-হযরত মাওলানা মুফতী সাইয়্যিদ শোয়াইব আহমদ
আরবী পঞ্চম মাসের নাম জুমাদাল উলা। অভিধানে “জুমাদা” শব্দের অর্থ লেখা হয়েছে জমাট পানি বা বরফ। আর ‘‘উলা’’ শব্দের অর্থ প্রথম। কাওয়ায়েদ অনুসারে ‘‘জুমাদা’’ শব্দটি মুয়ান্নাছ (স্ত্রী লিঙ্গ) হওয়ায় তার সাথে মিল রেখে আউয়াল শব্দের মুয়ান্নাছ ‘উলা’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে।
প্রত্যেক মাসই আল্লাহ্ পাক কর্তৃক নির্ধারিত এবং এর নিয়ন্ত্রনকারীও তিনি নিজেই। এজন্য কোন মাস, বছর তথা সময়কে গালী দেয়া জায়েয নেই, সম্পূর্ণ হারাম। এ সম্পর্কে হাদীস শরীফে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন,
لا تسبوا الدهر فان الله هو الدهر.
অর্থঃ- “তোমরা যুগ বা সময়কে গালী দিওনা। কারণ আল্লাহ্ পাকই সময়কে নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন।” (মসনদে আহমদ)
বস্তুত প্রতিটি মাস, দিন, তারিখ মানুষের ইবরত-নসীহত হাছিলের উপকরণ স্বরূপ এবং তা ফযীলত প্রাপ্ত ও আলোচিত কোন না কোন অনুসরণীয় ব্যক্তিত্বের মুবারক জীবন প্রবাহের দ্বারা। “জুমাদাল উলা” মাস, পবিত্র ২৭ তারিখে বিশিষ্ট ছাহাবী হযরত সালমান ফারসী রদিয়াল্লাহু আনহু ইন্তেকাল বরণ করার কারণে মর্যাদা ও আলোচনার দাবি রাখে।
সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন,
اصحابى كالنجوم بايهم اقتديتم اهتديتم.
অর্থঃ- “আমার প্রত্যেক ছাহাবাই রদিয়াল্লাহু আনহু তারকা সাদৃশ্য, তাঁদের যে কাউকে অনুসরণ করলেই হিদায়েত পেয়ে যাবে।” (মেশকাত শরীফ)
মূলতঃ হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদিয়াল্লাহু আনহুমগণের মেছাল পূর্ববর্তী-পরবর্তী সকল উম্মতের মেছাল হতে সম্পূর্ণ আলাদা। তাঁদের মেছাল তাঁরা নিজেরাই। তাঁরা সাইয়্যিদুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মুবারক সোহ্বতের কারণে এমন পূর্ণতা হাছিল করেছেন যে, তাঁদেরকে মুহব্বত করা ঈমানের অংশ বিশেষ, তাঁদেরকে অনুসরণ করা ওয়াজিব এবং আল্লাহ্ তায়ালার সন্তুষ্টি লাভের উসীলা। জলীলুল ক্বদর ছাহাবী হযরত সালমান ফারসী রদিয়াল্লাহু আনহু একজন বিশেষ শ্রেণীর অনুসরনীয় এবং মুহব্বত পাবার হক্বদার ছাহাবীর অন্তুর্ভক্ত। তিনি ছিলেন বে-মেছাল মর্যাদার অধিকারী। পঞ্চম হিজরীর জিলক্বদ মাসে খন্দকের যুদ্ধ শুরু হয়। এ যুদ্ধে মুশরিকদের একটি বিরাট বাহিনী মদীনা শরীফের উপর চড়াও হলো। হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যুদ্ধের ব্যাপারে ছাহাবীদের সঙ্গে পরামর্শ করলেন, হযরত সালমান ফারসী রদিয়াল্লাহু আনহু ইরানের যুদ্ধ কৌশল সম্পর্কে খুব ভালভাবে ওয়াকিফহাল ছিলেন। তিনি আরজ করলেন, “হে আল্লাহ্ পাক-এর হাবীব হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! দুশমনের বিরাট বাহিনীর মোকাবিলায় আমাদের সংখ্যা অনেক কম। তাই খোলা ময়দানে যুদ্ধ করা ঠিক হবেনা। মদীনা শরীফের চারদিকে খন্দক বা পরিখা খনন করে শহরকে হিফাজত করাটাই উত্তম হবে।”
হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর প্রস্তাব খুব পছন্দ করলেন এবং পরিখা খননের কাজ শুরু করে দিলেন। রাসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সঙ্গে তিন হাজার ছাহাবী রদিয়াল্লাহু আনহুম এ কাজে শরীক হলেন এবং প্রায় ১৫ দিন কঠিন পরিশ্রমের পর পাঁচ গজ প্রশস্ত ও পাঁচ গজ গভীর পরিখা তৈরি হয়ে গেল। কাজ বন্টনের সময় আনছার ও মুহাজির উভয়েই হযরত সালমান ফারসী রদিয়াল্লাহু আনহুকে নিজেদের মধ্যে পেতে চাইলেন। আনছার গণ বলতেন, “সালমান রদিয়াল্লাহু আনহু আমাদের সাথে থাকবেন।” আর মুহাজিরগণ বলতেন, “তিনি আমাদের সাথে থাকবেন।” হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শুনে বললেন, “সালমান আমার আহ্লে বাইতের সদস্য।” (সুবহানাল্লাহ্) মুশরিকরা রাসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শহরকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার দৃঢ় সংকল্প নিয়ে এসেছিল। কিন্তু সেই খন্দক তাদেরকে শহর পর্যন্ত পৌঁছতেই দেয়নি। অধিকন্তু আল্লাহ্ তায়ালা মুসলমানদেরকে অদৃশ্যভাবে সাহায্য করলেন এবং এমন সব কারণ সৃষ্টি করে দিলেন যে, মুশরিকরা ২৭ দিন পর অবরোধ তুলে নিয়ে ব্যর্থ মনোরথ হয়ে ফিরে গেল।
হযরত সালমান ফারসী রদিয়াল্লাহু আনহু জনৈক ইহুদীর দাসত্ব বন্ধনে আবদ্ধ থাকার কারণে বদর ও ওহুদ জিহাদে শরীক থাকতে পারেনননি। খন্দকের জিহাদের পর হতে সকল জিহাদে শরীক ছিলেন। তাঁর রাসূল প্রেম এবং জিহাদের উৎসাহ দেখে একবার হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “জান্নাত তিন ব্যক্তির কামনা করে থাকে। (১) হযরত আলী রদিয়াল্লাহু আনহু, (২) হযরত আম্মার রদিয়াল্লাহু আনহু এবং (৩) হযরত সালমান ফারসী রদিয়াল্লাহু আনহু।”
তিনি ইল্ম, আমল, ইখলাছ, রাসূল প্রেম ও আলাহ্ ভীতি সব কিছুর বদৌলতে হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদিয়াল্লাহু আনহুমগনের পবিত্র জামায়াতে বিশেষ মর্যাদার অধিকারী ছিলেন। তাঁর ইল্ম ও ফযীলতের উপর সবচে যে বড় সাক্ষ্য স্বয়ং নবী করিম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদীস শরীফ, “সালমান রদিয়াল্লাহু আনহু ইল্মে পূর্ণ।” হযরত আলী রদিয়াল্লাহু আনহু-এর নিকট একবার হযরত সালমান রদিয়াল্লাহু আনহু সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, “সালমান রদিয়াল্লাহু আনহু ইল্ম ও হিকমতে হযরত লুকমান আলাইহিস্ সালাম-এর সমান ছিলেন।” আরেকবার তিনি বলেছিলেন, “তাঁকে প্রথম (তাওরাত, জাবুর ও ইঞ্জিল) এবং শেষ (কুরআন শরীফ)-এর ইল্ম দান করা হয়েছে।” তিনি ইল্ম ও হিকমতে এমন এক নদী যা কখনো শুকায় না।
আল্লামা ইবনে সায়াদ বর্ণনা করেছেন যে, ইমামুল ফুকাহা হযরত মায়াজ বিন জাবাল আনছারী রদিয়াল্লাহু আনহু একবার নিজের এক শাগরেদকে ওছিয়ত করেছিলেন, “চার ব্যক্তির নিকট থেকে ইল্ম হাছিল করবে। এই চার ব্যক্তির মধ্যে হযরত সালমান ফারসী রদিয়াল্লাহু আনহু একজন ছিলেন।”
হাফেজ ইবনে আব্দুল বার রহমতুল্লাহি আলাইহি “ইসতিয়ার” গ্রন্থে এই রেওয়ায়েত উল্লেখ করেছেন যে, একবার রাসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করলেন, “আল্লাহ্ তায়ালা আমাকে চার ব্যক্তির সঙ্গে মুহব্বত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন এবং আমাকে খবর দিয়েছেন যে, তিনিও তাঁদের প্রতি মুহব্বত রাখেন। জিজ্ঞেস করা হলো, এই চার ব্যক্তি কে কে? বললেন, “হযরত আলী রদিয়াল্লাহু আনহু, হযরত মিকদাদ রদিয়াল্লাহু আনহু, হযরত আবু জার রদিয়াল্লাহু আনহু এবং হযরত সালমান ফারসী রদিয়াল্লাহু আনহু।”
প্রিয় নবী করিম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি হযরত সালমান ফারসী রদিয়াল্লাহু আনহু-এর এমন গভীর ভালবাসা ছিল যে, তিনি বেশীর ভাগ সময়ই হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর খিদমতে অতিবাহিত করতেন। এ মোবারক খিদমতে থেকে তিনি ৬০ টি হাদীস শরীফ বর্ণনা করেন।
আমীরুল মু’মিনীন হযরত ওসমান জুন্নূরাইন রদিয়াল্লাহু আনহু-এর খিলাফতকালে ৩৫হিজরীতে তিনি ইন্তেকাল করেন। সীরত গ্রন্থ সমূহে তাঁর বয়স সম্পর্কে বিভিন্ন ধরণের রেওয়ায়েত উল্লেখ করা হয়েছে। ২০০ থেকে ৫০০ পর্যন্ত। হাফেজ ইবনে হাজার রহমতুল্লাহি আলাইহি ২৫০ বছর রেওয়ায়েতকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
সংশোধনী
গত ৮২তম সংখ্যায় ১২৮ নং পৃষ্ঠায় চতুর্থ অনুচ্ছেদে
৮ম লাইনে ১৩৩৪ হিঃ এর স্থলে ১২৩৪ হিঃ হবে।
সম্মানিত রজবুল শরীফ, সম্মানিত শা’বান শরীফ ও সম্মানিত রমাদ্বান শরীফ মাস এবং উনাদের প্রাসঙ্গিক আলোচনা
সম্মানিত জুমাদাল ঊলা শরীফ ও সম্মানিত জুমাদাল উখরা শরীফ মাস এবং উনাদের প্রাসঙ্গিক আলোচনা