(তৃতীয় পর্ব)
“মহান আল্লাহ পাক উনাকে আলো বা জ্যোতি অর্থে নূর বলা এবং আখেরী রসূল সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিইয়ীন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে মহান আল্লাহ পাক উনার জাতের অংশ বলা কুফরী।” এর স্বপক্ষে স্বঘোষিত সুন্নীদের আতঙ্ক “মাসিক আল বাইয়্যিনাতে” অসংখ্য, সুস্পষ্ট ও অকাট্য দলীল প্রমাণাদি পেশ করার পরও অদক্ষ জলীলের হিদাযেত নছীব হলোনা। সে এখনো উক্ত কুফরী মতবাদের উপরই দৃঢ় রয়েছে। কিভাবে এবং কখন যে তার হিদায়েত নছীব হবে তা মহান আল্লাহ পাক তিনিই ভাল জানেন।
মূলত: যে ব্যক্তি ইবলিসের ন্যায় কিবর বা অহঙ্কারের সমুদ্রে হাবুডুব খায় এবং ইবলিসের ন্যায় গোমরাহীতে দৃঢ়, তাদের হিদায়েত নছীব না হওয়াটাই স্বাভাবিক। তাদেরকে হেদায়েতের পথে আসার জন্যে যতই সুযোগ সুবিধা, দলীল-আদিল্লা বা যুক্তি প্রদান করা হোকনা কেন, তারা কখনোই হিদায়েত গ্রহণ করবেনা।
দেখুন! ইবলিস শয়তান অহঙ্কার করে নিজেকে হযরত আদম আলাইহিস সালাম উনার থেকে বড় বা শ্রেষ্ঠ মনে করে এবং তার ভুল ইজতিহাদ বা ক্বিয়াসের উপর আমল করতে গিয়ে হযরত আদম আলাইহিস সালাম উনাকে সিজদা করা থেকে বিরত থাকলো। যার ফলে তার উপর মহান আল্লাহ পাক উনার লা’নত বর্ষিত হলো, সে হয়ে গেল, “মুয়াল্লিুমুল মালাকুত” থেকে মালউন বা লা’নত প্রাপ্ত।
একবার জলীলুল ক্বদর রসূল হযরত মূসা কালামুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার সাথে সাক্ষাত হয় এই ‘মালউনের’।
‘মালউন’ বললো- হে হযরত মূসা কালামুল্লাহ আলাইহিস সালাম! আপনি আপনার রবের সাথে কথা বলেন, আপনি আপনার রবকে জিজ্ঞাসা করে দেখুন তো, মহান আল্লাহ পাক তিনি আমাকে ক্ষমা করবেন কিনা? আমি তওবা করতে চাই, হযরত মূসা কালীমুল্লাহ আলাইহিস সালাম তিনি মনে করলেন- ভাল সুযোগ পাওয়া গেছে, কারণ ইবলিস যদি হিদায়েত হয়ে যায় তবে সমস্ত উম্মতই হিদায়েত হয়ে যাবে। তাই হযরত মূসা আলাইহিস সালাম তিনি ইবলিসকে বললেন, তুমি একটু অপেক্ষা কর, আমি এখনই মহান আল্লাহ পাক উনার সাথে কথা বলে আসছি। হযরত মূসা আলাইহিস সালাম তিনি মহান আল্লাহ পাক উনার দরবারে আরজ করলেন- হে বারে এলাহী! ইবলিস তার ভুল বুঝতে পেরেছে, সে তওবা করতে চায়, আপনি তার তওবা কবুল করে তাকে ক্ষমা করে দিন। মহান আল্লাহ পাক তিনি বললেন, হে মূসা আলাইহিস সালাম! আমি অবশ্যই তাকে ক্ষমা করে দিব, তবে একটি কাজ তাকে করতে হবে, আর তা হলো- সে যেন আমার নবী ও রসল হযরত আদম আলাইহিস সালাম উনার কবর শরীফকে সিজদা করে। তবেই আমি তাকে ক্ষমা করে দিব। হযরত মূসা আলাইহিস সালাম একথা শুনে খুব খুশি হয়ে গেলেন, কারণ এটাতো সহজ কাজ এবার ইবলিস হিদায়েত হয়ে যাবে। এই ভেবে হযরত মূসা আলাইহিস সালাম তিনি ইবলিসের নিকট আসলেন এবং বললেন, হে ইবলিস! তোমার জন্য সুসংবাদ রয়েছে, তোমাকে মহান আল্লাহ পাক তিনি ক্ষমা করে দিবেন, তবে তোমাকে সহজ একটি কাজ করতে হবে। আর তা হলো- তুমি গিয়ে হযরত আদলম আলাইহিস সালাম উনার কবর শরীফ-এ একটি সিজদা দিবে, তবেই মহান আল্লাহ পাক তিনি তোমাকে ক্ষমা করে দিবেন। একথা শুনে অহঙ্কারী ও মালউন ইবলিস বলে উঠলো, হে মূসা আলাইহিস সালাম, আপনি বলেন কি? যাকে আমি জীবিত অবস্থায় সিজদা করিনি তাকে মৃত অবস্থায় কবরের উপর সিজদা করবো? এটা আমার পক্ষে কস্মিনকালেও সম্ভব নয়। এত সহজ ও সুন্দর সুযোগ দেয়ার পরও ইবলিসের হিদায়েত নছীব হলো না। কারণ সে অহঙ্কারী ও গোমরাহীর মধ্যে দৃঢ়।
অনুরূপ কাট্টা কাফির আবু জেহে, আবু লাহাবরা আখেরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিইয়ীন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে বলেছিল, ইয়া রসূলাল্লাহ, ইয়া হাবীবাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আপনি যদি চাঁদ দ্বিখ-িত করে দেখাতে পারেন এবং মুর্দা জিন্দা করে দেখাতে পারেন, তবে আমরা ঈমান আনবো। আখেরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিইয়ীন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি চাঁদ দ্বিখ-িত করে এবং মুর্দা জিন্দা করে ঠিকই দেখিয়েছেন, কিন্তু এরপরও আবূ জেহেল ও আবু লাহাবরা হিদায়েত হয়নি। কারণ তারা ছিল গোমরাহীতে চরমভাবে নিমজ্জিত ও দৃঢ়। ঠিক একই অবস্থা অদক্ষ জলীল ও তার অনুসারীদের।
তাদেরকে বড় বড় তাফসীর, হাদীছ, ফিক্বাহ, ফতওয়া ও আক্বাইদের কিতাবসমূহ থেকে যত মজবুত দলীলই দেয়া হোকনা কেন এবং বড় বড় যত ইমাম-মুজতাহিদগণ উনাদের বরাত বা রেফারেন্সই দেয়া হোকনা কেন, এমনকি তারা যাদেরকে নবীতুল্য মনে করে থাকে, সেই রেযা খানদের লিখিত বক্তব্যও যদি তাদের সামনে তুলে ধরা হয়, তবুও তারা তা মানবেনা। কারণ তারা একদিকে চরমভাবে নফসের গোলাম, তাই নফসের খাহেশ মিটাতে তারা নিজ মুরুব্বির ফতওয়ার বিপরীত আমল করতেও কুণ্ঠাবোধ করে না, তারই একটি জ্বাজ্বল্য প্রমাণ নি¤েœ তুলে ধরা হলো- এই অদক্ষ জলীল কিছু দিন পূর্বে তার কতিপয় অন্ধ ভক্তকে নিয়ে ভারত সফরে গিয়েছিল। তার সাথে বেগানা ও বেপর্দা মহিলাও সফর সঙ্গি হিসেবে ছিল। সে সফর থেকে এসে নিজেকে জাহির করা তথা ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য উক্ত সফরের উপর একটি কিতাব রচনা করে সে উক্ত কিতাবের নাম দেয় “সফর নামা আজমীর” এই সফর নামা থেকেই তার গোমরাহী ও প্রতারণার একটি চিত্র আপনাদের সম্মুখে তুলে ধরছি। সে লিখেছে, “…… সকালে রওনা দিয়ে জুমা ধরলাম বেরেলী শরীফ-এর আ’লা হযরত ….. উনার মসজিদে। আমাদের সাথি মহিলারা …..। সেখানে প্রাণীর ফটো তোলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বাদ্য যন্ত্রের সাথে সামা বা ক্বাওয়ালী সেখানে হারাম।”
পাঠক! এরপর অদক্ষ জলীল তার সিলসিলার যারা গান-বাজনা করে এবং গান-বাজনাকে জায়েয বলে, যেমন- আলী আকবর রেজভী, তাদের উপর একচোট নছীহত ঝাড়লো। কারণ রেযা খানের সিলসিলার হয়ে যারা গান-বাজনা করে সেই রেযা খানের মাযারেই লিখা আছে, গান-বাজনা সম্পূর্ণই নিষেধ বা হারাম।
কিন্তু অদক্ষ জলীল ছবির ব্যাপারে কিছুই লিখলো না, কারণ সে নিজেই ছবি তুলে থাকে। তার সেই “সফর নামা” বই খানা দেখুন, সেখানে সে ও তার সঙ্গিরা কত রকমের পোজ দিয়ে ছবি তুলেছে। যেমন তুলেছে হনুমানের সাথে তেমনি বেগানা-বেপর্দা মহিলার সাথে। অথচ প্রাণীর ছবি তোলা নিষেধ, এটা তার মুরুব্বী রেযা খানের মাযারেই লিখিত রয়েছে। শুধু তাই নয়, রেযা খান তার কিতাবেও ছবি তোলা হারাম লিখেছে। অথচ নফসের গোলাম অদক্ষ জলীল- আখেরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সহীহ হাদীছ শরীফ, ও ইমাম-মুজতাহিদগণ উনাদের নির্ভুল ও অকাট্য ফতওয়া তো অমান্য করলোই এমনকি তার নবীতুল্য রেযা খানের ফতওয়াও অমান্য করলো। এটা শুধু অদক্ষ জলীলের ক্ষেত্রেই নয়, বরং তার যারা বর্তমান মুরুব্বী রয়েছে- যেমন তৈয়বশাহ, তাহের শাহ, ছাবের শাহ তাদের ক্ষেত্রেও দেখা যায় যে, তারা বৎসরে একবার বা দুবার এদেশে আসে, পুরুষ-মহিলা এক সাথে নিয়ে জুলুস বের করে, মহিলাদের সাথে সরাসরি দেখা সাক্ষাত করে, তাদের গায়ে ফুঁ দেয়, অহরহ তাদের ছবি পেপার পত্রিকায় আসে, তাদের মাহফিলগুলো ভিডিও করা হয়। অদক্ষ জলীলের মতে এরাই নাকি আবার পীরে তরীকত ও হক্কানী ওলী। (নাউযুবিল্লাহ) ভাবতে অবাক লাগে। বেপর্দা ও ছবি তোলার ন্যায় হারাম কাজ করেও অদক্ষ জলীল কি করে পীরে তরীক্বত দাবী করে?
মূলত: এদের আরো অনেক হাক্বীকত আমাদের জানা আছে যা সময়ে প্রকাশ করা হবে ইনশাআল্লাহ।
পাঠক! যারা কুরআন-সুন্নাহতো দুরে থাক, নিজেদের মুরুব্বীর ফতওয়াই মানেনা বা পালন করেনা তারা কিভাবে হিদায়েত লাভ করবে? যদি তারা হিদায়েত তলবকারীই হতো তবে মাসিক আল বাইয়্যিনাত-এর “নূর” সম্পর্কিত ফতওয়াই তাদের হিদায়েত লাভের জন্যে যথেষ্ট ছিল। যেহেতু অদক্ষ জলীল ইবলিসের ন্যায় অহঙ্কারের সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছে, গোমরাহীর সাগরে নিমজ্জিত আছে এবং নফসের গোলামী করে থাকে তাই তার হিদায়েত নছীব হয় নাই।
কারণ মহান আল্লাহ পাক তিনিই পবিত্র কালামে পাকের অসংখ্য স্থানে বলেছেন, “যে ব্যক্তি গোমরাহীর মধ্যে দৃঢ়, সে কখনোই হিদায়েত পায়না বা পথ প্রদর্শক ওলী পায়না।”
-মুফতী মুহম্মদ ইবনে ইসহাক, বাসাবো, ঢাকা।
(প্রথম পর্ব)
মহান আল্লাহ পাক তিনি পবিত্র হাদীছে কুদসীতে ইরশাদ করেন,
كنت كنزا مخفيا فاحببت ان اعرف فخلقت الخلق لاعرف.
অর্থ: “আমি মহান আল্লাহ পাক উনার একটি গুপ্ত ধন-ভান্ডার ছিলাম।
অর্থাৎ আমাকে কেউ চিনতনা, আমার, ইচ্ছে হলো- আমি পরিচিতি লাভ করি। তাই আমি পরিচিতি লাভ করার উদ্দেশ্যে মাখলুকাত সৃষ্টি করলাম।” অর্থাৎ “নূরে মুহম্মদী” ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে সৃষ্টি করলাম।” আর উক্ত ‘নূরে মুহম্মদী’ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার থেকে একটি অংশ নিয়ে পর্যায়ক্রমে তামাম মাখলুকাত সৃষ্টি করি।
এ মাখলুকাত সৃষ্টি করার উদ্দেশ্য সম্পর্কে মহান আল্লাহ পাক তিনি পবিত্র কালামে পাকে ইরশাদ করেন,
وما خلقت الجن والانس الا ليعبدون.
অর্থাৎ “আমি জিন ও মানব জাতিকে শুধুমাত্র আমার ইবাদত তথা মা’রিফত-মুহব্বত হাছিল করার জন্য সৃষ্টি করেছি।”
মানবজাতির নিকট ইবাদত করার তথা মা’রিফত মুহব্বত অর্জন করার নিয়ম-নীতি, তর্জ-তরীকা বা বিধি-বিধান পৌছে দেয়ার জন্য মহান আল্লাহ পাক তিনি এ পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন- এক লক্ষ মতান্তরে দুই লক্ষ চব্বিশ হাজার নবী ও রসূল আলাইহিমুস সালাম।
এ প্রসঙ্গে তাফসীরে উল্লেখ আছে যে, মহান আল্লাহ পাক যখন মানব জাতির রূহগুলোকে সৃষ্টি করলেন, সৃষ্টি করে জিজ্ঞাসা করলেন, الست بربكم
অর্থ: আমি কি তোমাদের রব নই?
সকল রূহই জবাব দিল- بلى অর্থাৎ হ্যাঁ আপনিই আমাদের একমাত্র রব। মহান আল্লাহ পাক তিনি বললেন, তোমরা যমীনে গিয়ে একথা ভুলে যেওনা। রূহ সম্প্রদায় বললো, যমীনে গিয়ে আমাদের একথা স্মরণ নাও থাকতে পারে আয় মহান আল্লাহ পাক! মহান আল্লাহ পাক তিনি বললেন, তোমাদের চিন্তার কোন কারণ নেই, একথা স্মরণ করে দেয়ার জন্য তথা তোমাদের হিদায়েতের জন্য আমি তোমাদের মাঝে আমার সবচেয়ে প্রিয় ও মুহব্বতের বান্দা অর্থাৎ আমার নবী ও রসূলগণ উনাদেরকে পাঠাতে থাকবো। আর সর্বশেষ নবী-রসূল হিসেবে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে পাঠাবো। উনার পর ক্বিয়ামত পর্যন্ত আর কোন নবী-রসূল পৃথিবীতে আগমন করবেন না। উনার পর থেকে ক্বিয়ামত পর্যন্ত মানবজাতির হিদায়েতের জন্য পৃথিবীতে আগমন করবেন নায়েবে নবী বা ওরাছাতুল আম্বিয়াগণ।
তাই আমরা দেখতে পাই এ পৃথিবীতে আগমন করেছেন, আখেরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনিসহ এক লক্ষ চব্বিশ হাজার মতান্তরে দুই লক্ষ চব্বিশ হাজার নবী ও রসূল এবং অসংখ্য, অগনিত নায়েবে নবী বা ইমাম-মুজতাহিদ, পীর-মাশায়েখ ও আউলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণ।
নবী-রসূল আলাইহিমুস সালামগণ উনাদের মধ্যে যেরূপ ‘উলুল আযমে মিনার রসূল’ অর্থাৎ বিশেষ মর্যাদা প্রাপ্ত রসূল প্রেরিত হয়েছেন। তদ্রুপ নায়েবে নবীগণ উনাদের মধ্যেও বিশেষ মর্যাদা প্রাপ্ত নায়েবে নবী পৃথিবীতে আগমন করেছেন এবং করবেন। আর উনারা হচ্ছেন যামানার “মুজাদ্দিদ বা সংস্কারক।”
মুজাদ্দিদের আগমন প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব আখেরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ করেন,
ان الله تعالى يبعث لهذه الامة على رأس كل مائة سنة من يجددلها دينها.
অর্থ: “নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ পাক তিনি প্রত্যেক হিজরী শতকের শুরুতে এ উম্মতের জন্য এমন এক ব্যক্তিকে প্রেরণ করবেন, যিনি উনাদের দ্বীনের তাজদীদ বা সংস্কার করবেন।” (আবূ দাউদ শরীফ)
পাঠক! এমনি ধরনের একজন খাছ ‘মুজাদ্দিদ’ হিসেবে ত্রয়োদশ শতাব্দিতে এ ধরায় আগমন করেছিলেন শহীদে আযম, ছহেবে ইলমে লাদুন্নী, বাহরুল উলূম ওয়াল হিকাম, শায়খুল আরব ওয়াল আযম, সাইয়্যিদুল আউলিয়া, দলীলুল আরেফীন, মাখযানে মা’রিফাত, রুহুল হাক্বে, সিরাজুল উম্মত, আসাদুল্লাহ, মুহইস সুন্নাহ, দাফিউল বিদয়াত, মুজাদ্দিদে মিল্লাত, আমীরুল মু’মিনীন, ইমামে তরীক্বায়ে মুহম্মদিয়া, আওলাদে রসূল, ইমামে আহলে সুন্নত, শায়খে আ’লা হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি।
আর সেই মহান ‘মুজাদ্দিদকে’ ইংরেজদের সুরে সুর মিলিয়ে “কাফির ও ওহাবী” ফতওয়া দিয়ে রেজভী ফিতনার গোড়া পত্তন করলো বাঁশ বেরেলীর এক অখ্যাত, তাসাউফ শূন্য, তথাকথিত আশেকে রসূল আহমদ রেযা নামক এক মৌলভী।
আমি অত্র কলামে রেযা খানের দেয়া কুফরী ফতওয়ার খ-নসহ তার সমুদয় ভুল-ভ্রান্তিগুলো পর্যায়ক্রমে তুলে ধরবো ইনশাআল্লাহ। (চলবে)
মুফতী আবুল হাসান, মতলব, চাঁদপুর।
মক্কা শরীফ বিজয় হলে গেল। দলে দলে মানুষ দ্বীন ইসলাম গ্রহণ করতে লাগল। সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি যেন নিজের মাঝে স্বীয় মাহবুবের ডাক শুনতে পেলেন। সৃষ্টির সূচনা লগ্ন হতে সার্বক্ষনিক ওহীর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত থাকার পরও, বারে এলাহীর চরম সন্তুষ্টির মাঝে নিমজ্জিত থাকার পরও প্রতি মুহুর্তে রাফে দারাজাত বা সম্মান বৃদ্ধির সম্মান দ্বারা ভূষিত থাকলেও এ ধরাধাম থেকে বিদায়লগ্নে উম্মতকে উদ্দেশ্য করে এক অভিনব আহবান জানালেন। ঘোষণা দিলেন, “আমার কাছে যদি তোমাদের কারো কিছু পাওনা থাকে তবে তা ব্যক্ত করে নিয়ে যাও।”
এতদ্বপ্রেক্ষিতে এক অদ্ভূত দাবিকারী হাজির হলেন। তার দাবির মোদ্দাকথা রসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে প্রহার করেছেন, সুতরাং তিনিও রসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে স্পর্শ করবেন। সমবেত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ উনারা অন্য হাজারো উপকরণে তাকে নিবৃত্ত করতে চাইলেন কিন্তু তিনি স্বীয় দাবিতে অটল। এদিকে স্বয়ং রসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার দাবি মেটানোর সুযোগ দিলেন। কিন্তু দাবিকারী তখন আরো এক নতুন দাবির অবতারণা করল। রসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার কাঁধ মুবারক পোশাকের আবরণ থেকে উন্মুক্ত করে দিতে হবে। এটাই নাকি তার অভীষ্ট স্থান। অবশেষ তাই দেয়া হল।
আর তখনই ঘটল আসল ঘটনা। রসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার কাঁধ মুবারক-এর পোশাক উন্মুক্ত করতেই প্রকাশ হয়ে পড়ল সোনালী অক্ষরে জ্বলজ্বল করা মোহরে নুবুওওয়াত। অনুপমভাবে কাঁধে অঙ্কিত “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহম্মদুর রসূলুল্লাহ”। দাবিকারী সাথে সাথে তথায় চুম্বন করে জানালেন, এটাই ছিল তার মূল মকছুদ। আর সবই তার কৌশলমাত্র। কিন্তু কৌশল হলেও, আপাত দৃষ্টিতে তা অপ্রস্তুতজনিত অবস্থা হলেও এ ঘটনার আড়ালে উসওয়াতুন হাসানা, রসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি আমাদের মাঝে যে আদর্শ রেখে গেলেন তা হল হক্বদারের হক্ব আদায় সম্পর্কে। মূলত: একজনের হক্ব বা অধিকার আরেকজনের দায়িত্ব বা কর্তব্য।
হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ উনারাও এই আদর্শের অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। হযরত ওমর ফারুক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বলেছেন, “ফোরাতের তীরে একটি কুকুরও যদি না খেয়ে মারা যায় তবে আমি হযরত ওমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনাকে তার জবাবদিহী করতে হবে।” যেটা হাদীছ শরীফ-এ এসেছে, “প্রত্যেকেই রক্ষক, তাকে তার রক্ষিত বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে।”
প্রসঙ্গত: আলেম দাবিদারদের জিজ্ঞেস করা হবে তাদের ফতওয়া প্রসঙ্গে, আম লোক যে ফতওয়া শুনে আমল করত। যে প্রসঙ্গে “হযরত আবূ হুরায়রা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার হতে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, “ সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলেন, “যে ব্যক্তিকে ইলম ব্যতীত ফতওয়া দেয়া হয়েছে, অতপর সে তদনুযায়ী কাজ করেছে, তার গুণাহ যে তাকে ফতওয়া দিয়েছে, তার উপরই পড়বে।” (আবু দাউদ শরীফ)
এতদ্বপ্রেক্ষিতে সকল মুহাক্কিক আলেমই এ হাদীছ শরীফ-এর উপর আমল করেছেন। এ প্রসঙ্গে সীরতগ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে যে, হযরত ইমাম মালেক রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি প্রথম যেদিন ফতওয়ার মসনদে বসলেন মুফতী হিসেবে, ফতওয়া দেয়ার জন্য, সেদিনই উনার কাছে ৪০টি মাসয়ালা বা সুওয়াল আসলো। তিনি ১৮টির জাওয়াব দিলেন এবং বাকী ২২টির জাওয়াবে বললেন, ‘আমি জানি না।’ যখন জাওয়াব শেষ হয়ে গেলো এবং সুওয়ালকারীগণ চলে গেলেন, তখন উনার নিকটবর্তী যে সকল বড় বড় আলেমগণ বসেছিলেন উনারা বললেন, “হে হযরত ইমাম মালেক রহমতুল্লাহি আলাইহি, আপনি কি সত্যিই ঐ ২২টি মাসয়ালার জাওয়াব জানেন না? তখন হযরত ইমাম মালেক রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বললেন, “হ্যাঁ, আমার জানা আছে। তবে ১৮টি মাসয়ালার ক্ষেত্রে আমার পূর্ণ তাহকীক আছে, তাই জাওয়াব দিয়েছি। আর বাকী ২২টি মাসয়ালায় পূর্ণ তাহকীক নেই। হতে পারে বর্তমানে ২২টি মাসয়ালা সম্বন্ধে আমার যে ফয়সালা আছে পূর্ণ তাহকীকের পরে তার ব্যতিক্রমও হতে পারে। এই লোকগুলি অনেক দূর থেকে প্রায় ৬ মাসের রাস্তা অতিক্রম করে আমার কাছে এসেছে মাসয়ালা জানার জন্য। এখন যদি আমি বিনা তাহকীকে তার জাওয়াব দিয়ে দেই যা পূর্ণ শুদ্ধ নয়, তবে তার ভিত্তিতে তারা আমল শুরু করবে। আর পরে যখন আমার পূর্ণ তাহকীক হবে এবং তা যদি বর্তমান ফয়সালার ব্যতিক্রম ফয়সালা হয়, তাহলে তাদেরকে কে এই ফয়সালার বিশুদ্ধ বা পূর্ণ তাহকীক সম্বলিত মতটি জানাবে?
বিষয়টি মূলত সবযুগেই এমন হওয়া উচিত ছিল। কারণ কুরআন শরীফ, হাদীছ শরীফ-এর হুকুম যেমন চিরন্তন তেমনি মানুষের হক্ব তথা দায়বদ্ধতাও চিরন্তন।
সে দায়বদ্ধতার নীতিমালাকে যারা অস্বীকার করে, দুনিয়াবী দৃষ্টিতেই তাদের অসাধু, অসৎ লেখক বলে গণ্য করা হয়। আর ইসলামের দৃষ্টিতে তাকে মানুষের ঈমান আমল বিধ্বংসকারী শয়তানের দোসর, নিকৃষ্ট আলেম বলেই গণ্য করা যায়।
অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বৎসরের পর বৎসর প্রায় প্রতিটি সংখ্যায়ই এরূপ অসৎ, ভুল ও গোমরাহী জনিত লেখা লিখে উম্মাহর কাছে চরম দায়বদ্ধতার সৃষ্টি করেছে মদীনা সম্পাদক মাহিউদ্দীন। কেবল মাত্র মাসিক আল বাইয়্যিনাতই স্বল্প পরিসরে গত ৮ বৎসরে তার অসংখ্য ভুলের মধ্যে অসংখ্য দলীল দিয়ে খ-িয়ে দিয়েছে ৯৩ টিরও বেশি মাসয়ালার ভুল। আর এরূপ অজ¯্র ভুল ও গোমরাহীর উপর যারা আমল করছে তাদের কি উপায় হবে।
-মুহম্মদ লিসানুল্লাহ।
“না না, এরা কাল সাপ। শত্রুর শেষ চিহ্নটুকু মুছে ফেলতে হবে। এই বয়সেই ওরা কোম্পানী রাজত্বের বিরুদ্ধে শ্লোগান দিয়েছে।” কথাগুলো বলল, বারানসীর সামরিক আদালতের কমা-িং অফিসার। আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়ানো কোমলমতি কিশোরদের ফাঁসির আদেশ রহিত করার জন্য নবীন বিচারকের আকুতি ভরা কণ্ঠকে নির্মমভাবে উপক্ষা করে কড়া ভাবেই কথাগুলো বলল সে। উপরন্ত সুপারিশকারীকে ভৎসনা করে বলল, “আপনার অভিজ্ঞতা কম তাই ¯েœই বেশি। এর চেয়েও কম অপরাধে আমরা হাজার হাজার লোককে ফাঁসি দিয়েছি।”
আর সে ধারাবাহিকতায় অবশেষে কচি শিশু গুলোও ফাঁসী হয়ে গেল। তথাকথিত সুসভ্য এ ইংরেজরা এদেশবাসী বিশেষত: এদেশীয় মুসলমানদের উপর যে অবর্ণনীয়, অমানবিক, নির্মম অত্যাচার চালাত তা ইতিহাস তো বটেই এমনকি অনেক স্বগোত্রীয় ইংরেজ অফিসার, লেখক, সাংবাদিকের বর্ণনায়ও জ্বলজ্বল হয়ে আছে। সাংবাদিক উইলিয়াম রাসেল ইংরেজদের অকল্পনীয় নিষ্ঠুর নৃশংসতার বিবরণ দিয়েছে তার ডায়েরী অব ই-িয়া গ্রন্থে। তাতে একস্থানে উল্লেখ করা হয়েছে, “একজন সামরিক অফিসারের সাথে আজ আমার আলাপ হলো। তিনি মেজর রেনোনের অধস্তন কর্মচারী। তিনি গর্বের সাথে আমাকে জানালেন, স্থানীয়দের হত্যার ব্যাপারে আমরা আপোষহীন। সামনে পেলেই হলো। বিচার বিবেচনা করে মারার সময় আমাদের নেই। নির্বিচারে হত্যা না করলে ওদের কমাবো কি করে? তাই আমরা খতম করেছি শক্তিবানদের। শক্ত-সমর্থ, তেজী-নির্ভীক আর শিক্ষিত-অশিক্ষিত দেশ-প্রেমিকদের আমরা রাখবোনা। গতকাল যখন রাস্তা দিয়ে কুচকাওয়াজ করে আসছিলাম, তখন বারজন পথচারী মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিল। বুঝেছিলাম ওরা আমাদের ঘৃণা করছে। ইংরেজ বিদ্বেষ ওদের অন্তরে। সঙ্গে সঙ্গে আমরা চলা বন্ধ করে বন্দী করেছিলাম সেই হিংসুটে লোকগুলোকে। অন্যদের সামনেই গাছের ডালে তাদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছিল। গ্রাম বাসীরা শিক্ষা গ্রহণ করেছিল। বিচার-সালিশ করে ওদের ফাঁসি দেয়া যেতোনা। সময়ও লাগতো যথেষ্ট। ওসব ঝামেলার মধ্যে আমরা আপাতত যাচ্ছিনা। সন্দেহ হলেই হলো। গত দু’দিনে এইভাবে চলার পথেই বিয়াল্লিশ জন ফাঁসি দিয়েছি। এতো গেল চলার পথের বিবরণ। মেজর রেনোন দিন শেষে যেখানে দলবল নিয়ে আস্তানা গাড়তেন তার আশ পাশের গ্রামগুলোর অবস্থা হতো আরো করুন ও হৃদয় বিদারক। সাথের লোকজন দিয়ে গ্রামগুলোকে তিনি ঘিরে ফেলতেন। গ্রামবাসীরা যাতে বেরুতে না পারে তার পাকাপোক্ত ব্যবস্থা করতেন। তারপর আদেশ দিতেন আগুন জ্বালানোর। গ্রামগুলো পুড়ে ছাই না হওয়া পর্যন্ত তিনি দাঁড়িয়ে থাকতেন অদূরে।” সে সময়কার কানপুরের ম্যাজিষ্ট্রেট জন ওয়াল্টার লিখেছেন, “আমাদের চলার পথে যে সব গ্রাম পড়ল সেগুলো জনশূন্য। গোড়া সিপাহীরা আগেই গ্রামবাসীদের মেরে ফেলেছে। ঘর-বাড়ি, গাছ-পালা পুঁড়িয়ে ছাই করেছে। চারদিকে নিদারুণ শূন্যতা বিরাজ করছে। কিছুদিন আগে পর্যন্ত সে সব জনপদে গৃহস্থরা মনের সুখে ঘরকন্যা করতো। বৃদ্ধেরা করতো ছোটদের খবরদারী। চঞ্চল শিশু কিশোরদের চপলতায় আনন্দ মুখরিত হতো ছায়া ঘেরা শাস্ত গ্রামগুলো। মেয়েরা পর্দা-পুশিদার মধ্যে অতিবাহিত করতো তাদের জীবন। আজ কিছুই নেই। নেই প্রাণের স্পন্দন। ঘর নেই, বাড়ি নেই, বাগান নেই, পশু নেই পাখি নেই। শুধু নেই, আর নেই। গ্রামদেশে এমন নির্জনতা, এমন শুন্যতা কল্পনা করাও দুঃসাধ্য। আছে শুধু পচাঁ দুর্গন্ধময় জলাশয়, পোড় খাওয়া কালো কালো ভিটেমাটি আর গোস্ত চর্মহীন প্রাণীর অস্থি। থেকে থেকে ব্যাঙের গোঙানী কানে আসে। রাতে শোনা যায় ভয়ার্ত শিয়ালের আর্ত চিৎকার। গভীর রাতে ভেসে আসে নাম না জানা পোকা-মাকড়ের একটানা করুণ সূরের ঐক্যতান। একটা উগ্র দুর্গন্ধ নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসে বিঘœ ঘটায়। বড় বড় গাছের শক্ত ডালে এখনো গ্রামবাসীদের প্রাণহীন গলিত দেহগুলো ঝুলছে। ছিড়ে পড়েছে কিছু কিছু। শকুন আর শিয়ালেরা সে সব নিয়ে মহা উৎসবে মগ্ন। মানব জীবন নিয়ে এমন জঘন্য খেলা খেলতে কেউ কোন দিন দেখেছে কিনা আমি জানি না। আমার একার নয়, আমার সঙ্গিদের হৃদয়েও যে শূন্যতা, যে বেদনা, যে সহানুভূতি সৃষ্টি হয়েছে তার স্মৃতি সারাজীবন অ¤œান হয়ে থাকবে। সে অচিস্তনীয় দৃশ্য ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়।”
জহির দেহলভী নামক একজন লেখক ‘দস্তন-ই-গফর’ নামক গ্রন্থে দিল্লীর হত্যাযজ্ঞের বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে, “ইংরেজ সৈন্যরা দিল্লী নগরীর রাস্তায় ভারতীয়দের দেখামাত্রই গুলি করতো। সে ব্যাপারে দোষী আর নির্দোষ বলে কোন বিচার-বিবেচনা ছিলনা।” শুধু ইংরেজদের স্ব-গোত্রীয় লেখায়ই নয়, ইতিহাসের পাতা উল্টালেই জানা যায়, মুসলমানদের প্রতি তারা কিরূপ অবর্ণনীয় নৃশংসতা চালাত। মুসলমানদের দেহ শুকরের চামড়া দিয়ে মুড়িয়ে নদীতে ফেলে দিত। কাছে নদী না থাকলে শুকরের চর্বিতে ভিজিয়ে নেয়া হত মুসলমানদের দেহ। তারপর ঝুলানো হত ফাঁসিতে।
প্রসঙ্গেত: উল্লেখ্য এমন হৃদয় বিদারক নৃশংসতা কি আজকের তথাকথিত অতি সুন্নী দাবিদাররা চিন্তা করতে পারেন? অবশ্য ইংরেজ তোষন গোষ্ঠী তথা রেজা খানের অনুসারীদের অনুধাবন করতে ব্যর্থ হওয়ারই কথা। যদিও খোদ ইংরেজ জাতিই তাদের জাত ভাইদের সে সময়ের নৃশংসতায় আজও লজ্জাবোধ করে। আর সেই জালিমদের বিরুদ্ধে যিনি কেবল জিহাদই নয় বরং খিলাফতও কাযেম করলেন, সেই আমীরুল মু’মিনীন, হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার জিহাদ ও খিলাফতকে পর্যুদস্থ করার জন্য উনার পেছনে উনার এবং এদেশবাসীর কাছে ঘৃণ্য সেন্টিমেন্ট ‘ওহাবী’ আখ্যা জুড়ে দেয়ার কুটকৌশল, যা উইলিয়াম হান্টার গং কর্তৃক সাধিত হয়েছিল তা আরও লজ্জার, ঘৃণার ও ধিক্কারের বিষয়। আর তাতে কেবলি বিচলিত হয়না রেযা খান ভক্ত নির্লজ্জ, নাক্বেছ, জাহিল অন্ধ অনুসারীরা, তথাকথিত সুন্নীরা।
-মুহম্মদ রবিউল্লাহ বাদল।
“তোমরা ঐ সকল লোককে গালী দিওনা যাহারা মহান আল্লাহ পাক তিনি ব্যতীত অন্য কাউকে ডাকে, তাহলে তাহারাও না জানিয়া শত্রুতাবশত মহান আল্লাহ পাক উনাকে গালী দিবে।” (সূরা আনয়াম/১০৮) এই ক্ষেত্রে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি এমনি আদর্শ রাখিয়া গিয়াছেন যে, কাফিরদিগকেও তিনি সরাসরি আক্রমণ করেন নাই। বিপরীত পক্ষ হইতে প্রথম আক্রমণ হইলেই কেবল তাহার জবাব দিয়াছেন।
ঠিক একই সুন্নতের দৃষ্টান্ত স্থাপন করিয়াছে মাসিক আল বাইয়্যিনাত। প্রথমেই দোষ উদঘাটন নহে বরং সুযোগ দেওয়া। কিন্তু সেই সুযোগকে যদি কোন অর্বাচীনরা দুর্বলতা মনে করে তবে তাহার শক্ত জবাব দেওয়া।
কুরআনে কারীমায় এবং হাদীছ শরীফ-এ যেইখানে মহান আল্লাহ পাক এবং উনার রসূল হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিধর্মীদের উপাস্যদের গালি দিতে নিষেধ করিয়েছেন। সেইখানে বিধর্মীদের উপাস্য নহে, সাধারণ মুসলমান নহে, বরং সৃষ্টির শুরু হইতেই মহান আল্লাহ পাক উনার মকবুল ওলীআল্লাহ, মুজাদ্দিদে জামান, ইমামুল আয়িম্মা, মুহইস সুন্নাহ, আওলাদে রসূল, আমীরুল মু’মিনীন, হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে কাফির ফতওয়া দেওয়া যে কি চরম জিহালত ও স্পর্ধাজনিত কাজ তাহা বলার অপেক্ষা রাখেনা। এই জন্য বলা হইয়াছে, “জ্ঞানমূলক কথা যদি কোন মূর্খ লোকও বলে তবু তাহা মানিয়া নাও। আর কোন জ্ঞানী নামধারী ব্যক্তিও যদি কোন মূর্খতা সূচক কথা বলে তবুও তাহা সযত্নে পরিহার কর।”
মূলত: মহান আল্লাহ পাক ও উনার রসূল সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নিকট মকবুল ওলীআল্লাহ উনাকে কাফির আখ্যা দেওয়া কখনও জ্ঞানীর কাজ নহে। আর এর পরিণতিও মোটেই ভাল নহে। হাদীছ শরীফ-এ ইরশাদ হইয়াছে, “কাউকে যখন কাফির ফতওয়া দেওয়া হয় তখন উহা আসমানে উঠিতে চাহে, কিন্তু আসমানের দরজা তখন বন্ধ করিয়া দেওয়া হয়। অতপর তাহা যমীনে পড়িতে চাহে, কিন্তু যমীনের দরজাও তখন বন্ধ হইয়া যায়। অতপর যাহাকে উদ্দেশ্য করিয়া বলা হইয়াছে তাহার উপর গিয়া পড়িতে চাহে। কিন্তু সে যদি সেইরূপ না হয় তাহা হইলে যে বলিয়াছে তাহার উপর গিয়াই পড়ে এবং সে তখন কাফির অবস্থায় মারা যায়।” এই কারণে বিদয়াতীদেরও কাফির বলা সম্পর্কে মুহাক্কিকগণ সতর্ক করিয়াছেন। শাইখুল ইসলাম শায়খ তকিউদ্দীন সাবকীকে প্রশ্ন করা হইয়াছিল, বিদয়াতীদের কাফির বলা সম্বন্ধে, সাইয়্যিদুনা শাইখুল ইসলাম কি বলিতে চান? উত্তরে তিনি বলিয়াছেন, “ভাই সাহেব, মহান আল্লাহ পাক তিনি আপনাকে এবং আমাকে সাহায্য করুন। জানিয়া রাখুন যে ঈমানদার দিগকে কাফির বলিয়া ফতওয়া দেওয়া অতিশয় কঠোর ব্যাপার। যেই সমস্ত বিদয়াতীগণ কালিমা তৈয়ব লা-ইলাহা-ইল্লাল্লাহু মুহম্মদুর রসূলুল্লাহ প্রকাশ্যভাবে স্বীকার করে তাহাদিগকে কাফির বলা যাহার হৃদয়ে ঈমান আছে তাহার নিকট খুবই কঠিন। কারণ কাউকে কাফির বলা অতি ভয়াবহ ও বিপদজনক। কাহাকেও কাফির বলার অর্থ এই যে, তাহাকে পরিস্কার বলিয়া দেওয়া যে, সে আখিরাতে অনন্তকালের জন্য দোযখে থাকিবে এবং পৃথিবীতে তাহার রক্তপাত করা এবং তাহার ধন-সম্পদ হস্তগত করা বৈধ। তাহাছাড়া সে কোন মুসলমান স্ত্রীলোককে বিবাহ করিতে পারিবেনা এবং তাহার জীবদ্দশায় ও মৃত্যুর পর ইসলামের কোন বিধান প্রযোজ্য হইবেনা।” তিনি আরো বলেন, “যেই সব বিষয়ের উপর ভিত্তি করিয়া কাফির বলা হয় সেই সব বিষয় অতি সুক্ষ্ম ও গভীর। তাহার শাখা-প্রশাখা অনেক বেশি। প্রত্যেকটির মূল-মন্ত্র আবার খুবই সুক্ষ্ম, ইঙ্গিতসমূহ ভেদপূর্ণ এবং লক্ষ্যস্থল বিভিন্ন প্রকারের। যাহার নিকট এই সমস্ত বিষয়ে সম্পূর্ণ সত্যের পরিচয় আছে তাহার ও এই বিষয়ে প্রত্যেকটি শাখা-প্রশাখার বিভিন্ন ইঙ্গিত এবং সমূহ প্রকারের লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে কোথায় কি ভুল-ত্রুটি আছে তাহার জ্ঞান লাভ করা আবশ্যক। ইহা ছাড়াও তাহাকে সমস্ত ভাবার্থের তাৎপর্য, স্থান-বিশেষে ব্যবহারের শর্তাবলী এবং ভাবার্থ বিশিষ্ট ও ভাবার্থহীন শব্দ সমূহেরও পরিচয় লাভ করিতে হইবে। যাহা করিতে হইলে তাহাকে আরবের সমস্ত সম্প্রদায়ে সমস্ত গুঢ় তত্ত্ব, যাবতীয় অর্থ ও ভাবার্থসহ জ্ঞান লাভ করিতে হইবে। তৌহিদের বিষয়ে এইরূপ সুগভীর জ্ঞান লাভ করা অধিকাংশ আলেমের পক্ষেই সম্ভব নহে।” (মানারূত তাওহীদ)
বলাবাহুল্য এমনই সম্ভব ছিলনা আহমদ রেযা খানের। আর সেই জ্ঞানের অভাবেই সে তাকভীয়াতুল ঈমান কিতাবের প্রেক্ষিতে ইসমাইল শহীদ রহমতুল্লাহি আলাইহি ও আমীরুল মু’মিনীন হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে কাফির বলিয়া অমার্জনীয় অপরাধ করিয়াছে এবং মূলত: নিজেই কুফরী করিয়াছে।
-মুহম্মদ আরিফুর রহমান।
“যে মহান আল্লাহ পাক উনার আয়াতসমূহ শুনে, অতপর অহঙ্কারী হয়ে জিদ ধরে, যেন সে আয়াত শুনেনি। অতএব তাকে যন্ত্রনাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ দিন। যখন সে আমার কোন আয়াত অবগত হয় তখন তাকে ঠাট্টারূপে গ্রহণ করে। এদের জন্যই রয়েছে লাঞ্ছণাদায়ক শাস্তি।”
উল্লেখ্য কুরআনে কারীমার আয়াত শরীফ-এর নুযুল খাছ কিন্তু হুকুম আম অর্থাৎ কোন ব্যক্তি বা ঘটনা যা কাফিরদের উদ্দেশ্য করে কোন আয়াত শরীফ নাযিল হলেও তার প্রয়োগ, সম্পক্ত বা সদৃশ সবক্ষেত্রে এমনকি মুসলমান বা নামধারী মুসলমানদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে।
তাই প্রদত্ত আয়াত শরীফ-এর প্রেক্ষিতে বলতে হয় যে, ইতোমধ্যে উলামায়ে ছূ’দের মুখপত্র, ইসলামের নামে ভুল মাসয়ালা, বিকৃত দ্বীনি শিক্ষা পরিবেশনকারী মাসিক মুহীনুল ইসলামের মিথ্যাবাদী, পাপাচারী লেখক আব্দুল গণি কর্তৃক তদীয় পত্রিকায়, রাজারবাগ শরীফ সম্পর্কে লিখিত যাবতীয় মিথ্যাচারের দাঁতভাঙ্গা শক্ত জবাব দেয়া হলেও, একের পর এক মিথ্যা বক্তব্যের সকল অসারতা ও অসত্যতা এবং জেহালতি সূচক মন্তব্যের সমুচিত জবাব দেয়ার পরও সে একই মিথ্যাচারীতার, একই গোমরাহীর উপর দৃঢ় রয়েছে। আয়াত শরীফ-এ প্রদত্ত কাফিরদের মত অহঙ্কারী হয়ে ভান ধরেছে যে ইতোপূর্বে তার মিথ্যাচারিতার জবাবে, লক্বব সম্পর্কে জিহালতির বক্তব্যে সারাদেশব্যাপী রাজারবাগ শরীফ-এর মাহফিলের ২/১টি বিচ্ছিন্ন ঘটনায়, অপতৎপরতাকারীদের অপপ্রয়াসের প্রেক্ষিতে তার কল্পিত ঠাট্টা-বিদ্রুপের যে জ্ঞান গর্ভ জবাব বাইয়্যিনাতে এসেছে তা যেন সে পড়েইনি।
মূলত হক্ব ওলীআল্লাহকে মিথ্যা ঠাওরানো, উনার মাহফিল নিয়ে কল্পিত ঠাট্টা-বিদ্রুপ করে আব্দুল গণি সাহিত্য অর্বাচীন তথা আদুল গাই সেই কাফিরদেরই অনুকরণ করেছে। কাফিররা মহান আল্লাহ পাক উনাকে মিথ্যাবাদী বলেছে, মহান আল্লাহ পাক উনার রাসূলকে মিথ্যাবাদী বলেছে, মহান আল্লাহ পাক উনার আয়াত শরীফ, মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ উনাদেরকে নিয়ে মিথ্যা সমালোচনা করেছে, ঠাট্টা-বিদ্রুপ করেছে।
মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ করেন, “তারা যদি আপনাকে মিথ্যাবাদী বলে তবে আপনার পূর্ববর্তী পয়গম্বরগণ উনাদেরকেও তো মিথ্যাবাদী বলা হয়েছিল।” (সূরা ফাতির/৪)
“তারা বিস্ময়বোধ করে যে, তাদেরই কাছে তাদের মধ্যে থেকে একজন সতর্ককারী আগমণ করেছেন। আর কাফিররা বলে এতো এক মিথ্যাবাদী যাদুকর। সে কি বহু উপাস্যের পরিবর্তে, এক উপাস্যের উপাসনা সাব্যস্ত করে দিয়েছে। নিশ্চয়ই এটা বিস্ময়কর ব্যাপার। তাদের কতিপয় বিশিষ্ট ব্যক্তি এ কথা বলে যে, তোমরা প্রস্থান করে চলে যাও এবং তোমাদের উপাস্যের পূঁজায় দৃঢ় থাক। নিশ্চয়ই এ বক্তব্য কোন বিশেষ উদ্দেশ্য প্রণোদিত আমরা আমাদের সাবেক ধর্মে এ ধরণের কথা শুনিনি। এটা মনগড়া ব্যাপার বৈ নয়। আমাদের মধ্যে থেকে শুধু কি তারই প্রতি উপদেশ বাণী অবতীর্ণ হল?” (সূরা ছোয়াদ)
বলাবাহুল্য এ আয়াত শরীফ-এর হুবহু মেছদাক দেখা যায় ইমামুল আইম্মা, কুতুবুল আলম, মুহইস সুন্নাহ, মুজাদ্দিদে যামান, আওলাদে রসূল, রাজারবাগ শরীফ-এর হযরত পীর সাহেব ক্বিবলা আলাইহিস সালাম এবং বর্তমান উলামায়ে ‘ছূ’দের।
ইসলামে বলা হয়েছে, “বহু উপাস্যের মাঝে নিকৃষ্ট উপাস্য হচ্ছে নিজের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করা।” বর্তমান উলামায়ে ‘ছূ’রা তাই করছে। তারা মহান আল্লাহ পাক উনার দ্বীন ছেড়ে ছবি, লংমার্চ, হরতাল, গণতন্ত্র, মৌলবাদ ইত্যাদি বিজাতীয় আদর্শের অনুসরণ তথা নিজস্ব খেয়াল খুশির তাবেদারী করছে। রাজারবাগ শরীফ-এর হযরত পীর সাহেব ক্বিবলা আলাইহিস সালাম তাদেরকে তাদের নফসের উপাসনা, খেয়াল-খুশির উপাসনা ছেড়ে দিয়ে সুন্নতে রসূল উনার দিকে আহবান করছেন। অথচ মাহিউদ্দীন, শাইখুল হদস, আহমক শফী, ফজলু গং তাতেই মত্ত হয়েছে এবং তাদের অনুসারীদের মহান আল্লাহ পাক উনার রাস্তা ছেড়ে দিয়ে নফসের উপাসনা খেয়াল খুশির উপাসনা তথা বহু উপাস্যেরই উপাসনা করতে বলছে। কাফিরদের মত তারাও বলছে, “আমরা সবাই এসবের মাঝে রয়েছি, আর কেবলি কি রাজারবাগ শরীফ-এর হযরত পীর সাহেব ক্বিবলাই আলাইহিস সালাম তিনি হক্ব বোঝেন?” কাফিরদের মত তারাও রাজারবাগ শরীফ-এর হযরত পীর সাহেব ক্বিবলা আলাইহিস সালাম উনার তাজদীদকে উদ্দেশ্য প্রণোদিত বলছে।
আর চরম জাহিল, মিথ্যাচারী, পাপাচারী আব্দুল গণি সাহিত্য অর্বাচীন তথা আদুল গাই তাদেরই মুখপাত্ররূপে ফরমায়েশী মিথ্যাচার উদগীরণ করছে। যা সমঝদার সত্যানুসন্ধানীদের নিকট মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। মহান আল্লাহ পাক পাক তিনি বলেন, “হে নবী! মহান আল্লাহ পাক উনাকে ভয় করুন এবং কাফির ও কপট বিশ্বাসীদের কথা মানবেন না।” (সূরা আহযাব/১)
-মুহম্মদ গোলাম মুর্শিদ।
পবিত্র কুরআন শরীফ-এ উল্লেখ আছে,
الفتنة اشد من القتل.
অর্থ: “ফিৎনা কতলের চেয়েও ভয়ঙ্কর।”
ইমামুল হিন্দ হযরত শাহ আব্দুল আজীজ মুহাদ্দিস দেহলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার “তাফসীরে আজীজীতে” ছয় প্রকার লোক বিনা হিসেবে দোযখে যাবে বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, তার মধ্যে এক প্রকার হলো- “হিংসুক আলেম সমাজ।”
হাদীছ শরীফ-এ আছে-
ان الحسد ياكل الحسنات كما تأكل النار الحطب.
“হিংসা নেকীগুলিকে এমনভাবে জ্বালিয়ে দেয়, যেমন আগুন লাকড়ীকে জ্বালিয়ে দেয়।”
গত জুন/২০০০ ঈসায়ী, আরবী রবিউল আউয়াল মাসে আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের একমাত্র মুখপত্র “মাসিক আল বাইয়্যিনাত” পত্রিকায় আমিরুল মু’মিনীন, হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি ও বালাকোটের সত্যিকার ইতিহাসের সূত্র কি ছিল, তা পাক ভারতের নামজাদা বুযুর্গ আলেমদের দ্বারা লিখিত মশহুর কিতাব এবং সেই কিতাবের পৃষ্ঠা নং সহ প্রমাণ পেয়েছি।
সে সময় “দারুল হরব ভারত বর্ষ হতে চিরতরে ইংরেজ শক্তির মূল্যেৎপাটন ও পাঞ্জাব সীমান্তবর্তী শিখ ও পাঠান মুনাফিকদের কবল হতে মুসলমানদের রক্ষাপ করার নিমিত্তে হযরত শহীদে আযম রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার জিহাদী আন্দোলন ও বালাকোটের ইতিবৃত্ত শুরু হয়েছে এবং এ কাজে উনাকে উৎসাহ উদ্দীপনা ও অনুপ্রেরণা দিয়েছেন- হযরত শাহ আব্দুল আজীজ মুহাদ্দিস দেহলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি। কেননা তিনি নিজেই উনার গ্রন্থে তার স্বচক্ষে দেখা পাঠানদের স্বভাব ও শিখদের অত্যাচারের কাহিনী বর্ণনা করেছেন।
বলাবাহুল্য, উনার এ জিহাদী আন্দোলনে উনবিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে ঈমানের বলে বলীয়ান আলেম সমাজ, উনার কাফেলায় শরীক হয়েছিল। বাংলাদেশ থেকেও হাজার হাজার মাইল পাড়ী দিয়ে নোয়াখালী নিবাসী হযরত শাহ আব্দুল আজীজ মুহাদ্দিস দেহলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার প্রিয় ছাত্র হযরত ইমামুদ্দীন বাঙালী সুধারামপুরী রহমতুল্লাহি আলাইহি, চট্টগ্রাম থেকে সুফী নূর মুহম্মদ নিযামপূরী রহমতুল্লাহি আলাইহি, বগুড়া থেকে সাইয়্যিদ আমিরুদ্দীন রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি এবং আরো অনেকে সেই পাকিস্তান সীমান্তবর্তী বালাকোটে গিয়ে উপস্থিত হয়েছেন।
সেই যামানার আলেমকুল শিরোমণি হযরত শাহ আব্দুল আজীজ মুহাদ্দিস দেহলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার জামাতা হযরত মাওলানা আব্দুল হাই রহমতুল্লাহি আলাইহি, হযরত মাওলানা কারামত আলী জৈনপুরী রহমতুল্লাহি আলাইহি, হযরত মাওলানা ইউসুফ ফুলতী রহমতুল্লাহি আলাইহি, হযরত শায়খ ইমাম আলী ইলাহাবাদী রহমতুল্লাহি আলাইহি, হযরত শায়খ হাম্মাদ রহমতুল্লাহি আলাইহি, হযরত শায়খ সুজাত আলী ফয়জাবাদী রহমতুল্লাহি আলাইহি, হাফিজ হযরত আব্দুল কাদীর রহমতুল্লাহি আলাইহি, হযরত ইসমাঈল শহীদ রহমতুল্লাহি আলাইহি, হযরত মাওলানা আব্দুর রহীম বেলায়েতী রহমতুল্লাহি আলাইহি, হযরত বাদিল খান বাঁশ বেরেলী রহমতুল্লাহি আলাইহি প্রমূখ আলেম সমাজ ও মাশায়েখগণ আমীরুল মু’মিনীন, হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে উনাদের মাথার তাজ মনে করতেন। উনার যে কোন কথা, কাজ, নসীহতকে উনারা এক বাক্যে মেনে নিতেন।
১৮২৬ সালের ১৩ই জানুয়ারি, ১২৪২ হিজরীর ১২ই রবিউস ছানী মাসে আকোড়ার যুদ্ধের পর “হিন্ড” নামক স্থানে আলিম সমাজ, মুজাহিদগণ ও সর্দার সম্প্রদায় একজন সঠিক নেতৃত্বদানকারী ইমাম ও খলীফার অভাব অনুভব করেন। খলীফা ও ইমামতের জন্য যে বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলীর প্রয়োজন তা একমাত্র উনারা মধ্যে খুঁজে পেলেন। কেননা তৎকালে তিনি জাহিরী, বাতিনী কামালতে সর্বাধিক পরিপূর্ণ ছিলেন। সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার হাতে হাত দিয়ে তিনি বাইয়াত হয়েছেন। হযরত পীরানে পীর, দস্তগীর হযরত গাউসুল আযম বড় পীর সাহেব রহমতুল্লাহি আলাইহি, হযরত খাজা বাহাউদ্দীন নকশবন্দ বোখারী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে রূহানীভাবে তাদের তরীকার নিসবত দান করেছেন।
হযরত শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার পুরো খান্দানই উনার থেকে রূহানী ফযেজ পেয়েছেন। উনার মুর্শিদে বরহক হযরত শাহ আব্দুল আজিজ সাহেব রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি নিজে স্বয়ং উনার নিকট বাইয়াত হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। সুবহানাল্লাহ!
তাই তারা সকলে মিলে খলীফা (ইমাম) হিসেবে উনার কাছেই বাইয়াত গ্রহণ করলেন। খলীফা হওয়ার পর শুক্রবার জুমুয়ার খুৎবার অন্যান্য খলীফাগণ উনাদের নামের সাথে উনার পবিত্র নাম মুবারকও উচ্চারণ করা হয়। তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন রাজন্য বর্গের নিকট দৃত প্রেরণ করেন এবং বহু স্থান হতে উনার নিকট পত্র ও উপঢৌকন আসে। উনার জিহাদী আন্দোলন, চিন্তা-চেতনা ও হিদায়েতের গতিধারাকে স্বাগত জানানো হয়।
উপমহাদেশের মানুষ দলে দলে হিদায়েতের জন্য উনার নিকট ছুটে এলো। মাত্র ৫/৬ বৎসরের ব্যবধানে ত্রিশ লক্ষ লোক উনার হাতে হাত রেখে বাইয়াত হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করে হিদায়েত পেয়েছিলো। (কখনো) একেকদিন দশ/বার হাজারেরও বেশি লোক উনার হাতে হাত রেখে বাইয়াত হতো। একমাত্র হজ্জের সফরকালে এক লক্ষ লোক উনার সাথে শরীক হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছিল।
উপমহাদেশের বাইরেও যেমন, মক্কা শরীফ, মদীনা শরীফ, মিশর, আফ্রিকা, ইউরোপ পর্যন্ত উনার হিদায়েতের আলোক রশ্মি ছড়িয়ে পড়েছিল। হজ্জের সফরকালে মক্কা শরীফ, মদীনা শরীফ ও মিশরের বুযুর্গগণ উনার ছোহবত এখতিয়ার করার জন্য ছুটে আসেন। উনার খিলাফত প্রাপ্ত কামিল খলীফাগণ তৎকালে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিলেন দাওয়াতের কাজে। উত্তর প্রদেশের রায়বেরলীর “দায়রায়ে শাহ আলামুল্লাহ”-এর রহমত, বরকত, ফুয়ুজাতের ¯্রােতধারা পঞ্চান্ন হাজার পাঁচশত আটানব্বই বর্গ মাইল অধ্যুষিত এই বাংলার বুকেও এসেছিল।
বাংলা ও আসামের হাদী আলামুল হুদা আল্লামা হযরত কারামত আলী জৈনপুরী রহমতুল্লাহি আলাইহি যিনি বাংলার বুকে পঞ্চান্ন বৎসর হিদায়েতের কাজ করেছেন। তিনি আমীরুল মু’মিনীন হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার নিকট থেকে মাত্র আট দিনে কাদেরীয়া, নকশবন্দীয়া, মুজাদ্দেদীয়া এই চারটি মশহুর তরীকার কালামত হাছিল করেছেন। বালাকোটের যুদ্ধে তিনি অংশগ্রহণ করার জন্য দরখাস্ত করলে উনার মুর্শিদে বরহক উনাকে বারণ করেন বরং বাংলার মুলুকে হিদায়েত, ওয়াজ-নসিহত, খালকুল্লাহকে খিদমত পৌছানোর জন্য উনাকে প্রেরণ করেন। বাংলার মানুষকে তিনি সভ্যতার পোশাক পরিধান করিয়াছেন। নিজের ব্যক্তিগত উদ্যোগে ও খরচে শত শত মাইল অতিক্রম করে ওয়াজ-নসিহত করেছেন। উনবিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে যে জাহেলী অজ্ঞতা ও কুসংস্কার বাংলার বুজে গেঁড়ে বসেছিল তিনিই সর্বপ্রথম এই বাংলার বুক থেকে সেই কুসংস্কার, অজ্ঞতা দূর করেন। তৎকালে আযানের ডাক শোনা যেত না। লুঙ্গির বদলে মুসলমানগণ হিন্দুদের ধূতি পরিধান করতো। মসজিদ, মন্দির পার্থক্য করা কঠিন ছিল। জুমুয়া, দু’ঈদ প্রায় উঠেই গিয়েছিল। হিন্দুদের পূঁজা পার্বনে মুসলমানগণ অংশগ্রহণ করতো। দাড়ি মু-ানো, হুক্কাপান, মূর্তি বানানো সাধারণ রেওয়াজ ছিল। মুসলমানদের এহেন দুর্দিনে তিনি এক দিকে কুরআন শরীফ, হাদীছ শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াস থেকে দ্বীনের বিভিন্ন বিষয়ের উপর কিতাব লিখেন অন্যদিকে ওয়াজ-নসীহত, রূহানী ফয়েজ-তাওয়াজ্জুহর মাধ্যমে পথভ্রষ্ট মানুষকে হিদায়েতের আলো দেখান।
বলা হয়ে থাকে যে, তিনি একদিনে তিন শতেরও অধিক লোককে লুঙ্গি পরিধান করতে শিখিয়েছেন। ভাতের সাথে কেবলমাত্র সিদ্ধ কদু খেয়ে বহুদিন গুজরান করেছেন। ইন্তিকালের সময় উনার নিকট কাফনের কাপড়ের পয়সা পর্যন্ত মজুদ ছিল না। অভাব অনটনের মধ্য দিয়ে উনার পবিত্রতম জীবন অতিবাহিত হয়। তিনি “মুকাশিফাতে রহমত, নূরুন আলা নূর যখিরায়ে কারামত, আল মুলাখখাস, মুরাদুল মুরাদিন, মিফতাহুল জান্নাত” প্রভূতি কিতাব রচনা করেন। একমাত্র উনার “মিফতাহুল জান্নাত” কিতাবটি পৃথিবীর ২১টি ভাষায় অনূদিত হয়। সুবহানাল্লাহ!
বাংলার মানুষ ক্বিয়ামত পর্যন্ত উনার নিকট ঋণী থাকবে। নোয়াখালীর শাইখুল আল্লামা হযরত ইমামুদ্দীন সুধারামপুরী যিনি হযরত শাহ আব্দুল আজীজ মুহাদ্দিস দেহলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার নিকট জাহিরী ইলম এর তা’লীম নিয়ে ছিলেন। তিনি জাহিরী বিদ্যা লাভে পরিতৃপ্ত না হয়ে হযরত শাহ সাহেবের নির্দেশে আমীরুল মু’মিনীন হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার নিকট বাইয়াত হয়ে অতি স্বল্পকালের মধ্যে কামালত হাছিল করেন। ১৮৫৮ সালে তিনি হজ্জে গমন করেন। দেশে প্রত্যাবর্তনের সময় সমুদ্রে জাহাজের মধ্যেই ১৮৫৯ সালে ইন্তিকাল করেন। সাগরেই উনার পবিত্র জিসম মুবারক ভাসিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু যেখানে ভাসিয়ে দেয়া হয় সেখানে দ্বীপ জেগে উঠে। এটি উনার সবচেয়ে বড় কারামত। সুবহানাল্লাহ! উনার হিদায়েতের কেন্দ্র ছিল চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীর আশপাশ। চট্টগ্রামের মীরেস্বরাই-এর গাজীয়ে বালাকোট কুতুবুল আকতাব হযরত মাওলানা নূর মুহম্মদ নিযামপুরী রহমতুল্লাহি আলাইহি যিনি স্বপ্নযোগে রসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নির্দেশ পেয়ে হযরত আমীরুল মু’মিনীন রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার নিকট বাইয়াত হন। উনার সিলসিলায় বহু বড় বড় ওলী এখনও বাংলার বুকে বিদ্যমান। চট্টগ্রামেই উনার মূল হিদায়েতের কেন্দ্র ছিল। উনার নামে বর্তমান মীরেস্বরাইতে মাদরাসা, কলেজ, রাস্তাঘাট পর্যন্ত করা হয়েছে। বালাকোটের যুদ্ধে হাটুতে আঘাত প্রাপ্ত হয়ে তিনি দেশে প্রত্যাবর্তন করেন। তিনি হিদায়েতের কাজে এমন ব্যস্ত ছিলেন যে, জীবনে বিয়ে করার সুযোগ পর্যন্ত পাননি। আজও উনার মাযার মুবারক হতে অসংখ্যা ভক্ত, সালেকগণ রূহানী ফয়েজ হাছিল করে থাকেন।
কিন্তু অত্যন্ত দুঃখ ও পরিতাপের বিষয় যাদের জীবনের প্রারম্ভ থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি সেকেন্ড, প্রতিটি মুহুর্তে যিনি খালিক-মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক ও সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার রাস্তায় ব্যয় হয়েছে, যারা দুনিয়ার বিনিময়ে আখিরাত ক্রয় করেছেন। খালিক-মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার সন্তুষ্টির নিমিত্তে যারা নিজেদের আমিত্ব ও নফসকে মিটিয়েছেন। যারা ঘাম ও রক্তের বিনিময়ে চিরস্থায়ী জীবন লাভে ধন্য হয়েছেন। ইতিহাসের চিরন্তন নিয়ম অনুযায়ী কায়েমী স্বার্থবাদীরা, আজ উনাদের নামে বিদ্রুপ, অপবাদ লেপনের অপপ্রয়াস চালাচ্ছে। উনাদেরকে ওহাবী, কাফির ইত্যাদি অপবাদ দেয়া হচ্ছে। কিন্তু কেন এ অসৎ আচরণ? কোন কারণে? পবিত্র কুরআন শরীফ-এর কোন আয়াতের ভিত্তিতে এবং কোন হাদীছ শরীফ-এর ভিত্তিতে উনাদের বিরুদ্ধে কুফরী ফতওয়া দেয়া হয়েছে? বাঁশ বেরলীর আহমদ রেযা খান সহীহভাবে জবাব দিতে পারেনি। মূলত: অধিক কিতাব লিখার দাবী করে হিংসা ও তাকাব্বুরীর কারণেই কি সে এই ফিৎনা ছড়ায়নি? আন্দাজের উপর অন্ধকারে ঢিল মেরে অমুসলিম বিদেশী হান্টারের ইতিহাসের উপর ভর করেইকি এ কলঙ্ক লেপন করেনি?
এই বাংলার বুকে কে হিদায়েতের ঝান্ডা উত্তোলন করলো? আহমদ রেযা খানের অস্তিত্ব ও তার নাম চট্টগ্রামের সামান্য কয়েক কিলোমিটার ব্যতীত বাংলার আর কোথাও আছে কি? বাংলার যমীনের একটি লোকও কি তার সঙ্গি খলিফা দ্বারা হিদায়েত প্রাপ্ত হয়েছে? ইতিহাস বলে এর উত্তর সম্পূর্ণই না বোধক। ফিরক্বাবন্দী বেরেলীদের দাবী তিনি অনেক কিতাব লিখেছেন। অবশ্য এটা সত্য, সে চারটি রেসালা বহু লিখেছে। রবীন্দ্রনাথ কম বই লিখেনি। একজন ইংরেজ লেখকের কাব্য গ্রন্থের অনুসরণে “গীতাঞ্জলী” কাব্য গ্রন্থ লিখে ১৯১৩ সালে নোবেল পুরস্কার পেয়ে বাঙালী জাতিকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রী পর্যন্ত তাকে সম্মান স্বরূপ দেয়া হয়েছিল। যদিও তার পড়ালেখার দৌরাত্ম ছিল মাত্র অষ্টম শ্রেণী। মীর্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর লেখা পান্ডুলিপির ওজন ও সংখ্যা শুনলে তো বেরেলীরা ত্রাহি ত্রাহি করবে। শোনা যায় তার নাকি ত্রিশ হাজার পান্ডুলিপির আলমারী ছিল। মাওলানা মওদুদীর কিতাবের সংখ্যাও কম নয়। কিন্তু আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের আলেমগণ তাকে গ্রহণ করেনি। আফসোস! বেরেলীদের কান্ড কীর্তি দেখে, জাহেরী বিদ্যার বড়াইয়ে তাদের সাথে কে কলিয়ে উঠবে? যদি সত্যিকার মা’রিফাতই সে অর্জন করতো এবং প্রকৃতই আশেকে রসূল হতো, তবে হক্কানী আলেম সমাজকে ইয়াজীদ তুল্য, কাফির, ওহাবী বলার মত ধৃষ্টতা দেখাতে পারতনা। ভারত বাংলার মকবুল আউলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনাদের মতে তার মারিফাতের সীমানা ছিল খুবই সংকীর্ণ, বিধায় সে এই ভুল করে বসেছে। যদি তার আত্ম এতই প্রসারিত হতো এবং বিশুদ্ধ কাশফ হাছিল হতো, তবে কেন বারগাহে ইলাহীতে সে আফজালুল আউলিয়া, আমিরুল মু’মিনীন হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার কোন মর্যাদা, ফযীলত আছে কিনা তা দেখে নিলো না?
তিনি জান্নাতী না জাহান্নামী এই কথাই যদি উনার আত্মা জানতে না পারলো, তবে আর কি কামালত হাছিল হলো? হযরত মায়ায়েখ কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণ উনাদের মতে মা’রিফাতের সত্তর শাখা বা সত্তর সিঁড়ি। উনার মধ্যে নি¤œতম সিড়ি হচ্ছে- “কাশফ কারামত হাছিল হওয়া।” চিশতীয়া খান্দানের বুযুর্গদের মতে আরিফের নি¤œতম আলামত হলো, সে সমস্ত কায়েনাত উনার দু আঙ্গুলের ফাঁকের মধ্যে অবলোকন করবে। সুবহানাল্লাহ!
নিঃসন্দেহে আহমদ রেযা খানের এ সমস্ত কিছুই হাছিল হয়নি। যদি হাছিল হতো তাহলে এত বড় অপরাধ তার দ্বারা হতো না। মূলত, হযরত আমীরুল মু’মিনীন রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার নি¤œ স্তরের খলীফারও যে মাকাম হাছিল হয়েছে, আহমদ রেযা খানের তার এক বিন্দুবিসর্গও হাছিল হয়নি।
নিম্নে চট্টগ্রামের কথিত সুন্নী নামধারী লোকদের দ্বারা প্রকাশিত মাসিক তরজুমান জুলাই-আগষ্ট/২০০০ ঈসায়ী সংখ্যায় প্রশ্নোত্তর বিভাগে আমীরুল মু’মিনীন, সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সম্পর্কে অবমাননাকর প্রশ্নোত্তর-এর তীব্র প্রতিবাদ ও যুক্তি খণ্ডন করা হলো-
উক্ত পত্রিকাটিতে প্রশ্নকারী বলেছে, “আল বাইয়্যিনাত পত্রিকায় সুওয়াল-জাওয়াব বিভাগে সৈয়দ আহমদ বেরলভীকে খলীফাতুল্লাহ, আমীরুল মু’মিনীন, আওলাদে রসূল, শহীদ মুজাদ্দিদ ইত্যাদি বড় বড় লক্ববে ভূষিত করা হয়েছে …..।” এখন প্রশ্ন হচ্ছে- সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে বর্ণিত বিশেষণ দ্বারা আখ্যা দেয়া কতটুকু শরীয়ত সম্মত?
এর জবাব হলো, উনার এ লক্বব মাসিক আল বাইয়্যিনাত দেয়নি। বরং যিনি খালিক-মালিক, রব মহান আল্লাহ, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, পীরানে তরীক্বত ও ভারত উপমহাদেশের মশুহুর বুযুর্গ আলিমদের দ্বারা তিনি এ লক্বব প্রাপ্ত হয়েছেন। মাসিক আল বাইয়্যিনাত পত্রিকার ৮২তম সংখ্যায় এ সম্পর্কে বিতাবের দলীল, পৃষ্ঠা নং সহ উল্লেখ করেছে। যেমন, “যব ঈমান কি বাহার আই, সীরাতে সাইয়্যিদ আহম্মদ শহীদ, সাওয়ানে আহম্মদী, ওয়াসীলে ওয়াজীর, মনজুরাতুস সাদাত ফি আহওয়ালুল গাযা ওয়াশশুহাদা, তাওয়ারীখে আজিবা, মুকাশিফাতে রহমত, জখিরায়ে কারামত, ওকায়ে আহম্মদী” ইত্যাদি কিতাবে উনাকে আমীরুল মু’মিনীন, খলীফাতুল্লাহ, মুজাদ্দিদ, ইমাম, শহীদ লক্ববে ভূষিত করা হয়েছে।
হযরত সাইয়্যিদ আবুল হাসান আলী নদভী যিনি হযরত আমীরুল মু’মিনীন হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার আওলাদের অন্তর্ভুক্ত, তার সম্পর্কে “নুযহাতুল খাওয়াতীর” কিতাবের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, তিনি আহমদ রেযা খানের ইলমে ফিক্বাহর যোগ্যতার প্রশংসা করেছেন। কিন্তু বেরেলীরা কি এটা ভুলে গেছে, হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার প্রতি তাদের বদ আকিদার কারণে তিনি তিরিশের দশকে যৌবনের প্রারম্ভে “সীরাতে সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ” যা পাঁচশত পৃষ্ঠারও অধিক লিখে ভারতের হক্কানী রব্বানী বুযুর্গ আলিম সমাজ ও সাধারণ মানুষকে অবাক করে দিয়েছেন! মিশর হতে পরবর্তীতে যা আরবীতে প্রকাশ হয়েছিল। বেরেলীরা তখন আলিমদের সামনে খুব হেস্তনেস্ত হয় এবং তাদের বদ আক্বীদা ও ভ্রান্ত চিন্তাধারা থেকে দূরে থাকে।
দেওবন্দের মাওলানা আশ্রাফ আলী থানভী সাহেবের ‘আশ্রাফুস সাওয়ানেহ’ কিতাবের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, মাওলানা থানবী সাহেব নাকি বলেছে, আহমদ রেযা খান আমার কাছে যথেষ্ট সম্মানের পাত্র। অথচ আহমদ রেযা খান মাওলানা থানভীর কিতাবের রেওয়ায়েত কাটছাট করে তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ এনে তাকে কাফির ফতওয়া দিয়েছে। মাওলানা থানভী “বাসতুল বানান ফি তাওযীহে হিফযিল লিসান” নামক কিতাব লিখে আহমদ রেযা খানের স্বরূপ উদঘাটন করেছে।
মাওলানা রশীদ আহম্মদ গাংগুহী সাহেব ও মাওলানা খলীল আহমদ রেযা খান তাদেরও কাফির ফতওয়া দিয়েছে। এই খবর যখন মাওলানা সাহারান পুরীর নিকট পৌছে তিনি আহমদ রেযা খানের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান এবং রেযা খানের বিরুদ্ধে “আল মুফান্নিদ” কিতাব লিখে, আহমদ রেযা খানের মুখ বন্ধ করে দেন। ‘কাতয়ুল ওয়াতান’ কিতাবে বর্ণিত আছে, খলীল আহমদ সাহারানপুরী বলেছে, মৌলভী আহমদ রেযা খান বেরলী আমার উপর যে দোষ চাপিয়ে দিয়েছে তা একেবারে ভিত্তিহীন এবং অনর্থক। এর বিচার কিয়ামতের দিন হবে। এভাবে মাওলানা রশীদ আহমদ গাংগুহী তার বিরুদ্ধে রেযা খানের মিথ্যা অভিযোগ শুনে অত্যন্ত দুঃখিত হয় এবং তা প্রত্যাখান করে।
নাক্বেছ দেওবন্দীরা “আশ শিয়াবুছ ছাকিব, রেযাখানী মাযহাব, নকশে হায়াত, আস সাহাবুল মিদরার, বারাতুল আবরার, বাসতুল বানান, কাতয়ুল ওয়াতান” কিতাবে বেরেলীদের মিথ্যা অভিযোগ ও তোহমতের প্রতিবাদে যা লিখেছে তা খন্ডানোই রেযাখানীদের পক্ষে সম্ভব হয়নি।
এরপর বলা হয়েছে, ‘যখীরায়ে কারামতে’ আলামুল হুদা হযরত মাওলানা কারামত আলী জৈনপুরী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি নাকি হযরত মাওলানা ইসমাঈল শহীদ রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার “তাকাবিয়াতুল ঈমান” কিতাবের সমালোচনা করেছেন।
এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা। বরং তিনি তার উচ্চ প্রশংসা করেছেন। যেমন ‘যখিরায়ে কারামত’ কিতাবের ২০ পৃষ্ঠায় লিখা হয়েছে, হযরত মাওলানা কারামত আলী জৈনপুরী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, ‘তাকবিয়াতুল ঈমান’ কিতাবখানা যা আমি অতি মনোযোগ দিয়া দেখেছি। উহার মূল বিষয়বস্তু আহলে সুন্নাত মাযহাব মুতাবেক পেয়েছি। এবারত ও শব্দগুলিও অতি উত্তমই পাওয়া গেছে। এতদসত্ত্বেও যদি এই কিতাবের কোন ইবারত বেখাপ্পা পাওয়া যায় এবং বুঝে যে, লিখতে পুস্তক প্রণেতার ভুল হয়েছে, তাহলে দুই একটি শব্দের ভুল হওয়ার দরুন উক্ত সত্য কিতাবটি যা শিরক রর্দ করিবার জন্য লিখা হয়েছে তা মিথ্যা মনে করে কেহ যেন মুশরিক না হয়।’ উনার লিখিত “মুকাশিফাতে রহমত” কিতাবে তিনি আরো বলেন, “তাকবিয়াতুল ঈমান” হযরত মাওলানা ইসমাঈল শহীদ রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার লিখিত একখানা প্রসিদ্ধ কিতাব। ইহা তৌহিদ সুন্নাত অনুসরণের শিক্ষা, শিরক, বিদয়াত এবং কুসংস্কার দূরীকরণ বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ কিতাব, এটা প্রত্যেক যুগেরই বিদয়াতী ও কবর পূজকদের মধ্যে ভীতি এবং শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা এই কিতাবের বিরুদ্ধে তাদের জীবন-মরণ সমস্যাকে একত্রিত করে সর্বদাই এর বিরুদ্ধে প্রচার করে আসছে। এমন কি তার বিরুদ্ধে কুফরী ফতওয়া ছাপিয়ে প্রচার করেছে। বিদয়াতীরা একটি সনদী কিতাবের লেখককে যিনি খালিক-মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার রাস্তায় শহীদ হয়েছেন উনাকে কাফির বলে থাকে। আমরা এইরূপ জঘন্য কাজ হতে খালিক-মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার নিকট আশ্রয় চাচ্ছি।”
সর্বশেষে সুন্নী নামধারী বেরেলী মৌলভী শেরে বাংলার “দিওয়ানে আজীজ” নামক কিতাবে নাকি হযরত আমীরুল মু’মিনীন সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরলভী ও হযরত ইসমাইল শহীদ দেহলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মাকে কাফির, ওহাবী ফতওয়া দিয়েছে।
এর জবাব হলো, এই মৌলভীর কথা-বার্তার মধ্যে কোন মিল আছে কি? চট্টগ্রামের তথাকথিত সুন্নী মহল্লা ব্যতীত তাকে কে চিনে? সেতো সারা জীবন দেওবন্দী মাওলানাদের সাথে হেরেই কুপোকাৎ। এই মৌলভীর কথার কোন ঠিক নেই। সে আফজালুল আউলিয়া হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার প্রধান খলীফা গাজীয়ে বালাকোট, কুতুবুল আকতাব হযরত নূর মুহম্মদ নিযামপুরী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে বড় বুযুর্গ ওলী মেনে থাকে। অথচ উনার মুর্শিদকে ওহাবী, কাফির বলে। এটি কোন ধরণের আক্বিদা? মুর্শিদ নাহক্ব, কাফির, ওহাবী অথচ মুরীদ বড় ওলী, বুযুর্গ! এটা কখনও সম্ভব? কাফিরের মুরীদ কখনও ওলী হতে পারে কি? একটা মুর্খ লোকও তো এই আক্বীদা পোষণ করে না।।
-মুফতী মুহম্মদ শামসুল আলম, ঢাকা।
তৎকালীন চিকিৎসকরা সমসাময়িক সব রোগেরই চিকিৎসা করতে পারত। কেবল তিনটি ব্যতীত। এক জন্মান্ধকে দৃষ্টি দেয়া, কুষ্ঠ রোগীকে সুস্থ করা আর মৃতকে জীবিত করা। কিন্তু যিনি খালিক-মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার অপার কুদরতে উনার জলীলুল কদর রসূল হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম তিনি উপরোক্ত তিনটি অস্বাভাবিক কাজও করতে পারতেন। খুব সহজেই পারতেন তিনি মৃতকে জীবিত করতে। ‘যিনি খালিক-মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার হুকুমে জীবিত হও’ একথা বলার সাথে সাথে দাঁড়িয়ে যেত মৃত লোকটি। স্বল্প পরিসরের জীবনে হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম তিনি মৃতকে জীবিত করার অভিজ্ঞতা লাভ করেছেন অনেক। আর এ সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতা তাকে দিয়েছে আরো গুঢ় অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞা। তিনি বলেছেন, ‘আমি মুর্দাকে জিন্দা করতে পেরেছি। কিন্তু নির্বোধ তথা জাহিলকে জ্ঞান দিতে পারিনি।’
আর প্রথাগত জ্ঞান অনেক থাকলেও ইসলামের সুক্ষ্ম সমঝ না থাকলে সে জাহিল। আরব বাসীর কথিত ‘আবুল হাকাম’ বা জ্ঞানীর পিতাকে, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার কর্তৃক ‘আবু জাহিল’ আখ্যা দেয়া তারই প্রমাণ।
প্রথাগত জ্ঞান গিরীশচন্দ্রেরও ছিল। সে কুরআন শরীফ বাংলায় অনুবাদ করেছিল, মেশকাত শরীফ অনুবাদ করেছিল, তাযকিরাতুল আউলিয়া অনুবাদ করেছিল। কিন্তু তাই বলে কি সে যিনি খালিক-মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক, মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদের প্রতি যথাযথ বিশ্বাস স্থাপন এবং প্রকাশ করতে পেরেছে?
শুধু কিতাবে লেখা আর প্রকাশ করাই কি গর্বের বিষয়? যদি তাতে সমঝ না থাকে! যদি না হয় তা নির্বোধের মত লেখা। কাদিয়ানী কি কম কিতাব লিখেছে? তার ভাষ্যমতে সে যা লিখেছে তাতে ত্রিশ হাজার আলমারী ভরে যেত। আর একইভাবে নির্বোধ আহমদ রেযা খানের নির্বোধ ভক্তরা যদি তার কিতাবের সংখ্যাধিক্য নিয়ে বড়াই করে তবে সেটাও চরম নির্বুদ্ধিতা তথা জিহালতের পরিচয় নয় কি?
তদুপরি নির্বোধ আহমদ রেযা খার কিতাবের সংখ্যা নিয়ে রয়েছে সত্যের অপলাপ অনেক ফুলানো-ফাঁপানো তথ্য। যার প্রমাণ রয়েছে তার জাহিল ভক্তদের মুখপত্র মাসিক তরজুমানেও। তরজুমানের জুলাই-আগস্ট/২০০০ ঈসায়ী সংখ্যায় বদিউল আলম রিজভীর প্রশ্নের উত্তরে বলা হল, পঞ্চাশের অধিক বিষয়ে জ্ঞান বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় প্রায় হাজারের অধিক গ্রন্থের প্রণেতা আ’লা হযরত ইমাম আহমদ রেযা খান।” (পৃষ্ঠা/৫৬)
পাঠক এখানেও নির্বোধ তরজুমান পন্থীদের বোধহীনতার পরিচয় মেলে। কারণ ‘প্রায়’ শব্দটা সম্ভাব্য নিকট অর্থেই ব্যবহৃত হয়। যেমন, প্রায় শত। প্রায় হাজার। কিন্তু প্রায় হাজারেরও বেশি, এটা মূলত জাহিলদেরই জিহালতি সূচক বক্তব্য। কারণ প্রায় হাজার বলত যেখানে হাজারই পুরো হয়নি সেখানে আবার হাজারের বেশি হয় কি করে? এটা কি পরস্পর বিরোধী কথা নয়? আর এ অসঙ্গতি মূলত তখনই হয় যখন সেখানে মিথ্যা ও জালিয়াতীর আশ্রয় নেয়া হয়। আর তার প্রমাণও অবশ্য তরজুমান পক্ষ দিয়েছে। কারণ জুলাই-আগস্ট/২০০০ ঈসায়ী সংখ্যায় পঞ্চাশের অধিক বিষয়ে …….. ‘প্রায় হাজারেরও বেশি’ সংখ্যার কথা তরজুমানে লেখা হয়েছে। আবার তরজুমানেরই আগস্ট-সেপ্টেম্বর সংখ্যায় লেখা হয়েছে, যিনি জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় শতাধিক বিষয়ে পনের সহ¯্রাধিক গ্রন্থ রচনা করে। (পৃষ্ঠা/১৮) পাঠক, মাত্র এক মাসের ব্যবধানে আহমদ রেযা খার লেখার বিষয় গিয়ে দাঁড়াল পঞ্চাশের অধিক থেকে শতাধিক আর সংখ্যা গিয়ে দাঁড়াল ‘প্রায় হাজারের অধিক’ থেকে ‘পনের হাজারের অধিকে।’ অর্থাৎ সাড়ে চৌদ্দ হাজারেরও বেশি।
পাঠক, নির্বোধ আহমদ রেযা খার জাহিল ভক্তরা যে কিভাবে তার অন্ধ প্রশংসা করে থাকে এবং তার সাথে মিথ্যারও আশ্রয় নিয়ে থাকে এটি তারই জাজ্বল্য প্রমাণ।
আরও লক্ষ্যনীয় যে জুলাই-আগস্ট সংখ্যায় যে বদিউল আলম রিজভী তরজুমান পত্রিকায় ছিল সুওয়ালকারী সেই একই মুহম্মদ বদিউল আলম রিজভীই হয়ে গেল আগস্ট-সেপ্টেম্বর সংখ্যায় আহমদ রেযা খার সর্ম্পকীয় ব্যাপক তথ্য (!) পরিবেশন কারী লেখক। এক সংখ্যা পূর্বেও আহমদ রেযা খার সম্পর্কে যে প্রশ্ন করে আর এক সংখ্যা পরেই সে কি করে একই বিষয়ে ফুলানো-ফাঁপানো তথ্য পেশ করে! বিষয়টিতে কি তাদের অসঙ্গতি এবং বানোয়াটিই প্রমাণ হয়না?
মূলত, এভাবেই নির্বোধ আহমদ রেযা খার নির্বোধ ভক্তরা তার অহেতুক এবং মিথ্যা প্রশংসা করে আসছে আর আমীরুল মু’মিনীন, হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার অন্যায় সমালোচনা করছে। পর্যায়ক্রমে তার জবাব দেয়া হবে ইনশাআল্লাহ।
-মুফতী মুহম্মদ নেয়ামত মাওলা।
যিনি খালিক-মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার এ কালাম দ্বারা ঐ সকল জ্ঞানীকে বুঝানো হয়েছে যারা যিনি খালিক-মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার প্রদত্ত জ্ঞানে জ্ঞানবান। এ জ্ঞানকে বলা হয় ইলমে লাদুন্নী। ইহা জাহেরী বা প্রাতিষ্ঠানিক পড়া-শুনা করে অর্জিত হয় না। খালেছভাবে যিনি খালিক-মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার মুহব্বত, মা’রিফতের জন্য যারা কোশেশ করেন তিনি নিজ দয়ায় উনাকে তা দান করেন। আর এ সকল ব্যক্তির পরিচয় সমাজে ওলীআল্লাহ হিসেবে। ওলীআল্লাহ অর্থ যিনি খালিক-মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার বন্ধু। যিনি নিজের মত-পথকে সম্পূর্ণ রূপে পরিহার করে একমাত্র মহান আল্লাহ পাক উনার মতে মত এবং যিনি খালিক-মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার আদর্শিত পথে নিয়োজিত। কুরআন শরীফ-এ উনাদেরকে উলীল আমর এবং হাদীছ শরীফ-এ উনাদেরকে অরাসাতুল আম্বিয়া বলে সম্বোধন করা হয়েছে। আর যিনি খালিক-মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক ও উনার রসূল সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে ইতায়াত বা অনুসরণ-অনুকরণ করা, মুহব্বত করার জন্য উক্ত উলীল আমর বা অরাসাতুল আম্বিয়াকে অনুসরণ-অনুকরণ ও মুহব্বত করার কথা বলা হয়েছে।
স্মর্তব্য যে, মুহব্বত ও অনুসরণের বিষয়টি শুধু জানা-শোনা ও বলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ইহা দৃশ্যত ও বাস্তব আমলের সাথেও সম্পর্কিত। এ জন্য বলা হয়, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি হলেন বান্দার জন্য যিনি খালিক-মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার সন্তুষ্টি লাভের মূল উসীলা। তাই তিনি মহান আল্লাহ পাক উনাকে দেখে, উনার থেকে জেনে শুনে আমল করে দেখিয়েছেন। আর হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনারা স্বয়ং যিনি খালিক-মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে দেখে, উনার থেকে জেনে শুনে আমল করেছেন। পরবর্তীতে তাবেয়ীনগণ হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদেরকে দেখে, উনাদের থেকে জেনে শুনে আমল করেছেন।
এমনিভাবে যারা পরবর্তী উম্মত উনারা যিনি খালিক-মালিক, রব মহান আল্লাহ উনাকে দেখেনি, দেখেনি উনার রসূল সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও উনার ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদেরকে। তাহলে তাদের আমল করার উপায় কি? জবাব হল, যারা পরিপূর্ণরূপে কুরআন-সুন্নাহর অনুসরণ করেন, যাদেরকে উলীল আমর বা অরাসাতুল আম্বিয়া বলা হয় উনাদেরকে অনুসরণ করতে হবে। এ অনুসরণ করা ফরয-ওয়াজিব।
নবী রসূল আলাইহিমুস সালাম আগমণের দরজা বন্ধ। সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি শেষ নবী, শেষ রসূল। উনার বিদায়ের পর উনার প্রকৃত ওয়ারিছ (উত্তরাধিকারী) কে? যিনি উনার প্রতি যে অর্পিত দায়িত্ব ছিল তা সঠিকভাবে মানুষের মাঝে পৌঁছে দিবেন? উনার পরিচয় তিনি নিজেই দিয়ে গেছেন হাদীছ শরীফ-এ ইরশাদ হয়েছে, “নিশ্চয়ই যিনি খালিক-মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক তিনি এই উম্মতের হিদায়েতের জন্য প্রতি হিজরী শতকের মাথায় একজন মুজাদ্দিদ প্রেরণ করে থাকেন।” (আবু দাউদ শরীফ) সত্যিই হাদীছ শরীফ-এর বর্ণনা অনুযায়ী প্রত্যেক হিজরী শতকে মুজাদ্দিদ আগমণ করেছেন। তেমনি হিজরী ত্রয়োদশ শতকের মুজাদ্দিদ আমীরুল মু’মিনীন, আওলাদে রসূল, হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি।
সুতরাং যিনি মুজাদ্দিদ উনার মাক্বামাত, কামালত, ফযীলত ইত্যাদি বর্ণনার অপেক্ষা রাখেনা। কিন্তু এর পরও উক্ত মুজাদ্দিদের প্রতি মিথ্যা অপবাদ, কুফরীর তোহমত দিতে ছাড়েনি তথা কথিত আলা হযরত নামধারী আহমদ রেযা খান। যদিও কুরআন-সুন্নাহর ফতওয়া অনুযায়ী তার প্রদত্ত কুফরীর তোহমত তার নিজেরই উপর অর্পিত হয়েছে। উপরন্ত তাকে একটা পেঁচার সাথে তুলনা দিলে খুব সুন্দর মিলে যায়।
গত ৮২তম সংখ্যায় মাসিক আল বাইয়্যিনাত পত্রিকায় শতাধিক কিতাবের বরাতে উল্লেখ করা হয়েছে, আরব আ’যমসহ বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশে উনার হাজার হাজার খলীফা, মুহিব্বীন ও মুরীদের সংখ্যা এবং আজও উনার সিলসিলার আবাদ হচ্ছে সারা বিশ্বে। অথচ রেযা খান নিলর্জ্জভাবে অন্ধের ভূমিকা পালনে একটুও ইতস্তত করেনি, যেমনটি আকাশে সূর্য উঠে পেঁচা আপন চোখ বন্ধ করে সূর্য উঠেনি বলে অনুভব ও মন্তব্য করে।
এ অন্ধ সে যে একাই তা নয়। তার যত ভক্ত অনুসারী তারাও সে অন্ধেরই পূঁজা করছে। তারা রেযা খানের লিখিত বেশ কিছু চটি রেসালা ও কিতাবের ফখরে হাবুডুবু খাচ্ছে। কিন্তু তাদের জানা নেই যে, কিতাবের সংখ্যা বৃদ্ধি করাই বুযুর্গী লাভের কারণ নয়। তা যদি হতো তাহলে তারা আশরাফ আলী থানভী সাহেবকে কাফির বলে কেন? কারণ তার কিতাবের সংখ্যাও হাজারের উর্ধ্বে। কিতাব লিখলেই যদি বুযুর্গ হয় তাহলে আশরাফ আলী থানভী সাহেবকেও তাদের বুযুর্গ হিসেবে মেনে নেয়া উচিত। আরো উল্লেখ্য, মিথ্যা নুবুওয়াতের দাবীদার গোলাম আহমদ কাদিয়ানীও বড় বুযুর্গ হতো। অথচ সে কাট্টা কাফির ও চির জাহান্নামী। কথিত আছে যে, তার লিখিত কিতাবাদি আলমারিতে ঢুকালে ৩০ হাজার আলমারি ভরে যেত।
সুতরাং কিতাব প্রণয়নই বুযুর্গীর কারণ নয়, তা কম বা বেশি যাই হোক না কন। প্রকৃতপক্ষে বিশুদ্ধ আক্বীদা, আমল ও ইখলাছই বুযুর্গী বা মর্যাদার মাপকাঠি।
-মুফতী আলমগীর হুসাইন, বসুনিয়া।
হাদীছ শরীফ-এ উল্লেখ আছে যে, যিনি খালিক-মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক তিনি প্রত্যেক হিজরী শতাব্দীর শুরুতে এই উম্মতের জন্য এরূপ লোক প্রেরণ করবেন, যিনি দ্বীনের সংস্কার করবেন।”
এই হাদীছ শরীফ-এর ব্যাখ্যায় নবম শতাব্দির মুজাদ্দিদ হযরত মুল্লা আলী ক্বারী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার “মিরকাত শরীফ-এ” লিখেছেন, “মুজাদ্দিদ হওয়া ফক্বীহগণ উনাদের বৈশিষ্ট্য নয়। কেননা উনাদের দ্বারা এই উম্মতের উপকার সাধিত হলেও (ইনসাফগার) খলীফাগণ, মুহাদ্দিসগণ, ক্বারীগণ, ওয়ায়েজগণ ও পীর-দরবেশ কর্তৃক তাদের বিস্তর উপকার সাধিত হয়ে থাকে। আমার নিকট সমধিক প্রকাশ্য মত এই যে, মুজাদ্দিদ এক ব্যক্তি হবে না বরং একদল হবে।”
হযরত আব্দুল হক মুহাদ্দিস দেহলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার “আশরাতুল লুময়াত” কিতাবে লিখেন, “উক্ত মুজাদ্দিদ এক ব্যক্তি হতে পারেন কিংবা একদলও হতে পারেন।”
আর একদল আলিম, বুযুর্গদের অভিমত- মুজাদ্দিদ একজন বা একাধিকও হতে পারেন তবে মূল মুজাদ্দিদ একজন থাকবেন আর বাকিরা তার সহকারী হিসেবে কাজ করবেন।
আল্লামা মুল্লা আলী ক্বারী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার “মিরকতা শরীফ-এর” ব্যাখ্যায় ভারতরতœ, ফকীহুল উম্মত, বাহরুল উলূম, হাফিজে হাদীছ, মুবাহিছে আ’যম, আল্লামা রুহুল আমীন রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার “সায়াকাতুল মুসলিমীন এবং একখানা বিজ্ঞাপন রদ” কিতাবে উপমহাদেশে মুজাদ্দিদের আগমণ সম্পর্কে বলেন, “একাদশ শতাব্দির মুজাদ্দিদ হযরত ইমামে রব্বানী, মুজাদ্দিদে আলফে ছানী রহমতুল্লাহি আলাইহি, দ্বাদশ শতাব্দির মুজাদ্দিদ হযরত শাহ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি, ত্রয়োদশ শতাব্দির মুজাদ্দিদ, হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি এবং চতুর্দশ শতাব্দির মুজাদ্দিদ ছিলেন, কাইয়্যুমে যামান, মুহইস সুন্নাহ, হযরত আবু বকর ছিদ্দীক ফুরফুরাবী রহমতুল্লাহি আলাইহি।
মূলত: মুজাদ্দিদ-এর সংজ্ঞা ও ব্যাখ্যা ব্যাপক ও বিস্তৃত এবং এটি কোন প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যাঙ্গন থেকে অর্জিত সার্টিফিকের্ট সমতুল্য নয় বা চেষ্টা কিংবা কোশেশ করেও এটি লাভ করা যায় না। এটা যিনি খালিক-মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার দয়া ও অনুকম্পা। তিনি যাকে ইচ্ছা এটি দান করতে পারেন।
এ সম্পর্কে যিনি খালিক-মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক তিনি বলেন, “এটি যিনি খালিক-মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার ফযল করম তিনি যাকে ইচ্ছা তা দান করেন।
আকাবারে আউলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণ উনাদের মতে মুজাদ্দিদ হওয়ার জন্য প্রধান শর্ত হচ্ছে- যিনি খালিক-মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক ও উনার হাবীব সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাথে সরাসরি সম্পর্কে ও যোগাযোগ থাকবে এবং তিনি ইলমে লাদুন্নী প্রাপ্ত ওলী হবেন ও মুজাদ্দিদ হওয়ার সম্পর্কেও তার খোশ-খবরী থাকবে।
এছাড়া পীরানে তরীক্বতের নিসবত হাছিল আকাবারে আউলিয়ায়ে কিরাম, ইমাম-মুজতাহিদের সাথেও তার রূহানী সম্পর্কে থাকতে হবে। উনার সমস্ত আমল-আখলাক সুক্ষ্মাতিসুক্ষ্মভাবে কুরআন-সুন্নাহ মুতাবিক হতে হবে। এমনকি ইতনি স্ব-ইচ্ছায় একটি মুস্তাহাবও তরক করবেন না। ইলমে শরীয়ত ও তরীকত এবং উনার সমসাময়িক কালের যে কোন জটিল সমস্যার সমাধান তিনি দিতে সক্ষম হবেন। চাই তার মাদরাসার সার্টিফিকের্ট থাকুক অথবা নাই থাকুক, মানুষ তাকে মানুক অথবা নাই মানুক, উনার সম্পর্কে জানুক অথবা নাই জানুক, যামানা উনাকে গ্রহণ করুক অথবা নাই করুক।
হযরত আউলিয়ায়ে কিরামগণ উনাদের এই উক্ত সম্পূর্ণ সত্য। কেননা, যিনি খালিক-মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক তিনি সৃষ্টির শুরু থেকে এক লক্ষ চব্বিশ হাজার বা দুই লক্ষ চব্বিশ হাজার আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম উনাকে পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন। কিন্তু প্রত্যেক নবী-রসূল উনাদেরকে উনার কওম বা জাতি গ্রহণ করতে পারেনি। এবং উনাদের প্রত্যেক যামানায়ই কিছু জাহেরী জ্ঞানী দার্শনিক, প-িত, মৌলভী ছিল। অথচ সেই নবী-রসূল উনাদেরকে চিনতে না পারার কারণে উনার পবিত্রতম ছোহবত লাভ থেকে তারা বঞ্চিত রয়েছে। গ্রীক, দার্শনিক সক্রেটিস সম্পর্কে বলা হয়, “উনার যামানায় সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বিদ্যমান ছিলেন অথচ সে তার নাপাক গর্হিত জ্ঞানের অহংকারের কারণে সেই সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ছোহবতে যেতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।” হযরত ইউসা বিন নুন আলাইহিস সালাম উনার যামানায় দরবেশ বালাম বিন বাওর অধিক জ্ঞানী ও প-িত ছিল। তার বাতেনী শক্তি সম্পর্কে বর্ণিত আছে, সে উপরের দিকে তাকালে আরশে আজিমের মালায়েকাদের কাতার দেখতে পেতো এবং যমীনের দিকে তাকালে সপ্ত যমীনের রহস্য তার নিকট উদ্ভাসীত হতো। কিন্তু উনার যামানার নবী হযরত ইউশা বিন নুন আলাইহিস সালাম উনাকে গ্রহণ করতে না পারার কারণে সে চিরতরে মরদুদ ও পথভ্রষ্ট হয়ে যায়।
হযরত আদম আলাইহিস সালাম উনার রিসালত ও নুবুওওয়াতকে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করার কারণে মালউন ইবলিস “আবাদুল আবাদ” অর্থাৎ চিরকালের জন্য অগ্নির খোরাকে পরিণত হয়। সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যামানায় “জাজিরাতুল আরবে” অনেক জ্ঞানী-গুনী, প-িত এবং উচ্চ সম্ভ্রান্ত গোত্রের লোক ছিল। স্বয়ং আবু জেহেল আরবে “আবুল হাকাম” বা “জ্ঞানীর পিতা” বলে অধিক পরিচিত চিল। কিন্তু যিনি খালিক-মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক তিনি সকল গোত্র বংশ থেকে হাশেমী গোত্রের হযরত আব্দুল্লাহ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার ছেলে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে নুবুওওয়াত রিসালাত দানের জন্য মনোনীত করলেন। যখন উনার নুবুওওয়াত প্রকাশিত হলো তখন আরব ভুমিতে গোত্রে গোত্রে, বংশে বংশে অসন্তোষের ভাব ফুটে উঠলো। তারা বলতে লাগালো, ওমুক ওমুক বংশে নবী আসার কথা। অথচ একজন ইয়াতীম ব্যক্তি, যে আমাদেরই মত একজন মানুষ, যে হাটে-বাজারে যায়, খাদ্য ভক্ষণ করে, সে কি করে নবী হতে পারে? নাউযুবিল্লাহ!
মূলত, সমস্ত আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামগণ উনাদের ব্যাপারেই এরূপ দেখা যায়। তাদের “ক্বওম” বা জাতি তাদের উপর প্রেরিতে নবী-রসূলগণ উনাদেরকে বলতো, আমরা কি আমাদেরই মত একজন সাধারণ মানুষকে নবী হিসেবে মেনে নিবো? কখনোই নয়। আর এই সমস্ত নবী-রসূলগণ উনারা কেউই প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যাঙ্গন থেকে সার্টিফিকেট প্রাপ্ত নয়। যিনি খালিক-মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক তিনি সৃষ্টির শুরু থেকেই উনাদের মনোনীত নির্বাচিত করে রেখেছেন।
-মুফতী মুহম্মদ শামছুদ্দীন, ভৈরব।
হাদীছ শরীফ-এ উল্লেখ করা হয়েছে, যিনি খালিক-মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ করেন, “অতি শীঘ্রই আমার উম্মতের প্রতি এমন এক যামানা আসবে, যখন কিছু লোক এমন হবে যাদের অন্তরগুলো নেকড়ে বাঘের ন্যায়, তাদের কথাগুলো নবী উনাদের কথার ন্যায় এবং তাদের কাজগুলো ফিরাউনের কাজের ন্যায়। আমি তাদের থেকে আলাদা বা জুদা তারাও আমার থেকে বিচ্ছিন্ন (আমার উম্মত নয়)।”
অর্থাৎ তারা বাহ্যিক সূরতে ঈমানদার, হাক্বীকতান তাদের মধ্যে ঈমানের লেশ মাত্রও নেই। স্বার্থবাদী কারণে ঈমানের ক্ষতি সাধন করেও তারা যে কোন ধরণের অশালীন ও অশোভনীয় কথাবার্তা ও কার্যকলাপ করতে তারা বিন্দুতম দ্বিধাবোধ করবে না, যেকোন মুসলমানকে কাফির বলতে যেকোন হাক্কানী ওলীআল্লাহ উনাদেরকে বিদয়াতী, ভ- ও কাফির বলে আখ্যায়িত করতে সামান্যতম চিন্তাও তারা করবে না। এ সমস্ত ঈমানদার নামধারী মুনাফিকদের সম্পর্কেই সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি অন্য হাদীছ শরীফ-এ বলেছেন, “আখেরী যামানায় একদল আলেমরা হবে আসমানের নীচে সবচেয়ে নিকৃষ্ট জীব। তাদের দ্বারা ফিৎনা তৈরি হবে এবং তাদের মধ্যেই ফিৎনা পতিত হবে।” (বায়হাক্বী, মেশকাত)
পৃথিবীর সূচনা লগ্ন থেকে এপর্যন্ত সকল নবী-রসূল আলাইহিমুস সালামগণ উনাদের বিরোধীতা করা হয়েছে, তাদের সকলকেই অমানুষিক নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। সর্বপ্রথম এই বিরোধীতা শুরু করেছে, যিনি খালিক-মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার হুকুম সাময়িকভাবে মান্যকারী, অত্যধিক ইবাদত গুজার তথা ছয় লক্ষ বছর এবাদতকারী কিন্তু অন্তর নেফাকীতে পূর্ণ মুয়াল্লিমুল মালাকুত ইবলিস। বাহ্যিক আমলে যার তুলনা বিরল, শেষ পর্যন্ত সে প্রথম মানব, প্রথম নবী ও প্রথম রসূল হযরত আদম আলাইহিস সালাম উনার বিরোধীতা করে ফাসিক, জালিম, কাফির ও মালউন হয়ে চির জাহান্নামী হয়েছে। এ ধারাবাহিকতারই হুবহু অনুসরণ করেছিল হযরত ইউসা বিন নূন আলাইহিস সালাম উনার সময়ের বালাম মিন বাওর। সে জাহিল, যিনি খালিক-মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার জলীলুল কদর রসূল হযরত ইউসা বিন নূন আলাইহিস সালাম উনার বিরুদ্ধে বদদোয়া করে নিজেই নিজের সর্বনাশ করেছে। শেষ পর্যন্ত ঈমান হারা হয়ে কুফরীতে নিপতিত হয়েছে।
একই ধারাবাহিকতায় আখেরী নবী সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনারও বিরোধীতা করেছে তৎকালীন কাফির ও মুনাফিকরা। তবে কাফিরদের তুলনায় মুনাফিকদের বিরোধীতা ছিল অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও কঠোর। যার ফলে দান্দান মুবারক শহীদ হওয়াসহ অসহ্য কষ্টের স্বীকার হয়েছেন। এমনকি পাগল, যাদুকর, সাবী (ধর্মত্যাগী) ইত্যাদি অপবাদেরও স্বীকার হয়েছেন তিনি। ইসলামী লেবাস ধারী, বাহ্যিক ঈমান গ্রহণকারী ও বাহ্যিক ইবাদতকারী এসকল মুনাফিকদের কারণেই জঙ্গে সিফফীন, জঙ্গে জামাল সংঘটিত হয়েছে। খোলাফায়ে রাশেদীনসহ অসংখ্য হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ উনারা শাহাদাতের অমীয় সুধা পান করে চির জান্নাতী হয়েছেন। ইসলামের মধ্যে মতভেদের সূচনা হয়েছে এ সকল মুনাফিকদের কারণেই।
এখানেই বিরোধীতার শেষ নয়। একই ধারাবাহিকতায় বর্তমান সনের হিজরী শতক পর্যন্ত যত গাউছ, কুতুব, আবদাল, পীর-মাশায়েখ, ওলীআল্লাহ তথা মুজাদ্দিদগণ অতীত হয়েছেন, তারা প্রত্যেকেই বিরোধীতার স্বীকার হয়েছেন- জেল-জুলুমসহ নানাবিধ অত্যাচার সহ্য করেছেন। আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের হাক্বীক্বী অনুসারী হওয়া সত্ত্বেও কাফির, বিদয়াতী, ভ-, গোমরাহ ও ওহাবী হিসাবে আখ্যায়িত হয়েছেন।
যেমন, আখ্যায়িত হয়েছেন ত্রয়োদশ শতাব্দিতে এ ধরায় আগমণ কারী- শহীদে আযম, ছহেবে ইলমে লাদুন্নী, বাহরুল উলূম ওয়াল হিকাম, শায়খুল আরব ওয়াল আযম, সাইয়্যিদুল আউলিয়া, দলীলুল আরেফীন, মাখযানে মা’রিফাত, রুহুল হাক্বে, সিরাজুল উম্মত, আসাদুল্লাহ, মুহিয়্যুস সুন্নাহ, দাফেউল বিদয়াত, মুজাদ্দিদে মিল্লাত, আমীরুল মু’মিনীন, ইমামে তরীক্বায়ে মুহম্মদিয়া, আওলাদে রসূল, ইমামে আহলে সুন্নত, শায়খে আ’লা হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি।
-মাওলানা মুফতী মুহম্মদ রুহুল আমীন, নেছারাবাদ, পিরোজপুর।
وتلك الامثال نضربها للناس وما يعقلها الا العلمون.
অর্থ: “ঐ সকল উদাহরণ বা দৃষ্টান্ত আমি সকল মানুষের জন্য উপস্থাপন করি। কিন্তু হক্ক্যনী-রব্বানী আলেমগণ ব্যতীত আর কেউ তা অনুধাবন করতে সক্ষম হয় না।” (সূরা আনকাবুত/৪৩)
যিনি খালিক-মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক তিনি পবিত্র কুরআন শরীফকে উনার হুকুম-আহকাম এবং নিষিদ্ধ বিষয়াবলীকে সহজবোধ্য করে উপস্থাপন করার জন্য পবিত্র কুরআন শরীফ-এর অসংখ্য স্থানে বিভিন্ন দৃষ্টান্ত বা উপমা বর্ণনা করেছেন।
উল্লেখ্য যে, পবিত্র কুরআন শরীফ-এ অধিকাংশের মতে ৬৬৬৬ খানা আয়াত শরীফ রয়েছে। এর প্রতিটি আয়াত শরীফ-এর মাঝেই রয়েছে যিনি খালিক-মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার মুহব্বত মা’রিফাতের গুঢ় নির্যাস।
কিন্তু যিনি খালিক-মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার মা’রিফাত-মুহব্বত বিষয়টি এমনি খাছ যে, স্বয়ং আহকামুল হাকীমিন মহান আল্লাহ পাক তিনিই সে সম্পর্কে বলেছেন যে, “হক্কানী-রব্বানী আলেমগণ ব্যতীত আর কেউ তার হাক্বীক্বত উপলব্ধি করতে পারে না।”
হক্কানী-রব্বানী আলেমগণই পারেন যিনি খালিক-মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার মতে মত হতে, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পথে পথ হতে তথা মা’রিফাত-মুহব্বত হাছিল করতে। যিনি খালিক-মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার সাথে নিকটত নিসবত বা একান্ত সম্পর্কে প্রতিষ্ঠা করতে।
উল্লেখ্য যে, নিসবত বা সম্পর্কে প্রতিষ্ঠার জন্য শুধুমাত্র ইলমে ফিক্বাহই যথেষ্ট নয় বরং হাক্বীক্বী ইলমে তাসাউফ ব্যতীত শুধু ইলমে ফিক্বাহ অনেকাংশে হালাক বা ধ্বংসের কারণ বটে। যেমনটি হয়েছে, আহমদ রেযা খানসহ গোলাম আহমদ কাদিয়ানী ও অন্যান্যদের ক্ষেত্রে।
ইমামে রব্বানী মুজাদ্দিদে আলফে ছানী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সাথে বিরোধীতাকারী আবুল ফজল ফৈজী, মোল্লা মুবারক নাগরী প্রমুখ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও।
স্মর্তব্য যে, আবুল ফজল ফৈজী, মোল্লা মুবারক নাগরীর মত তথাকথিত জাহেরী ইলমের অধিকারী হতে হলেও আহমদ রেযার আরো প্রায় ১০০ বছর সময় অতিবাহিত করতে হতো; কিন্তু তার পূর্বেই সে পদস্খলনের গ্লানী নিয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে। শুধুমাত্র জাহেরী ইলম দিয়েই যিনি খালিক-মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার হাক্বীক্বী মা’রিফাত বা পরিচিতি লাভ করা যায় না, মুহব্বত, সন্তুষ্টি, রেযামন্দি আশা করা যায় না। তাই কিতাবে আছে যে, ইলমে তাসাউফ ব্যতীত শুধু ইলমে ফিক্বাহ তলব করা এবং তদ্বারা জীবন পরিচালনা করা কাঁটাযুক্ত পায়ের ন্যায়। অর্থাৎ কাঁটাযুক্ত পা দিয়ে যেমন ভারি বোঝা কাঁধে নিয়ে চলাতো দুরের কথা একাকী চলাই অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। ঠিক ইলমে তাসাউফ শুন্য ব্যক্তি তদ্রুপ।
সুতরাং আলেম হওয়ার জন্য, যিনি খালিক-মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার সন্তুষ্টি রেজমন্দী, মা’রিফাত- মুহব্বত হাছিলের জন্য ইলমে ফিক্বাহর পাশাপাশি হাক্বীক্বী ইলমে তাসাউফ তথা অন্তরের পরিশুদ্ধতাও পূর্ব শর্ত।
এছাড়া যিনি খালিক-মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার হাক্বীক্বী পরিচিতি লাভ করা সম্ভব হবে না, আল্লাহওয়ালা ব্যক্তিবর্গের পরিচিতি লাভ করা যাবে না। আর যা পাওয়া যাবে তা যিনি খালিক-মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার ওলীগণ উনাদের বিরুদ্ধাচরণ, আওলাদে রসূল উনাদের বিরুদ্ধাচরণ সর্বোপরি যিনি খালিক-মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার রোষ অর্জন।
যেমনটি অর্জন করেছে আহমদ রেযা খান। আহমদ রেযা খানের ইলমে ফিক্বাহ যাই ছিল কিন্তু হাক্বীক্বী ইলমে তাসাউফ সম্পর্কে সে ছিল একেবারেই ব-কলম। যে ইলমে তাসাউফ ব্যতীত হক্কানী আলেম হওয়া যায় না। আর আলেম না হয়ে আলেমগণ উনাদের বিরোধীতা করা নিজেকে হালাকী বা ধ্বংসের মধ্যে ঠেলে দেয়ার নামান্তর।
হক্বানী আলেম কারা
কুরআন শরীফ, হাদীছ শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াসের দৃষ্টিতে আলেম কারা? শুধু কি দুনিয়াবী কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হতে কোন সনদ লাভ করতে পারলে আলেম হওয়া যায়? আহমদ রেযা খানের মত শুধু কুরআন শরীফ, হাদীছ শরীফ পড়ে কিছু রেসালা লিখে আত্মতৃপ্তির ঢেকুর তুললেই কি হক্বানী আলেম হওয়া যায়? হক্বানী আলেম হওয়ার জন্য কি কি যোগ্যতা থাকা আবশ্যক তাই পাঠকদের খিদমতে তুলে ধরবো। ইনশাআল্লাহ!
-মাওলানা মুফতী মুহম্মদ ত্বাহেরী।
সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে উদ্দেশ্য করে মহামহিম যিনি খালিক-মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ করেন, “আপনি বলুন! যিনি খালিক-মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক তিনি এ বিষয়েও শক্তিমান যে, তোমাদের প্রতি উপর দিক থেকে কিংবা ভূ-তল থেকে কোন শাস্তি পাঠিয়ে দিবেন কিংবা তোমাদেরকে বিভিন্ন দল উপদলে বিভক্ত করে পরস্পরের মুখোমুখি করে দিবেন এবং একে অন্যের উপর আক্রমণের স্বাদ-আস্বাদন করাবেন।” (সূরা আনয়াম/৬৫)
এ আয়াত শরীফ-এর তাফসীরে খোদায়ী শাস্তি তিনভাবে ব্যাখ্যা করা হয়ে থাকে। প্রথমত, যা উপর দিক থেকে আসে। যেমন হযরত নূহ আলাইহিস সালাম উনার বৃষ্টির প্রেক্ষিতে বন্যা। আদ জাতির উপর ঝড়ঝাপটা। হযরত লুত আলাইহিস সালাম উনার কুওমের উপর পাথর বৃষ্টি বর্ষণ। বণী ইসরাঈলের উপর রক্ত-ব্যাঙ ইত্যাদি নাযিল। বিশেষত: আবরাহার হস্তিবাহিনীর উপর পাখির ক্ষুদে পাথরকণা নিক্ষেপ ইত্যাদি।
দ্বিতীয়ত: ভূ-তলের আযাবের উদাহরণ কারূন ও ফিরআউনের আযাবের ন্যায়। তারা স্বীয় ধন-সম্পদসহ ভূ-গর্ভে নিমজ্জিত হয়েছিল। এছাড়া হযরত নূহ আলাইহিস সালাম উনার সময় ভূ-তল থেকেও পানি স্ফীত হয়েছিল।
তৃতীয়তঃ যে বিশেষ আযাবের কথা প্রদত্ত আয়াত শরীফ-এ বলা হয়েছে তা হলো, “তোমরা বিভিন্ন দল, উপদলে বিভক্ত হয়ে পরস্পরে মুখোমুখি হয়ে যাবে।” এ বিষয়টি “সূরা হুদে” বলা হয়েছে, “তারা সর্বদা পরস্পরে মত-বিরোধই করতে থাকবে, তবে যাদের প্রতি যিনি খালিক-মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার রহমত রয়েছে তারা ব্যতীত।” এর ব্যাখ্যায় হাদীছ শরীফ-এ বলা হয়েছে, “বণী ই¯্রাঈলের মধ্যে হয়েছে ৭২টি ফিরক্বা আর আমার উম্মতের মধ্যে হবে ৭৩টি ফিরক্বা। তার মধ্যে কোন দলটি হক্ব ইয়া রসূলাল্লাহ, ইয়া হাবীবাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ উনাদের এই প্রশ্নের জবাবে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বললেন, “আমি এবং আমার ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ যে মতও পথের উপর রয়েছি।”
প্রসঙ্গতঃ বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বর্তমানে ওহাবী, দেওবন্দী, কাদিয়ানী, তথাকথিত গরম সুন্নী বা অতি সুন্নী, শিয়া, রাফেজী, খারেজী ইত্যাদিসহ ইসলামের নামে রাজনীতি ছত্রছায়ায় জামায়াতে ইসলাম, ইসলামী ঐক্যজোট, শাসনতন্ত্র আন্দোলন, খিলাফত মজলিশ ইত্যাদি অনেক অনেক দল উপদল বিদ্যমান। যাদের একজন আর একজনকে সহ্য করতে পারে না। এবং উল্লিখিত আয়াত শরীফ অনুযায়ী এরা প্রত্যেকেই প্রত্যেকের আযাব স্বরূপ। কারণ এরা প্রত্যেকেই নিজেদের দলীয় স্বার্থে বক্তব্য দিয়ে থাকে। আর যে বক্তব্য দেয় তা হয় ভিত্তিহীন, মনগড়া। ফলে অপরজন খুব সহজেই তা খ-িয়ে নিজের মত প্রকাশের সুযোগ পায়।
ফলতঃ এদের মাঝে সহজেই তৈরি হয় কলহ-বিবাদ। এসব ভ-দের কেউ “মুহম্মদী ইসলামের নামে” মত প্রকাশ করে যে, উপরের মাকামে উঠলে ইবাদত করতে হয় না, কেউ ইসলামী শাসনতন্ত্রের নামে বলে যে, মৌলবাদী দাবী না করলে জারজ সন্তান, কাফির। নাউযুবিল্লাহ! কেউ ইসলামের নামে হারাম দলীয় রাজনীতি ও নির্বাচন করাকে ফরয বলে। অতপর এরা হত্যা, মারা-মারি, রাহাজানি করে। মহাসড়ক অবরুদ্ধ করে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে, পাগড়ীপড়ে লাঠি হাতে নিয়ে মসজিদে মুছল্লীদের রক্তাক্ত করে ইসলামের নামে মুসলমানদের হত্যা করে, পুলিশ বাহিনীকে হত্যা করা জিহাদ বলে ঘোষণা দেয় আবার এক সময় ইসলামের নামধারী হাত-পায়ের রগকাটা খুনি সম্প্রদায়ের কাছে তাদের পীর সাহেবও গাড়ীতে প্রহৃত হয়, লাঞ্ছিত হয়।
অর্থাৎ সব মিলে এরা সত্যপথ, সত্যকথা, সত্যদ্বীন ছেড়ে এক চরম অরাজকতা, বিশৃঙ্খলা আর হানাহানির দিকে দেশ জাতি তথা মুসলিম উম্মাহকে ঠেলে দিচ্ছে। নিজেরা হক্ব বলে দাবী করলেও তার পক্ষে অকাট্য অখ-নীয় গ্রহণযোগ্য দলীল দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। অথচ যিনি খালিক-মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক তিনি বলেন, “তোমরা যদি সত্যবাদী হয়ে থাকে তবে দলীলসমূহ পেশ কর।”
মহান আল্লাহ পাক উনার অশেষ রহমত-বরকত এই যে, “তারা সর্বদা মত-বিরোধ করতেই থাকবে, তবে যাদের প্রতি যিনি খালিক-মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার রহমত রয়েছে তারা এর ব্যতিক্রম।” এ আয়াত শরীফ-এর দ্বিতীয়াংশ এবং হাদীছ শরীফ-এ উল্লিখিত “যার মধ্যে আমি এবং আমার ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ উনারা রয়েছি” উনাদের মেছদাক অনুযায়ী “মাসিক আল বাইয়্যিনাতই বর্তমান সময়ের একমাত্র তাজদীদী মুখপত্র যার উপর ভিত্তি করে সমস্ত হানাহানি-ফিৎনার অবসান হওয়া সম্ভব। কারণ “আল বাইয়্যিনাতের” প্রতিটি মন্তব্যে, বক্তব্যে, তথা সমসাময়িক হানাহানিকর বিষয়গুলির সঠিক সমাধান ব্যাপক অখ-নীয় দলীলসহকারে দেয়া হয়। কাজেই এরপরে আর মত-বিরোধের প্রয়োজন পড়ে না।
যিনি খালিক-মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক তিনি বলেন, “তোমরা সকলে মহান আল্লাহ পাক উনার রজ্জুকে শক্তভাবে ধারণ কর এবং তোমরা বিভক্ত হয়ে পড়ো না। আর তোমরা সে নিয়ামতের কথা স্মরণ কর যা মহান আল্লাহ পাক তিনি তোমাদের দিয়েছেন।”
বলাবাহুল্য, বর্তমান যামানায় দলীলবিহীন, মনগড়া ও ভ্রান্ত ফতওয়া জনিত কলহ কোন্দলের প্রেক্ষিতে অকাট্য অখ-নীয় ব্যাপক দলীলভিত্তিক পত্রিকা “আল বাইয়্যিনাত” যিনি খালিক-মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার সে নিয়ামত। যা গ্রহণে আমরা অবাঞ্ছিত সব কলহ কোন্দল, যার পরিণতি একটা সম্ভব্য গৃহযুদ্ধ, তা থেকে নাযাত লাভ করে যিনি মহান আল্লাহ পাক উনার রজ্জুকে শক্তভাবে ধরার একমাত্র উছিলারূপে পেতে পারি।
-মুহম্মদ ওয়ালীউল্লাহ।