(ধারাবাহিক)
পীর সাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে
২২। পীর সাহেব-এর ব্যবহৃত খাছ কোন কিছুই ব্যবহার করবে না। তাঁর জায়নামাজ বা সেন্ডেলের উপর পা রাখবে না। ওজু-গোছলের স্থানে ওজু-গোছল করবে না। পায়খানা-প্রস্রাবখানার ক্ষেত্রেও একই হুকুম। (মাকতুবাত শরীফ)
পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, পীর সাহেব-এর সাথে সংশ্লিষ্ট সকল জিনিসই তাঁর মত সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী, সুতরাং তাঁর সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয় বস্তু, কথা-বার্তা প্রতিক্ষেত্রে শ্রদ্ধাশীল হওয়া, যথাযথ সম্মান ও মর্যাদা প্রদর্শন করা মুরীদের জন্য অতি আবশ্যক। অন্যথায় তার ইল্ম ও আমলের বরকত উঠে যায়। আমলের শক্তি খর্ব হয়, অন্তর- নূরের অবসান ঘটে। সর্বোপরি তার অবমূল্যায়ণ দ্বারা হেদায়েতের পথ হতে বিচ্যূত হওয়ার সম্ভাবনাও থাকে প্রবলভাবে। এমনিভাবে বাহ্যিক ক্ষয়-ক্ষতি ও আকস্মিক বিপদাপদও এসে পড়ে অনেকাংশে। যা নিম্নলিখিত ঘটনায় পরিস্ফুটিত হয়েছে।
হযরত আব্দুল্লাহ্ আনসারী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন যে, “একদা এক অপরাধের কারণে আমার পায়ে বেড়ী লাগিয়ে বলখের দিকে আমাকে নিয়ে যাওয়া হলো। সারা পথ আমি এ চিন্তা করতে লাগলাম যে, আমার পা নিশ্চয়ই কোন গুরুতর অপরাধ করেছে। যার ফলে আমাকে এভাবে শৃঙ্খলাবদ্ধ হতে হয়েছে। বলখ নগরে উপস্থিত হওয়া মাত্রই দেখলাম লোকগণ আমাকে প্রস্তর বর্ষণ করার জন্য হাতে পাথর নিয়ে ভবনগুলির ছাদের উপর উঠে দাঁড়িয়ে আছে। ঠিক এমনি সময় হঠাৎ আমার প্রতি এলহাম হলো ওহে! অমুক দিন সুলতানুল আরিফীন, হযরত আবুল হাসান খারকানী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর জায়নামাজ বিছানোর সময় তাতে তোমার পা লেগে গিয়েছিল। অদ্যকার এ বিপদ তারই সাজা স্বরূপ।” তখন আমি সঙ্গে সঙ্গে তওবা করলাম এবং ভবিষ্যতে সতর্কতা রক্ষা করে চলব বলে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম। ফলে প্রস্তর হাতে দন্ডায়মান লোকগণ আমার প্রতি প্রস্তর নিক্ষেপ করলোনা। তাদের হাতগুলি যেন অবশ হয়ে গেল এবং আমার পায়ের জিঞ্জীর আপনা হতেই ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। বলখের শাসকও আমাকে মুক্তি দান করলো। (তাজকিরাতুল আউলিয়া)
২৩। পীর সাহেব যদি কোন মাসয়ালা-মাসায়েল বা অন্য কোন বিষয় সম্পর্কে আলোচনা করেন তবে তা জানা থাকলেও চুপ থাকবে এবং গভীর মনোযোগ সহকারে তা শুনতে থাকবে। কখনও নিজের ইল্ম জাহির করার কোশেশ করবে না।
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে,
عن ابن عمر قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم ان من الشجر شجرة لايسقط ورقها وانها مثل المسلم فحدثونى ما هى قال فوقع الناس فى شجر البوادى قال عبد الله و وقع فى نفسى انها النخلة فاستحييت ثم قالوا حدثنا ما هى يا رسول الله صلى الله عليه وسلم قال هى النخلة.
অর্থঃ- “হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে ওমর রদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আখেরী রাসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, এমন একটা গাছ আছে যার পাতা ঝরে পড়ে না। আর সেটা মুসলমানগণের দৃষ্টান্ত স্বরূপ। তোমরা আমাকে বলত সেটা কি? তখন হযরত সাহাবা-ই-কিরাম রদিয়াল্লাহু আনহুমগণ বনের বিভিন্ন গাছ-পালার কথা চিন্তা করতে লাগলেন। হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে ওমর রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমার মনে হলো- সেটা খেজুর গাছ। কিন্তু আমি বলতে লজ্জাবোধ করেছিলাম। (কেননা সে মজলিশে হযরত আবু বকর সিদ্দীক রদিয়াল্লাহু আনহু, হযরত ওমর রদিয়াল্লাহু আনহুর মত বিশিষ্ট সাহাবা-ই-কিরাম রদিয়াল্লাহু আনহুমগণ উপস্থিত ছিলেন কিন্তু তাঁরা কোন কথা বলছেন না।) অবশেষে হযরত সাহাবা-ই-কিরাম রদিয়াল্লাহু আনহুমগণ আরজ করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্, ইয়া হাবীবাল্লাহ্ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! অনুগ্রহপূর্বক আপনিই বলে দিন, সেটা কি গাছ? তখন হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, সেটা খেজুর গাছ।” (বুখারী শরীফ/১৪, উমদাতুল ক্বারী শরহে সহীহ্ বুখারী-২/১৩)
উল্লেখ্য যে, আখেরী রাসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাঝে মধ্যে কোন বিষয় ভালভাবে বোধগম্য ও উক্ত বিষয়টির গুরুত্ব বুঝানোর উদ্দেশ্যে হযরত সাহাবা-ই-কিরাম রদিয়াল্লাহু আনহুমগণকে জিজ্ঞাসাবাদ করতেন। বিদায় হজ্বের দিন আরাফার ময়দানে খুৎবাহ্ দানকালে লক্ষাধিক সাহাবা-ই-কিরাম রদিয়াল্লাহু আনহুমগণের প্রতি উদ্দেশ্য করে বলেন, “এটা কি মাস? আজকে কোন দিন? এটা কোন স্থান? হযরত সাহাবা-ই-কিরাম রদিয়াল্লাহু আনহুমগণ সেক্ষেত্রেও নীরবতার ভূমিকাই পালন করেছিলেন। কারণ সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এরূপ প্রশ্নের পিছনে বিরাট হিকমত নিহিত থাকে। যেহেতু তিনি শারে বা শরীয়ত প্রণেতা। কাজেই তিনি যদি প্রচলিত মাসের নাম পরিবর্তন করে বলেন, আজকে অমুক মাস, অমুক দিন তখন তাই হবে। সে কারণে এসব ক্ষেত্রে হযরত সাহাবা-ই-কিরাম রদিয়াল্লাহু আনহুমগণ তার জাওয়াবে শুধু এতটুকুই বলতেন যে, আল্লাহ্ পাক ও তাঁর হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামই ভাল জানেন।
তবে কোন কোন সময় তাঁরা সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রশ্নের জাওয়াব প্রদান করতেন যা একান্তভাবেই সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জানতে চাইতেন।
স্মর্তব্য যে, পীর সাহেব তথা আউলিয়া-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহি গণ আল্লাহ্ পাক-এর মা’রিফাত-মুহব্বত ও গোপন রহস্যাদির ভান্ডার স্বরূপ। তারা যখন কথা বলেন তখন তা সাধারণ পর্যায়ে থাকে না। তারা আল্লাহ্ পাক-এর নূর দিয়ে কথা বলেন। কাজেই তাদের কথার তাছির সম্পূর্ণ আলাদা। যা মানুষের ক্বলবের উপর পতিত হয় এবং তা তার হিদায়েতের কারণ হয়ে থাকে।
আরো উল্লেখ্য যে, হক্কানী-রব্বানী পীর সাহেবগণ ইল্মে লাদুন্নীপ্রাপ্ত হয়ে কথা বলেন। কাজেই তাঁদের কথার শান ও তাছির অন্য সকলের কথা থেকে অতি উচুঁ দরজার, যদিও তা সাধারণ বিষয়ে হয়ে থাকুক না কেন। কাজেই তাঁর নির্দেশ ছাড়া তথা বিনা অনুমতিতে কথা বললে তাতে ছন্দপতন ঘটে। পীর সাহেব ক্বিবলার রূহানী জবান থেকে সে নিজেও বঞ্চিত হয় এবং মানুষকে বঞ্চিত করে।
কাজেই পীর সাহেব-এর দরবার শরীফে যদি মাসয়ালা-মাসায়েল আলোচনা হয়, ইল্মের আলোচনা হয় তখন সর্বক্ষেত্রে নীরবতা অবলম্বন এবং গভীর মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ করা ফায়দার কারণ। আর লৌকিকতা তথা পীর সাহেব-এর সামনে নিজের ইল্ম জাহির করা নেহায়েত মূর্খতা, আদবের খেলাফ এবং ইল্ম অন্বেষণের পথেও বড় ধরণের অন্তরায়।
মূলতঃ পীর সাহেব ক্বিবলার সামনে নিজের ইল্ম জাহির করার এটাই অর্থ যে, সে যা এতদিন শুনেছে বা শিখেছে তাতেই সে পরিতৃপ্ত। অথচ মাহবুবে সুবহানী, কুতুবে রব্বানী, আফজালুল আওলিয়া, কাইয়্যূমে আউয়াল, হযরত শায়খ আহমদ ফারুকী সেরহিন্দী মুজাদ্দেদে আলফেসানী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন, “যে তৃপ্ত সে বঞ্চিত, যে অতৃপ্ত সে প্রাপ্ত।”
স্বীয় পীর সাহেব-এর প্রতি এরূপ আক্বীদা-বিশ্বাস বদ্ধমূল হওয়া আবশ্যক যে, পীর সাহেব যা বলেন, যেভাবে বলেন তা আল্লাহ্ পাক ও তাঁর হাবীব সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর রুহানী নির্দেশ পেয়েই বলে থাকেন। আর যেখানে পীর সাহেব নিজেই উপস্থিত এবং তিনি স্বয়ং আলোচনা করছেন সেখানে অন্য লোকের মাসয়ালার সমাধান দেয়ার আবশ্যকতা কোথায়?
এ প্রসঙ্গে একটি ওয়াকেয়া প্রতিধানযোগ্য। হযরত আবূ সাঈদ রহমতুল্লাহি আলাইহি কোন দিনই তাঁর পীর সাহেবের সম্মুখে উচ্চ-বাচ্য করতেন না বা কোন কথা-বার্তা বলতেন না। শুধু নীরবে সব শুনতে থাকতেন। লোকজন এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলতেন, হযরত পীর সাহেব-এর সম্মুখে কথা না বলাই হলো সওয়াবের কাজ। কেননা সমুদ্রের বর্তমানে নদীর কি গুরুত্ব আছে? তিনি আরো বলেন, খারকান শরীফে আগমন কালে আমি এক সাধারণ পাথর ছিলাম। কিন্তু আমার পীর সাহেব ছহেবে মিল্লাদুন্না ইল্মা, সুলতানুল আরিফীন, ফখরুল উলামা ওয়াল মাশায়েখ, হযরত আবুল হাসান খারকানী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর নেক দৃষ্টি, ফয়েজ ও বরকতে আমি মূল্যবান জিনিসে পরিণত হয়েছি। (তাযকিরাতুল আউলিয়া)
সুতরাং তাঁর সম্মুখে কথা বলা নির্বুদ্ধিতার পরিচয়। কারণ পীর সাহেব যদি তার কথা গ্রহণ না করেন তবে তার কোন মূল্যই থাকবে না। এজন্য বলা হয়, “বাদশাহ্র কথা, কথার বাদশাহ্।” (অসমাপ্ত)
পীর সাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে
হযরত মুর্শিদ ক্বিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (২৬৪) বিশুদ্ধ নিয়ত এবং তার ফযীলত ও গুরুত্ব (৮)
হযরত মুর্শিদ ক্বিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (২৬৩) বিশুদ্ধ নিয়ত এবং তার ফযীলত ও গুরুত্ব (৭)
ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর সাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৩৩)
ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর সাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৩৪)