প্রসঙ্গ: আমেরিকা, আফগানিস্তান ও ওসামা বিন লাদেন প্রচারিত ধারার বিপরীতে একটি অর্ন্তভেদী বিশ্লেষণ

সংখ্যা: ৯৯তম সংখ্যা | বিভাগ:

ব্যাপক প্রচারণাটা চালানো হয়েছিল উদ্দেশ্যমূলকভাবেই ইরাক অত্যন্ত শক্তিধরই কেবল নয় বরং বেশ বিপজ্জনকই হয়ে পড়েছে। এতটা বিপজ্জনক যে খোদ আমেরিকা তথা গোটা পাশ্চাত্য শক্তিকেই এখানে প্রভূত শক্তি ব্যয় করতে হবে। কার্যত তারা অবশ্য তা করতে কার্পণ্য করেনি। বেশ জোরালোভাবেই আক্রমণ চালিয়েছিল। তাতে ক্ষুদ্র শক্তিধর ইরাক যেভাবে বিপর্যস্ত হয়েছিল তা এখনও বিশ্ববাসীর হৃদয়ে করুণার উদ্রেক করে। পক্ষান্তরে সা¤্রাজ্যবাদী আমেরিকার একটি সৈন্যও ক্ষয় করতে হয়নি বলে সূত্রে প্রকাশ।

ইরাক খুব শক্তিধর হয়ে উঠছে। এ আপাত প্রচারনাটার বিস্তার না ঘটালে সা¤্রাজ্যবাদী শক্তি এত বিশাল আয়োজনে ইরাকের উপর ঝাপিয়ে পড়তে পারতনা। তাতে সূর্যালোকের নীচে খানিকটা হলেও বিশ্ববাসীর কাছে চক্ষুলজ্জার শিকার হতে হত। সেটাকে আঁড়াল করার জন্যই ইরাক শক্তিধর ও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। এ প্রচারণার পিছনে জর্জ বুশের এই উদ্দেশ্যমূলক দূরভিসন্ধি বিরাজ করেছিল। জর্জ বুশের ছেলের জেব বুশও একইভাবে বাবার পদাঙ্ক অনুসরণ করছে।

আফগানিস্তান একটি দূর্ভেদ্য রাষ্ট্র। পাহাড়-পর্বত দিয়ে পাকৃতিকভাবে সুরক্ষিত এলাকা। আফগানিস্তান যুদ্ধ সহজে ও স্বল্প সময়ে শেষ করা যাবেনা। জেব বশের ইত্যকার প্রচারণার পিছনে মূলতঃ দীর্ঘ যুদ্ধ করে নেতিয়ে পড়া আফগানিস্তানে ব্যাপক ও বিধংসী আক্রমণ করে তাকে পুরোদস্তুর তামা বানানোর প্রক্রিয়া তৈরি করার একটা ভূমিকা তৈরি করাই উদ্দেশ্য!

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর যুক্তরাজ্য সম্মিলিতভাবে বর্তমান বিশ্বের সর্বাধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে প্রস্তুতকৃত বি-১, বি-২ (রাডারকে ফাঁকি দিতে পারে এমন বোমারু বিমান (ংঃবধষঃয নড়সনবৎ), বি-৫২ এবং টমাহক ক্রুজ মিসাইল দিয়ে একযোগে হামলা করে।

উল্লেখ করা যেতে পারে, যেসব অস্ত্র এযাবৎকাল কোন প্রকৃত যুদ্ধে ব্যবহৃত হয়নি সে রকম অস্ত্রসস্ত্র যুক্তরাষ্ট্র প্রথমবারের মত এই আফগানিদের উপর প্রয়োগ করেছে।

অবলা আফগানিস্তানে নির্বিঘ্নে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বোমা হামলা চালিয়ে গোটা আফগানিস্তানকে ধুলোয় ধুসরিত করার জন্য আমেরিকা বর্তমানে যেসব অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র ব্যবহার করছে তা তারা ভিয়েতনাম যুদ্ধেও ব্যবহার করেনি; এমনকি গালফ যুদ্ধেও ব্যবহার করেনি।

নিউ ইয়র্ক ট্রেড সেন্টারে এবং মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনে (১১ সেপ্টেম্বর/২০০১ ঈসায়ী) হামলার জন্য তারা ওসামাকে দায়ী করেছে। বর্তমানে সর্বাত্মক সাড়াশী আক্রমণ দ্বারা আমেরিকা আফগানিস্তানকে যে সমতল করে দিতে চাইছে তার পিছনে কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে ওই ওসামাকে।

ওসামা তামাম বিশ্বের কাছে এখনও রহস্যময় পুরুষ। তার গতিবিধি বড় বিচিত্র। শুধু ওসামা নয় আফগানিস্তানে আমেরিকার ‘মোষ্ট ওয়ান্টেড’ ব্যক্তি রয়েছে আরো একজন। আমিরুল মু’মিনীন বলে কথিত মোল্লা ওমর।

ওসামা আর মোল্লা ওমরকে নিয়ে প্রচারণা রয়েছে, হুজুগ উঠেছে। এই হুজুগের পিছনে যে অন্তর্ভেদী সত্য বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ণের অবকাশ রয়েছে সেটা কেবল সচেতন মহলের পক্ষেই উপলব্ধি করা সম্ভব।

আফগানিস্তানে যুদ্ধের প্রেক্ষিতে প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডোনান্ড রামসফেল্ডকে যখন জিজ্ঞেস করা হলো, “কখন আমেরিকার বিজয় হয়েছে বলে তিনি মনে করবেন?” জবাবে রামসফেল্ড বললেন, “যখন সারা বিশ্বকে তিনি বোঝাতে সক্ষম হবেন যে আমেরিকানদের তাদের নিজস্ব জীবনধারা চালিয়ে যেতে দেয়া উচিত- তখনই বিজয় হয়েছে বলে তিনি মনে করবেন।

কিন্তু আমেরিকার পুরনো যুদ্ধের কাহিনীগুলো কি বলে! কোরিয়া, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার লাখ লাখ লোককে হত্যা করার রক্ত এখনও আমেরিকার গায়ে লেগে রয়েছে। ১৯৮২ সালে আমেরিকার মদদে লেবাননে হামলা চালিয়ে ইসরাইল সাড়ে ১৭ হাজার মানুষ মেরেছে, অপারেশন ডেজার্ট স্টর্মে হত্যা করা হয়েছে ২ লাখ ইরাকীকে, হাজার হাজার ফিলিস্তিনী মারা গেছে পশ্চিম তীরে ইসলাইলী আক্রমনে। ইরাক-ইরান আত্মঘাতী যুদ্ধ চলেছে আমেরিকার ইন্ধনে। আমেরিকার মদদে, প্রশিক্ষণে, অর্থে লালিত সন্ত্রসাীদের দ্বারা যুগোশ্লাভিয়া, সোমালিয়া, হাইতি, চিলি, নিকারাগুয়া, এল সালভেদর, জেমিনিকান রিপাবলিক আর পানামায় লাখ লাখ লোক মারা গেছে। আমেরিকার দৃষ্টিতে সেগুলো কোন সন্ত্রাস নয়, আমেরিকার মূল্যবোধের নীতিতে সেসব জাতির বেঁচে থাকার কোন অধিকার নেই- এই হচ্ছে আমেরিকার অসম ও অপাংতের নীতিবোধ। পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন ওসামা বিন লাদেন না থাকলে যুক্তরাষ্ট্র একটা ওসামা বানিয়ে নিত।

আর সত্যিকার কথা এই যে, আমেরিকাই ওসামাকে বানিয়ে নিয়েছে। ১৯৭৯ সালে সি, আই, এ যখন আফগানিস্তানে মুজাহিদিনদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছিল তখন সেখানে আমেরিকার খুব পছন্দের ও পেয়ারের লোক ছিল ওসামা। ওসামাকে আমেরিকা গড়েছে তার একান্ত আপন করে নিজ হাতে।

পর্যবেক্ষক মহল তাই ওসামাকে আমেরিকার ফ্যামিলি সিক্রেটি বলে মনে করেন। আমেরিকার যাবতীয় আগ্রাসী প্রক্রিয়া চরিতার্থ করার ক্ষেত্রে ওসামা এখন বড় সহায়ক কারণ, ফলপ্রসূ উছীলা।

আমেরিকা তার জন্য এই নীতি একান্ত প্রনিধানযোগ্য মনে করে যে, তার একবার যুদ্ধে যাওয়া মানেই সেই যুদ্ধ শেষ না করে ফিরে না আসা। আর যুদ্ধে গিয়ে যদি শত্রু খুঁজে না পায় সেক্ষেত্রে দেশের বিক্ষুদ্ধ জনতাকে শান্ত করার খাতিরে তাকে একটা শত্রু বানিয়ে নিতে হয়।

২০ শে সেপ্টেম্বর এফ, বি, আই জানায়, বিমান ছিনতাইকারীদের কয়েকজনের পরিচয়ের ব্যাপারে তাদের মনে দ্বিধা আছে। আর এই একই দিনে জর্জ বুশ জুনিয়র বলেন, আমরা নিশ্চিতভাবে জানি কারা এবং কোন রাষ্ট্র এদের মদদ দিচ্ছে। ওসামা এবং মোল্লা ওমরের অস্তিত্ব এক্ষেত্রে জর্জ বুশের জন্য সহায়ক হয়েছে।”

সঙ্গতকারণেই তাই ওসামা এবং মোল্লা ওমরের ভূমিকা এখন রীতিমত প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।

১৯৭৯ সালে সোভিয়েতরা আফগানিস্তান দখল করার পর সি, আই, এ এবং পাকিস্তানের আই, এস, আই, গোপনে ব্যাপক তৎপরতা চালিয়েছে। তাদের আপাত কাজ ছিল সোভিয়েতদের বিরুদ্ধে আফগান মোকাবিলাকে মদদ যুগিয়ে যাওয়া আর এটাকে জিহাদে রূপান্তরিত করা। এর ফলে সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত মুসলমান দেশগুলো কমিউনিষ্ট শাসনের বিরুদ্ধে চলে যাবে। শুরু হবে অস্থিতিশীলতা। আমেরিকা চেয়েছিল এটাকে সোভিয়েতের জন্য ভিয়েতনাম তৈরি করতে। কিন্তু ব্যাপার হয়ে উঠল অন্য রকম। দশ বছরে আমেরিকার এই ফাঁদপাতা যুদ্ধে ৪০ টি মুসলমান দেশ থেকে ১ লাক চরমপন্থী মুজাহিদিনকে অর্থ আর প্রশিক্ষণ দিয়েছে, সি, আই, এ। আর এই কাজটি তারা করিয়েছে পাকিস্তানী আই, এস, আই, এর মাধ্যমে।

দশ বছর পর ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত চলে যাওয়ার পর দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। আফগানিস্তানে শুরু হয় গৃহযুদ্ধ। সি, আই, এ যথারীতি সামরিক সরজ্ঞাম ও অর্থ সাহায্য চালিয়ে যেতে থাকে।

একটা পর্যায়ে সি, আই, এর মদদে ও প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় আফগানিস্তানে আসন গেড়ে নেয় মোল্লা ওমর তথা তালেবান সরকার। এরা দৃশ্যত শরীয়তী হুকুমের কিছু বাস্তবায়ন দেখালেও আসলে যে মোল্লা ওমর আর ওসামার কলকাঠি নাড়ছে সি, আই, এ একটু গভীরে নজর নিবদ্ধ করলেই তা ধরা পড়ে।

সি, আই, এ’র তৎপরতায়ই তালেবানরা কৃষকদের নির্দেশ দিলো- আফিমের চাষ কর। সি, আই, এ’র নির্দেশে আফগানিস্তান জুড়ে হাজার হাজার হেরোইনের ল্যাবরেটরি বানিয়ে দিলো আই, এস, আই। দুই বছরে পাকিস্তান আফগানিস্তান সীমান্ত হয়ে দাঁড়ালো বিশ্বের সবচেয়ে বড় হেরোইন উৎপাদনকারী এলাকা এবং তা আমেরিকায় পাচারের প্রধান উৎস হয়ে দাঁড়ালো। এই মাদক ব্যবসার বার্ষিক আয় ছিল দশ হাজার কোটি থেকে বিশ হাজার কোটি ডলার। এই বিপুল অর্থ সি, আই, এ’র আনুকূল্যেই ব্যয়িত হতে লাগল।

১৯৯৫ সালের গৃহযুদ্ধে, তালেবানরা আফগানিস্তানের একটি বড় অংশ দখল করে। এর পেছনে মূল ভূমিকা ও নিয়ন্ত্রন ছিল সি, আই, এ’র। ক্ষেত্র বিশেষে সরাসরি নিজে। ক্ষেত্র বিশেষে পাকিস্তানী আই, এস, আই, এরা দ্বারা অত্যন্ত সুনিপুনভাবে কাজটি করিয়েছে সি,আই, এ।

মূলতঃ একথা ধরে নেয়ার কোন অবকাশ নেই যে শুধু মাত্র আফগানিস্তানে হামলা করাই সি, আই, এ বা আমেরিকার মূখ্য উদ্দেশ্য। বরং ওদের দূরভিসন্ধি আরো গভীরে নিহিত। কোন মুসলিম দেশ পরাশক্তি হিসেবে থাকবে এটা মোটেই আমেরিকার সি, আই, এ’র পছন্দ নয়। আর আমেরিকার এই না পছন্দের কাজটি যাতে অব্যাহত না থাকে সেহেতু সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যত আমেরিকার না পছন্দির ব্যক্তিত্ব কিন্তু হাক্বীক্বতের খুব পছন্দের ও পেয়ারের এজেন্ট ওসামা ও ওমরকে খুব সুকৌশলে আমেরিকা কাজে লাগিয়ে যাচ্ছে।

-মুহম্মদ আশরাফুল মাহবুবে রব্বানী, ঢাকা।

মতামত বিভাগ

মতামত বিভাগ

ইসলামী বিশ্বকোষের আলোকে বালাকোট যুদ্ধের ইতিহাস- (৪)

তিনি কি শের-ই-বাংলা, না শের-ই-মুনাফিক (২)

একই অঙ্গে বহুরূপে সজ্জিত, বিকৃত মস্তিস্ক সম্পন্ন স, আ, ত, ম আলাউদ্দীনের বিকৃত রুচি সম্পন্ন লিখার প্রতিবাদে