সুওয়াল-জাওয়াব

সংখ্যা: ৮৪তম সংখ্যা | বিভাগ:

প্রফেসর ডঃ মুহম্মদ নুরুদ্দীন

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ব বিদ্যালয়, ময়মনসিংহ।

সুওয়ালঃ-  মাসিক মদীনা ডিসেম্বর ১৯৯৯ ঈঃ সংখ্যার ৪৮ নং পৃষ্ঠায় নির্বাচন ভিত্তিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভোটদান সম্পর্কে একটি প্রশ্নের উত্তরে বলা হয়- (১) সহীহ্ অর্থে মুসলমানদের প্রকৃত শাসক হচ্ছে পবিত্র কোরআন এবং রসূলের সুন্নাহ্। (২) প্রচলিত যে কোন শাসন ব্যবস্থায় যদি কুরআন-সুন্নাহ্র প্রাধান্য মেনে নেয়া হয় তবে তা মুসলিম জনগণ বিনা দ্বিধায় মেনে নিতে পারেন। (৩) ভোটের মাধ্যমে নেতা বা শাসক নির্বাচনের বর্তমান যে পদ্ধতি এটা অংকুরিত হয়েছে- ইসলামী শুরা পদ্ধতির মধ্য থেকে। সুতরাং এই পদ্ধতিতে ভোটের রাজনীতি ইসলামে বৈধ নয় এ কথা বলা যাবে না। (৪) এ যুগের ভোট প্রদান বাইয়াতের বিকল্প বিবেচিত হতে পারে।

          এখন আমার সুওয়াল হলো- মাসিক মদীনার উপরোক্ত বক্তব্য সহীহ্ কি-না? এছাড়া (৫) খলীফাগণ কি পদপ্রার্থী ছিলেন? (৬) একটি পদের জন্য একাধিক প্রার্থী ছিলেন কি? (৭) খলীফাগণ পদ লাভ করার পর রাষ্ট্র পরিচালনা করেছিলেন? না খিলাফত পরিচালনা করেছিলেন? (৮) তা মানব রচিত বিধানে? না শরীয়তী বিধানে? (৯) খলীফা নিয়োগদান পদ্ধতিটি নির্বাচন না মনোনয়ন? (১০) গণতান্ত্রিক বহু দলীয় নির্বাচন পদ্ধতিতে প্রার্থীকে ভোট দেয়া ওয়াজিব কি-না?

          দয়া করে আমাদেরকে উপরে বর্ণিত মাসয়ালাগুলির রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও শরয়ী ফায়সালা দিয়ে বাধিত করবেন।

জাওয়াবঃ- মাসিক মদীনার উত্তর সঠিক হয়নি। শরয়ী দৃষ্টিতে তা সম্পূর্ণ মনগড়া ও ভুল হয়েছে। দলীলসহ নিম্নে আলোচনা করা হলো।

          মাসিক মদীনা পত্রিকা লিখেছে- (১) সহীহ্ অর্থে মুসলমানদের প্রকৃত শাসক হচ্ছে পবিত্র কোরআন এবং রসূলের সুন্নাহ্।

          মাসিক মদীনার এ বক্তব্য সম্পূর্ণ ভুল। কারণ কুরআন-সুন্নাহ্ মুসলমানদের শাসক নয়। বরং তা মুসলমানদের জন্য যেমন পরিপূর্ণ জীবন বিধান বা ব্যবস্থা তদ্রুপ শাসন বা প্রশাসনের ক্ষেত্রেও। আর যিনি উক্ত কুরআন-সুন্নাহ্ তথা শরীয় বিধান মোতাবেক শাসন বা বিচারকার্য্য পরিচালনা করেন, সহীহ্ অর্থে তিনিই হলেন মুসলমানদের শাসক তথা খলীফা।

          মূলতঃ ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও গোটা বিশ্বের মানব-জ্বিন জাতির ইহলৌকিক ও পরলৌকিক শান্তিকামী, সুষ্ঠ বিধানাবলির নাম হচ্ছে- কুরআন ও সুন্নাহ্।

          এ প্রসঙ্গে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন,

تركت فيكم امرين لن تضلوا ما تمسكتم بهما كتاب الله وسنتى.

অর্থঃ- “আমি তোমদের মাঝে দু’টি বিধান রেখে যাচ্ছি যতদিন তোমরা যে দু’টিকে আকঁড়ে থাকবে, কখনোই গোমরাহ্ হবে না।” (বুখারী শরীফ)

(২) প্রচলিত যে কোন শাসন ব্যবস্থায় যদি কুরআন-সুন্নাহ্র প্রাধান্য মেনে নেয়া হয় তাহলে তা মুসলিম জনগণ বিনা দ্বিধায় মেনে নিতে পারেন।

          মাসিক মদীনার এ বক্তব্য মোটেই শুদ্ধ হয়নি। বরং কুফরী হয়েছে। কারণ মাসিক মদীনার বক্তব্য অনুযায়ী বোঝা যায় যে, প্রচলিত শাসন ব্যবস্থার নিয়ম-কানুনও বজায় থাকবে আর তার পাশাপাশি কুরআন-সুন্নাহ্র আইনও বজায় থাকেব। তবে বেশী থাকবে কুরআন-সুন্নাহ্র আইন। আর এটাকেই সে বলতে চেয়েছে কুরআন-সুন্নাহ্র প্রাধান্য।

          মূলতঃ তার বিবৃত “প্রচলিত ব্যবস্থায় কুরআন-সুন্নাহ্র প্রাধান্য” এটা একটা স্ব-বিরোধী কথা। কারণ কুরআন-সুন্নাহ্র প্রাধান্য তখনই স্বীকৃত হবে যখন সবক্ষেত্রে, সব বিষয়ে সর্বোতরূপে কুরআন-সুন্নাহ্র বাস্তবায়ন ঘটানো হবে। নচেৎ নয়। আল্লাহ্ পাক বলেন,

افتؤمنون ببعض الكتاب وتكفرون ببعض.

“তোমরা কি কিতাবের কিছু অংশ মানবে আর কিছু অংশ মানবে না?” (সূরা বাক্বারা/৮৫)

          প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, বর্তমানে প্রচলিত যে শাসন ব্যবস্থা রয়েছে বর্তমান কালে তা হচ্ছে- সমাজতন্ত্র, রাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ইত্যাদি। এ সমস্ত শাসন ব্যবস্থায় যদি কুরআন-সুন্নাহ্কে প্রাধান্য দেয়া হয় আর তা যদি পরিপূর্ণভাবে হয় তাহলে তা সমাজতন্ত্র, রাজতন্ত্র, বা গণতন্ত্র থাকবে না। বরং তা খিলাফত পদ্ধতির রূপ ধারণ করবে। অর্থাৎ খিলাফত আলা মিনহাজিন নুবুওওয়াত বা ইসলামী খিলাফত হিসেবে সাব্যস্ত হবে। যে শাসন ব্যবস্থার জন্য শরীয়ত নির্দেশ করেছে।

          আর যদি সমাজতন্ত্র, রাজতন্ত্র ও গণতন্ত্রের মধ্যে কোন কোন ক্ষেত্রে কুরআন-সুন্নাহ্কে প্রাধান্য দেয়া হয় আর কোন কোন ক্ষেত্রে উল্লিখিত মতবাদের আইন-কানুন জারি থাকে তাহলে তা ইসলামের দৃষ্টিতে কখনোই গ্রহণযোগ্য হবে না এবং মুসলমানদের পক্ষে সেটা মেনে নেয়া শরীয়তসম্মত হবে না।  কারণ আল্লাহ্ পাক বলেন,

افحكم الجاهلية يبغون ومن احسن من الله حكم لقوم يوقنون.

অর্থঃ- “তোমরা কি জাহেলিয়াতের আইন-কানুন তালাশ কর বা চাও। অথচ আল্লাহ্ পাক হতে ঈমানদারদের জন্য উত্তম হুকুমদাতা বা আইন প্রণেতা কে রয়েছেন?” (সূরা মায়েদা/৫০)

          অর্থাৎ ঈমানদারগণ একমাত্র আল্লাহ্ পাক-এরই আইন-কানুন, নিয়ম-নীতি অনুযায়ী জীবন-যাপন করবে। এর খেলাফ চলা ঈমানদারদের জন্য নাজায়েয ও হারাম।

          এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক বলেন,

هو الذى ارسل رسوله بالهدى ودين الحق ليظهره على الدين كله.

অর্থঃ- “সেই মহান আল্লাহ্ পাক যিনি তাঁর রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে পাঠিয়েছেন হিদায়েত এবং সত্য দ্বীনসহ অন্য সমস্ত ধর্মের উপর প্রাধান্য দিয়ে।” (সূরা ফাতাহ্/২৮) অর্থাৎ অন্যান্য সমস্ত ধর্ম বাতিল করে দিয়ে একমাত্র দ্বীন ইসলামকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য।

          এ প্রসঙ্গে হাদীস শরীফে উল্লেখ করা হয়েছে,

عن جابر قال حين اتاه عمربن الخطاب قال انا نسمع احاديث من يهود تعجبنا افترى ان نكتب بعضها فقال امتهوكون انتم كما تهوكت اليهود والنصارى لقد جئتكم بها بيضاء نقية ولو كان موسى حيا ما وسعه الا اتباعى.

অর্থঃ- “হযরত জাবির রদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, একদিন হযরত ওমর ফারুক রদিয়াল্লাহু আনহু হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয় সাল্লাম-এর নিকট এসে বললেন, হে আল্লাহ্ পাক-এর রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমরা ইহুদীদের নিকট থেকে কিছু কথা শুনি যাতে আশ্চর্য্যবোধ করি। তা থেকে কিছু কি আমরা লিখে রাখব। তখন হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, হে ছাহাবা-ই-কিরাম রদিয়াল্লাহু আনহুম! তোমরা ইহুদী-নাসারাদের মত ইসলাম সম্পর্কে দ্বিধাগ্রস্থ রয়েছো? নিশ্চয়ই আমি তোমাদের জন্য পরিপূর্ণ, উজ্বল দ্বীন নিয়ে এসেছি। এমনকি যদি ইহুদীদের নবী হযরত মূসা আলাইহিস্ সালামও জীবিত থাকতেন তবে তাঁর উপরও আমার দ্বীন মানা ওয়াজিব হতো।” (আহমদ, বায়হাক্বী)

          তাহলে কি করে ঈমানদারের পক্ষে ইসলামের সাথে মিশ্রিত করে অন্য ধর্মীয় নিয়ম-কানুন বা মতবাদ মেনে নেয়া সম্ভব? এরপরও যদি কেউ অন্য কোন ধর্মীয় নিয়ম-কানুন বা মতবাদ ইসলামের সাথে মিশ্রিত করে গ্রহণ করে তার কঠিন পরিণতি সম্পর্কে আল্লাহ্ পাক এরশাদ করেন,

ومن يبتغ غير الاسلام دينا فلن يقبل منه وهو فى الاخرة من الخاسرين.

অর্থঃ- “যে ব্যক্তি ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন ধর্ম তালাশ করে বা চায় তা কখনোই তার থেকে গ্রহণ করা হবেনা। বরং সে পরকালে ক্ষতিগ্রস্থদের অন্তর্ভূক্ত হবে।” (সূরা আলে ইমরান/৮৫)

          অর্থাৎ কোন ঈমানদার ইসলাম ছাড়া অন্য কোন ধর্ম বা আইন-কানুন, নিয়ম-নীতি গ্রহণ করতে পারে না বা মেনে নিতে পারেনা। যদি সে তা করে তাহলে সে ঈমানদার থাকতে পারবেনা। অর্থাৎ একজন ঈমানদার ব্যক্তি তার ঈমানের সাথে কুফরীকে মিশ্রিত করতে পারেনা। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক বলেন, ولا تلبسوا الحق بالباطل.

অর্থঃ- “হক্বকে না হক্বের সাথে মিশ্রিত করনা(ঈমানের সাথে কুফরীকে মিশ্রিত করনা)।” (সূরা বাক্বারা/৪২)

          শুধু তাই নয় এমনকি শরীয়তের খেলাফ কোন কাজেও সাহায্য সহযোগীতা করতে পারে না। যদি কেউ করে তাহলে তার কঠিন পরিণতি সম্পর্কে আল্লাহ্ পাক-এর রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, হাদীস শরীফে উল্লেখ করা হয়েছে, আল্লাহ্ পাক একবার হযরত ইউশা বিন নুন আলাইহিস্ সালামকে জানালেন যে, তাঁর এক লক্ষ উম্মতকে ধ্বংস করে দেয়া হবে। তার মধ্যে ষাট হাজার সরাসরি পাপে লিপ্ত। তখন হযরত ইউশা বিন নুন আলাইহিস্ সালাম আল্লাহ্ পাক-এর নিকট জানতে চাইলেন, তাহলে বাকি ৪০ হাজার উম্মতকে কোন কারণে ধ্বংস করা হবে? জবাবে আল্লাহ্ পাক জানালেন, তারা পাপীদের সাথে মেলামেশা করে ও পাপীদেরকে পাপ থেকে ফিরে থাকার জন্য নিষেধ করে না।” এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক বলেন,

ولا تعاونوا على الاثم والعدوان واتقوا الله ان الله شديد العقاب.

অর্থঃ- “তোমরা পাপ ও শত্রুতায় পরস্পর পরস্পরকে সাহায্য বা সহযোগীতা করনা।” (কুরআন-সুন্নাহ্র খেলাফ কোন আমলে কাউকে কোন সহযোগীতা করনা) আল্লাহ্ পাককে ভয় কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ পাক কঠিন শাস্তিদাতা। (সূরা মায়েদা/২)

এ আয়াত শরীফের ব্যাখ্যায় হাদীস শরীফে বলা হয়েছে, من تشبه بقوم فهو منهم.

অর্থঃ-  যে ব্যক্তি যে সম্প্রদায়ের সাথে মিল রাখবে সে তাদেরই অন্তর্ভূক্ত হবে।” (আবূ দাউদ, মুসনদে আহমদ)

          শুধু পাপ কাজে সাহায্য সহযোগীতা  করাই গুণাহ্র কারণ নয় বরং শুধুমাত্র সমর্থন করাও গুণাহ্র কারণ। তা উপস্থিত থেকেই  হোক অথবা অনুপস্থিত অবস্থায়ই হোক। এ আয়াত শরীফের ব্যাখ্যায় হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

اذا عملت الخطيئة فى الارض من شهدها فكرهها كان كمن غاب عنها ومن غاب فرضيها كان كمن شهدها.

অর্থঃ- “জমিনে যখন কোন পাপ বা অন্যায় অর্থাৎ খেলাফে শরা কাজ সংঘটিত হয় কোন ব্যক্তি সেখানে উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও সেটাকে অপছন্দ করে তাহলে সে যেন সেখানে উপস্থিত ছিলনা।” (উল্লিখিত পাপে সে দোষী সাব্যস্ত হবেনা) আর যদি কোন ব্যক্তি উপস্থিত না থাকা সত্ত্বেও উক্ত খেলাফে শরা কাজের প্রতি সন্তুষ্ট থাকে তাহলে সে যেন সেখানে উপস্থিত ছিল। অর্থাৎ সে উল্লিখিত পাপে পাপী বলে সাব্যস্ত হবে। (আবূ দাউদ)

          উপরোক্ত আয়াত শরীফ ও হাদীস শরীফ দ্বারা এটাই সাব্যস্ত হলো যে, কোন ঈমানদারের পক্ষে আল্লাহ্ পাক-এর আইন-কানুন, নিয়ম-নীতির খেলাফ অন্য কোন নিয়ম-নীতি ও মতবাদ  মেনে নেয়া যেমন নাজায়েয, ঠিক অন্য কোন নিয়ম-নীতি ও মতবাদকে ইসলামের সাথে মিশ্রিত করাও অনুরূপ। শুধু তাই নয় বরং তা সমর্থন করাও নাজায়েয এবং হারাম। যদি কেউ তা করে তাহলে তা গ্রহণযোগ্য তো হবেই না বরং  সে কঠিন শাস্তির উপযুক্ত হবে, কারণ তা কুফরী। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক বলেন,

من لم يحكم بما انزل الله فاولئك هم الكافرون.

অর্থঃ- “আল্লাহ্ পাক যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী যারা আদেশ-নিষেধ করবেনা তারাই কাফির।” (সূরা মায়েদা/৪৪)

(৩) ভোটের মাধ্যমে নেতা বা শাসক নির্বাচনের বর্তমান যে পদ্ধতি এটা অংকুরিত হয়েছে ইসলামের শুরা পদ্ধতির মধ্য থেকে। সুতরাং ভোটের রাজনীতি ইসলামে বৈধ নয় এ কথা বলা যাবে না।

          তার এ বক্তব্যও শুদ্ধ হয়নি বরং কুফরী হয়েছে। কারণ নির্বাচনভিত্তিক গণতন্ত্রের উৎপত্তি হয় আখেরী রাসূল, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জমিনে আগমণের অনেক পূর্বে। যার প্রবর্তক হচ্ছে ইহুদী ও নাছারা। কাজেই ইসলামী শুরা পদ্ধতি থেকে শাসক নির্বাচনের পদ্ধতির উদ্ভব ঘটেছে এ কথা বলা নেহায়েতই মূর্খতা ও অজ্ঞতাসূচক এবং কূফরীমূলক। তাই ইসলামের নামে ভোটের রাজনীতি বৈধ বলাও কুফরী।

        নির্বাচনের ইতিহাসঃ প্রাচীন ইতিহাস

          প্রাচীন গ্রীসে খ্রীষ্টপূর্ব পঞ্চম এবং ষষ্ঠ শতাব্দীতে নির্বাচন প্রথা চালু ছিল। এছাড়া রোমান সিনেটেও এ পদ্ধতি চালু ছিল। তবে Election সম্পর্কে ধর্ম, মিথলজি বিষয়ক Encyclopedia Man, Myth’s Magic বলা হয়েছে-Election, the world is derived from the Greek word eloge (choice). The idea is basic to the traditional structure of Christian theology, অর্থাৎ ইলেকশন বা নির্বাচন শব্দটি উৎসরিত হয়েছে বা উৎপত্তি লাভ করেছে গ্রীক শব্দ eloge হতে যার অর্থ ছিল পছন্দ। নির্বাচনের ধারণা প্রাচীন খ্রীষ্টীয় ধর্মতত্ত্বের ব্যাখ্যার উপর প্রতিষ্ঠিত। এ ব্যাখ্যাটি এরূপ যে, তাদের God নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তিবর্গ অথবা জাতিকে বিশেষ কোন দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে তার বিধান চালাতেন। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে, The idea that God specially choses certain individuals or nations for some peculiar role in the scheme of his providence is khown as election. উল্লেখ্য, খ্রীষ্টান ধর্মতত্ত্বে নির্বাচনের ধারণাটি অদৃষ্টবাদ থেকে এসেছে। এ সম্পর্কে বলা হয়েছেঃ In Christian theology the idea of election became associated with predestination, খ্রীষ্টানদের আরো ধারণা যে, তাদের খোদার পছন্দনীয় বা elected অবশ্যই স্বল্প হবে। Many are called buf few are chosen (Mathew- 22-14) মূলকথা হচ্ছে নির্বাচন খ্রীষ্টীয় ধর্মতত্ত্বের সাথে বিশেষভাবে সম্পৃক্ত একটি বিষয়। এ বিষয়ে Man, Myth & Encyclopedia Magic, আরো বলা হয়েছে, “However that the doctrine of election 2 found its most notable expression in Christianity.

আধুনিক কালের ইতিহাস

          তবে আধুনিক ভোটদান ব্যবস্থার সূত্রপাত ঘটে ইংল্যান্ডে ১৬৮৮ সালে। ইংল্যান্ডে ১৬৮৮ সালে বিপ্লবের পর রাজনৈতিক ক্ষমতা পার্লামেন্টের হাতে চলে যায়। পার্লামেন্ট ১৮৩২ সালে প্রথম সংস্কার আইনে সমস্ত মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে ভোটাধিকার দেয়। এরপর পর্যায়ক্রমে ১৮৬৭ সালে কারখানার শ্রমিকদের, ১৮৮৪ সালে কৃষি মজুরদের, ১৯১৮ সালে সীমিত সংখ্যক নারীদের এবং ১৯২৮ সালে সকল নারীদের ভোটাধিকার দেয়া হয়। ১৯১৮ সালের পূর্বে বৃটেনে বিশ্ব বিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েটরা সাধারণ কেন্দ্র ও বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্র এ দু’টি কেন্দ্রের ভোটাধিকারী ছিল। পরবর্তীতে অর্থাৎ ১৯৪৮ সালে এ সকল পদ্ধতির সমাপ্তি ঘটিয়ে একুশ বছর বা তদুর্ধ বয়সের সকল সম্প্রদায়ের জন্য সার্বজনিন ভোটাধিকার দেয়া হয়।

          অপরদিকে আমেরিকায় ১৮৭০ খৃষ্টাব্দে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে বলা হয় যে, কোন ব্যক্তিকে তার জাতি, ধর্ম অথবা পূর্ব দাসত্বের জন্য ভোটদানের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবেনা। ১৯৩৩ সালে সপ্তদশ সংশোধনীতে সিনেট সদস্যদের, জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হয়। ১৯২০ সালে মহিলা ভোটাধিকার স্বীকৃত হয়। ১৯৭১ সালে ভোটারদের বয়স সীমা কমিয়ে ১৮ বছরে আনা হয়।

ভোটের প্রকারভেদ ও ব্যালট প্রথা

          উল্লেখ্য, ভোট হলো দু’প্রকার- (১) প্রকাশ্য ভোটদান, (২) গোপনে ভোটদান।

          প্রকাশ্য ভোটদান ব্যবস্থায় ভোটদানকারীরা বিপরীত পক্ষীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, তাই এটি সর্বত্রই পরিত্যক্ত হয়েছে।

          আর গোপনে ভোটদান ব্যবস্থায় ভোটদানকারীরা কারো দ্বারা কোন প্রকার ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার সম্ভাবনা থাকেনা, তারা তাদের ভাষায় নির্ভয়ে ও স্বাধীনভাবে ভোট প্রদান করতে পারে। তাই ব্যালট পেপারের মাধ্যমে এ ব্যবস্থা প্রায় সর্বত্রই চালু রয়েছে।

ব্যালট

          ব্যালট হচ্ছে একটি কাগজের শীট, যার দ্বারা গোপন ভোট প্রদান করা হয়। ইধষষড়ঃ শব্দটি এসেছে ইটালী ব্যালোটা ইধষষড়ঃরধ হতে। যার অর্থ হচ্ছে- ছোট বল। এটি এভাবে উৎপত্তি হয়েছে যে, প্রাচীনকালে এর দ্বারা ভোট গ্রহণ করা হতো এবং গ্রীসে এই পদ্ধতির প্রচলন ছিল। জনতার দরবারে অথবা আইন সভায় খ্রীষ্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে এবং কখনো কখনো রোমান সিনেটে এই পদ্ধতি চালু ছিল। সাধারণতঃ সাদা এবং কালো বল হ্যাঁ এবং না বোধক ভোটে ব্যবহৃত হতো।

          অপরদিকে আমেরিকায় উপনিবেশিক কালের শুরুতে সীম শস্যকণা ব্যালট হিসেবে ব্যবহৃত হতো।

          উল্লেখ্য, কোন কোন সংগঠন এখনো নতুন সদস্য গ্রহণে ভোটাভুটিতে সাদা এবং কালো বলের ব্যবহার করে থাকে।

          বর্তমানে গণতান্ত্রিক দেশসমূহে কাগজের ব্যালট বা ব্যালট পেপার নির্বাচনে ভোটারদের ছদ্মনাম হিসেবে কাজ করে এবং এভাবেই অধিকাংশ ভোটারের ইচ্ছা প্রকাশ পায়।

          গোপন ভোটদানের পদ্ধতি হিসেবে ব্যালট পেপার ব্যবহারের প্রথম প্রামাণিক ঘটনা ঘটে ১৬২৯ সালে আমেরিকার চার্চে। অতঃপর আমেরিকান ঔপনিবেশে এই ব্যালট পেপারের প্রচলন ছড়িয়ে পড়ে। এরপরে ধীরে ধীরে ব্যালট পেপারের অনেক সংস্কার হয় এবং পরবর্তীতে একই কলামে বিভিন্ন দলের প্রতীক সংযুক্ত হয়, যা সাধারণতঃ বর্ণমালা অনুযায়ী সংযুক্ত হয়।

          উল্লেখ্য, ১৯৫০ সালের মধ্যে এই ব্যালট প্রথা প্রায় সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে।

ইসলামের দৃষ্টিতে ভোট ও নির্বাচন

          ভোট হচ্ছে এমন একটি সিদ্ধান্ত নেয়ার পদ্ধতি যাতে প্রত্যেক ব্যক্তি পারে তার পছন্দনীয়কে চিহ্নিত করতে বা প্রকাশ করতে এবং যে পছন্দের সংখ্যা বেশী হয়, তাই গ্রহণযোগ্য হয়।

          উল্লেখ্য, সংবিধানে ভোটদানের জন্য কিছু শর্ত-শারায়েত করা হয়েছে। সেগুলো হচ্ছে- দু’টি। (১) বাংলাদেশের নাগরিক হওয়া, (২) ভোটদাতার বয়স আঠারো বছরের কম নয়।

          আর এক্ষেত্রে যে অযোগ্যতা, তা হলো- (১) কোন যোগ্য আদালত তাকে অপ্রকৃতিস্থ বলে ঘোষণা করেনি। (২) ১৯৭২ সালের বাংলাদেশে যোগসাজসকারী (বিশেষ ন্যায় পীঠ) আদেশের অধীন কোন অপরাধের জন্য দন্ডিত হননি। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এসব শর্ত দ্বারা ইসলাম পালিত হয় না।

          প্রকৃতপক্ষে নির্বাচন হচ্ছে গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি। কেননা নির্বাচনের মাধ্যমেই গণতন্ত্র বাস্তবায়িত হয়। আর নির্বাচনের প্রয়োজন তখনই হয় যখন কোন পদে একাধিক ব্যক্তি প্রার্থী হয়। একাধিক প্রার্থীর মধ্যে উক্ত পদ একজনকে দেয়ার লক্ষ্যেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আর উক্ত নির্বাচন ভোট প্রয়োগের মাধ্যমেই বাস্তবায়িত হয়।

          উল্লেখ্য, বর্তমান গণতান্ত্রিক নির্বাচন, তার পদপ্রার্থী হওয়া ও পদপ্রার্থীকে ভোট দেয়া ইত্যাদি কাজগুলিকে ইসলামের নামে ফরজ-ওয়াজিব হিসেবে উল্লেখ করা নাজায়েয ও হারাম।

          আরো উল্লেখ্য, গণতন্ত্রের মূল বিষয় বা ভিত সমূহের মধ্যে অন্যতম হলো সার্বভৌমত্ব জনগণের। অর্থাৎ জনগণই হচ্ছে গণতন্ত্রের মূল অথবা গণতন্ত্রে জনগণই সকল সার্বভৌমত্বের মালিক।

          স্মরণীয়, আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র যেহেতু বিশাল এলাকা ও জনগোষ্ঠীর সমন্বয়ে গঠিত সেহেতু জনসাধারণের পক্ষে সরকার পরিচালনায় প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ সম্ভব নয়। তাই জনগণ ভোটদানের মাধ্যমে তাদের সার্বভৌম ক্ষমতা ব্যবহার করে প্রতিনিধি নির্বাচন করে পরোক্ষভাবে সরকার পরিচালনায় অংশগ্রহণ করে।

          এখন প্রশ্ন হচ্ছে- এরূপ ভোট শরীয়তসম্মত কিনা? যদি শরীয়তসম্মত না হয়, তাহলে কেন বা কি কারণে শরীয়তসম্মত নয়?

          উল্লেখ্য, পূর্বেই আলোচনা করা হয়েছে   গণতন্ত্রের মূল বিষয় বা ভিত্তিসমূহের মধ্যে অন্যতম হলো সার্বভৌমত্ব জনগণের। অর্থাৎ জনগণই হচ্ছে গণতন্ত্রের মূল। অথচ আল্লাহ্ পাক “সূরা মায়েদার” ১২০নং আয়াত শরীফে বলেন,

لله ملك السموت والارض وما فيهن وهو على كل شيئى قدير.

অর্থঃ- “আসমান ও জমিন এবং এর মধ্যে যা কিছু রয়েছে, সমস্ত কিছুরই মালিক আল্লাহ্ পাক। আর তিনিই সমস্ত কিছুর উপর ক্ষমতাবান।”

          পবিত্র কালামুল্লাহ্ শরীফে এরশাদ হয়েছে,

هو الله الخالق البارى المصور له الاسماء الحسنى يسبح له مافى السموات والارض وهو العزيز الحكيم.

অর্থঃ- “তিনিই আল্লাহ্ তায়ালা, স্রষ্টা, উদ্ভাবক, রূপদাতা, উত্তম নামসমূহ তারই। নভোমন্ডলে ও ভূমন্ডলে যা কিছু আছে সবই তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করে। তিনি পরাক্রান্ত প্রজ্ঞাময়।” (সূরা হাশর/২৪) অন্যত্র এরশাদ হয়েছে,

قل اللهم ملك الملك تؤتى الملك من تشاء وتنزع الملك ممن تشاء وتعز من تشاء وتذل من تشاء بيدك الخير انك على كل شيئ قدير.

অর্থঃ- “বলুন, {হে মুহম্মদ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম} আয় আল্লাহ্ পাক! সমগ্র রাজ্যের মালিক আপনি। আপনি রাজ্য যাকে ইচ্ছা প্রদাণ করেন এবং যার হতে ইচ্ছা করেন রাজ্য ছিনিয়ে নেন। আর যাকে ইচ্ছা সম্মান দান করেন আর যাকে ইচ্ছা অপমানে পতিত করেন। আপনারই হাতে রয়েছে যাবতীয় কল্যাণ। নিশ্চয়ই আপনি সর্ব বিষয়ে ক্ষমতাশীল।” (সূরা আল ইমরান/২৬) অন্যত্র এরশাদ হয়েছে,

ولله ما فى السموت وما فى الارض يغفر لمن يشاء ويعذب من يشاء والله غفور رحيم.

অর্থঃ- “আর যা কিছু আসমান ও জমিনে রয়েছে, সে সবই মহান আল্লাহ্ পাক-এর। তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করবেন, যাকে ইচ্ছা আযাব দান করবেন। আর আল্লাহ্ পাক হচ্ছেন, ক্ষমাকারী, করুণাময়। (সূরা আলে ইমরান/১২৯)

          এছাড়া অনুরূপ আয়াত “সূরা আনয়াম/১৭,৫৭, সূরা ফাতির/১০, সূরা বাক্বারা/১১৭, সূরা শুরা/৭৩, সূরা আনয়াম/৯৫, সূরা মু’মিন/৬৮, সূরা আল ফোরকান/২, সূরা হাদীদ/৩, সূরা আস্সাফফাত/১৮০-১৮২, সূরা জাছিয়াত/৩৬-৩৭ সহ আরো অনেক আয়াত শরীফে মহান আল্লাহ্ পাক-এর সার্বভৌমত্বের কথা লিপিবদ্ধ রয়েছে।

          কাজেই “সার্বভৌমত্ব জনগণের” একথা বলা ও মানা কুফরী। অবশ্য যদিও কেউ কেউ বলে থাকে যে, “সার্বভৌমত্ব জনগণের” এটা আমরা মানিনা, অথচ তারা পূর্ণরূপেই ইসলামের নামে গণতন্ত্র মানে ও করে। তাদের জন্য আফসোস, তারা এত অজ্ঞ যে, তারা গণতন্ত্র ও সার্বভৌমত্বের সাথে যে কি সম্পর্ক এবং সার্বভৌমত্বই বা কাকে বলে সে বিষয়ে তাদের বিন্দুতম জ্ঞান নেই বললেই চলে।

          কারণ গণতন্ত্রে জনগণকে যে সার্বভৌমত্বের অধিকারী বলা হয়েছে, সে সার্বভৌমত্বের বহিঃপ্রকাশই ঘটে ভোট প্রয়োগের মাধ্যমে। অর্থাৎ গণতন্ত্রে জনগণ ভোট দেয়ার ব্যাপারে কারো মুখাপেক্ষী নয় এবং সে ভোট কাকে দেবে বা দেবেনা, সে বিষয়েও কারো কাছে তাকে জবাবদিহী করতে হয়না।

          অতএব, যারা নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করে বা তা সমর্থন করে, তারা সার্বভৌমত্ব যে জনগণের, আল্লাহ্ পাক-এর নয়, তা ইচ্ছায় হোক, অনিচ্ছায়ই হোক মেনে নেয় এবং ভোট দানের মাধ্যমে তার বহিঃপ্রকাশ ঘটায়।

          উপরোক্ত আলোচনা থেকে এ কথাই স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হচ্ছে যে, “নির্বাচন” যার ইংরেজী হচ্ছে “ইলেকশন” (ঊষবপঃরড়হ) যা গ্রীক “এ্যালোজি” (ঊষড়মব) শব্দ থেকে উৎসারিত বা উৎপত্তি লাভ করেছে। যা পরবর্তীতে খ্রীষ্ট ধর্মের সাথে বিশেষভাবে সম্পৃক্ত হয়ে খ্রীষ্ট ধর্মের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। যার সাথে ইসলামের কোন দিক থেকে কোন প্রকার সম্পর্ক নেই। বরং যা জনগণকে সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক বলে প্রতিপন্ন করে আর এই ভোট পদ্ধতি ইসলামের শুরা বা পদ্ধতি থেকেও অংকুরিত হয়নি। বরং এর প্রতিটি অনুষঙ্গ যথা সার্বজনীন ভোটাধিকার, প্রার্থী হওয়া, ব্যালট প্রথা, গননা ও মূল্যায়ন ইত্যাদি সবকিছুই এসেছে ইহুদী-নাছারাদের থেকে। আর হাদীস শরীফে এসেছে, “যে যে জাতির সাথে মিল  বা তাশাব্বু রাখে তার হাশর-নশর তার সাথে হবে।”  তাই এই ভোটের রাজনীতি ইসলামে শুধু অবৈধই নয় বরং একে ইসলামে বৈধ বলাও কুফরীর অন্তর্ভূক্ত।

          আরো উল্লেখ্য যে, মাসিক মদীনার সম্পাদক মাহিউদ্দীনের এ জেহালতপূর্ণ বক্তব্যের জবাবে বলতে হয় যে, যদি ভোটের মাধ্যমে নেতা বা শাসক নির্বাচনের পদ্ধতি ইসলামী শুরা পদ্ধতির মধ্য থেকে হয়ে থাকে তাহলে ইউরোপ, আমেরিকা, ভারত অর্থাৎ ইহুদী, খ্রীষ্টান, হিন্দু, বৌদ্ধ ইত্যাদি অপরাপর বিধর্মী গণতান্ত্রিক দেশের শাসকরাও কি ইসলামী শুরা তথা খিলাফত পদ্ধতিতে খলীফা নির্বাচিত হয়ে থাকে? তাহলে কি তারা খলীফা? এবং তারা সেখানে কি কুরআন-সুন্নাহ্র বিধান চালু করে থাকে? প্রকৃতপক্ষে ইহা সম্পূর্ণ কুফরী কথা।

(৪) এ যুগের ভোট প্রদান বাইয়াতের বিকল্প বিবেচিত হতে পারে।

তার এ বক্তব্যও সম্পূর্ণ কুফরী হয়েছে। কারণ ভোট পদ্ধতি বেদ্বীন, বদ্দ্বীন, ইহুদী ও নাছারাদের মাধ্যমে প্রবর্তিত বা উদ্ভাবিত হয়েছে। আর বাইয়াত প্রথা বা এর নিয়ম-কানুন জারি করেছেন স্বয়ং আখেরী রাসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।

          উল্লেখ্য, ভোট প্রথা কুরআন শরীফ নাযিল হওয়ার পূর্ব থেকেই ছিল অর্থাৎ ইহা হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জামানা পূর্ব থেকেই ছিল। তা সত্ত্বেও সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইহা গ্রহণ করেননি বা ইহাকে বাইয়াতের বিকল্প হিসেবেও ঘোষণা দেননি। কারণ এই ভোট প্রদান পদ্ধতি আল্লাহ্ পাক-এর কাছে পছন্দনীয় নয়।

          তাহলে মাহিউদ্দীন খান কি করে ভোট প্রদান পদ্ধতিকে বাইয়াতের বিকল্প বলে উল্লেখ করতে পারে?

          এতে কি এই সাব্যস্ত হয়না যে, মাহিউদ্দীন গং দ্বীন-ই এলাহীর মত কোন নুতন দ্বীন প্রবর্তন করতে চায় অথবা কাদিয়ানীদের মত নুতন কোন কিছুর দাবীদার।

          অথচ ইহুদী-নাছারা তথা সর্বপ্রকার বেদ্বীন ও বদ্দ্বীনদের শেয়ার (বৈশিষ্ট্য), নিয়ম-নীতি, তর্জ-তরীকা, আইন-কানুন ইত্যাদি সবকিছু থেকে মুসলমানদেরকে দূরে সরে থাকা বা বেঁচে থাকার জন্য আল্লাহ্ পাক ও তাঁর রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শক্ত নির্দেশ দিয়েছেন।

          অতএব, এ যুগের ভোট প্রদান পদ্ধতি বাইয়াতের বিকল্প বলা কুফরীর অন্তর্ভূক্ত।

          আরো উল্লেখ্য যে, মাসিক মদীনার সম্পাদকের সীমাহীন মুর্খতাসূচক  বক্তব্যের জবাবে আরো বলতে হয় যে, যদি এ যুগের ভোট প্রদান বাইয়াতের বিকল্প বিবেচিত হয় তাহলে যেসব গণতান্ত্রিক দেশে ভোটের মাধ্যমে ইহুদী, খৃষ্টান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও মহিলা শাসক নির্বাচিত হয়, তাহলে কি তারা বাইয়াত করিয়ে থাকে? তবে তার মাসয়ালা কি হবে? মুসলমান ব্যক্তির জন্য কোন বিধর্মী, বিজাতীয় কিংবা মহিলার নিকট বাইয়াত গ্রহণ করা শরীয়তে জায়েয রয়েছে কি? কখনোই নয়। বরং ইহা সম্পূর্ণ হারাম ও কুফরীর অন্তর্ভূক্ত।

(৫) খলীফাগণ কি পদপ্রার্থী ছিলেন?

          না, কস্মিনাকালেও নয়। অর্থাৎ কোন খলীফাই কখনো পদপ্রার্থী হননি। কারণ শরীয়তের উসূল হচ্ছে- আল্লাহ্ পাক-এর রাসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “যে পদপ্রার্থী হয় আমরা তাকে পদ দেইনা।”

 উল্লেখ্য যারা পদপার্থী হয়, এমনকি যারা পদের আকাংখা করে, তাদেরকে আল্লাহ্র রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পদ দেননি। এ প্রসঙ্গে হাদীস শরীফে উল্লেখ আছে,

وعن ابى موسى قال دخلت على النبى صلى الله عليه وسلم انا و رجلان من بنى عمى فقال احدهما يا رسول الله امرنا على بعض ما ولاك الله وقال الاخر مثل ذلك فقال انا والله لا نولى على هذا العمل احدا ساله ولا احد حرص عليه وفى رواية قال لا نستعمل على عملنا من اراده.

অর্থঃ- হযরত আবূ মুসা রদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমি ও আমার দু’জন চাচাত ভাই হযরত নবী করীম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট গেলাম। সে দু’জনের একজন বললো, হে আল্লাহ্ পাক-এর রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আল্লাহ্ পাক আপনাকে যে সকল কাজের দায়িত্ব দিয়েছেন, আপনি আমাদেরকে ওটার মধ্য হতে কোন একটির শাসক নিযুক্ত করুন এবং দ্বিতীয়জনও অনুরূপই বললো। উত্তরে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “আল্লাহ্ পাক-এর কসম! আমরা এ কাজে (শাসক পদে) এমন কোন ব্যক্তিকে নিয়োগ করিনা, যে ওটার প্রার্থী হয় এবং ঐ ব্যক্তিকেও নিয়োগ করিনা, যে ওটার লোভ বা আকাঙ্খা করে।” (বুখারী শরীফ ও মুসলিম শরীফ)

وعن عبد الرحمن ابن سمرة قال قال لى رسول الله صلى الله عليه وسلم لاتسال الامرة فانك ان اعطيتها عن مسنلة وكلت اليها وان اعطيتها عن غير مسئلة اعنت عليها.

অর্থঃ- হযরত আব্দুর রহ্মান বিন সামুরা রদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহ্ পাক-এর রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বললেন, “(হে সামুরা!) তুমি নেতৃত্ব বা পদ চেওনা। কেননা, যদি তোমাকে ওটা চাওয়ার কারণে দেয়া হয়, তবে ওটা তোমার উপর চাপিয়ে দেয়া হবে। আর যদি ওটা তোমাকে চাওয়া ব্যতীত দেয়া হয়, তাহলে এ ব্যাপারে তোমাকে সাহায্য করা হবে।” (মুয়াত্তা)

وعن ابى هريرة قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم تجدون من خير الناس اشدهم كراهية لهذا الامر حتى يقع فيه.

অর্থঃ- “হযরত আবূ হুরায়রা রদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহ্ পাক-এর রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “এই শাসনভারকে যারা কঠোরভাবে ঘৃণা করে, তাদেরকে তোমরা উত্তম লোক হিসেবে পাবে, যে পর্যন্ত তারা তাতে লিপ্ত না হয়।” (মুয়াত্তা)

অর্থাৎ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রত্যেক ব্যক্তিকে পদপ্রার্থী হতে নিষেধ করেছেন।

          তাই খোলাফায়ে রাশেদীন রদিয়াল্লাহু আনহুমগণ কখনও পদপ্রার্থী হননি। আর তাঁরা আল্লাহ্ পাক-এর রাসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আদেশ নির্দেশের খেলাফ কোন কাজ করেছেন তা চিন্তা করাও কুফরীর অন্তর্ভূক্ত। খোলাফায়ে রাশেদীন রদিয়াল্লাহু আনহুমগণ পদপ্রার্থী হয়েছিলেন এ কথা তাঁদের শানে বলার অর্থ হলো তাঁদেরকে দোষী বলে সাব্যস্ত করা। যা কুফরীর অন্তর্ভূক্ত।

(৬) একটি পদের জন্য একাধিক প্রার্থী ছিলেন কি?

          না, যেহেতু কোন খলীফাই কখনো পদপ্রার্থী হননি সেহেতু একটি পদের জন্য একাধিক পদপ্রার্থী হওয়ার প্রশ্নই আসেনা।

          উল্লেখ্য যে, আমীরুল মু’মিনীন, খলীফাতুল মুসলিমীন, হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহুকে শাহাদতের পূর্বে অর্থাৎ আহত অবস্থায় হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদিয়াল্লাহু আনহুমগণ আরজ করলেন, তাঁর পরবর্তী খলীফা মনোনীত করার জন্য। তখন তিনি বললেন, আজকে যদি হযরত আবু উবায়দা ইবনে জাররা রদিয়াল্লাহু আনহু জীবিত থাকতেন তাহলে তাঁকেই আমি খলীফা হিসেবে মনোনীত করতাম। তাঁর অনুপস্থিতিতে ছয়জনের নাম ঘোষণা করে যাচ্ছি। এদের মধ্য হতে যে কোন একজনকে খলীফা হিসেবে মনোনীত করতে হবে।

          উল্লিখিত ছয়জন হচ্ছেন- হযরত উসমান যিন্ নূরাইন রদিয়াল্লাহু আনহু, হযরত আলী রদিয়াল্লাহু আনহু, হযরত ত্বালহা রদিয়াল্লাহু আনহু, হযরত জুবাইর রদিয়াল্লাহু আনহু, হযরত সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাছ রদিয়াল্লাহু আনহু ও হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আওফ রদিয়াল্লাহু আনহু।

          স্মরণীয় যে, উপরোক্ত ছয়জনই ছিলেন “আশারা-ই-মুবাশ্শারার” অন্তর্ভূক্ত।

          উল্লিখিত ছয়জনের নাম ঘোষণা করে হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আওফ রদিয়াল্লাহু আনহুকে দায়িত্ব দিলেন। তিনদিনের মধ্যে যে কোন একজনকে মনোনীত করার জন্য। হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আওফ রদিয়াল্লাহু আনহু উল্লিখিত পাঁচজনের সাথে পরামর্শ করে হযরত উসমান রদিয়াল্লাহু আনহুকে খলীফা হিসেবে মনোনীত করেন। আর দ্বিতীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে মনোনীত হন হযরত আলী রদিয়াল্লাহু আনহু। যার ফলশ্রুতিতে হযরত উসমান রদিয়াল্লাহু আনহু-এর শাহাদতের পর হযরত আলী রদিয়াল্লাহু আনহু খলীফা হিসেবে খেলাফত লাভ করেন।

          স্মর্তব্য যে, উল্লেখিত ছয়জনের মধ্যে কেহই খলীফা পদের অথবা খিলাফতের জন্য পদপ্রার্থী হননি। বরং হযরত ওমর রদিয়াল্লাহু আনহু তাঁদের নাম ঘোষণা করার কারণে তাঁরা পরস্পর পরামর্শ করেই একজনকে খলীফা হিসেবে মনোনীত করেছেন।

          অতএব প্রমাণিত হলো, কোন খলীফাই কখনো পদপ্রার্থী হননি। আর যদি কেহই পদপ্রার্থী না হন তাহলে একাধিক পদপ্রার্থীর প্রশ্নই অবান্তর।

(৭) খলীফাগণ পদ লাভ করার পর রাষ্ট্র পরিচালনা করেছিলেন? না খিলাফত পরিচালনা করেছিলেন?

          খলীফাগণ খলীফা হওয়ার পর খিলাফত পরিচালনা করেছিলেন। রাষ্ট্র পরিচালনা করেননি। কেননা যে রাষ্ট্র পরিচালনা করে সে কখনো খলীফা হতে পারেনা। হয় সে প্রধানমন্ত্রী হবে অথবা রাষ্ট্রপ্রধান বা প্রেসিডেন্ট হবে। আর খলীফা এবং রাষ্ট্র প্রধান হওয়ার শর্ত শারায়েতের মধ্যেও অনেক পার্থক্য রয়েছে। যেমন খলীফা হতে হলে(১) মুসলমান হওয়া, (২) আক্বেল হওয়া, (৩) বালেগ হওয়া, (৪) পুরুষ হওয়া, (৫)স্বাধীন হওয়া, (৬) বাকশক্তি সম্পন্ন হওয়া, (৭) শ্রবণ শক্তি সম্পন্ন হওয়া, (৮) দৃষ্টি শক্তি সম্পন্ন হওয়া, (৯) সাহসী ও শক্তি সম্পন্ন হওয়া, (১০) আদেল বা পরহেযগার হওয়া, (১১) মুজতাহিদ হওয়া,(১২) কুরাঈশ হওয়া ইত্যাদি শর্ত পুরা হওয়া আবশ্যক। (হাদীস শরীফ)

           আর রাষ্ট্র প্রধানের জন্য উপরোল্লিখিত শর্তসমূহ পুরা হওয়া আবশ্যক নয়।

          উল্লেখ্য, খলীফা হওয়ার জন্য যে শর্ত শারায়েত নির্ধারণ বা ধার্য্য করা হয়েছে, তা কুরআন-সুন্নাহর ভিত্তিতে। আর রাষ্ট্র প্রধান হওয়ার জন্য যে শর্ত আরোপ করা হয়েছে তা মানব রচিত আইনের দ্বারা। তাই পুরুষ-মহিলা, ফাসেক-ফুজ্জার, কাফির-মুশরিক, মুর্খ-জাহেল ইত্যাদি যে কেউ রাষ্ট্র প্রধান হতে পারে।

          কারণ রাষ্ট্রের সংজ্ঞা আলাদা রয়েছে। যা গণতান্ত্রিক রাজনীতিতেই বিশেষভাবে গ্রহণ করা হয়। রাষ্ট্রের সংজ্ঞা সম্পর্কে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলে থাকে, রাষ্ট্রের কয়েকটি উপাদান থাকা আবশ্যক। (১) সার্বভৌমত্ব (২) জন সমষ্টি, (৩) নির্দিষ্ট ভৌগলিক সীমারেখা, (৪) সরকার ইত্যাদি।

          অথচ ইসলাম উপরোক্ত বৈশিষ্ট্যধারী কোন রাষ্ট্রকে সমর্থন করে না। কারণ রাষ্ট্র পরিচালনা করলে তা হবে হয় রাজতন্ত্র, নয় গণতন্ত্র অথবা মানব রচিত অন্য কিছু যার সাথে ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই। তাই ইসলাম সমর্থন করে খিলাফত আলা মিন্হাজিন নুবুওওয়াত অর্থাৎ নুবুওওয়াতের দৃষ্টিতে খিলাফতকে।

          উল্লেখ্য, খিলাফত পরিচালককেই খলীফা বলে। আর রাষ্ট্র পরিচালককে প্রধানমন্ত্রী অথবা প্রেসিডেন্ট বা রাষ্ট্রপ্রধান ইত্যাদি বলে।

          সুতরাং খলীফাগণ কর্তৃক রাষ্ট্র পরিচালনা করা হয়নি বরং খিলাফত পরিচালনা করা হয়েছে।

(৮) তা মানব রচিত বিধানে না শরীয়তী বিধানে?

          খলীফাগণ শরয়ী বিধানে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে খিলাফত পরিচালনা করেছেন। মানব রচিত কোন আইনের দ্বারা খলীফাগণ খিলাফত পরিচালনা করেননি। তাঁরা মানব রচিত আইনে পরিচালনা করেছেন এ চিন্তা করাটাও কুফরীর অন্তর্ভূক্ত। কোন ব্যক্তি যদি মানব রচিত কোন আইনে শাসন ব্যবস্থা পরিচালনা করে তাহলে সেটা খিলাফত হবে না।  বরং সেটা রাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ইত্যাদি তন্ত্রের মত একটি তন্ত্রেরই অন্তর্ভূক্ত হয়ে যাবে।

(৯) খলীফা নিয়োগদান পদ্ধতিটি নির্বাচন না মনোনয়ন?

          খলীফা নিয়োগ মনোনয়ন পদ্ধতিতে হতে পারে তবে তা কস্মিনকালেও নির্বাচন নয়। কারণ সাধারণভাবে নির্বাচন বলতে বুঝায়, একাধিক পদপ্রার্থী থেকে ভোটদানের মাধ্যমে একজনকে নির্বাচিত করা।

          মনোনয়ন ও নির্বাচনের মধ্যে শাব্দিক পার্থক্য রয়েছে। যে পদের মুখাপেক্ষী নয় কিন্তু তাঁকে পদ দিলে সে সুষ্ঠভাবে উক্ত দায়িত্ব পালন করতে পারবে সেই লক্ষ্যে তাকে যখন পদ দেয়া হয় সেটা নির্বাচন নয় সেটা হচ্ছে মনোনয়ন। মনোনীত ব্যক্তিত্ব ইচ্ছা করলে সেটা গ্রহণ করতেও পারেন অথবা ফিরিয়েও দিতে পারেন।

          আর নির্বাচন হচ্ছে- যে বা যারা পদের মুখাপেক্ষী তারা তাদের পদের জন্য মানুষের নিকট  তাদের মুখাপেক্ষীতা প্রকাশ করে থাকে। তখন মানুষ যাকে তাদের বিবেচনায় উপযুক্ত মনে করে তাকেই ভোট দিয়ে নির্বাচিত করে।

          এক কথায় মনোনীত ব্যক্তি পদের মুখাপেক্ষী নয় বরং পদ মনোনীত ব্যক্তির মুখাপেক্ষী। আর নির্বাচিত ব্যক্তি পদের মুখাপেক্ষী, পদ নির্বাচিত ব্যক্তির মুখাপেক্ষী নয়।

          কাজেই হযরত খোলাফা-ই-রাশেদীন রদিয়াল্লাহু আনহুমগণকে নির্বাচিত বললে তাঁদেরকে এহানত করা হবে যা কুফরীরই অন্তর্ভূক্ত। তাই তাঁদেরকে জনগণের দ্বারা নির্বাচিত না বলে খলীফা বা তাঁর প্রতিনিধি দ্বারা মনোনীত বলতে হবে।

(১০) গণতান্ত্রিক বহু দলীয় নির্বাচন পদ্ধতিতে প্রার্থীকে ভোট দেয়া ওয়াজিব কি-না?

          গণতান্ত্রিক বহুদলীয় নির্বাচন পদ্ধতিতে প্রার্থীকে ভোট দেয়া শরীয়তের দৃষ্টিতে ওয়াজিব নয় বরং ওয়াজিব বলাটা শরীয়তের দৃষ্টিতে কুফরীর অন্তর্ভূক্ত। তবে গণতন্ত্র ভিত্তিক বহুদলীয় রাজনীতিতে প্রার্থীকে নির্বাচনে ভোট দেয়া গণতন্ত্রের দৃষ্টিতে অবশ্য কর্তব্য বলা হয়েছে। কারণ নিদিষ্ট পরিমাণ ভোট না দিলে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবেনা। আর নির্বাচন গ্রহণযোগ্য না হলে গণতন্ত্রও প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারবেনা।

          আর ইসলামের নামে গণতন্ত্রভিত্তিক নির্বাচনে প্রার্থীকে ভোট দেয়া জায়েয নয়। প্রকৃতপক্ষে জায়েয বলাটাও কুফরীর অন্তর্ভূক্ত।

          সুতরাং মাসিক মদীনার উপরোক্ত উত্তর সম্পূর্ণরূপে মনগড়া ও ভুল বলে প্রমাণিত হলো। মাসিক মদীনার সম্পাদক হযরত শাহ্ ওয়ালী উল্লাহ্ মুহাদ্দিস দেহলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর লিখিত “হুজ্জাতুল্লাহিল বালেগা ও ইযালাতুল খাফা” কিতাবদ্বয়ের উদ্বৃতি এনে একটা জঘণ্য প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছে। তাহলো এই যে, খিলাফত পরিচালনা ও খলীফা মনোনয়নকে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, নির্বাচন ও ভোট প্রদানের দ্বারা রাষ্ট্রপ্রধান নির্ধারিত হওয়ার সাথে  মিলিয়ে দিয়েছে। অথচ এ দু’টি বিষয় সম্পূর্ণই আলাদা।

          উল্লেখ্য, মাসিক মদীনার সম্পাদক শুধু এ সংখ্যা ও এ উত্তর প্রদানের ক্ষেত্রেই নয় বরং পূর্বের প্রায় সংখ্যায়ই উত্তর প্রদানের ক্ষেত্রে সে দলীলবিহীন, মনগড়া ও ভুল উত্তর দিয়েছে যা মানুষের ঈমান, আক্বীদা ও আমলের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকারক। মাসিক আল বাইয়্যিনাত যার বাস্তব প্রমাণ।

          অতএব হক্ব তালাশীর জন্য করণীয় হচ্ছে, নিজের আক্বীদা ও আমল সহীহ্ রাখার জন্য মাসিক মদীনা  ও তার সমমনা এবং সমপর্যায়ের পত্রিকা পড়া ও তার মাসয়ালা-মাসায়েল গ্রহণ করা থেকে সম্পূর্ণরূপে বিরত থাকা।

          এ কথা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য  জানা ও মানা আবশ্যক যে, যে বা যারা আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের দলীল- কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াসের বিপরীত মনগড়া, দলীলবিহীন, ভুল মাসয়ালা প্রদাণ করবে তার বা তাদের সে মাসয়ালা গ্রহণ করা শরীয়তে যেরূপ নিষেধ তদ্রুপ এমন ব্যক্তিকে মাসয়ালা জিজ্ঞেস করাও নিষেধ।

          এখন অনেকে প্রশ্ন করতে পারে, যদি ইসলামের নামে গণতন্ত্র করা জায়েয না হয় তাহলে কি করা যেতে পারে?

          এ প্রশ্নের জবাবে আমরা সংক্ষেপে বলতে চাই যে, বর্তমানে কেউ যদি ইসলামী আন্দোলন করতে চায়, তবে তাকে “খিলাফত আলা মিন্ হাজিন্ নুবুওওয়াহ” অর্থাৎ নুবুওওয়াতের দৃষ্টিতে খিলাফতের জন্য কোশেশ করতে হবে। আর খিলাফত কায়েমের জন্য মজলিসে শুরা করতে হবে।

মজলিসে শুরার প্রধান তিনিই হবেন, যিনি সবচেয়ে বেশী তাক্ওয়াধারী হবেন। আল্লাহ্ পাক বলেন,

ان اكرمكم عند الله اتقاكم.

অর্থঃ- “নিশ্চয়ই আল্লাহ্ পাক-এর নিকট ঐ ব্যক্তি সব চাইতে সম্মানিত, যিনি তোমাদের মধ্যে তাক্ওয়াধারী বা পরহেযগার।” (সূরা হুজরাত/১৩)

          আর যিনি ইল্ম, আমল, ইখলাস অর্থাৎ প্রতিটি বিষয়ে তাক্মীলে (পূর্ণতায়) পৌঁছেছেন, তিনিই হাক্বীক্বী তাক্ওয়াধারী। অর্থাৎ যিনি উপরে বর্ণিত খলীফা হওয়ার সমস্ত শর্তের অধিকারী হবেন।

          তিনিই মূলত আওয়ামুন্নাছ বা জনসাধারণকে খিলাফতের বিপরীতে যতসব মত-পথ, নিয়ম-নীতি, তর্জ-তরীকা চালু রয়েছে তা থেকে সরিয়ে খিলাফতের কার্যক্রমের দিকে ধাবিত ও চালিত করবেন।

          স্মরণীয় যে, খিলাফতের প্রাথমিক কার্যসমূহ হচ্ছে সাধারণ মানুষের আক্বীদা বিশুদ্ধ করা। তাদেরকে আমলের দ্বারা সূসজ্জিত করা এবং ইখলাসের দ্বারা সৌন্দর্য মন্ডিত করা।

          এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক বলেন,

وعد الله الذين امنوا منكم وعملوا الصالحات ليستخلفنهم فى الارض كما استخلف الذين من قبلهم وليمكنن لهم دينهم الذى ارتضى لهم وليبدلنهم من بعد خوفهم امنا يعبدوننى لايشر كون بى شيأ ومن كفر بعد ذالك فاولئك هم الفاسقون والقيموا الصلوة واتوا الزكوة واطيعوا الرسول لعلكم ترحمون لا تحسبن الذين كفروا معجزين فى الارض ومأواهم النار ولبئس المصير.

অর্থঃ- “আল্লাহ্ পাক ওয়াদা দিয়েছেন যে, তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছেন এবং আমলে ছলেহ করেছেন, তাদেরকে অবশ্যই পৃথিবীতে খিলাফত (শাসন কর্তৃত্ব) দান করবেন। যেমন তিনি তাদের পূর্ববর্তীদেরকে খিলাফত দিয়েছিলেন এবং তিনি অবশ্যই সুদৃঢ় করবেন তাদের জন্য তাদের দ্বীনকে, যে দ্বীন তিনি তাদের জন্য পছন্দ করেছেন এবং নিশ্চয়ই তিনি তাদের ভয়ভীতির পরিবর্তে আসান (নিরাপত্তা) দান করবেন এ শর্তে যে, তারা আমার ইবাদত বন্দেগী করবে এবং আমার সাথে কাউকে শরীক করবে না। আর এর পর যারা অস্বীকার করবে, তারাই ফাসেক। তোমরা নামাজ কায়েম কর এবং যাকাত আদায় কর এবং রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আনুগত্যতা প্রকাশ কর। আশা করা যায়, তোমরা (পূর্ণ) রহ্মত প্রাপ্ত হবে। তোমরা কাফিরদের সম্পর্কে এটা ধারণা করোনা যে, তারা জমিনে পরাক্রমশীল, তাদের ঠিকানা হবে জাহান্নাম, আর নিশ্চয়ই তাদের প্রত্যাবর্তন স্থল অত্যন্ত নিকৃষ্ট।” (সূরা নূর/ ৫৫-৫৭)

          উপরোক্ত আয়াত শরীফে আল্লাহ্ পাক ওয়াদা দিয়েছেন যারা খালেছভাবে ঈমান আনবে এবং খালেছ আমলে ছলেহ্ করবে, তাদেরকে খিলাফত দান করবেন। যেমন পূর্ববর্তীগণকে দান করেছেন। আর শুধু তাই নয়, সাথে সাথে দ্বীনী মজবুতী দান করবেন, ভয়ভীতি দূর করে নিরাপত্তা দান করবেন। আর এ খিলাফত কায়েম থাকবে আল্লাহ্ পাক-এর ইবাদত-বন্দেগীতে দায়েম-কায়েম থাকলে এবং কোন বিষয়ে আল্লাহ্ পাক-এর সাথে কাউকে শরীক করা যাবে না। আর বিশেষ করে শাসন পরিচালনার ক্ষেত্রে আল্লাহ্ পাক-এর প্রদত্ত আইনের সাথে অন্য কারো প্রণীত আইন-কানুন, নিয়ম-নীতি (গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, রাজতন্ত্র, মাওবাদ, লেনিনবাদ, মার্কসবাদ ইত্যাদি), মিশ্রিত করে শরীক করা যাবে না। আর যে এর খেলাফ (বিপরীত) করবে, সে গোমরাহ্ হয়ে যাবে।

          কাজেই প্রত্যেক ব্যক্তির উচিৎ নামাজ কায়েম, যাকাত আদায় এবং আল্লাহ্ পাক-এর রাসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং হযরত সাহাবা-ই-কিরাম রদিয়াল্লাহু আনহুমগণের ইত্তেবার দ্বারা খিলাফত কায়েমের কোশেশের মাধ্যমে রহ্মত হাছিল করা।

          আর এটা যেন কোন মুসলমানই কখনো ঘুর্নাক্ষরেও চিন্তা না করে যে, কাফির, ফাসেক, জালেমরা পৃথিবীতে প্রতাপশালী, ক্ষমতাশালী, আধিপত্য বিস্তারকারী হয়ে গেছে, তাই তাদের নিয়ম-নীতি, তর্জ-তরীকা ব্যতীত খিলাফত কায়েম করা সম্ভব নয়- অবশ্যই সম্ভব। কারণ তারা আল্লাহ্ পাক-এর নিকট মনোনীত, পছন্দনীয়, প্রিয় নয়, তাই তাদের অবস্থানস্থল করা হয়েছে জাহান্নাম।

          অতএব যদি কেউ বিশ্বাস করে বা মনে করে যে, কাফির, মুশরিক, বেদ্বীনদের তর্জ-তরীকা, নিয়ম-নীতি অনুযায়ী কোশেশ করেই খিলাফত কায়েম করতে হবে অন্যথায় কায়েম করা সম্ভব নয়। তাহলে সে কাট্টা কাফির হবে।

          {দলীলসমূহঃ- (১) আহকামুল কুরআন জাস্সাস, (২) রুহুল মায়ানী, (৩) রুহুল বয়ান, (৪) খাযেন, (৫) মাযহারী, (৬) কবীরী, (৭) তাবারী, (৮) বুখারী, (৯) মুসলিম, (১০) আবূ দাউদ, (১১) মসনদে আহমদ, (১২) মুয়াত্তা, (১৩) ফতহুল বারী, (১৪) উমদাতুল ক্বারী, (১৫) বজলুল মজহুদ, (১৬) শরহে নববী, (১৭) আওনুল মা’বুদ, (১৮) মেশকাত, (১৯) মেরকাত, (২০) ত্বীবী, (২১) তা’লীক্ব, (২২) হুজ্জাতুল্লাহিল বালেগা, (২৩) ইযালাতুল খাফা, (২৪) বাংলাদেশ – সংবিধান, (২৫) বাংলা একাডেমী বিশ্বেকোষ, (২৬)। Encyclopeadia Britanica, (২৭) Encyclopeadia Americana. (২৮) world book, (২৯) Man Myths Magic, (৩০) Lexicon Macmillan Encyclopedia, (৩১) Encyclopedia, (৩২) New book of knowledge. ৪ (৩৩) Groller Encyopedia, (৩৪) Fank and Wagnalls Encyclopedia, (৩৫) Wordsworth Encyclopedia, (৩৬) Encyclopedia of Democracy, (৩৭) Political Parties: Their Organization and Activity in the Modern state- Duverger, Maurice, (৩৯) After Two Centurics, Should Condorcet’s voting procedure Be Implemented- Felsenthal Dan (80) Electoral laws and Their Political consequences. Grofman, Bernard and Arend Lijp hart, (৪১) A Democracy or Anarchy? A study of proportional Representation. notre Dame. University of notre Dame Press, 1941. (৪২) The political consequences of Electoral Laws in Latin america and the Caribbean, (৪৩) Constitutional Choices for New Democracies. (88) Compariny Voting System. -Nurmi Hannu. (৪৫) Scats and Votes: The Effcets and Determinates of Electoral System. Taagepera Rein. (৪৬) Presidents and Assemblies. Constitutional Design and Electoral Dynamics. (৪৭) The Case against Direct Election of the President. Best Judith. (৪৮) Report of the Twentieth Century Fund Task Force on Reform of the presidential Election Process. William R. Keech (৪৯) The Politics of Electoral college Reform.- yale university press-1975. ইত্যাদি।

          বিঃ দ্রঃ অতি শীঘ্রই মাসিক আল বাইয়্যিনাতে ইসলামের নামে গণতন্ত্র করা হারাম ও  খিলাফত সম্পর্কে বিস্তারিত ফতওয়া দেয়া হবে ইনশাআল্লাহ্।

মুহম্মদ আমিনুজ্জামান

সভাপতি, আঞ্জুমানে আল বাইয়্যিনাত, চট্টগ্রাম।

সুওয়ালঃ- চট্টগ্রাম হালিশহরস্থ মাদ্রাসা-এ তৈয়্যেবিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়ার মাওলানা মুহম্মদ বদিউল আলম রিজভী কর্তৃক সদ্য লিখিত একটি চটি রেসালার শেষোক্ত জিজ্ঞাসা ও তার সমাধানটি নিম্নরূপ।

জিজ্ঞাসাঃ- ভোট শব্দের সংজ্ঞা কি? ইসলামী দৃষ্টিকোণে একজন প্রার্থীর কি কি গুণাবলী থাকা প্রয়োজন? জানালে কৃতার্থ হবো।

সমাধানঃ- আলোচ্য জিজ্ঞাসার সমাধানে যে বিষয়গুলি বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে তাহলো-  (ক) ভোট একটি পবিত্র আমানতঃ (খ) ভোট স্বাক্ষ্য স্বরূপঃ

           যোগ্য প্রার্থীর জন্য নিম্নোক্ত গুণাবলী অনিবার্য

(ক) খোদাভীরু হওয়াঃ (খ) আমানতদার হওয়াঃ (গ) ন্যায় পরায়ন হওয়াঃ (ঘ) মুসলিম হওয়াঃ (ঙ) পুরুষ হওয়াঃ (চ) ইসলামের মূল ধারায় বিশ্বাসী হওয়াঃ

          এখন আমার সুওয়াল হলো-  ভোট ও তার প্রার্থী সংক্রান্ত উপরোক্ত জিজ্ঞাসার-সমাধানটি কতটুকু সঠিক? দলীলসহ জানিয়ে বাধিত করবেন।

জাওয়াবঃ- না, প্রদত্ত জিজ্ঞাসার-সমাধানটি মোটেও সঠিক নয় বরং  তা সম্পূর্ণই কুরআন-সুন্নাহ্র খেলাফ যা কুফরী বিশিষ্ট ও গোমরাহীমূলক।

          যেমন, সমাধানে প্রথমতঃ বলা হয়েছে, (ক) “ভোট একটি পবিত্র আমানতঃ”

          এর জবাবে বলাতে হয় যে, ভোট, নির্বাচন এসেছে গণতন্ত্র হতে এবং এর প্রবর্তক হচ্ছে- বিধর্মী তথা ইহুদী-খৃষ্টান। অর্থাৎ ইহা বেদ্বীন, বিজাতীয়দের নিয়ম-নীতি, পদ্ধতির অন্তর্ভূক্ত। ইসলাম ও মুসলমানদের নিয়ম-নীতি, তর্জ-তরীকার অন্তর্ভূক্ত নয়। অর্থাৎ কুরআন-সুন্নাহ্র দ্বারা ছাবেতকৃত নয়। বরং কুরআন-সুন্নাহ্র সম্পূর্ণ বিপরীত।

          আর ভোটের প্রার্থী তথা পদের প্রার্থী হওয়াও শরীয়তে সম্পূর্ণ নাজায়েয ও হারাম। হাদীস শরীফে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন, “যে পদপ্রার্থী হয় আমরা তাকে পদ দেই না।” (বুখারী, মুসলিম)

          অপর এক হাদীস শরীফে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিশিষ্ট ছাহাবী হযরত আব্দুর রহমান বিন সামুরা রদিয়াল্লাহু আনহুকে পদপ্রার্থী হতে নিষেধ করেছেন।” (বুখারী, মুসিলম)

তাহলে ভোট কি করে পবিত্র আমানত হতে পারে?

দ্বিতীয়তঃ বলা হয়েছে, (খ) ভোট স্বাক্ষ্য স্বরূপঃ

          এ কথাও সম্পূর্ণ কুরআন-সুন্নাহ্র খেলাফ। কারণ নির্বাচনে পুরুষ ও মহিলার ভোটের মান বা স্বাক্ষ্য সমান বলে সাব্যস্ত করা হয়। অথচ আল্লাহ্ পাক “সূরা বাক্বারার” ২৮২ নং আয়াত শরীফে এরশাদ করেন, “তোমাদের পুরুষদের মধ্য হতে দু’জন স্বাক্ষী দাড় করাও। যদি দু’জন পুরুষ না পাওয়া যায় তবে একজন পুরুষ, দু’জন মহিলার স্বাক্ষ্য গ্রহণ কর।” অর্থাৎ ইসলামে দু’জন মহিলার স্বাক্ষ্য একজন পুরুষের স্বাক্ষ্যের সমান।

          তাহলে এ ভোট পদ্ধতি কি করে স্বাক্ষ্য স্বরূপ হতে পারে?

তৃতীয়তঃ বলা হয়েছে, যোগ্য প্রার্থীর জন্য নিম্নোক্ত গুণাবলী অনিবার্য।

(ক) খোদাভীরু হওয়া, (খ) আমানতদার হওয়া, (গ) ন্যায় পরায়ন হওয়া, (ঘ) মুসলিম হওয়া, (ঙ) পুরুষ হওয়া, (চ) ইসলামের মূল ধারায় বিশ্বাসী হওয়া।

          এ কথাও সম্পূর্ণ ভুল। কারণ গণতান্ত্রিক নির্বাচনে তথা ভোট পদ্ধতিকে পদপ্রার্থীর জন্য উপরোক্ত গুণাবলী অনিবার্য করা হয়নি।  অর্থাৎ উল্লিখিত বিষয়গুলি শর্ত হিসেবে আরোপ করা হয়নি। যে কারণে ফাসেক-ফুজ্জার, মুসলমান-কাফির, পুরুষ-মহিলা, জাহিল-জালিম সবাই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারে এবং নির্বাচিতও হয়ে থাকে। যা ইসলামের নামে করা সম্পূর্ণ নাজায়েয ও হারাম।

          অতএব প্রমাণিত হলো যে, উপরোক্ত জিজ্ঞাসার-সমাধানটি কুরআন-সুন্নাহ্র সম্পূর্ণ খেলাফ হওয়ায় কুফরীমূলক হয়েছে।

সমাধানদাতাকে এর জন্য        অবশ্যই খালিছ তওবা-ইস্তেগ্ফার করতে হবে। অন্যথায় কুফরীমূলক সমাধান প্রদাণের জন্য তার উপর কুফরীর ফতওয়া বর্তাবে এবং এর সমূদ্বয় গুণাহ্ও তার উপর বর্তাবে। যেমন, এ প্রসঙ্গে হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে,

من افتى بغير علم كان اثمه على من افتاه.

অর্থঃ- “যাকে ইল্ম ছাড়া (ভুল) ফতওয়া দেয়া হয়েছে তার গুণাহ্ ফতওয়া দানকারীর উপর বর্তাবে।” (আবূ দাউদ)

মুহম্মদ কাওছার জামান (বাবলা)

মাহিগঞ্জ, রংপুর।

সুওয়ালঃ- মাসিক মদীনা মে’২০০০ ঈঃ সংখ্যায় প্রশ্নোত্তর বিভাগে নিম্নোক্ত প্রশ্নোত্তর ছাপা হয়।

প্রশ্নঃ- জানাযা নামাজের পর পুনরায় দোয়া করা যাবে কিনা?

উত্তরঃ- জানাযাই হচ্ছে মৃতের জন্য দোয়া। সুতরাং জানাযার পর পুনরায় দোয়া করা অর্থহীন।

          এখন আমার সুওয়াল হলো মাসিক মদীনার উক্ত বক্তব্য সঠিক হয়েছে কি? আর সত্যিই কি জানাযার নামাজের পর পুনরায় দোয়া করা অর্থহীন দয়া করে সঠিক জাওয়াব দানে বাধিত করবেন।

জাওয়াবঃ- জানাযার নামাজের পর পুনরায় দোয়া করা সম্পর্কে মাসিক মদীনার উক্ত বক্তব্য কুফরীমূলক হয়েছে। কারণ আখেরী রাসূল সাইয়্যিদুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বয়ং নিজেই জানাযার নামাজের পর মৃত ব্যক্তির জন্য পুনরায় দোয়া করেছেন। তাহলে কি আখেরী রাসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জানাযার নামাজের পর মৃত ব্যক্তির জন্য পুনরায় দোয়া করে অর্থহীন কাজ করেছেন? (নাউযুবিল্লাহ্)

          অথচ আখেরী রাসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পূর্ণ ওহীর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। তিনি ওহী ব্যতীত নিজের থেকে কোন কথা বলেননি বা কোন কাজ করেননি।

          এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক বলেন,

وما ينطق عن الهوى ان هو الا وحى يوحى.

অর্থঃ- “তিনি (সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ওহী ব্যতীত নিজ থেকে কোন কথাই বলেননা।” (সূরা লজম/৩-৪)

          মূলকথা হলো- জানাযার নামাজের পর নামাজের কাতার ভঙ্গ করে মৃত ব্যক্তির জন্য সম্মিলিতভাবে পুনরায় দোয়া করা সুন্নত। যেমন “ফতহুল ক্বাদীর, সিফরুস সায়াদাত ও যাদুল আখেরাত” কিতাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জানাযার নামাজের পর এ দোয়া করতেন,

اللهم انت ربها وانت خلقتها وانت رزقتها وانت هديتها الى الاسلام و انت قبضت روحها وانت اعلم بسرها وعلانيتها جئنا شفعاء فاغفرلها وارحمها انك انت الغفور الرحيم.

অর্থঃ- “আয় আল্লাহ্ পাক! আপনিই তার রব। আর আপনিই তাকে সৃষ্টি করেছেন, তাকে ইসলামের দ্বারা হিদায়েত দান করেছেন। আপনিই তার রূহ্ কবয করেছেন ও আপনিই তার জাহির ও বাতিন সম্পর্কে অধিক জ্ঞাত। আমি সুপারিশ করছি, তাকে মাফ করে দিন, তার প্রতি দয়া করুন। নিশ্চয়ই আপনি অতি ক্ষমাশীল ও দয়ালু।”

          অতএব নামাজের পর মৃত ব্যক্তির জন্য পুনরায় মুনাজাত করা অর্থহীন নয় বরং খাছ সুন্নত। তাছাড়া মৃত ব্যক্তির জন্য যত বেশী দোয়া করা যায় ততই তার জন্য ফায়দাজনক। কেননা হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে, الميت كالغريق.

অর্থঃ- “মৃত ব্যক্তি ডুবন্ত ব্যক্তির ন্যায়।” অর্থাৎ মৃত ব্যক্তি সর্বদাই দোয়ার অপেক্ষায় থাকে। তাই মৃত ব্যক্তির জন্য অধিকমাত্রায় দোয়া করার আদেশ স্বয়ং হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দিয়েছেন এবং নিজেও করেছেন।           সুতরাং মাসিক মদীনার উক্ত বক্তব্য ভুল ও কুফরীমূলক বলেই প্রমাণিত হলো।

{দলীলসমূহঃ- (১) আবু দাউদ শরীফ, (২) মেশকাত শরীফ, (৩) মেরকাত শরীফ, (৪) ফতহুল ক্বাদির, (৫) সিফরুস সায়াদাত, (৬) যাদুল আখিরাত, (৭) জামিউর রুমুজ, (৮) তাতারখানিয়া, (৯) হাদিয়াতুল মুছল্লীন, (১০) আইনী, (১১) ফতহুল বারী, (১২) কেফায়া, (১৩) এনায়া, (১৪) শরহে বরযখ, (১৫) বাহরুর রায়েক, (১৬) তোহফাতুল গাফেলীন, (১৭) জাওয়াহিরুন্নাফীছ, (১৮) ফতওয়ায়ে দেওবন্দ ইত্যাদি।}

বিঃ দ্রঃ জানাযার নামাজের পর পুনরায় দোয়া করা সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে ও দলীল আদিল্লা ভিত্তিক জানতে হলে মাসিক আল বাইয়্যিনাত ২০, ৩৬, ৪১, ৬৯তম সংখ্যাগুলো পড়ুন।

মুহম্মদ আনোয়ার

 মুহম্মদপুর, ঢাকা।

সুওয়ালঃ- মাসিক রাহমানী পয়গাম জুন/২০০০ঈঃ সংখ্যায় জিজ্ঞাসার-জবাব বিভাগে এক জিজ্ঞাসার জবাবে বলা হয়েছে “টাকার বিনিময়ে কুরআন শরীফ খত্ম করানো …… বিদ্’আত ও নাজায়িয।”

          এখন আমার সুওয়াল হলো মাসিক রাহমানী পয়গামের উক্ত বক্তব্য সঠিক হয়েছে কি? আর সত্যিই কি টাকার বিনিময়ে কুরআন শরীফ খত্ম করা নাজায়িয? দয়া করে সঠিক জাওয়াব দানে বাধিত করবেন।

জাওয়াবঃ- টাকার বিনিময়ে কুরআন শরীফ তিলাওয়াত বা খত্ম করা স্পর্কে মাসিক রহমানী পয়গামের উক্ত বক্তব্য সম্পূর্ণই অশুদ্ধ, বিভ্রান্তিকর ও অনুসরনীয় সকল ইমাম মুজতাহিদ ও ফক্বীহগণের ফতওয়াগ্রাহ্য মতের বিপরীত। কারণ নির্ভরযোগ্য সকল ফিক্বাহ্ ও ফতওয়ার কিতাবে এ কথাই উল্লেখ আছে যে, সময় অথবা স্থান নির্ধারণ করে দেয়া হলে কুরআন শরীফ তিলাওয়াত বা খত্ম করে উজ্রত বা পারিশ্রমিক গ্রহণ করা জায়েয। কেননা কুরআন শরীফ তিলাওয়াত বা খত্ম করলে বিনিময়ে যে উজ্রত বা পারিশ্রমিক দেয়া হবে তা তার সময় অথবা স্থানে আবদ্ধ থাকার কারণে, কুরআন শরীফ তিলাওয়াত বা ইবাদতের বিনিময়ে নয়। সুতরাং সময় অথবা স্থান নির্ধারণ করে দেয়ার শর্তে কুরআন শরীফ তিলাওয়াত বা খতম করে উজরত বা পারিশ্রমিক গ্রহণ করা জায়েয। এমনকি উক্ত পারিশ্রমিক সে জোরপূর্বকও আদায় করতে পারবে। এর উপরই ওলামায়ে মুতাআখখেরীন গণের ফতওয়া এবং এটাই গ্রহণযোগ্য ও ফতওয়া গ্রাহ্যমত। এর বিপরীত ফতওয়া দেয়া সম্পূর্ণই নাজায়েয, হারাম ও কুফরীর নামান্তর।

          এ প্রসঙ্গে ফিক্বাহ্র বিখ্যাত ও নির্ভরযোগ্য কিতাব “বাহ্রুর রায়েকে” উল্লেখ আছে,

ان المفتى به جواز الاخذ على القرائة.

অর্থঃ- “কুরআন শরীফ পাঠ করে উজরত গ্রহণ করা জায়েয, এটা ফতওয়া গ্রাহ্যমত।”

সর্বজনমান্য ও অনুসরণীয় নির্ভরযোগ্য ও বিশ্ববিখ্যাত ফিক্বাহ্র কিতাব “তাহ্তাবীতে” উল্লেখ আছে,

المختار جواز الا ستيجار على قرأة القران الخ.

অর্থঃ- “কুরআন শরীফ তিলাওয়াত করে উজরত গ্রহণ করা জায়েয হওয়াই (ফক্বীহ্গণের) মনোনীত মত।”

          আর ফিক্বাহ্ শাস্ত্রের উছূল বা নিয়ম হলো- মতভেদযুক্ত মাসয়ালায় যে মতটাকে وبه يفتى – وهوالمختار – عليه الفتاوى ترجيح. ইত্যাদি শব্দ  দ্বারা ণ্ড॥ভ্রƒ“ম্ন বা প্রাধান্য দেওয়া হবে, সে মতটিই গ্রহণযোগ্য হবে। প্রাধান্যপ্রাপ্ত মাসয়ালার বিপরীত ফতওয়া দেয়া সম্পূর্ণই নাজায়েয ও হারাম।

          এ প্রসঙ্গে কিতাবে উল্লেখ করা হয় যে,

ابن حجر مكى قال، لايحل لهما الحكم والافتاء بغير الراجح لانه اتباع اهواء وهو حرام اجماعا.

অর্থঃ- “মুহাক্কিক, ইব্নে হাজার মক্কী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ইখ্তিলাফ যুক্ত মাসয়ালায় প্রাধ্যন্য প্রাপ্ত মাসয়ালার বিপরীত ফতওয়া দেয়া বা আমল করা সর্বসম্মতিক্রমে হারাম। কেননা তা নফ্সের অনুসরণ।” তা “ফতওয়ায়ে কোবরাতে”ও উল্লেখ আছে। (উবুদে রস্মুল মুফ্তি/৩)

          অতএব উপরোক্ত আলোচনা সাপেক্ষে বিশেষভাবে সাব্যস্ত হয় যে, কুরআন শরীফ তিলাওয়াত করে বিনিময় বা পারিশ্রমিক গ্রহণ করা জায়েয। সুতরাং মাসিক রাহমানী পয়গামের বক্তব্য ভুল বলেই প্রমাণিত হলো।

          এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে হলে মাসিক আল বাইয়্যিনাত-এর ২৩ ও ২৪তম সংখ্যা এবং বিশেষ করে ৫৯তম সংখ্যা থেকে ৬৯তম সংখ্যা মতামত বিভাগের উজরত সম্পর্কিত “ভন্ডামী ফাঁস” মতামতটি পাঠ করুন।

মুহম্মদ মুহিউদ্দীন

সদর থানা, সন্দীপ।

সুওয়ালঃ- মাসিক মুঈনুল ইসলাম জুন’২০০০ ঈঃ সংখ্যায় জিজ্ঞাসা সমাধান বিভাগে এক জিজ্ঞাসার সমাধানে বলা হয়েছে “প্রচলিত মীলাদ-ক্বিয়াম বিদ্আত।”

          এখন আমার সুওয়াল হলো- মাসিক মুঈনুল ইসলাম পত্রিকার উক্ত বক্তব্য সঠিক হয়েছে কি? আর সত্যিই কি প্রচলিত মীলাদ-ক্বিয়াম বিদ্য়াত? সঠিক জাওয়াব দানে বাধিত করবেন।

জাওয়াবঃ- প্রচলিত মীলাদ-ক্বিয়াম সম্পর্কে হাট  হাজারী খারেজী মাদ্রাসার মুখপত্র মাসিক মুঈনুল ইসলাম ওরফে মুহীনুল ইসলাম পত্রিকার উক্ত বক্তব্য সঠিক হয়নি। বরং তা সম্পূর্ণই ভুল বিভ্রান্তিকর ও দলীলবিহীন হয়েছে এবং তা অনুসরণীয় ইমাম-মুজতাহিদ ও ফক্বীহগণের সর্বজনমান্য ও স্বীকৃত বিশ্ববিখ্যাত ফিক্বাহ ও ফতওয়ার কিতাবসমূহের বক্তব্যের সম্পূর্ণ বিপরীত ও বিরুদ্ধ মত।

          কেননা প্রচলিত মীলাদ-ক্বিয়াম বিদ্য়াত নয় বরং প্রচলিত মীলাদ-ক্বিয়াম অবশ্যই একটি শরীয়তসম্মত ইবাদত যা আমরা কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ, তাফসীর ও ফিক্বাহ্র অসংখ্য কিতাবের দলীল-আদিল্লা দ্বারা বিস্তারিতভাবে প্রমাণ করেছি যে,  “প্রচলিত মীলাদ-ক্বিয়াম সুন্নতে উম্মত ও মুস্তাহ্সান।”

          সুতরাং মাসিক মুহীনুল ইসলাম পত্রিকার উক্ত বক্তব্য ভুল ও বিভ্রান্তিকর যা থেকে বেঁচে থাকা প্রত্যেক মুসলমানদের জন্য ফরজ, ওয়াজিবের অন্তর্ভূক্ত।

          উল্লেখ্য প্রচলিত মীলাদ-ক্বিয়াম সম্পর্কে দলীল আদিল্লাসহ বিস্তারিত ভাবে জানতে হলে মাসিক আল বাইয়্যিনাত পত্রিকার ২৮, ৩৬, ৪০, ৪৭, ৬৮তম সংখ্যা পড়ুন।

মুহম্মদ রাশেদ

সভাপতি- ছাত্র আঞ্জুমানে আল বাইয়্যিনাত

রংপুর শাখা, রংপুর।

সুওয়ালঃ- মুছাফির ব্যক্তির জন্য মসজিদে গিয়ে জামায়াতে নামাজ পড়ার ব্যাপারে বাধ্যবাধকতা কতটুকু? দলীলসহ জানতে ইচ্ছুক।

জাওয়াবঃ- কুরআন শরীফ ও হাদীস শরীফে মসজিদের অনেক ফযীলত উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি হাদীস শরীফে মসজিদে গিয়ে নামাজ আদায় করার ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। যেমন, হাদীস শরীফে আল্লাহ্ পাক-এর রাসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন,

لا صلوة لجار المسجد الا فى المسجد.

অর্থঃ- “মসজিদের আহ্ল বা পরশিদের মসজিদ ব্যতীত নামাজ পরিপূর্ণরূপে আদায় হবে না।” (ফিরদাউস লিদ্ দায়লামী)

এছাড়া মসজিদে গিয়ে জামায়াতে নামাজ আদায় করার বহুগুণ সওয়াব লাভের কথা বর্ণিত রয়েছে।

          এখন কথা হচ্ছে- কোন্ ব্যক্তির জন্য মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়ার ব্যাপারে কুরআন-সুন্নাহ্র নির্দেশ?জাওয়াব হচ্ছে- মুকিম ও সুস্থ মুছল্লীদের জন্য মসজিদে গিয়ে জামায়াতে নামাজ আদায় করা শরীয়তের হুকুম। কিন্তু যারা মুছাফির কিংবা অসুস্থ এমন মুছল্লীদের জন্য মসজিদে গিয়ে নামাজ আদায় করার ব্যাপারে শরীয়ত গুরুত্বারোপ করেনি। বরং মুছাফির ব্যক্তির জন্য নামাজের ওয়াক্তে যেখানে সুবিধা হয় মনে সেখানেই নামাজ আদায় করবে। চাই তা মসজিদে হোক অথবা অন্য কোন স্থানে হোক। এ কারণেই আল্লাহ্ পাক-এর হাবীব, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন,

جعلت لى الارض مسجدا وطعورا.

অর্থঃ- “আমার জন্য সমগ্র জমিনকে মসজিদ ও পাক পবিত্র করে দেয়া হয়েছে।” (মুসলিম শরীফ)

          এ হাদীস শরীফের ব্যাখ্যায় বলা হয় যে, পূর্ববর্তী আম্বিয়া আলাইহিমুস্ সালামগণের উম্মতের জন্য তাঁদের ইবাদতখানায় ইবাদত-বন্দেগী করার হুকুম ছিল। ইবাদতখানার বাইরে ইবাদত-বন্দেগী করা হলে তা কবুল করা হতোনা। কিন্তু আল্লাহ্ পাক আখেরী রাসূল, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ফযীলতের কারণে তাঁর উম্মতের জন্য সেই হুকুম রহিত করে দেন এবং সমস্ত জমিনকে ইবাদতখানা বানিয়ে দেন। (সুবহানাল্লাহ্)

          এ কারণে শুধুমাত্র পুরুষ স্বাধীন মুকিম ও সুস্থ ব্যক্তির জন্য মসজিদে গিয়ে জামায়াতে নামাজ আদায় করার ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। মহিলা, গোলাম, মুছাফির, জিহাদে অংশগ্রহণকারী ও অসুস্থ ব্যক্তির জন্য মসজিদে নামাজ আদায় করার ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করা হয়নি।

          তাই আল্লাহ্ পাক-এর হাবীব, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জীবনী মোবারকে দেখা যায় যে, তিনি সফরে থাকাকালীন মরুভূমিতে নামাজ আদায় করেছেন, তবে তা জামায়াতের সাথে।

          কাজেই মুছাফিরদের জন্য মসজিদে গিয়ে নামাজ আদায় করা শর্ত নয়। বরং মুছাফির একাধিক হলে তাদের জন্য জামায়াতে নামাজ আদায় করা শর্ত। আর মুছাফির একজন হলে তার জন্য জামায়াতও শর্ত নয়। তাই মুছাফিরের জন্য জুমুয়া শর্ত করা হয়নি। কেননা জুমুয়ার জন্য ইমাম ব্যতীত তিনজন মুছল্লী থাকা শর্ত। সুতরাং তারা জুমুয়ার পরিবর্তে জোহরের (কছর) নামাজ আদায় করবে। তবে যদি মুছাফির মুছল্লী ইমামসহ চারজন হয় তাহলে তারা ইচ্ছা করলে জুমুয়া আদায় করতে পারবে।

          উল্লেখ্য, মুছাফিরগণ ১৫ দিনের কম সময়ের জন্য পায়ে হেঁটে অথবা যানবাহনে আরোহন করে দীর্ঘপথ (৪৮ মাইল ও তার উর্দ্ধে) অতিক্রম করতঃ এক স্থান হতে অন্যস্থানে গমণ করে থাকেন বিভিন্ন উদ্দেশ্যে। সে কারণে তাদের খাকা-খাওয়া, চলা-ফেরা, ওজু-ইস্তেঞ্জা ইত্যাদি কিছুই নির্দিষ্ট থাকে না। সবকিছু কষ্ট সাধ্য হয়ে থাকে। তাই আল্লাহ্ পাক-এর রাসূল, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন, السفر قطعة من النار.

অর্থঃ- “সফর হচ্ছে- আগুণের একটি টুকরা বিশেষ।”(দারেমী, ইবনে মাযাহ্)

          সুতরাং সফরকারীদের কষ্টের কারণ হেতু স্বয়ং আল্লাহ্ পাক তাদের প্রতি ইহ্সান হিসেবে রোজা ভঙ্গ করার ইখতিয়ার দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে এরশাদ হয়েছে,

من كان مريضا او على سفر فعدة من ايام اخر.

অর্থঃ- “যে ব্যক্তি অসুস্থ অথবা মুছাফির হয় সে অন্য সময় রোজা রাখতে পারে। অর্থাৎ মুছাফিরের জন্য রোজা কাজা করা জায়েয রয়েছে।” (সূরা বাক্বারা/১৮৫)

আর নামাজের ক্ষেত্রে চার রাকায়াত বিশিষ্ট ফরজ নামাজকে কছর করে দু’রাকায়াত করে দিয়েছেন।

          এ প্রসঙ্গে এরশাদ হয়েছে,

واذا ضربتم فى الارض فليس عليكم جناح ان تقصروا من الصلوة.

অর্থঃ- “যখন তোমরা জমিনে ভ্রমণ করবে তখন তোমাদের জন্য নামাজকে কছর করা গুণাহ্র কাজ নয়। অর্থাৎ মুছাফিরের জন্য জোহর, আছর ও এশা কছর (দু’রাকায়াত) আদায় করা ফরজ, ওয়াজিবের অন্তর্ভূক্ত।” (সূরা নিসা/১০১)

          সুন্নত বা নফল নামাজ আদায় করা সফরকারীদের ইচ্ছার উপর ছেড়ে দিয়েছেন। ইচ্ছা করলে তারা আদায়ও করতে পারে। আর ইচ্ছা করলে আদায় নাও করতে পারে। আদায় করা বা না করা উভয়টি সুন্নতের অন্তর্ভূক্ত।

          অতএব, মুছাফিরদের জন্য প্রথমতঃ জামায়াত শর্ত নয়, যদি মুছাফির একা হয়। দ্বিতীয়তঃ মুছাফির যদি একাধিক হয় তাহলে জামায়াত শর্ত, তবে মসজিদ শর্ত নয়। অর্থাৎ মসজিদে গিয়ে জামায়াতে নামাজ আদায় করা শরীয়তের নির্দেশ নয়। বরং মুছাফিরগণ তাদের সুবিধামত স্থানে নামাজ আদায় করবে। তাই মুছাফিরদেরকে মসজিদে গিয়ে জামায়াতের নামাজ আদায় করার জন্য বাধ্য করা বা চাপ সৃষ্টি করা শরয়ী হুকুমের খেলাফ।

          {দলীলসমুহঃ- (১) তাফসীরে কুরতুবী, (২) রুহুল মায়ানী, (৩) মাযহারী, (৪) ইবনে কাছীর, (৫) আহ্কামুল কুরআন, (৬) মুসলিম শরীফ, (৭) শরহে নববী, (৮) মেরকাত, (৯) ত্বীবী, (১০) কুদুরী, (১১) শরহে বেকায়া, (১২) আইনুল হেদায়া, (১৩) আলমগীরী, (১৪) শামী, (১৫) গায়াতুল আওতার, (১৬) আরকানে আরবাআ, (১৭) দুররুল মোখতার, (১৮) ফতহুল ক্বাদীর, (১৯) বাহরুর রায়েক ইত্যাদি}

মুহম্মদ রবিউল হোসেন ভুঁইয়া

অর্থ ও হিসাব বিভাগ, চট্টগ্রাম বন্দর, চট্টগ্রাম।

সুওয়ালঃ- ধর্মীয় অনুষ্ঠান বা প্রতিষ্ঠানের অবৈধ উপার্জনকারীর (ঘুষ, সুদখোর ইত্যাদি) নিকট থেকে চাঁদা বা সাহায্য নেয়া জায়েয কি-না? দয়া করে জানাবেন।

জাওয়াবঃ- অবৈধভাবে উপার্জিত ধন-সম্পদ সওয়াবের আশায় সদ্কা বা দান করা জায়েয নেই। বরং সওয়াবের আশায় দান করলে কুফরী হবে। আর হারাম মাল দান-সদ্কা করা হলে তা আল্লাহ্ পাক-এর নিকট কবুলযোগ্যও হবে না।

এই মর্মে আল্লাহ্ পাক তাঁর কালামে পাকে এরশাদ করেন, كلوا من الطيبات واعملوا صالحا.

অর্থঃ- “তোমরা পবিত্র বা হালাল খাও এবং নেক আমল কর।” (সূরা মু’মিনুন/৫১) তিনি অন্যত্র এরশাদ করেন,

يا ايها الذين امنوا كلوا من طيبات ما رزقناكم.

অর্থঃ- “হে ঈমানদারগণ! আমি তোমাদেরকে যে রিজিক দিয়েছি তা থেকে যা হালাল বা পবিত্র তা খাদ্য হিসেবে গ্রহণ কর।” (সূরা বাক্বারা/১৭২)

          আর হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে,

ان الله تعالى طيب لا يقبل الا طيبا.

অর্থঃ- “নিশ্চয়ই আল্লাহ্ পাক পবিত্র। তিনি পবিত্র (হালাল) ছাড়া গ্রহণ করেন না।” (মুসলিম শরীফ)

          উল্লেখ্য, এতদ্বসম্পর্কে আরো হাদীস শরীফ বর্ণিত রয়েছে যার উপর ভিত্তি করে হালার খাদ্য, পানিয়, পরিধেয় বস্ত্র ইত্যাদি শরীয়তের একটি বিশেষ হুকুমের অন্তর্ভূক্ত হয়েছে। আর হালাল মাল থেকে দান খয়রাত করা শরীয়তের আদেশ করা হয়েছে এবং হারাম মাল থেকে দান খয়রাত করা নিষেধ করা হয়েছে।

আল্লাহ্ পাক তাঁর কালামে পাকে এরশাদ করেন,

احل الله البيع وحرم الربوا.

অর্থঃ- “আল্লাহ্ পাক ব্যবসাকে হালার করেছেন আর সুদকে হারাম করেছেন।” (সূরা বাক্বারা/২৭৫)

          তিনি আরো এরশাদ করেন,

يا ايها الذين امنوا لا تأكلوا الربوا اضعافا مضاعفة واتقوا الله لعلكم تفلحون.

অর্থঃ- “হে ঈমানদারগণ! তোমরা দিগুণ বহুগুণে সুদ খেওনা। আর (এ ব্যাপারে) আল্লাহ্ পাককে ভয় কর। তবে আশা করা যায় তোমরা সফলকাম হবে।” (সূরা আলে ইমরান/১৩০) আর হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে,

عن جابر قال لعن رسول الله صلى الله عليه وسلم اكل الربوا وموكله وكاتبيه وشاهديه و قال هم سواء.

অর্থঃ- “হযরত জাবের রদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসলীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লা’নত (অভিশাপ) করেছেন, যে সুদ খায়, যে সুদ দেয়, যে সুদের দলীল লিখে, যে দু’জন সুদের সাক্ষী হয়, তাদের সকলের প্রতি এবং তিনি (হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন যে, তারা সবাই (গুণাহ্গার হিসেবে) সমান।” (মুসলিম শরীফ)

          হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেন, الراشى والمرتشى كلاهما فى النار.

অর্থঃ- “ঘুষ দাতা ও গ্রহীতা উভয়েই জাহান্নামী।” (দায়লামী)

          উপরোক্ত আাত শরীফ ও হাদীস শরীফ ছাড়াও আরো অনেক আয়াত শরীফ ও হাদীস শরীফ রয়েছে যা দ্বারা সুদ-ঘুষ সম্পূর্ণরূপে হারাম সাব্যস্থ হয়েছে। যারা এই হারামের সাথে জড়িত তারা সকলেই কবীরা গুণাহ্-এ গুণাহ্গার। তাদের সকলের প্রতি আল্লাহ্ পাক ও তাঁর রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর লা’নত এবং তাদের শেষ পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ। সুতরাং এ থেকে সকলকে খালেছ তওবা ইস্তেগ্ফার করা জরুরী।

          অতএব, হারাম উপায়ে উপার্জিত টাকা দ্বীনি কোন প্রতিষ্ঠান বা অনুষ্ঠানে দেয়া বা নেয়া জায়েয হবে না। বরং এমন অর্থ সম্পদ একমাত্র ঐ ব্যক্তির পক্ষে নেয়া মুবাহ্ যে ব্যক্তি মাজুরের অন্তর্ভূক্ত। অর্থাৎ যে থাকা-খাওয়া, পড়ার সংস্থান করতে সম্পূর্ণরূপে অক্ষম। এমন ব্যক্তিকে তা দান করতে হলেও সওয়াবের নিয়ত ছাড়াই দান করে দিতে হবে।

          হ্যাঁ, সুদ-ঘুষখোর যদি কোন হালাল প্রতিষ্ঠান বা কোন হালাল ক্ষেত-খামার হতে অর্থ সম্পদ কোন দ্বীনি প্রতিষ্ঠানে, কিংবা কাউকে দান-সদ্কা করে তবে তা গ্রহণ করা জায়েয। কেউ কেউ বলে থাকে যে, আমাদের দেশে সমস্ত প্রতিষ্ঠানগুলো তা সরকারী হোক বা বেসরকারী হোক প্রত্যেকটি সুদে জর্জরিত। কারণ সরকার বাইরের দেশ থেকে সুদ দেয়ার শর্তে টাকা এনে থাকে। তাই সকলেই ইচ্ছায় হোক আর অনিচ্ছায়ই হোক সুদ থেকে মুক্ত নয়। কাজেই খাদ্য, পানীয়, বস্ত্র ইত্যাদি সমস্ত কিছুই সুদী লেনদেন থেকে খালি নয়।

          এর জাওয়াব হচ্ছে- উপরোক্ত বক্তব্য সম্পূর্ণ শরীয়তের খেলাফ। কারণ সরকার কার থেকে এবং কিভাবে টাকা এনেছে সেটা দেখা জনগণের দায়িত্ব নয়। বরং সেটা সম্পূর্ণভাবে সরকারের এখতিয়ারাধীন। সরকার সুদে টাকা আনলে জনগণের ব্যবসা-বাণিজ্য সুদে জর্জরিত হবে একথাও শরীয়তের খেলাফ। কারণ যে ব্যবসা করবে তার ব্যবসায় যদি সুদী টাকা নিয়োগ করা না হয় তাহলে তার ব্যবসা সুদভিত্তিক হবে কেন? আর যে চাকুরী করবে তার কাজ যদি সুদ সংশ্লিষ্ট না হয় তাহলে তার এ চাকুরী সুদে জর্জরিত হবে কেন? এর উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে যে, যদি কোন ব্যক্তি কারো বাড়ীতে তার ছেলে-মেয়েকে কুরআন শরীফ শিক্ষা দেয় তখন সে এর বিনিময় গ্রহণ করতে পারবে যা তার জন্য শরীয়তসম্মত। এখন যদি উক্ত ছাত্র-ছাত্রীর পিতা অবৈধ কামাই থেকে উক্ত আলেম সাহেবকে তার পারিশ্রমিক দেয় তাহলে সেটা উক্ত আলেম সাহেবের জন্য সম্পূর্ণ বৈধ। কারণ সে যে কাজের বিনিময় টাকা নিচ্ছে সে কাজটি হালাল ও শরীয়সম্মত। তবে যে ব্যক্তি অবৈধ টাকা থেকে হালার বা শরীয়তসম্মত কাজের পারিশ্রমিক দিবে সেজন্য সে নিজেইে গুণাহ্গার ও দোষী বলে সাব্যস্ত হবে।

          আরো উদাহরণ দেয়া যেতে পারে, কোন রিক্সাচালক যদি তার রিক্সায় চড়িয়ে কোন ব্যক্তিকে দূরবর্তী স্থানে নিয়ে যায় এবং তার পারিশ্রমিক বাবদ টাকা গ্রহণ করে আর সেই আরোহী যদি তার অবৈধ টাকা থেকে মূল্য পরিশোধ করে তাহলে রিক্সাচালকের জন্য উক্ত টাকা হতে পারিশ্রমিক গ্রহণ করা সম্পূর্ণ জায়েয। কারণ সে হালাল কাজের বিনিময় গ্রহণ করেছে। এক্ষেত্রেও আরোহী গুণাহ্গার ও দোষী বলে সাব্যস্ত হবে।

          অতএব, শরীয়তের উসূল হচ্ছে- যে কাজের বিনিময় পারিশ্রমিক গ্রহণ করবে তা যদি শরীয়তসম্মত হয় তাহলে পারিশ্রমিক হালাল। আর যদি কাজটা শরীয়তের খেলাফ হয় তাহলে তার পারিশ্রমিকও হারাম।

          {দলীলসমূহঃ- (১) আহকামুল কুরআন, (২) কুরতুবী, (৩) রুহুল মায়ানী, (৪) মাযহারী, (৫) খাযেন, (৬) বাগবী, (৭) ইবনে কাছীর, (৮) বুখারী শরীফ, (৯) মুসলিম শরীফ, (১০) ফতহুল বারী, (১১) ওমদাতুল ক্বারী, (১২) মেশকাত, (১৩) মেরকাত, (১৪) আশয়াতুল লুময়াত, (১৫) আলমগীরী, (১৬) শামী, (১৭) হেদায়া, (১৮) আইনুল হেদায়া, (১৯) ফতহুল ক্বাদীর ইত্যাদি}

সুওয়াল-জাওয়াব

সুওয়াল-জাওয়াব

সুওয়াল-জাওয়াব বিভাগ

সুওয়াল-জাওয়াব বিভাগ

সুওয়াল-জাওয়াব বিভাগ