মাওলানা মুহম্মদ শহীদুল ইসলাম
রঈসুল মজলিশ- আঞ্জুমানে আল বাইয়্যিনাত
পাটগ্রাম, লালমনিরহাট।
সুওয়ালঃ বোনাসের উৎপত্তি ঘটে কিভাবে? এর উদ্ভাবক কারা? এবং এর ইতিহাস কি? এর সংজ্ঞা ও প্রকারভেদ এবং অর্থ কি? রমাদ্বান শরীফে তারাবীহ্ নামায পড়িয়ে তা সূরা তারাবীহ্ হোক অথবা খতম তারাবীহ্-ই হোক ওজরতের পরিবর্তে বোনাস নেয়া বা বোনাস নেয়ার জন্য উৎসাহিত করা কতটুকু শরীয়তসম্মত?
উল্লেখ্য, এ বিষয়ে মাসিক রহমানী পয়গামের সেপ্টেম্বর/২০০০ ঈঃ সংখ্যায় উজরত গ্রহণ করাকে নাজায়েয বলা হয়েছে কিন্তু তা বোনাসের নাম দিয়ে গ্রহণ করা জায়েয বলা হয়েছে। আরো উল্লেখ্য যে, মাসিক মুহীনুল ইসলাম তথা মাসিক মদীনা সম্পাদক মাহিউদ্দীন গংরাও একই ধরণের কথা বলে থাকে। তাদের কথা কতটুকু গ্রহণযোগ্য।
জাওয়াবঃ বোনাসের উৎপত্তি ও প্রাচীন ইতিহাসঃ বোনাসের ধারণা উৎপত্তি লাভ করে আমেরিকায় জর্জ ওয়াশিংটনের মাধ্যমে এবং তা সামরিক বাহিনীর প্রায়োগিক ও প্রয়োজনীয় ক্ষেত্র থেকে। আধুনিক বিশ্বে সম্পৃক্ত অনেক প্রতিষ্ঠানেও বোনাসের ধারণা সংযুক্ত করা হয়েছে, যা সাধারণ পাওনার অতিরিক্ত দেয় মজুরী।
শিল্প বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের মধ্যে যে অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা প্রদান করা হয় সাধারণতঃ তাকে “বোনাস” বলা হয়ে থাকে। এই আর্থিক সুবিধা পুরস্কার হিসেবে বিবেচিত এবং কর্মচারীদের মূল বেতনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
১৭৭৮ সালে আমেরিকার কংগ্রেসে জর্জ ওয়াশিংটন একটি পরামর্শ দেয় যে, যারা বিপ্লবের শেষ মুহূর্তে কাজ করেছিল তাদের বোনাস দেয়ার জন্য। অফিসারদের জন্য তাদের বেতনের অর্ধেক হারে মোট সাত বছরের বেতনের সমান দেয়ার কথা বলা হয়। এবং নন কমিশন্ড অফিসারদের ৮০ ডলারের ফ্লাট বোনাস হিসেবে দেয়ার কথা বলা হয়। এ রকম ১৮৩০ সালে ভার্জিনিয়ার বিপ্লবের অভিজ্ঞ কর্মীদের ঞযব The land script আইন অনুযায়ী বিপ্লবের পুরাতন কর্মীদের বোনাস দেয়া হয়। ১৮১২ সালের যুদ্ধে স্বল্প পরিমাণে নগদ টাকা এবং ৪ মিলিয়ন একর ভূমি সৈন্যদের বোনাস হিসেবে দেয়া হয়। আমেরিকার গৃহযুদ্ধের শেষে যারা তিন বছর ধরে কাজ করেছিল তাদের ১০০ ডলার এবং যারা তার চেয়ে কম সময় ধরে কাজ করেছিল তাদের অপেক্ষাকৃত কম ডলার বোনাস দেয়া হয়।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে কারো মতে ১২ থেকে ১৫ হাজার অভিজ্ঞ সৈনিক যারা তাদের স্ত্রী-পুত্রের সাথে মিলিত হয়েছিল তারা যুদ্ধকালীন সময়ের বিভীষিকা উপশমের জন্য বোনাসের দাবী জানিয়েছিল। এ প্রেক্ষিতে কংগ্রেস ১৯২৪ সালে স্বীকৃতি দিলেও ১৯৫৪ সালের পূর্বে তাদের পূর্ণ দাবী পূরণ করেনি।
সংজ্ঞা ও প্রকারভেদঃ- বোনাস সম্পর্কে World Book এ লেখা হয়েছেঃ Bonus is a payment given in addition to what is normally due a person particularly an employee. There are two main kinds of bonuses, incentive bonuses and yearend holiday bonus. বোনাস হচ্ছে- অতিরিক্ত দেয় অংশ যা কোন ব্যক্তিকে তথা কর্মচারীকে সাধারণ ক্ষেত্রের চেয়ে বেশী দেয়া হয়। সাধারণত দু’ধরণের বোনাস রয়েছে। ইনসেনটিভ বোনাস এবং বাৎসরিক হলিডে বোনাস।” ইনসেনটিভ বোনাস হচ্ছে- উৎসাহ ব্যঞ্জক বোনাস। যা কর্মীদের কর্মতৎপরতা বৃদ্ধির জন্য দেয়া হয়। বাৎসরিক হলিডে বোনাস বা বাৎসরিক উৎসব বোনাসকে অনেক সময় ক্রীষ্ট মাস বোনাস বা বড় দিনের বোনাসও বলা হয়। এটা বাৎসরিক হিসেবে কর্মীদের দেয়া হয়। এটা অনেক সময় নির্ভর করে কর্মী যতদিন ধরে কাজ করছে তার উপর। এছাড়া অন্যান্য ডিকশনারীতে বোনাস সম্পর্কে বলা হয়েছে, An extra dividend paid to the shareholders, policyholders. “অংশীদার, বীমাকারী প্রভৃতির মধ্যে বন্টিত অতিরিক্ত লভ্যাংশ। A Share of profit paid to the employees of a firm. “কোন প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের মাঝে তাদের বেতন বাদেও লাভের যে অংশ বন্টন করে দেয়া হয়। এ সম্পর্কে Encyclopedia Americana তে লিখা হয়েছে, Bonus: A reward or gratuity beyond normai pay granted to veteras of military service “
“বোনাস হচ্ছে একটি পুরস্কার বা বকশিশ যা সাধারণভাবে প্রদেয় অর্থের অতিরিক্ত। যা সামরিক বাহিনীর অভিজ্ঞ বা পুরাতন ব্যক্তিকে দেয়া হয়।”
মোটকথা, কোন প্রতিষ্ঠানের মালিক বা কর্তৃপক্ষ তার ব্যবসায় বা কাজে লাভবান হওয়ার কারণে প্রাপ্ত লভ্যাংশ থেকে কর্মচারীদেরকে খুশী বা সন্তুষ্ট রাখার জন্য তাদের নির্ধারিত বেতন বা ভাতার অতিরিক্ত যা প্রদান করেন তারই নাম হচ্ছে “বোনাস”। আর সাধারণভাবে যে কোন প্রতিষ্ঠান তা সরকারী হোক কিংবা বে-সরকারী হোক তার যারা কর্মচারী রয়েছে তাদেরকে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বছরে কিংবা কোন উপলক্ষ্যে সন্তুষ্ট বা খুশী রাখার জন্য নির্ধারিত বেতন বা ভাতার অতিরিক্ত যে অর্থ-সম্পদ প্রদান করা হয় তাই ‘বোনাস’ নামে অভিহিত।
অতএব বুঝা গেল যে মূল বেতন বা ভাতার অতিরিক্ত প্রদেয় অংশের নাম হচ্ছে বোনাস। সুতরাং এই যদি বোনাস হয় তাহলে রমাদ্বান মাসে ‘খতমে তারাবীহ’ কিংবা ‘সূরা তারাবীহ’ পড়ানোর বিনিময়ে হাফিয, ক্বারী, মাওলানা তথা ইমাম সাহেবকে শুধুমাত্র এক মাসের জন্য নিয়োগ দিয়ে তাকে দেয় টাকা যা নির্ধারিত করা হয়নি তা কি করে বোনাস হতে পারে?
কারণ বোনাস হওয়ার বা পাওয়ার জন্য শর্ত হল কোন প্রতিষ্ঠানে চাকুরী করা এবং চাকুরীজীবীর জন্য প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ কর্তৃক একটি নিদিষ্ট বেতন বা ভাতা (আরবী ভাষায় যাকে ওজরত বলা হয়) নির্ধারিত থাকা।
আর বোনাস-এর সংজ্ঞা, অর্থ, উৎপত্তি ও ইতিহাস তাহ্ক্বীক্বের পর এটাই প্রমাণিত হয় যে, এটা বিধর্মীদের পদ্ধতি। যার দ্বারা তারা তাদের কর্মচারীদেরকে সন্তুষ্ট রাখে।
শরীয়তের ফতওয়া হচ্ছে- যা ওলামা-ই-মুতাআখ্খিরীন দিয়েছেন, তাহলো- “সময় ও স্থান নির্ধারণ করার শর্তে কুরআন শরীফ খতম করাসহ সর্ব প্রকার ইবাদতের বিণিময়ে উজরত বা পারিশ্রমিক গ্রহণ করা জায়েয ও শরীয়তসম্মত।” এটাই গ্রহণযোগ্য মত এবং এ মতের উপরই ফতওয়া। এর বিপরীত মত পোষণ করা গোমরাহী ব্যতীত আর কিছুই নয়। আল্লাহ্ পাক এরশাদ করেন,
انزلنا اليك الكتب بالحق مصدقا لما بين يديه من الكتب و مهيمنا عليه فاحكم بينهم بما انزل الله ولا تتبع اهوائهم عما جاءك من الحق لكل جعلنا منكم شرعة ومنهاجا.
অর্থঃ- “হে হাবীব! আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি সত্য কিতাব যা পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের সত্যায়ণকারী এবং সেগুলোর বিষয়বস্তুর রক্ষণাবেক্ষণকারী। অতএব, আপনি তাদের মাঝে আল্লাহ্ পাক যা নাযিল করেছেন তদানুযায়ী ফায়সালা করুন এবং আপনার কাছে যে সত্য পথ এসেছে তা ছেড়ে তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করবেন না। আমি তোমাদের প্রত্যেকের জন্য একটি বিশেষ শরীয়ত ও বিশেষ কর্মপন্থা নির্ধারণ করেছি।” (সূরা মায়িদা/৪৮)
আল্লাহ্ পাক প্রত্যেক নবী-রসূল আলাইহিস্ সালাম-এর উম্মতের হিদায়েতের উদ্দেশ্যে একটি বিশেষ শরীয়ত ও কর্মপন্থা নির্ধারণ করেছেন তবে সর্বশেষ যে শরীয়ত ও কর্মপন্থা নির্ধারণ করেছেন তাহচ্ছে- দ্বীন ইসলাম। এর মূল হচ্ছে কুরআন শরীফ। যা পূর্ববর্তী সকল শরীয়ত ও কর্মপন্থার জামে ও মুকাম্মাল এবং এটাই আল্লাহ্ পাক-এর নিকট সবচেয়ে মনোনীত ও একমাত্র পরিপূর্ণ দ্বীন হিসেবে স্বীকৃত। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক এরশাদ করেন,
ان الدين عند الله الاسلام.
অর্থঃ- “নিশ্চয়ই আল্লাহ্ পাক-এর নিকট একমাত্র দ্বীন হচ্ছে ইসলাম।” তিনি আরো এরশাদ করেন,
اليوم اكملت لكم دينكم واتممت عليكم نعمتى ورضيت لكم الاسلام دينا.
অর্থঃ- “আজকে আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে কামিল বা পরিপূর্ণ করে দিলাম এবং তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামতকে পরিপূর্ণ করে দিলাম এবং তোমাদের জন্য দ্বীন ইসলামকে মনোনীত করলাম ও এতে সন্তুষ্ট রইলাম।”
তাই এ দ্বীন ইসলামের বাইরে মনগড়া কিংবা অন্য কোন দ্বীন বা তার নিয়ম-নীতি, তর্জ-তরীক্বা গ্রহণ করা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। যদি কেউ তা করে তবে সে ক্ষতিগ্রস্থ তথা জাহান্নামী হয়ে যাবে।
এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক এরশাদ করেন,
ومن يبتغ غير الاسلام دينا فلن يقبل منه وهو فى الاخرة من الخسرين.
অর্থঃ- “যে ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া অন্য কোন দ্বীন (ধর্ম) বা তার নিয়ম-নীতি তালাশ করে তা কখনোই তার থেকে গ্রহণ করা হবেনা এবং সে পরকালে ক্ষতিগ্রস্থদের অন্তর্ভূক্ত হবে।”
এ আয়াত শরীফের প্রেক্ষিতে হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে,
وعن جابر عن النبى صلى الله عليه وسلم حين اتاه عمر فقال انا نسمع احاديث من يهود تعجبنا افترى ان نكتب بعضها فقال امتهوكون انتم كما تهوكت اليهود والنصارى؟ لقد جئتكم بها بيضاء نقية ولو كان موسى حيا ما وسعه الا اتباعى.
অর্থঃ- “হযরত জাবের রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু নবী করীম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন যে, একদিন হযরত ওমর রদিয়াল্লাহু আনহু যখন হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট এসে বললেন, “আমরা ইহুদীদের অনেক ধর্মীয় কাহিনী, কথাবার্তা, নিয়ম-কানুন ইত্যাদি শ্রবণ করে থাকি যা আমাদের নিকট ভাল লাগে। আমরা এর থেকে কিছু লিখে রাখতে পারবো কি?” তখন হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “তোমরাও কি তোমাদের দ্বীন সম্পর্কে দ্বিধাগ্রস্থ বা বিভ্রান্ত রয়েছ? যেভাবে ইহুদী-নাছারাগণ বিভ্রান্ত রয়েছে? আল্লাহ্ পাকের কসম, আমি তোমাদের নিকট সম্পূর্ণ পরিষ্কার ও পরিপূর্ণ দ্বীন এনেছি। হযরত মুসা আলাইহিস্ সালামও যদি এখন জমিনে থাকতেন তাহলে তাঁকেও আমার অনুসরণ করতে হতো।” (আহ্মদ, বায়হাক্বী)
সুতরাং উপরোক্ত আয়াত শরীফ ও হাদীস শরীফ হতে বুঝা গেল যে, দ্বীন ইসলাম তথা কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াস ছাড়া অন্য কোন বিজাতীয় ও বিধর্মীয়পন্থা অনুসরণ করা সম্পূর্ণ হারাম ও কুফরী।
তাই শরীয়তে শরয়ী পরিভাষাগত কোন শব্দ থাকা সত্বেও তার পরিবর্তে কোন বেদ্বীনি ও বদ্দ্বীনি শব্দ ব্যবহার করা শরীয়তে গ্রহণযোগ্য নয়। অর্থাৎ শরীয়তের কোন বিষয়ে যোগ্য সমাধান বা ফায়সালা মওজুদ থাকা সত্বেও সে বিষয়ে বিধর্মীদের দ্বারা প্রবর্তিত পদ্ধতি গ্রহণ করা যাবে না। এ সম্পর্কে আল্লাহ্ পাক কালামে পাকে এরশাদ করেন,
يايها الذين امنوا لا تقولوا راعنا وقولوا انظرنا واسمعوا وللكفرين عذاب اليم.
অর্থঃ- “হে ঈমানদারগণ! তোমরা “রয়িনা” বলনা বরং “উংযুরনা” বল এবং শ্রবণ কর আর কাফিরদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি।” (সূরা বাক্বারা/ ১০৪)
বর্ণিত আয়াত শরীফের দ্বারা এ মাসয়ালা বর্ণনা করা হয়েছে যে, কোন মুসলমানের জন্য ভাল ও উত্তম অর্থবোধক শব্দ থাকা সত্তেও¡ মন্দ ও অপছন্দনীয় অর্থবোধক শব্দ ব্যবহার করা জায়েয নেই এবং বিশেষ করে যে সকল শব্দ বিধর্মীদের খাছ শেয়ারের অন্তর্ভূক্ত তা ব্যবহার করা সম্পূর্ণ নাজায়েয, হারাম ও কুফরীর অন্তর্ভূক্ত।
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে,
عن عبد الله بن عمر رضى الله عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم من تشبه بقوم فهو منهم.
অর্থঃ- “হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে ওমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত আছে, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি যে সম্প্রদায়ের সাথে মিল রাখে, সে তাদের দলভূক্ত এবং তার হাশর-নশর তাদের সাথেই হবে।” (মসনদে আহমদ, সুনানে আবূ দাউদ)
এই হাদীস শরীফ প্রসঙ্গে নিম্নলিখিত ঘটনা উল্লেখ করা হয়- হিন্দুস্থানে আল্লাহ্ পাক-এর একজন জবরদস্ত ওলী ছিলেন। তাঁর ইন্তিকালের পর অন্য একজন বুযুর্গ ব্যক্তি তাকে স্বপে¦ দেখে জিজ্ঞেস করেন, “হে আল্লাহ্ পাক-এর ওলী, আপনি কেমন আছেন?” তখন সেই আল্লাহ্ পাক-এর ওলী জাওয়াবে বললেন, “আপাতত আমি ভালই আছি, কিন্তু আমার উপর দিয়ে এক কঠিন সময় অতিবাহিত হয়েছে যা বলার অপেক্ষা রাখে না। আমার ইন্তিকালের পর আমাকে ফিরিশ্তারা সরাসরি আল্লাহ্ পাকের সম্মুখে পেশ করেন।” আল্লাহ্ পাক ফিরিশতাদেরকে বলেন, “হে ফিরিশ্তারা! তোমরা তাকে এখানে কেন নিয়ে এসেছ?” ফিরিশ্তারা বললেন, “আয় আল্লাহ্ পাক! আমরা তাকে খাস বান্দা হিসেবে আপনার সাথে সাক্ষাত করার জন্য নিয়ে এসেছি। এ কথা শ্রবণ করে আল্লাহ্ পাক বললেন, তাকে এখান থেকে নিয়ে যাও, তার হাশর-নশর হিন্দুদের সাথে হবে, কেননা সে পূঁজা করেছে।” “এ কথা শুনে আমি ভয় পেয়ে গেলাম এবং আমার সমস্ত শরীর ভয়ে কাঁপতে লাগল। তখন আমি আল্লাহ্ পাক-এর নিকট আরজু পেশ করলাম, “আয় আল্লাহ্ পাক! আমার হাশর-নশর হিন্দুদের সাথে হবে কেন? আমি তো সব সময় আপনার এবং হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ফরমাবরদার ছিলাম। কখনও ইচ্ছাকৃত নাফরমানি করিনি এবং পূঁজা করাতো দূরের কথা কখনো মন্দিরের নিকটবর্তীও হইনি।” তখন আল্লাহ্ পাক বললেন, “তুমি সেদিনের কথা স্মরণ কর, যেদিন হিন্দুস্থানে হোলি পূঁজা হচ্ছিল। তুমি হিন্দুস্থানের উপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলে, তখন তোমার সামনে-পিছনে, ডানে-বায়ে, উপরে-নীচে সমস্ত গাছ-পালা, তরু-লতা, পশু-পাখী, কীট-পতঙ্গ যা কিছু ছিলো সবকিছুকেই রঙ দেয়া হয়েছিল। এমতাবস্থায় তোমার সামনে দিয়ে একটি গর্দভ যাচ্ছিল যাকে কোন রঙ দেয়া হয়নি। তখন তুমি পান চিবাচ্ছিলে, তুমি সেই গর্দভের গায়ে এক চিপটি পানের রঙীন রস নিক্ষেপ করে বলেছিলে, “হে গর্দভ! তোমাকে তো কেউ রঙ দেয়নি এই হোলি পূঁজার দিনে আমি তোমাকে রঙ দিয়ে দিলাম।” এটা কি হোলি পূঁজার শামিল হয়নি? তুমি কি জান না, আমার হাবীব হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, من تشبه بقوم فهو منهم.
অর্থঃ- “যে ব্যক্তি যে সম্প্রদায়ের সাথে মিল রাখে, সে তাদের অন্তর্ভূক্ত এবং তার হাশর-নশর তাদের সাথে হবে।” সুতরাং তোমার হাশর-নশর হিন্দুদের সাথে হওয়া উচিৎ ছিল। “যখন আল্লাহ্ পাক এই কথা বললেন, তখন আমি লা জাওয়াব হয়ে গেলাম এবং ভীত-সন্ত্রন্ত হয়ে বললাম, “আয় আল্লাহ্ পাক! আমি এটা বুঝতে পারিনি, আমাকে কেউ বুঝিয়ে দেয়নি এবং আমার অন্তরও সাড়া দেয়নি। আমি তখন কাকুতি-মিনতি সহকারে রোনাজারী, আহাজারী ও কান্নাকাটি করতে লাগলাম।”
কিছুক্ষণ পর আল্লাহ্ পাক বললেন, “ঠিক আছে, তোমাকে অন্যান্য আমলের কারণে ক্ষমা করা হলো।”
এ প্রসঙ্গে বনী ইসরাঈল যুগের অনুরূপ আরও একটি ওয়াকেয়া তফসীরে উল্লেখ করা হয়। আল্লাহ্ পাক হযরত ইউশা বিন নুন আলাইহিস্ সালাম-এর উপর ওহী নাযিল করলেন, “হে আমার নবী! আপনার উম্মতের মধ্যে এক লক্ষ লোককে ধ্বংস করে দেয়া হবে, যার মধ্যে ৬০ হাজার লোক সরাসরি গুণাহে লিপ্ত (গোমরাহ)।” তখন হযরত ইউশা বিন নুন আলাইহিস্ সালাম বললেন, “আয় আল্লাহ্ পাক! ৬০ হাজার লোক সরাসরি গুণাহে লিপ্ত তাই তাদের ধ্বংস করে দেয়া হবে, কিন্তু বাকী ৪০ হাজার লোককে ধ্বংস করা হবে কেন?” তখন আল্লাহ্ পাক বললেন, “যেহেতু তারা ঐ গুণাহে লিপ্ত লোকদের সাথে মিলা-মিশা ও ওঠা-বসা করে এবং সম্পর্ক রাখে আর গুণাহ্র কাজে বাধা দেয় না, তাই তাদেরকেসহ ধ্বংস করে দেয়া হবে।”
উপরোক্ত আয়াত শরীফ, হাদীস শরীফ এবং তার ব্যাখ্যার দ্বারা এটাই সাবেত হলো যে, বিজাতীয় বিধর্মীদের কোন নিয়ম-নীতি, আমল-আখলাক ও সীরত-সূরত ইত্যাদি কোনটাই যেমন অনুসরণ-অনুকরণ করা যাবে না তেমন কোন শব্দও ব্যবহার করা যাবে না বা আমলও করা যাবেনা। যদি কেউ করে তবে তার থেকে সেটা আল্লাহ্ পাক গ্রহণ করবেন না বা কোন ছাওয়াবও দেবেন না এবং আল্লাহ্ পাকের তরফ থেকে কোন মদদও সে পাবেনা। যার ফলে সে ইহ্কালে ও পরকালে ক্ষতিগ্রস্থ হবে এবং পরকালে তার হাশর-নশর তাদের সাথেই হবে যাদেরকে সে অনুসরণ করত।
উল্লেখ্য, আমাদের সমাজে কিছু ওলামায়ে “ছু” রয়েছে যারা ইসলামী পরিভাষাগত শব্দ ব্যবহার না করে বিধর্মীদের দ্বারা রচিত শব্দ ও পদ্ধতি ব্যবহার করাকে বেশী পছন্দ করে। যেমন, মুসলমান না বলে মৌলবাদী ব্যবহার করে থাকে। কুরআন-সুন্নাহ্র আইন না চেয়ে ব্লাসফেমী আইন তলব করে থাকে। ইসলামী শব্দ ব্যবহার না করে লংমার্চ ব্যবহার করে থাকে।
প্রকৃতপক্ষে এটা বিধর্মীদের একটি চক্রান্ত। এর মাধ্যমে তারা মুসলমানদেরকে ঈমান, ইসলাম ও মুসলমানিত্ব থেকে সরিয়ে দিতে চায়। আর এদেরই সহযোগী হচ্ছে- ওলামায়ে “ছূ” যারা এ সমস্ত বিষয়গুলো তাদের পক্ষ হয়ে প্রচার-প্রসার করে থাকে।
যেমন, বাদশাহ্ আকবরের সময় সে সময়কার নামকরা বিখ্যাত তথাকথিত ছুফী-দরবেশ, পীর, মোল্লা মোবারক নাগোরী ও তথাকথিত কুখ্যাত আলিম আবুল ফজল ও ফয়জী যারা বাদশাহ্ আকবরকে ওয়াস্ওয়াসা দিয়ে, তাকে নবী বানিয়ে, তার প্রতি কিতাব নাযিল করিয়ে তার দ্বারা নতুন ধর্ম প্রবর্তন করায়। যার নাম দেয় তারা দ্বীনে ইলাহী। এবং এ দ্বীনে ইলাহীর অনুসারীদের নাম দেয় “চেলা”। অর্থাৎ মুসলমানদের ঈমান, ইসলাম ও মুসলমানিত্ব বাদ দিয়ে ইসলামের পরিবর্তে দ্বীনে ইলাহীর অনুসরণকারী আর মুসলমান-এর পরিবর্তে ‘চেলা’ বলে পরিচিত করার কোশেশ করে।
বর্তমানেও ওলামায়ে “ছূ”রা সেই আবুল ফজল, ফয়জী, মোল্লা মোবারক নাগোরীর উত্তরসূরী হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে।
অতএব, বোনাস শব্দ ব্যবহার না করে উজরত বা হাদিয়া ব্যবহার করতে হবে।
আর বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, যেসব ওলামায়ে ‘ছু’ বোনাস গ্রহণ করে এটা জাহির করতে চায় যে, তারা ওজরত নিচ্ছে, না, বোনাস নিচ্ছে সেটা তাদের জঘণ্য প্রতারণা। কারণ বোনাস মূল ওজরতের বর্ধিত অংশ। কাজেই বোনাস গ্রহণ মানেই হচ্ছে মূল বেতন বা ওজরত তো গ্রহণ বটেই বরং সে মূল ওজরতের উপর ভিত্তি করে তার চেয়েও বর্ধিত পরিমাণে ওজরত গ্রহণ করা। কাজেই ওলামায়ে ‘ছু’দের বোনাসের নামে এই প্রতারণা হতে সকলেরই সচেতন হওয়া উচিৎ।
(দলীলসমূহঃ- (১) তাফসীর আহকামুল কুরআন, (২) জাস্সাস, (৩) কুরতুবী, (8) রুহুল মায়ানী, (৫) মাযহারী, (৬) ইবনে – কাছীর, (৭) খাযেন, (৮) বাগবী, (৯) তাবারী, = (১০) রুহুল বয়ান, (১১) Encyclopadja – Britanica, (১২) Encyclopedia Americana, (১৩) The World Book, (১৪) Fung’s Wagnals Encyclopedia, (১৫) Macmilan – Encyclopedia, (১৬) Lexicon Encyclopedia, (১৭) Grolier Encyclopedia. ইত্যাদি }
হাফেজ মুহম্মদ কবীর হুসাইন
সভাপতি- আঞ্জুমানে আল বাইয়্যিনাত
মাধবদী, নরসিংদী।
সুওয়ালঃ মৌলভী আজিজুল হকের অখ্যাত পত্রিকার অক্টোবর/২০০০ঈঃ সংখ্যায় জিজ্ঞাসার জবাব বিভাগে একটি জিজ্ঞাসার জবাবে বলা হয়েছে, “শরীয়তে প্রচলিত মীলাদের কোন অস্তিত্ব নাই সুতরাং দাঁড়িয়ে কেয়াম করারতো প্রশ্নই উঠেনা। এগুলোকে শরীয়তের বিধান মনে করা বিদ্আত ও নাজায়িয।”
আর মৌলভী মাহিউদ্দিন তার মাসিক মদীনা নভেম্বর ২০০০ ঈঃ সংখ্যায় প্রশ্নোত্তর বিভাগে এক প্রশ্নের উত্তরে বলেছে, “বর্তমানে প্রচলিত নিয়মে…. যে মিলাদ পড়া হয় এবং মিলাদে যে কিয়াম করা হয় শরীয়তে এর কোন ভিত্তি নেই।”
আর হাটহাজারী মাদ্রাসা থেকে মৌলভী আহমক শফীর সম্পাদনায় প্রকাশিত অখ্যাত পত্রিকার অক্টোবর/২০০০ঈঃ সংখ্যায় জিজ্ঞাসা-সমাধান বিভাগে এক জিজ্ঞাসার সমাধানে বলা হয়েছে, “সম্মিলিতভাবে উচ্চস্বরে দরুদ শরীফ পাঠ করা, যা প্রচলিত মীলাদ মাহফিলগুলোতে পরিলক্ষিত হয় তা হাদীস দ্বারা প্রমাণিত নয় বিধায় বিদ্আত ও নাজায়েয।”
এখন আমার সুওয়াল হলো- মীলাদ-ক্বিয়াম সম্পর্কে উক্ত অখ্যাত পত্রিকাগুলোর উক্ত বক্তব্য সঠিক হয়েছে কি? আর সত্যিই কি প্রচলিত মীলাদের কোন অস্তিত্ব শরীয়তে নেই? অথচ আমরা “মাসিক আল বাইয়্যিনাত”-এর মাধ্যমে জানতে পেরেছি, প্রচলিত মীলাদ-ক্বিয়াম শরীয়তসম্মত একটি ইবাদত। দয়া করে সঠিক জাওয়াব দানে বাধিত করবেন।
জাওয়াবঃ “মীলাদ-ক্বিয়াম” সম্পর্কে “মাসিক আল বাইয়্যিনাত”-এর মাধ্যমে যা জানতে পেরেছেন তাই সঠিক ও দলীলভিত্তিক। মৌলভী আজিজুল হক, মৌলভী মাহিউদ্দিন ও হাটহাজারী মাদ্রাসার মৌলভী আহমক শফীর অখ্যাত পত্রিকাগুলোর “মীলাদ-ক্বিয়াম” সম্পর্কে উক্ত বক্তব্য যে সম্পূর্ণ ভুল, মনগড়া, মিথ্যা ও দলীলবিহীন এবং অনুসরণীয় ইমাম-মুজতাহিদ ও ফক্বীহ্গণের সর্বজনমান্য ও স্বীকৃত বিশ্ববিখ্যাত ফিক্বাহ্ ও ফতওয়ার কিতাব সমূহের বক্তব্যের বিপরীত ও বিরুদ্ধমত তা ইতোপূর্বে আমাদের “মাসিক আল বাইয়্যিনাত”-এর অনেক সংখ্যায় খন্ডন করে সঠিক ও দলীলভিত্তিক জবাব দেয়া হয়েছে। আমাদের উক্ত খন্ডনের জবাবকে খন্ডন করা মৌলভীদের পক্ষে আদৌ সম্ভব হয়নি, হবেও না ইনশাআল্লাহ্।
দ্বিতীয়তঃ আমাদের “গবেষণা কেন্দ্র মুহম্মদিয়া জামিয়া শরীফ, রাজারবাগ শরীফ-এর পক্ষ থেকে মীলাদ-ক্বিয়াম বিরোধীতাকারীদের প্রতি চ্যালেঞ্জ দেয়া হয় যে, “কেউ যদি কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াস দ্বারা মীলাদ-ক্বিয়াম নাজায়েয প্রমাণ করতে পারে তাহলে তাকে দুই হাজার পাউন্ড পুরস্কার দেয়া হবে।”
কিন্তু এখন পর্যন্ত মীলাদ-ক্বিয়াম বিরোধীতাকারীরা মুহম্মদিয়া জামিয়া শরীফের সে চ্যালেঞ্জ গ্রহণের হিম্মত দেখাতে সমর্থ হয়নি, হবেওনা ইনশাআল্লাহ্।
এরপরেও মৌলভী আজিজুল হক, মৌলভী মাহিউদ্দিন ও মৌলভী আহমক শফী এবং তাদের সকল সমজাতীয়রা বারবার মীলাদ ক্বিয়াম সম্পর্কে বিনা তাহক্বীকে ও বিনা দলীলে উক্ত ভুলেরই পুনরাবৃত্তি করে যাচ্ছে।
উল্লেখ্য, তারা বলেছে, “শরীয়তে প্রচলিত মীলাদের কোন অস্তিত্ব বা ভিত্তি নাই।” …..
এ বক্তব্যের জবাবে বলতে হয় যে, আসলে শরীয়ত কাকে বলে? এই জ্ঞানটুকুও এই মৌলভীদের নেই।
কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াসের সমষ্টিই হচ্ছে শরীয়ত। উল্লিখিত চারটির যে কোন একটির মধ্যে থাকার অর্থই হলো শরীয়তের মধ্যে থাকা। আমরা আমাদের মাসিক আল বাইয়্যিনাতের ২৮, ৩৬, ৪০, ৪৭ তম সংখ্যায় কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ, তাফসীর ও ফিক্বাহ্র অসংখ্য কিতাবের দলীল-আদিল্লা দ্বারা বিস্তারিতভাবে প্রমাণ করেছি যে, “প্রচলিত মীলাদ-ক্বিয়াম সুন্নতে উম্মত মুস্তাহ্সান, জায়েয তো বটেই।
তারা আরো বলেছে, “দাঁড়িয়ে ক্বিয়াম করার তো প্রশ্নই উঠেনা।”
অথচ মীলাদ শরীফের মধ্যে দাঁড়িয়ে ক্বিয়াম করাও সুন্নতে উম্মত মুস্তাহ্সান। যেমন, “ইক্বদুল জাওয়াহির” কিতাবের ২৯ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে যে,
قد استحسن القيام عند ذكر ولادته الشريفة صلى الله عليه وسلم ائمة ذو رواية ودراية.
অর্থঃ- “সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জন্মবৃত্তান্ত আলোচনাকালে ক্বিয়াম করাকে বিচক্ষণ ইমামগণ মোস্তাহ্সান বা মোস্তাহাব বলেছেন।”
“ইশবাউল কালাম” কিতাবের ৫৪নং পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে যে,
قد اجمعت الامة المحمدية من الاهل السنة والجماعة على استحسان القيام المذكور وقال عليه السلام لا تجتمع امتى على الضلالة.
অর্থঃ- “উম্মতে মুহম্মদীর আহ্লে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের সকল আলিমগণ মীলাদ শরীফের ক্বিয়াম মোস্তাহ্সান হওয়ার ব্যাপারে ইজ্মা বা ঐক্যমত পোষণ করেন। আর সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আমার উম্মত (আলিমগণ) কখনোই গোমরাহীর উপর একমত হবেনা।”
তাছাড়া মাওলানা আশরাফ আলী থানভী, গাঙ্গুহী সাহেবসহ সকল ওলামায়ে দেওবন্দের পীর ও মুর্শিদ শায়খুল আরব ওয়াল আ’যম, আল্লামা হাজী এমদাদুল্লাহ্ মুহাজিরে মক্কী রহমতুল্লাহি আলাইহি স্বয়ং নিজেই মীলাদ-ক্বিয়াম করেছেন, যা তিনি তাঁর “হাফ্তে মাসায়েল” কিতাবে উল্লেখ করেছেন।
বড় কাটরা ও লালবাগ মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা, মুজাহিদে আ’যম, খাদিমুল ইসলাম, হযরত মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী রহমতুল্লাহি আলাইহি ক্বিয়াম সম্পর্কে তাঁর “তাছাউফ তত্ত্ব” কিতাবে লিখেন যে, মীলাদ শরীফের মধ্যে ক্বিয়াম করা আদব, শরাফত বা ভদ্রতা।
সুতরাং প্রমাণিত হলো, প্রচলিত মীলাদ ক্বিয়ামের অস্তিত্ব বা ভিত্তি শরীয়তে আছে বিধায় আল্লামা হাজী এমদাদুল্লাহ্ মুহাজিরে মক্কী রহমতুল্লাহি আলাইহি স্বয়ং নিজেই মীলাদ ক্বিয়াম করেছেন।
আর মৌলভী আহমক শফী তার অখ্যাত পত্রিকায় বলেছে, “সম্মিলিতভাবে উচ্চস্বরে দরুদশরীফ পাঠ করা যা প্রচলিত মীলাদ মাহ্ফিলগুলোতে পরিলক্ষিত হয় তা হাদীস দ্বারা প্রমাণিত নয় বিধায় বিদ্আত ও নাজায়েয।”
মৌলভী আহমক শফীর এ বক্তব্য ডাহা মিথ্যা ও দলীলবিহীন। কারণ সম্মিলিতভাবে দরুদশরীফ পাঠ করা হাদীস শরীফ দ্বারাই প্রমাণিত। যা প্রচলিত মীলাদ মাহ্ফিলগুলোতে পাঠ করা হয়।
যেমন, হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে,
قال النبى صلى الله عليه وسلم اذا جلس قوم يصلون على حفت بهم الملئكة من لدن اقدامهم الى عنان السماء باليديهم قراطيس الفضة واقلام الذهب يكتبون الصلات على النبى صلى الله عليه وسلم ويقولون زيدوا زادكم الله.
অর্থঃ- সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “যখন কোন সম্প্রদায় একত্রিত হয়ে বসে এবং সম্মিলিতভাবে আমার প্রতি ছলাত (দরূদ শরীফ) পাঠ করে, তখন ফেরেশ্তাগণ তাদের পা থেকে আকাশ পর্যন্ত বেষ্টন করে নেন। তাদের হাতে থাকে রূপার কাগজ ও সোনার কলম। যার দ্বারা তারা ছলাতের (দরূদ শরীফের) ছাওয়াব লিখতে থাকেন এবং বলেন, তোমরা আরো অধিক মাত্রায় ছলাত পাঠ কর, আল্লাহ্ পাক তোমাদের উন্নত করবেন।” (দুররুল মুনাজ্জাম, কাশফুল গুম্মাহ্)
অন্য হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে,
عن ابن عمر رضى الله عنهما. قال النبى صلى الله عليه وسلم زينوا مجالسكم بالصلوة على فان صلاتكم على نورلكم يوم القيامة.
অর্থঃ- হযরত ইবনে ওমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “তোমাদের মজলিসকে আমার প্রতি ছলাত (দরূদ শরীফ) পাঠের দ্বারা সুসজ্জিত কর। কারণ তোমাদের ছলাত (দরূদ শরীফ) পাঠ ক্বিয়ামতের দিন তোমাদের জন্যে নূরে পরিণত হবে।” (দায়লামী শরীফ)
হাদীস শরীফের উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা প্রমাণিত হলো যে, সম্মিলিতভাবে মজলিসে বা মাহ্ফিলে ছলাত বা দরূদ শরীফ পাঠ করা অত্যন্ত ফযীলতের কাজ। শরীয়ত সম্মত তো অবশ্যই। তাই প্রচলিত মীলাদ শরীফের মজলিসে বা মাহ্ফিলের মধ্যে সম্মিলিতভাবে ছলাত বা দরূদ শরীফ পাঠ করা হয়।
অতএব প্রমাণিত হলো- প্রচলিত মীলাদ-ক্বিয়াম সম্পর্কে মৌলভী আজিজুল হক, মৌলভী মাহিউদ্দিন ও হাটহাজারী মাদ্রাসার মৌলভী আহমক শফীর উক্ত বক্তব্য শরীয়তের দৃষ্টিতে পরিপূর্ণভাবে বর্জনীয়। কারণ এদের মত কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াসের সম্পূর্ণ বিপরীত হয়েছে। কেননা মীলাদ-ক্বিয়াম শরীয়তসম্মত একটি ইবাদত অথচ মৌলভীরা বলেছে নাজায়েয। সুতরাং এ ধরণের বিভ্রান্তিকর পত্রিকা পাঠ করা থেকে বিরত থাকা প্রত্যেক মুসলমানদের জন্য ওয়াজিব।
বিঃ দ্রঃ মীলাদ-ক্বিয়াম সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হলে আমাদের মাসিক আল বাইয়্যিনাত পত্রিকার ২৮, ৩৬, ৪০, ৪৭তম সংখ্যাগুলো পাঠ করুন।
মুহম্মদ মশীউজ্জামান,
পানি উন্নয়ন বোর্ড, চট্টগ্রাম।
সুওয়ালঃ মাসিক আল বাইয়্যিনাত ৮৫তম সংখ্যায় “সুওয়াল- জাওয়াব” বিভাগে এক জাওয়াবের পরিপ্রেক্ষিতে মাসিক তরজুমান সেপ্টেম্বর/২০০০ ঈঃ সংখ্যায় প্রশ্নোত্তর বিভাগে নামাজে দু’সিজদার মধ্যে দোয়া পাঠ করা সম্পর্কে যে বক্তব্য প্রদান করেছে তা কতটুকু সত্য? দয়া করে জানিয়ে বাধিত করবেন।
জাওয়াবঃ- মাসিক তরজুমানের উক্ত উত্তরটি সম্পূর্ণ অশুদ্ধ, মিথ্যা, প্রতারণামূলক, জালিয়াতি, ধোকাপূর্ণ, ইবারতচুরি, অনুবাদে ভুল এবং এ ধরণের “প্রায় ৩৫টি ত্রুটিতে ত্রুটিপূর্ণ থাকায় মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়।”
উক্ত বিবিধ ত্রুটিপূর্ণ উত্তরটি নির্ভরযোগ্য দলীলের ভিত্তিতে খন্ডন করে তার সহীহ জাওয়াব ধারাবাহিকভাবে পেশ করা হচ্ছে।
(ধারাবাহিক)
১৭. তারা বলেছে, এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার পর খাতেমুল মোহাক্কেকীন ইমাম ইবনে আবেদীন শামী হানাফী (রাঃ) বলেন,
اذ لو كان مكروها لنهى عنه ………………….
তরজুমান গংদের নিকট এখন প্রশ্ন হলো- কোন্ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার পর ইবনে আবেদীন শামী এ কথা বলেছেন? তাদের জুলাই-আগষ্ট/২০০০ ঈঃ সংখ্যার তরজুমানে উল্লিখিত “আল্লাহুম্মার যুকনী ওয়ার হামনী ওয়াশ্ফাআনী ওয়াহ্দিনী” দোয়াটির বিষয়ে?
অথবা, তাদের সেপ্টেম্বর/২০০০ ঈঃ সংখ্যার তরজুমানে উল্লিখিত-
اللهم اغفرلى وارحمنى واهدنى وعافنى وارزقنى.
এই সম্পূর্ণ দোয়াটির বিষয়ে?
অথবা দুই সিজদার মাঝখানে মাসনুন কোন যিকির নেই, এ বিষয়ে আলোচনার পর ইবনে আবেদীন শামী اذ لو كان مكروها لنهى عنه …………
বলেছেন?
যদি তরজুমান গংরা বলে যে, আমাদের তরজুমানে জুলাই-আগষ্ট ২০০০/ঈঃ সংখ্যার উল্লিখিত দোয়াটি অথবা সেপ্টেম্বর/২০০০ ঈঃ সংখ্যার দোয়াটি আলোচনার পর ইবনে আবেদীন শামী
اذ لو كان مكروها لنهى عنه …………
এ কথা বলেছেন।
তাহলে তার দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, তরজুমান গংরা সত্যিকারের দাজ্জালে কাজ্জাবের চেলা এবং তারাই প্রকৃতপক্ষে বড় প্রতারক। কারণ ইবনে আবেদীন শামী তাদের তরজুমানে উল্লিখিত সম্পূর্ণ দোয়াগুলো আলোচনার পর
اذ لو كان مكروها لنهى عنه …………
বলেননি। (ইবারতসহ বিস্তারিত দলীলের অপেক্ষায় থাকুন)
আর যদি তরজুমান গংরা স্বীকার করে নেয় বা মেনে নেয় যে, দুই সিজদার মাঝখানে মাসনুন কোন যিকির নেই। এরই ব্যাখ্যায় শুধুমাত্র اللهم اغفرلى পড়া যাবে। এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার পর ইবনে আবেদীন শামী।
اذ لو كان مكروها لنهى عنه …………
বলেছেন।
তাহলে এর জবাব হলো যে, মাসিক আল বাইয়্যিনাত-এ তো একথা বলা হয়নি যে, ফরয নামাযের দুই সিজদার মাঝে اللهم اغفرلى পড়া যাবে না। বরং মাসিক আল বাইয়্যিনাত এ বলা হয়েছে, তরজুমানে উল্লিখিত দোয়াটি অর্থাৎ “আল্লাহুম্মার যুকনী ওয়ার হামনী ওয়াশফাআনী ওয়াহ্দিনী” দোয়াটি ফরয নামাযের দুই সিজদার মাঝখানে পড়া যাবে না। তবে ফরয নামাযে শুধুমাত্র اللهم اغفرلى পড়া যাবে। আর সেটাই ইবনে আবেদীন শামী বলেছেন, اللهم اغفرلى মাকরূহ নয়। মাকরূহ হলে নিষেধ করতেন এবং اللهم اغفرلى পড়াও মাসনুন নয়, তবে জায়েয। সুতরাং এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার পর …..। একথা বলে তারা ১৭তম জালিয়াতি ও প্রতারণা করেছে।
১৮. তারা শামী কিতাবের اللهم اغفرلى পড়া সম্পর্কিত ইবারতটি কারচুপি করে সম্পূর্ণ উল্লেখ করেনি। কারণ اللهم اغفرلى সম্পর্কিত সম্পূর্ণ ইবারতটি উল্লেখ করলে তাদের মুখোশ ও হাক্বীক্বত উন্মোচিত হতো। এটা তাদের ১৮তম জালিয়াতি ও প্রতারণা।
১৯. তারা শামী কিতাবের ইবারতের অর্থে বলেছে, “দুই সাজদার মাঝখানে এবং রুকু থেকে দাঁড়ানোর পর মাগফিরাতের দোয়া করা।”
অথচ উক্ত অর্থগুলো তাদের তরজুমানে উল্লিখিত শামী কিতাবের ইবারতের অর্থ নয়। যদি ধরে নেয়া যায় যে, তারা পূর্বের ইবারতের অর্থের উপর ভিত্তি করে অর্থগুলো করেছে।
তাহলে এর জবাব হলো, এখানেও তারা প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছে। কারণ পূর্বের ইবারতে (মাগফিরাত) مغفرة শব্দের কোনই উল্লেখ নেই। বরং পূর্বের ইবারতে استغفار (ইস্তিগফার) শব্দের উল্লেখ আছে। আর استغفار দ্বারা اللهم اغفرلى কে বুঝানো হয়েছে।
আর তারা যদি পূর্বের ইবারতের অর্থের উপর ভিত্তি করে অর্থগুলো করতে পারে, তাহলে ‘মাগফিরাত’ শব্দের সঠিক অর্থ করলো না কেন? কেননা, তারা যদি মাগফিরাত শব্দের সঠিক অর্থ করে তাহলে তাদের হাক্বীক্বত ও তাদের মুখোশ জনগণের সামনে উন্মোচিত হবে। কারণ মাগফিরাত শব্দের অর্থ দ্বারা ইবনে আবেদীন শামী কে বুঝিয়েছেন। তারা শামী কিতাবের ইবারতের অর্থে কারচুপি করেছে, এটা তাদের ১৯তম জালিয়াতি ও প্রতারণা।
২০. তারা শামী কিতাবের ইবারতের অর্থ ভুল করেছে এবং মনগড়াভাবে অর্থ করেছে। সঠিক অর্থ করতে ব্যর্থ হয়েছে। যেমন, ভুল অর্থগুলোর মধ্যে বিশেষ ভুল হলো, তারা বলেছে, “তবে এটা (ফরজ নামাযে) দুই সিজদার মাঝখানে দোয়া পড়া মাসনুন বা সুন্নাত হিসাবে সাব্যস্ত না হওয়ার প্রমাণ নয়।”
অথচ তাদের এ বক্তব্য প্রমাণ করে যে, এটা ফরয নামাযে মাসনুন বা সুন্নত। অথচ সঠিক অর্থ হবে, উহা মাসনুন বা সুন্নত নয়। যেটা মাসনুন বা সুন্নত নয় সেটাকে মাসনুন বা সুন্নত প্রমাণ করার অপচেষ্টা। এটা তাদের ২০তম জালিয়াতি ও প্রতারণা।
২১. তারা শামী কিতাবের ইবারতের অর্থে ফরয নামাযের কথাটা প্রথম বন্ধনীর মধ্যে রেখে প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছে।
অথচ প্রতারণা করার কোনই প্রয়োজন নেই। কারণ ফরজ নামাযে মাগফিরাতের দোয়া অর্থাৎ শুধুমাত্র اللهم اغفرلى পড়াকে আল বাইয়্যিনাতে অবৈধ বলা হয়নি বরং বলা হয়েছে তরজুমান জুলাই-আগষ্ট’ ২০০০ঈং সংখ্যায় প্রশ্নোত্তর বিভাগে উল্লিখিত “আল্লাহুম্মারযুকনী ওয়ারহামনী ওয়াশ্ফাআনী ওয়াহদিনী”এই দোয়াটি আমাদের হানাফী মাযহাব মোতাবিক ফরজ নামাযের দুই সিজদার মাঝে পড়া যাবেনা। বরং উক্ত দোয়াটি শুধুমাত্র নফল নামাযের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। ফরজ নামাযে উক্ত দোয়াটি পড়লে সাহুসিজদা ওয়াজিব হবে। তারা ফরজ নামাযের কথাটা প্রথম বন্ধনীর মধ্যে রেখে প্রতারণা করেছে। ইহা তাদের ২১তম জালিয়াতি ও প্রতারণা। (চলবে)
মুহম্মদ আলী হায়দার
বহদ্দারহাট, চট্টগ্রাম।
সুওয়ালঃ মাসিক তরজুমান নভেম্বর/২০০০ঈঃ সংখ্যার ৪৭ পৃষ্ঠায় রদ্দুল মুহতার, মেরাত ও মালাবুদ্দা মিনহু কিতাবের বরাত দিয়ে লিখেছে,
اللهم اغفرلى وارحمنى واهدنى وعافنى وارزقنى.
দোয়াটি ফরজ নামাযে জায়েয। আর আপনারা মাসিক আল বাইয়্যিনাতে লিখেছেন, ফরয নামাযে শুধু اللهم اغفرلى পড়তে হয়। কোনটি সঠিক দয়া করে জানাবেন।
জাওয়াবঃ দুই সিজদার মাঝখানে দোয়াটি পড়া সম্পর্কে মাসিক আল বাইয়্যিনাতে যা লিখা হয়েছে তাই সঠিক ও দলীলভিত্তিক। উক্ত দোয়াটি পড়া সম্পর্কে মাসিক তরজুমানের বক্তব্যকে আমরা দলীলের মাধ্যমে খন্ডন করে দিয়েছি। কিন্তু আমাদের উক্ত খন্ডনের জবাবে তারা কিছুই লিখতে পারেনি। বরং তরজুমান গংরা রদ্দুল মুহতার, মেরাত ও মালাবুদ্দা মিনহু এই তিনটি কিতাবের বরাত দিয়ে মিথ্যা ও ভূঁয়া বক্তব্য পেশ করেছে এবং উক্ত কিতাবগুলোর কোন কোনটার ইবারতও তারা বিকৃত করেছে। আমরা পর্যায়ক্রমে রদ্দুল মুহতার, মেরাত ও মালাবুদ্দা মিনহু এই তিনটি কিতাবের বক্তব্য খন্ডন করবো ইনশাআল্লাহ্। নিম্নে রদ্দুর মুহতার কিতাবের বক্তব্য খন্ডন করা হলো।
তরজুমান গংরা কিতাবের ইবারত বিকৃত করে নিজেদেরকে ইহুদী-নাসারাদের দোসর সাব্যস্ত করলো।
উল্লেখ্য যে, মিথ্যুক ধোকাবাজ তরজুমান গং للهم اغفرلى এর অজুহাত দিয়ে হাদীস শরীফে বর্ণিত
اللهم اغفرلى وارحمنى واهدنى وعافنى وارزقنى.
এই সমস্ত দোয়াগুলো ফরয নামাযের দুই সিজদার মাঝখানে চালিয়ে দেয়ার ব্যর্থ কোশেশ করেছে। যার জ্বাজ্বল্য প্রমাণ হলো রদ্দুল মুহতার ১ম খন্ড ৫০৫ পৃষ্ঠার ইবারত। তারা কিতাবের মূল ইবারত বাদ দিয়ে ইহুদী-নাসারাদের মত কিতাবের ইবারত বিকৃত করে নিজ হাতে কিতাবের ইবারত লিখে দিয়েছে। যেমন কিতাবের মূল ইবারত হলো أيقول অথচ তরজুমান গংরা أيقول শব্দের (أ) হামযাকে বাদ দিয়ে ইবারত বিকৃত করে নিজ হাতে লিখেছে يقول
অতঃপর কিতাবের মূল ইবারত হলোاللهم اغفرلى؟ এই বাক্যের পর কিতাবে (?) প্রশ্নবোধক রয়েছে। অথচ তরজুমান গংরা اللهم اغفرلى؟ এই বাক্যের পরে কিতাবের (?) প্রশ্নবোধক চিহ্ন বাদ দিয়ে ইবারত বিকৃত করে নিজ হাতে الخ অর্থাৎ الى الاخر লিখে মানুষদেরকে এটাই বুঝাতে চেয়েছে যে, اللهم اغفرلى এই বাক্যের পরে মূল কিতাবে আরো অনেক দোয়া অর্থাৎ হাদীস শরীফে বর্ণিত
اللهم اغفرلى وارحمنى واهدنى وعافنى وارزقنى.
এই সমস্ত দোয়াগুলো লিখা রয়েছে। ইবারত বেশী হবে তাই اللهم اغفرلى এর পরে الخ শব্দটি লিখার মাধ্যমে সংক্ষেপে জানিয়ে দিলাম যে, اللهم اغفرلى এরপরে হাদীসে বর্ণিত সমস্ত দোয়াগুলো মূল কিতাবের ইবারতে আছে।
সাধারণ মানুষকে এটাই বুঝানোর জন্য তরজুমান গংরা মূল কিতাবের ইবারত বিকৃত করে للهم اغفرلى। এরপরে নিজহাতে الخ শব্দটি লিখে দিয়েছে।
আরো উল্লেখ্য যে, ধোকাবাজ তরজুমান গংরা উপরোক্ত কথাগুলো বুঝানোর জন্য সাধারণ মানুষকে ধোকা দেয়ার উদ্দেশ্যে অনুবাদে ও আল্লাহুম্মাগফিরলী লিখার পর প্রথম বন্ধনীর ভিতর (অর্থাৎ হাদীসে বর্ণিত দোয়া) এই লিখাটি ইচ্ছাকৃতভাবে ঢুকিয়েছে।
অথচ রদ্দুল মুহতার ১ম খন্ড- ৫০৫ পৃষ্ঠার মূল কিতাবে اللهم اغفرلى؟ এরপর হাদীস শরীফে বর্ণিত সমস্ত দোয়াগুলো নেই। বরং মূল কিতাবে শুধুমাত্র اللهم اغفرلى؟ রয়েছে এবং মূল কিতাবে اللهم اغفرلى؟ এরপরেই প্রশ্নবোধক চিহ্ন রয়েছে।
উল্লেখ্য যে, তরজুমান গংরা উক্ত বিকৃত ইবারতের অর্থটিও একইভাবে বিকৃত করেছে যেমন তারা লিখেছে, يقول الرجل ……… اللهم اغفرلى الخ.
অর্থাৎ …………. আল্লাহুম্মাগফিরলী (অর্থাৎ হাদীসে বর্ণিত দোয়া) বলা যাবে কিনা? ……..
অথচ কিতাবের মূল ইবারত ও সঠিক অর্থ হলো
أيقول الرجل ……… اللهم اغفرلى؟
অর্থঃ- “লোকটি কি …….. আল্লাহুম্মাগফিরলী বলবে?
অতএব প্রমাণিত হলো মিথ্যুক, ধোকাবাজ তরজুমান গংরা সারাজীবন আলিমদের, কিতাবের ইবারত কাঁটছাট করে ভূয়া দলীল পেশ করে, সত্যকে অস্বীকার করে সাধারণ মানুষকে ধোকা দিয়ে আসছে। আর ধোঁকা দেয়াই তাদের মজ্জাগত বদ অভ্যাস। কিন্তু সাধারণ মানুষকে ধোকা দিলেও মাসিক আল বাইয়্যিনাত-এর হাতে তাদেরকে ধরা পড়তেই হবে। কারণ মাসিক আল বাইয়্যিনাত বর্তমান জামানার তাজদীদী মুখপত্র। মাসিক আল বাইয়্যিনাত মানুষের ইছলাহ্র জন্য তরজুমান গংদের ধোকা ও প্রতারণাগুলোকে বলিষ্ঠ কলমে সুস্পষ্ট ভাষায় তুলে ধরে তাদের হাক্বীক্বত প্রকাশ করে যাবেই ইনশাআল্লাহ্।
তরজুমান গংরা ফরয নামাযের দুই সিজদার মাঝখানে দোয়া পড়ার ব্যাপারে ধোঁকা দিতে গিয়ে নিজেই ধোঁকাবাজ হিসেবে ধরা পড়ে গেল। অতএব তরজুমান গংরা কিতাবের ইবারত নিজ হাতে লিখে কিতাব বিকৃতকারী হিসেবে নিজেদেরকে ইহুদী-নাসারাদের দোসর বলেই সাব্যস্ত করলো।
দ্বিতীয়তঃ তারা মেরাত কিতাবের বরাত দিয়ে বলেছে, به دعاء نوافل میں همیشه کهتے تھے فرائض میں کبھی کبھی অর্থাৎ কখনো কখনো ফরয নামাযেও পড়তেন। এর জবাবে বলতে হয় যে, জাহেল তরজুমান গংরা এই পর্যন্ত কিতাবের ছবক শেষ করেছে। কিতাবের পরবর্তী ছবক তাদের এখনও পড়া হয়নি। এখন মাসিক আল বাইয়ি্যনাত প্রাইভেট টিউটর স্বরূপ তরজুমান গংদেরকে কিতাবের পরবর্তী ছবক বাতলিয়ে দিচ্ছে। ছবক বাতলিয়ে দেয়ার আগে একটি ঘটনা না বললেই নয়। যেহেতু নীচের শ্রেণীর ছাত্ররা ঘটনা শুনতে খুব ভালবাসে সেহেতু ঘটনাটি বলেই কিতাবের পরবর্তী ছবক দেয়া হচ্ছে। জনৈক ফার্সী কবি বলেছেন, نیم حکیم خطره جان نیم ملا خطره ایمان অর্থঃ- “আধা ডাক্তার জীবনের জন্যে হুমকি স্বরূপ। আর আধা মুফতী ঈমানের জন্যে হুমকি স্বরূপ।” এ প্রসঙ্গে কিতাবে একটি ঘটন। উল্লেখ করা হয়েছে- যা কিতাব বিকৃতকারী ইহুদী-নাসারাদের দোসর, ধোকাবাজ ও গোমরাহ্ তরজুমান গোষ্ঠীর নীম মোল্লাদের আসল চেহারাকে সুস্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলে। ঘটনাটি নিম্নরূপ- এক লোকের শরীরে একটি বাগী বা ফোঁড়া হয়। সে চিকিৎসার জন্যে গ্রাম্য এক ডাক্তারের নিকট যায়। ডাক্তার চিকিৎসা স্বরূপ লোহা গরম করে উক্ত বাগী বা ফোঁড়াতে দাগা দিয়ে দেয়। রোগী চিকিৎসা নিয়ে বাড়ীতে চলে আসে, কিন্তু রোগীর অবস্থা ক্রমেই মারাত্মক আকার ধারণ করে। এ অবস্থা দেখে রোগীর আত্মীয়-স্বজন ডাক্তারের নিকট এসে বলে- হে ডাক্তার ছাহেব! আপনি রোগীর কেমন চিকিৎসা করলেন যে, রোগী মরে যাওয়ার অবস্থা হয়েছে। আর আমরা এমন চিকিৎসাও কখনো দেখিনি যে, বাগী হলে, লোহা গরম করে দাগা দিতে হয়। একথা শুনে ডাক্তার ছাহেব রাগান্বিত হয়ে বলে উঠে- কেন, আমি কি বই না পড়ে চিকিৎসা করেছি? আমার চিকিৎসা ঠিকই আছে। তখন রোগীর লোকজন বললো দেখিতো আপনি কোন ডাক্তারী বই পড়ে চিকিৎসা করেছেন? ডাক্তার ছাহেব বইখানা বের করে তাদেরকে দেখিয়ে বলে- দেখো এখানে লিখা আছে, “বাগী বা ফোঁড়া হলে লোহা গরম করে দাগা দিবে” এখানে এসে পৃষ্ঠা শেষ হয়ে যায়। আর উক্ত লেখার পরে কমা রয়েছে বিধায় লোকেরা বললো- পৃষ্ঠা উল্টাতে, কেননা এখানে কমা দেয়া হয়েছে, নিশ্চয় বক্তব্য সম্পূর্ণ হয়নি। কিন্তু হাতুড়ে ডাক্তার পৃষ্ঠা উল্টাতে নারাজ, তার মতে এটাই মূল বক্তব্য। অনেক অনুরোধের পর যখন ডাক্তার ছাহেব পৃষ্ঠা উল্টালো তখন দেখলো, সেখানে লেখা রয়েছে- “রোগী যদি গরু হয়।” অর্থাৎ গরুর যদি বাগী বা ফোঁড়া হয়, তবে লোহা গরম করে দাগা দিবে। উপরোক্ত ঘটনায় বর্ণিত নীম হেকিমদের ন্যায় অবস্থা হয়েছে তরজুমান গং নীম মোল্লাদের। তরজুমান গং নীম মোল্লারা অর্ধেক পড়ে ফতওয়া দিয়েছে এবং এই পর্যন্ত তারা ছবক শেষ করেছে। তাই কিতাবের পরবর্তী ছবক দেয়া হলো- فرائض میں اختصار ہے نوافل میں آزادی ফরয নামাযে সংক্ষিপ্ত অর্থাৎ শুধুমাত্র اللهم اغفرلي আর নফল নামাযে ইচ্ছাধীন অর্থাৎ ইচ্ছা করলে اللهم اغفرلی পড়তে পারে অথবা ইচ্ছা করলে নফল নামাযে সমস্ত দোয়াগুলোও পড়তে পারে। সেটাই মিরকাত শরীফের উদ্ধৃতি দিয়ে মেরাত কিতাবের ২য় খন্ডের ৮৬ পৃষ্ঠার ৪ নং হাশিয়ায় উল্লেখ আছে যে, به دعا نوافل میں همیشه کهتے تھے فرائض میں کبهی کبهی فرائض میں اختصار نوافل میں آزادی (مرقات) অর্থঃ- “এই দোয়া নফল নামাযে সর্বদা পড়তেন, ফরজ নামাযে কখনো কখনো। তবে ফরজ নামাযে সংক্ষিপ্ত অর্থাৎ শুধুমাত্র اللهم اغفرلي আর নফল নামাযে ইচ্ছাধীন অর্থাৎ। ইচ্ছা করলে শুধুমাত্র اللهم اغفرلی অথবা ইচ্ছা করলেই নফল নামাযে সম্পূর্ণ দোয়াগুলো পড়তে পারে।” (মিরকাত) আর মেশাত শরীফের শরাহ “মিরকাত শরীফের” দ্বিতীয় খন্ডের ৩২৬ পৃষ্ঠায় হাদীস শরীফখানা বর্ণনার পর বলা হয়েছে, و هو محمول على التطوع عندنا. অর্থঃ- “ইমামুল মুহাদ্দিসীন হযরত মোল্লা আলী কারী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, দুই সিজদার মাঝে উক্ত দোয়াটি পড়া সম্পর্কিত হাদীস শরীফখানা আমাদের মাযহাবে নফল নামাযের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।” অতএব মাসিক আল বাইয়্যিনাতের পক্ষ থেকে তরজুমান গংদেরকে তাদের ওস্তাদ হিসেবে আজীবনের জন্য কিতাবের পরবর্তী ছবক দেয়া হলো যে, فرائض میں اختصار ہے نوافل میں آزادی (مرقات) অর্থাৎ “ফরয নামাযের দুই সিজদার মাঝখানে সংক্ষিপ্ত অর্থাৎ শুধুমাত্র اللهم اغفرلي আর নফল নামাযে ইচ্ছাধীন।
মুহম্মদ আমিনুজ্জামান
পাহাড়তলী, চট্টগাম।
সুওয়ালঃ চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত রেজভী ফিরকার মুখপত্র মাসিক তরজুমান নভেম্বর/২০০০ ঈঃ সংখ্যায়, পীর ছাহেবের নিকট বাইয়াত হওয়া সংক্রান্ত এক প্রশ্নের উত্তরে যা লিখেছে তন্মধ্যে হতে নিম্মোক্ত বিষয়ে আমি বিভ্রান্তিতে পতিত হয়েছি। যেমন তারা লিখেছে-
১। “…… পীরের হাতে বাইয়াত হওয়া সুন্নাত। এ প্রকার বাইয়াতের নিয়ম যুগ যুগ ধরে সুফিয়ায়ে কেরামের মাধ্যমে চলে আসছে। এ প্রকার বাইয়াতকে তাফসীর ও ফিকাহ্বিদ গণের অধিকাংশই সুন্নাত বলেছেন।” তারা প্রমাণ স্বরূপ তাফসীরে রুহুল বয়ান, কুরতুবী ইত্যাদির কতিপয় ইবারতও উল্লেখ করেছে।
২। তারা লিখেছে, “…….. যারা তাছাউফের এ বাইয়াতকে “ফরজ বলে মনে করে তারা উম্মতে মুহম্মদী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাজার-হাজার নর-নারী এবং অসংখ্য ইমাম ও উলামায়ে কেরামকে ফরজ ছেড়ে দেয়ার কারণে গুণাহগার হিসেবে অভিযুক্ত করে।”
এখন আমার সুওয়াল হলো- তরজুমানের বাইয়াত হওয়া সংক্রান্ত উপরোক্ত বক্তব্য কতটুকু সঠিক ও গ্রহণযোগ্য? নির্ভরযোগ্য দলীলের দ্বারা জবাবদানে বিভ্রান্তি দুর করবেন বলে আমি আশাবাদী।
জাওয়াবঃ হক্কানী পীর মাশায়েখগণের নিকট বাইয়াত হওয়া সংক্রান্ত রেজভীদের উক্ত বক্তব্য তাদের সত্যিকার জিহালতীকেই প্রকাশ করে দিয়েছে। কারণ জিহালতীর কারণেই তারা মাসিক আল বাইয়্যিনাত-এর বাইয়াত হওয়া সংক্রান্ত সহজ সরল ও নির্ভরযোগ্য দলীল ভিত্তিক বক্তব্যটি যেমন বুঝে উঠতে সক্ষম হয়নি তেমনি সক্ষম হয়নি “সুরায়ে মুমতাহানার” ১২ নং আয়াত শরীফের ব্যাখ্যা বা বক্তব্য বুঝে উঠতে।
মূলতঃ এ ব্যাপারে মাসিক আল বাইয়্যিনাত এর বক্তব্য ছিল ইলমে তাছাউফ অর্জন করা ফরজে আইন, আর কোন পীর বা শায়খ ব্যতীত যেহেতু ইলমে তাছাউফ অর্জন করা যায়না, তাই ইলমে তাছাউফ অর্জনের ন্যায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ফরয আদায়ের লক্ষ্যে একজন পীরে কামিল অন্বেষণ করা বা গ্রহণ করাও ফরয। তাফসীর, উছূল ফিক্বাহ ও অন্যান্য বহু কিতাবেই তা উল্লেখ আছে।
আর রেজভীরা যে দলীল উদ্বৃতি করেছে, সেটা হলো- বাইয়াত হওয়ার বা করানোর সুন্নত তরীক্বা। অর্থাৎ বাইয়াত হওয়া বা করানোর সুন্নত তরীক্বা বা পদ্ধতি হলো, “হাতে হাত রেখে বা পাগড়ী বা কাপড় ধরে বাইয়াত হওয়া।” এ তরীক্বায় বা নিয়মে যে বাইয়াত হওয়া বা করানো সুন্নত তা কেউ অস্বীকার করবেনা। কারণ তার প্রমাণ সূরায়ে মুমতাহানার’ ১২নং আয়াত শরীফ ও তার তাফসীরে রয়েছে।
অতএব, আখেরী রসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে তরীক্বায় হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদিয়াল্লাহু আনহুম গণকে বাইয়াত করেছেন সে তরীক্বায় বাইয়াত হওয়া বা করানো নিঃসন্দেহে সুন্নত। আর এ সুন্নতকে অস্বীকার করা নিঃসন্দেহে কুফরী। মাসিক আল বাইয়্যিনাতের কোথাও বাইয়াত হওয়ার এ সুন্নত তরীক্বাকে অস্বীকার করা হয়নি। আর অস্বীকার করার প্রশ্নই উঠেনা।
সুতরাং হক্কানী পীরে কামিলের নিকট বাইয়াত বা মুরীদ হওয়ার তর্জ-তরীকা বা নিয়মটা হচ্ছে- সুন্নত। যেহেতু রহমতুল্লিল আলামীন হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাইয়াত করেছেন এবং হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ বাইয়াত হয়েছেন। এ দৃষ্টি কোন থেকে নামায, রোজা, হজ্ব, যাকাত-ইত্যাদি সবই সুন্নত। কেননা সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আমল দ্বারা তা প্রমাণিত।
এখন তরজুমানওয়ালাদের কাছে আমাদের প্রশ্ন? তবে কি তাদের মতে নামায, রোজা, হজ্ব, যাকাত ইত্যাদি সবই সুন্নত? মূলতঃ সাধারণভাবে বা তর্জ-তরীক্বার দিক থেকে এগুলো যদিও সুন্নত কিন্তু হাক্বীকতান বা আহ্কামের দিক দিয়ে এগুলো ফরজ-ওয়াজিব।
ঠিক তদ্রুপ বাইয়াত এর তর্জ-তরীক্বা বা নিয়ম যদিও সুন্নত কিন্তু হাক্বীকতান বা আহকামের দিক দিয়ে বাইয়াত বা মুরীদ হওয়া ফরজ। এখন কেউ যদি উক্ত তরীক্বা বা নিয়মে বাইয়াত হয় তবে তার সুন্নত ও ফরজ উভয়টিই আদায় হবে। যেমন দাঁড়ি রাখার সুন্নত তরীক্বা হচ্ছে সিনাপোর, কেননা হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সিনাপোর দাঁড়ি মোবারক রেখেছেন। তাই বলে আহকামের দিক দিয়ে দাঁড়ি সুন্নত নয় বরং ফরজ-ওয়াজিব। এ প্রসঙ্গে জগতখ্যাত মুহাদ্দিস, ইমামুল মুহাদ্দিসীন, আশেকে রসূল হযরত আব্দুল হক মুহাদ্দিস দেহলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর বিখ্যাত কিতাব “আশয়াতুল লুময়াত”-এর ১ম জিঃ ২১২ পৃষ্ঠায় লিখেন,
উর্দূ কম্পোজ করতে হবে
অর্থাৎ “দাঁড়ি কমপক্ষে এক মুষ্ঠি পরিমাণ লম্বা করা ওয়াজিব, যারা দাঁড়ি রাখাকে সুন্নত বলেছেন, তাদের এরূপ বলার কারণ এই যে, রসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যাবতীয় আমল বা কাজকেই সুন্নত বলা হয়, অথবা হাদীস শরীফে দাঁড়ি রাখার কথা উল্লেখ আছে বিধায় এটাকে সুন্নত বলা হয়। যেমন ঈদের নামাযকে সুন্নত বলা হয়। (অথচ ঈদের নামায ওয়াজিব)।”
অতএব, প্রমাণিত হলো যে, যে সকল তাফসীর গ্রন্থে বাইয়াতকে সুন্নত বলা হয়েছে, তদ্বারা মূলতঃ বাইয়াত হওয়ার তর্জ-তরীক্বাকেই বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ আখেরী রসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেহেতু এ তর্জ-তরীক্বায় বাইয়াত করিয়েছেন তাই তাঁরা এ তর্জ-তরীক্বায় বাইয়াতকে সুন্নত বলেছেন। রেজভীরা “ফয়ূজুর রহমান” গ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়ে যে ইবারত উল্লেখ করেছে তাতেও একথা সুষ্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে,
উর্দূ কম্পোজ করতে হবে
অর্থাৎ …… রসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাইয়াত হওয়ার এ পদ্ধতি চালু করার কারণে এটা সুন্নত হয়ে গেল।”
সুতরাং বলার আর অপেক্ষাই রাখেনা যে, মুফাস্সিরগণ মুলতঃ বাইয়াত হওয়ার পদ্ধতী বা তরীক্বাকেই সুন্নত বলেছেন। আহকামের দিক দিয়ে নয়। কারণ আহকামের দিক দিয়ে তায্কিয়ায়ে বাতেন হাছিল করার লক্ষ্যে ইলমে তাছাউফ বা ইলমে বাতেন অর্জন করা ফরয। আর এই ফরয আদায়ের লক্ষ্যেই একজন কামিল পীর গ্রহণ করা বা কামিল পীরের নিকট বাইয়াতের মাধ্যমে মুরীদ হওয়া ফরয। এটাকেই ইমাম মুজ্তাহিদগণ ফরয বলেছেন। বস্তুতঃ দুনিয়ার সমস্ত তাফসীরকারক, ফিক্বাহবিদ ও পীরে তরীক্বতগণ স্বীকার করেছেন যে, প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর জন্য ইলমে ফিক্বাহের ন্যায় ইলমে তাছাউফ অর্জন করাও ফরজে আইন, (জরুরত আন্দাজ)।
যেমন এ প্রসঙ্গে বিখ্যাত মুফাস্সির শায়খে তরীকত, আল্লামা ছানাউল্লাহ্ পানিপথি রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর প্রসিদ্ধ তাফসীর গ্রস্থ “তাফসীরে মাজহারীতে” সূরা তওবার আয়াত শরীফের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লিখেন,
واما العلم الدنى الذى يسمون اهلها بالصوفية الكرام فهو فرض عين لان من ثمراتها تصفية القلب عن الشتغال بغير الله تعالى واتصافه بدوام الحضور وتزكية النفس عن زائل الاخلاق …….. وكل مايترتب عليه الاثر من الفروض الاعيان فهو فرض عين-
অর্থাৎ “যারা ইলমে লাদুন্নী বা ইলমে তাছাউফের অধিকারী তারা হচ্ছেন, ছুফিয়ায়ে কিরাম। উহা (ইলমে তাছাউফ) শিক্ষা করা ফরজে আইন। যেহেতু তা ক্বল্ব বা অন্তরকে গাইরুল্লাহ্ হতে ফিরিয়ে আল্লাহ্ পাক-এর দিকে লিপ্ত রাখে এবং অন্তরে দায়েমী হুজুরী পয়দা করে ও অন্তরকে সর্বপ্রকার বদ স্বভাব (রিয়া, কিনা, হাসাদ, অহঙ্কার) হতে তায্কিয়া বা পরিশুদ্ধ করে। …. সুতরাং যে আমল ব্যতীত ফরজে আইন গুলো যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়না, তাও ফরয।”
খাতেমুল মুফাস্সিরীন, আল্লামা ইসমাঈল হাক্কী রহমতুল্লাহি আলাইহি “তাফসীরে রুহুল বয়ানে” উক্ত সূরার উক্ত আয়াত শরীফের ব্যাখ্যায় লিখেন,
النوع الثانى علم السر هو ما يتعلق بالقلب ومسا عيه فيفترض على المؤمن.
অর্থঃ- “দ্বিতীয় প্রকার ইল্ম হচ্ছে, ইলমুস্সির বা ইলমে তাছাউফ, যা ক্বল্ব বা অন্তরের সাথে সংশ্লিষ্ট। এ ইল্ম অর্জন করা প্রত্যেক মু’মিনের জন্যই ফরজ।”
বিশ্বখ্যাত কিতাব “জামেউল উছুলে” উল্লেখ আছে,
اعلم ان العلم الباطن الذى هو من اعظم المنجيات والسلوك ولرياضات والمجاهدة فرض عين-
অর্থঃ- “জেনে রাখ! ইলমে বাতেন বা ইলমে তাছাউফ যা মুক্তির প্রধান পথ, আল্লাহ্ পাককে পাওয়ার, কুরিপুসমূহ দূর করার ও সংযম শিক্ষা করার একমাত্র মাধ্যম তা শিক্ষা করা ফরযে আইন।”
বিশ্ববিখ্যাত ও নির্ভরযোগ্য ফিক্বাহের কিতাব “হাশিয়ায়ে তাহতাবীতে” উল্লেখ আছে,
فان البخل والجبن والكبر والتقتير حرام ولايمكن التحرز عنها الا بعلمها والحاصل ان التحرز عن المحرم فرض-
অর্থঃ- “কৃপনতা, অহঙ্কার ইত্যাদি বদ স্বাভাব সমূহ হারাম। উল্লিখিত বদ স্বভাব গুলোর ইল্ম ব্যতীত অর্থাৎ ইলমে তাছাউফ ব্যতীত উহা থেকে বেঁচে থাকা সম্ভব নয়, অথচ হারাম থেকে বেঁচে থাকা ফরজ। সুতরাং ইলমে তাছাউফ শিক্ষা করা ফরজ।”
তায্কিয়ায়ে বাতেন বা আতœশুদ্ধির জন্যে ইলমে তাছাউফ অর্জন করা যে ফরযে আইন তার বহু প্রমাণ নির্ভরযোগ্য কিতাবে রয়েছে। এখন কথা হলো ইলমে তাছাউফ শিখবে কিভাবে? কোথায় পাওয়া যাবে ইলমে তাছাউফ? বস্তুতঃ পীরে কামিল বা শায়খে কামিল ব্যতীত কোন দিনই ইলমে তাছাউফ অর্জন করা সম্ভব নয়।
যেমন, এ প্রসঙ্গে হাদিয়ে বাঙ্গাল, মুজাহিদে আ’যম শাইখুল মাশায়েখ আল্লামা কারামত আলী জৈনপূরী রহমতুল্লাহি আলাইহি “যাদুত্ তাকওয়াতে” লিখেন,
উর্দূ কম্পোজ করতে হবে
অর্থাৎ “এটাই প্রমাণিত হলো যে, ইলমে তাছাউফ ব্যতীত ফিক্বাহের উপর যথাযথ ভাবে আমল করা সম্ভব নয়। সুতরাং ছাবেত হলো যে, ইল্মে তাছাউফ চর্চা করা সকলের জন্যই অবশ্য কর্তব্য (ফরজ) আর এই ইলমে তাছাউফ তাছাউফে পারদর্শী মুর্শিদে কামিল-এর ছোহ্বত ও তা’লীম ব্যতীত অর্জন করা সম্ভব নয়।”
তাই ক্বাদরীয়া তরীক্বার ইমাম, গাওছুল আযম, মাহবুবে সোবহানী, কুতুবে রব্বানী, মুজাদ্দিদে আযম শায়খ সাইয়্যিদ মুহিউদ্দীন আব্দুল কাদির জিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর বিখ্যাত তাছাউফ গ্রন্থ “সিররুল আসরার” এর ৫ম অধ্যায়ে “তওবার’ বয়ানে লিখেন,
ولذالك طلب اهل التلقين لحياة القلب فرض كما قال عليه الصلواة والسلام طلب العلم فريضة على كل مسلم ومسلمة والمرار منه علم المعرفة والقربة-
অর্থাৎ “ক্বল্ব বা অন্তরকে জীবিত বা যাবতীয় কুরিপু হতে পবিত্র করার জন্য “আহ্লে তালক্বীন’ অর্থাৎ পীরে কামিল গ্রহণ করা প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর জন্য ফরয। “হাদীস শরীফে যে ইল্ম অর্জন করা ফরয বলা হয়েছে” তদ্বারা ইলমে মা’রিফত ও কোরবতকেই বুঝানো হয়েছে।” অনুরূপ হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাজ্জালী রহমতুল্লাহি আলাইহি ও কাইউমে আউয়াল, মুজাদ্দিদে আলফে ছানী রহমতুল্লাহি আলাইহিসহ আরো অনেকেই তাঁদের নিজ নিজ কিতাবে ইলমে তাছাউফ অর্জন করার লক্ষ্যে একজন কামিল মুর্শিদের নিকট বাইয়াত হওয়াকে ফরয বলেছেন।
উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা অকাট্য ভাবেই প্রমাণিত হলো যে, প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর জন্যে জরুরত আন্দাজ ইলমে তাছাউফ অর্জন করা ফরযে আইন। সাথে সাথে এটাও প্রমাণিত হলো যে, কামিল পীর ছাহেবের নিকট বাইয়াত বা মুরীদ হওয়া ব্যতীত ইলমে তাছাউফ অর্জন করা সম্ভব নয়। তাই কামিল পীর ছাহেবের নিকট মুরীদ হওয়াও ফরয।
কেননা ফিক্বাহের বিখ্যাত কিতাব “দুররুল মুখতারে” উছুল বর্ণিত হয়েছে,
مالايتم به الفرض فهو فرض-
অর্থাৎ “যেটা ব্যতীত ফরয পূর্ণ হয় না বা আদায় হয়না উক্ত ফরয আদায়ের জন্য উহা করাও ফরয।”
যেমন, পীর ছাহেবের নিকট বাইয়াত হওয়া ব্যতীত ইলমে তাছাউফ অর্জনের ফরজ আদায় হয়না। তাই ইলমে তাছাউফ অর্জনের ফরয আদায়ের জন্য পীর ছাহেবের নিকট মুরীদ হওয়াও ফরয।
অতএব প্রমাণিত হলো যে, ইলমে তাছাউফ অর্জনের উদ্দেশ্যে একজন কামিল পীর ছাহেবের নিকট বাইয়াত বা মুরীদ হওয়া ফরয। আর বাইয়াত হওয়ার যে তরীক্বা বা পদ্ধতি রয়েছে সেটা সুন্নত। রেজভীরা জিহালতীর কারণেই এ বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেনি। আর প্রতারণামূলক ইলমে তাছাউফের বিষয়টি এড়িয়ে গেছে। অর্থাৎ পীর ছাহেবের নিকট বাইয়াত হওয়ার মূল উদ্দেশ্য যে, ইলমে তাছাউফ অর্জন করা আর ইলমে তাছাউফ অর্জন করা যে ফরয এটা সম্পূর্ণরূপে এড়িয়ে গেছে তবে কি রেজভীদের মতে ইলমে তাছাউফ অর্জন করাও সুন্নত?
যদি তারা একটি দলীলের দ্বারাও প্রমাণ করতে পারে যে, ইলমে তাছাউফ অর্জন করা সুন্নত। তবে আমরাও মেনে নিব যে, বাইয়াত হওয়াও সুন্নত। আর যদি তারা ইলমে তাছাউফ অর্জন করাকে সুন্নত প্রমাণ করতে না পারে তবে তাদেরকে মেনে নিতে হবে যে, “বাইয়াত হওয়া ফরজ।”
দ্বিতীয়তঃ তারা লিখেছে, “…….. যারা তাছাউফের এ বাইয়াতকে “ফরজ বলে মনে করে তারা উম্মতে মুহম্মদী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাজার-হাজার নর-নারী এবং অসংখ্য ইমাম ও উলামায়ে কেরামকে ফরজ ছেড়ে দেয়ার কারণে গুণাহগার হিসেবে অভিযুক্ত করে।”
রেজভীদের এ বক্তব্য শুধু অশুদ্ধই নয়, বরং চরম মূর্খতাসূচকও বটে। কারণ তাদের কথা দ্বারা এটাই বুঝা যায় যে, অধিকাংশ মুসলমান আমল না করার কারণে কোন ফরযকে ফরয বলা যাবেনা। তবে তো রেজভীদের ফতওয়া মোতাবেক নামায পড়া ফরয একথা বলা যাবেনা। কারণ অনেক লোকই নামায পড়েনা, পর্দা করা ফরয একথা বলা যাবেনা, কারণ রেজভীদের পীরসহ অনেকেই পর্দা করেনা, দাঁড়ি রাখা ফরয-ওয়াজিব বলা যাবেনা, কারণ অনেক লোকই দাঁড়ী রাখেনা, গান-বাজনা হারাম বলা যাবেনা, কারণ অনেকেই গান-বাজনা করে, ছবি তোলা হারাম বলা যাবেনা, কারণ রেজভীদের পীরসহ অনেকেই ছবি তোলে। ইল্ম অর্জন করা ফরয একথাও বলা যাবেনা, কারণ অধিকাংশ লোকই দ্বীনি ইল্ম অর্জন থেকে বিরত।
এখন প্রশ্ন হলো? রেজভীরা কি নামায, পর্দা, দাঁড়ি, ইল্ম অর্জন ইত্যাদিকে ফরয মনে করেনা? যদি তারা ফরয বলে থাকে তবে তো তারাও অসংখ্য লোককে ফরয তরকের গুণাহ্তে অভিযুক্ত করলো। শুধু কি তাই তাদের কথা মোতাবেক স্বয়ং আল্লাহ্ পাক ও আখেরী রসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং সমস্ত ইমাম-মুজতাহিগণ অধিকাংশ মুসলমানকে ফরয তরকের গুণাহে অভিযুক্ত করেছেন। কারণ আল্লাহ্ পাক ও আল্লাহ্ পাক-এর রসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইলমে তাছাউফকে ফরয বলেছেন অথচ অধিকাংশ লোকই ইলমে তাছাউফ অর্জন করেনা। (নাউযুবিল্লাহ্ মিন যালিক)।
আর মালেকী মাযহাবের ইমাম, ইমামুল আইম্মা, ফখরুল ফুক্বাহ্া, হযরত ইমাম মালেক রহমতুল্লাহি আলাইহি ফতওয়া দিয়েছেন আর তাঁর সে ফতওয়া ইমামুল মুহাদ্দিসীন মুল্লা আলী ক্বারী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর বিখ্যাত ব্যাখ্যাগ্রন্থ “মিরকাত শরীফে” উল্লেখ করেন যে,
من تفقه ولم يتصوف فقد تفسق ومن تصوف ولم يتفقه فقد تزندق ومن جمع بينهما فقد تحقق.
অর্থাৎ- “যে ব্যক্তি ইলমে ফিক্বাহ্ অর্জন করলো অথচ ইলমে তাসাউফ অর্জন করলো না সে ব্যক্তি ফাসিক। আর যে ব্যক্তি শরীয়ত অস্বীকার করে মা’রিফাতের দাবী করে সে যিন্দিক। আর যে ব্যক্তি উভয়টা অর্জন করলো সে ব্যক্তি মুহাক্কিক। অর্থাৎ কামিল।
এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, হযরত ইমাম মালেক রহমতুল্লাহি আলাইহি ও হযরত মুল্লা আলী ক্বারী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন, যারা ইলমে তাছাউফ অর্জন করে না তারা ফাসিক। আর শরীয়তের দৃষ্টিতে ফাসিক তারাই যারা ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নতে মুয়াক্কাদা তরক করে।
এখন তরজুমানওয়ালারা কি এটাই প্রমাণ করলো না যে, ইমাম মালেক রহমতুল্লাহি আলাইহি ও হযরত মুল্লা আলী ক্বারী রহমতুল্লাহি আলাইহি অধিকাংশ লোককে ফাসিক বলে ফরজ তরকের গুণাহ্ েঅভিযুক্ত করেছেন! এবার দেখুন, আল্লাহ্ পাক তাঁর হাবীব ও ইমামগণের প্রতি কত জঘণ্য অপবাদ। বস্তুতঃ আল্লাহ্ পাক, আল্লাহ্ পাক-এর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও ইমাম-মুজতাহিগণের প্রতি যে তাদের আক্বীদা শুদ্ধ নয়, এটাই তার বাস্তব প্রমাণ।
বস্তুতঃ যদি ফিকির করা হয় তবে এটাই প্রমাণিত হয় যে, রেজভীরাই মুলতঃ মুসলমানদেরকে ফরয তরকে উৎসাহিত করেছে। কারণ তারা বাইয়াত হওয়াকে সুন্নত বলার কারণে অনেকেই পীর ছাহেব গ্রহণ করবেনা। আর পীর ছাহেব গ্রহণ না করার কারণে ফরয পরিমাণ ইলমে তাছাউফ থেকে বঞ্চিত থাকবে। অর্থাৎ রেজভীদের ফতওয়ার কারণে অধিকাংশ লোক একটি গুরুত্বপূর্ণ ফরয আদায়ে ব্যর্থ হবে।
মূলকথা হলো যেটা ফরয সেটাকে ফরয বলতেই হবে। মানুষ তা আমল করুক বা না করুক। অধিকাংশ মানুষ আমল না করার কারনে ফরযকে ফরয বলা যাবেনা। আর অধিকাংশ লোক আমল করার কারণে হারামকে হারাম বলা যাবেনা, এ কথা বলা গোমরাহী বৈ কিছুই নয়।
সুতরাং ইলমে তাছাউফ অর্জন করা যেহেতু ফরযে আইন। আর কামিল পীর ছাহেব ব্যতীত যেহেতু ইলমে তাছাউফ অর্জন করা সম্ভব নয়, সেহেতু একজন কামিল পীর ছাহেব অন্বেষণ করা, গ্রহণ করা বাইয়াত বা মুরীদ হওয়া ফরয। এটাই গ্রহণযোগ্য, বিশুদ্ধ ও দলীলভিত্তিক ফতওয়া। এর বিপরীত মত পোষণকারীরা বাতিল ও গোমরাহ্।
মুহম্মদ মতিয়ার রহমান
রাঙ্গাদিয়া, চট্টগ্রাম।
সুওয়ালঃ মাসিক তরজুমান নভেম্বর/২০০০ সংখ্যায় এক প্রশ্নোত্তরে “মাসিক আল বাইয়্যিনাতে” প্রদত্ত “ধুমপান করা মাকরূহ্ তাহরীমী”-এর সঠিক ও অসংখ্য দলীল-আদিল্লা ভিত্তিক ফতওয়ার বিপরীতে দু’একটি কিতাবের ইবারত উল্লেখপূর্বক ধুমপান করাকে জায়েয ও মুবাহ্ বলা হয়েছে।
এখন আমার সুওয়াল হচ্ছে- তরজুমানের উক্ত উত্তর কতটুকু সহীহ? দয়া করে জানাবেন।
জাওয়াবঃ ধুমপায়ী, হুক্কা খোর তরজুমান গংদের উল্লিখিত উত্তর মোটেও সহীহ্ নয়। বরং তাদের প্রদত্ত উত্তর সম্পূর্ণরূপে ভুল এবং বারবার একই ভুল উত্তর প্রচার করে তারা এ কথাই প্রমাণ করছে যে, তারা গোমরাহীর উপর মজবুত।
উল্লেখ্য, “মাসিক আল বাইয়্যিনাত” ৮৬তম সংখ্যায় ধুমপান সম্পর্কে তরজুমানের ভুল উত্তর খন্ডন করে কুরআন-সুন্নাহ্র অসংখ্য ও অকাট্য দলীল-আদিল্লার ভিত্তিতে ফতওয়া দেয়া হয়েছে যে, ধুমপান করা মাকরূহে তাহ্রীমী। এটাই সহীহ্ ও নির্ভুল ফতওয়া। কেউ কেউ হারামও ফতওয়া দিয়েছেন।
অথচ এই ফতওয়ার বিপরীতে নিজেদের বদ্ নেশা ও মতকে টিকিয়ে রাখার জন্য তারা ধুমপান জায়েয ও মুবাহ্ বলে উল্লেখ করেছে। এ সম্পর্কে তারা উসূল পেশ করেছে যে,
الاصل فى الاشياء الاباحة.
“বস্তুর মূল হল মুবাহ্।”
আফসুস! তরজুমান গংদের জন্য। ফিক্বাহ্র এ উসূল বুঝতে তারা ব্যর্থ। এখানে শুধু কুরআন-হাদীসই নয় বরং কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াস- এসবের ভিত্তিতে কোন বিষয় হালাল, হারাম ও মাকরূহ স্পষ্ট হওয়ার ব্যাপারে নিশ্চুপ হলে তা মুবাহ্র অন্তর্ভূক্ত হবে।
কিন্তু ধুমপানের ব্যাপারে শরীয়ত নিশ্চুপ নয়। বরং কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ-এর ভিত্তিতে ক্বিয়াস করে ধুমপান মাকরূহ্ তাহরীমী, কেউ কেউ হারাম ফতওয়া দিয়েছেন। তাহলে সেটা মুবাহ্ ও জায়েয হয় কি করে?
তারা হাদীস শরীফের অপব্যাখ্যা করে বলেছে যে, “যদি প্রত্যেক ধোয়াঁই হারাম হয় তবে লাকড়ী দ্বারা রান্না-বান্না করতে গিয়ে গৃহিনীর এবং অনেক মিল কারখানার ইঞ্জিনের ধোঁয়া শ্রমিকের নাক মুখ দিয়ে ঢুকে থাকে, এতে কি তারা হারাম খাচ্ছে?”
তরজুমান গংদের এ মূর্খতাসূচক প্রশ্নের জাওয়াবে বলতে হয়, উক্ত ধোঁয়া কোন ব্যক্তির নাকে-মূখে ঢুকার কারণে তাকে কেউ কি ধুমপায়ী বলে? আর সেগুলি কি কেউ ইচ্ছা করে গ্রহণ করে? মূলতঃ তা ব্যক্তির সম্পূর্ণ অনিচ্ছা সত্বে নাকে-মূখে প্রবেশ করে থাকে এবং তার উদ্দেশ্যও তা পান করা নয়। যে কারণে উক্ত ধোঁয়া নাকে-মূখে প্রবেশ করার কারণে রোজাদারের রোজার কোন ক্ষতি হয়না। কিন্তু হুক্কা, বিড়ি ইত্যাদি পানকারীর মাসয়ালা কি তাই? কখনোই না। ধুমপায়ি সম্পূর্ণ ইচ্ছা করে তামাকের ধোঁয়া পান করে থাকে। যা এক প্রকার নেশা বটে। যা রোজা ভঙ্গের স্পষ্ট কারণ।
শুধু তাই নয় ফতওয়ার কিতাবে উল্লেখ করা হয়েছে, কোন রোজাদার যদি আগর বাতি জ্বালিয়ে তার ধোঁয়া দ্বারা সুঘ্রাণ নেয় তবে তার রোজা ভঙ্গ হবে।
আর তারা যে, ইবনে আবেদীন শামী রহমতুল্লাহি আলাইহি ‘আল উকুদুদ দুররিয়্যাহ ফী তানকীহিল ফাতওয়াইল হামিদিয়্যাহ্’ গ্রন্থের ২য় খন্ডের ৩৩২ পৃষ্ঠার বরাত দিয়ে ধুমপান প্রসঙ্গে উলামা ও ফক্বীহ্দের যে চুড়ান্ত ফায়সালা পেশ করেছে তা দ্বারা ধুমপান হারামই প্রমাণিত হয়। কারণ ধুমপানে শুধু ক্ষতিই হয় এবং তা উপকার থেকে সম্পূর্ণরূপে খালি। এমন কোন লোক খুঁজে পাওয়া যাবেনা, যে একথা স্বীকার করেনা, বিশেষ করে চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা এ মতেরই প্রবক্তা এবং তাদের মতই এক্ষেত্রে সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য।
আর “ইবনে আবেদীন শামী রদ্দুল মুহতার” ৫ম খন্ডের ৪০৬ পৃষ্ঠায় যে লিখেছেন, “আল্লামা শেখ আলী আজহুরী মালেকী রহমতুল্লাহি আলাইহি হুক্কা পানের বৈধতার উপর একটি রেসালা লিখেছেন যাতে বলা হয়েছে যে, মাযহাব চতুষ্টয়ের নির্ভরযোগ্য ইমামগণ তা বৈধ হওয়ার ফতওয়া দেন।”
মূলতঃ আল্লামা শেখ আলী আজহুরী মালেকী সাহেবের উক্ত রেসালার বক্তব্য সহীহ্ ও গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ চার মাযহাবের ইমামগণের যুগে হুক্কা, তামাকের অস্তিত্বই ছিল না। অনুরূপ আল্লামা গণী ছাহেবের বক্তব্যও শুদ্ধ নয়।
আর হযরত শাহ্ ওয়ালী উল্লাহ্ মুহাদ্দিস দেহলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি যিনি ধুমপানের প্রথম ফতওয়া প্রদানকারী। তাঁর ফতওয়া হচ্ছে- “ধুমপান করা মাকরূহ্ তাহরীমী।” এবং দ্বিতীয়তঃ তাঁর ছেলে হযরত শাহ্ আব্দুল আজীজ মুহাদ্দিস দেহলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁরও সেই একই ফতওয়া “মাকরূহ্ তাহরীমী।”
সুতরাং উক্ত ফতওয়ার খিলাফ তার ছাত্র রশীদ উদ্দীন আল দেহলভী-এর ফতওয়া “মাকরূহ্ তানযীহী” গ্রহণযোগ্য নয়।
আর অনেক যুগশ্রেষ্ঠ আলিম, মুফতী, মুহাদ্দিস, বুযুর্গ, ওস্তাদ, কিতাবের হাফেজ, গাজী, ধুমপান করলেই যে তা মুবাহ্ ও হালাল হবে তা শুদ্ধ নয়। আর আরব জাহানে এর রেওয়াজ প্রচলিত আছে বলে তা মুবাহ্ ও হালাল হবে এটাও শর্ত নয়। মূলতঃ এ ধরণের কথা সম্পূর্ণ মূর্খতাসূচক। বরং শরীয়তের ফতওয়া কিসের উপর সেটাই গ্রহণযোগ্য। আর তা হচ্ছে- “ধুমপান করা মাকরূহ্ তাহ্রীমী। তা পান করে মসজিদে প্রবেশ করা হারাম।”
(বিঃ দ্রঃ বিস্তারিত জানার জন্য মাসিক আল বাইয়্যিনাত ৮৬তম সংখ্যা পাঠ করুন।}
মুহম্মদ আযীযুল হক বেলাল
সাধারন সম্পাদক- আঞ্জুমানে আল বাইয়্যিনাত
চাপাইনবাবগঞ্জ জিলা শাখা।
সুওয়ালঃ মাসিক তরজুমান নভেম্বর/২০০০ ঈঃ সংখ্যায় ৪৬ পৃষ্ঠার বক্তব্যে তারা বলেছে, আপনারা নাকি নফল নামায জামায়াতে পড়া সংক্রান্ত “বাহারে শরীয়তের” ইবারত কারচুপি করেছেন? ইহা কতটুকু সত্য তা জানতে বাসনা রাখি।
জাওয়াবঃ ইবারত কারচুপি করা, একজনের বক্তব্য আরেক জনের উপর চাপিয়ে দিয়ে ভূয়া দলীল পেশ করে মানুষকে ধোকা দেয়া তরজুমান ওয়ালাদের জন্মগত, মজ্জাগত ও সিলসিলাগত বদ অভ্যাস। কারণ তাদের বড় জন রেজা খাঁ ইবারত কারচুপি করার ব্যাপারে খুবই পটু। “মাসিক আল বাইয়্যিনাত”-এর প্রতি ইবারত কারচুপি করার যে অভিযোগ তরজুমানওয়ালা করেছে তা জিহালতপূর্ণ, মূর্খতাসূচক ও ডাহা মিথ্যা বৈ কিছুই নয়। কারণ কারচুপি তখনই হতো যখন কিতাবের ইবারত ধারাবাহিকভাবে হুবহু উল্লেখ না করে প্রয়োজনীয় ইবারতটিকে চুপিয়ে রাখা হতো। কিতাবে যেভাবে ইবারত ছিল ধারাবাহিকতার সহিত হুবহু সেভাবেই শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় ইবারতটুকু উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে ইবারত কারচুপি হলো কিভাবে? কিতাবে অনেক ইবারত থাকে সমস্ত ইবারতগুলো উল্লেখ করা কি সম্ভব বা প্রাসঙ্গিক?
তারা কি প্রমাণ করতে পারবে চারজন মুক্তাদীসহ নফল নামায জামায়াতে পড়া জায়েয? কস্মিনকালেও তারা তা পারবে না।
অতএব, তাদের উক্ত অভিযোগ সম্পূর্ণই মিথ্যা, ভূয়া ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রমাণিত হলো।
তরজুমানওয়ালাদের উচিত ছিল, এ ধরণের মিথ্যা অভিযোগ না তুলে “মাসিক আল বাইয়্যিনাতে” প্রদত্ত “সুওয়ালের-জাওয়াবটি” খন্ডন করে দেয়া। অর্থাৎ প্রমাণ করে দেয়া যে, আল বাইয়্যিনাত নফল নামায জামায়াতে পড়া সম্পর্কে যে বক্তব্য প্রদান করেছে তা ঠিক নয় বরং তাদের বক্তব্যই ঠিক। কিন্তু একথা বলার সাহস তাদের হয়নি।
অতএব, আবারো প্রমাণিত হলো যে, “মাসিক আল বাইয়্যিনাত”-এর বক্তব্যই সঠিক। আর তরজুমান ওয়ালাদের বক্তব্য ভুল।
মূলতঃ তরজুমানওয়ালারাই প্রয়োজনীয় ইবারত উল্লেখ না করে “বাহারে শরীয়ত”-এর ইবারত কারচুপি করেছে। কারণ এখানে প্রয়োজনীয় বিষয়টা হলো, নফল নামায জামায়াতে আদায় করা সম্পর্কে। আর নফল নামায জামায়াতে আদায় করা নাজায়েয, মাকরূহ তাহরীমী ও বিদ্য়াতে সাইয়্যিয়াহ্ তা “বাহারে শরীয়তের ইবারতেই সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। অথচ তরজুমানওয়ালারা সে ইবারতগুলো কারচুপি করে উল্লেখ করেনি। কারণ সে ইবারতগুলো উল্লেখ করলে তাদের ধোকাবাজী ধরা পড়তো এবং তাদের মুখোশ উন্মোচিত হতো। সেহেতু সম্পূর্ণ ইবারতটি পুনরায় দেয়া হলো
মৌলভী আমজাদ আলী তার “বাহারে শরীয়ত” কিতাবের ৪র্থ খন্ডের ২৫ ও ২৬ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছে,
উর্দু কম্পোজ করতে হবে
অর্থঃ- “রাগায়িবের নামায যা রজবের প্রথম জুমুয়ার রাত্রি ও শা’বানের ১৫ই রাত্রি অর্থাৎ শবে বরাত এবং শবে ক্বদরে জামায়াতের সাথে কিছু লোক নফল নামায আদায় করে থাকে। ফুক্বাহা-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণ উক্ত নফল নামাযগুলো জামায়াতের সাথে আদায় করাকে নাজায়েয, মাকরূহ তাহরীমী এবং বিদ্য়াতে সাইয়্যিয়াহ্ বলেছেন, আর লোকেরা এর স্বপক্ষে যে হাদীস শরীফ বর্ণনা করে থাকে,মুহাদ্দিসীন-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণ উক্ত হাদীস শরীফকে মওজু বলেছেন। তবে সম্মানিত আকাবিরে আওলিয়া-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণ থেকে ছহীহ সনদে রেওয়ায়েত আছে। সুতরাং উহার নিষেধে বাড়াবাড়ি করা উচিত নয়। যদি জামায়াতে তিনের অধিক মুক্তাদী না হয় তখন কোন অসুবিধা নেই।”
উপরোক্ত ইবারতে যা প্রমাণিত হলো- (১) নফল নামায জামায়াতে আদায় করা নাজায়েয, মাকরূহ্ তাহরীমী ও বিদ্য়াতে সাইয়্যিয়াহ্। (২) নফল নামায জামায়াতে আদায় করার স্বপক্ষে যে হাদীস শরীফ বর্ণনা করা হয়, মুহাদ্দিসীন-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণ উক্ত হাদীস শরীফ মওজু বলেছেন। (৩) জামায়াতে তিনের অধিক মুক্তাদী না হলে অসুবিধা নেই। তবে তিনজন মুক্তাদী হলে মাকরূহ হওয়ার ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। যেমন, “খোলাছাতুল ফতওয়া, আইনী শরহে হেদায়া, শরহে বেক্বায়া, শরহে ইলিয়াস, মাকতুবাত শরীফ ইত্যাদি কিতাবের ভাষ্য হলো-
اما لو اقتدى ثلثة بولحد اختلف فيه.
অর্থঃ- “আর যদি ইমামের সহিত তিনজন মুক্তাদী ইক্তিদা করে তাহলে মাকরূহ হওয়ার মধ্যে মতভেদ রয়েছে।”
এখানে বিশেষভাবে লক্ষ্যনীয় যে,
جب تو اصلا كوئى حرج نهير.
এর পূর্বের সমস্ত ইবারতগুলো মাসিক আল বাইয়্যিনাত অক্টোবর/২০০০ ঈঃ সংখ্যার ৩০ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করা হয়েছে।
অথচ তরজুমানওয়ালারা নফল নামায জামায়াতে পড়া নাজায়েয, মাকরূহ্ তাহরীমী ও বিদ্ায়াতে সাইয়্যিয়াহ্ সংক্রান্ত ইবারতগুলো কারচুপি করে বাদ দিয়ে এখান থেকে
উর্দু কম্পোজ করতে হবে
উল্লেখ করেছে।
অথচ এর দ্বারা নফল নামায জামায়াতে আদায় করা প্রমাণিত হয় না। আর জামায়াতে তিনের অধিক মুক্তাদী না হলে অর্থাৎ দুইজন অথবা তিনজন মুক্তাদী হলে জায়েয, মাকরূহ নয়। তবে তিনজ মুক্তাদী হলে কেউ কেউ মাকরূহ বলেছেন একথা মাসিক আল বাইয়্যিনাতে অনেক কিতাবের ইবারতসহ উল্লেখ করা হয়েছে। আর জামায়াতে তিনের অধিক মুক্তাদী না হলে তাতে যে কোন অসুবিধা হবে না সেই অসুবিধা না হওয়ার কথাটি এই
جب تو اصلا كوئى حرج نهير.
ইবারতে বলা হয়েছে। তবে তিনজন মুক্তাদী হলে মাকরূহ হওয়ার মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
আর চারজন মুক্তাদী হলে নফল নামায জামায়াতে আদায় করা সকলের ঐক্যমতে মাকরূহ হবে। যা রেযা খাঁ তার “ফতওয়ায়ে রেজভীয়ার” ১০ খন্ডের ১৭৫, ১৭৬ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছে,
উর্দু কম্পোজ করতে হবে
অর্থঃ- “নফল নামায পড়তে হলে পৃথক পৃথক পড়বে কেননা নফল নামায বড় জামায়াতের সাথে পড়া অর্থাৎ যদি জামায়াতে চারজন মুক্তাদী হয় তাহলে সকল ইমাম ও ফুক্বাহা-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণের ঐক্যমতে মাকরূহ।”
অতএব, মাসিক তরজুমানের জালিয়াতি, ধোঁকাবাজী, প্রতারণা, মিথ্যা ও ইবারতের কারচুপি সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো।
{বিঃ দ্রঃ এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে মাসিক আল বাইয়্যিনাত-এর ১৩ ও ৮৬তম সংখ্যার ফতওয়া ও সুওয়াল-জাওয়াব বিভাগ পাঠ করুন। সেখানে ৭৬টি নির্ভরযোগ্য কিতাবের দলীল পেশ করা হয়েছে।}
(বিশেষ প্রয়োজনে ধারাবাহিকভাবে লেখা হবে ইন্শাআল্লাহ্)
মুহম্মদ তাজউদ্দিন মামুন
হালিশহর, চট্টগ্রাম।
সুওয়ালঃ রেজভী ফিরকার অখ্যাত এক পত্রিকায় দেখতে পেলাম প্রশ্নোত্তর বিভাগে লিখেছে, মাকি আল বাইয়্যিনাতে রেজভীদের কিতাবের বরাত দেয়ার অর্থ নাকি তাদের ইল্ম ও কলমকে স্বীকার করে নেয়া।
আর বহুল প্রচারিত “মাসিক আল বাইয়্যিনাতে” রেজভীদের অখ্যাত কিতাবগুলোর বরাত না দিলে হয়না?
জাওয়াবঃ মহান আল্লাহ পাক-এর রহমতে মাসিক আল বাইয়্যিনাত-এর প্রতিষ্ঠাতা ও পৃষ্ঠপোষক, ইমামুল আইম্মা, কুতুবুল আলম, মুহ্ইস্ সুন্নাহ্, গাউসুল আযম, দাস্তগীর, সুলতানুল আরিফীন, মুজাদ্দিদুয্ যামান, আওলাদে রসূল ঢাকা, রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর ছাহেব ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলী-এর ব্যক্তিগত লাইব্রেরীতে এক কোটিরও বেশী টাকার কিতাব রয়েছে। যা অনেকের কাছেই নেই। তন্মেধ্যে হাদীস শরীফ, তাফসীর, ফিক্বাহ্, ফতওয়া ইত্যাদি সব বিষয়েই শত শত কিতাব রয়েছে। যার প্রমাণ ইতোমধ্যে পাঠকগণ পেয়ে গেছেন।
শরীয়তের কোন বিষয় প্রমাণ করার জন্য রেজভী কেন, দেওবন্দীদেরও কিতাবের বিন্দুমাত্র সাহায্যের আমাদের প্রয়োজন নেই। তবে কোন কোন ক্ষেত্রে তাদের কিতাবের বরাত দেয়া হয় তাদেরই গোমরাহী ও ভন্ডামী জনগণের কাছে তুলে ধরার জন্য যে, দেখ! তারা কত বড় জাহিল, ভন্ড ও গোমরাহ্ যে, নিজ মুরুব্বীর মতের বিরুদ্ধে ফতওয়া দেয়, নিজ সিলসিলার মুরুব্বী বা প্রণেতার কিতাবের খবরও রাখেনা। তাদের জিহালতী ও ভন্ডামী প্রকাশ করে দেয়ার জন্যই মূলতঃ তাদের কিতাবের বরাত দেয়া হয়।
কারো কিতাবের বরাত দেয়ার অর্থ কখনোই এটা নয় তার ইল্ম ও কলমকে স্বীকার করে নেয়া। যদি তাই হয় তবে তো রেজভীরাও দেওবন্দীদের কলম ও ইল্মকে স্বীকার করে নিয়েছে। এরূপ বহু প্রমাণ রয়েছে যে, তারা প্রসঙ্গতঃ দেওবন্দীদের বহু কিতাবের খন্ড, পৃষ্ঠাসহ ইবারত উল্লেখ করে দলীল দিয়েছে। তবে কি রেজভীরা এখন দেওবন্দী হয়ে গেছে? আর রেজভীদের মতে দেওবন্দীরা এখন আর কাফির নয়?
মূলতঃ নিজেদের হাক্বীকত প্রকাশ পেয়ে যাওয়ায় এবং তারা যে মুরুব্বীর ফতওয়াও মানেনা এবং নিজ সিলসিলার খবরও রাখেনা তা জনসম্মুখে প্রকাশ হয়ে যাওয়ায় দিক-বেদিক জ্ঞানশুণ্য হয়ে অবান্তর ও অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্নোত্তর অবতারণা করে প্রশ্নোত্তর বিভাগের শুণ্যস্থান পূরণ করেছে মাত্র।
মুহম্মদ আব্দুছ ছামাদ (আনছার কমান্ডার)
গ্রামঃ দক্ষিণ সাদুল্যা, ডাকঃ মাটিয়াল
থানাঃ উলিপুর, জেলাঃ কুড়িগ্রাম।
সুওয়ালঃ- এক ব্যক্তি তার স্ত্রীকে তিন তালাক দিয়েছে। এর স্বাক্ষী তিনজন পুরুষ রয়েছে। জনৈক মাওলানা ছাহেব তিন তালাক শোনার পর তালাকদাতা স্বামীকে কয়েক দোররা বেত মেরে তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীর সাথে বিবাহ্ পড়িয়ে দিয়েছে। ইহা শরীয়তসম্মত হয়েছে কি-না?
জাওয়াবঃ- উক্ত মাওলানা ছাহেবের বিবাহ্ পড়ানো কাজটি শরীয়তসম্মত হয়নি। কারণ স্বামী তার স্ত্রীকে তিন তালাক দিয়েছে। তিন তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীর সাথে তালাকদাতা স্বামীকে শুধুমাত্র দোররা মেরে বিবাহ্ পড়িয়ে দিলে সেই বিবাহ্ শরীয়তে গ্রহণযোগ্য নয়।
তালাকদাতা স্বামীর সাথে তিন তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীর বিবাহ্ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক বলেন,
فان طلقها فلاتحل له من بعد حتى تنكح زوجا غيره.
অর্থঃ- “স্বামী যদি তার স্ত্রীকে (তিন) তালাক প্রদান করে তাহলে স্ত্রী অন্য স্বামীর সহিত বিবাহ্ েআবদ্ধ না হওয়া পর্যন্ত তালাকদাতা স্বামীর জন্য উক্ত স্ত্রীকে গ্রহণ করা জায়েয বা হালাল হবে না।” (সূরা বাক্বারা/২৩০)
অর্থাৎ তিন তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রী ইদ্দত পালনের পর অন্য স্বামীর সহিত বিবাহ্ েআবদ্ধ হয়ে পরস্পর মেলামেশা করার পর দ্বিতীয় স্বামী যদি তালাক দেয় অতঃপর ইদ্দত পালন করবে। এই ইদ্দত পালনের পর প্রথম স্বামী ইচ্ছা করলে পুনরায় বিবাহ্ করতে পারবে।
এ তরতীবের খেলাফ বিবাহ্ পড়িয়ে দিলে কস্মিনকালেও বিবাহ্ শুদ্ধ হবে না।
অতএব, উক্ত মাওলানা ছাহেবের বিবাহ্ পড়া শুদ্ধ হয়নি। এখন উক্ত মাওলানা ছাহেব, তালাকদাতা স্বামী ও তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রী সকলকে খালেছ তওবা-ইস্তিগ্ফার করতে হবে। আর উক্ত স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার বিবাহ্ ভঙ্গ করে দিতে হবে।
{দলীলসমূহঃ (১) আলমগীরী, (২) শামী, (৩) দুররুল মুখতার, (৪) ফতহুল ক্বাদীর, (৫) আইনুল হেদায়া, (৬) শরহে বেক্বায়া, (৭) কাজীখান, (৮) বাহরুর রায়েক, (৯) কানযুদ্দাক্বায়েক, (১০) নুরুল হেদায়া, ইত্যাদি সমূহ ফিক্বাহের কিতাব।}