মুহম্মদ শিহাবউদ্দীন
সাতকানিয়া, চট্টগ্রাম।
সুওয়াল : মাসিক তরজুমান জুলাই/আগস্ট ২০০০ ঈসায়ী সংখ্যায় প্রশ্নোত্তর বিভাগে এক প্রশ্নের উত্তওে বলা হয়েছে, “নামাযে দুই সিজদার মধ্যে এক তসবীহ পরিমাণ বিরাম নেয়া ওয়াজিব। এ সময় নিম্নে দোয়াটি পড়া মুস্তাহাব। দোয়া হচ্ছে, “আল্লাহুম্মার যুকনী ওয়ারহামনী-ওয়াশফাআনী ওয়াহদিনী (নুরুল ইজা, হিন্দিয়া ও বাহাওে শরীয়ত ৩য় খণ্ড)
এখন আমার সুওয়াল হলো- দুই সিজদার মধ্যে উক্ত দোয়াটি পড়া সম্পর্কে মাসিক তরজুমানের উক্ত বক্তব্য সঠিক হয়েছে কি? কারণ মাসিক তরজুমানের উক্ত বক্তব্য দ্বারা এাঁই সাবেত হয় যে দুই সিজদার মধ্যে উক্ত দোয়াটি ফরয নামাযসহ সমস্ত নামাযে পড়া মুস্তাহাব। অথচ আমরা জানি, ফরয নামাযের দুই সিজদার মাঝে উক্ত দোয়াটি পড়া যাবে না। বরং শুধুমাত্র নফল নামাযের মধ্যে উক্ত দোয়াটি পড়া যাবে। আমাদেও এ ধারণা কি সঠিক দয়া কওে দলীলভিত্তিক সঠিক জাওয়াব দানে বাধিত করবেন।
জাওয়াব : দুই সিজদার মধ্যে উক্ত দোয়াটি পড়া সম্পর্কে চট্টগ্রামস্থ আনজুমানে রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া কর্তৃক প্রকাশিত মাসিক তরজুমান সুন্নী নামের ছস্ফাবরণে মিথ্যা ও ভুয়া দলীলের বরত দিয়ে ভুল, গোমরাহী ও বিদয়াতী আমলের সূচনা করার ব্যর্থ প্রয়াস চালিয়েছে। কারণ তার বক্তব্যে এাঁই সাবেত হয় যে, উক্ত দোয়াটি ফরয নামাযসহ সমস্ত নামাযে পড়া মুস্তাহাব। অথচ উক্ত দোয়াটি আমাদেও হানাফী মাযহাব মুতাবিক ফরয নামাযে পড়া যাবে না বরং উক্ত দোয়াটি শুধুমাত্র নফল নামাযের ক্ষেত্রে প্রয়োজ্য। যেমন এ প্রসঙ্গে সর্বজন মান্য, অনুসরণীয় ও নির্ভরযোগ্য হানাফী মাযহাবের বিখ্যাত ফিক্বাহর কিতাব “মারাকিউল ফালাহ” কিতাবের ১৭৯ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,
ومقدا الجلوس عندنا بين السجدتين مقدار تسبيحة وليس فيه ذكر مسنون كما فى السراج وكذا ليس بعد الرفع من الركوع دعاء وما ورد فيهما محمول على التهجد كما فى مجمع الانهر.
অর্থ: “হানাফী মাযহাব মুতাবিক দুই সিজদার মাঝখানে এক তাসবীহ পরিমাণ বসা (ওয়াজিব)। এবং দুই সিজদার মাঝখানে মাসনুন কোন যিকর (দোয়া) নেই। যেমন “সিরাজে” বর্ণিত আছে। অনুরূপ রুকু থেকে মাথা উঠানোর পর কোন দোয়া নেই। আর রুকুর পর এবং দুই সিজদার মাঝখানে যে সকল দোয়াগুলি বর্ণিত হয়েছে তা তাহাজ্জুদ (নফল) নামাযের জন্য প্রযোজ্য। যেমন- “মাজমাউল আনহুর” কিতাবে বর্ণিত আছে।
“রুদ্দুল মোহতার” কিতাবের দ্বিতীয় খণ্ডের ২১৩ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে,
وبين السجدتين اللهم اغفرلى وارحمنى وعافنى واهدنى وارزقنى …….. محمول على النفل اى تهجدا او غيره.
অর্থ : “ধার দুই সিজদার মাঝে-
اللهم اغفرلى وارحمنى وعافنى واهدنى وارزقنى.
এই দোয়াটি পড়া … তাহাজ্জুদ নামায অথবা অন্যান্য নফল নামাযের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
“মাজমাউল আনহুর” কিতাবের প্রথম খণ্ডের ৯৯ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,
وليس بين السجدتين ذكر مسنون عندنا وكذا بعد رفعه وما ورد فيهما من الدعاء فمحمول على التهجد.
অর্থ: “আমাদের হানাফী মাযহাবে দুই সিজদার মাঝে মাসনূন কোন যিকির (দোয়া) নেই। অনুরূপ রুকু থেকে মাথা উঠানোর পর কোন দোয়া নেই।” আর রুকুর পর এবং দুই সিজদার মাঝখানে যে সকল দোয়াগুলি বর্ণিত হয়েছে তা তাহাজ্জুদ নামাযের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
উক্ত “কিতাবের হাশিয়ায়” উল্লেখ আছে,
ولا بين السجدتين وبعد الرفع من الركوع دعاء وما ورد محمول على النفل تهجدا او غيره.
অর্থ: “দুই সিজদার মাঝে এবং রুকু থেকে মাথা উঠানোর পর কোন দোয়া নেই। …… আর রুকুর পর এবং দুই সিজদার মাঝখানে যে সকল দোয়াগুলি বর্ণিত হয়েছে তা নফল, তাহাজ্জুদ অথবা অন্যান্য (নফল-মুস্তাহাব) নামাযের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।”
“মেশকাত শরীফ-এর” ৮৪ পৃষ্ঠায় বাইনাস সুতুরে উল্লেখ আছে, وهو محمول على التطوع عندنا.
অর্থ: “দুই সিজদার মাঝে উক্ত দোয়াটি পড়া সম্পর্কিত হাদীছ শরীফখানা আমাদের মাযহাবে নফল নামাযের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।”
আর মেশকাত শরীফ-এর শরাহ “মেরকাত শরীফ-এর” দ্বিতীয় খণ্ডের ৩২৬ পৃষ্ঠায় হাদীছ শরীফখানা বর্ণনার পর বলা হয়েছে,
وهو محمول على التطوع عندنا.
অর্থ: “নমামুল মুহাদ্দিসীন হযরত মোল্লা আলী ক্বারী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, দুই সিজদার মাঝে উক্ত দোয়াটি পড়া সম্পর্কিত হাদীছ শরীফখানা আমাদের মাযহাবে নফল নামাযের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।”
আর “ইলাউস সুনান” কিতাবের তৃতীয় খণ্ডের ৩৪ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করা হয়েছে-
ولو تركه رأسا لايلام عليه فان هذا الذكر ورد فى صلاة الليل دون المكتوبة كما يظهر من مجمع الاحاديث ولذا قال الشرنبلالى فى نور الايضاح وليس فيه اى فى الجلوس بين السجدتين ذكر مسنون والوارد فيه محمول على التهجد.
অর্থ: “যদি উক্ত দোয়াটি একেবারেই না পড়ে, তাহলে সে তিরস্কৃত হবে না। নিশ্চয়ই এ দোয়াটি তাহাজ্জুদ নামাযের জন্য বর্ণিত হয়েছে। ফরয নামাযের জন্য নয়। যা হাদীছ শরীফ-এর সমষ্টিগত বর্ণনা দ্বারা সুস্পষ্ট। এ জন্য আল্লামা শারাম্বলালী রহমতুল্লাহি আলাইহি “নূরুল ইযাহ” কিতাবে উল্লেখ করেছেন যে, দুই সিজদার মাঝের বৈঠকে কোন মাসনূন দোয়া নেই। আর এ সম্পর্কিত বর্ণনাগুলি তাহাজ্জুদ নামাযের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।”
আবূ দাউদ শরীফ-এর শরাহ “বজলুল মাজহুদের” দ্বিতীয় খণ্ডের ৬৮ পৃষ্ঠায় দুই সিজদার মাঝে উক্ত দোয়া পড়া সম্পর্কিত হাদীছ শরীফ খানা বর্ণনা করার পর বলা হয়েছে-
وقال القارى وهو محمول على التطوع عندنا.
অর্থ: “হযরত মুল্লা আলী ক্বারী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, আমাদের হানাফী মাযহাব মুতাবিক উক্ত দোয়াটি নফল নামাযের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।”
“গায়াতুল আওতার” কিতাবের ১ম খণ্ডের ২৩৫ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,
উর্দূ কম্পোজ করতে হবে
অর্থ: “দুই সিজদার মাঝখানে মাসনূন কোন যিকর (দোয়া) নেই। অনুরূপ রুকু থেকে মাথা উঠানোর পর মাসনূন কোন দোয়া নেই। ………. আর রুকুর পর এবং দুই সিজদার মাঝখানে যে সকল দোয়াগুলি বর্ণিত হয়েছে তা নফল নামাযের জন্য প্রযোজ্য।”
দুররুল মুখতার শরহে “তানবীরিল আবছার” কিতাবে উল্লেখ আছে,
وليس بينهما ذكر مسنون وكذا ليس بعد رفعه من الركوع دعاء ………. وما ورد محمول على النفل اى تهجدا او غيره.
অর্থ: দুই সিজদার মাঝে মাসনূন কোন যিকর (দোয়া) নেই। অনুরূপ রুকু থেকে মাথা উঠানোর পর কোন দোয়া নেই। …….. আর রুকুর পর এবং দুই সিজদার মাঝখানে যে সকল দোয়াগুলি বর্ণিত হয়েছে, তা নফল নামাযের জন্য প্রযোজ্য। অর্থাৎ দুই সিজদার মাঝে বর্ণিত দোয়াগুলি তাহাজ্জুদ নামায অথবা অন্যান্য নফল নামাযে পড়া যাবে।
“ইবনে মাযাহ শরীফ-এ” স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি উক্ত দোয়াটি তাহাজ্জুদ নামাযে পাঠ করতেন। যেমন ইবনে মাযাহ শরীফ-এর ১ম জি: ৬৪ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,
عن ابن عباس قال كان رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول بين السجدتين فى صلى الليل رب اغفرلى وارحمنى واجبرنى وارزقنى وارفعنى.
অর্থ: “হযরত ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি তাহাজ্জুদ নামাযে দুই সিজদার মাঝে এই দোয়াটি পড়তেন-
رب اغفرلى وارحمنى واجبرنى وارزقنى وارفعنى.
হ্যাঁ, শাফেয়ী, হাম্বলী ও অন্যান্য মাযহাবে ফরয, নফল উভয় নামাযেই উক্ত দোয়াটি পাঠ করা জায়েয। যেমন, “তিরমিযী শরীফ-এর” ১ম খণ্ডের ৩৮ পৃষ্ঠায় উক্ত হাদীছ শরীফ-এর ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, এই দোয়াটি শাফেয়ী, হাম্বলী ইত্যাদি মাযহাবে ফরয নামাযেও পাঠ করা জায়েয রয়েছে। যেমন-
وبه يقول الشافعى واحمد واسحق يرون هذا جائزا فى المكتوبة والتطوع.
অর্থ: “ইমাম শাফেয়ী, আহমদ ও ইসহাক রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, “ইহা (অর্থাৎ উক্ত দোয়াটি) ফরয ও নফল নামাযের দুই সিজদার মাঝে পড়া জায়েয আছে।”
তিরমীমী শরীফ-এর শরাহ “আরিদাতুল আহওয়াজী” কিতাবের দ্বিতীয় খণ্ডের ৮১ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে-
وبه يقول الشافعى واحمد واسحق يرون هذا جائزا فى المكتوبة والتطوع.
অর্থ: “ইমাম শাফেয়ী, আহমদ ও ইসহাক রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, “ইহা (অর্থাৎ উক্ত দোয়াটি) ফরয ও নফল নামাযের দুই সিজদার মাঝে পড়া জায়েয আছে।”
মোটকথা হলো- শাফেয়ী, হাম্বলী ও অন্যান্য মাযহাবে ফরয নামাযের দুই সিজদার মাঝে উক্ত দোয়াটি পড়া জায়েয রয়েছে।
আর আমাদের হানাফী মাযহাবের ফতওয়া মুতাবিক ফরয নামাযে দুই সিজদার মাঝে উক্ত দোয়াটি পাঠ করলে ফরয বা রোকন আদায়ে তা’খীয় বা বিলম্ব হওয়ার কারণে সাহু সিজদা ওয়াজিব হবে। সুতরাং আমাদের মাযহাবে উক্ত দোয়াটি পড়া যাবে না।
“ফতওয়ায়ে শামীর” দ্বিতীয় খণ্ডের ২১২ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,
لو اطال هذه الجلسة او قومة الركوع اكثر من تسبيحة بقدر تسبيحة ساهيا يلزمه سجود السهو.
অর্থ: “যদি দুই সিজদার মাঝে এবং রুকু থেকে দাঁড়ানোর পর এক তাসবীহ পরিমাণের চেয়ে বেশি বিলম্ব করে তাহলে ওয়াজিব তরক হবে এবং এ সাহু সিজদা আবশ্যক হবে।
আরো উল্লেখ্য যে, উক্ত দোয়াটি পড়া সম্পর্কে হাদীছ শরীফ-এর শরাহ ও ফতওয়ার কিতাবগুলিতে
دون المكتوبة، التطوع، النفل، التهجد.
(ফরয ব্যতীত নফল, তাহাজ্জুদ ইত্যাদি নামাযে বলা হয়েছে।)
অতএব, উল্লিখিত আলোচনা থেকে এটাই ছাবেত হলো যে, মাসিক তরজুমান তথা অছিয়র রহমানের উক্ত বক্তব্য ভুল।
মাসিক তরজুমানের উদ্ধৃত দলীল মিথ্যা।
উল্লেখ যে, তারা বলেছে নামাযে দুই সিজদার মধ্যে ….. দোয়াটি পড়া মুস্তাহাব, এবং দলীল হিসেবে “নুরুল ইজাহ, হিন্দিয়া ও বাহাওে শরীয়ত” ৩য় খণ্ডের বরাত দিয়েছে। অথচ নুরুল ইজাহ কিতাবের ৭৬ পৃষ্ঠায় بين السجدتين এর ব্যাখ্যায় বাইনাস সুতূরে উল্লেখ আছে- وليس فيه ذكر مسنون.
অর্থ: “দুই সিজদার মাঝে কোন মাসনূন যিকর বা দোয়া নেই।”
আর “নুরুল ইজাহ” কিতাবের বরাত দিয়ে “এলাউস সুনান” কিতাবের তৃতীয় খণ্ডের ৩৪ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করা হয়েছে,
قال الشرنبلالى فى نور الايضاح وليس فيه اى فى الجلوس بين السجدتين ذكر مسنون والوارد فيه محمول على التهجد.
অর্থ: আল্লামা শারাম্বলালী রহমতুল্লাহি আলাইহি “নুরুল ইজাহ” কিতাবে উল্লেখ করেছেন যে, দুই সিজদার মাঝের বৈঠকে মাসনুন কোন যিকর (দোয়া) নেই। আর এ সম্পর্কিত বর্ণনাগুলি তাহাজ্জুদ নামাযের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
দ্বিতীয়ত: “ফতওয়ায়ে হিন্দিয়া” কিতাবের বরাত দিয়েছে। অথচ “ফতওয়ায়ে হিন্দিয়া” কিতাবের ১ম খণ্ডের ১১৬ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,
উর্দূ কম্পোজ করতে হবে
অর্থ: ঐ বৈঠকে (অর্থাৎ দুই সিজদার মাঝে) আমাদের হানাফী মাযহাবে কোন মাসনূন যিকর (দোয়া) নেই। ইহা “জাওহারাতুন নাইয়্যারাহ” কিতাবে উল্লেখ আছে।
“ফতওয়ায়ে আলমগীরী” কিতাবের ১ম খণ্ডের ৭৫ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,
وليس فى هذا الجلوس ذكر مسنون عندنا هكذا فى الجوهرة النيرة.
অর্থ: “এই বৈঠকে অর্থাৎ দুই সিজদার মাঝের বৈঠকে আমাদেও হানাফী মাযহাবে মাসনূন কোন যিকর (দোয়া) নেই।”
আর “জাওহারাতুন নাইয়্যারাহ” কিতাবের ৬৯ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে, وليس فى هذا الجلوس ذكر مسنون عندنا
অর্থ: “এই বৈঠকে অর্থাৎ দুই সিজদার মাঝের বৈঠকে আমাদের হানাফী মাযহাবে মাসনূন কোন যিকর (দোয়া) নেই।”
তৃতীয়ত: তারা “বাহাওে শরীয়ত” ৩য় খণ্ডের বরাত দিয়েছে অথচ বাহাওে শরীয়ত ৩য় খণ্ডে দুই সিজদার মাঝে উক্ত দোয়াটি পড়ার কোনই বর্ণনা নেই। বরং বাহারে শরীয়তের ৩য় খণ্ডের ৫৭ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে-
উর্দূ কম্পোজ করতে হবে
অর্থ: “এক সিজদার পরে দ্বিতীয় সিজদার মাঝে যেন পৃথক কোন রুকন না হয়।”
অথচ মাসিক তরজুমানে উল্লেখিত দোয়াটি পড়লে দুই সিজদার মাঝে পৃথক এশটি রুকন হয়ে যায়। যার ফলশ্রুতিতে সাহু সিজদাহ ওয়াজিব হয়। আর এ সাহু সিজদা ইচ্ছাকৃত না দিয়ে নামায শেষ করলে ওয়াজিব তরকের কারণে নামায বাতিল বলে গণ্য হবে এবং পুনরায় উক্ত নামায দোহরানো ওয়াজিব হবে।
অতএব, উক্তরোক্ত দলীল ভিত্তিক আলোচনা দ্বারা এটাই সাব্যস্ত হলো যে, উক্ত দোয়াটি ফরয নামযের দুই সিজদার মাঝে পড়া যাবে না বরং শুধুমাত্র নফল ও তাহাজ্জুদ নামাযের দুই সিজদার মাঝে উক্ত দোয়াটি পড়া যাবে। সুতরাং মাসিক তরজুমানের কথিত মুফতী অছিয়র রহমান জিহালতপূর্ণ ও প্রতারণামূলক উল্টর প্রদান করে মুফতী খেতাবের পরিবর্তে মুফতে খেতাবের হাক্বীক্বী মেছদাক হয়েছে। তবে তার এ ভুল মাসয়ালার সংশোধনী দিয়ে খালেছ তরবা ইস্তেসফার করার সুযোগ রয়েছে। অন্যথায় প্রদত্ত ভুল মাসয়ালা আমলকারীর সমূদয় গুণাহর বোঝা তার কাঁধেই বর্তাবে।
{দলীলসমূহ: (১) তিরমীযী শরীফ, (২) আবূ দাউদ শরীফ, (৩) ইবনে মাযাহ শরীফ, (৪) নাসাঈ শরীফ, (৫) মেশকাত শরীফ, (৬) মেরকাত শরীফ, (৭) এলাউস সুনান, (৮) বজলুল মজহুদ, (৯) মসনদে আহমদ, (১০) হাকেম, (১১) বায়হাকী শরীফ, (১২) আরিদাতুল আহওয়াজী, (১৩) তানবীরুল আবছার, (১৪) আলমগীরী, (১৫) হিন্দিয়া, (১৬) শামী, (১৭) দুররুল মোখতার, (১৮) রদ্দুল মোহতার, (১৯) গায়াতুল আওতার, (২০) হাশিয়ায়ে তাহতাবী, (২১) খানিয়া, (২২) মুহীত, (২৩) শরহে মুনিয়া, (২৪) খাযায়েন, (২৫) নাহরুল ফায়েক, (২৬) জাওহারাতুন নাইয়্যারাহ, (২৭) সিরাজুল ওয়াহহাজ, (২৮) মারাকিউল ফালাহ, (২৯) মাজমাউল আনহুর, (৩০) নুরুল ইজাহ, (৩১) বাহারে শরীয়ত ইত্যাদি।}
ক্বারী মুহম্মদ মঈননুদ্দীন
বাঁশখালী, চট্টগ্রাম।
সুওয়াল: মাসিক তরজুমান জুলাই-আগস্ট ২০০০ ঈসায়ী সংখ্যায় প্রশ্নোত্তর বিভাগে এক প্রশ্নের উত্তওে বলা হয়েছে “ইমাম আলা হযরত সহ অনেকেরই মতে জুমার দ্বিতীয় আযান মসজিদেও দরজায় দেয়া সুন্নাত ও হাদীছ শরীফ দ্বারা প্রমাণিত।”
এখন আমার সুওয়াল হলো- মাসিক তরজুমানের উক্ত বক্তব্য সঠিক হয়েছে কি? আর সত্যিই কি জুমুয়ার ছানী বা দ্বিতীয় আযান মসজিদেও দরজায় দেয়া সুন্নত? দলীলসহ জানিয়ে বাধিত করবেন।
জাওয়াব: ছানী আযান সম্পর্কে চট্টগ্রামস্থ আনজুমানে রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া কর্তৃক প্রকাশিত রেযা খানী মাযহাবের মুখপত্র মাসিক তরজুমান পত্রিকার উক্ত বক্তব্যে আহমদ রেজা খান এবং তাকে সমর্থনকারী তরজুমান কর্তৃপক্ষ সকলেরই কুফরী হয়েছে। কারণ প্রথমত তরজুমান পত্রিকায় লিখেছে যে, “ইমাম আ’লা হযরত সহ অনেকেরই মতে জুমুয়ার দ্বিতীয় আযান মসজিদেও দরজায় দেয়া সুন্নাত।”
এর জবাবে প্রথমত: বলতে হয় যে, কোন আলা হযরত শরীয়তের দলীল নয় বরং শরীয়তের দলীল হচ্ছে, কুরআন শরীফ, হাদীছ শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াস। রেযা খানীরা শরীয়তের দলীলকে বাদ দিয়ে আলা হযরতের মতকে গ্রহণ করে এটাই প্রমাণ করেছে যে, তাদের আলা হযরত যেন তাদের নবী বা শরীয়ত প্রণেতা। তাই আলা হযরত কুরআন শরীফ, হাদীছ শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াসের বিপরীত ফতওয়া দেয়ার পরও তা তাদের নিকট সঠিক ও গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয়।
দ্বিতীয়ত: বলতে হয় যে, “ছানী আযান মসজিদেও দরজায় দেয়া সুন্নাত ও হাদীছ শরীফ দ্বারা প্রমাণিত।” আহমদ রেযা খানের এ মতটিও সম্পূর্ণ মনগড়া, দলীলবিহীন ও মিথ্যা।
কারণ শুধু আহমদ রেযা কেন তার সকল অনুসারীরাও যদি তাকে সহযোগীতা করে তবুও সে প্রমাণ করতে পারবে না যে, আখেরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন নাবিইয়ীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম ও অনুসরণীয় ইমাম-মুজতাহিদগণ জুমুয়ার ছানী আযান (যা বর্তমানে মিম্বরের নিকট ইমামের সামনে দেয়া হয়) মসজিদেও দরজায় দিয়েছেন ও দিতে বলেছেন।
কেননা আখেরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন নাবিইয়ীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, হযরত আবূ বকর ছিদ্দীক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এবং হযরত ওমর ইবনুল খত্তাব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর সময়ে ছানী আযান বলতে কোন আযানই ছিল না। বরং উনাদের সময়ে জুমুয়ার দিনে একটি মাত্র আযান ছিল যা মসজিদের দরজায় দেয়া হতো। তৃতীয় খলীফা হযরত উসমান জুননূরাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ উনাদেও সর্বসম্মত সিদ্ধান্তক্রমে আরেকটি আযান বৃদ্ধি করেন। আখেরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন নাবিইয়ীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, হযরত আবূ বকর ছিদ্দীক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এবং হযরত ওমর ইবনুল খত্তাব রদ্বিয়াল্লাহু আনহু উনার সময়ে যে আযান মসজিদের দরজায় দেয়া হতো, হযরত উসমান জুননূরাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু সে আযানটি স্থানান্তরিত করে মিম্বরের নিকট ইমামের সম্মুখে দেয়ার নির্দেশ দেন। আর প্রবর্তিত ছানী আযানটি মসজিদেও বাইরে “যাওরা” নামক স্থানে দেয়ার নির্দেশ দেন। তখন থেকে অদ্যাবধি এ নিয়মেই সারা বিশ্বে ছানী আযান প্রচারিত হয়ে আসছে। নিম্নে তার অকাট্য প্রমাণ পেশ করা হলো।
সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন নাবিইয়ীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সময় পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের আযানের ন্যায় জুমুয়ার দিনেও একটি মাত্র আযান জারী ছিল যা মসজিদের বাইরে দরজার উপর দেয়া হতো। অনুরূপ খলীফাতুল মুসলিমীন, হযরত আবূ বকর ছিদ্দীক রদ্বিয়াল্লাহু আনহু এবং আমীরুল মু’মিনীন, হযরত ওমর ইবনুল খত্তাব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার খিলাফত কালেও জুমুয়ার নামাযে একটি মাত্র আযান জারী ছিল। যেমন এ প্রসঙ্গে হাদীছ শরীফ-এ ইরশাদ হয়েছে,
عن السائب بن يزيد قال كان الاذان على عهد رسول الله صلى الله عليه وسلم وابى بكر وعمراذا خرج الامام واذا اقيمت الصلاة فلما كان عثمان زاد النداء النالت على الزوراء.
অর্থ: “হযরত সায়েব বিন ইয়াযীদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বলেন, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন নাবিইয়ীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, হযরত আবূ বকর ছিদ্দীক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এবং হযরত ওমর ইবনুল খত্তাব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার সময় একটি মাত্র আযানের প্রচলন ছিল। আর তা ইমাম (হুজরা হতে) বের হলে দেয়া হতো।
এরপর (খুৎবা পাঠ করার পর) নামাযের জন্য ইক্বামত দেয়া হতো, অত:পর হযরত উসমান রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু (খিলাফতে আসীন হবার পর) “যাওরা” নামক স্থানে তৃতীয় আযান বৃদ্ধি করেন। (উল্লেখ্য হাদীছ শরীফ-এর রাবীগণ ইক্বামতকেও আযান হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাই উনারা হযরত উসমান রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার আযানকে তৃতীয় আযান বলেছেন) ইমাম তিরমীযী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি এ হাদীছ শরীফকে হাসান, সহীহ বলেছেন।
এ প্রসঙ্গে বিশ্ব বিখ্যাত তাফসীর গ্রন্থ “তাফসীরে খাযেন ও মাদারেকে” উল্লেখ রয়েছে,
فلما كان عثمان وكثر الناس زاد النداء الثانى على الزوراء.
অর্থ: “অত:পর হযরত উসমান রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি খলীফা হওয়ার পর জনসংখ্যার আধিক্যতার কারণে “যাওরা” নামক স্থানে জুমুয়ার দ্বিতীয় আযান (বর্তমানে প্রথম আযান) বৃদ্ধি করেন।”
আর বুখারী শরীফ-এর শরাহ “ফয়জুল বারীতে” উল্লেখ রয়েছে,
والظاهر ان الاذان الثانى هو الاول انتقل الى داخل المسجد.
অর্থ: “প্রকাশ থাকে যে, ছানী আযান যা প্রথম আযান ছিল (দরজার উপর দেয়া হতো)। অত:পর স্থান পরিবর্তন করে মসজিদের ভিতওে নেয়া হয়।” অনুরূপ তিরমীযী শরীফ-এর শরাহ “আল উরফুশ শাজীতে” ও উল্লেখ আছে।
আমীরুল মু’মিনীন, হযরত উসমান রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু যে শুধু একটি আযান বৃদ্ধি করেছেন তা নয়, বরং আখেরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন নাবিইয়ীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সময়কার আযানকেও (যা দরজায় দেয়া হতো) স্থানান্তরিত করে মসজিদের ভিতরে, ইমামের সম্মুখে, মিম্বরের নিকট দেয়ার ব্যবস্থা করেন। যেমন এ প্রসঙ্গে বিখ্যাত ও মশহুর তাফসীর গ্রন্থ “তাফসীওে আহকামুল কুরআন লিল কুরতুবীতে” উল্লেখ আছে যে,
زاد عثمان رضى الله عنه اذانا ثانيا يؤذنون بمدينة السلام وبعد اذان المنار بين يدى الامام تحت المنبر.
অর্থ: “হযরত উসমান রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি মদীনায় দ্বিতীয় আরেকটি আযান বৃদ্ধি করেন। অত:পর ছানী আযানটি ইমামের সম্মুখে, মিম্বরের নিকট দেয়া হয়।”
এ প্রসঙ্গে কিতাবে উল্লেখ করা হয়,
الاذان الثالث هو الاول وجودا اذا كانت مشروعيته باجتهاد عثمان وموافقه سائر الصحابة له بالسكوت وعدم الانكاو فصار اجماعا.
অর্থ: “তৃতীয় আযান, এটাই মূলত: প্রথম আযান, (তৃতীয় এ জন্য বলা হয় যে, ইক্বামতকেও আযান বলা হয়) যা হযরত উসমান রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার ইজতিহাদের দ্বারা সাব্যস্ত করা হয়। (যখন হযরত উসমান রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু দ্বিতীয় আরেকটি আযানের প্রচলন করেন) তখন প্রায় সকল ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ উনারাই তা জ্ঞাত ছিলেন। কেউ এটার ব্যাপারে প্রতিবাদ না করার কারণে এর উপর ইজমা তথা ইজমায়ে আযীমত প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়।” (আইনী শরহে বুখারী, হাশিয়ায়ে আবূ দাউদ)
উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা সুস্পষ্ট ভাবেই প্রমাণিত হলো যে, আমীরুল মু’মিনীন হযরত উসমান জুননূরাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার পূর্বে ছানী আযান বলতে কোন আযানই ছিল না।
তাই “ছানী আযান দরজায় দেয়া সুন্নাত ও হাদীছ শরীফ দ্বারা প্রমাণিত” একথা সম্পূর্ণই বানোয়াট ও অবান্তর। সাথে সাথে এটাও প্রমাণিত হলো যে, ছানী আযান মসজিদের ভিতরে মিম্বরের নিকটে ইমামের সম্মুখে দিতে হবে এটা ইজমায়ে আযীমত দ্বারাই সাব্যস্ত। যেটা মানা ফরয, অস্বীকার করা কুফরী ও গোমরাহীর আলামত।
অতএব, আহমদ রেযা খান “ছানী আযান মসজিদের দরজায় দেয়া সুন্নাত ও হাদীছ শরীফ দ্বারা প্রমাণিত।” এ বক্তব্য প্রদান করে নিজেকে একজন মিথ্যাবাদী ও ইজমা-ক্বিয়াস অস্বীকারকারী গায়রে মুকাল্লিদ হিসেবে সাব্যস্ত করার সাথে সাথে শরীয়তের তৃতীয় দলীল ইজমায়ে আযীমতকে অস্বীকার করে সুস্পষ্ট কুফরী করেছে। এটা মূলত: আমাদের ফতওয়া নয় বরং কুরআন-সুন্নাহরই ফতওয়া। যেমন, এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ পাক রব্বুল আলামীন কালামে পাকে ইরশাদ করেন,
ومن يشاقق الرسول من بعد ماتبين له الهدى ويتبع غير سبيل المؤمنين نوله ماتولى …… الخ.
অর্থ: “কারো নিকট হিদায়েত বিকশিত হওয়ার পর যদি সে রসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিরুদ্ধাচরণ করে, আর মু’মিনগণ উনাদের পথ বাদ দিয়ে ভিন্ন পথের অনুসরণ করে, আমি তাকে সে দিকেই ফিরাবো, যে দিকে সে ফিরেছে।” (সূরা নিসা/১১৫)
বিখ্যাত মুফাসসির, আলেমে হক্বানী, শায়খে রব্বানী, শায়খ আহমদ ইবনে আবূ সাঈদ মুল্লা জিউন রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি উপরোক্ত আয়াত শরীফ-এর তাফসীরে বলেন,
فجعلت مخالفة المؤمنين مثل مخالفة الرسول فيكون اجماعهم كخبر الرسول حجة قطعية.
অর্থ: “অতপর সাব্যস্ত হয় যে, মু’মিনগণ উনাদেও বিরোধীতা করা মূলত: রসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিরোধীতা করারই নামান্তর। তাই রসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার হাদীছ শরীফ-এর ন্যায় মু’মিনগণ উনাদের ইৎমাও অকাট্য ও প্রামান্য দলীল বলে পরিগণিত হবে।” (নুরুল আনোয়ার)
আর সে কারণেই মুল্লা জিউন রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি উনার বিখ্যাত তাফসীর গ্রন্থ “তাফসীরে আহমদীতে” ইৎমার আহকাম সম্পর্কে চুড়ান্ত রায় পেশ করে বলেন,
فيكون الاجماع حجة يكفر جاحده كالكتاب والسنة.
অর্থ: “ইজমায়ে আযীমত কুরআন শরীফ ও হাদীছ শরীফ-এর মতই একটি অকাট্য দলীল। যে ব্যক্তি এ ইজমাকে অস্বীকার করলো, সে মূলত: কুফরী করলো।”
মূলকথা হলো, সহীহ ও ফতওয়াযোগ্য অভিমত এই যে, “জুমুয়ার ছানী আযান মসজিদের ভিতরে মিম্বরের নিকটে ইমামের সম্মুখে দেয়াই খাছ সুন্নত ও ইজমায়ে আযীমত দ্বারা প্রমাণিত। এটাকে অস্বীকার করা কুফরী। আর এর বিপরীত আমল করা বিদয়াত ও গোমরাহী। ছানী আযান যে মসজিদের ভিতরে মিম্বরের নিকটে ইমামের সম্মুখে দিতে হবে বিশ্বখ্যাত কিতাবসমূহ হতে তার কতিপয় প্রমাণ পেশ করা হলো।
ফিক্বাহর বিখ্যাত কিতাব “আল জাওহারাতুন নাইয়্যারাহ”-এর ১১৮ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,
واذا صعد الامام المنبر وجلس ويؤذنون ثانيا بين يدى الخطيب.
অর্থ: “ইমাম যখন মিম্বরে উঠে বসবেন, তখন মুয়াজ্জিন খতীবের সামনে আযান দিবে।” (কাজেই খতীবের সম্মুখে আযান দেয়ার অর্থ হলো মসজিদের ভিতরে আযান দেয়া)।
অনুরূপ হেদায়া, রদ্দুল মোহতার, আইনী শরহে হেদায়া কিতাবেও উল্লেখ আছে।
ঘানাফী মাযহাবের বিশ্ব বিখ্যাত কিতাব “বাহরুর রায়েক” এর ২য় জি:, ১৫৬ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,
اذان الثانى الذى يكون بين يدى المنبر لانه لم يكن فى زمنه عليه السلام.
অর্থ: “ছানী আযান যা মিম্বরের সম্মুখে বা সন্নিকটে দিতে হবে, আর হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সময় এটা ছিলনা।” অনুরূপ “হেদায়া মায়াদ্দেরায়া” কিতাবেও উল্লেখ আছে।
বিশ্ব বিখ্যাত ফিক্বাহর কিতাব “ফতহুল ক্বাদীর”-এর ২য় জি: ১২০ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,
وكان المعتبر هو الاذان الثانى عند المنبر بين يدى الخطيب الخ.
অর্থ: “হানাফী মাযহাবের একজন শ্রেষ্ঠ ইমাম হযরত আবূ জা’ফর তাহারী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, নির্ভরযোগ্য মত হলো- জুমুয়ার দিন খতীবের সামনে, মিম্বরের নিকট যখন খুৎবার জন্য আযান দিবে, তখন হতে মসজিদেও দিতে তাড়াতাড়ি যাওয়া ওয়াজিব।” অনুরূপ মা’রাকিউল ফালাহ কিতাবেও উল্লেখ আছে।
এয়াড়াও নিম্নলিখিত পঞ্চাশের অধিক তাফসীর, হাদীছ, ফিক্বাহ ও ফতওয়ার কিতাব সমূহে ছানী আযান মিম্বরের নিকটে ইমামের সম্মুখে দেয়ার কথা বলা হয়েছে। অথচ রেজ খানীরা বিশ্ববিখ্যাত ও নির্ভর যোগ্য কিতাব সমূহের বক্তব্য ও অনুসরণীয় ইমামগণ উনাদের মতকে উপেক্ষা করে মুরুব্বী পুঁজারী ও অন্ধ বিশ্বাসীদের ন্যায় রেজা খানের ভুল, বিভ্রান্তিকর ও কুফরীমূলক মতটিকেই অনুসরণ করছে ও প্রচার করছে। বস্তুত: এরা দ্বারা তারা নিজেরাও কুফরীতে নিপতিত হচ্ছে আর মানুষকেও কুফরীর দিকে ধাবিত করছে। তাই রেজা খানীদের উচিত সময় থাকতে হক্বেও পথে ফিরে আসা এবং রেজা খানের কুফরীমূলক মতবাদ পরিহার করে হক্বানী-রব্বানী ইমামগণ উনাদের কুরআন-সুন্নাহ, ইজমা-ক্বিয়াস সম্মত ফতওয়াকে অনুসরণ ও প্রচার করা।
{দলীলসমূহ: (১) তাফসীওে আহকামুল কুরআন লিল জাসসাস, (২) কুরতুবী, (৩) রুহুল মায়ানী, (৪) হাশিয়াতুশ শারক্বাবী, (৫) মোরাগী, (৬) মাযহারী, (৭) ওসমানী, (৮) সিরাজুম মুনীর, (৯) ইবনুল আরাবি, (১০) কামালাইন, (১১) মাআরফুল কুরআন, (১২) এলাউস সুনান, (১৩) ফতহুল বারী, (১৪) ফয়জুল বারী, (১৫) শরহে জামেউস সহীহ, (১৬) আল আরফুশ শাজী, (১৭) মেরকাত, (১৮) হেদায়া, (১৯) রদ্দুল মোহতার, (২০) আইনী, (২১) আল জাওহারাতুন নাইয়্যারা, (২২) দুররুল মোখতার, (২৩) আল কাহেসতানী, (২৪) গায়াতুল আওতার, (২৫) বাহরুর রায়েক, (২৬) হেদায়া মায়ান্দেরায়া, (২৭) মারাকিউল ফালাহ, (২৮) ফতহুল ক্বাদীর, (২৯) হালবিয়ে কবীর, (৩০) শরহে বেক্বায়া, (৩১) শরহে নেক্বায়া, (৩২) শরহে সেক্বায়া, (৩৩) ফতওয়ায়ে শরীয়ত, (৩৪) ইসলামী ফিক্বাহ, (৩৫) জামেউল রুমুজ, (৩৬) কবীরী (৩৭) এনায়া (৩৮) কেফায়া (৩৯) আল মুখতাছারুল কুদুরী (৪০) উমদাতুর রেওয়ায়া (৪১) ইলমুল ফিক্বাহ (৪২) বেহেস্তী জেওর (৪৩) আল মাজমু শরহুল মুহাযযাব (৪৪) তোহফাতুল মোহতাজ বি শরহিল মিনহাজ (৪৫) বেদায়াতুল মুজতাহিদ (৪৬) শরহু মুলতাক্বাল আবহুর (৪৭) মাজমাউল আনহুর (৪৮) মাদানুল হাক্বায়েক্ব (৪৯) আলমগীরী (৫০) আইনুল হেদায়া (৫১) শামী (৫২) বাদায়েউস সানায়ে (৫৩) মারাকিউল ফালাহ (৫৪) কেফায়া (৫৫) নেহায়া (৫৬) দারুল উলুম দেওবন্দ (৫৭) আযীযুল ফতওয়া (৫৮) এমদাদুল ফতওয়া (৫৯) আহসানুল ফতওয়া ইত্যাদি।}
বি: দ্র: ছানী আযান সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হলে মাসিক আল বাইয়্যিনাত-এর ৯, ৪৭, ৪৮, ৪৯, ৫০তম সংখ্যা পাঠ করুন।
মুহম্মদ মাহবুবুজ্জামান
ঝাউতলা, চট্টগ্রাম।
এখন আমার সুওয়াল হলো- মাসিক তরজুমান পত্রিকার উক্ত বক্তব্য সঠিক হয়েছে কি? আর সত্যিই কি পীর সাহেবের হাতে বাইয়াত হওয়া সুন্নাত? দলীল-আদিল্লা ভিত্তিক সঠিক জাওয়াব দানে বাধিত করবেন।
জাওয়াব: পীর সাহেবের হাতে বাইয়াত হওয়ার সম্পর্কে চট্টগ্রামস্থ আনজুমানে রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া কর্তৃক প্রকাশিত রেজা খানী মাযহাবের মুখপত্র মাসিক তরজুমান পত্রিকার উক্ত বক্তব্য নেহায়েতই মুর্খতাসূচক, চরম বিভ্রান্তিকর এবং গোমরাহী মূলক। কারণ মাসিক তরজুমান পত্রিকায় বলা হয়েছে, “পীরের হাতে বায়আত হওয়া সুন্নাত ও ঈমান রক্ষার উছিলা।”
তরজুমান এর এ বক্তব্যের জবাবে প্রথমত: বলতে হয় যে, তরজুমানের উক্ত বক্তব্য স্ববিরোধী। কেননা পীর সাহেবের হাতে বাইয়াত হওয়া যদি ঈমান রক্ষার উছীলা হয়, তাহলে ঈমান রক্ষা করা তো ফরয। আর যে উছীলায় ঈমান রক্ষা হবে সেটাও অর্জন করা ফরয। যেহেতু ঈমান রক্ষা করা ফরয। আর ঈমান রক্ষার উছীলা হলো পীর সাহেবের হাতে বাইয়াত হওয়া। সেহেতু পীর সাহেবের হাতে বাইয়াত হওয়াও ফরয।
এ প্রসঙ্গে সর্বজনমান্য ও বিশ্ববিখ্যাত হানাফী মাযহাবের মশহুর ফিক্বাহর কিতাব “দুররুল মোখতারে” উল্লেখ আছে যে,
مالا يتم به الفرض فهو فرض.
অর্থ: “যে আমল ব্যতীত ফরয পরিপূর্ণ হয়না, যে ফরয পূর্ণ করার জন্য ঐ আমল করাটাও ফরয।”
আর বিখ্যাত তাফসীরগ্রস্থ “তাফসীওে মাযহারীতে” উল্লেখ আছে,
كل ما يترتب عليه الاثر من الفروض الاعيان فهو فرض عين.
অর্থ: “যে কাজ বা আমল ব্যতীত ফরযসমূহ আদায় করা সম্ভব হয়না, ফরযগুলো আদায় করার জন্য সে কাজ বা আমল করাও ফরয।”
উল্লিখিত উছূলের ভিত্তিতে বিশেষভাবে এটাই প্রমাণিত হয় যে, ঈমান রক্ষা করা যেহেতু ফরয আর ঈমান রক্ষার উছীলা হলো পীর সাহেবের হাতে বাইয়াত হওয়া, সেহেতু ঈমান রক্ষার জন্য পীর সাহেবের হাতে বাইয়াত হওয়াও ফরযের অন্তর্ভুক্ত।
দ্বিতীয়ত: বলতে হয় যে, তরজুমান পত্রিকায় লিখেছে, “পীরের হাতে বায়আত হওয়া সুন্নাত।” এখানে বলার অপেক্ষা রাখেনা যে ‘সুন্নত’ বলতে তরজুমান কর্তৃপক্ষ ফরয-ওয়াজিবরূপে গ্রহণ করাকে অস্বীকার করেছে।
এখন আমাদের কথা হলো, পীর সাহেবের হাতে বাইয়াত হওয়া যদি সুন্নত হয় তাহলে ইলমে তাসাউফ অর্জন করাও সুন্নত প্রমাণিত হয়। কেননা ইলমে তাসাউফ ও পীর সাহেবের নিকট বাইয়াত হওয়া বিষয় দু’টি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। অর্থাৎ পীর সাহেবের হাতে বাইয়াত হওয়া ব্যতীত কস্মিনকালেও ইলমে তাসাউফ অর্জন করা সম্ভব নয়।
আর ইলম অর্জন করা সম্পর্কে আখেরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন নাবিইয়ীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ করেন,
طلب العلم فريضة على كل مسلم.
অর্থ: “প্রত্যেক মুসলমানের (নর-নারীর) জন্য ইলম অর্জন করা ফরয।”
আর হাদীছ শরীফ-এ ইলমকে দু’ভাগে ভাগ করা হয়েছে। যেমন বর্ণিত হয়েছে,
العلم علمان فعلم فى القلب فذاك العلم النافع وعلم على اللسان فذالك حجة الله عز وجل على ابن ادم.
অর্থ: “ইলম দু’প্রকার। (১) ক্বালবী ইলম। অর্থাৎ ইলমে তাসাউফ, এটিই উপকারী ইলম। (২) জবানী ইলম। অর্থাৎ ইলমে ফিক্বাহ যা মহান আল্লাহ পাক উনার পক্ষ হতে বান্দার জন্য দলীল স্বরূপ।” (মেশকাত শরীফ)
আর এ হাদীছ শরীফ-এর ব্যাখ্যায় হযরত মোল্লা আলী কারী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মিশকাত শরীফ-এর বিখ্যাত শরাহ “মিরকাত শরীফ-এ” উল্লেখ করেন যে, মালেকী মাযহাবের ইমাম ইমামুল আইম্মা, তাজুল মুজতাহিদীন, রঈসুল মুহাদ্দিসীন, ফখরুল ফুক্বাহা, হযরত ইমাম মালেক রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন,
من تفقه ولم يتصوف فقد تفسق ومن تصوف ولم يتفقه فقد تزندق ومن جمع بينهما فقد تحقق.
অর্থ: “যে ব্যক্তি ইলমে ফিক্বাহ অর্জন করলো কিন্তু ইলমে তাসাউফ অর্জন করলো না, সে ব্যক্তি ফাসিক। আর যে ব্যক্তি ইলমে তাসাউফের দাবী করে অথচ ইলমে ফিক্বাহ বা শরীয়ত স্বীকার করেনা, সে ব্যক্তি জিন্দীক (কাফির)। আর যে ব্যক্তি ইলমে ফিক্বাহ ও ইলমে তাসাউফ উভয়টাই অর্জন করলো, সে ব্যক্তিই মুহাক্কিক অর্থাৎ অর্থাৎ মু’মিনে কামিল।
অতএব, প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যই উল্লিখিত দু’প্রকার ইলম অর্থাৎ ইলমে ফিক্বাহ ও ইলমে তাসাউফ জরুরত আন্দাজ শিক্ষা করা ফরয।
মাসিক তরজুমান কর্তৃপক্ষ ‘ফরয’কে ‘সুন্নত’ সাব্যস্ত করে স্পষ্ট কুফরী করেছে। কারণ এটা সকলেরই জানা যে, শরয়ী উছূল মুতাবিক ফরযকে সুন্নত, সুন্নতকে ফরয, হারামকে হালাল ও হালালকে হারাম সাব্যস্ত করা সুস্পষ্ট কুফরী।
তৃতীয়ত: বলতে হয় যে, “পীরের হাতে বায়আত হওয়া সুন্নাত।” মাসিক তরজুমানের এ বক্তব্য পূর্ববর্তী “উলীল-আমর” অর্থাৎ অনুসরণীয় ইমাম-মুজতাহিদ ও আউলিয়ায়ে কিরামগণ উনাদের ফতওয়ার সম্পূর্ণই খেলাফ বা বিপরীত হয়েছে। কারণ পূর্ববর্তী অনুসরণীয় ইমামগণ উনাদের ফতওয়া হচ্ছে- “ইলমে তাসাউফ হাছিল করার জন্য একজন কামিল শায়খ বা মুর্শিদের নিকট বাইয়াত হওয়া ফরয।”
যেমন, এ প্রসঙ্গে গাউসুল আ’যম, মাহবুবে সোবহানী, কুতুবে রব্বানী, ইমামুল আইম্মা, হযরত বড় পীর আব্দুল ক্বাদির জিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি (তরজুমান গং জাহেরীভাবে যার মুহব্বত ও ইশকের দাবীদার) উনার বিখ্যাত ও আলোড়ন সৃষ্টিকারী কিতাব “সিররুল আসরারে” লিখেন,
ولذالك طلب اهل التلقين لحياة القلوب فرض
অর্থ: “ক্বালব জিন্দা করার জন্য অর্থাৎ অন্তর পরিশুদ্ধ বা আত্মশুদ্ধি অর্জন করার জন্য “আহলে তালক্বীন” তালাশ করা বা কামিল মুর্শিদের নিকট বাইয়াত গ্রহণ করা ফরয।” অনুরূপ “ফাতহুর রব্বানীতে” ও মালফুজাতে গাউসুল আজমে উল্লেখ আছে।
এয়াড়া আরো অন্যান্য সর্বজনমান্য ও সর্বজন স্বীকৃত ইমাম, মুজতাহিদ ও আউলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম পীর সাহেবের নিকট বাইয়াত গ্রহণ করা ফরয বলে ফতওয়া দিয়েছেন।
যেমন- হুজ্জাতুল ইসলাম হযরত ইমাম গাজ্জালী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার “এহইয়াউল উলুমুদ্দীন ও ক্বিমিয়ায়ে সায়াদাত” কিতাবে, হযরত খাজা মুঈনুদ্দীন চিশতী আজমিরী রহমতুল্লাহি আলাইহি “ধানিসুল আরওয়াহ” কিতাবে, ইমামুশ শরীয়ত ওয়াত তরীক্বত শায়খ আবুল কাসিম কুশাইরী রহমতুল্লাহি আলাইহি “রিসালায়ে কুশাইরিয়া” কিতাবে, হযরত হাজী ছানাউল্লাহ পানিপথি রহমতুল্লাহি আলাইহি, “মালা বুদ্দা মিনহু” ও “মরশাদুত্তালেবীন” কিতাবে, শাহ আব্দুল আযীয মুহাদ্দিস দেহলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি “তাফসীরে আযীযী” নামক কিতাবে, কাইয়্যুমে আউয়াল, আফজালুল আউলিয়া, হযরত মুজাদ্দিদে আলফে ছানী রহমতুল্লাহি আলাইহি “মকতুবাত শরীফ-এ”, ইমামুজ্জামান হযরত ইমাম আহমদ রেফায়ী রহমতুল্লাহি আলাইহি “আল বুনইয়ানুল মুশাইয়্যাদ” কিতাবে, ইমামুল আলিম, শাইখুল কামিল, খতিমাতুল মুফাসসিরীন শায়খ হযরত ইসলামঈল হাক্কী রহমতুল্লাহি আলাইহি “তাফসীরে রুহুল বয়ানে” সরাসরি পীর সাহেব গ্রহণ করা ফরয বলে ফতওয়া দিয়েছেন।
তাছাড়া পীর সাহেব গ্রহণ করা ফরয না হয়ে যদি সুন্নতই হতো তবে হানাফী মাযহাবের ইমাম, ইমামুল আইম্মা, ইমামে আ’যম হযরত আবূ হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি একথা কেন বলেছেন যে, “যদি আমি দুই বৎসর আমার পীর সাহেব হযরত ইমাম বাকের ও হযরত ইমাম জা’ফর ছাদিক্ব রহমতুল্লাহি আলাইহিমা-এর হাতে বাইয়াত হয়ে উনাদের সোহবত এখতিয়ার না করতাম তবে আমি নু’মান বিন ছাবিত হালাক হয়ে যেতাম।”
এখন প্রশ্ন হলো, যে আমল দ্বারা হালাকী থেকে বাঁচা যায় সে আমল সুন্নত না ফরয? অবশ্যই ফরয।
উপরোক্ত দলীলভিত্তিক আলোচনা দ্বারা এটাই প্রমাণিত হলো যে, “পীরের হাতে বাইয়াত হওয়া সুন্নাত” মাসিক তরজুমানের এ বক্তব্য কুরআন শরীফ, হাদীছ শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াসের খিলাফ হওয়ার কারণে শুধু বিভ্রান্তিকরই নয় বরং কুফরীমূলকও হয়েছে। কাজেই তারা যদি মহান আল্লাহ পাক ও উনার হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সন্তুষ্টিই চেয়ে থাকে তবে তাদের উচিত হবে নিজেদের ভুল স্বীকার করে পরবর্তী সংখ্যায় সঠিক ফতওয়া প্রকাশ করা।
“পীর সাহেবের হাতে বাইয়াত হওয়া ফরয।” এটাই বিশুদ্ধ, গ্রহণযোগ্য ও কুরআন-সুন্নাহ সম্মত ফতওয়া।
{দলীলসমূহ: (১) তাফসীরে খাযেন (২) বাগবী (৩) কুরতুবী (৪) আহকামুল কুরআন লিল জাসসাস (৫) আবী সউদ (৬) ফতহুল ক্বাদীর (৭) ইবনে কাছীর (৮) তাবাবী (৯) দুররে মানছুর (১০) রুহুল বয়ান (১১) রুহুল মায়ানী (১২) মাআরফুল কুরআন (১৩) মুসলিম (১৪) তিরমীযী (১৫) আবূ দাউদ (১৬) ইবনে মাযাহ (১৭) বায়হাক্বী (১৮) দারেমী (১৯) দায়লামী (২০) তারগীব ওয়াত তারহীব (২১) তারীখ (২২) আব্দুল বার (২৩) মেশকাত (২৪) বজলুল মাযহুদ (২৫) শরহে নব্বী (২৬) মায়ারেফুস সুনান (২৭) উরফুশ শাজী (২৮) মেরকাত (২৯) লুময়াত (৩০) আশয়াতুল লুময়াত (৩১) শরহুত ত্বীবী (৩২) তা’লীকুছ ছবীহ (৩৩) মোযাহেরে হক্ব (৩৪) মিরআতুল মানাজীহ (৩৫) কিমিয়ায়ে সায়াদাত (৩৬) এহইয়াউল উলুমুদ্দীন (৩৭) আল মুনকিযু মিনাদ্দালাল (৩৮) ফাতহুর রব্বানী (৩৯) মাকতুবাত শরীফ (৪০) আল বুনিয়ানুল মুশাইয়্যাদ (৪১) সাইফুল মুকাল্লেদীন (৪২) ফতওয়ায়ে আমিনীয়া (৪৩) ফতওয়ায়ে সিদ্দীক্বিয়া (৪৪) শরহে আক্বায়েদে নসফী (৪৫) ফিক্বহুল আকবার (৪৬) মিনহাজুল আবেদীন ইত্যাদি।}
(এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে হলে মাসিক আল বাইয়্যিনাত পত্রিকার ৪৩ ও ৪৪তম সংখ্যা পাঠ করুন)।
বি:দ্র: পীর সাহেবের নিকট মুরীদ বা বাইয়াত হওয়া ফরয এ ব্যাপারে আমরা অচিরেই বিস্তারিত ফতওয়া দিব ইনশাআল্লাহ।
মুহম্মদ সাইফুল ইসলাম
পীরগাছা, বগুড়া।
সুওয়াল: মাসিক মদীনা আগস্ট ২০০০ ঈসায়ী সংখ্যায় প্রশ্নোত্তর বিভাগে ৪৮নং প্রশ্নের উত্তরে বলা হয়েছে ……….. “কোন একজন বুযুর্গ আলেমের হাতে বাইয়াত গ্রহণ করা মোস্তাহাব। যারা বলে বাইয়াত না হলে নামাযই কবুল হবে না, তাদের সে বক্তব্য বাণিজ্যিক স্বার্থদোষে দুষ্ট বলে মনে হয়। বাইয়াত হওয়া নামায কবুলের শর্ত এরূপ তথ্য কোন কিতাবে এ পর্যন্ত আমি দেখি নাই।”
এখন আমার সুওয়াল হলো- মাসিক মদীনার উক্ত বক্তব্য সঠিক হয়েছে কি? দলীল সহ সঠিক জাওয়াব দানে বাধিত করবেন।
জাওয়াব: একজন বুযুর্গ আলেমের হাতে তথা একজন হক্কানী পীর সাহেবের হাতে বাইয়াত হওয়া সম্পর্কে মাসিক মদীনার উক্ত বক্তব্য সঠিক হয়নি। বরং তার উক্ত বক্তব্য কুরআন শরীফ, হাদীছ শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াসের খিলাফ হওয়ায় কুফরী মূলক হয়েছে। মূলত কুরআন শরীফ, হাদীছ শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াসের দৃষ্টিতে সঠিক ও নির্ভুল ফতওয়া হলো একজন হক্কানী-রব্বানী বুযুর্গ আলেমের তথা পীর সাহেবে হাতে বাইয়াত হওয়া ফরয।
বস্তুত যেনোতেনো প্রকারে শরীয়ত পালন করা মুখ্য উদ্দেশ্য নয় বরং শরীয়তের আমলগুলো যথাযথভাবে মহান আল্লাহ পাক এবং হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নির্দেশ মুতাবিক আল করে মহান আল্লাহ পাক ও উনার রসূল হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সন্তুষ্টি অর্জন করাই মূল বিষয়। কুরআন শরীফ, হাদীছ শরীফ, ইজমা, ক্বিয়াস দ্বারা অকাট্যভাবে প্রমাণিত যে, ইখলাছ ব্যতীত শরীয়তের কোন আমলই মহান আল্লাহ পাক উনার দরবারে কবুলযোগ্য নয় বা মহান আল্লাহ পাক ও উনার রসূল হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সন্তুষ্টি হাছিল হবে না। এ প্রসঙ্গে হাদীছ শরীফ-এ ইরশাদ হয়েছে, হযরত আবু উমামা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার হতে বর্ণিত সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলেন-
ان الله يقبل من العمل الا ماكان له خالصا وابتغى به وجهه.
অর্থ: “নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ পাক তিনি ঐ সব আমল কবুল করবেন না, যা ইখলাছের সাথে মহান আল্লাহ পাক উনার সন্তুষ্টির জন্য না করা হয়।” (নাসাঈ শরীফ)
হাদীছ শরীফ-এ আরো ইরশাদ হয়েছে, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইখলাছের গুরুত্ব ও তাৎপর্য সম্পর্কে বলেন,
عن ابى هريرة رضى الله تعالى عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم ان اول الناس يقضى عليه يوم القيامة رجل اشتشهد فاتى به فعرفه نعمته فعرفها فقال فما عملت فيها؟ قال قاتلت فيك حتى اشتشهدت، قال كذبت ولكنك قاتلت لان يقال جرىء فقد قيل ثم امر به فسحب على وجهه حتى القى فى النار ورجل تعلم العلم وعلمه وقرأ القران فاتى به فعرفه نعمه فعرفها قال فما عملت فيها؟ قال تعلمت العلم وعلمته وقرأت فيك القران قال كذبت ولكنك تعلمت العلم ليقال انك عالم وقرأت القران ليقال هو قارى فقد قيل ثم امر به فسحب على وجهه حتى القى فى النار و رجل وسع الله عليه واعطاه من اصناف المال كله فاتى به فعربه نعمه فعرفها قال فما عملت فيها؟ قال ماتركت من سبيل تحب ان ينفق فيها الا انفقت فيهالك قال كذبت ولكنك فعلت ليقال هو جواد فقد قيل ثم امر به فسحب على وجهه ثم القى فى النار.
অর্থ: “ক্বিয়ামতের দিন তিনজন লোককে প্রথমে বিচারের জন্য আনা হবে। প্রথম যে ব্যক্তিকে আনা হবে, সে হলো একজন শহীদ। তাকে জিজ্ঞেস করা হবে, হে ব্যক্তি তোমাকে আমি এত শক্তি সামর্থ দিলাম, তা দিয়ে তুমি কি করেছ? সে বলবে, মহান আল্লাহ পাক আমি জিহাদ করতে করতে আপনার জন্য শহীদ হয়েছি।
মহান আল্লাহ পাক তিনি বলবেন, মিথ্যা কথা, আমার জন্য জিহাদ করনি। মানুষ তোমাকে বড় পালোয়ান বা শক্তিশালী বলবে, সেজন্য তুমি জিহাদ করেছ, যুদ্ধ করেছ। মানুষ তোমাকে শহীদ বলেছে। (তোমার বদলা তুমি পেয়েছ) তখন ফেরেশতাদের বলবেন, হে ফেরেস্তারা, এ লোকটাকে চুলে ধরে জাহান্নামে নিক্ষেপ কর, তাই করা হবে।
দ্বিতীয় আরেকজন লোককে আনা হবে, যাকে ইলম দান করা হয়েছে এবং সে তা অন্যকে শিক্ষা দিয়েছে এবং কুরআন শরীফ সহীহ-শুদ্ধভাবে পড়তে শিখেছে।
মহান আল্লাহ পাক তিনি তাকে বলবেন, হে আলেম বা ক্বারী সাহেব, তোমাকে এত ইলম দেয়া হয়েছিল, শুদ্ধ করে কুরআন শরীফ পাঠ করতে শিক্ষা দেয়া হয়েছিল, তুমি কি করলে?
সে ব্যক্তি বলবে, মহান আল্লাহ পাক, আমি আপনার জন্য ইলম শিক্ষা করেছি এবং তা অন্যকে শিক্ষা দিয়েছি, আর আপনার জন্যই আমি কুরআন শরীফ শুদ্ধ করে পাঠ করেছি।
মহান আল্লাহ পাক তিনি বলবেন, মিথ্যা কথা। বরং মানুষকে তোমাকে বড় আলেম বা বড় ক্বারী সাহেব বলবে, সে জন্যেই তুমি ইলম অর্জন করেছ, কুরআন শরীফ শুদ্ধ করে তিলাওয়াত করতে শিখেছ। কাজেই মানুষ তোমাকে বড় আলেম, বড় ক্বারী সাহেব বলেছে (তোমার বদলা তুমি পেয়েছ)। তখন মহান আল্লাহ পাক তিনি ফেরেশতাদেরকে বলবেন, হে ফেরেশতারা, তোমরা এ লোকটাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ কর। তখন তার চুলে ধরে তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।
এরপর তৃতীয় আরেক জনকে আনা হবে, যাকে অনেক সম্পদ দান করা হয়েছে। তাকে মহান আল্লাহ পাক তিনি বলবেন, হে ব্যক্তি, তোমাকে আমি দুনিয়াতে অনেক সম্পদের মালিক করেছিলাম, তার বিনিময়ে তুমি কি আমল করলে?
সে ব্যক্তি বলবে, হে মহান আল্লাহ পাক, আমি আপনার পছন্দণীয় এমন কোন পথ নেই, যে পথে দান-খয়রাত করিনি। অর্থাৎ আপনি যতগুলো রাস্তা পছন্দ করতেন, মসজিদ, মাদরাসা, লঙ্গরখানা, এতিমখানা, গরীব-মিসকিন, রাস্তা-ঘাট, পুল ইত্যাদি সমস্ত ক্ষেত্রেই আমি কম-বেশি দান করেছি। কোন প্রার্থীকে আমি খালিহাতে ফিরিয়ে দেইনি। সবাইকে কম-বেশি দান করেছি, একমাত্র আপনার সন্তুষ্টির জন্য।
মহান আল্লাহ পাক তিনি বলবেন, মিথ্যা কথা। তুমি এ জন্য করেছ যে, লোকে তোমাকে দানশীল বলবে, তোমাকে তা বলা হয়েছে। মহান আল্লাহ পাক তিনি তখন বলবেন, হে ফেরেশতারা, এ দানশীল ব্যক্তিকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করে দাও। তখন ফেরেশতারা তাকে চুলে ধরে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন। (মুসলিম শরীফ)
এ প্রসঙ্গে ফতওয়ায়ে শামীতে উল্লেখ আছে যে,
وعلم الاخلاص لان صحة العمل موقوفة عليه
অর্থ: “ইখলাছ সম্পর্কিত ইলম অর্জন করা ফরয, কেননা ইখলাছ ব্যতীত আমল কবুলযোগ্য নয়।”
অতএব, প্রমাণিত হলো যে, ইখলাছ ব্যতীত শরীয়তের কোন আমলই যেমন নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত, দান-খয়রাত, জিহাদ, দর্স-তাদরীস ইত্যাদি যেকোন আমলই হোকনা কেন তা কখনও মহান আল্লাহ পাক উনার দরবারে কবুলযোগ্য নয়। সে যতই শরীয়ত মত জীবন-যাপন করুক না কেন। এজন্য ইখলাছ অর্জন করা ফরয বলা হয়েছে।
আর এ ইখলাছ অর্জন করা সম্ভব নয় ইলমে তাসাউফ ব্যতীত আর ইলমে তাসাউফ হাছিল করা সম্ভব নয়, একজন হক্কানী ও কামিল পীর সাহেবের নিকট মুরীদ বা বাইয়াত হওয়া ব্যতীত।
উল্লেখ্য, পীর সাহেবের নিকট মুরীদ হওয়া ব্যতীত শরীয়ত মুতাবিক জীবন-যাপন করা বা ইখলাছের সাথে আমল করা কস্মিনকালেও সম্ভব নয় বিধায় পূর্ববর্তী সকল বিশ্বখ্যাত ইমাম-মুজতাহিদ ও আলেমগণ প্রত্যেকেই কোন না কোন পীর সাহেবের নিকট মুরীদ হয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে ইমামকুল শিরমণি, ফখরুল ওলামা ওয়াল মাশায়েখ, ইমামুল মুজতাহিদীন, শায়খুল মুতাকাদ্দেমীন ওয়াল মুতাআখখেরীন, ইমামুল আইম্মা, ইমামুল আ’যম, হযরত ইমাম আবূ হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন,
لولا سنتان لهلك ابو نعمان.
অর্থ: “যদি আমি আবূ হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি দুটি বৎসর না পেতাম, তবে ধ্বংস হয়ে যেতাম।” অর্থাৎ যদি দু’বৎসর আমার পীর সাহেবের নিকট বাইয়াত হয়ে ইলমে তাসাউফ চর্চার মাধ্যমে ইখলাছ অর্জন না করতাম, তবে ধ্বংস হয়ে যেতাম।
উল্লেখ্য, উনার পীর সাহেব ছিলেন দু’জন। একজন হলেন, হযরত ইমাম বাকের রহতুল্লাহি আলাইহি আর দ্বিতীয়জন হলেন, হযরত ইমাম জাফর রাদিক রহমতুল্লাহি আলাইহি। আর বিখ্যাত কবি, বিশ্বখ্যাত দার্শনিক ও আলেম, বিশিষ্ট সূফীসাধক, হযরত মাওলানা জালালুদ্দীন রূমী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন,
উর্দু কম্পোজ করতে হবে
অর্থ: “আমি মাওলানা রূমী রহমতুল্লাহি আলাইহি ততক্ষণ পর্যন্ত মহান আল্লাহওয়ালা হতে পারিনি, যতক্ষণ পর্যন্ত আমার পীর শামছে তাবরীজি রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার নিকট বাইয়াত হয়ে ইলমে তাসাউফ চর্চা করে ইখলাছ হাছিল না করেছি। অর্থাৎ ইলমে তাসাউফ চর্চার মাধ্যমে ইখলাছ অর্জন করার পরই হাক্বীক্বী মু’মিন হতে পেরেছি।”
এখানে ফিকিরের বিষয় এই যে, উনাদের মত মশহুর ইমাম, মুজতাহিদ ও আলেমগণ যদি পীর সাহেবের নিকট বাইয়াত হওয়া ব্যতীত ইখলাছ অর্জন করত: হাক্বীক্বী মু’মিন হতে না পারেন, তবে সাধারণ লোকের পক্ষে পীর সাহেবের নিকট বাইয়াত হওয়া ব্যতীত কিরূপে নফসানিয়াত তথা গায়রুল্লাহ থেকে বাঁচা তথা ইখলাছ অর্জন করা বা হাক্বীকী মু’মিন হওয়া সম্ভব? প্রকৃতপক্ষে কস্মিনকালেও তা সম্ভব নয়।
উল্লেখ কুরআন শরীফ-এ মহান আল্লাহ পাক তিনি বলেন,
فويل للمصلين الذين هم عن صلاتهم صاهون.
অর্থ: “ঐ মুছল্লীর জন্য জাহান্নাম যে তার নামাযে সুস্থি-কাহিলী করেছে।” (সূরা মাউন/৪-৫)
কাজেই দেখা যাচ্ছে যে নামায পড়েও মানুষ জাহান্নামে যাবে। বলার অপেক্ষা রাখেনা যে যারা তাসাউফ করেনা, বা বাইয়াত হয় না তাদের সকলেই নামাযে দাঁড়ালে হাজারো দুনিয়াবী কথা মনে হয়। চাকুরী-বাকুরী, ব্যবসা-বাণিজ্য, বন্ধু-বান্ধব, বিভিন্ন ঘটনা ইত্যাদি হাজারো কিছু তাদের মনে হয়। তাই তারা ধ্যান-খেয়ালের সাথে আদৌ যথাযথভাবে নামায পালন করতে পারে না। সুতরাং তাদের নামায কবুল না হওয়াই স্বাভাবিক। পক্ষান্তরে যারা তাসাউফ অর্জন বা বাইয়াত হয়ে যিকির-ফিকির করত: ইখলাছ অর্জন করেছে তাদের পক্ষেই কেবল হুজুরী পুরোপুরিভাবে বজায় রাখা সম্ভব। তাদের সম্পর্কেই হাদীছ শরীফ-এ এসেছে الصلوة معراج المؤمنين.
“নামায মু’মিনের মিরাজ।” আর মহান আল্লাহ পাক তিনি বলেন, قد افلح المؤمنين الذين هم فى صلاتهم خشعون
অর্থ: ঐ সকল মু’মিন কামিয়াবী হাছিল করবে যারা খুশুখুজুর সাথে নামায আদায় করবে।” (সূরা মু’মিনুন/১-২)
মূলত: মাসিক মদীনা সম্পাদক ইলমে তাসাউফ অর্জন থেকে মাহরূম থাকার ফলেই সে এরকম জিহালতি পূর্ণ বক্তব্য দিয়েছে।
কাজেই তার উচিত এ ধরণের জিহালতি ও গোমরাহীমূলক বক্তব্য প্রদান থেকে বিরত থাকা এবং এর থেকে খালেছ তওবা করা।
হযরত বড় পীর সাহেব রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার ফতহুর রব্বানীতে, মালফুজাতে গাওসুল আযম কিতাবে, হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী আজমিরী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি আনিসুল আরওয়াহ কিতাবে, হযরত মুজাদ্দিদে আলফে সানী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি মকতুবাত শরীফ-এ, ইমামুশ শরীয়ত ওয়াত ত্বরীক্বত শায়খ আবুল কাসিম কুশাইরী রহমতুল্লাহি আলাইহি রিসালায়ে কুশাইরিয়া কিতাবে, হযরত কাজী সানাউল্লাহ পানিপথি রহমতুল্লাহি আলাইহি মালা বুদ্দা মিনহু ও এরশাদুত্তালেবীন কিতাবে, শাহ আব্দুল আযীয মুহাদ্দিস দেহলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি তফসীরে আযীযীতে, হাফিজে হাদীছ মাওলানা রুহুল আমীন রহমতুল্লাহি আলাইহি তাসাউফ তত্ত্ব ও তরীক্বত দর্পন কিতাবে, আল্লামা শামী রহমতুল্লাহি আলাইহি রদ্দুল মোহতার কিতাবে, ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার তাফসীরে কবীর কিতাবে ইলমে তাসাউফ অর্জন করা ফরয ও পীর সাহেব গ্রহণ করা আবশ্যক বলেছেন।
{দলীলসমূহ: (১) তাফসীরে খাযেন, (২) বাগবী (৩) কুরতুবী (৪) আহকামুল কুরআন লিল জাসসাস (৫) আবী সউদ (৬) ফতহুল ক্বাদীর (৭) ইবনে কাছীর (৮) তাবারী (৯) দূররে মানছুর (১০ রুহুল বয়ান (১১) রুহুল মায়ানী (১২) তাফসীরে কবীর (১৩) মাযহারী (১৪) মাআরেফুল কুরআন (১৫) মুসলিম (১৬) তিরমিযী (১৭) আবূ দাউদ (১৮) ইবনে মাযাহ (১৯) বায়হাক্বী (২০) দারেমী (২১) দায়লামী (২২) তারগীব ওয়াত তারহীব (২৩) তারীখ (২৪) আব্দুল বার (২৫) মেশকাত (২৬) বজলুল মাযহুদ (২৭) শরহে নব্বী (২৮) মাআরেফুস সুনান (২৯) উরফুশ শাজী (৩০) মেরকাত (৩১) লুময়াত (৩২) আশয়াতুল লুময়াত (৩৩) শরহুত ত্বীবী (৩৪) তা’লীকুছ ছবীহ (৩৫) মোযাহেরে হক্ব (৩৬) মিরআতুল মানাজীহ (৩৭) কিমিয়ায়ে সাআদাত (৩৮) ইহইয়াউল উলুমুদ্দীন (৩৯) আল মুনকিযু মিনাদ্দালাল (৪০) ফাতহুর রাব্বানী (৪১) আল বুনিয়ানুল মুশাইয়্যাদ (৪২) সাইফুল মুকাল্লেদীন (৪৩) দুররুল মোখতার (৪৪) ফতওয়ায়ে আমিনীয়া (৪৫) ফতওয়ায়ে সিদ্দীক্বিয়া (৪৬) শরহে আক্বায়েদে নসফী (৪৭) ফিক্বহুল আকবার ইত্যাদি}।
বি:দ্র: পীর সাহেবের নিকট মুরীদ বা বাইয়াত হওয়া ফরয, এ ব্যাপারে আমরা অচিরেই বিস্তারিত ফতওয়া দিব ইনশাআল্লাহ। এ ব্যাপারে মোটামুটি বিস্তারিত জানতে হলে মাসিক আল বাইয়্যিনাত পত্রিকার ৪৩ ও ৪৪তম সংখ্যা পাঠ করুন।
হাফেয মুহম্মদ কবীর হুসাইন
পূর্ব মইশাদী, মাধবদী, নরসিংদী।
সুওয়াল: মাসিক রাহমানী পয়গাম জুলাই/২০০০ ঈসায়ী সংখ্যায় জিজ্ঞাসার জবাব বিভাগে ৬২০ নং জিজ্ঞাসার জবাবে বলা হয়েছে, “কোন আযানের মৌখিক জাওয়াব দেওয়াই ওয়াজিব নয়, বরং পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের আযানের মৌখিক জবাব মুস্তাহাব আর জুমু’আর দ্বিতীয় আযান অর্থাৎ খুতবার পূর্বের আযানের জওয়াব মুখে দেয়া মাকরূহ ……..।”
এখন আমার সুওয়াল হলো- মাসিক রাহমানী পয়গামের উক্ত বক্তব্য সঠিক হয়েছে কি? আর সত্যিই কি মৌখিকভাবে আযানের জাওয়াব দেয়া মুস্তাহাব এবং জুমু’আর ছানী বা দ্বিতীয় আযানের জাওয়াব মুখে দেয়া মাকরূহ? দলীল সহ সঠিক জাওয়াব দানে বাধিত করবেন।
জাওয়াব: আযানের মৌখিক জাওয়াব দেয়া ও ছানী আযানের জাওয়াব দেয়া সম্পর্কে মাসিক রাহমানী পয়গামের জবাব শুদ্ধ হয়নি। বরং তা জিহালতসূচক ও গোমরাহীমূলক হয়েছে। কারণ আযানের মৌখিক জাওয়াব দেয়া হচ্ছে ওয়াজিব। আর ছানী আযানের জাওয়াব দেয়া হচ্ছে জায়েয। এর অসংখ্য দলীল-আদিল্লা রয়েছে।
হাদীছ শরীফ-এর সহীহ কিতাব “বুখারী শরীফ-এর” ১ম খণ্ডের ৮৬ পৃষ্ঠা ও মুসলিম শরীফ-এর ১ম খণ্ডের ১৬৬ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,
عن ابى سعيدن الخدرى ان رسول الله صلى الله عليه وسلم قال اذا سمعتم النداء فقولوا مثل مايقول المؤذن.
অর্থ: “হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নিশ্চয়ই হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলেছেন, “যখন তোমরা আযান শুনবে, তখন মুয়াজ্জিন যা বলে, তোমরাও তাই বল।” অনুরূপ “তিরমিযী শরীফ-এর” ১ম খণ্ডের ২৯ পৃষ্ঠায় “আবূ দাউদ শরীফ” কিতাবের ১ম খণ্ডের ৯৩ পৃষ্ঠায়, “ইবনে মাযাহ শরীফ-এর” ৫৩ পৃষ্ঠায়, “নাসাঈ শরীফ-এ”, “মুয়াত্তা ইমাম মালেক রহমতুল্লাহি আলাইহি” ৬১ পৃষ্ঠায় মুয়াত্তা “ইমাম মুহম্মদ রহমতুল্লাহি আলাইহি” ৭৫ পৃষ্ঠায়, “মেশকাত শরীফ-এর” ৬৪ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে যে, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলেছেন, যখন তোমরা মুয়াজ্জিনের আযান শুনবে তখন তোমরাও অনুরূপ বল যা মুয়াজ্জিন বলে।
“বাহরুর রায়েক” কিতাবের ১ম খণ্ডের ২৫৯ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,
والظاهر ان الاجابة باللسان واجبة لظاهر الامر فى قوله صلى الله عليه وسلم اذا سمعتم المؤذن فقولوا مثل مايقول.
অর্থ: “জাহের রেওয়ায়েত অনুযায়ী নিশ্চয়ই মৌখিকভাবে আযানের জবাব দেয়া ওয়াজিব। কেননা হাদীছ শরীফ-এ আখেরী রাসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি সুস্পষ্টভাবে আদেশ করেছেন যে, যখন তোমরা মুয়াজ্জিনের আযান শুনবে তখন মুয়াজ্জিন যেরূপ বলে তোমরাও তদ্রুপ বল।”
দ্বিতীয়ত: জুমুয়ার ছানী বা দ্বিতীয় আযান যা হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার যামানায় প্রথম আযান ছিল। আর তিনি স্বয়ং নিজেই এ আযানের জাওয়াব দিয়েছিলেন। এ প্রসঙ্গে বোখারী শরীফ ও নাসাঈ শরীফ-এ হযরত আবূ উমামা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে রেওয়ায়েত রয়েছে যে,
عن ابى امامة قال سمعت معاوية بن ابى سفيان رضى الله عنهما وهو جالس على المنبر اذن المؤذن فقال الله اكبر، الله اكبر الخ، فلما ان قضى التأذين قال يا ايها الناس انى سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم على هذا المجلس حين اذن المؤذن يقول ما سمعتم منى من مقالتى.
অর্থ: “হযরত আবূ উমামা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি শুনেছি ছাহাবী হযরত মুয়াবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি জুমুয়ার দিন মিম্বরের উপর বসে মুয়াজ্জিনের আযানের সঙ্গে সঙ্গে নিজেও আযানের শব্দ সমূহকে উচ্চারণ করেন এবং আযান শেষে বলেন, হে লোক সকল! আমি হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে জুমুয়ার দিন মিম্বরে বসা অবস্থায় মুয়াজ্জিনের আযান প্রবনে এরূপ বলতে শুনেছি, যেরূপ তোমরা আমার থেকে শুনতে পেলে।”
আর তার ব্যাখ্যায় বোখারী শরীফ-এর বিখ্যাত শরাহ “আইনী” কিতাবে উল্লেখ করা হয়,
مما يستفاد منه تعلم العلم وتعليمه من الامام وهو على المنبر وفيه اجابة الخطيب للمؤذن وهو على المنبر وفيه قول المجيب “وانا كذالك” وظاهره ان هذا المقدار يكفى لكن الاولى ان يقول مثل قول المؤذن.
অর্থ: “উল্লিখিত (হযরত মুয়াবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার আযানের পর কথা বলা সংক্রান্ত) হাদীছ শরীফ দ্বারা নি¤œলিখিত বিষয়গুলো স্পষ্ট হয়ে যায়, (১) খতীব মিম্বরে থাকা অবস্থায় মোক্তাদীগণকে কোন মাসয়ালা-মাসায়েল শিক্ষা দেয়া, (২) মোক্তাদীগণ কোন মাসয়ালা শিক্ষা করা, (৩) মুয়াজ্জিনের আযানে (আমি এরূপ শুনেছি) শ্রোতাদের জবাব দেয়া জায়েয। প্রকাশ থাকে যে, ঐভাবে সংক্ষেপে জবাব দিলেও চলবে, তবে পরিপূর্ণ জবাব দেয়াই উত্তম।”
{দলীলসমূহ: (১) বুখারী শরীফ (২) মুসলিম শরীফ (৩) তিরমিযী শরীফ (৪) আবূ দাউদ শরীফ (৫) নাসাঈ শরীফ (৬) ইবনে মাযাহ শরীফ (৭) মুয়াত্তা ইমাম মালেক রহমতুল্লাহি আলাইহি (৮) মুয়াত্তা ইমাম মুহম্মদ রহমতুল্লাহি আলাইহি (৯) মেশকাত শরীফ (১০) লুময়াত (১১) আশয়াতুল লুময়াত (১২) কুনিয়া (১৩) শরহে মুনিয়া (১৪) নেহায়া (১৫) মুহিত (১৬) জখীরা (১৭) শরহুছ ছগীর (১৮) শরহুল কবীর (১৯) আল কাওয়ানী নুল ফিক্বাহিয়্যাহ (২০) আল আজমু (২১) মুগনিউল মুহতাজ (২২) আল মাযহাব (২৩) কাশশাফুল কিনা (২৪) মুগনী (২৫) বাহরুর রায়েক (২৬) নাহরুল ফায়েক (২৭) ফিক্বাহুল ইসলামী ওয়া আদিল্লাহ (২৮) বাদায়েয়ুছ ছানায়াা (২৯) বেনায়া (৩০) তোহফা (৩১) ফাতাওয়া (৩২) খোলাছাতুল ফতওয়া (৩৩) আলমগীরী (৩৪) ফতহুল ক্বাদীর (৩৫) মূহীতে সারাখসী (৩৬) গারায়েব (৩৭) আইনুল হেদায়া (৩৮) গায়াতুল আওতার (৩৯) তানবীরুল আবছার (৪০) দুররুল মোখতার (৪১) রদ্দুল মোহতার (৪২) হাশিয়ায়ে তাহতাবী আলা দুররিল মোখতার (৪৩) মারাকিউল ফালাহ (৪৪) ফতওয়ায়ে কাজীখান (৪৫) মাযমাউল আনহুর (৪৬) জাওহারাতুন নাইয়ারাহ (৪৭) ফতওয়ায়ে হিন্দিয়া (৪৮) শরহে ইলিয়াস (৪৯) জামিউর রুমুজ (৫০) শামী (৫১) কাশফুল গোম্মা (৫২) আরকানে আরবায়া (৫৩) কবীরী (৫৪) হাশিয়ায়ে তাবিনুল হাকায়েক্ব (৫৫) আল ফাওয়ায়েদ (৫৬) জাওয়াহের ইত্যাদি}
বি: দ্র: আযানের মৌখিক জাওয়াব দেয়া ওয়াজিব এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হলে মাসিক আল বাইয়্যিনাত-এর ৮১তম সংখ্যা পাঠ করুন। আর ছানী আযান সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হলে ১৮তম ও ৫১তম সংখ্যা পাঠ করুন।
সাইয়্যিদ মুহম্মদ ইউসুফ
মধ্য বাসাবো, ঢাকা।
সুওয়াল: মাসিক মুঈনুল ইসলাম জুলাই ২০০০ঈসায়ী সংখ্যায় জিজ্ঞাসা সমাধান বিভাগে ২৯৭১ নং জিজ্ঞাসার সমাধানে বলা হয়েছে, যে সকল ইমাম সাহেব প্রচলিত মুনাজাত করেন, যদিও তাদের পিছনে ইক্তিদা করা বিশুদ্ধ কিন্তু তবুও এই বিদয়াত আমলে লিপ্ত থাকার জন্য উনারা গুণাহগার হবেন।
এখন আমার সুওয়াল হলো- মুঈনুল ইসলামের উক্ত বক্তব্য কি সঠিক হয়েছে? আর সত্যিই কি প্রচলিত মুনাজাত বিদয়াত আমল? দয়া করে সঠিক জাওয়াব দানে বাধিত করবেন।
জাওয়াব: ফরয নামাযের পর সম্মিলিতভাবে মাসিক মুঈনুল ইসলাম পত্রিকার উক্ত বক্তব্য অশুদ্ধ ও কুফরীমূলক হয়েছে। কারণ ফরয নামাযের পর সম্মিলিতভাবে মুনাজাত করা সুন্নাত। আর সুন্নাত কে বিদয়াত বলা কুফরী। কেননা খোদ-হাদীছ শরীফ-এ বর্ণিত আছে যে, আখেরী রসূল সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদেরকে নিয়ে ফরয নামাযের পর হাত তুলে সম্মিলিতভাবে মুনাজাত করেছেন। যেমন হাদীছ শরীফ-এ উল্লেখ আছে,
عن الاسود العامرى عن ابيه قال صليت مع رسول الله صلى الله عليه وسلم الفجر فلما سلم انصرف ورفع يديه ودعا.
অর্থ: “হযরত আসওয়াদ আমিরী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার পিতা হতে বর্ণিত করেন, উনার পিতা বলেন, আমি হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাথে ফযরের নামায পড়লাম, যখন তিনি সালাম ফিরালেন, ঘুরে বসলেন এবং উভয় হাত মুবারক উঠিয়ে মুনাজাত করলেন।” (মুছান্নেফ ইবনে আবী শায়বা)
স্মর্তব্য যে, উল্লিখিত হাদীছ শরীফ মুতাবিক যে সকল ইমাম সাহেব ফরয নামাযের পর সম্মিলিতভাবে মুনাজাত করেন তারা মূলত খাছ সুন্নত আমল করেন। আর মুঈনুল ইসলাম গংসহ যে সকল ইমামরা ফরয নামাযের পর সম্মিলিতভাবে মুনাজাত করাকে বিদয়াত বলে পরিত্যাগ করে তারা প্রকৃত পক্ষে সুন্নতকে বিদয়াত বলার কারণে কুফরী করছে।
আর এই কুফরী করার কারণে মুঈনুল ইসলাম গং কঠিন গুণাহে গুণাহগার হবে। তাদের উচিত এ ধরণের কুফরী মূলক বক্তব্য ও আক্বীদা থেকে খালিছ তওবা করা। অন্যথায় এর পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ হবে।
তাছাড়া নিম্মোক্ত কিতাবসমূহেও ফরয নামাযের পর সম্মিলিতভাবে মুনাজাত করাকে সুন্নত বলা হয়েছে। যেমন- (১) তিরমিযী শরীফ (২) মাআরিফুস সুনান (৩) এলাউস সুনান (৪) কিতাবুল আযকার (৫) সাবাহাতুল ফিকর (৬) নুযহাতুল মাযালিস (৭) ইমদাদুল ফতওয়া (৮) ইমদাদুল মুফতীন (৯) নুরুল ইজাহ (১০) মারাক্বিউ ফালাহ (১১) মাজমাউয যাওয়াযেদ (১২) বেহেশতী জিওর (১৩) ফতওয়ায়ে রহিমিয়া (১৪) ফতওয়ায়ে মাহমূদীয়া (১৫) নাফায়েসুল মারগুবাহ (১৬) ক্বিয়ায়াতুল মুফতী (১৭) ইখতেলাফে উম্মত আওর ছিরাতে মুস্তাক্বীম (১৮) ফতওয়ায়ে দেওবন্দ ইত্যাদি।
বি: দ্র: এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হলে মাসিক আল বাইয়্যিনাত পত্রিকার ১৪-২০তম ও ৮২তম সংখ্যা পাঠ করুন, তবেই মুনাজাত সম্পর্কে আপনার সকল বিদ্রান্তি দূরীভূত হবে এবং মুনাজাত বিরোধীদের মুখোশ উন্মোচিত হবে।