বিগত ২৫ বছরে ঋণ বা সাহায্যের নামে এদেশে এসেছে ৫০ হাজার কোটি টাকা, তার ৭৫ ভাগ অর্থাৎ ৩৭.৫০ কোটি টাকা তারাই নিয়ে গেছে, বাকি ১২.৫০ হাজার কোটি টাকা এ দেশে একটি লুম্পেন ধনিক শ্রেণী গঠনে খরচ হয়েছে। এনজিও বিষয়ক ব্যুরোতে তালিকাভুক্ত এনজিও’র সংখ্যা বাংলাদেশে ২ হাজার ৩৭টি। চলতি ২০১৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত এনজিওবিষয়ক ব্যুরো প্রকল্প অনুমোদন করেছে ৩২৯টি। অর্থ অবমুক্ত হয়েছে ১ হাজার ৮১৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা।

ক্ষুদ্রঋণ দারিদ্র্যবিমোচন করে না, বরং সামন্তসমাজের ভূমিদাসের মতো এ যুগের মানুষকে গ্রামীণ ব্যাংক এক ধরনের ঋণদাসে পরিণত করছে। দারিদ্র্য বিমোচনের এই পথ অনুসরণ করার ফলে আমাদের উন্নতির কোনো দিশা আমরা খুঁজে পাচ্ছি না। পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থার মধ্যেই সংখ্যালঘুর ধনী ও সংখ্যাগরিষ্ঠের গরিব হওয়ার প্রক্রিয়া নিহিত। মানুষকে গরিব করা ও গরিব রাখার ব্যবস্থা বহাল রেখে গরিবদের ঋণ দিয়ে ও উচ্চহারে সুদ নিয়ে কীভাবে গরিবী মোচন হবে?

-আল্লামা মুহম্মদ তা’রীফুর রহমান

 

 

 

 

হালাল-হারাম নিয়ে নানা কথা

 

ইউরোপসহ পাশ্চাত্যের সবদেশে গোশতের প্রধান উৎস হচ্ছে শূকর। এই প্রাণীর প্রজন্মের জন্য রয়েছে অনেক ফার্ম। কেবল ফ্রান্সেই আছে ৪২০০০ ফার্ম। এই প্রাণীটির গায়ে থাকে প্রচুর পরিমাণ চর্বি। কিন্তু  বেশি চর্বি দেহের জন্য ভালো নয় বলে ইউরোপিয়ান এবং আমেরিকানরা এই চর্বি থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করে।

কিন্তু এই চর্বি কোথায় যাবে? এই প্রাণীগুলো আবার সরকারের নিয়ন্ত্রণেই মারা হয়। ফলে সরকারের জন্য এই চর্বি ফেলে দেয়া এক মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। প্রায় ৬০ বছর আগে এসব চর্বি পুড়িয়ে ফেলা হতো। পরে এগুলো সাবান তৈরিতে ব্যবহার হতে থাকে।

পরবর্তীতে ব্যবসার নতুন এক ক্ষেত্র উন্মোচিত হয়। এই চর্বিগুলো রাসায়নিক উপাদান দ্বারা প্রক্রিয়াজাত করে প্যাকেটে ভরে বিপণনের ব্যবস্থা করা হয়। অন্য এক কোম্পানী কিনে নিয়ে বিক্রি করা শুরু করে।

এরই মধ্যে ইউরোপে নতুন আইন চালু হয় যেন সকল খাদ্য, ওষুধ, ব্যক্তিগত ব্যবহারের সকল প্রোডাক্টের মোড়কে সব উপাদানের নাম উল্লেখ করা থাকে। ফলে লেখা হতে থাকে চরম ঋধঃ বা শূকরের চর্বি।

চল্লিশ বছর আগে যারা ইউরোপ গিয়েছেন তাদের এই বিষয়টি জানা আছে। কিন্তু সকল মুসলিম দেশ তখন এ সকল প্রোডাক্টের ব্যবহার বন্ধ করে দেয়। ফলে দেখা দেয় ব্যবসার মধ্যে মন্দা ।

১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের কথা আমাদের জানা আছে। তখন রাইফেলের বুলেট  তৈরি হতো ইউরোপে আর সমুদ্র পথে তা ভারতবর্ষে আসতো। কিন্তু সাগর পথে বুলেট আসতে মাসের পর মাস সময় লাগতো। তাছাড়া বন্দুকের বারুদ সমুদ্রের আবহাওয়াতে নষ্ট হয়ে যেত বলে এই প্রাণীর চর্বি দিয়ে প্রলেপ দেয়া হতো। কিন্তু বুলেট ব্যবহারের পূর্বে দাঁত দিয়ে কামড়ে এই চর্বির আবরণ ছিঁড়ে ফেলতে হতো।

যখন এ কথা প্রচার হয়ে যায়, তখন মুসলমান সৈনিকগণের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়, যা পরিণামে গৃহযুদ্ধ ডেকে নিয়ে আসে। ইউরোপিয়ানদের এই ইতিহাস জানা আছে। তাই তারা Pig Fat লেখা বন্ধ করে দিয়ে Animal Fat বা প্রাণীর চর্বি লেখা শুরু করলো। পরবর্তীতে তাদের যখন প্রশ্ন করা হতো- কোন্ প্রাণীর চর্বি, তখন বলা শুরু করলো- গরু, ভেড়া ইত্যাদি। তখন মুসলমান উনারা হালাল উপায়ে যবেহ না বলে আবারো ইউরোপিয়ানদের পণ্যের ব্যবহার বন্ধ করে দিলে কাফিররা নতুন ষড়যন্ত্র আঁটে। কারণ মুসলিম দেশ থেকে তাদের আয়ের প্রায় ৭৫ ভাগ আসতো।

তারপর থেকে সরাসরি উপাদানের নাম না লিখে ই-কোড ব্যবহার শুরু হয়।  টুথপেস্ট, চকলেট, ক্যান্ডি, চুইং গাম, মিষ্টি, বিস্কিট, কর্ন ফ্লেক্স, টফি, ক্যান জাতীয় দ্রব্য ইত্যাদিতে ই-কোড লেখা হতে থাকে। তাহলে আমাদের এই ই-কোড সম্বন্ধে স্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন।

অনলাইনে অনেক লেখা পাওয়া যায় কিন্তু সব লেখা সত্য নয়। আবার অনেক তথ্যের অনেক ব্যাখ্যা প্রয়োজন। তাই আমরা চেষ্টা করবো এমন একটি ধারণা দিতে, যাতে আপনি নিজেই হালাল হারামের ব্যাপারে একটি সিদ্ধান্তে আসতে পারেন।

প্রথমেই মনে রাখতে হবে- যা শূকরের চর্বি থেকে তৈরি হয়, তা গরুর চর্বি থেকেও তৈরি করা সম্ভব। কিন্তু কোনো গরু হালাল উপায়ে যবেহ না হলে সেই প্রাণীর চর্বি থেকে বানানো যা; শূকররে চর্বি থেকে বানানোও তা। দুটোই হারাম হবার কথা। আর এ নিয়ে যদি আমরা হালাল হারাম বাছতে যাই- আমাদের জীবন হয়ে পড়বে কঠিন। দেখা যবে- এটা খাওয়া যাবে না, ওটা খাওয়া যাবে না, জীবন প্রায় দুঃসহ। কিন্তু পবিত্র দ্বীন ইসলাম মানুষকে সহজ সমাধান দিয়েছেন। ফলে আমাদের সেই সমাধানের পথটা জানতে  হবে।

এছাড়াও অনেক উপাদান আছে, যা প্রাণীর উৎস থেকে তৈরি হয়; একইভাবে ভেষজ উৎস থেকেও তৈরি হয়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই উৎস উল্লেখ থাকে না। সেক্ষেত্রে প্রাণীর উৎস মনে করেই এগিয়ে যেতে হবে।

অনেক ক্ষেত্রে উল্লেখিত উপাদানসমূহের মধ্যে হারাম কোনো উপাদান না থাকলেও দেখা যায়- যে ফ্লেভারিং এজেন্ট যোগ করা হয়, সেখানে হারাম উপাদান মিশ্রিত থাকে। আর সে কারণে দ্রব্যটি ব্যবহারের বা খাবারের অনুপযুক্ত হয়ে উঠে।

এসব দিক মাথায় রেখে আমরা আমাদের আলোচনা চালিয়ে যাবো।

নিচের চার্ট থেকে ধারণা পাবেন- কোন্ নম্বরগুলো কি উপাদান হিসেবে ব্যবহার হয়।

১। E100–E199 (রং-এর কাজে ব্যবহার হয়)

২। E200–E299 (প্রিজারভেটিভ হিসেবে ব্যবহার হয়)

৩। E300–E399 (এন্টিওক্সিডেন্ট এবং এসিডিটি রেগুলেটর হিসেবে ব্যবহার হয়)

৪। E400–E499 (ঘন, দীর্ঘস্থায়ী ও ইমালসিফায়ার হিসেবে ব্যবহার হয়)

৫। E500–E599 (এসিডিটি রেগুলেটর এবং এন্টি কেইকিং এজেন্ট হিসেবে ব্যবহার হয়)

৬। E600–E699 (সুগন্ধি দ্রব্য হিসেবে ব্যবহার হয়)

৭। E700–E799 (এন্টিবায়োটিক হিসেবে ব্যবহার হয়)

৮। E900–E999 (চকলেট, মিষ্টির চকচকে ভাব আনার জন্য ব্যবহার হয়)

৯। E1000–E1599 (বাড়তি উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়)

-ফার্মাসিস্ট মুহম্মদ রুহুল হাসান