সাইয়্যিদ মুহম্মদ আফজালুল হক
নাজিমখান, কুড়িগ্রাম
মুহম্মদ তাজুল ইসলাম, কাউনিয়া, রংপুর
মুহম্মদ শহিদুল ইসলাম, দিলালপুর, পাবনা
সুওয়াল: দেওবন্দী, করমী-খারিজী, ওহাবী, জামাতী ও অতি সুন্নীদের মাসিক মুখপত্রে এবং তাদের সমমনা ও সমগোত্রীয়দের কোন কোন দৈনিক মুখপত্রে ভোটকে ইসলামের নামে আমানত, সাক্ষী, সুপারিশ, উকিল নিয়োগের মাধ্যম ও ওয়াজিব বলে উল্লেখ করা হয়েছে। দলীল হিসেবে কেউ কেউ পাকিস্তানের মুফতী শফী এবং বাংলাদেশের মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী ছাহেবের বক্তব্য তুলে ধরেছে।
বর্তমানে আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের একমাত্র দলীলভিত্তিক মুখপত্র “মাসিক আল বাইয়্যিনাত শরীফ” কর্তৃপক্ষের নিকট আমাদের বিনীত সুওয়াল এই যে, উল্লিখিত পত্র-পত্রিকায় প্রদত্ত্ব বক্তব্য এবং তার অনুকূলে মুফতী শফী ও মাওলানা শামসুল হক ছাহেবের বক্তব্য কতটুকু পবিত্র কুরআন শরীফ-পবিত্র সুন্নাহ্ শরীফ সম্মত? দলীলসহ জানিয়ে দেশের সরলমনা মুসলমানদের ঈমান, আক্বীদা ও আমল হিফাযতে সাহায্য করবেন।
জাওয়াব: উল্লিখিত মাসিক ও দৈনিক পত্র-পত্রিকার বক্তব্য সম্পূর্ণরূপে পবিত্র কুরআন শরীফ-পবিত্র সুন্নাহ শরীফ উনাদের খিলাফ এবং উক্ত বক্তব্যের অনুকূলে মুফতী শফী ছাহেব ও মাওলানা শামসুল হক ছাহেব দু’জনের বক্তব্য ও লিখনী তাফসীর বির রায় বা মনগড়া তাফসীর হেতু তা সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাজ্য।
তাফসীর বির রায় সম্পর্কে পবিত্র হাদীছ শরীফে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-
مَنْ فَسَّرَ الْقُرْاٰنَ بِرَأْيِهٖ فَـقَدْ كَفَرَ
অর্থ: “যে ব্যক্তি পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মনগড়া তাফসীর করলো সে কুফরী করলো।”
পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে আরো ইরশাদ মুবারক হয়েছে-
مَنْ قَالَ فِى الْقُرْاٰنِ بِرَأْيِهٖ فَـلْيَـتَـبَـوَّأْ مَقْعَدَهٗ مِنَ النَّارِ وَفِى رِوَايَةٍ مَنْ قَالَ فِى الْقُرْاٰنِ بِغَيْرِ عِلْمٍ فَـلْيَـتَـبَـوَّأْ مَقْعَدَهٗ مِنَ النَّارِ
অর্থ: “যে ব্যক্তি পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মনগড়া ব্যাখ্যা করে সে যেন তার স্থান জাহান্নামে নির্ধারণ করে নেয়।”
অপর রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে, “যে ব্যক্তি ইলিম ব্যতীত, না জেনে পবিত্র কুরআন শরীফ উনার ব্যাখ্যা করে সেও যেন তার স্থান জাহান্নামে নির্ধারণ করে নেয়।” (তিরমিযী, মিশকাত, মিরকাত, মায়ারিফুস্ সুনান ইত্যাদি)
উল্লেখ্য, কেবল সাধারণ মুফতী ও মাওলানা তো দূরের কথা যারা ইমাম-মুজতাহিদ হিসেবে পরিচিত তাঁদেরও সকলের সমস্ত ব্যাখ্যা ও বক্তব্য যে সঠিক হবে তা নয়। বরং কোন কোন মুজতাহিদের কোন কোন ইজতিহাদ সঠিক নাও হতে পারে।
এ প্রসঙ্গে “বুখারী শরীফে” ইরশাদ মুবারক হয়েছে-
إِذَا حَكَمَ الْحَاكِمُ فَاجْتَـهَدَ ثُمَّ أَصَابَ فَـلَهُ أَجْرَانِ، وَإِذَا حَكَمَ فَاجْتَـهَدَ ثُمَّ أَخْطَأَ فَـلَهٗ أَجْرٌ
অর্থ: “যখন মুজতাহিদ কোন বিষয়ে সঠিক ইজতিহাদ করেন তখন তাঁর জন্য রয়েছে দ্বিগুণ ছওয়াব। আর যখন তিনি জারী হয়নি এমন ইজতিহাদ করেন তখন তাঁর জন্য রয়েছে একগুণ ছওয়াব।”
অর্থাৎ মুজতাহিদ ইজতিহাদ করার জন্য একগুণ এবং ইজতিহাদ সঠিক ও জারী হওয়ার জন্য একগুণ মোট দ্বিগুণ ছওয়াব। আর মুজতাহিদের ইজতিহাদ জারী না হলে শুধু ইজতিহাদ করার কারণে একগুণ ছওয়াব পাবেন। জারী না হওয়ার কারণে সেই জন্য কোন ছওয়াব পাবেননা।
তবে এ কথা সর্বজন স্বীকৃত যে, মুজতাহিদের ভুল, ইজতিহাদ হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়, সম্পূর্ণরূপে তা পরিত্যাজ্য। আর যারা ইমাম-মুজতাহিদ নয়, সাধারণ মুফতী, মাওলানা, মৌলভী তাদের ভুল ফতওয়া, ব্যাখা সম্পর্কে হাদীছ শরীফে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-
مَنْ أُفْتِىَ بِغَيْرِ عِلْمٍ كَانَ إِثْمُهٗ عَلٰى مَنْ أَفْـتَاهُ
অর্থ: “যাকে ইলিম ব্যতীত ফতওয়া দেয়া হলো তার সমূদয় গুণাহ্ ফতওয়া দানকারীর উপর বর্তাবে।” (আবূ দাউদ, মিশকাত, বযলুল মাযহুদ, মিরকাত)
অতএব, শরীয়তে মনগড়া, ভুল ফতওয়া, ব্যাখা, বক্তব্য, লিখনী ইত্যাদি প্রদান করা এবং তা গ্রহণ করা উভয়ই সম্পূর্ণরূপে নাজায়েয ও হারাম।
মাসিক আল বাইয়্যিনাত শরীফ কর্তৃক পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র সুন্নাহ শরীফ উনাদের দৃষ্টিতে ছহীহ্ বা বিশুদ্ধ ফতওয়া নিম্নরূপ-
ইসলাম কাকে বলে?
মহান আল্লাহ্ পাক তিনি “ পবিত্র সূরা আলে ইমরান শরীফ উনার ১৯ নং পবিত্র আয়াত শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক করেন-
إِنَّ الدِّينَ عِنْدَ اللهِ الْإِسْلَامُ
অর্থ: “নিশ্চয়ই ইসলামই মহান আল্লাহ্ পাক উনার কাছে একমাত্র দ্বীন।”
আর দ্বীন ইসলাম ব্যতীত অন্য সমস্ত ধর্ম যা পূর্বে ছিল বর্তমানে রয়েছে এবং ভবিষ্যতে হবে সেগুলিকে মহান আল্লাহ পাক তিনি বাতিল ঘোষণা করেছেন।
এ প্রসঙ্গে কালাম পাক উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-
هُوَ الَّذِي أَرْسَلَ رَسُولَهٗ بِالْهُدٰى وَدِينِ الْحَقِّ لِيُظْهِرَهٗ عَلَى الدِّينِ كُلِّهٖ وَكَفٰى بِاللهِ شَهِيدًا مُحَمَّدٌ رَّسُولُ اللهِ
অর্থ: “তিনি (মহান আল্লাহ্ পাক) উনার মহাসম্মানিত রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে হিদায়েত এবং সত্য দ্বীন সহকারে পাঠিয়েছেন সকল দ্বীনের উপর প্রাধান্য দিয়ে (সমস্ত দ্বীনকে বাতিল ঘোষণা করে) এবং মহান আল্লাহ্ পাক উনার স্বাক্ষ্যই যথেষ্ট। (যার সাক্ষী মহান আল্লাহ্ পাক) আর রসূল হচ্ছেন মুহম্মদুর রসূলুল্লাহ্ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।” (সম্মানিত ও পবিত্র সূরা ফাত্হ শরীফ: সম্মানিত ও পবিত্র আয়াত শরীফ ২৮,২৯)
উপরোক্ত আয়াত শরীফের ব্যাখ্যায় হাদীছ শরীফে ইরশাদ মুবারক করা হয়েছে-
عَنْ حَضْرَتْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللهِ رَضِىَ اللهُ تَـعَالٰى عَنْهُ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حِينَ أَتَاهُ حَضْرَتْ عُمَرُ عَلَيْهِ السَّلَامُ، فَـقَالَ : إِنَّا نَسْمَعُ أَحَادِيثَ مِنْ يَّـهُودَ تُـعْجِبُـنَا، أَفَـتَـرَى أَنْ نَكْتُبَ بَـعْضَهَا، فَـقَالَ: أَمُتَـهَوِّكُونَ أَنْـتُمْ كَمَا تَـهَوَّكَتِ الْيَهُودُ وَالنَّصَارَى ، لَقَدْ جِئْـتُكُمْ بِهَا بَـيْضَاءَ نَقِيَّةً، وَلَوْ كَانَ مُوسَى عَلَيْهِ السَّلَامُ حَيًّا مَّا وَسِعَهٗ إِلَّا اتِّبَاعِي
অর্থ: “হযরত জাবির রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার থেকে বর্ণনা করেন যে, একদিন হযরত ফারূকে আ’যম আলাইহিস সালাম তিনি নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নিকট এসে বললেন, ইয়া রসূলাল্লাহ্ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমরা ইহুদীদের থেকে তাদের কিছু ধর্মীয় কথা শুনে থাকি, যাতে আমরা আশ্চর্যবোধ করি, এর কিছু আমরা লিখে রাখবো কি? নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বললেন, আপনারাও কি দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছেন? যে রকম ইহুদী-নাছারারা দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছে? অবশ্যই আমি আপনাদের নিকট পরিপূর্ণ, উজ্জ্বল ও পরিস্কার দ্বীন নিয়ে এসেছি। হযরত মুসা আলাইহিস সালাম (যিনি ইহুদীদের নবী) তিনিও যদি দুনিয়ায় থাকতেন, তাহলে উনাকেও আমার অনুসরণ করতে হতো।” (মুসনাদে আহমদ, বাইহাক্বী, মিশকাত, মিরকাত, আশয়াতুল লুময়াত, লুময়াত, শরহুত্ ত্বীবী, তা’লীকুছ ছবীহ্ ইত্যাদি)
মূলতঃ ইসলাম হচ্ছে মহান আল্লাহ্ পাক উনার তরফ থেকে উনার মহাসম্মানিত রসূল, যিনি মহান আল্লাহ পাক ব্যতিত সকলের জন্য অনুসরনীয় অনুকরনীয় মহাসম্মানিত রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। সেই মহাসম্মানিত রসূল হচ্ছেন নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার প্রতি ওহীর মাধ্যমে নাযিলকৃত দ্বীন, যা বাড়ানো-কমানো বা ইফরাত-তাফরীত যেমন কুফরী তেমনি তার মনগড়া তাফসীর বা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ এবং নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নাম মুবারকে মিথ্যারোপ করাও কুফরীর অন্তর্ভুক্ত।
তার মেছাল বা উদাহরণ হচ্ছে- কাদিয়ানী সম্প্রদায়। কাদিয়ানীরা ইসলাম মানে এবং তা স্বীকারও করে থাকে। এমনকি কাদিয়ানীরা خَاتَمُ النَّبِيِّينَ (খাতামুন নাবিয়্যীন) এ রহমতপূর্ণ ও বরকতপূর্ণ বাক্যাংশটিও তারা শব্দগতভাবে অস্বীকার করে না কিন্তু মনগড়া অর্থ করে, তিনি নবীদের মোহর। নাউযুবিল্লাহ! অর্থাৎ কাদিয়ানী সম্প্রদায় শুধুমাত্র “খতম” শব্দের অর্থ শেষ না করে মোহর করার কারণে কাট্টা কাফির ও চির জাহান্নামী হয়েছে। নাঊযুবিল্লাহ!
গণতন্ত্র কাকে বলে?
গণতন্ত্র হচ্ছে- মানবরচিত শাসন ব্যবস্থা, যার আইন-কানুন, নিয়ম-নীতি, তর্জ-তরীক্বা মানুষের দ্বারা রচিত। যা ইহুদী-খৃষ্টানদের দ্বারা প্রবর্তিত ও সংস্কারকৃত শাসন পদ্ধতি। যা মহান আল্লাহ্ পাক উনার তরফ থেকে ওহীর দ্বারা নাযিলকৃত নয়। যা খৃষ্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে গ্রীসে উৎপত্তি লাভ করেছে এবং বর্তমান বিশ্বে ব্যাপক প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে।
“রাষ্ট্র বিজ্ঞান” বইয়ে উল্লেখ করা হয়েছে যে, গণতন্ত্র শব্দের অর্থ হচ্ছে- ‘গণ’ অর্থ জনগণ, আর ‘তন্ত্র’ অর্থ নিয়ম-নীতি বা পদ্ধতি। এক্ষেত্রে গণতন্ত্রের প্রবক্তা আব্রাহাম লিঙ্কনের উক্তি উল্লেখ্য। তার ভাষায়- ‘উবসড়পৎধপু রং ধ এড়াবৎহসবহঃ ড়ভ ঃযব ঢ়বড়ঢ়ষব, নু ঃযব ঢ়বড়ঢ়ষব ধহফ ভড়ৎ ঃযব ঢ়বড়ঢ়ষব’ যার অর্থ হলো- গণতান্ত্রিক সরকার জনগণের, জনগণের দ্বারা ও জনগণের জন্য।
সার্বভৌম ক্ষমতা বা সমস্ত ক্ষমতার মালিক হওয়ার কারণেই গণতন্ত্রে জনপ্রতিনিধিরাই একমাত্র আইন প্রণেতা।
উপরোক্ত আলোচনার মাধ্যমে এটাই প্রমাণিত হয় যে, মহান আল্লাহ্ পাক তিনি দ্বীন ইসলামকে মনোনীত ও পরিপূর্ণ করে নাযিল করেছেন। তার সাথে গণতন্ত্রের কোনই সম্পর্ক নেই। কারণ ইসলামী শরীয়তে আইন-কানুন, নিয়ম-নীতি ও তর্জ-তরীক্বা, মহান আল্লাহ পাক উনার তরফ থেকে নাযিল করা হয়েছে। যা ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ইত্যাদি প্রতিক্ষেত্রেই পালনীয়, তা ক্বিয়ামত পর্যন্ত একইভাবে বলবৎ থাকবে। আর গণতন্ত্রের যে আইন-কানুন, নিয়ম-নীতি ও তর্জ-তরীক্বা, তা মানুষের দ্বারা তৈরী। যার সাথে মহান আল্লাহ্ পাক উনার ও উনার হাবীব নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার অর্থাৎ উনাদের কোনই সম্পর্ক নেই।
নির্বাচনের ইতিহাস: প্রাচীন ইতিহাস: প্রাচীন গ্রীসে খৃষ্টপূর্ব পঞ্চম এবং ষষ্ঠ শতাব্দীতে নির্বাচন প্রথা চালু ছিল। এছাড়া রোমান সিনেটেও এ পদ্ধতি চালু ছিল। ইলেকশন বা নির্বাচন শব্দটি উৎসরিত হয়েছে বা উৎপত্তি লাভ করেছে গ্রীক শব্দ ঊষড়মব হতে যার অর্থ ছিল পছন্দ। নির্বাচনের ধারণা প্রাচীন খৃষ্টীয় ধর্মতত্ত্বের ব্যাখ্যার উপর প্রতিষ্ঠিত।
আধুনিক কালের ইতিহাস: আধুনিক ভোটদান ব্যবস্থার সূত্রপাত ঘটে ইংল্যান্ডে ১৬৮৮ সালে। ইংল্যান্ডে ১৯২৮ সালে সকল নারীদের ভোটাধিকার দেয়া হয়। পরবর্তীতে অর্থাৎ ১৯৪৮ সালে এ সকল পদ্ধতির সমাপ্তি ঘটিয়ে একুশ বছর বা তদুর্ধ বয়সের সকল সম্প্রদায়ের জন্য সার্বজনীন ভোটাধিকার দেয়া হয়।
অপরদিকে আমেরিকায় ১৯২০ সালে মহিলা ভোটাধিকার স্বীকৃত হয়। ১৯৭১ সালে ভোটারদের বয়স সীমা কমিয়ে ১৮ বছরে আনা হয়।
ব্যালট: ব্যালট হচ্ছে একটি লিখিত কাগজ, যার দ্বারা গোপন ভোট প্রদান করা হয়। প্রাচীনকালে এর দ্বারা ভোট গ্রহণ করা হতো এবং গ্রীসে এই পদ্ধতির প্রচলন ছিল। উল্লেখ্য, ১৯৫০ সালের মধ্যে এই ব্যালট প্রথা প্রায় সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে।
ইসলামের দৃষ্টিতে নির্বাচন ও ভোট: প্রকৃতপক্ষে নির্বাচন হচ্ছে গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি। কেননা নির্বাচনের মাধ্যমেই গণতন্ত্র বাস্তবায়িত হয়। আর নির্বাচনের প্রয়োজন তখনই হয় যখন কোন পদে একাধিক ব্যক্তি প্রার্থী হয়। একাধিক প্রার্থীর মধ্যে উক্ত পদ একজনকে দেয়ার লক্ষ্যেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আর উক্ত নির্বাচন ভোট প্রয়োগের মাধ্যমেই বাস্তবায়িত হয়।
উল্লেখ্য, বর্তমান গণতান্ত্রিক নির্বাচন, তার পদপ্রার্থী হওয়া ও পদপ্রার্থীকে ভোট দেয়া ইত্যাদি কাজগুলিকে ইসলামের নামে ফরয-ওয়াজিব হিসেবে উল্লেখ করা নাজায়েয ও হারাম এবং কুফরী।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে- এরূপ ভোট শরীয়তসম্মত কিনা? যদি শরীয়তসম্মত না হয়, তাহলে কেন বা কি কারণে শরীয়তসম্মত নয়?
ভোট আমানত নয়: গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ভোট প্রদান হচ্ছে কথিত সুনাগরিকের কর্তব্য। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে ভোটকে আমানত হিসেবে উল্লেখ করা হয় না। কারণ ভোটদাতাকে যদি আমানতদার বলা হয় তবে প্রশ্ন উঠে, তাকে এ আমানত দিল কে?
যারা ভোটকে আমানত বলে উল্লেখ করে থাকে তারা নিম্নের আয়াত শরীফকে দলীল হিসেবে উল্লেখ করে থাকে। অথচ নিম্নের আয়াত শরীফের সাথে ভোটের কোনই সম্পর্ক নেই।
আমানত সংক্রান্ত আয়াত শরীফ, তার অর্থ, শানে নুযূল ও ব্যাখ্যা উল্লেখ করা হলো-
إِنَّ اللهَ يَأْمُرُكُمْ أَنْ تُـؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلٰى أَهْلِهَا وَإِذَا حَكَمْتُمْ بَيْنَ النَّاسِ أَنْ تَحْكُمُوا بِالْعَدْلِ إِنَّ اللهَ نِعِمَّا يَعِظُكُمْ بِهٖ إِنَّ اللهَ كَانَ سَمِيعًا بَصِيرًا
অর্থ: “নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ্ পাক তিনি তোমাদেরকে আদেশ করেন যে, তোমরা আদায় করে দাও আমানত সমূহকে তার হকদারদেরকে এবং যখন তোমরা মানুষের মধ্যে ফায়সালা বা বিচার করবে, তখন ন্যায়ের সাথে বিচার করো। নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ্ পাক তিনি তোমাদেরকে উত্তম উপদেশ প্রদান করেন। নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ্ পাক তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা।” (সম্মানিত ও পবিত্র সূরা নিসা শরীফ: সম্মানিত ও পবিত্র আয়াত শরীফ ৫৮)
শানে নুযুল: হিজরতের পূর্বে জাহিলিয়াতের যুগে, সপ্তাহে দু’দিন ইছনাইনিল আযীম শরীফ (সোমবার) ও খমীস (বৃহস্পতিবার) কা’বা শরীফের দরজা খোলা হতো। যাতে যারা কা’বা শরীফে প্রবেশ করতে ইচ্ছুক তাঁরা যেন প্রবেশ করতে পারে। এবং উক্ত ঘরের চাবীর জিম্মাদার ছিলেন হযরত উছমান বিন তাল্হা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু।
একদা কা’বা শরীফের দরজা খোলার পর মহান আল্লাহ্ পাক উনার মহাসম্মানিত রসূল, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি কিছু সংখ্যক হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদেরকে নিয়ে প্রবেশ করতে আসলেন, তখন তিনি বাধা প্রদান করেন এবং কিছু কটু কথা বলেন। কেননা, তিনি তখনও ঈমান গ্রহণ করেননি। এ সকল অশালীন ও অশোভনীয় আচরণ লক্ষ্য করে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলেন, “হে উছমান! এমন একদিন আসবে, যেদিন তুমি এ কা’বা ঘরের চাবি আমার মহাসম্মানিত নূরুল মাগফিরাত মুবারকে (হাত মুবারকে) দেখতে পাবে এবং এ চাবির ব্যাপারে ফায়সালা মুবারক করার অধিকারও আমার থাকবে।” ইত্যাদি আরো কিছু কথা বলে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি যিয়ারত মুবারক করে চলে গেলেন। পরবর্তীতে যখন মক্কা শরীফ বিজয় হলো, তখন নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি পবিত্র মক্কা শরীফে কা’বা ঘরের চাবি হযরত উছমান বিন তালহা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার কাছ থেকে নিয়ে কা’বা শরীফ খুলে উনার মধ্যে প্রবেশ করে দু’রাকায়াত নামায পড়লেন। অতঃপর যখন বের হলেন, তখন হযরত আব্বাস আলাইহিস সালাম বললেন, ইয়া রসূলাল্লাহ্ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমরা তো পানি পান করানোর জিম্মাদারীতে আছি, সুতরাং আমাদেরকে কা’বা ঘরের চাবিরও জিম্মাদারী করে দিন।
নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি তো ওহী মুবারক ব্যতিত নিজ থেকে কোন ফায়সালা মুবারক দেননা। কারণ মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-
وَمَا يَنطِقُ عَنِ الْـهَوٰى. إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُّوحٰى
অর্থ: (মহাসম্মানিত রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তিনি ওহী মুবারক ব্যতিত নিজ থেকে কোন কথা মুবারক বলেন না (কোন ফায়সালা মুবারক দেননা)। (সম্মানিত ও পবিত্র সূরা নজম শরীফ: সম্মানিত ও পবিত্র আয়াত শরীফ ৩-৪)
তাই কাকে চাবি দেয়া হবে, তা উক্ত আয়াত শরীফ উনার মাধ্যমে মহান আল্লাহ্ পাক তিনি জানিয়ে দিলেন, তখন নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি হযরত উছমান বিন তালহা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনাকে ডেকে বললেন, “তোমার কি সেই কথা স্মরণ আছে যে, আমি বলেছিলাম কা’বা ঘরের চাবি আমার মহাসম্মানিত নূরুল মাগফিরাত মুবারকে (হাত মুবারকে) আসবে এবং চাবির ব্যাপারে ফায়সালা মুবারক করার অধিকারও আমার থাকবে।” অতঃপর উনার নিকট চাবি অর্পণ করলেন এবং বললেন, এ চাবি ক্বিয়ামত পর্যন্ত তোমার বংশধরগণের নিকট থাকবে, যে এটি নিবে সে যালিমের অন্তর্ভুক্ত হবে।
মহান আল্লাহ্ পাক উনার মহাসম্মানিত রসূল, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার উক্ত ভবিষ্যৎবাণী সত্যে বাস্তবায়িত হওয়া দেখে উনার ইসলাম গ্রহণের পূর্ব সূক্ষ্ম আকাংখা প্রবল হয়ে উঠল এবং তিনি ইসলাম গ্রহণ করলেন।
ব্যাখ্যা: উপরোক্ত আয়াত শরীফে মহান আল্লাহ্ পাক তিনি আমানত সমূহের হকদার কে, তার প্রতিই তার প্রাপ্ত আমানত আদায় করার জন্য আদেশ করেছেন।
উল্লেখ্য, পবিত্র কুরআন শরীফ উনার কোথাও ভোটকে আমানত বলে উল্লেখ করা হয়নি। শুধু তাই নয়, হাদীছ শরীফ, ইজ্মা ও ক্বিয়াসের কোথাও আমানত বলে উল্লেখ করা হয়নি। কারণ ভোট প্রথা ইসলামের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়। অর্থাৎ ইসলামের নামে করা সম্পূর্ণই হারাম। যা ইসলামের নামে করা জায়েয নেই এবং সম্পূর্ণই হারাম। তা কি করে ঈমানদারদের জন্য আমানত বলে সাব্যস্ত হতে পারে?
ভোটকে ইসলামের দৃষ্টিতে ও ইসলামের নামে আমানত বলা সম্পূর্ণ কুফরী।
ইসলামের দৃষ্টিতে ভোট সাক্ষ্য নয়: সাক্ষী প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্ পাক তিনি পবিত্র কুরআন শরীফে ইরশাদ মুবারক করেন-
يَاأَيُّـهَا الَّذِينَ اٰمَنُوا كُونُوا قَـوَّامِينَ بِالْقِسْطِ شُهَدَاءَ لِلّٰهِ وَلَوْ عَلٰى أَنْـفُسِكُمْ أَوِ الْوَالِدَيْنِ وَالْأَقْـرَبِينَ إِنْ يَّكُنْ غَنِيًّا أَوْ فَقِيرًا فَاللهُ أَوْلٰى بِهِمَا فَلَا تَـتَّبِعُوا الْهَوٰى أَنْ تَـعْدِلُوا وَإِنْ تَـلْوُوا أَوْ تُـعْرِضُوا فَإِنَّ اللهَ كَانَ بِمَا تَـعْمَلُونَ خَبِيرًا
অর্থ: “হে ঈমানদারগণ! তোমরা ইনছাফের উপর কায়েম থাক, মহান আল্লাহ্ পাক উনার জন্য সাক্ষ্য দেয়ার ব্যাপারে। যদি তা তোমাদের নিজেদের, পিতা-মাতার ও নিকট আত্মীয়দের বিরুদ্ধে হয়। হোক চাই সে ধনী বা দরিদ্র। অতঃপর মহান আল্লাহ্ পাক তিনিই তাদের প্রতি অধিক কল্যাণকামী। তোমরা ইনছাফ করতে গিয়ে নফ্সের অনুসরণ করোনা। আর যদি তোমরা বর্ণনায় বক্রতা অবলম্বন করো অথবা সঠিক সাক্ষ্য দেয়া হতে বিরত থাক, তবে নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ্ পাক তিনি তোমাদের কাজ সম্পর্কে সমধিক জ্ঞাত।” (সম্মানিত ও পবিত্র সূরা নিসা শরীফ: সম্মানিত ও পবিত্র আয়াত শরীফ ১৩৫)
মহান আল্লাহ্ পাক তিনি আরো ইরশাদ মুবারক করেন-
يَاأَيُّـهَا الَّذِينَ اٰمَنُوا كُونُوا قَـوَّامِينَ لِلّٰهِ شُهَدَآءَ بِالْقِسْطِ وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَاٰنُ قَـوْمٍ عَلٰى أَلَّا تَـعْدِلُوا اِعْدِلُوا هُوَ أَقْـرَبُ لِلتَّـقْوٰى وَاتَّـقُوا اللهَ إِنَّ اللهَ خَبِيرٌ بِمَا تَـعْمَلُونَ
অর্থ: “হে ঈমানদারগণ! তোমরা মহান আল্লাহ্ পাক উনার জন্য সঠিক সাক্ষ্য দেয়ার ব্যাপারে ইন্ছাফের উপর কায়েম থাক এবং কোন সম্প্রদায়ের শত্রুতা যেন তোমাদেরকে ন্যায় বিচার করা হতে বিরত না রাখে, তোমরা ন্যায় বিচার করো। এটি তাক্বওয়া বা মহান আল্লাহ্ পাক উনার ভীতির অধিক নিকটবর্তী এবং তোমরা মহান আল্লাহ্ পাক উনাকে ভয় করো। নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ্ পাক তিনি তোমাদের কাজ সম্পর্কে সমধিক অবহিত।” (সম্মানিত ও পবিত্র সূরা মায়িদা শরীফ: সম্মানিত ও পবিত্র আয়াত শরীফ ৮)
শানে নুযূল: একদা একজন ধনী ও একজন গরীব লোক মহান আল্লাহ্ পাক উনার মহাসম্মানিত রসূল, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নিকট এসে পরস্পর পরস্পরকে অপরাধের জন্য দোষারোপ করতে লাগলো। অতঃপর নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি গরীবকে হক্বের উপর দেখে তার পক্ষে রায় দিলেন। তখন মহান আল্লাহ্ পাক তিনি উপরোক্ত আয়াত শরীফ নাযিল করেন।
কারো মতে, ত্ব’মা ইবনে আবরাক্ব নামক এক ব্যক্তির পক্ষে তার সম্প্রদায়ের লোকেরা তার বিরুদ্ধবাদীদের বিপক্ষে মিথ্যা ও বাতিল সাক্ষী দিয়েছিল। তাদের সম্পর্কে উপরোক্ত আয়াত শরীফ নাযিল হয়।
ব্যাখ্যা: উপরোক্ত আয়াত শরীফে মহান আল্লাহ্ পাক তিনি প্রতিক্ষেত্রে, সর্বাবস্থায়, সকলের জন্যই, চাই সে আত্মীয় বা অনাত্মীয়, শত্রু বা মিত্র, নিকটবর্তী বা দূরবর্তী যে কেউ হোক না কেন, এমন কি নিজের বিরূদ্ধে হলেও ইন্ছাফের সাথে সাক্ষ্য প্রদান করার জন্য আদেশ করেছেন। অনুরূপ “সূরা মায়েদা শরীফের” ৮নং আয়াত শরীফেও সঠিক বা ইন্ছাফের সাথে সাক্ষ্য প্রদান করার জন্য মহান আল্লাহ্ পাক তিনি নির্দেশ করেছেন।
যার সাথে ভোট প্রথার মিল নেই। ভোটকে স্বাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করলে কুরআন শরীফকে অস্বীকার করা হয়। মহান আল্লাহ্ পাক তিনি “পবিত্র সূরা বাক্বারার” ২৮২ নং আয়াত শরীফে বলেন-
وَاسْتَشْهِدُوا شَهِيدَيْنِ مِنْ رِّجَالِكُمْ فَإِنْ لَّـمْ يَكُونَا رَجُلَيْنِ فَـرَجُلٌ وَّامْرَأَتَانِ
অর্থ: “তোমাদের পুরুষদের মধ্য হতে দু’জন সাক্ষী দাঁড় করাও। যদি দু’জন পুরুষ না পাওয়া যায় তাহলে একজন পুরুষ ও দু’জন মহিলার সাক্ষ্য গ্রহণ করো।” অর্থাৎ ইসলামে দু’জন মহিলার সাক্ষ্য একজন পুরুষের সমান।
আর ভোট প্রথায় একজন মহিলা একজন পুরুষের সমান যা কুরআন শরীফের আয়াতের বা আদেশের খেলাফ। তাহলে ভোট প্রথা কি করে ইসলামের দৃষ্টিতে সাক্ষ্য বলে গণ্য হতে পারে?
ভোট প্রথাকে সাক্ষ্য হিসেবে হুকুম দেয়া বা বলা সম্পূর্ণ নাজায়েয, হারাম ও কুফরী।
ভোট সুপারিশ নয়: সুপারিশ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্ পাক তিনি বলেন-
مَنْ يَّشْفَعْ شَفَاعَةً حَسَنَةً يَكُنْ لَّهٗ نَصِيبٌ مِّنْـهَا وَمَنْ يَّشْفَعْ شَفَاعَةً سَيِّئَةً يَكُنْ لَّهٗ كِفْلٌ مِّنْـهَا وَكَانَ اللهُ عَلٰى كُلِّ شَيْءٍ مُّقِيتًا
অর্থ: “যে ব্যক্তি সুপারিশ করবে কোন নেক কাজের জন্য, সে এর দরুণ (ছওয়াবের) একটা অংশ পাবে। আর যে ব্যক্তি সুপারিশ করবে কোন পাপ কাজের জন্য, সে এর দরুণ (গুণাহ্র) একটা অংশ পাবে এবং মহান আল্লাহ্ তায়ালা তিনি সর্ব বিষয়ে ক্ষমতাশীল।” (সম্মানিত ও পবিত্র সূরা নিসা শরীফ:সম্মানিত ও পবিত্র আয়াত শরীফ ৮৫)
শানে নুযূল: উল্লিখিত আয়াত শরীফ পরস্পর পরস্পরের মাঝে সুুপারিশ করার প্রসঙ্গে নাযিল হয়েছে। আয়াত শরীফের ব্যাখ্যায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, কেউ যদি শরীয়তসম্মত কোন নেক কাজের সুপারিশ করে, সে নেক কাজ সংঘটিত হোক বা না হোক সে নেকী লাভ করবে। তদ্রুপ কেউ যদি কোন পাপ কাজের সুপারিশ করে, তাহলে এর জন্য যা গুণাহ্ হবে, তার একটা অংশ তার উপর বর্তাবে।
অতএব, ভোট প্রথাই যেখানে ইসলামে গ্রহণযোগ্য নয় সেখানে ইসলামের দৃষ্টিতে তার জন্য সুপারিশ কি করে গ্রহণযোগ্য হতে পারে? মূলতঃ ইসলামের নামে এরূপ সুপারিশ করা বা ভোট দেয়াও হারাম, নাজায়িয ও কুফরী।
ভোট উকিল বা প্রতিনিধি নিয়োগ নয়: উকিল বা প্রতিনিধি নিয়োগ করা প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্ পাক তিনি বলেন-
أَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَهَهُ هَوَاهُ أَفَأَنْتَ تَكُونُ عَلَيْهِ وَكِيلًا
অর্থ: “আপনি কি লক্ষ্য করেননি? যে ব্যক্তি তার নফ্স্ বা প্রবৃত্তিকে ইলাহ্ (উপাস্য) হিসেবে গ্রহণ করে, এরপরও কি আপনি তার উকিল হবেন?” (সম্মানিত ও পবিত্র সূরা ফুরক্বান শরীফ: সম্মানিত ও পবিত্র আয়াত শরীফ ৪৩)
শানে নুযূল: নজর বিন হারেস ও তার সঙ্গী-সাথীরা নফ্সের চাহিদা মুতাবেক কোন বড় ও সুন্দর ধরণের পাথর বা অন্য কিছু যখন দেখতো, তখন সেটিকে উপাস্য হিসেবে গ্রহণ করে নিত। আবার পরবর্তীতে তার চাইতে আরো বড় ও সুন্দর ইত্যাদি আকৃতির কোন কিছু দেখলে প্রথমটি বাদ দিয়ে পরবর্তীটিকে উপাস্য হিসেবে গ্রহণ করতো।
ব্যাখ্যা: যারা নফ্স্ বা প্রবৃত্তিকে উপাস্য হিসেবে গ্রহণ করে তথা পবিত্র কুরআন শরীফ-পবিত্র সুন্নাহ শরীফ উনাদের খেলাফ কাজ করে বা তাতে অংশ গ্রহণ করে, ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে তাদের উকিল হওয়া সম্পূর্ণভাবে নাজায়েয ও হারাম। কেননা নফ্সের অনুসরণকারী ব্যক্তি মহান আল্লাহ্ পাক উনার নাফরমানীতে লিপ্ত। এ প্রসঙ্গে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-
وَلَئِنِ اتَّـبَـعْتَ أَهْوَاءَهُمْ بَـعْدَ الَّذِي جَآءَكَ مِنَ الْعِلْمِ مَا لَكَ مِنَ اللهِ مِنْ وَّلِيٍّ وَّلَا نَصِيرٍ
অর্থ: “আপনার নিকট সুস্পষ্ট প্রমাণাদি আসার পর কেউ যদি তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে তাহলে মহান আল্লাহ্ পাক উনার পক্ষ হতে তার জন্য কোন অভিভাবক ও সাহায্যকারী থাকবে না।”
উল্লেখ্য, উকিল বা প্রতিনিধি নির্ধারণ করতে হলে নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে। এক্ষেত্রে বলতে হয়, ইসলামের নামে নির্বাচন যেহেতু হারাম। কাজেই সে হারাম কাজের জন্য উকিল মনোনীত হতে চাওয়া অথবা মনোনীত করা কোনটিই জায়েয নেই।
নির্বাচন যে ইসলামের দৃষ্টিতে ও ইসলামের নামে কখনোই গ্রহণযোগ্য নয় সে প্রসঙ্গে স্বয়ং নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-
وَاللهِ لَا نُـوَلِّى عَلٰى هٰذَا الْعَمَلِ أَحَدًا سَأَلَهٗ وَلَا أَحَدًا حَرَصَ عَلَيْهِ
অর্থ: “এই কাজে (শাসক পদে) যারা পদপ্রার্থী হয় বা পদের আকাঙ্খা করে আমরা তাদের পদ দেই না।” (বুখারী, মুসলিম)
যেখানে স্বয়ং নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি নির্বাচন পদ্ধতি শুধু অপছন্দই করেননি সাথে সাথে নিষেধও করেছেন। তাহলে ইসলামের নামে নির্বাচন জায়েয কি করে বলা যেতে পারে?
তাই ইসলামের নামে নির্বাচন জায়েয বলা কুফরী। যা সমগ্র পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র হাদীছ শরীফে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষভাবে পবিত্র সূরা ফাতিহা শরীফেও বলা হয়েছে।
অতএব, উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা এটাই সাব্যস্ত হলো যে, ইসলামের নামে ভোট দেয়া ওয়াজিব বলা কুফরীর অন্তর্ভুক্ত। আরো সাব্যস্ত হলো, ভোটকে ইসলামের নামে আমানত, সাক্ষ্য, সুপারিশ এবং উকিল বা প্রতিনিধি নিয়োগের মাধ্যম বলাও সম্পূর্ণ হারাম ও কুফরীর অন্তর্ভুক্ত। তাই যারাই ইসলামের নামে উপরোক্ত আক্বীদা ও আমলে লিপ্ত তাদের উচিৎ খালিছ তওবা করে ছহীহ্ আক্বীদা ও আমলে ফিরে আসা।
{বিঃ দ্রঃ এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হলে মাসিক আল বাইয়্যিনাত শরীফ উনার ২৬, ৩০, ৮৪ ও ৯০তম সংখ্যার সুওয়াল-জাওয়াব বিভাগ এবং ১৬১ হতে ১৭৫তম সংখ্যার ফতওয়া বিভাগ পাঠ করুন।}
মুহম্মদ আব্দুল কাদির
সংযুক্ত আরব আমিরাত।
সুওয়াল: পবিত্র শবে বরাত কি? এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র হাদীছ শরীফ-এ কোন বর্ণনা আছে কি? জানিয়ে বাধিত করবেন।
জাওয়াব: পবিত্র শবে বরাত হচ্ছে পবিত্র দ্বীন ইসলাম উনার বিশেষ রাত্রিসমূহের মধ্যে একটি রাত্র। যা পবিত্র শা’বান মাস উনার চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাত্রিতে হয়ে থাকে। শবে বরাত উনার অর্থ হচ্ছে ‘মুক্তির রাত’ বা ‘নাজাতের রাত।’
‘শব’ ফার্সী শব্দ। যার অর্থ হচ্ছে, রাত। আর বরাত আরবী শব্দ যা উর্দূ, ফার্সী, বাংলা ইত্যাদি সব ভাষাতেই ব্যবহার হয়ে থাকে। যার অর্থ ‘মুক্তি’ ও ‘নাজাত’ ইত্যাদি। পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদের ভাষা যেহেতু আরবী তাই ফার্সী ‘শব’ শব্দটি পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদের মধ্যে না থাকাটাই স্বাভাবিক।
স্মরণীয় যে, পবিত্র কুরআন শরীফ উনার ভাষায় ‘শবে বরাতকে’ ‘লাইলাতুম মুবারাকাহ বা বরকতময় রাত্রি’ এবং পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার ভাষায় শবে বরাতকে ‘লাইলাতুন নিছফি মিন শা’বান’ বা শা’বান মাসের চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাত্রি’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
যেমন মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-
إِنَّاۤ أَنْـزَلْنَاهُ فِي لَيْـلَةٍ مُّبَارَكَةٍ إِنَّا كُنَّا مُنْذِرِينَ. فِيهَا يُـفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍ حَكِيمٍ. أَمْرًا مِّنْ عِنْدِنَا إِنَّا كُنَّا مُرْسِلِينَ
অর্থ: “নিশ্চয়ই আমি বরকতময় রাত্রিতে (শবে বরাতে) পবিত্র কুরআন শরীফ নাযিল করেছি অর্থাৎ নাযিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আর আমিই ভয় প্রদর্শনকারী। উক্ত রাত্রিতে আমার পক্ষ থেকে সমস্ত প্রজ্ঞাময় কাজগুলো ফায়সালা করা হয়। আর নিশ্চয়ই আমিই প্রেরণকারী।” (সম্মানিত ও পবিত্র সূরা দুখান শরীফ : সম্মানিত ও পবিত্র আয়াত শরীফ ৩, ৪, ৫)
শবে বরাতে যে সকল বিষয়ের ফায়সালা করা হয় তা ‘পবিত্র সূরা দুখান উনার’ উক্ত পবিত্র আয়াত শরীফ উনার মধ্যেই উল্লেখ আছে। যেমন ইরশাদ মুবারক হয়েছে-
فِيهَا يُـفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍ حَكِيمٍ
অর্থাৎ- “উক্ত রাত্রিতে প্রজ্ঞাসম্পন্ন সকল বিষয়ের ফায়সালা করা হয়।”
উক্ত পবিত্র আয়াতাংশ উনার সমর্থনে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-
فِيهَا أَنْ يُّكْتَبَ كُلُّ مَوْلُودٍ مِّنْ بَنِي اٰدَمَ فِي هٰذِهِ السَّنَةِ، وَفِيهَا أَنْ يُّكْتَبَ كُلُّ هَالِكٍ مِّنْ بَنِي اٰدَمَ فِي هٰذِهِ السَّنَةِ، وَفِيهَا تُـرْفَعُ أَعْمَالُهُمْ، وَفِيهَا تُـنْـزَلُ أَرْزَاقُـهُمْ
অর্থাৎ- “বরাতের রাত্রিতে ফায়সালা করা হয় কতজন সন্তান আগামী এক বৎসর জন্ম গ্রহণ করবে এবং কতজন সন্তান মৃত্যুবরণ করবে। এ রাত্রিতে বান্দাদের আমলগুলো উপরে উঠানো হয় অর্থাৎ মহান আল্লাহ পাক উনার দরবার শরীফ-এ পেশ করা হয় এবং এ রাত্রিতে বান্দাদের রিযিকের ফায়সালা করা হয়।” (বায়হাক্বী শরীফ, মিশকাত শরীফ)
কাজেই, মহান আল্লাহ পাক তিনি যেহেতু বলেছেন যে, বরকতময় রাত্রিতে সকল কাজের ফায়সালা করা হয় আর উনার হাবীব, নূরে মুজাসসাম, হাবীবূল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনিও যেহেতু বলেছেন যে, বরাতের রাত্রিতেই সকল বিষয় যেমন- হায়াত, মউত, রিযিক, আমল ইত্যাদি যা কিছু মানুষের প্রয়োজন হয়ে থাকে তার ফায়সালা করা হয় সেহেতু বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, “পবিত্র সূরা দুখান শরীফ উনার” উক্ত পবিত্র আয়াত শরীফ দ্বারা পবিত্র শবে বরাতকেই বুঝানো হয়েছে।
উল্লেখ্য, বরাতের রাত উদযাপন বা উক্ত রাতে খাছভাবে ইবাদত-বন্দেগী, দোয়া-ইস্তিগফার ও দিনে রোযা রাখা ইত্যাদির নির্দেশ পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র সুন্নাহ শরীফ উনাদের মধ্যে রয়েছে। যেমন পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত রয়েছে-
عَنْ حَضْرَتِ الْاِمَامِ الْاَوَّلِ كَرَّمَ اللهُ وَجْهَهٗ عَلَيْهِ السَّلَامُ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وسَلَّمَ: إِذَا كَانَتْ لَيْـلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ، فَـقُومُوا لَيْـلَهَا وَصُومُوا يَـوْمَهَا، فَإِنَّ اللهَ يَـنْزِلُ فِيهَا لِغُرُوبِ الشَّمْسِ إِلٰى سَمَاءِ الدُّنْـيَا، فَـيَـقُولُ: أَلَا مِنْ مُّسْتَـغْفِرٍ فَأَغْفِرَ لَهٗ أَلَا مُسْتَـرْزِقٌ فَأَرْزُقَهٗ أَلَا مُبْـتَـلًى فَأُعَافِيَهٗ أَلَا كَذَا أَلَا كَذَا حَتّٰى يَطْلُعَ الْفَجْرُ
অর্থ: “হযরত ইমামুল আউওয়াল কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম উনার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, যখন শা’বান মাসের ১৫ তারিখ রাত্রি অর্থাৎ বরাতের রাত্রি উপস্থিত হবে তখন তোমরা উক্ত রাত্রিতে নামায আদায় করবে এবং দিনে রোযা রাখবে। কেননা নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ পাক তিনি উক্ত রাত্রিতে সূর্যাস্তের সময় পৃথিবীর আকাশে আসেন অর্থাৎ রহমতে খাছ নাযিল করেন। অতঃপর ঘোষণা করেন, “কোন ক্ষমা প্রার্থনাকারী আছো কি? আমি তাকে ক্ষমা করে দিবো।” “কোন রিযিক প্রার্থনাকারী আছো কি? আমি তাকে রিযিক দান করবো।” “কোন মুছিবতগ্রস্ত ব্যক্তি আছো কি? আমি তার মুছিবত দূর করে দিবো।” এভাবে ফজর পর্যন্ত ঘোষণা করতে থাকেন।” (ইবনে মাজাহ শরীফ, মিশকাত শরীফ)
অতএব প্রমাণিত হলো যে, পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদের মধ্যেই শবে বরাতের কথা উল্লেখ আছে। তবে পবিত্র কুরআন শরীফে বরাতের রাতকে ‘লাইলাতুম মুবারকাহ’ আর পবিত্র হাদীছ শরীফে ‘লাইলাতুন নিছফি মিন শা’বান’ বলা হয়েছে।
অনেকে বলে থাকে যে, পবিত্র সূরা দুখান শরীফ উনার উক্ত পবিত্র আয়াত শরীফ দ্বারা শবে ক্বদরকে বুঝানো হয়েছে। কেননা উক্ত পবিত্র আয়াত শরীফে স্পষ্টই উল্লেখ আছে যে, “আমি পবিত্র কুরআন শরীফ নাযিল করেছি ….” আর পবিত্র কুরআন শরীফ যে ক্বদরের রাত্রিতে নাযিল হয়েছে তা ‘পবিত্র সূরা ক্বদর শরীফ’ উনার মধ্যে উল্লেখ আছে।
মূলতঃ যারা উপরোক্ত মন্তব্য করে থাকে তারা ‘পবিত্র সূরা দুখান শরীফ উনার’ উক্ত পবিত্র আয়াত শরীফ উনার সঠিক ব্যাখ্যা না জানা ও না বুঝার কারণেই করে থাকে। মহান আল্লাহ পাক তিনি যে ‘পবিত্র সূরা দুখান শরীফ’ উনার মধ্যে বলেছেন, “আমি বরকতময় রজনীতে পবিত্র কুরআন শরীফ নাযিল করেছি।” এর ব্যাখ্যামূলক অর্থ হলো, “আমি বরকতময় রাত্রিতে পবিত্র কুরআন শরীফ নাযিলের ফায়সালা করেছি।”
আর ‘পবিত্র সূরা ক্বদর শরীফ’ উনার মধ্যে যে বলেছেন, “আমি ক্বদরের রাত্রিতে পবিত্র কুরআন শরীফ নাযিল করেছি।”
এর ব্যাখ্যামূলক অর্থ হলো, “আমি ক্বদরের রাত্রিতে পবিত্র কুরআন শরীফ একসাথে লৌহে মাহফূজ থেকে বাইতুল ইজ্জতে নাযিল করি।” যা সামায়ে দুনিয়া বা পৃথিবীর আকাশে অবস্থিত। সেখান থেকে মহাসম্মানিত ১২ই রবীউল আউওয়াল শরীফ ইয়াওমুল ইছনাইন শরীফ বা সোমবার পৃথিবীতে নাযিল শুরু করি।
অর্থাৎ মহান আল্লাহ পাক তিনি “লাইলাতুম মুবারকাহ বা শবে বরাতে” পবিত্র কুরআন শরীফ নাযিলের সিদ্ধান্ত নেন আর শবে ক্বদরে তা বাইতুল ইজ্জতে নাযিল করেন।
এজন্যে হযরত মুফাসসিরীনে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনারা শবে বরাতকে لَيْـلَةُ التَّجْوِيزِ অর্থাৎ ‘ফায়সালার রাত’ আর শবে ক্বদরকে لَيْلَةُ التَّـنْفِيذِ অর্থাৎ ‘জারী করার রাত’ বলে উল্লেখ করেছেন।
পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে আরো বর্ণিত রয়েছে-
عَنْ حَضْرَتْ اُمِّ الْـمُؤْمِنِينَ الثَّالِثَةِ الصِّدِّيقَةِ عَائِشَةَ عَلَيْـهَا السَّلَامُ، قَالَتْ: فَـقَدْتُّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَيْلَةً فَإِذَا هُوَ بِالْبَقِيعِ فَـقَالَ ” أَكُنْتِ تَخَافِينَ أَنْ يَّحِيفَ اللهُ عَلَيْكِ وَرَسُولُهُ؟ قُـلْتُ: يَا رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِنِّي ظَنَـنْتُ أَنَّكَ أَتَـيْتَ بَـعْضَ نِسَائِكَ فَـقَالَ: إِنَّ اللهَ تَـعَالٰى يَـنْزِلُ لَيْـلَةَ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيـَا فَـيَـغْفِرُ لِأَكْثَـرَ مِنْ عَدَدِ شَعْرِ غَنَمِ كَلْبٍ
অর্থ: হযরত উম্মুল মু’মিনীন আছছালিছাহ ছিদ্দীক্বাহ আলাইহাস সালাম উনার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাথে কোন এক রাত্রিতে রাত্রিযাপন করছিলাম। এক সময় উনাকে বিছানা মুবারক-এ না পেয়ে আমি মনে করলাম যে, তিনি হয়তো অন্য কোন হযরত উম্মুল মু’মিনীন আলাইহিন্নাস সালাম উনাদের হুজরা শরীফে তাশরীফ নিয়েছেন। অতঃপর আমি তালাশ করে উনাকে জান্নাতুল বাক্বীতে পেলাম। সেখানে তিনি উম্মতের জন্য মহান আল্লাহ পাক উনার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছেন। এ অবস্থা দেখে আমি স্বীয় হুজরা শরীফে ফিরে আসলে তিনিও ফিরে এসে আমাকে বললেন, আপনি কি মনে করেছেন, মহান আল্লাহ পাক সুবহানাহূ ওয়া তায়ালা ও উনার হাবীব নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনারা আপনার সাথে ব্যতিক্রম ব্যবহার করবেন! আমি বললাম, ইয়া রসূলাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমি ধারণা করেছিলাম যে, আপনি হয়তো অপর কোন হুজরা শরীফে তাশরীফ মুবারক নিয়েছেন। অতঃপর নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বললেন, নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ পাক তিনি পবিত্র শা’বান মাস উনার ১৫ তারিখ রাত্রিতে পৃথিবীর আকাশে অবতরণ করেন অর্থাৎ রহমতে খাছ নাযিল করেন। অতঃপর তিনি বনী কালবের মেষের গায়ে যতো পশম রয়েছে তার চেয়ে অধিক সংখ্যক বান্দাকে ক্ষমা করে থাকেন।” (তিরমিযী, ইবনে মাজাহ, রযীন, মিশকাত)
কাজেই, পবিত্র শবে বরাত উদ্যাপন করা বা উক্ত রাত্রিতে ইবাদত-বন্দেগী করা পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র সুন্নাহ শরীফ উনাদেরই নির্দেশের অন্তর্ভুক্ত। মোটেও বিদয়াত ও নাজায়িয নয়। বরং সম্মানিত সুন্নত উনার অন্তর্ভুক্ত।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: পবিত্র শবে বরাত সম্পর্কে মাসিক আল বাইয়্যিনাত শরীফ উনার ১৯৫ থেকে ২১৩তম সংখ্যায় অর্থাৎ মোট ১৯টি সংখ্যায় ৩৮৬টি অকাট্য ও নির্ভরযোগ্য দলীলের ভিত্তিতে বিস্তারিত ফতওয়া প্রদান করা হয়েছে। তাই এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হলে উল্লিখিত ফতওয়া সংগ্রহ করে পাঠ করুন।
মুহম্মদ আলাউদ্দীন
মতলব, চাঁদপুর
সুওয়াল: শবে বরাতে কি আমল করতে হবে? দয়া করে জানিয়ে বাধিত করবেন।
জাওয়াব: শবে বরাত হচ্ছে মুক্তি বা ভাগ্য অথবা নাজাতের রাত।
এ প্রসঙ্গে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত আছে-
عَنْ حَضْرَتْ أَبِي مُوسَى الأَشْعَرِيِّ رَضِىَ اللهُ تَـعَالٰى عَنْهُ، عَنْ رَّسُولِ اللهِ صَلَّى الله عَليْهِ وسَلَّمَ قَالَ: إِنَّ اللهَ لَيَطَّلِعُ فِي لَيْـلَةِ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ فَـيَـغْفِرُ لِجَمِيعِ خَلْقِهٖ إِلَّا لِمُشْرِكٍ أَوْ مُشَاحِنٍ
অর্থ: “হযরত আবু মূসা আশআরী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার থেকে বর্ণনা করেন, নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ পাক তিনি শা’বান মাসের ১৫ তারিখ রাত্রিতে ঘোষণা করেন যে, উনার সমস্ত মাখলূকাতকে তিনি ক্ষমা করে দিবেন। শুধু মুশরিক ও হিংসা-বিদ্বেষকারী ব্যতীত। (ইবনে মাজাহ শরীফ, আহমদ শরীফ, মিশকাত শরীফ)
এ ব্যতিত বরাতের রাত্রিতে ইবাদত-বন্দেগী করে ও পরবর্তী দিনে রোযা রেখে মহান আল্লাহ পাক ও উনার রসূল, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদের সন্তুষ্টি অর্জন করাই মূল উদ্দেশ্য।
এ প্রসঙ্গে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত রয়েছে-
عَنْ حَضْرَتِ الْاِمَامِ الْاَوَّلِ كَرَّمَ اللهُ وَجْهَهٗ عَلَيْهِ السَّلَامُ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَليْهِ وسَلَّمَ: إِذَا كَانَتْ لَيْلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ، فَقُومُوا لَيْلَهَا وَصُومُوا يَوْمَهَا، فَإِنَّ اللَّهَ يَنْزِلُ فِيهَا لِغُرُوبِ الشَّمْسِ إِلٰى سَمَاءِ الدُّنْيَا، فَيَقُولُ: أَلَا مِنْ مُسْتَغْفِرٍ فَأَغْفِرَ لَهٗ أَلَا مُسْتَرْزِقٌ فَأَرْزُقَهٗ أَلَا مُبْتَلًى فَأُعَافِيَهٗ أَلَا كَذَا أَلَا كَذَا حَتّٰى يَطْلُعَ الْفَجْرُ.
অর্থ: “হযরত ইমামুল আউওয়াল কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম উনার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, যখন শা’বান মাসের ১৫ তারিখ রাত্রি অর্থাৎ বরাতের রাত্রি উপস্থিত হবে তখন তোমরা উক্ত রাত্রিতে নামায আদায় করবে এবং দিনে রোযা রাখবে। কেননা নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ পাক তিনি উক্ত রাত্রিতে সূর্যাস্তের সময় অর্থাৎ সূর্য ডুবার পর পৃথিবীর আকাশে আসেন অর্থাৎ রহমতে খাছ নাযিল করেন। অতঃপর ঘোষণা করেন, “কোন ক্ষমা প্রর্ার্থনাকারী আছো কি? আমি তাকে ক্ষমা করে দিবো।” “কোন রিযিক প্রার্থনাকারী আছো কি? আমি তাকে রিযিক দান করবো।” “কোন মুছিবতগ্রস্ত ব্যক্তি আছো কি? আমি তার মুছিবত দূর করে দিবো।” এভাবে ফজর পর্যন্ত অর্থাৎ সোবহে সাদিক হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত ঘোষণা করতে থাকেন।” (ইবনে মাজাহ, মিশকাত)
উপরোক্ত পবিত্র হাদীছ শরীফসমূহের সংক্ষিপ্ত বিষয়বস্তু হলো, বরাতের রাত্রিতে ইবাদত-বন্দেগী করতে হবে এবং দিনে রোযা রাখতে হবে। যার মাধ্যমে মহান আল্লাহ পাক তিনি বান্দাকে ক্ষমা করে স্বীয় সন্তুষ্টি দান করবেন।
বরাতের রাত্রিতে যদিও পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র সুন্নাহ শরীফ উনাদের মাধ্যমে কোন্ কোন্ ইবাদত-বন্দেগী করতে হবে তা নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়নি। তবে ইবাদত-বন্দেগী করার জন্য নির্দেশ মুবারক দেয়া হয়েছে। সে লক্ষ্যে যেসব ইবাদত-বন্দেগী করতে হবে তার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেয়া হলো-
বরাতের নামায
শবে বরাত উপলক্ষে ৪, ৬, ৮, ১০, ১২ রাকায়াত নফল নামায পড়া যেতে পারে।
ছলাতুত তাসবীহ নামায
অতঃপর ছলাতুত তাসবীহ নামায পড়বে, যার দ্বারা মানুষের সমস্ত গুণাহখতা ক্ষমা হয়।
তাহাজ্জুদ নামায
অতঃপর তাহাজ্জুদ নামায পড়বে, যা দ্বারা মহান আল্লাহ পাক উনার নৈকট্য হাছিল হয়।
পবিত্র কুরআন শরীফ তিলাওয়াত
পবিত্র কুরআন শরীফ তিলাওয়াত করবে, যার মাধ্যমে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার সন্তুষ্টি অর্জিত হয়। কেননা নফল ইবাদতের মধ্যে পবিত্র কুরআন শরীফ তিলাওয়াত হচ্ছে সর্বোত্তম আমল।
পবিত্র মীলাদ শরীফ ও দুরূদ শরীফ পাঠ
পবিত্র মীলাদ শরীফ ও পবিত্র দুরূদ শরীফ পাঠ করবে, যার দ্বারা মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিইয়ীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সন্তুষ্টি অর্জিত হয়।
যিকির-আযকার
যিকির-আযকার করবে, যার দ্বারা দিল ইছলাহ হয়।
কবর যিয়ারত
কবরস্থান যিয়ারত করবে, যার দ্বারা সুন্নত আদায় হয়। তবে কবর বা মাযার শরীফ যিয়ারত করতে গিয়ে সারারাত্র ব্যয় করে দেয়া জায়িয হবেনা। সুন্নত আদায়ের লক্ষ্যে নিকটবর্তী কোন কবরস্থান যিয়ারত করে চলে আসবে।
দান-ছদকা
গরীব-মিসকীনকে দান-ছদকা করবে ও লোকজনদের খাদ্য খাওয়াবে, যার দ্বারা হাবীবুল্লাহ হওয়া যায়।
হালুয়া-রুটি বা গোশত রুটি পাকানো
উল্লেখ্য, শবে বরাতে হালুয়া-রুটি অথবা অন্য কোন বিশেষ খাবার তৈরী করা শরীয়তে নাজায়িয নয়। শবে বরাত উপলক্ষে বিশেষ করে আমাদের দেশ ও তার আশ-পাশের দেশসমূহে যে রুটি-হালুয়ার ব্যাপক প্রচলন রয়েছে তার পিছনে ইতিহাস রয়েছে।
ইতিহাসে উল্লেখ করা হয়েছে, পূর্ববর্তী যামানায় যখন বর্তমানের মতো বাজার, বন্দর, হোটেল-রেঁস্তরা ইত্যাদি সর্বত্র ছিলোনা তখন মানুষ সাধারণতঃ সরাইখানা, লঙ্গরখানা, মুসাফিরখানা ইত্যাদিতে ছফর অবস্থায় প্রয়োজনে রাত্রিযাপন করতেন। অর্থাৎ মুসাফিরগণ তাদের সফর অবস্থায় চলার পথে আত্মীয়-স্বজন বা পরিচিত জনের ঘর-বাড়ি না পেলে সাধারণতঃ সরাইখানা, মুসাফিরখানা ও লঙ্গরখানায় রাত্রিযাপন করতেন। আর এ সমস্ত মুসাফিরখানা, লঙ্গরখানা ও সরাইখানার দায়িত্বে যারা নিয়োজিত থাকতেন উনারাই মুসাফিরদের খাবারের ব্যবস্থা করতেন।
বিশেষ করে মুসাফিরগণ শবে বরাতে যখন উল্লিখিত স্থানসমূহে রাত্রি যাপন করতেন তখন উনাদের মধ্যে অনেকেই রাত্রিতে ইবাদত-বন্দেগী করতেন ও দিনে রোযা রাখতেন। যার কারণে উল্লিখিত স্থানসমূহের দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিগণ খাবারের ব্যাবস্থা করতেন যাতে মুসাফিরদের রাত্রে ইবাদত-বন্দেগী করতে ও দিনে রোযা রাখতে অসুবিধা না হয়।
আর যেহেতু হালুয়া-রুটি ও গোশ্ত-রুটি খাওয়া সুন্নত সেহেতু উনারা হালুয়া-রুটি বা গোশ্ত-রুটির ব্যবস্থা করতেন।
এছাড়াও আরবীয় এলাকার লোকদের প্রধান খাদ্য রুটি-হালুয়া বা রুটি-গোশ্ত। তারা ভাত, মাছ, ইত্যাদি খেতে অভ্যস্ত নয়। সেখান থেকে পর্যায়ক্রমে শবে বরাত উপলক্ষে হালুয়া-রুটির প্রচলন আমাদের দেশে ছড়িয়ে পড়ে।
উল্লেখ্য, কোন আমলের ক্ষেত্রেই বদ রছম বা বদ প্রথার অনুসরণ করা জায়িয নেই।
এখন মাসয়ালা হচ্ছে- কেউ যদি শবে বরাত উপলক্ষে রছম-রেওয়াজ না করে বা নিজের ইবাদত-বন্দেগীর ব্যাঘাত না ঘটিয়ে উক্ত হালুয়া-রুটির ব্যবস্থা করে তাহলে তা অবশ্যই জায়িয। শুধু জায়িযই নয় বরং কেউ যদি তার নিজের ইবাদত-বন্দেগী ঠিক রেখে অন্যান্যদের জন্য যারা রাত্রিতে ইবাদত-বন্দেগী করবে ও দিনে রোযা রাখবে তাদের ইবাদত-বন্দেগী ও রোযা পালনের সুবিধার্থে হালুয়া-রুটি বা গোশ্ত-রুটি অথবা আমাদের দেশে প্রচলিত খাদ্যসমূহের কোন প্রকারের খাদ্যের ব্যবস্থা করে তা অবশ্যই অশেষ ফযীলত ও নেকীর কারণ হবে।
পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-
عَنْ حَضْرَتْ عَبْدِ اللهِ بْنِ سَلاَمٍ رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَا أَيُّهَا النَّاسُ، أَفْشُوا السَّلَامَ، وَأَطْعِمُوا الطَّعَامَ، وَصِلُوا الأَرْحَامَ، وَصَلُّوا بِاللَّيْلِ وَالنَّاسُ نِيَامٌ تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ بِسَلاَمٍ.
.অর্থ: “হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, হে লোক সকল! তোমরা সালামের প্রচলন করো, মানুষকে খাদ্য খাওয়াও, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করো এবং মানুষ যখন ঘুমিয়ে থাকে তখন নামায পড়ো তাহলে শান্তির সাথে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে।” (তিরমিযী শরীফ, ইবনে মাজাহ শরীফ, দারিমী শরীফ)
তবে সতর্ক থাকতে হবে যে, এই কাজে ব্যস্ত থাকার কারণে যাতে এমন পরিশ্রম তথা এমন সময় ব্যয় না হয় যাতে করে কারো শবে বরাতের ইবাদতে ঘাটতি হয়। আরো সতর্ক থাকতে হবে যে, খাদ্য বিতরণ যেনো আত্মীয়-স্বজন বা প্রতিবেশীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে বরং এক্ষেত্রে লক্ষ্য রাখতে হবে যেনো অভাবগ্রস্তদের প্রাধান্য দেয়া হয়।
দোয়া-ইস্তিগফার
মহান আল্লাহ পাক উনার নিকট দোয়া করবে, যার কারণে মহান আল্লাহ পাক তিনি খুশি হবেন ও উনার নিয়ামত লাভ হবে। আর সর্বশেষ খালিছ ইস্তিগফার ও তওবা করবে, যার মাধ্যমে বান্দাহর সমস্ত গুণাহ-খতা মাফ হয়ে মহান আল্লাহ পাক উনার খালিছ সন্তুষ্টি অর্জিত হয়। অর্থাৎ শবে বরাত উনার বারাকাত, ফুয়ূজাত, নিয়ামত, রহমত, মাগফিরাত ও নাজাত ইত্যাদি হাছিল করা যায়।
স্মরণীয় যে, অনেক স্থানে দেখা যায় যে, লোকজন ছুবহে ছাদিকের পর আখিরী মুনাজাত করে থাকে। মূলতঃ মুনাজাত যে কোন সময়েই করা যায়। তবে বরাতের রাতে দোয়া কবুল করার যে প্রতিশ্রম্নতি দেয়া হয়েছে তা ছুবহে ছাদিকের পূর্ব পর্যন্ত। এরপর বরাতের রাত অবশিষ্ট থাকেনা। কেননা, হাদীছ শরীফে স্পষ্টই বলা হয়েছে যে-
حَتّٰى يَطْلُعَ الْفَجْرُ
অর্থ: “ফজর বা ছুবহি ছাদিক পর্যন্ত মহান আল্লাহ পাক তিনি দোয়া কবুল করেন।”
অতএব, সকলের উচিৎ হবে মূল বা আখিরী মুনাজাত ছুবহে ছাদিকের পূর্বেই করা।
{দলীলসমূহঃ- (১) তাফসীরে কুরতুবী, (২) মাযহারী, (৩) রুহুল বয়ান, (৪) রুহুল মায়ানী, (৫) খাযিন, (৬) বাগবী, (৭) তিরমিযী, (৮) ইবনে মাজাহ, (৯) আহমদ, (১০) রযীন, (১১) মিশকাত, (১২) মিরকাত, (১৩) আশয়াতুল লুময়াত, (১৪) লুময়াত, (১৫) ত্বীবী, (১৬) ত্বালীক, (১৭) মুযাহিরে হক্ব ইত্যাদি।}
হাফিয মুহম্মদ উমর ফারূক
রাজারহাট, কুড়িগ্রাম
সুওয়াল: “ছলাতুত্ তাসবীহ” নামাযের ফযীলত ও নিয়ম জানতে বাসনা রাখি।
জাওয়াব: “ছলাতুত্ তাসবীহ” নামাযের বহু ফযীলত পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত রয়েছে। যেমন পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-
عَنْ حَضْرَتْ اِبْنِ عَبَّاسٍ رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ لِلْعَبَّاسِ بْنِ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ عَلَيْهِ السَّلَامُ يَا عَبَّاسُ يَا عَمَّاهُ أَلَا أُعْطِيكَ أَلَا أَمْنَحُكَ أَلَا أَحْبُوكَ أَلَا أَفْعَلُ بِكَ عَشْرَ خِصَالٍ إِذَا أَنْتَ فَعَلْتَ ذٰلِكَ غَفَرَ اللهُ لَكَ ذَنْبَكَ أَوَّلَهٗ وَاٰخِرَهٗ قَدِيمَهٗ وَحَدِيثَهٗ خَطَأَهٗ وَعَمْدَهٗ صَغِيرَهٗ وَكَبِيرَهٗ سِرَّهٗ وَعَلاَنِيَتَهٗ أَنْ تُصَلِّىَ أَرْبَعَ رَكَعَاتٍ …إِنِ اسْتَطَعْتَ أَنْ تُصَلِّيَهَا فِى كُلِّ يَوْمٍ مَرَّةً فَافْعَلْ فَإِنْ لَّـمْ تَفْعَلْ فَفِى كُلِّ جُمُعَةٍ مَرَّةً فَإِنْ لَّـمْ تَفْعَلْ فَفِى كُلِّ شَهْرٍ مَرَّةً فَإِنْ لَّـمْ تَفْعَلْ فَفِى كُلِّ سَنَةٍ مَرَّةً فَإِنْ لَّـمْ تَفْعَلْ فَفِى عُمُرِكَ مَرَّةً
অর্থ: “হযরত ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত। একদা নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি (আমার পিতা) হযরত আব্বাস আলাইহিস সালাম উনাকে বলেন, ‘হে হযরত আব্বাস আলাইহিস সালাম! হে আমার চাচা! আমি কি আপনাকে দিবো না, আমি কি আপনাকে দান করবো না, আমি কি আপনাকে বলবো না, আমি কি আপনার সাথে করবো না দশটি কাজ? (অর্থাৎ শিক্ষা দিবো না দশটি তাসবীহ) যখন আপনি তা আমল করবেন মহান আল্লাহ পাক তিনি আপনার প্রথম গুণাহ, শেষ গুণাহ, পুরাতন গুণাহ, নতুন গুণাহ, অনিচ্ছাকৃত গুণাহ, ইচ্ছাকৃত গুণাহ, ছোট গুণাহ, বড় গুণাহ, গোপন গুণাহ, প্রকাশ্য গুণাহ ইত্যাদি সকল গুণাহখতা ক্ষমা করে দিবেন। আপনি (ছলাতুত তাসবীহ) চার রাকায়াত নামায পড়বেন। …. যদি সম্ভব হয় তবে প্রতিদিন একবার এ নামায আপনি পড়বেন। যদি সম্ভব না হয় তবে সপ্তাহে একবার, তাও যদি সম্ভব না হয় তবে বৎসরে একবার, তাও যদি সম্ভব না হয় তবে জীবনে অন্ততঃ একবার এ নামায আপনি পড়বেন।” (আবূ দাউদ শরীফ, ইবনে মাজাহ শরীফ, বায়হাকী ফী দাওয়াতিল কবীর শরীফ, তিরমিযী শরীফ, মিশকাত শরীফ)
আর ‘ছলাতুত্ তাসবীহ’ নামায উনার নিয়ম সম্পর্কে কিতাবে দু’টি মত উল্লেখ আছে। একটি হানাফী মাযহাব অনুযায়ী এবং অপরটি শাফিয়ী মাযহাব অনুযায়ী।
এখানে আমাদের হানাফী মাযহাব উনার নিয়মটিই উল্লেখ করা হলো-
প্রথমতঃ এই বলে নিয়ত করবে যে, “আমি ছলাতুত তাসবীহ উনার চার রাকায়াত সুন্নত নামায ক্বিবলামুখী হয়ে আদায় করছি।”
অতঃপর তাকবীরে তাহরীমা বেঁধে ছানা পাঠ করবে, ছানা পাঠ করে সূরা-ক্বিরায়াত পাঠ করার পূর্বেই ১৫বার নিম্নোক্ত তাসবীহ পাঠ করবে-
سُبْحَانَ اللهِ وَالْحَمدُ لِلّٰهِ وَلَا اِلٰهَ اِلَّا اللهُ وَاللهُ اَكْبَرُ
উচ্চারণ: “সুব্হানাল্লাহি ওয়ালহাম্দু লিল্লাহি ওয়ালা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার।”
অতঃপর সূরা-ক্বিরায়াত পাঠ করে রুকূতে যাওয়ার পূর্বে ১০বার, রুকূতে গিয়ে রুকূর তাসবীহ পাঠ করার পর ১০বার, রুকূ থেকে উঠে (ক্বওমায়) সিজদায় যাওয়ার পূর্বে দাঁড়িয়ে ১০বার, অতঃপর সিজদায় গিয়ে সিজদার তাসবীহ পাঠ করে ১০বার, সিজদা থেকে উঠে দ্বিতীয় সিজদায় যাওয়ার পূর্বে (জলসায়) বসে ১০বার, অতঃপর দ্বিতীয় সিজদায় গিয়ে সিজদার তাসবীহ পাঠ করে ১০বার অর্থাৎ এরূপভাবে প্রতি রাকায়াতে ৭৫ বার উক্ত তাসবীহ পাঠ করবে।
অতঃপর পরবর্তী রাকায়াতের জন্য দাঁড়াবে। দাঁড়িয়ে প্রথমেই ১৫বার উক্ত তাসবীহ পাঠ করবে। তারপর প্রথম রাকায়াতের মতোই উক্ত তাসবীহগুলো আদায় করবে। অর্থাৎ চার রাকায়াত নামাযে মোট ৩০০ বার উক্ত তাসবীহ পাঠ করবে।
জরুরী মাসয়ালা
উল্লেখ্য, ছলাতুত তাসবীহ নামায আদায়কালীন হাতে তাসবীহ নিয়ে গণনা করা মাকরূহ। আঙ্গুল টিপে টিপে তাসবীহগুলো গণনা করতে হবে। কোন স্থানে তাসবীহ পড়তে ভুলে গেলে পরবর্তী তাসবীহ পাঠের সময় তা আদায় করে নিতে হবে। তবে শর্ত হচ্ছে ক্বওমায় ও জলসায় ১০ বারের বেশী তাসবীহ আদায় করা যাবেনা। যেমন, সূরা-ক্বিরায়াত পাঠের পূর্বে তাসবীহ ভুলে গেলে তা ক্বিরায়াতের পর আদায় করতে হবে। ক্বিরায়াতের পর তাসবীহ ভুলে গেলে রুকূতে আদায় করতে হবে। রুকূতে তাসবীহ ভুলে গেলে উক্ত তাসবীহ ক্বওমায় আদায় না করে প্রথম সিজদাতে গিয়ে আদায় করতে হবে। ক্বওমায় তাসবীহ ভুলে গেলে তাও প্রথম সিজদাতে গিয়ে আদায় করতে হবে। প্রথম সিজদাতে তাসবীহ ভুলে গেলে তা জলসায় আদায় না করে দ্বিতীয় সিজদাতে গিয়ে আদায় করতে হবে। জলসায় তাসবীহ ভুলে গেলে তাও দ্বিতীয় সিজদায় আদায় করতে হবে। আর দ্বিতীয় সিজদাতে তাসবীহ ভুলে গেলে সূরা-ক্বিরায়াত পাঠ করার পূর্বে আদায় করে নিতে হবে। আর ভুলে যাওয়া তাসবীহ প্রত্যেক স্থানে নির্ধারিত তাসবীহ আদায় করার পর আদায় করতে হবে।
{দলীলসমূহ ঃ- (১) আবূ দাউদ শরীফ, (২) ইবনে মাজাহ শরীফ্, (৩) বায়হাক্বী শরীফ, (৪) তিরমিযী শরীফ, (৫) মিশকাত শরীফ, (৬) বযলুল মাজহুদ শরীফ, (৭) আওনুল মা’বুদ শরীফ, (৮) তুহ্ফাতুল আহওয়াযী শরীফ, (৯) মা’য়ারিফুস্ সুনান শরীফ, (১০) মিরকাত শরীফ, (১১) লুময়াত শরীফ, (১২) আশয়াতুল লুময়াত, (১৩) শরহুত্ ত্বীবী শরীফ, (১৪) তা’লীকুছ ছবীহ্ শরীফ, (১৫) মুজাহিরে হক্ব শরীফ, (১৬) ফতহুল ক্বাদীর শরীফ, (১৭) বাহরুর রায়েক শরীফ, (১৮) মারাকিউল ফালাহ্ শরীফ, (১৯) আলমগীরী, (২০) শরহে বিক্বায়া শরীফ, (২১) হিদায়া শরীফ, (২২) আইনুল হিদায়া শরীফ ইত্যাদি}
মুহম্মদ মুনীরুল ইসলাম
চট্টগ্রাম
সুওয়াল: কোনো ব্যক্তি যদি রোযা রেখে স্বপ্নে অথবা জাগ্রত অবস্থায় ভুলে কিছু পান করে অথবা খেয়ে ফেলে, তবে রোযা ভঙ্গ হবে কি?
জাওয়াব: না, রোযা রাখা অবস্থায় স্বপ্নে কিছু পান করলে বা খেলে রোযা ভঙ্গ হবে না। আর জাগ্রত অবস্থায় ভুলে পেট ভরে পানাহার করলেও রোযা ভঙ্গ হবে না। তবে অবশ্যই রোযা উনার কথা স্মরণ হওয়ার সাথে সাথেই পানাহার থেকে বিরত থাকতে হবে। রোযা উনার কথা স্মরণ হওয়ার পরও যদি সামান্য খাদ্য বা পানীয় গিলে ফেলে, তবে রোযা ভঙ্গ হয়ে যাবে। এতে শুধু উক্ত রোযা উনার কাযা আদায় করতে হবে, কাফফারা দিতে হবে না। (দুররুল মুখতার, শামী)
আহমদ মা’রূফা, কিশোরগঞ্জ।
সুওয়াল: রোযা রেখে যেকোনো ধরণের ইনজেকশন বা টিকা নেয়া যাবে কি- না?
জাওয়াব: রোযা অবস্থায় কোন ধরণের টিকা, ইনজেকশন, ইনহেলার, স্যালাইন, ইনসুলিন ইত্যাদি গ্রহণ করা যাবে না। গ্রহণ করলে অবশ্যই রোযা ভঙ্গ হয়ে যাবে।
যেমন এ প্রসঙ্গে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে স্পষ্ট বর্ণিত রয়েছে-
عَنْ حَضْرَتْ اُمِّ الْمُـؤْمِنِيْنَ الثَّالِثَةِ الصِّدِّيْـقَةِ عَلَيْـهَا السَّلَامُ قَالَتْ اِنَّـمَا الْاِفْطَارُ مِـمَّا دَخَلَ وَلَيْسَ مِـمَّا خَرَجَ وَفِـىْ رِوَايَةٍ اَلْفَطْرُ مِـمَّا دَخَلَ وَلَيْسَ مِـمَّا خَرَجَ
অর্থ: সাইয়্যিদাতুনা হযরত উম্মুল মু’মিনীন আছ ছালিছাহ ছিদ্দীক্বাহ আলাইহাস সালাম উনার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, নিশ্চয়ই শরীরের ভিতর কিছু প্রবেশ করলে রোযা ভঙ্গ হবে। কিছু বের হলে ভঙ্গ হবে না। অপর এক বর্ণনায় ইরশাদ মুবারক হয়েছে, শরীরের ভিতর কিছু প্রবেশ করলে রোযা ভঙ্গ হবে। আর কিছু বের হলে রোযা ভঙ্গ হবে না। (আবূ ইয়া’লা শরীফ ৪/৩২৮: হাদীছ শরীফ ৪৬০২)
পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে আরো ইরশাদ মুবারক হয়েছে-
عَنْ حَضْرَتْ عَبْدِ اللهِ بْنِ مَسْعُوْدٍ رَضِىَ اللهُ تَـعَالٰـى عَنْهُ مِنْ قَـوْلِهٖ اِنَّـمَا الْوُضُوْءُ مِـمَّا خَرَجَ وَلَيْسَ مِـمَّا دَخَلَ وَالْفَطْرُ فِى الصَّوْمِ مِـمَّا دَخَلَ وَلَيْسَ مِـمَّا خَرَجَ
অর্থ: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত আছে- ওযূর ব্যাপারে নিয়ম হলো- শরীর হতে কিছু বের হলে ওযূ ভঙ্গ হবে, প্রবেশ করলে ভঙ্গ হবে না। আর রোযার ব্যাপারে নিয়ম হলো- শরীরের ভিতর কিছু প্রবেশ করলে রোযা ভঙ্গ হবে, বের হলে নয়।” (বায়হাক্বী শরীফ ১/১১৬: হাদীছ ৫৬৬, ত্ববারানী শরীফ)
উপরোক্ত পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার দ্বারা প্রমাণিত যে, শরীরের ভিতর কোন কিছু প্রবেশ করলে রোযা ভঙ্গ হয়ে যাবে।
পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার পরিপ্রেক্ষিতে অনুসরণীয় ইমাম, মুজতাহিদ ও ফক্বীহগণ ফতওয়া দিয়েছেন যে, রোযা অবস্থায় ইনজেকশন, স্যালাইন, ইনহেলার, ইনসুলিন, টিকা ইত্যাদি নেয়া রোযা ভঙ্গের কারণ। যা ফিক্বাহ’র বিশ্বখ্যাত কিতাব- ফতওয়ায়ে শামী, বাহরুর রায়িক, ফতহুল ক্বাদীর, হিদায়া, আইনুল হিদায়া, জাওহারাতুন নাইয়্যারাহ ইত্যাদি কিতাবে উল্লেখ আছে।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে হলে ‘রোযা অবস্থায় ইনজেকশন নেয়ার আহকাম’ কিতাবখানা এবং মাসিক আল বাইয়্যিনাত শরীফ উনার ২১, ২২ এবং ২৮২তম সংখ্যা পাঠ করুন।
আহমদ মালিহা
চাঁপাইনবাবগঞ্জ
সুওয়াল: মহিলারা মসজিদে গিয়ে তারাবীহ নামায জামায়াতে পড়তে পারবে কি-না?
জাওয়াব: সম্মানিত আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াত উনাদের ফতওয়া হচ্ছে, মহিলাদের জন্য পাঁচ ওয়াক্ত, জুমুয়াহ, তারাবীহ ও ঈদের নামাযসহ সকল নামাযের জামায়াতের জন্য মসজিদ, ঈদগাহ অর্থাৎ যে কোনো স্থানে যাওয়া নাজায়িয, হারাম ও কুফরী।
(এ সম্পর্কে বিস্তারিত ফতওয়া জানতে হলে মাসিক আল বাইয়্যিনাত শরীফ ১১, ১৪, ১৯, ২২, ২৯, ৩৭, ৪৪, ৪৭, ৪৮, ৫৫, ৬৫, ৭১, ৮২, ১০১ ও ১০২তম সংখ্যাগুলো পড়–ন যাতে বিশ্বখ্যাত ও নির্ভরযোগ্য কিতাবসমূহ হতে প্রায় ১০০টি দলীল-আদিল্লাহ পেশ করা হয়েছে।
মুহম্মদ রাহিবুল ইসলাম
মীরগঞ্জ, রংপুর
সুওয়াল: কেউ কেউ বলে, তারাবীহ’র নামায ৮ রাকায়াত, ১০ রাকায়াত। আবার কেউ কেউ বলে, ১২ রাকায়াতও পড়া যায়। তাদের বক্তব্য কতটুকু সঠিক?
জাওয়াব: উক্ত বক্তব্য মোটেও সঠিক নয়। সম্মানিত আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াত উনাদের ফতওয়া হচ্ছে, তারাবীহ’র নামায ২০ রাকায়াত পড়াই সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ। অতএব, কেউ যদি ২০ রাকায়াত থেকে এক রাকায়াতও কম পড়ে, তবে তার সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ তরক করার কারণে ওয়াজিব তরকের গুনাহ হবে। অর্থাৎ তারাবীহ’র নামায ২০ রাকায়াতই পড়তে হবে এবং এর উপরই ইজমা’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
(এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হলে মাসিক আল বাইয়্যিনাত শরীফ ২৫, ২৬, ২৭, ২৮, ২৯ ও ৩০তম সংখ্যা পাঠ করুন। সেখানে ৩০৪ খানা অকাট্য ও নির্ভরযোগ্য দলীলের ভিত্তিতে প্রমাণ করা হয়েছে যে, তারাবীহ’র নামায ২০ রাকায়াত পড়াই সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ।)
মুহম্মদ রওশন আলী
কুমিল্লা
সুওয়াল: যাদের আক্বীদা-আমল-আখলাক্ব শুদ্ধ নয় এমন গরীব মিসকীনদেরকে যাকাত দেয়া যাবে কি?
জাওয়াব: মহান আল্লাহ পাক তিনি পবিত্র কালামুল্লাহ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক করেন-
تَـعَاوَنُـوْا عَلَى الْبِـرِّ وَالتَّـقْوٰى وَلَاتَـعَاوَنُـوْا عَلَى الْإِثْـمِ وَالْعُدْوَانِ وَاتَّـقُوا اللهَ اِنَّ اللهَ شَدِيْدُ الْعِقَابِ
অর্থ: তোমরা নেকী ও পরহেযগারীর মধ্যে সাহায্য-সহযোগিতা করো; পাপ ও নাফরমানীর মধ্যে সাহায্য-সহযোগিতা করো না। এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ পাক উনাকে ভয় করো, নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ পাক তিনি কঠিন শাস্তিদাতা। (পবিত্র সূরা মায়িদা শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ২)
এই পবিত্র আয়াত শরীফ উনার মধ্যে মহান আল্লাহ পাক তিনি বলে দিয়েছেন কোথায় আমাদেরকে যাকাত, ফিতরা, উশর ইত্যাদি দিতে হবে। অর্থাৎ ১. আদেশ: যারা নেককার, পরহেযগার তাদেরকে যাকাত, ফিতরা, উশর ইত্যাদি দিতে হবে। আর ২. নিষেধ: পাপে, বদীতে, সীমালঙ্ঘনে, শত্রুতায় কোন সাহায্য-সহযোগিতা করা যাবে না। মহান আল্লাহ পাক উনার আদেশ-নিষেধ মানা ফরয। কোন কারণে তা লঙ্ঘণ করলে কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে।
স্মরণীয় যে, যাদের ঈমান-আক্বীদা বিশুদ্ধ নয়: যাদের ঈমান নাই, আক্বীদা নষ্ট তাদেরকে কোন প্রকার সাহায্য-সহযোগিতা করা যাবে না। অনুরূপ যারা নেককার-পরহেযগার নয়, যারা পাপী, মহাপাপী, যারা হারাম কাজে অভ্যস্ত; তাদেরকে যাকাত, ফিতরা, উশর ইত্যাদি দেয়া যাবে না।
নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার এবং হযরত উম্মাহাতুল মু’মিনীন আলাইহিন্নাস সালাম উনাদের শান মুবারকের খিলাফ কুফরীমূলক কথা যারা বলে থাকে। নাউযুবিল্লাহ! যারা হযরত আহলু বাইত শরীফ আলাইহিমুস সালাম উনাদের শান মুবারকের খিলাফ কুফরীমূলক কথা বলে থাকে। নাঊযুবিল্লাহ! যারা বলে, হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনারা দোষ করেছেন, ভুল করেছেন, গুনাহ করেছেন। নাঊযুবিল্লাহ! যারা হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদেরকে দোষারোপ করে। নাঊযুবিল্লাহ! এই সমস্ত লোকদের ঈমান নেই। এদেরকে যাকাত, ফিতরা, উশর, কুরবানীর চামড়া ইত্যাদি কিছুই দেয়া যাবে না। দিলে তা কবুল হবে না।
এছাড়া আরো যাদেরকে যাকাত, ফিতরা, উশর, কুরবানীর চামড়া ইত্যাদি দেয়া যাবে না তারা হচ্ছে:
১। উলামায়ে সূ’ বা ধর্মব্যবসায়ী মালানা অথবা তথাকথিত ইসলামী চিন্তাবিদদের দ্বারা পরিচালিত মাদরাসা অর্থাৎ যারা গণতন্ত্র, ভোট, নির্বাচন, হরতাল, লংমার্চ, মৌলবাদ, সন্ত্রাসবাদ, কুশপুত্তলিকা দাহ ও অন্যান্য কুফরী মতবাদের সাথে সম্পৃক্ত, সেই সব মাদরাসাগুলোতে যাকাত প্রদান করলে যাকাত আদায় হবে না। যেমন পত্রিকার সংবাদে পাওয়া যায়, জামাতী-কওমীরা তাদের নিয়ন্ত্রিত মাদরাসায় সংগৃহীত যাকাত, ফিতরা, কুরবানীর চামড়ার মাধ্যমে প্রতি বছর অনেক টাকা আয় করে। যা মূলতঃ তাদের বদ আক্বীদা ও বদ আমল তথা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে এবং ধর্মব্যবসায় ও সম্মানিত দ্বীন-ইসলাম উনার বিরোধী কাজেই ব্যয় হয়। কাজেই এদেরকে যাকাত দেয়া যাবে না, যে বা যারা তাদেরকে যাকাত দিবে কস্মিনকালেও তাদের যাকাত আদায় হবে না।
২। একইভাবে যাকাত, ফিতরা, উশর, ছদকা, মান্নত ও কুরবানীর চামড়া বা চামড়া বিক্রিকৃত টাকা- যেখানে আমভাবে ধনী-গরীব সকলের জন্য ফায়দা লাভের সুযোগ করে দেয়- এমন কোন জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানে বা সংগঠনে প্রদান করা হারাম ও নাজায়িয। যেমন ‘আনজুমানে মফিদুল ইসলাম’ এই সংগঠনটি বিশেষ ৩ পদ্ধতিতে মুসলমানদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে-
(ক) যাকাত, ফিতরা, উশর, ছদকা, মান্নত ও কুরবানীর চামড়া বা চামড়া বিক্রিকৃত টাকা হাতিয়ে নেয়ার মাধ্যমে গরীব-মিসকীনদের হক্ব বিনষ্ট করে তাদেরকে বঞ্চিত করে দিচ্ছে। নাউযুবিল্লাহ!
(খ) অপরদিক থেকে জনকল্যাণমূলক সুবিধা প্রদান ও গ্রহণের মাধ্যমে ধনীদেরকেও যাকাত, ফিতরা, উশর, ছদকা, মান্নত ও কুরবানীর চামড়া বা চামড়া বিক্রিকৃত টাকা খাওয়ায়ে তথা হারাম গ্রহণের মাধ্যমে তাদের ইবাদত-বন্দেগী বিনষ্ট করে দিচ্ছে। নাউযুবিল্লাহ!
গ) আরেক দিক থেকে যাকাত দাতাদের সম্মানিত যাকাত, ফিতরা, উশর, ছদকা, মান্নত ও কুরবানীর চামড়া বা চামড়া বিক্রিকৃত টাকা যথাস্থানে না যাওয়ায় এবং যথাযথ কাজে ব্যবহার না হওয়ায় যাকাত দাতাদেরকে ফরয ইবাদতের কবুলিয়াত থেকে বঞ্চিত করছে। নাউযুবিল্লাহ! অর্থাৎ যাকাত দাতাদের কোন যাকাতই আদায় হচ্ছে না। কাজেই এ সমস্ত সংগঠনে যাকাতের টাকা প্রদান করা সম্পূর্ণরূপে হারাম।
৩। অনুরূপভাবে যাকাত, ফিতরা, উশর, ছদকা, মান্নত ও কুরবানীর চামড়া বা চামড়া বিক্রিকৃত টাকা আত্মসাতের আরেকটি প্রতিষ্ঠান হচ্ছে ‘কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন’। এই প্রতিষ্ঠানটি মূলত হিন্দু ও বৌদ্ধদের ‘যোগ সাধনা শিক্ষা’ প্রদানের একটি প্রতিষ্ঠান, যা মুসলমানদের জন্য শিক্ষা করা কুফরী। এই প্রতিষ্ঠানটি একদিকে এই কুফরী শিক্ষা বাস্তবায়ন করে মুসলমানদের ক্ষতিগ্রস্ত করছে, অন্যদিকে মুসলমানদের সম্মানিত যাকাত, ফিতরা, উশর, দান-ছদকা, মান্নত বা কুরবানীর চামড়া বিক্রিকৃত টাকা হাতিয়ে নিয়ে তা তাদের কুফরী কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের মাধ্যমে গরীব-মিসকীনের হক্ব বিনষ্ট করছে। অপরদিকে সম্মানিত যাকাত প্রদানকারীদেরকেও তাদের ফরয ইবাদত থেকে বঞ্চিত করে কবীরা গুনাহে গুনাহগার করছে। নাউযুবিল্লাহ! কাজেই মুসলমানদের জন্য কাফিরদের এই কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনে যাকাত, ফিতরা, উশর, ছদকা, মান্নত ও কুরবানীর চামড়া বা চামড়া বিক্রিকৃত টাকা প্রদান করা সম্পূর্ণরূপে হারাম ও নাজায়িয তো অবশ্যই, এমনকি সাধারণ দান করাও হারাম ও নাজায়িয।
৪। অমুসলিম ব্যক্তিকে যাকাত দেয়া যাবে না।
৫। বেতন বা ভাতা হিসেবে নিজ অধিনস্ত ব্যক্তি বা কর্মচারীকে যাকাতের টাকা দেয়া যাবে না।
৬। জনকল্যাণমূলক কাজে ও প্রতিষ্ঠানে যাকাত দেয়া যাবে না। যেমন: আমভাবে লাশ বহন ও দাফন, রাস্তা-ঘাট নির্মাণ, সেতু নির্মাণ, হাসপাতাল নির্মাণ, বৃক্ষদেরাপন, পানির ব্যবস্থাকরণ ইত্যাদি জাতীয় প্রতিষ্ঠানে সম্মানিত যাকাত দেয়া যাবে না।
হাদিউল ইসলাম
মানিকগঞ্জ
সুওয়াল: পাওনা ও আটকে পড়া সম্পদের যাকাতের হুকুম কি?
জাওয়াব: এ সম্পর্কে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে উল্লেখ আছে-
عَنْ حَضْرَتِ الْـحَسَنِ الْبَصْرِىِّ رَحْـمَةُ اللهِ عَلَيْهِ قَالَ اِذَا حَضَرَ الْوَقْتُ الَّذِىْ يُـوَدِّىْ فِيْهِ الرَّجُلُ زَكَاتَهٗ اَدّٰى عَنْ كُلِّ مَالٍ وَّعَنْ كُلِّ دَيْنٍ اِلَّا مَا كَانَ ضِمَارًا لَا يَـرْجُوْهُ
অর্থ: “বিশিষ্ট তাবিয়ী হযরত হাসান বছরী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, যখন যাকাত প্রদানের সময় উপস্থিত হবে, তখন যাকাত প্রদানকারী ব্যক্তি তার সমস্ত সম্পদের উপর এবং সকল পাওনার উপর যাকাত দিবেন। তবে যে পাওনা বা সম্পদ আটকে রাখা হয়েছে এবং যা ফেরত পাওয়ার সে আশা করে না, সেই সম্পদের যাকাত দিতে হবে না। তবে যখন পাবে তখন (শুরু থেকে পাওয়া পর্যন্ত) তার যাকাত আদায় করবে।” (ইমাম হাসান বছরী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার এ মতটি হযরত আবূ উবাইদ কাসিম ইবনে সালাম রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি সঙ্কলন করেছেন)
মুহম্মদ আব্দুর রহমান
মুমিনবাগ, ঢাকা
সুওয়াল: যাকাত, ফিতরা ও উশর সহজে কিভাবে হিসাব রেখে প্রদান করা যায়?
জাওয়াব: যাকাত শব্দের অনেক অর্থ তবে মূল অর্থ ২টা। ১টা অর্থ হলো বরকত বা বৃদ্ধি। আর দ্বিতীয় অর্থ হলো পবিত্রতা বা পরিশুদ্ধি। অর্থাৎ যারা যাকাত আদায় করবে, প্রদান করবে তাদের মালী, জিসমানী, রূহানী, সবদিকে বরকত ও বৃদ্ধি হবে এবং পবিত্রতা ও পরিশুদ্ধি হাছিল হবে। সুবহানাল্লাহ!
যদি কারও কাছে নিছাব পরিমাণ সম্পত্তি অর্থাৎ ৭.৫ (সাড়ে সাত) ভরী সোনা অথবা ৫২.৫ (সাড়ে বায়ান্ন) ভরী রূপা অথবা তার সমতুল্য পরিমাণ অর্থ (৫ই শা’বান শরীফ ১৪৪৭ হিজরীর হিসাব অনুযায়ী যা ২ লক্ষ ৩৩ হাজার টাকা) নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদী বাদ দিয়ে এক বছর ধরে অতিরিক্ত থাকে তখন তার উপর যাকাত ফরয।
কতটুকু দিবে? ৪০ ভাগের ১ ভাগ, অর্থাৎ শতকরায় ২.৫%। কখন দিবে? প্রত্যেক হিজরী বছরে ১ বার। মালে তেজারতের নিছাব পূর্ণ হলেও যাকাত দিতে হবে।
ফিতরা: ফিতরাও এক প্রকার যাকাত। যাকে ‘ছদকাতুল ফিতরা’ বা ‘যাকাতুল ফিতর’ বলা হয়। ফিতরা শব্দটা এসেছে ‘ইফতার’ থেকে। ইফতার হচ্ছে রোযা বিরতি দেওয়া। আমরা ঈদের দিন রোযা বিরতি করি, অর্থাৎ ঈদের দিন ছুবহে ছাদিকের সময় ফিতরা ওয়াজিব হয়। পরিবারের সবার পক্ষ থেকে অর্থাৎ পুরুষ-মহিলা, ছোট-বড়, গোলাম-আযাদ সবার পক্ষ থেকে ফিতরা দিতে হবে।
যিনি পরিবারের কর্তা তিনি ফিতরা দিবেন। কতটুকু দিবেন? ১৬৫৭ গ্রাম আটা বা তার মূল্য। কখন দিবে? রোযা শেষ হলে ঈদের নামাযের আগেই ফিতরা দিতে হয়। তবে হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদের সুন্নত ছিল রমাদ্বান শরীফ মাসের মধ্যেই ফিতরা আদায় করা। তা না হলে রোযার মধ্যে যে ভুল-ত্রুটি হয়ে থাকে সে কারণে রোযা আসমান ও যমীনের মাঝে ঝুলে থাকে এবং মহান আল্লাহ পাক উনার দরবারে তা পেঁৗছে না বা কবুল হয় না। কাজেই যথাসময়েই ফিতরা আদায় করতে হবে।
যাদের উপর ছদাক্বাতুল ফিতর ওয়াজিব অর্থাৎ ঈদের দিন ছুব্হে ছাদিকের সময় যাদের নিকট নিছাব পরিমাণ (সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ অথবা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপা অথবা এর সমপরিমাণ মূল্য থাকে, তাদের প্রত্যেককেই উল্লেখিত ১ সের সাড়ে ১২ ছটাক বা ১৬৫৭ গ্রাম আটা বা তার মূল্য দান করতে হবে।
দেশের বিভিন্ন এলাকায় আটার দাম বিভিন্ন রকম। কাজেই যাদের উপর ছদাক্বাতুল ফিতর ওয়াজিব, তাদেরকে বর্তমান মূল্য হিসাবে একসের সাড়ে বার ছটাক বা ১৬৫৭ গ্রাম আটার মূল্য হিসাবে দিতে হবে।
উশর: উশর শব্দটি এসেছে ‘আশরাতুন’ শব্দ থেকে। যার অর্থ হচ্ছে ১০ ভাগের ১ ভাগ। উশর হচ্ছে ফল-ফসলাদির যাকাত।
সম্মানিত হানাফী মাযহাব মতে উশরের কোন নিছাব নেই। বিনা পরিশ্রমে যমীন থেকে উৎপাদিত ফল-ফসলাদির ১০ ভাগের ১ ভাগ বা তার মূল্য প্রদান করতে হবে। যেমন: বাড়ীর আঙ্গিনায় একটি আম গাছে কোন পরিশ্রম ছাড়াই বছরের পর বছর আম হয়। এক্ষেত্রে, ১০০ টি আম হলে উশর দিতে হবে ১০টি আম বা তার মূল্য। আর পরিশ্রম করে ফল-ফসলাদি ফলানো হলে তখন ২০ ভাগের ১ ভাগ বা তার মূল্য প্রদান করতে হবে। যেমন: ধান, গম ইত্যাদির ক্ষেত্রে। যদি কোন জমিতে ১০০ মণ ধান হয় তবে উশর দিতে হবে ৫ মণ বা তার মূল্য।
কে দিবে? যিনি ফল-ফসলাদির মালিক হবেন বা পাবেন তিনি উশর দিবেন। কতটুকু দিবে? বিনা পরিশ্রমে হলে ১০ ভাগের ১ ভাগ। আর পরিশ্রম করে হলে ২০ ভাগের ১ ভাগ। কখন দিবে? যখন ফল-ফসলাদি তোলা হবে তখনই উশর বা নিছফে উশর দিতে হবে। এবং যতবার ফল-ফসলাদি তোলা হবে ততবারই উশর বা নিছফে উশর দিতে হবে।
এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-
وَاٰتُـوْا حَقَّهٗ يَـوْمَ حَصَادِهٖ
অর্থ: তোমরা ফসল কাটার সময় তার হক (উশর) আদায় করো। (পবিত্র সূরা আনআম শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ১৪১)
ফসল কাটার সময় উশর আদায় করতে হবে। যাকাতের মতই উশর ফরয।
উশর আদায়ের উদাহরণ: যখনই কোন ফল-ফসল উৎপন্ন হবে তখনই নীচের ছক অনুযায়ী হিসাব করে লিখে রাখতে হবে।