প্রসঙ্গঃ “মহিলা জামায়াত” অতি উৎসাহের অন্তরালে অন্তঃসারশুন্যতা হাদীস শরীফের বরাতে মহল বিশেষের জিহালতি ও কুফরীর প্রবণতা

সংখ্যা: ১০২তম সংখ্যা | বিভাগ:

 মহিলাদের ঈদ, জুমুয়া ও পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের জামায়াতে অর্থাৎ মসজিদ ও ঈদগাহে যাওয়া শরীয়ত সম্মত কি-না এই মর্মে “মুহম্মদিয়া জামিয়া শরীফ” থেকে প্রকাশিত লিফলেটের বক্তব্য মাসিক আল বাইয়্যিনাত-এর গত ১০১তম সংখ্যার সুওয়াল-জাওয়াব বিভাগে যে আলোচনা করা হয়েছে তা সময়ের প্রেক্ষাপটে খুবই প্রাসঙ্গিক ও গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে। কেননা সম্প্রতি কিছু অতিউৎসাহীরা মসজিদে মহিলা জামায়াতের নামে একটি অশুভ পায়তারা সৃষ্টির প্রয়াস চালাচ্ছে।   ইসলামে অতি উৎসাহের কোন স্থান নেই। অতি উৎসাহীরা ‘মসজিদে মহিলা জামায়াত’ শব্দটির মাঝে যে আপাত জজ্বা খুঁজে পান ইসলাম সে জজ্বায় সায় দেয়না। কারণ ইসলাম কেবল শুধু কুরআন শরীফ নয়, শুধু হাদীস শরীফ নয় এর সাথে সাথে সংযুক্ত রয়েছে সত্যের মাপকাঠি হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণের ইজমা এবং তৎপরে ক্বিয়াস।  কারণ কুরআন শরীফ-এর সব আয়াত শরীফের যদি সরাসরি অর্থ গ্রহণ করা হয় তাহলে তা কুফরীতে দাঁড়ায়। যেমন, “কাফিররা ধোকাবাজি করেছে। আল্লাহ্ পাকও তাদের ধোকা দিয়েছেন। আর আল্লাহ্ পাক হলেন বড় ধোকাবাজ।” (নাউযুবিল্লাহ্) “আমাদের খোদার দাদা হলেন বড় খোদা।” (নাউযুবিল্লাহ্)   মূলতঃ এ কারণেই সবক্ষেত্রে শুধুমাত্র কুরআন শরীফ বা হাদীস  শরীফ থেকে আক্ষরিকভাবে যারা কাজ করতে চাবে তারাই গোমরাহীতে নিপতিত হবে। আর আল্লাহ্ পাক ইরশাদ ফরমান, “তোমরা আল্লাহ্ পাক ও আল্লাহ্ পাক-এর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তোমাদের মাঝে যারা উলীল আমর তাদের অনুসরণ কর।” মূলতঃ এখানে উলীল আমর শব্দটির সংযোজনের গুরুত্ব অনেক ব্যাপক। কারণ সাধারণভাবে কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফের নির্দেশ সঠিকভাবে অনুধাবন সম্ভব নাও হতে পারে। সেক্ষেত্রে উলীল আমরদের ফায়সালা বা আমল কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফের সঠিক রূপায়ন ঘটায়। উল্লেখ্য, উলীল আমর প্রসঙ্গে ইসলামের দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে আফজালু নাছ বা’দাল আম্বিয়া হযরত আবূ বকর ছিদ্দীক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর পরেই মূল্যায়ন করতে হয়। যার সম্পর্কে আখিরী রসূল, হাবীবুল্লাহ্ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ ফরমান, “আমার পরে যদি কেউ নবী হতেন তাহলে তিনি হতেন হযরত উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু।”  যার সম্পর্কে আরো বলা হয়েছে, “আল্লাহ্ পাক হযরত উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর জবানে কথা বলেন।” এমনকি তাঁর কথার প্রেক্ষিতে আল্লাহ্ পাক কুরআন শরীফের ২২টিরও অধিক আয়াত শরীফ নাযিল করেছেন। যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে তিনিই যখন মসজিদে মহিলা জামায়াত নিষিদ্ধ করলেন তখন এরপরে এমন কোন মা আছে যে, এমন কোন সন্তান প্রসব করেছে যে, হযরত উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর কথার উপর কথা বলতে পারে? যদি কেউ সে স্পর্ধা দেখায় তাহলে হয় সে অবৈধ সন্তান অথবা শয়তানের কক্তস্বর।  তদুপরি হযরত উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু কর্তৃক মহিলা জামায়াত নিষিদ্ধকরণে সমর্থন যে হযরত আয়িশা ছিদ্দীকা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহাই দিয়েছেন শুধু তাই নয় বরং সামগ্রিক বিচারে হাদীস শরীফেও এর পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। যেমন, “মসনদে আহ্মদের” হাদীস শরীফে বলা হয়েছে, “ঘরসমূহে যদি মহিলা ও বালক-বালিকা না থাকত তাহলে আমি ইশার নামাযের জামায়াত কায়িম করে যুবকদের নির্দেশ দিতাম তারা যেন যারা ঘরে আছে সকলকে আগুনে পুড়ে ফেলে।”  মূলতঃ এই হাদীস শরীফ দ্বারাও প্রতিভাত হয় যে, মসজিদে জামায়াত পুরুষদের জন্য; মহিলাদের জন্য নয়।   এখানে উল্লেখ্য, অনেক আমল যা আখিরী রসূল, হাবীবুল্লাহ্ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জন্য খাছ ছিলো কিন্তু উম্মতের জন্য জায়িয নেই। তেমনি অনেক আমল আখিরী রসূল, হাবীবুল্লাহ্ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জামানার জন্য খাছ। পরবর্তী যুগে তা প্রজোয্য নয়। আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হাবীবুল্লাহ্ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জামানায় কেউ রোযা রেখে গীবত করলে সে আর রোযা রাখতে পারতনা এবং তার মুখ দিয়ে রক্ত-গোশ্তের বমি যা গীবতের হাক্বীক্বী ছূরত, তা বেরিয়ে আসত। কিন্তু আজকের জামানায় অগণিত, কোটি কোটি গীবত হলেও এরূপ কোন নজীর চোখে পড়ে কি? হযরত জাবির রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আখিরী রসূল, হাবীবুল্লাহ্ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনা শরীফে আগমণের পর মদীনা শরীফে যে বরকত, রহমত অনুভূত হতো, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র জিস্ম মুবারক রওজা শরীফে রাখার সাথে সাথেই সে বরকত অবগুক্তিত হয়ে যায়।       কাজেই বলতে হয় যে, আখিরী রসূল, হাবীবুল্লাহ্ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জামানায় একটি আলাদা খুছূসিয়ত ছিলো যার কারণে তখন মহিলা জামায়াত স্বছন্দ ছিলো। আর এর বিশেষ কারণও ছিল বটে।

উল্লেখ্য, তখন শরীয়তী ইল্ম হাছিলের একমাত্র কেন্দ্র ছিলেন, আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হাবীবুল্লাহ্ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তদুপরি সে সময় ওহীর দরজা খোলা থাকায় এবং ছোট বড় কোন সমাবেশে আখিরী রসূল, হাবীবুল্লাহ্ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতিটি বাক্য বা কাজই শরীয়ত হওয়ায় প্রত্যেক নর-নারী ঐ সুযোগে প্রত্যক্ষভাবে শরীয়ত শিক্ষার সুবিধা পেতেন। এজন্যই সে সময় ঈদ, মুনাজাত ইত্যাদিতে নারীদের উপস্থিতি অনুমোদিত ছিলো।  এজন্যই আল্লাহ্ পাক-এর হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন মসজিদে মহিলাদের গমন সমর্থন করেছেন। এবং তখন হযরত উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুও স্বীয় স্ত্রী হযরত আতিকা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহাকে মসজিদে যেতে নিষেধ করেননি।  তবে তখন কিরূপে মহিলা জামায়াত অনুষ্ঠিত হতো তাও পর্যালোচনার বিষয়। হযরত উম্মে ছালমা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা বর্ণনা করেন, আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হাবীবুল্লাহ্ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সময়ে নারীগণ মসজিদে উপস্থিত হতেন এবং সালাম ফিরানো মাত্র তারা বের হয়ে যেতেন। হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন দাঁড়াতেন পরে অন্যান্যরাও দাঁড়াতেন। হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং পুরুষগণ মসজিদ হতে বের হওয়ার পূর্বে নারীগণ নিজ নিজ ঘরে প্রবেশ করতেন।”   আর এর দ্বারা এও প্রমাণিত হয় যে, কেবলমাত্র নিকটস্থ মহিলারাই তখন মসজিদে আসতেন।    মূলতঃ এ রকম অবস্থা কেবল হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জামানায়ই খাছ ছিলো। কিন্তু এরপরে হযরত আয়িশা ছিদ্দীকা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা বা হযরত উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তাদের যুগে (সে রকম) অবস্থা মনে করেননি।     কেননা, আখিরী রসূল, হাবীবুল্লাহ্ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেই অবস্থায়ও মসজিদগামী মহিলাদের পর্দার জন্য যথেষ্ট তাকিদ দিয়েছেন।  তিনি বলেছেন, “যে নারী মসজিদে আসার সময় সুগন্ধি ব্যবহার করবে তার নামায কবুল হবেনা।” উল্লেখ্য, যেক্ষেত্রে একটু সুগন্ধি ব্যবহার করলেই নামায ফাসেদ হবার প্রকাশ্য ঘোষণা সেক্ষেত্রে বর্তমানে যে তার চাইতে অনেক বড় ও বেশী ধরণের বেপর্দার নিশ্চিত সম্ভাবনা সেখানে নামাযতো ফাসেদ বটেই বিপরীতে হাজারো কবীরাহ্ গুণাহ্ তথা কুফরী হওয়ারও সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। তদুপরি এ কথা চিন্তা করে খাইরুল কুরুনেই খোদা তায়ালার জবানে কথা বলনেওয়ালা হযরত উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু মহিলা জামায়াত নিষিদ্ধ করলেন এবং এ ব্যাপারে হযরত  আয়িশা ছিদ্দীকা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহার দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বললেন, “হযরত উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ঠিকই করেছেন।” পাঠক! বুখারী শরীফ, আবূ দাউদ শরীফ, মিশকাত শরীফ, গায়াতুল আওতার ইত্যাদি কিতাবে স্পষ্টরূপে এসব নিষেধবাণী থাকার পরও যারা হাদীস শরীফের বরাত দিয়ে মহিলা জামায়াত জায়িয করতে চায় তারা মূলতঃ সুস্পষ্ট কুফরীর দিকেই ধাবিত হয়।  কারণ এর দ্বারা তারা বিরোধীতা করে হযরত উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর, হযরত আয়িশা ছিদ্দীকা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা-এর, আখিরী রসূল, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং খোদ আল্লাহ্ পাক-এর। কারণ আখিরী রসূল হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খুলাফা-ই-রাশেদার সুন্নত মাড়ির দাঁত দিয়ে আকঁড়িয়ে ধরতে বলেছেন এবং হযরত উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর হুকুমের বিরোধীতা করাকে কুফরী বলেছেন। অপরদিকে আল্লাহ্ পাক, আল্লাহ্ পাক-এর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আদেশ পালন করাকে ফরয বলেছেন এবং হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমকে হক্ব বলেছেন। কিন্তু যারা তার মূল্যায়ণ না করে তাদের চেয়ে জ্ঞানী দাবী করে, বেশী বুঝদার, আমলদার দাবী করে শরীয়তের পরিভাষায় তারা নিশ্চিত কুফরী করে। (নাউযুবিল্লাহ্)

-মুহম্মদ মাহবুবুর রহমান, ঢাকা।

তাজদীদী মুখপত্র মাসিক আল বাইয়্যিনাত পাঠে উপলব্ধি- (১)

মতামত বিভাগ

মতামত বিভাগ

মতাম বিভাগ

মতামত বিভাগ