আপনারা মোল্লা মানুষ, মসজিদেই থাকুন॥ তাহারা কোন ধরণের মোল্লা; জাতি এখনও বুঝিবে কি?

সংখ্যা: ১২০তম সংখ্যা | বিভাগ:

 ‘মোল্লা’ উপাধি হাল যামানায় যেই অর্থে ব্যবহৃত হয় উহা আদতে সেই তবকায় ছিলোনা। বর্তমানে ইহা কুয়ার ব্যাঙ, তুচ্ছ অর্থে ব্যবহৃত হইলেও আসলে প্রবর্তনকালে বহুত বড় মর্তবার শীর্ষস্থানীয় আলিম তথা বেমেছাল শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্ব হিসাবে ইহার প্রয়োগ হইত। অর্থাৎ সমসাময়িক যুগে যিনি বহুত আলা দরজার আলিম তাঁহাকেই মোল্লা লক্ববে ভূষিত করা হইত। যেমন, হযরত মোল্লা জিউন রহমতুল্লাহি আলাইহি। কিন্তু ইহার পরের ইতিহাস বড়ই করুণ। ইসলাম বিদ্বেষী ইংরেজরা ইসলাম ও ইসলামী মূল্যবোধকে অবমাননা করিবার জন্য যে বিবিধ পন্থা অবলম্বন করিয়াছিল মোল্লা উপাধির অবমাননা তন্মধ্যে অন্যতম। উল্লেখ করা যাইতে পারে যে, ‘পাগড়ী’ সুন্নাত মুসলমানগণের সম্মানিত পোষাক। কিন্তু সেই পাগড়ী তাহারা লাগাইয়াছে তাহাদের ঘোড়ার সহিষ চাপরাশি ইত্যাদির মাথায়। তাহাদের গৃহভৃত্যের নাম রাখিত আব্দুল্লাহ্, রমজান ইত্যাদি। ঠিক তেমনি মুসলমানগণের শীর্ষস্থানীয় আলিমের উপাধি ‘মোল্লাকে’ তারা তুচ্ছভাবে ব্যবহার করিয়া বর্তমান অবমাননামূল অর্থে পৌঁছাইয়াছে। বলাবাহুল্য, ঘটনাক্রমে বর্তমান সরকার প্রধানও অতি সম্প্রতি (গত ২রা জুলাই) মোল্লা শব্দকে সেইরূপ তুচ্ছ অর্থেই প্রয়োগ করিলেন। ঘটনাটি এইরূপ যে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জনৈক মুফতির সাথে নির্বাচন পূর্বে তাহার আঁতাত হইয়াছিলো। সেই আঁতাতে উক্ত মুফতি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আসন হইতে এমপির জন্য নমিনেশন চাহিয়াছিল। কিন্তু ঐতিহ্যগতভাবে এই আসনটি ছিল বর্তমান সরকার দলীয় লোকের। যিনি ইতিপূর্বে সেইখানে তিন তিনবার এমপি হইয়াছিলেন। এইক্ষেত্রে তাহাকে বাদ দিয়া নামধারী সেই মুফতিকে দেওয়া ভাল ঠেকে না বিধায় নামধারী মুফতিকে অনুরোধ জানানো হইয়াছিলো, তিনি যদি এমপি পদের নমিনেশন দাবী না করেন তাহা হইলে তাহারা সরকারে যাইতে পারিলে তাহাকে মন্ত্রী করা হইবে।

কিন্তু তথাকথিত মুফতির কাছে তখন এমপি হওয়াটাই ছিল বড় বিষয়। তাই তিনি বাকা হইয়া রহিলেন। বেকায়দা দেখিয়া তখন তাহাকেই এমপি পদ দেওয়া হইলো। কিন্তু ক্ষমতার লোভ বলিয়া কথা। যাহা হাদীস শরীফে ইরশাদ হইয়াছে, “আদম সন্তানকে দুই উপত্যকা সম্পদ দেওয়া হইলে সে তৃতীয় উপত্যকা সম্পদের জন্য প্ররোচিত হয়। তাহার পেট ভরবেনা মারা না যাওয়া পর্যন্ত।”

তদ্রুপ এমপি হইবার পর প্রথমেই তিনি গাড়ী ক্রয়ে আণ্ডার ইনভয়েসিং অর্থাৎ দুর্নীতির দ্বারা চল্লিশ লাখ টাকা কামাইলেন। (প্রমাণ দৈনিক যুগান্তর, ৩রা এপ্রিল, ২০০২) ইহারপর বিভিন্ন মন্ত্রীর দরবারে গিয়া সময়-অসময়ে আরো কিছু বাগাইতে সচেষ্ট রহিলেন। তাহার ভাষ্যমতে স্থানীয় সরকার ও সমবায় মন্ত্রীর কাছে দশ লাখ টাকা চাহিবার পর এক লাখ টাকা দেওয়ায় তিনি ক্ষুব্ধ হইয়াছেন। তাহার নিজের ভাষায়, “মন্ত্রীরা আমাদের পাত্তা দিতে চান না। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সাথে দেখা করিতে গেলে তিনি দেখা দেননা। ঘন্টার পর ঘন্টা বসাইয়া রাখেন। অন্যরা কমবেশী এ ধরণের আচরণ করেন। তাহারা এমন আচরণ করেন যেন আমি তাহাদের দলের কর্মী। জোটের বৈঠকে এইসব বিষয় তুলিতেই জামাতের নেতারা রুষ্ট হন। বিএনপি নেতারা এই বিষয়টি আমলে না নিয়া উল্টা আমাকেই দোষারোপ করিবার চেষ্টা করেন। এক পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী আমাকে বলেন, “আপনারা মোল্লা মানুষ। দয়া করে মসজিদেই থাকুন। জোট দিলেন বলেই আজ এমপি হতে পেরেছেন। এতেই সন্তুষ্ট থাকুন।” (৩রা জুলাই, দৈনিক ভোরের কাগজ) পাঠক! এই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া মূলতঃ দুইটি। এক. ‘আপনারা মোল্লা মানুষ।’ এই বক্তব্যের অন্তরালে মূলতঃ বর্তমান সরকার প্রধানের অবচেতন মনে জমা থাকা সমস্ত আলিম সমাজের প্রতি ইংরেজদের তুচ্ছার্থে প্রয়োগকৃত মোল্লা শব্দের অবমাননামূলক ভাবই প্রতিফলিত হইয়াছে। অর্থাৎ তাহার চারিপার্শ্বে যাহারা মাওলানা, মুফতি, মুফাস্সিরে কুরআন তথা শাইখুল হাদীছের পরিচয়ে গিজগিজ করিতেছেন তাহাদেরকে প্রকৃতপক্ষে প্রধানমন্ত্রী কি চোখে দেখিয়া থাকেন তাহাই হঠাৎ তাহার জবান ফসকিয়া জাহির হইয়া পড়িয়াছে।

 দুই. বর্তমান নামধারী শাইখুল হাদীছ, মুফাস্সিরে কুরআন মাওলানা, মুফতিরা যাহারা প্রত্যেকেই ইসলামী ব্যক্তিত্ব দাবী করিবার পরও কিরূপ ছ্যাচড়া ক্ষমতার লোভী হইতে পারে, নিজের মুখের ওয়াদা নিজেই ভঙ্গ করিতে পারে, মন্ত্রীত্ব দিলেই সব হজম করিতে পারে ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া ছয় হত্যার কথা, ফতওয়া বিরোধী রায়, মাদ্রাসা, স্বগোত্রীয় আলিম-উলামার আমল ইত্যাদির কথা ভুলিয়া যাইতে পারে। আর না দিলে এই ইস্যুগুলির জাবর কাটতে পারেন তথা এইরূপ‘ হাজারো ইসলামী ইস্যূ উল্লেখ করিয়া আন্দোলনের ভয়, জোট ত্যাগ করিবার জুজু দেখাইতে পারে। এইরূপ সুবিধাবাদী, স্বার্থবাদী, ক্ষমতালোভী, ব্যক্তিত্বহীন পরিচয়ই বোধকরি বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর মুখ হইতে তাহাদের হাক্বীক্বত জাহির করিয়া দিয়াছে। ইহাতে যদিও সঠিকভাবে আলিম সমাজের মর্যাদার প্রতি অবমাননা করা হইয়াছে কিন্তু বর্তমান ক্ষমতালোভী উলামারাই ইহার আসল কারণরূপে পর্যবসিত হইয়াছে। যেমনটি হইয়াছিলো, বাদশাহ্ আকবরের সময়, দরবারী আলিমগণের দলাদলি, ক্ষমতালোভী প্রবণতা অবশেষে বাদশাহ্ আকবরকে ইসলাম হইতেই বিমূখ করিয়া দিয়াছিলো।

তদ্রুপ আজিকের নামধারী শাইখুল হাদীছ মুফাস্ছিরে কুরআন, মুফতি, মাওলানা মন্ত্রীত্ব লাভের জন্য তীব্র কোন্দল, দলাদলি ও মুনাফিকী প্রবণতাই বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে এতবড় কথা বলিবার সুযোগ করিয়া দিয়াছে। যদিও হক্কানী-রব্বানী আলিমগণের জন্য তাহা একেবারেই প্রযোজ্য নহে।

-মুহম্মদ মাহবুবুর রহমান, ঢাকা।

তাজদীদী মুখপত্র মাসিক আল বাইয়্যিনাত পাঠে উপলব্ধি- (১)

মতামত বিভাগ

মতামত বিভাগ

মতাম বিভাগ

মতামত বিভাগ