৩৩তম ফতওয়া হিসেবে
“মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র কুরআন শরীফ, মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র হাদীছ শরীফ, পবিত্র ইজমা শরীফ ও পবিত্র ক্বিয়াস শরীফ উনাদের দৃষ্টিতে সম্মানিত ও পবিত্র মাযহাব চতুষ্ঠয় উনাদের মধ্যে যে কোন একটি সম্মানিত ও পবিত্র মাযহাব মানা ও অনুসরণ করা ফরয ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া”- পেশ করতে পারায় মহান আল্লাহ পাক উনার পবিত্র দরবার শরীফ-এ শুকরিয়া জ্ঞাপন করছি।
সম্মানিত হানাফী মাযহাব উনার কতিপয় মাসয়ালা সম্পর্কে মাযহাব বিদ্বেষী বাতিল ফিরক্বা লা-মাযহাবীদের মনগড়া
আপত্তির দলীলভিত্তিক জবাব
বাতিল ফিরক্বা লা-মাযহাবীরা সম্মানিত হানাফী মাযহাব উনার কতিপয় মাসয়ালা নিয়ে সমাজে অনর্থক ফিৎনা সৃষ্টি করে থাকে। যেমন নামাযে ইমামের পিছনে পবিত্র সূরা ফাতিহা শরীফ বা অন্য কোন পবিত্র সূরা শরীফ পাঠ করা, রফয়ে ইয়াদাইন করা, নাভির নীচে হাত বাঁধা, জোরে আমীন বলা ইত্যাদি।
বাতিল ফিরক্বা লা-মাযহাবীরা অপপ্রচার করে বেড়ায় যে, হানাফীদের উল্লিখিত আমলসমূহের কোনো দলীল নেই। নাউযুবিল্লাহ! অথচ সম্মানিত হানাফী মাযহাবের প্রতিটি আমলের ব্যাপারেই অসংখ্য ছহীহ ও নির্ভরযোগ্য দলীল আদিল্লাহ রয়েছে। কেননা সম্মানিত হানাফী মাযহাবের ইমাম, ইমামে আ’যম হযরত আবু হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি পবিত্র হাদীছ শরীফের হাকিম ছিলেন। অর্থাৎ তিনি সমস্ত পবিত্র হাদীছ শরীফ সম্পর্কে ইলিম রাখতেন। যার কারণে উনার প্রতিটি মাসয়ালার স্বপক্ষে পবিত্র হাদীছ শরীফ থেকে দলীল-আদিল্লাহ রয়েছে। সুবহানাল্লাহ!
নিম্নে উল্লিখিত বিষয়গুলো সম্পর্কে ধারাবাহিকভাবে দলীলভিত্তিক আলোচনা করা হলো।
২। পবিত্র সূরা ফাতিহা শরীফ উনার পর আমীন চুপে চুপে পাঠ করা
হানাফী মাযহাবের ফতওয়া মুতাবিক জামায়াতে নামায পড়ার সময় ইমাম ছাহেবের সাথে প্রকাশ্য ক্বিরাআতে পবিত্র সূরা ফাতিহা শরীফ শেষে চুপে চুপে আমীন বলতে হয়, প্রকৃতপক্ষে এটাই সঠিক। মূলত নামায জেহরী বা প্রকাশ্য ক্বিরাআতে হোক অথবা সেররী বা চুপে চুপে ক্বিরাআত পাঠে হোক ইমাম-মুক্তাদী সকলের জন্যেই সূরা ফাতিহার পর আমীন চুপে চুপে বা অনুচ্চ আওয়াজে বলাটাই শরীয়তের নির্দেশ। কারণ একাধিক ছহীহ হাদীছ শরীফ ও নির্ভরযোগ্য ফিক্বাহ ও ফতওয়ার কিতাবের বর্ণনা দ্বারা সুস্পষ্ট ও অকাট্যভাবেই প্রমাণিত যে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, হযরত খুলাফায়ে রাশিদীন আলাইহিমুস সালাম ও হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনারা নামাযে পবিত্র সূরা ফাতিহা শরীফ পাঠ শেষে ‘আমীন’ অনুচ্চ আওয়াজে অর্থাৎ চুপে চুপে বলতেন।
যেমন পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-
عَنْ حَضْرَتْ وَائِلِ بْنِ حُجْرٍ رَضِىَ اللهُ تَـعَالٰى عَنْهُ قَالَ أَنَّ النَّبِىَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَـرَأَ غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلاَ الضَّالِّينَ فَـقَالَ اٰمِينَ وَخَفَضَ بِهَا صَوْتَهٗ وَفِى رِوَايَةٍ اَخْفٰى بِهَا
অর্থ: হযরত ওয়ায়িল বিন হুজর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বর্ণনা করেন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি পবিত্র সূরা ফাতিহা শরীফ পাঠ শেষ করে আমীন বলতেন এবং তা অনুচ্চ আওয়াজে তথা চুপে চুপে বলতেন। (তিরমিযী শরীফ)
পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে আরো ইরশাদ মুবারক হয়েছে-
عَنْ حَضْرَتْ اَبِى وَائِلٍ رَضِىَ اللهُ تَـعَالٰى عَنْهُ قَالَ كَانَ حَضْرَتْ عُمَرُ عَلَيْهِ السَّلَامُ وَحَضْرَتْ عَلِىٌّ عَلَيْهِ السَّلَامُ لَا يَجْهَرَانِ ببِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيمِ وَلَا بِالتَـعَوُّذِ وَلَا بِاٰمِينَ
অর্থ: হযরত আবূ ওয়ায়িল রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বর্ণনা করেন, হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম এবং হযরত ইমামুল আউওয়াল কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম উনারা বিসমিল্লাহ, আউযুবিল্লাহ ও আমীন চুপে চুপে পাঠ করতেন। (তহাবী শরীফ)
পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে আরো ইরশাদ মুবারক হয়েছে-
عَنْ حَضْرَتْ عُمَرَ الْفَارُوقِ عَلَيْهِ السَّلَامُ: أَنَّهٗ يُخْفِي الْإِمَامُ أَرْبَـعَةَ أَشْيَاءَ: اَلتَّعَوُّذَ، وَالْبَسْمَلَةَ، وَاٰمِينَ وَسُبْحَانَكَ اللّٰهُمَّ
অর্থ: হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম তিনি বর্ণনা করেন, ইমাম চারটি জিনিস চুপে চুপে পাঠ করবেন। ১. আউযুবিল্লাহ, ২. বিসমিল্লাহ, ৩. আমীন, ৪. সুবহানাকাল্লাহুম্মা অর্থাৎ ছানা। (বায়হাক্বী, তবারানী)
পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে আরো ইরশাদ মুবারক হয়েছে-
عَنْ حَضْرَتْ اِبْنِ مَسْعُودٍ رَضِيَ اللهُ تَـعَالٰى عَنْهُ قَالَ: يُخْفِي الْإِمَامُ ثَلَاثًا: اَلتَّـعَوُّذَ، وَبِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيمِ، وَاٰمِينَ
অর্থ: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বর্ণনা করেন, ইমাম তিনটি জিনিস চুপে চুপে পাঠ করবে। ১. আউযুবিল্লাহ, ২. বিসমিল্লাহ, ৩. আমীন। (আমানিউল আহবার)
পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে আরো ইরশাদ মুবারক হয়েছে-
عَنْ حَضْرَتْ وَائِلِ بْنِ حُجْرٍ رَضِيَ اللهُ تَـعَالَى عَنْهُ أَنَّهُ صَلَّى مَعَ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَـلَمَّا بَـلَغَ: غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ، قَالَ اٰمِينَ، وَأَخْفَى بِهَا
অর্থ: হযরত ওয়ায়িল বিন হুজর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বর্ণনা করেন, নিশ্চয়ই তিনি নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাথে নামায আদায় করেন। এতে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি পবিত্র সূরা ফাতিহা শরীফ শেষ করে চুপে চুপে আমীন পাঠ করেন। (মুসতাদরিকে হাকিম)
পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে আরো ইরশাদ মুবারক হয়েছে-
عَنْ حَضْرَتْ وَكِيعٍ، عَنْ سُفْيَانَ، عَنْ سَلَمَةَ، عَنْ حُجْرِ بْنِ عَنْـبَسٍ، عَنْ وَائِلِ بْنِ حُجْرٍ رَضِيَ اللهُ تَـعَالٰى عَنْهُ قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا قَـرَأَ: وَلَا الضَّالِّينَ فَـقَالَ: اٰمِينَ، خَفَضَ بِهَا صَوْتَهُ
অর্থ: হযরত ওয়াকী’ রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি হযরত সুফিয়ান রহমতুল্লাহি আলাইহি থেকে, তিনি হযরত সালমাহ রহমতুল্লাহি আলাইহি থেকে, তিনি হযরত হুজর ইবনে আম্বাস রহমতুল্লাহি আলাইহি থেকে, তিনি হযরত ওয়ায়িল ইবনে হুজর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণনা করেন যে, হযরত ওয়ায়িল রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বলেন, আমি শুনেছি, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি যখন পবিত্র সূরা ফাতিহা শরীফ শেষ করতেন তখন তিনি চুপে চুপে আমীন বলতেন। (মুছান্নাফে ইবনে আবি শায়বা)
পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে আরো ইরশাদ মুবারক হয়েছে-
عَنْ حَضْرَتْ سَمُرةَ بْنِ جُنْدُبٍ رَضِيَ اللهُ تَـعَالٰى عَنْهُ: أنَّهٗ حَفِظَ عَنْ رَّسُولِ اللهِ صَلَّى الله عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سَكْتَـتَـيْنِ: سَكْتَةً إِذَا كَبَّـرَ، وَسَكْتَةً إِذَا فَـرَغَ مِنْ قِرَاءَةِ: غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ، فَصَدَّقَهٗ أُبَيُّ بْنُ كَعْبٍ رَضِيَ اللهُ تَـعَالٰى عَنْهُ
অর্থ: হযরত সামুরা ইবনে জুনদুব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বর্ণনা করেন, নিশ্চয়ই তিনি নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার থেকে দু’বার চুপ করে থাকার কথা স্মরণ রেখেছেন। একবার যখন তিনি তাকবীর বলতেন, আরেকবার যখন তিনি পবিত্র সূরা ফাতিহা শরীফ শেষ করতেন। হযরত উবাই ইবনে কা’ব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এই পবিত্র হাদীছ শরীফখানা সত্য বলে স্বীকার করেছেন। (আবু দাউদ, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ, দারিমী, মিশকাত)
পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে আরো ইরশাদ মুবারক হয়েছে-
قَالَ الطِّيبِيُّ الشَّافِعِيُّ: الظَّاهِرُ أَنَّ السَّكْتَةَ الْأُولَى لِلثَّـنَاءِ، وَالسَّكْتَةَ الثَّانِيَةَ لِلتَّأْمِينِ
অর্থ: শাফিয়ী মতালম্বী হযরত ইমাম তীবী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, উপরোক্ত হাদীছ শরীফ এ সুস্পষ্টরূপে প্রমাণিত হয় যে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি প্রথমবার ছানা পড়ার জন্য চুপ থাকতেন এবং দ্বিতীয়বার আমীন পড়ার জন্য চুপ থাকতেন। (মিরকাত শরহে মিশকাত)
কিতাবে উল্লেখ করা হয়-
قَالَ: اٰمِينَ، وَخَفَضَ بِهَا صَوْتَهُ
অর্থ: নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি চুপে চুপে আমীন বলতেন। (মুসনাদে আহমদ)
فَـلَمَّا بَلَغَ: غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ قَالَ: اٰمِينَ، وَأَخْفَى بِهَا صَوْتَهُ
অর্থ: নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি পবিত্র সূরা ফাতিহা শরীফ শেষ করে চুপে চুপে আমীন বলতেন। (আবু দাউদ তায়ালুছী)
فَـقَالَ: اٰمِينَ، وَأَخْفَى بِهَا صَوْتَهُ
অর্থ: নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি চুপে চুপে আমীন বলতেন। (আবু ইয়া’লী মুছিলী)
قَالَ: اٰمِينَ، وَأَخْفَى بِهَا صَوْتَهُ
অর্থ: নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি পবিত্র সূরা ফাতিহা শরীফ শেষ করে চুপে চুপে আমীন বলতেন। (মহল্লী)
قَالَ: اٰمِينَ، وَأَخْفَى بِهَا صَوْتَهُ
অর্থ: নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি আমীন চুপে চুপে বলতেন। (দারুকুতনী)
قَالَ: اٰمِينَ، وَأَخْفَى بِهَا صَوْتَهُ
অর্থ: নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি পবিত্র ফাতিহা শরীফ শেষে আমীন চুপে চুপে বলতেন। (তবারানী)
عَنْ حَضْرَتْ إِبْـرَاهِيمَ النَّخَعِيِّ قَالَ: أَرْبَعٌ يُخْفِيهِنَّ الْإِمَامُ: التَّـعَوُّذُ، وَبِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيمِ، وَسُبْحَانَكَ اللّٰهُمَّ، وَاٰمِينَ
অর্থ: হযরত ইবরাহীম নখয়ী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বর্ণনা করেছেন, ইমাম আউযুবিল্লাহ, বিসমিল্লাহ, ছানা ও আমীন এই চারটি কালাম চুপে চুপে পাঠ করবেন। (কিতাবুল আছার)
عَنْ حَضْرَتْ شُعْبَةَ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ، عَنْ سَلَمَةَ بْنِ كُهَيْلٍ، عَنْ حُجْرٍ أَبِي الْعَنْـبَسِ، عَنْ عَلْقَمَةَ بْنِ وَائِلٍ، عَنْ أَبِيهِ، أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَـرَأَ: غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ، فَـقَالَ: اٰمِينَ، وَخَفَضَ بِهَا صَوْتَهُ
অর্থ: হযরত ইমাম শু’বাহ রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি হযরত সালমা ইবনে কুহাইল রহমতুল্লাহি আলাইহি থেকে, তিনি হুজর আবিল আম্বাস রহমতুল্লাহি আলাইহি থেকে তিনি উনার পিতা হযরত ওয়ায়িল থেকে বর্ণনা করেছেন যে, নিশ্চয়ই নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি পবিত্র সূরা ফাতিহা শরীফ শেষ করে চুপে চুপে আমীন পাঠ করেছিলেন। (কিতাবুল আছার)
حَضْرَتْ أَبِي وَائِلٍ رَضِيَ اللهُ تَـعَالٰى عَنْهُ قَالَ: لَمْ يَكُنْ عُمَرُ عَلَيْهِ السَّلَامُ وَعَلِيٌّ عَلَيْهِ السَّلَامُ يَجْهَرَانِ بِبِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيمِ وَلَا بِاٰمِينَ
অর্থ: ইমাম তিবরী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি হযরত আবূ ওয়ায়িল রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার সনদে বর্ণনা করেছেন যে, হযরত ফারূক্বে আ’যম এবং হযরত কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিমাস সালাম উনারা বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম ও আমীন চুপে চুপে পাঠ করতেন। (তাহযীবুল আছার)
وَرُوِيَ الْإِخْفَاءُ عَنْ حَضْرَةِ عَبْدِ اللهِ بْنِ مُغَفَّلٍ وَحَضْرَةِ أَنَسٍ رَضِيَ اللهُ تَـعَالَى عَنْـهُمَا
অর্থ: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মুগাফফাল রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এবং হযরত আনাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনারা আমীন চুপে চুপে পড়ার হাদীছ শরীফ বর্ণনা করেছেন। (তাফসীরে বায়যাবীতে)
عَنْ حَضْرَتِ الْإِمَامِ جَلَالُ الدِّينِ السُّيُوطِيُّ فِي جَمْعِ الْجَوَامِعِ: عَنِ ابْنِ وَائِلٍ رَضِيَ اللهُ تَـعَالَى عَنْهُ، قَالَ: كَانَ عُمَرُ عَلَيْهِ السَّلَامُ وعَلِيٌّ عَلَيْهِ السَّلَامُ لَا يَجْهَرَانِ بِالْبَسْمَلَةِ وَلَا بِالتَّـعَوُّذِ وَلَا بِالتَّأْمِينِ
অর্থ: হযরত ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী রহমতুল্লাহি আলাইহি ‘জামউল জাওয়ামি’ কিতাবে উক্ত তিনখানা কিতাব থেকে বর্ণনা করেছেন, হযরত ফারূক্বে আ’যম এবং হযরত কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিমাস সালাম উনারা বিসমিল্লাহ, আউযুবিল্লাহ ও আমীন চুপে চুপে পাঠ করতেন। (তহাবী, ইবনে শাহীন ও ইবনে জারীর)
قَالَ حَضْرَتْ عَبْدُ اللهِ بْنِ مَسْعُودٍ رَضِيَ اللهُ تَـعَالَى عَنْهُ: أَرْبَعٌ يُخْفِيهِنَّ الْإِمَامُ: التَّـعَوُّذُ، وَالثَّـنَاءُ، وَالتَّسْمِيَةُ، وَالتَّأْمِينُ
অর্থ: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বলেছেন, ইমাম আউযুবিল্লাহ, বিসমিল্লাহ, ছানা, আমীন এ চারটি কালাম বা বাক্য চুপে চুপে পাঠ করবেন। (মুসনাদে ইবনে আবী শায়বাহ)
قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِذَا قَالَ: غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ، فَـقُولُوا: اٰمِينَ؛ فَإِنَّ الْمَلَائِكَةَ تَـقُولُ: اٰمِينَ، وَإِنَّ الْإِمَامَ يَـقُولُ: اٰمِينَ
অর্থ: নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, তোমরা আমীন পাঠ করো। কেননা নিশ্চয়ই ফেরেশতা আলাইহিমুস সালাম উনারাও আমীন পাঠ করেন এবং ইমামও আমীন পাঠ করেন। (নাসায়ী, ইবনে হাব্বান ও মুসনাদে আব্দুর রযযাক)
قَـوْلُهُ: فَإِنَّ الْإِمَامَ يَـقُولُهَا يَدُلُّ عَلَى أَنَّ الْإِمَامَ يُخْفِيهَا لِأَنَّهُ لَوْ كَانَ جَهْرًا لَكَانَ مَسْمُوعًا، فَحِينَئِذٍ اُسْتُـغْنِيَ عَنْ قَـوْلِهِ: فَإِنَّ الْإِمَامَ يَـقُولُهَا
অর্থ: নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি উক্ত পবিত্র হাদীছ শরীফ-এ বলেছেন যে, ইমামও আমীন পড়েন; এতে বুঝা যাচ্ছে যে, ইমাম চুপে চুপে আমীন পড়তেন। যদি আমীন উচ্চ আওয়াজে পড়ার বিধান থাকতো, তাহলে মুক্তাদীগণ তা শুনতে পেতেন এবং নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনিও উক্তরূপ কথা বলতেন না।
এছাড়া হযরত ফেরেশতা আলাইহিমুস সালাম উনারা এবং ইমাম আমীন পড়েন; এতে বুঝা যাচ্ছে যে, হযরত ফেরেশতা আলাইহিমুস সালাম উনারা যেরূপ চুপে চুপে আমীন পড়েন, ইমামও সেরূপ চুপে চুপে আমীন পড়ে থাকেন।
তানবীরুল আবছার কিতাবের ৪৯২নং পৃষ্ঠায় বর্ণিত রয়েছে-
اَمَّنَ الْإِمَامُ سِرًّا كَالْمَأْمُومِ وَالْمُنْـفَرِدِ
অর্থ: মুক্তাদী ও একাকী নামাযী ব্যক্তির মতো ইমামও আমীন চুপে চুপে পড়বে।
উপরোক্ত বর্ণনার মাধ্যমে প্রতিভাত ও প্রমাণিত হয়েছে যে, ইমাম-মুক্তাদী সকলের জন্যেই পবিত্র সূরা ফাতিহা শরীফ পাঠ করার পর চুপে চুপে আমীন বলাটাই হচ্ছে সম্মানিত শরীয়ত উনার হুকুম তথা খাছ সুন্নত মুবারক উনার অন্তর্ভুক্ত।
তাছাড়া ‘আমীন’ কালামটি দোয়ার অন্তর্ভুক্ত। আর দোয়াকে নামাযের ভিতরে চুপে চুপে পাঠ করাটাই দলীলসম্মত।
যেমন এ প্রসঙ্গে সম্মানিত ও পবিত্র সূরা আ’রাফ শরীফ উনার ৫৫ নং সম্মানিত ও পবিত্র আয়াত শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-
اُدْعُوا رَبَّكُمْ تَضَرُّعًا وَخُفْيَةً
অর্থ: তোমরা তোমাদের রব তায়ালা মহান আল্লাহ পাক উনার নিকট বিনীত-বিন¤্রভাবে ও চুপে চুপে দোয়া করো।
এ প্রসঙ্গে তাফসীরে কবীর ৪র্থ খণ্ড ২৪৩ পৃষ্ঠায় বর্ণিত হয়েছে-
قَالَ أَبُو حُذَيْفَةَ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ: إِخْفَاءُ التَّأْمِينِ أَفْضَلُ، وَقَالَ الشَّافِعِيُّ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ: إِعْلَانُهُ أَفْضَلُ. وَاحْتَجَّ أَبُو حَنِيفَةَ عَلَى صِحَّةِ قَـوْلِهِ، فَـقَالَ: فِي قَـوْلِهِ: اٰمِينَ وَجْهَانِ: أَحَدُهُمَا أَنَّهُ دُعَاءٌ، وَالثَّانِي أَنَّهُ مِنْ أَسْمَاءِ اللهِ. فَإِنْ كَانَ دُعَاءً وَجَبَ إِخْفَاؤُهُ؛ لِقَوْلِهِ تَـعَالَى: ادْعُوا رَبَّكُمْ تَضَرُّعًا وَخُفْيَةً. وَإِنْ كَانَ اِسْمًا مِنْ أَسْمَاءِ اللهِ تَـعَالَى وَجَبَ إِخْفَاؤُهُ لِقَوْلِهِ تَـعَالَى: وَاذْكُرْ رَبَّكَ فِي نَـفْسِكَ تَضَرُّعًا وَخِيفَةً. فَإِنْ لَمْ يَـثْـبُتِ الْوُجُوبُ فَلَا أَقَلَّ مِنَ النَّدْبِيَّةِ، وَنَحْنُ لِهَذَا الْقَوْلِ نَـقُولُ
অর্থ; হযরত ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বর্ণনা করেন, হযরত ইমাম আ’যম আবূ হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, ‘আমীন’ চুপে চুপে পাঠ করা উত্তম। আর হযরত ইমাম শাফিয়ী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, ‘আমীন’ উচ্চ শব্দে পাঠ করা উত্তম। হযরত ইমাম আ’যম আবূ হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি নিজ মতের সত্যতা প্রমাণ করার উদ্দেশ্যে এই দলীল প্রকাশ করেছেন যে, আমীন কালামটি পাঠে দুই প্রকার মত রয়েছে। প্রথম হলো, ‘আমীন’ কালামটি একটি দোয়া। দ্বিতীয় হলো, ‘আমীন’ আল্লাহ পাক উনার একটি নাম। যদি আমীন দোয়া হয় তাহলে তা (নামাযের ভিতর) চুপে চুপে পাঠ করা ওয়াজিব হবে। কেননা মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ করেছেন-
اُدْعُوا رَبَّكُمْ تَضَرُّعًا وَخُفْيَةً
অর্থ: তোমরা তোমাদের রব তায়ালা মহান আল্লাহ পাক উনার নিকট বিনীতভাবে ও চুপে চুপে দোয়া করো।
আর যদি ‘আমীন’ মহান আল্লাহ পাক উনার একটি নাম মুবারক ধরা হয় তাহলেও তা চুপে চুপে পাঠ করা ওয়াজিব হবে। কেননা মহান আল্লাহ পাক তিনি বলেছেন-
وَاذْكُرْ رَبَّكَ فِي نَـفْسِكَ تَضَرُّعًا وَخِيفَةً
অর্থ: তুমি তোমার রব আল্লাহ পাক উনাকে মনে মনে, বিনীত-বিন¤্রভাবে ও অনুচ্চ আওয়াজে স্মরণ করো। (সম্মানিত ও পবিত্র সূরা আ’রাফ শরীফ: সম্মানিত ও পবিত্র আয়াত শরীফ ২০৫)
আর যদি ‘আমীন’ চুপে চুপে পড়া ওয়াজিব না হয়, তবে অন্ততপক্ষে তা মুস্তাহাব- সুন্নত হবে। আমরা হানাফীগণ এ মতই অবলম্বন করে থাকি।