(হুযূর কিবলা উনার ওয়াজ শরীফ থেকে সংকলিত)
মুহররমুল হারাম হলো ইসলামী চন্দ্র মাসের প্রথম মাস। বারটি মাসের কথা কুরআন মজিদেই বর্ণিত আছে। এর মধ্যে চারটি মাসকে মহান আল্লাহ পাক তিনি পবিত্র বলে ঘোষণা করেছেন আর তা হলো- যিলক্কদ, যিলহজ্জ, মুহররম ও রজব। যেমন মহান আল্লাহ পাক তিনি কালামুল্লাহ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক করেন- “মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন উনার কাছে আসমান ও জমিনের সৃষ্টির শুরু থেকে গণণা হিসাবে মাসের সংখ্যা বারটি। তন্মধ্যে চারটি পবিত্র মাস।” (পবত্রি সূরা তওবা শরীফ, পবিত্র আয়াত শরীফ ৩৬)
পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে আছে- নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলেন- “হারাম মাসের তিনটি মাস একসাথে। এ তিনটি হলো জিলক্কদ, জিলহজ্জ, মুহররম এবং একটি আলাদা সেটি হলো রজব।”
পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন- “তোমরা মুহররমকে সম্মান করো।”
পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছেন, তোমরা মুহররম মাসকে সম্মান কর। যে মুহররম মাসকে সম্মান করবে মহান আল্লাহ পাক তাকে বেহেস্ত দ্বারা সম্মানিত করবেন এবং জাহান্নাম থেকে নাজাত দান করবেন। মুহররম মাসের ১০ তারিখ আশুরা নামে পরিচিত। আশুরা আশারাহ শব্দ থেকে নিঃসৃত। দশকে আরবী ভাষায় বলে আশারাহ। আশুরা দিবসে যে সমস্ত ঘটনা সংঘঠিত হয়েছে তা অত্যন্তু বরকতময় ও আনন্দের, কিন্তু হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার শাহাদাত এর ব্যতিক্রম যা মানুষের অন্তুরকে ভাবিয়ে তোলে এবং বিষাদময় করে, তবে শিক্ষা দেয় ত্যাগের ও সত্যের।
আশুরার দিন অর্থাৎ মুহররমের ১০ তারিখে যে সমস্ত ঘটনা সংঘঠিত হয়েছে মোঁমুটিভাবে আলোকপাত করা হলো। সৃষ্টির শুরু হয় আশুরার দিন এবং ক্বিয়ামত হবে ১০ই মুহররম রোজ শুক্রবার অর্থাৎ ঐ আশুরার দিনেই। পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলেন- “তোমরা মুহররমকে সম্মান করবে কেননা এই মুহররমের ১০ তারিখে অর্থাৎ আশুরার দিন অনেক কান্নাকাটি, অনেক রোনাজারি, অনেক ফরিয়াদীর পর মহান আল্লাহ পাক তিনি হযরত আদম আলাইহিস সালাম উনার দোয়া কবুল করেছেন। মহান আল্লাহ পাক তিনি এ দিন হযরত ইদ্রিস আলাইহিস সালাম উনাকে আকাশে তুলে নিয়েছিলেন। এদিন হযরত নুহ আলাইহিস সালাম এবং উনার সঙ্গী-সাথী যাঁরা ছিলেন উনাদের মহান আল্লাহ পাক তিনি বন্যা থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। মহান আল্লাহ পাক তিনি এ দিন হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম উনাকে নমরূদের তৈরী আগুন থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। মহান আল্লাহ পাক তিনি এ দিন হযরত মুসা আলাইহিস সালাম উনার সাথে কথা বলেছিলেন এবং তাওরাত কিতাব নাজিল করেছিলেন।
এ দিনই মহান আল্লাহ পাক তিনি বনী ইস্রাঈলের জন্য রাস্তা করে দিয়েছিলেন লোহিত সাগরের মধ্য দিয়ে যার দ্বারা মুসা আলাইহিস সালাম এবং উনার সম্প্রদায় পার হয়ে গিয়েছিলেন আর ফিরাউন ও তার সম্প্রদায় ডুবে গিয়েছিল। এ দিন মহান আল্লাহ পাক তিনি ইউনুস আলাইহিস সালাম উনাকে মাছের পেট থেকে নাজাত দিয়েছিলেন। হযরত আইয়্যুব আলাইহিস সালাম উনাকে শেফা দান করেছিলেন এবং এ দিনই হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম উনাকে হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম উনার কাছে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।
এ দিনেই হযরত দাউদ আলাইহিস সালাম উনার গুনাহ খাতা ক্ষমা করা হয়েছিল এবং হযরত সোলায়মান আলাইহিস সালাম উনার রাজত্ব ফিরে পেয়েছিলেন। মহান আল্লাহ পাক তিনি এ দিন হযরত ইসা আলাইহিস সালাম উনাকে আসমানে তুলে নিয়েছিলেন। হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মর্যাদা বৃদ্ধি করে দিয়েছিলেন এ দিন যা সবচেয়ে দুঃখের তথা মর্মান্তিুক ঘটনা সংঘঠিত হয়েছে তা হলো- হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার প্রিয় দৌহিত্র ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনাকে শহীদ করা হয়। আশুরার মধ্যে যতগুলো ঘটনা ঘটেছে তার মধ্যে সবগুলোই বরকতময় শুধু শেষ ঘটনাটি ব্যাতীত। মূলতঃ এটাও বরকতময় অর্থাৎ এটা থেকে এ নসিহত হাসিল করতে হবে যে, হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম তিনি কখনও নাহকের সাথে হাত মেলাননি এমনকি আপোষও করেননি। তিনি হক্বের উপর কায়েম থেকে শহীদ হন। হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার বর্ণনা ক্বিয়ামত পর্যন্তু চলবে এবং উনার বিপরীত ইয়াজিদ এবং তার সঙ্গী-সাথীদের সবাই লানত দিতে থাকবে।
এখানে একটা জরুরী মাসআলা হলো পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে- হযরত দাউদ আলাইহিস সালাম উনার গুনাহ মাফ করা হল, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার গুনাহ খাতা মাফ করে দেয়া হল। তবে কি নবী আলাইহিস সালাম উনাদের কোন গুনাহ ছিল? কখনও নয়। নবী আলাইহিস সালামগণ উনারা মাসুম, নিষ্পাপ। আকাঈদের কিতাবে উল্লেখ করা হয় সমস্ত আম্বিয়া আলাইহিস সালামগণ উনারা পবিত্র। সগীরা ও কবীরা গুনাহ থেকে, কুফরী থেকে এমনকি অপছন্দনীয় কাজ থেকে নবী আলাইহিমুস সালামগণ উনারা পবিত্র। ইহা আহলে সুন্নাত আল জামায়াতের আকীদা। কাজেই উনাদেরকে গুনাহগার বলা যাবে না, বলা কুফরী।
মহান আল্লাহ পাক তিনি নবী আলাইহিস সালাম উনার দ্বারা যা সংঘটিত করেছিলেন তা মূলত উম্মতের শিক্ষার জন্য এবং তাদের তওবা তাদের মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য। আশুরা দিবসের আরও কিছু ঘটনা উল্লেখযোগ্য। যেমন- প্রথম বৃষ্টিপাত বর্ষন হওয়া এবং প্রথম রহমতও মহান আল্লাহ পাক তিনি নাযিল করেন এ দিনে। আশুরা দিবসের কিছু আমলের কথা হাদীছ শরীফ-এ উল্লেখ করা হয়েছে। হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলেন- “কোন ব্যক্তি যদি এদিন তার পরিবারবর্গকে ভাল খাওয়ায় পরায় তাহলে মহান আল্লাহ পাক তিনি তাকে এক বৎসরের জন্য স্বচ্ছলতা দান করবেন।” আশুরাকে সম্মান করলে যে কি ফযীলত হয় তার একটা ওয়াকিয়া বর্ণনা করা হয়- এক ব্যক্তি ছিল গরীব, দিনমজুর। একবার অসুস্থতার কারণে তিনি তিন দিন যাবত কাজ করতে পারলেন না। চতুর্থ দিন ছিল আশুরার দিন। তিনি আশুরার দিনে ভাল খাওয়ার ফযীলত সম্পর্কে জানতেন।
তখন ছিল কাজীদের (বিচারক) যুগ। কাজী সাহেব ধনী ব্যক্তি ছিলেন। তার কাছে আশুরায় ফজিলতের কথা বলে এবং নিজের অসুস্থ্যতা ও পরিবারের তিনদিন যাবত অভুক্ত থাকার কথা উল্লেখ করে ১০ সের আটা, ১০ সের গোস্ত ও দুই দিরহাম চাইলেন। কাজী সাহেব তাকে যোহরের সময় আসতে বললেন। যোহরের সময় কাজী সাহেব বললেন আছরে আসতে। কিন্তু এর পরে আসরের সময় মাগরেব এবং মাগরেবের সময় সরাসরি না করে দিলেন। দুঃখে অধীর হয়ে লোকটি তখন কাঁদতে কাঁদতে বাড়ীর দিকে রওয়ানা হল। পথে ছিল এক খৃষ্টানের বাড়ী। লোকটিকে কাঁদতে দেখে উক্ত খৃষ্টান উনাকে কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করল। কিন্তু তিনি বিধর্মী বিধায় খৃষ্টানকে প্রথমে কিছু বলতে চাইলেন না।
অতঃপর খৃষ্টানের অধীর আগ্রহের কারণে তিনি আশুরার ফযীলত ও তার বর্তমান দুরবস্থার কথা ব্যক্ত করলেন। খৃষ্টান ব্যক্তি তখন উৎসাহী হয়ে তাকে আশুরার সম্মানার্থে ১০সের আটা, ১০সের গোস্ত, ২ দিরহাম এবং অতিরিক্ত আরও ২০ দিরহাম দিল এবং বললো যে তোমাকে আমি আশুরার সম্মানার্থে প্রতিমাসে এ পরিমাণ হাদিয়া দিব। ঐ ব্যক্তি তখন তা নিয়ে বাড়ীতে গেল এবং খাবার তৈরী করে ছেলে-মেয়েসহ আহার করল। অতঃপর দোয়া করলো, “হে মহান আল্লাহ পাক যে ব্যক্তি আমাকে সন্তুষ্ট করলো আমার ছেলে-মেয়েদের মুখে হাসি ফোটালো মহান আল্লাহ পাক আপনি তার দিল খুশি করে দেন, তাকে সন্তুষ্ট করে দিন”। ওই রাত্রে কাজী সাহেবকে স্বপ্নে দেখানো হলো যে, কাজী সাহেবকে বলা হচ্ছে, হে কাজী তুমি মাথা উত্তোলন করো। মাথা তুলে কাজী দেখতে পেলেন যে তার সামনে দুটি বেহেস্তের বালাখানা একটি স্বর্ণের আরেকটি রৌপ্যের। কাজী সাহেব বললেন হে মহান আল্লাহ পাক এটা কি? গায়েবী আওয়াজ হলো এ বালাখানা দুটি তোমার ছিল। কিন্তু এখন আর তোমার নেই। কারণ তোমার কাছে যে গরীব লোকটা এসেছিল তাকে তুমি সাহায্য করার ওয়াদা করে ওয়াদা ভঙ্গ করেছ। এজন্য এ বালাখানা দুটি এখন একজন খৃষ্টান লোকের। কাজী সাহেব বললেন মহান আল্লাহ পাক কোন সে খৃষ্টান। কাজী সাহেব! অতঃপর ঘুম থেকে উঠে ওজু ও নামাজ আদায় করে সেই স্বপে¦র খৃষ্টানের বাড়ীতে গেল। খৃষ্টান কাজী সাহেবকে দেখে বিস্ময়াভুত হলো কাজী সাহেবকে খৃষ্টান বললো, আপনি এত সকালে কি জন্য এলেন? কাজী সাহেব বললো- হে খৃষ্টান ব্যক্তি তুমি গতরাত্রে কি কোন নেককাজ করেছ? খৃষ্টান ব্যক্তি বলতে নারাজ। তিনি বললেন কি ব্যাপার হয়েছে আগে বলেন তারপর বলবো। তখন কাজী সাহেব বললেন যে এই ঘটনা ঘটেছে এবং তুমি নিশ্চয়ই গরীব লোকটাকে সাহায্য করেছ। তখন খৃষ্টান ব্যক্তি তা স্বীকার করল। কাজী সাহেব বললো যে তুমি তো খৃষ্টান তুমি মরলে জাহান্নামে যাবে। তুমি তো এই বালাখানা পাবেনা। তোমার এটা নিয়ে কি ফায়দা হবে? তুমি তোমার এই নেক কাজ এক লক্ষ দেরহামের বিনিময়ে আমার নিকট বিক্রি করে দাও এবং তুমি তার কাছে প্রত্যেক মাসে যে ওয়াদা করেছ আমি তাকে তা দিয়ে দিব। খৃষ্টান ব্যক্তি বললো এটা কখনও সম্ভব নয়। হে কাজী তুমি সাক্ষী থাক আমি কলেমা শরীফ পড়ে মুসলমান হয়ে গেলাম। অতএব এটা ফিকির করার কথা যে আশুরাকে সম্মান করার কারনে মহান আল্লাহ পাক তিনি উক্ত খৃষ্টানকে ঈমান দিয়ে দিলেন এমনকি জান্নাত নসিব করলেন। এই জন্য মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলেছেন- “যে ব্যক্তি আশুরাকে সম্মান করবে মহান আল্লাহ পাক তিনি তাকে জান্নাতের দ্বারা সম্মানিত করবেন।” সুতরাং এটা ফিকিরের বিষয়।
আশুরা দিবসের আমল সম্পর্কে আরও উল্লেখ করা হয়েছে আশুরার সম্মানার্থে কেউ যদি গোসল করে তাহলে মহান আল্লাহ পাক তিনি তাকে রোগ থেকে মুক্তি দান করবেন এবং এক বৎসরের মধ্যে মৃত্যু ব্যতীততার আর কোন কঠিন রোগ হবেনা। হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি অন্যত্র পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বলেনঃ- “আশুরার দিনে কোন মুসলমান যদি কোন এতিমের মাথায় হাত বুলায় এবং কোন ক্ষুধার্তকে খানা খাওয়ায় কোন পিপাসার্তকে পানি পান করায় মহান আল্লাহ পাক তিনি তাকে বেহেশতের দস্তরখানায় খানা খাওয়াবেন আর বেহেশতের খালেছ শরবত সাল সাবিল ঝরণা থেকে পানি পান করাবেন অর্থাৎ সে জান্নাতী হবে।” কেউ যদি এই দিন মেশক মিশ্রিত সুরমা চোখে দেয় তাহলে মহান আল্লাহ পাক তিনি তাকে একবছর চোখের রোগ থেকে শেফা দান করবেন। আশুরা উপলক্ষে দুটি রোযা রাখা সুন্নত। নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলেন- “রমজান মাসের রোযার পরে আশুরার রোযা সবচেয়ে বেশী ফযীলতপূর্ণ। আশুরার দিন যদি কোন ব্যক্তি রোযা রাখে তবে মহান আল্লাহ পাক তিনি তাকে ৬০ বৎসরের দিনের রোযা এবং রাত্রের ইবাদতের ফযীলত দান করবেন। এবং অন্য পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলেন- “কোন ব্যক্তি যদি আশুরার দিন রোযা রাখে তবে মহান আল্লাহ পাক তিনি তাকে পূর্ববর্তী ১ বৎসরের গুনাহ খাতা মাফ করে দিবেন।”
আশুরা উপলক্ষে দুটি রোযা রাখা সুন্নাত। ৯, ১০ অথবা ১০, ১১ তারিখে। হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলেন- “তোমরা আশুরার রোযা রাখ এবং ইহুদীদের খেলাপ কর। আশুরার জন্য একটা রোযা রাখা মাকরূহ। নফল রোযার ক্ষেত্রে মাসআলা হলো সবক্ষেত্রেই ১টি রোযা পৃথকভাবে রাখা যায়, আশুরা ব্যতীত। কেউ যদি আশুরার রোযা রাখার ইচ্ছা পোষন করে তাহলে তাকে ২টি রোযা রাখতে হবে যা উপরে বর্ণিত হয়েছে। এর কারণ হলো ইহুদীরা আশুরা উপলক্ষে ১টি রোযা রাখতো তাই হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি তাদের খেলাপ ২টি রাখতে আদেশ করেছেন। আশুরার রোযার কোন ব্যক্তি যদি অন্য কোন রোযাদার ব্যক্তিকে ইফতার করায় তবে সে যেন সমস্ত উম্মতে মুহাম্মদীকে ইফতার করালো। এখন হয়ত সবাই মনে করবেন যে সবাই যদি সবাইকে দাওয়াত দেয় তবে তা কি করে সম্ভব যে প্রত্যেকেই প্রত্যেকের দাওয়াত গ্রহন করবেন।
এটা এক পদ্ধতিতে সম্ভব। যেমন কোন ব্যক্তি যদি ইফতারের দাওয়াত অন্য কোন ব্যক্তিকে দেয় তবে দ্বিতীয় ব্যক্তি সাথে করে কিছু ইফতারী নিয়ে যাবেন এবং তা একসাথে মিলিয়ে ইফতারী করবেন তা দুজনেই পূর্ণ ফযীলত পাবেন। অর্থাৎ একজন লোককে ইফতারী করানোর ফলে প্রত্যেকেই সমস্ত উম্মতে হাবীবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদেরকে ইফতার করানো ফযীলত পাবেন এটা সত্যিই ফিকিরের বিষয়। অনেকে হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার শাহাদত উপলক্ষে হযরত মুয়াবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ও অন্য অনেক ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ উনাদেরকে দোষারোপ করে থাকে যা আদৌ সঠিক নয় বরং এটা কুফরী। এ প্রসঙ্গে একটা ঘটনা উল্লেখ করা হয়- হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক রহমতুল্লাহি আলাইহি এবং হযরত মোয়াফা ইবনে ইমরান রহমতুল্লাহি আলাইহি উনারা দু’জন বিশ্ব বিখ্যাত বুজুর্গ ছিলেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি ছিলেন আমিরুল মু’মিনীন ফিল হাদীছ। অর্থাৎ হাদীছ শাস্ত্রে যিনি আমিরুল মু’মিনীন, উনাকে জিজ্ঞেস করা হল, “হুযূর, হযরত মুয়বিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার মর্যদা বেশী না হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মর্যাদা বেশী। তখন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক রহমতুল্লাহি আলাইহি এবং উনার সঙ্গী যিনি ছিলেন তিনি বললেন যে, দেখ হযরত মুয়বিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি যখন নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাথে জিহাদে যেতেন তখন উনার ঘোড়ার পায়ের দাপটের জন্য যে ধুলাগুলি ঘোড়ার নাকে প্রবেশ করতো সে ধুলাগুলিও হযরত উমর বিন আব্দুল আজিজ রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার চেয়ে শ্রেষ্ঠ। (সুবহানাল্লাহ) তিনি আরও বললেন যে, হযরত ইউনুস আলাইহিস সালাম উনার মর্যাদা বেশী না হযরত জুনায়েদ বাগদাদী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মর্যদা বেশী? জবাবে বলা হল- হযরত ইউনুস আলাইহিস সালাম তিনি তো নবী, উনার সাথে কোন তুলনাই হয়না। তদ্রুপ ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুগণ উনাদের সাথে পরবর্তী উম্মতদের কোন তুলনাই হয়না। উনাদের সাথে কোন তুলনা করা আদবের খেলাপ। তাই মহান আল্লাহ পাক তিনি পবিত্র কুরআন কারীমা শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক করেন- “নিশ্চয়ই যারা আমাকে এবং আমার রসূল হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে কষ্ট দেয়, তাদের ইহকাল এবং পরকালে লানত এবং তাদের জন্য লাঞ্চিত শাস্তি রয়ে গেছে। বুখারী শরীফ উনার একটা পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে- মহান আল্লাহ পাক উনাকে ভয় কর মহান আল্লাহ পাক উনাকে ভয় কর আমার ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ উনাদের ব্যাপারে। আমার পরে উনাদেরকে তিরস্কারের লক্ষ্যস্থল করোনা। উনাদেরকে যারা মুহব্বত করল তারা আমাকে মুহব্বত করার কারণেই করল। উনাদেরকে যারা কষ্ট দিল তারা আমাকেই কষ্ট দিল। আর যারা আমাকে কষ্ট দিল তারা মহান আল্লাহ পাক উনাকেই কষ্ট দিল। আর যারা মহান আল্লাহ পাক উনাকে কষ্ট দিল তাদেরকে মহান আল্লাহ পাক তিনি পাকড়াও করবেন।
মেশকাত শরীফ উনার একটা পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে উল্লেখ করা হয় “যে আমার (নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার) হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ উনাদের প্রতি বিদ্বেষ পোষন করে সে কাফির। মহান আল্লাহ পাক তিনি বলেন, একমাত্র কাফিররাই ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ উনাদের সম্পর্কে বিদ্বেষ করে। উপরোক্ত পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র হাদীছ শরীফ দ্বারা বুঝা যায় যে, ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ উনাদের সম্পর্কে বিদ্বেষ পোষন করা কুফরী।
বস্তুতঃ আমরা যাতে পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র হাদীছ শরীফ অনুযায়ী মুহররম মাসকে সম্মান করতে পারি আর আম্বিয়ায়ে কিরাম, ছাহাবায়ে কিরাম, আওলিয়ায়ে কিরাম তথা বুজুর্গ ব্যক্তিদের সম্বন্ধে যেন সুধারণা রাখতে পারি মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পথে চলতে পারি এবং এর উপর কায়েম থাকতে পারি এবং খাস করে আশুরা শরীফ-এর বারাকাত, ফুয়ুযাত, নিয়ামত, রহমত, মাগফিরাত ও নাজাত নসীব করেন। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তিনি আমাদের সেই তৌফিক দান করুন। (আমীন)
সম্মানিত মুহররমুল হারাম শরীফ এবং সম্মানিত ছফর শরীফ মাস উনাদের প্রাসঙ্গিক আলোচনা
সম্মানিত শাওওয়াল, সম্মানিত যিলক্বদ শরীফ ও সম্মানিত যিলহজ্জ শরীফ মাস এবং উনাদের প্রাসঙ্গিক আলোচনা
সম্মানিত রজবুল শরীফ, সম্মানিত শা’বান শরীফ ও সম্মানিত রমাদ্বান শরীফ মাস এবং উনাদের প্রাসঙ্গিক আলোচনা