সুওয়াল-জাওয়াব বিভাগ

সংখ্যা: ৮২তম সংখ্যা | বিভাগ:

সুওয়ালঃ- আমরা জানি, কাদেরিয়া, চিশ্তিয়া, নক্শবন্দিয়ায়ে মুজাদ্দেদিয়া ইত্যাদি হক্ব তরীকা ও সিলসিলার ন্যায় তরীকায়ে মুহম্মদিয়াও একটি। আর উক্ত তরীকাগুলির যারা ইমাম তারা সকলেই ছিলেন উঁচু দরজার ওলী এবং জামানার মুজাদ্দিদ। যাদের প্রশংসা ও মর্যাদার কথা বলার অপেক্ষা রাখেনা। কিন্তু আহমদ রেযা খান সাহেব তার কিতাবাদিতে লিখেছে যে, হযরত সাইয়্যিদ আহ্মদ শহীদ বেরেলভী (রঃ) নাকি ওহাবী ও কাফির ছিলেন। (নাউযুবিল্লাহ্) এমনিভাবে তাঁর নামে আরো জঘণ্য ধরণের কটুক্তি করেছে।

          এছাড়া সে ও তার অনুসারীরা আরো বলে থাকে যে, তিনি নাকি খৃষ্টানদের পক্ষ হয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন। প্রকৃতপক্ষে তিনি কোন জিহাদই করেননি। বরং তিনি ওহাবী ছিলেন তাই ওহাবীদের প্রচারের জন্য আন্দোলন করেছেন।

          তাঁর বিরোধীতা করার পিছনে দলীল দিয়ে থাকে যে, ইসমাইল শহীদ সাহেবের লিখিত কিতাব “তাকভিয়াতুল ঈমান ও সীরাতুল মুস্তাকিম।” এছাড়াও অন্যান্য ইতিহাস এবং জীবনী থেকেও দলীল পেশ করে থাকে।

          এখন আমাদের সুওয়াল হলো- উক্ত বক্তব্য সঠিক কিনা? আর হযরত সাইয়্যিদ আহ্মদ শহীদ (রঃ)-এর লিখিত কোন কিতাব আছে কি-না? এবং তাতে কোন কুফরী বক্তব্য আছে কি-না? দয়া করে দলীল-আদিল্লার দ্বারা জবাব দিয়ে আমাদের ঈমান হিফাযতে সাহায্য করবেন।

জাওয়াবঃ  সত্যের সওগাত, হক্বের ঝান্ডা বুলন্দকারী, অসত্য, বদদ্বীন ও বাতিলের কক্তরোধকারী মাসিক আল বাইয়্যিনাত পত্রিকায় দীর্ঘ দিন থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দির মুজাদ্দিদ ও মুজাহিদে মিল্লাত মুজাহিদে আজম, খলীফাতুল্লাহ্ আমিরুল মু’মিনীন সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ) ও তাঁর তরিকায়ে মুহম্মদীয়া সম্পর্কে এই ধরণের একটি সুওয়াল আমাদের সুওয়াল-জাওয়াব বিভাগে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে যেমন, মাদ্রাসা, খানকা, অফিস-আদালত হতে আসছে এবং আমাদেরকে বারবার বিশেষ অনুরোধ করা হচ্ছে যাতে আমরা সত্য প্রকাশে কুক্তাবোধ না করি এবং নির্ভরযোগ্য দলীল-আদিল্লাহ্সহ এর যথাযথ, সঠিক ও নির্ভুল জাওয়াব দিতে বাধ্য হই।

          হযরত সাইয়্যিদ আহমদ বেরেলভী (রঃ)কে কেউ ওহাবী, কাফির, ইংরেজদের দালাল, মুসলমানদের বিপক্ষ অবলম্বনকারী, আব্দুল ওহ্হাব নজদীর শিষ্য, ওহাবী মতবাদ প্রচারকারী ইত্যাদি ইত্যাদি বলছে। সত্যিকার অর্থে তিনি কি ওহাবী, কাফির ছিলেন? ইংরেজদের থেকে উৎকোচ গ্রহণ করে মুসলমানদের বিপক্ষ অবলম্বন করেছেন এবং তার কোন লিখিত কিতাব আছে কি ও তাতে আপত্তিকর কুফরীমূলক বক্তব্য পরিলক্ষিত হয় কি-না?

          এর জবাবে আমরা বলি এই উপমহাদেশের কেবলমাত্র একটি সংখ্যালঘু জামায়াত, গুটি কতক ইউরোপীয় খৃষ্টান লেখক এবং কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ ও তাসাউফের ইল্মে অন্তসারশুন্য কিছু সাধারণ মানুষ ব্যতীত আর কেউই এ কথায় বিশ্বাসী নয়।

          আমরা আশ্চর্য ও বিস্মিত হয়ে যাই, এই সংখ্যালঘু জামায়াতের প্রধান মুসলমানদের মধ্যে আলা হযরত নামধারী আহমদ রেযা খান সাহেব ও তার অনুসারীরা দীর্ঘ প্রায় সোয়া’শ বছর ধরে হযরত সাইয়্যিদ আহ্মদ শহীদ বেরেলভী (রঃ) ও তাঁর অনুসারীদেরকে ওহাবী, কাফির ফতওয়া দিয়ে যাচ্ছে।

          এখানে প্রথমেই উল্লেখ্য যে, আহমদ রেযা খান সাহেব কোন যোগ্যতাধারী ব্যক্তিত্ব যে, উনি হযরত সাইয়্যিদ আহমদ বেরেলভী (রঃ)কে নাহক্ব বলতে পারেন?

          আর আহমদ রেযা খান সাহেব কাউকে হক্ব বললেই তিনি হক্ব আর না হক্ব বললেই না হক্ব সেটা কুরআন-সুন্নাহ্র কোথায় আছে?

          উপরন্ত আরো প্রশ্ন যে, আহমদ রেযা খান সাহেব নিজেই যে হক্ব তারই বা দলীল কুরআন-সুন্নাহ্ কোথায় আছে?

          অথচ আহ্লে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের সকল আলেম, ফাযেল, মুফাস্সির, মুহাদ্দিস, ফক্বীহ, সূফী, দরবেশ ও সাধারন মানুষ সকলেই হযরত সাইয়্যিদ আহমদ বেরেলভী (রঃ)-এর ইমামত, খিলাফত, ইল্ম, আমল-আখলাক, তাকওয়া-পরহেযগারী ও তাঁর ত্বরিকার প্রতি নির্দ্বিধায় এখনও এক বাক্যে সম্মান প্রদর্শন করে যাচ্ছে ও তাঁর ত্বরিকায় দাখিল হচ্ছে। ত্রিশ লক্ষের অধিক যার মুরীদের সংখ্যা, চল্লিশ হাজার বিধর্মী যার হাতে মুসলমান হয়েছে, মক্কা শরীফ, মদীনা শরীফ, মিশর, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ভারত, বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যার খলীফার সংখ্যা হাজার হাজার, লক্ষাধিক জ্বীন ও রেযালুল গায়েব যার আনুগত্য করতো, শত সহস্র আলেম, ফাযেল, গাউস, কুতুব, আবদাল, নজীব যার সিলসিলা থেকে কামালিয়ত হাছিল করেছেন, যিনি ত্রয়োদশ শতাব্দীর ঝিমিয়ে পড়া ও নূয়ে পড়া দ্বীনকে পূনরুজ্জীবিত  করেছেন, জমিন থেকে র্শিক, বিদ্য়াত, কূফরী দুর করে দ্বীনের মজবুত খুঁটি গেড়েছেন, যাঁর দ্বারা বন্ধ হয়ে যাওয়া বহু মসজিদ, খানকা, জুমুয়া, জামায়াত, কুরবানী, তারাবীহ্ চালু হয়েছিল।

          বহু কামিল মুর্শিদগণ খলীফাসহ নিজস্ব খানকা শরীফ ত্যাগ করে যার হাতে বাইয়াত হয়েছেন, যিনি হুজুর পাক সালাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সুন্নতকে সঠিকভাবে আঁকড়ে ধরে রেখেছিলেন। উপমহাদেশের মশহুর ত্বরিকাগুলো যেমন, কাদেরীয়া, চিশ্তিয়া, নকশ্বন্দীয়া, মুজাদ্দেদীয়া, সোহ্রাওয়ার্দীয়া তরীকার ভক্ত ও সালেকগণ যাঁর তরিকা ও সিলসিলার অন্তর্ভূক্ত, এমনকি হিংসুক ও তাঁর বিরুদ্ধে ওহাবী, কাফির ফতওয়া লেপনকারী বিরুদ্ধবাদীরা ও তাদের পূর্বপুরুষরা যাঁর ত্বরিকা থেকে ফায়দা হাছিল করে যাচ্ছে। যদিওবা তারা প্রকাশ্যে এ কথা স্বীকার করতে নারাজ। এখন তিনি যদি কাফির হন তবে জমিনে মুসলমান কে? আমিরুল মু’মিনীন সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ) ও তাঁর খলিফা এবং অনুসারীদের দ্বারা অত্র এলাকায় দ্বীন ইসলামের যে খিদমত ও উপকার সাধিত হয়েছে তাঁর শত সহস্র ভাগের এক ভাগও কি এই রেযা খানীদের দ্বারা হয়েছে? যেমন, হযরত সাইয়্যিদ আহমদ রেরেলভী (রঃ)-এর আকাবির খলিফাদের মধ্যে ইমামুল হুদা হযরত মাওলানা আব্দুল হাই (রঃ) (ইনি হযরত শাহ্ আব্দুল আজীয মুহাদ্দিস দেহলবী (রঃ)-এর জামাতা ছিলেন) হযরত মাওলানা বেলায়েত আলী আযিমাবাদী (রঃ), হযরত মাওলানা মুহম্মদ রামপুরী (রঃ), হযরত খোদা বখ্স (রঃ) (মিরাট), হযরত মাওলানা ইয়াকুব (রঃ) (দিল্লী), হযরত মাওলানা ইসহাক (রঃ) (দিল্লী), হযরত মাওলানা মুরতাযা খাঁ রামপুরী  (রঃ) (উত্তর প্রদেশ), হযরত মাওলানা আব্দুল হাকিম (রঃ) (বোম্বে), হযরত মাওলানা আব্দুল্লাহ্ (রঃ) (বেনারস), হযরত সাইয়্যিদ কাসেম সাহেব নাছিরাবাদী (রঃ) (অযোধ্যা), হযরত মাওলানা শিহাবুদ্দীন বাটালবী (রঃ) (পাঞ্জাব), হযরত মাওলানা আব্দুল কুদ্দুস (রঃ) (কাশ্মীর), হযরত মাওলানা মিয়াঁ ফজল (রঃ) (শিয়াল কোর্ট পাকিস্তান), হযরত মাওলানা মুহম্মদ আজিম (রঃ) (পেশওয়ার আফগানিস্তান), হযরত মাওলানা আব্দুল্লাহ্ (রঃ) (গজনী, আফগানিস্তান), হযরত মিয়াজী নূর মুহম্মদ (রঃ) (ইনি হযরত খাজা হাজী এমদাদুল্লাহ্ মুহাজেরে মক্কী (রঃ)-এর পীর সাহেব), হযরত কাজী ইউসুফ মুরকী (রঃ) (মহারাষ্ট্র), হযরত মাওলানা মির আহমদ আলী সাহেব (রঃ) (মাদ্রাজ), হযরত সাইয়্যিদ মুহম্মদ হামজা (রঃ) (বার্মা), হযরত মাওলানা সাইয়্যিদ মুহম্মদ হুসাইন (রঃ) (উত্তর প্রদেশ), হযরত মাওলানা চিশ্তী (রঃ) (কান্দলা), হযরত মাওলানা হায়দার আলী (রঃ) (হুশিয়ারপুর), হযরত মাওলানা সূজাত আলী (রঃ) (আজিমাবাদ),

          হযরত মাওলানা আব্দুর রহীম বেলায়েতি (রঃ) (ইনি হাজী এমদাদুল্লাহ্ মুহাজেরে মক্কী (রঃ)-এর দাদা পীর সাহেব ছিলেন), হযরত মাওলানা সাইয়্যিদ আওলাদ হাসান (রঃ) (কান্নোজ), হযরত মাওলানা সাইয়্যিদ নেসার আলী ওরফে তিতুমীর (রঃ) (পশ্চিম বঙ্গ), হযরত হাফেজ মাওলানা জামালুদ্দীন (রঃ) (পশ্চিম বঙ্গ), হযরত নিযামুদ্দীন (রঃ) (দিল্লী), হযরত মাওলানা ইকরামুদ্দীন (রঃ) (দিল্লী), হযরত মাওলানা ইমামুদ্দীন (রঃ) (বাংলাদেশ), হযরত মাওলানা রমিজুদ্দীন (রঃ) (বাংলাদেশ), হযরত মাওলানা শাহ্ সূফী নূর মুহম্মদ নিযামপূরী (রঃ) (বাংলাদেশ), হযরত মাওলানা শায়খুল উলামা শায়খ মুস্তফা মিরদাদ (রঃ) (ইনি মক্কা শরীফের হানাফী মুসাল্লার ইমাম ছিলেন), হযরতুল আল্লামা খাজা আল মাস (রঃ) (ইনি পবিত্র মদীনা শরীফের গাউস ও প্রধান ওলী ছিলেন), হযরত শামসুদ্দীন শায়খ আতা মিসরী (রঃ) (ইনি মিশরের বুজুর্গ ছিলেন), হযরত সাইয়্যিদ হামজা (রঃ) ও হযরত সাইয়্যিদ আকিল (রঃ) (মক্কা শরীফ) এই দুই বুজুর্গ কাশ্ফ ও ইলহাম যোগে তাঁর কামালত বেলায়েতের দরজা অবগত হয়ে তাঁর নিকট বাইয়াত হয়েছেন), হযরত শাইখুল আল্লামা শায়খ মুহম্মদ আলী হিন্দী (রঃ) (এই মহান ওলী বাইতুল্লাহ্ শরীফের মুর্দারেছ ছিলেন), হাফেজ মাগরিবী শায়খ আহমদ বিন ইদরীস (রঃ) (ইনি মাগরীব দেশের সুলতানের উজির ছিলেন এবং সহীহ্ বুখারী শরীফও তাঁর হিফ্জ ছিলো), হযরত শায়খ ওমর বিন আব্দুর রসূল (রঃ) (প্রসিদ্ধ ওলী ও হানাফী মুহাদ্দিস), হযরত শায়খ বোখরামী (রঃ) (ইনি মদীনা শরীফে মুর্দারিস ছিলেন), ক্বাজিউল কুজাত হযরত মাওলানা ফজলুর রহমান (রঃ)(কলিকাতা), কাজী মাওলানা আব্দুল বারী (রঃ) (কলিকাতা), হযরত শাহ্ আহমদ (রঃ) (ইউপি) আরও অন্যান্য খলীফা যারা তৎকালে আরব আজমের বিভিন্ন মূলকে ছড়িয়ে পড়েছিলেন দ্বীনের দাওয়াত দেয়ার জন্য। তাঁরা গাফেল ও অলস জাতিকে জাগ্রত করেছেন। দ্বীন ইসলামের মাঝে পুঞ্জীভূত বিদ্য়াত, বেশরাকে বিদূরীত করে তারা হক্ব-মত পথকে নতুন করে সঞ্জীবিত করেছেন। মানুষকে দ্বীনের সহীহ্ বুঝ দিতে গিয়ে তারা যারপর নেই কষ্ট ও তাক্লীফ বরদাশ্ত করেছেন। পরবর্তীতে তাঁরই খলীফা ও অনুসারী হযরত শাহ্ নূর মুহম্মদ নিযামপূরী (রঃ), কুতুবুল ইরশাদ সূফী ফতেহ আলী বর্ধমানী (রঃ), হযরত ইকরামুল হক মুর্শিদাবাদী (রঃ), মুহিয়্যূস্সুন্নাহ্, মুজাদ্দিদুয্যামান, হযরত আবূ বকর সিদ্দীকী ফুরফুরাবী (রঃ), হাফেজে হাদীস আল্লামা রুহুল আমীন (রঃ), হযরত মাওলানা নেছারুদ্দীন (রঃ), হযরত আল্লামা সূফী তোজাম্মেল হোসেন (রঃ), হযরত আব্দুল হাই সিদ্দীকী ফুরফুরাবী (রঃ), হযরত নাজমুস সা’দাত সিদ্দীকী ফুরফুরাবী (রঃ), হযরত শায়খ বোরহানুদ্দীন (রঃ), হযরত সূফী সদরুদ্দীন (রঃ), হযরত আব্দুল খালেক (রঃ), ঢাকা আলীয়া মাদ্রাসার মুফাস্সির হযরত শাইখুল আল্লাম, হযরত মাওলানা ওয়াজিহুল্লাহ্ নানুপুরী (রঃ) ও তাঁর একমাত্র সুযোগ্য ও প্রধান খলীফা পঞ্চদশ শতাব্দীর মুজাদ্দিদ, ইমামুল আইম্মা, মুহিয়্যূস্সুন্নাহ্, কুতুবুল আলম, মুজাদ্দিদুয্যামান, ঢাকা, রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর সাহেব ক্বিবলা মুদ্দাজিল্লুহুল আলী-এর রুহানী ফয়েজ, তাঁর কলমী জিহাদ, লিখনী, ওয়াজ-নসিহত দ্বারা উম্মতে মুহম্মদী আজ যে ফায়দা ও উপকার পাচ্ছে তা-কি রেযাখানীদের দ্বারা পাচ্ছে?

          বর্তমানে একমাত্র রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর সাহেব ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলী  দ্বীনের যে হাক্বীকী দাওয়াত ও তাজদীদের ডাক দিচ্ছেন, তাতে বিদ্য়াতী, দুনিয়াদার আলেম ও সরকার পোষ্য বেতনভোগী মাওলানাদের পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাচ্ছে।  হযরত পীর সাহেব ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলী-এর মাধ্যমে দ্বীনের ডাক আজ বাংলার আনাচে-কানাচে, গ্রামে-গঞ্জে, শহরে এমনকি বহিঃ বিশ্বের বিভিন্ন মহাদেশে বিদ্যুতের ন্যায় ছড়িয়ে যাচ্ছে। এটা তো এমন যেমন মেঘে ঢাকা কুয়াশাচ্ছন্ন আকাশ থেকে একটা দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত  হবার পর আবার সূর্য তার  আলো ছড়িয়ে দেয়ার জন্য পূর্ব আকাশে উদিত হয়েছে। রেযা খান সাহেব ও তার অনুসারীদের মতে তারাও ওহাবী ও কাফিরদের মধ্যে গণ্য। কেননা সে বলেছে, তাঁকে যারা ওহাবী বা কাফির না জানবে তারাও কাফির। (নাউযুবিল্লাহ্)

          এখন প্রশ্ন হচ্ছে- ত্রয়োদশ শতাব্দী হতে বিশেষ করে ১৮৩১ সালে বালা কোটের জিহাদের পর হতে আজ প্রায় পৌঁনে দু’শো বছর হতে চললো। এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে উপমহাদেশে হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী(রঃ)-এর সিলসিলায় যে সমস্ত আলেম, ফাযেল, গাউস, কুতুব-দরবেশ এসেছেন তাঁরা কি সবাই কাফিরের ঘরে জন্মগ্রহণ করেছেন? এবং মক্কা শরীফ, মদীনা শরীফ, মিসর, আফ্রিকাসহ বিশ্বের যে সমস্ত এলাকায় তাঁর সিলসিলাভুক্ত অনুসারীরা ছড়িয়ে আছেন তাঁরাও  কি সবাই কাফির ছিলেন? বিদ্য়াতিদের এ উদ্ভট যুক্তি কোন ঈমানদার মুসলমান স্বীকার করে নিবে কি?

          মায়াজাল্লাহু আসতাগ্ফিরুল্লাহ্! কত বড় ধৃষ্টতা ও দুঃসাহস থাকলে এ ধরণের কথা বলা সম্ভব?

          “ঈমানদার ও কামিল মুসলমানদের কষ্ট দেয়া ও কাফির বলা যে কত জঘণ্য ও অমার্জনীয় অপরাধ এই  রেযা খানীর জামায়াত কি তা ভুলে গেছে? কথিত আলা হযরত সাহেব এই সম্পর্কে কি আল্লাহ্ পাক-এর ধমকীসূলভ ও ভীতিমূলক আয়াত ও হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদীস শরীফ শ্রবণ করেনি?

          এই সম্পর্কে আল্লাহ্ পাক কালামুল্লাহ্ শরীফে এরশাদ করেন,

والذين يؤذون المؤمنين والمؤمنت بغير ما اكتسبوا فقد احتملوا بهتانا و اثما مبينا.

অর্থঃ- “যারা বিনা অপরাধে মু’মিন পুরুষ ও মু’মিন নারীদের কষ্ট দেয়, তারা মিথ্যা অপবাদ ও প্রকাশ্যে পাপের বোঝা বহণ করে।” (সূরা আহযাব/৫৮)

          অন্যত্র আল্লাহ্ পাক বলেন,

ومن يكسب خطيئة او اثما ثم يرم به بريئا فقد احتمل بهتانا و اثما مبينا.

অর্থঃ- “যে ব্যক্তি ভুল বা গুণাহ্ করে অতঃপর কোন নিরপরাধের উপর অপবাদ আরোপ করে, সে নিজের মাথায় বহণ করে জঘন্য মিথ্যা ও প্রকাশ্য গুণাহ্। (সূরা আন নিসা/১১২)

           হাদীস শরীফে আছে,

وعن ابى ذر قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم لايرمى رجل رجلا بالفسوق ولايرميه بالكفر الا ارتدت عليه ان لم يكن صاحبه كذلك.

অর্থঃ- হযরত আবূ যর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “কোন  ব্যক্তি অপর ব্যক্তিকে ফাসিক বলবে না এবং কুফরীর অপবাদও দিবে না। কেননা সেই ব্যক্তি প্রকৃত পক্ষে সেরূপ না হলে তবে তার অপবাদ নিজের উপরই বর্তাবে।” (বুখারী)

          অন্য হাদীস শরীফে আছে,

وعن ابى ذر قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم من دعا رجلا بالكفر او قال عدو الله وليس كذلك الا حار عليه.

অর্থঃ- হযরত আবূ যার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি কাউকে কাফির বলে ডাকে অথবা আল্লাহ্ পাক-এর দুশমন বলে অথচ যাকে বলা হয়েছে সে তা নয় তখন উক্ত বাক্যটি তার নিজের উপরই প্রত্যাবর্তন করবে।” (বুখারী, মুসলিম)

          ফিক্বাহ্র বিখ্যাত কিতাব “বাহরুর রায়েকে” উল্লেখ আছে, “যে ব্যক্তি কোন আলেম কিংবা ফক্বীহ্কে বিনা কারণে গালি দেয় তার উপর কুফরের আশংকা করা হবে।”

          “মাজমাউল আনহারে” কিতাবে লিখিত আছে, “যে ব্যক্তি কোন আলেমকে ইন্কার করে তার কাফির হওয়ার ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই।”

          এখন উপরোল্লিখিত আয়াত শরীফ ও হাদীস শরীফ দ্বারা এবং ফিক্বাহ্র বিশুদ্ধ কিতাব দ্বারা বুঝা গেল বিনা কারণে কোন মুসলমানকে কাফির বললে তা নিজের উপর বর্তায়। রেযা খানীগণ কি এই শক্ত মজবুত দলীল থেকে ছল-চাতুরী করে পালিয়ে যেতে পারবে? সম্ভবতঃ রেযা খান সাহেব অন্য মনস্ক হয়ে বহু সময় ব্যয় করে অযথা কিতাবের সংখ্যা বৃদ্ধি করেছে। মুসলমান হক্কানী-রব্বানী আলেম সমাজকে কাফির ফতওয়া দেয়া তার স্বভাবে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। আশেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দাবীদার আলা হযরত সাহেব হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মকবুল উম্মতদের উপর কুফরীর ফতওয়া দিয়ে নিজে কামিল ঈমানদার সাজতে চাচ্ছে? এই রেযা খান সাহেব ভুলে গেছে  যে, অপরের জন্য গর্ত খুড়লে সে গর্তে নিজেকেই পড়তে হয়।

          হযরত শহীদে আযম (রঃ)-এর উপর কুফরী ফতওয়া দিয়ে সে যে অমার্জনীয় অপরাধ ও ত্রুটি করেছে তা কস্মিনকালেও ক্ষমার যোগ্য নয়।  সে ও তার অনুসারীদের দ্বারা লিখিত কিতাবাদি থেকেও আলেমগণ র্শিক ও কুফরীমূলক বাক্য উদ্ঘাটন করেছে, তা-কি তারা একেবারে ভুলতে বসেছে?

          তাদের লিখিত কিতাবাদি যেমন, হাদায়েকে বখশীস, নুগমাতুর রূহ, মাল ফুজাতে আলা হযরত, হাফতে আকতাব, আল জুন্নাতু লি আহ্লিস সুন্নাহ্, হায়াতে আহম্মদ রেযা খান, ফতওয়ায়ে রিজভীয়া, ফাওয়াদে ফরীদিয়া, জামেউল ফতওয়া, আনোয়ারে শরীয়ত, মাদায়েহ আলা হযরত, তাযকেরায়ে গাউসিয়া, ইরফানে শরীয়ত, মাকাবীসুল মাজালিশ, আনোয়ারে সাতেয়া, ওসায়া ইত্যাদি কিতাবগুলো পড়ে তাদের যে ঈমান আক্বীদার চিত্র পরিস্কার ভাবে ধরা পড়ে তা হচ্ছে- রেযা খানের তাযীম করা হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর তাযীম করার মত। (নাউযুবিল্লাহ্)

          তার পীর ভাইয়ের কবরের খুশবু হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর রওজা শরীফের খুশবুর সমান।(নাউযুবিল্লাহ্)

          হাশরের ময়দানে রেযা খান আল্লাহ্ পাক-এর আরশের একমাত্র ছায়া এবং হাউজে কাওসারের অধিকারী। কবরে মুনকির-নকির এসে যখন জিজ্ঞাসা করবে তুমি কার হও? (অর্থাৎ তোমার রব ও রাসূল কে?) তখন আদবের সাথে মাথা নত করে আহমদ রেযা খানের নাম নিবে। আল্লাহ্ পাককে হাজির-নাজির মানা বেদ্বীনি, বদ্দ্বীনি। সকল জায়গায় তার উপস্থিতি বেদ্বীনি, হযরত আম্বিয়া-ই-কিরাম (আঃ) হাজির-নাজির, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ্ পাক-এর জাতের নূর থেকে তৈরী, তিনি যেমার সময় হাজির হয়ে থাকেন। (নাউযুবিল্লাহ্)

          “নূগমাতুর রূহ” কিতাবে তার এক সাগরিদ বলেছে যে, “তোমার আমার সকলের খোদা আহম্মদ রেযা খান।” (নাউযুবিল্লাহ্) হযরত জিব্রাঈল (আঃ) সমস্ত ফেরেশ্তাদের পীর, খোদা নবীর মনসা। হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পর যদি কেউ নবী হতো তবে কাজী মুহম্মদ আকীল নবী হতো।” (নাউযুবিল্লাহ্)

          মুত্যুর কিছু সময় আগে আহম্মদ রেযা খান সাহেব বলেছে, “আমার মাযহাব, দ্বীনকে শক্ত ও মজবুতভাবে ধরে রাখা সকল ফরজের চেয়ে অধিক ফরজ।” নিজের ফাতেহা সম্পর্কে আহমদ রেযা খান সাহেব বলেন, “আমার মৃত্যুর পর সপ্তাহে দু’তিনবার নিম্নে বর্ণিত বস্তুসমূহ আমার কবরের নিকট ফাতেহার জন্য প্রেরণ করবে- গৃহ নির্মিত আইসক্রীম, মোরগের বিরিয়ানী, মোরগের পোলাও, শামী কাবাব, পরোটা, মাহাত, ফির্নি, ডাল-গোশ্তের খিচুরী, ফলের রস, ডালিমের রস, সোডার বোতল ইত্যাদি ইত্যাদি।” আহম্মদ রেযা সাহেবের অনুসারীরা তার উপর দরুদ শরীফ পড়া ওয়াজিব ধরে নিয়েছে, তাকে কেউ নবী, কেউ খোদার আসনে বসিয়েছে। তাদের মতে, মক্কা শরীফ ও মদীনা শরীফের আলেমগণ কাফির।

          মুরীদের মৃত্যুর পর পীরেরা কবরে এসে তাদের সুওয়াল-জাওয়াবের উত্তর দিয়ে থাকে; কিন্তু ভন্ড পীরগণও কি এ ক্ষমতা রাখে? তাদের ধারণা তারা ব্যতীত আর সকলেই কাফির।

          বলার অপক্ষো রাখেনা যে, এগুলো শিয়া আক্বীদার ন্যায়। কেননা, শিয়ারা হযরত আলী (রাঃ)-এর প্রতি মুহব্বত দেখাতে গিয়ে প্রথম দু’খলীফাকে গাল-মন্দ করে থাকে। তাদের ধারণা হযরত আলী (রাঃ)-এর মর্যাদা নবী-রাসূল(আঃ)গণেরও উর্ধ্বে ইত্যাদি ইত্যাদি। (নাউযুবিল্লাহ্) আর এই সমস্ত বিভ্রান্তি ও আপত্তিকর কথা-বার্তা তো ঐ সমস্ত ব্যক্তিরাই বলে, যারা জ্ঞানশুণ্য হয়ে কলম চালায়। ফলে বাধ্য হয়ে রেযা খানীদেরকে আলেমগণ শিয়া, রাফেজী, কাদিয়ানী, গোমরাহ্ ফিরকা বলে সাব্যস্ত করে থাকে।

          আমীরে মুজাহিদে আযম (রঃ)-এর প্রতি রেযা খান সাহেব একবার কুফরীর ফতওয়া দেয়ায় আজ শত সহস্র কুফরীর ফতওয়া তার ও তার অনুসারীদের উপর ঝুলছে। মূলতঃ আল্লাহ্ পাক-এর রাস্তায় যাদের পায়ে একটি কাটাও ফুটেনি, জিহাদের ময়দানে যারা হাজিরাই দেয়নি, ইসলামের সত্যিকার খিদমত করতে গিয়ে যাদের শরীর থেকে এক ফোটা ঘাম ও রক্ত ঝরেনি তাদের পক্ষেই হযরত সাইয়্যিদ আহমদ বেরেলভী (রঃ)কে কাফির বলা সম্ভব।

          এবার আমরা আহ্লে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের আকাবিরে দ্বীন, হক্বানী-রব্বানী আলেমদের দ্বারা লিখিত নির্ভরযোগ্য ও মশহুর কিতাব দ্বারা ত্রয়োদশ শতাব্দীর মুজাদ্দিদ হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরলভী (রঃ)-এর সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরবো যাতে মানুষ তাঁর সত্যিকার হাক্বীক্বী পরিচয় পায় এবং বিদ্য়াতী, গোমরাহ্, অসৎ লোকদের সংসর্গ থেকে দূরে থেকে ঈমান হিফাজত করতে পারে।

          হযরত সাইয়্যিদ আহ্মদ শহীদ বেরেলভী (রঃ)-এর জন্ম মোবারক

সাইয়্যিদুল আওলিয়া, দলিলুল আরেফিন, মাখজানে মারিফাত, রুহুল হাক্কে, সিরাজুল উম্মত, আসাদুল্লাহ্, সাহিবুল আসরার, সাইয়্যিদুল আবেদীন, মুহিয়্যূস্সুন্নাহ্, দাফিউল বিদ্য়াত, মুজাদ্দিদে মিল্লাত, খলিফাতুল্লাহ্ ফিল আরদ, আমিরুল মু’মিনীন, আওলাদে রাসূল, হযরত সাইয়্যিদ আহ্মদ শহীদ বেরলভী (রঃ) ১২০১ হিজরী শতকের সফর মাসে ইংরেজী ১৭৮৬ সালের ২৯ নভেম্বর সোমবার ভারতের উত্তর প্রদেশের রায় বেরেলী শহরের বিখ্যাত সম্ভ্রান্ত সাইয়্যিদ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

নসবনামা

তাঁর নসব নামা সম্পর্কে “মাখজানে আহম্মদী” কিতাবের ৭১২ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে এভাবে … সাইয়্যিদ আহমদ বিন সাইয়্যিদ মুহম্মদ ইরফান বিন সাইয়্যিদ মুহম্মদ নূর বিন সাইয়্যিদ হুদা বিন সাইয়্যিদ বিন সাইয়্যিদ মুহম্মদ ইলমুল্লাহ্ বিন সাইয়্যিদ মুহম্মদ ফুযাইল বিন সাইয়্যিদ মুহম্মদ মুয়াজ্জিম বিন সাইয়্যিদ আহম্মদ বিন কাজী সাইয়্যিদ মুহম্মদ বিন সাইয়্যিদ আলাউদ্দিন বিন সাইয়্যিদ কুতুবুদ্দীন মুহম্মদ সানী বিন সাইয়্যিদ মুহম্মদ সানী ছদরুদ্দীন বিন সাইয়্যিদ যইনুদ্দীন বিন সাইয়্যিদ আহম্মদ বিন সাইয়্যিদ আলী বিন সাইয়্যিদ  কিয়ামুদ্দীন বিন সাইয়্যিদ সদরুদ্দীন বিন সাইয়্যিদ কাজী রুকুনুদ্দীন বিন সাইয়্যিদ আমীর নিযামুদ্দীন আমীর সাইয়্যিদ কুতুবুদ্দীন মুহম্মদ আল হাসানী  ওয়াল হুসাইনী আল মাদানী আল কাড়দী বিন সাইয়্যিদ রশীদুদ্দীন আহমদ মাদানী বিন সাইয়্যিদ ইউসুফ বিন সাইয়্যিদ ঈসা বিন সাইয়্যিদ হাসান বিন সাইয়্যিদ আবুল হাসান আলী বিন আবি জাফর মুহম্মদ বিন কাশিম বিন আবি মুহম্মদ আব্দুল্লাহ্ বিন সাইয়্যিদ হাসান আওরাজুল জাওয়াদ নাকিব কুফা বিন সাইয়্যিদ মুহম্মদ সানি বিন আবি মুহম্মদ সাহিবুন নাফসে যাকিয়া বিন আব্দুল্লাহ্ মাহদ বিন হাসান মুসান্না বিন ইমাম হাসান বিন  আমিরুল মু’মিনীন সাইয়্যিদিনা হযরত আলী (রাঃ)।

          হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ)-এর পিতার নাম সাইয়্যিদ মুহম্মদ ইরফান (রঃ) এবং দাদার নাম সাইয়্যিদ মুহম্মদ নূর (রঃ)। তাঁর চতুর্থ পূর্ব পুরুষ সাইয়্যিদ মুহম্মদ ইলমুল্লাহ্ (রঃ), হযরত মুজাদ্দিদে আল্ফে সানী (রঃ)-এর প্রধান খলীফা হযরত শায়খ আদম বিননূরী (রঃ)-এর আকাবিরে খলিফাদের মধ্যে গণ্য।

মাতৃগর্ভেই বিলায়েতের পূর্বাভাস

তাজকেরা নামক কিতাবে বর্ণিত আছে, হযরত সাইয়্যিদ শহীদ আহমদ (রঃ) মাতৃগর্ভে থাকাকালীন সময় একদিন তার পবিত্র মাতা সাহেবানী (রঃ) স্বপ্ন দেখেন, তার রক্ত দ্বারা এক খন্ড কাগজে কিছু লিখা হলো এবং পরক্ষণেই উক্ত কাগজখন্ড সারা পৃথিবীতে উড়তে লাগলো।” তিনি জাগ্রত হয়ে এ স্বপে¦র ব্যাখ্যা তাঁর জামাতা সাইয়্যিদ আব্দুস সুবহান (রঃ)-এর নিকট জিজ্ঞাসা করেন, তিনি বলেন- আপনার গর্ভস্থ সন্তানটি ভূমিষ্ট হয়ে কালক্রমে সারা পৃথিবীতে প্রসিদ্ধি লাভ করবেন এবং উচ্চ মর্যাদার অধিকারী হবেন। মূলতঃ এ ধরণের বহু ঘটনা আউলিয়া-ই-কিরাম (রঃ)-এর জীবনীতে উল্লেখ আছে যে তাঁরা মাতৃগর্ভ থেকেই বিলায়েতের সুধা পান করে থাকেন।

          “সাওয়ানেহ আহমদী, মাখজানে আহ্মদী, সীরতে সাইয়্যিদে আহ্মদ শহীদ, তারিখে মাশায়েখে চিশ্ত, যব ঈমান কি বাহার আই” গ্রন্থে লিখা আছে, চার বৎসর বয়সে তাঁকে মক্তবে পাঠানো হয়। মক্তবের পাঠ শেষ করার পর পরিণত বয়সে তিনি হযরত শাহ ইসহাক দেহলভী (রঃ)-এর নিকট তা’লিম নিয়ে কাফিয়া ও মেশকাত শরীফ পর্যন্ত পড়েছিলেন। এ সম্পর্কে ‘আমিরুর রেওয়াত’ গ্রন্থে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, হযরত নূর মুহম্মদ মিয়াজী ঝানঝানবী (রঃ) বলেন, আমি শাহ ইসহাক (রঃ) এর নিকট কাফিয়া পড়তে ছিলাম। আর হযরত সাইয়্যিদ সাহেব (রঃ) যখন তাশরীফ আনেন তখন তিনি তাঁর নিকট মিজান পড়া আরম্ভ করেন। তার পড়া-লিখা এত দ্রুত উন্নতি লাভ করলো যে, তিনি মিযানের অর্ধাংশ পড়ার পূর্বেই আমার সাথে কাফিয়ার মধ্যে যোগ দিলেন। আর কাফিয়া পড়া অবস্থায় তিনি শাহ সাহেবের নিকট মেশকাত শরীফ পড়া শুরু করেন।

বাল্যকাল

যে বয়সে বালকগণ খেলাধুলা, আমোদ-আহলাদে মত্ত থাকে তিনি সে বয়স থেকে নির্জনতা অবলম্বন এবং কাফির মুশরিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করার চিন্তা-ভাবনা করতেন। তাঁর শৈশব কাল সম্পর্কে “সাওয়ানেহ্ আহম্মদী” কিতাবে তিনি নিজেই বলেন, বাল্যকাল হতেই আমার মনে এই ধারণা বা ভাব উদয় হতো যে, একদিন আমি কাফিরদের বিরুদ্ধে জিহাদ করবো। তাই শৈশবেই দেখা যায় তিনি তার সঙ্গী-সাথীদের দুই দলে বিভক্ত করে দু’টি পরস্পর সৈন্যবাহিনী দাঁড় করিয়ে দিতেন। একটি দলের আমির হয়ে তিনি তার নাম দিতেন “মুজাহীদে ইসলাম” অন্য দলটির নাম দেওয়া হতো “কাফির বাহিনী।”   এইভাবে দু’টি দলের মধ্যে যুদ্ধ লেগে যেত। যুদ্ধে যখন “মুজাহিদে ইসলাম” বাহিনী জয় লাভ করতো তখন তিনি ও তার সঙ্গীগণ খুব জোরে শোরে তাকবীর ধ্বনি দিতেন। আর এটা হবে না-ই বা কেন? তিনি যে আসাদুল্লাহিল গালিব হযরত সাইয়্যিদানা আলী (রাঃ)-এর আওলাদদের অন্তর্ভূক্ত। হযরত আলী (রাঃ) জিহাদের ময়দানে কাফিরদের বিরুদ্ধে সিংহের মত গর্জে উঠতেন। জিহাদের ময়দানে তার ডান পার্শ্বে  সাহায্যকারী হিসেবে থাকতেন হযরত জিব্রাইল (আঃ) আর বাম পার্শ্বে থাকতেন হযরত মিকাইল (আঃ)। হযরত আলী (রাঃ) এর পবিত্র রক্তধারা যে তাঁর জিসম মোবারকে মিশে আছে। কাফির-মুশরিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা যে তার বংশগত ঐতিহ্য। এই জন্যই দেখা যায়, তাঁর জীবনের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত তিনি কাফির-মুশরিকদের বিরুদ্ধে বহু জিহাদ করেছেন। ভারতবর্ষ থেকে কাফিরদের অস্তিত্ব তুলে দেয়ার জন্য তিনি আকোড়ার যুদ্ধ, শিধূর যুদ্ধ, উতমান জাইর যুদ্ধ, পানজ্তার যুদ্ধ, ফুলড়ার যুদ্ধ, মর্দান যুদ্ধ, মায়ার যুদ্ধসহ আরো অনেক যুদ্ধ ক্ষেত্রে তিনি কাফিরদের মোকাবিলায় তরবারী পরিচালনা করেছিলেন। অবশেষে ১৮৩১ সালে বালাকোটে শিখ,  খৃষ্টান ও মুনাফিক সীমান্ত সরদারদের বিরুদ্ধে জিহাদ করতে গিয়ে শাহাদত বরণ করেছেন।

          দিল্লী সফর, বাইয়াত ও খিলাফত লাভ

 “মাখজানে আহম্মদী ১৮ পৃষ্ঠায়, সাওয়ানেহ আহম্মদী, সীরাতে সাইয়্যিদ আহম্মদ শহীদ” করাচী ছাপা ৯০ পৃষ্ঠায় লিখা আছে, হযরত সাইয়্যিদ আহম্মদ শহীদ (রঃ) রায় বেরেলী থেকে দিল্লী এলেন সিরাজুল হিন্দ, ইমামুল মুহাদ্দিস হযরত শাহ আব্দুল আজীজ মুহাদ্দিস দেহলভী (রঃ)-এর সাক্ষাত ও সোহবত লাভের জন্য। প্রথমেই তিনি তাঁকে সুন্নাত ত্বরীকা মুতাবিক সালাম পেশ করলেন এবং তার সাথে মুসাফা করলেন। হযরত শাহ সাহেব (রঃ) তাঁর সালাম দেয়ার সুন্নাত তরীকা ও আদব কায়দা দেখে জিজ্ঞেস করলেন, কি কারণে এলেন? জবাবে তিনি বললেন আল্লাহ পাক-এর মুহব্বত-মারিফত হাসিলের জন্য। শাহ সাহেব (রঃ) এরপর জিজ্ঞেস করলেন, কোন বংশের? তিনি বললেন, সাইয়্যিদ বংশের। তখন হযরত শাহ আব্দুল আযীয (রঃ) খুশী হয়ে বললেন, এটা তো আপনারই বংশগত মিরাসী হক। আল্লাহ্ পাক-এর ফযল-করম আপনিও তা অর্জন করতে পারবেন। এরপর তিনি তাঁকে চার তরীকায় বাইয়াত করালেন এবং হযরত শাহ্ সাহেব(রঃ)-এর নেক সোহবতের কারণে তিনি অতি অল্প সময়ের মধ্যে সুলুকের রাস্তা অতিক্রম করে মনজিলে মাকসুদে পৌঁছে গেলেন। হযরত শাহ সাহেব (রঃ) স্বল্প সময়ে আপন মুরীদের এহেন তরক্কী ও উন্নতী দেখে অত্যন্ত খুশী হলেন এবং তার গোটা খান্দানের নামজাদা আলেমদেরকে তার কাছ থেকে ফয়েজ হাসিল ও তা’লিম নেয়ার জন্য বিশেষ তাগিদ দিলেন। অতঃপর তাঁকে খিলাফতের খিরকা পরিধানে ভূষিত করে বিদায় দিলেন।

          হযরত শাহ আব্দুল আজীজ মুহাদ্দিস দেহলভী (রঃ)-এর স্বপ্ন

আল্লামা রুহুল আমীন বশীর হাটি (রঃ) তাঁর “কারামতে আহমদী” পৃঃ ২৭ হযরতুল আল্লামা জাফর থানেশ্বরী (রঃ) প্রণীত “তাওয়ারীখে আজীবা” ১১ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে, “হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ) দিল্লী পৌঁছার সাত দিন আগে হযরত শাহ আব্দুল আজীজ (রঃ) হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে স্বপ¦ দেখেন যে, তিনি দিল্লীর জামে মসজিদে তাশরীফ এনেছেন। চারদিক থেকে লোক তাঁর যিয়ারতের জন্য আসছে। তখন হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি লাঠি হযরত শাহ্ সাহেব (রঃ)কে দিয়ে বললেন, তুমি এটি নিয়ে মসজিদের দরজায় বস আর যে আমার সাক্ষাতের জন্য আসে তার পরিচয় আমাকে জানাও। আমি যাকে অনুমতি দিব তাকে তুমি আমার সাক্ষাতে নিয়ে আসবে আর যাকে নিষেধ করবো তাকে আনবেনা। অতঃপর তিনি লাঠি খানা নিয়ে মসজিদের দরজায় দাঁড়ালেন এবং হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদেশ মত কাজ করলেন। হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অনুমতি সাপেক্ষে বহু লোক এই ভাবে তাঁর জিয়ারত লাভে ধন্য হলো। সকাল বেলা হযরত শাহ সাহেব (রঃ) এই স্বপে¦র ব্যাখ্যার জন্য সেই জামানার বিখ্যাত বুযুর্গ হযরত শাহ গোলাম আলী দেহলভী (রঃ)-এর নিকট জানতে গেলেন। তিনি বললেন, এর ব্যাখ্যা হলো- হযরত সাইয়্যিদ হাসান (রঃ) যিনি মুরীদানদেরকে রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যিয়ারত করিয়ে দিতেন। আজ দেড়শত বৎসর হতে তা বন্ধ। তখন হতে হিদায়েতের জন্য হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর তাওয়াজ্জোহ রহিত হয়ে গিয়েছে। আমার মনে হচ্ছে, আপনার কোন উপযুক্ত মুরীদ দ্বারা তা আবার চালু বা প্রসারিত হবে। হযরত শাহ্ সাহেব (রঃ)-এর এই স্বপ¦  দেখার সাত দিন পর রঈসুল আউলিয়া হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ (রঃ) দিল্লী পৌঁছে তার নিকট বাইয়াত হন।

তরীকা মশক করা ও নিছবত হাসিল

হযরত শাহ সাহেব (রঃ)-এর নিকট বাইয়াত হয়েই তিনি কঠিন রিয়াজত ও মুশাক্কাতে কোমর বেঁধে নিলেন।  এ সম্পর্কে           “ওয়াসীলে ওয়াজীর আলা তরীকুল বাশীর ওয়ান নাজির” এবং “সাওয়ানেহ আহম্মদী” কিতাবের ৫৮ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে, এই সময় হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ (রঃ) কঠিন রিয়াজত ও মুশাক্কাতের মধ্যে দিন কাটাচ্ছিলেন। বছরের পর বছর এক ওজুতে এশা ও ফজর নামাজ আদায় করতেন অর্থাৎ সারা রাত বিনিদ্র অবস্থায় ইবাদত-বন্দেগী করতেন। এমনকি রাতের নামাজে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে তাঁর পা মোবারক ফুলে  যেতো।

          তাঁর ত্বরীকার নিসবত হাছিল সম্পর্কে আল্লামা রুহুল আমীন (রঃ) এর একখানা ‘বিজ্ঞাপন রদ’ কিতাবের ২৫ পৃষ্ঠায় ও হযরত কারামত আলী জৈনপুরী (রঃ) এর “যাদুত তাকওয়া” কিতাবে উল্লেখ করেছেন, হযরত আব্দুল আজীজ মুহাদ্দিস দেহলভী (রঃ)-এর ফয়েজের বরকতে হযরত গাউসে সাকালাইন হযরত বড় পীর সাহেব (রঃ) ও হযরত বাহাউদ্দীন নকশবন্দী বোখারী (রঃ) এই দুই বুযুর্গের রূহ মোবারক বাতেনী ভাবে তার তর্বিয়তের জন্য প্রকাশিত হলেন এবং একমাস পর্যন্ত এই দুইজন তরীকার ইমাম তাঁকে সম্পূর্ণ ভাবে নিজেদের তরীকার দিকে নিসবত দিলেন। এক দিন উভয় রূহ মোবারক তাঁর নিকট প্রকাশিত হয়ে এক প্রহর পর্যন্ত তাঁর নফসের উপর সজোরে তাওয়াজ্জুহ্ দিলেন। এতে দুই খান্দানের নিসবত তিনি পেলেন। চিশ্তীয়া তরীকার নিসবত হাসিল সম্পর্কে উক্ত কিতাবের ২৬ পৃষ্ঠায় বর্ণিত আছে, একবার তিনি খাজা কুতুবুদ্দীন বখতিয়ার কাকী (রঃ) এর মাযার মোবারকে মোরাকাবায় বসলেন এবং মোরাকাবা হালতে তিনি তাঁর নিকট থেকে চিশতীয়া খান্দানের নিয়ামত লাভ করেন। এই ভাবে মোজাদ্দেদীয়া, শাজালিয়া তরীকার নিসবতও তার হাসিল হয়।

          কামালতে নুবুওওয়াতের মাকাম হাসিল

“সিরাতুল মুস্তাকিম” ১৪৯-১৫২ পৃষ্ঠা, “তাওয়ারিখে আজিবা” ১০/১১ পৃষ্ঠায়, “কারামতে আহম্মদী” ২৩ পৃষ্ঠা হতে জানা যায়, আফজালুল আওলিয়া, হযরত সাইয়্যিদ আহম্মদ শহীদ বেরেলভী (রঃ) কামালতে নুবুওওয়াত তবকার ওলী ছিলেন। রাসূল পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও হযরত আলী (রাঃ) তাঁকে স্বপে¦ সাক্ষাত দিলেন। তিনি স্বপ্নে দেখেন যে, রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনটি খোরমা নিজের হাতে নিয়ে তাঁর মুখে দিচ্ছেন। জাগ্রত হওয়ার পর উক্ত স্বপ¦ তিনি নিজের মধ্যে স্থায়ী পেলেন।

          এরপর একদা আরো তিনি স্বপে¦ দেখেন- হযরত আলী (রাঃ) ও হযরত ফাতিমা (রাঃ) স্বপে¦ তাঁকে গোসল করিয়ে নিজের সন্তানের মত মূল্যবান নতুন কাপড় পরিধান করালেন। এই স্বপে¦র ঘটনার পর হতে কামালতে নুবুওওয়াতের নিসবত তার মধ্যে সম্পূর্ণ ভাবে বিকশিত হতে লাগলো।

মুজাহীদে মিল্লাত, খলীফাতুল্লাহ্, হযরত আমিরুল মু’মিনীন (রঃ) ইল্মে লাদুন্নী প্রাপ্ত আল্লাহ্ পাক-এর  খাছ ওলী ছিলেন

          যে সমস্ত আওলিয়া-ই-কিরাম (রঃ) আল্লাহ্ পাক-এর তরফ হতে খাস ভাবে ইলমে লাদুন্নী প্রাপ্ত হয়েছেন তিনিও তাদের মধ্যে একজন। তাঁর ইল্মে লাদুন্নীর শক্তি ও ক্ষমতা এত বেশী ছিল যে, এ সম্পর্কে “তাওয়ারিখে আজীবা” কিতাবের ৪০-৪১ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে, তিনি জাগ্রত অবস্থায়ই হযরত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাক্ষাত লাভ করতে পারতেন এবং কাশ্ফের শক্তি বলে হযরত ইমাম আ’যম আবু হানীফা (রঃ)-এর সাথে সাক্ষাত করতেন। এতে শরীয়তের জটিল মাসয়ালা অবগত হওয়া তাঁর নিকট সহজ ছিল। (সুবহানাল্লাহ্)

          উক্ত কিতাবের ৩৬ পৃষ্ঠায় আরো বর্ণিত আছে, তিনি যখন সিরাজুল উম্মত হযরত মাওলানা শাহ্ আব্দুল আজীজ মুহাদ্দীস দেহলভী (রঃ)-এর নিকট জাহেরী ইল্ম-এর তালীম নিচ্ছিলেন, একদিন দেখতে পেলেন কিতাবের কালো অক্ষর তাঁর নিকট থেকে উধাও হয়ে যাচ্ছে। তিনি সাদা পৃষ্ঠা ব্যতীত আর কিছুই দেখতে পাচ্ছেন না। এই অবস্থা তিনি পীর সাহেবকে জানালেন। তিনি বললেন, শুধুমাত্র কিতাব পড়ার বেলায়ই কি এরূপ হয়ে থাকে? জবাবে আমিরুল মু’মিনীন(রঃ) বললেন হ্যাঁ, শুধু কিতাব পড়ার সময়ই এরূপ হয়ে থাকে। এটা শুনে পীর সাহেব তাঁকে বললেন, আপনি কিতাব রেখে দিন। আল্লাহ্ পাক আপনাকে অন্য কাজের জন্য পয়দা করেছেন। বিনা মধ্যস্থতায় আপনি আল্লাহ্ পাক হতে ইল্ম ও হিকমত লাভ করবেন।

          “কারামতে আহম্মদী” কিতাবে আরো উল্লেখ আছে যে, হযরত শাহ্ আব্দুল আজিজ মুহাদ্দেস দেহলভী (রঃ) তাঁর মুরীদানদেরকে বলতেন, এখন হতে যা কিছু হবে হযরত সাইয়্যিদ সাহেব (রঃ)-এর মাধ্যমে হবে। লোকেরা তাঁর নিকট মুরীদ হতে এলে তিনি তাঁর নিকট পাঠিয়ে দিতেন।

          এক বর্ণনায় রয়েছে, হযরত শাহ্ সাহেব (রঃ) বলেন, আমার নিকট ১৫ বছরে যা হাছিল হবে হযরত সাইয়্যিদ সাহেবের নিকট ১৫ দিনে তা হাছিল হবে। (সুবহানাল্লাহ্) “সাওয়ানেহ আহম্মদী” কিতাবে বর্ণিত আছে, হযরত শাহ্ সাহেব (রঃ) বললেন, আমার নিকট বার বৎসরে যা না হবে রঈসুল আওলিয়া, হযরত সাইয়্যিদ সাহেব(রঃ)-এর নিকট বার দিনে তা হবে।  (সুবহানাল্লাহ্)

          এমনকি হযরত শাহ্ আব্দুল আজীজ মুহাদ্দিস দেহলভী (রঃ) জগত বিখ্যাত আলেম মুফতি, মুফাস্সির, মুহাদ্দিস ও রঈসুল আউলিয়া হওয়া সত্ত্বেও নিজের মুরীদ ও খলিফা হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ)-এর নিকট বাইয়াত হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। একথা একখানা “বিজ্ঞাপন রদ” কিতাবের ৮৪ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে।

          একবার পরীক্ষা করার জন্য তিনজন আলেম তাঁকে নির্জনে সূরা ফাতিহার তাফসীর জিজ্ঞাসা করলেন। তিনি সূরা ফাতিহার তাফসীর এমন সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করলেন যে, উক্ত আলেম তিনজন আশ্চর্য হয়ে গেলেন এবং শেষ পর্যন্ত তাঁর নিকট ক্ষমা চেয়ে মুরীদ হয়ে গেলেন। “তাওয়ারিখে আজিবার” ৩৮ পৃষ্ঠায় একথা উল্লেখ আছে।

          “সাওয়ানেহ আহ্মদী, সীরাতে সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ ১ম খন্ড, “তাওয়ারীখে আযীবা” কিতাবের ৯-১০ পৃষ্ঠায় বর্ণিত আছে, “পবিত্র রমজান মাসের ২১ রাত্রিতে সাইয়্যিদুল আবেদীন, হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ (রঃ) হযরত মাওলানা শাহ্ আব্দুল আজীজ মুহাদ্দিস দেহলভী (রঃ)-এর নিকট উপস্থিত হয়ে বললেন, হুজুর! এই ১০ রাত্রির কোন রাত্রিতে শবে ক্বদর পাওয়ার চেষ্টা করবো? হযরত শাহ্ সাহেব (রঃ) হেসে বললেন, হে প্রাণাধিক পুত্র! যেরূপ আপনি সর্বদা রাত্রি জাগরণ করে থাকেন এই রাত সমূহেও সেরূপ নিয়মিত জাগরণ করতে থাকুন। ২৭ রাত্রিতে হযরত আমীরুল মু’মিনীন (রঃ) রাত্রি জাগরণের ইচ্ছা করলেন, কিন্তু সেই রাত্রে এশার নামাজের পর তাঁর নিদ্রা এত প্রবল হলো যে, দু’চার রাকায়াত নফল নামাজ ছাড়া আর কিছুই আদায় করতে পারলেননা। রাত্রির শেষ তৃতীয়াংশ বাকি থাকতে দু’জন লোক এসে তাঁর হাত ধরে জাগিয়ে দিলেন। তিনি স্বপে¦ দেখলেন যে, তার ডান দিকে রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও বাম দিকে হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) বসে বলছেন, হে আহমদ! তাড়াতাড়ি উঠে গোছল কর। হযরত আমীরুল মু’মিনীন (রঃ) চৈতন্য লাভ করে তাদেরকে দেখে লজ্জিত অবস্থায় হাউজের নিকট গোছল করে নিলেন। যখন তিনি গোছল করছিলেন তখন তিনি হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ)কে সে স্থানে বসে থাকতে দেখেছেন। গোছল করার পর তিনি তাঁদের নিকট উপস্থিত হলেন। হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আজ শবে ক্বদর। তুমি দোয়া, মুনাজাত ও যিকিরে মশগুল হও। (সুবহানাল্লাহ্)

          “কারামতে আহম্মদী” কিতাবে লিখা আছে, একবার তিনি নদীর ধারে ভ্রমণ করছিলেন। একজন পাদরী অগ্রসর হয়ে তাঁকে বললো আমি আপনার নিকট কিছু শুনতে চাই। পাদরী জ্যামিতি বিষয় সম্পর্কে জানতে চাইলো। অথচ তিনি এ বিষয় সম্পর্কে তেমন কিছুই জানতেন না। তখন আল্লাহ্ পাক-এর পক্ষ হতে তিনি এ বিষযে এরূপ তত্ত্ব লাভ করলেন যে, স্বয়ং (জ্যামিতি) বিজ্ঞানী ইউক্লিড যদি জীবিত থাকতো তবে তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করতে বাধ্য হতো। পাদরী তাঁর জ্যামিতিক জ্ঞান দেখে বললো, এই হযরতের নিকট আমাদের জ্যামিতি জ্ঞান একেবারে বাতিল। (সুবহানাল্লাহ্)

মাশায়েখে আকবর, সুলতানুল আরিফীন, খলীফাতুল্লাহ্, হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ)-এর কারামতসমূহ

“তাওয়ারীখে আযীবা” কিতাবের ২০/২১ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে, এক সময় জনাব হযরত আমিরুল মু’মিনীন আপন হুজরায় শয়ন অবস্থায় চিন্তা করতেছিলেন, না জানি এই জামানার কুতুবুল আকতাব (গাওস) কে? তখন তিনি আল্লাহ্ পাক-এর নিকট উক্ত কুতুবুল আকতাবের যিয়ারতের জন্য আরজু করলেন। এই দোয়া করা মাত্র তা কবুল হয়। আল্লাহ্ পাক বাতাসকে হুকুম দিলেন যে, বিছানাসহ হযরত আমীরুল মু’মিনীনকে কুতুবুল আকতাব-এর নিকট পৌঁছে দিতে। তিনি অনেক দেশ, পাহাড় ও বন-জঙ্গল দেখতে দেখতে অল্প সময়ের মধ্যে শাম দেশে (সিরিয়া) উপস্থিত হলেন। তিনি তখন দেখলেন উক্ত কুতুবুল আকতাব একজন সুন্দর যুবক। তাঁর চেহারা অনেক নূরানী, বংশ সাইয়্যিদ, হোসাঈনী। নদীর উপকূলে মুরীদানদের সাথে বসে আছেন। প্রকাশ্যভাবে তিনি আদৌ আমিরুল মু’মিনীনের দিকে দৃষ্টিপাত করলেন না। তখন হযরত সাইয়্যিদ সাহেব (রঃ) তাঁকে বললেন, আল্লাহ্ পাক-এর সন্তুষ্টি লাভ ব্যতীত আপনার সাক্ষাতে আমার অন্য কোন উদ্দেশ্য নেই। কিন্তু তা সত্বেও তিনি তাঁর দিকে লক্ষ্য করলেন না। এতে তাঁর অন্তরে এক প্রকার কষ্ট অনুভূত হলো। কিন্তু আল্লাহ্ পাক-এর বদৌলতে তাঁকে একটি নিয়ামত ও কারামত দান করলেন। যে চল্লিশজন রেজালুল গায়েব কুতুবুল আকতাবের জন্য নিয়োজিত করা হয়, তাঁেদরকে হযরত আমিরুল মু’মিনীন(রঃ)-এর জন্য নিয়োজিত করা হয়। যা হোক এই নতুন পুরস্কারের পরে আল্লাহ্ পাক তাঁকে যেমন শাম দেশে নিয়ে গিয়েছিলেন সেরূপভাবে তাঁকে তাঁর স্থানে পৌঁছে দিলেন। কিছু দিন পরে পুনরায় আল্লাহ্ পাক তাঁকে উক্ত নিয়ামতসহ ঐ কুতুবুল আকতাবের নিকট পৌঁছে দিলেন, এবার আল্লাহ্ পাক কুতুবুল আকতাবকে জানিয়ে দিলেন তারপরে উক্ত মাকাম হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ) প্রাপ্ত হবেন। এজন্য এবার সেই “গাউস” তার সাথে অত্যন্ত ভদ্রতা ও নম্রতার সাথে সাক্ষাত করলেন। এ ঘটনা ঘটবার কয়েক বছর পর যে সময় তিনি খোরাসানে উপস্থিত হয়েছিলেন। (তখন তিনি বলেছিলেন) আমি ইতোপূর্বে এই পাহাড় ও ময়দানগুলোর উপর দিয়ে শাম দেশে গিয়েছি। (সুবহানাল্লাহ্)

          “ওয়াসীলে ওয়াজীর, মাখজানে আহম্মদী ও তাওয়ারিখে আযীবা” কিতাবের ৫৬, ৫৭ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে, শ্রীহট্টে একজন বড় অর্থশালী হিন্দু বাস করতো। এক রাত্রে সে স্বপে¦ দেখলো যে, একটা বড় লম্বা সিঁড়ি আসমান হতে নেমে আসছে। সে ব্যক্তি উক্ত সিঁড়িতে আরোহণ করে আসমানের উপর চলে গেলো। একটি দরজা দিয়ে আসমানে প্রবেশ করে একজন উৎকৃষ্ট পরিচ্ছদধারী খুব সূরতওয়ালা লোককে কুরসির উপর বসা দেখলো। ঐ ব্যক্তি তাঁর নিকট উপস্থিত হয়ে আদবের সাথে সালাম করলো এবং জিজ্ঞাসা করলো, হুজুরের নাম (মোবারক) কি? তাঁর উত্তরে তিনি বললেন, আমি সমস্ত মানুষের পিতা হযরত আদম (আঃ)। তারপর সেই ব্যক্তি তাঁর বাম দিকে দোযখের ভীষণ যন্ত্রণা ও আযাব দেখে জ্ঞান হারা হয়ে পড়লো। এতে হযরত আদম (আঃ) একজন লোকলে বললেন, একে ডান দিকে নিয়ে যাও। তখন ঐ ব্যক্তি সেখানকার জান্নাতের অতুলনীয় সুখ শান্তি দেখে আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে গেল। ঐ ব্যক্তি হযরত আদম (আঃ)কে এই দু’স্থানের কথা জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, জান্নাত ঈমানদারদের স্থান এবং দোযখ পৌত্তলিক, মুশরিক ও রাসূল অমান্যকারীদের স্থান। তুমি মুশরিকদের দলে। যদি মারা যাও এই অবস্থায় দোযখে যাবে। তারপর তিনি বললেন, এই সময় হযরত সাইয়্যিদ আহমদ নামীয় একজন আল্লাহ্ওয়ালা, হাদী কলকাতায় অবস্থান করছে তুমি সত্ত্বর তাঁর নিকট উপস্থিত হয়ে বাইয়াত গ্রহণ করে নিজের স্থান জান্নাতে করে নাও। ঐ ব্যক্তি (এইসব শুনার পর) কলকাতায় গিয়ে হযরত  আমিরুল মু’মিনীনের নিকট এই সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করে তার নিকট মুসলমান হয়ে মুরীদ হয়ে গেল। (সুবহানাল্লাহ্)

          “কারামতে আহম্মদী” কিতাবের ৪৫ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে, তাজুল আউলিয়া, হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ (রঃ) হজ্বে যাওয়ার সময় সমুদ্রের মধ্যে ষ্টিমারে মিষ্টি পানি শেষ হয়ে গিয়েছিল। জাহাজের পরিচালকরা তা সাইয়্যিদ সাহেব (রঃ)কে অবগত করলে তিনি আল্লাহ্ পাক-এর নিকট দোয়া করতে বসে গেলেন। দোয়ার সময় তাঁর নিকট ইল্হাম হলো যে, আল্লাহ্ পাক এই স্থানের সমুদ্রের পানি মিষ্টি করে দিয়েছেন। যে পরিমাণ পানি ইচ্ছা হয় জাহাজে পূর্ণ করে নেয়া যাবে। তখন তিনি জাহাজের পরিচালকগণকে এই সুসংবাদ জানিয়ে দিলেন। তারা সাথে সাথে আবশ্যক মত মিষ্টি পানি সমুদ্র হতে তুলে জাহাজ পূর্ণ করে নিলেন। (সুবহানাল্লাহ্)

          “একখানা বিজ্ঞাপন রদ” কিতাবের ৪৭ পৃষ্ঠায়, “তাওয়ারিখে আযীবা” কিতাবের ৬৬ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে, কলকাতার একজন নামজাদা আলেম আমিরুল মু’মিনের প্রতি অভক্তি প্রকাশ করত। একদিন মৌলভী আশরাফ আলী সাহেব তাকে হযরত সাইয়্যিদ আহমদ বেরেলভী(রঃ)-এর নিকট নিয়ে গেলেন। তিনি সেই সময় আহার করতেছিলেন। উক্ত দু’জনকে দেখে তাদেরও আহার করার জন্য তিনি অনুরোধ জানালেন এবং উক্ত নামজাদা আলেমের হাত ধরে বললেন, আপনি হাত ধুয়ে শরীক হয়ে যান। হাত ধরা মাত্র উক্ত আলেম সাহেব অচৈতন্য হয়ে তওবা করতঃ তাঁর কাছে মুরীদ হয়ে গেলেন। তিনি বলেন, যখন আমিরুল মু’মিনীন হযরত সাইয়্যিদ সাহেব (রঃ) আমার হাত ধরেছিলেন তখনই আল্লাহ্ পাক-এর রহমতের ফয়েজ প্রাপ্তির প্রতিবন্ধক স্বরূপ মানতেক, হিকমাত ইত্যাদি নাপাক ইল্মগুলো আমার অন্তর হতে বিলুপ্ত হয়ে গেলো এবং আল্লাহ্ প্রাপ্তির পথ আমার জন্য সহজ হয়ে গেল।  (সুবহানাল্লাহ্)

          “তাওয়ারীখে আযীবা” কিতাবের ৫০ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে, একবার তিনি “কুএল” নামক স্থানে ছিলেন। এমতাবস্থায় আকবর আলি খাঁ নামক একজন লোক তাঁকে হত্যা করার ইচ্ছায় অস্ত্রসহ সেখানে উপস্থিত হলো। তিনি ইল্হাম কর্তৃক অবগত হয়ে  তার সাথীদেরকে বললেন, এরূপ নামধারী এক ব্যক্তি আমার নিকট আসতেছে তাকে ভিতরে আসতে বাধা দিওনা। একটু পরে সেই অস্ত্রধারী লোকটি তাঁর সম্মুখে এসে বসে গেল এবং বললো, আপনার নিকট আমার কিছু জিজ্ঞাসা করার আছে। সাইয়্যিদুল আউলিয়া, হযরত সাইয়্যিদ সাহেব (রঃ) বললেন, আগ্রহ সহকারে জিজ্ঞাসা কর। ইহা বলা মাত্র তার সর্ব শরীরে কম্পন উপস্থিত হলো। তিনি বললেন, খাঁ সাহেব ভালতো? এতে তার শরীরের কম্পন আরোও বেড়ে গেল। অবশেষে অস্ত্রসস্ত্র খুলে ফেলে হাত লম্বা করে তাঁর নিকট মুরীদ হয়ে গেলো এবং প্রকাশ করলো হুজুর! আমি আপনার প্রাণ হত্যা করতে এসেছিলাম। কিন্তু আপনার সামনে বসলে আমার ইচ্ছার পরিবর্তন হয়ে যায়। (সুবহানাল্লাহ্)

          কিতাবে আরো বর্ণিত আছে, একবার কিছু শিয়া ও বিদ্য়াতী লোক অসৎ উদ্দেশ্য প্রণোদিত হয়ে আমীরুল মু’মিনীন, হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ)-এর নিকট কিছু প্রশ্ন নিয়ে এলো। তাদের ধারণা ছিল যে, তাদের প্রশ্নগুলোর জবাব তিনি দিতে পারবেন না। বলা প্রয়োজন যে, বিদ্য়াতীদের উক্ত প্রশ্নগুলোর জবাব আমিরুল মু’মিনীন, হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ)-এর মুরীদগণই দিতে চাইলেন। কিন্তু বিদ্য়াতীরা তাঁদের একথায় রাজি হলোনা। তাদের ধারণা ছিল পীর সাহেব যেহেতু মাদ্রাসায় লেখাপড়া করেননি তাই তাদের এ প্রশ্নগুলোর জবাব নির্ঘাত তিনি দিতে পারবেননা। এমনকি মুজাহিদে মিল্লাত, আমিরুল মু’মিনীন, হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ)-এর নিজের মুরীদানগণের মধ্য হতেও কেউ কেউ উক্ত সন্দেহের দোলায় দুলছিলেন, তখন হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ) কাশ্ফের মাধ্যমে আপন মুরীদানদের অন্তরের এহেন অবস্থা জেনে নিলেন। তিনি বললেন, ঠিক আছে সরাসরি তাদেরকে আমার কাছে নিয়ে আস। আমিই তাদের এ প্রশ্নের জবাব দিব। তখন উক্ত বিদ্য়াতীরা তাঁর সামনে এসে নতজানু হয়ে তাঁকে কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ, ফিক্বাহ্ ও মানতেক থেকে কিছু প্রশ্ন করলো। মুজাহিদে আজম, হযরত সাইয়্যিদ আহমদ বেরেলভী (রঃ) তাদের প্রশ্নগুলোর জবাব অত্যন্ত সুন্দর ও নিখূঁতভাবে দিলেন যা তারা কল্পনা করতে পারেনি। এতে তারা যার পর নেই বিস্মিত ও অবাক হয়ে সন্তুষ্টচিত্তে চলে গেলো।

          যখন বিদ্য়াতীরা তাদের প্রশ্নের জবাব পেয়ে চলে গেল তখন কিছু মুরীদান তাকে জিজ্ঞাসা করলো, আচ্ছা, হুজুর ক্বিবলা! আমরা আপনাকে দেখলাম আপনি যখন কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ ও ফিক্বাহ্ থেকে তাদের প্রশ্নের জবাব দিলেন তখন আপনার মধ্যে স্বাভাবিক অবস্থা লক্ষ্য করা গেল। কিন্তু আপনি যখন তাদের মানতেকের প্রশ্নগুলোর জবাব দিচ্ছিলেন তখন আপনার শরীর মোবারক থেকে ঘাম ঝরছিলো, এর কারণ কি?

          খলীফাতুল্লাহ্ ফিল্ আরদ, হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ) মুরীদানদের প্রশ্নের জবাবে বললেন, তারা যখন আমাকে কুরআন শরীফ থেকে প্রশ্ন করলো, তখন আমি সরাসরি আল্লাহ্ পাক থেকে এর উত্তর জেনে তাদের জবাব দিয়েছি। যখন তারা হাদীস শরীফ থেকে প্রশ্ন করলো, তখন হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে সাক্ষাত করে তার উত্তর জেনে নিয়ে তাদের উত্তর দিয়েছি। যখন তারা ফিক্বাহ্ সম্পর্কিত প্রশ্ন করলো, তখন আমি হযরত ইমাম আযম আবূ হানিফা (রঃ)-এর সাথে সাক্ষাত ও  যোগাযোগ করে এর জবাব দিয়েছি। আর যখন তারা আমাকে মানতেক সম্পর্কে কিছু মাসয়ালা জিজ্ঞেস করলো, তখন আমি মানতেকের বড় বড় ইমামদের খুঁজতে লাগলাম, তাদেরকে জান্নাতে খুঁজে না পেয়ে অবশেষে জাহান্নামে তাদের পেলাম। আমি জাহান্নামে প্রবেশ করে তাঁদের কাছ থেকে সরাসরি ঐ মাসয়ালার জবাব নিয়ে প্রত্যাবর্তন করি। জাহান্নামে প্রবেশ করার কারণে তার প্রচন্ড আগুণের তাপে আমার শরীর ঘেমে গেছে যা তোমরা দেখতে পাচ্ছো।

          “তাওয়ারিখে আযীবা” কিতাবের ২৪ পৃষ্ঠায়, “কারামতে আহম্মদী” কিতাবের ৫৬ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে, হিন্দুস্থানে যে সময় দুর্ভিক্ষের জন্য মানুষ নিজেদের সন্তানদেরকে বিক্রয় করতে বাধ্য হতো সেই সময় হযরত আমিরুল মু’মিনীন (রঃ)-এর সাথে শতাধিক লোক প্রতিদিন সন্ধায় আহার করতো। তাঁর খাদ্য ভান্ডারের জিম্মাদার মৌলভী মুহম্মদ ইউসুফ সাহেবের প্রতি তিনি হুকুম করেছিলেন, সকল লোকের জন্য একই প্রকার খাদ্য প্রস্তুত হবে আর খাদ্য প্রস্তুত হলে বড় বড় ডেকচিতে রেখে চাদর দিয়ে যেন ঢেকে রাখা হয়। তারপর হযরত আমিরুল মু’মিনীন (রঃ) সেখানে উপস্থিত হয়ে খাদ্যবস্তুকে হাত দ্বারা স্পর্শ করে এই দোয়া পড়তেন, আয় আল্লাহ্ পাক! ইহা বেশী করে দিন এবং এতে বরকত দিন। অবশেষে দশ দশ কিংবা বিশ বিশ জনকে একত্রে বসিয়ে বড় বড় পাত্রে ভক্ষণ করানো হতো। যদিও দুর্ভিক্ষের জন্য খাদ্য অল্প পরিমাণ প্রস্তুত করা হতো অথচ এতে এতো বরকত হতো যে, সমস্ত কাফেলার লোক তা ভক্ষণ করে তৃপ্তি লাভ করতো এমনকি কখনো কখনো কিছু খাদ্য বেশী হয়ে যেতো।

          “তাওয়ারিখে আযীবা” কিতাবের ৫৩ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে, সাহিবুল আসরার, রঈসুল আওলিয়া, হযরত সাইয়্যিদ সাহেব (রঃ) আপন বোনকে একটা টাকা বরকতের জন্য দিয়েছিলেন। তিনি উক্ত টাকাটি একটা সিন্ধুকে রেখে দিয়েছিলেন। তার যত টাকার দরকার হতো তিনি উক্ত সিন্দুক হতে বের করে ব্যয় করতেন কখনও তাঁর টাকার অভাব হতো না।

          উক্ত কিতাবের ৫৩ পৃষ্ঠায় আরো উল্লেখ আছে, কলকাতা শহরে একজন অর্থশালী লোক ছিল। সে সর্বদা মদপান করতো। সেই লোকটি এক দিন রঈসুল আওলিয়া, হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ)-এর খেদমতে উপস্থিত হয়ে বলতে লাগলো, হুজুর! আমি মদ পান করতে এরূপ অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি যে, আমি তা করা ব্যতীত বেঁচে থাকতে পারিনা। আমি আপনার নিকট সমস্ত গুণাহ্ হতে তওবা করতে পারি কিন্তু মদ পান ত্যাগ করতে পারবনা। তিনি বললেন, আচ্ছা বাবা! তাই করো। কিন্তু আমার সাক্ষাতে মদ পান করো না। সে ব্যক্তি শর্ত স্বীকার করে তাঁর নিকট বাইয়াত হলো। বাড়িতে উপস্থিত হয়ে তার মদ পানের ইচ্ছা প্রবল হলে  খাদেমের নিকট মদ চাইলো। খাদেম পিয়ালায় মদ ঢেলে তার নিকট আনল। যখনই সে ব্যক্তি পিয়ালাটি মুখের নিকট আনলো তখনই দেখতে পেলো যে, আমিরুল মু’মিনীন (রঃ) দাঁতে অঙ্গুলি দিয়ে তার সম্মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। তৎক্ষনাৎ সে ব্যক্তি মদের পিয়ালাটি নিক্ষেপ করে তওবা করে দাঁড়িয়ে পড়লো কিন্তু তারপরে আর তাঁকে তথায় দেখতে পেল না। এতে সে বুঝল যে, হয়তো তার ভুল হয়েছে। হযরত আমীরুল মুমিনীন (রঃ) এখানে কিভাবে আসবেন? দ্বিতীয়বার সে ব্যক্তি খাদেমকে হুকুম  দিল যে, অন্য একটি পিয়ালায় করে মদ আনো। খাদেম মদ আনলো। সে ব্যক্তি মদের পিয়ালা হাতে নিয়ে পান করার ইচ্ছা করল, অমনি পূর্বের ন্যায় এবারও সে তাঁকে দন্ডায়মান দেখে পিয়ালাটি ফেলে দিলো ও হুজুর বলে সে দিকে ধাবিত হলো। (কিন্তু এবারও) তথায় কাউকে দেখতে পেলনা। তারপরে সে ব্যক্তি একটি কামরায় প্রবেশ করে দরজা বন্ধ করে মদের পিয়ালা মুখের নিকট নেয়া মাত্র আমিরুল মুমিনীন (রঃ)কে সম্মুখে দেখতে পেয়ে তৎক্ষনাত পিয়ালাটি ফেলে দিল এবং তাঁকে অনুসন্ধান করতে লাগলো। কিন্তু তাঁর কোন চিহ্ন পাওয়া গেল না। অবশেষে নিরুপায় হয়ে পায়খানার মধ্যে মদ পান করার ইচ্ছা করা মাত্র উক্ত ব্যক্তি হযরত সাইয়্যিদ সাহেব (রঃ)কে সম্মুখে দন্ডায়মান দেখে মদ পান হতে তওবা করলো এবং সমস্ত শরাবের পাত্র ভেঙ্গে ফেললো।

          “তাওয়ারিখে আযীবা” কিতাবের ৫৪-৫৫ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে, মৌলভি মুহম্মদ আলী রামপুরী সাহেব লিখেছেন যে, কলকাতায় গোলাম হুসাইন নামক একজন বড় অর্থশালী দালাল ছিল। তার ৯০ লক্ষ টাকা ছিল। কোটি টাকা পূর্ণ করার জন্য দিবা-রাত্রি তার আকাঙ্খা ছিল। ঐ ব্যক্তি বড় মদখোর, বদ্কার ছিল। হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ)-এর সাথে তার অতিশয় শত্রুতার সৃষ্টি হয়েছিল, যেহেতু তিনি নৃত্যাগীত, মদপান ইত্যাদি আমোদ-প্রমোদের বিষয়গুলো নিষেধ করতেন। হযরত সাইয়্যিদ সাহেব (রঃ) তার অবাধ্যতা অবগত হয়ে কিছুই বলতেন না। একদিন তিনি আছরের নামাজ পরে এক ময়দানে ভ্রমণ করছিলেন। সেই সময় তিনি হঠাৎ মাথা হতে টুপি খুলে বললেন, গোলাম হুসাইন দালালের উপর এখনই আল্লাহ্ পাক-এর গযব নাযিল হলো। তারপরে তিনি শহরে পৌঁছে শুনলেন যে, উক্ত দালাল ঠিক সেই সময় উম্মাদ হয়ে গিয়েছে। যখন তার চৈতন্য লাভ হত তখন সে চিৎকার করে বলতো যে, হয় হযরত সাইয়্যিদ সাহেব (রঃ)কে আমার নিকট আনয়ণ কর, না হয় আমাকে তাঁর নিকট নিয়ে যাও। লোকেরা তাকে খলীফাতুল মুসলিমীন (রঃ)-এর নিকট নিয়ে গেলে সে একটু আরোগ্য লাভ করতো এবং তথা হতে প্রত্যাবর্তন করলে পুনরায় উম্মাদ হয়ে যেত। অবশেষে ঐ অবস্থায় বিষয় সম্পত্তি ত্যাগ করে মারা যায়।

          “তাওয়ারিখে আযীবা” কিতাবের ৫৯ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে, হযরত সাইয়্যিদ আহমদ বেরেলভী (রঃ) হজ্বে যাওয়ার সময় আদন বন্দরে উপস্থিত হলে তিনি কয়েকজন লোকসহ একটি নৌকায় উঠে বন্দরে নামলেন। শহরটি বন্দর হতে দূরে অবস্থিত। এদিকে সুর্যের এত প্রচন্ড তাপ যে এক পাও চলা কঠিন। তথায় উট ইত্যাদি কোন প্রকার যানবাহন ছিলনা। আবার কারো পায়ে জুতা ছিলনা। অনুসন্ধানে অবগত হওয়া গেলো যে, সম্মুখে পাহাড়ে ভাড়াটিয়া উট পাওয়া যায়। কিন্তু উক্ত প্রচন্ড সূর্যের তাপে পাহাড় পর্যন্ত গিয়ে উট নিয়ে আসা সাধ্যাতীত ছিল। তখন সঙ্গীরা নিরুপায় হয়ে হযরত সাইয়্যিদ আহমদ বেরেলভী(রঃ)-এর নিকট আবেদন করলেন। এতে তিনি বললেন, তোমরা চিন্তা করোনা, আল্লাহ্ পাক আমাদের আবশ্যকীয় বিষয় আমাদের জন্য সংগ্রহ করে দিবেন। তারপর তিনি সকলকে সাত সাতবার সূরা ফাতিহা শরীফ পড়তে বললেন। তাদের উক্ত সূরা পড়া শেষ হতে না হতেই পাহাড়ের দিক হতে কয়েকটি উট সোজাভাবে তাঁদের নিকট এসে উপস্থিত হলো এবং তাঁদেরকে উটের পরিচালকরা তাদের উটের উপর উঠিয়ে আদন শহরে পৌঁছে দিল। শহরে পৌঁছে দেয়ার পরে উটগুলো ও তৎসমূদয়ের পরিচালকগণ অদৃশ্য হয়ে গেল। বেতন দেয়ার উদ্দেশ্যে তাঁদেরকে খোঁজা হলো কিন্তু তাঁদের সন্ধান পাওয়া গেল না। শহরের কাজির নিকট উট পরিচালকগণের রূপ ও চেহারার কথা প্রকাশ করা হলো ও তাঁর নিকট তাঁদের বেতন গচ্ছিত রাখার প্রস্তাব করা হলো। কিন্তু কাজী সাহেব বললেন, এরূপ চেহারার উট পরিচালকরা এখানে নাই। কোন গায়েবী সাহায্য আপনাদের নিকট পৌঁছেছিল, যদি আপনারা এই প্রচন্ড তাপে উক্ত সাহায্য প্রাপ্ত না হতেন তবে আপনারা বিনষ্ট বা ধ্বংস হয়ে যেতেন।

          ত্রয়োদশ শতাব্দীর মুজাদ্দিদুয্যামান খলীফাতুল মুসলিমীন, হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ)

 হাদীস শরীফে রয়েছে,

ان الله يبعث لهذه الامة على رأس كل مأة سنة من يجددلها دينها.

অর্থঃ- প্রত্যেক শতাব্দীর শুরু অথবা শেষভাগে এরূপ লোক পয়দা হবে যিনি তাদের জন্য তাদের দ্বীনকে সংস্কার করবেন। এই হাদীস শরীফের ব্যাখ্যায় ফকিহুল উম্মত আল্লামা রুহুল আমীন (রঃ) তাঁর একখানা “বিজ্ঞাপন রদ” কিতাবের ৫-৬ পৃষ্ঠায় বলেছেন, একাদশ শতাব্দীর মুজাদ্দিদ ইমামে রব্বানী মুজাদ্দিদে আল্ফে সানী (রঃ), দ্বাদশ শতাব্দীর মুজাদ্দিদ হযরত শাহ্ ওয়ালী উল্লাহ্ মুহাদ্দিস দেহলভী (রঃ) এবং ত্রয়োদশ শতাব্দীর মুজাদ্দিদ আমিরুল মু’মিনীন হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ)। আলিম কুল শিরমণি হাদীয়ে জামান আল্লামা কারামত আলী জৈনপুরী (রঃ) তার “মুকাশিকাতে রহমত” কিতাবে এ সম্পর্কে বলেন, প্রকৃতপক্ষে আমিরুল মু’মিনীন, হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ) এই জামানার প্রত্যেক লোকের মুর্শিদ, কেউ ইহা অবগত হোক অথবা না হোক, মান্য করুক অথবা না করুক তিনি ত্রয়োদশ শতাব্দীর মুজাদ্দিদ। যাঁকে আল্লাহ্ পাক মুজাদ্দিদ করেছেন তার ত্বরিকায় দাখিল হওয়া দ্বীনের দৃঢ়তার লক্ষণ। যেহেতু তাঁর ত্বরিকায় সুন্নতের পায়রবি করা হয়।

তৎকালে ভারতবর্ষে মুসলমানদের অবস্থা

          আলামুল হুদা, হযরতুল আল্লাম হযরত কারামত আলী জৈনপুরী (রঃ) তাঁর বিখ্যাত “মুকাশিফাতে রহমত” কিতাবে তৎকালে ভারতবর্ষে মুসলমানদের অবস্থা সম্পর্কে বর্ণনা করেন এইভাবে- “মানুষ তাদের ভাল অবস্থা ও চরিত্রকে অসৎ চরিত্র দ্বারা কলঙ্কিত করে ফেললো। বিদ্য়াত ও কুফরী চাল-চলন, প্রতিমা পুজা, মুর্তি বানানো, নাচ-গান, ঢাক-ঢোল, তানপুরা ইত্যাদি শরীয়ত গর্হিত কাজে রত হলো হিন্দুদের রথযাত্রা, দোলযাত্রায় অংশ নিত। কিছু লোক পাদরি গোশাইর চালচলনে চলতো। কলেমা তাইয়্যিবার মর্ম না বুঝার দরুন র্শিক করতো। নামাজ, রোজা, হজ্ব, যাকাত, কুরবানী, সদকা, ফিতরা, জুমা, জামায়াত, দু’ঈদ এবং নামাজ একেবারে ছেড়ে দিয়েছিল। তাদের মধ্যে দাড়ি মুন্ডানোর রীতি ছিল। হিন্দু-মুসলমান চিনা যেতনা। কতক লোক রোজা রাখত কিন্তু ইফতার করা ও সেহ্রী খাওয়ার সময় সম্পর্কে জ্ঞান রাখতো না। সুবহি সাদিক হলেও পানাহার করতো। নিজেদের সাধ্যমত মোহর ধার্য করতো। কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ, ওয়াজ-নসীহত শ্রবণ করা একেবারে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আযানের শব্দ শুনা যেত না। কুরআন শরীফ পাঠের বদলে বালকদেরকে ফার্সি শিক্ষা দেয়া উত্তম মনে করতো। নামাজ, রোজা, হায়েজ-নিফাসের মাসয়ালা একে বারে মানতো না। এমনকি স্ত্রী লোকেরা বেপর্দা হতো এবং কতক স্ত্রী লোক রাত্রি বেলায় সজ্জিত হয়ে মেলায় যেতো। দ্বীনের এই করুণ অবস্থায় আল্লাহ্ পাক খলীফাতুল মুসলিমীন, হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ (রঃ)কে মুজাদ্দিদ রূপে প্রেরণ করেন। তিনি দ্বীনের সংস্কার করেন। যিকির-ফিকির, মুরাবাকার মাধ্যমে অসাবধান লোকদেরকে সতর্ক করে তোলেন। তাঁর আগমণে বহু বছরের কুপ্রথা, র্শিক, বিদ্য়াত-বেশরার উচ্ছেদ ঘটে। পুনরায় হাক্বীক্বী দ্বীনি প্রথা চালু হলো। কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ শিক্ষা, নামাজ, রোজা, হজ্ব, যাকাত, তারাবীহ্, জুমা, জামায়াত, আযান, পুনরায় পূর্ণ্যদমে চালু হলো। তাঁর আলেম খলিফাগণ কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ, আকাঈদ, তাসাউফ, ফিক্বাহ্র কিতাব থেকে মানুষকে নতুনভাবে তালিম দিতে লাগলেন।

হজ্বে বাইতুল্লাহ্ শরীফ ও

মদীনা শরীফ জিয়ারত

১২৩৬ হিজরী মোতাবেক, ইংরেজী ১৮২১ সালে তিনি এক বিশাল কাফেলাসহ হজ্বের জন্য হারামাইন শরীফের উদ্দেশ্যে গৃহ ত্যাগ করেন। পথের বিভিন্ন জায়গা যেমন ইলাহাবাদ, বেনারস, মির্জাপুর, চুনারগড়, গাজীপুর, দানাপুর, ফুলওয়ার শরীফ, আযিমাবাদ, কলিকাতা, তিব্বত প্রভৃতি জায়গা হতে তাঁর নিকট হাজার হাজার লোক এসে বাইয়াত হয়ে তাঁর কাফেলায় শরীক হয়। ১৮২২ সালের ১৬ মে তিনি পবিত্র হেরেম শরীফে প্রবেশ করেন। এই সময় পবিত্র হারাইন শরীফের মাশাইখ-ই-কিরাম (রঃ) তাঁর নিকট বাইয়াত হওয়ার জন্য দ্রুত ছুটে আসেন। যেমন, শায়খ মুহম্মদ ওমর (রঃ) (হানাফী মুসাল্লার ইমাম) শায়খ মুস্তফা মিরদাদ (রঃ), হযরত শায়খ আতা মিছরী (রঃ), শায়খ মুহম্মদ আলী হিন্দী (রঃ), সাইয়্যিদ আকিল (রঃ), সাইয়্যিদ হামযা খাজা আলমাস (রঃ) শায়খ আহমদ বিন ইদ্রিস (রঃ) শায়খ বোখারামী (রঃ) শায়খ হাসান আফেন্দী (রঃ), শায়খ শামসুদ্দীন (রঃ) ও প্রমূখ হারামাইন শরীফের মাশাইখ-ই-কিরাম (রঃ) কেউ সরাসরি কেউ কাশ্ফের মাধ্যমে অবগত হয়ে তার নিকট এসে বাইয়াত হন। একথা “মাখজানে আহম্মদী, সীরাতে সাইয়্যিদ আহ্মদ শহীদ, সাওয়ানে আহ্মদী, কারামতে আহমদী” কিতাবে বর্ণিত আছে।     পবিত্র মক্কা শরীফের হজ্ব পর্ব সমাপনের পর তিনি মদীনা শরীফের দিকে রওয়ানা হন। এখানে তিনি সরকারে দো আলম হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর রওজায়ে আকদাস জিয়ারত করেন। বাতেনী ভাবে তিনি তাঁর নিকট থেকে প্রচুর নিয়ামত লাভ করেন। এখানেও মদীনা শরীফের বহু শায়খ তাঁর নিকট বাইয়াত হন। পবিত্র মক্কা শরীফ ও মদীনা শরীফের যে সমস্ত জায়গা তিনি যিয়ারত করেন তা হচ্ছে- জান্নাতুল মুয়াল্লা, আকাবার প্রান্তর, হুদাইবিয়া, জান্নাতুল বাকী, ওহুদ প্রান্তর, মসজিদে কুবা, মসজিদে ক্বিবলাতাইন, মসজিদে খায়েফ, বাইয়াতে রিদওয়ান, ওয়াদীয়ে ছোগরা (যেখানে বদরী সাহাবী হযরত আবূ উবাইদা বিন হারিস (রাঃ) সমাহিত আছেন)। তিনি এ সমস্ত বরকতময় ও পবিত্র জায়গা জিয়ারত করেন।

তরীকায়ে মুহম্মদিয়া বা

আওর মুহম্মদিয়া তরীকার সংস্কার

ত্বরীকায়ে মুহম্মদিয়া বা আওর মুহম্মদিয়া ত্বরীকা কোন নতুন তরীকা নয়। বরং পাক ভারত উপমহাদেশে মশহুর ত্বরীকাগুলোর যেমন, কাদেরীয়া, চিশ্তিয়া, নকশ্বন্দীয়া, মুজাদ্দেদীয়া, সোহ্রাওয়ার্দীয়া তরিকাগুলোর নির্যাসমাত্র। এই তরিকায় নতুন কোন সবক সন্নিবেশিত করা হয়নি। বরং হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সূক্ষ্মতিসূক্ষ্ম সুন্নত অনুসরণই হচ্ছে- এই তরীকার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেমন, কাফির, মুশরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ-জিহাদ করেছেন, দ্বীনের দাওয়াত দিয়েছেন, হিজরত করেছেন, বিধবা বিবাহ্ করেছেন, সবার আগে সালাম দিয়েছেন, দুস্থঃ ও ইয়াতিমদের মাথায় হাত বুলিয়েছেন, জানাযার নামাজ ও রোগীদের খবরা-খবর নিয়েছেন, শত্রু কর্তৃক বিষপানে আক্রান্ত হয়েছেন ইত্যাদি ইত্যাদি সুন্নতগুলো আল্লাহ্ পাক-এর খাছ ওলী হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ)-এর জীবন মোবারকেও দেখতে পাওয়া যায়। বাংলার বুকে ৫৫ বছর হিদায়াতকারী আলামুল হুদা হযরত মাওলানা কারামাত আলী জৈনপুরী (রঃ) তাঁর “যাদুত তাকওয়া” কিতাবের ১২৭-১২৮-১২৯ পৃষ্ঠায় এ সম্পর্কে বলেন, আমিরুল মু’মিনীন হযরত মুর্শিদে বরহক (কোঃ সেঃ আঃ)-এর তরীকার নাম তরিকায়ে মুহম্মদিয়া বা আওর মুহম্মদিয়া রাখার কারণ এই যে, আউলিয়া-ই-কিরাম (রঃ) রূহানীভাবে কোন না কোন নবী (আঃ)-এর অধীনে থেকে ত্বরক্কীলাভ করেন। যে ওলী যে নবীর অধীনে থাকেন, সে ওলীর জন্য সেটাই মাশরাব। আমার মুর্শিদে বরহক হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অধীনে অর্থাৎ (মুহম্মদি উল মাশরাবের অন্তর্ভূক্ত) ছিলেন। এই জন্য নিজের তরীকার নাম তরীকায়ে মুহম্মদিয়া রেখেছেন। কলকাতার মাওলানা হযরত গোলমি সুবহান মুর্শিদ ক্বিবলাকে “তরীকায়ে মুহম্মদিয়া” নাম রাখার কারণ জিজ্ঞেস করলে, জাওয়াবে তিনি বলেন, মনে কর যেমন, এক বাদশাহ্ কোন শহরে ছিল। ঐ বাদশাহ্র নানা প্রকার কারিগরি এবং শিল্পের প্রতি খুব আগ্রহ। এই কারণে ঐ শহরের যত কারিগর আছে সকলেই নিজ নিজ কারিগরী ও শিল্প কার্যানুযায়ী বাদশাহ্কে সন্তুষ্টি করে এবং এর দ্বারা বাদশাহ্র নৈকট্য পদ মর্যাদা লাভ করে। এই ভাবে প্রত্যেকেই নিজের কারিগরী নৈপুণ্যতা দ্বারা বাদশাহ্র নৈকট্য লাভ করে। তারা সবাই বাদশাহ্র প্রিয় পাত্র। তাদের মধ্যে কোন ব্যক্তি এমন করতে থাকেন যে, তিনি সমস্ত প্রকার কারিগরী ও শিল্প কাজ সম্বন্ধে অভিজ্ঞ এবং সে বাদশাহ্র নিকটতম ব্যক্তি। আর সে ব্যক্তি সর্বদাই বাদশাহ্র নিকটে থাকে যাতে বাদশাহ্ প্রয়োজন মত তার দ্বারা যে সময় যে কাজের দরকার সে কাজ করাতে পারেন। অতএব এ থেকে বুঝে নিবে আমাদের দ্বীনের যত ধর্মীয় আমির অতিবাহিত হয়েছেন। যেমন, হযরত গাউসুল আযম বড় পীর সাহেব (রঃ), হযরত খাজা মুঈনুদ্দীন চিশ্তী (রঃ), হযরত খাজা বাহাউদ্দীন নক্শবন্দ (রঃ) তাঁরা সকলেই ছিলেন আমাদের দ্বীনের (ইল্মে শরীয়ত ও তরীকতের) ইমাম। আর এই সমস্ত বুযুর্গানে দ্বীনের তরীকায় আমি বাইয়াত হয়েছি। আমি দাবি করিনা যে, আমি তাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। কিন্তু আমাকে তাদের তরীকায় চলার দরুণ আল্লাহ্ পাক এমন যোগ্যতা দান করেছেন, যার জন্য যিকির শোগলের মধ্যে মশগুল থাকি এবং আল্লাহ্ পাক হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে খাছ করে যে নিয়ামত দান করেছেন তা হতে উম্মত হিসেবে এই অধম বান্দাকেও সামান্য কিছু দান করেছেন। তাহলো- জিহাদের হুকুম (শরীয়তের নির্দিষ্ট হুকুম) জারী এবং ক্বিসাস (প্রতিশোধ গ্রহণের আইন) চালু এবং শিরক ও বিদ্য়াতের প্রতিরোধ করা ইত্যাদি। মহা মহিমান্বিত আল্লাহ্ পাক-এর মেহেরবানীতে নিজের মধ্যে এই সমস্ত কাজ চালু করার যোগ্যতা ও ক্ষমতা পাচ্ছি। আর আল্লাহ্ পাক  আয্যা ওয়া জাল্লাহ হক সুবহানাল্লাহু তা’আলা আমাকে এমন ক্ষমতা দান করেছেন, যার ফলে আমি এমন ধারণা ও ইচ্ছা পোষণ করছি যে, কাফিরদের মোকাবিলায় ঘোড়ায় চড়ে যুদ্ধের অস্ত্র, তলোয়ার, তীর, নেজা, কামান বন্ধুক ইত্যাদি নিয়ে যুদ্ধের পোষাক পরিধান করে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলইহি ওয়া সাল্লাম-এর কালিমার আওয়াজ বুলন্দ করার মানসে ঐ কাফিরদের সঙ্গে জিহাদ করবো। আল্লাহ্ প্রদত্ত ক্ষমতায় নিজের হাতে পরিখা খনন করবো, কুঠার নিয়ে লাকড়ি ফাড়বো এবং হুদুদ কিসাস জারী করতে পারবো। অতএব এই বিশেষ নিয়ামতের বদৌলতে আনন্দচিত্তে নিজের তরীকার নাম তরিকায়ে মুহম্মদিয়া রেখেছি।” অতএব বুঝা গেল, এই “তরীকায়ে মুহম্মদিয়া” নজদের শায়খ আব্দুল ওহাব নজ্দীর প্রবর্তিত “মুহম্মদী আন্দোলন” -এর সাথে কোনই সম্পর্ক নেই।

হযরত শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্ মুহাদ্দিস দেহলভী (রঃ), হযরত শাহ্ আব্দুল আজিজ মুহাদ্দিস দেহলভী (রঃ), হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ) ও মুহম্মদ ইবনে আব্দুল ওহাব নজদীর সময়কালের পার্থক্য ও প্রাসঙ্গিক কিছু কথা

ভারতীয় উপমহাদেশে ইমামুল হিন্দ হযরত শাহ্ ওয়ালী উল্লাহ্ মুহাদ্দিস দেহলভী (রঃ)-এর সময়কাল হচ্ছে- ১১১৪ থেকে ১১৭৬ হিজরী। আর সিরাজুল হিন্দ হযরত শাহ্ আব্দুল আজীজ মুহাদ্দিস দেহ্লভী (রঃ)-এর সময়কাল ১১৫৯ থেকে ১২৩৯ হিজরী পর্যন্ত। হযরত সাইয়্যিদ আহমদ বেরেলভী (রঃ)-এর সময় হচ্ছে ১২০১ থেকে শুরু এবং ১২৪৬ এ গিয়ে তাঁর সময় শেষ হয়েছে। হযরত শাহ্ ওয়ালী উল্লাহ্ মুহাদ্দেস দেহলভী (রঃ)-এর সাথে তাঁর সময়ের পার্থক্য হচ্ছে তিনি যখন দুনিয়া থেকে বিদায় নেন অর্থাৎ তার ইন্তিকালের পঁচিশ বছর পর হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ) জন্মগ্রহণ করেন। হযরত শাহ্ আব্দুল আজীজ মুহাদ্দিস দেহলভী (রঃ)-এর জন্মের বিয়াল্লিশ বছর পর হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ) জন্মগ্রহণ করেন এবং হযরত শাহ্ আব্দুল আজীজ মুহাদ্দেস দেহলভী (রঃ) যখন ১২৩৯ সালে এই ফানী দুনিয়া থেকে ইন্তিকাল করেন তারও সাত বছর পর পর্যন্ত তিনি জীবিত ছিলেন। অর্থাৎ আমিরুল মু’মিনীন (রঃ)-এর জীবিত অবস্থাতেই হযরত শাহ্ আব্দুল আজীজ মুহাদ্দেস দেহলভী (রঃ) ইন্তিকাল করেন। এখন একটি প্রশ্ন উঠতে পারে, হযরত শাহ্ আব্দুল আজীজ মুহাদ্দেস দেহলভী (রঃ) যাঁকে দুনিয়ার সকল আলেম, ফাযেল, সূফী-দরবেশ, মুহাদ্দেস, মুফাস্সীর সকলেই একবাক্যে চিনে এবং যার সীলসীলা উপমহাদেশে অত্যান্ত মকবুল ও মশহুর। আর তারই সুযোগ্য এবং প্রধান খলীফা হচ্ছেন, আমিরুল মু’মিনীন হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ)। যাঁর কামালত বেলায়েত বুযুর্গী ও কাশ্ফ কারামতের কথা বলার অপেক্ষা রাখেনা। যার বাতিনী নিয়ামতের কাছে হযরত শাহ্ ওয়ালী মুহাদ্দেস দেহলভী (রঃ)-এর গোটা খানদানই সম্পূর্ণরূপে ঝুকে গিয়েছিলো। হযরত শাহ্ আব্দুল আজীজ মুহাদ্দেস দেহলভী সাহেব (রঃ) আপন প্রধান খলীফা ও মুরীদের চরম উন্নতি দেখে যার নিকট বাইয়াত হওয়ার কথা পর্যন্ত চিন্তা করেছিলেন। এখন তিনি যদি এই ধরণের আপত্তিকর ত্রুটি ও গলদ করতেন তাহলে হযরত শাহ্ সাহেব (রঃ) জীবিত থাকা অবস্থায় তাকে কি শুধুরিয়ে দিতেন না? অথবা হযরত শাহ্ সাহেব (রঃ)-এর তা’লীম তরবীয়ত ও ইসলাহের পদ্ধতির মধ্যে কি এ ধরণের জঘন্য ত্রুটি প্রচ্ছন্ন বা লুক্কায়িত ছিল? যা প্রকাশ ঘটেছে হযরত সাইয়্যিদ সাহেবের মাধ্যমে। (নাউযুবিল্লাহ্ মিন যালিক)

          একমাত্র গোমরাহ্ সম্প্রদায় ব্যতীত হযরত শাহ্ আব্দুল আজীজ মুহাদ্দিস দেহলভী (রঃ)-এর প্রতি এই ধরণের কুটক্তি বা বদ্গুমানী কেহই অন্তরে স্থান দিবেনা।

          অপরদিকে হযরত শাহ্ ওয়ালী উল্লাহ্ মুহাদ্দেস দেহলভী (রঃ)-এর সময়ের সাথে(১১১৪-১১৭৬) মুহম্মদ ইবনে আব্দুল ওহাব নজ্দীর সময়ের পার্থক্য হচ্ছে (১১১১-১২০৩)। অর্থাৎ হযরত শাহ্ ওয়ালী উল্লাহ্ মুহাদ্দেস দেহলভী (রঃ) ও নজ্দের মুহম্মদ বিন আব্দুল ওহাব নজ্দী একই সময়কালের। যদিও হযরত শাহ্  সাহেব (রঃ) মুহম্মদ বিন আব্দুল ওহাব নজ্দীর তিন বছর পর জন্মগ্রহণ করেন। আর নজ্দীর মৃত্যুর ২৭ বছর আগেই দুনিয়া থেকে রোখসত নেন। আর হযরত শাহ্ আব্দুল আজিজ (রঃ) নজ্দীর জন্মের ৪৮ বছর পর জন্মগ্রহণ করেন এবং নজ্দীর মৃত্যুর ৩৬ বছর পর ইন্তিকাল করেন। এবং হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ) (১২০১-১২৪৬) ও নজ্দীর সময় (১১১১-১২০৩) কালের পার্থক্যের মধ্যে ব্যবধান হচ্ছে, মুহম্মদ ইবনে আব্দুল ওহাব নজ্দী যখন দুনিয়া থেকে বিদায় নেয় তখন হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ) ছিলেন প্রায় দুই বছরের শিশু এবং এটাই ঐতিহাসিক বিশুদ্ধ রেওয়াত।

          তাহলে সাধারণ আক্বলের প্রশ্ন, (প্রায়) দুই বছরের এই শিশু হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ) মুহম্মদ ইবনে আব্দুল ওহাব নজ্দীর ছাত্র, শিষ্য অনুসারী হতে পারে? এটা পাগলের প্রলাপ বৈঃ নয়।

          যদি তরীকায়ে মুহম্মদীয়ার মাধ্যমে দাওয়াত দিলেই  মুহম্মদ ইবনে আব্দুল ওহাব নজ্দীর শিষ্য, ছাত্র, অনুসারী হয়ে যায় তাহলে বিরুদ্ধবাদী ও বিদ্বেষ পোষণকারীদের সূত্রানুযায়ী হযরত শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্ মুহাদ্দিস দেহলভী (রঃ) ও তাঁর সাগরীদগণ তারপর হযরত শাহ্ আব্দুল আজীজ মুহাদ্দেস দেহলভী (রঃ) ও তাঁর সাগরীদগণ মুহম্মদ ইবনে আব্দুল ওহাব নজ্দীর শিষ্য হওয়ার কথা। (নাউযুবিল্লাহি মিন যালিক)

          কেননা হযরত শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্ মুহাদ্দেস দেহলভী (রঃ) ও হযরত শাহ্ আব্দুল আজীজ মুহাদ্দেস দেহলভী (রঃ)ও  এই তরিকার কাজ করেছেন। আর এই তরীকা কোন নতুন তরীকা নয় বরং পাক ভারত উপমহাদেশে মশহুর তরীকাগুলোর নির্যাসমাত্র। হযরত শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্ মুহাদ্দিস দেহলভী (রঃ) ও হযরত শাহ্ আব্দুল আজীজ মুহাদ্দেস দেহলভী (রঃ)-এর পর এ তরীকার প্রচার-প্রসারের দায়িত্ব এসে যায় আমীরুল মু’মিনীন হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ)-এর উপর। তবে বিশেষ করে এবং খাছ ভাবে আল্লাহ্ পাক ও হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পক্ষ থেকে এই তরীকায়ে মুহম্মদিয়ার খাছ কামালত ও বেলায়েত দান করেন হযরত সাইয়্যিদ সাহেব (রঃ)কে এবং এই তরীকার ইমাম হিসেবে তাঁকে মনোনীত করেন তিনি স্বয়ং নিজেই। এ সম্পর্কে বলেন, “আমি আল্লাহ্ পাক-এর রাসূল হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাতে হাত দিয়ে বাইয়াত হয়েছি। অতঃপর তিনি আমাকে তরীকা দিলেন। আর আমার ত্বরীকার নাম দিলেন বা রাখলেন- “তরীকায়ে মুহম্মদিয়া।”

          যদিও তিনি হযরত শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্ মুহাদ্দেস দেহলভী (রঃ) ও হযরত শাহ্ আব্দুল আজীজ মুহাদ্দেস দেহলভী (রঃ)-এর উত্তরসূরী হিসেবে এই তরীকা প্রচার-প্রসারের মাধ্যমে মানুষদেরকে দাওয়াত দিয়েছেন। কিন্তু সত্যিকারভাবে মূলতঃ তিনিই হচ্ছেন এই তরীকার ইমাম।

          কাজেই এই মুহম্মদিয়া ত্বরীকার প্রচার-প্রসারের জন্য যদি তাঁকে ওহাবী বলা হয় এবং তাঁর উপর  অপবাদ ও তোহ্মত  দেয়া হয় তবে হযরত শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্ মুহাদ্দেস দেহলভী (রঃ) ও হযরত শাহ্ আব্দুল আজীজ মুহাদ্দেস দেহলভী (রঃ)কে কেন ওহাবী বলা হবেনা? এবং তাঁদের উপরও কোন মিথ্যা তোহ্মত দেয়া হলোনা? মূলতঃ ইহা এক বিরাট ষড়যন্ত্র ও মিথ্যার সংমিশ্রণ ইতিহাসের প্রতি অন্যায় ও অসদ্বাচরণ। আর এর জন্য দায়ী বৃটিশ বেনিয়া ইংরেজ জাতি এবং আহমদ রেযা খান সাহেব ও তার অনুসারীরা। কারণ তারাই বৃটিশদের সাথে তাল মিলেয়ে  অপবাদ ছড়িয়েছে।

মুহম্মদ ইবনে আব্দুল ওহাব নজ্দীর সংক্ষিপ্ত পরিচয় ও তার আক্বীদা

 মুহম্মদ ইবনে আব্দুল ওহাব নজদীর পরিচয় সম্পর্কে ফতওয়ায়ে “শামী, ইশয়াতে হক্ব, ওহাবীদের ইতিহাস, ওহাবীদের উৎপত্তি, সাইফুল মাযহাব, মাযহাব কি ও কেন, সাইফুল জাব্বার” ইত্যাদি কিতাবে মুহম্মদ ইবনে আব্দুল ওহাব নজদীর পরিচয় সম্পর্কে এইভাবে বর্ণিত আছে,  মুহম্মদ ইবনে আব্দুল ওহাব নজদী ১১১১ হিজরী মোতাবেক ইংরেজী ১৭০৩ সালে আরবের নজ্দ প্রদেশে জন্মগ্রহণ করে। তার পিতার নাম আব্দুল ওহহাব। তার বড় ভাই এর নাম সুলায়মান। পিতা ও ভ্রাতা দু’জনই তৎকালে দেশে হক্কানী বিজ্ঞ আলেম নামে খ্যাত ছিলেন। কিন্তু আব্দুল ওহাবের কণিষ্ঠ পুত্র “মুহম্মদ ইবনে আব্দুল ওহহাব” অত্যন্ত উদাসীন ও গোঁড়ামী চরিত্রের অধিকারী ছিল। তাই সে তার পিতা ও ভ্রাতার মতের বিপরীত চলতো এবং প্রায়ই তাদের বিরূদ্ধচারণ করতো এবং মনগড়া নতুন মত প্রচার করে ফিৎনা পয়দা করতো। তার ভ্রান্ত আক্বীদাগুলির সাথে সেই জামানার হক্কানী-রব্বানী আলেমগণ একমত হতে পারেননি। ফলে সে বহু আলেম, সূফী, দরবেশ, মুত্তাকীদের উপর ষ্টিম রোলারের ন্যায় অত্যাচার চালায় এবং তাঁদের অনেককে সে হত্যা করে ফেলে।

নজ্দ প্রদেশ সম্পর্কে হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ভবিষ্যৎবাণী

আব্দুল ওহাব নজ্দীর ফিৎনা সম্পর্কে হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভবিষ্যৎবাণী করেছেন এভাবে,

 عن ابن عمر قال قال النبى صلى الله عليه وسلم اللهم بارك لنا فى شامنا اللهم بارك لنا فى يمننا قالوا يا رسول الله صلى الله عليه وسلم وفى نجدنا قال اللهم بارك لنا فى شامنا اللهم بارك لنا فى يمننا قالوا يا رسول الله صلى الله عليه وسلم وفى نجدنا فاظنه قال فى الثالثة هناك الزلازل والفتن وبها يطلع قرن الشيطان.

অর্থাৎ- হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে ওমর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দোয়া করলেন। আয় আল্লাহ্ পাক! আমাদের শ্যাম ও ইয়েমেন দেশে বরকত দিন। তখন সাহাবা-ই-কিরাম (রাঃ) আরজু করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্ সাাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমাদের নজ্দের জন্য দোয়া করুন। হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবার শ্যাম ও ইয়েমেনের জন্য বরকতের দোয়া করলেন। আবার তাঁরা বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমাদের নজ্দের জন্য বরকতের দোয়া করুন। তবুও হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নজদের জন্য দোয়া অস্বীকার করে বললেন, আমি নজ্দের জন্য কি করে দোয়া করবো? কারণ নজ্দে তো ভূমিকম্প ও ফিৎনার সৃষ্টি হবে এবং তথায় শয়তানী দলের উৎপত্তি হবে। (বুখারী  শরীফ ২য় খন্ড পৃষ্ঠা ১০৫১, মিশকাত শরীফ ৫৮২ পৃষ্ঠা)

          রাসূল পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ভবিষ্যৎবাণীর ফলে ১১১১ হিজরীতে নজ্দে আব্দুল ওহাবের ঘরে মুহম্মদ ইবনে আব্দুল ওহাবের জন্ম হয়। ১১৪০ হিজরী হতে এই মুহম্মদ ইবনে আব্দুল ওহাব নজ্দীর ফিৎনা সৃষ্টি হয়। সে আহ্লে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের বিরুদ্ধে দল তৈরী করে খাঁটি মুসলমানদেরকে পাইকারীহারে হত্যা করতে থাকে। এমনকি মক্কা শরীফ ও মদীনা শরীফের সম্মানিত স্ত্রী ও কুমারীদের সহিত ব্যভিচারে লিপ্ত হয় এবং তাদের দাস-দাসী বানায়। মসজিদে নববীর মূল্যবান বিছানা ও বাতিগুলো নজ্দে নিয়ে যায়। হযরত সাহাবা-ই-কিরাম (রাঃ) ও হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর খান্দানের মাজার শরীফগুলো চুরমার করে দেয়। এমনকি হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর রওজা শরীফ ভেঙ্গে দেয়ার জন্যও একদল (নজ্দীর অনুসারী) উদ্যত হলে মহান আল্লাহ্ পাক এক সাপ পাঠিয়ে তাদের হত্যা করলেন।

          মুহম্মদ ইবনে আব্দুল ওহাব নজ্দী ও তার অনুসারীদের আক্বীদাগুলো নিম্নরূপ- (১) সে বলেছে, ৬০৬ হিজরী হতে তার সময় কাল পর্যন্ত সমস্ত উম্মতগণ কাফির।

(২) যে ব্যক্তি তার মতাবলম্বী হবে সে মু’মিন। আর যে তার মতাবলম্বী হবে না সে বড় মুত্তাকী হলেও কাফির-মুশরিক।

(৩) হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রকৃত পক্ষে রাসূল ছিলেন না বরং তারেশ (বাহক) ছিলেন। (নাউযুবিল্লাহ্)

(৪) হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি দরুদ পড়া মাকরূহ। সে আরো বলে নবীর প্রতি দরূদ পাঠকারী ব্যক্তির চেয়ে জেনাকারিনী বেশ্যা কম পাপী। (আসতাগফিরুল্লাহ্)

(৫) সাহাবা, তাবেঈন, ইমাম-মুজতাহীদগণ কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াস হতে যে মাসয়ালা বের করেছেন সে তা মানতে নারাজ।

(৬) তার মতে চার ইমামের অধিকাংশ কথাই ভূয়া। তা শরীয়তের কথা নয়। তারা ভ্রষ্ট ছিলেন এবং মানুষদেরকেও ভ্রষ্ট করেছেন।

(৭) সে জুমুয়ার দিনে মসজিদে খুৎবার সময় খোঘণা দিত, যারা নবীর উসীলা ধরে তারা অবশ্যই কাফির।

(৮) নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর রওজা শরীফ যিয়ারত করা নিষেধ।

(৯) নবী, ওলী, সূফী, বুযুর্গ কারো উসীলা দিয়ে যে দোয়া করবে সে মুশরিক।

(১০) তার মতে ঈমানের ভিত্তি ৬টি। কলিমা, নামায, রোজা, হজ্ব, যাকাত ও তার অনুগামী হওয়া।

(১১) নফল নামাজ, যিকির, তাসবীহ্, অযিফা, দরূদ, মীলাদ শরীফ ইত্যাদি পড়া সম্পূর্ণ নিষেধ।

(১২) নবী (আঃ)গণ ওফাতের পর কবরে জীবিত নন।

(১৩) দালায়েলুল খায়রাত, কাসিদায়ে বুরদা এবং এই জাতীয় দরুদ শরীফের কিতাবগুলি তারা বিদ্য়াত বলে জ্বালিয়ে দিয়েছে।

(১৪) তার অনুসারীরা নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর রওজা শরীফ জিয়ারত করতে নিষেধ করে থাকে।

(১৫) তারা বলে থাকে আমরা কুরআন হাদীস ছাড়া আর কোন কিছু মানবনা। এবং কেউ যদি বলে আমি মিছরী, শামী, হিন্দী, শাফী, হানাফী ইত্যাদি তা মানিনা। আমরা কোন ইমাম বা আলেমের ইক্তেদা ও তাকলীদ করবনা। ইত্যাদি ইত্যাদি।

          বলা জরুরী যে, নজ্দ প্রদেশের এই মুহম্মদ ইবনে আব্দুল ওহাব নজ্দী এবং তার দল ও দেশ সম্পর্কে যেখানে রাসূল পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দোয়া করেননি যার আমল-আক্বীদার সাথে পৃথিবীর আহ্লে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের কোন আলেম, ফাযেল, ফক্বীহ্, সূফী, মুহাদ্দিস, মুফাস্সিরগণ একমত নয় সেখন এই রেযা খানী মাযহাবীগণ কি করে কুটচালে আমীরে মুজাহিদ, শহীদে আযম (রঃ)-এর গোটা জামায়াতকে তার দলের সাথে সামাজস্যপূর্ণ বা ওহাবী বলে আখ্যা দিলো?

          মূলতঃ যাদের আক্বীদা, চিন্তা-চেতনার মধ্যে ত্রুটি ও গন্ডগোল রয়েছে তাদের পক্ষেই এই কারসাজী ও ছলছাতুরী করা সম্ভব।

হিন্দুস্থানের আকাবিরে উলামায়-ই-কিরাম ও পীর-মাশায়েখ (রঃ)গণের বাইয়াত গ্রহণ

          খলীফাতুল মুসলিমীন, আমিরুল মু’মিনীন, হযরত সাইয়্যিদ আহম্মদ শহীদ (রঃ)-এর শোহ্রত ও খ্যাতি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়লো। তাঁর এক দৃষ্টি বা সামান্য সোহ্বতে বহু সাধনার কষ্ট লাঘব হতে লাগলো। সমস্ত সৃষ্টি তাঁর দিকে ঝুকে পড়লো। বিশেষ করে হিন্দুস্থানের আকাবিরে আলেম সমাজ ও পীর-মুর্শিদগণ তার সোহ্বতে থেকে ফয়েজ হাসিল করার জন্য তার দরজায় ধরা দিলেন। তাঁর দরবারে হাজির হয়ে সকলেই নিজেকে ধন্য মনে করলেন। এদের মধ্যে ইমামুল হুদা হযরত মাওলানা কারামত আলী জৈনপুরী (রঃ), হযরত মাওলানা আব্দুর রহীম বেলায়েতী (রঃ,) হযরত মাওলানা আব্দুল হাই (রঃ) (হযরত শাহ আব্দুল আজীজ মুহাদ্দিস দেহলভী (রঃ)-এর জামাই), হযরত শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলভী (রঃ)-এর পৌত্র হযরত মাওলানা ইসমাঈল শহীদ (রঃ), হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজেরে মক্কী (রঃ)-এর পীর সাহেব হযরত নূর মুহম্মদ মিয়াঁজী (রঃ), হযরত মাওলানা হাফেজ জামাল উদ্দীন (রঃ), কাজিউল কুজাত মাওলানা আব্দুল বারী (রঃ), মাওলানা আব্দুল হাকিম (রঃ) মাওলানা শিহাবুদ্দীন শিয়ালকোর্ট (রঃ), হযরত মাওলানা শুজাত আলী রামপুরী (রঃ) প্রমুখ নামজাদা আলেমগণ তাঁদের সমস্ত অস্তিত্ব বিলীন করে তাঁর থেকে বাইয়াত হয়ে ফয়েজ হাছিল করে নিজেকে ধন্য মনে করলেন। যখন আলেম কুল শিরোমনি হযরত মাওলানা আব্দুল হাই (রঃ) তাঁর নিকট বাইয়াত হলেন, তখন দিল্লীতে একটা সাড়া পড়ে গেলো। কেউ বললো, আপনি এত বড় আলেম, ফাযিল হওয়া সত্বেও তাঁর নিকট বাইয়াত হওয়ার কি দরকার ছিলো? জবাবে তিনি বলেন আমি হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ)-এর নিকট বাইয়াত হয়ে তাঁর পিছনে মুক্তাদি হিসেবে দু’রাকাত নামাজ পড়েছি। ঐ দু’রাকাত নামাজে আমার যা কিছু হাসিল হয়েছে তা সারাজীবনেও হয়নি। ঐ দু’রাকায়াত নামাজে তাঁর নিকট সালাতের হাক্বিকত জাহির হয়েছিল। তিনি নামাজে সরাসরি কাবাঘর দেখতে পেয়েছিলেন। তিনি আরো বলেন, আমি সাইয়্যিদ সাহেব(রঃ)-এর পিছনে হযরত সাহাবা-ই-কিরাম (রাঃ)গণের ন্যায় নামাজ পড়ার স্বাদ পেয়েছি। হযরত শায়েখ আব্দুর রহীম বেলায়েতী (রঃ) যাঁর হাজার হাজার মুরীদ ছিল। যিনি হাজী এমদাদুল্লাহ্ মুহাজিরে মক্কী (রঃ)-এর দাদা পীর সাহেব। তিনি সব ত্যাগ করে তাঁর নিকট বাইয়াত হয়েছিলেন। তিনি বলেন, সুলুকের রাস্তায় চলতে কারো নিকট বাইয়াত হওয়ার প্রয়োজন নেই আমার। কিন্তু সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী(রঃ)-এর হাতে বাইয়াত হয়ে যাওয়ার ব্যাপারে রাসূল পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সন্তুষ্টি নিহীত রয়েছে বলে আমার বিশ্বাস।

হিজরত ও শিখদের বিরুদ্ধে

জিহাদ ঘোষণা

মুঘল সাম্রাজ্য পতনের পর ভারত বিবিধ সমস্যার সম্মুখীন হয়ে পড়ে। আওরঙ্গজেব (রঃ)-এর পরবর্তী অধিকাংশ শাসকগণ ছিল বিলাস প্রিয় জীবনে অভ্যস্ত ও দেশ পরিচালনায় অনুপযুক্ত। ফলে বিদেশী শক্তি তাদের উপর চেপে বসে। প্রথমতঃ যেমন ইংরেজ শক্তি বাণিজ্য করার নামে উপমহাদেশের বিপুল সম্পদ কুক্ষিগত করার জন্য মুঘল শাসন পতনের অপেক্ষায় ছিল। এছাড়া ইরানের নাদীর শাহ, আফগানিস্থানের আহম্মদ শাহ আবদালীর আগমণ বিবিধ সম্পদ লুক্তন, হত্যা যজ্ঞ কার্য পরিচালনার মধ্য দিয়ে ভারতবর্ষ ধ্বংসের মুখোমুখি হলো। দ্বিতীয়তঃ মারাঠা ও পাঞ্জাব সীমান্তে শিখদের যুলুম অত্যাচার এর মাত্রা এত বৃদ্ধি পেয়েছিল যে, মুসলমানদের শান্তিতে বসবাস করাই অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। সেই সময় শিখদের অত্যাচারে মুসলমানগণ কত যে অসহায় ছিলো তার সত্যিকার পরিচয় মিলে হযরত শাহ আব্দুল আযীয মুহাদ্দিস দেহলভী (রঃ)-এর একটি কবিতার মধ্যে। তিনি তাঁর স্বচক্ষে দেখা শিখদের অত্যাচার সম্পর্কে কাব্যিক ভাষায় বলেন-

আল্লাহ পাক! শিখ ও মারাঠাদের প্রতিশোধ নিন,

তাদের ঘৃণ্য উপদ্রব নিকটে, দূরে নয়।

তারা আমাদের অনেককে হত্যা করেছে।

শীতকাল প্রায় আগত, তাই মন উৎকক্তিত শিখদের ভয়ে, এবং সেই ভয় যথার্থ।

আল্লাহ পাক তাদের এদেশ থেকে উচ্ছেদ করুন!

যেহেতু তারা নিকৃষ্ট শত্রু আর তারা সন্ত্রাসের সমষ্টি।

          হযরত শাহ্ আব্দুল আজীজ মুহাদ্দেস দেহলভী (রঃ)-এর এ কবিতা হতে বুঝা যায় তৎকালে শিখ সম্প্রদায় মুসলমানদের জন্য কত ভয়ের কারণ ছিল। তারা পাঞ্জাবের মুসলমানদের উপর জোর-জুলুম চালাতো। মসজিদ গুলিকে ঘোড়ার ঘর বানিয়েছিল। লাহোরের শাহী মসজিদের হুজরা গুলি শাহী আস্তা বলে পরিণত করেছিল। আজানের উপর নিষেধাজ্ঞা জারী করেছিল। মুসলিম নর-নারীদের মান সম্ভ্রম নষ্ট করতো এবং তাদের দ্বারা দাসীবান্দীর কাজ জোর করে করানো হতো। সীমান্তে মুসলমান কৃষকদের শস্যের ক্ষেতগুলি ও তাদের বাড়ী ঘরে প্রায় সময় আগুন ধরিয়ে দেয়া হতো। অন্যান্য ইসলামী শরীয়ত, হুকুমত সেখানে পালন করা কোন অবস্থাতেই সম্ভবপর ছিল না। মোট কথা সেখানকার সমগ্র মুসলমান হতাশা, বঞ্চনা ও অবমাননাকর অবস্থায় মধ্য দিয়ে দিন গুজরান করছিল। তারা একজন নিঃস্বার্থ ও নিবেদিত মুসলিম আমীরের প্রতীক্ষায় ছিল। যিনি তাদের এহেন অবস্থায় থেকে বিশেষ করে শিখদের কবল থেকে মুক্তি দিতে পারেন।

          মুজাহিদে মিল্লাত, হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ) মুসলমানদের এ অবস্থা লক্ষ্য করে সীমান্তে বিশেষ করে সারা ভারতে তাগুত শক্তির বিরুদ্ধে জিহাদের ডাক দিলেন। এতে তার সঙ্গী-সাথী, খলিফা ও সাধারণ মানুষের মধ্য থেকে বিপুল সাড়া পাওয়া গেল। ইতোমধ্যে তিনি কয়েকবার ভারতবর্ষের এ প্রান্ত থেকে ঐ প্রান্ত পর্যন্ত সফর করে সরে জমিনে মুসলমানদের দুরাবস্থা পর্যবেক্ষন করেছিলেন। ১২৪১ হিজরী ৭ই জমাদিউস্ সানি মোতাবেক ইংরেজী ১৮২৬ সালের ১৭ই জানুয়ারী তিনি তার মাতৃভূমি রায় বেরেলভীর নিজস্ব বাড়ি থেকে স্ত্রী-সন্তান, আত্মীয়-স্বজন ত্যাগ করে সারা জীবনের জন্য  আল্লাহ্ পাক-এর রাস্তায়  বেরিয়ে পড়েন। শাহাদত লাভের আগ পর্যন্ত আর কোন দিন দেশে ফেরেননি। তিনি রাজপুতনা, মারওয়াড়, সিন্ধু, বেলুচিস্থান, আফগানিস্থান ও সীমান্তের বিভিন্ন গিরি পর্বত, বন জঙ্গল, মালভূমি, নদী-নালা অতিক্রম করে শিখদের এলাকায় এসে তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। শিখদের সাথে তাঁর যে সমস্ত যুদ্ধ হয়েছে তার মধ্যে নওশেরার যুদ্ধ, সিদুর যুদ্ধ, আকোড়ার যুদ্ধ, পানজ তারের যুদ্ধ, মায়ার যুদ্ধ, মর্দান যুদ্ধ ও বালাকোটের যুদ্ধ প্রধান।

বালাকোটের জিহাদ ও মুজাহিদে মিল্লাত, আমিরুল মু’মিনীন, হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ)-এর শাহাদত লাভ

          আলামুলহুদা, মুজাহিদে আজম, হযরত সাইয়্যিদ আহমদ বেরেলভী (রঃ)-এর শাহাদত লাভ ও বালাকোটের জিহাদের আলোচনা করার আগে তাঁর আরো একটি আশ্চর্য ও বিস্ময়কর বড় কারামতের আলোচনা না করলে এই সুওয়ালটির দীর্ঘ জবাবই যেন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। আর তা হচ্ছে- একবার তাঁর কিছু খাছ খলীফা ও মুরীদান তাঁকে অত্যন্ত আদরের সহিত জিজ্ঞাসা করলো, হুজুর ক্বিবলা! এই ভারত বর্ষের লোকেরা হচ্ছে, পীর ও মাযার ভক্ত। এদেশে এমন বহু অশিক্ষিত, আনপড়, বিদ্য়াতী, ভন্ড, ফকীর আছে যারা কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ ও শরীয়তের কোন জ্ঞানই রাখেনা। তারা গাইরুল্লাহ্র নামে মানত করে থাকে। মাযার শরীফ যিয়ারতের নামে পুরুষ-মহিলা একত্রে বেপর্দা হয়ে শরীয়তের সীমা লংঘন করে ফেলে। বহু লালসালু জটাধারী ভন্ড ফকীর আছে যারা সর্বক্ষণই হযরত আউলিয়া-ই-কিরাম (রঃ)গণের মাযার মোবারকের আশে-পাশে যেয়ে মদ, গাঁজা খেয়ে ঢোল-তবলা, তানপুরা বাজিয়ে সারাক্ষণ নেশার ঘোরে বিভোর হয়ে থাকে। তাদের ধারণা সর্বক্ষণ তারা মাযারে শায়িত বুযুর্গ (রঃ)-এর পাশে এভাবে থাকতে পারলে তাদের দয়া ও নেক দৃষ্টি লাভ করতে পারবে। এছাড়া আমাদের সমাজে আরো দুনিয়া পূজারী বহু নামধারী ভন্ড পীর, ফকির আছে যারা শরীয়তের কোনই তোয়াক্কা করেনা, সর্বক্ষণই কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফের খেলাফ চলে এবং মানুষকে দ্বীন থেকে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। তাদের দরবারেও বহু মানুষের আনাগোনা রয়েছে। আর আপনি হচ্ছেন এই ভারত বর্ষের হক্কানী-রব্বানী বুযুর্গ পীর সাহেবদের পীর-মুর্শিদ। আপনি যদি ইন্তিকাল করেন তবে তো আপনার কামালত বেলায়েতের সম্মানের দিকে লক্ষ্য করে মানুষ আপনার জিস্ম মোবারক মাটিতে না রেখে মাথায় নিয়ে ঘুরে বেড়াবে। মুরীদানদের এই প্রশ্নের জবাবে, সানদুল আউলিয়া, মাশায়েখে আযম, হযরত সাইয়্যিদ আহমদ বেরেলভী (রঃ) বলেন, তোমরা নিশ্চিত থাক, আল্লাহ্ পাক আমাকে তিনটি ওয়াদা দিয়েছেন। প্রথমতঃ আল্লাহ্ পাক আমাকে ওয়াদা দিয়েছেন, আমিও আমার সাথীরা অর্থাৎ মুজাহিদ বাহিনীরা যেখানেই থাকিনা কেন তিনি সেখানেই কুদরতীভাবে রিযিক পৌঁছাবেন। দ্বিতীয়তঃ আমাকে কোন যাদু-টোনা, বান, বিষপান ইত্যাদি করা হলে সেটার কোন ক্রিয়া করবেনা। আর তৃতীয়তঃ  আমার ইন্তেকালের পরে কেউ আমার লাশ (দেহ মোবারক) খুঁজে পাবে না।

          হযরত খলীফাতুল্লাহ্, রঈসুল আউলিয়া, হযরত সাইয়্যিদ আহমদ বেরেলভী (রঃ)-এর এই তিনটি কথাই পরবর্তীতে হুবহু সত্য পরিণত হয়েছিল। যেমন, রিযিকের ব্যাপারে হযরত মুজাহিদে আজম, হযরত সাইয়্যিদ আহমদ বেরেলভী (রঃ) ও তাঁর মুজাহিদ বাহিনীদের দেখা গেছে, তারা এমন এক জনমানবহীন প্রান্তরে অথবা জঙ্গলে মোরাকাবায় মুশাহেদায় মশগুল আছেন অথবা তিনি তার মুজাহিদ বাহিনীদের যুদ্ধ বিদ্যার প্রশিক্ষণ দিচ্ছিলেন। হঠাৎ দেখা গেল কোথা থেকে অচেনা, অজানা অপরিচিত লোক তাদের সামনে উপাদেয় খাদ্য ভরা পাত্র রেখে চলে গেছেন। এই ধরণের ঘটনা কেবলমাত্র তাঁর জীবনে একবার নয় বরং অসংখ্য ও বহুবার দেখা গিয়েছে।

 সিধুর যুদ্ধে মুনাফিকদের ষড়যন্ত্রে তাঁর খাদ্যের মধ্যে বিষ মিশ্রিত করা হয়েছিল। কিন্তু আল্লাহ্ পাক-এর অশেষ মেহেরবানী ও রহমতের কারণে তিনি সেই বিষ মিশ্রিত খাদ্যভক্ষণ করেও সুস্থতা লাভ করেছেন।

          ১৮৩১ সালে শিখদের সাথে বালাকোটের প্রান্তরে যুদ্ধ করতে গিয়ে তিনি শহীদ হয়েছেন। বড় আশ্চর্য ও বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে- ১৮৩১ সালের পর থেকে আজ ২০০০ সালের মধ্যেও অর্থাৎ এই দীর্ঘ প্রায় পৌণ্য দু’শ বছরের ব্যবধানে আজ পর্যন্ত কেউ তার মাযার শরীফের সন্ধান দিতে পারেনি। এমনকি বালাকোট ফেরত তাঁর বহু মুরীদ, খলীফা, মুজাহিদগণ পর্যন্ত যুদ্ধের ময়দানে শাহাদতের পর তার হুবহু শরীর মোবারক দেখেছেন একথারও কোন প্রমাণ বা স্বাক্ষ্য কোন কিতাবে মিলেনা।  (সুবহানাল্লাহ্)

          এ থেকেইে প্রমাণিত হয় যে, মুজাদ্দিদুয্যামান আমিরুল মু’মিনীন (রঃ) কত বড় আল্লাহ্ পাক-এর ওলী ছিলেন। এ ঘটনা আল্লামা নবাব ওয়াজীরুদ্ দৌল্লা (রঃ) তাঁর “ওয়াসীলে  ওয়াজীর আলা তরীকুল বাশীর ওয়ান নাজীর” কিতাবে, আল্লামা গোলাম রসূল মেহের তাঁর বিশ্ব বিখ্যাত “সাওয়ানে আহমদী” কিতাবে এবং শাইখুল হিন্দ, হযরত মাওলানা সাইয়্যিদ আবুল হাসান নদভী তাঁর সাড়া জাগানো সীরাত গ্রন্থ “সীরাতে সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ” কিতাবে বর্ণনা করেছেন।

          হযরত আমিরুল মু’মিনীন (রঃ)-এর জিহাদী আন্দোলনের দু’টি গতিধারা লক্ষ্য করা যায়। প্রথমতঃ ভারতভূমি হতে চিরতরে ইংরেজ শক্তির মূলোৎপাটন করা। দ্বিতীয়তঃ পাঞ্জাবের সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলো হতে শিখ ও পাঠান মুনাফিক মুসলমান সর্দারদের অস্তিত্ব মিটিয়ে দেয়া।

          কেননা শিখদের সাথে সীমান্তের পাঠান মুনাফিক মুসলমান সর্দারগণও স্বার্থের তাগীদে একত্রিত হয়ে গিয়েছিল। কারণ পূর্বে তারা ছিল স্বাধীন। সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোর দেখাশোনার ভার তাদেরই হাতে ন্যস্ত ছিল। তাই তারা জুলুম করে কৃষকদের ফসলের উপর সীমার অতিরিক্ত উশরের বোঝা চাপিয়ে দিয়েছিল। যদি কোন কৃষক উশর দানে অস্বীকৃতি জানাতো তবে তার বাড়ি-ঘরে হামলা চালানো হতো। এবং জায়গা বিশেষ তাদেরকে শিখদের হাতে তুলে দেয়া হতো। আর শরয়ী হুকুমত বলতে এদেরই নিয়মনীতি চলতো। শরীয়তের কোন আইন-কানুনই নিদিষ্টভাবে এই সমস্ত এলাকায় কখনোই চালু করা সম্ভব ছিলনা। একমাত্র এদের দৌরাত্ম্যের কারণে। অবশেষে আমিরুল মু’মিনীন হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ (রঃ)-এর আগমনের কারণে অত্র অঞ্চলগুলোতে শরীয়তের হুকুমাত পূর্ণভাবে চালু হয়। সাধারন মানুষ, কৃষক, দিন মজুর, ব্যবসায়ী যারা ছিল সর্দারদের হাতের পুতুল তারা হাফ ছেড়ে বাঁচলো। কিন্তু বেঁকে বসলো এই মুনাফিক সর্দারগণ যারা দীর্ঘদিন থেকে এ এলাকার রাজস্ব কর, খাজনা ও উষরের ভাগ  নিজেদের ঝুলিতে রাখত। এখন খলীফা সাহেব (রঃ)-এর আগমণের কারণে সেই অবৈধ বাড়তি সুযোগ-সুবিধা জীবনের তরে বন্ধ হয়ে গেল। তাই ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য তারা মুসলমান হয়েও মুনাফিকদের ভূমিকা পালন করে শিখদের সাথে গোপনে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলো।

          স্মরণ থাকা জরুরী যে, সিদুঁর যুদ্ধে এই মুনাফিক সর্দারদের মধ্যে ইয়ার মুহম্মদ খানের প্ররোচনাই হযরত আমিরুল মু’মিনীন (রঃ)-এর খাদ্যে বিষ মিশ্রিতি করা হয়েছিল। সাম্মাবাসীদের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে সেখানে শত শত মুজাহিদদের অকাতরে প্রাণ দিতে হয়েছিল। তারও একমাত্র কারণ ছিল এই পাঠান মুনাফিক মুসলমান সর্দারগণ। আর ধোকাবাজ সুলতান নজফ খানের কারসাজিতেই শের সিংহ তার বাহিনীসহ বালাকোটে এসে পৌছে। নতুবা কোন অবস্থাতেই বালাকোটে মুজাহিদদের ঘাটি সম্পর্কে তার জানা সম্ভব ছিলনা।

          বালাকোটের পশ্চিমে মাটিকোট টিলার পাশাপাশি শের সিংহ তার বাহিনী নিয়ে যুদ্ধের ছাউনি তৈরী করলো। লাহোরের শিখ সর্দার রনজিৎ সিং এর তরফ থেকে কড়া নির্দেশ ছিল যাতে খলীফা সাহেবের মুজাহিদ বাহিনীর সাথে শের সিং এর সৈন্যরা মরণপণ যুদ্ধ চালিয়ে যায়। ফলে বিশেষভাবে বালাকোটে শিখ সৈন্যদের মাশোহারা বৃদ্ধি করে দেয়া হয়। একদিকে ইংরেজ অপরদিকে এই সীমান্তবর্তী মুনাফিক পাঠান সর্দার যারা প্রত্যেকেই ছিল আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাইর চরিত্রে চরিত্র দুষ্ট। তারাও শিখদের সাথে একত্র হয়ে মুজাহিদের বিপক্ষ অবলম্বন করে। শিখদের মাটিকোট টিলায় আগমনের সংবাদ  শুনে হযরত আমীরুল মু’মিনীন (রঃ) ও তাঁর মুজাহিদ বাহিনীদের বিভিন্ন সারিতে বিভক্ত করেন। এবং প্রত্যেক দলের সাথে একজন আমীর নিয়োগ করে তাদের নির্দিষ্ট জায়গা অনুযায়ী মোতায়েন করে রাখেন। হযরত আমীরুল মু’মিনীন (রঃ)-এর তরফ থেকে ফরমান ছিল শিখ সৈন্যরা যতক্ষণ পর্যন্ত মাটিকোট টিলা অতিক্রম করে সমতল ভূমিতে এগিয়ে না আসবে ততক্ষণ পর্যন্ত মুজাহিদদের তরফ থেকে কোন প্রকার যেন গোলাগুলি ছোড়া না হয়। অবশেষে শিখদের তরফ থেকেই প্রথম আক্রমণ করা হয়। কিন্তু সেটা ছিল অতর্কিত এবং মুনাফিক পাঠান  মুসলমান সর্দারদের সহযোগীতায় অত্যন্ত কূট চালে এ পরিকল্পনা করা হয়। দিনের প্রথম পর্বে বা ভাগে মুজাহিদগণ প্রত্যেকেই তাদের ব্যক্তিগত কাজে ব্যস্ত ছিলেন। যেমন, এ সময় কেউ বিশ্রাম নিচ্ছিলেন, কেউ ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলেন, কেউ কেউ খাদ্য পাকাচ্ছিলেন, কেউবা জরুরতবশতঃ নিজের নির্দিষ্ট স্থান ত্যাগ করে অনত্র গিয়েছিল- অর্থাৎ শিখদের অতর্কিত আক্রমণের সময় মুজাহিদগণ সম্পূর্ণভাবে অপ্রস্তুত ছিলেন। তাদের মধ্যে যারা প্রহরী সৈন্য হিসেবে বিভিন্ন জায়গায় মোতায়েন ছিলেন তারাও হঠাৎ করে  এই ধরণের হামলার কথা কল্পনাও করতে পারেননি। ফলে পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়াই তাড়াহুড়া করে মুসলিম মুজাহিদগণ একত্রিত হয়ে পাল্টা আক্রমণ করার পূর্বেই শিখ সৈন্যরা শাহীন, রাইফেল, মীনজানিকের সাহায্যে তাঁদের উপর গোলাবারুদ নিক্ষেপ করতে থাকে। কার্তুজের ধোঁয়ায় মাটিকোট টিলা, বালাকোটের বস্তিগুলো এবং আকাশ অন্ধকারচ্ছন্ন হয়ে যায়। এ সময়ে মুজাহিদগণ জনে জনে শহীদ হতে লাগলেন। তারা একে অপরের সাহায্য-সহযোগীতা করারও সময়-সুযোগ পেলেননা।

          অবশেষে খলীফাতুল্লাহ্, আমীরুল মু’মিনীন হযরত সাইয়্যিদ আহ্মদ শহীদ বেরেলভী (রঃ) আমীরে মুজাহিদ হযরত মাওলানা ইসমাঈল শহীদ দেহলভী সাহেবও প্রাণপণে কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বহু শিখ সৈন্যদের জাহান্নামে পাঠিয়ে নিজেরাও  শাহাদতের শারাবান তাহুরা পান করলেন। এ যুদ্ধে  শত শত মুজাহিদ বাহিনী শহীদ হয়েছেন। এটা ছিল ১২৪৬ হিজরীর ২৪ জিলক্বদ মোতাবেক ইংরেজী ১৮৩১ সালের ৬ই মের ঘটনা।

          মূলতঃ বালাকোটের প্রান্তরে মুসলিম মুজাহিদদের বিরুদ্ধে যদি ইংরেজ ও মুনাফিক পাঠান সর্দারগণ সীমান্তে সহযোগীতা না করতো তবে মুজাহিদদের সাথে সম্মুখ যুদ্ধে শিখ সৈন্যরা কোন অবস্থাতেই তাদের সাথে মোকাবিলা করার সাহস পেতনা। কারণ রনজিৎ সিং ভাল করেই জানতো যে, খলীফা সাহেবের অল্প সংখ্যক জানবাজ মুজাহিদদের সাথে তার বিশাল ‘খালসা বাহিনী’ পেরে উঠবেনা। এরা আল্লাহ্ পাক-এর রাহের পথিক। মৃত্যু তাদের নিকট শীতল ঠান্ডা পানির চেয়েও অধিক প্রিয়। রাত্রির অন্ধকারে এরা সারারাত খোদার মুহব্বতে রুকু সিজদায় পড়ে থাকে। অথচ দিনের বেলায় যুদ্ধের ময়দানে এদের চেহারা-সূরত অন্যরূপ ধারণ করে। যুদ্ধের ময়দানে এরা একেকজন  মুজাহিদ সিংহের চেয়েও বেশী গর্জনশীল ও অধিক শক্তিশালী। তাই সে মুজাহিদদের দমন করার জন্য ইংরেজ সরকারের সাহায্য নেয় ও সীমান্তবর্তী পাঠান মুনাফিক সর্দারদের বিপুল পরিমাণ উৎকোচ বা ঘুষ দিয়ে তাদেরকে মুজাহিদদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছিলো।

          এ ঘটনা থেকে একথাই পরিস্ফুট হয়ে উঠে যে হযরত আমিরুল মু’মিনীন  (রঃ) ও তাঁর মুজাহিদ বাহিনীগণ শিখ সৈন্যদের সাথে ও তাদের সাথে আতাঁত করা মুসলমানদের চিরশত্রু খ্রীষ্টান ইংরেজদেরও বিরুদ্ধে জিহাদ করেছেন অথচ আহমদ রেযা খান সাহেব ও তার অনুসারীরা অপবাদ ও দূর্ণাম রটনা করেছে এঘটনা থেকে ইহাও প্রমাণিত হয় যে, হযরত সাইয়্যিদ সাহেব (রঃ) খৃষ্টান ও শিখদের সাথে আতাঁত করে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন প্রকৃতপক্ষে ইহা ডাহা মিথ্যা। যদি তিনি ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধই না করতেন তবে বালাকোট যুদ্ধের পর তার অবশিষ্ট মুজাহিদগণ যারা প্রাণে বেঁচেছিল তাঁদের থেকে বেছে বেছে কেন বিট্রিশ রাজশক্তি তাদের ফাসীর হুকুম জারী করলো? এবং আন্দামান দ্বীপপূঞ্জে যাবৎজীবন কারাদন্ড দিলো? ১৮৩১ সালের ২৬ বছর পর অর্থাৎ ১৮৫৭ সালে পুনরায় কেন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের  জোয়ারের গতিধারা সারা উপমহাদেশে ছড়িয়ে পড়েছিল? ১৯৪৭ সালে কেন ইংরেজ খেদাও আন্দোলন? বিলেতি দ্রব্য বর্জন ও দেশ বিভাগের প্রয়োজন দেখা দিলো?

মুজাহিদদেরকে “ওহাবী” আখ্যা দেয়া ইংরেজদের একটি বিরাট কুটচাল ও ষড়যন্ত্র

          হযরত আমিরুল মু’মিনীন, সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ (রঃ)-এর মুজাহিদ বাহিনীর শাহাদতের পর যাঁরা বেঁচে ছিল তাঁরা আবার নব উদ্দ্যেমে নতুন ভাবে জাগ্রত হয়ে উঠলো। এবার সরাসরি তারা বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে ঝাপ দিলো। তাদের আমীর নিযুক্ত হলো হযরত মাওলানা নাসিরুদ্দীন মঙ্গোলরী (রঃ), হযরত মাওলানা বেলায়েত আলী (রঃ) ও মাওলানা  ইনয়েত আলী (রঃ), মাওলানা আহমদুউল্লাহ্ আজিমাবাদী (রঃ), মাওলানা আব্দুর রহীম সাদিকপুরী (রঃ), “তাওয়ারীখে আজীবার” লেখক হযরত মাওলানা জাফর থানেশ্বরী (রঃ) ও অন্যান্য মুজাহিদ যারা জীবন বাজি রেখে ষড়যন্ত্রকারী বৃটিশ বিরোধীতা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন।

          বিদ্রোহের দাবানল আবার দাউ দাউ করে জ্বলে উঠতে দেখে বৃটিশ রাজ শক্তি জনমনে অসন্তোষ সৃষ্টি করার জন্য তাদের “ওহাবী” চিহ্নিত করে ধর-পাকড় শুরু করলো। কাউকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলালো এবং কাউকে সারা জীবন কারাদন্ড দিয়ে তার জীবন শেষ করেদিল। বৃটিশরা ইতিহাসের স্বাভাবিক গতিধারা পাল্টিয়ে দিলো। নির্ভূল নির্ভেজাল সত্যকে অসৎ উদেশ্য প্রণোদিত হয়ে ভারতের স্বাধীন সংগ্রাম আযাদী আন্দোলন এর ইতিহাসে তাঁরা মিথ্যার সংমিশ্রণ ঘটালো।

           যেমন, এ সম্পর্কে কলকাতা থেকে প্রকাশিত “চেপে রাখা ইতিহাস”- কিতাবের ২০৯ পৃষ্ঠায় বর্ণিত আছে, হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ)-এর ওফাত হওয়ার পর যে সব আন্দোলন, বিদ্রোহ বা সংগ্রাম সংগঠিত হয়েছিলো, সেগুলোকে বিকৃত করে (বৃটিশ রাজশক্তি) তাদের নাম পাল্টে কোনটাকে ‘সিপাহী বিদ্রোহ’ কোনটাকে ‘ওহাবী আন্দোলন’ বলেছে।

          উক্ত কিতাবের ২০৫ পৃষ্ঠায় আরো বর্ণিত আছে, আলিগড়ের সৈয়দ আহমদ ও বেরেলীর হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ (রঃ) দু’জনই ইতিহাস প্রসিদ্ধ মানুষ। তবে আলিগড়ের আহমদ সাহেবও পেয়েছেন ইংরেজদের পক্ষ থেকে ‘স্যার’ উপাধী, প্রচুর সম্মান, চাকুরীর পদন্নতি প্রভৃতি। আর বেরেলীর সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ (রঃ) ইংজেদদের পক্ষ থেকে পেয়েছেন অত্যাচার ও আহত হওয়ার উপহার। আর সব শেষে শত্রুদের চরম আঘাতে তাঁকে শহীদ হতে হয়েছে- ভারতবাসীকে শেষ উপহার হিসেবে দিয়ে গেছেন তিনি তাঁর রক্তমাখা কাটা মাথা মোবারক।

          এ সময়ই ধুরন্ধর ও শঠ প্রকৃতির খৃষ্টান লেখক উইলিয়াম হান্টার তার ঞযব ওহফরধহ গঁংষরসং গন্থ রচনা করে। অবশেষে সে স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে এবং বলেছে, “ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের মধ্যে ফাটল সৃষ্টির নিমিত্ত এই অপবাদ (ওহাবী বলা) ভারত বিপ্লবীদের মাথায় সুপরিকল্পিতভাবে আমরাই চাপিয়ে দিয়েছি।”

          সে তার ঞযব ওহফরধহ গঁংষরসং গ্রন্থের ৬৫/৬৬ পৃষ্ঠায় আরো লিখেছে, দেশদ্রোহীদের সকলকে সরকার কারাবাসে আটক রাখতে পারেন কিন্তু সমগ্র বিদ্রোহী দলটাকে কোনঠাসা করার আরও একটা সহজ উপায় আছে, সেটা হলো সাধারণ মুসলমান সমাজ থেকে তাদের আলাদা করে ফেলা। মুজাহিদদের সম্পর্কে মিথ্যা দুর্নাম ছড়িয়ে সে আরো লিখেছে, অসন্তোষের সামান্যতম মনোভাব সৃষ্টির আগেই অবাধ্য শ্রেণীকে (মুজাহিদদেরকে) অবশ্যই আলাদা  করে ফেলতে হবে এবং এটা করতে হবে সম্পূর্ণ ভদ্র প্রক্রিয়ায় অথচ শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে।”

          এই বৃটিশ লেখক মুসলমানদের চির শত্রু হান্টার তার ইতিহাস গ্রন্থে শুধু এতটুকু লিখেই ক্ষান্ত হয়নি বরং আমিরুল মু’মিনীন হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরলভী (রঃ) সম্পর্কে সে লিখিছে, পাঞ্জাব সীমান্তে বিদ্রোহীর শিবিরের পত্তন করে সৈয়দ আহমদ। কুখ্যাত এক দস্যু অশ্বারোহী যে সৈনিক হিসেবে জীবন আরম্ভ করে এবং বহু বছর যাবত মালওয়া অঞ্চলের আফিম সমৃদ্ধ গ্রামসমূহ লুটতরাজ চালায়। (ঞযব ওহফরধহ গঁংষরসং ১২৬)

          শত ধিক ঘৃণ্য  মুসলমানদের চিরশত্রু এই খৃষ্টান লেখক হান্টারকে। আফসোস ঐ সমস্ত রেযাখানী মাযহাবে বিশ্বাসী লোকদের জন্য, যারা হান্টারের ইতিহাস পড়ে মুসলমানকে ওহাবী, কাফির  বলে বেড়ায়।

          কোন মুসলমান আলেম, সূফি ঐতিহাসিদের দ্বারা কি খলীফাতুল্লাহ্, শহীদে আযম (রঃ)-এর  দস্যুবৃত্তি ও লুটতরাজ করার প্রমাণ মিলে? মুসলমানের চির শত্রু একজন খৃষ্টান লেখকের ধোকায় পড়ে এই জামায়াত পুরো আযাদী আন্দোলনের সিপাহ্সালারকে ওহাবী আখ্যা দিয়ে মুসলিম জনসমাজে ফিৎনা সৃষ্টি করে যাচ্ছে। শতধিক আফসুস তাদের জন্য।

হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ (রঃ)কে আহমদরেযা খানের ওহাবী ফতওয়া দানের বিপক্ষে পশ্চিম বঙ্গের আকাবিরে আলেমদের ফতওয়া

(১)

হযরত মাওলানা সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ (রঃ) সালিক ও ওলীগণের আমীর। তিনি সুন্নত জামায়াত ভক্ত ছিলেন। চার মাযহাব সত্য বলে বিশ্বাস  করতেন। তার শিষ্য হযরত মাওলানা কারামত আলী (রঃ) ওহাবী লা-মাযহাবীদের প্রতিবাদ করেছেন। আরব, আযম, হিন্দুস্থান ও বাংলার জাহেরী-বাতেনী কামালতে পূর্ণ বড় বড় অদ্বিতীয় আলেমগণ যাদের দ্বারা র্শিক, বিদ্য়াত দুরিভূত হয়েছে। তাঁরা উক্ত সাইয়্যিদ সাহেব (রঃ)-এর মুরীদ ছিলেন। তাঁরা সকলেই মাযহাব অবলম্বণকারী ছিলেন। হযরত সাইয়্যিদ সাহেব (রঃ) হযরত মাওলানা শাহ আব্দুল আজীজ মুহাদ্দিস দেহলভী (রঃ)-এর খাছ মুরীদ ছিলেন। যে ব্যক্তি এইরূপ তরিকত ও শরীয়তের হাদী, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বংশধর ও কামিল মুর্শিদের উপর অযথা অপবাদ প্রয়োগ করে সে ব্যক্তি গুণাহ্গার, বদ্কার, মিথ্যাবাদী ও অপবাদকারী ব্যতীত আর কিছুই নয়। যে ব্যক্তি এই ধ্রুব সত্যকে অস্বীকার করে তবে সে ব্যক্তি ভ্রান্ত, সত্য পথ ভ্রষ্ট। (সৈয়দ আব্দুর রশীদ (রঃ) ষষ্ঠ মুদাররিস- আলিয়া মাদ্রাসা, কলিকাতা)

(২)

আল্লাহ্ পাক জনাব  সাইয়্যিদ আহমদ (রঃ)-এর দ্বারা বহু মুসলমানকে বিদ্য়াত হতে মুক্ত করে উজ্বল সুন্নতের অনুসারী করেছেন, সত্যপথ প্রাপ্ত হয়েছেন, তাদের মধ্যে একজন হাফেজ, ক্বারী হাজী কারামত  আলী জৈনপুরী (রঃ) দ্বিতীয় হাফেজ, হাজী, গাজী, মাওলানা জামালুদ্দীন সাহেব ছিলেন। যে ব্যক্তি তাঁদের বিরুদ্ধাচরণ করবে এবং তাদের হিদায়তের প্রতি ইন্কার করবে সে ব্যক্তি মেধাহীন ও গোমরাহ্ এবং হিদায়েত ও সত্যপথ ভ্রষ্ট। (হযরত মাওলানা আহম্মদুল্লাহ্ (রঃ) সপ্তম মুদাররিস-আলিয়া মাদ্রাসা কলিকাতা)

(৩)

জনাব সাইয়্যিদ আহমদ (রঃ) ও মাওলানা কারামত আলী (রঃ) ধর্ম ভীরু ও পরহেজগার ছিলেন, তিনি ওহাবী ছিলেন না। (মাওলানা মুহম্মদ ইসমাইল (রঃ) অষ্টম মুদাররিস- আলিয়া মাদ্রাসা কলিকাতা)

(৪)

দ্বীনদার গণের শিরোভূষণ, পরহেজগারদের অগ্রণী, প্রবীন হাদী শ্রেণীর আদর্শ, প্রবীন ওলীগণের নেতা হযরত সাইয়্যিদ আহমদ (রঃ) হানাফী ধর্মভীরু ওলী আল্লাহ্ ও উজ্জ্বল শরীয়তের আলেম ছিলেন। ছোট বড় সকলেই তিনি কর্তৃক সত্য পথ প্রাপ্ত হয়েছেন। (হযরত মাওলানা মুহম্মদ আশরাফ (রঃ), নবম মুদাররিস- আলিয়া মাদ্রাসা কলিকাতা)

(৫)

জনাব হযরত মুজাদ্দিদ সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ সাহেব (রঃ) খাঁটি হানাফি ছিলেন ও তাঁর ত্রিশ লক্ষ হানাফি মুরীদ ছিলো। এক্ষেত্রে যদি মাযহাব বিদ্বেষীদল নিজেদেরকে তার তাবেদার বলে দাবী করেন তবে হযরত সাইয়্যিদ সাহেব (রঃ) কি এই জন্য ওহাবী হবেন? যদি কেউ তার নিকট মুরীদ হয়ে থাকে বা তাঁর সঙ্গ অবলম্বন করে থাকে তবে তিনি কি ওহাবী? হযরত আলী (রাঃ)-এর সঙ্গে কত রাফেজী শিয়ারা থাকতো এবং তার নিকট বাইয়াত হয়েছিল এতে হযরত আলী (রাঃ)কে শিয়া, রাফেজী বলবেন কি? যদি হযরত সাইয়্যিদ সাহেব (রঃ) ওহাবী হতেন তবে মক্কা শরীফ, মদীনা শরীফের গাউস, কুতুব, ওলী, মুদাররিস, মুফতী, ইমাম ও ওয়ায়েজগণ, হিন্দুস্থানের নামজাদা আলেমগণ তাঁর নিকট মুরীদ হতেন না ও  বঙ্গের বড় বড় নামজাদা আলেমগণ তাঁর নিকট মুরীদ হতেন না। আর তিনি তরিকতে হযরত নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কদমের উপর ছিলেন। এইজন্য তিনি নিজ তরিকাকে মুহম্মদীয়া তরিকা বলতেন। ইহা কাদেরীয়া, চিশ্তিয়া, নক্শবন্দীয়া, সোহ্রাওয়ার্দীয়া ইত্যাদি তরিকাগুলোর অন্তর্ভূক্ত। কাজেই লা-মাযহাবীদের ওহাবী হওয়ার দাবী এবং হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ সাহেব(রঃ)-এর ওহাবী হওয়ার দাবি পৃথক পৃথক। হযরত সাইয়্যিদ সাহেব (রঃ)-এর মাযহাব হানাফি এবং তাঁর তরিকার নাম মুহম্মদীয়া। (মাওলানা রুহুল আমীন (রঃ) বশিরহাট)

(৬)

আলী জনাব মায়ালী আলকাব। জাহেরী বাতেনী কামালতের অধিকারী দ্বীনি-দুনিয়াবী গুণাবলীর ভান্ডার, বিদ্য়াত ধ্বংসকারী শরীয়ত প্রচারক জামানার গাওছ, জামানার অদ্বিতীয় ও আল্লাহ্ তায়ালা হতে সাহায্য প্রাপ্ত জনাব সাইয়্যিদ সাহেব (কোঃ সেঃ আঃ) সুন্নি হানাফী ছিলেন। তাঁর খলিফা আলেমে রব্বানী ও অদ্বিতীয় ফাজেল জনাব মৌলভি কারামত আলী (রঃ) মরহুম মগফুর সাহেব ও হানাফী মাযহাব ভুক্ত ছিলেন। কখনও কেউ যেন উক্ত দুই বুযুর্গের সম্বন্ধে বাতিল ধারণা না করেন। (মাওলানা বিলায়েত হুসাইন (রঃ), দ্বিতীয় মুদাররিস, আলিয়া মাদাসা, কলিকাতা)

(৭)

          জনাব হযরত ওলিগণের শিরোভূষন সাইয়্যিদ আহমদ (কোঃ সিঃ আঃ) বড় দলের ওলী ও হানাফি মাযহাব অবলম্বনকারী ছিলেন এই সমুজ্জ্বল সূর্য দ্বারা একটি জগৎ আলোকময় হয়েছে। যে বা যারা তাঁর দুর্নাম ও অপবাদ করে সে ব্যক্তি গোমরাহ্ ও ভ্রান্তকারী। অপবাদকারীকে এইরূপ কুধারণা হতে তওবা করা উচিৎ। (মাওলানা সুলায়মান আব্বাসী (রঃ), চতুর্থ মুদাররিস, আলিয়া মাদ্রাসা, কলিকাতা)

(৮)

জনাব হযরত সাইয়্যিদ আহমদ সাহেব (রঃ) মরহুম মৌলভী কারামত আলী (রঃ) অতিশয় ধর্মভীরু ও পরহেজগার ছিলেন। বহু সহস্র লোক তাঁর সঙ্গ লাভে সত্য প্রাপ্ত হয়েছেন। কেউ যেন কিছুতেই তাঁদের সম্বন্ধে কুধারণা পোষণ না করেন নচেৎ নিজের ক্ষতি সাধন করবে।  (মাওলানা শাহাদত হুসাইন (রঃ), তৃতীয় মুদাররিস, আলিয়া মাদ্রাসা, কলিকাতা)

(৯)

সালেকদের অগ্রণী ও ওলীগণের নেতা হযরত মাওলানা সাইয়্যিদ (রঃ)কে ওহাবী বলা একেবারে মিথ্যা অপবাদ, দ্বীনের বুযুর্গগণের দুর্নাম ও অপবাদ করা অন্যায় আচরণ ও গোমরাহ্ী। (মাওলানা আহমদ (রঃ), প্রথম মুদাররিস, আলিয়া মাদ্রাসা, কলিকাতা)

(১০)

যে ব্যক্তি জামানার ওলী ও জামানার আলেমগণের নেতা হযরত সাইয়্যিদ (রঃ)-এর প্রতি দোষারোপ করে সে ব্যক্তি ভ্রান্ত ও বিভ্রান্তকারী হওয়াতে কোন সন্দেহ নেই। বুযুর্গ লোকদের সম্বন্ধে বে-আদবি পূর্ণ ও অনুপযুক্ত কথা বলা যোগ্যতা আল্লাহ্ পাক-এর অনুগ্রহ লাভ হতে বঞ্চিত থাকার কারণ। (কাজি আব্দুল খালেক, শিয়ালদাহ্, কলিকাতা)

(১১)

হযরত সাইয়্যিদ সাহেব ও মাওলানা কারামত আলী (রঃ) বিনা সন্দেহে আল্লাহ্ পাক-এর ওলী ছিলেন। ওহাবীদের প্রতিবাদ করতেন। তাসাউফের অদ্বিতীয় আলেম, মুহাদ্দিস, তাফসীর, তত্ত্ববিদ ও পরহেজগার ছিলেন। সহস্র সহস্র সুন্নী-এর নেতা এবং বঙ্গ দেশে অদ্বিতীয় আলেম ছিলেন। (মাওলানা আজিজুর রহমান (রঃ), কলিকাতা চাঁদনি বাজার মসজিদের ঈমাম, মাওলানা মুহম্মদ নাছিরুদ্দিন (রঃ), ধর্মতলা মসজিদের ইমাম)

(১২)

বিদ্য়াত ধ্বংসকারী, গোমরাহ্ী মিটানেওয়ালা, হযরত মাওলানা সাইয়্যিদ আহমদ সাহেব (রঃ) একজন আলেম কাশ্ফ শক্তি সম্পন্ন উচ্চ দরজার ওলি ছিলেন। যে ব্যক্তি তাঁর উপর দোষারোপ করে সে সত্য পথ ত্যাগ করতঃ গোমরাহ্ীতে নিমর্জিত আছে।  (মাওলানা মুহম্মদ সিদ্দিক আহমদ, মুদাররিস, হুগলি মাদ্রাসা)

আফজালুল আউলিয়া, মুজাহিদে আযম, আমিরুল মু’মিনীন,  হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ)-এর লিখিত কিতাব সম্পর্কে

সহীহ্ রেওয়াতে ও বিশ্বস্ত বর্ণনা মতে রঈসুল মিল্লাত, আফজালুল আউলিয়া, হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ)-এর স্বহস্তে লিখিত কোন কিতাব নেই। এ কথাটি ঐতিহাসিক সত্য। এ বিষয়ে আমরা নির্দ্বিধায় বলতে পারি যে, আল্লাহ্ পাক-এর জমিনে এমন কোন সন্তান জন্মগ্রহণ করেনি যে প্রমাণ করতে পারবে যে, হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ)-এর রচিত বা লিখিত কোন কিতাব রয়েছে; কিন্তু একটি স্বার্থান্বেষী ও সংখ্যা লঘু জামায়াত নফ্সের তাড়নায় উদ্ভূদ্ধ হয়ে হযরত ইসমাঈল শহীদ দেহলভীর রচিত “সিরাতুল মুস্তাকিম” কিতাবখানা অত্যন্ত কূটচালে তাঁর নামে চালিয়ে দিবার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। তাদের মতে উক্ত কিতাবের বিষয়বস্তু ও আপত্তিকর কথাবার্তা স্বয়ং হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ)-এর নিজের এবং এটাকে কিতাব আকারে রূপ দিয়েছেন হযরত মাওলানা ইসমাঈল শহীদ সাহেব। কিন্তু হিন্দুস্থান ও বাংলাদেশের জমহুর বিখ্যাত ও নামজাদা আলেমগণের বক্তব্যনুযায়ী এ কথা সম্পূর্ণ মিথ্যা যার ঐতিহাসিক কোন প্রমাণ খুঁজে পাওয়া যায় না।

          শ্রদ্ধেয়, বরেণ্য, আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের এই বড় জামায়াতের বক্তব্য ও বর্ণনা থেকে বুঝা যায় বৃটিশ মদদপুষ্ট এক শ্রেণীর হিংসুক, বিরুদ্ধবাদী, ষড়যন্ত্র করে মানুষের নিকট তাঁকে হেয় প্রতিপন্ন করার মানসে তাঁকে ওহাবী বলার সাথে সাথে উক্ত বহুল সমালোচিত “সিরাতুল মুস্তাকিম” কিতাবটিও তাঁর নামে জনসমাজে অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ভাবে ছড়িয়ে দিয়েছে। এই বড় জামায়াতের সাথে আমরাও সম্পূর্ণ একমত। আমাদের মতেও হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ)-এর স্বহস্তে লিখিত বা রচিত কোন কিতাব আল্লাহ্ পাক-এর জমিনে নেই। এবং একথা কেউ দলীল-আদিল্লাহ্ ও সুত্রসহ প্রমাণও করতে পারবে না যে, এটি তারই লিখিত কিতাব।

          মূলতঃ এই কিতাবের লেখক হচ্ছেন, হযরত মাওলানা ইসলামাঈল শহীদ দেহলভী সাহেব।

          আর ইসমাঈল দেহলভী সাহেব যদি তার কিতাবে কিছু আপত্তিকর কথাবার্তা লিখে থাকেন তার জন্য তিনি নিজেই দায়ী হবেন বা তার জবাবদিহী তিনিই করবেন। সেইজন্য রঈসুল আউলিয়া, আমিরুল মু’মিনীন, হযরত সাইয়্যিদ শহীদ আহমদ বেরেলভী (রঃ)কে কোন প্রকারেই দায়ী বা দোষী সাব্যস্ত করা জায়েয নয়।

কারণ আল্লাহ্ পাক বলেন, ولاتزر وازرة وزر اخرى.

অর্থঃ- “এক জনের গুণাহ্রে বোঝা অন্যজন বহন করবেনা।” অর্থাৎ একজনের জন্য অন্যজন দায়ী হবেনা। (সূরা আনআম/১৬৪)

          এরপরও যদি হযরত সাইয়্যিদ শহীদ আহমদ বেরেলভী (রঃ)কে দোষারোপ করা হয় তাহলে তা হবে সম্পূর্ণরূপে কুরআন-সুন্নাহ্র খেলাফ। যা নাজায়েয ও হারাম।

          আর যারা বলেন, “সিরাতুল মুস্তাকীম” কিতাব হচ্ছে, হযরত সাইয়্যিদ শহীদ আহমদ বেরেলভী (রঃ)-এর মুখনিসৃত বাণী বা উনার বয়ান যা শুনে হযরত ইসমাঈল শহীদ সাহেব তা কিতাব আকারে রূপ দিয়েছেন তাহলে ইসমাঈল শহীদ সাহেব কি করে দোষী সাব্যস্ত হবেন? আমাদের জবাব হলো, যে ব্যক্তি  কোন মুহাক্কিক ওলী আল্লাহ্র বয়ান শুনে তা লিপিবদ্ধ করে কিতাবের আকারে রূপ দেয় উক্ত কিতাবের ভুল-ত্রুটির জন্য সংকলকই দায়ী থাকে।

          উল্লেখ্য যে, হাদীস শরীফ সম্বলিত অনেক কিতাব রয়েছে যার মধ্যে মওজু মতরুক অর্থাৎ গায়ের সহীহ্ হাদীস শরীফও রয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে- এ সমস্ত মওজু মতরুকও গায়ের সহীহ্ হাদীস শরীফের জন্য কি স্বয়ং আল্লাহ্ পাক-এর রাসূল হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দায়ী বা দোষী সাব্যস্ত হবেন? না এর সংকলক দায়ী ও দোষী সাব্যস্ত হবেন?

          যদি সংকলক দায়ী ও দোষী বলে সাব্যস্ত হন তাহলে হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ)-এর মুখ নিসৃতবাণী সংকলন করার কারণে তার মধ্যস্থ ভুল-ত্রুটির কারণে একইভাবে সংকলকই দায়ী বা দোষী বলে সাব্যস্ত হওয়ার কথা। তাহলে এ ব্যাপারে কি করে হযরত সাইয়্যিদ আহমদ বেরেলভী (রঃ)কে দোষারোপ করা যেতে পারে?

          জানা আবশ্যক যে, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র হস্ত মোবারকে বাইয়াত হয়ে কত নামধারী কপট মুনাফিক মুসলমান তাঁর সাথে যুদ্ধ-জিহাদ করেছে। তাঁর পিছনে মুক্তাদী সেজে সালাত(নামাজ) আদায় করেছে। সর্বক্ষণই তারা হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর চারপাশে তাঁকে ছায়ার মত ঘিরে থাকতো। অথচ এক সময় এরাই তাঁর পবিত্র সহধর্মিনী (রাঃ)-এর উপর অর্থাৎ উম্মাহাতুল মু’মিনীন (রাঃ)গণের উপর মিথ্যা তোহ্মত, অপবাদ দিয়ে গোটা নবী পরিবারে বিষের আগুণ লাগিয়ে দিয়ে রাহমাতুল্লীল আলামীনকে যারপর নাই তাকলীফ(কষ্ট) দিয়েছে।

          তেমনি পূর্ববর্তী ইহুদী-নাছারাদের নবী-রাসূল (আঃ) যেমন হযরত মূসা (আঃ)-এর উপর তাওরাত শরীফ, হযরত দাউদ (আঃ)-এর উপর যাবুর শরীফ, হযরত ঈসা (আঃ)-এর উপর ইনজিল শরীফ নাযিলকৃত আসমানী কিতাব যা-কিনা তাদের মন মত হয়নি। তাই তারা তাদের চাহিদানুযায়ী উক্ত পবিত্র আসমানী কিতাবগুলোর বিকৃতি ঘটিয়ে অর্থাৎ নিজেদের মনগড়া অভিমত উক্ত পবিত্র গ্রন্থে ঢুকিয়ে মুল আসমানী কিতাবগুলোর অস্তিত্বই নষ্ট করে ফেলেছে। এখন উক্ত চির পথভ্রষ্ট, গোমরাহ্ ইহুদী-নাছারাদের জন্য কি তাদের নবী রাসূল (আঃ)গণকে দোষারোপ করা হবে? (নাউযুবিল্লাহি মিন যালিক)

          হযরত আলী (রাঃ)-এর মুহব্বতের দাবীদার বহু শিয়া, রাফেজী, খারেজী তাঁর জীবিত অবস্থাতেই তাঁকে তাদের ইমাম মানতো এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের প্রথম দু’খলীফাদের চেয়ে তাঁকে শ্রেষ্ঠ মনে করত। যদিও বা হযরত আলী(রাঃ) এটা একদমই পছন্দ করতেন না। এই খারেজী, রাফেজী, শিয়া সম্প্রদায় যারা হযরত আলী (রাঃ)কে সকলের চেয়ে অধিক মুহব্বত করতো বা করে থাকে তাদের ভ্রান্ত ও গোমরাহ্ী আক্বীদার জন্য হযরত আলী (রাঃ)কে কি তাদের পথ প্রদর্শক বা আমীর ধরে নেয়া যাবে? (নাউযুবিল্লাহ্ মিন যালিক)

          তদ্রুপ হযরত আমিরুল মু’মিনীন হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ)-এর উচ্চ কামালত বেলায়েতের দরজা হাছিল হওয়ার সংবাদ শুনে বহু খারেজী, ওহাবী, মুনাফিক, বিদ্য়াতী, লা-মাযহাবী  দল তাঁর হাতে হাত রেখেছে এখন তাদের ভ্রান্ত ও বদ্ আক্বীদার জন্য তো আর তিনি দায়ী নন।

          আর যদি প্রকৃত অর্থেই তাই হয় অর্থাৎ হযরত ইসমাঈল শহীদ দেহলভী সাহেবের জন্য হযরত মুজাহিদে মিল্লাত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ)কে দোষী সাব্যস্ত করা হয় তবে কাবিলের জন্য হযরত আদম (আঃ)কে, কেনানের জন্য হযরত নূহ্ আলাইহিমুস্সালামকে, আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাইর জন্য আল্লাহ্ পাক-এর রাসূল হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এবং ইয়াজিদের ভুল-ত্রুটির জন্য বিরূদ্ধবাদীদের মতে হযরত মুয়াবিয়া (রাঃ) দোষি সাব্যস্ত হবেন।

          নিরেট মূর্খ জাহেল, বিদ্য়াতী, গোমরাহ্, পথভ্রষ্ট সম্প্রদায় ব্যতীত কেউই এ ধরণের আক্বীদা ও চিন্তাভাবনা করবেনা কস্মিলকালেও।

          উপরোক্ত বিস্তৃতি ও তথ্যবহুল সমৃদ্ধ আলোচনা শেষে এই বিদ্য়াতী ফিরকাবন্দীদের  আমরা দ্ব্যর্থহীন ও বলিষ্টকক্তে বলতে চাই যদি তারা সত্যবাদী ও হক্বের অনুসন্ধানকারী হয়ে থাকে তবে তারা যেন মুজাহিদে মিল্লাত, মুহিয়্যূস্ সুন্নাহ্, দাফিউল বিদ্য়াত, রুহুল হাক্কে, সানদোল মাশায়েখ, মুজাহিদে আকবর, ত্রয়োদশ শতাব্দীর মুজাদ্দিদ, খলীফাতুল্লাহ্, আমীরুল মু’মিনীন হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ)-এর স্বরচিত কিতাব থেকে লিখিত কোন আপত্তিকর বাক্য উদ্ঘাটন করে দেখাক যা তার ওহাবী ও কাফির হওয়ার পরিচয় বহন করে। এবং হযরত ইসমাঈল শহীদ দেহলভী সাহেবের রচিত “সীরাতুল মুস্তাকিম” কিতাবের বিভ্রান্তিমূলক বাক্যগুলো যে তারই লিখা তা তারা প্রমাণ করুক। অন্যথায় পৃথিবী বিখ্যাত একজন  আফজালুল ওলী, মুজাদ্দিদুয্যামান-এর বিরুদ্ধে মিথ্যা তোহ্মত, কুফরী ফতওযা বা অপবাদ দেয়ার কারণে উক্ত তোহ্মত বা কুফরী ফতওযা তাদের উপরই বর্তাবে।

          এ প্রসঙ্গে হাদীস শরীফে বর্ণিত রয়েছে-

وعن ابى الدرداء قال سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول ان العبد اذا لعن شيئا صعدت اللعنة الى السماء فتغلق ابواب السماء دونها ثم تهبط الى الارض فتغلق ابوابها دونها ثم تأخذ يمينا شمالا فاذا لم تجد مساغا رجعت الى الذى لعن فان كان لذلك اهلاوالا رجعت الى قائلها رواه ابو داود.

অর্থঃ- হযরত আবূ দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া  সাল্লামকে বলতে শুনেছি তিনি বলেছেন, যখন বান্দাহ কোন বস্তুকে বা কাউকে অভিসম্পাত করে, তখন সে অভিসম্পাত আকাশের দিকে উঠতে থাকে,তখন আকাশের দরজা বন্ধ করে দেয়া হয়। অতঃপর ঐ অভিসম্পাত যমীনের দিকে প্রত্যাবর্তন করে। তখন যমীনের দরজাও বন্ধ করে দেয়া হয়। অতঃপর উহা ডান দিকে ও বাম দিকে যায় এবং সেখানেও যখন কোন রাস্তা না পায়, শেষ পর্যন্ত সেই ব্যক্তি বা বস্তুর দিকে প্রত্যাবর্তন করে যার প্রতি অভিসম্পাত করা হয়েছে। যদি সে অভিসম্পাতের উপযুক্ত হয় তবে তার উপরে আপতিত হয়। অন্যথায় (যদি সেই ব্যক্তি বা বস্তু অভিসম্পাতের উপযুক্ত না হয়) অভিসম্পাতকারীর দিকেই ফিরে আসে।” (আবূ দাউদ শরীফ)

          কাজেই যারা সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ)কে বিনা প্রমাণে কাফির ফতওয়া দেয় বা দিবে তাদের স্মরণ রাখতে হবে যে, হযরত সাইয়্যিদ আহমদ বেরেলভী (রঃ) কোন কুফরী না করার কারণে এই ফতওয়া তাদের উপরই বর্তাবে।

          উল্লেখ্য যে, এমনও হতে পারে উক্ত কিতাবের যেসমস্ত আপত্তিকর বিভ্রান্তমূলক কথা-বার্তা পরিলক্ষিত হয় তা হচ্ছে- হিংসুক ও নিন্দুকের নিন্দার ফসল। অর্থাৎ বৃটিশ সরকার ও তাদের পদলেহী দালালেরা উক্ত কুফরীমূলক বাক্য হযরত ইসমাঈল শহীদ দেহলভী সাহেবের “সিরাতুল মুস্তাকিম” কিতাবে প্রবেশ করিয়ে দিয়েছে। কারণ এই কিতাব ১২৩৩ হিজরীতে লিখিত হয়েছে আর প্রকাশ করা হয়েছে ১৩৩৪ হিজরীতে তখন হযরত শাহ্ আব্দুল আজীজ মুহাদ্দিস দেহলভী (রঃ) জীবিত ছিলেন। যদি সীরাতুল মুস্তাকীম কিতাবে কুফরীমূলক আক্বীদা উল্লেখ থাকতো তাহলে হযরত শাহ্ আব্দুল আজীজ মুহাদ্দিস দেহলভী (রঃ) অবশ্যই তাকে সতর্ক করে শুধরিয়ে দিতেন।

          আরো উল্লেখ্য যে, হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ)কে যদি হযরত ইসমাইল শহীদ দেহলভী সাহেবের জন্য দোষারোপ করতে হয় তবে প্রথম দোষারোপ করতে হবে  ইসমাঈল শহীদ দেহলভী সাহেবের চাচা ও প্রথম পীর সাহেব হযরত শাহ্ আব্দুল আজীজ মুহাদ্দিস দেহলভী (রঃ)কে। কারণ তিনি তার সোহ্বতে থেকে তা’লীম-তরবিয়ত পেয়ে ইল্মে ফিক্বাহ্ ও ইল্মে তাসাউফে পূর্ণতাপ্রাপ্ত হয়ে খিলাফত লাভ করেন।

 তাঁর সম্পর্কে সিরাজুল হিন্দ, হযরত শাহ্ আব্দুল আজীজ মুহাদ্দিস দেহলভী (রঃ) তাঁর এক মাকতুবে তাঁকে হুজ্জাতুল ইসলাম (ইসলামের দলীল), তাজুল মুফাস্সীরিন (মুফাস্সীরগণের মাথার মুকুট), ফখরুল মুহাদ্দিসিন (হাদীস শরীফ বিশারদগণের গৌরব) বলে তাঁর উচ্চ প্রশংসা করেন।”

          পরবর্তীতে হযরত শাহ্ আব্দুল আজীজ মুহাদ্দিস দেহলভী (রঃ) সাহেবের নির্দেশে ইল্মে তাসাউফে আরো তরক্কী হাছিলের জন্য হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ)-এর নিকট বাইয়াত গ্রহণ করেন।

          আর যদি উক্ত কিতাবের বিভ্রান্তি ও আপত্তিকর কথা-বার্তাগুলো সত্যিই হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ)-এর নিজের হতো তবে মক্কা শরীফ, মদীনা শরীফ, মিশর, আফ্রিকা, আফগানিস্থান, ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশসহ বহু দেশের লক্ষ লক্ষ মুরীদ শত শত হাজার হাজার আকাবিরে আলেম মুরীদগণ কি তাঁকে এ ব্যাপারে সচেতন করাতেন না? বাংলা, ভারতসহ মক্কা শরীফ, মদীনা শরীফ ও মিশরের আলেমগণ যারা তাঁর নিকট মুরীদ হয়ে খেলাফত লাভের যোগ্যতা অর্জন করেছিলেন তারা কি এ সমস্ত কথা মেনে নিয়েছিলেন? তারা কি এ সমস্ত আপত্তিকর ও বিভ্রান্তিমূলক বাক্য শ্রবণ করে তাঁর নিকট বাইয়াত হয়েছিলেন? না আল্লাহ্ পাক-এর দরবারে তাঁর মর্যাদা মর্তবা ও উচ্চ বেলায়েতের দরজা হাছিল হবার সুসংবাদ শুনে তাঁর নিকট মুরীদ হয়েছিলেন? হযরত সাইয়্যিদ আহ্মদ বেরেলভী (রঃ)-এর সিলসীলা থেকে ফয়েজপ্রাপ্ত হয়ে শুরু থেকে এ পর্যন্ত লক্ষ লক্ষ গাউস, কুতুব, আবদাল, নুকাবা, নোজাবা ইত্যাদি হয়েছেন এমনকি গত শতকের মুজাদ্দিদ কুতুবুল আলম, কাইউমুয্যামান, মুহিউস্ সুন্নাহ্, মুজাদ্দিদুয্ যামান, হযরত আবু বকর সিদ্দীক ফুরফুরাবী (রঃ)ও ওনার সিলসিলার অন্তর্ভূক্ত। তাহলে তাদের কথামত তিনি যদি কুফরী করে থাকেন, আর যে কুফরী করে সে কাফের হয়। তাহলে একজন কাফেরের সিলসীলা থেকে কি করে লক্ষ লক্ষ গাউস, কুতুব, আবদাল ও মুজাদ্দিদের আবির্ভাব ঘটাতে পারে?

কুরআন-সুন্নাহ্র দলীল ব্যতীত অর্থাৎ বিনা দলীলে একাধিক লোক যদি কাউকে মনগড়া ফতওয়া দিয়ে কাফির সাব্যস্ত করে তাহলে সে কি কাফির হবে?

অতএব, নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত কিতাবসমূহ থেকে উপরোক্ত সংক্তিপ্ত আলোচনা দ্বারা এটাই সাব্যস্ত হলো যে, সাইয়্যিদুল আওলিয়া, দলিলুল আরিফীন, রুহুল হাক্কে, সিরাজুল উম্মত, আসাদুল্লাহ্, সাহিবুল আসরার, সাইয়্যিদুল আবেদীন, মুহিয়্যুস্সুন্নাহ্, দাফেউল বিদ্য়াত, আলামুল হুদা, মুজাদ্দিদে মিল্লাত খলীফাতুল্লাহ্ ফিল আরদ, আওলাদে রাসূল, আমিরুল মু’মিনীন হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী ওয়াল হানাফী ওয়াল কাদেরী ওয়াল চিশ্তী ওয়ান নকশ্বন্দী মুজাদ্দেদী ওয়াল মুহম্মদী (রঃ) ছিলেন ত্রয়োদশ শতাব্দীর মুজাদ্দিদুয্যামান। কাজেই তিনি যদি দলীলবিহীন ফতওয়ার কারণে কাফির সাব্যস্ত হন তাহলে একই কারণে আহমদ রেযা খান সাহেবও তাঁর চেয়েও বড় কাফির বলে গণ্য হবে। কারণ হযরত শহীদে আযম সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ)কে যত লোক কাফির ফতওয়া দিয়েছে তার চেয়ে বেশী লোক আহমদ রেযা খান সাহেবকে কাফির, গোমরাহ্, বিদ্য়াতী, কাজ্জাব, দালাল, কাদিয়ানী, রাফেজী, শিয়া, ধোকাবাজ, ফিৎনাবাজ, বদ্কার, অপবাদকারী, পথভ্রষ্ট, খিনজির ইত্যাদি বলে ফতওয়া দিয়েছে। তার কিছু দলীল নিম্নে পেশ করা হলো-

(১) রেযা খানী মাযহাব, (২) আস সাহাবুল মিদরার, (৩) আল খাতামু আলা  লিসানিল খাসমি, (৪) বাসতুল বানা, (৫) কাতুয়ুল ওয়াতীন, (৬) আত তাজদিকাত লি দাফয়িত তালবীসাত, (৭) আশ শিয়াবুছ ছাকিব আলাল মুস্তাকিল কাযিব, (৮) কারামতে আহম্মদী, (৯) আল জাওয়াবুল মাহ্মুদ আন আকাযীবি রাহতিল হাসুদ, (১০) তাযকেরাতুল খাওয়াতীর, (১১) সাইফে ইয়ামানী বর হলক্বমে রেযা খানী, (১২) খানযারে ইয়ামানী বর গরদানে রেযা খানী, (১৩) আত্ তাছদীকাত লি দফইত তালবীসাত, (১৪) সায়ে কায়ে আসমানী, (১৪) বারাআতুল আবরার, (১৫) তালকিছুল মাকাল, (১৬) মুনকারাতুল কুবুর, (১৭) ইরশাদুল উম্মাহ্ ইলাত তাফরীকাতে বাইনাল বিদ্য়াতে ওয়াস্ সুন্নাহ্, (১৮) আল মঞ্জুমাতুল মুখতাছারা, (১৯) আল বায়ানুল ফাসিল বাইনাল হাক্কি ওয়াল বাতিল, (২০) সুন্নত বিদ্য়াতের পার্থক্য, (২১) সত্যের দিকে করুণ আহবান, (২২) ওহাবীদের ইতিহাস, (২৩) রেজভী ধর্মমতের স্বরূপ, (২৪) প্রকৃত ওহাবী কারা, (২৫) রেজভী ফিৎনা, (২৬) একখানা বিজ্ঞাপন রদ, (২৭) রেজভী ফিৎনার ষ্টাইল ইত্যাদি।

          অতএব, উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা প্রথমতঃ এটাই প্রমাণিত হলো যে, ইমামুল আইম্মা, মুহিউস্ সুন্নাহ্, দাফিউল বিদ্য়াত, কুতুবুল আলম, ক্বাইউমুয্যামান, হুজ্জাতুল ইসলাম, লিসানুল উম্মত, ফখরুল উলামা ওয়াল মাশায়েখ, ছাহেবুল আছরার, আমীরুশ্ শরীয়ত ওয়াত্ ত্বরীকত, আওলাদে রাসূল, আমীরুল মু’মিনীন হযরত সাইয়্যিদ আহ্মদ শহীদ বেরেলভী (রঃ) ছিলেন তাঁর জামানার আল্লাহ্ পাক-এর লক্ষ্যস্থল এবং ত্রয়োদশ শতাব্দীর মুজাদ্দিদ ও ইমাম।

দ্বিতীয়তঃ হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ) তাঁর এ তরীক্বা সম্পর্কে নিজেই বলেন, “আমি সুন্নতের পূর্ণ পায়রবী করে থাকি। তাই স্বয়ং হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম  আমার প্রতি খুশী হয়ে আমাকে বাইয়াত করিয়ে আমার তরীক্বার নাম দিয়েছেন তরীক্বায়ে মুহম্মদীয়া।”

তৃতীয়তঃ আমীরুল মু’মিনীন হযরত সাইয়্যিদ আহ্মদ শহীদ বেরেলভী (রঃ)-এর সাথে মুহম্মদ ইবনে আব্দুল ওহাব নজদীর কোন দিক থেকেই কোন সম্পর্ক ছিল একথাও সম্পূর্ণ মিথ্যা। এরও কোন সহীহ দলীল-প্রমাণ  কেউ পেশ করতে পারবেনা।। আর তিনি ওহাবীও ছিলেননা।

চতুর্থতঃ তারা তাঁকে কাফির বলে থাকে। প্রকৃতপক্ষে  এ কথাও ডাহা মিথ্যা এবং কুফরীমূলক। কারণ এর কোন প্রমাণ নাই।

পঞ্চমতঃ তারা তাঁর সম্পর্কে বলে থাকে যে, তিনি নাকি খ্রীষ্টানদের পক্ষ হয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন ……….. একথাও সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং এরও কোন দলীল প্রমাণ নেই।

ষষ্ঠতঃ আরো বলে থাকে যে তিনি নাকি শিখদের পক্ষ হয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন একথাও সম্পূর্ণ মিথ্যা যার কোন দলীল প্রমাণ নেই।

সপ্তমতঃ তারা বলে থাকে তিনি তার লিখিত কিতাবাদীতে কুফরী আক্বীদামূলক কথাবার্তা লিখেছেন। এটাও সম্পূর্ণ মিথ্যা, কারণ তিনি কোন কিতাবই লিখেননি।

অষ্টমতঃ যদি মুহম্মদি বললে মুহম্মদ বিন আব্দুল ওহাব নজ্দীকে বুঝায় আর আহমদী বললে যদি মির্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীকে বুঝায় তাহলে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বরকতময় নাম মোবারক মুহম্মদ ও আহমদ বাদ দিতে হবে। অথচ এটা চিন্তা করাও কুফরী।

নবমতঃ শরীয়তের উছূল হলো- কাউকে কাফির প্রমাণ করতে হলে কুরআন-সুন্নাহ্র দলীল পেশ করতে হবে। এক্ষেত্রে ইতিহাস গ্রহণযোগ্য নয়। যতক্ষণ পর্যন্ত ইতিহাস কুরআন-সুন্নাহ্ মোতাবেক না হবে।

দশমতঃ প্রমাণিত হলো যে, আহমদ রেযা খান সাহেব ও তার অনুসারীরা তাদের স্বরচিত কিতাবাদী ও পত্রপত্রিকাতে সানদুল আওলিয়া, মাখযানে মারিফাত, খাযিনার্তুরহমা, সাহিবুল আসরার, রুহুল হাক্কে, মুজাহিদে মিল্লাত, খলীফাতুল্লাহ্ ফিল আরদ, আওলাদে রাসূল, আমীরুল মু’মিনীন, হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ) সম্পর্কে যা কিছু লিখেছে ও লিখে যাচ্ছে তা প্রকৃতপক্ষে সম্পূর্ণই অনুমান নির্ভরযোগ্য দলীলবিহীন ও মিথ্যা প্রোপাগান্ডা বৈ অন্য কিছুই নয়।

একাদশতঃ হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ), ইসলামকে বুলন্দ করতে যেয়ে খ্রীষ্টান, শিখ ও সীমান্তের সেনা সর্দারদের বিরুদ্ধে জিহাদ করতে গিয়ে শাহাদত বরণ করেন।

দাদ্বশতঃ হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ)কে ওহাবী ও কাফির বলা কুফরীর অন্তর্ভূক্ত।

          সুতরাং যারা হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ)-এর সম্পর্কে কুফরীমূলক বক্তব্য পেশ করে থাকে তদের উচিৎ এ বিষয়ে আল্লাহ্ পাককে ভয় করে এ সমস্ত কুফরীমূলক বক্তব্য থেকে তওবা ইস্তেগফার করে নিজেদের ঈমানকে হিফাযত করা। কারণ আল্লাহ্ পাক তাঁর ওলীদের সম্পর্কে হাদীসে কুদসীতে এরশাদ ফরমান,

من عادلى وليا فقد اذنته بالحرب.

অর্থাৎ- আমার ওলীদের সাথে যে শত্রুতা বা বিদ্বেষ পোষণ করে আমি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করি। (বুখারী শরীফ)

          দলীলসমূহঃ-(১) বুখারী শরীফ, (২) মুসলিম শরীফ,  (৩) আবূ দাউদ শরীফ, (৫) মেশকাত শরীফ (৬) বাহরুর রায়েক, (৭) শামী, (৮) মাযমাউল আনহোর, (৯) ওকায়ে আহম্মদী,(১০) মনজুরাতুস্ সাদাত ফি আহ্ওয়ালুল গাযা ওয়াশশুহাদা, (১১) ওয়াসিলে ওয়াজীর আলা তরিকুল বাশীর ওয়ান নাযীর, (১২) তাওয়ারীখে আযিবা, (১৩) মাখযানে আহম্মদী, (১৪) মুকাশিফাতে রহমত, (১৫) আমিরুর রেওয়ায়েত, (১৬) নকশে হায়াত, (১৭) জখিরায়ে কারামত, (১৮) নুরুন আলা নূর, (১৯) শাহ্ ওয়ালী উল্লাহ্ আওর উনকি সিয়াসাত, (১৬) কারামতে আহম্মদী, (২০) নুযহাতুল খাওয়াতীর, (২১) উলামায়ে হিন্দ শান দারাজী, (২২) তাহরীকে বালাকোট, (২৩) সাওয়ানেহ আহম্মদী (আল্লামা জাফর থানেশ্বরী (রঃ)-এর কিতাব), (২৪) সীরাতে সাইয়্যিদ আহম্মদ শহীদ (রঃ), (২৫) এহকাকোল হক, (২৬) মুরাদুল মুরিদীন, (২৭) (২৮) যর ঈমান কি বাহার আই, (২৯) কারবালা থেকে বালাকোট, (৩০) আরোয়ায়ে সালাছা, (৩১) তারিখে মাশায়েখে চিশ্ত, (৩২) হেক্বায়েতে আউলিয়া, (৩৩) যাদুদ তাকওয়া, (৩৪) তারিখে নজদওহেজায, (৩৫) সীরাতে শাহ্ আব্দুল আজীজ, (৩৬) তাহ্রীকে দেওবন্দ, (৩৭) বঙ্গ ও আসামের পীর ওলী, (৩৮) রিসালাত ও দাওয়াত, (৩৯) সিরাতে মুস্তাকিম, (৪০) মাকালাতে তরিকত, (৪০) দাফেউল বিদ্য়াত নাফেউল ইবাদ, (৪১) তাসকেরার্তু রশিদ, (৪২) আরগুমানে আহবাব, (৪৩) সিয়ানাতুন্নস, (৪৪) সীরাতে শাহ্ ইসমাঈল দেহলভী, (৪৫) ইশয়াতে হক্ব, (৪৬) জিয়াউল কুলুব, (৪৭) ছাইফূল জব্বার, (৪৮) এশ্কে রাসূল ও উলামা-ই দেওবন্দ, (৪৯) মাকাতিবে শাহ্ ইসমাঈল, (৫০) হায়াতে তাইয়্যিব, (৫১) হায়াতে ওলী, (৫২) মাসিরুল আবরার, (৫৩) রাসায়েলে খোলাফা, (৫৪) আহলে সাদিকপুর, (৫৫) সারে জুয়ুদুল আহরার, (৫৬) আবাই আওর খানদানি হালত কে মা আখাজ, (৫৭)(৫৮) সাইফুল মাযহাব, (৫৯) ইসলামী বিশ্বকোষ, (৬০) পলাশী যুদ্ধোত্তর আযাদী সংগ্রামের পাদপিঠ, (৬১) বাংলাদেশের মুসলমানদের ইতিহাস, (৬২) চেপে রাখা ইতিহাস, (৬৩) তাযকেরাতুল আউলিয়া/৫ম খন্ড, (৬৪) চল্লিশ আউলিয়া কাহিনী, (৬৫)  সাওয়ানেহ্ আহমদী (আল্লামা গোলাম রসূল মেহের কৃত), (৬৫) তাওয়ারীখে হাজেরা, (৬৬) হাজেরা গেজেট, (৬৭)  মুজাহিদ বাহিনীর ইতিবৃত্ত, (৬৮) ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সত্যিকারের ইতিহাস, (৬৯) পাক ভারতে মুসলমানদের ইতিহাস, (৭০) ওহাবীর ইতিহাস, (৭১) রেজভী ফিৎনা, (৭২) প্রকৃত ওহাবীকারা, (৭৩) ওহাবী আন্দোলন, (৭৪) রেজভী ধর্মমতের স্বরূপ, (৭৫) রেজভী ফিৎনার ষ্টাইল, (৭৬) আমরা যাদের উত্তরসূরী, (৭৭) ঈমান ও মুসলিম জাতির হিফাজত, (৭৮) ঞযব ওহফরধহ গঁংষরসং (৭৯) হাদায়ে বশশীশ, (৮০) নুগমাতুর রূহ, (৮১) হাফতে আকতাব, (৮২) আল জুন্নাতু লি আহ্লিস্ সুন্নাহ্, (৮৩) হায়াতে আহমদ রেযা খান, (৮৪) মালফুজাতে আলা হযরত, (৮৫) ফতওয়ায়ে রেজভীয়া, (৮৬) ফাওয়ায়ে ফরীদিয়া, (৮৭) জামেউল ফতওয়া, (৮৮) আনোয়ারে শরীয়ত, (৮৯) মাদায়েয়ে আলা, (৯০) তাযকিরায়ে গাউসিয়া, (৯১) ইরফানে শরীয়ত, (৯১) মাকাবিসুল মাজালিস ইত্যাদি।

          ইনশাআল্লাহ্ হক্বের অতন্ত্র প্রহরী, সত্যের ঝান্ডা বুলন্দকারী, না হক্ব ও বাতিলের মুখোশ উন্মোচনকারী মাসিক আল বাইয়্যিনাত পত্রিকা থেকে অচিরেই ত্রয়োদশ শতাব্দীর মুজাহিদে মিল্লাত, মুজাদ্দিদুয্যামান, মুজাহিদে আযম, আমিরুল মু’মিনীন হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ)-এর উপর ধারাবাহিকভাবে ফতওয়া বের হবে।

সুওয়াল-জাওয়াব

সুওয়াল-জাওয়াব

সুওয়াল-জাওয়াব

সুওয়াল-জাওয়াব বিভাগ

সুওয়াল-জাওয়াব বিভাগ