৩৩তম ফতওয়া হিসেবে
“মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র কুরআন শরীফ, মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র হাদীছ শরীফ, পবিত্র ইজমা শরীফ ও পবিত্র ক্বিয়াস শরীফ উনাদের দৃষ্টিতে সম্মানিত ও পবিত্র মাযহাব চতুষ্ঠয় উনাদের মধ্যে যে কোন একটি সম্মানিত ও পবিত্র মাযহাব মানা ও অনুসরণ করা ফরয ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া”- পেশ করতে পারায় মহান আল্লাহ পাক উনার পবিত্র দরবার শরীফ-এ শুকরিয়া জ্ঞাপন করছি।
সম্মানিত হানাফী মাযহাব উনার কতিপয় মাসয়ালা সম্পর্কে মাযহাব বিদ্বেষী বাতিল ফিরক্বা লা-মাযহাবীদের মনগড়া আপত্তির দলীলভিত্তিক জাওয়াব
বাতিল ফিরক্বা লা-মাযহাবীরা সম্মানিত হানাফী মাযহাব উনার কতিপয় মাসয়ালা নিয়ে সমাজে অনর্থক ফিৎনা সৃষ্টি করে থাকে। যেমন নামাযের পিছনে পবিত্র সূরা ফাতিহা বা অন্য কোন পবিত্র সূরা পাঠ করা, রফয়ে ইয়াদাইন করা, নাভির নীচে হাত বাঁধা, জোরে আমীন বলা ইত্যাদি।
বাতিল ফিরক্বা লা-মাযহাবীরা অপপ্রচার করে বেড়ায় যে, হানাফীদের উল্লিখিত আমলসমূহের কোনো দলীল নেই। নাউযুবিল্লাহ! অথচ সম্মানিত হানাফী মাযহাবের প্রতিটি আমলের ব্যাপারেই অসংখ্য ছহীহ ও নির্ভরযোগ্য দলীল আদিল্লাহ রয়েছে। কেননা সম্মানিত হানাফী মাযহাবের ইমাম, ইমামে আ’যম হযরত আবু হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি পবিত্র হাদীছ শরীফের হাকিম ছিলেন। অর্থাৎ তিনি সমস্ত পবিত্র হাদীছ শরীফ সম্পর্কে ইলিম রাখতেন। যার কারণে উনার প্রতিটি মাসয়ালার স্বপক্ষে পবিত্র হাদীছ শরীফ থেকে দলীল-আদিল্লাহ রয়েছে। সুবহানাল্লাহ!
নিম্নে উল্লিখিত বিষয়গুলো সম্পর্কে দলীলভিত্তিক আলোচনা করা হলো।
১। ইমামের পিছনে ক্বিরাআত পাঠ
সম্মানিত হানাফী মাযহাবে ইমামের পিছনে মুক্তাদী পবিত্র সূরা ফাতিহা শরীফসহ কোন পবিত্র সূরা পাঠ করবে না। বরং কোন পবিত্র সূরা-ক্বিরায়াত পাঠ না করে চুপ করে থাকবে সে বর্ণনা বা প্রমাণ পবিত্র কুরআন শরীফেও বর্ণিত রয়েছে। আর পবিত্র হাদীছ শরীফেতো বর্ণিত রয়েছেই। যেমন- পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-
وَإِذَا قُرِئَ الْقُرْاٰنُ فَاسْتَمِعُوا لَهٗ وَأَنصِتُوا لَعَلَّكُمْ تُـرْحَمُونَ
অর্থ: “যখন পবিত্র কুরআন শরীফ পাঠ করা হবে তখন তোমরা চুপ থেকে তা শ্রবন করো। অবশ্যই তোমরা রহমত প্রাপ্ত হবে। (সম্মানিত ও পবিত্র সূরা আ’রাফ শরীফ: সম্মানিত ও পবিত্র আয়াত শরীফ ২০৪)
এ পবিত্র আয়াত শরীফ উনার ব্যাখ্যায় মুজাদ্দিদে আউওয়াল, ইমামে আ’যম, হযরত ইমাম আবূ হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, উক্ত পবিত্র আয়াত শরীফ উনার হুকুম হচ্ছে ইমাম ছাহেব যখন নামাযে পবিত্র ক্বিরায়াত পাঠ করেন তখন মুক্তাদীর জন্য চুপ থেকে তা শ্রবন করা ওয়াজিবের অন্তর্ভুক্ত। অনুরূপ ইমাম ছাহেব খুৎবা দানকালে মুছল্লীদের জন্য তা চুপ থেকে শ্রবন করাও ওয়াজিব।
আর পবিত্র হাদীছ শরীফে বর্ণিত রয়েছে-
عَنْ حَضْرَتْ اَبِىْ هُرَيْـرَةَ رَضِىَ اللهُ تَـعَالٰى عَنْهُ قَالَ قَالَ النَّبِىُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اِنَّمَا جُعِلَ الْاِمَامُ لِيُـتَمَّ بِهٖ اِذَا كَبَّـرَ الْاِمَامُ فَكَبِّرُوا وَاِذَا رَكَعَ فَارْكَعُوْا وَاِذَا قَـرَأَ فَاَنْصِتُـوْا
অর্থ: হযরত আবূ হুরায়রা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বর্ণনা করেন, মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, ইমাম নিযুক্ত করা হয়েছে তার অনুসরণ করার জন্য। সুতরাং ইমাম যখন তাকবীর বলবে তখন তোমরাও তাকবীর বলবে, ইমাম যখন রুকু করবে, তখন তোমরাও রুকু করবে, আর ইমাম যখন ক্বিরায়াত পাঠ করবে তোমরা তখন চুপ থাকবে। (মুসলিম শরীফ)
পবিত্র হাদীছ শরীফে আরো বর্ণিত রয়েছে-
عَنْ حَضْرَتْ اَبِى الدَّرْدَاءِ رَضِىَ اللهُ تَـعَالٰى عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَنْ كَانَ لَهٗ اِمَامٌ فَقِرَاءَةُ الْاِمَامِ لَهٗ قِرَاءَةٌ
অর্থ: হযরত আবূ দারদা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বর্ণনা করেন, মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তির ইমাম থাকবে, (তার পবিত্র সূরা ফাতিহা বা অন্য কোন পবিত্র সূরা পাঠ করার প্রয়োজন নেই) তখন ইমামের ক্বিরায়াতই তার ক্বিরায়াত। (নাসায়ী শরীফ ও ইবনে মাজাহ শরীফ)
পবিত্র হাদীছ শরীফে আরো বর্ণিত রয়েছে-
عَنْ حَضْرَتْ أَبِي هُرَيْـرَةَ رَضِىَ اللهُ تَـعَالٰى عَنْهُ، أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اِنْصَرَفَ مِنْ صَلَاةٍ جَهَرَ فِيهَا بِالْقِرَاءَةِ فَـقَالَ هَلْ قَـرَأَ مَعِي مِنْكُمْ أَحَدٌ اٰنِفًا. فَـقَالَ رَجُلٌ نَـعَمْ أَنَا يَا رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ فَـقَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِنِّي أَقُـوْلُ مَا لِي أُنَازَعُ الْقُرْاٰنَ. فَانْـتَـهَى النَّاسُ عَنِ الْقِرَاءَةِ مَعَ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِيْمَا جَهَرَ فِيْهِ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى الله عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِالْقِرَاءَةِ
অর্থ: হযরত আবূ হুরায়রা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বর্ণনা করেন, মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু ওয়া সাল্লাম তিনি একবার ফজরের নামাযের সালাম ফিরিয়ে মুক্তাদিদের দিকে মুখ করে বললেন, নামাযের মধ্যে এই মাত্র আমার সাথে আপনাদের কেউ পবিত্র সূরা-ক্বিরায়াত পাঠ করেছেন? একজন ছাহাবী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উত্তর দিলেন, আয় মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমি পাঠ করেছি। মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, আমি আপনাদেরকে সতর্ক করে দিয়ে বলছি, আমার পিছনে সূরা-ক্বিরায়াত পাঠ করে আমার পবিত্র সূরা-ক্বিরায়াত পাঠের সাথে বিবাদ সৃষ্টি করা আপনাদের মোটেও উচিত হবে না। এই পবিত্র হাদীছ শরীফ শোনার পর থেকে উক্ত ছাহাবীসহ অন্যান্য ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনারা কেউ আর কখনও ইমামের পিছনে পবিত্র সূরা ফাতিহা শরীফসহ কোন সূরা পাঠ করতেন না। (আবূ দাউদ শরীফ)
পবিত্র হাদীছ শরীফে আরো বর্ণিত রয়েছে-
عَنْ حَضْرَتْ اَنَسٍ رَضِىَ اللهُ تَـعَالٰى عَنْهُ قَالَ صَلَّى بِنَا رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ثُمَّ اَقْـبَلَ بِوَجْهِهٖ فَـقَالَ اَتَـقْرَئُـوْنَ وَالْاِمَامُ يَـقْرَأُ فَسَكَتُـوْا فَسَأَلَهُمْ ثَلَاثًا فَـقَالُوْا اِنَّا لَنَـفْعَلُ قَالَ لَا تَـفْعَلُوْا
অর্থ: হযরত আনাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বর্ণনা করেন, মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি একদিন নামায শেষে আমাদের দিকে মুখ ফিরিয়ে ইরশাদ মুবারক করলেন, ইমামের ক্বিরায়াত পাঠ করার সময় আপনারা কি ক্বিরায়াত- পবিত্র সূরা ফাতিহা শরীফ পাঠ করেন? হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনারা চুপ করে থাকলেন। ছাহাবীগণ উনাদের উত্তর না পেয়ে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনবার প্রশ্ন করলেন। তৃতীয়বার প্রশ্ন করার পর ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনারা বললেন, হ্যাঁ, আমরা পাঠ করি। তখন নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি নির্দেশ মুবারক দিলেন, আর কখনও ইমামের পিছনে আপনারা পবিত্র সূরা ফাতিহা শরীফ বা অন্য কোন সূরা পাঠ করবেন না। (ত্বহাবী শরীফ)
পবিত্র হাদীছ শরীফে আরো বর্ণিত রয়েছে-
عَنْ حَضْرَتْ جَابِرٍ رَضِىَ اللهُ تَـعَالٰى عَنْهُ يَـقُوْلُ مَنْ صَلَّى رَكْعَةً فَـلَمْ يَـقْرَأْ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ فَـلَمْ يُصَلِّ اِلَّا اَنْ يَّكُوْنَ وَرَاءَ الْاِمَامِ قَالَ التِّرْمِذِىُّ هٰذَا حَدِيْثٌ حَسَنٌ صَحِيْحٌ
অর্থ: হযরত জাবির রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বর্ণনা করেন, যে ব্যক্তি পবিত্র সূরা ফাতিহা শরীফ বাদে নামায পড়বে তার নামায হবে না। কিন্তু সে যদি মুক্তাদী হয় তার পবিত্র সূরা ফাতিহা শরীফ পাঠ করা লাগবে না। (তিরমিযী শরীফ)
উল্লেখ্য, ইমাম তিরমিযী রহমতুল্লাহি আলাইহি এই পবিত্র হাদীছ শরীফখানা বর্ণনা করে এই পবিত্র হাদীছ শরীফ সম্পর্কে মতামত ব্যক্ত করে বলেন যে, মুক্তাদীর জন্য পবিত্র সূরা ফাতিহা না পড়ার এই পবিত্র হাদীছ শরীফখানা হাছান ছহীহ।
পবিত্র হাদীছ শরীফে আরো বর্ণিত রয়েছে-
عَنْ حَضْرَتْ عَلِىٍّ عَلَيْهِ السَّلَامُ مَنْ قَـرَأَ خَلْفَ الْاِمَامِ فَـلَيْسَ عَلَى الْفِطْرَةِ
অর্থ: হযরত ইমামুল আউওয়াল কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম তিনি বর্ণনা করেন, যে ব্যক্তি ইমামের পিছনে পবিত্র সূরা ফাতিহা শরীফ পাঠ করবে সে মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার আদর্শের পরিপন্থী কাজ করলো। (ত্বহাবী শরীফ)
عَنْ حَضْرَتْ اِبْنِ مَسْعُوْدٍ رَضِىَ اللهُ تَـعَالٰى عَنْهُ قَالَ لَيْتَ الَّذِىْ تَـقْرَأُ خَلْفَ الْاِمَامِ مُلِئَ فَـوْهُ تُـرَابًا
অর্থ: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বর্ণনা করেন, যে ব্যক্তি ইমামের পিছনে পবিত্র সূরা ফাতিহা শরীফ পাঠ করবে তার মুখে মাটি নিক্ষেপ করা উচিত। (ত্বহাবী শরীফ)
পবিত্র হাদীছ শরীফে আরো বর্ণিত রয়েছে-
عَنْ حَضْرَتْ عُبَـيْدُ اللهِ بْنِ مَقْسَمٍ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ اَنَّهٗ سَاَلَ عَبْدَ اللهِ بْنَ عُمَرَ رَضِىَ اللهُ تَـعَالٰى عَنْهُ وَزَيْدَ بْنَ ثَابِتٍ رَضِىَ اللهُ تَـعَالٰى عَنْهُ وَجَابِرَ بْنَ عَبْدِ اللهِ رَضِىَ اللهُ تَـعَالٰى عَنْهُ فَـقَالُوْا لَا تَـقْرَئُوا خَلْفَ الْاِمَامِ فِى شَىْئٍ مِّنَ الصَّلَوَاتِ
অর্থ: হযরত উবায়দুল্লাহ ইবনে মাকসাম রহমতুল্লাহি আলাইহি বর্ণনা করেন, আমি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রদ্বিয়াল্লাহ তায়ালা আনহু, হযরত যায়েদ ইবনে ছাবিত রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এবং হযরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনাদের নিকট ইমামের পিছনে পবিত্র সূরা ফাতিহা শরীফ পাঠ করা সম্পর্কে প্রশ্ন করলে উল্লেখিত প্রসিদ্ধ বিশ্বস্ত হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনারা সকলে উত্তর দিয়েছেন যে, ইমামের পিছনে কোন নামাযে পবিত্র সূরা শরীফ পাঠ করবে না। (ত্বহাবী শরীফ)
পবিত্র হাদীছ শরীফে আরো বর্ণিত রয়েছে-
عَنْ حَضْرَتْ اَبِىْ حَمْزَةَ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ قَالَ قُـلْتُ لِاِبْنِ عَبَّاسٍ رَضِىَ اللهُ تَـعَالٰى عَنْهُ اَقْـرَأُ وَالْاِمَامُ بَـيْنَ يَدَىَّ فَـقَالَ لَا
অর্থ: হযরত আবূ হামযা রহমতুল্লাহি আলাইহি বর্ণনা করেন, আমি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার নিকট প্রশ্ন করলাম, ইমামের পিছনে সূরা পবিত্র ফাতিহা শরীফ বা কোন সূরা-ক্বিরায়াত পাঠ করবো কি? জলীলুল ক্বদর ছাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উত্তর দিলেন, না। ইমামের পিছনে পবিত্র সূরা ফাতিহা বা অন্য কোন সূরা পাঠ করবে না। (ত্বহাবী শরীফ)
পবিত্র হাদীছ শরীফে আরো বর্ণিত রয়েছে-
عَنْ حَضْرَتْ زَيْدِ بْنِ ثَابِتٍ رَضِىَ اللهُ تَـعَالٰى عَنْهُ اَنَّهٗ قَالَ مَنْ قَـرَأَ خَلْفَ الْاِمَامِ فَلَا صَلٰوةَ لَهٗ
অর্থ: হযরত যায়িদ ইবনে সাবিত রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বর্ণনা করেন, যে ব্যক্তি ইমামের পিছনে পবিত্র সূরা ফাতিহা শরীফ বা অন্য কোন পবিত্র সূরা পাঠ করবে তার নামাযই হবে না। (আল বাইয়্যিনাত শরীফ)
পবিত্র হাদীছ শরীফে আরো বর্ণিত রয়েছে,
عَنْ حَضْرَتْ عُمَرَ الْفَارُوْقِ عَلَيْهِ السَّلَامُ لَيْتَ فِى فَمِ الَّذِىْ يَـقْرَأُ خَلْفَ الْاِمَامِ حَجَرٌ
অর্থ: হযরত ফারূকে আ’যম আলাইহিস সালাম তিনি বর্ণনা করেন, যে ব্যক্তি ইমামের পিছনে পবিত্র সূরা ফাতিহা শরীফ বা অন্য কোন পবিত্র সূরা পাঠ করবে তার মুখে পাথর থাকাই উত্তম। (আল বাইয়্যিনাত শরীফ)
স্মরণযোগ্য যে, ইমামের পিছনে পবিত্র সূরা ফাতিহা শরীফ পাঠ করার স্বপক্ষে সরাসরি একটি পবিত্র হাদীছ শরীফও নেই। অথচ ইমামের পিছনে পবিত্র সূরা ফাতিহা শরীফ পাঠ না করার বিষয়ে অসংখ্য পবিত্র হাদীছ শরীফ রয়েছে। এমনকি স্পষ্ট শব্দের দ্বারা ইমামের পিছনে পবিত্র সূরা ফাতিহা শরীফ না পড়ার নিষিদ্ধ ঘোষণা পবিত্র হাদীছ শরীফের দ্বারাই প্রমাণিত। তবে যারা ইমামের পিছনে পবিত্র সূরা ফাতিহা শরীফ পড়ার জন্য মতামত ব্যক্ত করে থাকে এবং তাদের মতের স্বপক্ষে যে পবিত্র হাদীছ শরীফখানা নিয়ে টানা-হেঁচড়া করে থাকে সে পবিত্র হাদীছ শরীফখানা হলো-
عَنْ حَضْرَتْ عُبَادَةَ بْنِ الصَّامِتِ رَضِىَ اللهُ تَـعَالٰى عَنْهُ اَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ لَا صَلٰوةَ لِـمَنْ لَّـمْ يَـقْرَأْ بِفَاتِـحَةِ الْكِتَابِ
অর্থ: “হযরত উবাদা বিন ছামিত রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বর্ণনা করেন, মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি পবিত্র সূরা ফাতিহা শরীফ পড়বে না, তার নামায হবে না।” (বুখারী শরীফ)
এখানে উল্লেখ্য, অত্র পবিত্র হাদীছ শরীফে ইমাম, মুক্তাদী বা একা নামায আদায়কারী কার জন্য হুকুম দেয়া হয়েছে তার কোন উল্লেখ নেই। বরং উল্লেখ করতে হয় যে, অত্র পবিত্র হাদীছ শরীফের বর্ণনাকারী হযরত ইমাম বুখারী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার উস্তাদ হযরত সুফিয়ান রহমতুল্লাহি আলাইহি বর্ণনা করেন-
قَالَ سُفْيَانُ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ لِمَنْ يُّصَلِّىْ وَحْدَهٗ
অর্থাৎ- উল্লেখিত পবিত্র হাদীছ শরীফে মুক্তাদীর জন্য সূরা ফাতিহা পড়ার জন্য বলা হয়নি বরং যে ব্যক্তি একা একা নামায আদায় করবে তার জন্য বলা হয়েছে। (আবু দাঊদ শরীফ)
পবিত্র হাদীছ শরীফে আরো বর্ণিত রয়েছে,
اَيْضًا رَوَاهُ التِّرْمِذِىُّ عَنْ اَحْمَدَ مَعْنٰى قَـوْلُهٗ لَا صَلٰوةَ اِلَّا بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ هٰذَا اِذَا كَانَ وَحْدَهٗ
অর্থাৎ- হযরত ইমাম তিরমিযী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিরমিযী শরীফে উক্ত পবিত্র হাদীছ শরীফ বর্ণনাকারীদের উল্লেখ করে বলেছেন যে, উক্ত পবিত্র হাদীছ শরীফ মুক্তাদীর জন্য নয় বরং একা নামায আদায়কারীদের জন্য। (তিরমিযী শরীফ)
উছূল হলো: কোন পবিত্র হাদীছ শরীফের হুকুম যদি সেই পবিত্র হাদীছ শরীফের দ্বারা নির্দিষ্ট করা না যায় তবে অন্য পবিত্র হাদীছ শরীফের দ্বারা হুকুম নির্দিষ্ট করতে হয়। আর যদি উক্ত পবিত্র হাদীছ শরীফের বর্ণনাকারী থেকে ব্যাখ্যা পাওয়া যায় তবে উক্ত ব্যাখ্যাকে গ্রহণ করতে হয়। পবিত্র হাদীছ শরীফের উপর আমল করার উল্লেখিত দু’টি নিয়মের দ্বারা প্রমাণিত হচ্ছে যে, পবিত্র সূরা ফাতিহা শরীফ ছাড়া নামায হবে না, এ হুকুম মুক্তাদীর জন্য নয়।
প্রথমত: অসংখ্য পবিত্র হাদীছ শরীফের দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে যে, মুক্তাদীর জন্য সূরা ফাতিহা শরীফসহ সর্বপ্রকার ক্বিরায়াত পাঠ করা নিষিদ্ধ।
দ্বিতীয়ত: পবিত্র হাদীছ শরীফের বর্ণনাকারী নিজেই বর্ণনা করেছেন যে, উক্ত পবিত্র হাদীছ শরীফে মুক্তাদীর জন্য পবিত্র সূরা পড়ার কথা বলা হয়নি। বরং উহা একা একা নামায আদায়কারীর জন্য বলা হয়েছে।
আরো উল্লেখ্য, বুখারী শরীফে বর্ণিত হযরত উবাদা বিন ছামিত রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার বর্ণনায় পবিত্র হাদীছ শরীফখানার পূর্ণ অংশ নেই বরং একটি অংশের বর্ণনা রয়েছে। সূতরাং হুকুম দিতে হলে পূর্ণ অংশ বর্ণনা করে হুকুম দিতে হবে। পবিত্র হাদীছ শরীফখানার পূর্ণ অংশ হযরত উবাদা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুসহ হযরত আবু সাঈদ খুদরী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এবং হযরত আবু হুরায়রা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনাদের থেকে বর্ণিত হয়েছে।
পবিত্র হাদীছ শরীফখানার পূর্ণাংশ হলো-
عَنْ حَضْرَتْ اَبِىْ سَعِيْدِنِ الْـخُدْرِىِّ رَضِىَ اللهُ تَـعَالٰى عَنْهُ قَال قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَا صَلٰوةَ لِمَنْ لَّـمْ يَـقْرَأْ بِالْحَمْدِ وَسُوْرَةٍ مَّعَهَا وَفِى رِوَايَةٍ لَـمْ يَـقْرَأْ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ فَصَاعِدًا
অর্থ: হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বর্ণনা করেন, মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, যে ব্যক্তি পবিত্র সূরা ফাতিহা শরীফ এবং উহার সহিত অন্য পবিত্র সূরা শরীফ মিলিয়ে না পড়বে, তার নামায হবেনা। (মুসলিম শরীফ, আবূ দাঊদ শরীফ, নাসায়ী শরীফ)
সূতরাং পবিত্র সূরা ফাতিহা শরীফ ছাড়া নামায হবে না পবিত্র হাদীছ শরীফখানা দ্বারা মুক্তাদীর জন্য পবিত্র সূরা ফাতিহা শরীফ পড়ার হুকুম দেয়ার কোন সুযোগ নেই। হুকুম দিলে পবিত্র সূরা ফাতিহা শরীফসহ অন্য সূরা মিলিয়ে পড়ার হুকুম দিতে হয়। কারণ পবিত্র হাদীছ শরীফের পূর্ণ অংশে পবিত্র সূরা ফাতিহা শরীফ এবং উহার সহিত অন্য সূরা মিলিয়ে পড়ার কথা উল্লেখ আছে। আর এই হুকুম কেউই দেননি এবং দিতেও পারেন না। কারণ মুক্তাদির জন্য ইমামের পিছনে ক্বিরায়াত পড়া বা পবিত্র সূরা ফাতিহা শরীফ পড়ার বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয়েছে।
পরবর্তী সংখ্যার অপেক্ষায় থাকুন।
কুরআন-সুন্নাহ্ দৃষ্টিতে ইমামাহ্ বা পাগড়ীর ফাযায়েল ও আহ্কাম এবং তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া