মুহম্মদ মশীউজ্জামান, পানি
উন্নয়ন বোর্ড, চট্টগ্রাম
সুওয়ালঃ- মাসিক আল বইয়্যিনাত ৮৫তম সংখ্যায় “সুওয়াল- জাওয়াব” বিভাগে এক জাওয়াবের পরিপ্রেক্ষিতে মাসিক তরজুমান সেপ্টেম্বর/২০০০ ঈঃ সংখ্যায় প্রশ্নোত্তর বিভাগে নামাজে দু’সিজদার মধ্যে দোয়া পাঠ করা সম্পর্কে যে বক্তব্য প্রদান করেছে তা কতটুকু সত্য? দয়া করে জানিয়ে বাধিত করবেন।
জাওয়াবঃ- মাসিক তরজুমানের উক্ত উত্তরটি সম্পূর্ণ অশুদ্ধ, মিথ্যা, প্রতারণামূলক, জালিয়াতি, ধোকাপূর্ণ, ইবারতচুরি, অনুবাদে ভুল এবং এ ধরণের “প্রায় ৩৫টি ত্রুটিতে ত্রুটিপূর্ণ থাকায় মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়।”
উক্ত বিবিধ ত্রুটিপূর্ণ উত্তরটি নির্ভরযোগ্য দলীলের ভিত্তিতে খন্ডন করে তার সহীহ জাওয়াব ধারাবাহিকভাবে পেশ করা হবে ইনশাআল্লাহ্।
উল্লেখ্য, মাসিক আল বাইয়্যিনাতের মূলনীতি সম্পর্কে তার পাঠক মাত্রই সকলেরই জানা। যা আবূ দাউদ ও তিরমীযী শরীফে বর্ণিত সহীহ হাদীস শরীফে বর্ণিত রয়েছে-
من احب لله وابغض لله واعطى لله ومنع لله فقد استكمل الايمان.
অর্থঃ- “যে ব্যক্তি মহব্বত করে আল্লাহ্ পাক-এর জন্য, বিদ্বেষ পোষণ করে আল্লাহ্ পাক-এর জন্য, আদেশ (দান) করে আল্লাহ্ পাক-এর জন্য, নিষেধ করে আল্লাহ্ পাক-এর জন্য, সে ঈমানে পরিপূর্ণ।”
অতএব একথা সর্বতোভাবে সত্য যে, আল বাইয়্যিনাতের কোন লিখাই বিশেষ করে মাসয়ালা ও ফতওয়ার ক্ষেত্রে, প্রতিটি মাসয়ালা ও ফতওয়া নির্ভরযোগ্য কিতাবের ইবারত উল্লেখপূর্বক সর্বাধিক দলীল-আদিল্লাহ পেশ করে প্রদান করা হয়ে থাকে। যে কারণে আজ পর্যন্ত কোন মহল বা কোন জামায়াত মাসিক আল বাইয়্যিনাতের কোন বক্তব্য বা লিখনীকে ভুল প্রমাণ করতে সক্ষম হয়নি এবং হবেও না ইনশাআল্লাহ্। বরং আল বাইয়্যিনাতেই তাদের একাধিক কুরআন-সুন্নাহ্ বিরোধী আক্বীদা, আমল, বক্তব্য, লিখনী ইত্যাদি তুলে ধরে তার সহীহ জাওয়াব পেশ করা হয়েছে ও হচ্ছে উম্মাহ্র সংশোধনের উদ্দেশ্যে। তবে আশ্চর্য হলেও সত্য যে, মাসিক তরজুমান গং জিহালত ও দুঃসাহসীকতার পরিচয় দিয়ে মাসিক আল বাইয়্যিনাত কর্তৃক তরজুমানের ভুল মাসয়ালা খন্ডনের প্রতি মিথ্যা অভিযোগ লেপন করেছে। তবে তার কারণ হচ্ছে এই যে,
اذا ينس الانسان طال لسانه.
অর্থঃ- “মানুষ যখন নিরাশ হয় তার জিহবাা লম্বা হয়।” অর্থাৎ সে তখন গালী-গালাজ করে।
মাসিক আল বাইয়্যিনাতের দলীলভিত্তিক, নির্ভরযোগ্য, অখন্ডনীয়, অকাট্ট লিখনীর জবাব দিতে ব্যর্থ হয়ে উক্ত তরজুমান গং কোনরূপ দিশা না পেয়ে অবশেষে ওহাবী-খারেজীদেরই অনুসরণ করতে বাধ্য হয়েছে।
উল্লেখ্য, মাসিক তরজুমান-এর জুলাই-আগষ্ট/২০০০ঈঃ সংখ্যায় প্রদত্ত মিথ্যা দলীলের বরাতে নামাজে দু’সিজদার মধ্যে “আল্লাহুম্মার যুকনী, ওয়ার হামনী ওয়াশফাআনী ওয়াহদিনী” দোয়াটি পড়া মুস্তাহাব, এ বক্তব্যটি মাসিক আল বাইয়্যিনাত সেপ্টেম্বর/২০০০ঈঃ সংখ্যায় বিশ্ববিখ্যাত, নির্ভরযোগ্য, সহীহ হাদীস শরীফ ও তার শরাহ্ এবং ফিক্বাহ্র কিতাবের পৃষ্ঠাসহ ২২টি আরবী ইবারত উল্লেখ করে প্রায় ৩১টি কিতাবের দলীল পেশ করে সংক্ষিপ্তভাবে খন্ডন করে বলা হয়েছে যে, “উক্ত দোয়াটি আমাদের হানাফী মাযহাব মোতাবেক ফরজ নামাজে পড়া যাবেনা। বরং উক্ত দোয়াটি শুধুমাত্র নফল নামাযের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।” ফরজ নামাজে উক্ত দোয়াটি পড়া নিষেধ হওয়ার কারণ হচ্ছে, যদি দু’সিজদার মাঝে উক্ত দোয়াটি পাঠ করা হয় তাহলে নামাযের রোকন আদায়ে তা’খীর বা বিলম্ব হবে এবং সাহু সিজদা ওয়াজিব হবে। যেমন- এ প্রসঙ্গে ফতওয়ায়ে শামীর দ্বিতীয় খন্ডের ২১২ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,
لو اطال هذه الجلسه او قومه الركوع اكثر من تسبيحة بقدر تسبيحة ساهيا يلزمه سجود السهو.
অর্থঃ- “যদি দুই সিজদার মাঝে এবং রুকু থেকে দাঁড়ানোর পর ভুলবশতঃ এক তাসবীহ পরিমাণের চেয়ে বেশী বিলম্ব করে তাহলে ওয়াজিব তরক হবে এবং সাহু সিজদা আবশ্যক হবে।
আলোচ্য ইবারতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, যদি ভুলে দুই সিজদার মাঝে এক তাসবীহ পরিমাণের চেয়ে বেশী বিলম্ব করে, তাহলে সিজদা সাহু ওয়াজিব হবে। আর ইচ্ছাকৃত বিলম্ব করা হলে তা তো নামাযই ভঙ্গের কারণ।
এবার মাসিক তরজুমানের উপরোক্ত ও প্রতারণামূলক প্রশ্নোত্তর নিয়ে পর্যালোচনা করা যাক। তরজুমানের উপরোক্ত প্রশ্ন ও তার উত্তর পড়ে একথা বুঝতে কারোরই বাকী থাকেনা যে, উত্তরদাতাই প্রশ্নটি বানিয়ে সুবিধামত উত্তর দেয়ার ব্যর্থ কোশেশ করেছে। তবে এখানে কথা হলো মিথ্যা (ভুল) তো মিথ্যাই যদিও একটা মিথ্যাকে ঢেকে রাখতে দশটা মিথ্যার আশ্রয় নেয়া হোক, যার বাস্তব প্রমাণ হলো তরজুমানের উক্ত প্রশ্নোত্তরটি। কারণ তারা এক মিথ্যাকে ঢাকতে আরো বহু মিথ্যা, প্রতারণা ও জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছে।
নিম্নে তরজুমানের প্রায় ৩৫টি মিথ্যা, প্রতারণা, ভুল-ত্রুটি, ধোকাবাজি ও জালিয়াতি সমুহের ফিরিস্তি থেকে কয়েকটি উল্লেখ করা হল-
১. মাসিক তরজুমানের সেপ্টেম্বর সংখ্যার প্রশ্নে বলা হয়েছে, “তরজুমান বিগত রবিউস্ সানী …. ১৪২১ হিজরী প্রশ্নোত্তর বিভাগে জানতে পারলাম যে, ….. মনে মনে নিম্নের দোয়াটি আল্লাহুম্মাগফিরলী ওয়ার হামনী ওয়াহ্দিনী ….. পড়া মুস্তাহাব।
অথচ তাদের উক্ত রবিউস সানী সংখ্যায় আল্লাহুম্মাগফিরলী বাক্যটি নেই। যা মাগফিরাতের দোয়া। বরং উহার পরিবর্তে আল্লাহুম্মার যুকনী উল্লেখ আছে যা রিযিক প্রাপ্তির দোয়া। ইহা তাদের ১ম জালিয়াতি ও প্রতারণা।
২. তরজুমানের সেপ্টেম্বর সংখ্যার প্রশ্নে উক্ত রবিউস সানী সংখ্যার উদ্ধৃতি দিয়ে যে দোয়াটি উল্লেখ করেছে তাতে ওয়াশ্ফাআনী বাক্যটি উল্লেখ নেই। যা শাফায়াত প্রাপ্তির দোয়া।
অথচ রবিউস সানী সংখ্যায় ওয়ার হামনী বাক্যের পরে ওয়াশ্ফাআনী বাক্যের উল্লেখ আছে। ইহা তাদের ২য় জালিয়াতি ও প্রতারণা।
৩. সেপ্টেম্বর সংখ্যার তরজুমানের প্রশ্নে, দোয়াটি মনে মনে পড়ার কথা বলা হয়েছে।
অথচ বিগত দু’টি সংখ্যার কোন সংখ্যায়ই মনে মনে পড়ার কথা উল্লেখ নেই। ইহা তাদের ৩য় জালিয়াতি ও প্রতারণা।
৪. তরজুমানের সেপ্টেম্বর সংখ্যার প্রশ্নে উল্লেখ করা হয়েছে, জমাদিউল আউয়াল ১৪২১ হিজরী প্রশ্নোত্তর বিভাগে জানতে পারলাম যে, ….. নিম্নের দোয়াটি “আল্লাহুম্মাগফিরলী ওয়ার হামনী ওয়াহ্দিনী ওয়ারযুকনী” পড়া …. সুন্নতে যায়েদা।
অথচ উক্ত সংখ্যায় ওয়ারযুকনী বাক্যের পরে ওয়া আ’ফিনী বাক্যটি উল্লেখ নেই। ইহা তাদের ৪র্থ জালিয়াতি ও প্রতারণা।
৫. তারা তাদের প্রশ্নে উল্লেখ করেছে, “মাসিক আল বাইয়্যিনাত সেপ্টেম্বর/২০০০ সংখ্যা, প্রশ্নোত্তর বিভাগে বলা হয়েছে, “….. ফরজ নামাযে মোটেই পড়া যাবে না।
অথচ মাসিক আল বাইয়্যিনাতের সুওয়াল-জাওয়াব বিভাগে মোটেই শব্দটি উল্লেখ নেই। বরং তাতে বলা হয়েছে, “উক্ত দোয়াটি আমাদের হানাফী মাযহাব মোতাবেক ফরজ নামাযে পড়া যাবে না। সুতরাং এখানেও তারা মোটেই শব্দ উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে ঢুকিয়ে ধোকার আশ্রয় নিয়েছে। ইহা তাদের ৫ম জালিয়াতি ও প্রতারণা।
৬. তারা উত্তরে আবূ দাউদ শরীফ ও তিরমীযী শরীফের হাদীস শরীফ উল্লেখ করেছে।
অথচ সরাসরি হাদীস শরীফ দ্বারা ফতওয়া দেয়া যাবে না। কারণ হাদীস শরীফে সব ধরণের বর্ণনা রয়েছে। যেমন হাদীস শরীফে নামাযের মধ্যে কথা বলার বর্ণনাও উল্লেখ আছে। বরং মাযহাবের ইমাম মুজতাহিদগণের ফতওয়া কি? সে অনুযায়ী ফতওয়া দিতে হবে। এখানেও তারা হাদীস শরীফ দ্বারা ধোঁকা দিতে চেয়েছে। ইহা তাদের ৬ষ্ঠ জালিয়াতি ও প্রতারণা।
৭. তরজুমানের উত্তরে আবু দাউদ ও তিরমিযী শরীফের বরাত দিয়ে নিম্নোক্ত হাদীস শরীফ উল্লেখ করা হয়েছে-
عن ابن عباس رضى الله عنهما قال كان النبى صلى الله عليه وسلم بين السجدتين اللهم اغفرلى وارحمنى واهدنى وعافنى وارزقنى.
অথচ আবু দাউদ ও তিরমিযী শরীফে বর্ণিত হাদীস শরীফের সাথে উক্ত হাদীস শরীফের ইবারতের হুবহু মিল নেই। এখানে তারা হাদীস শরীফের ইবারত পরিবর্তন করে ধোঁকা দিতে চেয়েছে। ইহা তাদের ৭ম জালিয়াতি ও প্রতারণা।
৮. তারা বলেছে, সহীহ্ মুসলিম শরীফেও দুই সিজদার মাঝখানে ও রুকু থেকে দাঁড়ানোর পর হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দোয়া করেছেন মর্মে একাধিক হাদীস শরীফ বর্ণিত রয়েছে।
অথচ মুসলিম শরীফে দুই সিজদার মাঝখানে দোয়া করা সম্পর্কে কোন হাদীস শরীফ বর্ণিত নেই। ইহা তাদের ৮ম জালিয়াতি ও প্রতারণা।
৯. তারা বলেছে, সহীহ মুসলিম শরীফেও দু’সিজদার মাঝখানে……..উক্ত হাদীস শরীফসমূহ ইমাম ইবনে আবেদীন শামী হানাফী (রহঃ) রাদ্দুল মুখতার ১ম খন্ডে উল্লেখ করেছেন।
অথচ দুই সিজদার মাঝে দোয়া সম্পর্কে মুসলিম শরীফ থেকে কোনই হাদীস শরীফের উদ্ধৃতি ইবনে আবেদীন শামী, রাদ্দুল মুহতার ১ম খন্ডের ৫০৫ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেননি। ইহা তাদের ৯ম জালিয়াতি ও প্রতারণা।
১০. তারা কিতাবের নাম লিখেছে, “রাদ্দুল মুখতার”।
অথচ উক্ত নামে কোন কিতাবই নেই। বরং কিতাবের নাম হচ্ছে “রদ্দুল মুহতার।” আশ্চর্য্যরে বিষয় যারা কিতাবের নামই জানেনা তারা আবার ফতওয়া দেয়! ইহা তাদের ১০ম জালিয়াতি ও প্রতারণা। (অসমাপ্ত)
মুহম্মদ আব্দুল গণী, পাহাড়তলী, চট্টগ্রাম।
সুওয়াল ঃ- আমাদের চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত রেজভী জামায়াতের পত্রিকা মাসিক তরজুমানের সেপ্টেম্বর/২০০০ ঈঃ সংখ্যার “পাঠকের কথা মালা” বিভাগে মুহম্মদ নিজামুদ্দীন অভিযোগ করেছেন যে, “মাসিক আল বাইয়্যিনাত সেপ্টেম্বর/২০০০ ঈঃ সংখ্যায় তরজুমানের ছানী আযান সম্পর্কিত কথা কাটছাট করে জনগণের সাথে প্রতারণা করেছে।”
এখন আমার সুওয়াল হলো- সত্যিই কি আল বাইয়্যিনাতে তরজুমানের বক্তব্য কাঁটছাট করা হয়েছে? তরজুমান কর্তৃপক্ষ আল বাইয়্যিনাত-এর প্রতি যে অভিযোগ করেছে তা সত্য কি? সঠিক জবাব দানে বাধিত করবেন।
জাওয়াব ঃ- বক্তব্য কাঁটছাট করা, এক জনের বক্তব্য আরেক জনের উপর চাপিয়ে দেয়া, ভুয়া দলীল পেশ করা এবং সত্যকে অস্বীকার করে মিথ্যার বেসাতি করা তরজুমানওয়ালাদেরই জন্মগত ও সিলসিলাগত অভ্যাস। কারণ তাদেরই বড় জন যে, বক্তব্য কাঁটছাট করে পাইকারী হারে লক্ষ লক্ষ ওলামা-ই-কিরামকে ওহাবী ও কাফের বানানোর অপচেষ্টা করেছিল সে কথা বড়জনের উম্মত তরজুমান ওয়ালারা ভুলতে বসলেও অন্যদের তা ভাল করেই জানা।
মাসিক আল বাইয়্যিনাতে তরজুমানের বক্তব্য কাঁটছাট করার যে অভিযোগ তরজুমান ওয়ালারা করেছে, তা মূর্খতা ও মিথ্যা বৈ কিছুই নয়। কারণ কাঁটছাট তখনই হতো যখন সুওয়ালকারীর সুওয়াল হুবহু না দিয়ে কম-বেশী করা হতো। সুওয়ালকারী আল বাইয়্যিনাতে যেরূপ সুওয়াল করেছে, হুবহু সে সুওয়াল উল্লেখ করে শুধুমাত্র তারই জবাব দেয়া হয়েছে। এখানে বক্তব্য কাঁটছাট হলো কিভাবে? তারা কি প্রমাণ করতে পারবে যে, সুওয়ালকারী সুওয়াল করেছেন এক রকম আর বাইয়্যিনাত কর্তৃপক্ষ তা কাঁটছাট করে অন্যভাবে উল্লেখ করেছেন। কস্মিনকালেও তারা তা পারবে না।
অতএব, তাদের উক্ত অভিযোগ সম্পূর্ণই মিথ্যা ও উদ্দ্যেশ্যে প্রনোদিত প্রমাণিত হলো।
তরজুমান ওয়ালাদের উচিত ছিল, এ ধরণের মিথ্যা অভিযোগ না তুলে মাসিক আল বাইয়্যিনাতে প্রদত্ত সুওয়ালের-জাওয়াবটি খন্ডন করে দেয়া। অর্থাৎ প্রমাণ করে দেয়া যে, আল বাইয়্যিনাত ছানী আযান সম্পর্কে যে বক্তব্য প্রদান করেছে তা সঠিক নয় বরং রেযা খাঁর বক্তব্যই সঠিক। কিন্তু এ কথা বলার সাহস তাদের হয়নি।
অতএব, প্রমাণিত হলো যে, আল বাইয়্যিনাত-এর বক্তব্যই সঠিক। আর রেযা খাঁর বক্তব্য ভুল।
উল্লেখ্য, তরজুমান ওয়ালাদের ছানী আযান সম্পর্কিত উক্ত সংখ্যার সম্পূর্ণ বক্তব্যটা যদি ধরা হয়, তবে তাদের জেহালতি ও প্রতারণা আরো ভালরূপেই স্পষ্ট হয়ে উঠে। কারণ তারা তাদের উক্ত বক্তব্যে প্রথমতঃ এ কথাই বুঝিয়েছে যে, ছানী আযান মসজিদের ভিতরে ও দরজায় উভয় প্রকারেই দেয়া জায়েয। অথচ এটা সুস্পষ্ট মূর্খতা। কেননা মিম্বরের সামনে ছানী আযান দেয়া ইজমায়ে আযীমত। আর ইজমায়ে আযীমত অস্বীকার করা কুফরী। কারণ নির্ভরযোগ্য কোন ফিক্বাহ্র কিতাবেই ছানী আযান মসজিদের দরজায় দেয়ার কথা উল্লেখ নেই।
বরং পৃথিবীর সমস্ত বড় বড় ফিক্বাহ্র নির্ভরযোগ্য কিতাবসমূহ্ েছানী আযান মসজিদের ভিতর মিম্বরের সম্মুখে দেয়ার কথাই বলা হয়েছে। আরো বলা হয়েছে যে, ছানী আযান মসজিদের ভিতরে মিম্বরের সামনে দেয়া ইজমায়ে আযীমত দ্বারা প্রমাণিত। আর ইজমায়ে আযীমত অস্বীকার করা কুফরী। এ ব্যাপারে রেযা খাঁও একমত।
তাই বিনা দলীলে উভয়টাকে সুন্নত বলে তরজুমান সুস্পষ্ট কুফরী করেছে।
দ্বিতীয়তঃ তরজুমান ওয়ালারা সূক্ষ্মভাবে যে প্রতারণা করেছে তাহলো, তারা ছানী আযান মসজিদের ভিতরে দেয়াকে বলেছে, “প্রচলিত রীতি।” অর্থাৎ বিদ্য়াত। আর দরজায় দেয়াকে বলেছে, সুন্নত।
এটাও তাদের কুফরীমূলক কথা। কারণ তারা আমীরুল মু’মিনীন, হযরত ওসমান জুন্নূরাইন রদিয়াল্লাহু আনহু-এর ইজতিহাদ ও আমলকে প্রচলিত প্রথা বা বিদ্য়াত হিসেবে সাব্যস্ত করেছে। অথচ হাদীস শরীফ দ্বারা প্রমাণিত যে, হযরত ছাহাবা-ই-কিরামগণের “আমল” সুন্নতের অন্তর্ভূক্ত। তাই এরশাদ হয়েছে,
عليكم بسنتى وسنة الخلقاء الراشدين.
অর্থঃ- “তোমাদের জন্য আমার ও ছাহাবা-ই-কিরামগণের সুন্নত অবশ্য পালনীয়।”
দ্বিতীয়তঃ তারা ছানী আযান দরজায় দেয়াকে সুন্নত বলে আখেরী রসূল, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি সুস্পষ্ট মিথ্যারোপ করেছে। কেননা তাদের কথায় বুঝা যায় যে, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছানী আযান মসজিদের দরজায় দিয়েছেন। অথচ সে সময় ছানী আযান নামক কোন আযানই ছিল না। ছানী আযানের উৎপত্তিই হলো, হযরত ওসমান রদিয়াল্লাহু আনহু-এর সময়ে।
স্মর্তব্য যে, আমরা মাসিক আল বাইয়্যিনাতে প্রমাণ করেছি যে, ছানী আযান মসজিদের ভিতরে দেয়াই সুন্নত ও ইজমায়ে আযীমত দ্বারা প্রমাণিত। পক্ষান্তরে তরজুমান ওয়ালারা দলীল দ্বারা প্রমাণ করে দিক যে, আখেরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও খোলাফা-ই-রাশেদীনগণের কেউ ছানী আযান মসজিদের দরজায় দিয়েছেন। একটি প্রমাণও তারা পেশ করতে পারবে না।
যদি তাদের সৎ সাহস থাকে এবং তারা সত্যবাদী হয়ে থাকে তবে পরবর্তী সংখ্যায় কিতাবের পৃষ্ঠা নং সহ ইবারত উল্লেখ করুক। তা কস্মিনালেও সম্ভব নয়।
অতএব, মাসিক তরজুমানের জালিয়াতি, ধোঁকাবাজী, প্রতারণা, মিথ্যা ও কুফরী সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো।
বিঃ দ্রঃ ছানী আযান সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হলো- মাসিক আল বাইয়্যিনাত-এর ৪৭, ৪৮, ৪৯, ও ৫০তম সংখ্যাগুলোর ফতওয়া পাঠ করুন।
মুহম্মদ সিদ্দীকুর রহমান, রাউজান, চট্টগ্রাম।
সুওয়ালঃ- মাসিক তরজুমান মার্চ/২০০০ ঈঃ সংখ্যায় প্রশ্নোত্তর বিভাগে নিম্নোক্ত প্রশ্নোত্তর ছাপা হয়।
প্রশ্নঃ- লায়লাতুল কদর বা বরাত এর নামায জামাত সহকারে আদায় করা যাবে কিনা?
উত্তরঃ- লায়লাতুল কদর ও বরাতের নফল নামায আজান ইকামত ছাড়া জামাতে আদায় করলে অসুবিধা নাই। তবে আজান ইকামত সহকারে বরাত ও কদরের নফল নামায জামাতে পড়াটাকে অধিকাংশ ইমাম ও ফকিহ মাকরূহ বলেছেন।
এখন আমার সুওয়াল হলো- মাসিক তরজুমানের উক্ত বক্তব্য সঠিক হয়েছে কি? কারণ মাসিক তরজুমানের উক্ত বক্তব্য দ্বারা এটাই প্রতিয়মান হয় যে, লাইলাতুল ক্বদর, লাইলাতুল বরাতসহ সব ধরণের নফল নামায জামায়াতে পড়া জায়েয। অথচ আমরা জানি, নফল নামায জামায়াতে পড়া মাকরূহ তাহরীমী।
আমাদের ধারণা কি সঠিক? দয়া করে দলীল-আদিল্লাহ্সহ সঠিক জাওয়াব জানিয়ে বাধিত করবেন।
জাওয়াবঃ- চট্টগ্রাম আঞ্জুমান-এ রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া কর্তৃক প্রকাশিত, রেযাখানী মাযহাবের মুখপত্র মাসিক তরজুমান পত্রিকায় উপরোল্লিখিত উত্তর সঠিক তো হয়নি বরং মূর্খতাসূচক ও জিহালতপূর্ণ হয়েছে।
কারণ আমাদের হানাফী মাযহাব মোতাবেক, পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামায ব্যতীত অন্য কোন নামায, আযান-ইক্বামত দিয়ে পড়া সমস্ত ইমামের নিকট মাকরূহ তাহরীমী ও বিদ্য়াতে সাইয়্যিয়াহ্।
আর নফল নামায আদায় করার ব্যাপারে আমাদের হানাফী মাযহাব মোতাবক শুধুমাত্র তারাবীহ্, ছলাতুল কুছুফ (সূর্যগ্রহণের নামায), ছলাতুল ইস্তেস্কা (বৃষ্টির নামায) জামায়াতে আদায় করা জায়েয রয়েছে। এই তিন প্রকার নামায ব্যতীত যেমন লাইলাতুল ক্বদর, লাইলাতুল বরায়াত, তাহাজ্জুদ, চাশ্ত, আওয়াবীন ইত্যাদি নফল নামাযসমূহ ইমামের সহিত চারজন মুক্তাদীসহ জামায়াতে আদায় করা মাকরূহ তাহ্রীমী ও বিদ্য়াতে সাইয়্যিয়াহ। চাই তা ঘোষণা দিয়ে পড়ুক অথবা ঘোষণা ছাড়াই পড়ুক সকল অবস্থাতেই। এর উপরেই হানাফী মাযহাবের ফতওয়া। কারণ ঘোষণা অর্থাৎ (بالتداعى) এর অর্থ হলো ইমামের সাথে চারজন মুক্তাদী ইক্তেদা করা।
যেমন “ফতওয়ায়ে সা’দিয়াহ” কিতাবের ৭২ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,
التداعى بان يقتدى اربعة بواحد كما فى الدرر.
অর্থঃ- (التداعى) বা ঘোষণা দেয়ার অর্থ হলো ইমামের সহিত চারজন মুছল্লী ইক্তেদা করা (যেটা সম্পূর্ণই মাকরূহ তাহরীমী) অনুরূপ “দুরার” কিতাবেও উল্লেখ আছে। এছাড়াও “ইলমুল ফিক্বাহ, মাবসূত লিস সারাখ্সী, কিতাবুল আছল, দুররুল মুখতার, রদ্দুল মুহতার, শামী, গায়াতুল আওতার, আল কুহেস্তানী, ফতওয়ায়ে আলমগীরী, বাহরুর রায়েক, মিনহাতুল খালিক, শরহে মুনিয়া, তাতারখানিয়া, মারাকিউল ফালাহ, খুলাছাতুল ফতওয়া মাআ মাজমা’তুল ফতওয়া, আইনী, শরহে হেদায়া, শরহে নেকায়া, শরহে ইলিয়াস” ইত্যাদি কিতাবসমূহেও (التداعى) তথা ইমামমের সহিত চারজন মুছল্লী ইক্তেদা করে নফল নামায জামায়াতে আদায় করা মাকরূহ তাহরীমী বলে উল্লেখ আছে।
“আশবাহ্ ওয়ান্ নাজায়ের” কিতাবের ১ম খন্ডের ২১৯ পৃষ্ঠায় ও “শরহুল মুনিয়ায়” উল্লেখ আছে,
وقال الحلبى – واعلم ان النفل بالجماعة على سبيل التداعى مكروه ماعدا التراويح – وصلوة الكسوف والا ستسقاء فعلم ان كلا من الرغاثب ليلة اول جمعة من رجب وصلوة البرأة وصلاة القدر ليلة السبع والعشرين من رمضان بالجماعة بدعة مكروهة.
অর্থঃ- “ইমাম হালাবী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, জেনে রাখ! নিশ্চয় নফল নামায ঘোষণা দিয়ে জামায়াতে পড়া মাকরূহ্ তাহ্রীমী। তবে তারাবীহ্, কুছুফ (চন্দ্রগ্রহণ) ও ইস্তেস্কার (বৃষ্টির) নামায ব্যতীত। সুতরাং ছালার্তু রাগায়িব (অর্থাৎ রজব মাসের প্রথম জুময়ার রাত্রির নামায), শবে বরাতের রাত্রির নফল নামায এবং শবে ক্বদরের রাত্রির নফল নামায জামায়াতে পড়াও মাকরূহ্ তাহ্রীমী ও বিদ্য়াতে সাইয়্যিাহ্।
“এলাউস্ সুনান” কিতাবের ৭ম খন্ডের ৭৮ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করা হয়েছে,
فتكره الجماعة فى النوافل لكونها خلاف السنة المؤكدة وخلاف عمل الخلفاء والصحابة – فانهم لم يصلوا الرواتب من السنن والنفل المطلق فى جماعة قط.
অর্থঃ- “নফল নামায জামায়াতে পড়া মাকরূহ্ তাহ্রীমী। কেননা এটা সুন্নতে মুয়াক্কাদার বিপরীত এবং খোলাফা-ই-রাশেদীন, হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদিয়াল্লাহু আনহুমগণের আমলেরও বিপরীত। কেননা তাঁরা কখনও নফল নামায জামায়তে পড়েননি।”
তেমনিভাবে কাইয়ূমে যামান, মাহ্বুবে সুবহানী, আফযালুল আউলিয়া, হযরত শায়খ আহ্মদ ফারুকী সিরহিন্দি মুজাদ্দিদে আল্ফে ছানী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর প্রসিদ্ধ ও বিশ্ববিখ্যাত কিতাব “মক্তুবাত শরীফে” উল্লেখ করেন,
উর্দু কম্পোজ করতে হবে
অর্থঃ- “স্মরণ রেখ যে, নফল নামায পূর্ণ জামায়াতের সাথে আদায় করা মাকরূহ্ তাহ্রীমী ও বিদ্য়াতের অন্তর্ভূক্ত। এবং নফল নামায জামায়াতের সাথে পড়া কোন কোন ফিক্বাহ্বিদগণের মতে, সর্ব অবস্থায় মাকরূহ্ তাহ্রীমী। আর কারো কারো মতে, ঘোষণা দেয়ার সাথে শর্ত যুক্ত। সুতরাং যদি কেউ বিনা ঘোষণায় মসজিদের এক কোনায় নামায পড়ার সময় দু’একজন ইক্তেদা করে তবে মাকরূহ ছাড়াই আদায় হবে। আর তিনজন পড়ার ব্যাপারে মাশায়েখগণের মতবিরোধ রয়েছে। চারজন ইক্তেদা করলে কেউ কেউ বলেন- মাকরূহ্ নয়, কিন্তু সর্বসম্মত ও সহীহ্ মত হলো- মাকরূহ্ তাহ্রীমী হবে।”
মুফতী আমজাদ আলী তার
“বাহারে শরীয়ত” কিতাবের ৪র্থ খন্ডের ২৫ ও ২৬ পৃষ্ঠায় উল্লেখ রয়েছে,
উর্দু কম্পোজ করতে হবে
অর্থঃ- “রাগায়িবের নামায যা রজবের প্রথম জুমুয়ার রাত্রি ও শা’বানের ১৫ই রাত্রি অর্থাৎ শবে বরায়াত এবং শবে ক্বদরে জামায়াতের সাথে কিছু লোক নফল নামায আদায় করে থাকে। ফুক্বাহা-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণ উক্ত নফল নামাযগুলো জামায়াতের সহিত আদায় করাকে নাজায়েয, মাকরূহ তাহরীমী এবং বিদ্য়াতে সাইয়্যিয়াহ্ বলেছেন, আর লোকেরা এর স্বপক্ষে যে হাদীস শরীফ বর্ণনা করে থাকে,মুহাদ্দিসীন-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণ উক্ত হাদীস শরীফকে মওজু বলেছেন। তবে সম্মানিত আকাবিরে আওলিয়া-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণ থেকে ছহীহ সনদে রেওয়ায়েত আছে। সুতরাং উহার নিষেধে বাড়াবাড়ি করা উচিত নয়। যদি জামায়াতে তিনের অধিক মুক্তাদী না হয়।
আহমদ রেযা খাঁ স্বয়ং নিজেই তার “ফতওয়ায়ে রেজভীয়া” কিতাবে উল্লেখ করেছে যে, “নফল নামায জামায়াতে পড়া মাকরূহ।”
যেমন “ফতওয়ায়ে রেজভীয়া”-এর ৩য় খন্ডের ৪৫৯ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,
উর্দু কম্পোজ করতে হবে
অর্থঃ- “আমাদের আইম্মা-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণের নিকট নফল নামাযসমূহ ঘোষণা দিয়ে বা تداعى-এর সাথে জামায়াতে পড়া মাকরূহ। এই হুকুমের মধ্যে ছলাতুল খুছুফও (চন্দ্রগ্রহণের নামায) অর্ন্তভূক্ত। এই নামাযও একাকী পড়তে হবে। যদিও জুময়ার ইমাম উপস্থিত থাকে।
যেমন শামী কিতাবে, ইসমাঈল এবং বরজুন্দী থেকে বর্ণিত আছে, …….. আর তারাবীহ্, ছলাতুল কুছুফ (সূর্য গ্রহণের নামায), ছলাতুল ইস্তেস্কা (বৃষ্টির নামায), এই হুকুমের অর্ন্তভূক্ত নয়। অর্থাৎ এই তিন প্রকার নামায জামায়াতে পড়া মাকরূহ নয়। …… অধিক ছহীহ মতে চারজন অথবা চারের অধিক মুক্তাদী হওয়াই (تداعى) তাদায়ী অর্থাৎ মাকরূহ। দু’জন অথবা তিনজন মুক্তাদী হলে মাকরূহ নয়।
হযরত শামসুল আইম্মা ইমাম শামসুদ্দীন ছরুখছী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর বিশ্ববিখ্যাত ও নির্ভরযোগ্য “মাবছুত” কিতাবে বর্ণনা করেন,
وان اقتدى اربعة بواحد كره اتفاقا.
অর্থঃ- আর যদি ইমামের সহিত চারজন মুক্তাদী ইক্তেদা করে নফল নামায জামায়াতে আদায় করে, তাহলে সকল ইমাম ও ফক্বীহ্গণের সর্বসম্মত মত হলো- ‘মাকরূহ্ তাহ্রীমী’ হবে।
“হাশিয়ায়ে তাহতাবী আলা মারাকিউল ফালাহ্” কিতাবের ২৫৬ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,
والجماعة فى النفل فى غير التراوبح مكروهة …………. واذا اقتدى اربعة بواحد كره اتفاقا.
অর্থঃ- “তারাবীহ্ ব্যতীত নফল নামায জামায়াতে পড়া মাকরূহ্ তাহ্রীমী। …….. আর যদি ইমামের সাথে চারজন মুক্তাদি ইক্তেদা করে নফল নামায জামায়াতে পড়ে তাহলে সকলের ঐক্যমতে মাকরূহ্ তাহ্রীমী হবে।
“ফতওয়ায়ে রেজভীয়ার” ১০ খন্ডের ১৭৫, ১৭৬ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,
উর্দু কম্পোজ করতে হবে
অর্থঃ- “নফল নামায পড়তে হলে পৃথক পৃথক পড়বে কেননা নফল নামায বড় জামায়াতের সাথে পড়া অর্থাৎ যদি জামায়াতে চারজন মুক্তাদী হয় তাহলে সকল ইমাম ও ফুক্বাহা-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণের ঐক্যমতে মাকরূহ।
উল্লেখ্য যে, সুন্নত ও নফল নামাযগুলো নিজের ঘরে একা একা পড়াই উত্তম। আর ফরজ নামায মসজিদে জামায়াতে পড়াই উত্তম।
যেমন এ প্রসঙ্গে “ফতওয়ায়ে আলমগীরী” কিতাবের ১ম খন্ডের ১১৩ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,
الافضل فى السنن والنوافل المنزل لقوله عليه السلام صلاة الرجل فى المنزل افضل الا المكتوبة.
অর্থঃ- “সুন্নত ও নফল নামাযসমূহ নিজের ঘরে (একা একা) পড়াই উত্তম। কেননা আখেরী রসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “পুরুষের নামায (তার নিজের) ঘরে একা একা পড়াই উত্তম। তবে ফরজ নামায ব্যতীত। কেননা ফরজ নামায মসজিদে জামায়াতের সহিত পড়াই উত্তম।”
উপরোক্ত দলীল ভিত্তিক আলোচনার দ্বারা এটাই বিশেষ ভাবে প্রমাণিত হলো যে, লাইলাতুল ক্বদর, লাইলাতুল বরায়াত, তাহাজ্জুদ, চাশ্ত, আওয়াবীন ইত্যাদি নফল নামাযগুলো ইমাম ব্যতীত চারজন মুক্তাদী জামায়াতের সাথে আদায় করা সম্পূর্ণরূপে মাকরূহ তাহরীমী ও বিদ্য়াতে সাইয়্যিয়াহ। চাই তা ঘোষণা দিয়ে পড়ুক অথবা বিনা ঘোষণায় পড়ুক। আর উক্ত নফল নামাযসমূহ জামায়াতে পড়ার মধ্যে কোনই ফযীলত নেই।
উল্লেখ্য যে, নফল নামায জামায়াতে আদায় করা শুধু হানাফী মাযহাবেই মাকরূহ তাহরীমী নয়, শাফেয়ী মাযহাবেও নফল নামায জামায়াতে পড়া মাকরূহ তাহরীমী। (এলাউস সুনান ৭ম খন্ড)
কাজেই কেউ আহ্লে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের দাবিদার হলে তাকে অবশ্যই উপরোক্ত ফতওয়া মেনে আমল করতে হবে।
উল্লেখ্য, তরজুমানের কথিত ইমাম আহমদ রেযা খাঁ ও তাদের মুফতী আমজাদ আলীও বলেছে, “চারজন মুক্তাদীসহ নফল নামায জামায়াতে পড়া সকলের ঐক্যমতে মাকরূহ।”
অতএব মাসিক তরজুমান তথা অছিয়র রহমানের উক্ত উত্তর শুধু ভুলই নয় বরং গোমরাহীমূলক ও অশুদ্ধ বলে প্রমাণিত হলো।
{দলীলসমূহঃ (১) মাবসুত লিস সারাখসী, (২) কিতাবুল আছল, (৩) বাদায়েউছ্ ছানায়ে, (৪) আসবাহ ওয়ান নাজায়ের, (৫) শরহে মুনিয়া, (৬) দুরার (৭) আল কুহেস্তানী, (৮) মিনহাতুল খালিক, (৯) শরহে নেক্বায়া, (১০) শরহে ইলিয়াস, (১১) বাহরুর রায়েক, (১২) আলমগীরী, (১৩) দুররুল মোখতার, (১৪) গায়াতুল আওতার, (১৫) শামী, (১৬) খোলাছাতুল ফতওয়া, (১৭) ফতওয়ায়ে মজমুয়া, (১৮) তাতারখানীয়া, (১৯) রদ্দুল মুহতার, (২০) ফতহুল ক্বাদীর, (২১) হাশিয়ায়ে তাহতাবী আলা মারাকিউল ফালাহ, (২২) আল জাওহারাতুন নাইয়্যারাহ্, (২৩) আইনী শরহে হেদায়া, (২৪) তাহ্তাবী, (২৫) কিতাবুল ফিক্বাহ, (২৬) ফতওয়ায়ে হিন্দিয়া, (২৭) এলাউস্ সুনান, (২৮) হাশিয়ায়ে শরহে বেকায়া লি ফাজেল চলপী, (২৯) ফতওয়ায়ে সা’দিয়াহ্, (৩০) মাছাবাতা বিস্ সুন্নাহ, (৩১) নেহায়া, (৩২) শরহে শামায়েল, (৩৩) হেদায়া মাআদ্ দেরায়া, (৩৪) কেফায়া, (৩৫) কুদুরী, (৩৬) ইলমুল ফিকাহ, (৩৭) কিতাবুজজিয়া, (৩৮) ফতওয়ায়ে সিরাজিয়া, (৩৯) গিয়াছিয়া, (৪০) শাফিয়াহ, (৪১) মকতুবাতে ইমাম রব্বানী, (৪২) ফতওয়ায়ে দারুল উলূম দেওবন্দ, (৪৩) আযীযুল ফতওয়া, (৪৪) ফতওয়ায়ে মাহমুদিয়া, (৪৫) ইমদাদুল ফতওয়া, (৪৬) ইমদাদুল আহকাম, (৪৭) ফতওয়ায়ে রশীদিয়া, (৪৮) ফতওয়ায়ে রহীমিয়া, (৪৯) আহসানুল ফতওয়া, (৫০) মালাবুদ্দা মিনহু,(৫১) আনওয়ারে মাহমুদাহ (৫২) বাহারে শরীয়ত, (৫৩) ফতওয়ায়ে রেজভীয়া, ইত্যাদি।}
বিঃ দ্রঃ- এ সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জানতে হলে আমাদের মাসিক আল বাইয়্যিনাতের ১৩তম সংখ্যার ফতওয়া বিভাগ পাঠ করুন। যাতে ৭৬টি নির্ভরযোগ্য কিতাবের দলীল পেশ করা হয়েছে।
মুহম্মদ নাছির আলী, পোর্ট কলোনী, চট্টগ্রাম
সুওয়ালঃ- মাসিক তরজুমান ডিসেম্বর ’৯৯ জানুয়ারী-২০০০ ঈঃ সংখ্যায় প্রশ্নোত্তর বিভাগে নিম্নোক্ত প্রশ্নোত্তর ছাপা হয়।
প্রশ্নঃ- জামাতের নামাজে ইকামতের কোন পর্যায়ে ইমাম ও মুক্তাদীদের দাঁড়ানোর বিধান? জানালে খুশী হবো।
উত্তরঃ- ইকামত বলার সময় ইমাম ও মুক্তাদী-সবাই বসে থাকবেন। যখন মুয়াজ্জিন “হাইয়া আলাস্ সালাত” বা হাইয়া আলাল ফালাহ” বলবেন তখন সবাই দাঁড়াবেন। এটাই সুন্নাত এবং সাহাবা কেরামের আমল। ইকামতের প্রাক্কালে শুরু থেকে দাঁড়িয়ে থাকা সুন্নতের পরিপন্থী।
এখন আমার সুওয়াল হলো- মাসিক তরজুমানের উক্ত বক্তব্য সঠিক হয়েছে কি? দয়া করে দলীল সহ সঠিক জাওয়াব দানে বাধিত করবেন।
জাওয়াবঃ- ইক্বামতের সময় ইমাম ও মুক্তাদীগণের দাঁড়ানো সম্পর্কে চট্টগ্রাম আন্জুমান-এ-রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া কর্তৃক প্রকাশিত, রেযাখানী মাযহাবের মুখপত্র মাসিক তরজুমান পত্রিকার উক্ত বক্তব্য সঠিক হয়নি। বরং ভুল হয়েছে।
নিম্নে তরজুমানের ভুল বক্তব্যগুলো
খন্ডন করা হলো-
যেমন, মাসিক তরজুমানে প্রথমতঃ বলা হয়েছে, “ইকামত বলার সময় ইমাম ও মুক্তাদী সবাই বসে থাকবেন।”
উক্ত বক্তব্যের জবাবে প্রথমতঃ বলতে হয় যে, মাসিক তরজুমান তথা অছিয়র রহমানের এ বক্তব্য সঠিক হয়নি। কারণ তার এ বক্তব্য এটাই প্রমাণ করে যে, ইক্বামত বলার সময় ইমাম ছাহেব বসে থাকার ব্যাপারে বাধ্য বা তাকে খাছ করে হুকুম করা হয়েছে। অথচ ইমাম ছাহেব বসে থাকার ব্যাপারে বাধ্য নয়।
অথচ আহমদ রেযা খাঁ তার ফতওয়ায়ে রেজভীয়ায় বলেছে, “ইক্বামত বলার সময় ইমাম ছাহেব বসে থাকবে কি থাকবেনা এ ব্যাপারে ইমাম ছাহেবের জন্য খাছ কোন হুকুম নেই।”
যেমন, “ফতওয়ায়ে রেজভীয়া” কিতাবের ২য় খন্ডের, ৪২০ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,
উর্দু কম্পোজ করতে হবে
অর্থঃ- ইমামের জন্য এ ব্যাপারে খাছ কোন হুকুম নেই।
দ্বিতীয়তঃ তরজুমানে বলা হয়েছে, “যখন মুয়াজ্জিন হাইয়া আলাস সালাত” বা “হাইয়া আলাল ফালাহ” বলবেন তখন সবাই দাঁড়াবেন।
এ বক্তব্যের জাওয়াবে বলতে হয় যে, তরজুমানের এ বক্তব্য সঠিক হয়নি। কারণ কোন কোন শর্তে …….. حى على الفلاح (হাইয়্যা আলাল ফালাহ্) বলার সময় সকলকেই দাঁড়াতে হবে সে শর্তগুলোর একটি শর্তও উল্লেখ করেনি। বরং শর্তগুলোর ইবারতের অর্থ কারচুপি করে পরবর্তী ইবারতের অর্থ অনুবাদ করে বলেছে যে, “যখন মুয়াজ্জিন ………. “হাইয়া আলাল ফালাহ” বলবেন তখন সবাই দাঁড়াবেন।” যা তরজুমান তথা অছিয়র রহমান চরম জিহালতির পরিচয় দিয়েছে।
যেমন, এ প্রসঙ্গে সর্বজনমান্য ও বিশ্ব বিখ্যাত ফতওয়ার কিতাব “ফতওয়ায়ে আলমগীরী” কিতাবের ১ম খন্ডের, ৫৭ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,
ان كان المؤذن غير الامام وكان القوم مع الامام فى المسجد فانه يقوم الامام والقوم اذا قال المؤذن حى على الفلاح عند علمائنا الثلاثة وهو الصحيح.
অর্থঃ- যদি মুয়াজ্জিন ইমাম ব্যতীত অন্য কেউ হয় এবং মুক্তাদীগণ যদি ইমামের সহিত মসজিদে থাকে তাহলে মুয়াজ্জিন যখন ইক্বামতের মধ্যে حى على الفلاح (হাইয়্যা আলাল ফালাহ্) বলবে তখন আমাদের তিন ইমাম অর্থাৎ হযরত ইমাম আ’যম আবূ হানিফা রহমতুল্লাহি আলাইহি, হযরত ইমাম আবূ ইউসুফ রহমতুল্লাহি আলাইহি ও হযরত ইমাম মুহম্মদ রহমতুল্লাহি আলাইহিগণের মতে, ইমাম এবং মুক্তাদীগণ দাঁড়িয়ে যাবে। আর এটাই বিশুদ্ধ মত।
উপরোক্ত কিতাবের ইবারতে যে শর্তগুলো পরিলক্ষিত হয়- তাহলো ইমাম ও মুয়াজ্জিন যদি একই ব্যক্তি না হয় অর্থাৎ ইমামতি করার জন্য ইমাম যদি নির্দিষ্ট করা থাকে। অনুরূপ আযান-ইক্বামত দেয়ার জন্য মুয়াজ্জিন যদি নির্দিষ্ট করা থাকে। এরপর বলা হয়েছে, মুক্তাদীগণ যদি ইমামের সহিত মসজিদে বসে থাকে তাহলে حتى على الفلاح (হাইয়্যা আলাল ফালাহ্) বলার সময় দাঁড়ানোটা আম ফতওয়া। এছাড়াও আরো অনেক শর্ত রয়েছে।
অথচ তরজুমান তথা অছিয়র রহমান শর্তগুলোর ইবারতের অর্থ কারচুপি করে নিজেকে ইবারত চোর ও প্রতারক হিসেবে সাব্যস্ত করেছে।
তৃতীয়তঃ তরজুমানে বলা হয়েছে- “এটাই সুন্নত এবং সাহাবা কেরামের আমল।”
এ বক্তব্যের জবাবে বলতে হয়, তরজুমানের এ বক্তব্যও ভুল হয়েছে কারণ শুধু …….. حى على الفلاح হাইয়্যা আলাল ফালাহ্ বলার সময় দাঁড়ানোই সুন্নত নয়, বরং ইক্বামত শেষ হওয়ার পর দাঁড়ানোও সুন্নত।
যেমন মিরকাত শরীফের ২য় খন্ডের ১৫৪ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,
قال اصحابنا السنة ان لا يقوم المأموم حتى يفرغ المقيم من جميع اقامته.
অর্থঃ- “আমাদের আছহাবগণ বলেছেন, মুয়াজ্জিনের ইক্বামত শেষ না হওয়া পর্যন্ত মুক্তাদীগণের না দাঁড়ানো সুন্নত। অর্থাৎ ইক্বামত শেষ হওয়ার পর দাঁড়ানো সুন্নত।
আর শুধু … حى على الفلاح (হাইয়্যা আলাল ফালাহ্) বলার সময় দাঁড়ানোই হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদিয়াল্লাহু আনহুমগণের আমল নয় বরং ইক্বামত শুরু হওয়ার আগে দাঁড়ানোও হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদিয়াল্লাহু আনহুমগণের আমল।
যেমন হযরত ওমর রদিয়াল্লাহু আনহু ইক্বামত শুরু হওয়ার আগে দাঁড়িয়ে কাতার সোজা করতেন এবং কাতারের ফাঁকে তীর ছুড়ে কাতার সোজা করতেন। আর কাতার সোজা করার ব্যাপারেও লোক নিয়োগ করতেন এবং কাতার সোজা না হওয়া পর্যন্ত তাকবীর বলতেন না। যেমন হাদীস শরীফে উল্লেখ আছে,
روى عن عمر رضى الله تعالى عنه انه كان يوكل رجالا باقامة الصفوف فلايكبر حتى يخبر ان الصفوف قداستوت.
অর্থঃ- “হযরত ওমর রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি কাঁতার সোজা করার জন্য লোক নিয়োগ করতেন এবং কাতার সোজা হওয়ার খবর যতক্ষণ পর্যন্ত না দেয়া হতো ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি নামাযের তাকবীর বলতেন না। ”
অনুরূপ ভাবে হযরত উসমান রদিয়াল্লাহু আনহু ও হযরত আলী রদিয়াল্লাহু আনহু করতেন।
روى عن على عثمان انهما كانا يتعاهدان ذلك.
অর্থঃ- হযরত উসমান রদিয়াল্লাহু আনহু ও হযরত আলী রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে, তাঁরা উভয়েই অনুরূপ দেখা-শুনা করতেন। (নাইলুল আওতার)
চতুর্থতঃ মাসিক তরজুমানে বলা হয়েছে, “ইকামতের প্রাক্কালে শুরু থেকে দাঁড়িয়ে থাকা সুন্নতের পরিপন্থী।
এ বক্তব্যের জবাবে বলতে হয় তাদের এ বক্তব্যও সঠিক হয়নি। কেননা মুয়াজ্জিন যখন ইক্বামত শুরু করবেন তখনও মুক্তাদীগণের দাঁড়ানো মুস্তাহাব সুন্নত।”
যেমন “তানজীমুল আশতাত” কিতাবের ১ম খন্ডের ৩১৯ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,
উর্দু কম্পোজ করতে হবে
অর্থঃ- অধিকাংশ ওলামা-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণের নিকট মুস্তাহাব হলো মুয়াজ্জিন যখন ইক্বামত শুরু করবেন তখন সকল মুছল্লী দাঁড়িয়ে যাবে।
উপরোক্ত আলোচনা থেকে এটাই প্রমাণিত হলো যে, শর্ত সাপেক্ষে কোন কিতাবে حى على الفلاح (হাইয়্যা আলাল ফালাহ্) বলার সময় দাঁড়ানোর কথা উল্লেখ আছে এবং বলা হয়েছে, এটাই বিশুদ্ধ। এবং কোন কোন কিতাবে حى على الصلوة (হাইয়্যা আলাছ ছলাহ্) বলার সময় দাঁড়ানোর কথা উল্লেখ আছে এবং বলা হয়েছে, এটাই বিশুদ্ধ। আবার কোন কোন কিতাবে قد قامت الصلوة (ক্বদ্ক্বামাতিছ্ ছলাহ্) বলার সময় ইমাম ও মুক্তাদীগণের দাঁড়ানোর কথা উল্লেখ আছে। আবার কোন কোন কিতাবে ইক্বামত শেষ হওয়ার পর দাঁড়ানোর কথা উল্লেখ আছে এবং বলা হয়েছে, এটাই সুন্নত। আবার কোন কোন কিতাবে অধিকাংশ ইমাম, মুজতাহিদ ফক্বীহ ও সলফে সালেহীনগণের মতে মুয়াজ্জিন যখন ইক্বামত শুরু করবেন তখন সকল মুছল্লীগণের দাঁড়ানোকে মুস্তাহাব বলা হয়েছে।
কোন কোন কিতাবে বর্ণিত আছে, হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদিয়াল্লাহু আনহুম কখনো কখনো কাঁতার সোজা করে বসে থাকতেন। যেমন “মিরআতুল মানাজীহ” কিতাবের ১ম খন্ডের ৪০৪ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,
উর্দু কম্পোজ করতে হবে
অর্থঃ- “সে যামানায় নিয়ম এই ছিল যে, হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদিয়াল্লাহু আনহুম কাতার সোজা করে বসে ছিলেন।”
আর হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদিয়াল্লাহু আনহুমগণ সকলেই আলেম ছিলেন। কিন্তু এ যামানার অধিকাংশ মসজিদেই নামাযের কাঁতারে লাইন কাটা বা দাগ দেয়া থাকা সত্ত্বেও অধিকাংশ মুছল্লী আলেম না হওয়ায় ও অন্যান্যদের পর্যাপ্ত পরিমাণের দ্বীনী ইল্ম না থাকায় কাঁতার সোজা করার গুরুত্ব অনুধাবন করতে না পারায় প্রায়ই কাতার বাঁকা হয়ে থাকে ও কাঁতারে ফাঁক থাকে। অথচ কাতার সোজা করা ও ফাঁক বন্ধ করা ওয়াজিব। সুতরাং যদি ইমাম ছাহেব কাঁতার সোজা করা ও ফাঁক বন্ধ করার জন্য দাঁড়ান, তখন মুক্তাদীদের জন্যও দাঁড়ানো আবশ্যক। কারণ ইমাম ছাহেবের দাঁড়ানো অবস্থায় মুক্তাদীদের জন্য বসে থাকা মাকরূহ্ ও আদবের খেলাফ। কজেই حى على الصلاة বা حى على الفلاح
বলার সময় না দাঁড়িয়ে ইক্বামত বলার পূর্বে দাঁড়িয়ে কাতার সোজা করা, যাতে সকলেই কাতার সোজা করা ও ফাঁক বন্ধ করা যে ওয়াজিব তার গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারে।
অতএব প্রমাণিত হলো মাসিক তরজুমানের উত্তর সম্পূর্ণটাই অশুদ্ধ ও মুর্খতাসূচক যা তাদেরকে জাহিল বলেই সাব্যস্ত করলো।
{দলীলসমূহঃ- (১) বুখারী, (২) মুসলিম, (৩) মেশকাত, (৪) তিরমিযী, (৫) আবূ দাউদ, (৬) ত্বহাবী, (৭) মসনদে আব্দুর রাজ্জাক, (৮) ফতহুল বারী, (৯) উমদাতুল ক্বারী, (১০) আইনী, (১১) উরফুশ শাজী, (১২) মেরকাত, (১৩) তা’লিকুছ ছবীহ্, (১৪) তানজীমুল আশতাত, (১৫) মিরআতুল মানাজীহ, (১৬) মাজমাউয যাওয়ায়েদ, (১৭) বজলুল মাজহুদ, (১৮) মুয়াত্তা, (১৯) যুরকানী, (২০) শরহে শেফায়া, (২১) নববী শরহে মুসলিম, (২২) বাদায়েউছ ছানায়ে, (২৩) জহীরিয়া, (২৪) মুহীত, (২৫) জামিউল মুজমেরাত, (২৬) কিতাবুল আছল, (২৭) কুহেস্তানী, (২৮) শরহে মাজমাআ, (২৯) খোলাছা, (৩০) নাহরুল ফায়েক, (৩১) কানজুদ দাকায়েক, (৩২) ফতওয়ায়ে আলমগীরী, (৩৩) বাহরুর রায়েক, (৩৪) শরহে বেক্বায়া, (৩৫) শরহে নেকায়া, (৩৬) আইনুল হেদায়া, (৩৭) নুরুল হেদায়া, (৩৮) দুররুল মুখতার, (৩৯) হাশিয়ায়ে তাহতাবী, (৪০) তাতারখানিয়া, (৪১) রদ্দুল মুহতার, (৪২) মজমাউল আনহুর, (৪৩) গায়াতুল আওতার, (৪৪) নুরুদ দেরায়া, (৪৫) মারাকিউল ফালাহ্, (৪৬) জাওয়াহেরুল ফিক্বাহ, (৪৭) বাহারে শরীয়ত, (৪৮) ফতয়ায়ে রেজভীয়া, ইত্যাদি}
এখানে সংক্ষিপ্তভাবে জবাব দেয়া হলো। প্রয়োজনবোধে পরবর্তীতে আরো অধিক ইবারত ও দলীলসহ বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হবে ইনশাআল্লাহ্।
সুওয়ালঃ- মাসিক তরজুমান ডিসেম্বর’ ৯৯ জানুয়ারী ২০০০ ঈঃ সংখ্যায় প্রশ্নোত্তর বিভাগে এক প্রশ্নের উত্তরে বলা হয়েছে, “সিগারেট বা ধুমপান করে ভালভাবে কুলি করে নেবে যাতে মুখের মধ্যে ধুমপানের দুর্গন্ধ না থাকে। কেননা দুগর্ন্ধাবস্থায় নামায পড়া মাকরূহ।”
এখন আমার সুওয়াল হলো- মাসিক তরজুমানের উক্ত বক্তব্য দ্বারা এটাই প্রতীয়মান হয় যে, ধুমপান করাতে কোন অসুবিধা নেই। সুতরাং ধুমপান করে ভাল ভাবে কুলি করে নিলেই চলবে। অথচ আমরা জানি, ধুমপান করা মাকরূহ তাহরীমী। তাহলে মাসিক তরজুমানের উক্ত বক্তব্য সঠিক হয়েছে কি?
জাওয়াবঃ- সিগারেট বা ধুমপান করা সম্পর্কে চট্টগ্রাম আন্জুমান-এ-রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া কর্তৃক প্রকাশিত, রেযাখানী মাযহাবের মুখপত্র মাসিক তরজুমান পত্রিকার উক্ত বক্তব্য শুদ্ধ হয়নি। বরং ভুল ও অশুদ্ধ হয়েছে।
কারণ স্পষ্ট, সহীহ্ ও গ্রহণযোগ্য ফতওয়া মোতাবিক ধুমপান যেখানে মাকরূহ্ তাহ্রীমী, সেখানে মনগড়া মত পেশ করে তারা যেমন নিজেদের গোমরাহী প্রকাশ করেছে, তেমনি সাধারণ জনগণকে বিভ্রান্ত করার ব্যর্থ কোশেশও করেছে।
“ধুমপান করা মাকরূহ্ তাহরীমী” যা ইমামুল হিন্দ শাহ ওয়ালী উল্লাহ্ মুহাদ্দিস দেহলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর “দূররে ছামীন” কিতাবে, সিরাজুল হিন্দ শাহ আব্দুল আযীয মুহাদ্দিস দেহলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর “ফতওয়ায়ে আযীযী” কিতাবে এবং হযরত আব্দুল হাই লখনভী ছাহেব তাঁর “ফতওয়ায়ে আব্দুল হাই” কিতাবে উল্লেখ করেছেন। এছাড়া “মাজালিসুল আবরার, শারবুদ্দোখান” ইত্যাদি কিতাবেও ধুমপান করা হারাম বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
মূলতঃ ধুমপানের মাসয়ালাটি ক্বিয়াসী মাসয়ালার অন্তর্ভুক্ত। যার বর্ণনা সরাসরি কুরআন শরীফ এবং হাদীস শরীফে উল্লেখ নেই। আর না থাকাটাই স্বাভাবিক। কেননা বিড়ি, সিগারেট, হুক্কা ইত্যাদি যা তামাক দ্বারা তৈরী হয়। যার ব্যবহার আল্লাহ্ পাক-এর রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, নূরে মুজাস্সাম, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যামানার অনেক পরে শুরু হয়েছে।
আমেরিকার পাশে “কিউবা” নামক একটি দেশে তামাকের চাষ হতো। সেখান থেকে বাদশাহ্ জাহাঙ্গীরের শাসনামলে জনৈক রাষ্ট্রদূত ভারত উপমহাদেশে সর্বপ্রথম তামাক নিয়ে আসে। পরবর্তীতে এ উপমহাদেশে ধুমপানের ব্যবহার শুরু হয়। তামাক সম্পর্কে সর্ব প্রথম ফতওয়া প্রদান করেন দ্বাদশ শতকের মুজাদ্দিদ হযরত শাহ্ ওয়ালি উল্লাহ্ মুহাদ্দিস দেহ্লভী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর ‘দুররে ছামীন’ কিতাবে। তাতে তিনি ধুমপান মাকরূহ তাহ্রীমী বলে ফতওয়া প্রদান করেন এবং তিনিই ধুমপানের সর্বপ্রথম ফতওয়া প্রদানকারী। তাঁর পরে ফতওয়া দেন তাঁর ছেলে হযরত শাহ্ আব্দুল আযীয রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর “ফতওয়ায়ে আযীযী” কিতাবে যা সহীহ্ হাদীস শরীফ থেকে ক্বিয়াস করে প্রদান করা হয়েছে এবং এটাই সহীহ্ ও নির্ভরযোগ্য ফতওয়া। যার উপর ওলামায়ে হক্কানী, রব্বানীগণ একমত।
হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহ্ পাক-এর রসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন,
من اكل من هذه الشجرة المنتنة فلا يقربن مسجدنا فان الملائكة تتأذى مما يتأذى منه الانس.
অর্থঃ- “যে ব্যক্তি এমন দুর্গন্ধযুক্ত বৃক্ষের (কাঁচা পিঁয়াজ বা রসূনের) কিছু খায়, সে যেন আমাদের মসজিদের নিকটেও না আসে। নিশ্চয়ই যে কারণে মানুষ কষ্ট পায় তা ফেরেশ্তাগণেরও কষ্টের কারণ। (বুখারী, মুসলিম ও মিশকাত শরীফ)
হাদীস শরীফে আরো বর্ণিত হয়েছে,
نهى عن هاتين الشجرتين يعنى البصل والثوم وقال من اكلهما فلا يقربن مسجدنا وقال ان كنتم لابد اكلهما فاميتوهما طبخا.
অর্থঃ- হযরত রসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ দু’টি বস্তু খেতে নিষেধ করেছেন। অর্থাৎ পিঁয়াজ ও রসূন। এবং বলেছেন, “যে ব্যক্তি তা খায়, সে যেন আমাদের মসজিদের নিকটেও না আসে।” তিনি আরো বলেছেন, “তোমাদের যদি খেতেই হয়, তাহলে তা রান্না করে দুর্গন্ধ বিনষ্ট করে খাবে।” (আবূ দাউদ ও মিশকাত শরীফ)
উল্লিখিত হাদীস শরীফের ব্যাখ্যায় বিখ্যাত মুহাদ্দিস হযরত মাওলানা কুতুবুদ্দীন খান দেহ্লভী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, “যে সকল দুর্গন্ধযুক্ত বস্তুর দ্বারা মানুষের কষ্ট হয়, তার দ্বারা ফেরেশ্তাগণেরও কষ্ট হয়।” (মোযাহেরে হক্ব)
সুতরাং কাঁচা পিঁয়াজ, কাঁচা রসূন, গাজর, মূলা এবং এ জাতীয় যে সমস্ত কাঁচা দ্রব্য খেলে মুখে দুর্গন্ধ হয়, সেটা খাওয়া মাকরূহ্ তান্যীহী এবং সেটা খেয়ে মসজিদে যাওয়া মাকরূহ্ তাহ্রীমী।
এ মাসয়ালার উপর ক্বিয়াস করে ধুমপান করা মাকরূহ্ তাহ্রীমী এবং ধুমপান করে মসজিদে যাওয়া হারাম ফতওয়া প্রদান করা হয়েছে। কেননা কাঁচা পিঁয়াজ, কাঁচা রসুন খাওয়া অপেক্ষা ধুমপানে মুখ অনেক বেশী দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে থাকে।
ধুমপান প্রসঙ্গে “ফতওয়ায়ে আযীযী” কিতাবের ৫৯৬-৫৯৭ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,
উর্দু কম্পোজ করতে হবে
অর্থঃ- “হুক্কা পান করা হালাল কি হারাম এ ব্যাপারে ইখ্তিলাফ বা মত বিরোধ রয়েছে, তবে বিশুদ্ধ মত এই যে, হুক্কা পান করা মাকরূহ তাহ্রীমী।”
ফতওয়ায়ে আব্দুল হাই লখনভী” কিতাবের ৫০৮ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,
উর্দু কম্পোজ করতে হবে
অর্থঃ- “সিগারেট পান করা হুক্কা পান করার মতই মাকরূহ্ তাহরীমী।”
এ ছাড়াও ফিক্বাহ্র কিতাবসমূহে ধুমপান মাকরূহ্ তাহ্রীমী হওয়ার ব্যাপারে নিম্নোক্ত কারণসমূহ উল্লেখ করা হয়েছে-
(১) বিড়ি, সিগারেটে ‘নিকোটিন’ রয়েছে। যেটা পান করা বিষ পানের নামান্তর।
(২) চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, ধুমপান স্বাস্থের জন্য ক্ষতিকর।
(৩) ধুমপানে আর্থিক অপচয় হয়। কুরআন শরীফে এরশাদ হয়েছে, ان المبذرين كانوا اخوان الشياطين.
অর্থঃ- “নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই।”
(৪) ধুমপানে আগুনের ধোঁয়া মুখের ভিতর প্রবেশ করানো হয়, যা জাহান্নামীদের সাথে সদৃশ হয়ে যায়। হাদীস শরীফে আছে, كل دخان حرام.
অর্থঃ-“প্রত্যেক ধোঁয়াই (পান করা) হারাম।”
(৫) ধুমপান বিধর্মীদের প্রচলিত অভ্যাস। ধুমপানে তাদের মুশাবেহাত হয়। হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে,
من تشبه بقوم فهو منهم.
অর্থঃ- “যে ব্যক্তি যে সম্প্রদায়ের সাথে মিল রাখবে, তাদের সাথেই তার হাশর-নশর হবে।”
(৬) ধুমপানে মানুষ ও ফেরেশ্তাদের কষ্ট হয়। হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে, ايذاء المسلم كفر.
অর্থঃ- “মুসলমানদেরকে কষ্ট দেয়া কুফরী।”
(৭) ধুমপানে নেশার সৃষ্টি হয়। হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে, كل مسكر حرام.
অর্থঃ- “সমস্ত নেশা জাতীয় দ্রব্যই হারাম।”এছাড়াও আরো শত সহস্র কারণ রয়েছে।
কাজেই যারা ধুমপান মুবাহ্ ফতওয়া দিয়েছে, তাদের ফতওয়া মোটেও গ্রহণয্যো নয়।
কারণ কাঁচা পিঁয়াজ, কাঁচা রসুন বা এ জাতীয় সাধারণ গন্ধযুক্ত খাদ্য খাওয়া যেখানে মাকরূহ্ তান্যীহী, সেখানে বিড়ি, সিগারেট, হুক্কা ইত্যাদি মারাত্মক দুর্গন্ধযুক্ত দ্রব্য কি করে মুবাহ্ হতে পারে?
সুতরাং ধুমপান সম্পর্কে শরীয়তের মূল ফতওয়া হচ্ছে- মাকরূহ্ তাহ্রীমী। কেউ কেউ হারাম ফতওয়াও দিয়েছেন।
অতএব ধুমপান সম্পর্কে মাসিক তরজুমানের উত্তর সম্পূর্ণ ভুল বলে প্রমাণিত হলো।
তাছাড়া নিম্নোক্ত কিতাবসমূহেও “ধুমপান” করা “মাকরূহ্ তাহ্রীমী” লেখা হয়েছে- (১) দুররে ছামীন, (২) ফতওয়ায়ে আযীযীয়া, (৩) ফতওয়ায়ে আব্দুল হাই লখনভী, (৪) ফতওয়ায়ে আমিনীয়া, (৫) ফতওয়ায়ে আশরাফিয়া, (৬) ইমদাদুল ফতওয়া, (৭) নেহায়া, (৮) আইনী, (৯) দুররুল মুখতার,(১০) আল আশবাহ্ ওয়ান্ নাজায়ের, (১১) ফতওয়ায়ে আলমগীরী, (১২) আল হালালু ওয়াল হারামু ফিল ইসলাম, (১৩) কেফায়াতুল মুফতী, (১৪) ফতওয়ায়ে হাম্মাদীয়া, (১৫) গায়াতুল আওতার, (১৬) শরহে ওহ্বানিয়া, (১৭) ক্বওলুস্ সাবিত, (১৮) তিবইয়ান, (১৯) তাফসীরে রুহুল মা’য়ানী, (২০) শরহে মাওয়াহেবুর রহ্মান, (২১) বুখারী শরীফ, (২২) মুসলিম শরীফ, (২৩) মিশকাত শরীফ, (২৪) মুজাহেরে হক্ব, (২৫) দায়লামী শরীফ, (২৬) মাজালেসুল আবরার, (২৭) সুয়ালাতে আসরার, (২৮) হাদিয়া তরীক্বায়ে মুহাম্মদিয়া উছীলায়ে আহ্মদিয়া, (২৯) নাসিহাতু ইবাদিল্লাহ্ ওয়া উম্মতে রসূলিল্লাহ্, (৩০) তারবীহুল জানান বতাশরীহে শারাবিদ দুখান,(৩১) আচ্ছুলহু বাইনাল ইখওয়ানি ফি ইবাহাতে শারবিদ দুখান, (৩২) তোহ্ফাতুল ইখওয়ান ফি শরবুদ দুখান, (৩৩) তোহ্ফাতুল মাকাসেদে ওয়ার রাসায়েল, (৩৪) ইমামুল ইখওয়ান ফি তাহ্রীমুদ্দুখান, (৩৫) আল বুরহান ফি তাহ্রীমুদ্দুখান ইত্যাদি।
এখানে সংক্ষিপ্ত ভাবে জবাব দেয়া হলো। প্রয়োজনবোধে পরবর্তীতে আরো অধিক ইবারত ও দলীলসহ বিস্তারিত ভাবে উল্লেখ করা হবে ইনশাআল্লাহ্।
মুহম্মদ মহসীন, ভোলাহাট, নবাবগঞ্জ
সুওয়ালঃ- হাটহাজারী মাদ্রাসার মুখপত্র মাসিক মুঈনুল ইসলাম সেপ্টেম্বর/২০০০ ঈঃ সংখ্যায়, মাসিক মদীনার নভেম্বর /’৯৮ ঈঃ সংখ্যার “উমরী ক্বাযা” সম্পর্কিত একটি প্রশ্নোত্তর উল্লেখ করে লিখেছে যে, “মাসিক মদীনার উত্তর সঠিক। অজ্ঞাত কাযা আদায়ের ব্যাপারে শরীয়তের কোন বিধান নেই ….. ।
অথচ আপনারা মাসিক আল বাইয়্যিনাতের ডিসেম্বর/’৯৮ ঈঃ সংখ্যায় সুওয়াল-জাওয়াব বিভাগে মাসিক মদীনার উত্তর খন্ডন করে তা ভুল প্রমাণ করেছেন।
এখন আমার সুওয়াল হলো- আপনারা বলছেন মাসিক মদীনার উত্তর ভুল। আর মুঈনুল ইসলাম বলছে, সঠিক। কোনটি গ্রহণযোগ্য আর সত্যিই কি উমরী কাযা বলতে কোন নামায শরীয়তে নেই? বিস্তারিত জানিয়ে এত্মিনান দান করবেন।
জাওয়াবঃ- “উমরী ক্বাযা” সম্পর্কে মাসিক আল বাইয়্যিনাতে যা লিখা হয়েছে তাই সঠিক ও দলীলভিত্তিক। মাসিক মদীনা ও মুঈনুল ইসলামে প্রদত্ত উমরী কাযা সম্পর্কিত বক্তব্য ইতিপূর্বে বহুবার খন্ডন করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু আমাদের উক্ত খন্ডনের জবাবে তারা কিছুই লিখতে পারেনি। এরপরও তারা বার বার উক্ত ভুলেরই পুনরাবৃত্তি করে যাচ্ছে। যা তাদের জিহালত ও গোমরাহীরই পরিচায়ক।
তাদের দাবী তারাই দেশের একমাত্র ফিক্বাহ্ বিশেষজ্ঞ বা ফক্বীহ্। অথচ ফিক্বাহ্র বিশ্ব বিখ্যাত ও নির্ভরযোগ্য সকল ফিক্বাহ্র কিতাবে উমরী কাযার সংজ্ঞা ও তরীক্বা বর্ণিত থাকার পরও এবং মাসিক আল বাইয়্যিনাতে সে সকল কিতাবসমূহের ইবারতসমূহ স্পষ্টভাবে পৃষ্ঠা ও খন্ড নাম্বার সহ উল্লেখ করার পরও তারা “উমরী কাযার” জ্ঞান লাভ করতে পারলো না।
মূলতঃ সত্যিকার ফক্বীহ্ ব্যতীত কারো পক্ষেই ইল্মে ফিক্বাহ্র হাকীক্বত উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। আর সত্যিকার ফক্বীহ্ তো সেই, যে ইল্মে ফিক্বাহ্র সাথে সাথে ইল্মে তাছাউফেও পারদর্শী। অর্থাৎ মহান আল্লাহ্ পাক ও তাঁর হাবীব হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও ইমাম-মুজতাহিদগণের সাথে যাঁদের রূহানী সম্পর্ক রয়েছে। এ ধরণের ফক্বীহ্গণের সম্পর্কেই হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে,
فقيه واحد اشد على الشيطان من الف عابد.
অর্থাৎ- “একজন সত্যিকার ফক্বীহ্, শয়তানের নিকট এক হাজার আবেদ (জাহেরী মাওলানা) -এর চেয়েও ভয়ংকর।”
এ ধরণের ফক্বীহ্ সবার পক্ষেই হওয়া সম্ভব না। মহান আল্লাহ্ পাক যাকে কবুল করেন তাকেই খাছ ফিক্বাহ্র ইল্ম দান করেন। তাই হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে,
من يرد الله به خيرا يفقهه فى الدين.
অর্থাৎ- “মহান আল্লাহ্ পাক যে ব্যক্তির ভালাই চান তাকেই শুধু দ্বীনের বুঝ তথা ফিক্বাহ্র জ্ঞান দান করেন।”
মদীনা ও মুঈনুলের তথাকথিত মুফতীরা যেহেতু এ স্তরের ফক্বীহ্ নয় তাই তারা আজও পর্যন্ত “উমরী কাযা” কি তা বুঝতে সক্ষম হয়নি।
এবার মূল মাসয়ালার আলোচনায় আসা যাক। মাসিক মুঈনুল ইসলাম লিখেছে, মদীনা নভেম্বর /’৯৮ ঈঃ সংখ্যায় “উমরী কাযা সম্পর্কে যে উত্তর দিয়েছে তা সঠিক।”
মুঈনুল ইসলামের এ বক্তব্য সম্পূর্ণই মিথ্যা ও দলীলবিহীন। মাসিক মদীনার উক্ত উত্তর যে সঠিক নয় তা মাসিক আল বাইয়্যিনাতের ডিসেম্বর /’৯৮ ঈঃ সংখ্যায় হানাফী মাযহাবের বিখ্যাত ও নির্ভরযোগ্য ফিক্বাহ্র কিতাবসমূহ যেমন, “বাহরুর রায়েক, আলমগীরী, ফতহুল ক্বাদীর, হেদায়া, আইনুল হেদায়া, দুররুল মোখতার, রদ্দুল মুহতার” ইত্যাদির ইবারতে প্রমাণ করা হয়েছে যে, “উমরী কাযা সম্পর্কিত মাসিক মদীনার উক্ত উত্তর সম্পূর্ণই ভুল। বিস্তারিত জানার জন্য মাসিক আল বাইয়্যিনাত ডিসেম্বর/’৯৮ ঈঃ সংখ্যা পাঠ করুন।
অতঃপর মুঈনুল ইসলাম লিখেছে, “…… অজ্ঞাত কাযা আদায়ের ব্যাপারে শরীয়তে বিধান নেই। অর্থাৎ উমরী কাযার কথা শরীয়তে উল্লেখ নেই।”
মুঈনুল ইসলামের এ বক্তব্যও ডাহা মিথ্যা, মনগড়া ও বিভ্রান্তিকর,দলীলবিহীনতো অবশ্যই। আসলে শরীয়ত কাকে বলে এ জ্ঞানই তাদের নেই। কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াসের সমষ্টিই হচ্ছে শরীয়ত। উল্লিখিত চারটির যে কোন একটির মধ্যে থাকার অর্থই হলো, শরীয়তের মধ্যে থাকা। উমরী কাযার কথা কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ না থাকলেও ইজমা-ক্বিয়াস তথা ফিক্বাহ্র কিতাবে ঠিকই উল্লেখ আছে। আর যেটা ফিক্বাহ্র কিতাবে উল্লেখ আছে সেটা শরীয়তে উল্লেখ নেই বলা শরীয়ত সম্পর্কে চরম জিহালতের পরিচয় নয় কি?
ফিক্বাহ্র কিতাবসমূহে কাযা নামাযকে
দু’ভাগ করা হয়েছে।
প্রথমতঃ “কাযায়ে আদা।” যে নামায কাযা হওয়ার ব্যাপারে মুছল্লী সম্পূর্ণ নিশ্চিত। অর্থাৎ তার কত ওয়াক্ত নামায কাযা হয়েছে তা তার নিশ্চিতরূপে জানা রয়েছে। এই প্রকার কাযা আদায় করা অপরিহার্য।
দ্বিতীয়তঃ “কাযায়ে উমরী বা অজ্ঞাত কাযা।” যে নামায কাযা হওয়ার ব্যাপারে মুছল্লীর সন্দেহে রয়েছে। অর্থাৎ কাযা থাকতেও পারে নাও থাকতে পারে। এ প্রকার কাযা আদায় যদিও অপরিহার্য নয়। কিন্তু তাকওয়া বা সাবধানতার জন্যে কাযায়ে উমরী আদায় করে নেয়াকে ফক্বীহ্গণ মুস্তাহ্সান বা উত্তম বলেছেন।
উল্লেখ্য, সন্দেহ হতে বাঁচার জন্য এহতিয়াত বা তাক্বওয়া অবলম্বন করাকে হাদীস শরীফও সমর্থন করে। যেমন হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে,
فمن اتقى الشبهات استبرأ لدينه وعرضه.
অর্থঃ- “যে ব্যক্তি সন্দেহ হতে বাঁচলো সে তার দ্বীন ও সম্মানকে হিফাযত করলো।”
এ হাদীস শরীফের ব্যাখ্যায় ফিক্বাহ্র কিতাবসমূহে উল্লেখ আছে, لايمنع شرعية الاحتياط للتقوى.
অর্থঃ- “শরীয়তে তাক্বওয়ার জন্য সাবধানতা অবলম্বন করতে নিষেধ নেই।” (কবীরী, ছগীরী, শামী)
আর এ কারণেই “উমরী কাযা” সম্পর্কে আল্লামা শামী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর “ফতওয়ায়ে শামী”-এর ৩ খন্ড ১৭ পৃষ্ঠায় চুড়ান্ত রায় পেশ করে বলেন,
ولذاقال بعضهم فيمن يقضى صلوات عمره مع انه لم يفته منها شئى لايكره لانه اخذ بالاحتياط.
অর্থঃ- “হাদীস শরীফের উপরোক্ত মর্ম অনুধাবন করে কোন কোন মুজতাহিদ ফতওয়া দেন যে, কারো নামায কাযা না থাকার পরও সে যদি ইহ্তিয়াত বশতঃ উমরী কাযা আদায় করে তবে তা মাকরূহ হবে না। কেননা সে তা সাবধানতার জন্যে আদায় করেছে।”
স্মর্তব্য যে, ফক্বীহ্গণ ইহ্তিয়াত বা সাবধানতাবশতঃ “উমরী কাযা” আদায় করা মাকরূহ বলেননি বরং উত্তম বলে ফতওয়া দিয়েছেন।
যেমন হানাফী ফিক্বাহ্র বিখ্যাত কিতাব “ফতওয়ায়ে আলমগীরীতে” উল্লেখ আছে,
فيمن يقضى صلوات عمره من غير ان فاته شئ يريد الاحتيتاط ………… فحسن.
অর্থঃ- “যে ব্যক্তির নামায কাযা হয়নি এমন ব্যক্তিও যদি ইহ্তিয়াত বা সাবধানতার জন্যে “উমরী কাযা” আদায় করে তবে তা মুস্তাহ্সান বা উত্তম হবে।” অনুরূপ বহু ফিক্বাহ্র কিতাবে উল্লেখ আছে।
অতএব, প্রমাণিত হলো যে, উমরী কাযা আদায়ের বিধান শরীয়তে রয়েছে। আর রয়েছে বলেই ফক্বীহ্গণ উমরী কাযা আদায় করাকে “মুস্তাহ্সান বা উত্তম” বলে ফতওয়া দিয়েছেন।
মাগরিব ও বিত্রের উমরী কাযা
চার রাকায়াত আদায় করবে
আর উমরী কাযা আদায়ের ক্ষেত্রে মাগরীব ও বিত্র নামায তিন রাকায়াত যথারীতি আদায় করার পর দাঁড়িয়ে আরেক রাকায়াত আদায় করে সালাম ফিরানোর কথা ফক্বীহ্গণ উল্লেখ করেছেন, মাগরীব ও বিত্র তিন রাকায়াতের স্থলে চার রাকায়াত পড়ার কথা বলার কারণ হলো, যেহেতু উক্ত নামায কাযা হওয়ার ব্যাপারে সন্দেহ রয়েছে। থাকতেও পারে নাও থাকতে পারে। যদি কাযা থাকে তবে তিন রাকায়াত কাযা হিসেবে গণ্য হবে। আর যদি কাযা না থাকে তবে চার রাকায়াত নফল হিসেবে গণ্য হবে। এরূপ নিয়মই সকল ফিক্বাহ্র কিতাবে বর্ণিত রয়েছে।
আর “উমরী কাযা” আদায় করার ক্ষেত্রে মাগরীব ও বিত্র যে তিন রাকায়াতের স্থলে চার রাকায়াত আদায় করবে। এ নিয়ম ফক্বীহ্গণই বর্ণনা করেছেন। তা আমাদের বানানো নয়।
যেমন, উক্ত নিয়ম সম্পর্কে ফিক্বাহ্র কিতাব “বাহরুর রায়েক” ২য় জি ৮০ পৃষ্ঠায় আল্লামা ইবনে নজীম মিছরী রহমতুল্লাহি আলাইহি লিখেন,
انه يصلى المغرب اربعا بثلاث قعدات وكذا الوتر.
অর্থঃ- “তিনি (উমরী কাযার) মাগরিব নামায তিন বৈঠকের সহিত চার রাকায়াত পড়েছেন, অনুরূপ বিত্র নামাযও তিন বৈঠকের সহিত চার রাকায়াত পড়েছেন।”
আল্লামা শামী-এর “ফতওয়ায়ে শামীর” ২য় জিঃ ৪৮৫-৪৮৬ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,
انه كان يضم الى المغرب والوتر ركعة فعلى احتمال صحة ماكان صلاه اولا تقع هذه الصلاة نفلا ةزيادة القعدة على رأس الثالثة لا تبطلها وعلى احتمال فساده تقع هذه فرضا مقضيا وزيادة ركعة عليها لاتبطلها-
অর্থাৎ মাগরীব ও বিত্র-এর নামাযে অতিরিক্ত এক রাকায়াত বৃদ্ধি করবে। অর্থাৎ মাগরীব ও বিত্র-এর তিন রাকায়াত এর স্থলে উমরী ক্বাযার নামায চার রাকায়াত পড়বে। অতঃপর সে যদি নিশ্চিত রূপে জানে যে, তার জীবনের প্রথম দিকে নামায ক্বাযা ছিলনা তাহলে এ চার রাকায়াত নামায নফল হিসেবে আদায় হবে। তৃতীয় রাকায়াতের পরে অতিরিক্ত একটি বৈঠকের দ্বারা নামায বাতিল হবে না। আর যদি সে নিশ্চিত থাকে যে তার ক্বাযা নামায ছিল তাহলে ইহা ফরজ হিসেবে আদায় হবে। এবং অতিরিক্ত একটি রাকায়াত বৃদ্ধির কারণে নামায বাতিল হবে না।
ফিক্বাহ্র বিশ্ব বিখ্যাত কিতাব “ফতওয়ায়ে আলমগীরী” ১ম খন্ড, ১২৫ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে যে,
رجل يقضى الفوائت فانه يقضى الوتر وان لم يستيقن انه هل بقى عليه وتر او لم يبق فانه يصلى ثلاث ركعات ويقنت ثم يقعد قدر التشهد ثم يصلى ركعة اخرى فان كان وترا فقد اداه وان لم يكن فقد صلى التطوع اربعا ولا يضره القنوت فى التطوع.
অর্থঃ- “কোন ব্যক্তি যদি ফউত (অনাদায়ী নামাযের ক্বাযা আদায় করতে চায়, তবে তাকে বিত্র নামাযেরও ক্বাযা আদায় করতে হবে। আর যদি সে বিত্র নামায ফউত হওয়া বা না হওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত না হয়, তাহলে সে তিন রাকায়াত নামায আদায় করবে এবং দোয়ায়ে কুনুতও পড়ে নিবে। অতঃপর তাশাহুদ পরিমাণ বসার পর অতিরিক্ত এক রাকায়াত পড়বে। এক্ষেত্রে যদি বিত্র থাকে, তবে তা আদায় হয়ে যাবে। আর যদি বিত্র না থাকে, তবে চার রাকায়াতই নফল হিসেবে গণ্য হবে। নফল নামাযের ক্ষেত্রে দোয়ায়ে কুনুত কোন প্রকার ক্ষতি করবেনা।” অনুরূপ মাগরিব নামাযের উমরী ক্বাযা সম্পর্কে “দুররুল মুখতার” কিতাবে বর্ণিত আছে।
উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা অকাট্যভাবে প্রমাণিত হলো যে, মাসিক মদীনা ও মুঈনুল ইসলামের “উমরী কাযা” সম্পর্কিত বক্তব্য সম্পূর্ণই ভুল, বিভ্রান্তিকর, দলীলবিহীন ও অনুসরণীয় ইমাম-মুজতাহীদ তথা ফক্বীহ্গণের মতের সম্পূর্ণই খেলাফ। তাই তা সম্পুর্ণরূপেই পরিতাজ্য।
{দলীলসমূহঃ (১) মারাকিউল ফালাহ্, (২) বাহরুর রায়েক, দুররুল মোখতার, (৩) রদ্দুল মুহতার, (৪) তাতার খানিয়া, (৫) খোলাছাতুল ফতওয়া, (৬) আলমগীরী, (৭) হিন্দিয়া, (৮) মুজমারাত, (৯) জহীরিয়া, (১০) ছগীরী, (১১) কবিরী, (১২) হেদায়া, (১৩) গায়াতুল আওতার, (১৪) ফতহুল ক্বাদীর, (১৫) কুনিয়া, (১৬) খানিয়া, (১৭) ইতাবিয়া, (১৮) হুজ্জাত, (১৯) আইনুল হেদায়া ইত্যাদি।}
সাইয়্যিদ মুহম্মদ ইউসুফ, মধ্য বাসাবো, ঢাকা।
সুওয়ালঃ- মাসিক মদীনা মে’২০০০ ঈঃ সংখ্যায় নিম্নোক্ত প্রশ্নোত্তর ছাপানো হয়।
প্রশ্নঃ- কোন একজন মুসলমান ব্যক্তি খৃষ্টান মেয়েকে বিয়ে করল। বিয়ের পর স্বামী ইসলাম ধর্ম এবং স্ত্রী খৃষ্টান ধর্ম পালন করতে থাকল। এমতাবস্থায় তাদের চলমান দাম্পত্য জীবন কি ইসলামের দৃষ্টিতে জায়েয? তাদের ছেলে-মেয়ের ভবিষ্যত কি? বিস্তারিত জান্তে চাই।
উত্তরঃ- ইসলামী শরীয়তে মুসলমান ছেলের জন্য ‘আহলে কিতাব’ বা ইহুদী-খৃষ্টান মেয়ে বিয়ে করার অনুমতি আছে। খৃষ্টান বা ইহুদী মেয়ে তার নিজের ধর্মের উপর থেকেই মুসলমান স্বামীর ঘর করতে পারবে। তবে তাদের সন্তান মুসলমানরূপে গণ্য হবে।
এখন আমার সুওয়াল হলো- মাসিক মদীনার প্রদত্ত উত্তর সঠিক হয়েছি কি-না? দলীলসহ জাওয়াব দানে বাধিত করবেন।
জাওয়াবঃ- মাসিক মদীনার উপরোক্ত বক্তব্য শুদ্ধ হয়নি। কারণ দ্বীন ইসলাম তথা ইসলামী শরীয়তে আহ্লে কিতাবের মেয়েকে বিবাহ্ করার অনুমতি রয়েছে সত্যিই তবে তা আমভাবে সকল আহলে কিতাবের মেয়েকে নয়। শুধুমাত্র ঐ সকল আহ্লে কিতাব যারা পূর্ববর্তী অবিকৃত আসমানী কিতাব অনুযায়ী আক্বীদা পোষণ করেন ও আমল করে থাকেন। অর্থাৎ যারা আল্লাহ্ পাক-এর তাওহীদ বা একত্বতায় পূর্ণ বিশ্বাসী এবং আল্লাহ্ পাক-এর প্রেরীত নবী ও রসূল আলাইহিস্ সালামগণের প্রতি বিশুদ্ধ আক্বীদা পোষণ করেন এবং কোন প্রকার র্শিক করেন না।
আল্লাহ্ পাক আহ্লে কিতাবদের মেয়েকে বিবাহ্ করা প্রসঙ্গে এরশাদ করেন,
والمحصنت من المؤمنت والمحصنت من الذين اوتوا الكتب من قبلكم اذا اتيتموهن اجورهن محصنين غير مسافحين ولا متخذى اخدان ومن يكفر بلايمان فقد حبط عمله وهو فى الاخرة من الخسرين.
অর্থঃ- “ঈমানদার সতী-সাধবী মহিলা এবং যারা পূর্ববর্তী আহ্লে কিতাব তাদের সতী-সাধবী মহিলা তোমাদের জন্য বিবাহ্ করা হালাল এই শর্তে যে, সৎ উদ্দেশ্যে তোমরা তাদেরকে মহর প্রদান করবে আর অসৎ উদ্দেশ্যে ও গোপন বন্ধুত্ব বজায় রাখার জন্য নয়। যে ব্যক্তি ঈমানের পরিবর্তে কুফরী গ্রহণ করবে নিশ্চয়ই তার আমল বরবাদ হয়ে যাবে এবং সে পরকালে ক্ষতিগ্রস্থদের অন্তর্ভূক্ত হয়ে যাবে।” (সূরা মায়িদা/৫)
উপরোক্ত আয়াত শরীফে আহ্লে কিতাবদের মেয়ে বিবাহ্ করা জায়েয বলা হয়েছে সত্যি তবে আহ্লে কিতাব কারা? এবং কোন শ্রেণীর আহ্লে কিতাবদের মেয়ে বিবাহ্ করা জায়েয?
আহ্লে কিতাব হচ্ছে- (১) ইহুদী সম্প্রদায় যারা হযরত মূসা আলাইহিস্ সালাম-এর উম্মত। যাদের প্রতি তাওরাত কিতাব নাযিল হয়েছে।
(২) খৃষ্টান সম্প্রদায় যারা হযরত ঈসা আলাইহিস্ সালাম-এর উম্মত। যাদের প্রতি ইঞ্জিল শরীফ নাযিল হয়েছে।
উক্ত আয়াত শরীফের ব্যাখ্যায় উল্লেখ করা হয়েছে, শুধুমাত্র আহ্লে কিতাব হলেই তাদের মেয়েকে বিবাহ্ করা জায়েয হবে না বরং শর্ত দেয়া হয়েছে যে, আহ্লে কিতাব হওয়ার সাথে সাথে মুশরিক না হওয়া। অর্থাৎ যে সকল আহ্লে কিতাব মুশরিক তাদের মেয়েকে বিবাহ্ করা জায়েয নেই। যেমন, যদি ইহুদী হয় তাহলে তারা যেন হযরত ওজায়ের আলাইহিস্ সালামকে আল্লাহ্ পাক-এর ছেলে হিসেবে বিশ্বাস না করে আল্লাহ্ পাক-এর নবী হিসেবে বিশ্বাস করে। আর হযরত মূসা আলাইহিস্ সালামকে আল্লাহ্ পাক-এর নবী ও রসূল হিসেবে বিশ্বাস করে এবং আল্লাহ্ পাককে এক হিসেবে জানে।
আর যদি খ্রীষ্টান হয় তাহলে তারা যেন ত্রিত্ববাদে বিশ্বাস না করে। অর্থাৎ হযরত ঈসা আলাইহিস্ সালামকে আল্লাহ্ পাক-এর ছেলে এবং হযরত মরিয়ম আলাইহাস্ সালামকে আল্লাহ্ পাক-এর স্ত্রী হিসেবে বিশ্বাস না করে। হযরত ঈসা আলাইহিস্ সালামকে আল্লাহ্ পাক-এর নবী ও রসূল হিসেবে বিশ্বাস করে এবং হযরত মরিয়ম আলাইহাস্ সালামকে আল্লাহ্ পাক-এর খালিছ বান্দী হিসেবে বিশ্বাস করে। এবং আল্লাহ্ পাককে এক হিসেবে জানে। এই শ্রেণীর আহ্লে কিতাবদের মেয়েকে বিবাহ্ করা জায়েয বলে কুরআন শরীফে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই শ্রেণীর আহ্লে কিতাবদেরকে বাংলায় তাওহীদ বা একত্বতায় বিশ্বাসী এবং আরবীতে বলে موحد মুওয়াহ্হিদ বলে আর ইংরেজীতে (টহরঃধৎরধহ) ইউনিটেরিয়ান। সুতরাং যারা কুফরী ও শেরেকী করে তারা আহ্লে কিতাব হোক কিংবা আহ্লে কুরআন বা হাদীস হোক তাদের কারো মেয়েকে বিবাহ্ করা জায়েয নেই। সম্পূর্ণ নাজায়েয ও হারাম।
এ মর্মে আল্লাহ্ পাক তাঁর কালাম পাকে এরশাদ করেন,
ولا تنكحوا المشركت حتى يؤمن.
অর্থঃ- “তোমরা ঐ সকল মেয়েকে বিবাহ্ করনা যারা কুফরী-শেরেকীতে লিপ্ত। যে পর্যন্ত না তারা ঈমান গ্রহণ করে।” (সূরা বাক্বারা/২২১)
উল্লেখ্য, বর্তমানে সহীহ্ আক্বীদা ও আমল সম্পন্ন আহ্লে কিতাব আছে তবে তা অত্যন্ত নগণ্য।
অতএব, “আমভাবে আহ্লে কিতাবদের মেয়েকে বিবাহ্ করা জায়েয।” এ কথা বলা শরীয়তের খেলাফ ও কুফরী।
{দলীলসমূহঃ (১) জাস্সাস, (২) কুরতুবী, (৩) আহমদী, (৪) মাযহারী, (৫) ইবনে কাসীর, (৬) খাযেন, (৭) তাবারী, (৮) কবীর, (৯) কাশ্শাফ ইত্যদি।}
সাইয়্যিদ মুহম্মদ শহীদ, রামপুরা, ঢাকা।
সুওয়ালঃ- মৌলভী আযীমুল হক্বের পত্রিকা “রাহমানী পয়গাম” সেপ্টেম্বর/২০০০ ঈঃ সংখ্যায় নিম্নোক্ত জিজ্ঞাসা-জবাব ছাপা হয়।
জিজ্ঞাসাঃ- সাইড কাটা পাঞ্জাবী পরিধান করলে জামার সুন্নাত আদায় হবে কি? বিস্তারিত জানতে চাই। অধিকন্তু কোন ধরণের জামা পরা উত্তম- জানালে কৃতজ্ঞ হব।
জবাবঃ- পুরুষের জন্য সুন্নাত জামা হল কাঁধ থেকে পায়ের অর্ধ গোছা পর্যন্ত লম্বা হওয়া। সুতরাং সাইড কাটা পাঞ্জাবী যদি এ পরিমাণ লম্বা হয় তাহলে এর দ্বারাও সুন্নাত আদায় হবে। আর উভয়ের মধ্যে জুব্বাই উত্তম। কারণ জুব্বার দ্বারা সতর ঢাকার ব্যাপারে সতর্কতা বেশী পাওয়া যায়। তাছাড়া আলেম, মুফতী ও বিশেষ ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ অসুবিধা না থাকলে জুব্বা পরা ভাল। যাতে বিশেষ ব্যক্তিত্ব হিসেবে বুঝা যায় এবং জন সাধারণও তাদের খিদমতে দ্বীনী মাসআলা মাসায়িল জিজ্ঞেস করতে পারে।
এখন আমার সুওয়াল হলো- তারা যে লিখেছে, “সাইড কাটা বা কোণা ফাড়া পাঞ্জাবী বা কোর্তা সুন্নত।” তাদের এ কথা কতটুকু দলীলভিত্তিক। সঠিক জবাব দানে খুশী করবেন।
জাওয়াবঃ- রাহমানী পয়গামের উক্ত বক্তব্য দলীলভিত্তিক তো নয়ই বরং তা সম্পূর্ণই মিথ্যা, মনগড়া ও কুফরীমূলক হয়েছে। কারণ সাইড কাটা বা কোণা ফাড়া পাঞ্জাবী সুন্নত বলে তারা এটাই প্রমাণ করতে চেয়েছে যে, আখেরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাস্সাম, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাইড কাটা বা কোণা ফাড়া পাঞ্জাবী পরিধান করেছেন।” (নাউযুবিল্লাহ্)
এটা আল্লাহ্ পাক-এর হাবীব হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি সুস্পষ্ট “মিথ্যারোপ” বৈ কিছুই নয়। কেননা নির্ভরযোগ্য তাফসীর, হাদীস, ফিক্বাহ্, ফতওয়া ও সীরাতগ্রন্থসমূহের কোথাও তারা দেখাতে পারবে না যে, আখেরী রসূল, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাইড কাটা বা কোণা ফাড়া কোর্তা ব্যবহার করেছেন। বরং তাদের দেওবন্দী মুহাদ্দিস আছগর হোসাইন দেহলভী সাহেবই তার “গুলজারে সুন্নত” কিতাবে লিখেছে,
شكاف دار كرته جتناهى لمبى هو هركز سنت ادا نه هوكى.
অর্থাৎ- “সাইড কাটা কোর্তা (নেছফুসাক কেন) যতই লম্বা হোক না কেন তদ্বারা কস্মিনকালেও সুন্নত আদায় হবে না।”
যদি তাই হয়ে থাকে তবে কি এটাই প্রমাণিত হয় না যে, তারা আখেরী রসূল, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি মিথ্যারোপ করেছে। আর তাঁর প্রতি মিথ্যারোপ যে কুফরী ও জাহান্নামী হওয়ার কারণ এতেও কি কারো মতভেদ রয়েছে?
মূলতঃ এতে কারোই মতভেদ নেই। কারণ সহীহ্ হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে,
من كذب على متعمدا فليتبوا مقعده من النار.
অর্থঃ- “যে ব্যক্তি জেনে-শুনে স্বেচ্ছায় আমার নামে মিথ্যা বলে সে যেন দুনিয়ায় থাকতেই তার স্থান জাহান্নামে নির্ধারণ করে নেয়।”
অতএব, বলার অপেক্ষাই রাখে না যে, কোণা ফাড়া বা সাইড কাটা কোর্তাকে সুন্নত বলে তারা সুস্পষ্ট কুফরী করেছে। এর থেকে তাদের খালিছ তওবা করা ফরজ-ওয়াজিব।
মূলকথা হলো, সাইড কাটা বা কোণা ফাড়া কোর্তা বা পাঞ্জাবী সুন্নত নয়, আর সাইড কাটা পাঞ্জাবী যতই লম্বা হোক না কেন তদ্বারা কস্মিনকালেও সুন্নত আদায় হবে না। কেননা তা হিন্দুদের পোশাক। খাছ সুন্নতী কোর্তা হচ্ছে- “নেছফুসাক পর্যন্ত বিলম্বিত, কোণা বন্ধ অর্থাৎ গোল, গুটলীওয়ালা ও কলারবিহীন।” এটা হাদীস শরীফ দ্বারা প্রমাণিত।
{দলীলসমূহঃ (১) বুখারী শরীফ, (২) তিরমিযী শরীফ, (৩) আবূ দাউদ শরীফ, (৪) মিশকাত শরীফ, (৫) ফতহুল বারী, (৬) উমদাতুল কারী, (৭) এরশাদুস্ সারী, (৮) জামিউল ওসায়েল, (৯) শামায়িলে তিরমিযী, (১০) তোহফাতুল আহয়াযী, (১১) বজলুল মাজহুদ, (১২) মিরকাত, (১৩) শরহুত্ ত্বীবি, (১৪) তা’লীকুছ্ ছবীহ্, (১৫) লুময়াত, (১৬) আশয়াতুল লুময়াত, (১৭) মোযাহেরে হক্ব, (১৮) যাদুল মায়াদ, (১৯) মাদারেজুন নুবুওওয়াত, (২০) সীরাতুন্ নবী, (২১) গুলজারে সুন্নত ইত্যাদি}