সুওয়াল-জাওয়াব বিভাগ

সংখ্যা: ৩০৪তম সংখ্যা | বিভাগ:

মুহম্মদ মুহম্মদ আমজাদ আলী,

বাইতুল মোকাররম মার্কেট, ঢাকা,

মুহম্মদ রায়হানুদ্দীন, খদ্দর মার্কেট, ঢাকা,

মুহম্মদ রওশন, নবাবপুর মার্কেট, ঢাকা,

মুহম্মদ আলী আকবর, মৌচাক মার্কেট,

ঢাকা, মুহম্মদ আলমগীর, বিজয় নগর, ঢাকা,

মুহম্মদ আজাদ, শান্তিনগর, ঢাকা

সুওয়াল: সম্প্রতি জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতীব এক আলোচনায় বলেছে যে- (১) দ্বীন ইসলামে ঈদ হলো শুধু ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আদ্বহা। (২) শরীয়তে ঈদে মীলাদুন নবী নামে কোনো ঈদ নাই। এই নামে নামকরণ করা এবং এই দিনকে ঈদ হিসেবে গ্রহণ করা ব্যক্তিগত ইচ্ছা। (৩) এ ঈদ পালন করা শরীয়তসম্মত নয় এবং রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার আদর্শও নয়।

এখন আমার জানার বিষয় হচ্ছে, কথিত উক্ত খতীবের বিভ্রান্তিমূলক বক্তব্যগুলোর সঠিক জাওয়াব দিয়ে আমাদের ঈমান হিফাজত করবেন বলে আমরা আশাবাদী।

জাওয়াব: আমাদের ভাবতে অবাক লাগে যে, এরকম একটি আশাদ্দুদ দরজার জাহিল বা মূর্খ লোক বায়তুল মোকাররম মসজিদের খতীব হয় কিভাবে? তার না আছে দ্বীনী ইলিম, না আছে দুনিয়াবী জ্ঞান আর না আছে কোনো ব্যক্তিত্ব। তার মাথার টুপিটা বিদয়াত, চুলটা বিদয়াত, কোর্তাটা বিদয়াত, জুতাটা বিদয়াত অর্থাৎ সে আপাদমস্তক বিদয়াতে ডুবে আছে। সে আবার পবিত্র মীলাদ শরীফকে বিদয়াত ফতওয়া দেয়। সে যে ছবি তোলে, ভিডিও করে এটা জায়িয পেলো কোথায়? এটা তো সবচেয়ে বড় বিদয়াত ও হারাম কাজ।

কাজেই এরূপ একটা মূর্খ, ফাসেক ও বিদয়াতী লোক কস্মিনকালেও বায়তুল মোকাররমের খতীব হতে পারেনা। তাকে অবিলম্বে খতীব পদ থেকে বহিস্কার করা উচিত। নচেৎ আশেকে রসূলগণ তাকে অর্ধচন্দ্র দিয়ে বিদায় জানাবে ইনশাআল্লাহ।

উল্লেখ্য সে তার বক্তব্যের পক্ষে কোন দলীল পেশ করতে পরেনি। কাজেই বিনা দলীলে কারো কোন কথা মহাসম্মানিত শরীয়ত উনার নিকট কখনোই গ্রহনযোগ্য নয়।

এখন আমরা মহাসম্মানিত শরীয়ত থেকে দলীল দ্বারা তার কুফরীমূলক বক্তব্য খণ্ডন করবো ইনশাআল্লাহ।

এখন তার কুফরীমূলক বক্তব্যের জবাবে আসা যাক। কথিত খতীব উরফে খবীছ (আব্দুল মালেক) প্রথমত: বলেছে, “দ্বীন ইসলামে ঈদ হলো শুধু ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আদ্বহা অর্থাৎ দুই ঈদ ছাড়া আর কোনো ঈদ শরীয়তে নাই। নাউযুবিল্লাহ!

কথিত খতীব উরফে খবীছের উক্ত বক্তব্য শুধু জিহালতপূর্ণই নয়, বরং দলীলবিহীন, মনগড়া ও কুফরীমূলক হয়েছে। কারণ সে তার বক্তব্যের মাধ্যমে পবিত্র হাদীছ শরীফ ও শরীয়তের অন্যতম অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ ঈদকে অস্বীকার করেছে।

যেমন পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

عَنْ حَضْرَتْ عُبَـيْدِ ابْنِ السَّبَّاقِ رَضِىَ اللهُ تَـعَالٰى عَنْهُ اَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ فِيْ جُـمُعَةٍ مِّنَ الْـجُمَعِ يَا مَعْشَرَ الْمُسْلِمِيْنَ اِنَّ هٰذَا يَوْمٌ جَعَلَهُ اللهُ عِيْدًا…

অর্থ : “হযরত উবাইদ বিন সাব্বাক্ব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বর্ণনা করেন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি এক পবিত্র জুমুআর দিনে ইরশাদ মুবারক করেন, এ পবিত্র জুমআর দিন হচ্ছে এমন একটি দিন, যে দিনকে মহান আল্লাহ পাক তিনি পবিত্র ঈদের দিন হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন।…” সুবহানাল্লাহ! (মুয়াত্তা মালিক শরীফ : হাদীছ শরীফ নং ১৪৪, ইবনে মাজাহ শরীফ : হাদীছ শরীফ নং ১১৯৮, মাআরিফুস সুনান ওয়াল আছার বায়হাক্বী শরীফ : হাদীছ শরীফ ১৮০২, মুসনাদে শাফিয়ী শরীফ : হাদীছ শরীফ নং ২৬৮, আল্ মু’জামুল আওসাত লিত্ ত্ববারানী শরীফ : হাদীছ শরীফ নং ৩৪৩৩)

পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে আরো ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

لِكُلِّ مُؤْمِنٍ فِيْ كُلِّ شَهْرٍ اَرْبَـعَةُ اَعْيَادٍ اَوْخَـمْسَةُ اَعْيَادٍ

অর্থ : “নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, মু’মিন মুসলমানদের প্রতি মাসে চারটি অথবা পাঁচটি ঈদ রয়েছে। অর্থাৎ প্রতিমাসে চারটি অথবা পাঁচটি ইয়াওমুল ইছনাইন শরীফ হয়ে থাকে।” (কিফায়া শরহে হিদায়া ২য় খণ্ড : বাবু ছলাতিল ঈদাইন, হাশিয়ায়ে লখনবী আলাল হিদায়া)

পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে আরো ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

عَنْ حَضْرَتْ عَمَّارِ بْنِ اَبِـيْ عَمَّارٍ رَضِىَ اللهُ تَـعَالٰـى عَنْهُ قَالَ قَـرَاَ حَضْرَتْ اِبْنُ عَبَّاسٍ رَضِىَ اللهُ تَـعَالٰـى عَنْهُ ‏‏(‏اَلْيَـوْمَ اَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَاَتْـمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِيْ وَرَضِيْتُ لَكُمُ الْاِسْلاَمَ دِيْـنًا‏)‏ وَعِنْدَهٗ يَـهُوْدِيٌّ فَـقَالَ لَوْ اُنْزِلَتْ هٰذِهٖ عَلَيْـنَا لَاتَّـخَذْنَا يَوْمَهَا عِيْدًا‏.‏ قَالَ حَضْرَتْ اِبْنُ عَبَّاسٍ رَضِىَ اللهُ تَـعَالٰى عَنْهُ فَإِنَّـهَا نَـزَلَتْ فِيْ يَوْمِ عِيْديْنِ فِيْ يَـوْمِ جُـمُعَةٍ وَيَـوْمِ عَرَفَةَ‏.‏

অর্থ : “হযরত আম্মার ইবনে আবূ আম্মার রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, হযরত ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি একদা ‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণ করে দিলাম। ’ … (সম্মানিত ও পবিত্র সূরা মায়িদা শরীফ : পবিত্র আয়াত শরীফ ৩)

এ পবিত্র আয়াত শরীফখানা শেষ পর্যন্ত তিলাওয়াত করলেন। তখন উনার নিকট এক ইয়াহূদী ছিল, সে বলে উঠলো, যদি এমন আয়াত শরীফ আমাদের ইয়াহূদী স¤প্রদায়ের প্রতি নাযিল হতো, আমরা উক্ত আয়াত শরীফ নাযিলের দিনটিকে ঈদের দিন হিসেবে ঘোষণা করতাম। এটা শুনে হযরত ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বললেন, এ আয়াত শরীফ দুই ঈদের দিন নাযিল হয়েছে – (১) জুমুয়ার দিন এবং (২) আরাফার দিন।” (তিরমিযী শরীফ : হাদীছ শরীফ ৩৩১৮)

পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে আরো ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

عَنْ حَضْرَتْ عُقْبَةَ بْنِ عَامِرٍ رَضِىَ اللهُ تَـعَالٰى عَنْهُ اَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ‏ اِنَّ يَـوْمَ عَرَفَةَ وَيَـوْمَ النَّحْرِ وَاَيَّامَ التَّشْرِيْقِ عِيْدُنَا اَهْلَ الْاِسْلَامِ

অর্থ: “হযরত উক্ববা ইবনে আমির রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত। নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, আরাফা দিন, ইয়াওমে নহর বা কুরবানীর দিন এবং আইয়্যামে তাশরীক (অর্থাৎ ১১, ১২ ও ১৩ যিলহজ্জ শরীফ) অর্থাৎ  ১০, ১১, ১২ ও ১৩ই যিলহজ্জ শরীফ পর্যন্ত এই চার দিনই আমাদের মুসলমানদের জন্য ঈদের দিন।” (নাসাঈ শরীফ : কিতাবুল হজ্জ : হাদীছ শরীফ নং ৩০০৪, আবূ দাঊদ শরীফ : কিতাবুছ ছিয়াম, হাদীছ শরীফ নং ২৪১৯, তিরমিযী শরীফ : কিতাবুছ ছিয়াম : হাদীছ শরীফ নং ৭৭৩)

উপরোক্ত দলীলভিত্তিক আলোচনা দ্বারা অকাট্যভাবেই প্রমাণিত যে, সম্মানিত শরীয়ত উনার মাঝে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আদ্বহা ছাড়াও আরো অনেক ঈদ রয়েছে। তাই বলার আর অপেক্ষাই রাখেনা যে, খবীছ ভগবান দাসের উক্ত বক্তব্য সম্পূর্ণভাবেই মিথ্যা, বানোয়াট, দলীলবিহীন, মনগড়া এবং তা ছহীহ হাদীছ শরীফ ও  উনার মধ্যে বর্ণিত অন্যান্য ঈদকে অস্বীকার করার কারণে কাট্টা কুফরী হয়েছে।

কথিত খতীব উরফে খবীছ দ্বিতীয়ত: বলেছে, শরীয়তে ঈদে মীলাদুন নবী নামে কোনো ঈদ নাই, এই নামে নামকরণ করা ও এই দিনকে ঈদ হিসেবে গ্রহণ করা ব্যক্তিগত ইচ্ছা।

কথিত খতীব উরফে খবীছের উক্ত বক্তব্যও ডাহা মিথ্যা, দলীলবিহীন ও কুফরীমূলক হয়েছে। কারণ সে তার উক্ত বক্তব্য দ্বারা পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র হাদীছ শরীফ অস্বীকার করেছে। নাউযুবিল্লাহ!

পবিত্র ঈদে মীলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অর্থ হচ্ছে- নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার যমীনে তাশরীফ মুবারক আনা বা উনাকে সর্বশ্রেষ্ঠ নিয়ামত হিসেবে লাভ করার কারণে শুকরিয়া আদায় করে ঈদ বা খুশি প্রকাশ করা। এটা তো পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র হাদীছ শরীফ দ্বারাই অকাট্যভাবে প্রমাণিত।

 যেমন পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

قُلْ بِفَضْلِ اللهِ وَبِرَحْـمَتِهٖ فَبِذٰلِكَ فَـلْيَـفْرَحُوْا هُوَ خَيْـرٌ مِّـمَّا يَـجْمَعُوْنَ

অর্থ: “(আমার সম্মানিত হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম!) আপনি উম্মতকে বলে দিন, মহান আল্লাহ পাক তিনি সম্মানিত ফদ্বল বা অনুগ্রহ মুবারক ও সম্মানিত রহমত মুবারক হিসেবে উনার হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে উম্মত মাঝে পাঠিয়াছেন, সেজন্য অবশ্যই তারা যেনো খুশি মুবারক প্রকাশ করে অর্থাৎ ঈদ উদযাপন করে। এই খুশি মুবারক প্রকাশ করা বা ঈদ উদযাপন করাটা তাদের সমস্ত আমল বা ইবাদত থেকে শ্রেষ্ঠ ইবাদত।” (সম্মানিত ও পবিত্র সূরা ইঊনুস শরীফ : পবিত্র আয়াত শরীফ ৫৭-৫৮)

অন্যত্র আরো ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

قَالَ عِيْسَى ابْنُ مَرْيَـمَ اللّٰـهُمَّ رَبَّـنَاۤ اَنْزِلْ عَلَيْـنَا مَآئِدَةً مِّنَ السَّمَآءِ تَكُوْنُ لَـنَا عِيْدًا لِّاَوَّلِنَا وَاٰخِرِنَا وَاٰيَةً مِّنْكَ ۖ

অর্থ : “হযরত ঈসা রূহুল্লাহ আলাইহিস সালাম তিনি বলেন, আয় আমাদের রব মহান আল্লাহ পাক! আমাদের জন্য আপনি আসমান হতে (বেহেশ্তী) খাদ্যসহ একটি খাঞ্চা নাযিল করুন। খাঞ্চা নাযিলের উপলক্ষটি আমাদের জন্য, আমাদের পূর্ববর্তী ও পরবতীর্ সকলের জন্য ঈদ (খুশি) স্বরূপ হবে এবং আপনার পক্ষ হতে একটি নিদর্শন হবে।” (পবিত্র সূরা মায়িদা শরীফ : পবিত্র আয়াত শরীফ ১১৪-১১৫)

পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

عَنْ حَضْرَتْ اَبِـي لُبَابَةَ بْنِ عَبْدِ الْمُنْذِرِ رَضِىَ اللهُ تَـعَالٰـى عَنْهُ قَالَ قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اِنَّ يَـوْمَ الْـجُمُعَةِ سَيّدُ الْاَيَّامِ وَاَعْظَمُهَا عِنْدَ اللهِ وَهُوَ اَعْظَمُ عِنْدَ اللهِ مِنْ يَّـوْمِ الْاَضْحٰى وَيَـوْمِ الْفِطْرِ فِيْهِ خَـمْسُ خِلَالٍ خَلَقَ اللهُ فِيْهِ حَضْرَتْ اٰدَمَ عَلَيْهِ السَّلَامُ وَاَهْبَطَ اللهُ فِيْهِ حَضْرَتْ اٰدَمَ عَلَيْهِ السَّلَامُ اِلَى الْاَرْضِ وَفِيْهِ تَـوَفَّى اللهُ حَضْرَتْ اٰدَمَ عَلَيْهِ السَّلَامُ وَفِيْهِ سَاعَةٌ لَا يَسْاَلُ اللهَ فِيْـهَا الْعَبْدُ شَيْـئًا اِلَّا اَعْطَاهُ مَا لَـمْ يَسْاَلْ حَرَامًا وَفِيْهِ تَـقُوْمُ السَّاعَةُ مَا مِنْ مَلَكٍ مُّقَرَّبٍ وَلَا سَـمَاءٍ وَلَا اَرْضٍ وَلَا رِيَاحٍ وَلَا جِبَالٍ وَلَا بَـحْرٍ اِلَّا وَهُنَّ يُشْفِقْنَ مِنْ يَّـوْمِ الْـجُمُعَةِ‏

অর্থ : “হযরত আবূ লুবাবা ইবনে আব্দুল মুনযির রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বর্ণনা করেন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, পবিত্র জুমআর দিন সকল দিনের সাইয়্যিদ এবং সকল দিন অপেক্ষা মহান আল্লাহ পাক উনার নিকট অধিক শ্রেষ্ঠ ও মহান। এদিনটি পবিত্র ঈদুল আদ্বহার দিন ও পবিত্র ঈদুল ফিতরের দিন অপেক্ষাও মহান আল্লাহ পাক উনার নিকট অধিক শ্রেষ্ঠ ও মহান। এ দিনটিতে পাঁচটি (গুরুত্বপূর্ণ) বিষয় রয়েছে- (১) এ দিনে মহান আল্লাহ পাক তিনি আবুল বাশার হযরত আদম ছফিউল্লাহ আলাইহিস সালাম উনাকে সৃষ্টি করেছেন, (২) এ দিনে উনাকে যমীনে প্রেরণ করেছেন, (৩) এ দিনে তিনি পবিত্র বিছালী শান মুবারক প্রকাশ করেছেন, (৪) এ দিনটিতে এমন একটি সময় রয়েছে, যে সময়টিতে বান্দা মহান আল্লাহ পাক উনার নিকট কিছু চাইলে তিনি অবশ্যই তাকে তা দান করেন, যে পর্যন্ত না সে হারাম কিছু চায় এবং (৫) এ দিনেই ক্বিয়ামত সংঘটিত হবে। এমন কোন ফেরেশতা নেই, আসমান নেই, যমীন নেই, বাতাস নেই, পাহাড় নেই, সমুদ্র নেই, যে জুমুআর দিন সম্পর্কে ভীত নয়।” (ইবনে মাজাহ শরীফ : হাদীছ শরীফ নং ১১৩৭, আল্ মু’জামুল কবীর লিত্ ত্ববারানী শরীফ : হাদীছ শরীফ নং ৪৫১১, বায়হাক্বী শরীফ  : হাদীছ শরীফ নং ২৯৭৩)

উপরোক্ত দলীলভিত্তিক বর্ণনা দ্বারা অকাট্যভাবেই প্রমানিত যে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার এবং হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম  উনাদের আগমণ ও বিদায়ের দিন এবং মহান আল্লাহ পাক উনার পক্ষ থেকে নিয়ামত মুবারক লাভ করার দিনসমূহ কায়িনাতবাসীর জন্য ঈদ বা খুশির দিন। সে হিসেবে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মুবারক আগমণ এবং উনাকে সর্বশ্রেষ্ঠ নিয়ামত হিসেবে লাভ করার দিনটিই হচ্ছে পবিত্র ঈদে মীলাদুন নবী বা পবিত্র সাইয়্যিদু সাইয়্যিদিল আ’ইয়াদ শরীফ। সুবহানাল্লাহ!

কাজেই এ ঈদ মুবারক সম্মানিত শরীয়ত উনার মধ্যেই রয়েছে। এ নামকরণ সম্মানিত শরীয়ত উনার খেলাফ না এবং  এ দিনকে ঈদ হিসেবে গ্রহণ করাও ব্যক্তিগত ইচ্ছা না। বরং সম্পূর্ণরূপেই পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র সুন্নাহ শরীফ সম্মত এবং উনাদেরই নির্দেশ মুবারক।

কথিত খতীব উরফে খবীছ তৃতীয়ত: বলেছে, “এ ঈদ পালন করা শরীয়তসম্মত নয় এবং নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার আদর্শও নয়”। নাউযুবিল্লাহ!

এর জবাবে বলতে হয় যে, এ ঈদ যে শরীয়তসম্মত অর্থাৎ পালন করা ফরয তা উপরে উল্লেখিত দলীল দ্বারাই অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

কথিত খতীব উরফে খবীছের প্রতি আমাদের প্রশ্ন, এই ঈদ যে শরীয়ত সম্মত না তার দলীল কোথায়? সে তো তার বক্তব্যে পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র হাদীছ শরীফ থেকে একটি দলীলও পেশ করেনি। অথচ দলীলবিহীন কারো কোন বক্তব্য শরীয়তে গ্রহণযোগ্য ও আমলযোগ্য নয়।

পবিত্র হাদীছ শরীফে বর্ণিত রয়েছে, একবার হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু আনহুম উনারা হযরত উম্মুল মু’মিনীন আছ ছালিছাহ ছিদ্দীক্বাহ আলাইহাস সালাম উনাকে জিজ্ঞাসা করলেন- নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার আদর্শ মুবারক কেমন?

জবাবে তিনি বলেন- كَانَ خُلُقُهُ الْقُرْاٰنَ অর্থাৎ উনার আদর্শ মুবারক হচ্ছে পবিত্র কুরআন শরীফ। সুবহানাল্লাহ!

সেই পবিত্র কুরআন শরীফেই মহান আল্লাহ পাক তিনি স্বয়ং নিজেই তো আমাদেরকে فَـلْيَـفْرَحُوْا বা ঈদ পালন করতে নির্দেশ দিয়েছেন। যা পালন করা সকলের জন্য ফরয। তাছাড়া নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি স্বয়ং নিজেই নিজের পবিত্র বিলাদত শরীফ দিবস উদযাপন করেছেন। যেমন পবিত্র হাদীছ শরীফে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

عَنْ حَضْرَتْ أَبِيْ قَـتَادَةَ رَضِيَ اللهُ تَـعَالٰى عَنْهُ أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سُئِلَ عَنْ صَوْمِ يَـوْمِ الْاِثْـنَـيْنِ فَـقَالَ ذٰلِكَ يَـوْمٌ وُلِدْتُ فِيهِ وَأُنْزِلَ عَلَيَّ فِيْهِ

অর্থ: “হযরত আবু কাতাদা আনছারী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম শরীফ রোযা রাখার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলো, তখন তিনি ইরশাদ মুবারক করেন যে, এদিন (ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম শরীফ) আমি পবিত্র বিলাদতী শান মুবারক প্রকাশ করেছি, আর এদিনই আমার উপর ওহী বা পবিত্র কুরআন শরীফ নাযিল হয়েছে।” (মুসলিম শরীফ : হাদীছ শরীফ নং ২৮০৭, আবূ দাঊদ শরীফ : হাদীছ শরীফ নং ২৪২৮, সুনানে কুবরা লি বায়হাক্বী শরীফ : হাদীছ শরীফ নং ৮২১৭, ইবনে খুযাইমা শরীফ : হাদীছ শরীফ নং ২১১৭, মুসনাদে আবি আওয়ানা : হাদীছ শরীফ নং ২৯২৬, মুসনাদে আহমদ শরীফ : হাদীছ শরীফ নং ২২৬০৩)

প্রমাণিত হলো যে, এই ঈদ পালন করা শরীয়ত সম্মত তো অবশ্যই বরং ফরয এবং নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার আদর্শ মুবারক ও নির্দেশ মুবারক।

মূলকথা হচ্ছে, কথিত খতীব উরফে খবীছের উপরোক্ত বক্তব্য সম্পূর্ণরূপেই পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র সুন্নাহ শরীফ উনাদের খিলাফ, মনগড়া, দলীলবিহীন, মিথ্যা ও কুফরীমূলক হয়েছে যার ফলে সে মুরতাদে পরিণত হয়েছে। আর মুরতাদের শরয়ী ফায়ছালা হলো- তার সমস্ত নেক আমল বরবাদ হবে, স্ত্রী তালাক হবে, সে মারা গেলে মুসলমান কবরস্থানে দাফন করা যাবে না। খিলাফতের ফায়ছালা অনুযায়ী তার একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। শরীয়তের দৃষ্টিতে তার পিছনে নামায পড়া হারাম এবং তাকে খতীব হিসেবে রাখাও হারাম।

মুহম্মদ মুনীর হসাইন,

মাহিগঞ্জ, রংপুর

সুওয়াল: বাতিল ফিরক্বার লোকেরা বলে থাকে যে, ‘পবিত্র সাইয়্যিদু সাইয়্যিদিল আ’ইয়াদ শরীফ অথার্ৎ পবিত্র ঈদে মীলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’ সপ্তম হিজরীতে ইরাকের ইরবাল শহরের বাদশাহ মুজাফ্ফর চালু করেন।’ আবার কেউ কেউ বলে যে, হিজরী চতুর্দশ শতাব্দীর কায়রোর শাসকরা প্রবর্তন করেন। উক্ত বক্তব্যের মধ্যে কোনটি সঠিক? জানিয়ে বাধিত করবেন।

জাওয়াব: বাতিল ফিরক্বার লোকদের বক্তব্য দুটির একটিও সঠিক নয়। উভয়টিই মিথ্যা, মনগড়া, ধারণাপ্রসূত সবোর্পরি পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র সুন্নাহ শরীফ উনাদের খিলাফ হওয়ার কারণে কুফরীর অন্তর্ভুক্ত। সঠিক এবং দলীল সম্মত বক্তব্য হচ্ছে- ‘পবিত্র সাইয়্যিদু সাইয়্যিদিল আ’ইয়াদ শরীফ’ সৃষ্টির শুরু থেকেই পালিত হয়ে আসছেন। স্বয়ং যিনি খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক তিনি নিজেই উনার মহাসম্মানিত হাবীব ও মাহবূব নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালাম উনার নূরুত তাশরীফ মুবারক উপলক্ষে খুশি মুবারক প্রকাশ করে ছলাত মুবারক পেশ করে যাচ্ছেন অর্থাৎ ছানা-ছিফত মুবারক করে যাচ্ছেন। শুধু তাই নয়, সমস্ত হযরত ফেরেশ্তা আলাইহিমুস সালাম উনাদেরকেও তিনি উক্ত ছানা-ছিফত মুবারক করার জন্য আদেশ মুবারক করেছেন। তাই উনারাও দায়িমীভাবে ছানা-ছিফত মুবারক করে যাচ্ছেন। অতঃপর ঈমানদার বান্দা-বান্দী ও উম্মত উনাদেরকেও তিনি উক্ত ছানা-ছিফত মুবারক করার জন্য আদেশ মুবারক করেছেন। যেমন এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

إِنَّ اللهَ وَمَلَآئِكَتَهٗ يُصَلُّوْنَ عَلَى النَّبِيِّ ۚ يَاۤ أَيُّـهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُـوْا صَلُّوْا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوْا تَسْلِيْمًا

অর্থ: নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ পাক তিনি এবং উনার সকল হযরত ফেরেশতা আলাইহিমুস সালাম উনারা নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার প্রতি ছলাত মুবারক পেশ করেন। হে ঈমানদাররা! উনার প্রতি তোমরাও ছলাত মুবারক পেশ করো এবং সালাম মুবারক পেশ করার মতো পেশ করো। (সম্মানিত ও পবিত্র সূরা আহযাব শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ৫৬)

উপরে উল্লেখিত পবিত্র আয়াত শরীফ উনার মাধ্যমে প্রতিভাত যে, মহান আল্লাহ পাক তিনি অনাদি কাল থেকেই নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার প্রতি ছলাত মুবারক পেশ করে যাচ্ছেন। অর্থাৎ মহান আল্লাহ পাক তিনিই সর্বপ্রথম পবিত্র ঈদে মীলাদে হাবীবুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অর্থাৎ পবিত্র সাইয়্যিদু সাইয়্যিদিল আ’ইয়াদ শরীফ পালন করেন। এবং উনার সমস্ত হযরত ফেরেশতা আলাইহিমুস সালাম উনাদেরকেও পাঠ করার আদেশ মুবারক করেছেন যার কারনে উনারাও পাঠ করে যাচ্ছেন। উনাদের সৃষ্টির শুরু থেকে। পরবর্তীতে বান্দা-বান্দীদেরকেও পবিত্র সাইয়্যিদু সাইয়্যিদিল আ’ইয়াদ শরীফ পালন করার জন্য নির্দেশ মুবারক প্রদান করেন, যা উক্ত পবিত্র আয়াত শরীফ উনার শেষাংশে উল্লেখ রয়েছে। এই নির্দেশ মুবারক আরো পবিত্র আয়াত শরীফ উনার মধ্যে করা হয়েছে। যেমন মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

يَاۤ أَيُّهَا النَّاسُ قَدْ جَاءَتْكُم مَّوْعِظَةٌ مِّنْ رَّبِّكُمْ وَشِفَآءٌ لِّمَا فِي الصُّدُورِ وَهُدًى وَّرَحْمَةٌ لِّلْمُؤْمِنِينَ. قُلْ بِفَضْلِ اللهِ وَبِرَحْمَتِهٖ فَبِذٰلِكَ فَـلْيَـفْرَحُوْا هُوَ خَيْـرٌ مِّمَّا يَجْمَعُوْنَ

অর্থ: “হে মানুষেরা! তোমাদের যিনি মহান রব তায়ালা উনার নিকট হতে মহান নছীহতকারী, অন্তরের মহান আরোগ্য দানকারী, মহান হিদায়েত দানকারী এবং মু’মিনদের জন্য মহান রহমত দানকারী (নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালাম) তোমাদের নিকট তাশরীফ নিয়েছেন। (আমার মহাসম্মানিত হাবীব ও মাহবূব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম!) আপনি (উম্মতকে) বলে দিন, মহান আল্লাহ পাক উনার মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র ফদ্বল মুবারক ও মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র রহমত মুবারক স্বরূপ আপনাকে যে তারা পেয়েছে, সেজন্য অবশ্যই তারা যেন খুশি মুবারক প্রকাশ করে। এই খুশি মুবারক প্রকাশ করা হচ্ছে তাদের সমস্ত ইবাদত থেকে সবোর্ত্তম বা সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত।” (পবিত্র সূরা ইউনুস শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ৫৭, ৫৮)

ঈদে মীলাদে হাবীবুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালন করার জন্য হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনারা ওয়াদা মুবারক করেছেন

এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

وَإِذْ أَخَذَ اللهُ مِيْـثَاقَ النَّبِيِّينَ لَمَا اٰتَـيْـتُكُم مِّنْ كِتَابٍ وَّحِكْمَةٍ ثُمَّ جَآءَكُمْ رَسُولٌ مُّصَدِّقٌ لِّمَا مَعَكُمْ لَتُـؤْمِنُنَّ بِهٖ وَلَتَـنْصُرُنَّهٗ قَالَ أَأَقْـرَرْتُمْ وَأَخَذْتُمْ عَلٰى ذَلِكُمْ إِصْرِيْ قَالُواۤ أَقْـرَرْنَا قَالَ فَاشْهَدُوْا وَأَنَا مَعَكُمْ مِّنَ الشَّاهِدِيْنَ

অর্থ: “(আমার মহাসম্মানিত হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আপনি স্মরণ করুন সেই সময়ের কথা) যখন মহান আল্লাহ পাক তিনি আলমে আরওয়াহতে সমস্ত হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের কাছ থেকে ওয়াদা নিয়েছিলেন যে, আপনাদেরকে আমি কিতাব ও হিকমত দান করবো। অতঃপর আপনাদেরকে সত্য প্রতিপাদনের জন্য আমার মহাসম্মানিত রসূল, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে প্রেরণ করবো। আপনারা অবশ্যই অবশ্যই উনাকে নবী ও রসূল হিসেবে উনার প্রতি ঈমান আনবেন অর্থাৎ মেনে নিবেন এবং সার্বিকভাবে উনার পবিত্র খিদমত মুবারক করবেন। আপনারা কি এই ওয়াদার কথা মেনে নিলেন? উত্তরে সকলে বললেন, হঁ্যা আমরা এই ওয়াদা স্বীকার করলাম। তখন মহান আল্লাহ পাক তিনি বললেন, আপনারা সাক্ষী থাকুন, আমিও আপনাদের সাথে সাক্ষী থাকলাম।” (সম্মানিত ও পবিত্র সূরা আলে ইমরান শরীফ : সম্মানিত ও পবিত্র আয়াত শরীফ ৮১)

উপরোক্ত পবিত্র আয়াত শরীফ উনার মধ্যে প্রদত্ত ওয়াদা মুবারক অনুযায়ী প্রত্যেক হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনারা যমীনে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মুবারক আগমনের সুসংবাদ মুবারক প্রচার করেছেন অর্থাৎ প্রদান করেছেন।

যেমন পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে হযরত ঈসা রূহুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার ক্বওল শরীফ উল্লেখ করা হয়েছে-

وَمُبَشِّرًا بِرَسُولٍ يَّأْتِي مِنْ بَعْدِي اسْـمُهٗۤ أَحْمَدُ

অর্থ: “আমি এমন একজন মহাসম্মানিত রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মুবারক আগমনের সুসংবাদদানকারী, যিনি আমার পরে পৃথিবীতে তাশরীফ মুবারক আনবেন, উনার সুমহান নাম মুবারক হচ্ছেন সাইয়্যিদুনা হযরত আহমদ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।” (সম্মানিত ও পবিত্র সূরা ছফ শরীফ: সম্মানিত ও পবিত্র আয়াত শরীফ ৬)

অর্থাৎ মহান আল্লাহ পাক উনার নিকট কৃত ওয়াদা মুবারক পালনার্থে প্রত্যেক হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনারা যমীনে পবিত্র ঈদে মীলাদে হাবীবুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালন করেছেন এবং উম্মতদেরকেও পালন করতে বলেছেন।

নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি নিজে উনার ঈদে মীলাদে হাবীবুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালন করেছেন

পবিত্র ঈদে মীলাদে হাবীবুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালন করার নির্দেশ মুবারক মহান আল্লাহ পাক তিনি প্রদান করেছেন। আর নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি নিজেই উনার পবিত্র বিলাদতী শান মুবারক প্রকাশ দিবসকে স্মরণে রেখে ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম শরীফ রোযা রেখে শুকরিয়া প্রকাশ করেছেন। যেমন পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত রয়েছে-

عَنْ حَضْرَتْ أَبِي قَـتَادَةَ رَضِيَ اللهُ تَـعَالٰى عَنْهُ أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سُئِلَ عَنْ صَوْمِ يَـوْمِ الْاِثْـنَـيْنِ فَـقَالَ ذٰلِكَ يَـوْمٌ وُلِدْتُّ فِيهِ وَأُنْزِلَ عَلَيَّ فِيْهِ

অর্থ: “হযরত আবু কাতাদা আনছারী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম শরীফ রোযা রাখার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলো, তখন তিনি ইরশাদ মুবারক করেন যে, এদিন (ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম শরীফ) আমি পবিত্র বিলাদতী শান মুবারক প্রকাশ করেছি, আর এদিনই আমার উপর আনুষ্ঠানিকভাবে পবিত্র ওহী মুবারক ও পবিত্র কুরআন শরীফ নাযিল শুরু হয়েছেন।” (মুসলিম শরীফ হাদীছ শরীফ নং ১১৬২, আবূ দাউদ শরীফ: হাদীছ শরীফ নং ২৪২৮, সুনানে কুবরা লি বায়হাক্বী শরীফ : হাদীছ শরীফ নং ৮২১৭, ইবনে খুজাইমা শরীফ: হাদীছ শরীফ নং ২১১৭, মুসনাদে আবি আওয়ানা: হাদীছ শরীফ নং ২৯২৬, মুসনাদে আহমদ শরীফ: হাদীছ শরীফ নং ২২৬০৩)

প্রথম হিজরী শতকে পবিত্র সাইয়্যিদু সাইয়্যিদিল আ’ইয়াদ শরীফ পালন:

নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে পাওয়ার কারণে হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনারা ব্যক্তিগতভাবে যেমন পবিত্র সাইয়্যিদু সাইয়্যিদিল আ’ইয়াদ শরীফ পালন করেছেন। তেমনি উনারা মাহফিলের আয়োজন করেও পবিত্র সাইয়্যিদু সাইয়্যিদিল আ’ইয়াদ শরীফ পালন করেছেন।

হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদের ব্যক্তিগত বা এককভাবে পবিত্র সাইয়্যিদু সাইয়্যিদিল আ’ইয়াদ শরীফ পালন: হযরত উবাই ইবনে কা’ব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার দায়িমী পবিত্র সাইয়্যিদু সাইয়্যিদিল আ’ইয়াদ শরীফ পালন সম্পর্কে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত রয়েছে যে, তিনি বলেন-

أَجْعَلُ لَكَ صَلَاتِي كُلَّهَا

অর্থ: আমি আমার জিন্দেগীর সমস্ত সময় (২৪ ঘন্টাই) আপনার ছানা-ছিফত মুবারকে ব্যয় করবো। সুবহানাল্লাহ! (তিরমিযী শরীফ)

হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদের মজলিস করে পবিত্র সাইয়্যিদু সাইয়্যিদিল আ’ইয়াদ শরীফ পালন: যেমন এ প্রসঙ্গে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত রয়েছে-

عَنْ حَضْرَتْ أَبِي الدَّرْدَاءِ رَضِيَ اللهُ تَـعَالَى عَنْهُ أَنَّهٗ مَرَّ مَعَ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِلٰى بَـيْتِ عَامِرِ الْأَنْصَارِيِّ رَضِيَ اللهُ تَـعَالٰى عَنْهُ وَكَانَ يُـعَلِّمُ وَقَائِعَ وِلَادَتِهٖ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِأَبْـنَائِهٖ وَعَشِيْـرَتِهٖ وَيَـقُولُ هٰذَا الْيَـوْمَ هٰذَا الْيَـوْمَ فَـقَالَ عَلَيْهِ الصَّلٰوةُ وَالسَّلَامُ إِنَّ اللهَ فَـتَحَ لَكَ أَبْـوَابَ الرَّحْمَةِ وَالْمَلَائِكَةُ كُلُّهُمْ يَسْتَغْفِرُونَ لَكَ مَنْ فَـعَلَ فِعْلَكَ نَجٰى نَجٰتَكَ

অর্থ: “হযরত আবূ দারদা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত আছে যে, একদা তিনি নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাথে হযরত আমির আনছারী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার গৃহে উপস্থিত হয়ে দেখতে পেলেন যে, তিনি উনার সন্তানাদি এবং আত্মীয়-স্বজন, জ্ঞাতি-গোষ্ঠী, পাড়া-প্রতিবেশী উনাদেরকে নিয়ে আখিরী রসূল, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র বিলাদতী শান মুবারক প্রকাশ সম্পর্কিত মুবারক ঘটনাসমূহ শুনাচ্ছেন এবং বলছেন, এই দিবস; এই দিবস (অর্থাৎ এই দিবসে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি যমীনে তাশরীফ মুবারক এনেছেন এবং ইত্যাদি ইত্যাদি ঘটেছে)। এতদশ্রবণে মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ, হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, “নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ তায়ালা উনার মুবারক রহমত উনার দরজা মুবারক আপনার জন্য উন্মুক্ত করেছেন এবং সমস্ত হযরত ফেরেশতা আলাইহিমুস সালাম উনারা আপনার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করছেন এবং যে কেউ আপনার মত এরূপ কাজ করবে, তিনিও আপনার মত নাযাত (ফযীলত) লাভ করবেন” সুবহানাল্লাহ! (আত তানউইর ফী মাওলিদিল বাশীর ওয়ান নাযীর, মাওলুদুল কাবীর, দুররুল মুনাযযাম- পৃষ্ঠা ৯৫, সুবুলুল হুদা ফী মাওলিদিল মুস্তফা ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, ইশবাউল কালামি ফী ইছবাতিল মাওলিদি ওয়াল কিয়ামি, হাক্বীকৃতে মুহম্মদী মীলাদে আহমদী)

দ্বিতীয় হিজরী শতকে পবিত্র সাইয়্যিদু সাইয়্যিদিল আ’ইয়াদ শরীফ পালন:

হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদের পরে সর্বোত্তম ব্যক্তিত্ব হচ্ছেন হযরত তাবেয়ীন রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনারা। হয়রত ছহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদের পরবর্তী তাবিয়ীন উনাদের যুগে এবং তৎপরবতীর্ প্রত্যেক যুগেই অনুসরণীয় ইমাম-মুজতাহিদ ও আউলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনারা পবিত্র সাইয়্যিদু সাইয়্যিদিল আ’ইয়াদ শরীফ পালনের ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করেন।

এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট তাবিয়ী হযরত হাসান বছরী রহমতুল্লাহি আলাইহি যিনি শতাধিক হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদের সাক্ষাৎ মুবারক পেয়েছিলেন। যিনি দ্বীন ইসলাম উনার সম্মানিত চতুর্থ খলীফা হববত ইমামুল আউওয়াল কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম উনার খলীফা ও ছাত্র ছিলেন। তিনি বলেন-

وَدِدْتُّ لَوْ كَانَ لِى مِثْلُ جَبَلِ أُحُدٍ ذَهَبًا فَاَنْـفَقْتُهٗ عَلٰى قِرَاءَةِ مَوْلِدِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ

অর্থ: “আমার একান্ত ইচ্ছা হয় যে, আমার যদি উহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণ থাকতো তাহলে মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব, নূরে মুজাসসাম, হাবীবল্লাহ হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র মীলাদ শরীফ পাঠ উপলক্ষ্যে আমি তা ব্যয় করতাম।” সুবহানাল্লাহ! (আন নি’মাতুল কুবরা আলাল আলাম ফী মাওলিদি সাইয়্যিদি উইলদি আদম-৮ম পৃষ্ঠা)

তৃতীয় হিজরী শতকে পবিত্র সাইয়্যিদু সাইয়্যিদিল আ’ইয়াদ শরীফ পালন:

সে সময়কার বিখ্যাত ফক্বীহ, শাফিয়ী মাযহাব উনার ইমাম হযরত ইমাম শাফিয়ী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার বিলাদত শরীফ ১৫০ হিজরী সালে, তিনি নিজেই বলেন-

قَالَ الْاِمَامُ الشَّافِعِىُّ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ مَنْ جَـمَعَ لِمَوْلِدِ النَّبِىِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اِخْوَانًا وَهَيَّاَ طَعَامًا وَاَخْلٰى مَكَانًا وَعَمَلَ اِحْسَانًا وَصَارَ سَبَـبًا لِّقِرَائَتِهٖ بَعَثَهُ اللهُ يَـوْمَ الْقِيَامَةِ مَعَ الصِّدِّيْقِيْنَ وَالشُّهَدَاءِ وَالصَّالِـحِيْنَ وَيَكُوْنُ فِىْ جَنَّاتِ النَّعِيْمِ

অর্থ : “যে ব্যক্তি পবিত্র ঈদে মীলাদে হাবীবীল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উদযাপন উপলক্ষে লোকজন একত্রিত করলো, খাদ্য তৈরি করলো, জায়গা নির্দিষ্ট করলো এবং এ জন্য উত্তমভাবে তথা সুন্নাহভিত্তিক আমল করলো তাহলে উক্ত ব্যক্তিকে মহান আল্লাহ পাক তিনি হাশরের দিন ছিদ্দীক্ব, শহীদ, ছলিহীনগণ উনাদের সাথে উঠাবেন এবং উনার ঠিকানা হবে জান্নাতে নায়ীমে।” সুবহানাল্লাহ। (আন নি’মাতুল কুবরা আলাল আলাম ১০ পৃষ্ঠা, মাদরিজুস সউদ ১৫ পৃষ্ঠা, নাফহতুল আম্বারিয়া ৮ পৃষ্ঠা, ইয়ানাতুল ত্বলেবীন ৩য় খ- ৬১৩ পৃষ্ঠা)

হযরত জুনাইদ বাগদাদী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন-

مَنْ حَضَرَ مَوْلِدَ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَعَظَّمَ قَدْرَهٗ فَـقَدْ فَازَ بِالْإِيْمَانِ

অর্থ: “যে ব্যক্তি পবিত্র মীলাদে রসূলিল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার আয়োজনে উপস্থিত হল এবং উপযুক্ত সম্মান প্রদর্শন করলো। সে তাঁর ঈমানের দ্বারা সাফল্য লাভ করবে অর্থাৎ সে বেহেশতী হবে।” সুবহানাল্লাহ! (আন নি’মাতুল কুবরা আলাল আলাম ফী মাওলিদি সাইয়্যিদি উইলদি আদম- ৮ম পৃষ্ঠা)

মুফাস্সির আন নাক্কাস রহমতুল্লাহি আলাইহি (২৬৬-৩৫১ হিজরী) তিনি উল্লেখ করেন, “নূরে মুজাসসাম হাবীবল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র বিলাদতী শান মুবারক প্রকাশের স্থানে প্রতি ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম শরীফ দুপুরে দোয়া করা হতো।” (আশ শিফাউল গারাম বিআখবারি বিলাদিল হারাম)

চতুর্থ হিজরী শতকে পবিত্র সাইয়্যিদু সাইয়্যিদিল আ’ইয়াদ শরীফ পালন:

কিতাবে উল্লেখ আছে, ৩৯৪ হিজরীতে মিশরে মাসব্যাপী পবিত্র ঈদে মীলাদে হাবীবীল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালন করা হতো। আপত্তিকারীদের দেয়া সনের প্রায় ২০০ বছর আগে।

বিখ্যাত আলিমে দ্বীন ইমাম মাকরিযী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি উনার “তাজুল হুনাফা” কিতাবে এ প্রসঙ্গে লিখেন-

سَنَةَ اَرْبَعٍ وَّتِسْعِيْنَ وَثَـلٰثَ مِائَةٍ

তিনশত চুরানব্বই হিজরী

وَفِيْ رَبِيْعِ الْاَوَّلِ اُلْزِمَ النَّاسُ بِوُقُـوْدِ الْقَنَادِيْلِ بِاللَّيْلِ فِىْ سَائِرِ الشَّوَارِعِ وَالْاَزْقَةِ بِـمِصْرٍ

অর্থ : “পবিত্র রবীউল আউওয়াল শরীফ মাসে (সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র বিলাদতী শান মুবারক প্রকাশ উপলক্ষে) সব মানুষকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ঘোষণা করে দেয়া হলো, সম্পূর্ণ মাস সমস্ত রাস্তায় রাস্তায় এবং রাস্তার অলি গলিতে বাতি জ্বালিয়ে রাখতে হবে।” সুবহানাল্লাহ! (তাজুল হুনাফা ২/৪৮, আলজামিউ ফিল মাওলূদ ৩/১২)

পঞ্চম হিজরী শতকে পবিত্র সাইয়্যিদু সাইয়্যিদিল আ’ইয়াদ শরীফ পালন:

হযরত ইবনে জুবাইর রহমতুল্লাহি আলাইহি (৫৪০-৬৪০ হিজরী) তিনি উল্লেখ করেছেন- “নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সম্মানিত বাড়ি মুবারক-এ পবিত্র রবীউল আউওয়াল শরীফ মাসে প্রতি ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম শরীফ পবিত্র ঈদে মীলাদে হাবীবিল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালন করা হতো।” (কিতাবুর রিহাল, পৃষ্ঠা ১১৪-১১৫)

ষষ্ঠ হিজরী শতকে পবিত্র সাইয়্যিদু সাইয়্যিদিল আ’ইয়াদ শরীফ পালন:

হাফিজুল হাদীছ আবুল ফয়েয হযরত আব্দুর রহমান ইবনুল জাওযী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি লিখেন-

لَا زَالَ أَهْلُ الْحَرَمَيْنِ الشَّرِيفَيْنِ وَالْمِصْرِ وَالْيَمَنِ وَالشَّامِ وَسَائِرِ بِلَادِ الْعَرَبِ مِنَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ يَحْتَفِلُوْنَ بِمَجْلِسِ مَوْلِدِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَيَـفْرَحُوْنَ بِقُدُوْمِ هِلَالِ رَبِيعِ الْاَوَّلِ وَيَـغْتَسِلُوْنَ وَيَـلْبَسُوْنَ الثِّيَابَ الْفَاخِرَةَ وَيَـتَـزَيَّـنُـوْنَ بِأَنْـوَاعِ الزِّيْـنَةِ وَيَـتَطَيِّبُـوْنَ وَيَكْتَحِلُوْنَ وَيَأْتُـوْنَ بِالسُّرُورِ فِي هٰذِهِ الْأَيَّامِ وَيَـبْذُلُوْنَ عَلَى النَّاسِ بِمَا كَانَ عِنْدَهُمْ مِنَ الْمَضْرُوْبِ وَالْأَجْنَاسِ وَيَـهْتَمُوْنَ اِهْتِمَامًا بَلِيْضًا عَلَى السَّمَاعِ وَالْقِرَاءَةِ لِمَوْلِدِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَيَـنَالُوْنَ بِذَالِكَ أَجْرًا جَزِيلًا وَفَـوْزًا عَظِيمًا

অর্থ: “হারামাইন শারীফাইন, মিশর, ইয়ামেন, সিরিয়া এবং পূর্ব থেকে পশ্চিম পর্যন্ত আরবের সকল শহর ও নগরের অধিবাসীদের মধ্যে অব্যাহতভাবে এ নিয়ম চলে আসছে যে, তারা নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র মীলাদ শরীফ উনার অনুষ্ঠান করেছেন।

পবিত্র রবীউল আউওয়াল শরীফ উনার নতুন চাঁদের আগমনে আনন্দিত হন, গোসল করেন, দামী পোশাক পরিধান করেন, নানা প্রকার সাজ-সজ্জা করেন, সুগন্ধি ব্যবহার করেন, সুরমা লাগান, এই দিনগুলোতে আনন্দ উৎসব করেন, ধন-সম্পদ, টাকা-পয়সা মানুষের মধ্যে বিলিয়ে দেন এবং অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে পবিত্র মীলাদ শরীফ পাঠ ও শ্রবণের ব্যবস্থা করে অধিক ছাওয়াব এবং বিরাট সাফল্য অর্জন করেন। উনারা পবিত্র ঈদে মীলাদে হাবীবুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালন করে যে নিরাপত্তা ও স্বস্তি, জীবিকার মানোন্নয়ন, শিশু ও সম্পদ বৃদ্ধি এবং শহরের শান্তি ও উনাদের সাফল্য অর্জন করেছেন তা প্রকাশ করতেন।” (তাফসীরে রুহুল বয়ান লি শেখ ইসমাইল হাক্কী রহমতুল্লাহি আলাইহি- ৯ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৬; মীলাদুল উরুস- উর্দু “বয়ান-ই-মিলাদুন নবী”, পৃষ্ঠা ৩৪-৩৫, লাহোর; দুররুল মুনাজ্জাম, পৃষ্ঠা ১০০-১০১; মীলাদুন নবী, পৃষ্ঠা ৫৮)

সপ্তম হিজরী শতকে পবিত্র সাইয়্যিদু সাইয়্যিদিল আ’ইয়াদ শরীফ পালন:

সপ্তম হিজরী শতাব্দীর ইতিহাসবিদ শায়েখ আবুল আব্বাস আল আযাফি এবং উনার ছেলে আবুল কাসিম আল আযাফি (সার্জারির জনক) উনাদের কিতাব-এ লিখেন-

“পবিত্র মক্কা শরীফ উনার মধ্যে ঈদে মীলাদে হাবীবল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার দিন দ্বীনদার উমরাহ-হজ্জ যাত্রী এবং পর্যটকেরা দেখতেন যে, সকল ধরণের কার্যক্রম (দুনিয়াবী) বন্ধ, এমনকি ক্রয়-বিক্রয় হতো না, উনাদের ব্যতীত যারা সম্মানিত বিলাদতী শান মুবারক প্রকাশের স্থান জড়ো হয়ে দেখতেন। এ দিন পবিত্র কা’বা শরীফ সকলের জন্য উন্মুক্ত করা হতো।” (দুররুল মুনাজ্জাম)

সপ্তম হিজরী শতকে উমর বিন মুল্লা মুহম্মদ মউসুলি রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি পবিত্র ঈদে মীলাদে হাবীবুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দিবসকে নিয়মিতভাবে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে জারী রাখার প্রচলন চালু করেন। উনার অনুসরণে সম্মানিত দ্বীন ইসলাম উনার অমর সিপাহসালার সুলত্বান হযরত সালাহউদ্দিন আইয়ুবী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার ভগ্নিপতি ইরবিলের বাদশাহ মালিক আবু সাঈদ মুজাফফরুদ্দীন রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি রাষ্ট্রীয়ভাবে পবিত্র ঈদে মীলাদে হাবীবুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অনুষ্ঠান পালন প্রচলন করেন। (রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রথম করলেও পূর্ব থেকেই পবিত্র ঈদে মীলাদে হাবীবুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালন করা হতো।)

অষ্টম হিজরী শতকে পবিত্র সাইয়্যিদু সাইয়্যিদিল আ’ইয়াদ শরীফ পালন:

প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ইবনে বতুতা তিনি লিখেন- “প্রতি জুমআ নামায শেষে এবং নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র বিলাদতী শান মুবারক প্রকাশ দিবসে বনু শায়বা গোত্রের প্রধান কর্তৃক পবিত্র কা’বা শরীফ উনার দরজা খোলা হতো। নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সম্মানিত বংশধর আলাইহিমুস সালাম উনাদের এবং সাধারণ জনগণের মাঝে খাবার বিতরণ করতেন পবিত্র মক্কা শরীফ উনার বিচারক নাজমুদ্দীন মুহম্মদ ইবনে আল ইমাম মুহিউদ্দীন আত তাবারী।” (কিতাবুর রিহলা, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩০৯ ও ৩৪৭)

নবম হিজরী শতকে পবিত্র সাইয়্যিদু সাইয়্যিদিল আ’ইয়াদ শরীফ পালন:

সুলত্বানুল আরিফীন হযরত ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ূতী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি পবিত্র ঈদে মীলাদে হাবীবুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সম্পর্কে উল্লেখ করেন-

اَنَّ اَصْلَ عَمَلِ الْـمَوْلِدِ الَّذِيْ هُوَ اِجْتِمَاعُ النَّاسِ وَقِرَاءَةٌ مَا تَـيَسَّرَ مِنَ الْقُرْاٰنِ وَرِوَايَةُ الْاَخْبَارِ الْوَارِدَةِ فِيْ مَبْدَأِ اَمْرِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَمَا وَقَعَ فِيْ مَوْلِدِهٖ مِنَ الْاٰيَاتِ ثُـمَّ يَـمُدُّ لَـهُمْ سِـمَاطٌ يَأْكُلُوْنَهٗ وَيَـنْصَرِفُـوْنَ مِنْ غَيْرِ زِيَادَةٍ عَلٰى ذٰلِكَ هُوَ مِنَ الْبِدَعِ الْـحَسَنَةِ الَّتيْ يُـثَابُ عَلَيْهَا صَاحِبُـهَا لِـمَا فِيْهِ مِنْ تَـعْظِيْمِ قَدْرِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَاِظْهَارِ الْفَرْحِ وَالْاِسْتِبْشَارِ بِـمَوْلِدِهِ الشَّرِيْفِ

অর্থ : “পবিত্র মীলাদে হাবীবুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উদযাপন যা মূলতঃ মানুষদের সমবেত করা, পবিত্র কুরআন শরীফ উনার অংশ-বিশেষ তিলাওয়াত, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার দুনিয়ায় তাশরীফ মুবারক (পবিত্র বিলাদতী শান মুবারক প্রকাশ) সংক্রান্ত ঘটনা ও মুবারক লক্ষণগুলোর বর্ণনা করা, অতঃপর তবাররুক (খাবার) বিতরণের জন্য দস্তরখানা বিছানো এবং সবশেষে সমাবেশ ত্যাগ, তা উত্তম কাজ (উদ্ভাবন); আর যে ব্যক্তি এর অনুশীলন করেন তিনি সওয়াব অর্জন করেন, কেননা এতে জড়িত রয়েছে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মহান মর্যাদা মুবারক উনার প্রতি গভীর তা’যীম প্রদর্শন এবং উনার সম্মানিত বিলাদতী শান মুবারক প্রকাশের প্রতি খুশি প্রকাশ।’’ (আল-হাওয়ী লিল্ ফাতাওয়া লি ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ূতী রহমতুল্লাহি আলাইহি, ১ম খণ্ড, ২৯২ পৃষ্ঠা, মাকতাবাল আসরিয়া, বৈরূত, লেবানন)

তিনি আরো বলেন-

مَا مِنْ مُسْلِمٍ قَـرَاَ فِىْ بَـيْتِهٖ مَوْلِدَ النَّبِىِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اِلَّا رَفَعَ اللهُ سُبْحَانَهٗ وَتَـعَالٰى اَلْقَحَطَ وَالْوَبَاءَ وَالْـحَرْقَ وَالْغَرَقَ وَالْاَفَاتِ وَالْبَلِيَّاتِ وَالْبُـغْضَ وَالْـحَسَدَ وَعَيْنَ السُّوْءِ وَاللُّصُوْصِ عَنْ اَهْلِ ذٰلِكَ الْبَـيْتِ فَاِذَا مَاتَ هَوَّنَ اللهُ عَلَيْهِ جَوَابَ مُنْكَرٍ وَّنَكِيْرٍ وَيَكُوْنُ فِىْ مَقْعَدِ صِدْقٍ عِنْدَ مَلِيْكٍ مُّقْتَدِرٍ

অর্থ : “যখন কোন মুসলমান নিজ বাড়িতে পবিত্র মীলাদ শরীফ পাঠ করে তখন সেই বাড়ির অধিবাসীগণ উনাদের উপর থেকে মহান আল্লাহ পাক তিনি অবশ্যই খাদ্যাভাব, মহামারি, অগ্নিকাণ্ড, ডুবে মরা, বালা-মুছিবত, হিংসা-বিদ্বেষ, কু-দৃষ্টি, চুরি ইত্যাদি উঠিয়ে নেন। যখন উক্ত ব্যক্তি মারা যান তখন মহান আল্লাহ পাক তিনি উনার জন্য মুনকার-নকীরের সুওয়াল-জাওয়াব সহজ করে দেন। আর উনার অবস্থান হয় মহান আল্লাহ পাক উনার সন্নিধানে পবিত্র সিদকের মাক্বামে।” সুবহানাল্লাহ! (আন নি’মাতুল কুবরা আলাল আলাম ফী মাওলিদি সাইয়্যিদি উইলদি আদম- পৃষ্ঠা ১১)

দশম হিজরী শতকে পবিত্র সাইয়্যিদু সাইয়্যিদিল আ’ইয়াদ শরীফ পালন:

ইতিহাসবিদ শায়েখ ইবনে যাহিরা রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি উনার লিখিত ‘জামীউল লতিফ ফি ফাদ্বলি  মক্কাতা ওয়া আহলিহা’, শায়েখ হাফিয ইবনে হাযার আল হায়তামী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি উনার লিখিত ‘আল মাওলিদুশ শারীফুল মুনাজ্জাম’ এবং ইতিহাসবিদ শায়েখ আল নাহরাওয়ালি রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি উনার লিখিত ‘আল ইমাম বি’আলামি বাইতিল্লাহিল হারাম’ কিতাবের ২০৫ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেন- “প্রতি বছর মহাসম্মানিত ১২ই রবীউল আউওয়াল শরীফ বাদ মাগরিব মাযহাব চতুষ্টয়ের মুকাল্লিদ, বিচারক, ফিকাহবিদ, শায়েখ, শিক্ষক, ছাত্র, ম্যাজিস্ট্রেট, বিজ্ঞজন এবং সাধারণ মুসলমান মসজিদের বাহিরে আসতেন এবং তাসবীহ-তাহলীল পাঠ করতে করতে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিলাদতী শান মুবারক প্রকাশের মুবারক স্থান- হুজরা শরীফ পরিদর্শন করতেন। মুবারক স্থান- হুজরা শরীফ যাওয়ার পথ আলোকসজ্জা করা হতো। সকলে উত্তম পোষাক পরিধান করতেন এবং সাথে উনাদের আল-আওলাদদের নিতেন। পবিত্র বিলাদতী শান মুবারক প্রকাশের বরকতময় স্থানের ভিতরে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিলাদতী শান মুবারক প্রকাশের সময়কার বিভিন্ন বিষয়াদি বিশেষভাবে বর্ণনা করা হতো।

তারপর উসমানীয় খিলাফতের জন্য সবাই দোয়া করতেন এবং বিনয়ের সাথে দোয়া করা হতো। ইশা’র নামায শুরুর কিছুক্ষণ পূর্বে সকলে মসজিদে চলে আসতেন (যা থাকতো লোকে লোকারণ্য) এবং সারিবদ্ধভাবে মাকামে ইবরাহীম উনার সামনে বসতেন।”

একাদশ হিজরী শতকে পবিত্র সাইয়্যিদু সাইয়্যিদিল আ’ইয়াদ শরীফ পালন:

এই উপমহাদেশে যিনি পবিত্র হাদীছ শরীফ শাস্ত্রের প্রচার-প্রসার করেছেন, ইমামুল মুফাসসিরীন ওয়াল মুহাদ্দিছীন ওয়াল ফুক্বাহা হযরত শায়েখ আব্দুল হক মুহাদ্দিছ দেহলবী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন-

مَنْ عَظَّمَ لَيْـلَةَ مَوْلِدِهٖ بِمَا أَمْكَنَهٗ مِنَ التَّـعْظِيْمِ وَالْإِكْرَامِ كَانَ مِنَ الْفَائِزِيْنَ بِدَارِ السَّلَامِ

অর্থ: “যে ব্যক্তি নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র বিলাদতী শান মুবারক প্রকাশ দিবসকে সাধ্য-সামর্থ অনুযায়ী তা’যীম-তাকরীম করবে এবং এ উপলক্ষ্যে খুশি প্রকাশ করবে সে সফলতা লাভ করবে ফলে সে চির শান্তিময় জান্নাতের অধিকারী হবে।”

বিশিষ্ট মুহাদ্দিছ হযরত মোল্লা আলী ক্বারী রহমতুল্লাহি আলাইহি, যিনি ইলমে হাদীছ শরীফ উনার ইলিম হাছিলের জন্য পবিত্র মক্কা শরীফ ও পবিত্র মদীনা শরীফ সব স্থানে ভ্রমন করেন। তিনি সারাজীবন অসংখ্য কিতাব রচনা করে মুসলিম জাহানের জন্য এক বিশাল নিয়ামত রেখে গিয়েছেন। উনার সে অসংখ্য কিতাবের মধ্যে একটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং ঐতিহাসিক গ্রন্থের নাম হচ্ছে “মাওরিদুর রাউয়ী ফি মাওলিদিন নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।

এ কিতাবে তিনি নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র বিলাদতী শান মুবারক প্রকাশ তথা পবিত্র সাইয়্যিদু সাইয়্যিদিল আ’ইয়াদ শরীফ পালন সম্পর্কে পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র হাদীছ শরীফ থেকে দলীল পেশ করেছেন এবং সেই সাথে ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণ করেছেন যে, সারা পৃথিবীর সকল দেশে জাঁকজমকের সাথে পবিত্র ঈদে মীলাদে হাবীবুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালন করা হতো।

দ্বাদশ হিজরী শতকে পবিত্র সাইয়্যিদু সাইয়্যিদিল আ’ইয়াদ শরীফ পালন:

হযরত ইমাম শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিছ দেহলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি দ্বাদশ হিজরী শতকের মুজাদ্দিদ। উনার সময়কালে তিনি নিজে পবিত্র ঈদে মীলাদে হাবীবুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালন করেছেন।

এমনকি তিনি পবিত্র মক্কা শরীফ যিয়ারতকালে সেখানে পবিত্র ঈদে মীলাদে হাবীবল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালনের ঘটনা উনার কিতাবে বর্ণনা করেছেন- “আমি এর পূর্বে পবিত্র মক্কা মুআযযামায় পবিত্র বিলাদতী শান মুবারক প্রকাশের বরকতময় হুজরা শরীফ উনার মধ্যে উপস্থিত ছিলাম। আর সেখানে লোকজন সমবেত হয়ে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার উপর একত্রে দুরূদ শরীফ পাঠ করছিলেন। পবিত্র বিলাদতী শান মুবারক প্রকাশের সময় সংঘটিত অলৌকিক ঘটনাবলী ও নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার আনুষ্ঠানিক নুবুওওয়াত মুবারক প্রকাশের পূর্বে সংঘটিত ঘটনাবলী আলোচনা করছিলেন। তারপর আমি সেখানে এক মিশ্র মুবারক নূরের ঝলক প্রত্যক্ষ করলাম। আমি বলতে পারিনি যে, এ মুবারক নূরগুলো চর্মচক্ষে দেখেছিলাম এবং এটাও বলতে পারি না যে, এগুলো কেবল মাত্র অন্তর চক্ষুতে দেখেছিলাম। এ দুটোর মধ্যে প্রকৃত ব্যাপার কি ছিল, তা মহান আল্লাহ পাক তিনিই ভালো জানেন। অতঃপর আমি গভীরভাবে চিন্তা করলাম এবং উপলব্ধি করতে পারলাম যে, এই নূর বা জ্যোতি ওই সব ফেরেশতা আলাইহিমুস সালাম, যাঁরা এ ধরনের মজলিস ও উল্লেখযোগ্য (দ্বীনি) স্থানসমূহে (জ্যোতি বিকিরণের জন্য) নিয়োজিত থাকেন। আমার অভিমত হল, সেখানে হযরত ফেরেশতা আলাইহিমুস সালাম উনাদের নূর ও রহমতের নূরের সংমিশ্রণ ঘটেছে।” (ফয়ূযুল হারামাইন (আরবী-উর্দু), পৃষ্ঠা ৮০-৮১)

ত্রয়োদশ হিজরী শতকে পবিত্র সাইয়্যিদু সাইয়্যিদিল আ’ইয়াদ শরীফ পালন:

নির্ভরযোগ্য আলিম মাওলানা হাফিজ মুহাম্মদ আব্দুল হক এলাহাবাদী মুহাজিরে মক্কী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি উনার স্বরচিত বিখ্যাত কিতাবে শায়েখ আব্দুল আযীয দেহলবী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মন্তব্য তুলে ধরেছেন এভাবে- “শায়েখ আব্দুল আযীয দেহলবী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি মুহররমুল হারাম মাসের অনুষ্ঠান মরসিয়াখানি (শোক গাঁথা পাঠ) সম্পর্কে জনৈক ব্যক্তির জিজ্ঞাসার উত্তরে বললেন, সারা বছরের মধ্যে এ ফকীরের (আমার) বাড়িতে দুটি মজলিস অনুষ্ঠিত হয়।

একটি হচ্ছে মীলাদ শরীফ উনার আলোচনা অনুষ্ঠান। আর অপরটি হচ্ছে শাহাদাতে সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুছ ছালিছ আলাইহিস সালাম উনার আলোচনা।

প্রথম মজলিসে পবিত্র আশূরা শরীফ উনার দিন প্রায় এক হাজার লোকের সমাগম হয়। সে মজলিসে দুরূদ শরীফ পাঠ করা হয়। আমিও সে মজলিসে উপস্থিত হয়ে থাকি। আর সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুছ ছালিছ আলাইহিস সালাম উনার সম্পর্কে হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে যেসব ফযীলত বর্ণিত হয়েছে মজলিসে তাও বর্ণনা করা হয়।

হযরত শাহ মুহম্মদ ইসহাক মুহাদ্দিছ দেহলবী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার স্থলাভিষিক্ত উস্তাযুল উলাম হযরত মাওলানা শাহ আব্দুল গনী মুহাদ্দিছ দেহলবী মুহাজিরে মাদানী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি পবিত্র মীলাদ শরীফ উনার মাহফিলে শরীক হতেন। (আদ-দুররুল মুনাজ্জাম, রিসালায়ে আসরারে মুহব্বত)

চতুর্দশ হিজরী শতকে পবিত্র সাইয়্যিদু সাইয়্যিদিল আ’ইয়াদ শরীফ পালন:

১৯৩০ ঈসায়ীতে (১৩৪৮ হিজরী) ওহাবী রাষ্ট্র সউদী আরব প্রতিষ্ঠার পূর্বে পবিত্র মক্কা শরীফ ও পবিত্র মদীনা শরীফ উনাদের মধ্যে পবিত্র ঈদে মীলাদে হাবীবুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালিত হতো। যেমন পবিত্র মক্কা শরীফ উনার পত্রিকা আল কিবলা পত্রিকা মতে- “পবিত্র ঈদে মীলাদে হাবীবুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পবিত্র মক্কা শরীফ উনার অধিবাসীরা পালন করতেন যার নাম ছিল ‘ইয়াওম আল ঈদ মাওলিদ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’। মুসলমান উনারা উত্তম খাবার রান্না করতেন।

পবিত্র মক্কা শরীফ উনার আমীর এবং হিজাজের কমান্ডার তাঁর সেনাদের সাথে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার রওযা শরীফ যিয়ারত করতেন এবং পবিত্র কাছীদা শরীফ পাঠ করতেন। পবিত্র মক্কা শরীফ থেকে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বরকতময় স্থান মুবারক পর্যন্ত আলোকসজ্জা করা হতো এবং দোকান-পাট সুসজ্জিত করা হতো। (মাদিক তরিকত- লাহোর জানুয়ারী ১৯১৭ ঈসায়ী (১৩৩৫ হিজরী), পৃষ্ঠা ২-৩)

পঞ্চদশ হিজরী শতকে পবিত্র সাইয়্যিদু সাইয়্যিদিল আ’ইয়াদ শরীফ পালন:

পঞ্চদশ হিজরী শতকের যিনি মহান মুক্তাদ্দিদ, মুজাদ্দিদে আ’যম, আওলাদে রসূল, আহলে বাইতে রসূল, ক্বায়িম মাক্বামে রসূল সাইয়্যিদুনা হযরত সুলত্বানুন নাছীর আলাইহিস সালাম তিনি অনন্তকালব্যাপী পবিত্র ঈদে মীলাদে হাবীবুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বা সুমহান সাইয়্যিদু  সাইয়্যিদিল আ’ইয়াদ শরীফ জারি করেন। এবং তা পালনে কোটি কোটি টাকা খরচ করেন। তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, ‘এই সম্মানিত মাহফিল অনন্তকালব্যাপী চলতে থাকবে ইনশাআল্লাহ। আর কখনও বন্ধ হবে না।’ সুবহানাল্লাহ!

উপরোক্ত আলোচনা হতে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত যে, সৃষ্টির শুরু হতে এখন পর্যন্ত পবিত্র ঈদে মীলাদে হাবীবুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালিত হয়ে আসছে এবং অনন্তকাল ব্যাপী পালিত হতেই থাকবে। যা কখনোই বন্ধ হবে না। সুবহানাল্লাহ!

মুহম্মদ শরীফ হুসাইন

পলাশ, নূরানীবাদ

সুওয়াল: নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার আনুগত্য ও অনুসরণ মুবারকের বিষয়ে শরঈ হুকুম জানতে ইচ্ছুক।

জাওয়াব: সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি যেমন কায়িনাত বা সৃষ্টির জন্য মহান উসীলা তেমনি মহান আল্লাহ পাক উনার রবূবিয়াত মুবারক প্রকাশেরও মহান ওসীলা হচ্ছেন তিনিই। অর্থাৎ উনার নূরুল ইযহার মুবারক না হলে মহান আল্লাহ পাক তিনি নিজেকেই প্রকাশ করতেন না। মোটকথা, মহান আল্লাহ পাক তিনি খ¦ালিক, মালিক রব ও ইলাহ হিসেবে একক। আর নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হিসেবে একক। মহান আল্লাহ পাক উনার পরেই উনার মহাসম্মানিত হাবীব ও মাহবূব নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা মুবারক।

খলিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক উনার ও উনার মহাসম্মানিত হাবীব ও মাহবূব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদের গোলামী ও আনুগত্য করার মধ্যেই বান্দা ও উম্মতের কামিয়াবী নিহিত। আর এ লক্ষ্যেই উনাদের উভয়ের প্রতি ঈমান আনতে হবে, উনাদেরকে মহব্বত করতে হবে। এটা যার যার অবস্থান থেকে করতে হবে। কেউ  বাদ যেতে পারবে না। হযরত ফেরেশতা আলাইহিমুস সালাম উনারা উনাদের অবস্থান থেকে করছেন। হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনারা উনাদের অবস্থান থেকে করেছেন, হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনারা উনাদের অবস্থান থেকে করেছেন। হযরত ইমাম, মুজতাহিদ, আউলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনারাও উনাদের অবস্থান থেকে করেছেন এবং করে যাচ্ছেন। এমনকি পশু-পাখি, কীট-পতঙ্গ, জামাদাত, শাজারাত, হাজারাত উনারাও উনাদের অবস্থান থেকে করেছেন এবং করে যাচ্ছেন। কেননা মহান আল্লাহ পাক তিনি হচ্ছেন সমস্ত কায়িনাত বা সৃষ্টির মহাসম্মানিত ইলাহ। আর নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি হচ্ছেন সমস্ত কায়িনাত বা সৃষ্টির মহাসম্মানিত রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। কায়িনাতবাসীর জন্য তাদের যিনি মহান ইলাহ ও রব  তায়ালা মহান আল্লাহ পাক উনাকে মানা যেমন ফরয অনুরূপভাবে কায়িনাতবাসীর জন্য যিনি মহসম্মানিত রসূল নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে মানাটাও তদ্রƒপ ফরয তথা ফরযে আইন। যার কারণে সমস্ত সৃষ্টির কালিমা শরীফ হিসেবে ঘোষিত হয়েছে-

لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا اللهُ مُحَمَّدٌ رَّسُولُ  اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ

একই বাক্যে বর্ণিত এই কালিমা শরীফের মধ্যে কোনরূপ বিভাজন সৃষ্টি করা যাবে না। অর্ধেক মানবে আর অর্ধেক মানবে না। তা হবে না। পুরোটাই মানতে হবে এবং বিশ্বাস করতে হবে। তবেই সে প্রকৃত বান্দা ও উম্মত বলে বিবেচিত হবে।

এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

وَاللهُ وَرَسُوْلُهٗۤ أَحَقُّ أَنْ يُّـرْضُوْهُ إِنْ كَانُـوْا مُؤْمِنِيْنَ ‎

অর্থ: যদি তারা মু’মিন হয়ে থাকে তবে তাদের কর্তব্য হলো, মহান আল্লাহ পাক উনাকে এবং উনার মহাসম্মানিত রসূল নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে সন্তুষ্ট করে। উনারাই সন্তুষ্টি মুবারক পাওয়ার সমধিক হক্বদার। (সম্মানিত ও পবিত্র সূরা তওবা শরীফ: সম্মানিত ও পবিত্র আয়াত শরীফ ৬২)

মূলত মহান আল্লাহ পাক উনার সন্তুষ্টি মুবারক এবং উনার হাবীব ও মাহবূব নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সন্তুষ্টি মুবারক অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।

উল্লেখ্য, কায়িনাতবাসী সকলেই নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত। আর কোন উম্মতের পক্ষে তাদের যিনি মহাসম্মানিত রসূল, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে ব্যতিত যেরূপ মহান আল্লাহ পাক উনার প্রতি ঈমান আনা সম্ভব নয়, তদ্রƒপ মহান আল্লাহ পাক উনার মহব্বত, মা’রিফত, নিছবত, কুরবত, সন্তুষ্টি মুবারক হাছিল করাও সম্ভব নয়।

এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ পাক তিনি নিজেই ইরশাদ মুবারক করেন-

قُلْ إِنْ كُنْـتُمْ تُحِبُّـوْنَ اللهَ فَاتَّبِعُوْنِيْ يُحْبِبْكُمُ اللهُ وَيَـغْفِرْ لَكُمْ ذُنُـوْبَكُمْ ۗ وَاللهُ غَفُوْرٌ رَّحِيْمٌ

অর্থ:  (আমার মহাসম্মানিত  হাবীব ও মাহবূব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম!) আপনি উম্মতকে বলে দিন, তোমরা যদি মহান আল্লাহ পাক উনাকে মহব্বত করে থাক তবে আমাকে ইত্তিবা বা অনুসরণ করো, তাহলে মহান আল্লাহ পাক তিনি তোমাদেরকে মহব্বত করবেন, তোমাদের গুনাহখতা ক্ষমা করে দিবেন। আর মহান আল্লাহ পাক তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, অতিশয় দয়ালু। (সম্মানিত ও পবিত্র সূরা আলে ইমরান শরীফ: সম্মানিত ও পবিত্র আয়াত শরীফ ৩১)

পবিত্র হাদীছ শরীফে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

اَحِبُّـوْنِىْ لِحُبِّ اللهِ

অর্থ: মহান আল্লাহ পাক উনার মহব্বত পেতে হলে তোমরা আমাকে মহব্বত করো। (মেশকাত শরীফ)

মহান আল্লাহ পাক তিনি আরো ইরশাদ মুবারক করেন-

إِنَّاۤ أَرْسَلْنَاكَ شَاهِدًا وَّمُبَشِّرًا وَّنَذِيرًا. لِّتُـؤْمِنُوا بِاللهِ وَرَسُولِهٖ وَتُـعَزِّرُوهُ وَتُـوَقِّرُوهُ وَتُسَبِّحُوهُ بُكْرَةً وَّأَصِيلًا

অর্থ: নিশ্চয়ই আমি আপনাকে পাঠিয়েছি হাযির-নাযির বা প্রত্যক্ষদশীর্ বা স্বাক্ষ্য দানকারী, সুসংবাদ দানকারী এবং সতর্ককারী হিসেবে। এজন্য যে, (কায়িনাতবাসী) তোমরা ঈমান আনবে মহান আল্লাহ পাক উনার প্রতি এবং উনার মহাসম্মানিত রসূল, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার প্রতি। সুতরাং উনার তোমরা খিদমত বা গোলামী করো, উনাকে সম্মান করো এবং উনার ছানা-ছিফত করো সকাল-সন্ধা অথার্ৎ সদাসর্বদা। (সম্মানিত ও পবিত্র সূরা ফাতহ্ শরীফ: সম্মানিত ও পবিত্র আয়াত শরীফ ৮,৯)

অত্র পবিত্র আয়াত শরীফ উনার মধ্যে স্পষ্ট বলে দেয়া হয়েছে যে, মহান আল্লাহ পাক উনার প্রতি ঈমান আনতে হলে উনার মহাসম্মানিত হাবীব ও মাহবূব নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মাধ্যমে ঈমান আনতে হবে। আর সে কারণে উম্মতকে আদেশ করা হয়েছে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার খিদমত মুবারক বা গোলামী মুবারক করার জন্য, উনাকে সম্মান মুবারক করার জন্য এবং উনার দায়িমীভাবে ছানা-ছিফত মুবারক করার জন্য। উক্ত প্রতিটি আদেশ মুবারক-ই ফরয তথা ফরযে আইন।

মূলত নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাথে নিছবতযুক্ত প্রতিটি বিষয়ই সর্বশ্রেষ্ঠ এবং আনুগত্য ও অনুসরণের দিক থেকে তা পালন করা ফরয তথা ফরযে আইন। এ ব্যাপারে বহু আয়াত শরীফ এবং হাদীছ শরীফ বর্ণিত হয়েছে।

وَأَطِيعُوا اللهَ وَرَسُولَهٗ إِنْ كُنْـتُمْ مُؤْمِنِيْنَ

অর্থ: মহান আল্লাহ পাক উনার এবং উনার মহাসম্মানিত রসূল, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার আনুগত্য করো যদি তোমরা মু’মিন হয়ে থাকো। (সম্মানিত ও পবিত্র সূরা আনফাল শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ০১)

উদ্ধৃত আয়াত শরীফ উনার মধ্যে মু’মিন বা ঈমানদার হওয়ার জন্য নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার আনুগত্য বা অনুসরণ করাকে অপরিহার্য তথা ফরযে আইন করে দেয়া হয়েছে।

পবিত্র কালামুল্লাহ শরীফ উনার মধ্যে আরো ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

وَمَاۤ اٰتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَـهَاكُمْ عَنْهُ فَانْـتَـهُوا وَاتَّـقُوا اللهَ إِنَّ اللهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ

অর্থ: মহাসম্মানিত রসূল নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি তোমাদের নিকট যা নিয়ে এসেছেন বা তোমাদেরকে যা আদেশ করেছেন তা তোমরা আঁকড়ে ধরো বা পালন করো এবং তিনি তোমাদেরকে যা থেকে বিরত থাকতে বলেছেন বা যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থাক। এ বিষয়ে তোমরা মহান আল্লাহ পাক উনাকে ভয় করো। নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ পাক তিনি কঠিন শাস্তিদাতা। (সম্মানিত ও পবিত্র সূরা হাশর শরীফ: সম্মানিত ও পবিত্র আয়াত শরীফ ০৭)

  অনুরূপ পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

كُلُّ أُمَّتِي يَّدْخُلُونَ الْجَنَّةَ إِلَّا مَنْ أَبٰى قِيلَ: يَا رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَمَنْ أَبٰى ؟ قَالَ مَنْ أَطَاعَنِي دَخَلَ الْجَنَّةَ، وَمَنْ عَصَانِي فَـقَدْ أَبٰى

অর্থ: আমার প্রত্যেক উম্মতই জান্নাতে প্রবেশ করবে। তবে যে আমাকে অস্বীকার করলো সে ব্যতীত। জিজ্ঞাসা করা হলো, ইয়া রসূলাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! কে আপনাকে অস্বীকার করলো? তিনি বললেন, যে আমার আনুগত্য বা অনুসরণ করলো সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যে আমার নাফরমানী করলো অর্থাৎ আমার আনুগত্য বা অনুসরণ করলো না, সেই আমাকে অস্বীকার করলো। অর্থাৎ সে জান্নাতে যেতে পারবে না। (বুখারী শরীফ, মেশকাত শরীফ)

পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি আরো ইরশাদ মুবারক করেন-

لَوْ تَـرَكْتُمْ سُنَّةَ نَبِيِّكُمْ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَضَلَلْتُمْ

অর্থ: যদি তোমরা তোমাদের যিনি সম্মানিত নবী নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সুন্নত মুবারক তরক করো বা ছেড়ে দাও তাহলে তোমরা অবশ্যই পথভ্রষ্ট হয়ে যাবে। (মুসলিম শরীফ, নাসায়ী শরীফ, মুসনাদে আহমদ শরীফ, আবূ দাউদ শরীফ, ইবনু মাজাহ শরীফ, দারিমী শরীফ, মেশকাত শরীফ, রিয়াদুছ ছলিহীন ইত্যাদি)

নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি আরো ইরশাদ মুবারক করেন-

لَوْ تَـرَكْتُمْ سُنَّةَ نَبِيِّكُمْ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَكَفَرْتُمْ ‏

অর্থ: যদি তোমরা তোমাদের যিনি সম্মানিত নবী নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সুন্নত মুবারক তরক করো বা ছেড়ে দাও তাহলে তোমরা অবশ্যই কাফির হয়ে যাবে। (আবূ দাউদ শরীফ, মেশকাত শরীফ ইত্যাদি)

উল্লেখিত পবিত্র আয়াত শরীফ ও পবিত্র হাদীছ শরীফ এবং অনুরূপ সকল আয়াত শরীফ ও হাদীছ শরীফ উনাদের আলোকে সাব্যস্ত হয়েছে যে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার আনুগত্য বা অনুসরণ মুবারক অপরিহার্য তথা ফরযে আইন।

সুওয়াল-জাওয়াব বিভাগ

সুওয়াল-জাওয়াব বিভাগ

সুওয়াল-জাওয়াব

সুওয়াল-জাওয়াব

সুওয়াল-জাওয়াব বিভাগ: