মাহবুবে ইলাহী, সুলতানুল মাশায়িখ হযরত নিযামুদ্দীন আউলিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি
মূলঃ হযরত শায়খ আব্দুল হক মুহাদ্দিসে দেহ্লভী রহমতুল্লাহি আলাইহি, ভাষান্তরঃ মুহম্মদ শামসুল আলম
(ধারাবাহিক)
হযরত মাহবুবে সুবহানী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর বাণী ছালেকের খেয়াল থাকে পূর্ণতার দিকে। অর্থাৎ ছালেক যতক্ষণ ছুলুকের রাস্তার মাকাম বা মন্জিল গুলো অতিক্রম করতে থাকে তখন তার আশা বা খেয়াল থাকে পূর্ণতা হাছিলের দিকে। আর এই প্রতিক্ষীত আশা হচ্ছে তিন রকমের। প্রথমত ছালেক (গমণকারী), দ্বিতীয়ত ওয়াকিফ (পরিচিত ইল্ম), তৃতীয় হচ্ছে রজে’ (প্রত্যাবর্তন কারী)
ছালেক হচ্ছে, ঐ ব্যক্তি যে রাহেসুলূক বা তরীক্বতের পথে নিরন্তরভাবে চলতে থাকে, আর ওয়াকিফ ঐ ব্যক্তিকে বলে, যে নাকি তরীক্বতের রাস্তায় চলতে গিয়ে (হঠাৎ) কোন এক মন্জিলে আটকা পড়ে। তখন লোকেরা আরজ করলো ছালেকগণও কি সুলূকের পথে চলার সময় আটকা পড়েন নাকি? তিনি বলেন, “খোদা অনুসন্ধানী ব্যক্তি যখন এই অবস্থায় পতিত হন বা রাস্তা চলার পথে কোন ভুল ভ্রান্তির কারণে খোদা অনুসন্ধানী ব্যক্তির ইবাদতে শিথিলতা এসে যায় যার দরুণ রিয়াজত-মুজাহিদার (প্রকৃত) স্বাদ-অস্বাদ বিলীন বা নিঃশেষ হয়ে যায়। ঐ সময় সাথে সাথে যদি সে কোন তদবীর বা কৌশল অবলম্বন করে আল্লাহ্ পাক রব্বুল আলামীন-এর দরবারে খালিছ তওবা করে তবে সে তার পূর্বের হালে ফিরে আসতে পারে। কিন্তু যদি খোদা না করুন! ছালেক যদি তার পূর্বের অবস্থায়ই থেকে যায় তবে এটা তারজন্য ভীষণ বিপদের কারণ। এরপর সুলূকের রাস্তায় চলতে গিয়ে ছালেক থেকে যে ত্রুটি-বিচ্যুতি হয় সেটা হচ্ছে সাত প্রকারের।
(১) اعراض (ই’রাদ্ব)-মুখ ফিরানো, (২) حجاب (হিজাব)-পর্দা, (৩) تفاصل (তাফাছুল)-পৃথক করা, (৪) سلب مزيد (সলবে মাযীদ)-অতিরিক্ত নিয়ামত ছলব হওয়া, (৫) سلب قديم (সলবে ক্বদীম)-মূল নিয়ামত ছলব হওয়া, (৬) تسلى (তাসাল্লী)-নিশ্চিত হওয়া, (৭) عداوت (আদাওয়াত)-শত্রুতা, এরপর বললেন, “আশেক আর মাশুক উভয় হচ্ছেন বন্ধু।” যেমন, একজন আর এক জনের মুহব্বতে ডুবে থাকে। ঐ অবস্থায় যদি আশেক থেকে এমন কোন ভুলত্রুটি বা গুণাহ্ হয়ে যায় যা মাশুকের নিকট অপছন্দনীয় তাহলে মাশুক তার আশেক থেকে রোখ ফিরিয়ে নেন। অর্থাৎ ঐ অবস্থায় নিজের তাওয়াজ্জুহ্ বা রুজু অন্য দিকে ঘুরিয়ে নেন। এজন্য আশেকের উচিত ঐ সময় জরুরী, খালিছ তওবা ইস্তিগফার করে মাশুকের নিকট নিজের ওজরখাহি পেশ করা। তার ঐ ওজরখাহির কারণে হয়তো বা মাশুক শেষ পর্যন্ত খুশী হয়ে যেতে পারেন। কিন্তু আশেক যদি তার ত্রুটির উপর বহাল থাকে এবং অক্ষমতা প্রকাশ না করে তাহলে এই বিমুখতাই ঐ সময় তার জন্য হিজাব বা পর্দা হয়ে দাঁড়ায়। অর্থাৎ তখন মাশুক ও আশেকের মাঝখানে পর্দা পড়ে যায়। ঐ সময় পর্যন্ত আশেকের কর্তব্য খালিছ তওবা ইস্তিগফার করা। কিন্তু ঐ অবস্থায়ও যদি ছালেক তা না করে তবে تفاصل “তাফাছুল” (পার্থক্য রচনা) হয়ে যায়। এরপরও যদি সে তওবা ইস্তিগফার না করে তাহলে তার অতিরিক্ত যা নিয়ামত হাছিল হয়েছিল সেটা ছলব বা ফউত হয়ে যায় যাকে سلب مزيد (সলবে মাযীদ) বলে তাতে পরিবর্তন হয়ে যায়। অর্থাৎ কিনা তখন আশেকের দিল থেকে দরূদ, ওযীফা ও অন্যান্য ইবাদতের লজ্জত ও স্বাদ নষ্ট হয়ে যায়। এরপরও যদি খোদা অনুসন্ধানী ছালেক তার এক গুয়েমীর উপর অবিচল থাকে এবং স্বীয় ত্রুটি-বিচ্যুতির জন্য অনুতপ্ত না হয় তবে سلب مزيد (সলবে মাযীদ) তখন سلب قديم (সলবে ক্বদীম) এর রূপ ধারণ করে। (অর্থাৎ মূল যা হাছিল হয়েছে তাও ছলব হয়ে যায়।) আর এই অবস্থায় ইবাদত, আনুগত্য, (আত্মার) শান্তি, সালামতি (নেক আমলের) ছওয়াবসমূহ যা প্রথমেই হাছিল করেছিল তা এ পর্যায়ে এসে কেঁড়ে নেয়া হয়। এরপর যদি তার মধ্যে তওবা ইস্তেগফারের কমতি দেখা যায় তবে سلب قدم (সলবে ক্বদীম) تسلى (তাসাল্লী) এর ছূরত ধারণ করে। অর্থাৎ মাশুকের দিল থেকে আশেকের (স্থান) জুদায়ী বা বরবাদী নিশ্চিত হয়ে যায়। কিন্তু এই সময়ও যদি খালিছ তওবা-ইস্তিগফার করতে গাফলতি করে তাহলে تسلى (তাসাল্লী) তখন عداوت (আদাওয়াত) তথা শত্রুতায় পরিণত হয়ে দাঁড়ায়। অর্থাৎ কিনা তখন সালেকের হালাকী বা বরবাদীর ব্যাপারে আর কোন সন্দেহ থাকেনা। আল্লাহ্ রব্বুল আলামীন আমাদের সকলকে ভুলত্রুটি থেকে হিফাযতে রাখুন। (আমীন)
বিশ্ব সমাদৃত, হযরত আওলিয়া-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণের অনুপম মুবারক চরিত গ্রন্থ আখবারুল আখইয়ার