মুহম্মদ শিহাবুদ্দীন
পাহাড়তলী, চট্টগ্রাম।
সুওয়ালঃ- মাসিক মদীনা মে/২০০০ ঈঃ সংখ্যায় প্রশ্নোত্তর বিভাগে ১২ নং প্রশ্নের উত্তরে বলা হয়েছে, “একখানা ছহীহ হাদীসে আছে যে, তিনটি মসজিদ ব্যতীত অন্য কোন স্থানের উদ্দেশ্যে যাত্রা করো না। অর্থাৎ, তিনটি মসজিদ ছাড়া অন্য কোন পবিত্র স্থান এমন নাই যেখানে বিশেষ ছওয়াব বা ফযীলত প্রাপ্তির আশায় সফর করা যেতে পারে। কারণ এই তিনটি মসজিদ ছাড়া অন্য সব মসজিদের মর্যাদা সমান। মসজিদ তিনটি হচ্ছে- পবিত্র মক্কার মসজিদুল হারাম, মদীনার মসজিদে নববী শরীফ এবং বাইতুল মোকাদ্দাসের মসজিদুল-আকসা। পীর-ফকীরের কবর-মাযার সফর করার উদ্দেশ্যে দূর-দূরান্তের সফর করা যেমন শরীয়তের বিধানে অনুমোদিত নয়, তেমনি সেগুলির উদ্দেশ্যে কোন কিছু মানত করাও বৈধ নয়। মানত হতে হবে একমাত্র আল্লাহর নামে।”
এখন আমার সুওয়াল হলো- মাসিক মদীনার উক্ত বক্তব্য সঠিক হয়েছে কি? আর সত্যিই কি পীর, বুযুর্গ এবং আওলিয়া-ই-কিরাম (রঃ)গণের মাযার শরীফ জিয়ারত করার উদ্দেশ্যে দূর-দূরান্তে সফর করা শরীয়তের বিধানে অনুমোদিত নয় অর্থাৎ জায়েয নেই। অথচ আমরা জানি মাযার শরীফ জিয়ারতের উদ্দেশ্যে দূর-দূরান্তে সফর করা সুন্নত। তাহলে আমরা কি মাযার শরীফ জিয়ারত না করে একটি সুন্নত ছেড়ে দিব? দলীলসহ জানিয়ে বাধিত করবেন।
জাওয়াবঃ- মাযার শরীফ জিয়ারত করার উদ্দেশ্যে দূর-দূরান্তে সফর করা সম্পর্কে মাসিক মদীনার উক্ত বক্তব্য ভুল হয়েছে। যা সম্পূর্ণই মনগড়া ও দলীলবিহীন। কেননা মাযার শরীফ জিয়ারত করার উদ্দেশ্যে দূর-দূরান্তে সফর করা শরীয়ত সম্মত তো বটেই বরং তা খাছ সুন্নতের অন্তর্ভূক্ত। কারণ দূর-দূরান্তে সফর করার জন্য স্বয়ং আল্লাহ্ পাক কুরআন শরীফে বলেছেন,
قل سيروا فى الارض.
অর্থঃ- “হে হাবীব! আপনি বলে দিন, তোমরা জমিনে সফর কর।” (সূরা আনয়াম/১১)
আর আল্লাহ্ পাক-এর রাসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বহু দূরের পথ অতিক্রম করে নিজেই মাযার বা কবর জিয়ারত করেছেন এবং তা করার জন্য উম্মতগণকেও আদেশ করেছেন।
আর কবর জিয়ারত করার জন্য স্বয়ং আখেরী রাসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মতদেরকে আদেশও করেছেন।
এ প্রসঙ্গে হাদীস শরীফে উল্লেখ আছে,
عن بريدة قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم كنت نهيتكم عن زيارة القبور فزوروها.
অর্থঃ “হযরত বুরাইদাহ্ রদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত। রাসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আমি তোমাদেরকে কবর জিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম, এখন তোমরা তা কর।” (মুসলিম শরীফ)
অন্য হাদীস শরীফে আছে,
عن ابن مسعود ان رسول الله صلى الله عليه وسلم قال كنت نهيتكم عن زيارة القبور فزوروها فانها تزهد فى الدنيا وتذكر الاخرة.
অর্থঃ “হযরত ইবনে মসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত। নিশ্চয়ই রাসুলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আমি তোমাদেরকে কবর জিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম, এখন তোমরা তা কর। কেননা উহা দুনিয়ার আসক্তিকে কমায় এবং আখিরাতকে স্মরণ করায়।” (ইবনে মাযাহ)
এ প্রসঙ্গে হাদীস শরীফ বর্ণিত হয়েছে,
ان النبى صلى الله عليه وسلم كان يأتى قبور الشهداء باحد على رأس كل حول فيقول السلام عليكم بما صبرتم فنعم عقبى الدار.
অর্থঃ- “নিশ্চয়ই রাসূলুল্লাহ্ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতি বছরান্তে ওহুদের শহীদগণের কবর (মাযার) জিয়ারত করতে আসতেন। অতঃপর বলতেন, তোমাদের প্রতি সালাম, তোমরা যেমন ধৈর্য্য ধারণ করেছ, তেমনি পরকালে উত্তম বাসস্থান লাভ করেছ।” (ফতওয়ায়ে শামী)
অনুরূপভাবে তিনি বদরের শহীদ সাহাবী রদিয়াল্লাহু আনহুগণের কবর বা মাজার জিয়ারত করতে যেতেন।
পরবর্তীতে হযরত আবূ বকর সিদ্দীক রদিয়াল্লাহু আনহু, হযরত ওমর ফারুক রদিয়াল্লাহু আনহু এবং হযরত ওসমান যুন্ নুরাইন রদিয়াল্লাহু আনহু ওহুদ ও বদরে শহীদ সাহাবী রদিয়াল্লাহু আনহুগণের মাজার বা কবর জিয়ারত করতেন।
এখানে লক্ষ্যনীয় যে, ওহুদ মদীনা শরীফ থেকে পৌনে দু’মাইল এবং বদর আশি মাইল দূরে অবস্থিত। এতদ্বসত্বেও আল্লাহ্ পাক-এর রাসূল, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও হযরত খুলাফা-ই-রাশেদীন সাহাবা-ই-কিরাম রদিয়াল্লাহু আনহু শুধুমাত্র জিয়ারতের উদ্দেশ্যে বা নিয়তে সেখানে যেতেন।
শুধু তাই নয়, যাঁরা ইমাম মুজ্তাহিদ ও আওলিয়া-ই-কিরাম তাঁরাও মাজার শরীফ জিয়ারত করতেন। যেমন এ প্রসঙ্গে ইমাম শাফেয়ী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন,
انى لاتبرك بابى حنيفة واجيئ الى قبره فاذا عرضت لى حاجة صليت ركعتين وسألت الله تعالى عند قبره فتقضى سريعا.
অর্থঃ- “নিশ্চয়ই আমি ইমাম আ’যম আবু হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি হতে বরকত হাছিল করি। যখন আমার কোন সমস্যা দেখা দেয়, আমি তাঁর মাজার শরীফে এসে দু’রাকায়াত নামাজ আদায় করি। অতঃপর তাঁর উছীলা দিয়ে আল্লাহ্ পাক-এর নিকট সমস্যা সমাধানের জন্য প্রার্থনা করি। অতঃপর অতি তাড়াতাড়ি উক্ত সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। (মুকাদ্দিমায়ে শামী)
অতএব, প্রমাণিত হলো যে, কবর বা মাজার শরীফ জিয়ারত করা সুন্নতে রাসূল, সুন্নতে খুলাফা-ই-রাশেদীন এবং ইমাম-মুজ্তাহিদ ও আওলিয়া-ই-কিরাম প্রত্যেকেরই খাছ সুন্নতের অন্তর্ভূক্ত।
উল্লেখ্য, মাসিক মদীনার সম্পাদক বলেছে, “একখানা ছহীহ্ হাদীসে আছে যে, তিনটি মসজিদ ব্যতীত অন্য কোন স্থানের উদ্দেশ্যে যাত্রা করো না।”
এর জবাবে বলতে হয় যে, মাসিক মদীনার সম্পাদক অজ্ঞতাহেতু হাদীস শরীফের ভুল ব্যাখ্যা করেছে। কারণ হাদীস শরীফে স্থানের কথা উল্লেখ নেই। শুধু মসজিদের কথা উল্লেখ আছে।
যেমন হাদীস শরীফে উল্লেখ আছে,
عن ابى سعيدن الخدرى رضى الله تعالى عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم لاتشد الرحال الا الى ثلاثة مساجد مسجد الحرام والمسجد الاقصى ومسجدى هذا.
অর্থঃ- “হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তিন মসজিদ ব্যতীত অন্য কোন মসজিদে (নামাজ পড়ার উদ্দেশ্যে) সফর করোনা। মসজিদুল হারাম, মসজিদুল আক্বছা ও আমার এই মসজিদ।” (বুখারী শরীফ, মুসলিম শরীফ, মেশকাত শরীফ/৬৭-৬৮)
এ হাদীস শরীফের ব্যাখ্যায় হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিম্নোক্ত হাদীস শরীফ বর্ণনা করেন,
عن انس بن مالك رضى الله تعالى عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم صلاة الرجل فى بيته بصلاة وصلاته فى مسجد القبائل بخمس وعشرين صلاة وصلاته فى المسجد الذى يجمع فيه بخمس مأة صلاة وصلاته فى المسجد الاقصى بخمسين الف صلاة وصلاته فى مسجدى بخمسين الف صلاة وصلاته فى المسجد الحرام بمأة الف صلاة.
অর্থঃ “হযরত আনাস ইবনে মালিক রদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত যে, রসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “কোন ব্যক্তি যদি ঘরে নামাজ পড়ে তবে তার এক নামাজে- এক নামাজের সওয়াব পাবে। আর যদি পাঞ্জেগানা মসজিদে নামাজ পড়ে তবে এক নামাজে- পঁচিশ নামাজের সমান সওয়াব পাবে। আর যদি জুমুআর মসজিদে এক নামাজ পড়ে তবে পাঁচশ নামাজের সওয়াব পাবে আর যদি মসজিদুল আক্বসায় এক নামাজ পড়ে তবে পঞ্চাশ হাজার নামাজের সওয়াব পাবে। আর মসজিদুন্ নববীতে যদি এক নামাজ পড়ে তবেও পঞ্চাশ হাজার নামাজের সওয়াব পাবে। এবং যদি ক্বাবা শরীফে এক নামাজ পড়ে তবে এক লাখ নামাজের সওয়াব পাবে।” (ইবনে মাজা, মেশকাত)
উল্লেখ্য, হাদীস শরীফে বর্ণিত উল্লিখিত তিনটি মসজিদ (১) কা’বা শরীফে এক রাকায়াত নামাজে এক লক্ষ গুণ রাকায়াত নামাজের সওয়াব হয়। (২) মসজিদে আক্বসায় পঞ্চাশ হাজার গুণ এবং (৩) মসজিদে নববীতে পঞ্চাশ হাজার গুণ সওয়াব হয়। এছাড়া মসজিদে কোবায় দু’রাকাত নামাজ আদায় করলে এক ওমরার সওয়াব হয়।
এ প্রসঙ্গে হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে,
من خرج حتى يأتى هذا المسجد مسجد قباء فصلى فيه كان له عدل عمرة.
অর্থঃ “যে ব্যক্তি মসজিদে কোবায় এসে দু’রাকাত নামাজ পড়বে সে এক ওমরার সওয়াব পাবে।” (নাসাঈ, আহ্মদ)
তাই শুধুমাত্র এ চারটি মসজিদের উদ্দেশ্যে সফর করা জায়েয।
যেমন, আল্লামা মুহম্মদ হাসান শাহ্ মোহাজেরে মক্কী বলেন, لا تشدالرحال এই হাদীস শরীফের ব্যাখ্যায় বলেন,
والمعنى كا افاد فى الاحيا انه لاتثد الرحال المسجد من المساجد الا لهذه الثلاثة لما فيها من المضاعفة خلاف بقية المساجد فانها منساوية فى ذلك فلا يرد انه قد تشد الرجال لغير ذلك كصلا رحم وتعلم علم وزيارة المشاهر كقبر النبى صلى الله عليه وسلم وقبر الخليل عليه السلام سائر الائمة.
অর্থঃ- “এর মর্ম হলো জীবিতদের জন্য ফায়দাদায়ক। বরকত হাসিলের জন্য এ তিন মসজিদ ব্যতীত অন্যত্র সফর করা বিধেয় নয়। কেননা বাকী মসজিদগুলো বরকতের দিক দিয়ে সমান। এ ছাড়া অপরাপর স্থানে সফর করা নিষেধ নয়। যেমন- আত্মীয়তার সম্পর্ক স্থাপনের জন্য, ইল্ম অর্জনের জন্য, বুজুর্গগণের জিয়ারতের জন্য, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর রওজা মোবারক, হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এর মাজার জিয়ারত ও সমস্ত ইমামগণের মাজারসমূহ জিয়ারত করা নিষিদ্ধ নয়।”
সুতরাং অধিক ফযীলতের কারণে শুধু এ চারটি মসজিদে সফর করার জন্য অনুমতি প্রদান করা হয়েছে। আর অন্যান্য সকল মসজিদে নামাজ আদায়ের ফযীলত সমান হওয়ার কারণে তাতে সফর করা নিষেধ করা হয়েছে। কবর বা মাজার শরীফ জিয়ারত করার উদ্দেশ্যে সফর করতে নিষেধ করা হয়নি।
উক্ত হাদীসের ব্যাখ্যায় আল্লামা মুহম্মদ ইউসুফ বিন নূরী বলেন,
مذهب جمهور الامة الى ان زيارة قبره صلى الله عليه وسلم اعظم القر بات والسفر اليها جائز بل مندوب مسروعيتها محل اجماع بلا نزاع.
অর্থঃ- “জমহুর উম্মত এর মাযহাব হল রওজা মোবারক জিয়ারত করা উত্তম ইবাদত, আর নিয়ত করে সফর করা শুধু জায়েযই নয় বরং মোস্তাহাব হওয়ার ব্যাপারে সকলেই একমত এতে কোন প্রকার অসুবিধা নেই।” (মা আরিফুস সুনান, শরহে তিরমিযী, খন্ড ৩, পৃঃ৩২৯)
বিখ্যাত মুহাদ্দিস জয়নুদ্দীন ইরাকী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন,
من احسن محال الحديث ان المراد منه حكم المسجد فقط، وانه لاتشد الرحال الى مسجد من المسجد غير هذه الثلاثة واما قصد غير المسجد من الراحلة فى طلب العلم وزيارة الصالحين والاخوان والتجارة والتنزه ونحوه ذلك فليس داخلا فيه.
অর্থঃ- “তিন মসজিদ ব্যতীত অন্য কোথাও ভ্রমণ করো না এ হাদীস শরীফের ব্যবহারের উত্তম যথোপযুক্ত স্থান হল শুধু মসজিদ। তবে যদি মসজিদ ব্যতীত অন্যত্র ভ্রমণের ইচ্ছা করে যেমন- ইলম অন্বেষণ, বুজুর্গগণের সাথে (মৃতও যদি হয়), আত্বীয়-স্বজনদের সাথে সাক্ষাৎ, ব্যবসার জন্য বা আনন্দ ভ্রমণের জন্য বা অনুরূপ যত ভ্রমণ আছে তা এ হাদীসের অন্তর্ভুক্ত নয়।”
শায়খ আবুল হাসান নূরুদ্দীন সিন্ধি لا تشد الرحال এর ব্যাখ্যায় বলেন,
والمعنى لا ينبغى شد الرحال والسفر من بين المساجد الا الى ثلاثة مساجد واما السفر للعلم وزيارة العلماء والصلحاء وللتجارة ونحو ذلك فغير داخل فى حين المنع وكذا زيارة المساجد الاخر بلا سفر كزيارة مسجد قباء لاهل المدينة غير داخل فى حين النهى.
অর্থঃ- “এর অর্থ হলো তিন মসজিদ ব্যতীত অন্য কোন মসজিদে (অপ্রয়োজনে নামাজ পড়ার জন্য) সফর করা যাবেনা। কিন্তু যদি ইলম অর্জনের জন্য, আলেম ও ছালেহ-গণের (কবর) জিয়ারতের জন্য ও ব্যবসা বাণিজ্যের জন্য সফর করা হয় তাহলে এ হুকুমের অন্তর্ভুক্ত হবে না। অনুরূপ মদীনাবাসীদের জন্য মসজিদে কুবাতে গেলে এ নিষিদ্ধতা প্রযোজ্য হবে না। (হাশিয়ায়ে সিন্ধি ২য় খন্ড ৩৮ পৃঃ, ইমাম ইবনে হাযম রহমতুল্লাহি আলাইহি এর মতে জীবনে একবার কবর জিয়ারত করা ওয়াজিব। আইনী৪/৭৬, ফতহুল মুলহীম ২/৫১, বজলুল মজহুদ ৪/২১৪)
ইমামুল মুহাদ্দিসীন শায়খ আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ুতী রহমতুল্লাহি আলাইহি শরহে সূয়ূতী কিতাবে لا تشد الرحال সম্বন্ধে ব বলেছেন যে, এটা শুধু মসজিদের জন্যই খাছ।
হাফেজে হাদীস, শায়খ আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন,
ان المراد حكم المسجد فقط وانه لا تشد الرحال الى مسجد من مسجد للصلاة فيه غير هذه الثلاثة واما قصد غير المساجد لزيارة صالح او قريب او صاحب او طلب علم او تجارة او نزهة فلا يدخل فى النهى.
لا تشد الرحال এ হুকুমের উদ্দেশ্য হলো শুধু মসজিদের সাথে সস্পৃক্ত। এ মসজিদত্রয় ব্যতীত অন্যান্য মসজিদে নামাজের জন্য সফর করা নিষিদ্ধ। তবে যদি মসজিদ ব্যতীত সালেহগণের (কবর) জিয়ারত, জীবিত-গণের সাথে সাক্ষাৎ, ইল্ম অর্জন, ব্যবসা ও ভ্রমণের জন্য সফর করে তা এ হাদীসের হুকুমের অন্তর্ভুক্ত হবে না। (ফতহুল বারী ৩য় খন্ড, ৬৫ পৃষ্ঠা)
অতএব প্রমাণিত হলো, আখেরী রাসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বয়ং কবর বা মাজার শরীফ জিয়ারত করেছেন এবং সাহাবা-ই-কিরাম রদিয়াল্লাহু আনহুগণকে কবর বা মাজার শরীফ জিয়ারত করার নির্দেশ দিয়েছেন। তাই কবর বা মাজার শরীফ জিয়ারত করা খাছ্ সুন্নতের অন্তর্ভূক্ত।
সুতরাং এ সুন্নত আমলকে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কবর বা মাজার শরীফ জিয়ারত করতে হবে যদিও শরীয়ত বিরোধী কার্যকলাপ সংঘটিত হয় তবে শরীয়ত বিরোধী কার্যকলাপ প্রতিরোধের ব্যবস্থা করতে হবে। এটাই ফতওয়া গ্রাহ্য মত। এর বিপরীত মত পোষণ করা গোমরাহ্ীর লক্ষণ।
মূলতঃ মাসিক মদীনা, ইবনে তাইমিয়া ও তার সমর্থকারীসহ সকল ওহাবীরা উক্ত হাদীস শরীফের ব্যাখ্যা ও তাৎপর্য উপলব্ধি করতে না পেরে বলে থাকে যে, মাযার শরীফ জিয়ারতের উদ্দেশ্যে সফর করা জায়েয নেই। যা ভুল বলে প্রমাণিত হলো।
বিঃদ্রঃ বিস্তারিত জানতে হলে মাসিক আল বাইয়্যিনাতের ৪র্থ সংখ্যা পাঠ করুন। সেখানে ৭৮টি দলীল উল্লেখ পূর্বক মাজার শরীফ জিয়ারত সুন্নত ও মুস্তাহাব প্রমাণ করা হয়েছে।
মুহম্মদ আলাউদ্দীন আল আজাদ
মতলব, চাঁদপুর।
সুওয়ালঃ- মাসিক রাহমানী পয়গাম জুন’২০০০ ঈঃ সংখ্যায় জিজ্ঞাসার-জবাব বিভাগে বলা হয়েছে, “….কুরাআনে কারীম, সহীহ্ হাদীস এবং চার ইমামের কারো থেকে আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ্ বলার সময় হাতে চুমা দিয়ে চোখে লাগানোর কোন প্রমাণ নেই। অথচ কিছু লোক ইহাকে ছাওয়াবের কাজ মনে করে। সুতরাং এ ধরণের কাজ ‘বিদ্য়াত’ যা থেকে বিরত থাকা জরুরী।
এখন আমার সুওয়াল হলো- মাসিক রাহমানী পয়গামের উক্ত বক্তব্য সঠিক হয়েছে কি? আর সত্যিই কি আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ্্ বলার সময় অর্থাৎ আযানে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র নাম মোবারক শুনে হাতে চুমু দিয়ে চোখে লাগানোর কোন প্রমাণ নেই? দলীলসহ জানিয়ে বাধিত করবেন।
জাওয়াবঃ- আযানে আখেরী রাসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র নাম মোবারক শুনে বৃদ্ধাঙ্গুলীদ্বয়ের নখে চুমু খেয়ে চোখে লাগানো সম্পর্কে মাসিক রাহমানী পয়গামের উপরোক্ত বক্তব্য সঠিক হয়নি। বরং তা বিভ্রান্তিকর ও জেহালতপূর্ণ হয়েছে।
উল্লেখ্য, কুরআন-সুন্নাহ্র দৃষ্টিতে এ প্রকার অজ্ঞ লোকদের সূক্ষ্ম ও জ্ঞানমূলক মাসয়ালা জিজ্ঞাসা করা সম্পর্কে নিষেধ করা হয়েছে। কারণ যারা শুধু বক্বদরে নেছাব বা এর চেয়ে কম পড়া শুনা করে থাকে তাদের পক্ষে এ ধরণের সূক্ষ্ম ও জ্ঞানমূলক প্রশ্নের সঠিক জবাব দেয়া কখনো সম্ভব নয়। আর এদেরকে এ প্রকার মাসয়ালা জিজ্ঞাসা করাও জ্ঞানী লোকদের লক্ষণ নয়।
কাজেই মূর্খ লোককে কোন বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তার জবাব যেমন হওয়া দরকার এখানেও ঠিক তাই হয়েছে।
আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের দলীল হচ্ছে- কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াস। এ চারটির যে কোন একটির দ্বারা যে মাসয়ালা ছাবেত হবে সেটাই গ্রহণযোগ্য। এক সাথে চারটির দলীল থাকা শর্ত নয়।
তারা প্রথমেই লিখেছে যে, “……..কুরআন কারীম, সহীহ্ হাদীস এবং চার ইমামের কারো থেকে আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ্ বলার সময় হাতে চুমা দিয়ে চোখে লাগানোর কোন প্রমাণ নেই….. ।”
প্রথমতঃ রাহমানী পয়গাম বলেছে, “…. কুরআন শরীফে নেই।” তাহলে কুরআন শরীফে না থাকলেই কি কোন বিষয় গ্রহণযোগ্য হবে না? যেমন, নামাজ কত রাকায়াত সেটা কুরআন শরীফে নেই, সেটা হাদীস শরীফে রয়েছে।
অনুরূপ দাদী-নানীকে বিয়ে করা নাজায়েয। এটা কুরআন শরীফ ও হাদীস শরীফের কোথাও নেই। বরং ইজমা ও ক্বিয়াসে রয়েছে। আরো অনেক মাসয়ালা রয়েছে যা সরাসরি কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ, ইজমাতে নেই। শুধুমাত্র ক্বিয়াসের দ্বারা ছাবেত রয়েছে। যেমন, ধুমপান করা।
তাহলে কি ফরজ নামাজ- ফজর দু’রাকায়াত, জোহর চার রাকয়াত, আছর চার রাকায়াত, মাগরীব তিন রাকায়াত ও এশা চার রাকায়াত হিসেবে কুরআন শরীফে বর্ণিত নেই বলে তা আদায় করা যাবে না?
দাদী-নানীকে বিবাহ্ করা কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফে নেই বলে কি তাদেরকে বিবাহ্ করা জায়েয হবে?
আর ধুমপান করা কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ, ইজমাতে নিষেধ হয়নি বলে কি ইহা মাকরূহ তাহ্রীমি হবে না?
প্রকৃতপক্ষে শরীয়তের চারটি উসূলের যে কোন একটি দ্বারাই যে মাসয়ালা ছাবেত হবে সেটাই গ্রহণযোগ্য হবে। ইহাই আহ্লে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের ফতওয়া।
আযানে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নাম মোবারক শুনে অঙ্গুলী চুম্বন করে চোখে বুছা দেয়া সম্পর্কিত হাদীস শরীফ সহীহ্ মওকুফ ও সহীহ্ মরফু হাদীস শরীফ দ্বারা প্রমাণিত।
আর যদিও এর প্রমাণ কুরআন শরীফে প্রত্যক্ষভাবে উল্লেখ নেই কিন্তু পরোক্ষভাবে তা উল্লেখ আছে। যেমন, আল্লাহ্ পাক কুরআন শরীফের “সূরা আহ্যাবের” ৫৬নং আয়াত শরীফে বলেন,
ان الله وملئكته يصلون على النبى ياايها الذين امنوا صلوا عليه وسلموا تسليما.
অর্থঃ- “নিশ্চয়ই আল্লাহ্ পাক ও তাঁর ফেরেশ্তাগণ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি সালাত পাঠ করেন। হে ঈমানদারগণ! তোমরাও তাঁর প্রতি সালাত-সালাম পাঠ কর।”
এ আয়াত শরীফের তাফসীরে, “তাফসীরে রুহুল বয়ানের” ৭ম খন্ডের ২২৯ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,
উর্দু কম্পোজ করতে হবে
অর্থঃ- “হযরত নবী করীম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মসজিদে তাশ্রীফ এনে একটি স্তম্ভের নিকট বসেছিলেন, তাঁর পাশে হযরত আবূ বকর সিদ্দীক রদিয়াল্লাহু আনহুও বসেছিলেন। এর মধ্যে হযরত বেলাল রদিয়াল্লাহু আনহু আযান শুরু করেছিলেন, যখন اشهد ان محمدا رسول الله.
(আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ্)
উচ্চারণ করলেন তখন হযরত আবূ বকর সিদ্দীক রদিয়াল্লাহু আনহু আপন বৃদ্ধাঙ্গুলীদ্বয়ের নখ চুম্বন করে আপন দু’চোখের উপর রেখে বললেন,
قرة عينى بك يا رسول الله.
(কুররাতু আইনী বিকা ইয়া রাসূলাল্লাহ্)
অর্থঃ- “হে রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আপনি আমার চোখের মণি।”
হযরত বেলাল রদিয়াল্লাহু আনহু-এর আযান শেষ হওয়ার পর হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, হে আবূ বকর রদিয়াল্লাহু আনহু! আপনি যা করেছেন, যে ব্যক্তি তদ্রুপ করবে, আল্লাহ্ পাক তার সমূদয় গুণাহ্ মাফ করে দিবেন।” (সুবহানাল্লাহ্)
অনুরূপ উক্ত আয়াত শরীফের তাফসীরে, “তাফসীরে জালালাইন শরীফের” ৩৫৭ পৃষ্ঠার ১৩ নং হাশিয়ায় উল্লেখ আছে,
اعلم انه يستحب ان يقال عند سماع الاولى من الشهادة الثانية صلى الله عليك يا رسول الله وعند سماع الثانية قرة عينى بك يا رسول الله ثم يقال اللهم متعنى بالسمع والبصر بعد وضع ظفر الابهامين على العينين فانه صلى الله عليه وسلم قائدله الى الجنة.
অর্থঃ- “জেনে রাখ! আযানের সময় শাহাদাতে ছানিয়া অর্থাৎ আশহাদু আন্না মুহম্মাদার রাসূলুল্লাহ্ প্র্রথমবার শুনে صلى الله عليك يا رسول الله.
(ছল্লাল্লাহু আলাইকা ইয়া রাসূলাল্লাহ্) বলা এবং উক্ত শাহাদতের বাক্য দ্বিতীয়বার শুনে
قرة عينى بك يا رسول الله.
(র্কুরাতু আইনী বিকা ইয়া রাসূলাল্লাহ্) বলা মুস্তাহাব।
অতঃপর বৃদ্ধাঙ্গুলীদ্বয়ের নখ চুম্বন করে চোখের উপর রেখে اللهم متعنى بالسمع والبصر.
(আল্লাহুমা মাত্তি’নী বিস্সাময়ী ওয়াল বাছার) বলা মুস্তাহাব। এরূপ আমলকারীকে রাসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে বেহেশ্তে নিয়ে যাবেন।” (সুবহানাল্লাহ্)
উপরোক্ত আলোচনা থেকে এটাই ছাবেত হলো যে, আযানে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র নাম মোবারক শুনে বৃদ্ধাঙ্গুলীদ্বয়ের নখ চুম্বন করে চোখে লাগানোর প্রমাণ প্রত্যক্ষ ভাবে কুরআন শরীফে না থাকলেও পরোক্ষভাবে আছে বিধায় মুফাস্সিরীন-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিগণ
ان الله وملئكته يصلون على النبى ياايها الذين امنوا صلوا عليه وسلموا تسليما.
এই আয়াত শরীফের তাফসীরে অঙ্গুলী চুম্বনের আলোচনা এনেছেন।
আর আযানে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র নাম মোবারক শুনে বৃদ্ধাঙ্গুলীদ্বয় চুম্বন করে চোখে লাগানো বর্ণিত হাদীস শরীফখানা নিম্নে পেশ করা হলো-
قال رسول الله صلى الله عليه وسلم من سمع اسمى فى الاذان وهو وضع ابهاميه على عينيه فانا طالبه فى صفوف القيامة وقائده الى الجنة.
অর্থঃ- সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “যে ব্যক্তি আযানের সময় আমার নাম শুনলো এবং তার উভয় অঙ্গুলী দু’চোখের উপর রাখল, আমি তাকে ক্বিয়ামতের দিন কাতারের মধ্যে তালাশ করবো এবং তাকে বেহেশ্তে প্রবেশ করাবো।” (সুবহানাল্লাহ্) (ছালাতে নখশী)
দ্বিতীয়তঃ তারা বলেছে, “সহীহ্ হাদীস দ্বারা ……… কোন প্রমাণ নেই ……..।
এর জবাবে বলতে হয় যে, মাসিক রাহমানী পয়গামের উপরোক্ত বক্তব্যটিও ভুল হয়েছে। কারণ তার বক্তব্যটি প্রমাণ করে যে, তারা হাদীস শরীফ ও তার উসূল সম্পর্কে নেহায়েতই অজ্ঞ। কেননা আযানে অঙ্গুলী চুম্বন করা সম্পর্কিত হাদীস শরীফখানা সহীহ্ মরফু ও সহীহ্ মওকুফ হিসেবেও বর্ণিত রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে “মারাকিউল ফালাহ্”-এর ১৩৭ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,
وذكر الديلمى فى الفردوس من حديث ابى بكر رضى الله عنه مرفوعا من مسح العين بباطن انملة السابتين بعد تقبيلهما عند قول المؤذن اشهد ان محمدا رسول الله وقال اشهد ان محمدا عبده و رسوله ……… حلت له شفاعتى.
অর্থঃ- “ইমাম দায়লামী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর বিখ্যাত ও মশহুর হাদীস শরীফের কিতাব) “ফিরদাউস লিদ্ দায়লামীতে” হযরত আবূ বকর সিদ্দীক রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে মরফু হাদীস উল্লেখ করেন, “যে ব্যক্তি মুয়াজ্জিনের আযানের সময় আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ্ (ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শুনে অঙ্গুলী চুম্বন করে চোখে বুছা দিবে ….. তার জন্য আমার সুপারিশ ওয়াজিব।”
এছাড়াও ইমাম ছাখাবী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর “মাকাসিদুল হাসানা” কিতাবে, মুল্লা আলী ক্বারী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর “মওজুআতুল কবীর” কিতাবে এবং মুহাম্মদ তাহের ফাত্তানী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর “মাজমাউল বিহার” কিতাবে আযানের সময় অঙ্গুলী চুম্বন করা সম্পর্কিত হাদীস শরীফকে মরফু হিসেবে সহীহ্ বলে উল্লেখ করেছেন।
আর মুফতী আমীমুল ইহ্সান মুজাদ্দেদী বরকতী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর “ফতওয়ায়ে বরকতীয়ায়” উক্ত হাদীস শরীফকে “মওকুফ” হিসেবে সহীহ্ বলে উল্লেখ করেছেন।
সুতরাং মাসিক রাহমানী পয়গাম পত্রিকায় যে লিখেছে, ছহীহ্ হাদীস দ্বারা কোন প্রমাণ নেই তা উপরোক্ত দলীলের বর্ণনা দ্বারা সম্পূর্ণরূপে মিথ্যা বলে প্রমাণিত হলো।
তৃতীয়তঃ তারা বলেছে, “…… চার ইমামের কারো থেকে…. কোন প্রমাণ নেই।
হ্যাঁ, চার মাযহাবের ইমামের থেকে সরাসরি বর্ণনা না থাকলেও হানাফী মাযহাব ও অন্যান্য ফিক্বাহ্র কিতাবে উক্ত আমলের কথা ঠিকই বর্ণিত আছে। যেমন, হানাফী মাযহাবের বিখ্যাত ফিক্বাহ্র কিতাব, “বাহরুর রায়েক, মারাকিউল ফালাহ্, মুনীরুল আইন ফি তাকবীমুল ইবহামাইন, ফতওয়ায়ে শামী, কানযুল ইবাদ, কাহেস্তানী, ফতওয়ায়ে সুফীয়া, মাকাসিদুল হাসানাহ্, শরহে ইলিয়াস, জামেউর রুমুয, শরহে কবীর, মজমুয়ায়ে ফতওয়া, শরহে নেকায়া, মাজমাউল বিহার, সিরাতে হালাবিয়া, হুজ্জাতুল্লাহি আলাল আলামীন, ফতওয়ায়ে দেওবন্দ, আহসানুল ফতওয়া ইত্যাদি।”
এছাড়া শাফী মাযহাবের বিখ্যাত কিতাব, “ইয়ানাতুত্ ত্বালেবীন আলা হাল্লে আলফাজে ফাতহিল মুবীন” কিতাবে এবং মালেকী মাযহাবের বিখ্যাত কিতাব “কিফায়াতুত্ তলেবীর রব্বানী লেরেসালাতে আবি যায়েদেল কায়রুয়ানী।” কিতাবে আযানে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র নাম মোবারক শুনে বৃদ্ধাঙ্গুলীদ্বয়ের নখ চুম্বন করে চোখে লাগানোর প্রমাণ রয়েছে। সুতরাং আযানে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র নাম মোবারক শুনে বৃদ্ধাঙ্গুলীদ্বয়ের নখ চুম্বন করে চোখে লাগানের প্রমাণ মাযহাবের কিতাবে থাকার অর্থ হলো, চার মাযহাবের ইমামের থেকে থাকা।
উল্লেখ্য যে, মাসিক রাহমানী পয়গাম ও তার গংরা একখানা দলীল পেশ করতে পারবে কি যে, আযানে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র নাম মোবারক শুনে বৃদ্ধাঙ্গুলীদ্বয়ের নখ চুম্বন করে চোখে লাগানো কুরআন শরীফে নিষেধ করা হয়েছে? এবং একখানা জঈফ হাদীস শরীফ দ্বারা প্রমাণ করতে পারবে কি যে, হাদীস শরীফে উক্ত আমলকে নিষেধ করা হয়েছে? আর চার ইমামের থেকে নিষেধ কোন বাণী আছে কি যে, আযানে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র নাম মোবারক শুনে বৃদ্ধাঙ্গুলীদ্বয়ের নখ চুম্বন করে চোখে লাগাতে চার মাযহাবের ইমামগণ নিষেধ করেছেন? অর্থাৎ তারা কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ এবং চার ইমামের থেকে একখানা দলীলও পেশ করতে পারবে না যে, আযানে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র নাম মোবারক শুনে বৃদ্ধাঙ্গুলীদ্বয়ের নখ চুম্বন করে চোখে লাগানো নিষেধ করা হয়েছে।
চতুর্থতঃ তারা বলেছে, “……….. সুতরাং এ ধরণের কাজ বিদ্য়াত। যা থেকে বিরত থাকা জরুরী।
এর জবাবে বলতে হয় যে, মাসিক রাহমানী পয়গামের এ বক্তব্যও ভুল হয়েছে যা আমরা উপরে দলীল দ্বারা প্রমাণ করেছি যে, আযানে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র নাম মোবারক শুনে বৃদ্ধাঙ্গুলীদ্বয় চুম্বন করে চোখে বুছা দেয়া সুন্নত।
আর হযরত সাহাবা-ই-কিরাম রদিয়াল্লাহু আনহুগণের আমল বা কাজ যে সুন্নতের অন্তর্ভূক্ত। এ প্রসঙ্গে ফিক্বাহ্র বিখ্যাত কিতাব “তাহ্তাবীতে” উল্লেখ আছে,
والسنة ما فعل النبى صلى الله عليه وسلم او واحد من اصحابه.
অর্থঃ- “সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অথবা তাঁর সাহাবীগণের মধ্য হতে কোন একজন যে কাজ করেছেন তাই সুন্নত।”
আর হাদীস শরীফে স্বয়ং সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
عليكم بسنتى وسنة الخلفاء الراشدين المهديين تمسكوابها وعضوا عليها بالنواجذ.
অর্থঃ- “আমার সুন্নত এবং হেদায়েতপ্রাপ্ত হযরত খোলাফায়ে রাশেদীন (সাহাবা-ই-কিরাম)-এর সুন্নত পালন করা তোমাদের প্রতি ওয়াজিব। তোমরা তা মজবুত ভাবে মাড়ীর দাঁত দিয়ে আঁকড়ে ধর।” (মেশকাত শরীফ)
উপরোক্ত বর্ণনা থেকে এটাই সাবেত হলো যে, হযরত সাহাবা-ই-কিরাম রদিয়াল্লাহু আনহুগণের সুন্নতও অবশ্যই পালনীয়।
উল্লেখ্য যে, সুন্নত আমলকে সুন্নত মনে করেই আমল করতে হবে। কেননা প্রকৃত জ্ঞানীতো তারাই যারা ফরজকে ফরজ, ওয়াজিবকে ওয়াজিব, সুন্নতে মুয়াক্কাদাকে মুয়াক্কাদা, যায়েদাকে যায়েদা ও মুস্তাহাবকে মুস্তাহাব হিসেবে মেনে নেয়।
সুতরাং সুন্নত আমলকে বিদ্য়াত বলার অর্থই হচ্ছে হাদীস শরীফকে অস্বীকার করা যা সম্পূর্ণই কূফরী।
কাজেই উপরোক্ত দলীলভিত্তিক বর্ণনা দ্বারা এটাই প্রমাণিত হলো, মাসিক রাহমানী পয়গামের উক্ত বক্তব্য সম্পূর্ণরূপে মিথ্যা এবং সুন্নত আমলকে বিদ্য়াত বলার কারণে কুফরী হয়েছে।
অতএব কেউ যদি আল্লাহ্ পাক-এর রাসূল, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মহব্বতে তাঁর নাম মোবারক শুনে মহব্বতের সাথে অঙ্গুলীসমূহ চুম্বন করে চোখে বুছা দেয়, তা আযানে হোক, ইক্বামতে হোক অথবা অন্য কোন সময়ই হোক, তা অবশ্যই সওয়াবের কাজ এবং ফযীলত, বুযুর্গী ও মর্যাদা লাভের কারণ।
[বিঃদ্রঃ আরো বিস্তারিত জানতে হলে মাসিক আল বাইয়্যিনাত পত্রিকার ১ম বর্ষ তয় সংখ্যার” অঙ্গুলী চুম্বনের বিধান ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া পাঠ করুন।}
মুহম্মদ তছলিমুদ্দীন বসুনিয়া
কদমতলা, দলদলিয়া, উলিপুর।
সুওয়ালঃ- মাসিক মুঈনুল ইসলাম মে’২০০০ ঈঃ সংখ্যায় জিজ্ঞাসা-সমাধান বিভাগে ২৯৪২ নং জিজ্ঞাসার-সমাধানে বলা হয়েছে, “হযরত আবূ হুরাইরা (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত, রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, আমার উম্মতের মধ্যে যখন মূর্খতা প্রবলতার হবে, তখন যে ব্যক্তি আমার সুন্নাতকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরবে (অর্থাৎ আমার সুন্নাতসমূহের উপর আমল করবে), সে এক শত শহীদের সাওয়াব পাবে। (মিশকাত শরীফ-৩০ পৃঃ। এখানে বলা দরকার যে, হাদীসে ব্যবহৃত শব্দ “সুন্নাতী”-এর অর্থ অনেকেই ‘একটি সুন্নাত’ বলে করে থাকে। যেমনটি প্রশ্নেও উল্লেখ করা হয়েছে। এটি ভুল। সুন্নাত বলতে হুযুর ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সকল সুন্নাত তথা আদর্শকে বোঝানো হয়েছে।”
এখন আমার সুওয়াল হলো- মাসিক মুঈনুল ইসলাম মিশকাত শরীফের উল্লিখিত হাদীস শরীফখানার “সুন্নাতী” শব্দের যে অর্থ করেছে তা সঠিক হয়েছে কি? আর “সুন্নাতী” বলতে সত্যিই কি সকল সুন্নাতকে বুঝানো হয়েছে? দয়া করে সঠিক জাওয়াব দানে বাধিত করবেন।
জাওয়াবঃ- হাদীস শরীফে উল্লিখিত “সুন্নাতী” শব্দের অর্থ সম্পর্কে মাসিক মুঈনুল ইসলামের উক্ত বক্তব্য সঠিক হয়নি বরং ভুল হয়েছে যা সম্পূর্ণ-ই মনগড়া ও দলীলবিহীন। কারণ উক্ত হাদীস শরীফে “সুন্নাতী” বলতে শুধুমাত্র একটি সুন্নতকেই বুঝানো হয়েছে।
আলোচ্য হাদীস শরীফখানা হচ্ছে,
وعن ابى هريرة قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم من تمسك بسنتى عند فساد امتى فله اجر مأة شهيد.
অর্থঃ- “হযরত আবূ হুরায়রা রদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, আখেরী রাসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আমার উম্মতের ফিৎনা-ফাসাদের জামানায় যে ব্যক্তি আমার একটি সুন্নতকে মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরে থাকবে। বিনিময়ে সে একশত শহীদের সওয়াব পাবে।” (মেশকাত শরীফ)
উক্ত হাদীস শরীফের ব্যাখ্যায় মাহবুবে সুবহানী, গাউসে সামদানী, ইমামে রব্বানী, ক্বাইয়্যূমে আউয়াল, আফজালুল আউলিয়া, হযরত শায়খ আহমদ ফারুকী সিরহিন্দী মুজাদ্দিদে আল্ফে সানী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর “মাকতুবাত শরীফে” বলেছেন, “যে ব্যক্তি আখেরী রাসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসলীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পরিত্যাজ্য (লুপ্তপ্রায়) কোন একটি সুন্নতকে মৃত্যু পর্যন্ত আকঁড়ে ধরবে অর্থাৎ আমল করবে বিনিময়ে সে একশত শহীদের সওয়াব পাবে।”
সুতরাং سنتى (সুন্নতী) দ্বারা শুধুমাত্র একটি মাত্র সুন্নতকে বুঝানো হয়েছে।
অথচ মাসিক মুঈনুল ইসলাম বলেছে, “সুন্নাত বলতে …. সকল সুন্নাতকে বুঝানো হয়েছে।”
এর জবাবে বলতে হয় যে, যদি সুন্নত বলতে আখেরী রাসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সকল সুন্নতকে ধরে নেয়া হয় তাহলে প্রশ্ন এসে যায় যে, আখেরী রাসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসলীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সকল সুন্নত পালন করা কোন মানুষের পক্ষে সম্ভব হবে কি?
এর জবাব হলো, সকল সুন্নাত পালন করা কোন মানুষের পক্ষেই সম্ভব নয়। তাহলে সকল সুন্নাত পালন করার বিনিময়ে একশত শহীদের সওয়াব পাওয়া কি করে সম্ভব হতে পারে?
উল্লেখ্য, একটি সুন্নত পালনের বিনিময়ে একশত শহীদের ছওয়াব তখনই পাবে যখন ফিৎনা-ফাসাদের জামানায় সুন্নতটি পালন করা হবে। আর ফিৎনা-ফাসাদের জামানা বলতে আখেরী জামানাকে বুঝানো হয়েছে। আর আখেরী জামানা সম্পর্কে হযরত মুজাদ্দিদে আল্ফে সানী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর “মাকতুবাত শরীফে” বলেছেন যে, “এক হাজার হিজরীর পর হচ্ছে- আখেরী জামানা।” আখেরী জামানায় ফিৎনা-ফাসাদ, ফিস্ক-ফুজুরী, মূর্খতা-অজ্ঞতা,বিদ্য়াত-বেশরা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়বে। এমনকি হক্ব-না হক্বের সংমিশ্রণে মানুষের পক্ষে প্রকৃত সুন্নত কোনটি তা জেনে আমল করাই কেবল দুঃসাধ্য হবে তা নয় বরং ফরজ পালন করার ক্ষেত্রেও অনেক বাধার সম্মূখীন হবে, অনেক কষ্ট-তাকলীফ ও কঠিনতর হবে।
সুতরাং ফিৎনা-ফাসাদের যুগে ফরজ পালনই যদি এত কঠিন হয় তাহলে সুন্নত পালন কত কঠিন হবে? তাও আবার সমস্ত সুন্নত! তবে কি উক্ত হাদীস শরীফে বর্ণিত সুন্নত পালনের ফযীলত মানুষ পাবে না?
হ্যাঁ, অবশ্যই পাবে। মূলতঃ এ ফযীলত ঐ ব্যক্তি হাছিল করবে যে ব্যক্তি একটিমাত্র সুন্নতকে দায়েমীভাবে তার মৃত্যু পর্যন্ত পালন করবে। এটাই হাদীস শরীফের সঠিক ব্যাখ্যা।
অতএব, সুন্নত দ্বারা সকল সুন্নতকে বুঝানো হয়নি বরং শুধুমাত্র একটি সুন্নতকেই বুঝানো হয়েছে। আর মাসিক মুঈনুল ইসলাম যে বলেছে, সুন্নাত বলতে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সকল সুন্নাতকে বুঝানো হয়েছে। তাদের এ বক্তব্য ভুল বলেই প্রমাণিত হলো।
{দলীলসমূহঃ- (১) বায়হাক্বী শরীফ, (২) মেশকাত শরীফ, (৩) আবূ দাউদ শরীফ, (৪) তিরমিযী শরীফ, (৫) আহমদ, (৬) মেরকাত, (৭) আশরাফুত তাওজীহ্, (৮) শরহুত্ ত্বীবী, (৯) আশয়াতুল লুময়াত, (১০) তানজীমুল আশতাত, (১১) তালিকুছ্ ছবী, (১২) মিরআতুল মানাজীহ্, (১৩) মোযাহেরে হক্ব,(১৪) মকতুবাত শরীফ ইত্যাদি}
মুহম্মদ আবূ ইয়াকুব ইছহাক (রাসেল)
সভাপতি- ছাত্র আঞ্জুমানে আল বাইয়্যিনাত
শেরপুর শাখা, শেরপুর।
সুওয়ালঃ- অনেকে ইয়াযিদকে দোষারোপ করতে গিয়ে হযরত মুয়াবিয়া রদিয়াল্লাহু আনহুসহ আরো অনেক হযরত সাহাবা-ই-কিরাম রদিয়াল্লাহু আনহুমকে দোষারোপ করে থাকে। শরীয়তের দৃষ্টিতে ইহা কিধরণের অপরাধ? দলীলসহ জানতে ইচ্ছুক।
জাওয়াবঃ- সমস্ত আকাইদের কিতাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আহ্লে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের আক্বীদা মোতাবেক হযরত সাহাবা-ই-কিরাম রদিয়াল্লাহু আনহুমকে কোন বিষয়ে দোষারোপ করা অথবা তাঁদের সমালোচনা করা সম্পূর্ণ নাজায়েয ও কুফরীর অন্তর্ভূক্ত।
এ প্রসঙ্গে হাদীস শরীফে উল্লেখ আছে যে,
الله الله فى اصحابى لا تتخذوهم غرضا من بعدى فمن احبهم فبحبى احبهم ومن ابغضهم فببغضى ابغضهم ومن اذاهم فقد اذانى ومن اذانى فقد اذى الله ومن اذى الله فيوشك ان يأخذه.
অর্থঃ- “সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আমার সাহাবা-ই-কিরাম রদিয়াল্লাহু আনহুমগণ সম্পর্কে আল্লাহ্ পাককে ভয় কর। আমার ওফাত মোবারকের পরে তাঁদেরকে তোমরা তিরস্কারের লক্ষ্যস্থল করনা। যে ব্যক্তি তাঁদেরকে মুহব্বত করলো, সে আমার প্রতি মুহব্বত করার কারণেই করলো। আর যে ব্যক্তি তাঁদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করলো, সে আমার প্রতি বিদ্বেষ পোষন করার কারণে তা করলো। আর যে ব্যক্তি তাঁদেরকে কষ্ট দিল, সে যেন আমাকেই কষ্ট দিল। আর যে ব্যক্তি আমাকে কষ্ট দিল মূলতঃ আল্লাহ্ পাককেই কষ্ট দিল। আর যে আল্লাহ্ পাককে কষ্ট দিবে, আল্লাহ্ পাক তাকে অতি শীঘ্রই পাকড়াও করবেন।” (তিরমিযী, মেশকাত, তোহফাতুল আহ্ওয়াযী, মাআরেফুল সুনান, উরফুশ্ শাজী, মেরকাত, আশয়াতুল লুময়াত, লুময়াত, শরহুত্ ত্বীবী, তা’লীকুছ ছবীহ্, মোযাহেরে হক্ব ইত্যাদি)
আর এ প্রসঙ্গে কালামুল্লাহ্ শরীফে এরশাদ হয়েছে যে,
ان الذين يؤذون الله و رسوله لعنهم الله فى الدنيا والاخرة واعد لهم عذابا مهينا.
অর্থঃ- “নিশ্চয়ই যারা আল্লাহ্ পাক ও তাঁর রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কষ্ট দেয়, দুনিয়া ও আখিরাতে তাদের প্রতি আল্লাহ্ পাক-এর অভিসম্পাত এবং তাদের জন্য নির্ধারিত রয়েছে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি। (সূরা আহযাব/৫৭)
উপরোক্ত হাদীস শরীফ ও আয়াত শরীফ দ্বারা এটাই প্রমাণিত হয় যে, হযরত সাহাবা-ই-কিরাম রদিয়াল্লাহু আনহুমগণের প্রতি বিদ্বেষ পোষন করা, তিরস্কার করা, সমালোচনা করা, গালি দেয়া ইত্যাদি সবই আল্লাহ্ পাক ও তাঁর রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কষ্ট দেয়ারই শামীল। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ্ পাক ও তাঁর রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কষ্ট দিবে সে ব্যক্তি ইহ্কালে লা’নতগ্রস্থ হবে আর পরকালে পাকড়াও হয়ে চরমভাবে লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়ে জাহান্নামের ইন্ধন হবে। শুধু তাই নয়, এ ধরণের লোকদের প্রতি লা’নতের বদ্দোয়া করার নির্দেশও দেয়া হয়েছে।
যেমন হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে,
عن عبد الله بن عمر قال رسول الله صلى الله عليه وسلم اذا رأيتم الذين يسبون اصحابى فقولوا لعنة الله على شركم.
অর্থঃ- “হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে ওমর রদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যখন তোমরা দেখ যে, কেউ আমার সাহাবা-ই-কিরাম রদিয়াল্লাহু আনহুমগণকে গালি দিচ্ছে। তখন তোমরা বল- তোমার এ জঘন্যতম কাজের জন্য তোমার প্রতি আল্লাহ্ পাক-এর লা’নত।” (তিরমিযী, মেশকাত, তোহফাতুল আহ্ওয়াযী, মাআরেফুল সুনান, উরফুশ্ শাজী, মেরকাত, আশয়াতুল লুময়াত, লুময়াত, শরহুত্ ত্বীবী, তা’লীকুছ ছবীহ্, মোযাহেরে হক্ব ইত্যাদি)
আর তাই হাদীস শরীফে সুস্পষ্ট ভাষায় ঘোষিত হয়েছে,
فمن سبهم فعليه لعنة الله والملائكة والناس اجمعين ولا يقبل الله منه صرفا ولا عدلا.
অর্থঃ- “যে ব্যক্তি হযরত সাহাবা-ই-কিরাম রদিয়াল্লাহু আনহুগণকে গালি দেয়, তাদের প্রতি শুধু আল্লাহ্ পাক-এর লান’ত নয় বরং ফেরেশ্তা, মানুষ এমনকি সকল মাখলুকাতের পক্ষ থেকেই তাদের প্রতি লা’নত বর্ষিত হয়। (যার ফলে) তাদের কোন ফরজ ও নফল ইবাদত আল্লাহ্ পাক কবুল করেন না।” (মোযাহেরে হক্ব)
অতএব, প্রমাণিত হলো যে, হযরত সাহাবা-ই-কিরাম রদিয়াল্লাহু আনহুমগণের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা, তাঁদের কোন প্রকার সমালোচনা করা, তাঁদেরকে নাক্বেছ বা অপূর্ণ বলা, তাঁদেরকে অর্থলোভী ইত্যাদি অশালীন ভাষায় গালি দেয়া হারাম ও নাজায়েয। সাথে সাথে আল্লাহ্ পাক ও তাঁর রাসূল, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামসহ সকল মাখলুকাতের পক্ষ হতে লা’নত বর্ষণের কারণ। যা জাহান্নামী হওয়ার কারণও বটে।
স্মর্তব্য যে, হযরত সাহাবা-ই-কিরাম রদিয়াল্লাহু আনহুমগণের ইজ্তিহাদ ও তাঁদের পরস্পরের মধ্যে ইখতিলাফ বা মতবিরোধ প্রত্যেকটাই বিশুদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য এবং খাছ রহমত স্বরূপ। যার প্রমাণ কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফে স্পষ্ট বিদ্যমান।
যেমন, কুরআন শরীফে আল্লাহ্ পাক বলেন,
قل كل يعمل على شاكلته فربكم اعلم بمن هو اهدى سبيلا.
অর্থঃ- আপনি বলুন, প্রত্যেকেই তাঁর অভ্যাস অনুযায়ী কাজ করে, তবে তোমাদের রব ভালো জানেন, কে অধিক সুপথে।” (সূরা বণী ইস্রাঈল/৮৪)
এ আয়াত শরীফের পরিপ্রেক্ষিতে মুফাস্সিরীনে কিরামগণ বলেন, পথ দু’টি। একটি হলো- সুপথ, অন্যটি হলো- অধিক সুপথ।
কাজেই হযরত সাহাবা-ই-কিরাম রদিয়াল্লাহু আনহুমগণের মধ্যে ইজ্তিহাদের ক্ষেত্রে পরস্পর যে ইখতিলাফ দেয়া দিয়েছে, তার মধ্যে উভয়েই হক্বের উপর ছিলেন। তবে কেউ অধিক হক্বের উপর, আর কেউ হক্বের উপর, কেউই না হক্বের উপর ছিলেন না। যার প্রমাণ হাদীস শরীফেও রয়েছে।
যেমন হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে,
عن عمر بن الخطاب رضى الله عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم سألت ربى عن اختلاف اصحابى من بعدى فاوحى الى يا محمد ان اصحابك عندى بمنزلة النجوم بعضها اقوى من بعض لكل نور فمن اخذ بشئى مماهم عليه من اختلافهم فهو عندى على هدى فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم اصحابى كالنجوم بايهم اقتديتم اهتديتم.
অর্থঃ- “হযরত ওমর ইবনুল খত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন, আমি আমার ওফাতের পর আমার সাহাবা-ই-কিরাম রদিয়াল্লাহু আনহুমগণের ইখতিলাফ (মত বিরোধ) সম্পর্কে আল্লাহ্ পাককে জিজ্ঞাসা করেছি। আল্লাহ্ পাক আমাকে বললেন, “হে হাবীব! (ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিশ্চয়ই আপনার সাহাবা-ই-কিরাম রদিয়াল্লাহু আনহুমগণ আমার নিকট তারকা সমতুল্য। কারো আলোর চেয়ে কারো আলো বেশী, তবে প্রত্যেকেরই আলো রয়েছে। সুতরাং তাঁদের যে কোন ইখতিলাফকে যারা আকঁড়িয়ে ধরবে, তারা হিদায়েত পেয়ে যাবে। কারণ তাঁদের ইখতিলাফগুলো আমার নিকট হিদায়েত হিসেবে গণ্য। আর তাই রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন, আমার সাহাবা-ই-কিরাম রদিয়াল্লাহু আনহুমগণ (প্রত্যেকেই) তারকা সাদৃশ্য, তাঁদের যে কাউকে তোমরা অনুসরণ করবে, হিদায়েত প্রাপ্ত হবে।” (রজীন, মেশকাত, মেরকাত, লুময়াত, আশয়াতুল লুময়াত, শরহুত্ ত্বীবী, তা’লীকুছ্ ছবীহ্, মোযাহেরে হক্ব, মিরাআতুল মানাজীহ্ ইত্যাদি)
অতএব, বুঝা গেল যে, হযরত সাহাবা-ই-কিরাম রদিয়াল্লাহু আনহুগণের ইখতিলাফও হিদায়েতের কারণ ছিল এবং আল্লাহ্ পাক-এর নিকটও তা গ্রহণযোগ্য।
উল্লেখ্য, কিছু লোক রয়েছে, যারা কুরআন-সুন্নাহ্র প্রতি অজ্ঞতাহেতু, হযরত সাহাবা-ই-কিরাম রদিয়াল্লাহু আনহুমগণের অশেষ ও অবর্ণনীয় মর্যাদা-মর্তবা, অনুধাবনে ব্যর্থ হয়ে এবং কিছু সংখ্যক ইসলাম ও সাহাবী বিদ্বেষী ঐতিহাসিকদের কুরআন-সুন্নাহ্ বিরোধী, মনগড়া ইতিহাস পাঠ করে, সে সব ভ্রান্ত দলীল দিয়ে আল্লাহ্ পাক ও তাঁর রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সবচেয়ে অধিক প্রিয় পাত্র, ন্যায়ের মূর্ত প্রতীক, সত্যের চরম নির্দশন, হক্বের পূর্ণ মাপকাঠি, দ্বীন ইসলামের ভিত্তি স্থাপনকারী এবং আল্লাহ্ পাক-এর সন্তুষ্টি ও জান্নাতের সুসংবাদ প্রাপ্ত, সম্মানিত, হযরত সাহাবা-ই-কিরাম রদিয়াল্লাহু আনহুমগণের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে, সমালোচনা করে, তিরস্কার করে ও অশালীন ভাষায় গালি দিয়ে থাকে। মূলতঃ এ সকল লোক যেরূপ আল্লাহ্ পাক ও তাঁর রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শত্রু, তদ্রুপ দ্বীন ইসলামের শত্রু। এদের ব্যাপারে সতর্ক থাকা প্রত্যেকেরই দায়িত্ব ও কর্তব্য।
মূলকথা হলো, আল্লাহ্ পাক ও তাঁর রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত সাহাবা-ই-কিরাম রদিয়াল্লাহু আনহুমগণের অশেষ ও সীমাহীন মর্যাদা-মর্তবা বর্ণনা করেছেন। যা কুরআন শরীফ ও হাদীস শরীফের প্রায় সর্বত্র সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। তন্মধ্যে নিম্নোক্ত আয়াত শরীফখানাই আক্বলমন্দের জন্যে, হযরত সাহাবা-ই-কিরাম রদিয়াল্লাহু আনহুমগণের মর্যাদা-মর্তবা অনুধাবনে যথেষ্ট। যেমন আল্লাহ্ পাক এরশাদ করেন,
والسابقون الاولون من المهاجرين والانصار والذين اتبعوهم باحسان رضى الله عنهم ورضوا عنه واعدلهم جنت تجرى تحتها الانهار خالدين فيها ابدا ذالك الفوز العظيم.
অর্থঃ- “(ঈমান ও আমলে) সর্বপ্রথম স্থান অধিকারী আনছার ও মুহাজির অর্থাৎ হযরত সাহাবা-ই-কিরাম রদিয়াল্লাহু আনহুমগণ এবং উত্তমভাবে উক্ত সাহাবা-ই-কিরাম রদিয়াল্লাহু আনহুমগণের অনুসরণকারী সকলের প্রতিই আল্লাহ্ পাক সন্তুষ্ট এবং তাঁরাও আল্লাহ্ পাক-এর প্রতি সন্তুষ্ট। হযরত সাহাবা-ই-কিরাম রদিয়াল্লাহু আনহুম ও তাঁদের অনুসারীদের জন্য আল্লাহ্ পাক এরূপ বেহেশ্ত নির্ধারণ করে রেখেছেন, যার তলদেশ দিয়ে ঝর্ণা প্রবাহিত হতে থাকবে, তারা চিরদিন সে বেহেশ্তে অবস্থান করবেন, যা তাঁদের বিরাট সফলতা।” (সূরা তওবা/১০০)
এ আয়াত শরীফ দ্বারা প্রমাণিত হলো যে, হযরত সাহাবা-ই-কিরাম রদিয়াল্লাহু আনহুমগণের সকলের প্রতিই আল্লাহ্ পাক পূর্ণ সন্তুষ্ট এবং তাঁরা সকলেই নিশ্চিত জান্নাতী। শুধু তাই নয়, সাথে সাথে যারা তাঁদেরকে অর্থাৎ হযরত সাহাবা-ই-কিরাম রদিয়াল্লাহু আনহুমগণকে উত্তমভাবে অনুসরণ করবে, তাঁদের প্রতিও আল্লাহ্ পাক তদ্রুপ সন্তুষ্ট এবং তাদের জন্যও তদ্রুপ বেহেশ্ত নিশ্চিত।” (সুবহানাল্লাহ্)
আর তাই হাদীস শরীফে হযরত সাহাবা-ই-কিরাম রদিয়াল্লাহু আনহুমগণের মর্যাদা-মর্তবা যথাযথভাবে অবগত হয়ে, তাঁদের ইখলাছের সাথে পরিপূর্ণ অনুসরণ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে,
عن عبد الله بن مسعود قال من كانمستنا فليستن بمن قد مات فان احى لا تؤمن عليه الفتنة اولئك اصحاب محمد صلى الله عليه وسلم كانوا افضل هذه الامة ابرها قلوبا واعمقها علما واقلها تكلفا اختارهم الله لصحبة نبيه ولاقامة دينه فاعرفوالهم فضلهم واتبعواهم على اثرهم وتمسكوا بما استطعتم من اخلاقهم وسيرهم فانهم كانوا على الهدى المستقيم.
অর্থঃ- “হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যে ব্যক্তি শরীয়তের সঠিক তরীক্বা অনুসরণ করতে চায়। তার উচিত হযরত মুহম্মদ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রিয় সাহাবা-ই-কিরাম রদিয়াল্লাহু আনহুমগণের অনুসরণ করা। সাহাবা-ই-কিরাম রদিয়াল্লাহু আনহুগণই উম্মতের মধ্যে সর্বোত্তম, তাঁরা আত্মার দিক দিয়ে অধিক পবিত্র, ইল্মের দিক দিয়ে গভীর ইল্মের অধিকারী, তাঁরা লোক দেখানো কোন আমল করতে জানেন না। আল্লাহ্ পাক তাঁদেরকে দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথী হিসেবে মনোনীত করেন। সুতরাং তাঁদের মর্যাদা-মর্তবা, ফাযায়েল-ফযীলত, শান-শওকত সম্পর্কে অবগত হও এবং তাঁদের কথা ও কাজের অনুসরণ কর এবং যথা সম্ভব তাঁদের সীরত-সূরতকে গ্রহণ কর, কারণ তাঁরা হিদায়েত ও সিরাতুল মুস্তাকীম-এর উপর দৃঢ়চিত্ত ছিলেন।” (রজীন, মেশকাত, মেরকাত, লুময়াত, আশয়াতুল লুময়াত, তা’লীক্ব, শরহুত্ ত্বীবী, মোযাহেরে হক্ব, ইত্যাদি)
এখন প্রশ্ন হলো- যাঁদের প্রতি আল্লাহ্ পাক স্বয়ং সন্তুষ্ট, যাঁদের জন্য জান্নাত নিশ্চিত, যাঁদের অনুসরণকারীগণও আল্লাহ্ পাক-এর সন্তুষ্টি ও জান্নাতপ্রাপ্ত, যাঁরা সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বোত্তম উম্মত, যাঁরা আত্মার দিক দিয়ে অধিক পবিত্র, যাঁরা গভীর ইল্মের অধিকারী, যাঁদের অন্তর ইখলাছে পরিপূর্ণ, যাঁদেরকে দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাহাবী মনোনীত করা হয়েছে, যাঁরা সিরাতুল মুস্তাক্বীমের উপর দৃঢ়, যাঁদের সীরত-সূরতকে অনুসরণ করার জোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সেখানে তাঁদের প্রতি বিদ্বেষ পোষন করা, তাঁদের কোন প্রকার সমালোচনা করা, তাঁদেরকে নাক্বেছ বা অপূর্ণ বলা, তাঁদেরকে তিরস্কার করা, তাঁদেরকে গালি দেয়া, তাঁদের সম্পর্কে অশ্লীল ও অশালীন ভাষা কি করে ব্যবহার করা যেতে পারে?
মূলতঃ যে ব্যক্তিই এরূপ আমল করবে ও আক্বীদা পোষণ করবে, সে ব্যক্তি অবশ্যই ঈমান হারা হয়ে যাবে।
কারণ আল্লাহ্ পাক-এর রাসূল, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
لا تسبوا اصحابى فلو ان احدكم انفق مثل احد ذهبا ما بلغ مد احدهم ولانصيفه.
অর্থঃ- “আমার সাহাবা-ই-কিরাম রদিয়াল্লাহু আনহুগণকে তোমরা গালী দিওনা, আমার সাহাবা-ই-কিরাম রদিয়াল্লাহু আনহুমগণ এক মুদ্ বা অর্ধ মুদ্ গম আল্লাহ্ পাক-এর রাস্তায় দান করে যে ফযীলত অর্জন করেছেন, তোমরা উহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণ দান করেও তার সমান ফযীলত হাছিল করতে পারবে না।” (বুখারী, মেশকাত, মেরকাত, লুময়াত, আশয়াতুল লুময়াত, মোযাহেরে হক্ব, ইত্যাদি)
এ হাদীস শরীফে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, হযরত সাহাবা-ই-কিরাম রদিয়াল্লাহু আনহুমগণকে গালি দিতে সম্পূর্ণরূপে নিষেধ করে দিয়েছেন।
উপরোক্ত আয়াত শরীফ ও হাদীস শরীফ দ্বারা এটাই প্রমাণিত হয় যে, হযরত সাহাবা-ই-কিরাম রদিয়াল্লাহু আনহুমগণকে কোন অবস্থাতে গালী দেয়া তো যাবেই না বরং কোন প্রকার অশোভনীয়, অপছন্দনীয় শব্দ দ্বারা সম্বোধনও করা যাবেনা। এরূপ করলে আল্লাহ্ পাক ও তাঁর রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কষ্টের কারণ হবে। আর যে তা করবে, সে লা’নতের উপযুক্ত হবে।
আর জলীলুল কদর সাহাবী হযরত ময়াবিয়া রদিয়াল্লাহু আনহু-এর ক্ষেত্রেও ঠিক একই কথা প্রযোজ্য হবে।
আমীরুল মু’মিনীন ফিল হাদীস হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে মোবারক রহমতুল্লাহি আলাইহিকে জিজ্ঞাসা করা হলো যে,
ايما افضل معاوية او عمر بن عبد العزيز فقال والله لغبار الذى دخل انف فرس معاوية مع رسول الله صلى الله عليه وسلم خير من مأة واحد مثل عمر بن عبد العزيز.
অর্থঃ- “হযরত মুয়াবিয়া রদিয়াল্লাহু আনহু শ্রেষ্ঠ, না হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজীজ রহমতুল্লাহি আলাইহি শ্রেষ্ঠ? তিনি বললেন, আল্লাহ্ পাক-এর কসম! হযরত মুয়াবিয়া রদিয়াল্লাহু আনহু যখন হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে ঘোড়ায় চড়ে জ্বিহাদে যেতেন, তখন ঘোড়ার নাকে যে ধুলোবালিগুলো প্রবেশ করতো সে ধুলোবালিগুলোও শত শত হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজীজ রহমতুল্লাহি আলাইহি হতে বহুগুণে শ্রেষ্ঠ। (সুবহানাল্লাহ্) (ফতওয়ায়ে হাদীসিয়াহ্)
আর তাই হযরত ইমামে আযম আবূ হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর বিশ্ববিখ্যাত আকাইদের কিতাবে উল্লেখ করেন,
لا نذكر احدا من اصحاب رسول الله صلى الله عليه وسلم الا بخير.
অর্থঃ- “আমরা হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রত্যেক সাহাবা-ই-কিরাম রদিয়াল্লাহু আনহুকেই সুধারণার সাথে স্মরণ করি।” (ফিক্বহুল আকবর)
উপরোক্ত কুরআন-সুন্নাহ্র আলোচনা দ্বারা এটাই প্রমাণিত হলো যে, হযরত সাহাবা-ই-কিরাম রদিয়াল্লাহু আনহুমগণের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা, তাঁদের কোন প্রকার সমালোচনা করা, তাঁদেরকে নাক্বেছ বা অপূর্ণ বলা, তাঁদেরকে তিরস্কার করা, তাঁদেরকে গালি দেয়া, তাঁদের সম্পর্কে অশ্লীল ও অশালীন ভাষা ব্যবহার করা ইত্যাদি প্রতিটি কাজই নাজায়েয, হারাম ও কুফরীর অন্তর্ভূক্ত। যারা এর মধ্যে কোন একটিতেও জড়িত থাকবে তারা শরীয়তের ফায়সালা মোতাবেক ঈমানদার থাকতে পারবে না। অর্থাৎ কাফির হয়ে যাবে।
অতএব, সমস্ত মুসলমানদের দায়িত্ব ও কর্তব্য হলো- তারা যেন হযরত সাহাবা-ই-কিরাম (রাঃ-গণ সম্পর্কে তথা জলীলুল কদর সাহাবী হযরত মুয়াবিয়া রদিয়াল্লাহু আনহু সম্পর্কে উল্লিখিত কুফরী আক্বীদাসমূহ থেকে বেঁচে নিজেদের ঈমান হিফাজত করে।
{দলীলসমূহঃ- (১) আহ্কামুল কুরআন জাস্সাস, (২) কুরতুবী, (৩) রুহুল মা’য়ানী, (৪) খাযেন, (৫) বাগবী, (৬) ইবনে কাছির, (৭) মাযহারী, (৮) বুখারী শরীফ, (৯) তিরমীযী শরীফ, (১০) মেশকাত শরীফ, (১১) ফতহুল বারী, (১২) উমদাতুল ক্বারী, (১৩) আইনী, (১৪) তোহ্ফাতুল আহওয়াযী, (১৫) শরহে নববী, (১৬) মেরকাত, (১৭) আশয়াতুল লুময়াত, (১৮) লুময়াত, (১৯) মা’য়ারেফস্ ুসুনান, (২০) ওরফুস্ সাজী, (২১) রাযীন, (২২) শরহুত্ ত্বীবী, (২৩) তালীকুছ্ ছবী, (২৪) মোযাহেরে হক্ব, (২৫) মেরয়াতুল মানাজীহ্, (২৬) ফতয়ায়ে হাদীসিয়া, (২৭) ফিকহুল আকবর ইত্যাদি}
ডাঃ ফারুক আহমদ
ঢাকা সেনানিবাস, ঢাকা।
সুওয়ালঃ- নিঃসন্তান মুসিলম দম্পত্তি। কতদিন যাবৎ বিবাহিত উল্লেখ নাই। সন্তানের জন্য স্বাভাবিক সময় ধরিয়া চেষ্টা ও অপেক্ষা ব্যর্থ হইয়াছে। উভয়ে নিজেদের একটি সন্তানের জন্য ব্যাকুল। স্বামী উৎপাদনে অক্ষম। স্ত্রী স্বাভাবিক। অনাত্মীয়/অপরিচিত মুসলিম/অমুসলিম পুরুষের নিকট হইতে বীর্য সংগ্রহ করিয়া হইলেও স্ত্রী সন্তান ধারণে আগ্রহী। স্বামীর সম্মতি আছে।
এই ব্যাপারে ইসলামের বিধান কি?
জাওয়াবঃ- মুসলমান হিসেবে জীবন-যাপনের জন্য পূর্ণাঙ্গ দ্বীন, সঠিক ইল্ম ও শিক্ষা এবং উত্তম আদর্শ কুরআন-সুন্নাহ্তে বর্ণিত রয়েছে। সেই আর্দশ মোতাবেকই প্রত্যেক মুসলমানেরই জীবন পরিচালনা করা দায়িত্ব ও কর্তব্য। তাই ইসলামী শরীয়তে বেগানা পুরুষের দ্বারা সরাসরি মিলন ঘটিয়ে অথবা টেষ্টটিউব পদ্ধতিতে বেগানা পুরুষের বীর্য দ্বারা সন্তান ধারণ করা সম্পূর্ণ নাজায়েয ও হারাম।
কোন স্ত্রী যদি বিবাহিত স্বামী ব্যতীত অন্য কারো মাধ্যমে সরাসরি হোক অথবা টেষ্টটিউবের মাধ্যমেই হোক সন্তান ধারণ করে তাহলে সেই সন্তান বৈধ হবে না। বরং তা যিনার সন্তান হিসেবে সাব্যস্ত হবে আর কাজটি যিনার অর্ন্তভুক্ত হবে। যা কবীরা গুণাহ্র শামীল। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ পাক বলেন,
ولا تقربوا الزنى انه كان فاحشة وساء سبيلا.
অর্থঃ- “তোমরা যিনার নিকটবর্তী হয়োনা। নিশ্চয়ই এটা অশ্লীল এবং নিকৃষ্ট পথ (অবৈধ পদ্ধতি)।” (সূরা বণী ইসরাঈল/৩২)
আল্লাহ পাক যিনার নিকটবর্তী হতে নিষেধ করেছেন এবং একে একটা নিকৃষ্ট পন্থা বা পদ্ধতি বলে উল্লেখ করেছেন। যিনার প্রকারভেদ প্রসঙ্গে হাদীস শরীফে উল্লেখ করা হয়েছে,
العينان زناهما النظر والاذنان زناهما الاستماع واللسان زناه الكلام واليدان زناهما البطش والرجلان زناهما الخط والقلب يهوى ويتمنى ويصدق ذالك الفرج ويكذبه.
অর্থঃ- “চোখের যিনা হলো দৃষ্টি করা, কানের যিনা হলো শ্রবণ করা, জবানের যিনা হলো কথা বলা, হাতের যিনা হলো স্পর্শ করা, পায়ের যিনা হলো ধাবিত হওয়া, অন্তর তা চেয়ে থাকে ও আকাঙ্খা করে থাকে আর লজ্জাস্থান তা সত্য কিংবা মিথ্যায় পরিণত করে।”
অর্থাৎ যিনা অনেক প্রকার রয়েছে। সর্বপ্রকার যিনা থেকেই বেঁচে থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
কারণ যিনাকারী ও যিনাকারিনীদের কঠিন শাস্তির কথা স্বয়ং আল্লাহ পাক নিজেই কুরআন শরীফে উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ পাক বলেন,
الزانية والزانى فاجلدوا كل واحد منهما مأة جلدة.
অর্থঃ- যিনাকারিনী ও যিনাকারী (অবিবাহিত ও অবিবাহিতা হলে) প্রত্যেককেই একশ দোররা বেত মারতে হবে। (সূরা নূর/২)
আর যদি বিবাহিত ও বিবাহিতা হয় তাদের শাস্তি সম্পর্কে হাদীস শরীফ ও তাফসীরের কিতাবে উল্লেখ করা হয়েছে,
الشيخ والشيخة اذا زنيا فارجموهما البتة نكالا من الله.
অর্থঃ- “যিনাকারী ও যিনাকারিনী (বিবাহিত ও বিবাহিতা হলে) তাদের দু’জনকেই রজম (পাথর মেরে) করে মৃত্যুদন্ড দাও। এটা আল্লাহ পাক এর পক্ষ হতে শাস্তি।
কাজেই সুওয়ালে বর্ণিত আমলকারী কঠিন শাস্তি ও আযাব-গযবের উপযুক্ত হবে। তার ইহকাল ও পরকাল বরবাদ হবে। এছাড়া উক্ত সন্তান তার পিতৃ পরিচয় থেকেও মাহরূম থাকবে। অর্থাৎ এই সন্তান যার রেহেমে জন্মগ্রহণ করল তার স্বামী তার পিতা নয়। আর এ স্বামীর ওয়ারিশও সে হবে না। কেননা এ সন্তান এ স্বামীর নয়।
উল্লেখ্য যে, জাহেলিয়াতের যুগে কোন বংশের লোকেরা তাদের বংশে শক্তিশালী সন্তানের জন্য বা তীক্ষè মেধা সম্পন্ন সন্তানের জন্য অথবা বিশেষ কোন গুণে গুণান্বিত সন্তানের জন্য তাদের বংশের বিবাহিতা মেয়েদেরকে উক্ত যোগ্যতা সম্পন্ন পুরুষদের নিকট রাত্রি যাপনের জন্য পাঠাত। যাতে উক্ত পুরুষের সংস্পর্শে এসে উক্ত মহিলা যেন উল্লিখিত গুণ সম্পন্ন সন্তান ধারণ করে যা সম্পূর্ণরূপে যিনা ও ব্যভিচারের অন্তর্ভূক্ত। এরপরও দেখা যেত উল্লিখিত অবৈধ কাজের মাধ্যমেও তাদের অনেকেরই উদ্দেশ্য সফল হতো না। অথচ তারা প্রত্যেকেই কঠিন গুণাহ্ েগুণাহ্গার হয়ে যেত। কাজেই সুওয়ালে বর্ণিত কাজটি সম্পূর্ণরূপে মূর্খতা ও ধর্মহীনতারই নামান্তর।
বিবাহ্ ব্যতীত বেগানা পুরুষের মাধ্যমে যে সন্তান জন্মগ্রহণ করবে সে কস্মিন কালেও শরীয়তে বৈধ বলে গ্রহণযোগ্য হবে না। তাই সন্তান বৈধ হওয়ার জন্য বিবাহ্কে শর্ত হিসেবে আরোপ করা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক এরশাদ করেন,
فانكحوا ما طاب لكم من النساء مثنى وثلث وربع فان خفتم الا تعدلوا فواحدة.
অর্থঃ- “তোমরা বিবাহ্ কর তোমাদের পছন্দমত দু’জন, তিনজন অথবা চারজন মেয়েকে। যদি আশঙ্কা কর (একাধিক স্ত্রীর মধ্যে) সমতা বা ইনসাফ করতে পারবে না তাহলে একজনকেই বিবাহ্ কর।” (সূরা নিসা/৩)
এছাড়া আল্লাহ্ পাক মু’মিনদের ক্ষেত্রে বলেন,
ان الله اشترى من المؤمنين انفسهم واموالهم بان لهم الجنة.
অর্থঃ- “নিশ্চয়ই আল্লাহ্ পাক মু’মিনদের থেকে তাদের জান ও মাল বেহেশ্তের বিনিময়ে খরিদ করে নিয়েছেন।” (সূরা তওবা/১১১)
আর আখেরী রাসূল, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিদায় হজ্বের সময় বলেছেন,
ان دمائكم واموالكم حرام عليكم.
“নিশ্চয়ই একজনের জান, মাল ও রক্ত অন্য জনের জন্য হারাম।” (মুসলিম শরীফ)
অর্থাৎ কোন মু’মিন মুসলমান সে পুরুষ অথবা মহিলা হোক না কেন সে কস্মিনকালেও তার কোন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অথবা রক্ত বা বীর্য কোনটাই আল্লাহ্ পাক ও তাঁর রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আদেশ ও নির্দেশের খেলাফ কাউকে যেমন দান করতে পারবে না তদ্রুপ গ্রহণও করতে পারবে না। অনুরূপ কারোটা যেমন ব্যবহার করতে পারবে না তেমন ব্যবহার করতে দিতেও পারবে না। কারণ আল্লাহ্ পাক মানুষদের সম্পর্কে বলেন,
لقد كرمنا بنى ادم.
অর্থঃ- “নিশ্চয়ই আমি বণী আদমকে সম্মানিত করেছি।” (সূরা বণী ইস্রাঈল/৭০)
অর্থাৎ মানুষকে আশরাফুল মাখলুকাত করা হয়েছে। তাই তার আশরাফিয়াতের কারণে প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, রক্ত-মনি ইত্যাদি সবকিছুই সম্মানিত।
মানুষের আশরাফিয়াতের কারণে তার ইন্তেকালের পর তাকে উত্তমভাবে গোছল করিয়ে কাফন পড়িয়ে দাফন করার নির্দেশ শরীয়ত দিয়েছে। শুধু তাই নয় এমনকি মানুষের নখ, চুল ইত্যাদি যা কেটে ফেলা হয় তাও সম্মানের সহিত মাটিতে দাফন করার নির্দেশ শরীয়তের দেয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, উপরোক্ত সুওয়াল মোতাবেক যদি মানুষ আমল করে তাহলে মানুষের মধ্যে ও পশুর মধ্যে কোন পার্থক্য থাকে না। অর্থাৎ মানুষের আশরাফিয়াতের কোন অস্তিত্বই থাকে না। যদিও পৃথিবীর অনেক দেশেই অনেক লোক উপরোক্ত কাজ করে থাকে সেটা তাদের জেহালত বা অজ্ঞতা ও ধর্মহীনতারই কারণ।
হ্যাঁ, যদি কারো সন্তান না হয় তাহলে তার দায়িত্ব হলো শরীয়তের খেলাফ কোন পদ্ধতি অবলম্বন না করে আল্লাহ্ পাক-এর নিকট খালেছভাবে দোয়া চাওয়া।
এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক এরশাদ করেন,
قال ربكم ادعونى استجب لكم.
অর্থঃ- “তোমাদের রব বলেন, আমাকে ডাক আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দিব।” (সূরা মু’মিন/৬০)
অর্থাৎ আল্লাহ্ পাক-এর নিকট দোয়া-ইস্তেগ্ফার, রোনাজারি, কান্নাকাটি ইত্যাদি করার পরও যদি কারো সন্তান না হয় তাদের সম্পর্কে আল্লাহ্ পাক বলেন,
ان الله مع الصابرين.
অর্থঃ- “নিশ্চয়ই আল্লাহ্ পাক ধৈর্য্যশীলদের সাথে রয়েছেন।” (সূরা বাক্বারা/১৫৩) তিনি আরো বলেন,
وان تعدوا نعمة الله لا تحصوها.
অর্থঃ- “যদি তোমরা আল্লাহ্ পাক-এর নিয়ামত গণনা কর তাহলে তা গণনা করে শেষ করতে পারবে না।” (সূরা ইব্রাহীম/৩৪) অর্থাৎ বান্দা তার অন্যান্য নিয়ামত যা সে লাভ করেছে সেদিকে খেয়াল করে ধৈর্য্যধারণ করবে ও শুকরিয়া আদায় করবে অস্থিরচিত্ত না হয়ে তাহলে আল্লাহ্ পাক তাকে আরো নতুন নতুন নিয়ামত দান করবেন।
এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক বলেন,
لئن شكرتم لازيدنكم ولئن كفرتم ان عذابى لشديد.
অর্থঃ- “যদি তোমরা আমার নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় কর তাহলে অবশ্যই অবশ্যই আমি তোমাদের নিয়ামত বৃদ্ধি করে দিব। আর যদি না শুকরিয়া কর তাহলে জেনে রাখ, নিশ্চয়ই আমার আযাব অনেক কঠিন।” (সূরা ইব্রাহীম/৭)
কাজেই বান্দার উচিৎ আল্লাহ্ পাক তাকে যে সমস্ত নিয়ামত দিয়েছেন সে সমস্ত নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করা। আর যা দেননি সে বিষয়ে ধৈর্য্য ধারণ করা। বান্দা যে সমস্ত নিয়ামত পায়নি সেজন্য অস্থির হয়ে শরীয়তের খেলাফ কাজ করা কখনোই সঠিক হবে না। কারণ এমনও হতে পারে, সে যে নিয়ামত চাচ্ছে সেটা হাছিল হলে তার যতটুকু লাভ হওয়ার কথা তার চাইতে লোকসানই বেশী হবে। কারণ বান্দা তার ভাল-মন্দ সম্পর্কে জ্ঞাত নয়।
এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক বলেন,
عسى ان تكرهوا شيئا وهو خيرلكم وعسى ان تحبوا شيئا وهو شرلكم والله يعلم وانتم لا تعلمون.
অর্থঃ- “সম্ভবত তোমরা যা খারাপ মনে কর সেটাই তোমাদের জন্য ভাল। আর সম্ভবত তোমরা যেটা ভাল মনে কর সেটাই তোমাদের জন্য খারাপ। আল্লাহ্ পাকই জানেন, (কোনটা ভাল ও মন্দ) কিন্তু তোমরা জান না। (সূরা বাক্বারা/২১৬)
অতএব, প্রত্যেক বান্দা-বান্দির দায়িত্ব ও কর্তব্য হলো- আল্লাহ্ পাক তাকে যে অবস্থায়ই রেখেছেন সে অবস্থাতেই সন্তুষ্ট থেকে ধৈর্য্যধারণ করে আল্লাহ্ পাক-এর নিকট বেশী বেশী দোয়া-ইস্তেগ্ফার করা তার ইহ্কাল ও পরকালের কামিয়াবী হাছিলের জন্য।
{দলীলসমূহঃ- (১) আহ্কামুল কুরআন জাস্সাস (২) কুরতুবী, (৩) রুহুল মায়ানী, (৪) ইবনে কাছীর, (৫) মাযহারী, (৬) নাওয়াসিখুল কুরআন, (৭) মুয়াত্তা মালেক (৮) ফতহুল বারী, (৯) ওমদাতুল ক্বারী, (১০) মেরকাত, (১১) আওজাযুল মাসালিক, (১২) আলমগীরী, (১৩) কাজীখান, (১৪) বায্যাজিয়া, (১৫) খুলাসাতুল ফতওয়া, (১৬) শরহ্ েসিয়ারে কবীর, (১৭) হেদায়া, (১৮) নেহায়া, (১৯) এনায়া, (২০) বাহরুর রায়েক, (২১) ফতহুল ক্বাদীর, (২২) দুররুল মোখতার, (২৩) শামী, (২৪) বাদায়ে, (২৫) কিতাবুল উম্ম, (২৬) শরহে তানবীর, (২৭) নুরুল আনোয়ার, (২৮) কুদুরী, (২৯) আইনুল হেদায়া, (৩০) মুসাওওয়া ইত্যাদি}