(ধারাবাহিক)
প্রসঙ্গঃ পীর সাহেবের সাথে সংশ্লিষ্ট সকল বিষয়কে সর্বশ্রেষ্ঠ ও বরকতময় মনে করতঃ যথাযথ তাজীম তাকরীম করার গুরুত্ব।
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে,
كم من صائم ليس له من صيامه الا الظمأ وكم من قائم ليس له من قيامه الا السهر.
অর্থঃ- “সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, অনেক রোজাদার আছে যারা রোজার প্রতিদানে ক্ষুধা ও তৃষ্ণা ব্যতীত কিছুই লাভ করতে পারেনা। আবার অনেক রাত জাগরণকারী আছে যারা রাত জাগরণের কষ্ট ব্যতীত আর কিছুই লাভ করতে পারে না।” (দারেমী ও মিশকাত শরীফ/১৭৭)
উল্লেখ্য, রাত জাগরণ ও নিয়মিত নফল রোজা রাখার মত কষ্ট সাধ্য-ইবাদত করার পরেও যদি ইখলাস না থাকার কারণে তা নিস্ফল হয়ে যায় সেক্ষেত্রে পীর সাহেবের সোহ্বতে গিয়ে তাঁর সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়াদির প্রতি মুহব্বত-ভালবাসা যদি অন্তরে বদ্ধমুল না হয় তাজিম-তাকরীম করতে না পারে, তাহলে আসা-যাওয়ায় পরিশ্রম ভিন্ন পূর্ণ ফায়দা লাভ করা কিংবা কাঙ্খিত সফলতা লাভ করা যে কঠিন তা বলাই বাহুল্য।
মাহবুবে ইলাহী, মুহাদ্দিসে আযম, ইমামুর রাসিখীন, মায়াদানুল মারিফাহ্, ফখরুল ইসলাম হযরত খাজা নিজামুদ্দীন আউলিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর দরবার শরীফে একদা “বল্খ” হতে দু’জন ব্যক্তি আসলেন। তারা আল্লাহ্ পাক-এর মা’রিফাত-মুহব্বতকাঙ্খী। তারা তাদের এ মহৎ উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে সুদীর্ঘ ছ’মাসের পথ পাড়ি দিয়ে তাঁর দরবার শরীফে উপস্থিত হলেন। দরবার শরীফে হাজির হয়ে শায়খের মোলাকাত লাভের পূর্বে দরবার শরীফস্থ অনেক চেনা-অচেনা জিনিস অবলোকন করলেন।
মাহবুবে ইলাহী, ইমামুর রাসিখীন, শাইখুল মুহাদ্দিসীন, ফখরুল ইসলাম রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর হুজরা শরীফ সম্মুখস্থ একটি চৌবাচ্চাও তাদের দৃষ্টি গোচর হলো। এক পর্যায়ে তারা চৌবাচ্চার গভীরতা ও প্রশস্থতা নিয়ে বিতর্কে লিপ্ত হলো। একজন বলছিলেন এ চৌবাচ্চাটি আমাদের এলাকার অমুক চৌবাচ্চাটি হতে অনেক ছোট এবং গভীরতাও কম বলে মনে হচ্ছে। অপর ব্যক্তি তার কথায় প্রতিবাদী হয়ে বললো, তোমার কথা শুদ্ধ হয়নি। বরং এ চৌবাচ্চাটি তোমার কথিত চৌবাচ্চাটির চেয়ে ভাল এবং বড়। তাদের বাদানুবাদের বিষয়টি খোদ মাহবুবে এলাহী, ফখরুল ইসলাম হযরত খাজা নিজামুদ্দীন আউলিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি পর্যন্ত পৌঁছেছিল। আর পৌঁছাই স্বাভাবিক। কেননা আল্লাহ্ পাক, তাঁর প্রিয়, একান্ত মনোনীত আশেক বান্দাদের অন্তরে এমন বিশেষ নূর স্থাপন করেন, যার নূরের ছটায় তাদের অন্তর থাকে সর্বদা নূরান্বিত। ফলে পৃথিবীর এক প্রান্ত হতে অপর প্রান্ত, আসমান হতে জমিন পর্যন্ত কোন কিছুই তাদের নিকট গোপন থাকে না। আরো কত শত রহস্যাবলী তাদের সীনা মোবারকে আল্লাহ্ পাক আমানত রেখেছেন তা সাধারণ মানুষতো দূরের কথা জাহিরী ইল্মের অধিকারী ব্যক্তিবর্গ পর্যন্ত তার কোন কল্পনাও করতে পারেনা। আর এরূপ অবস্থা একজন আল্লাহ্ প্রেমিক, মা’রিফাত-মুহব্বতের পথ নির্দেশকারী, ইসলামের হাক্বীক্বী ধারক-বাহকের জন্য আবশ্যক। কারণ যাদের উছীলায় আল্লাহ্ পাক-এর কায়েনাত পরিচালিত হয়। তাঁদের নিকট যদি প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো ভোরের আলোর মত পরিস্কার ও স্পষ্ট না হয়, এবং আল্লাহ্ পাক-এর সহিত গভীর নিসবত না থাকে তাহলে কায়েনাত পরিচালনা করা, মানবতার মুক্তির জন্য সহীহ্ সিদ্ধান্ত দেয়া অসম্ভব। দ্বীনের দাওয়াত বা দ্বীন ইসলামকে সমুন্নত রাখার পথে নানাবিধ দুঃখ কষ্ট সহ্য করাও কঠিন।
ফখরুল ইসলাম, মাহবুবে ইলাহী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁদের মনের অবস্থা অবলোকন করতঃ সাক্ষাত দান করলেন। তাদের কুশলাদী জিজ্ঞাসা করার পর জানতে চাইলেন তাদের অভিপ্রায় কি এবং কেনই বা ছ’মাসের সুদীর্ঘ পথ অতিক্রম করে তাঁর দরবার শরীফে আগমণ করেছে। জাওয়াবে তাঁরা বললেন, ফখরুল ইসলাম, মাহবুবে ইলাহী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর নিকট বাইয়াত হওয়ার নিমিত্তে এসেছি। আল্লাহ্ পাক ও তাঁর প্রিয় হাবীব সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মারিফাত-মুহব্বত প্রাপ্তির নিমিত্তে নিজকে নিবেদিত করার জন্য তারা আশা বাদী। তার জাওয়াবে মাহবুবে ইলাহী রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন, বাইয়াতের পূর্বে তোমরা স্বদেশে ফিরে যাও এবং তোমাদের কথিত সে চৌবাচ্চাটি মেপে আস। তাঁর কথার প্রতিউত্তরে কিছু বলার সাহস না পেয়ে অগত্যা উক্ত ব্যক্তিদ্বয় স্বদেশ অভিমুখে যাত্রা করলেন। বাড়িতে পৌঁছে ফখরুল ইসলাম রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর নির্দেশ মত উক্ত চৌবাচ্চাটি মাপতে লাগলেন। দেখা গেল, যে ব্যক্তিটি বলেছিল “এ চৌবাচ্চাটি (কুয়া) আমাদের এলাকার চৌবাচ্চার (কুয়ার) চেয়ে বড় এবং ভাল।” তার কথাই সত্য বলে প্রমাণিত হলো। অপর ব্যক্তির কথা মিথ্যায় পর্যবসিত হলো। চৌবাচ্চার মাপ শেষ করে উক্ত ব্যক্তিদ্বয় তাদের কাঙ্খিত অভিলাষ নিয়ে আবার ফখরুল ইসলাম, মাহবুবে ইলাহী হযরত খাজা নিজামুদ্দীন আউলিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর দরবার শরীফে রওয়ানা হলেন। বহু ত্যাগ স্বীকার করে, দুঃখ-কষ্টকে উপেক্ষা করে আবার সূদীর্ঘ ছ’মাসের পথ অতিক্রম করে তারা মাহবুবে ইলাহীর দরবার শরীফে উপণীত হলেন।
মাহবুবে ইলাহী, ফখরুল ইসলাম রহমতুল্লাহি আলাইহি তাদের দু’জনকেই উদ্দেশ্য করে বললেন, তোমাদের চৌবাচ্চাটি মেপে দেখেছ কি? তারা লজ্জায় মাথা অবনত করলেন। কোন জাওয়াব দেয়ার ভাষা তাদের ছিলনা। পরে উক্ত ব্যক্তিদ্বয়ের মধ্যে যে ব্যক্তি বলেছিলেন, “হুজরা শরীফ সংলগ্ন চৌবাচ্চাটি তাদের আলোচিত চৌবাচ্চাটির চেয়ে বড় এবং ভাল।” তার বাইয়াত কবুল করতঃ নিজের সোহ্বতে থাকার অনুমতি প্রদাণ করলেন। আর অপর ব্যক্তির বাইয়াত গ্রহণ করলেন না। বরং বললেন, তুমি অন্য কোন শায়খ বা পীর সাহেবের নিকট যাও এবং তার সোহ্বত অর্জন কর। আমার সোহ্বতে থাকা তোমার জন্য ফলপ্রসু হবেনা। কারণ তুমি বাইয়াত গ্রহণের পূর্বেই আমার সহিত সংশ্লিষ্ট বিষয়াবলীকে ছোট করে দেখেছো। অপর জিনিসের তুলনায় শ্রেষ্ঠ মনে করতে পারছ না, তাহলে বাইয়াতের যে হক্ব আছে তা কিভাবে তোমার দ্বারা সম্পাদনের আশা করা যেতে পারে? আর যার বাইয়াতের হক্ব আদায় করা সম্ভব হয়না তার কাছে বাইয়াত হওয়া বা তার সোহ্বতে থাকলে কাঙ্খিত সফলতার আশা অনেক ক্ষেত্রে নিরাশায় পর্যবসিত হয়। পক্ষান্তরে যারা স্বীয় পীর সাহেবের সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়াদিকে সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞান করতে পেরেছেন, সেগুলোর যথাযথ তা’জিম-তাকরীম করেছেন, তারা যেমন পীর সাহেবের খাছ সন্তুষ্টি পেয়েছেন তেমনি সফলতার শীর্ষ চূঁড়ায় উন্নীত হয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, একবার একজন দরবেশ মাহবুবে ইলাহী, ফখরুল ইসলাম, ইমামুর রাসিখীন, সুলতানুল আরিফীন হযরত খাজা নিজামুদ্দীন আউলিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর খিদমতে এসে কিছু খাবার প্রার্থনা করলেন। ঘটনাক্রমে তখন তাঁর লঙ্গরখানায় তাকে আহার করতে দেয়ার মত কিছুই ছিলনা। হযরত মাহবুবে ইলাহী রহমতুল্লাহি আলাইহি উক্ত দরবেশকে বললেন, আজ কোন নযরানা (হাদীয়া) আসেনি। আগামী কাল আস। কিন্তু পরের দিনও নযরানাস্বরূপ কিছুই আসলনা। সুতরাং ফখরুল ইসলাম হযরত খাজা সাহেব রহমতুল্লাহি আলাইহি ওয়াদামত নিজের পায়ের জুতা জোড়া উক্ত দরবেশকে দান করে দিলেন।
সে সময় তাঁর বিশিষ্ট মুরীদ শামসুল মুহিব্বীন হযরত আমীর খস্রু রহমতুল্লাহি আলাইহি বাদশাহ্র সাথে সফরে ছিলেন। পথি মধ্যে সেই দরবেশের সাথে তাঁর সাক্ষাত হলো। তিনি দরবেশের নিকট স্বীয় পীর সাহেবের কুশলাদি জিজ্ঞাসা করলেন। দরবেশের সাথে কথা বলতে বলতেই শামসুল মুহিব্বীন হযরত আমীর খস্রু রহমতুল্লাহি আলাইহি হঠাৎ বলে উঠলেন, “আমি যেন আমার পীর সাহেবের ঘ্রাণ পাচ্ছি। সম্ভবতঃ তোমার নিকট আমার পীর সাহেব ক্বিবলার কোন নিদর্শন আছে।” দরবেশ তা শুনে মাহবুবে ইলাহী খাজা সাহেব রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর জুতা জোড়া তাঁর সম্মুখে রেখে বললেন, “হযরত খাজা সাহেব রহমতুল্লাহি আলাইহি আমাকে ইহা দান করেছেন।” শামসুল মুহিব্বীন হযরত আমীর খস্রু রহমতুল্লাহি আলাইহি পীর সাহেবের জুতা দেখে ব্যাকুল হয়ে বললেন, দরবেশ সাহেব ইহা আমার নিকট বিক্রি করতে পারেন কি? দরবেশ সাহেব বিক্রির জন্য সম্মত হয়ে গেল। হযরত আমীর খস্রু রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর নিকট তখন পাঁচ লাখ রৌপ্যমুদ্রা ছিল যা দিল্লীর সুলতান তাঁকে একটি “ক্বাসিদাহ্” পাঠের পুরস্কার স্বরূপ দিয়ে ছিলেন। উক্ত সমূদয় মুদ্রার বিণিময়ে তিনি দরবেশের নিকট হতে পীর সাহেবের জুতা জোড়া খরিদ করে নিলেন এবং জুতাজোড়া মাথায় করে হযরত পীর সাহেব ক্বিবলার খিদমতে পেশ করে বললেন, হুজুর! উক্ত দরবেশ ইহার মূল্য পাঁচ লাখ রৌপ্যমুদ্রা নিয়েই ক্ষান্ত হলো। সে যদি ইহার বিণিময়ে আমার জান-মাল উভয়ই দাবী করত তবুও আমি তা দিতে আপত্তি করতাম না। (সুবহানাল্লাহ্)
উল্লেখ্য, বর্ণিত ঘটনা হতে এটাই পরিস্ফুট হয় যে, হযরত আমীর খসরু রহমতুল্লাহি আলাইহি স্বীয় পীর সাহেবের জুতার জন্যও কিভাবে স্বীয় জান-মাল ব্যয় করার মত মুহব্বত ও শ্রদ্ধাবোধ অর্জন করেছিলেন।
আর এ কারণে মাহবুবে ইলাহী, ফখরুল ইসলাম, হযরত খাজা নিজামুদ্দীন আউলিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহিও সুলতানুল মুহিব্বীন, হযরত আমীর খস্রু রহমতুল্লাহি আলাইহিকে একান্ত মুহব্বত করতেন। তিনি বলতেন, শরীয়তে অনুমতি থাকলে আমি অসিয়ত করতাম যে, “আমীর খস্রুকে মৃত্যুর পর আমার কবরে আমার সঙ্গে দাফন করে দিও যেন আমরা দুজন একস্থানে থাকতে পারি।” তুবও তিনি অসিয়ত করেছিলেন যে, আমার ইন্তিকালের পর আমীর খস্রু বেশী দিন বাঁচবে না। তাঁর ইন্তিকাল হলে তাঁকে তোমরা আমার কবরের পাশে দাফন করো। কেননা, সে আমার অন্তরঙ্গ বন্ধু। আমি তাঁকে সাথে না নিয়ে বেহেশ্তে পা রাখবনা। (সুবহানাল্লাহ্)(তায্কিরাতুল আউলিয়া)
মাহবুবে ইলাহী হযরত নিজামুদ্দীন আউলিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর বিশিষ্ট ও একান্ত মুরীদ আশেকুল্লাহ্ ও আশেকে রাসূলিল্লাহ্, শায়খের সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়াদির প্রতি সম্মান প্রদর্শন, তাজীম-তাকরীম করার চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেছেন। যা ক্বিয়ামত পর্যন্ত আগত সকল সালিক বা আল্লাহ্ পাক ও তাঁর রাসূল প্রেমিকগণের জন্য বিরাট ইব্রত ও নসীহত স্বরূপ। (অসমাপ্ত)
পীর সাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে
হযরত মুর্শিদ ক্বিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (২৬৪) বিশুদ্ধ নিয়ত এবং তার ফযীলত ও গুরুত্ব (৮)
হযরত মুর্শিদ ক্বিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (২৬৩) বিশুদ্ধ নিয়ত এবং তার ফযীলত ও গুরুত্ব (৭)
ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর সাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৩৩)
ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর সাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৩৪)