কুরআন শরীফের সূরায় সূরায় অনেক অনেক আয়াত শরীফে রয়েছে ইহুদীদের গোয়ার্তুমি, অবাধ্যতা, অকৃতজ্ঞতা আর সত্যদ্বীন বিরোধী মনোবৃত্তি ও কর্মকান্ডের ঘৃণিত ইতিহাস।
অথচ কে না জানে এই ইহুদীরা ছিল নিগৃহীত জীব। ফিরআউনের স্বজাতি কিবতীদের জুলুমে নিগৃহীত এক জাতি। ফিরআউন তাদের গোলাম করে রেখেছিলো। সে তাদের পুত্রদের জবেহ করতো। কিন্তু জলীলুর ক্বদর রসূল হযরত মূসা আলাইহিস্ সালাম-এর উছীলায় তারা ফিরআউনের হাত থেকে নাযাত পেলো।
তারা লোহিত সাগর নির্বিঘেœ পার হলো। কিন্তু তারপরেও তারা তাওহীদের বিরোধীতা করলো। শুরু করলো গো-বৎস তৈরী ও তার পূজা। হযরত মূসা আলাইহিস্ সালাম তাদের গো-দেবতাকে শুধু পুড়িয়েই ফেলেননি বরং তার ছাইকেও বাতাসে উড়িয়ে দিয়ে তাদের এই ধর্ম বিরোধী কাজের প্রবাহ বন্ধ করলেন।
আর তারা তওবা করে তখনকার মত নিস্কৃতি পেলেও প্রতারণা আর হক্ব-বিরোধীতায় তারা নতুন তৎপরতা শুরু করলো। তারা নতুন আবদার শুরু করলো যে, আমাদের নিকট আল্লাহ্ পাক-এর কিতাব আসলে আমরা তা মেনে চলবো। তাদের পুনঃ পুন অনুরোধ এবং দৃঢ় ওয়াদা দেয়ার প্রেক্ষিতে হযরত মূসা আলাইহিস্ সালামকে যখন আল্লাহ্ পাক তাওরাত কিতাব দান করলেন তখন তারা মন্তব্য করতে লাগলো যে, এই কিতাবের বিধি-নিষেধ অত্যন্ত কঠিন যা মেনে চলা সম্ভব নয়। এই প্রেক্ষিতে আয়াত শরীফ নাযিল হয়, “তাওরাতের বিধি-নিষেধ যথাযথভাবে মান, অন্যথায় তোমাদের উপর পাহাড় পড়লো বলে মনে রাখ।”
এরপর আল্লাহ্ পাক এই ইহুদীদের নির্দেশ করলেন, এলিয়া নামক শহরে সিজদারত অবস্থায় প্রবেশ করার জন্য এবং ম্নম্ভ্রব্ধ ‘হিত্তাতুন” বলার জন্য। অর্থাৎ তোমরা বলো, আয় আল্লাহ্ পাক! আপনি আমাদের গুণাহ্ ক্ষমা করুন। আমরা আপনার পথে জিহাদ করা হতে বিরত রয়েছি। আর শাস্তি স্বরূপ আমরা তীহ প্রান্তরে হতবুদ্ধি হয়ে চল্লিশ বছর পর্যন্ত ঘুরে বেরিয়েছি। কিন্তু এখানেও তাদের জাতিগত হঠকারিতা প্রকাশ পেল। তারা হাঁটুর ভরে চলতে চলতে বায়তুল মুকাদ্দাসের দরজায় পৌঁছে এবং ম্নশুম্ভ্রব্ধ ‘হিনত্বাতুন” বলে। অর্থাৎ গম দান করুন। তাদের আরোও দুষ্টমি এই যে, শনিবারের সীমালংঘন করা। কেননা শনিবারের মৎস শিকার করা ইহুদীদের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু যেহেতু ঐদিনই মাছ বেশী দেখা যেত। সেহেতু তারা লোভ সংবরণ করতে না পেরে কুট কৌশল ও প্রতারণার আশ্রয় নেয়। তারা শনিবারে মাছ শিকার না করে নদীর মোহনায় জলাশয় তৈরী করে রাখতো। মাছ যখন তাতে প্রবেশ করতো তখন তার পথ রুদ্ধ করে দিতো। এভাবে পরের দিন তারা মাছ শিকার করতো। অথচ তারা আল্লাহ্ পাক-এর কাছে ওয়াদাবদ্ধ ছিলো যে, তারা তাওরাতের বিধি-বিধান যথাযথভাবে মেনে চলবে। ইহুদীদের এই বদ খাছলত এতই মজ্জাগত যে তারা তাদের সেই চিরন্তন বিরোধী প্রবৃত্তিগত প্রক্রিয়ায় আখিরী নবী, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পা ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছেও এ ধরণের ঘটনার পুনরাবৃত্তি করেছিলো। বলেছিলো, “আপনি যদি সত্য সত্যই আল্লাহ্ পাক-এর নবী হন তবে হযরত মূসা আলাইহিস্ সালাম-এর ন্যায় আসমান থেকে একখানি কিতাব নিয়ে আসুন। “তারা এও দাবী করেছিলো যে,” আমরা যেন আল্লাহ্ পাক-এর কিতাব নাযিল হওয়ার সময় দেখতে পারি, তখন আমরা আপনার প্রতি ঈমান আনবো”
এর জবাবে আল্লাহ্ পাক ইরশাদ ফরমান, “আপনার নিকট আহলে কিতাবরা আবেদন জানায় যে, আপনি তাদের উপর আসমান থেকে লিখিত কিতাব অবতীর্ণ করিয়ে নিয়ে আসুন। বস্তুত এরা মূসা আলাইহিস্ সালাম-এর কাছে এর চেয়েও বড় জিনিস চেয়েছে। বলেছে, একেবারে সামনা-সামনি আল্লাহ্ পাককে দেখিয়ে দাও। অতএব তাদের উপর বজ্রপাত হয়েছে তাদের পাপের দরুন, অতঃপর তাদের নিকট সুস্পষ্ট প্রমাণ-নিদর্শন প্রকাশিত হবার পরেও তারা গো-বৎসকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করেছিলো। তাও আমি ক্ষমা করে দিয়েছিলাম এবং আমি মূসাকে প্রকৃষ্ট প্রভাব দান করেছিলাম। আর তাদের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি নেবার উদ্দেশ্যে আমি তাদের উপর তুর পর্বতকে তুলে ধরেছিলাম এবং তাদেরকে বলেছিলাম অবনত মস্তকে দরজায় ঢোক। আরো বলেছিলাম, শনিবার দিন সীমালংঘন করোনা। এভাবে তাদের কাছ থেকে দৃঢ় অঙ্গীকার নিয়েছিলাম।
অতএব, তারা যে শাস্তি প্রাপ্ত হয়েছিলো তা ছিল তাদেরই অঙ্গীকার ভঙ্গের জন্য এবং অন্যায়ভাবে রসূলগণকে হত্যা করার জন্য।” (সূরা নিসা/১৫৩-১৫৪)
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ইহুদীরা অন্যায়ভাবে অনেক অনেক রসূল আলাইহিমুস্ সালামগণকে হত্যা করেছে। সুতরাং অন্যায়ভাবে মুসলিম হত্যা অথবা মুসলিম বিশ্বকে বিপর্যস্ত করার ক্ষেত্রে নিজেদের প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য আমেরিকার টুইন টাওয়ার ও পেন্টাগনে বোমা হামলা তাদের জন্য কোন ব্যাপারই নয়।
পাকিস্তানের সাবেক আই.এস.আই প্রধান জেনারেল গুল মন্তব্য করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ফ্লোরিডা কেলেঙ্কারীর কথা সবাই জানে। ওই কারচুপিতে ইহুদীরা বুশের পক্ষে ব্যাপক লবিং করে। কিন্তু বুশের মন্ত্রীসভায় কোন ইহুদী না থাকায় ইহুদীরা দারুণভাবে ক্ষুব্ধ হয়। এদিকে আমেরিকার পক্ষ থেকে যখন ইসরাঈলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে রিভার চুক্তি মেনে নেয়ার আবেদন করা হয়েছিল তখন নেতানিয়াহু ক্ষুব্ধ হয়ে সি.এন.এনকে বলেছিল ইহুদীরা ওয়াশিংটনে আগুন ধরিয়ে দিবে। এ কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে সি.এন.এন সাক্ষাতকার প্রচার করলেও তারা তা প্রশমিত করতে পারেনি, ইহুদীদের চাপা ক্ষোভ। আর সেই ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে ওরা হামলায়।
ইসরাঈলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ গত ১১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক ও ওয়াশিংটনে সন্ত্রাসী হামলা চালিয়েছে বলে সৌদি আরবের বহুল প্রচারিত পত্রিকা ওকাশ এ অভিযোগ করেছে। পত্রিকার সম্পাদকীয়তে বলা হয়, আমেরিকার অভ্যন্তরের কিংবা ওয়াশিংটনের সঙ্গে ঘনিষ্ট সম্পর্ক রক্ষাকারী কোন মহলের সহায়তা ছাড়া এত নিখুঁত, নির্ভুল ও যথাযথভাবে এ ধরণের ভয়াবহ হামলা চালানো সম্ভব নয়। এদিকে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই পরিচালক রবার্ট মুলার বলেছেন, তাদের তদন্তকারীরা ১১ সেপ্টেম্বরের হামলায় জড়িত ১৯ জন সন্ত্রাসীর প্রকৃত পরিচয় বের করেছে এবং আমেরিকার বাইরে যেখানে বসে এই হামলার পরিকল্পনা আঁটা হয়েছিল তার পরিচয়ও উদ্ধার করেছে। এএফপি, এপি। সৌদি পত্রিকা ওকাজ জানায়, ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার সঙ্গে জড়িত থাকার দায়ে মার্কিন কর্তৃপক্ষ সন্দেহভাজন ৬ জন ইসরাঈলিকে গ্রেফতার করে পরে তাদের ছেড়ে দেয়। ওই জঘন্য হামলার সঙ্গে মোসাদ জড়িত এর মাধ্যমেই আমাদের সে সন্দেহ প্রমাণিত হয়। একটু গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায়, ইসরাঈলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ এজেন্টরাই আমেরিকায় সবচেয়ে বেশি প্রভাবশালী। এত বেশি প্রভাব সেখানে অন্য কোন দেশের কোন সংস্থার নেই। একমাত্র মোসাদের পক্ষেই সম্ভব মার্কিন কর্তৃপক্ষের ভেতরে ঢুকে পড়া এবং এত বিশাল পরিকল্পনা নিখুঁতভাবে কার্যকর করা। ওকাজ আরও জানায়, ওই হামলায় আরব কিংবা মুসলমানরা জড়িত বলে অকাট্য প্রমাণ নেই। তবে এমন জঘন্য হামলা চালানোর জন্য মোসাদ হয়তো কিছু মুসলমানকে ব্যবহার করে থাকতে পারে। আর সঙ্গতকারণে অভিজ্ঞ মহল মনে করেন যে, ব্যবহৃত নামধারী মুসলমানদের মাঝে ওসামাই এক্ষেত্রে মুখ্য নিয়ামক।
এদিকে ১১ সেপ্টেম্বরের বিমান হামলার সঙ্গে ইসলাঈলের সম্পর্ককে কেন উড়িয়ে দেয়া যায় না তার কারণ হিসাবে ওয়াশিংটনের “ফ্রি প্রেস নেটওয়ার্ক” চারটি কারণ উল্লেখ করে।
প্রথমতঃ আমেরিকার ওপর সন্ত্রাসী আক্রমণের পরিকল্পনা ও সে পরিকল্পনা কার্যকর করার ব্যাপারে ইসরাঈল সরকারের একটি দূরবর্তী উদ্দেশ্য আছে। এই আক্রমণের ফলে তারা লাভবান হয়েছে এ কারণে যে, এখন কোন আইনগত তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই দাবি করা হচ্ছে যে, আরব ও ইসলামী দেশগুলোর দ্বারা সাহায্যপ্রাপ্ত হয়ে সেসব আরব/ইসলামী গ্রুপই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ও পেন্টাগণের ওপর আক্রমণ করেছে, যারা ইসরাঈলি মাফিয়াদের হাত থেকে প্যালেষ্টাইনকে মুক্ত করার জন্য চেষ্টা করছে।
দ্বিতীয়তঃ আমেরিকান ও মুসলিম/আরবদের পরস্পরের মধ্যে ঘৃণা ও সংঘর্ষ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ইহুদিবাদীদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত প্রচার মাধ্যমে ‘সন্ত্রাস বিশেষজ্ঞ’ নামে প্রচারিত কিছু আমেরিকান ও ব্রিটিশ সাংবাদিক ইসরাঈলের গোয়েন্দা বিভাগ মোসাদের টাকা-পয়সা খেয়ে ১১ সেপ্টেম্বরের ঘটনার জন্য আরব ইসলামী বিভিন্ন গ্রুপ ও ইসলামী দেশগুলোকে দায়ী করে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে।
তৃতীয়তঃ ১১ সেপ্টেম্বরের ভয়েস অব আমেরিকা পাকিস্তানে আফগানিস্তানের রাষ্ট্রদূত আব্দুস সালাম যায়েফকে উদ্ধৃত করে বলে যে, মিষ্টার যায়েফ বলেন যে, এটা এক সুসংগঠিত এবং উচ্চ পর্যায়ের পরিকল্পনা। তিনি বলেন, ওসামা বিন লাদেনের কাছে সে রকম কোন যন্ত্রপাতি ও যোগাযোগ সুবিধা নেই যা এ ধরণের আক্রমণের জন্য প্রয়োজন। আসলে সুদক্ষ পাইলট, অস্ত্র, যন্ত্রপাতি, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং অর্থ যা ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ও পেন্টাগণের ওপর আক্রমণের জন্য প্রয়োজন ছিল সেটা ইসরাইলেরই আছে।
চতুর্থতঃ ১৯৬৭ সালে ছয় দিনের ইসরাঈল-আরব যুদ্ধের সময় ৮ জুন ইসরাঈলি সামরিক বাহিনী মার্কিন গোয়েন্দা জাহাজ ‘ইউএসএস লিবার্টি’র ওপর আক্রমণ চালিয়ে ৩৪ জন মার্কিন সৈন্যকে নিহত এবং ১৭১ জন মার্কিন সৈন্যকে আহত করে। তারা জাহাজটিতে ৮২১ টি রকেট ও মেশিনগানের ক্ষতি করে। এর উদ্দেশ্য ছিল তাদের এই সন্ত্রাসী আক্রমণের দায়িত্ব আরব/মুসলিম সেনাবাহিনীর ওপর চাপিয়ে দেয়া। জাহাজটি থেকে রক্ষা পাওয়া সৈন্যরা এবং মার্কিন সরকারের অনেক অফিসার, যার মধ্যে প্রাক্তন সেক্রেটারি অব স্টেট ডিন রাস্ক ও প্রাক্তন জেসিএস চেয়ারম্যান অ্যাডমিরাল টমাস মুরারও ছিলেন। তিনি বলেন যে, মার্কিন জাহাজ ‘লিবার্টি’র ওপর সেই আক্রমণ কোন দুর্ঘটনা ছিলনা।
ইসরাঈল যখন ‘লিবাটি’র ওপর আক্রমণ করে তখন জাহাজের ব্রিজের ওপর দায়িত্বে ছিলেন লেফটেন্যান্ট জেমস এম ইলেম। ২৭ বছর কমিশনড অফিসার হিসাবে কাজ করার পর তিনি ১৯৭৮ সালে মার্কিন নৌবাহিনী থেকে লেফটেন্যান্ট কমান্ডার হিসাবে অবসর গ্রহণ করেন। পরে তিনি অংংধঁষঃ ড়হ ঃযব খরনবৎঃু নামে তার বিখ্যাত বইয়ে (জধহফড়স ঐড়ঁংব ১৯৮০-ইধষষধহঃরহব ১৯৮৬) বলেন, “টঝঝ খরনবৎঃু’ র ওপর ইসরাইল ইচ্ছাকৃতভাবে আক্রমণ করে এবং পরে সে ব্যাপারে মিথ্যা বলে। আজ থেকে অথবা আগামীকাল, আমেরিকানরা তাদের সরকার ও কংগ্রেসে তাদের প্রতিনিধিদের ওপর চাপ দেবে যাতে তারা এর কারণ খুঁজে বের করে।”
পত্রিকাটি আরও বলে, এখন সময় এসেছে ইসরাইল, দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য বিশেষ করে আরব-ইসরাইলি সংঘর্ষ, কাশ্মীর, আফগানিস্তান ইত্যাদি সম্পর্কে মার্কিনযুক্তরাষ্ট্রের নীতির পরিবর্তন করা। পত্রিকাটি এ প্রসঙ্গে মার্কিন বিদেশ সচিব কলিন পাওয়েলের কাছে দাবি জানায় যে, যে ইসরাইলি রাষ্ট্র বহু প্যালেস্টিনীয় নেতাকে খুন করেছে, হাজার হাজার নাগরিককে খুন করেছে, প্যালেষ্টিনীয়, আরব, মুসলমান, কাশ্মীরি ও খ্রিষ্টানদের বিরুদ্ধে অনেক মারাত্মক সন্ত্রাসী ও অপরাধী তৎপরতা চালিয়েছে তাকে সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসাবে ঘোষণা করা হোক। পত্রিকাটি এ কথাও বলে যে, আমরা মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া এবং অন্যত্র ইসরাইলের হয়ে যুদ্ধ করতে পারি না। স্পষ্টত ‘ফ্রি প্রেস নেটওয়ার্ক’ কোন বিল্পবী, এমনকি মার্কিন সরকারবিরোধী সংবাদ সংস্থা নয়। কিন্তু তারাও ইসরাইল সম্পর্কে উপরোল্লিখিত যেসব মন্তব্য ও বক্তব্য ১১ সেপ্টেম্বর তারিখেই প্রদান করেছে সেটা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ।
এ প্রসঙ্গে মার্কিন গোয়েন্দা জাহাজ ‘লিবার্টি’র ওপর ১৯৬৭ সালে ইসরাঈলের আক্রমণের বিষয়টি আরেকটু বিশদভাবে উল্লেখ করা যেতে পারে। কারণ এ ইতিহাসের আলোকে সঙ্গত কারণেই ১১ সেপ্টেম্বরের ঘটনার সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্কের ব্যাপারটি যে উড়িয়ে দেয়ার মতো নয় সেটা ভালভাবেই বোঝা যাবে।
১৯৯৭ সালের ৮ জুন তারিখে অর্থাৎ ‘লিবর্টি’র ওপর ইসরাইলি আক্রমণের ঠিক ত্রিশ বছর পর অ্যাডমিরাল টমাস মুরার একটি মেমোরেন্ডামে বলেন যে, তিনি কখনই বিশ্বাস করেননি যে, ‘লিবার্টি’র ওপর আক্রমণ ভুলবশত হয়েছিল। খুব অদ্ভূত ধরণের দেখতে ছিল ‘লিবার্টি’। যোগাযোগের গোয়েন্দা জাহাজ হিসাবে তাতে এত রকমের অ্যান্টেনা ছিল, যাতে তাকে দেখতে মনে হতো বড় চিংড়ি মাছের মতো। কাজেই তাকে চিহ্নিত করতে ভুল হওয়ার কোন প্রশ্নই ছিল না।
ইসরাঈলের খুব ভালভাবেই জানা ছিল যে, সেটা আমেরিকান জাহাজ। জাহাজটিতে উড়ানো মার্কিন পতাকা আকাশ থেকে খুব সহজেই দৃষ্টিগোচর ছিল। আক্রমণের আগে ইসরাঈলি উড়োজাহাজ প্রায় আট ঘন্টা ধরে আটবার চক্কর দিয়েছিল। মুরার বলেন, ইসরাইল সে সময় সিরিয়া থেকে গোলান হাইটস দখল করে নেয়ার প্রস্ততি নিচ্ছিল। তারা জানত যে, ‘লিবার্টি’ যুদ্ধরত যে কোন দেশের রেডিওকৃত তথ্য ধরে ফেলতে পারত। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জনসন ইসরাঈল কর্তৃক গোলান হাইটস দখলের বিরোধী ছিলেন এবং সে কারণেই এ ব্যাপারে কোন তথ্য অবগত হয়ে ‘লিবার্টি’ যাতে মার্কিন সরকারকে সেটা জানাতে না পারে সেজন্যই ইসরাঈল নেতা মোশে দায়ান ‘লিবার্টি’কে অকেজো করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। সেই আক্রমণে নিহতের সংখ্যা ছিল ৩৪ এবং আহতের সংখ্যা ১৭১ জন।
এ প্রসঙ্গে মুরার বলেন যে, সেদিন পর্যন্ত অর্থাৎ ১৯৯৭ সালের ৮ জুন পর্যন্ত মার্কিন কংগ্রেসে ‘লিবার্টি’র ওপর আক্রমণের বিষয়ে কোন আনুষ্ঠানিক শুনানি হয়নি। এটা ছিল এক অদৃষ্টপূর্ব ব্যাপার। তিনি বলেন যে, ‘পিউবলো’ নামে ‘লিবার্টি’র মতো একটি জাহাজ উত্তর কোরিয়া আটক করার পর তাকে কংগ্রেসে সাক্ষ্য দিতে হয়েছিল এবং সে সময় তারা সকল প্রকার সম্ভাব্য প্রশ্ন তাকে করেছিল। তারা এ পর্যন্ত জিজ্ঞেস করেছিল যে, কাছাকাছি এলাকায় থাকা যুদ্ধ বিমানবাহী জাহাজ থেকে সে সময়, ‘পিউবলো’র সাহায্যের জন্য যুদ্ধ বিমান কেন পাঠানো হয়নি। ‘লিবার্টি’র ঘটনার সময় দু’দুবার যুদ্ধ বিমান আকাশে পাঠানো হলেও তাদের ফেরত যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। এবং এ নির্দেশ দিয়েছিলেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী স্যাকলসারা ও প্রেসিডেন্ট জনসন!! মুরার তার মেমোরেন্ডামে দাবি করেন যে, এর কারণ জানার অধিকার আমেরিকার জনগণের আছে।
তাছাড়া যেখানে ‘লিবার্টি’র নাবিক ও নৌ-সেনাদের প্রাপ্য ছিল বীরের সম্মান। সেখানে তাদের সম্পর্কে পালন করা হয় এক অদ্ভূত নীরবতা। তিনি আরও বলেন যে, ওয়াশিংটনের আরলিংটন সমাধি ক্ষেত্রে ‘লিবার্টি’ জাহাজে নিহত ছয়জনের কবর আছে। কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার যে, সেখানে শুধু লেখা আছে “তাদের মৃত্যু হয়েছিল পূর্ব ভূমধ্যসাগর অঞ্চলে”! কিভাবে তাদের মৃত্যু হয়েছিল অসুখে না অন্য কোন কারণে তার কোন কথা সেখানে উল্লেখ নেই!!
‘লিবার্টি’র কমান্ডার ছিলেন ম্যাকগোলগল। তিনি গুরুতর আহত অবস্থাতেও অসীম সাহসের সঙ্গে জাহাজের ব্রিজের ওপর থেকে যুদ্ধ পরিচালনা করে জাহাজটিকে আক্রমণের হাত থেকে রক্ষার চেষ্টা করেছিলেন। মুরার বলেন, তিনি বিভিন্ন সময় অন্তত ১৫ বার হোয়াইট হাউসে গেছেন প্রেসিডেন্ট কর্তৃক সাহসিকতার জন্য আমেরিকানদের কংগ্রেশনাল পুরস্কার দেয়ার সময়। কিন্ত ম্যাকগোলগল এর সময় সে পুরস্কার প্রেসিডেন্ট কর্তৃক হোয়াইট হাউসে না দিয়ে দেয়া হল নৌবাহিনী সচিবের দ্বারা ওয়াশিংটনের নেভী ওয়ার্ডে! অন্যরা হোয়াইট হাউসে মেডেল পেলেও তাঁর ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম করা হল। কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ইসরাঈল লবির প্রতিক্রিয়া নিয়ে প্রেসিডেন্ট জনসন চিন্তিত ছিলেন।
গেয়েন্দা জাহাজ ‘লিবার্টি’র ওপর ইসরাঈলের এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ আক্রমণ সম্পর্কে অ্যাডমিরাল মুরার বলেন যে, এই ধরণের কাজ করার সাহস তাদের হয়েছিল কারণ, তারা জানত যে, মার্কিন জনগণ এর বিরুদ্ধে যাতে ক্ষিপ্ত হয়ে না ওঠে সে ব্যাপারে ওয়াশিংটন সহযোগিতা করবে। অর্থাৎ ঘটনাটি চেপে যাওয়ার ব্যাপারে ওয়াশিংটন ইহুদী লবিকে যথাসাধ্য সাহায্য করবে।
কাজেই ১১ সেপ্টেম্বরের ঘটনা সম্পর্কে ইহুদীদের সম্ভাবনা বাতিল করার কোন কারণ নেই। কারণ নেই বিশেষত এ জন্য যে, ওয়াশিংটন ওইদিনের ঘটনা কারা ঘটিয়েছিল সে ব্যাপারে কোন তথ্যপ্রমাণের ধারে কাছেও যেতে চায় না। প্রথম থেকেই তারা তাদের পোষ্যপুত্র ওসামা বিল লাদেনকে ‘সন্দেহভাজন’ ‘প্রধান সন্দেহভাজন’ ইত্যাদি আখ্যা দিয়ে লাদেনের আশ্রয়দাতা হিসাবে আফগানিস্তানের ওপর এক প্রচন্ড সামরিক হামলা শুরু করেছে এবং মুসলিম সন্ত্রাসবাদ দমনের নামে অন্য দেশের ওপর আক্রমণের হুমকিও দিচ্ছে। এই আন্তর্জাতিক দস্যুতার নাম তারা উল্লেখ করেছে- ‘নতুন ধরণের বিশ্বযুদ্ধ’। ১১ সেপ্টেম্বরের ঘটনা মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দ্বারা প্রতিরোধ করা সম্ভব না হলেও এটা কারা করেছে সে ব্যাপারে তাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে কোন তথ্য নেই এটা একেবারেই অবিশ্বাস্য। কিন্তু তথ্য থাকলে সেটা প্রকাশ না করার কারণ মূলত দুটি। প্রথমত, যারা এ কাজ করেছে তাদের আড়াল করা। দ্বিতীয়ত, ঘটনাটি ঘটে যাওয়ার পর তথ্য প্রমাণ আড়াল করে মুসলিম সন্ত্রাস দমনের নামে নিজেদের তেল-গ্যাস স্বার্থ উদ্ধার এবং সারাবিশ্বের ওপর নতুনভাবে নিজেদের আধিপত্য শক্তিশালী করা।
আর বলাবাহুল্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তথা সি. আই. এ-এর পোষ্যপুত্র ওসামা ও তালেবান অবারিতভাবে শুধু মার্কিনীদেরই এ সুযোগ করে দেয়নি; সে আরো বহুবিধ প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার ক্ষেত্র তৈরী করে দিয়েছে মুসলমানদের ঘৃণ্য শত্রু ইহুদীদের। আর ইহুদীরা সুনিপুনভাবে সবকিছু করে এখন ওসামাকে ব্যবহার করে দিব্যি পার পেয়ে যাচ্ছে। (চলবে)
-সাইয়্যিদ মুহম্মদ আলমগীর, ঢাকা।
ইসলামী বিশ্বকোষের আলোকে বালাকোট যুদ্ধের ইতিহাস- (৪)