(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
মুহাম্মদ নূরুন্নবী
তাসাউফের উদ্দেশ্য:
হযরত শেখ জিয়াউদ্দিন নকশবন্দ রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি ‘জামিউল অসুল’ কিতাবে লিখিয়াছেন যে, অজ্ঞাত ও অদৃশ্য বস্তু দেখা তরিকত বা তাসাউফের উদ্দেশ্য নহে। নিম্নে বর্ণিত চারটি জিনিস লাভ করাই তরীক্বার প্রকৃত উদ্দেশ্য। যথাঃ (১) জমিয়ৎ অর্থাৎ বিচ্ছিন্ন মনকে একমাত্র মহান মহান আল্লাহ পাক উনার চিন্তায় নিমগ্ন রাখা, (২) হুযূরী অর্থাৎ মহান আল্লাহ পাক উনাকে সর্বত্র এইরূপ হাযির নাযির জানা যে, নির্জনে পাপের সুযোগ উপস্থিত হইলে মহান আল্লাহ পাক উনার অসন্তোষের ভয়ে লজ্জিত হইয়া উহা পরিত্যাগ করিতে সক্ষম হওয়া, (৩) জজবাৎ অর্থাৎ মহান আল্লাহ পাক উনার পক্ষ হইতে এশকের আকর্ষণ অনুভব করা এবং (৪) ওয়ারেদাৎ অর্থাৎ মহান আল্লাহ পাক উনার তরফ হইতে অবিশ্রান্ত অসহ্যকর ফয়েয প্রাপ্ত হওয়া। তাহাছাড়া তাসাউফের প্রামান্য ও বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ইহইয়াউল উলুম’ উনার ৩৯ পৃষ্ঠায় এর ব্যাখ্যা ‘ইত্তিহাদুস সাদাতুস মুত্তাকীন’ কিতাবে আছে তাসাউফের লক্ষ্য রিয়াযত ও মুজাহেদাহের মাধ্যমে পরিপক্ক জ্ঞান ও দৃঢ় বিশ্বাসে উপনীত হওয়া ছাড়া আর কিছুই নয়। (পৃঃ ৩৯)
হযরত মুজাদ্দিদে আলফে ছানী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি ‘মোল্লা হাজী লাহোরী’কে লিখেন, পবিত্র শরীয়ত উনার তিনটি বিভাগ, যথাঃ ইলম, আমল ও ইখলাস। এই তিনটি ঠিক না হইলে পবিত্র শরীয়ত ঠিক হয়না। পবিত্র শরীয়ত ঠিক না হইলে মহান আল্লাহ্ তায়ালা উনার সন্তুষ্টি অর্জিত হয়না। ইহা দুনিয়া ও আখেরাতের সমুদয় সম্পদ হইতে শ্রেষ্ঠ। তরীক্বত ও হাক্বীক্বতে সুফীগণ যে বৈশিষ্ট্য অর্জন করিয়াছেন এই উভয়টিই পবিত্র শরীয়ত উনার তৃতীয় বিভাগে ইখলাসের পূর্ণতা বিধানে পবিত্র শরীয়ত উনার খাদেম। সুতরাং পবিত্র শরীয়ত উনার পূর্ণতা বিধানের জন্যই তরীক্বত ও হাকীকত অবলম্বন করা হইয়া থাকে। মহান আল্লাহ পাক উনার পথের পথিকগণের যাত্রা পথে যে সমস্ত অবস্থার সম্মুখীন হইয়া থাকেন এবং যে সকল বিষয়ের পরিচয় লাভ করেন, এইগুলি লক্ষ্যবস্তুর অন্তর্ভূক্ত নহে। এই সকল অতিক্রম করিয়া মাকামে রেজা অর্থাৎ আল্লাহ পাক উনার সন্তুষ্টির মাকাম পর্যন্ত উপনীত হওয়া আবশ্যক এবং ইহাই সুলুকের শেষ মাকাম। অতএব তরীকত ও হাকীকতের মঞ্জিলসমূহ অতিক্রম করার উদ্দেশ্য ইখলাস অর্জন ছাড়া আর কিছুই নহে। ইখলাস দ্বারাই মাকামে রেজাতে উপনীত হওয়া যায়। বোকা ও অনভিজ্ঞ লোকেরা চলার পথে বিভিন্ন অবস্থা, মুশাহিদাৎ এবং তাযাল্লি ইত্যাদির লক্ষ্য ঈপ্সিত বস্তু বলিয়া মনে করে। এই শ্রেণীর লোকেরা পবিত্র শরীয়ত উনার পূর্ণতা লাভে বঞ্চিত থাকে। ইহাতে সন্দেহ নাই যে, তরীক্বত ও হাকীক্বতের এই সকল অবস্থা অতিক্রম করার পরই ইখলাস ও মহান আল্লাহ পাক উনার সন্তুষ্টি অর্জন হয়। স্বতন্ত্রভাবে ইহাদের কোনই মর্যাদা নাই। দীর্ঘ ১০ বৎসর এই পথে সাধনার পর নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার তোফায়েলে আমার নিকট পরিস্ফুটিত হইয়া উঠিয়াছে। (মকতুবাত শরীফ, প্রথম খন্ড, ৩৬ মকতুব)
তিনি আরও বলেন, সুলুকের বিভিন্ন মঞ্জিল ও মাকামে জযব (আকর্ষণ) অতিক্রম করার পর জানা গেল এই সায়ের অর্থাৎ অদৃশ্য জগতে পরিভ্রমন ও সুলুকের আসল উদ্দেশ্য হইল ইখলাস হাছিল করা। (মকতুবাত শরীফ প্রথম খন্ড, ৪০ মকতুব)
তিনি আরও বলেন, সূফীগণের তরীকার সুলুকের একমাত্র উদ্দেশ্য হইলো পবিত্র শরীয়ত উনার বিষয় বস্তুর প্রতি বিশ্বাস মজবুত করা এবং ফিক্বাহ শাস্ত্রের নির্দেশাবলী বিনাক্লেশে আদায় করা (মকতুবাত শরীফ প্রথম খ-, ২০৭ মকতুব)
‘ইনতিবাখাত ফি সালাসিলি আউলিয়া’ কিতাবে হযরত শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিছ দেহলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, সুফীগণের উন্নতি তরীক্বার উদ্দেশ্য হইল মুশাহাদায়ে হক হাছিল করা অর্থাৎ মহান আল্লাহ্ তায়ালা উনার দর্শন লাভ করা। যেমন পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে উল্লেখ আছে, যেন তুমি উনাকে দেখিতেছ এবং ইহাকেই সুফীগণ মুশাহাদাহ অর্থাৎ অন্তর দৃষ্টিতে দর্শন বলিয়া থাকেন।
‘কাউলুল জামিল’ কিতাবে আছে, আত্মার এক বিশেষ রূপ সৃষ্টিই মাশায়েখগণ উনাদের সকল তরীক্বার আসল লক্ষ্য। ইহাকে তাহারা নিছবত অর্থাৎ মহান আল্লাহ্ তায়ালা উনার সহিত সুদৃঢ় সংযোগ নামে অভিহিত করিয়া থাকেন। কেননা ইহা মহান আল্লাহ তায়ালা উনার সহিত আত্মীক মিলন ও যোগাযোগ আর ইহাকে সুফীগণ আত্মার প্রশান্তি এবং নূরও বলিয়া থাকে।
তাসাউফ শিক্ষা করা কতটুকু জরুরীঃ
‘দুররুল মুখতার’ কিতাবে আছে যে, আবশ্যক পরিমাণ ইলম শিক্ষা করা ফরজে আইন। অপরকে শিক্ষা দিবার মানসে স্বীয় আবশ্যকের অতিরিক্ত শিক্ষা করা ফরজে কেফায়া এবং বিশেষ বুৎপত্তি লাভ করার মানসে শিক্ষা করা মুস্তাহাব। এইরূপ ইলমে তাসাউফও অবস্থাভেদে শিক্ষা করা ফরজে আইন, ফরজে কিফায়া ও মুস্তাহাব।
এই সম্পর্কে ‘জামেউল উছুল’ কিতাবে বর্ণিত আছে, জানিয়া রাখ, মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তিনি যাহাকে বিশুদ্ধ হৃদয় ও জযবায়ে ইলাহী প্রদান করেন নাই তাহার জন্য ইলমে তাসাউফ শিক্ষা করা ফরজ। কেননা তাহা মহান আল্লাহ পাক উনার পথে সর্বপ্রকার সাধ্য সাধনা যথা- রিয়াযত, সুলুক ও মুজাহেদা অপেক্ষা অতি উত্তম। (জামেউল উছুল ২২৬ পৃষ্ঠা)
ইলম শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, প্রত্যেক নরনারীর জন্য ইলেম শিক্ষা করা ফরজ। (মিশকাত)
কাজেই আবশ্যক পরিমাণ তাসাউফ শিক্ষা করা ফরজ। অন্যত্র নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ রসুলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, ইলম দুই প্রকার। প্রথমটি ইলমে তাসাউফ বা হৃদয়ের ইলম এবং এইটা উপকারী ইলম। আর দ্বিতীয়টি বাহ্যিক বা মৌখিক ইলম, যা বনি আদমের উপর মহা সম্মানিত ও মহা প্রতাপশালী আল্লাহ্ তায়ালা উনার দলীলস্বরূপ। (মিশকাত)
উক্ত পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার ব্যাখ্যায় হযরত মোল্লা আলী কারী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার বিশিষ্ট গ্রন্থ ‘মিরকাত শরীফ’ কিতাবে বলেন, ইলম দুই প্রকার। (১) ইলমে শরীয়ত এবং (২) ইলমে মারেফাত।
উপরোক্ত পবিত্র হাদীছ শরীফ দুই খানার আলোকে ‘তফসীরে রুহুল বয়ান’ ও ‘ছিয়ারুল আছরার’ কিতাবদ্বয়ে ইলমে জাহির ও ইলমে বাতিন উভয়টি শিক্ষা করা ফরজ বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে।
তাসাউফের আলোচ্য ষিষয়ঃ
তাসাউফ যে সমস্ত বিষয় নিয়ে আলোচনা করে তা না জানার কারণেই তাসাউফ সম্পর্কে অনেকেরই অজ্ঞতা লক্ষ্য করা যায়। নিম্নের আলোচনার মাধ্যমে তাসাউফ যে সমস্ত বিষয় নিয়ে আলোচনা করে তাহার একটি সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেয়া হইলো-
ইলমে তাসাউফ অন্তরের যাবতীয় গুণাবলীর বিষয় নিয়া আলোচনা করে। আন্তরিক গুণাবলী দুইভাগে বিভক্ত। সৎগুণসমূহ যা নিয়া তাসাউফ আলোচনা করে সেগুলো হলো- তওবা বা মহান আল্লাহ তায়ালা উনার নিকট নিজ গুনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা। এনাবৎ বা মহান আল্লাহ তায়ালা উনার দিকে সর্বদা মনোযোগ অর্পন করা ‘যোহদ’ বা প্রয়োজনের অতিরিক্ত জিনিষের আসা পরিত্যাগ করা, ‘কানায়াৎ’ বা যাহা আছে তাহাতে সন্তষ্ট থাকা, অধিক আকাঙ্খা না করা। ‘অরা’ বা সন্দেহজনক কার্য ও খাদ্য পরিত্যাগ করা। সবর বা ধৈর্য্য ও সহিষ্ণুতা অবলম্বন করা। শোকর বা উপকারীর উপকার স্বীকার করা, তসলিম বা মহান আল্লাহ পাক উপর সম্পূর্ণ সমর্পন করা, রেজা বা মহান আল্লাহ পাক উনার ইচ্ছায় রাজী থাকা, তাওয়াক্কুল বা মহান আল্লাহ পাক উনার উপর নির্ভরশীল হওয়া, দোজখের ভয় বেহেশতের আশা, সৎ ব্যবহার, দানশীলতা, খোদাতায়ালা উনার প্রতি ধারনা পবিত্র রাখা, সৎ স্বভাব, সৎভাবে লোকের সহিত মেলামেশা করা, সত্যবাদীতা সরলতা, মহান আল্লাহ পাক উনার মুহব্বত তাবেদারী করা হুযূরী মোরাকাবা, মোশাহেদা জমিয়ত জজবা, ওয়ারেদাত, যিকির ও ফিকির ইত্যাদি। এই সমস্ত আন্তরিক গুণাবলীর পরিচয়। এইগুলি লাভ করিবার উপায় বা উপকরণ ইহার সুফল এবং ইহার চিহ্নসমূহ অর্থাৎ কিরূপ অবস্থা হইলে এই সমস্ত গুণ লাভ হইয়াছে তাহা বুঝিতে পারা এবং এই সমস্ত গুণের অবনতি হইলে প্রতিকারের উপায় এবং ইহা স্বভাব হইতে নিমূল হইলে পুণরায় উদ্ধারের রীতি পদ্ধতি ইত্যাদি বিষয় নিয়া তাসাউফ আলোচনা করে।
দ্বিতীয়তঃ কুপ্রকৃত্তি বা মনের মন্দ গুণসমূহ যথা ইবাদতে গর্ব করা মন খাটি না হওয়া, দরিদ্র হয়ে পড়ার আশংকা, হিংসা বা কপটতা পোষণ করা এবং বড় ও সম্মানিত হবার আকাঙ্খা, প্রশংসা অর্জনের ইচ্ছা, পার্থিব ভোগ বিলাসের প্রতি অনুরাগী হওয়া, সুখ সম্ভোগের আশায় দীর্ঘজীবী হওয়ার অভিলাস, অহংকার রিয়া, রাগ চতুরতা, শত্রুতা, অন্যের প্রতি মনে হিংসা পোষণ করা, কামনা, লোভ, কৃপণতা গর্ব, অবিনয়ীভাবে চলা, ধনী ব্যক্তির সম্মান করা, গরীবের প্রতি তাচ্ছিল্যভাব দেখান, বৃথা কাজে চিন্তামগ্ন হওয়া, বেশী কথা বলার অভ্যাস, বৃথা গল্প গুজব করা, ধর্মের কাজে শিথিলতা দেখান, নিজের ইবাদতকে বড় মনে করা, পরের দোষ অন্বেষণ করা, নিজের আয়েবের প্রতি অন্ধ হওয়া, মন হইতে গম চিন্তা দূরীভূত হওয়া, সম্মান লোপ পাইলে উদ্ধারের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করা, ন্যায় বিচারে দূর্বলতা প্রকাশ করা, পৃথিবী ছাড়িতে হবে ভাবিয়া দুঃখিত হওয়া, লজ্জা ও দয়া যথেষ্ট না থাকা ইত্যাদি গুণসমূহ নিয়া তাসাউফ আলোচনা করে।
অতএব মনের এই সমস্ত অসৎ গুণের পরিচয় এবং ইহা সংশোধনের পন্থা অবগত হওয়া এবং মানব হৃদয় হইতে এই সমস্ত মন্দ গুণসমূহ নির্মূল করার রীতি পদ্ধতিই তাসাউফের আলোচ্য বিষয়। (চলবে)