সুওয়াল-জাওয়াব বিভাগ

সংখ্যা: ৮২তম সংখ্যা | বিভাগ:

মুহম্মদ নূরুল হুদা

ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট, ঢাকা।

সুওয়ালঃ- সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পিতা-মাতা (রাঃ) জান্নাতি কি-না? এ সম্পর্কে আমাদের কি আক্বীদা রাখতে হবে?

 

কুরআন-সুন্নাহ্ আলোকে জানিয়ে বাধিত করবেন।

জাওয়াবঃ- সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পিতা-মাতা (রাঃ) অবশ্যই জান্নাতী।  প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর এই আক্বীদাই পোষণ করতে হবে। এর বিপরীত আক্বীদা পোষণ করা কুফরীর অন্তর্ভূক্ত।

আশ্চর্যের বিষয়, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পিতা-মাতা (রাঃ) জান্নাতী কি-না? অজ্ঞতাহেতু এ প্রশ্নের অবতারণা অনেকেই করে থাকে, এমনকি গোমরাহীর কারণে এ কথা পর্যন্ত বলে থাকে যে, তাঁর পিতা-মাতা জান্নাতী নন। কারণ তাঁরা জাহেলী যুগের কুফরী শেরেকীতে লিপ্ত ছিলেন। (নাউযুবিল্লাহ্)

যে বা যাদের ধারণা এই তাদের ক্ষেত্রে কুরআন-সুন্নাহ্র দলীলভিত্তিক জাওয়াব হলো-

হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পিতা-মাতা ফাতরাত যুগের অন্তর্ভূক্ত ছিলেন এবং তাঁরা দ্বীনে হানিফের উপর কায়েম ছিলেন

সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আনুষ্ঠানিক নুবুওওয়াত ঘোষণার বহু পূর্বে এবং হযরত ঈসা (আঃ)-এর থেকে প্রায় পাঁচশত বছর পরে তাঁর পিতা-মাতা (রাঃ) উভয়েই ইন্তেকাল করেন। যাঁরা কোন নবীর আমল পাননি, যাঁদের নিকট ইসলামের দাওয়াত পৌঁছেনি এবং যাঁরা দুই নবীর অন্তবর্তীকালীন সময়ে ইন্তেকাল করেন। এ সময়টাকে বলা হয় ফাতরাত যুগ।

“কার আযাব হবে আর কার আযাব হবে না এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক এরশাদ করেন,

وما كنا معذبين حتى نبعث رسولا.

  অর্থঃ- “রাসূল প্রেরণ ব্যতিরেকে আমি কাউকে শাস্তি দেইনা।” (সূরা বণী ইসরাঈল/১৫)

তিনি আরো বলেন,

ذلك ان لم يكن ربك مهلك القرى بظلم واهلها غافلون.

অর্থঃ- “আপনার প্রতিপালক কোন জনপদবাসীকে অন্যায়ভাবে অনবহিত অবস্থায় ধ্বংস করেননা।” (সূরা আনআম/১৩১)

তিনি আরো বলেন,

ولولا ان تصيبهم مصيبة بما قدمت ايديهم فيقولوا ربنا لولا ارسلت الينا رسولا فنتبع ايتك ونكون من المؤمنين.

অর্থঃ- “যারা ফাত্রাত যুগের তাদের কৃতকর্মের জন্য যখনই কোন মুসীবত আসত তখন তারা বলত, আল্লাহ্ তায়ালা কেন কোন রাসূল প্রেরণ করেননি, আমরা তাঁর আয়াতের অনুসরণ করতাম এবং ঈমানদার হতাম।” (সূরা কাছাছ/৪৭)

          আল্লাহ পাক বলেন,

ولو انا اهلكنهم بعذاب من قبله لقالوا ربنا لولا ارسلت الينا رسولا فنتبع ايتك من قبل ان نذل ونخزى.

 অর্থঃ- “রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আগমনের পূর্বে আমি যদি তাঁদেরকে শাস্তি দ্বারা ধ্বংস করতাম তারা বলত, “হে আমার প্রতিপালক! কেন আমাদের নিকট রাসূল প্রেরণ করেননি, তাহলে অপমানিত ও লাঞ্ছিত হওয়ার পূর্বেই আমরা আপনার আয়াতের অনুসরণ করতাম।” (সূরা ত্ব-হা/১৩৪)

আল্লাহ্ পাক বলেন,

وما كان ربك مهلك القرى حتى يبعث فى امها رسولا يتلوا عليهم ايتنا.

 অর্থঃ- “আল্লাহ্ পাক কোন জনপদবাসীকে ধ্বংস করেননা যতক্ষণ না উহার কেন্দ্রস্থলে কোন রাসূল প্রেরণ করেন যিনি তাদেরকে আল্লাহ্ পাক-এর আয়াত তিলাওয়াত করে শুনান।” (সূরা কাছাছ/৫৯)

তিনি আরো বলেন,

وما اهلكنا من قرية الا لها منذرون ذكرى وما كنا ظالمين.

 অর্থঃ- “আমি কোন জনপদবাসীকে ভীতি প্রদর্শণকারী ও উপদেশ প্রদাণকারী প্রেরণ ব্যতীত ধ্বংস করিনি এবং আমি সীমালংঘনকারী নই।” (সূরা শুয়ারা/২০৮-৯)

এই সমস্ত আয়াত প্রসঙ্গে হযরত আবদ বিন হামীদ, ইবনে মনযর,  হযরত ইবনে আবী হাতেম নিজ নিজ তাফসীর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, “নবী-রাসূল প্রেরণ ও নির্দেশ-উপদেশ প্রদান ব্যতীত আল্লাহ্ তায়ালা কোন জনপদবাসীকে ধ্বংস করেননি। কেননা আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন সর্বাপেক্ষা ন্যায়পরায়ণ; তিনি সীমালংঘনকারী নহেন।”

এ প্রসঙ্গে আরো উল্লেখ্য যে, হযরত ইমাম নববী রহমতুল্লাহি আলাইহিমুশরিকদের সন্তান-সন্ততি সম্পর্কে বলেছেন, তারা জান্নাতবাসী। কেননা পবিত্র কালামুল্লাহ্ শরীফের ঘোষণানুযায়ী প্রাপ্ত বয়স্কদের মধ্যে যাদের নিকট ইসলামের দাওয়াত পৌঁছেনি তাদেরকে শাস্তি দেয়া  হবে না  (যদি তারা কুফরী ও শেরেকী না করে থাকে)। আর যাদের নিকট ইসলামের দাওয়াত পৌঁছেছে, অথচ কুফরী ও শেরেকী পরিত্যাগ করেনি তারা অবশ্যই জাহান্নামী। এতে কারো দ্বিমত নেই।

সুতরাং দুই নবীর অন্তবর্তীকালীন সময়ে মৃত বা ইন্তেকালকারীগণ আহ্লে ফাত্রাত বিধায় তাদের হুকুম ব্যতিক্রম। অর্থাৎ তাঁরা যদি শুধু কুফরী ও শেরেকী থেকে মুক্ত থাকেন তাহলে তাঁরা আযাব বা শাস্তি থেকেও মুক্ত থাকবেন। (মাসালেকুল হুনাফা লিস সুয়ূতী দ্রষ্টব্য)

যেমন ছিলেন সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আব্বা-আম্মা। তাঁরা কোন প্রকার কুফরী ও শেরেকী করেননি। অর্থাৎ তাঁরা উভয়ে দ্বীনে হানিফে কায়েম ছিলেন। তাঁরা কখনো তাওহীদ বিরোধী কোন আমল করেছেন এমন কোন প্রমাণ আল্লাহ্ পাক-এর জমিনে কেউই পেশ করতে পারবে না। এ বিষয়ে সমস্ত ইমাম-মুজতাহিদ (রঃ)গণ একমত পোষণ করেন।

কুফরী-শেরেকীর জোয়ারের মাঝেও জমিনে সব সময়েই কিছু হক্বপন্থী লোক ছিলেন

উল্লেখ্য, আহ্লে কিতাবের মধ্যে অনেকেই হক্ব তালাশী ছিলেন। উক্ত আহ্লে কিতাবদের সম্পর্কে আল্লাহ্ পাক বলেন,

ليسوا سواء من اهل الكتاب امة قائمة يتلون ايت الله اناء اليل وهم يسجدون.

অর্থঃ- “তারা সবাই সমান নয়। আহ্লে কিতাবের মধ্যে কিছু লোক এমনও আছে যাঁরা অবিচলভাবে আল্লাহ্ পাক-এর আয়াতসমূহ পাঠ করেন এবং রাতের গভীরে তাঁরা সিজদাহ্ করেন।” (সূরা আলে ইমরান/১১৩)

এ আয়াত শরীফের ব্যাখ্যায় তাফসীর কারকগণ বলেন, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আবির্ভাবের পূর্বে তাঁর পূর্ব-পুরুষ, দাদা, পিতা-মাতা (রাঃ) ছাড়া আরো কতিপয় ব্যক্তি আল্লাহ্ পাককে বিশ্বাস করতেন এবং তাঁরা সত্য পথের উপর অর্থাৎ দ্বীনে হানিফের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। আইয়্যামে জাহেলিয়াতের যুগে সকল মানুষই মুশরিক ছিলো এ দাবী আদৌ সত্য নয়। কারণ বর্ণিত আয়াত শরীফের প্রথমাংশই স্পষ্টতঃ প্রমাণ বহন করছে যে, ইসলাম পূর্ব সকল মানুষ এক সমান ছিলনা।

তিবরানী শরীফে নিম্ন বর্ণিত ব্যক্তিগণ আল্লাহ্ পাক-এর একত্ববাদে বিশ্বাসী ছিলেন এবং তাঁরা পাক-নাপাকীরও বিশ্বাসী ছিলেন। যদি তাঁদের কেউ নাপাক হতেন, তাহলে অজু-গোছল করে পবিত্র হতেন, এমনকি তাঁরা হযরত ইব্রাহীম (আঃ)-এর ধর্মের বিশ্বাসী হয়ে আমল করতেন। তাঁদের নাম হলো-

(১) হযরত আব্দুল্লাহ্ (রাঃ), (২) হযরত আমিনা (রাঃ), (৩) হযরত আসওয়াদ বিন সারারা বিন মায়রুর আনসারী, (৪) হযরত মুহম্মদ বিন মাসলামা ও (৫) হযরত আবূ কাইস বিন সারমা ইত্যাদি।

এছাড়াও “তাফসীরে কবীর, খাযেন, রুহুল বয়ান ও রুহুল মায়ানীতে” বর্ণিত হয়েছে যে, নাজরানের ৪০ জন, হাবসার ৩২ জন, রোমের ৩ জন পুরুষ খাঁটি নাসারা ও কতেক ইহুদী ছিলেন। এছাড়াও কিছু ব্যক্তি মিল্লাতে ইব্রাহীমিয়ার উপর ছিলেন, তবে তাঁরা আল্লাহ্ পাক-এর প্রতি বিশ্বাসকে গোপন করে রেখেছিলেন। তাঁদের মধ্য হতে যাঁরা আমাদের পেয়ারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যুগ পেয়েছেন তাঁরা তাঁর প্রতি ঈমান এনেছেন। স্বয়ং সাদিকে মাসদূক্ব নবী হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেরূপ আল্লাহ্ পাক-এর ওয়াহ্দানিয়াতে বিশ্বাসী ছিলেন তদ্রুপ তাঁর পিতা-মাতা (রাঃ)ও ওয়াহ্দানিয়াতে বিশ্বাসী ছিলেন।

হযরত আলী (রাঃ) বর্ণনা করেন, “প্রত্যেক যুগে সাত বা ততোধিক মুসলমান পৃথিবীতে বর্তমান ছিলেন যাঁদের বদৌলতে বিভিন্ন সময়ে পৃথিবী ও উহার অধিবাসীদেরকে আল্লাহ্ পাক ধ্বংসের হাত হতে রক্ষা করেছেন।”

হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, “হযরত নূহ (আঃ)-এর পর এই পৃথিবীতে সব যুগেই আল্লাহ্ পাক-এর সাত বা ততোধিক খাঁটি বান্দা বর্তমান ছিলেন যাঁদের উসীলায় তিনি ভূ-পৃষ্ঠের অধিবাসীদের আযাব রহিত করেছেন।” এই সমস্ত হাদীস শরীফে এটাই প্রমাণিত হয় যে, প্রত্যেক যুগে সাত বা ততোধিক আল্লাহ্ পাক-এর পেয়ারা ও খাছ বান্দা জমিনে ছিলেন। আর তাঁরা তো অবশ্যই ঈমানদার। কেননা কাফির, মুশরিকরা কখনো খাছ বান্দা হতে পারেনা। কারণ তারা নাপাক।

এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক বলেন,

انما المشركون نجس.

অর্থঃ- “নিশ্চয়ই মুশরিকরা নাপাক।” (সূরা তওবা/২৮)

আল্লাহ্ পাক আরো বলেন,

ولامة مؤمنة خير من مشركة.

অর্থঃ- “নিশ্চয়ই মু’মিনা দাসী মুশরিকা (স্বাধীনা) মহিলা থেকে উত্তম।” (সূরা বাক্বারা/২২১)

আল্লাহ্ পাক আরো বলেন,

ولعبد مؤمن خيرمن مشرك.

 অর্থঃ- “নিশ্চয়ই মু’মিন দাস মুশরিক (স্বাধীন) ব্যক্তি থেকে উত্তম।” (সুুরা বাক্বারা/২২১)

উপরোক্ত আয়াত শরীফ দ্বারা এটাই প্রমাণিত হয় যে, মুশরিক ও কাফিররা কখনও উত্তম হতে পারেনা, কারণ তারা নাপাক। তাই সাধারণ মু’মিন ও মু’মিনাও তাদের থেকে উত্তম।

সহীহ্ হাদীস শরীফ ও আয়াত শরীফ দ্বারা প্রমাণিত যে, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পিতা-মাতা জান্নাতী

এ প্রসঙ্গে আখেরী রাসূল হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

لم ازل انقل من اصلاب الطاهرين الى ارحام الطاهرات على ان جميع ابائه صلى الله عليه وسلم وامهاته الى ادم وحواء عليهما السلام ليس فيهم كافر.

 অর্থঃ- “আমি সর্বদা পবিত্র পৃষ্ঠ মোবারক হতে পবিত্রা রেহেম শরীফে স্থানান্তরিত হয়েছি। আমার পূর্ববর্তী যত পুরুষ ও মহিলা হযরত আদম (আঃ) হতে হযরত হাওয়া (আঃ) পর্যন্ত অতীত হয়েছেন, তাঁদের কেউই কাফের ছিলেন না।”

এ হাদীস শরীফই প্রমাণ করে যে, আল্লাহ্ পাক-এর হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পূর্ব পুরুষ সকলেই ছিলেন যুগের সব চাইতে সম্ভ্রান্ত, মর্যাদাশীল ও আল্লাহ্ পাক-এর খাছ ও মকবুল বান্দাহর অর্ন্তভূক্ত। তিনি পবিত্র পুরুষ ও পবিত্রা মহিলাগণের মাধ্যমে বংশ পরম্পরায় এ জমিনে তাশরীফ এনেছেন। চাই পিতার দিক থেকে হোক কিংবা মাতার দিক থেকে হোক তাঁদের কেউই মুশরিক বা কাফির ছিলেন না। এমন কি তাঁদের মধ্যে কেউ চারিত্রিক দোষেও দোষী ছিলেন না। প্রত্যেকেই পবিত্র চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। এ প্রসঙ্গে হাদীস শরীফে উল্লেখ করা হয়েছে,

لم يلتق ابوى قط على سقاح.

 অর্থঃ- “হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পূর্বপুরুষগণ কেউই চারিত্রিক দোষে দোষী ছিলেননা।”

অতএব, ইহাতে প্রমাণিত হয়, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পূর্ব পুরুষগণ শুধু ঈমানদারই নন বরং তাঁরা আল্লাহ্ পাক-এর খাছ মাহবুব বান্দা-বান্দীর অন্তর্ভূক্ত। আর এ প্রসঙ্গে পবিত্র কালামে পাকে এরশাদ হয়েছে,

وتقلبك فى الساجدين.

অর্থঃ- “আপনাকে দেখেন সিজদাকারীদের সাথে, উঠতে বসতে।” (সূরা শুয়ারা/২১৯)

তাফসীরে মাদারেক ও জামালের গ্রন্থকার এ আয়াত শরীফের ব্যাখ্যায় বলেন, এখানে আখেরী রাসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শুধু পিতা-মাতা (রাঃ)ই নন বরং তাঁর সকল পূর্বপুরুষকে আল্লাহ্ পাক-এর  তাওহীদভুক্ত বলে ঘোষণা দেন। প্রকৃতপক্ষে তাঁর পূর্বপুরুষ  সকলেই ঈমানদার ও সর্বোৎকৃষ্ট ছিলেন।

উপরোক্ত আয়াত শরীফ ও হাদীস শরীফ দ্বারা এটাই প্রমাণিত হয় যে, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালাম সর্বযুগে যুগশ্রেষ্ঠ বান্দা-বান্দীদের মাধ্যম দিয়ে এসেছেন। তাহলে তাঁরা কি করে কাফির, মুশরিক হতে পারেন? কারণ প্রথমতঃ কাফিররা হচ্ছে নাপাক। দ্বিতীয়তঃ সাধারণ ঈমানদার দাস-দাসীরাও সমস্ত কাফির, মুশরিকদের চেয়েও উত্তম।

হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দেহঃস্থিত সবকিছু পাক ও তা গলধঃকরণ নাযাত হাসিলের কারণ হলে, যাঁদের মাধ্যমে তিনি এসেছেন তাঁদের দেহাবয়বের কি  হুকুম

হাদীস শরীফে এসেছে, উহুদের ময়দানে কিছু সাহাবী হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মাথা মোবরকের ক্ষতস্থান হতে নির্গত রক্ত মোবারক যাতে জমীনে না পড়তে পারে সেজন্য তাঁরা তা চুষে চুষে পান করেছিলেন। এতদ্বশ্রবনে তিনি তাঁদেরকে বললেন, তোমাদের জন্য জাহান্নামের আগুণ হারাম হয়ে গেল। অর্থাৎ তোমরা নিশ্চিত জান্নাতী। এছাড়া যে সকল সাহাবী (রাঃ) হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শরীর মোবারকে শিঙ্গা লাগিয়েছিলেন তাঁদের ক্ষেত্রেও তিনি উক্ত সুসংবাদ দান করেছিলেন। (সুবহানাল্লাহ্)

হাদীস শরীফে আরো বর্ণিত হয়েছে, একবার হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অসুস্থতার কারণে হুজরা শরীফের ভিতর একটি গামলার মধ্যে ইস্তেঞ্জা (পেশাব) মোবারক করলেন। সকাল বেলা এক সাহাবী (রাঃ) আসলে তিনি তাঁকে উক্ত গামলাটি দিয়ে বললেন, তুমি এগুলো এমনস্থানে ফেলে দিবে যাতে কেউ মাড়াতে না পারে। তখন সেই সাহাবী (রাঃ) উক্ত গামলাটি নিয়ে দূরবর্তী স্থানে গিয়ে একস্থানে রেখে চলে আসলেন। হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি তা কোথায় ফেলে আসলে? তখন সাহাবী (রাঃ) বললেন, আমি তা এমন স্থানে রেখে এসেছি যা ক্বিয়ামত পর্যন্ত কেউ মাড়াতে পারবেনা। সাহাবী (রাঃ) যখন কথা বলছিলেন, তাঁর মুখ দিয়ে সুঘ্রাণ বের হচ্ছিল। হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, হে সাহাবী (রাঃ)! তুমি কি তা পান করে ফেলেছ? সাহাবী (রাঃ) বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্, ইয়া হাবীবাল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমি তা রাখার জন্য আমার পেটের চাইতে উত্তম স্থান খুঁজে পাইনি, তাই তা পান করে ফেলেছি। সাহাবী (রাঃ)-এর কথা শুনে হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমার জন্য জাহান্নামের আগুণ আবাদুল আবাদের জন্য হারাম হয়ে গেল। কস্মিনকালেও জাহান্নামের আগুণ তোমাকে স্পর্শ করবেনা। আর তুমি জান্নাতী। (সুবহানাল্লাহ্)

এখন কথা হলো, যেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর রক্ত মোবারক, পেশাব মোবারক স্বল্পকালীন, স্বল্প পরিমাণ পান করার কারণে কোন ব্যক্তির জন্য যদি জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যায় আর জাহান্নাম হারাম হয়ে যায়, তাহলে খোদ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দীর্ঘ সময় যাঁর রেহেম শরীফে অবস্থান করলেন এবং এর পূর্বে নূর হিসেবে  যাঁর ললাট মোবারকে অবস্থান করলেন, অর্থাৎ হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পিতা ও মাতা তাঁদের দেহাবয়ব কি জাহান্নামে যাবে? কখনোই নয়।

উল্লেখ্য, যে নূরে মুহম্মদী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পবিত্র থেকেও পবিত্রতম তা কি নাপাক স্থানে অবস্থান করেছিল? সকলেই বলবে কস্মিনকালেও নয়। অর্থাৎ হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পূর্ব পুরুষ কি নাপাক ছিলেন? (নাউযুবিল্লাহ্) সকলেই বলবে অবশ্যই নয়, বরং পাক ছিলেন। আর পাক বললেই ঈমানদার বুঝতে হবে। তাহলে তাঁর পূর্ব পুরুষ কি করে কাফির মুশরিক হতে পারেন? কারণ কাফির, মুশরিক মাত্রই নাপাক।

আল্লাহ্ পাক তাঁর কালামে পাকে কাফির, মুশরিকদের সম্পর্কে এরশাদ করেন, انما المشركون نجس.

অর্থঃ- “নিশ্চয়ই মুশরিকরা অপবিত্র বা নাপাক।” (সূরা তওবা/২৮)

অতএব, এ ধরণের বক্তব্য উম্মতের জন্য বলাতো দূরের কথা কল্পনা করাও কুফরীর শামীল।

উল্লেখ্য, যিনি যত বেশী মূল্যবান তাঁর সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও তাঁর পাত্রও ততই মূল্যবান হয়ে থাকে। অতএব, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অবস্থানস্থল অর্থাৎ যে রেহেম শরীফ ও পৃষ্ঠ মোবারকের মাধ্যমে জমিনে আগমন করেন তা কতটুকু মূল্যবান ও পবিত্র ছিল তা বলার অপেক্ষা রাখেনা।

হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর স্পর্শধন্য রওজা শরীফের ধুলি মোবারকের মর্যাদা আরশে আজিমের চেয়ে শ্রেষ্ঠ হলে নূরে মুহম্মদী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ধারক-বাহক তাঁর পিতা-মাতার ফায়সালা কি?

সমস্ত ইমাম মুজতাহিদ রহমতুল্লাহি আলাইহিও আউলিয়া-ই-কিরাম (রঃ)গণ ইজমা করেছেন যে, রওজা শরীফের যে মাটি মোবারক হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শরীর মোবারক স্পর্শ করে আছে তা আরশে আজিম থেকেও বেশী মর্যাদাবান ও সম্মানিত। তাহলে নূরে মুহম্মদী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে পিতা-মাতা (রাঃ) ধারণ করেছেন এবং যাঁদের শরীর মোবারকের স্পর্শে ছিলেন তাঁদের ফযীলত কত বেশী এবং তাঁরা কতটুকু সম্মানিত তা বলার অপেক্ষাই রাখেনা। আর বেহেশ্তে তাঁদের সুউচ্চ মর্যাদা সম্পর্কে দুনিয়াবাসী কোন মানুষের পক্ষে কল্পনা করাও সম্ভব নয়।

এতে প্রমাণিত হয় যে, নবীকুল শ্রেষ্ঠের পিতা-পিতামহ (রাঃ) অর্থাৎ উর্ধ্বতন পূর্ব পুরুষগণ যাঁদের মাধ্যমে তিনি যুগে যুগে স্তরে স্তরে স্থানান্তরিত হয়ে এসেছেন তাঁদের সকলেই ঈমানদার তথা ওয়াহ্দানিয়াতের উপর ছিলেন। অন্যথায় বুখারী শরীফের সহীহ্ রেওয়ায়েত এবং পবিত্র কালামুল্লাহ্ শরীফের ঘোষণা ভুল প্রমাণিত হয়ে যায়। (নাউযুবিল্লাহ্)

স্বয়ং হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামই তাঁর পিতা-মাতাকে ঈমানের তা’লীম দিয়েছেন

হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিদায় হজ্বের সময় তাঁর মাতা-পিতাকে জীবিত করে ইসলামের কালেমা প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে বর্ণিত আছে,

ومن معجزاته صلى الله عليه وسلم إحياء الموتى وكلامهم معه وفى الخبر ان الله تعالى احيى له ابويه وعمه ابا طالب فامنابه صلى الله عليه وسلم ذكره القرطبى فى التذكرة.

অর্থঃ- হুজুর পাক সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মুজিযার মধ্যে অন্যতম হল মৃতকে জীবিত করা এবং তাদের সাথে কথা বলা। ইমাম কুরতুবী রহমতুল্লাহি আলাইহি‘তাজকিরাহ্’ নামক কিতাবে উল্লেখ করেন, আল্লাহ পাক তাঁর হাবীবের জন্য তাঁর পিতা-মাতা ও চাচাকে জীবিত করেন। অতঃপর তাঁর পিতা-মাতা ঈমান আনেন। ( আন নি’মাতুল কুবরা আলাল আলাম, ইবনে হাজার হায়সামী/১৯)

উল্লেখ্য, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পিতা-মাতা জান্নাতী হওয়ার পরও তাঁদেরকে কেন জীবিত করে ঈমানের তা’লীম দিয়ে ঈমানদার বানালেন?

এর জাওয়াব হলো, আরো অতিরিক্ত ফযীলত ও সম্মানের জন্য এবং বেহেশ্তে উচ্চ মর্যাদা হাছিলের লক্ষ্যে।

এখন যদি কেউ তাঁর এ কাজকে অসম্ভব মনে করে তাহলে এর জবাবে বলবো- আখেরী রাসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর ঈমান আনার শর্তে এক ইহুদী মহিলার দু’ছেলেকে তিনি যেভাবে জীবিত করেছিলেন;  ঠিক তেমনি তিনি তাঁর মহান জনক এবং মহিয়সী জননীকেও জীবিত করে ঈমান প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন। (সুবহানাল্লাহ্)

এছাড়া হাদীস শরীফে আরো শত-সহস্র বর্ণনা রয়েছে যেখানে উল্লেখ রয়েছে, হুজুর পাক  সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মৃতকে জীবিত করেছেন।

এছাড়া পবিত্র কুরআন শরীফে বর্ণিত হযরত ঈসা (আঃ) কর্তৃক মৃতকে জীবিত করার আয়াত শরীফকে প্রমাণ স্বরূপ পেশ করবো। আল্লাহ পাক বলেন,

انى اخلق لكم من الطين كهيئة الطير فانفخ فيه فيكون طيرا بإذن الله وابرئ الاكمه والابرص واحى الموتى باذن الله.

অর্থঃ- আমি তোমাদের জন্য মাটি দ্বারা পাখির আকৃতি তৈরী করে তাতে ফুঁ দিলে তা জীবন্ত পাখি হয়ে যায় আল্লাহ পাকের হুকুমে। আমি সুস্থ করে থাকি জন্মান্ধ ও শ্বেতকুষ্ঠ রোগীকে এবং আল্লাহ পাকের হুকুমে মৃতকে জীবিত করি। (সূরা আলে ইমরান/৪৯) অর্থাৎ  হযরত ঈসা (আঃ) কর্তৃক মৃতকে জিন্দা করার কথা স্বয়ং আল্লাহ্ পাক বর্ণনা করেছেন। তাহলে যিনি হযরত ঈসা (আঃ)-এরও রাসূল তাঁর কতটুকু মর্যাদা।

“মেশকাত শরীফে” কবর যিয়ারত অধ্যায়ে বর্ণিত। একদা পেয়ারা নবী হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ্ পাক-এর দরবারে তাঁর জননীর কবর যিয়ারত করার আকাঙ্খা করলে আল্লাহ্ পাক যিয়ারত করার অনুমতি প্রদাণ করেন। কারণ হযরত আমিনা (রাঃ) ঈমানদার ছিলেন। কাফিরদের কবর যিয়ারত করা নিষেধ। তবে, মহিয়সী জননীর জন্য মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ্ পাক-এর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনার অনুমতি চাইলে মহান আল্লাহ্ পাক তা রহিত করে দেন। কারণ ক্ষমা প্রার্থনা ঐ ব্যক্তির জন্য প্রযোজ্য যে জন্মগত পাপী। আর হযরত আমিনা (রাঃ) ছিলেন নিঃসন্দেহে খালেছ ঈমানদার। কারো শিশু সন্তান মারা গেলে আমরা তার জানাযার নামাজে ক্ষমা প্রার্থনার দোয়া ইস্তেগ্ফার কোনটাই করিনা। কারণ সে নিষ্পাপ ও বেগুণাহ্ অবস্থায় মারা গেছে। তাই তার জন্য দোয়া ইস্তেগফার করার প্রয়োজন নেই। এই নীতিমালার ভিত্তিতেই হযরত আমিনা (রাঃ)-এর কবর শরীফ যিয়ারত করা হয়েছিল কিন্তু দোয়া ত্যাগ করা হয়েছিল। উপরোন্ত একজন বণী ইসরাঈলীকে, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নাম মোবারককে চুম্বন করার কারণে তাঁকে জান্নাত দেয়া হলো, তাঁর জন্য জাহান্নাম হারাম করা হলো। শুধূ তাই নয় বরং তাঁর মর্যাদা আরো বৃদ্ধির জন্য আল্লাহ্ পাক-এর জলীলুল কদর নবী ও রাসূল হযরত মূসা (আঃ)কে তাঁর গোছল, কাফন ও দাফন সম্পন্ন করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। অর্থাৎ তিনি জান্নাতী হয়েছিলেন। তাহলে যিনি হাবীবুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কয়েক মাস রেহেম শরীফে ধারণ করেছেন ও যিনি সরাসরি চুম্বন করেছেন, তাঁর জান্নাতী হওয়া সম্পর্কে এরপরও কি প্রশ্ন উঠতে পারে?

হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পিতা-মাতার নাম হযরত আব্দুল্লাহ্ (রাঃ) ও হযরত আমিনা (রাঃ)  হওয়ার হাক্বীক্বত

“আব্দ” অর্থঃ- ‘আনুগত্য স্বীকারকারী’ আর এর সাথে আল্লাহ্ পাক-এর নাম মোবারক যুক্ত হয়ে আব্দুল্লাহ্ অর্থাৎ তিনি আল্লাহ্ পাক-এর বশ্যতা স্বীকার করতেন। তিনি যদি মূর্তি পুজারী হতেন তাহলে তাঁর নাম হতো ‘আব্দুল উজ্জা। (নাউজুবিল্লাহ্) অথচ তাঁর নাম হলো ‘আব্দুল্লাহ্’। এতে বুঝা গেল, আল্লাহ্ পাক তাঁর হাবীব-এর মহান ওয়ালেদকে তাঁর প্রতি বিশ্বাসীই পেয়েছিলেন ফলে কুদরতি ব্যবস্থায় তাঁর অসাধারণ নাম রাখার ব্যবস্থা করেছিলেন “আব্দুল্লাহ্।’ তেমনিভাবে “আমিনা” শব্দটির অর্থ হলো, ‘ঈমান আনয়নকারী বা নিরাপদ’। অর্থাৎ তিনি আল্লাহ্ পাক-এর প্রতি ঈমান এনে জাহান্নাম থেকে নিরাপদ হয়েছেন। (সুবহানাল্লাহ্)

আর এটাই স্বাভাবিক। কারণ আল্লাহ্ পাক বলেছেন,

والطيت للطيبين والطيبون للطيبت.

অর্থঃ- “সচ্চরিত্র নারী সচ্চরিত্র পুরুষের জন্য ও সচ্চরিত্র পুরুষ সচ্চরিত্র নারীদের জন্য।” (সূরা নূর/২৬)

তাছাড়া কোন একজন নবী (আঃ)-এর পিতা-মাতা (রাঃ) কাফির ও মুশরিক ছিলেন এ মর্মে কারো নিকট কোন প্রমাণ নেই বা কেউ তা পেশ করতে পারবেনা।

পূর্ব হতেই হযরত আমিনা (রাঃ) নূরে মুহম্মদী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শান সম্পর্কে অবহিত ছিলেন এবং হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি ঈমান এনেছিলেন

হযরত আব্দুল্লাহ্ (রাঃ)-এর কপাল মোবারকে নূরে মুহম্মদী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমানত ছিল। অতঃপর সে নূর তাঁর জননীর রেহেম শরীফে স্থানান্তরিত হয়। রেহেম শরীফে ধারণ করা অবস্থায় নূরে মুহম্মদীর শত শত প্রতিক্রিয়া তিনি স্বচক্ষে অবলোকন করেছিলেন। তাঁর পিতা-মাতা (রাঃ) এত কিছু দেখার পরও কি সে নূরে মুহম্মদীর প্রতি আস্থাবান ছিলেননা?

আল্লামা সুয়ূতী রহমতুল্লাহি আলাইহিতাঁর “কিতাবুল আজীম ওয়াস্সুন্নাহ্” গ্রন্থে পেয়ারা নবী হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পিতা-মাতা (রাঃ) ঈমানদার ও বেহেশ্তী হওয়ার স্বপক্ষে হযরত আমিনা (রাঃ)-এর মুখের আরবী কাসিদাগুলো লিপিবদ্ধ করেন যা তিনি ইন্তেকালের কয়েকদিন পূর্বে তাঁর মহান পুত্র মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শানে আবৃত্তি করেন,

بارك الله فيك من غلامى – يا ابن الذى من حرمة الحمامى

فانت مبعوث الى الانامى – من عند ذى الجلال والاكرامى

تبعث فى الحل والحرامى – تبعث بالتحقيق والاسلامى

دين ابيك البر وابراهامى – فالله انهاك عن الاصنامى.

অর্থঃ- “হে মোর নয়ন মনি যোগ্যপুত্র! আমি বিদায় বেলায় দোয়া করি, যেন আল্লাহ্ পাক তোমার জীবনকে ধন্য ও বরকতময় করেন। মহীয়ান, গরীয়ান আল্লাহ্ পাক-এর পক্ষ হতে বিশ্ব জগতের জন্য নবী-রাসূলরূপে প্রেরিত হবে। তুমি মক্কা শরীফ, মদীনা শরীফ এমনকি সারা বিশ্বে ইসলামী ঝান্ডা উঠাবে। তুমি ইব্রাহীম খলীলুল্লাহ্র দ্বীনকে পুনর্জীবিত করবে। আল্লাহ্ পাক তোমাকে মূর্তি পুজা হতে রক্ষা করবেন।

তিনি আরো বলেন,

كل كثير يفنى وانا ميتة و ذكرى باق تركت خيرا ولدت طهرا.

অর্থঃ- সবকিছুই ধ্বংস হবে। আমিও ইন্তেকাল করবো। কিন্তু আমার আলোচনা চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে। কারণ আমি শ্রেষ্ঠ (পুত্র)কে রেখে যাচ্ছি যাঁকে পাক পবিত্র হিসাবে জন্মদান করেছি।

স্মরণীয় যে, “যদি নবীদের নবী, রাসূলদের রাসূল” হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পিতা-মাতা (রাঃ) জান্নাতবাসী না হন তাহলে আল্লাহ্ পাক-এর জমিনে এমন কোন পিতা-মাতা খুঁজে পাওয়া যাবে কি যারা জান্নাতী হবে?” ইহা কস্মিনকালেও সম্ভব নয়।

অতএব, আহ্লে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের আক্বীদা ও ফতওয়া হলো- আখেরী রাসূল, সরদারে দো’আলম, খতামুল আম্বিয়া, ছাহেবে মীছাক্ব, উসওয়ায়ে হাসানা, ছাহেবে আছালিবে ত্বাহেরীনা ওয়া আরহামি ত্বাহেরা, ছাহেবে আসমাউল হুস্না, ছাহেবে আলক্বাব, ছাহেবে ইক্বরা, সাইয়্যিদুল খালায়েক্ব, রউফুর রহীম, ছাহেবে সালাত ও সালাম, ছাহেবে বাশীর ওয়া নাজীর, ছাহেবে লাওলাক, ফখরে বাহ্র ওয়া বার সাইয়্যিদুল আম্বিয়া, সরওয়ারে কাওনাইন, সিরাজাম মুনীরা, ফখরে কায়েনাত, আল আমীন, সাইয়্যিদুল আলম, ইমামুন্ নাবিয়্যীন, শাফিউল উমাম, হুব্বুল আউয়ালীন ওয়াল আখেরীন, সাইয়্যিদুল জিন্নে ওয়াল ইন্স, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পিতা-মাতা (রাঃ) উভয়েই জান্নাতী এবং তাতে বিন্দু মাত্র সন্দেহ প্রকাশ করাও কুফরী।

দলীলসমূহঃ- (১) তাফসীরে কবীর, (২) খাযেন, (৩) রুহুল মায়ানী, (৪) রুহুল বয়ান, (৫) মাদারেক, (৬) মাযহারী, (৭) ইবনে কাছীর, (৮) যাদুল মাছীর জামাল, (৯) জালালাইন, (১০) বুখারী শরীফ, (১১) ফতহুল বারী, (১২) উমদাতুল ক্বারী, (১৩) মেশকাত, (১৪) মেরকাত, (১৫) আশয়াতুল লুময়াত, (১৬) ত্বীবী, (১৭) তালীক্ব, (১৮) তিবরানী, (১৯) দুররুল মোখতার, (২০) আন নি’মাতুল কুবরা, (২১) নূরে মুহম্মদী, (২২) তাজকিরাহ্, (২৩) হিলইয়াতুল আওলিয়া, (২৪) আবু নঈম, (২৫) সীরাতে হালবিয়া, (২৬) হুজ্জাতুল্লাহি আলাল আলামীন, (২৭) তাওয়ারিখে মুহম্মদী, (২৮) কানযুল ইবাদ, (২৯) ফতওয়ায়ে সূফিয়া, (৩০) মুহীত, (৩১) কুওয়াতুল কুলুব, (৩২) ফতওয়ায়ে খাজেনাতুর রেওয়ায়েত, (৩৩) ফতওয়ায়ে সিরাজুম্ মুনীর, (৩৪) ফতওয়ায়ে মিফতাহুল জিনান, (৩৫) তাহ্ক্বীক্বুল মাকাম আলা ক্বিফায়াতিল আওয়াম, (৩৬) বারাহীনে কাতিয়া ফি মাওলিদীহি খাইরুল বারিয়্যাহ্, (৩৭) মজমুয়ায়ে ছগীর, (৩৮) মাওয়াহিব, (৩৯) শরহে মাওয়াহিব, (৪০) দালায়িলুন নুবুওওয়া, (৪১) আশ্ শিফা, (৪২) খাছায়েছুল কুবরা, (৪৩) মাদারেজুন নুবুওয়াত, (৪৪) শরফুল আলম, (৪৫) নশরুত ত্বীব ইত্যাদি।

মুহম্মদ মোসাব্বির হোসেন নিপু

সিনিয়র সভাপতি- ছাত্র আঞ্জুমানে আল বাইয়্যিনাত

দিনাজপুর জিলা শাখা

সুওয়ালঃ- অনেক লোককে দেখা যায় যে, তারা মুজাদ্দিদুয্যামান, ঢাকা, রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর সাহেব ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলী-এর বিরোধীতা করে থাকে। যেমন, তারা তাঁর ওয়াজ মাহ্ফিল বানচাল করার অপচেষ্টা চালায়। মানুষদেরকে তাঁর ওয়াজ-নসীহত শোনা ও তাঁর প্রকাশিত মাসিক আল বাইয়্যিনাত পত্রিকা পাঠ করা হতে বিরত রাখার চেষ্টা করে। তাঁর লক্ববসমূহ সম্পর্কে সম্পূর্ণ অপব্যাখ্যা করে এবং তাঁর নামে বিভিন্ন প্রকার মিথ্যা তোহ্মত আরোপ করে। কিন্তু এই বিরোধীতার নির্ভরযোগ্য কোন কারণ বিরোধীতাকারীরা পেশ করতে পারেনি এবং আমরাও কোন কারণ খুঁজে পাইনি।

তাই আমাদের সুওয়াল হলো- মুজাদ্দিদুয্যামান হযরত পীর সাহেব ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলী-এর বিরোধীতা কেন? তা আমাদেরকে জানিয়ে বাধিত করবেন।

জাওয়াবঃ- আখেরী রাসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শেষ নবী। ক্বিয়ামত পর্যন্ত পৃথিবীতে আর কোন নবী-রাসূল-এর আগমন ঘটবে  না। সুতরাং যে ব্যক্তিই নবী দাবী করবে সে ব্যক্তিই শরীয়তের দৃষ্টিতে কাফির। ক্বিয়ামতের পূর্ব পর্যন্ত মানবজাতির হেদায়েতের জন্য তথা মুসলমানদের আক্বীদা ও আমল পরিশুদ্ধ করার এবং দ্বীন ইসলামে প্রবেশকৃত সকল কূফরী, র্শেকী ও  বিদ্য়াতের মূলোৎপাটনের লক্ষ্যে নায়েবে রাসূলগণের মধ্য হতে “মুজাদ্দিদগণ” পৃথিবীতে আগমন করবেন। (আবূ দাউদ)

তাঁরা শরীয়তের দলীল তথা-কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াসের ভিত্তিতে যেরূপ সহীহ্ আক্বীদা ও আমলসমূহ মানুষের কাছে তুলে ধরবেন। তদ্রুপ কূফরী আক্বীদা ও শরীয়ত বিরোধী আমল থেকে তাদেরকে সতর্ক করবেন। যেমন করেছেন হুজ্জাতুল ইসলাম হযরত ইমাম গাজ্জালী (রঃ), গাউসুল আযম হযরত বড় পীর সাহেব (রঃ), সুলতানুল হিন্দ হাবীবুল্লাহ্ হযরত খাজা মুঈনুদ্দীন চিশ্তী (রঃ), কাউয়্যূমে আউয়াল হযরত মুজাদ্দিদে আল্ফে ছানী (রঃ), মুজাদ্দিদে যামান হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরলভী রহমতুল্লাহি আলাইহিএবং গত শতকের মুজাদ্দিদ হযরত আবূ বকর সিদ্দিকী ফুরফরাবী রহমতুল্লাহি আলাইহিপ্রমূখ মুজাদ্দিদগণ।

এ মহান দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে উল্লিখিত সকলেই নাহক্ব বা বাতিল কর্তৃক বিরোধীতার স্বীকার হয়েছেন, তাঁদের নামেও বহু মিথ্যা অপপ্রচারণা চালানো হয়েছে। ঠিক তারই ধারাবাহিকতা আমরা লক্ষ্য করছি- “বর্তমান শতকের মুজাদ্দিদ” রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর সাহেব ক্বিবলা (মুদ্দা জিল্লুহুল আলী)-এর ক্ষেত্রেও। অর্থাৎ এক শ্রেণীর লোক সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে “রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর সাহেব ক্বিবলা-এর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে এবং বিরোধীতা করছে।  তাই অনেকেরই মনে এ প্রশ্ন  হওয়া স্বাভাবিক যে, কেন এই বিরোধীতা?

মূলতঃ বিরোধীতার কারণ একটিই, আর তা হলো- “রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর সাহেব ক্বিবলা কূফরী  ও শরীয়ত বিরোধী আক্বীদা, আমল ও বক্তব্যের বিরোধীতা করেন। কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াসের অসংখ্য দলীলের ভিত্তিতে তার সঠিক ও শরয়ী ফায়সালা “মাসিক আল বাইয়্যিনাতে” তুলে ধরেন। রাজারবাগ বিরোধীরা দলীলের দ্বারা তা খন্ডন করতে না পেরে শুধুমাত্র নফ্সানিয়াতের কারণেই রাজারবাগ শরীফের বিরোধীতা করে এবং অপপ্রচার চালায়।

রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর সাহেব ক্বিবলা (মুদ্দা জিল্লুহুল আলী)-এর যে সকল হক্ব ফতওয়ার কারণে তাঁর বিরোধীতা করা হয় সে সকল ফতওয়া হতে কিছু ফতওয়া সংক্ষিপ্ত দলীলসহ নিম্নে তুলে ধরা হলো- আর এতেই বুঝতে পারবেন যে, কেন তারা রাজারবাগ শরীফের বিরোধীতা করে।

প্রসঙ্গ মৌলবাদ

রাজারবাগ বিরোধীরা বলে থাকে যে, “যারা মৌলবাদ না তারা জারজ বা অবৈধ সন্তান” (২৮ অক্টোবর’৯৯ দৈনিক ভোরের কাগজে এসেছে,  চরমোনাই পীর এ কথা বলেছে।” আর ২২ আগষ্ট মানিক মিয়া এভিনিউতে সে বলেছে, “যারা মৌলবাদে বিশ্বাসী নয় তারা কাফের, মুরতাদ ও মুশরিক এবং একই বক্তব্য সে ২৬ এপ্রিল/২০০০ বরিশাল টাউন হলে দিয়েছে।”

আর রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর সাহেব ক্বিবলা (মুদ্দা জিল্লুহুল আলী) ফতওয়া দিয়েছেন, “এ কথাটি সম্পূর্ণই শরীয়ত বিরোধী ও গোমরাহীমূলক এবং ক্ষেত্রবিশেষে কূফরী। কেননা মৌলবাদ দাবী না করলে জারজ সন্তান হবে এ ধরণের কথা  শরীয়তের কোথাও নেই। কারণ সন্তান বৈধ ও অবৈধ হওয়া তার মায়ের সাথে সম্পৃক্ত। অর্থাৎ মা যদি সতী-সাধবী হন তাহলে সন্তান বৈধ, আর যদি মা এর ব্যতিক্রম হয় তাহলে সন্তান অবৈধ হতে পারে, অন্যথায় নয়।           উল্লেখ্য, কুরআন শরীফ ও হাদীস শরীফে মু’মিন, মুসলিম, মুত্ত্বাকী ইত্যাদি হওয়ার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে  কোথাও মৌলবাদী হওয়ার জন্য বলা হয়নি। তাছাড়া ইতিহাস স্বাক্ষ্য দেয় যে, ধর্মান্ধ, চরমপন্থী আমেরিকান খ্রীষ্টান প্রোটেষ্ট্যান্ট সম্প্রদায়ের বাইবেল সম্পর্কিয় ৫টি মতবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯১২ সালে আমেরিকায় ফিলাডেলফিয়ায় খ্রীষ্টান প্রোটেষ্ট্যান্টরা ঋঁহফধসবহঃধষরংঃ বা মৌলবাদী আন্দোলন নামে যে গোড়া আন্দোলন করেছিল। এবং চরমপন্থী খ্রীষ্টান প্রোটেষ্ট্যান্ট সম্প্রদায়ই “মৌলবাদী” বলে পরিচিত। অতএব, মুসলমান কখনো মৌলবাদী হতে পারেনা। তারা বিনা দলীলে একথা বলে থাকে।

(এ সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জানতে হলে মাসিক আল বাইয়্যিনাত-এর ১৭, ৪৯, ৫০ ও ৫৪তম সংখ্যা পাঠ করুন)।

প্রসঙ্গ- হরতাল

কতিপয় নামধারী মাওলানা ও পীর হরতাল করে এবং হরতালকে জিহাদ বলে আখ্যায়িত করে। আবার কেউ কেউ হরতাল পালন করার পর শুকরিয়াও আদায় করে। (নাউযুবিল্লাহ্)

রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর সাহেব ক্বিবলা (মুদ্দা জিল্লুহুল আলী) ফতওয়া দিয়েছেন, “হরতাল করা জায়েয নেই।” কারণ প্রথমতঃ ইহা বিধর্মীদের দ্বারা প্রবর্তিত পদ্ধতি।     কারণ হরতালের উদ্ভাবক হচ্ছে কাট্টা হিন্দু মহনদাস করম চাঁদ গান্ধী।  ১৯৩০ সালে রাউলাট আইনের প্রতিবাদে গান্ধী তার স্বকীয়তা বজায় রাখতে গিয়ে এবহধৎধষ ংঃৎরশব বাদ দিয়ে নিজস্ব গুজরাটী ভাষায় হরতাল প্রবর্তন করে।

অথচ আল্লাহ্ পাক বলেন,

لقد كان لكم فى رسول الله اسوة حسنة.

অর্থঃ- “নিশ্চয়ই তোমদের জন্য আল্লাহ্ পাক-এর রাসূল হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।”

আর হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে,

من تشبه بقوم فهو منهم.

অর্থঃ “যে ব্যক্তি যে সম্প্রদায়ের সাথে (আক্বীদা ও আমলের) মিল রাখবে, তার হাশর-নশর তাদের সাথে হবে।”

দ্বিতীয়তঃ হরতাল মানুষের জান-মাল তথা জীবন যাত্রার জন্য অবর্ণনীয় দূর্ভোগ বা কষ্ট স্বরূপ আর হাদীস শরীফে আরো এরশাদ হয়েছে,

ايذاء المسلم كفر.

অর্থঃ- “মুসলমানকে কষ্ট দেয়া কূফরী।”

উল্লেখ্য, হরতাল শুধু জন সাধারনের জন্যই দুর্ভোগ বয়ে আনেনা বরং তা সামগ্রিকভাবে দেশের জন্যও বিশেষ ক্ষতিকর যা বলার অপেক্ষা রাখেনা। অতএব হরতাল করা নাজায়েয ও হারাম।

(এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে হলে মাসিক আল বাইয়্যিনাত-এর ১৬, ১৭, ১৮, ২৫, ২৯, ৪৯, ৫০ ও ৫৪তম সংখ্যা পাঠ করুন)।

প্রসঙ্গ ব্লাসফেমী আইন

তারা ব্লাসফেমী আইন তলব করে থাকে। তারা মনে করে থাকে, ব্লাসফেমী আইন জারি করলে তা ইসলামের হেফাজত তথা কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ জারি করা ও মুরতাদদের দমনে সহায়ক হবে। অথচ ব্লাসফেমী আইন একান্তই ইহুদী ও খ্রীষ্টানদের ধর্ম রক্ষার সাথে সম্পর্কযুক্ত।

প্রচলিত অর্থে ব্লাসফেমী বলতে বুঝায়- খ্রীষ্ট ধর্ম, বাইবেল ও ইশ্বর-এর প্রতি দোষারোপ করা। ব্লাসফেমী ইহুদীদেরও ধর্ম রক্ষার আইনের প্রচলন ছিল। এ আইনে ধর্মদ্রোহীতার বা ধর্মবিরোধীতার অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে বিভিন্ন প্রকার শাস্তিসহ, এমনকি মৃত্যুদন্ড পর্যন্ত দেয়া হতো। তবে খ্রীষ্ট সমাজেই এর অধিক ব্যবহার, চর্চা ও প্রয়োগ দেখা যায়। আবার ঐতিহাসিকদের মতে- অনেক খ্রীষ্টান শাসক তাদের ব্যক্তি তথা রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্যও এ আইনকে ব্যবহার করতো। সম্রাট ফেডারিক (২য়) সহ অনেকের ক্ষেত্রে এর দৃষ্টান্ত রয়েছে।

উল্লেখ্য যে, খ্রীষ্টান ও ইহুদী উভয় সম্প্রদায়ই ব্লাসফেমী প্রয়োগে একমত হলেও এর ব্যবহারবিধি সম্পর্কে তাদের মধ্যে মতভেদ পরিলক্ষিত হয়।

ঐতিহাসিক বিবরণ মতে এ আইনের প্রথম ব্যবহার দেখা যায়- ইহুদী সম্প্রদায়ের মাঝে। খ্রীষ্ট মতে হযরত ইব্রাহীম (আঃ)-এর আবির্ভাব ঘটে ৫০০০ বছর পূর্বে এবং তাঁর পরবর্তীতে এ আইনের প্রচলন হয়। তবে রাষ্ট্রীয় আইন হিসেবে এ আইন সর্বপ্রথম রোমে স্বীকৃত হয় এবং তার শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদন্ডও কার্যকর করা হয়।

প্রকৃতপক্ষে, ব্লাসফেমী আইন হলো ইহুদী ও খ্রীষ্টান ধর্মের প্রতি বিদ্বেষ পরায়ণ হয়ে প্রকাশ্যে দোষারোপ করলে তা ইংলিশ ও আমেরিকান আইনে ফৌজদারী অপরাধ। এ অপরাধে যারা অভিযুক্ত হবে তাদের শাস্তি হচ্ছে মৃত্যুদন্ড।

আর রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর সাহেব ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলী ফতওয়া দিয়েছেন যে, ব্লাসফেমী আইন তলব করা জায়েয নেই। কারণ আল্লাহ্ পাক দ্বীন ইসলামকে পুর্ণতা দিয়ে নাযিল করেছেন। ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন আইন তলব করার অর্থই হলো ইসলামকে অপূর্ণ মনে করা যা সম্পূর্ণ কুফরীর অন্তর্ভূক্ত।

অতএব, ব্লাসফেমী আইন তলব করা কুফরীর শামীল।

(এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হলে মাসিক আল বাইয়্যিনাত ১৮, ১৯ ও ৫০তম সংখ্যাগুলো পড়ুন)

প্রসঙ্গ লংমার্চ

তারা লংমার্চ করে। যেমন তারা ভারতের বাবরী মসজিদ পুনঃনির্মাণের লক্ষ্যে লংমার্চ করে এবং এই লংমার্চকে হিজরত ও তাবুকের জিহাদের সাথে তুলনা করে। আবার কেউ কেউ হুজুর পাক সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর তায়েফ গমনের সাথে তুলনা করে।

অথচ লংমার্চ হলো নাস্তিকদের নাস্তিক্যবাদ রক্ষার জন্য এক পলায়ন পর অভিযানের নাম। যার প্রবর্তক হচ্ছে চীনের কট্টর নাস্তিক মাওসেতুং। সে লংমার্চের একক কীর্তির দাবিদার আর সেই পদ্ধতি বা নিয়ম-নীতিকে হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কর্ম বা নিয়মনীতির সাথে তুলনা করা ও তা অনুসরণ করা শুধু নাজায়েযই নয় বরং কুফরীর অন্তর্ভূক্ত।

তাই রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর সাহেব ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলী ফতওয়া দিয়েছেন যে, লংমার্চ নাজায়েয ও হারাম। ক্ষেত্র বিশেষে কুফরীর অন্তর্ভূক্ত। কেননা, দ্বীন ইসলাম হচ্ছে পরিপূর্ণ ও তার নিয়মনীতি, তর্জ-তরীকা অন্যান্য বাতীল ধর্ম ও তার অনুসারীদের নিয়মনীতি হতে সম্পূর্ণ আলাদা। সেই নিয়মনীতির সাথে ইসলামের নিয়মনীতির তুলনা করা যেমন সম্পূর্ণ কুফরী তেমন তা অনুসরণ করাও নাজায়েয এবং হারাম।

(এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হলে ৯, ১০, ১১, ১৭, ১৮, ২৫, ৫০ ও ৫৪ তম সংখ্যাগুলো পাঠ করুন)

প্রসঙ্গ কুশপুত্তলিকাদাহ্

তারা কুশপুত্তলিকা নির্মাণ ও তা দাহ করেছে। অথচ কুশপুত্তলিকা তৈরি করা ও তা দাহ করা উভয়ই বিধর্মী ও বিজাতীয়দের প্রবর্তিত পদ্ধতি। মূলতঃ এ কাজটি হিন্দু ঐতিহ্য। যেমন প্রাচীনকালে হিন্দুরা বলত যে, তাদের মৃত ব্যক্তির শবদেহ দাহ না করলে শ্রাদ্ধাদি কার্য হতে পারেনা। নিখোঁজ মৃত ব্যক্তির ক্ষেত্রে তারা যখন শবদেহ পেতনা তখন তারা কুশের বা অন্য কিছুর দ্বারা মানবমূর্তি নির্মাণ করত যাকে কুশপুত্তলিকা বলা হয়। আর এ কুশপুত্তলিকা নির্মাণ করে তাকে দাহ করা হলে তাকে কুশপুত্তলিকা দাহ বলা হয়। ফ্রান্সের জনগণ কোন ব্যক্তিকে তার প্রতি ঘৃণা, বিদ্বেষ বা অসন্তোষ প্রকাশের জন্য তার অবিকল প্রতীক বা প্রতিমূর্তি পোড়ানো বা ফাঁসীতে ঝুলানো হতো। তারা একথা বিশ্বাস করতো যে, একটি প্রতিমূর্তির উপর শাস্তিমূলক কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করলে তা প্রকৃত ব্যক্তির উপর যাদুক্রিয়া করবে। তারা যখন প্রকৃত অপরাধীকে খুঁজে পেত না তখন তারা প্রতিমূর্তিকে ফাঁসী দেবার ব্যবস্থা করত।

কাজেই মূর্তি নির্মাণ ও তা দাহ্ করা অর্থাৎ কুশপুত্তলিকা তৈরী করা ও তা দাহ করা মুসলমানের জন্য কি করে জায়েয ও শরীয়ত সম্মত হতে পারে?

যেখানে হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন,

بعثت لكسر المزامير والاصنام.

অর্থঃ- “আমি প্রেরিত হয়েছি মূর্তি ও বাদ্যযন্ত্র ধ্বংস করার জন্য।”

আর রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর সাহেব ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলী ফতওয়া দিয়েছেন যে, কুশপুত্তলিকা নির্মাণ করা এবং তা দাহ করা সম্পূর্ণ নাজাযেয ও হারাম। কারণ ইহা বিধর্মী ও বিজাতীয়দের প্রবর্তিত প্রদ্ধতি।

(এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হলে ৯, ১০, ১২, ৬২, ৬৩ সংখ্যাগুলো পাঠ করুন)

প্রসঙ্গ ইসলামের নামে গণতন্ত্র

তারা ইসলামের নামে গণতন্ত্রভিত্তিক আন্দোলন করে এবং ইসলামের নামে গণতন্ত্রভিত্তিক নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে।

আর রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর সাহেব ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলী ফতওয়া দিয়েছেন যে, শরীয়তের দৃষ্টিতে ইসলামের নামে গণতন্ত্র করা ও নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা সম্পূর্ণই হারাম।

কারণ “গণতন্ত্র” হচ্ছে- “মানব রচিত মতবাদ।” আধুনিক গণতন্ত্রের প্রবর্তক হচ্ছে বেদ্বীন আব্রাহাম লিংকন। গণ অর্থ- জনগন, আর তন্ত্র অর্থ হচ্ছে- নিয়মনীতি। অর্থাৎ জনগণের দ্বারা জনগণের জন্য যে আইন প্রণয়ন করা হয় তাই গণতন্ত্র। কুরআন-সুন্নাহ্ তথা শরীয়তের সাথে এর কোন সম্পর্ক নাই। গনতন্ত্রের মূলনীতি হচ্ছে- “সকল ক্ষমতার উৎস জনগণ।” অথচ একথাটি সুস্পষ্ট কূফরী। কারণ সকল ক্ষমতার মালিক হচ্ছেন, আল্লাহ্ পাক। অতএব বিধর্মীদের প্রবর্তিত পদ্ধতি গণতন্ত্রকে ইসলামের নামে অনুসরণ করা মুসলমানদের জন্য কি করে জায়েয হতে পারে? সুতরাং ইসলামের নামে গণতন্ত্র করা ও নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা হারাম ও নাজায়েয।

(এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে হলে ২৬তম সংখ্যা পাঠ করুন।)

প্রসঙ্গ ছবি

রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর সাহেব ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলী ফতওয়া দিয়েছেন যে, ছবি তোলা, টেলিভিশন, ভি সি আর, ভি ডি ও ইত্যাদি দেখা সম্পূর্ণ নাজায়েয ও হারাম।

কারণ কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও ক্বিয়াসের দৃষ্টিতেও টেলিভিশন, ভিসিআর, ভিডিও ইত্যাদি দেখা এবং ছবি তোলা-আকাঁ, রাখা ইত্যাদি হারাম ও নাজায়েয। বুখারী শরীফসহ অসংখ্য হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে, “ক্বিয়ামতের দিন ঐ ব্যক্তি সবচেয়ে কঠিন শাস্তি পাবে যে ব্যক্তি ছবি তোলে বা তোলায়।”।

অথচ তাদের একটি সাপ্তাহিক পত্রিকায় লিখেছে যে, “টেলিভিশন, ভি সি আর, ভি ডি ও, নাটক, নোবেল ইত্যাদি সব জায়েয। এছাড়াও তারা স্ব-ইচ্ছায় তাদের মিটিং, মিছিল ইত্যাদির ছবি তোলে, এমনকি প্রত্যেকেই ব্যক্তিগতভাবে স্ব-ইচ্ছায় নিজের ছবি তোলে শুধুমাত্র প্রচারের জন্য পেপার-পত্রিকায় দিয়ে থাকে। দৈনিক পত্রিকাগুলোর দিকে লক্ষ্য করলে এর ভুরিভুরি প্রমাণ পাওয়া যায়। এছাড়া সাপ্তাহিক, পাক্ষিক, মাসিক পত্রিকায়ও  সর্বোপরি তাদের নিজস্ব পত্রিকায়ও তারা তাদের ছবি ছাপিয়ে থাকে।

(এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে হলে ৫, ৬, ৭ তম সংখ্যাগুলো পাঠ করুন)

প্রসঙ্গ পর্দা

রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর সাহেব ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলী ফতওয়া দিয়েছেন যে,

পর্দা করা ফরজ। পর্দার খেলাপ করা কবীরা গুণাহ্। তবে পর্দাকে অবজ্ঞা করা, পর্দা করা দরকার নেই বলা ইত্যাদি কুফরীর অন্তর্ভূক্ত।

কারণ আল্লাহ্ পাক কুরাআন শরীফে পর্দা করা “ফরজে আইন” ঘোষনা করেছেন। হাদীস শরীফে রয়েছে,

لعن الله الناظر والمنظور اليه.

অর্থঃ- “যে দেখে ও দেখায় উভয়ের প্রতিই আল্লাহ্ পাক-এর লা’নত।”

যারা পর্দা করে না তারা চরম ফাসেক। তাদের পিছনে নামাজ পড়া মাকরূহ তাহরীমী।

অথচ তারা পর্দাকে কোনই গুরুত্ব দেয়না তার প্রমাণ “চার দলের বৈঠক” সেখানে কতিপয় মাওলানাকে একজন বেগানা মহিলার সাথে পর্দা ব্যতীত মুখোমুখি বসে থাকতে দেখা গেছে এবং রমজান মাসে কতিপয় নামধারী আলেম বেগানা মহিলার সাথে পাশাপাশি বসে ইফতারও করেছে। এছাড়া তারা অহরহ বেগানা মেয়েদের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করে থাকে।

(সূরায়ে নূর, আহযাব, তাফসীরে আহকামুল কুরআন, কুরতুবী, বুখারী, মুসলিম, আলমগীরী, বাহরুর রায়েক, ফতওয়ায়ে দেওবন্দ ইত্যাদি)

প্রসঙ্গ মীলাদ-ক্বিয়াম

রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর সাহেব ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলী ফতওয়া দিয়েছেন যে, মীলাদ-ক্বিয়াম হচ্ছে সুন্নতে উম্মত মুস্তাহ্সান।          কারণ পূর্ববর্তী ইমাম-মুজতাহিদ, আউলিয়া-ই-কিরাম (রঃ)গণেরও ফতওয়া হলো, মীলাদ-ক্বিয়াম হচ্ছে সুন্নতে উম্মত মুস্তাহ্সান। জায়েয তো অবশ্যই।

অথচ তারা বলে, মীলাদ শরীফ পাঠ করা বিদ্য়াত। আর ক্বিয়াম করাকে শিরক বলে থাকে। তাদের কেউ কেউ আবার মীলাদ-ক্বিয়ামকে কৃষ্ণলিলার গীতের সাথেও তুলনা করেছে। (নাউযুবিল্লাহ্)

উল্লেখ্য, তাদেরই পীর সাহেব হযরত হাজী এমদাদুল্লাহ্ মুহাজেরে মক্কী রহমতুল্লাহি আলাইহিনিজেই মীলাদ-ক্বিলাম করতেন এবং ইহাকে জায়েয ছাবেত করা ও দায়েম-কায়েম রাখার জন্য কিতাবও লিখেছেন। যেমন, “হাফতে মাসায়েল” ইত্যাদি।

(এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে হলে, ২৮, ৩৬, ৪০, ও ৪৭তম সংখ্যাগুলো পাঠ করুন)

প্রসঙ্গ মুনাজাত

আর রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর সাহেব ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলী ফতওয়া দিয়েছেন যে, ফরজ নামাজের পর হাত উঠিয়ে সম্মিলিতভাবে মুনাজাত করা সুন্নতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। আযান ও জানাযার নামাজের পর কাতার ভঙ্গ করে হাত উঠিয়ে মুনাজাত করা জায়েয ও মুস্তাহাব।

কারণ হাদীস শরীফ দ্বারা প্রমাণিত রয়েছে যে, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বয়ং নিজেই ফরজ নামাজের পর সম্মিলিতভাবে হাত উঠিয়ে মুনাজাত করেছিলেন। আর ইমাম-মুজতাহিদ, আউলিয়া-ই-কিরাম (রঃ)গণ ফতওয়া দিয়েছেন যে, আযানের পর ও জানাযা নামাজের পর কাতার ভঙ্গ করে হাত উঠিয়ে মুনাজাত করা জায়েয ও মুস্তাহাব।

অথচ তারা বলে ফরজ নামাজের পর হাত উঠিয়ে মুনাজাত করা, আযানের পর হাত উঠিয়েম মুনাজাত করা ও জানাযার নামাজের পর কাতার ভঙ্গ করে হাত উঠিয়ে মুনাজাত করা বিদ্য়াত ও নাজায়েয।

(এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে হলে মাসিক আল বাইয়্যিনাত-এর ১৫, ১৬, ১৭, ১৮, ১৯ ও ২০তম সংখ্যাগুলো পাঠ করুন)

প্রসঙ্গ রোজা অবস্থায় ইনজেকশন

আর রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর সাহেব ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলী ফতওয়া দিয়েছেন যে, রোজা অবস্থায় ইনজেকশন নিলে রোজা ভঙ্গ হয়ে যায়। কেননা উক্ত ইনজেকশনের ঔষধ মগজ ও পাকস্থলিতে প্রবেশ করে।

কারণ পূর্ববর্তী ইমাম-মুজতাহিদ, আউলিয়া-ই-কিরাম (রঃ)গণ ফতওয়া দিয়েছেন, রোজা অবস্থায় কোন কিছু তা খাদ্য দ্রব্য হোক বা ঔষধ হোক ইত্যাদি মগজে বা পাকস্থলিতে প্রবেশ করলে রোজা ভঙ্গ হয়ে যায়। আর বর্তমানে চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতে ইনজেশকন, স্যালাইন ইত্যাদি মগজ ও পাকস্থলিতে পৌঁছে থাকে।

অথচ তারা বলে ও প্রচার করে যে, রোজা অবস্থায় ইনজেকশন, স্যালাইন ইত্যাদি নেয়া যায়, তাতে রোজা ভঙ্গ হয় না। কারণ ইনজেকশন মগজ ও পাকস্থলিতে পৌঁছেনা।

তাদের এ কথাটি সম্পূর্ণ ভুল ও দলীলবিহীন। তাদের একথার পক্ষে যেমন কুরআন-সুন্নাহ্ থেকে কোন দলীল নেই তেমন চিকিৎসা বিজ্ঞানেরও কোন দলীল নেই।

(এ ব্যাপারে বিস্তরিত জানতে হলে মাসিক আল বাইয়্যিনাত-এর ২১, ২২ ও ৪৭তম সংখ্যাগুলো পাঠ করুন)

প্রসঙ্গ কুরআন খতমের বিনিময়

আর রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর সাহেব ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলী ফতওয়া দিয়েছেন যে, সময় ও স্থান নির্ধারণ করে দেয়ার শর্তে তারাবীহ্র নামাজ ও অন্যান্য সময় কুরআন শরীফ খতম বা তিলাওয়াত করে উজরত বা বিনিময় দেয়া ও নেয়া উভয়টাই জায়েয।

কারণ বিশ্ব বিখ্যাত ও সর্বজনমান্য ফিক্বাহ্ ও ফতওয়ার  কিতাবের বর্ণনা দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, ওলামায়ে মুতাআখ্খেরীনগণের মতে সময় ও স্থান নির্ধারণ করে দেয়ার শর্তে কুরআন শরীফ, খতম ও তিলাওয়াত করে বা করায়ে বিনিময় নেয়া বা দেয়া জায়েয। তাতে কারো সওয়াবেরই কোন ঘাটতি হবে না।

অথচ তারা বলে, তারবীহ্ নামাজে ও অন্যান্য সময় কুরআন শরীফ খতম বা তিলাওয়াত করে উজরত বা বিনিময় নেয়া ও দেয়া উভয়টাই নাজায়েয ও হারাম। যে দিবে ও নিবে উভয়েই গুণাহ্গার হবে এবং সওয়াব থেকে বঞ্চিত হবে।

(এ ব্যাপারে দলীল পেতে হলে মাসিক আল বাইয়্যিনাত-এর ২৩ ও ২৪ তম সংখ্যাগুলো  ও বিশেষ করে ৫৯ হতে ৬৯তম সংখ্যাগুলোর মতামত পাঠ করুন)

প্রসঙ্গ টুপি

রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর সাহেব ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলী ফতওয়া দিয়েছেন যে, “চার টুকরা বিশিষ্ট, গোল, সাদা, সুতি কাপড়ের টুপি যা মাথার সাথে লেগে থাকে তা খাছ সুন্নত।”    কারণ হাদীস শরীফ দ্বারা প্রমাণিত রয়েছে যে, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও সাহাবা-ই-কিরাম (রাঃ)গণের টুপি ছিল গোল, সূতি কাপড়ের সাদা রঙের যা মাথার সাথে লেগে থাকত চার টুকরা বিশিষ্ট।

অথচ তারা বলে যে কোন টুপি পড়লেই সুন্নত  আদায় হবে। কারণ আখেরী রাসূল হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জালী, কিস্তি, পাঁচ কল্লি ইত্যাদি সব ধরণের টুপিই ব্যবহার করেছেন।

তাদের উপরোক্ত মন্তব্যটি আখেরী রাসূল হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শানে সুস্পষ্ট মিথ্যারোপের শামীল। কারণ জালী, কিস্তি, পাঁচ কল্লি ইত্যাদি টুপি গুলোর উৎপত্তি হলো বর্তমানেকালে। কাজেই উক্ত টুপিগুলোর প্রচলন হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, সাহাবা-ই-কিরাম, তাবেঈন, তাবে তাবে-তাবেঈন কারো জামানাতেই ছিলনা। তাই হাদীস  শরীফের কোথাও উক্ত টুপিগুলোর কোন বর্ণনাই নেই। যদি তাই হয়ে থাকে তবে উক্ত টুপিগুলোর দ্বারা কি করে সুন্নত আদায় হতে পারে?  ইহা সম্পূর্ণরূপে হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি মিথ্যারোপ যা কুফরীর অন্তর্ভূক্ত।

(এ ব্যাপারে বিস্তারিত দলীল আদীল্লাহ্সহ ও সুষ্ঠ সমাধান পেতে হলে আল বাইয়্যিনাতের  ৫৩ হতে ৫৯তম সংখ্যা গুলো পাঠ করুন)

প্রসঙ্গ পাগড়ী

রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর সাহেব ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলী ফতওয়া দিয়েছেন যে, পাগড়ী পরিধান করা দায়েমী সুন্নত এবং পাগড়ী পরিধান করে নামাজ পড়লে পাগড়ী ব্যতীত নামাজ পড়া অপেক্ষা ‘সত্তর গুণ’ ফযীলত পাওয়া যায়।

কারণ হাদীস শরীফে রয়েছে, পাগড়ী পরিধান করে নামাজ পড়া পাগড়ী ব্যতীত নামাজ পড়া অপেক্ষা সত্তর গুণ বেশী ফযীলত। আর স্বয়ং হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পাগড়ী দায়েমীভাবে ব্যবহার করতেন।

তাই ইমাম-মুজতাহিদ, আউলিয়া-ই-কিরাম (রাঃ)গণ ফতওয়া দিয়েছেন, পাগড়ী পড়া দায়েমী সুন্নতের অন্তর্ভূক্ত।

অথচ তারা পাগড়ী পরিধান করাকে তো কোন গুরুত্ব দেয়ই না বরং তারা পাগড়ী পরিধান করলে কাদিয়ানী সম্প্রদায় যারা কাট্টা কাফির তাদের সাথে তুলনা দিয়ে থাকে যা কুফরীর শামীল। তাদের মধ্যে যারা পাগড়ী পরিধান করাকে জায়েয মনে করে তাদের মধ্যে অনেকে বলে থাকে এত সুন্নতের দরকার নেই। ইহাও কুফরীমূলক কথা। কারণ আল্লাহ্ পাক কুরআন শরীফে বলেছেন,

وما اتاكم الرسول فخذوه.

অর্থঃ- “আমার রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যা এনেছেন তা আকঁড়িয়ে ধর।”

আর হুজুর পাক সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন,

عليكم بسنتى وسنة الخلفاء الراشدين المهديين.

অর্থঃ- “তোমাদের জন্য আমার সুন্নত এবং আমার হেদায়েতপ্রাপ্ত খলীফাগণের সুন্নত লাযেম করে দেয়া হল।” (মাসিক আল বাইয়্যিনাত/৩, আবূ দাউদ শরীফ, বজলুল মাজহুদ, শামায়েলে তিরমীযী, তোহফাতুল আহওয়াজী, মেশকাত, মেরকাত, জামউল ওসায়েল ইত্যদি)

প্রসঙ্গ রুমাল

রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর সাহেব ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলী ফতওয়া দিয়েছেন যে, পুরুষের জন্য সম্পূর্ণ লাল রুমাল ব্যবহার করা হারাম। অধিকাংশ লাল রুমাল মাকরূহ্ তাহরীমী। আর অধিকের কম লাল হলে মাকরূহ তানযীহী।        কারণ হাদীস শরীফে রয়েছে হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পুরুষদের জন্য  লাল কাপড় পরিধান করতে নিষেধ করেছেন। লাল কাপড় পরিহিত ব্যক্তির সালামের জাওয়াব দেননি। উটের হাওদায় লাল কাপড় বিছিয়ে দেয়ার কারণে সেখানে বসেননি।

অথচ তারা বলে থাকে, লাল কাপড় পরিধান করা পুরুষের জন্য জায়েয এবং নিজেরাও লাল রুমাল সদা-সর্বদা ব্যবহার করে থাকে।

প্রকৃতপক্ষে লাল কাপড় হচ্ছে খাছ করে মহিলাদের জন্য।

(এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হলে ১৭ ও ৪৭তম সংখ্যাগুলো পাঠ করুন।)

প্রসঙ্গ সুন্নতী কোর্তা

রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর সাহেব ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলী ফতওয়া দিয়েছেন যে, কোর্তা নেছফ ছাক, কোণা বন্ধ, গুটলীযুক্ত, সূতি কাপড়ের হবে খাছ সুন্নত।

কারণ হাদীস শরীফের দ্বারা প্রমাণিত আছে, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে কোর্তা পরিধান করেছেন তা সব সময় নেছফ ছাক, কোণা বন্ধ, গুটলীযুক্তু, সূতি কাপড়েরই হতো। তবে হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাদা রং এর মিশরী সূতি বেশী পছন্দ করতেন।

অথচ তারা কোণা ফাড়া, বোতাম যুক্ত, নেছফ ছাক থেকে ছোট কোর্তা পরিধান করে থাকে এবং এটাকেই তারা সুন্নত বলে প্রচার করে থাকে।

শরীয়তের ফায়সালা হলো- যা সুন্নত নয় তাকে সুন্নত বলা কুফরী। এছাড়া তাদের বক্তব্যের কোন দলীল নেই।

(এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হলে ৬, ৮, ১১, ২১, ২৪, ৪৪, ৪৭, ৪৯ ও ৭০ তম সংখ্যাগুলো পাঠ করুন)

প্রসঙ্গ লক্বব বা উপাধি

রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর সাহেব ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলী ফতওয়া দিয়েছেন যে, লক্বব ব্যবহার সুন্নাতুল্লাহ্, সুন্নতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, সুন্নতে সাহাবা-ই-কিরাম (রাঃ) ও সুন্নতে আউলিয়া-ই-কিরামের অন্তর্ভূক্ত।        কারণ আল্লাহ্ পাক স্বয়ং নিজেই এরশাদ করেন,

لله الاسماء الحسنى فادعوه بها.

অর্থঃ- আল্লাহ্ পাক-এর অনেক সুন্দর সুন্দর নাম মোবারক রয়েছে, তোমরা সে নামে তাঁকে ডাক।”

এর তাফসীরে বলা হয়েছে, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এরও অনেক সুন্দর সুন্দর নাম মোবারক রয়েছে সে নাম মোবারকে তাঁকে ডাক। এছাড়াও সমস্ত ইমাম-মুজতাহিদ, আউলিয়া-ই-কিরাম ফতওয়া দিয়েছেন, লক্বব ব্যবহার করা সুন্নত।

অথচ তারা নামের সাথে লক্বব বা উপাধি ব্যবহার করাকে নাজায়েয ও বিদ্য়াত বলে থাকে। যদিও তাদের কোন দলীল নেই। আরো আশ্চর্যের বিষয় তাদের অনুসরণীয় মুরুব্বীরাও নিজের নামের সাথে বহু লক্বব ব্যবহার করেছে।

উল্লেখ্য, লক্বব ব্যবহার করা হচ্ছে আল্লাহ্ পাক ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সুন্নত। হযরত সাহাবা-ই-কিরাম (রাঃ) এবং হযরত ইমাম মুজতাহিদ, আউলিয়া-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিসকলের সুন্নতের অন্তর্ভূক্ত।

(এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হলে ১২, ১৩, ১৪, ১৬, ১৭, ১৮, ১৯, ৪৪, ৪৭, ৪৮, ৫০, ৫৭, ৭৩ সংখ্যাগুলো পাঠ করুন।)

প্রসঙ্গ নূর

রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর সাহেব ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলী ফতওয়া দিয়েছেন যে, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নূরের তৈরী। অর্থাৎ নূরে মুজাস্সাম। তিনি আমাদের মত সাধারণ মানুষ বা মাটির তৈরী নন। আবার আল্লাহ্ পাক-এর জাতি নূরেরও তৈরী নন।

কারণ আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের ফতওয়া হলো হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের মত সাধারণ মানুষ বা মাটির তৈরি নন। তিনি হচ্ছে নূরের তৈরি। আল্লাহ্ পাক যে নূর মোবারককে সর্বপ্রথম সৃষ্টি করেন, সেই নূরই তিনি। তা হতেই কায়েনাতের সবকিছু সৃষ্টি করেন। আবার তিনি আল্লাহ্ পাক-এর জাতি নূরেরও তৈরি নন বরং তিনি আল্লাহ্ পাক-এর সৃষ্টিকৃত নূর। কারণ আল্লাহ্ পাক-এর জাতি নূর হতে সৃষ্টি বললে আল্লাহ্ পাক-এর সাথে হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে শরীক করা এবং আল্লাহ্ পাককে মাখলুক বা সৃষ্টি বলে সাব্যস্ত করা হয়। কারণ নূর হচ্ছে সৃষ্টবস্তু যার আকার আছে ইত্যাদি। অথচ আল্লাহ্ পাক সৃষ্টির কোন উপাদানের মেছাল থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র।

অথচ তারা বলে, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের মত সাধারণ মানুষ। তিনি মাটির তৈরি। নূরের তৈরি নন। আবার কেউ বলে, তিনি আল্লাহ্ পাক-এর জাতি নূরের তৈরি। অর্থাৎ আল্লাহ্ পাক-এর অংশ। (নাউযুবিল্লাহ্) তাদের উভয় প্রকার বক্তব্যই কুফরীর অন্তর্ভূক্ত।

(এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হলে ৬০ থেকে ৮২ তম সংখ্যাগুলো পাঠ করুন)

প্রসঙ্গ মাযার যিয়ারত

রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর সাহেব ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলী ফতওয়া দিয়েছেন যে, নিয়ত করে মাযার শরীফ যিয়ারত করা সুন্নতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, সুন্নতে সাহাবা-ই-কিরাম (রাঃ) এবং সুন্নতে আউলিয়া-ই-কিরাম (রঃ)গণের অন্তর্ভূক্ত।

কারণ হাদীস শরীফে রয়েছে, স্বয়ং আল্লাহ্ পাক-এর হাবীব হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেই সাহাবীগণকে সঙ্গে নিয়ে প্রতি বছর শুহাদায়ে বদর ও শুহাদায়ে ওহুদগণের মাযার শরীফ নিয়ত করে যিয়ারত করেছেন। খোলাফায়ে রাশেদীন (রাঃ)গণও করেছেন। পরবর্তীতে ইমাম-মুজতাহিদ ও আউলিয়া-ই-কিরাম (রঃ)গণও যিয়ারত করেছেন এবং জারি রেখেছেন।

অথচ তারা বলে, নিয়ত করে মাযার বা কবর যিয়ারত করা হারাম, নাজায়েয ও শিরকের অন্তর্ভূক্ত। যদিও তাদের কোন দলীল নেই।

(এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হলে ৪, ২২, ২৩, ৪৫, ৫২, ৫৫, ৬৯ তম সংখ্যাগুলো পাঠ করুন)

প্রসঙ্গ কদমবুছী

রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর সাহেব ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলী ফতওয়া দিয়েছেন যে, কদমবুছী করা সুন্নতে সাহাবা-ই-কিরাম(রাঃ) ও সুন্নতে আউলিয়া-ই-কিরাম (রঃ)গণের অন্তর্ভূক্ত।

কারণ হযরত সাহাবা-ই-কিরাম (রাঃ)গণ আল্লাহ্র রাসূল হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কদমবুছী করেছেন। হযরত সাহাবা-ই-কিরাম (রাঃ)গণ পরস্পর পরস্পরকে কদমবুছী করেছেন। যার স্বপক্ষে অসংখ্য হাদীস শরীফ বর্ণিত রয়েছে।

অথচ তারা বলে, কদমবুছী করা জায়েয নেই বরং  তা শিরকের অন্তর্ভূক্ত। যদিও তাদের কোন দলীল নেই।

(এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হলে ৬, ১২, ১৭, ১৮, ৪৯, ৫৫, ৬১, ৬২ ও ৬৫ তম সংখ্যাগুলো পাঠ করুন)

প্রসঙ্গ অঙ্গুলী চুম্বন

রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর সাহেব ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলী ফতওয়া দিয়েছেন যে, আযানের সময় হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নাম মোবারক শুনে অঙ্গুলি চুম্বন করে চক্ষু স্পর্শ করা সুন্নতে সাহাবা-ই-কিরাম (রাঃ)-এর অন্তর্ভূক্ত।

কারণ হাদীস শরীফ দ্বারা প্রমাণিত এ আমল উম্মতে মুহম্মদীর মাঝে সর্বপ্রথম সাইয়্যিদেনা হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) আরম্ভ করেন এবং হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা সমর্থন করেন এবং উক্ত আমলকারীকে স্বয়ং জান্নাতে প্রবেশ করানোর ওয়াদা করেন। (সুবহানাল্লাহ্)

অথচ তারা বলে, আযানে হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নাম মোবারক শুনে অঙ্গুলি চুম্বন করা শক্ত বিদ্য়াত এবং এ আমলকারীকে তারা উপহাস ও তিরস্কার করে থাকে যা শক্ত গুণাহ্র কারণ।

(এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হলে ৩, ১১, ১২, ১৪, ১৯, ২০, ৩৭, ৪৭, ৫৩ ও ৭৬তম সংখ্যাগুলো পড়ুন)

প্রসঙ্গ ইল্মে গায়ব

রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর সাহেব ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলী ফতওয়া দিয়েছেন যে,  আল্লাহ্ পাক বিনা মধ্যস্থতায় ইল্মে গায়ব বা অদৃশ্যের খবর রাখেন। শুধু ইল্মে গায়বই নয় বরং যাবতীয় ইল্ম সম্পর্কে তিনি  সম্মক জ্ঞাত।  এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক তাঁর কালামে পাকে এরশাদ করেন,

عالم الغيب والشهادة.

অর্থঃ- “তিনি (আল্লাহ্ পাক) দৃশ্য ও অদৃশ্যের ইল্ম রাখেন।” আরো এরশাদ করেন,

والله بكل شيئى عليم.

অর্থঃ- “আল্লাহ্ পাক সব বিষয়েই ভালরূপে জানেন।”

আল্লাহ্ পাক-এর ন্যায় কাউকে জ্ঞানী মনে করা বা ইল্মে গায়বের খবর রাখেন মনে করা কুফরী ও শেরেকীর অন্তর্ভূক্ত। কারণ আল্লাহ্ পাক-এর শানে এরশাদ হয়েছে,

لم يكن له كفوا احد.

অর্থঃ- “কোন ক্ষেত্রেই আল্লাহ্ পাক-এর সমকক্ষ কেউ নেই।”

আর হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে

مطلع على الغيب.

“আল্লাহ্্ পাক এত্তেলা’ (জানানো) করার কারণে তিনি ইল্মে গায়বের খবর রাখেন। যেমন, এ প্রসঙ্গে হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন,

اعطيت بجوامع الكلم.

অর্থঃ “আমাকে সকল বিষয়ের অর্থাৎ সৃষ্টির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত  ইল্ম দান করা হয়েছে।”

এক্ষেত্রে উল্লেখ্য, আল্লাহ্ পাক হযরত আদম (আঃ)কে প্রদত্ত ইল্ম সম্পর্কে তাঁর কালাম পাকে এরশাদ করেন, وعلم ادم الاسماء كلها.

অর্থঃ- “আর তিনি (আল্লাহ্ পাক) হযরত আদম (আঃ)কে যাবতীয় বিষয়ের নাম শিক্ষা দিলেন। অর্থাৎ জাগতিক সকল বিষয়ের ইল্ম তাঁকে দান করেন।”

আরো এরশাদ করেন,

فتلقى ادم من ربه كلمات فتاب عليه.

অর্থঃ- “হযরত আদম (আঃ)কে আপন রবের কাছ থেকে কতিপয় কালাম লাভ করলেন অতঃপর (তা দ্বারা) আল্লাহ্ পাক-এর নিকট তওবা করলেন। অর্থাৎ আল্লাহ্ পাক তাঁকে ইসলাহ্ হাছিল করার ইল্ম তথা ইল্মে বাতেনীও দান করলেন।”

উপরোক্ত আয়াতে কারীমাদ্বয়ে বুঝা গেল যে, হযরত আদম (আঃ)কে আল্লাহ্ পাক সকল প্রকার ইল্ম দান করেছেন। তাহলে যিনি সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যাকে সৃষ্টি না করলে কোন কিছুই সৃষ্টি করা হতোনা, এমনকি হযরত আদম (আঃ)কেও সৃষ্টি করা হতোনা, তাঁর ইল্মের ব্যাপকতা কি হতে পারে?

অর্থাৎ হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সবকিছুর ইল্ম রাখেন তবে আল্লাহ্ পাক-এর মত নন। বরং আল্লাহ্ পাকই তাঁকে সব বিষয় সম্পর্কে ইল্ম দান করেছেন।

আর ইহাই আহ্লে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের আক্বীদা।

অথচ তারা বলে, আল্লাহ্ পাক-এর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ইল্ম আমাদের মত ছিল। (নাউযুবিল্লাহ্) যা তাঁকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্ল্য বা এহানত করার শামীল তথা কাট্টা কুফরী অন্তর্ভূক্ত। আর কেউ কেউ বলে, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ইল্ম আল্লাহ্ পাক-এর মত। (নাউযুবিল্লাহ্) ইহাও কুফরী ও শেরেকীর অন্তর্ভূক্ত।

(এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হলে মাসিক আল বাইয়্যিনাত ৩ ও ৬২তম সংখ্যাগুলো পাঠ করুন)

প্রসঙ্গ হাজির নাজির

রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর সাহেব ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলী ফতওয়া দিয়েছেন যে, আল্লাহ্ পাক স্বীয় ইল্ম ও কুদরতের দ্বারা সর্বত্র ও সর্বাবস্থায় হাজির ও নাজির তথা বিরাজমান।

আর হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আল্লাহ্ পাক হাজির ও নাজিরের ক্ষমতা ও এখতিয়ার দান করেছেন। সেই ক্ষমতা ও এখতিয়ার বলে তিনি যেখানে ইচ্ছা সেখানে এবং যখন ইচ্ছা তখন হাজির (উপস্থিত) হন বা হতে পারেন এবং থাকেন বা থাকতে পারেন যা ইচ্ছা তা নাজির তথা দেখে থাকেন, দেখতে পারেন বা দেখেন। তবে আল্লাহ্ পাক-এর মত নন। আর ইহা আহ্লে সুন্নত ওয়াল জামায়াতেরও  ফতওয়া।

অথচ কেউ কেউ বলে, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্ব-শরীরে কিংবা আল্লাহ্ পাক-এর মত সর্বত্র হাজির ও নাজির। আবার কেউ বলে থাকে, তাঁর কোথাও যাওয়ার ক্ষমতা নেই, তিনি আমাদের মত। ইত্যাদি ইত্যাদি। তাদের এ উভয় আক্বীদাই অশুদ্ধ যা কুফরীর শামীল।

(এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য মাসিক আল বাইয়্যিনাত৬২ ও ৭১তম সংখ্যা পাঠ করুন)

প্রসঙ্গ মহিলা জামায়াত

রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর সাহেব ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলী ফতওয়া দিয়েছেন যে, মহিলাদের জামায়াতে নামাজ আদায় করার জন্য মসজিদে, ঈদাগাহ্ অথবা অন্য কোথাও যাওয়া যদিও তা পর্দা রক্ষা করে হয় সেটা মাকরূহ্ তাহরীমী।

কারণ ইহা হযরত সাহাবা-ই-কিরাম (রাঃ)গণের ইজমা তথা ইজমায়ে আযীমত দ্বারা স্বীকৃত যে, মহিলারা ঈদগাহ্, জুমুয়ার জামায়াতের জন্য হাজির হতে পারবেনা। তাই ইমাম-মুজতাহিদ রহমতুল্লাহি আলাইহিও আউলিয়া-ই-কিরাম (রঃ)গণও ফতওয়া দিয়েছেন মাকরূহ্ তাহরীমী।

অথচ তারা বলে, মহিলারা পর্দা রক্ষা করে অত্যাধিক ফযীলত লাভের উদ্দেশ্যে মসজিদে, ঈদগাহ্ েইত্যাদি স্থানে নামাজের জামায়াতে যেতে পারবে। যা ইজমায়ে আযীমতকে অস্বীকারহেতু কুফরীর অন্তর্ভূক্ত।

(এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য মাসিক আল বাইয়্যিনাত ১১ ও ৪৮তম সংখ্যা পাঠ করুন)

প্রসঙ্গ তাহাজ্জুদ নামাজের জামায়াত

রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর সাহেব ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলী ফতওয়া দিয়েছেন যে,  তাহাজ্জুদ নামাজের জামায়াত মাকরূহ তাহরীমী। তা রমজান মাসে হোক অথবা অন্যান্য মাসে হোক।

কারণ হাদীস শরীফে সকল মাসে একমাত্র  ফরজ নামাজ এবং রমজান মাসে বিত্র, তারাবীহ্র নামাজ ছাড়া অন্য কোন সুন্নত, নফল নামাজ বিশেষতঃ তাহাজ্জুদের নামাজ জামায়াতে আদায় করা নিষেধ করা হয়েছে।”

তাই ইমাম-মুজতাহিদগণও ফতওয়া দিয়েছেন যে, তাহাজ্জুদের নামাজ জামায়াতের সহিত আদায় করা মাকরূহ্ তাহরীমী ও বিদ্য়াতে সাইয়্যিয়াহ্।

অথচ তারা তাহাজ্জুদের নামাজ জামায়াতে আদায় করে এবং ইহাকে সওয়াব ও ফযীলত লাভের কারণ মনে করে থাকে। অথচ ইহার কোন দলীল নেই। যা মূলতঃ গোমরাহ্ীরই লক্ষণ।

(এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য মাসিক আল বাইয়্যিনাত ৭, ১৩, ১৪, ২০, ২২, ৩১, ৪১, ৫৩ ও ৭০তম সংখ্যা পাঠ করুন)

প্রসঙ্গ ছানী আযান

রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর সাহেব ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলী ফতওয়া দিয়েছেন যে, ছানী আযান মিম্বরের নিকট ইমামের সম্মুখে দিতে হবে।

কারণ ইহা ইজমায়ে আযীমতের দ্বারা সাব্যস্ত হয়েছে এবং ইমাম-মুজতাহিদগণ ইহার উপরই ফতওয়া দিয়েছেন। আর আহ্লে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের ফতওয়াও এর উপর।

অথচ তারা বলে, মসজিদের দরজায় অথবা মসজিদের বাইরে ছানী আযান দিতে হবে। যার কোন দলীল-প্রমাণ নেই। বরং তা ইজমায়ে আযীমতের খেলাফ হওয়ার কারণে কুফরীর অন্তর্ভূক্ত।

(এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য মাসিক আল বাইয়্যিনাত ৭, ৯, ১৫, ১৯, ২৮, ২৯, ৩২, ৪০, ৪২, ৪৭, ৪৯ ও ৫৪তম সংখ্যা পাঠ করুন)

অনুরূপ আরো অনেক মাসয়ালা-মাসয়েলের ক্ষেত্রেই তারা ভুল সিদ্ধান্ত পেশ করে থাকে। রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর সাহেব ক্বিবলা (মুদ্দাজিল্লুহুল আলী) মাসিক আল বাইয়্যিনাতে সে সকল ভুল মাসয়ালাগুলোর সঠিক ফায়সালা দলীলের মাধ্যমে তুলে ধরেন মানুষের আক্বীদা ও আমলকে হিফাজত করার লক্ষ্যে। কিন্তু তারা তা খন্ডন করতে না পেরে রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর সাহেব ক্বিবলার না-হক্ব বিরোধীতা করার লক্ষ্যে মানুষের নিকট সম্পূর্ণ মিথ্যা অপপ্রচার করে থাকে। অথচ তাদেরকে বহু বার বলা হয়েছে যে, তোমরা প্রকাশ্য ময়দানে জন সম্মুখে আমাদের সাথে আলোচনায় বসো। তোমাদের আক্বীদা-আমলগুলোর দলীল পেশ করো। আমাদের আক্বীদা-আমলের দলীলও আমরা জনগনের সামনে পেশ করবো। আর তখনই জনগন জানতে পারবে যে, কে হক্ব আর কে না হক্ব। অথচ তারা আমাদের সে আহবানে সাড়া দেয় না। আমরা এখনো বলছি, পৃথিবীর যে কোন স্থানে শর্ত-শারায়েত মোতাবেক যে কোন বিষয়ে বাহাস করতে প্রস্তুত আছি ইনশাল্লাহ্।

(এ ব্যাপারে আরো ভালরূপে জানতে হলে, “মুজাদ্দিদুয্যামান, রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর সাহেব ক্বিবলা-এর বিরোধীতা করার কারণ কি? নামক রেসালাটি সংগ্রহ করে পড়ুন)

 

সাইয়্যিদ মুহম্মদ মুক্তাদুল হুসাইন

সভাপতি, ছাত্র আঞ্জুমানে আল বাইয়্যিনাত

সিলেট জিলা শাখা

সুওয়ালঃ- সাম্প্রাতিক ২৪।০৪।২০০০ ইং তারিখে সিলেটের শাহ্জালাল বিশ্ব বিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে চরমোনাইর পীর ফজলুল করীম তার কিছু অনুচরবর্গ নিয়ে প্রায় আড়াই ঘন্টাব্যাপী এক নতুন আমলের অবতারণা করে, যার নাম হচ্ছে “অনশন” বা “হাঙ্গার ষ্ট্রাইক।” (সূত্র-২৪। ০৪। ২০০০ ইং দৈনিক আজকের কাগজ-এর প্রথম পৃষ্ঠা ২য় কলাম।)

মুসলিম জনতার প্রশ্ন- এই “অনশন” বা “হাঙ্গার ষ্ট্রাইক”-এর প্রথা দ্বীন ইসলামে জায়েয তথা শরীয়তসম্মত কি-না? দয়া করে দলীল-আদিল্লাহ্সহ বিস্তারিত জানাবেন।

জাওয়াবঃ- মুসলমান মাত্রই প্রত্যেককেই যে কোন কাজ করতে হলে কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ, ইজমা ও কিয়াসের ভিত্তিতেই করতে হবে। কারণ দ্বীন ইসলাম তথা শরীয়তের উসূলই হচ্ছে কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াস। তাই  এই “অনশন” বা “হাঙ্গার ষ্ট্রাইক” করা শরীয়ত সম্মত কি-না তার সমাধান করতে হলে প্রথমে এর উৎপত্তি ও ইতিহাস সম্বন্ধে জানতে হবে। অতঃপর তা শরীয়তসম্মত কি-না সেজন্য তা কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াসের সাথে মিলাতে হবে। যদি মিলে তাহলে তা শরীয়তসম্মত। আর যদি না মিলে তাহলে তা শরীয়তের খেলাফ। যদি তা শরীয়তসম্মত হয় তাহলে তা আমল করা জায়েয। আর যদি শরীয়তসম্মত না হয় তাহলে তা আমল করা সম্পূর্ণ নাজায়েয ও হারাম।

এখন যেহেতু প্রথমে আমাদেরকে এর ইতিহাস ও উৎপত্তি সম্বন্ধে জানতে হবে তাই হাঙ্গার ষ্ট্রাইক বা অনশনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও তার উৎপত্তি নিম্নে উল্লেখ করা হলো।

অনশন বা হাঙ্গার ষ্ট্রাইক

যার বা যাদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ পুঞ্জিভূত হয়েছে তাকে বা তাদেরকে চাপ দেয়ার উদ্দেশ্যে ভোজন বা খাদ্য পানীয় হতে বিরত থেকে স্ব-মত প্রতিষ্ঠা বা অধিকার আদায়ের জন্য হাঙ্গার ষ্ট্রাইক বা অনশনের প্রচলন ঘটে।

রাজনৈতিক কারণে কেউ স্বল্পকালীন, দীর্ঘকালীন বা আমরণ অনশন করে থাকে। এ প্রসঙ্গে “OXFORD Illustrated Encyclopedia: Volume 7-এ বর্ণিত আছে,” hunger strike, the attempt to demonstrate commitment to political or other cause by refusing food and/or drink. Hunger-strikes may be carried out by those imprisoned for political or other reasons to achieve changes in conditions, or to force a review of their cases”

অর্থঃ- “রাজনৈতিক অথবা কোন বিষয় প্রতিপাদন করার জন্য খাদ্য পানীয় থেকে বিরত থাকা অথবা অস্বীকার করাকে হাঙ্গার ষ্ট্রাইক বা অনশন বলে। রাজনৈতিক অথবা অন্য কারণে কয়েদীরা তাদের উপর আরোপিত শর্ত পরিবর্তন অথবা তা পুনঃবিবেচনার জন্য চাপ সৃষ্টি করার লক্ষ্যে অনশন করে থাকে।”

ব্রিটিশের বিরুদ্ধে আন্দোলনের লক্ষ্যে অনশন করে কারাগারে আইরিশ আত্মত্যাগী ম্যাক সুইনী ও বাঙ্গালী যতীন দাস মৃত্যুবরণ করে। এছাড়া ভারত উপমহাদেশে অনশন প্রথার বিশেষ অনুশীলন করে, তাকে বহুল পরিচিত করে তোলে মহন দাস করমচাঁদ গান্ধী। গান্ধী তার কথিত অসহিংস আন্দোলনের জন্য বারবার অনশন করেছে।

হিন্দু ধর্মে এই অনশন প্রথা স্বীকৃত। শ্রীকৃষ্ণের মতে, যে ব্যক্তি অনশন করে প্রাণ ত্যাগ করে সে বিষ্ণুতুল্য হয়।

উল্লেখ্য, বিষ্ণু- হিন্দু শাস্ত্রে উক্ত ভগবান, নারায়ণ সৃষ্টির পালক, প্রজাপতি কশ্যপের ঔরসে অদিতির গর্ভে জন্ম। বেদে  সে সূর্য দেবতা। কিন্তু আনুমানিক খৃষ্ট পূর্ব ৯০০ অব্দ হতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে। সে প্রকান্ড দেহধারী, ত্রিপাদ, চারিহস্ত বিশিষ্টরূপে কল্পিত হয়। তার চারি হস্তে শঙ্খ, চক্র, গদা ও পদ্ম, মনিবন্ধে (হাতের কব্জিতে) স্যমন্তকমণি এবং বক্ষে কৌস্তভমনি শোভা পায়। এর বাহন গরুড়। লক্ষী ও স্বরস্বতী ইহার স্ত্রী, কামদেব তার পুত্র। হিন্দুদের তিন প্রধান দেবতার অন্যতম বিষ্ণুর উপর জগতের পালন ভার অর্পিত। উপাসকগণ বিষ্ণুকে সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার চেয়েও শ্রেষ্ঠ মনে করে। বিষ্ণুর নাভিতে জাত, পদ্ম হতে ব্রহ্মা এবং কপাল হতে শিব উদ্ভুত হয়। এই তিন রূপে সে ত্রয়ী ভগবান। জগতের কল্যাণে অশুভ শক্তি নাশহেতু বিষ্ণু মৎস, কুকর্ম, বরাহ, নরসিংহ, বামন, পরশুরাম, রামচন্দ্র, কৃষ্ণ, বুদ্ধ এবং আজিও অনাগত কল্কি (যে কলি যুগের শেষে আসবে) এই দশ অবতার রূপে বিভিন্ন  যুগে মর্তে অবতীর্ণ হয়। তার মধ্যে কৃষ্ণ এবং রামচন্দ্র সবচেয়ে জনপ্রিয়। প্রলয় সমুদ্রে সে সস্ত্রীক অর্থাৎ শেষ নাগের উপর অনন্তশয্যায় শায়িত।

উল্লেখ্য, ১৩৭৫ সালে খুনের দায়ে দন্ডপ্রাপ্ত একজন আসামী ২০ দিন অনশন করার পর এডওয়ার্ড তাকে ক্ষমা করে।

অনশন বা হাঙ্গার ষ্ট্রাইক করা শরীয়সম্মত নয়। বরং তা সম্পূর্ণ নাজায়েয, হারাম ও কুফরীর অন্তর্ভূক্ত। কারণ ইহা হিন্দু ধর্মের খাস আমলের অন্তর্ভূক্ত। অর্থাৎ ইহা হিন্দু ধর্মের শেয়ার (বৈশিষ্ট্য বা আদর্শ)। অথচ আল্লাহ্ পাক আদর্শ সম্পর্কে এরশাদ করেন,

لقد كان لكم فى رسول الله اسوة حسنة.

অর্থঃ- “নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহ্ পাক-এর রাসূল হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।”

আল্লাহ্ পাক-এর রাসূল হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

تركت فيكم امرين لن تضلوا ماتمسكتم بهما كتاب الله وسنتى.

অর্থঃ- “আমি তোমাদের জন্য দু’টি বিষয় রেখে যাচ্ছি। তা যতক্ষণ পর্যন্ত আঁকড়িয়ে থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত গোমরাহ্ হবেনা। কিতাব ও সুন্নাহ্। (মুয়াত্তা, মেশকাত)

উল্লেখ্য, আল্লাহ্ পাক বলেন, আমার হাবীব হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হলেন, “তোমাদের জন্য আদর্শ।” আর হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “তোমরা গোমরাহ্ হবেনা কুরআন-সুন্নাহ্কে আকঁড়িয়ে থাকলে।”

তাই শত আফসুস! এ সমস্ত লোকদের জন্য, এরা কুরআন-সুন্নাহ্কে আকঁড়িয়ে না ধরে ও আল্লাহ্ পাক-এর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ না করে কাফির, হিন্দু, খ্রীষ্টান, ইহুদী ইত্যাদি বেদ্বীনদেরকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে তাদের কুফরীমূলক আমলগুলো করতে সদা তৎপর। অথচ আল্লাহ্ পাক দ্বীন ইসলামকে কামেল বা পরিপূর্ণ করে পাঠিয়েছেন। আল্লাহ্ পাক বলেন,

اليوم اكملت لكم دينكم واتممت عليكم نعمتى ورضيت لكم الاسلام دينا.

অর্থঃ- “আজকে আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে কামেল বা পরিপূর্ণ করে দিলাম এবং তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামতকে পরিপূর্ণ করে দিলাম এবং তোমাদের জন্য দ্বীন ইসলামকে মনোনীত করলাম ও এতে সন্তুষ্ট রইলাম।”

তাহলে কি এই সমস্ত লোকেরা ইসলামকে কামেল বা পরিপূর্ণ মনে করেনা? আর আল্লাহ্ পাক-এর রাসূল হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করতে নারাজ? তাই কি তারা কুরআন-সুন্নাহ্কে উপেক্ষা করে বিজাতীয়, বিধর্মীয় আমলে মশগুল রয়েছে?

অথচ মহান আল্লাহ্ পাক কুরআন শরীফে এবং সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাদীস শরীফে অনেকস্থানে কাফির, মুশরিক, মুনাফিক, ইহুদী, নাছারা তথা সকল বিধর্মী, বেদ্বীন, বদ্ দ্বীনদের সাথে মুহব্বত, মেলা-মেশা ও তাদেরকে অনুসরণ করাকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। অর্থাৎ বিধর্মীদের আক্বীদা, আমল ও তাদের প্রবর্তিত নিয়ম-কানুন, তর্জ-তরীকা, প্রথা-পদ্ধতি কোন মু’মিন-মুসলমানের জন্য গ্রহণ করা জায়েয নেই বরং সম্পূর্ণরূপে কুফরীর অন্তর্ভূক্ত।

আল্লাহ্ পাক এরশাদ করেন,

يا ايها النبى اتق الله ولا تطع الكفرين والمنفقين ان الله كان عليما حكيما واتبع ما يوحى اليك من ربك ان الله كان تعملون خبيرا.

অর্থঃ- “হে নবী! (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহ্ পাককে ভয় করুন। আর কাফিরদের ও মুনাফিকদের অনুসরণ করবেননা। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ পাক মহাজ্ঞানী ও প্রজ্ঞাময়। আর আপনার রবের তরফ হতে যা আপনার প্রতি ওহীরূপে প্রেরীত হয় তার অনুসরণ করুন। (হে মানুষেরা) নিশ্চয়ই আল্লাহ্ পাক তোমাদের আমল সম্পর্কে পূর্ণ খবর রাখেন।” (সূরা আহযাব/১১২)

উক্ত আয়াত শরীফে কাফির, মুনাফিক তথা বেদ্বীন, বদ্ দ্বীনদের অনুসরণ করতে মু’মিনদেরকে নিষেধ করা হয়েছে এবং এ ব্যাপারে আল্লাহ্ পাককে ভয় করার জন্য আদেশ করা হয়েছে। আর একমাত্র আল্লাহ্ পাক যা তাঁর হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর নাযিল করেছেন তা অনুসরণ বা মেনে চলার জন্য আদেশ করা হয়েছে।

শুধু এ আয়াত শরীফেই নয় বরং সম্পূর্ণ কুরআন শরীফেই অনুরূপ বলা হয়েছে। কারণ আল্লাহ্ পাক-এর কাছে একমাত্র মনোনীত দ্বীন হিসেবে স্বীকৃত হচ্ছে ইসলাম।

এ প্রসঙ্গে কালামে পাকে এরশাদ হয়েছে,

ان الدين عند الله الاسلام.

অর্থঃ- “নিশ্চয়ই আল্লাহ্ পাক-এর নিকট একমাত্র দ্বীন হচ্ছে ইসলাম।”

আর তিনি এ দ্বীন ইসলামকে পরিপূর্ণ করে নাযিল করেছেন। তাই এ দ্বীন ইসলামের বাইরে অন্য কোন দ্বীন, ধর্ম বা তার নিয়ম-নীতি, তর্জ-তরীকা গ্রহণ করা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। যদি  কেউ তা করে তবে সে ক্ষতিগ্রস্থ তথা জাহান্নামী হয়ে যাবে।

এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক নিজেই এরশাদ করেন,

ومن يبتغ غير الاسلام دينا فلن يقبل منه وهو فى الاخرة من الخاسرين.

অর্থঃ- “যে ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া অন্য কোন দ্বীন (ধর্ম) বা তার নিয়ম-নীতি তালাশ করে তা কখনোই তার থেকে গ্রহণ করা হবেনা এবং সে পরকালে ক্ষতিগ্রস্থদের অন্তর্ভূক্ত হবে।”

এ আয়াত শরীফের পরিপ্রেক্ষিতে হাদীস শরীফে উল্লেখ আছে,

وعن جابر عن النبى صلى الله عليه وسلم حين اتاه عمر فقال انا نسمع احاديث من يهود تعجبنا افترى ان نكتب بعضها فقال امتهوكون انتم كما تهوكت اليهود والنصارى؟ لقد جئتكم بها بيضاء نقية ولو كان موسى حيا ما وسعه الا اتباعى.

অর্থঃ- হযরত জাবের (রাঃ) নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন যে, একদিন হযরত ওমর (রাঃ) যখন হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট এসে বললেন, আমরা ইহুদীদের অনেক ধর্মীয় কাহিনী, কথাবার্তা, নিয়ম-কানুন ইত্যাদি শ্রবণ করে থাকি যা আমাদের নিকট ভাল লাগে। আমরা এটার থেকে কিছু লিখে রাখতে পারবো কি? তখন হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “তোমরাও কি তোমাদের দ্বীন সম্পর্কে দ্বিধাগ্রস্থ বা বিভ্রান্ত রয়েছে? যেভাবে ইহুদী-নাছারাগণ বিভ্রান্ত রয়েছে? আল্লাহ্ পাকের কসম, আমি তোমাদের নিকট সম্পূর্ণ পরিষ্কার ও পরিপূর্ণ দ্বীন এনেছি। হযরত মুসা (আঃ)ও যদি এখন জমিনে থাকতেন তাহলে তাঁকেও আমার অনুসরণ করতে হতো।” (আহ্মদ, বায়হাক্বী)

সুতরাং উপরোক্ত আয়াত শরীফ ও হাদীস শরীফ হতে বুঝা গেল যে, কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াস ছাড়া অন্য কোন বিজাতীয় ও বিধর্মীয়পন্থা অনুসরণ করা সম্পূর্ণ হারাম ও কুফরী।

বিধর্মীদের সাথে মিল বা তাশাব্বুহ্ রাখা সম্পর্কে হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

عن عبد الله بن عمر رضى الله عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم من تشبه بقوم فهو منهم.

অর্থঃ- হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে ওমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি যে সম্প্রদায়ের সাথে মিল রাখে, সে তাদের দলভূক্ত এবং তার হাশর-নশর তাদের সাথেই হবে।” (মসনদে আহমদ, সুনানে আবূ দাউদ)

এই হাদীস শরীফের প্রসঙ্গে নিম্নলিখিত ঘটনা উল্লেখ করা হয়- হিন্দুস্থানে আল্লাহ্ পাক-এর একজন জবরদস্ত ওলী ছিলেন। তাঁর ইন্তেকালের পর অন্য একজন বুযুর্গ ব্যক্তি তাকে স্বপে¦ দেখে জিজ্ঞেস করেন, “হে আল্লাহ্ পাক-এর ওলী, আপনি কেমন আছেন?” তখন সেই আল্লাহ্ পাক-এর ওলী জাওয়াবে বললেন, “আপাতত আমি ভালই আছি, কিন্তু আমার উপর দিয়ে এক কঠিন সময় অতিবাহিত হয়েছে যা বলার অপেক্ষা রাখে না। আমার ইন্তেকালের পর আমাকে ফিরিশ্তারা সরাসরি আল্লাহ্ পাকের সম্মুখে পেশ করেন। আল্লাহ্ পাক ফিরিশতাদেরকে বলেন, হে ফিরিশ্তারা! তোমরা তাকে এখানে কেন নিয়ে এসেছ? ফিরিশ্তারা বললেন, আয় আল্লাহ্ পাক! আমরা তাকে খাস বান্দা হিসেবে আপনার সাথে সাক্ষাত করার জন্য নিয়ে এসেছি। এ কথা শ্রবণ করে আল্লাহ্ পাক বললেন, তাকে এখান থেকে নিয়ে যাও, তার হাশর-নশর হিন্দুদের সাথে হবে, কেননা সে পূঁজা করেছে। এ কথা শুনে আমি ভয় পেয়ে গেলাম এবং আমার সমস্ত শরীর ভয়ে কাঁপতে লাগল। তখন আমি আল্লাহ্ পাক-এর নিকট আরজু পেশ করলাম, হে আল্লাহ্ পাক! আমার হাশর-নশর হিন্দুদের সাথে হবে কেন? আমি তো সব সময় আপনার এবং হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ফরমাবরদার ছিলাম। কখনও ইচ্ছাকৃত নাফরমানি করিনি এবং পুঁজা করাতো দূরের কথা মন্দিরের নিকটবর্তীও কখনো হইনি। তখন আল্লাহ্ পাক বললেন, “তুমি সেইদিনের কথা স্মরণ কর, যেইদিন হিন্দুস্থানে হোলি পূঁজা হচ্ছিল। তুমি হিন্দুস্থানের উপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলে তখন তোমার সামনে-পিছনে, ডানে-বামে, উপরে-নীচে সমস্ত গাছ-পালা, তরু-লতা, পশু-পাখী, কীট-পতঙ্গ যা কিছু ছিলো সবকিছুকেই রঙ দেয়া হয়েছিল। এমতাবস্থায় তোমার সামনে দিয়ে একটি গর্দভ যাচ্ছিল যাকে কোন রঙ দেয়া হয়নি। তখন তুমি পান চিবাচ্ছিলে, তুমি সেই গর্দভের গায়ে এক চিপটি পানের রঙীন রস নিক্ষেপ করে বলেছিলে, “হে গর্দভ! তোমাকে তো কেউ রঙ দেয়নি এই হোলি পূঁজার দিনে আমি তোমাকে রঙ দিয়ে দিলাম।” এটা কি হোলি পূঁজার শামীল হয়নি? তুমি কি জান না, আমার হাবীব হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

من تشبه بقوم فهو منهم.

অর্থঃ- “যে ব্যক্তি যে সম্প্রদায়ের সাথে মিল রাখে, সে তাদের অন্তর্ভূক্ত এবং তার হাশর॥নশর তাদের সাথে হবে।”

সুতরাং তোমার হাশর-নশর হিন্দুদের সাথে হওয়া উচিৎ ছিল। যখন আল্লাহ্ পাক এই কথা বললেন, তখন আমি লা জওয়াব হয়ে গেলাম এবং ভীত সন্ত্রস্থ হয়ে বললাম, “আয় আল্লাহ্ পাক! আমি এটা বুঝতে পারিনি, আমাকে কেউ বুঝিয়ে দেইনি এবং আমার অন্তরও সাড়া দেইনি। আমি তখন কাকুতি-মিনতি সহকারে রোনাজারী, আহাজারী ও কান্নাকাটি করতে লাগলাম।”

কিছুক্ষণ পর আল্লাহ্ পাক বললেন, “ঠিক আছে, তোমাকে অন্যান্য আমলের কারণে ক্ষমা করা হলো।”

এ প্রসঙ্গে বনী ইসরাঈল আমলের অনুরূপ আরও একটি ওয়াকেয়া তফসীরে উল্লেখ করা হয়। আল্লাহ্ পাক হযরত ইউশা বিন নুন (আঃ)-এর উপর ওহী নাযিল করলেন, হে আমার নবী! আপনার উম্মতের মধ্যে এক লক্ষ লোককে ধ্বংস করে দেয়া হবে, যার মধ্যে ৬০ হাজার লোক সরাসরি গুণাহে লিপ্ত (গোমরাহ)। তখন হযরত ইউশা বিন নুন (আঃ) বললেন, “হে আল্লাহ্ পাক! ৬০ হাজার লোক সরাসরি গুণাহে লিপ্ত তাই তাদের ধ্বংস করে দেয়া হবে, কিন্তু বাকী ৪০ হাজার লোককে ধ্বংস করা হবে কেন?” তখন আল্লাহ্ পাক বললেন, “যেহেতু তারা ঐ গুণাহে লিপ্ত লোকদের সাথে মিলা-মিশা ও ওঠা-বসা করে এবং সম্পর্ক রাখে আর গুণাহ্র কাজে বাধা দেয় না, তাই তাদেরকেসহ ধ্বংস করে দেয়া হবে।”

উপরোক্ত আয়াত শরীফ, হাদীস শরীফ এবং তার ব্যাখ্যার দ্বারা এটাই সাবেত হলো যে, বিজাতীয় বিধর্মীদের কোন নিয়ম-নীতি, আমল-আখলাক ও সীরত-সূরত ইত্যাদি কোনটাই যেমন অনুসরণ-অনুকরণ করা যাবে না তেমন আমলও করা যাবেনা। যদি কেউ করে তবে তার থেকে সেটা আল্লাহ্ পাক গ্রহণ করবেন না বা কোন সওয়াবও দেবেন না এবং আল্লাহ্ পাকের তরফ থেকে কোন মদদও সে পাবেনা। যার ফলে সে ইহ্কালে ও পরকালে ক্ষতিগ্রস্থ হবে এবং পরকালে তার হাশর-নশর তাদের সাথেই হবে যাদেরকে সে অনুসরণ করত। কাজেই অনশন বা হাঙ্গার ষ্ট্রাইক কোনমতেই জায়েজ নেই বরং তা কুফরী ও হিন্দুয়ানী আমল।।

অতএব সাম্প্রতিককালে ২৪।০৪।২০০০ঈঃ তারিখে সিলেটের শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে কোন মহল যদি অনশন বা হাঙ্গার ষ্ট্রাইক করে থাকে তবে তা সম্পূর্ণ  নাজায়েয,

হারাম ও কুফরী এবং হিন্দুয়ানী আমল হয়েছে। কাজেই উক্ত কুফরী ও হিন্দুয়ানী আমলের জন্য তাদের উচিৎ খালেস তওবা ও ইস্তেগ্ফার করা।

স্মরণীয়, শরীয়তের ফায়সালা হলো গোপন পাপের জন্য গোপনে তওবা করা, আর প্রকাশ্য পাপের জন্য প্রকাশ্য তওবা করা।

প্রকৃতপক্ষে এই সমস্ত লোকেরা কিল্লতে ইল্ম ও কিল্লতে ফাহ্ম বা কম জ্ঞান ও কম বুঝের কারণে অর্থাৎ বিশুদ্ধ আকল, পর্যাপ্ত পরিমাণ ইল্ম ও সহীহ্ সমঝ না থাকার ফলে এরা ইত্যাদি প্রকারের কুফরীমূলক বক্তব্য দিয়ে থাকে ও আমল করে থাকে।

সুতরাং এদের প্রত্যেকেরই উচিৎ মাসিক আল বাইয়্যিনাত রীতিমত পাঠ করে দ্বীনের পর্যাপ্ত পরিমাণ ইল্ম অর্জনের মাধ্যমে আকল বিশুদ্ধ করা ও সহীহ্ সমঝ হাছিল করা।

{দলীলসমূহঃ- (১) তাফসীর আহকামুল কুরআন, (২) জাস্সাস, (৩) কুরতুবী, (৪) রুহুল মায়ানী, (৫) মাযহারী, (৬) ইবনে কাছীর, (৭) খাযেন, (৮) বাগবী, (৯) তাবারী, (১০) রুহুল বয়ান, (১১) আবূ সউদ, (১২) যাদুল মাছীর, (১৩) কবীর, (১৪) আবূ দাউদ, (১৫) বযলুল মজহুদ, (১৬) মুসনদে আহমদ, (১৭) বায়হাক্বী, (১৮) মুয়াত্তা, (১৯) মুসাওয়া, (২০) মেশকাত, (২১) মেরকাত, (২২) আশয়াতুল লুময়াত, (২৩) লুময়াত, (২৪) তালীক্ব, (২৫) ত্বীবী, (২৬) মোযাহেরে হক্ব (২৭) বাংলা বিশ্বকোষ, (২৮) oxford lilustrated Encyclopedia, (২৯) Encyclopadia Britanica, (৩০) Encyclopedia Americana, (৩১) World Book, (৩২) Fung’s Wagnals Encyclopedia, (৩৩) Macmilan Encyclopedia, (৩৪) Lexicon Encyclopedia, (৩৫) Grolier Encyclopedia, ইত্যাদি}

মুহম্মদ আকরাম আলী (বাচ্চু)

নাগেশ্বরী মহাবিদ্যালয়, নাগেশ্বরী, কুড়িগ্রাম

 

সুওয়ালঃ- মাসিক মদীনা ডিসেম্বর’ ৯৯ ঈং সংখ্যায় প্রশ্নোত্তর বিভাগে নিম্নোক্ত প্রশ্নোত্তর ছাপা হয়।

প্রশ্নঃ- আমি আরব আমীরাতে থাকাকালীন দেখেছি এবং কুয়েতে দেখতেছি যে, মাগরিবের আযানের পরপর দুই রাকাত নামায পড়ে। এজন্য আযানের পর কিছুক্ষণ সময়ও দেওয়া হয়। আমাদের দেশে আযান শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই জামাত শুরু হয়ে যায়। মোটেও সময় দেওয়া হয় না, আমাদের দেশে কি মানুষজনকে এই নামাযটি থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে না?

উত্তরঃ- এক হাদীসে আছে যে, “প্রত্যেক আযানের পরই দুই রাকাত (নফল) নামায রয়েছে। এই নামায মক্কা-মদীনাসহ বিভিন্ন দেশের কিছু কিছু লোক পড়েও থাকেন। মাগরিবের ওয়াক্ত যেহেতু খুবই সংক্ষিপ্ত সে কারণে আমাদের দেশে বিশেষতঃ হানাফী মাযহাব অনুসারীগণ আযানের পর তাড়াহুড়া করেই জামাত শুরু করে দেন। তবে মুছল্লীগণের মধ্যে যেহেতু রোজাদার লোক থাকতে পারেন বা কেউ কেউ আযান পরবর্তী দু’রাকাত নফল পড়ার আগ্রহী থাকতে পারেন, সে কারণে জামাত শুরু করার আগে কিছুটা সময় দেওয়া উচিত।

এখন আমার সুওয়াল হলো- মাগরিবের আযানের পর ফরজ নামাজের পূর্বে দু’রাকাত নফল নামাজ পড়া সম্পর্কিত মাসিক মদীনার উক্ত বক্তব্য সঠিক হয়েছে কি-না ?

জাওয়াবঃ- আফসুস! আজকাল মানুষ ইসলামের নাম দিয়ে পত্রিকা বের করে তাতে হাদীসের বিরুদ্ধে নিজের মনগড়া মত পেশ করে, প্রচার-প্রসার করে থাকে। এরপরেও নিজেদেরকে হক্ব বলে দাবী করতে কুক্তাবোধ করেনা। ঠিক তাই হয়েছে মাসিক মদীনারও। মাসিক মদীনার সম্পাদক কিল্লতে ইল্ম, কিল্লতে ফাহ্ম অর্থাৎ কম জ্ঞান ও কম বুঝের কারণে মনগড়া ফতওয়া দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করছে। তার বাস্তব একটি উদাহরণ হচ্ছে, এই প্রশ্নের উত্তর।

মাগরিবের আযানের পর ফরজ নামাজের পূর্বে দু’রাকায়াত নফল নামাজ পড়া সম্পর্কিত তার উক্ত উত্তর শুধু ভুলই হয়নি বরং হাদীস শরীফ বিরোধী, কুফরীও হয়েছে। কারণ মাগরিবের আযানের পর ফরজ নামাজের পূর্বে দু’রাকায়াত নফল নামাজ পড়া হাম্বলী মাযহাবে জায়েয রয়েছে। আর হাম্বলী মাযহাবের লোকেরা যেহেতু মক্কা-মদীনাসহ বিভিন্ন দেশেই রয়েছে সেহেতু মক্কা-মদীনাসহ বিভিন্ন দেশের শুধুমাত্র হাম্বলী মাযহাবের লোকেরা মাগরিবের আযানের পর ফরজ নামাজের পূর্বে দু’রাকায়াত নফল আদায় করে থাকে। কিন্তু আমাদের হানাফী মাযহাবসহ শায়েফী, মালেকী ইত্যাদি মাযহাবে মাগরিবের আযানের পর ফরজ নামাজের পূর্বে কোন নফল নামাজ আদায় করা জায়েয নেই। তাই আমাদের হানাফী মাযহাবে মাগরিবের আযানের পর ফরজ নামাজের পূর্বে কোন নফল নামাজ আদায় করা যাবেনা।

নিম্নে মাসিক মদীনা পত্রিকার কুফরীমূলক বক্তব্যগুলো দলীল-আদিল্লাহ্ দ্বারা খন্ডন করে সঠিক জাওয়াব প্রদান করা হলো-

প্রথমতঃ মাসিক মদীনায় বলা হয়েছে যে, “এক হাদীসে আছে যে, প্রত্যেক আযানের পরই দুই রাকাত (নফল) নামায রয়েছে।”

এর জবাবে বলতে হয় যে, মাসিক মদীনার সম্পাদক সংশ্লিষ্ট হাদীস শরীফ সম্পর্কে নেহায়েত অজ্ঞ। যার কারণে সে সম্পূর্ণ হাদীস শরীফ সঠিকভাবে বর্ণনাও করতে পারেনি। হাদীস শরীফটি হলো- “প্রত্যেক আযানের পর দু’রাকায়াত নফল নামাজ রয়েছে। কিন্তু মাগরিবের আযানের পর কোন নফল নামাজ নেই।”

যেমন হাদীস শরীফের বিখ্যাত কিতাব “দারেকুত্বনী ও বায়হাক্বী শরীফে” উল্লেখ আছে,

عن بريدة عن ابيه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم ان عند كل اذانين ركعتين الا المغرب.

অর্থঃ- “হযরত বুরাইদা (রাঃ) তার পিতার থেকে বর্ণনা করেন যে, আখেরী রাসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, নিশ্চয়ই প্রত্যেক দুই আযানের মধ্যে অর্থাৎ প্রত্যেক আযানের পর ও ইক্বামতের পূর্বে দু’রাকায়াত নফল নামাজ রয়েছে; কিন্তু মাগরীব ব্যতীত।”

অর্থাৎ মাগরিবের আযানের পর ও ইক্বামতের পূর্বে কোন নফল নামাজ নেই। (বাজ্জার)

“নাসাঈ শরীফের” ১ম খন্ডের ১১১ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

قال رسول الله صلى الله عليه وسلم بين كل اذانين صلوة …. لمن شاء الا بين اذان المغرب لحديث بريدة الاسملمى رضى الله تعالى عنه.

অর্থঃ- “রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, প্রত্যেক দুই আযানের মধ্যে অর্থাৎ প্রত্যেক আযান ও ইক্বামতের মধ্যে নামাজ রয়েছে যে ব্যক্তি পড়তে চায়, তবে মাগরিবের আযান ও ইক্বামতের মধ্যে কোন নামাজ নেই যা হযরত বুরাইদা আসলামী (রাঃ)-এর বর্ণিত হাদীস শরীফে রয়েছে।

“উমদাতুল ক্বারী” ৫ম খন্ডের ১৩৮ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

روى الدارقطنى ثم البيهقى فى سننيهما من حبان بن عبد الله العدوى حدينا عبد الله بن بريدة عن ابيه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم ان عند كل اذانين ركعتين الا المغرب.

অর্থঃ- দারেকুত্বনী ও বায়হাক্বী তাঁদের কিতাবে হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে হাব্বান আদুবী থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, আমাদের নিকট আব্দুল্লাহ্ ইবনে বুরাইদা (রাঃ) তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন যে, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, নিশ্চয়ই প্রত্যেক দুই আযানের মধ্যে অর্থাৎ প্রত্যেক আযানের পর ও ইক্বামতের পূর্বে দু’রাকায়াত নফল নামাজ রয়েছে, তবে মাগরিবের আযানের পর ও ইক্বামতের পূর্বে কোন নফল নামাজ নেই।” অনুরুপ “বাজ্জার” কিতাবেও উল্লেখ রয়েছে।

“মেশকাত শরীফের” ৬৫ পৃষ্ঠার ৮ নং হাশীয়ায় উল্লেখ আছে,

ان رسول الله صلى الله عليه وسلم قال عند كل اذانين ركعتين خلا صلاة المغرب.

অর্থঃ- “নিশ্চয়ই আখেরী রাসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, প্রত্যেক আযানের পর ও ইক্বামতের পূর্বে দু’রাকায়াত নফল নামাজ রয়েছে, তবে মাগরিবের নামাজ ব্যতীত।”

অর্থাৎ মাগরিবের আযানের পর ইক্বামতের পূর্বে কোন নফল নামাজ নেই।

“তানযীমুল আশতাত” কিতাবের ১ম খন্ডের ৪০৮ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

قال رسول الله صلى الله عليه وسلم ان عند كل اذانين ركعتين ماخلا المغرب.

অর্থঃ- “হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, নিশ্চয়ই প্রত্যেক আযানের পর ইকামতের পূর্বে দু’রাকায়াত নামাজ রয়েছে; কিন্তু মাগরিব ব্যতীত। অর্থাৎ মাগরিবের আযানের পর ইক্বামতের পূর্বে কোন নফল নামাজ নেই।”

“মারাকিউল ফালাহ্” কিতাবের ১২৬ পৃষ্ঠার হাশিয়ায় উল্লেখ আছে,

لقوله صلى الله عليه وسلم بين كل اذانين صلاة ان شاء الا المغرب.

অর্থঃ- “হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন যে, প্রত্যেক দুই আযানের মধ্যে অর্থাৎ প্রত্যেক আযানের পর ও ইকামতের পূর্বে নামাজ রয়েছে যদি কেউ পড়তে চায়, তবে মাগরিব ব্যতীত। অর্থাৎ মাগরিবের আযানের পর ইক্বামতের পূর্বে কোন নফল নামাজ নেই।”

“মেরকাত শরীফের” ২য় খন্ডের ১৬৫ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

لحديث بريدة الاسلمى ان رسول الله صلى الله عليه وسلم قال عند كل اذانين ركعتين خلا صلاة المغرب.

অর্থঃ- “হযরত বুরাইদা আসলামী (রাঃ)-এর বর্ণিত হাদীস শরীফে উল্লেখ আছে যে, নিশ্চয়ই রাসূল পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, প্রত্যেক দুই আযানের মধ্যে অর্থাৎ প্রত্যেক আযানের পর ইক্বামতের পূর্বে দু’রাকায়াত নফল নামাজ রয়েছে, তবে মাগরিবের আযানের পর ইক্বামতের পূর্বে কোন নফল নামাজ নেই। অর্থাৎ মাগরিবের আযানের পর ফরজ নামাজের পূর্বে কোন নফল নামাজ  নেই।

“মাআরেফুস সুনান” কিতাবের ২য় খন্ডের ১৪১ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

 ان عند كل اذانين ركعتين ماخلا المغرب.

অর্থঃ- “নিশ্চয় প্রত্যেক আযানের পর এবং ইক্বামতের পূর্বে দুরাকায়াত নামাজ রয়েছে তবে মাগরিব ব্যতীত। কেননা মাগরিবের আযানের পর ফরজ নামাজের পূর্বে কোন নফল নামাজ নেই।”

“মিরকাত শরীফ” কিতাবের ৩য় খন্ডের ১১২ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

بين كل اذانين صلاة بما عدا …………… المغرب.

অর্থঃ- “প্রত্যেক দুই আযানের মধ্যে অর্থাৎ প্রত্যেক আযানের পর ও ইক্বামতের পূর্বে নামাজ রয়েছে, তবে মাগরিব ব্যতীত। কেননা মাগরিবের আযানের পর ইক্বামতের পূর্বে কোন নফল নামাজ নেই।”

“উমদাতুল ক্বারী” ৫ম খন্ডের ১৩৯ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

كل اذانين غير اذانى المغرب.

অর্থঃ- “প্রত্যেক আযান ও ইক্বামতের মধ্যে নামাজ রয়েছে, তবে মাগরিবের আযান ও ইক্বামত ব্যতীত। অর্থাৎ মাগরিবের আযানের পর ইক্বামতের পূর্বে কোন নফল নামাজ নেই।” উক্ত কিতাবে আরো উল্লেখ আছে,

بين كل اذانين صلاة مخصوص بالمغرب ……. فان فيه استثناء المغرب.

অর্থঃ- “প্রত্যেক আযান ও ইক্বামতের মাঝে নামাজ রয়েছে, তবে খাছ করে মাগরিব নামাজ ব্যতীত। অর্থাৎ মাগরিবের আযানের পর ও ইক্বামতের পূর্বে কোন নামাজ নেই। কেননা মাগরিব নামাজকে অন্যান্য নামাজ থেকে খাছ করা হয়েছে। সুতরাং মাগরিব নামাজকে অন্যান্য নামাজ থেকে ব্যতিক্রম বা পৃথক করা হয়েছে।

উপরোক্ত হাদীস শরীফের বর্ণনা থেকে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো যে,  প্রত্যেক আযানের পরই দুই রাকায়াত নফল নামাজ রয়েছে, তবে মাগরিবের আযানের পর কোন নফল নামাজ নেই।

তাছাড়া “উমদাতুল ক্বারী” ৫ম খন্ডের ১৩৯ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

رواه ابو داود عن طاوس قال سئل ابن عمر عن الركعتين قبل المغرب فقال ما رايت احدا على عهد رسول الله صلى الله عليه وسلم يصليهما …… ولم يفعله احد بعد الصحابة رضى الله تعالى عنهم وقال النخعى انها بدعة وروى عن الخلفاء الاربعة وجماعة من الصحابة انهم كانوا لا يصلونهما.

অর্থঃ- “আবু দাউদ শরীফে হযরত তাউস রহমতুল্লাহি আলাইহিথেকে বর্ণনা করা হয়েছে যে, হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে ওমর (রাঃ)কে মাগরিবের ফরজ নামাজের পূর্বে দুই রাকায়াত নামাজ পড়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি জাওয়াবে বলেন যে, আমি রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যুগে কাউকে মাগরিবের ফরজ নামাজের পূর্বে অর্থাৎ মাগরিবের আযানের পর ফরজ নামাজের পূর্বে দু’রাকায়াত নামাজ পড়তে দেখিনি। …… আর সাহাবা-ই-কিরাম (রাঃ)গণের পরে কেহই মাগরিবের আযানের পর ফরজ নামাজের পূর্বে এই দু’রাকায়াত নামাজ আদায় করেননি। হযরত ইব্রাহীম নখয়ী রহমতুল্লাহি আলাইহিবলেন, নিশ্চয়ই মাগরিবের আযানের পর ফরজ নামাজের পূর্বে দু’রাকায়াত নামাজ পড়া বিদ্য়াত। আর চারজন খলীফা হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ), হযরত ওমর (রাঃ), হযরত উসমান (রাঃ), হযরত আলী (রাঃ) এবং হযরত সাহাবা-ই-কিরাম (রাঃ)গণের একটি জামায়াত থেকে বর্ণনা করা হয়েছে যে, তাঁরা কেউই মাগরিবের আযানের পর ফরজ নামাজের পূর্বে দু’রাকায়াত নামাজ আদায় করেননি।”

দ্বিতীয়তঃ সে বলেছে, “এই নামাজ মক্কা-মদীনাসহ বিভিন্ন দেশের কিছু কিছু লোক পড়েও থাকেন।”

এর জবাবে বলতে হয় যে, মাগরিবের আযানের পর দু’রাকায়াত নফল নামাজ মক্কা-মদীনাসহ বিভিন্ন দেশের শুধুমাত্র হাম্বলী  মাযহাবের লোকেরা পড়ে থাকেন। কেননা মাগরিবের আযানের পর ফরজ নামাজের পূর্বে দু’রাকায়াত নফল নামাজ পড়া হাম্বলী মাযহাবে জায়েয রয়েছে।

যেমন, “কিতাবুল ফিক্বাহ্ আলাল মাযাহিবিল আরবা” কিতাবে উল্লেখ আছে,

الحنابلة قالوا …………. ويباح ان يصلى ركعتين بعد اذان المغرب وقبل صلاتها.

অর্থঃ- “হাম্বলী মাযহাবের ইমামগণ বলেন,……. মাগরিবের আযানের পর এবং মাগরিবের ফরজ নামাজের পূর্বে দু’রাকায়াত নামাজ আদায় করা মুস্তাহাব।”

উপরোক্ত দলীলের ভিত্তিতে ছাবেত হলো যে, “মাগরিবের আযানের পর এবং মাগরিবের ফরজ নামাজের পূর্বে দু’রাকায়াত নফল নামাজ মক্কা-মদীনাসহ বিভিন্ন দেশের শুধুমাত্র হাম্বলী মাযহাবের লোকেরা পড়ে থাকে। কিন্তু আমাদের হানাফী মাযহাবসহ শাফী, মালেকী ইত্যাদি মাযহাবের লোকেরা মাগরিবের আযানের পর দু’রাকায়াত নফল নামাজ পড়েন না। কেননা, আমাদের হানাফী মাযহাবে মাগরিবের আযানের পর এবং মাগরিবের ফরজ নামাজের পূর্বে দু’রাকায়াত নফল নামাজ পড়া মাকরূহ্ তাহরীমী।

তৃতীয়তঃ সে বলেছে, “হানাফী মাযহাব অনুসারীগণ আযানের পর তাড়াহুড়া করেই জামাত শুরু করে দেন”

এর জবাবে বলতে হয় যে, মাগরিবের আযানের পর দেরী করে নামাজ আদায় করা মাকরূহ্ তাহরীমী এবং তাড়াতাড়ি অর্থাৎ আযান শেষ হওয়ার পরপরই নামাজ আদায় করা সুন্নত। সেজন্য আমাদের হানাফী মাযহাবের লোকেরা মাগরিবের আযানের পর তাড়াতাড়ি করে নামাজ শুরু করে দেন। আর মাগরিবের আযানের পর তাড়াতাড়ি নামাজ আদায় করা সুন্নত। কেননা আখেরী রাসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাগরিবের নামাজ তাড়াতাড়ি আদায় করেছেন।

যেমন, “মেশকাত শরীফ” কিতাবের ১০৫ পৃষ্ঠার ৬নং হাশিয়ায় উল্লেখ আছে,

لانه عليه السلام كان يعجل لصلاة المغرب اجماعا.

অর্থঃ- “সকল ওলামা-ই-কিরাম(রঃ)গণের ঐক্যমতে, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাগরিবের নামাজ তাড়াতাড়ি আদায় করছেন।

“মিরকাত শরীফ” কিতাবের ৩য় খন্ডের ১১৭ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

لانه عليه السلام كان يعجل صلاة المغرب اجماعا.

অর্থঃ- “কেননা সকল ফুক্বাহা-ই-কিরাম (রঃ)গণের ঐক্যমতে হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাগরিবের নামাজ তাড়াতাড়ি আদায় করেছেন।

“মেরকাত শরীফ” কিতাবের ২য় খন্ডের ১৩৭ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

وفى شرح السنة اختار اهل العلم من الصحابة والتابعين ومن بعدهم تعجيل المغرب.

অর্থঃ- “শরহে সুন্নাহ্ কিতাবে বর্ণিত আছে যে, আহ্লে ইল্ম, হযরত সাহাবা-ই-কিরাম (রাঃ)গণ, তাবেয়ীন (রঃ)গণ এবং তাঁদের পরে যাঁরা রয়েছেন তাদের সকলেই মাগরিবের নামাজ তাড়াতাড়ি আদায় করার জন্য নির্ধারণ করেছেন।

“মাআরেফুস সুনান” কিতাবের ২য় খন্ডের ৭৪ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

وهو قول اكثر اهل العلم من اصحاب النبى صلى الله عليه وسلم ومن بعدهم من التابعين اختاروا تعجيل صلاة المغرب وكرهوا تاخيرها.

অর্থঃ- “হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাহাবা-ই-কিরাম (রাঃ) এবং তাঁদের পরবর্তী তাবেয়ীন (রঃ)-এর থেকে অধিকাংশ আহ্লে ইল্মগণ এটাই নির্ধারণ করেছেন যে, মাগরিবের নামাজ তাড়াতাড়ি আদায় করতে হবে এবং মাগরিবের নামাজ দেরী করে আদায় করা মাকরূহ্ তাহরীমী।”

“মাআরেফুস্ সুন্নান” কিতাবের ২য় খন্ডের ৫৯ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

فاتفقوا فى تعجيل المغرب.

অর্থঃ- “মাগরিবের নামাজ তাড়াতাড়ি করার ব্যাপারে সকলেই ঐক্যমত পোষণ করেছেন।”

শুধু তাই নয় মাগরিবের আযানের পরেই তাড়াতাড়ি মাগরিবের নামাজ আদায় করা মুস্তাহাবও বটে।

যেমন, “মেরকাত শরীফের” ২য় খন্ডের ১৩২ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

ولا خلاف فى استحباب تعجيل تعجيل المغرب عند الفقهاء.

অর্থঃ- “মাগরিবের নামাজে তাড়াতাড়ি আদায় করা যে মুস্তাহাব, এ ব্যাপারে সকল ফুক্বাহা-ই-কিরাম (রঃ)গণ একমত।”

“মাআরেফুস্ সুনান” কিতাবের ২য় খন্ডের ৭৩ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

 لا خلاف فى استحاب تعجيل المغرب.

অর্থঃ- “মাগরিবের নামাজ তাড়াতাড়ি আদায় করা যে মুস্তাহাব, এ ব্যাপারে ফুক্বাহা-ই-কিরাম (রঃ)-এর গণের মধ্যে কোন মতবিরোধ নেই।”

“হেদায়া মাআদ দেরায়া” কিতাবের ১ম খন্ডের ৮৩ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

ويستحب تعجيل المغرب لان تاخيرها مكروه.

অর্থঃ- “মাগরিবের নামাজ তাড়াতাড়ি আদায় করা মুস্তাহাব। কেননা মাগরিবের নামাজ দেরীতে আদায় করা মাকরূহ্ তাহরীমী।”

“মিরকাত শরীফ” কিতাবের ৩য় খন্ডের ১১৭ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

واكثر الفقهاء على المنع لما يلزم من فعله تأخير المغرب.

অর্থঃ- “অধিকাংশ ফুক্বাহা-ই-কিরাম (রঃ)গণ মাগরিবের আযানের পর দুই রাকায়াত নফল নামাজ পড়াকে নিষেধ করেছেন। কেননা মাগরিবের আযানের পর দুই রাকায়াত নফল নামাজ পড়লে মাগরিবের নামাজ দেরীতে আদায় হবে।”

আর মাগরিবের নামাজ দেরী করে আদায় করা মাকরূহ তাহরীমী। যেমন,

“মাআরেফুস সুনান” কিতাবের ২য় খন্ডের ৭৩ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

 وفى الدر المختار وكره تاخير المغرب ……. تحريما.

অর্থঃ- “দুররুল মোখতার কিতাবে বর্ণিত আছে, মাগরিবের নামাজ দেরীতে আদায় করা …….  মাকরূহ্ তাহরীমী।”

“মাআরেফুস সুনান” কিতাবের ২য় খন্ডের ৭৪ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

 وذكر فى الاشباه ……… ان تأخير المغرب مكروه.

অর্থঃ- “আশবাহ্ কিতাবে বর্ণিত আছে যে, মাগরিবের নামাজ দেরীতে আদায় করা মাকরূহ্ তাহরীমী।”

“মেরকাত শরীফে” ২ খন্ডের ১২০ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

ونقل الترمذى عن العلماء كراهية تأخيرها عن اوله.

অর্থঃ- ইমাম তিরমীযী রহমতুল্লাহি আলাইহিওলামা-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিথেকে বর্ণনা করেছেন যে, মাগরিবের নামাজের প্রথম ওয়াক্ত থেকে দেরী করে নামাজ পড়া মাকরূহ্ তাহরীমী।

আর সূর্য্য অস্ত যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মাগরিবের নামাজের প্রথম ওয়াক্ত শুরু হয়। যেমন,

“মেরকাত শরীফে” ২য় খন্ডের ১২০ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

ويدخل وقتها بالغروب اجماعا.

অর্থঃ- “সকলের ঐক্যমতে সূর্য অস্ত যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মাগরিবের ওয়াক্ত আরম্ভ হয়।”

বুখারী শরীফের শরাহ্ “উমদাতুল ক্বারীর” কিতাবের ৫ম খন্ডের ১৩৮ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

الحاصل ان الومل بينهما مكروه.

অর্থঃ- “মোটকথা হলো, মাগরিবের আযান ও ইক্বামতের মাঝে নামাজ পড়া মাকরূহ্ তাহরীমী।”

উক্ত কিতাবে আরো উল্লেখ আছে,

الا فى صلاة المغرب عند ابى حنيفة لان تأخيرها مكروه.

অর্থঃ- “তবে মাগরিবের নামাজ ব্যতীত। কেননা ইমামে আযম আবূ হানিফা (রঃ)-এর মতে, মাগরীব নামাজ দেরীতে আদায় করা মাকরূহ্ তাহরীমী।”

চতুর্থতঃ সে বলেছে, মুছল্লীগণের মধ্যে …. কেউ কেউ আযান পরবর্তী দু’রাকাত নফল পড়ার আগ্রহী থাকতে পারেন, সে কারণে জামাত শুরু করার আগে কিছুটা সময় দেওয়া উচিত।”

এর জবাবে বলতে হয় যে, মাগরিবের আযানের পর ফরজ নামাজের জন্য জামায়াত শুরু করার আগে নফল নামাজের জন্য কোন সময় দেয়া যাবে না। আর মাগরিবের আযানের পর অপেক্ষাও করা যাবে না বরং আযানের পর পরই জামায়াত শুরু করে দিতে হবে। কেননা সকল মাযহাবের ওলামা-ই-কিরাম (রঃ)গণ এ ব্যাপারে ঐক্যমত পোষণ করেছেন যে, মাগরিবের আযানের পর অপেক্ষা করা যাবে না।

যেমন “মাআরেফুস্ সুনান” কিতাবে ২য় খন্ডের ১৯৫ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

اتفق العلماء من سائر المذاهب على ان يتوقف بين الاذان والاقامة ماعدا المغرب.

অর্থঃ- “সকল মাযহ্াবের ওলামা-ই-কিরাম (রঃ)গণ ঐক্যমত পোষণ করেছেন যে,  (ফজর, জোহ্র, আছর ও এশার) আযান ও ইক্বামতের মধ্যে কিছু সময় অপেক্ষা করা যাবে। কিন্তু মাগরিবের আযানের পর অপেক্ষা করা যাবে না।

উল্লেখ্য, যদি মাগরিবের আযানের পর দু’রাকায়াত নফল নামাজ আদায় করা হয় তাহলে সেক্ষেত্রেও কয়েকটি মাকরূহ্ পরিলক্ষিত হয়।

(১) যদি মাগরিবের আযানের পর দু’রাকায়াত নফল নামাজ আদায় করা হয়, তাহলে একই সাথে, একই সময়ে, একবারে, একই তাহরীমাতে উক্ত দু’রাকায়াত নফল নামাজ আদায় করা সকল নামাজীর  পক্ষে সম্ভব হবে না। বরং অবশ্যই তাদের উক্ত দু’রাকায়াত নামাজ কারো আগে আদায় হবে, কারো দেরীতে আদায় হবে, কারো তাড়াতাড়ি আদায় হবে এবং কারো ধীরে ধীরে আদায় হবে। অতঃপর ইমাম সাহেব যদি নফল নামাজে রত ব্যক্তিদের জন্য অপেক্ষা করেন তাহলে জরুরত বশতঃ মাগরিবের নামাজ দেরীতে আদায় করা লাজেম হয়ে যায়। অথচ তা মাকরূহ্ তাহরীমী

আর ইমাম সাহেব যদি ফরজ নামাজ শুরু করার জন্য নফল নামাজে রত ব্যক্তিদের জন্য অপেক্ষা করেন তাহলে জরুরতবশতঃ মাগরিবের নামাজ দেরীতে আদায় করা লাজেম হয়ে যায়। অথচ মাগরিবের নামাজ দেরীতে আদায় করা মাকরূহ্ তাহরীমী।

এ সম্পর্কে একাধিক দলীল পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে।

(২) আর যদি ইমাম সাহেব তাদের জন্য অপেক্ষা না করেন তাহলে ইক্বামতের সময় উক্ত দু’রাকায়াত নামাজ আদায় করা মুক্তাদীর জন্য লাজেম হয়ে যায়। অথচ সেটাও মাকরূহ্ তাহরীমী।

“দুররুল মোখতার” কিতাবে উল্লেখ আছে,

يكره تطوع عند اقامة صلاة مكتوبة.

অর্থঃ- “ফরজ নামাজের ইক্বামতের সময় নফল নামাজ পড়া মাকরূহ্ তাহরীমী।”

অর্থাৎ ইক্বামতের সময় নফল নামাজ পড়া মাকরূহ্ তাহরীমী।

(৩) অথবা ইক্বামতের সময় নফল নামাজ আদায় করলে তাদের তাক্ববীরে উলা ফউত হয়ে যাবে।

(৪) আর যদি মাগরিবের আযানের সময় নফল নামাজের তাহ্রীমা বাঁধা হয় তাহলে তাদের জন্য আযানের জাওয়াব দেয়া ফউত হয়ে যাবে। অথচ আযানের জাওয়াব দেয়া ওয়াজিব। কেননা হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম বলেছেন,

فقولوا مثل ما يقول المؤذن.

অর্থঃ- “মুয়াজ্জিন যা বলে তা বলো।”

অতএব, সকল সূরতে আদিষ্ট বিষয় তরক করা লাজেম হয়ে যায় বিধায় মাগরিবের আযানের পর দু’রাকায়াত নফল নামাজ পড়া সকল অবস্থায় মাকরূহ্ তাহরীমী।

এ প্রসঙ্গে “মেরকাত শরীফ” কিতাবের ৩য় খন্ডের ১১৭ পৃষ্ঠায় আরো উল্লেখ আছে,

ما قاله المحقق ابن الهمام والذى عندى فى وجه الكراهة ان الناس اذا صلوا الركعتين قبل المغرب فانه لايمكن ان يصلوهما دفعة واحدة متفقة فى التحريمة فى وقت واحد بل لابد ان يكون لهم فيهما تقدم وتأخير وسرعة وبطوء فان انتظرهم الامام يلزم تاخير المغرب ضرورة وان لم ينتظرهم يلزم ان يصلوهما عند الاقامة وهو مكروه ايضا او يفوتهم التكبيرة الاولى وان احرموا عند الاذان يفوتهم الاجابة وقد قال صلى الله عليه وسلم فقولوا مثل ما يقول المؤذن فعلى جميع الصور يلزم ترك الماموربه.

অর্থঃ- “মুহাক্কিক আল্লামা হযরত ইবনুল হুমাম রহমতুল্লাহি আলাইহিবলেছেন, মাগরিবের আযানের পর দু’রাকায়াত নফল নামাজ আদায় করলে আমার কাছে যা মাকরূহ্ তাহরীমীর কারণ পরিলক্ষিত হয় তা হলো- যদি মানুষেরা মাগরিবের ফরজ নামাজের পূর্বে দু’রাকায়াত নফল নামাজ আদায় করে তাহলে একই সাথে, একই সময়ে, একবারে, একই তাহ্রীমাতে উক্ত দু’রাকায়াত নফল নামাজ আদায় করা সকল নামাজীর  পক্ষে সম্ভব হবে না। বরং অবশ্যই তাদের উক্ত দু’রাকায়াত নামাজ কারো আগে আদায় হবে, কারো দেরীতে আদায় হবে, কারো তাড়াতাড়ি আদায় হবে এবং কারো ধীরে ধীরে আদায় হবে। অতঃপর ইমাম সাহেব যদি নফল নামাজে রত ব্যক্তিদের জন্য অপেক্ষা করেন তাহলে জরুরত বশতঃ মাগরিবের নামাজ দেরীতে আদায় করা লাজেম হয়ে যায়। অথচ তা মাকরূহ্ তাহরীমী। আর যদি ইমাম সাহেব তাদের জন্য অপেক্ষা না করেন তাহলে ইক্বামতের সময় উক্ত দু’রাকায়াত নফল নামাজ আদায় করা লাজেম হয়ে যায় অথচ সেটাও মাকরূহ্ তাহরীমী। অথবা ইক্বামতের সময় উক্ত নফল নামাজ আদায় করলে তাদের জন্য তাক্ববীরে উলা ফউত হবে। আর আযানের সময় নফল নামাজের তাহ্রীমা বাধলে তাদের জন্য আযানের জাওয়াব দেয়া ফউত হয়ে যাবে। অথচ আযানের জাওয়াব দেয়া ওয়াজিব। কেননা হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, فقولوا مثل ما يقول المؤذن.

অর্থঃ- “মুয়াজ্জিন যা বলে তোমরাও অনুরূপ বল।”

অতএব, সকল সূরতে আদিষ্ট বিষয় তরক করা লাজেম হয়ে যায় বিধায় মাগরিবের আযানের পর ও ইক্বামতের পূর্বে নফল নামাজ পড়া মাকরূহ্ তাহরীমী।

উল্লেখ্য, মাগরিবের আযানের পর দু’রাকায়াত নফল নামাজ পড়া আমাদের হানাফী মাযহাবে যে মাকরূহ্ তাহরীমী নিম্নে তার আরো কিছু অকাট্ট ও নির্ভরযোগ্য দলীল পেশ করা হলো-

যেমন, “মেশকাত শরীফে” ৬৫ পৃষ্ঠায় ৮ নং হাশিয়ায় উল্লেখ আছে,

وكره ابو حنيفة رحمة الله عليه النفل قبل المغرب بحديث بريدة الاسلمى ان رسول الله صلى الله عليه وسلم قال عند كل اذانين ركعتين خلا صلاة المغرب كذا ذكره بعض علمائنا.

অর্থঃ- “ইমামে আযম আবূ হানীফা (রঃ)-এর মতে মাগরিবের আযানের পর এবং মাগরিবের ফরজ নামাজের পূর্বে দু’রাকায়াত নফল নামাজ পড়া মাকরূহ তাহরীমী। তিনি হযরত বুরাইদা আসলামী (রাঃ)-এর বর্ণিত হাদীস শরীফখানা হতে দলীল পেশ করেছেন যে, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “প্রত্যেক আযানের পর ইক্বামতের পূর্বে দু’রাকায়াত নফল নামাজ রয়েছে, তবে মাগরীব ব্যতীত।” অনুরূপভাবে আমাদের অধিকাংশ ওলামা-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিবলেছেন যে, মাগরিবের আযানের পর ফরজ নামাজের পূর্বে দু’রাকায়াত নফল নামাজ পড়া মাকরূহ্ তাহরীমী।

সুতরাং মাগরিবের আযানের পর এবং মাগরিবের ফরজ নামাজের পূর্বে দু’রাকায়াত নফল নামাজ পড়া মাকরূহ্ তাহরীমী।

“মেরকাত শরীফে” ২ খন্ডের ১৬৫ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

وكره ابو حنيفة رحمة الله عليه النفل قبل المغرب لحديث بريدة الاسلمى ان رسول الله صلى الله عليه وسلم قال عند كل اذانين ركعتين خلا صلاة المغرب كذا ذكره بعض علمائنا.

অর্থঃ- “ইমামে আযম আবূ হানীফা (রঃ)-এর মতে, মাগরিবের ফরজ নামাজের পূর্বে আযানের পরে দু’রাকায়াত নফল নামাজ পড়া মাকরূহ তাহরীমী। তিনি বুরাইদা আসলামী (রাঃ)-এর বর্ণিত হাদীস শরীফখানা দলীল হিসেবে পেশ করেন যে, রাসূল পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন যে, প্রত্যেক দু’আযানের মধ্যে অর্থাৎ প্রত্যেক আযান ও ইক্বামতের মধ্যে দু’রাকায়াত নামাজ রয়েছে, তবে মাগরিবের নামাজ ব্যতীত।” অনুরূপভাবে আমাদের অধিকাংশ ওলামা-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিবলেছেন যে, মাগরিবের আযানের পর ফরজ নামাজের পূর্বে নফল নামাজ পড়া মাকরূহ তাহরীমী।

অর্থাৎ মাগরিবের আযানের পর ফরজ নামাজের পূর্বে দু’রাকায়াত নফল নামাজ পড়া মাকরূহ্ তাহ্রীমি।

যেমন “কুদুরী” কিতাবের ৩১ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

ولا يتنفل قبل المغرب.

অর্থঃ- “মাগরিবের ফরজ নামাজের পূর্বে (আযানের পর) কোন নফল নামাজ পড়া যাবেনা। অর্থাৎ মাকরূহ্ তাহরীমী (জায়েয নেই।)।”

কেননা মাগরিবের আযানের পর ফরজ নামাজের পূর্বে নফল নামাজ পড়লে মাগরিবের ফরজ নামাজ দেরীতে আদায় হবে।

“কুদুরী” কিতাবের ৩১ পৃষ্ঠায় বাইনাস সাত্বরাইনে উল্লেখ আছে,

لما فيه من تاخير المغرب.

অর্থঃ- “কেননা মাগরিবের আযানের পর ফরজ নামাজের পূর্বে নফল নামাজ আদায় করলে মাগরিবের ফরজ নামাজ দেরীতে আদায় হবে। আর মাগরিবের নামাজ দেরীতে আদায় করাও মাকরূহ্ তাহরীমী।”

“নূরুল ইজাহ্” কিতাবের ৫৯ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

ويكره التنفل ………….. قبل صلوة المغرب.

অর্থঃ- “মাগরিবের ফরজ নামাজের পূর্বে …………. (আযানের পর) নফল নামাজ পড়া মাকরূহ্ তাহরীমী।”

“নূরুল ইছবাহ্” কিতাবের ৩৭ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

উর্দূ কম্পোজ করতে হবে

অর্থঃ- “মাগরিবের ফরজ নামাজের পূর্বে(আযানের পর) নফল নামাজ পড়া মাকরূহ্ তাহরীমী।”

“জাওহারাতুন নাইয়ারাহ্” কিতাবের ৯০ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

ولا يتنفل قبل المغرب لما فيه من تاخير المغرب فان المبادرة الى اداء المغرب مستحب.

অর্থঃ- “মাগরিবের ফরজ নামাজের পূর্বে(আযানের পর) কোন নফল নামাজ পড়া যাবেনা অর্থাৎ মাকরূহ্ তাহরীমী। কেননা মাগরিবের ফরজ নামাজের পূর্বে নফল নামাজ পড়লে মাগরিবের নামাজ দেরীতে আদায় হবে। অথচ মাগরিবের নামাজ তাড়াতাড়ি আদায় করা মুস্তাহাব। দেরী করা মাকরূহ্ তাহরীমী।”

“মারাকিউল ফালাহ্” কিতাবের ১২৬ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

ويكره التنفل قبل صلاة المغرب لان فى الاشتغال يذالك تأخير المستحب تعجيله المكروه تاخيره.

অর্থঃ- “মাগরিবের ফরজ নামাজের পূর্বে (আযানের পর) নফল নামাজ পড়া মাকরূহ্ তাহরীমী। কেননা মাগরিবের আযানের পর ফরজ নামাজের পূর্বে নফল নামাজে রত থাকলে বা মশগুল থাকলে মাগরিবের ফরজ নামাজ দেরীতে আদায় হবে। অথচ মাগরিবের নামাজ তাড়াতাড়ি আদায় করা মুস্তাহাব, দেরীতে আদায় করা মাকরূহ্ তাহরীমী।”

“ফতওয়ায়ে আলমগীরী” ১ম খন্ডের ৫৩ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

تسعة اوقات يكره فيها النوافل …….. ومنها ما بعد غروب الشمس قبل صلاة المغرب.

অর্থঃ- “নয় ওয়াক্ত এমন আছে যার মধ্যে নফল নামাজ পড়া মাকরূহ্ তাহরীমী। ………. তার মধ্যে একটি হলো সূর্য্য অস্ত যাওয়ার পর মাগরিবের ফরজ নামাজ আদায় করার পূর্বে নফল নামাজ আদায় করা মাকরূহ্ তাহরীমী।”

“ফতওয়ায়ে হিন্দিয়া” কিতাবের ১ম খন্ডের ৮২ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

উর্দূ কম্পোজ করতে হবে

অর্থঃ- “নয় ওয়াক্ত এমন আছে যার মধ্যে নফল নামাজ পড়া মাকরূহ্ তাহরীমী।” ….. তার মধ্যে একটি হলো সূর্য্য অস্ত যাওয়ার পর মাগরিবের ফরজ নামাজ আদায় করার পূর্বে নফল নামাজ পড়া মাকরূহ্ তাহরীমী।”

“খোলাছাতুল ফতওয়ার” ১ম খন্ডের ৬৮ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

ولا يجوز فيها النفل …………. بعد غروب الشمس قبل صلاة المغرب.

অর্থঃ- “নয় ওয়াক্তে নফল নামাজ পড়া জায়েয নেই তার মধ্যে একটি হলো সূর্য্য অস্ত যাওয়ার পর থেকে মাগরিবের ফরজ নামাজের পূর্বে (আযানের পর) কোন নফল নামাজ পড়া জায়েয নেই।”

“হেদায়া মাআদ দেরায়া” কিতাবের ১ম খন্ডের ৮৬ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

ولا يتنفل بعد الغروب قبل الفرض …………. المغرب.

অর্থঃ- “সূর্য্য অস্ত যাওয়ার (ডুবার) পর মাগরিবের ফরজ নামাজের পূর্বে (আযানের পর) কোন নফল নামাজ পড়া যাবেনা। অর্থাৎ মাগরিবের আযানের পর ফরজ নামাজের পূর্বে নফল নামাজ পড়া মাকরূহ্ তাহরীমী।”

“বাহ্রুর রায়েক” কিতাবের ১ম খন্ডের ২৫৩ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

ومنع عن التنفل بعد غروب الشمس قبل صلاة المغرب.

অর্থঃ- “সূর্য্য অস্ত যাওয়ার পর মাগরিবের ফরজ নামাজের পূর্বে (আযানের পর) নফল নামাজ আদায় করা নিষেধ করা হয়েছে। অর্থাৎ জায়েয নেই।”

“তানবীরুল আছার” কিতাবে উল্লেখ আছে,

وكره نفل …….. قبل صلاة مغرب.

অর্থঃ- মাগরিবের ফরজ নামাজের পূর্বে (আযানের পর) নফল নামাজ পড়া মাকরূহ্ তাহরীমী।”

“ফতহুল ক্বাদির” কিতাবের ১ম খন্ডের ২০৮ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

ولا يتنفل بعد الغروب قبل الفرض.

অর্থঃ- “সূর্য্য অস্ত যাওয়ার পর মাগরিবের ফরজ নামাজের পূর্বে নফল নামাজ পড়া যাবেনা অর্থাৎ মাকরূহ্ তাহরীমী।”

“বাদায়েউছ্ ছানায়ি” কিতাবের ১ম খন্ডের ২৯৭ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

بعد الغروب يكره فيه النفل وغيره لان فيه تأخير المغرب وانه مكروه.

অর্থঃ- “সূর্য্য অস্ত যাওয়ার পর নফল নামাজ পড়া এবং নফল নামাজের অনুরূপ যত নফল নামাজ রয়েছে সকল প্রকার নফল নামাজ পড়া মাকরূহ্ তাহরীমী। কেননা সূর্য্য অস্ত যাওয়ার পর অর্থাৎ মাগরিবের আযানের পর নফল নামাজ পড়লে মাগরিবের নামাজ দেরীতে আদায় হবে। আর মাগরিবের নামাজ দেরীতে আদায় করাও মাকরূহ্ তাহরীমী।”

“মায়াদানুল হাক্বায়েক শরহে কানযুদ দাক্বায়েক” কিতাবের ১ম খন্ডের ১২২ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

ومنع …………… عن التنفل …….. قبل المغرب.

অর্থঃ- “মাগরিবের ফরজ নামাজের পূর্বে (আযানের পর) নফল নামাজ পড়া নিষেধ করা হয়েছে।”

উক্ত কিতাবে আরো উল্লেখ আছে,

উর্দূ কম্পোজ করতে হবে

অর্থঃ- “সূর্য্য অস্ত (ডুবে) যাওয়ার পর মাগরিবের ফরজ নামাজের পূর্বে নফল নামাজ পড়া মাকরূহ্ তাহরীমী।”

“তাতারখানিয়া” কিতাবের ১ম খন্ডের ৪০৯ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

ولا يجوز فيها نفل …………… بعد غروب الشمس قبل صلاة المغرب.

অর্থঃ- “সূর্য্য অস্ত যাওয়ার পর মাগরিবের ফরজ নামাজের পূর্বে (আযানের পর) কোন নফল নামাজ পড়া জায়েয নেই।

“মাাবসূত্ব লিস্ সারাখসী” কিতাবের ১ম খন্ডের ১৫৭ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

لا تطوع بعد غروب الشمس قبل المغرب ………… ركعتان.

অর্থঃ- “সূর্য্য অস্ত যাওয়ার পর মাগরিবের ফরজ নামাজের পূর্বে দুই রাকায়াত নফল নামাজ পড়বেনা।”

“আইনুল হিদায়া” কিতাবে নেছফে আউয়াল খন্ডের ৩৬৯ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

উর্দূ কম্পোজ করতে হবে

অর্থঃ- “সূর্য্য অস্ত যাওয়ার পর মাগরিবের ফরজ নামাজের পূর্বে নফল নামাজ পড়বেনা। অর্থাৎ মাকরূহ্ তাহরীমী।”

উপরোক্ত অকাট্ট ও নির্ভরযোগ্য দলীল-আদিল্লাহ্র দ্বারা সুস্পষ্টভাবে এটাই ছাবেত হলো যে, মাগরিবের আযানের পর এবং মাগরিবের ফরজ নামাজের পূর্বে দু’রাকায়াত নফল নামাজ পড়া মাকরূহ তাহরীমী এবং এর উপরই ফতওয়া। আর মাসিক মদীনার বক্তব্য হাদীসের খেলাফ যা শরীয়ত বিরোধী ও কুফরীর অন্তর্ভূক্ত হয়েছে।

অতএব এ প্রকার হাদীস ও শরীয়ত বিরোধী আক্বীদা ও আমল সম্বলিত পত্রিকা পাঠ করা থেকে প্রত্যেক মুসলমানের বিরত থাকা ওয়াজিব।

{দলীলসমূহঃ- (১) বুখারী শরীফ, (২) মুসলিম শরীফ, (৩) তিরমিযী শরীফ, (৪) আবূ দাউদ শরীফ, (৫) নাসাঈ শরীফ, (৬) দারে কুত্বনী, (৭) বায়হাক্বী শরীফ, (৮) বায্যার, (৯) মেশকাত শরীফ, (১০) কেতাবুল আছার, (১১) শরহে কেতাবুল আছার, (১২) ফতহুল বারী, (১৩) উমদাতুল ক্বারী, (১৪) আইনী, (১৫) মেরকাত, (১৬) মায়ারেফুস্ সুনান, (১৭) তানযীমুল আশতাত, (১৮) ফয়জে আহ্মদ, (১৯) যুজাজা, (২০) যাওয়ায়েদ, (২১) বাদায়েয়ুল ফাওয়ায়েদ, (২২) আল আশবাহ্, (২৩) লুময়াত, (২৪) তালীকুছ্ছবী, (২৫) শরহুত্ ত্বীবি, (২৬) শরহে সুন্নাহ্, (২৭) কুদূরী, (২৮) হেদায়া, (২৯) কুনিয়া, (৩০) মুনিয়া, (৩১) শরহে মুনিয়া, (৩২) খানিয়া, (৩৩) নেহায়া, (৩৪) এনায়া, (৩৫) বেনায়া, (৩৬) হেলিয়া, (৩৭) বাহরুর রায়েক, (৩৮) নাহ্রুল ফায়েক, (৩৯) শরহুল মুহায্যাব, (৪০) শরহে হেদায়া, (৪১) জাওহারাতুন্ নাইয়ারাহ্, (৪২) ফতওয়ায়ে আলমগীরী, (৪৩) মাবসূত, (৪৪) আইনুল হেদায়া, (৪৫) তাতারখানিয়া, (৪৬) গায়াতুল আওতার, (৪৭) মায়াদানুল হাকায়েক শরহে কানযুদ্ দাকায়েক, (৪৮) শামী, (৪৯) তানবীরুল আবছার, (৫০) দুররুল মোখতার, (৫১) রদ্দুল মোহ্তার, (৫২) কেফায়া, (৫৩) ফতহুল ক্বাদীর, (৫৪) বাদায়েউস্ সানায়ে, (৫৫) হাশিয়ায়ে তাহ্তাবী আলা দুররিল মোখতার, (৫৬) মুগনী, (৫৭) শরহে কবীর, (৫৮) হালবীয়া, (৫৯) ফতওয়ায়ে হিন্দীয়া, (৬০) খোলাছাতুল ফতওয়া, (৬১) কাজীখান, (৬২) হেদায়া মাআদ দেরায়া, (৬৩) মারাকিউল ফালাহ্, (৬৪) কিতাবুল ফিক্বাহ্ আলাল মাযাহিবিল আরবায়া, (৬৫) তাহ্যীব, (৬৬) নুরুল ইজাহ, (৬৭) নুরুল ইছবাহ্ ইত্যাদি।}

 

মাওলানা মুহম্মদ আব্দুল কুদ্দুস

চিকন্দী, শরীয়তপুর

 

সুওয়ালঃ- মাসিক রাহ্মানী পয়গাম এপ্রিল/২০০০ ঈঃ সংখ্যায় জিজ্ঞাসার জবাব বিভাগে ৫৫৮ নং জিজ্ঞাসার জবাবে বলা হয়েছে, “সুবহে সাদিক উদিত হওয়ার পর ফজরের সুন্নত ও ফরজ আর উমরী কাযা নামায ব্যতীত অন্য কোন নামায পড়া জায়িয নয়।”

মাসিক রাহ্মানী পয়গামের উক্ত বক্তব্য দ্বারা এটাই প্রতীয়মান হয় যে, সুবহে সাদেক উদিত হওয়ার পর অর্থাৎ ফজর নামাজের ওয়াক্তের পর উমরী কাযার নামাজ পড়া জায়েয। অথচ আমরা জানি, সুবহে সাদেক উদিত হওয়ার পর অর্থাৎ ফজর নামাজের ওয়াক্তের পর উমরী কাযার নামাজ পড়া জায়েয নাই।

এখন আমার সুওয়াল হলো মাসিক রাহ্মানী পয়গামের উক্ত বক্তব্য সঠিক হয়েছে কি? আর সত্যিই কি সুবহে সাদেক উদিত হওয়ার পর অর্থাৎ ফজর নামাজের ওয়াক্তের পর উমরী কাযার নামাজ পড়া জায়েয? দয়া করে দলীল ভিত্তিক সঠিক জাওয়াব দানে বাধিত করবেন।

জাওয়াবঃ- সুবহে সাদেক উদিত হওয়ার পর অর্থাৎ ফজর নামাজের ওয়াক্তের পর উমরী কাযার নামাজ পড়া সম্পর্কে মাসিক রাহ্মানী পয়গামের উক্ত বক্তব্য সঠিক হয়নি, বরং ভুল ও অশুদ্ধ হয়েছে। যা সম্পূর্ণ মুর্খতাসূচক ও জিহালতপূর্ণ।

রাহমানী পয়গাম কর্তৃপক্ষ উমরী কাযার তা’রীফ বা সংজ্ঞা ও তার আহ্কাম সম্পর্কে না জানার কারণে উমরী কাযা সম্পর্কে এ ধরণের মুর্খতাসূচক ও বিভ্রান্তিমূলক বক্তব্য পেশ করেছে। তাই প্রথমে এখানে উমরী কাযার সংজ্ঞা ও আহ্কাম সম্পর্কে কিঞ্চিৎ আলোচনা করা হলো-

ক্বাযা দু’প্রকারঃ-

(১) ক্বাযায়ে আদা ও (২) ক্বাযায়ে উমরী।

(১) ক্বাযায়ে আদা  ক্বাযায়ে আদা বলে এমন নামাজকে যে নামাজ ক্বাযা থাকা সম্বন্ধে নামাজী ব্যক্তির কোন সন্দেহ নেই। অর্থাৎ তার ক্বাযা নামাজ বাকী রয়েছে। সন্দেহ ব্যতীত যে ক্বাযা নামাজ পড়া হয় তাকেই ক্বাযায়ে আদা বলে।

(২) ক্বাযায়ে উমরী : আর উমরী ক্বাযা বলে এমন ক্বাযা নামাজকে, যে নামাজ ক্বাযা থাকা সম্বন্ধে নামাজী ব্যক্তির সন্দেহ রয়েছে। অর্থাৎ তার ক্বাযা নামাজ বাকী আছে কিনা? এ সন্দেহের কারণে যে ক্বাযা নামাজ পড়া হয়, তাকে উমরী ক্বাযা বলে।

সুবহ্ সাদেক উদিত হওয়ার পর বা ফজর নামাজের ওয়াক্তের পর ক্বাযায়ে আদা নামাজ আদায় করা যাবে। কেননা ক্বাযায়ে আদা হলো ফরজ বা ওয়াজিব। আর সুবহে সাদেক উদিত হওয়ার পর বা ফজর নামাজের ওয়াক্তের পর উমরী ক্বাযার নামাজ আদায় করা যাবেনা। কেননা উমরী ক্বাযার নামাজ হলো নফল। আর সুবহে সাদেক উদিত হওয়ার পর বা ফজর নামাজের ওয়াক্তের পর সব ধরণের নফল নামাজ পড়া নিষেধ করা হয়েছে।

অথচ তারা ফরজ-ওয়াজিব (ক্বাযায়ে আদা) কে নফল নামাজের (উমরী ক্বাযার) সঙ্গে একত্রিত করে চরম জিহালতের পরিচয় দিয়েছে। কেননা বিশ্ববরেণ্য সর্বজনমান্য নির্ভরযোগ্য ও বিশ্ববিখ্যাত ফিক্বাহ্ ও ফতওয়ার কিতাবসমূহে উল্লেখ আছে যে, সুবহে সাদেক উদিত হওয়ার পর বা ফজর নামাজের ওয়াক্তের পর উমরী কাযার নামাজ পড়া জায়েয নাই।

যেমন বিশ্ববিখ্যাত ফতওয়ার কিতাব “ফতওয়ায়ে আলমগীরী” ১ম খন্ডের ১২৪ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

فيمن يقضى صلوات عمره ………… والصحيح انه يجوز الابعد صلاة الفجر والعصر.

অর্থঃ- “যে ব্যক্তি উমরী কাযার নামাজ আদায় করবে ….. বিশুদ্ধ মতে তার উমরী কাযার নামাজ আদায় করা জায়েয হবে। তবে আছর নামাজের পর এবং ফজর নামাজের ওয়াক্তের পর উমরী কাযার নামাজ আদায় করা জায়েয হবেনা।”

“খোলাছাতুল ফতওয়ার” ১ম খন্ডের ১৯২ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

رجل يقضى صلوات عمره ………….. واجمعوا انه لايقضى بعد العصر وبعد طلوع الفجر.

অর্থঃ- “কোন ব্যক্তি যদি তার উমরী কাযার নামাজ আদায় করে ….. তাহলে সে ব্যক্তি কোন কোন সময় উমরী কাযার নামাজ আদায় করবে, এক্ষেত্রে সকল ওলামা-ই-কিরাম (রঃ)-এর ঐক্যমত পোষণ করেছেন যে, সে ব্যক্তি আছরের নামাজের পর এবং সুবহে সাদেক উদিত হওয়ার পর অর্থাৎ ফজর নামাজের ওয়াক্তের পর উমরী কাযার নামাজ আদায় করবেনা।”

“ফতওয়া হিন্দিয়া” কিতাবের ১ম খন্ডের ২০০ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

উর্দূ কম্পোজ করতে হবে

অর্থঃ “যদি কোন ব্যক্তি উমরী কাযার নামাজ আদায় করে তাহলে বিশুদ্ধ মতে তার উমরী কাযার নামাজ আদায় করা জায়েয হবে, তবে আছর নামাজের পর এবং ফজর নামাজের ওয়াক্তের পর উমরী কাযার নামাজ আদায় করা যাবেনা।”

“তাতারখানিয়া” কিতাবে ১ম খন্ডের ৭৭০ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

فيمن يقضى صلوات عمره ………… والصحيح انه يجوز الا بعد صلاة الفجر والعصر.

অর্থঃ- “যে ব্যক্তি উমরী কাযার নামাজ আদায় করবে ……… বিশুদ্ধ মতে তার উমরী কাযার নামাজ আদায় করা জায়েয হবে, তবে আছর নামাজের পর এবং ফজর নামাজের ওয়াক্তের পর উমরী কাযার নামাজ আদায় করা জায়েয হবেনা।”

“বাহ্রুর রায়েক” কিতাবের ২য় জিল্দ ৮০ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

رجل يقضى صلوات عمره ………….. لايقضى بعد صلاة الفجر ولا بعد صلاة العصر.

অর্থঃ- “কোন ব্যক্তি যদি তার উমরী কাযার নামাজ আদায় করে ………… তাহলে সে ব্যক্তি আছরের নামাজের পর এবং ফজর নামাজের ওয়াক্তের পর আদায় করবেনা।”

“রদ্দুল মোহ্তার” কিতাবে উল্লেখ আছে,

ان الصحيح جواز هذا القضاء الابعد صلاة الفجر والعصر.

অর্থঃ- “নিশ্চয়ই বিশুদ্ধ মত এই যে, এই উমরী কাযার নামাজ আদায় করা জায়েয, তবে আছর নামাজের পর এবং ফজর নামাজের ওয়াক্তের পর উমরী কাযার নামাজ আদায় করা জায়েয হবেনা।”

“আইনুল হেদায়া” কিতাবের নেছ্ফে আউয়াল খন্ডের ৭৪৬ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

উর্দূ কম্পোজ করতে হবে

অর্থঃ- “কোন ব্যক্তি যদি তার উমরী কাযার নামাজ  আদায় করে ….. তাহলে বিশুদ্ধ মতে তার উমরী কাযার নামাজ আদায় করা জায়েয হবে, তবে আছর নামাজের পর এবং ফজর নামাজের ওয়াক্তের পর উমরী কাযার নামাজ আদায় করা জায়েয হবেনা।”

“ফতওয়ায়ে কাজীখান” কিতাবে উল্লেখ আছে,

رجل يقضى صلوات عمره …………. الصحيح انه يجوز لكن لا يقضى بعد صلاة العصر ولا بعد صلاة الفجر لانها نفل ظاهرا.

অর্থঃ- “কোন এক ব্যক্তি যদি উমরী ক্বাযার নামাজ আদায় করে …………. তাহলে বিশুদ্ধ মতে তার উমরী ক্বাযার নামাজ আদায় করা জায়েয  হবে, তবে সে ব্যক্তি আছর নামাজের পর এবং ফজর নামাজের ওয়াক্তের পর উমরী ক্বাযার নামাজ আদায় করবেনা। কেননা এটা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত যে, উমরী ক্বাযার নামাজ নফল।

অতএব ফজর নামাজের ওয়াক্তের পর অর্থাৎ সুবহে সাদেক উদিত হওয়ার পর উমরী ক্বাযার নামাজ আদায় করা জায়েয নাই।”

কেননা উমরী ক্বাযার নামাজ তো নফল যা কিতাবে সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। আর ফজর নামাজের ওয়াক্তের পর বা সুবহে সাদেক উদিত হওয়ার পর নফল নামাজ আদায় করা জায়েয নাই। সুতরাং উমরী ক্বাযার নামাজ যেহেতু নফল সেহেতু ফজর নামাজের ওয়াক্তের পর বা সুবহে সাদেক উদিত হওয়ার পর উমরী ক্বাযার নামাজ জায়েয নাই।

“মারাকিউল ফালাহ্” কিতাবের ২৯০ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

ومن قضى صلاة عمره …………….. لايقضى فى وقت تكره فيه النافلة.

অর্থঃ- “যে ব্যক্তি উমরী কাযার নামাজ আদায় করবে ………. সে ব্যক্তি যে সকল ওয়াক্তে নফল নামাজ পড়া মাকরূহ্ তাহরীমী সে সকল মাকরূহ্ তাহরীমী ওয়াক্তে উমরী কাযার নামাজ আদায় করবেনা।”

আর যে সমস্ত ওয়াক্তে নফল নামাজ পড়া মাকরূহ্ তাহরীমী সে সমস্ত মাকরূহ্ তাহরীমী ওয়াক্তে যদি উমরী কাযার নামাজ আদায় করা না যায় তাহলে সুবহে সাদিক উদিত হওয়ার পর অর্থাৎ ফজর নামাজের ওয়াক্তের পর উমরী কাযার নামাজ আদায় করা জায়েয হবেনা। কেননা সুবহে সাদিক উদিত হওয়ার পর অর্থাৎ ফজর নামাজের ওয়াক্তের পর সব ধরণের নফল নামাজ পড়া নিষেধ করা হয়েছে।

যেমন- “ফতওয়ায়ে আলমগীরী” ১ম খন্ডের ৫২ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

تسعة اوقات يكره فيها النوافل وما فى معناه ……… منها ما بعد طلوع الفجر. …………… .

অর্থঃ- “নয় ওয়াক্তে নফল নামাজ এবং এ ধরণের যত নফল নামাজ রয়েছে তা আদায় করা মাকরূহ্ তাহরীমী। আর যে নয় ওয়াক্তে নফল নামাজ পড়া মাকরূহ্ তাহরীমী তার একটি হলো- ফজর নামাজের ওয়াক্ত হওয়ার পর অর্থাৎ সুবহে সাদিক উদিত হওয়ার পর নফল নামাজ পড়া মাকরূহ্ তাহরীমী।”

“কুদুরী” কিতাবের ৩১ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

ويكره ان يتنفل بعد طلوع الفجر.

অর্থঃ- “ফজর নামাজের ওয়াক্ত হওয়ার পর অর্থাৎ সুবহে সাদিক উদিত হওয়ার পর নফল নামাজ পড়া মাকরূহ্ তাহরীমী।”

এছাড়া হেদায়া, বাহরুর রায়েক, দুররুল মুখতার, রদ্দুল মোহ্তার, শামী, গায়াতুল আওতার, হাশিয়ায়ে তাহতাবী আলা দুররিল মোখতার, ফতওয়ায়ে হিন্দিয়া, কাজীখান, তাতারখানিয়া, আইনুল হেদায়া, ফতহুল ক্বাদীর, মারাকিউল ফালাহ্, খোলাছাতুল ফতওয়া ইত্যাদি কিতাবসমূহে সুবহ্ েসাদিক উদিত হওয়ার পর বা ফজর নামাজের ওয়াক্তের পর সব ধরণের নফল নামাজ পড়তে নিষেধ করা হয়েছে।

সুতরাং সুবহে সাদিক উদিত হওয়ার পর অর্থাৎ ফজর নামাজের ওয়াক্ত হওয়ার পর যদি নফল নামাজ পড়া জায়েয না হয় তাহলে সুবহে সাদিক উদিত হওয়ার পর বা ফজর নামাজের ওয়াক্তের পর উমরী কাযার নামাজও পড়া জায়েয হবেনা। কেননা উমরী কাযার নামাজও নফল নামাজ। তাই ফুক্বাহা-ই-কিরাম (রঃ)গণ ফজর নামাজের ওয়াক্তের পর বা সুবহে সাদিক উদিত হওয়ার পর উমরী ক্বাযার নামাজ পড়া জায়েয নাই বলে তাদের বিশ্ববিখ্যাত ফতওয়ার কিতাব সমূহে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। যা উপরে সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।

অতএব উপরোক্ত অকাট্ট ও নির্ভরযোগ্য দলীলের ভিত্তিতে এটাই সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো যে, সুবহে সাদিক উদিত হওয়ার পর অর্থাৎ ফজর নামাজের ওয়াক্ত হওয়ার পর উমরী ক্বাযার নামাজ আদায় করা জায়েয নাই। আর এর উপরই ফতওয়া। সুতরাং মাসিক রাহ্মানী পয়গামের বক্তব্য মুর্খতাসূচক, অশুদ্ধ ও গোমরাহ্ীমূলক বলেই প্রমাণিত হলো।

{দলীলসমূহঃ- (১) ছগীরী, (২) কবীরী, (৩) হেদায়া, (৪) বাহরুর রায়েক, (৫) আলমগীরী, (৬) জহিরীয়া, (৭) দুররুল মোখতার, (৮) রদ্দুল মোহতার, (৯) শামী, (১০) গায়াতুল আওতার, (১১) হাশিয়ায়ে তাহ্তাবী আলা দুররিল মুখতার , (১২) ফতওয়ায়ে হিন্দিয়া, (১৩) তাতারখানিয়া, (১৪) আইনুল হেদায়া, (১৫) ফতহুল ক্বাদীর, (১৬) কুনীয়া, (১৭) খানিয়া, (১৮) ইতাবিয়া, (১৯) মুজমিরাত, (২০) হুজ্জাত, (২১) খোলাছাতুল ফতওয়া, (২২) মারাকিউল ফালাহ্, (২৩) হাশিয়ায়ে রদ্দিল মোহ্তার আলা দুররিল মোখতার, (২৪) নেহায়া, (২৫) কেফায়া, (২৬) মালুল ফতওয়া (২৭) ফতওয়ায়ে কাজীখান এবং (২৮) ফতওয়ায়ে দেওবন্দ ইত্যাদি}

 

মুহম্মদ আলমগীর হুসাইন (বসুনিয়া)

খতীব- কদমতলা জামে মসজিদ

উলিপুর, কুড়িগ্রাম

সুওয়ালঃ- মাসিক মুঈনুল ইসলাম এপ্রিল/২০০০ ঈঃ সংখ্যায় জিজ্ঞাসার-সমাধান বিভাগে ২৯১২ নং জিজ্ঞাসার-সমাধানে বলা হয়েছে, “রাসূূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বা সাহাবায়ে কিরামও তাবিঈনগণ কখনো ফরয নামাযের পর হাত উঠিয়ে সম্মিলিতভাবে প্রচলিত রীতিতে মুনাজাত করেনি। তা নাহলে কোন না কোন বর্ণনায় তার প্রমাণ পাওয়া যেত। অতএব ব্যাপারটি অতি পরিস্কার হয়ে গেল যে, মূলতঃ শরীয়তে প্রচলিত মুনাজাতের কোন ভিত্তি নেই। বলাবাহুল্য, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নবুয়্যাতী যিন্দিগীর দীর্ঘ তেইশ বছর পর্যন্ত দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের ইমামতীর কাজ নিজেই আঞ্জাম দিয়েছেন। ইমামতীর এ দীর্ঘ সময়ের ভেতর যদি সকল মুক্তাদীদেরকে নিয়ে একবারও ফরয নামাযান্তে সম্মিলিতভাবে মুনাজাত করতেন, যা বর্তমানে করা হয়, তাহলে অবশ্যই বর্ণনাকারীগণ অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে এ বিষয়টি বর্ণনা করার প্রয়াস পেতেন।”

এখন আমার সুওয়াল হলো- মাসিক মুঈনুল ইসলামের উক্ত বক্তব্য সঠিক হয়েছে কি? আর সত্যিই কি হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফরজ নামাজের পর হাত উঠিয়ে সম্মিলিতভাবে মুনাজাত করেননি। দলীল-আদিল্লাহ্সহ জানিয়ে বাধিত করবেন।

জাওয়াবঃ- ফরজ নামাজের পর হাত উঠিয়ে(ইজতেমায়ী) সম্মিলিতভাবে মুনাজাত করার ব্যাপারে “মাসিক মুঈনুল ইসলাম” পত্রিকার উপরোক্ত বক্তব্য শুধু অশুদ্ধই নয় বরং ভিত্তিহীন, বানোয়াট, বিভ্রান্তিকর ও অসৎ উদ্দেশ্য প্রণোদিত। যা সমাজে ও মুসলমানদের মধ্যে ফিৎনা সৃষ্টির কারণ। শুধু তাই নয়, তাদের উপরোক্ত বক্তব্য সরাসরি আখেরী রাসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, হযরত সাহাবা-ই-কিরাম (রাঃ) ও হযরত তাবেঈন(রঃ)গণের প্রতি মিথ্যারোপ করার শামীল, যেটা স্পষ্টতঃ গোমরাহীর নামান্তর, যার পরিনাম অত্যন্ত ভয়াবহ।

কেননা হাদীস শরীফে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

من كذب على متعمدا فليتبوأ مقعده من النار.

অর্থঃ- “যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় আমার নামে মিথ্যারোপ করলো, সে যেন তার স্থান জাহান্নামে নির্ধারণ করে নিল।” (বোখারী শরীফ)

যেমন বিখ্যাত হাদীস গ্রন্থ “মুছান্নেফ ইব্নে আবী শায়বায়” উল্লেখ আছে যে,

عن الاسود العامرى عن ابيه قال صليت مع رسول الله صلى الله عليه وسلم الفجر فلما سلم انصرف ورفع يديه ودعا.

অর্থঃ- “হযরত আসওয়াদ আমেরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেন, তাঁর পিতা বলেন- আমি হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে ফজর নামাজ পড়লাম। যখন তিনি নামাজের সালাম ফিরালেন, ঘুরে বসলেন এবং উভয় হাত মোবারক উঠিয়ে মুনাজাত করলেন।”

অতএব, যেখানে হাদীস শরীফ ও তার শরাহ্, তাফসীর, ফিক্বাহ্ এবং ফতওয়ার নির্ভরযোগ্য অসংখ্য কিতাবের দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত যে, “স্বয়ং সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেই হযরত সাহাবা-ই-কিরাম(রাঃ)গণকে নিয়ে ফরজ নামাজের পর হাত তুলে সম্মিলিতভাবে মুনাজাত করেছেন।”

মুনাজাত করতেন না বলা হাদীস শরীফ অস্বীকার করা ও উনাদের প্রতি মিথ্যারোপ করার শামীল নয় কি?

উল্লেখ্য, উক্ত হাদীস শরীফে যে সমস্ত বিষয় রয়েছে তাহলো- হযরত আসওয়াদ আমিরী (রাঃ)-এর পিতা, তিনি বলেছেন, صليت الفجر. (ছল্লাইতুল ফাজ্রা)

অর্থঃ- “আমি ফজরের নামাজ পড়েছি।”

এর দ্বারা ফরজ নামাজ সাবেত হলো। অন্য কোন নফল নামাজ এটা হতে “ইস্তেছ্না।” অর্থাৎ অন্যান্য নফল নামাজকে বাদ দেয়া হয়েছে।

দ্বিতীয়তঃ انصرف (ইনছরাফা) বলা হয়েছে। এর দ্বারা বুঝা গেল, হাদীস শরীফ বর্ণনাকারী হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে একা ছিলেন না। কেননা মাসয়ালা হলো- ইমামের সাথে মুক্তাদী যদি একজন হয়, তাহলে তো মুক্তাদী ইমামের সাথে দাঁড়াবে। আর মুক্তাদী ইমামের সাথে দাঁড়ালে তো انصرف (ইনছরাফা) হওয়ার কোন প্রয়োজন নেই। সুতরাং انصرف (ইনছরাফা) শব্দ দ্বারা বুঝা গেল, জামায়াতে একাধিক মুক্তাদী ছিল, তাই তিনি মুক্তাদীগণের দিকে মুখ ফিরিয়ে বসেছেন।

এখন মুনাজাত বিরোধীরা এ প্রশ্ন করতে পারে, যদি অধিক সংখ্যক মুক্তাদীই থাকবে তাহলে অন্য কেউ এ হাদীস শরীফ বর্ণনা করেননি কেন? আমরা এ প্রশ্নের দু’টি উত্তর দেব। প্রথমতঃ হয়তো অন্য কেউ এ ধরণের প্রশ্নের সম্মুখীন হননি, তাই বর্ণনা করেননি। দ্বিতীয়তঃ কেন বর্ণনা করেননি, এটাই যদি মুখ্য হতো তবে খবরে ওয়াহেদ প্রসঙ্গটা আসতো না।

এ প্রসঙ্গে আমরা انما الاعمال بالنيات.

অর্থঃ- “নিশ্চয়ই সমস্ত কাজের ফয়সালা হবে নিয়তের উপর। অর্থাৎ সমস্ত কাজ নিয়তের উপর নির্ভর করে। (বুখারী, মেশকাত শরীফ)

এ হাদীস শরীফকে দলীল হিসেবে পেশ করবো। এ হাদীস শরীফ হযরত ওমর (রাঃ) ব্যতীত অপর কেউ বর্ণনা করেননি।

এটা স্মরণ রাখতে হবে যে, এ হাদীস শরীফ হুজুর পাক সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বর্ণনা করেছেন এক বিশেষ ঘটণা প্রসঙ্গে। যার দ্বারা বুঝা যায় যে, তখন হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট হযরত ওমর (রাঃ) ছাড়াও আরো অনেকে ছিলেন। কেননা এটা কোন ব্যক্তিগত প্রশ্নের উত্তর ছিলনা। তাছাড়া সব ব্যাপারে সমস্ত সাহাবা-ই-কিরাম (রাঃ)গণের বর্ণনা নেই বলেই সাহাবা-ই-কিরাম (রাঃ)গণের হাদীস বর্ণনার তারতম্য দেখা যায়। যেমন হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) বর্ণনা করেছেন, ৫৩৭৪টি হাদীস শরীফ, অপরদিকে হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আজীবনের সাথী আফজালুন্নাস বা’দাল আম্বিয়া হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) বর্ণনা করেছেন মাত্র ১৪২টি হাদীস শরীফ। এ তারতম্য কেন? এর অর্থ সকলেই সমস্ত হাদীস শরীফ বর্ণনা করেননি। সুতরাং এ ব্যাপারে মুনাজাত বিরোধীদের বক্তব্য সম্পূর্ণই অযৌক্তিক প্রমাণিত হলো।

অতএব উপরোক্ত হাদীস শরীফ দ্বারা স্পষ্টরূপে ছাবেত হলো যে, “আখেরী রাসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফজর নামাজের পর হাত উঠিয়ে সম্মিলিতভাবে মুনাজাত করেছেন যা বর্তমানে প্রচলিত রয়েছে।

এছাড়াও আরো অসংখ্য হাদীস শরীফ বর্ণিত রয়েছে যাতে উল্লেখ রয়েছে যে, স্বয়ং সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দোয়া বা মুনাজাত করার সময় হাত মোবারক উঠিয়েছেন।

যেমন “বুখারী শরীফে” বর্ণিত রয়েছে,

وقال ابوموسى دعا النبى صلى الله عليه وسلم ثم رفع يديه.

অর্থঃ- “হযরত আবূ মুসা (রাঃ) বলেন, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দোয়া করলেন, অতঃপর হস্তদ্বয় উত্তোলন করলেন।”

“মিশকাত শরীফের” ১৯৬ পৃষ্ঠায়, “তানযীমুল আশতাত” ১ম জিঃ ৩১৮ পৃষ্ঠায় বর্ণনা আছে,

 وعن انس قال كان رسول الله صلى الله عليه وسلم يرفع يديه فى الدعاء.

অর্থঃ- হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত- “হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দোয়ার মধ্যে হাত মোবারক উঠিয়ে।” অনুরূপ “মেশকাত শরীফ, বায়হাক্বী শরীফ, মুসান্নেফ ইবনে আবী শায়বা” কিতাবে উল্লেখ আছে।

“তিরমিযী শরীফে” উল্লেখ আছে,

عن عمر بن الخطاب رضى الله عنه – قال كان رسول الله صلى الله عليه وسلم اذا رفع يديه فى الدعاء لم يحطهما حتى يمسح بهما وجهه.

অর্থঃ- “হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) বলেন, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এমনি অবস্থা ছিল যে, তিনি যখন মুনাজাতের জন্য হাত মোবারক উঠাতেন, তখন উভয় হাত মোবারক দ্বারা মুখমন্ডল মসেহ্ না করে হাত নামাতেন না।” (মিশকাত শরীফ)

অন্য হাদীস শরীফে বর্ণনা রয়েছে,

عن عمربن الخطاب قال كان النبى صلى الله عليه وسلم اذا انزل عليه الوحى فاستقبل القبلة ورفع يديه-

অর্থঃ- হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) বলেন, “যখন হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর ওহী অবতীর্ণ হতো —- তিনি ক্বিবলার দিকে মুখ করে উভয় হাত মোবারক তুলে দোয়া করতেন।” (মিশকাত শরীফ/২১৯, আহমদ, তিরমিযী)

“মুসলিম শরীফ” ১ম জিঃ ২৯৩ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

عن انس بن مالك قال رأيت رسول الله صلى الله عليه وسلم يرفع يديه فى الدعاء.

অর্থঃ- হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) বলেন, “আমি হুজুরে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে উভয় হাত মোবারক উঠায়ে দোয়া করতে দেখেছি।” (ফতহুল মুলহিম ২য় জিঃ পৃঃ৪৪২)

“মুছান্নেফ ইবনে আবী শায়বা” ২য় জিঃ৪৮৬ পৃষ্ঠায় আরো উল্লেখ আছে,

 عن انس قال سئل هل كان رسول الله صلى الله عليه وسلم يرفع يديه فقال نعم.

অর্থঃ- হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত- তিনি বলেন, “প্রশ্ন করা হলো- হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দোয়ায় হাত উঠায়েছেন কি? উত্তর দেওয়া হলো- হ্যাঁ।”

তাছাড়া উপরোক্ত (فعلى) ফে’লী হাদীস শরীফ ছাড়াও ফরজ নামাজের পর মুনাজাত করার ব্যাপারে অসংখ্য সহীহ্ (قولى) ক্বাওলী হাদীস শরীফও রয়েছে। যেমন হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে,

واخرج ابوبكر بن ابيض ان رسول الله صلى الله عليه وسلم قال من صلى فريضة فله دعوة مستجابة.

অর্থঃ- হযরত আবূ বকর ইব্নে আব্ইয়াদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুরে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “যে ব্যক্তি ফরজ নামাজ আদায় করলো, তার একটি দোয়া আল্লাহ্ পাক-এর নিকট অবশ্যই কবুলযোগ্য।” (সিহামুল ইছাবাহ্) হাদীস শরীফে আরো এরশাদ হয়েছে,

عن ابى موسى قال رسول الله صلى الله عليه وسلم من كانت له الى الله حاجة فليدع بها دبرصلوة مفروضة.

অর্থঃ- হযরত আবূ মূসা (রাঃ) হতে বণিত- সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুরে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “যে ব্যক্তির আল্লাহ্ পাক-এর নিকট কোন কিছু চাওয়ার প্রয়োজন পড়ে, সে যেন ফরজ নামাজের পর উহার জন্যে আল্লাহ্ পাক-এর নিকট মুনাজাত করে।” (ইব্নে আসাকির)

“তিরমিযী শরীফে” এরশাদ হয়েছে,

عن ابى امامة قال قيل يا رسول الله صلى الله عليه وسلم اى الدعاء اسمع قال جوف الليل الاخر و دبرالصلوة المكتوبة.

অর্থঃ- হযরত আবূ উমামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে প্রশ্ন করা হলো- কোন (সময়ের) মুনাজাত কবুলযোগ্য? (জবাবে) হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “শেষ রাত্রের মুনাজাত (দোয়া) ও ফরজ নামাজের পরের মুনাজাত বা দোয়া।” (ফতহুল বারী)

“মিশকাত শরীফ” কিতাবের ১৯৫ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

عن سلمان قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم ان ربكم حى كريم يستحيى من عبده اذا رفع يديه ان يرد هما صفرا.

অর্থঃ- হযরত সালমান (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “নিশ্চয়ই তোমাদের রব অতিশয় দয়ালু ও লজ্জাশীল। তাঁর কোন বান্দা যখন তাঁর নিকট হাত উঠায় (কিছু চায়), তখন তিনি তার (বান্দার) হাতকে শুন্যভাবে ফিরায়ে দিতে লজ্জাবোধ করেন।” (তিরমিযী, আবূ দাউদ, বায়হাক্বী)

“মসনাদুল ফিরদাউস দায়লমী” ১ম জিঃ পৃঃ২২৫, “তানজিয়াতুশ শরীয়ত” ২য় জিঃ ৩১৬ পৃষ্ঠায় বর্ণনা রয়েছে,

عن على بن ابى طالب ان موسى بن عمران سأل ربه رفع يديه.

অর্থঃ- হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত- “হযরত মূসা ইবনে ইমরান (রাঃ) আল্লাহ্ পাক-এর নিকট উভয় হাত মোবারক উঠায়ে দোয়া করেছেন।”

উপরোক্ত ক্বাওলী ও ফে’লী হাদীস শরীফ দ্বারা প্রমাণিত হলো যে, “ফরজ নামাজের পর হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, হযরত সাহাবা-ই-কিরাম (রাঃ)গণকে নিয়ে সম্মিলিত ভাবে হাত তুলে মুনাজাত করেছেন।”

সুতরাং এ হাদীস শরীফ খুঁজে পাওয়া যায় না বলা বা কোন প্রমাণ নেই বলা, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি মিথ্যা তোহ্মত দেয়ার শামীল যা কুফরী।

কাজেই ফরজ নামাজের পর হাত তুলে সম্মিলিতভাবে মুনাজাত করা সুন্নত।

উল্লেখ্য যে, মাসিক মুঈনুল ইসলাম কর্তৃপক্ষ এবং তাদের মাদ্রাসা যে সিলসিলার অন্তর্ভূক্ত ও তারা যে সিলেবাস অনুযায়ী তা’লীম দেয়, উক্ত সিলসিলার কিতাবসমূহেও অনুরূপ বলা হয়েছে।

যেমন “ফতওয়ায়ে দেওবন্দের” ২য় জিঃ ১৯৭নং পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে যে,

উর্দূ কম্পোজ করতে হবে

অর্থঃ- “যে সকল ফরজ নামাজের পর সুন্নত নামাজ রয়েছে, সে সকল নামাজের পরে ইমাম ও মুক্তাদীগণ সংক্ষিপ্ত মুনাজাত করে সুন্নত আদায় করবে।”

আর “ইমদাদুল আহ্কাম” ১ম জিঃ ২৪৪ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে যে,

 উর্দূ কম্পোজ করতে হবে

অর্থঃ- “যে সকল ফরজ নামাজের পর সুন্নত নামাজ রয়েছে, উহার পর মুনাজাত দীর্ঘ না করাই উত্তম। অর্থাৎ সংক্ষিপ্ত মুনাজাত করবে।” ……. (অনুরূপ “দুররুল মোখতার” ও “রদ্দুল মোহ্তার” কিতাবেও উল্লেখ আছে।)

এছাড়াও “শামী, আযীযুল ফতওয়া, ইলমুল ফিক্বাহ, মুনিয়াতুল মুছল্লী, আহ্সানুল ফতওয়া, বেহেস্তী জেওর, গায়াতুল আওতার” ইত্যাদি কিতাবসমূহে অনুরূপ বক্তব্য পেশ করা হয়েছে।

দ্বিতীয়তঃ মাসিক মুঈনুল ইসলামে আরো বলা হয়েছে, “মিশ্কাত শরীফের একটি হাদীসে বলা হয়েছে, হযরত আয়েশা (রাযিঃ) বলেন, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফরয নামাযের সালামের পর এতটুকু সময় বসতেন, যতটুকু সময়ের মধ্যে “আল্লাহুম্মা আনতাস্ সালামু ওয়া মিনকাস্ সালামু তাবা রাকতা ইয়া যাল জালালি ওয়াল ইকরাম” দোয়াটি পড়া যায়। (মুসলিম, মিশ্কাত শরীফ-১/৮৮)। উক্ত হাদীসে শুধুমাত্র সংক্ষিপ্ত একটি দোয়া পড়ার কথা উল্লেখ হয়েছে। কিন্তু তাতেও হাত উঠানোর কথা উল্লেখ নেই।

এর জবাবে বলতে হয় যে, “মিশকাত শরীফের” ৮৮ পৃষ্ঠায় হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাঃ) থেকে বর্ণিত হাদীস শরীফে ফরজ নামাজের সালাম ফিরানোর পর ফরজ ও সুন্নত নামাজের যেমন- জোহ্র, মাগরিব, এশার মাঝে হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কতটুকু পরিমাণ দোয়া করেছেন সেই দোয়া পড়ার مقدار বা পরিমাণ বর্ণনা করা হয়েছে। অর্থাৎ ফরজ নামাজের সালাম ফিরানো পর হাত তুলে মুনাজাত করা যে সুন্নত যা পূর্বে উল্লিখিত হাদীস শরীফ দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করা হয়েছে। কিন্তু ফরজ ও সুন্নত নামাজের (জোহ্র, মাগরিব, এশার) মাঝে হাত তুলে এই মোনাজাত কতটুকু পরিমাণ করতে হবে সেই مقدار বা পরিমাণটুকু এ হাদীস শরীফে বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন, হাদীস শরীফে উল্লেখ করা হয়েছে,

عن عائشة رضى الله عنها قالت كان رسول الله صلى الله عليه وسلم اذا سلم لم يقعد الا مقدار ما يقول اللهم انت السلام ومنك السلام تباركت يا ذا الجلال والاكرام.

অর্থঃ- হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, “হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ‘আল্লাহুম্মা আন্তাস সালাম ওয়া মিনকাস সালাম- এই দোয়া পড়ার পরিমাণ সময়ের অতিরিক্ত সময় নামাজের সালাম ফিরানোর পর বসতেন না।” (ইবনে মাজাহ্, আবু দাউদ শরীফ ও মুসলীম শরীফ)

এ হাদীস শরীফের ব্যাখ্যায় “ফতহুল মুলহিম শরহে মুসলিম শরীফে” বলা হয়েছে,

تمسك بهذا الحديث من زعم ان الدعاء بعد الصلوة لاشرع والجواب ان المراد بالنفى المذكور نفى استمراره جالسا على هيئة قبل السلام الا بقدر ان يقول ماذكر فقد ثبت انه كان اذاصلى اقبل على اصحابه فيحمل ماورد من الدعاء بعد الصلوة على انه كان يقوله بعد ان يقبل بوجهه على اصحابه.

অর্থঃ- নামাজের পর হাত উঠিয়ে দোয়া নেই বলে যারা মনে করে, তারা উপরোক্ত হাদীস শরীফকে দলীল হিসাবে পেশ করে। তাদের এ বক্তব্যের উত্তর এই যে, হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদীস শরীফের মূল উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য হলো- হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, সালামের পূর্বে মুছল্লী হিসাবে ক্বিবলামূখী হয়ে যে আকারে বসা ছিলেন, সালামের পর সে আকারে বসে থাকতেন না। অর্থাৎ নামাজির সুরতে ক্বিবলামূখী হয়ে আল্লাহুম্মা আনতাস সালাম- এই দোয়া পড়ার পরিমাণ সময়ের চেয়ে বেশী বসে থাকতেন না। কারণ এটা প্রমাণিত রয়েছে যে, তিনি নামাজ শেষে স্বীয় সাহাবা-ই-কিরাম (রাঃ)গণের দিকে ঘুরে সামনা-সামনি হয়ে বসতেন। অতএব, নামাজের পর তিনি যে দোয়া করেছেন বলে বর্ণিত রয়েছে, তা সাহাবা-ই-কিরাম (রাঃ)গণের দিকে ঘুরে বসার পরই করেছেন।

উক্ত হাদীস শরীফের ব্যাখ্যায় আল্লামা মানাবী রহমতুল্লাহি আলাইহিআরো বলেন,

لم يقعد الا مقدار مايقول الخ اى بين الفرض والسنة.

এ পরিমাণ দোয়া পড়া পর্যন্ত বসতেন। এর অর্থ হলো- এ দোয়া পড়তেন ফরজ ও সুন্নাতের মাঝে। এটা আজিজী ও এলাউস্সুনান কিতাবে উল্লেখ আছে।

অতএব, হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাঃ)-এর বর্ণিত হাদীস শরীফখানা মুনাজাতে হাত উঠানোর প্রসঙ্গ নয় বরং দোয়ার পরিমাণ প্রসঙ্গে সেহেতু হাত উঠানার কথা উল্লেখ নেই। শুধুমাত্র দোয়া পড়ার مقدار বা পরিমাণ বর্ণনা করা হয়েছে।

আর হযরত আসওয়াদ আমেরী (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদীস শরীফসহ অন্যান্য হাদীস শরীফসমূহের দ্বারা  ফরজ নামাজের পর মুনাজাতে হাত উঠানোর কথা উল্লেখ আছে। সুতরাং সকল হাদীস শরীফের সমন্বয়ে আমল করতে হবে। আর এক সাথে এক হাদীস শরীফে সবগুলোর বর্ণনা থাকা শর্ত নয়। বরং যে কোন হাদীস শরীফে বর্ণনা থাকলেই তার উপর আমল করতে হবে। কেননা শরীয়তে অনেক আহকাম রয়েছে, যা একসাথে এক আয়াত শরীফে বা এক হাদীস শরীফে বর্ণিত নেই।

যেমন নামাজ কত ওয়াক্ত পড়তে হবে এবং কোন নামাজ কত রাকায়াত? আর কোন নামাজ ফরজ, ওয়াজিব? ইত্যাদি বিষয়গুলো কুরআন শরীফে ও হাদীস শরীফে এক সাথে এক স্থানে বর্ণিত নেই।  বরং ইত্যাদি বিভিন্ন আয়াত শরীফ ও হাদীস শরীফে বিভিন্নভাবে বর্ণিত আছে। অনুরূপ ফরজ নামাজের পর হাত উঠিয়ে সম্মিলিতভাবে মুনাজাত করা, মুনাজাতে দোয়ার পরিমাণ, মুনাজাত শেষে মুখ-মন্ডল মসেহ্ করা ইত্যাদি বিষয়গুলোও এক সাথে এক হাদীস শরীফে নেই। বরং বিষয়গুলি বিভিন্ন হাদীস শরীফে বিভিন্নভাবে বর্ণিত আছে।

কাজেই মুনাজাত সম্পর্কে এ হাদীস শরীফে হাত উঠানোর কথা উল্লেখ নেই বলে হাত উঠানোকে অস্বীকার করে কাল্পনিক ও অবান্তর বক্তব্য পেশ করে মুইনুল ইসলাম কেবল তাদের জিহালতীকে আরো সুস্পষ্ট করেই তোলেনি বরং তারা যে আসলে ফিৎনাবাজ ও বিদ্য়াতী তাও প্রমান করে।

অতএব, উপরোক্ত দলীল ভিত্তিক আলোচনা দ্বারা এটাই সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো যে, মুনাজাত সম্পর্কে মাসিক মুঈনুল ইসলামের উপরোক্ত বক্তব্য দলীলবিহীন, মিথ্যা, অজ্ঞতা প্রসূত ও হাদীস শরীফ বিরোধী যা কুফরী। কেননা আখেরী রাসূল, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফরজ নামাজের পর হাত উঠায়ে সম্মিলিতভাবে মুনাজাত করেছেন যা বর্তমানে প্রচলিত রয়েছে।

কাজেই ফরজ নামাজের পর হাত উঠিয়ে সম্মিলিতভাবে প্রচলিত রীতিতে মুনাজাত করা সুন্নতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।

নিম্নোক্ত কিতাবসমূহেও ফরজ নামাজের পর সম্মিলিতভাবে মুনাজাত করাকে জায়েয ও সুন্নত বলা হয়ছে।

যেমন- (১) তিরমিযী শরীফ, (২) মায়ারিফুস্ সুনান, (৩) ইলাউস সুনান, (৪) কিতাবুল আযকার, (৫) সাবাহাতুল ফিক্র, (৬) মায়ারেফে মাদানিয়া (৭) নুযহাতুল মাযালিস, (৮) ফতওয়ায়ে দেওবন্দ (৯) ইমদাদুল ফতওয়া, (১০) ইমদাদুল মুফতীন, (১১) নুরুল ইজাহ্, (১২) মারাক্বিউল ফালাহ্, (১৩) মাজমাউয যাওয়ায়েদ, (১৪) বেহেস্তী জিওর, (১৫) ফতওয়ায়ে রহিমিয়া, (১৬) ফতওয়ায়ে মাহ্মূদীয়া, (১৭) নাফায়েসুল মারগুবাহ্, (১৭) ক্বিফায়াতুল মুফতী, (১৮) ইখতেলাফে উম্মত আওর ছিরাতে মুস্তাক্বীম, (১৯) ফতওয়ায়ে দেওবন্দ (২০) মিনহাজুল উম্মাল ওয়াল আকাঈদুস্ সুন্নীয়া, (২১) আল-মুরীদ ইলাল মুরাদ, (২২) ছাহিবুল মুন্তাখার, (২৩) ইস্তেহবাবুদ দাওয়াত, (২৪) আক্বিবুছ ছালাওয়াত, (২৫) তোহ্ফাতুল মারগুবা, (২৬) আযীযুল ফতওয়া ইত্যাদি।

(এ সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জানতে হলে মাসিক আল বাইয়্যিনাত পত্রিকা ১৪, ১৫, ১৬, ১৭, ১৮, ১৯ ও ২০তম সংখ্যাগুলো ধারাবাহিকভাবে পড়ুন)

 

মুহম্মদ আযীযুল হক জামী

সভাপতিঃ আঞ্জুমানে আল বাইয়্যিনাত

জগন্নাথপুর, সুনামগঞ্জ

 

সুওয়ালঃ- “ক্বিবলা” ও “কা’বা” শব্দের অর্থ কি? ইহার কি আর কোন প্রকার রয়েছে? কারণ দেখা যায়, যারা পীর সাহেব তাঁদের নামের পরে ক্বিবলা শব্দ ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

ইহা কতটুকু সঠিক? দলীলসহ জানতে আগ্রহী।

জাওয়াবঃ- ক্বিবলা শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে- জিহাত বা দিক। আর  কা’বা শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে- মুরাব্বাউশ্ শাক্ল বা চতুস্কোন বিশিষ্ট ঘর এবং উভয় শব্দ দ্বারা বাইতুল্লাহ্ শরীফকেও বুঝানো হয়ে থাকে। আর পারিভাষিক অর্থে ক্বিবলা ও কা’বা শব্দদ্বয় একই অর্থে ব্যবহৃত হয়। তা হচ্ছে- যার দিকে রুজু হয়।

হানাফী মাযহাবের বিখ্যাত ও নির্ভরযোগ্য ফতওয়ার কিতাব “ফতওয়ায়ে শামী” কিতাবে উল্লেখ রয়েছে যে, ক্বিবলা বা কা’বা হচ্ছে পাঁচ প্রকার।

(১) নামাজের ক্বিবলা হচ্ছে- “বাইতুল্লাহ্ শরীফ।” এজন্য বাইতুল্লাহ্ শরীফের দিকে মুখ করে নামাজ আদায় করতে হয়।

(২) দোয়া বা মুনাজাতের ক্বিবলা হচ্ছে- “আসমান।” এজন্য হাতের তালুদ্বয় আসমানের দিকে করে মুনাজাত করতে হয়।

(৩) মাখলুকাতের ক্বিবলা হচ্ছেন- “আখেরী রাসূল হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল ৗাম।” কেননা তিনি হলেন সৃষ্টির মূল, তাঁর উসীলায় সমস্ত মাখলুকাতের সৃষ্টি।

(৪) সমস্ত ক্বিবলাকে বিলীনকারী ক্বিবলা হচ্ছেন- “স্বয়ং আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন।”

(৫) ক্বিবলায়ে কুলূব বা কাল্বের ক্বিবলা হচ্ছেন- “পীর সাহেব।” যাঁর ফয়েজের মাধ্যমে আল্লাহ্ পাক ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মুহব্বত ও মা’রিফাতের ফয়েজে মুরীদ ফয়জিয়া বা ফয়েজপ্রাপ্ত হয়, ক্বালব ও অন্যান্য লতিফাসমূহে যিকির জারী হয়। অতঃপর ক্বালব (অন্তর)সহ সমস্ত লতিফা পরিশুদ্ধ হয় এবং ইখলাস পয়দা হয়।  আর তখনই মুরীদের পক্ষে গায়রুল্লাহ্ মুক্ত হয়ে একমাত্র আল্লাহ্ পাক-এর জন্য ইবাদত করা সম্ভব।

অতএব পীর সাহেবের নামের সাথে ক্বিবলা ও কা’বা শব্দ ব্যবহার করা শরীয়তসম্মত।

 

মুহম্মদ আযীযুল হক বেলাল

সাধারণ সম্পাদকঃ- আঞ্জুমানে আল বাইয়্যিনাত

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জিলা শাখা

 

সুওয়ালঃ- কুরআন-সুন্নাহ্র দৃষ্টিতে কারো নামের পূর্বে লক্বব (উপাধি) ব্যবহার করা জায়েয আছে কি-না? অনেকে বলে থাকে, লক্বব ব্যবহার করা জায়েয নেই। বিশেষ করে রাজারবাগ শরীফ-এর হযরত পীর সাহেব ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলী-এর নামে লক্বব ব্যবহার করা দেখে বর্তমানে কিছু লোক বলে থাকে যে, এত লক্বব পূর্ববর্তী কোন ওলী আল্লাহ্ (রঃ), হযরত সাহাবা-ই-কিরাম (রাঃ) এমনকি স্বয়ং আল্লাহ্ পাক-এর রাসূল হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ব্যবহার করেননি বা তাঁদের এত লক্বব বা উপাধি ছিল না।

তাদের এ কথা কতটুকু সঠিক? দলীল-আদিল্লাহ্সহ তা জানার বাসনা রাখি।

জাওয়াবঃ- আখেরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

ان شر الشر شرار العلماء وان خير الخير خيار العلماء.

অর্থঃ- “নিশ্চয়ই (আমার উম্মতের মধ্যে) সর্বোৎকৃষ্ট হলো- আলেমগণ ও সর্বনিকৃষ্ট হলো- দুনিয়াদার আলেমরা।” (দারেমী, মেশকাত)

এ সকল দুনিয়াদার আলেমদেরকেই অন্য হাদীস শরীফে দাজ্জালের চেলা বলা হয়েছে। যারা হক্বকে নাহক্ব, হালালকে হারাম ও হারামকে হালাল, সুন্নতকে বিদ্য়াত এবং বিদ্য়াতকে সুন্নত বলে প্রচার করে থাকে, তারা হক্কানী-রব্বানী ওলী আল্লাহ্গণকে ভন্ড, বিদ্য়াতী, এমনকি কাফির বলে আখ্যা দিতেও দ্বিধাবোধ করেনা। ইসলামের শুরু থেকে এ পর্যন্ত যত ইমাম মুজ্তাহিদ ও আউলিয়া-ই-কিরাম (রঃ)গণ অতীত হয়েছেন, তাঁদের প্রত্যেককেই উক্ত দুনিয়াদার নামধারী আলেমরা কাফির বলে আখ্যা দিয়েছে। তাঁদের সাথে করেছে পশুসুলভ আচরণ, বিরোধীতা ও দিয়েছে জঘণ্য অপবাদ।

বর্তমান যামানায় নামধারী দুনিয়াদার আলেমরাও রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর সাহেব ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলী-এর ক্ষেত্রে সে ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে। যার কারণে তারা আক্রোশবশতঃ বিরোধীতা করে লক্ববের মনগড়া ব্যাখ্যা দিয়ে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করছে।

অথচ লক্বব ব্যবহার করা সুন্নতুল্লাহ্, সুন্নতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, সুন্নতে সাহাবা-ই-কিরাম (রাঃ) ও সুন্নতে আউলিয়া-ই-কিরাম (রঃ)।

কিতাবে  আরো উল্লেখ করা হয়েছে,

ان لله تعالى خمسة الاف اسم.

অর্থঃ- নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ্ পাক-এর পাঁচ হাজার নাম (লক্বব) মোবারক রয়েছে। ” অর্থাৎ স্বয়ং আল্লাহ্ পাক নিজেই অসংখ্য লক্বব মোবারক ব্যবহার করেছেন।” (তাফসীরে মাযহারী ৩/৪২৮, ইবনে কাসীর, তাফসীরে হামাবী শরীফ, খুলাছাতুত্ তাফসীর, দায়লামী, তানযীম ২/৬০, আশয়াতুল লুময়াত, তা’লীক্ব, ফতওয়ায়ে সিদ্দিকীয়া)

অনুরূপভাবে স্বয়ং আল্লাহ্ পাক কুরআন শরীফে, হাদীস শরীফেও পুর্ববর্তী আসমানী কিতাবসমূহে হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অসংখ্য অগনিত লক্বব মোবারক দান করেছেন এবং তিনি তা ব্যবহার করেছেন।

কিতাবে আরো উল্লেখ করা হয়েছে,

ان لله تعالى الف اسم وللنبى صلى الله عليه وسلم الف اسم ايضا.

অর্থঃ- “নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ্ পাক-এর এক হাজার লক্বব মোবারক রয়েছে। অনুরূপ হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এরও এক হাজার লক্বব মোবারক রয়েছে।” (মেরকাত ১১/৭০, কিতাবুল আহওয়াজি, শরহে নববী, আশয়াতুল লুময়াত, মোযাহেরে হক্ব, শরহুত ত্বীবী, তা’লীকুচ্ছবী, মেরআতুল মানাজীহ্ ৮/৪১, খাছায়েছুল কুবরা ১/১৮৭, নে’মাতুল কুবরা, আল কালামুল আওদাহ্ ফি তাফসীরে  আলাম নাশ্রাহ)

লক্বব ব্যবহারের এই মহান সুন্নত আদায়ের লক্ষ্যেই অতীতের সকল ইমাম-মুজতাহিদ, অলীআল্লাহ্গণও স্বীয় নাম মোবারকের সাথে লক্বব ব্যবহার করেছেন।

যেমন-

(১) হযরত ইমাম আবূ হানীফা (রঃ)-এর ৪৮টি

(২) হযরত ইমাম শাফী (রঃ)-এর ৩৭টি

(৩) হযরত ইমাম মালেক (রঃ)-এর ৪১টি

(৪) হযরত ইমাম বোখারী (রঃ)-এর ২৮টি

(৫) হযরত বড় পীর সাহেব (রঃ)-এর ৫১টি

(৬) হযরত খাজা মুঈনুদ্দীন চীশ্তী (রঃ)-এর ৮২টি

(৭) হযরত মুজাদ্দিদে আল্ফে সানী (রঃ)-এর ২৪টি

(৮) হযরত হাসান বস্রী (রঃ)-এর ২৪টি

(৯) হযরত ইমাম বায়হাক্বী (রঃ)-এর ৪৫টি

(১০) গত ১৪০০ হিজরীর মুজাদ্দিদ আল্লামা আবূ বকর সিদ্দিকী ফুরফুরাবী (রঃ)-এর ৪১টি

(১১) হাফেজে হাদীস আল্লামা রুহুল আমীন (রঃ)-এর ২৮টি, (১২) হাজী এমদাদুল্লাহ্ মোহাজেরে মক্কী (রঃ)-এর ৩৩টি

(১৩) আল্লামা নেছারুদ্দীন রহমতুল্লাহি আলাইহি(ছারছীনা)-এর ৩০টি

(১৪) আল্লামা আমীমুল ইহ্সান (রঃ)-এর ২৯টি।

অনুরূপ সর্বজনমান্য বিশ্ববিখ্যাত সকল ইমাম-মুজতাহিদ ও আউলিয়া-ই-কিরাম (রঃ)গণ স্বীয় নাম মোবরকের সাথে অসংখ্য লক্বব মোবারক ব্যবহার করছেন। এছাড়াও

(১৫) আহমদ রেজা খান বেরেলভী-এর ৩১টি

(১৬) ইবনে তাইমিয়া-এর ৩৮টি

(১৭) রশীদ আহমদ গাঙ্গুহীর ৩২টি

(১৮) আশ্রাফ আলী থানভীর ৬১টি

(১৯) হুসাইন আহমদ মাদানীর ২৭টি

(২০) খলীল আহমদ শাহরানপূরীর ৪২টি লক্বব।

অনুরূপ ওলামায়ে দেওবন্দের আকাবীররা সবাই অসংখ্য লক্বব ব্যবহার করেছে।

(মুকাদ্দামায়ে এলাউস্সুনান, মানাকেবে আবূ হানীফা, তাহাবী শরীফ, আত্তারগীব, মা’রেফুস্ সুনান, আহকামুল কুরআন শাফী, মুয়াত্তা মালেক ৯, আওজাজুল মাসালিক, কিতাবুল হুজ্জাহ্, শরহে যুরকানী, বুখারী ১/৩, উমদাতুল ক্বারী ১/২, শরহে কেরমানী, তানযীম, আশয়াতুল লুময়াত,  হাফতে মাসায়েল, সাইয়্যিদুল আউলিয়া, আখবারুল আখইয়ার, মুঈনুল হিন্দ /১৮, আনীসুল আরওয়াহ্, দলীলুল আরেফীন, রাহাতিল মুহিব্বীন, মাকতুবাত শরীফ, সিরাতে মুজাদ্দিদে আল্ফে সানী, তাফসীরে হাসান বসরী, দালায়েলুন্ নুবুয়াহ্, তরীক্বত দর্পন, তাহক্বীকুল মাসায়েল, সুন্নত ওয়াল জামায়াত, নামাজ শিক্ষা, ফতোয়ায়ে আমিনিয়া, ফতোয়ায়ে সিদ্দিকীয়া, হাক্বীক্বতুল মারিফাতির রব্বানিয়া, ইত্তেহাফু আশরাফ, কাওয়ায়েদুল ফিক্বাহ্, আদাবুল মুফতী, তরীকায়ে হজ্ব, ফতওয়ায়ে রেজবিয়া ১ম, আহকামে শরীয়ত/৮-৯, ফতওয়ায়ে ইবনে তাইমিয়া, জিয়াউল কুলূব, দেওয়ানে আযীয, ইমদাদুচ্ছুলুম, ফতহুল মুলহিম, বযলুল মাযহুদ, এমদাদুল ফতওয়া/১০-৭, ফতওয়ায়ে দেওবন্দ/৭০, তাবলীগে দ্বীন, তামবীহুত্ ত্ববারী)

উপরোক্ত দলীলভিত্তিক বর্ণনায় এটাই প্রমাণিত হয় যে, অতীতের সর্বজনমান্য সকল ইমাম-মুজতাহিদগণই লক্বব মোবারক ব্যবহার করেছেন।

এতদসত্ত্বেও বর্তমানে সকল দুনিয়াদার আলেমরা রাজারবাগ শরীফ-এর হযরত পীর সাহেব ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলী-এর লক্বব মোবারকের বিরোধীতা করে থাকে এবং সে অন্যায় বিরোধীতা করতে গিয়ে তারা তার লক্বব মোবাকের মনগড়াভাবে শাব্দিক অর্থ গ্রহণ করে অপব্যাখ্যা করে থাকে।

লক্ববের শাব্দিক অর্থ গ্রহণ কি জায়েয?

          স্মর্তব্য, লক্ববের ক্ষেত্রে সব লক্ববেরই শাব্দিক অর্থ  গ্রহণযোগ্য নয়। যদি শাব্দিক অর্থ গ্রহণ করা হয়, তবে মাওলানা আশরাফ আলী থানভী সাহেবের একটি লক্বব হলো- “হাকীমুল উম্মতিল মুহম্মদিয়া”-এর শাব্দিক অর্থ হলো- হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উম্মতের হাকীম। সাধারণ অর্থে আল্লাহ্ পাক ব্যতীত সমস্ত কায়েনাতই আল্লাহ্ পাক-এর রসূল, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উম্মত। আর “হাকীম” মহান আল্লাহ্ পাক-এর একটি নাম মোবারক। (যা কুরআন শরীফের ৮১ স্থানে বর্ণনা করা হয়েছে) তাহলে “হাকীমুল উম্মত” অর্থ হয়- “উম্মতের আল্লাহ্।” যা স্পষ্টরূপে কুফরীর অন্তর্ভূক্ত।

অনুরূপ তার আরেকটি লক্বব হলো- “মুজাদ্দিদুল মিল্লাতিল ইসলামিয়া”। এর অর্থ হলো- ইসলামী মিল্লাতের মুজাদ্দিদ। আর ইসলামী মিল্লাতের অধীন হলো- হযরত ইব্রাহীম (আঃ) থেকে শুরু করে হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামসহ ক্বিয়ামত পর্যন্ত সমস্ত মানুষ। যার অন্তর্ভূক্ত হযরত ইমাম মাহ্দী (আঃ), হযরত ঈসা (আঃ) ও উনাদের পূর্বের ও পরের সকল ওলী আল্লাহ্গণ। তাহলে কি থানভী সাহেব সকলেরই মুজাদ্দিদ? প্রকৃতপক্ষে  এসব ক্ষেত্রে শাব্দিক অর্থ  গ্রহণযোগ্য নয়।

মূলতঃ কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াসে এরূপ শত-সহস্র শব্দ রয়েছে যার সরাসরি শাব্দিক অর্থ গ্রহণ করলে কুফরী হয়।

যেমন, (مكر) শব্দের অর্থ- ধোকা। আল্লাহ্ পাক বলেছেন,

 مكروا ومكر الله والله خير الماكرين.

অর্থঃ- “তারা ধোকা দিল আল্লাহ্ পাক মকর করলেন, আল্লাহ্ পাক উত্তম মকরকারী।” (সূরা আলে ইমরান/৫৪)

এখানে আল্লাহ্ পাক-এর শানে (مكر) শব্দের শাব্দিক অর্থ গ্রহণ করলে আল্লাহ্ পাককে উত্তম ধোকাবাজ বলতে হয় অথচ ইহা সুস্পষ্ট কুফরী।

এখানে আল্লাহ্ পাক-এর শানে (مكر) শব্দের অর্থ হলো- হিকমত। অনুরূপ مولانا (মাওলানা) মহান আল্লাহ্ পাক-এর একটি পবিত্র নাম মোবারক। যেমন, কুরআন শরীফে এরশাদ হয়েছে, انت مولنا فا نصرنا.

অর্থঃ- “আপনি আমাদের মাওলা বা রব আমাদেরকে সাহায্য করুন।” (সূরা বাক্বারা/২৮৬)

এখানে মাওলানা দ্বারা মহান আল্লাহ্ পাককে বুঝানো হয়েছে। অথচ ইহা সারা বিশ্বের লক্ষ লক্ষ মানুষ ব্যবহার করছে। তাহলে কি যারা শব্দ ব্যবহার করে তারা আল্লাহ্ দাবী করে? প্রকৃতপক্ষে এসব ক্ষেত্রে শাব্দিক অর্থ গ্রহণযোগ্য নয়।

নিম্নে রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর সাহেব ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলী-এর সামান্য কয়েকটি লক্বব মোবারকের সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা বর্ণনা করা হলো। যেমন-

ইমামুল আইম্মাঃ- এর অর্থ হলো- ইমামদের ইমাম। এ সম্পর্কে অনেকে বলে থাকে যে, “ইমামুল আইম্মা” বলতে চার মায্হাবের ইমামগণেরও ইমাম। মূলতঃ এ কথা আদৌ শুদ্ধ নয়। বরং “ইমামুল আইম্মাসহ” ওলী আল্লাহ্গণের সকল লক্বব যাঁর যাঁর যামানার জন্য খাছ। কাজেই “ইমামুল আইম্মা” হলো একটি লক্বব যা ইল্মে ফিক্বাহ্ ও ইল্মে তাসাউফ উভয় শাস্ত্রেই রয়েছে। তবে ইল্মে তাসাউফের অন্যান্য লক্ববের ন্যায় ইহাও একটি লক্বব। যে বা যিনি যখন এর খাছ মাকামে উপনীত হন তখন তিনিই “ইমামুল আইম্মাা” লক্ববে ভূষিত হন। “ইমামুল আইম্মা” কোন নতুন লক্বব নয়, বরং পূর্ব থেকেই উহার ব্যবহার হয়ে আসছে। যেমন-

(১) ইমামুল আইম্মা, হযরত ইমামে আ’যম আবূ হানীফা (রঃ), (২) ইমামুল আইম্মা, হযরত শো’বা ইবনুল হাজ্জাজ আসেতী (রঃ), (৩) ইমামুল আইম্মা, শাহ্ আব্দুল আযীয মুহাদ্দিসে দেহলভী (রঃ), (৩) ইমামুল আইম্মা, হযরত ইবনে আনাস আল ইসবাহী (রঃ), (৫) ইমামুল আইম্মা, হযরত আতিয়্যাতুছ্ ছালামী (রঃ), (৬) ইমামুল আইম্মা, হযরত ইমাম মালেক (রঃ), (৭) ইমামুল আইম্মা, হযরত খাজা মুঈনুদ্দীন চীশ্তী (রঃ), (৮) ইমামুল আইম্মা, হযরত ফরীদুদ্দীন মাসউদ গঞ্জে শোকর (রঃ),  (৯) ইমামুল আইম্মা, ইমাম খোজায়মা (রঃ), (১০) ইমামুল আইম্মা, হযরত মুজাদ্দিদে আল্ফে সানী (রঃ), (১১) ইমামুল আইম্মা, আল্লামা ইমাম কোস্তালানী শাফী (রঃ), (১২) ইমামুল আইম্মা, ইমাম শাওকানী (রঃ), (১৩) ইবনে তাইমিয়া, (১৪) ইমামুল আইম্মা, আল্লামা আবূ মুহম্মদ হুসাইন বিন মাসউদ (রঃ), (১৫) ইমামুল আইম্মা, আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ূতী (রঃ), (১৬) ইমামুল আইম্মা, আল্লামা সুলায়মান ইবনে হরব (রঃ), (১৭) ইমামুল আইম্মা, হযরত ইমাম নাসাঈ (রঃ), (১৮) ইমামুল আইম্মা, আল্লামা আবূল হাশেম (রঃ), (১৯) ইমামুল আইম্মা, মুহিউদ্দীন আবূ জাকারিয়া ইয়াহিয়া (রঃ), (২০) ইমামুল আইম্মা, হুসাইন বিন মাসউদ রহমতুল্লাহি আলাইহিপ্রমুখ।(মোকাদ্দামায়ে এলাউস্ সুনান, মানাকেবে আবূ হানীফা, আত্তাকদীরুল মাদানী, এরশাদুস্ সারী শরহে বোখারী, মেরকাত শরহে মেশকাত, শরহে যুরকানী, মুঈনুল হিন্দ, আল মুগনী, মাকতুবাত শরীফ, মাওয়াহেবুল্লাদুন্নিয়া শরহে সিরাতে মুহম্মদিয়া, তাফসীরে ফতহুল ক্বাদীর, মজমুয়ায়ে ফতওয়ায়ে ইবনে তাইমিয়া, আত্ তাফসীর ওয়াল মুফাস্সিরুন, মেশকাত শরীফের আসমায়ে রেজাল, আত্ তারগীব, ফয়জুছ্ ছামায়ী আলা সুনানিন নাসাঈ, তাফসীরে সুরাতুল ফাতিহা, রিয়াজুস সালেহীন ইত্যাদি।)

ক্বাইউমুয্ যামানঃ- অনেকে এ লক্ববের সরাসরি শাব্দিক অর্থ গ্রহণ করে বলে যে, এর অর্থ হলো- যামানার রক্ষক, যা আল্লাহ্ পাক-এর শান। কাজেই উহা ব্যবহার করা নাজায়েয। পূর্বেই বলা হয়েছে যে, ইসলামে তথা কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াসে এরূপ শত-সহস্র শব্দ রয়েছে, যার সরাসরী শাব্দিক অর্থ গ্রহণ করা হয়না বা লক্ববের ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য নয় বরং অবস্থা বিশেষে ঘুরিয়ে অর্থ করতে হয়। যেমন- (صلوة) “সলাত” শব্দের অর্থ- নামায, দরূদ, রহ্মত, ক্ষমা ও তাছবীহ্ ইত্যাদি অনুরূপ ক্বাইউমুয্ যামান-এর অর্থও ঘুরিয়ে করতে হবে। আল্লাহ্ পাক-এর শানে এর অর্থ হবে রক্ষক আর ওলী আল্লাহ্গণের ক্ষেত্রে এর হাক্বীক্বী অর্থ হবে- যাঁদের উছীলায়  আল্লাহ্ পাক যামানাকে রক্ষা করেন। মহান আল্লাহ্ পাক সর্বপ্রথম “ক্বাইউমুয্ যামান” লক্বব দান করেন আফজালুল আউলিয়া, হযরত মুজাদ্দিদে আল্ফে সানী (রঃ)কে। অতঃপর উনার ছেলে হযরত ইমাম মাছুম (রঃ)কে “ক্বাইউমে সানী”, উনার ছেলে হযরতুল আল্লামা, হুজ্জাতুল্লাহ্ নক্শবন্দ (রঃ)কে “ক্বাইউমে ছালেছ”, এরপর তাঁর ছেলে হযরত আবুল উলা (রঃ)-এর ছেলে হযরত জোবায়ের (রঃ)কে “ক্বাইউমে রাবে” বা “চতুর্থ ক্বাইউম” লক্বব দান করেন। এছাড়া হযরত শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রঃ), হযরত আবূ বকর সিদ্দিকী ফুরফুরাবী (রঃ), হযরত আব্দুল হাই সিদ্দিকী ফুরফুরাবী (রঃ)ও ছিলেন ক্বাইউমুয্ যামান। (মাকতুবাত শরীফ, হালাতে মাশায়েখে নকশবন্দিয়া, রওজাতুল ক্বাইউমিয়াত ১ম, ২য়, ৩য় ও ৪র্থ খন্ড, শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্র সমকালীন রাজনীতি)

গাউসুল আ’যমঃ- ‘গাউস’ শব্দের অর্থ- ফরিয়াদ শ্রবণকারী, আশ্রয়দাতা ইত্যাদি। আর আ’যম শব্দের অর্থ- বড়, মহান ইত্যাদি। শাব্দিক অর্থেই এ লক্বব ব্যবহার নাজায়েয নয়। কারণ মানুষ স্বাভাবিকভাবেই একে অপরের ফরিয়াদ শ্রবণ করে  ও আশ্রয় দিয়ে থাকে। কাজেই এটা আদৌ নাজায়েয নয় বরং ফযীলতের কারণ। এছাড়া আল্লাহ্ পাক সর্ব প্রথম এ লক্বব মোবারক হযরত বড় পীর সাহেব (রঃ)কে দান করেন।  উনার পরে আরো অনেককেই আল্লাহ্ পাক গাউসুল আ’যম লক্বব দান করেছেন। এমন কোন বর্ণনা নেই  বা এমন কোন দলীল কেউ দেখাতে পারবে না যে, একমাত্র হযরত বড় পীর সাহেব রহমতুল্লাহি আলাইহিছাড়া অন্য কেউ গাউসুল আ’যম নন বা উক্ত লক্বব অন্য কেউ ব্যবহার করতে পারবে না। মূলতঃ ওলী আল্লাহ্গণের একটি লক্বব হচ্ছে- ‘গাউছ’। গাউছগণের মধ্যে যিনি প্রধান হন, তিনিই ‘গাউছুল আ’যম’। (মাকতুবাত শরীফ, তাযকেরাতুল আউলিয়া)

হাবীবুল্লাহ্ঃ- এর অর্থ হলো- “আল্লাহ্ পাক-এর হাবীব বা বন্ধু।” এটা হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর একটি খাছ লক্বব মোবারক। আর আল্লাহ্ পাক-এর রসূল, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামে নাম রাখার জন্য অসংখ্য হাদীস শরীফে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। যেমন, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, سموا باسمى.

অর্থঃ- “তোমরা আমার নামে নাম রাখ।” (মেশকাত শরীফ)      এ জন্যই মানুষ বরকত লাভের উদ্দেশ্যে স্বীয় সন্তানদেরকে মুহম্মদ, আহ্মদ, হাবীবুল্লাহ্ ইত্যাদি নাম রেখে থাকে। সারা বিশ্বে অসংখ্য অগণিত সাধারণ মানুষ রয়েছে যাদের নাম রাখা হয়েছে হাবীবুল্লাহ্। আর অতীতের ওলী আল্লাহ্গণের মধ্যে খাছ করে দু’জনকে আল্লাহ্ পাক হাবীবুল্লাহ্ লক্বব দান করেছেন। তাঁরা হচ্ছেন হযরত যুন্নুন মিছ্রী রহমতুল্লাহি আলাইহিও হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশ্তী (রঃ)। যাঁদের ইন্তেকালের পরে কপাল মোবারকে সোনালী অক্ষরে লেখা উঠেছিল,

هذا حبيب الله مات فى حب الله.

 (হাজা হাবীবুল্লাহ্ মাতা ফি হুব্বিল্লাহ্)

ইনি আল্লাহ্ পাক-এর হাবীব, আল্লাহ্ পাক-এর মহব্বতে ইন্তেকাল করেছেন। কাজেই হক্কানী ওলী আল্লাহ্গণকে স্বয়ং আল্লাহ্ পাকই হাবীবুল্লাহ্সহ অন্যান্য সকল লক্বব মোবারক দান করেন। (মুঈনুল হিন্দ, তাযকেরাতুল আউলিয়া।)

খলীফাতুল্লাহি ফিল র্আদঃ- এর অর্থ হলো- পৃথিবীতে আল্লাহ্ পাক-এর প্রতিনিধি। আল্লাহ্ পাক হযরত আদম (আঃ)কে সৃষ্টি করার পূর্বে বলেছিলেন,

انى جاعل فى الارض خليفة.

অর্থাৎঃ- “আমি পৃথিবীতে খলীফা প্রেরণ করতে চাই।”

এ আয়াত শরীফের ব্যাখ্যায় নির্ভরযোগ্য মুফাস্সিরীন-ই-কিরাম (রঃ)গণ বলেছেন, “আল্লাহ্ পাক প্রতিটি মানুষের মধ্যেই খলীফা হওয়ার যোগ্যতা দান করেছেন। বান্দা যদি হাক্বীক্বীভাবে আল্লাহ্ পাক-এর মতে মত ও হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পথে পথ হয়, তবেই সে খিলাফতের যোগ্যতা অর্জন করতে পারে। এ অর্থে সমস্ত ইমাম-মুজ্তাহিদ, ওলী আল্লাহ্গণই “খলীফাতুল্লাহহি ফিল আরদ।” কাজেই এ লক্বব ব্যবহার আদৌ নাজায়েয নয়। (তাফসীরে রুহুল বায়ান, রুহুল মায়ানী, মাযহারী)

রাসূলে নোমাঃ- এটা ফার্সী শব্দ। এর অর্থ হলো- রাসূলকে দেখানেওয়ালা। অর্থাৎ যিনি নিজে রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখতে পারেন ও অন্যকে দেখাতে পারেন বা যাঁর সোহবতে গেলে মানুষ হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখার সৌভাগ্য অর্জন করে তিনিই “রাসূলে নোমা।”যেমন-আল্লামা সুফী ফতেহ আলী বর্ধমানীরহমতুল্লাহি আলাইহিছিলেন ‘রসূলে নোমা’। এমন অনেক  ওলী আল্লাহ্ অতীত হয়েছেন যাঁরা “রাসূলে নোমা” লক্ববের অধিকারী ছিলেন। (তাবাকাত ২য় খন্ড, হাক্বীক্বতে মোহাম্মদী, হায়াতে বর্ধমানী)।

উপরোক্ত সংশ্লিষ্ট আলোচনায় এটাই সাবেত হলো যে, যারা রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর সাহেব ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলী-এর লক্ববের বিরোধীতা করে এবং এ বিরোধীতা করতে গিয়ে যারা তার লক্ববের সংখ্যাধিক্য ও শব্দের সরাসরি অর্থ করে মনগড়াভাবে ব্যাখ্যা করে মানুষকে গোমরাহ্ করছে তারা সবাই সুষ্পষ্ট গোমরাহীতে রয়েছে।

র ইনশাআল্লাহ্ শীঘ্রই বের হচ্ছে- পাঁচ খন্ডে লিখিত কিতাবুল আলক্বাব।

 

মুহম্মদ তাজউদ্দিন মামুন

সভাপতি- ছাত্র আঞ্জুমানে আল বাইয়্যিনাত

চট্টগ্রাম জিলা শাখা

 

সুওয়ালঃ- পাগড়ী পড়া সুন্নত কি? উত্তর দিলে কৃতার্থ হবো।

জাওয়াবঃ- হ্যাঁ, পাগড়ী পরিধান করা সুন্নত। এবং তা খাছ ও দায়েমী সুন্নতের অন্তর্ভূক্ত। কারণ আল্লাহ্ পাক-এর হাবীব, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে, তাহাজ্জুদ নামাজে, জুমুয়ার নামাজে, ঈদের নামাজে ও বিশেষ অনুষ্ঠানে পাগড়ী পরিধান করতেন। তাছাড়া ঘরের ভিতরে ও বাইরে এমনকি জিহাদের ময়দানে পাগড়ী পরিধান করার বর্ণনা হাদীস শরীফে বর্ণিত রয়েছে।

এজন্য হাদীস শরীফের সহীহ্ কিতাব তিরমিযী শরীফের হাশিয়ায় বর্ণিত হয়েছে যে,

ان لبس العمامة سنة.

অর্থঃ- “নিশ্চয়ই পাগড়ী পরিধান করা হচ্ছে সুন্নত।” এবং আরো বর্ণিত রয়েছে যে,

ان ركعتين مع العمامة افضل من سبعين ركعة بدونها.

অর্থঃ- “নিশ্চয়ই পাগড়ী পরিধান করার অসংখ্য ফযীলতের মধ্যে একটি হচ্ছে এই যে, পাগড়ী পরিধান করে দু’রাকায়াত নামাজ আদায় করা পাগড়ী ছাড়া ৭০ রাকায়াত নামাজ আদায় করার চেয়ে উত্তম।”

পাগড়ীর এ অসংখ্য গুরুত্ব ও ফযীলতের দিক বিবেচনায় হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মতদেরকেও পাগড়ী পরিধান করার জন্য নির্দেশ করতঃ এরশাদ করেন,

عليكم بالعمائم فانها سيماء الملئكة.

অর্থঃ- “তোমাদের প্রতি পাগড়ী পরিধান করা ওয়াজিব। কেননা তা ফেরেশ্তাগণের নিদর্শন স্বরূপ।”

তিনি অন্যত্র এরশাদ করেন,

فاعتموا فان العمامة سيماء الاسلام وهى الى الحاجز بين المسلمين والمشركين.

অর্থঃ- “তোমরা পাগড়ী পরিধান কর। নিশ্চয়ই পাগড়ী ইসলামের নিদর্শন এবং ইহা মুসলমান ও মুশ্রিকদের মাঝে পার্থক্যকারী।”

বর্ণিত হাদীস শরীফে পাগড়ী পরিধানের আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে কোন কোন কিতাবে পাগড়ী পরিধান করাকে ফরজ, ওয়াজিব ফতওয়া দেয়া হয়েছে।

পাগড়ীর পরিমাপ ও ধরণ সম্পর্কেও কিতাবে বর্ণিত রয়েছে। ঘরের বাইরে ও পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে সাত হাত, জুমুয়া ও ঈদের নামাজে বার হাত এবং ঘরের ভিতরে তিন হাত পাগড়ী পরিধান করা সুন্নত। হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাধারণতঃ কালো, সাদা ও সবুজ এ তিন ধরণের পাগড়ী পরিধান করতেন। এছাড়া গন্দম, খয়েরী, ছাই ইত্যাদি রং-এর পাগড়ী পরিধাণ করার বর্ণনাও হাদীস শরীফে পাওয়া যায়, তবে হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা খুব কম পড়েছেন।

পাগড়ী পরিধান করার নিয়ম

          পাগড়ীর মাথা যাকে শামলা বা শিমলা বলা হয় তা দু’টি বলে কিতাবে বর্ণিত রয়েছে¬।

(১) প্রথম বা নিচের শামলা যার পরিমাপ হবে এক বিঘত হতে এক হাতের মধ্যে এবং তা পিছন দিকে শিরদারা বরাবর থাকবে আর ইহাই উত্তম ও খাছ সুন্নতের অন্তর্ভূক্ত। কারো মতে শিমলার পরিমাপ চার আঙ্গুল। অথবা শামলা শিরদারার ডানে বা বামেও রাখতে পারে। এছাড়া ডান কাঁধ ও বাম কাঁধের উপর দিয়ে সামনের দিকে ঝুলিয়ে রাখতে পারে।

(২) দ্বিতীয় বা উপরের শামলা যার নির্দিষ্ট কোন পরিমাপ নেই। কারণ এ শামলা সাধারনতঃ পাগড়ীর প্যাচের ভিতরে গুজিয়ে রাখা হয়। তবে হ্যাঁ, মাথায় প্যাচানোর পর উক্ত শামলা যদি বেশী পরিমাণ অবশিষ্ট থাকে যা প্রথম শামলার সমান কিংবা তার চেয়ে কম তবে তা রাখার তরীকা প্রথম শামলার অনুরূপ।

দলীলসমূহ- (১) তিরমিযী, (২) শামায়েলে তিরমিযী, (৩) তোহফাতুল আহওয়াজী, (৪) মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়া, (৫) মেশকাত, (৬) মেরকাত, (৭) আশয়াতুল লুময়াত, (৮) লুময়াত, (৯) শরহুত ত্বীবী, (১০) তালীকুছ ছাবী, (১১) মুজাহেরে হক্ব, (১২) আলমগীরী, (১৩) শামী, (১৪) দুররুল মোখতার, (১৫) রদ্দুল মোহতার, (১৬) আইনুল হেদায়া, (১৭) ফতওয়ায়ে আমীনিয়া ইত্যাদি।

{বিঃ দ্রঃ অতি শীঘ্রই বিস্তারিত দলীল-আদিল্লা সাপেক্ষে পাগড়ী সম্পর্কে মাসিক আল বাইয়্যিনাতে ফতওয়া প্রদাণ করা হবে ইনশাআল্লাহ্}

 

সুওয়ালঃ- আমরা জানি, কাদেরিয়া, চিশ্তিয়া, নক্শবন্দিয়ায়ে মুজাদ্দেদিয়া ইত্যাদি হক্ব তরীকা ও সিলসিলার ন্যায় তরীকায়ে মুহম্মদিয়াও একটি। আর উক্ত তরীকাগুলির যারা ইমাম তারা সকলেই ছিলেন উঁচু দরজার ওলী এবং জামানার মুজাদ্দিদ। যাদের প্রশংসা ও মর্যাদার কথা বলার অপেক্ষা রাখেনা। কিন্তু আহমদ রেযা খান সাহেব তার কিতাবাদিতে লিখেছে যে, হযরত সাইয়্যিদ আহ্মদ শহীদ বেরেলভী (রঃ) নাকি ওহাবী ও কাফির ছিলেন। (নাউযুবিল্লাহ্) এমনিভাবে তাঁর নামে আরো জঘণ্য ধরণের কটুক্তি করেছে।

          এছাড়া সে ও তার অনুসারীরা আরো বলে থাকে যে, তিনি নাকি খৃষ্টানদের পক্ষ হয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন। প্রকৃতপক্ষে তিনি কোন জিহাদই করেননি। বরং তিনি ওহাবী ছিলেন তাই ওহাবীদের প্রচারের জন্য আন্দোলন করেছেন।

          তাঁর বিরোধীতা করার পিছনে দলীল দিয়ে থাকে যে, ইসমাইল শহীদ সাহেবের লিখিত কিতাব “তাকভিয়াতুল ঈমান ও সীরাতুল মুস্তাকিম।” এছাড়াও অন্যান্য ইতিহাস এবং জীবনী থেকেও দলীল পেশ করে থাকে।

          এখন আমাদের সুওয়াল হলো- উক্ত বক্তব্য সঠিক কিনা? আর হযরত সাইয়্যিদ আহ্মদ শহীদ (রঃ)-এর লিখিত কোন কিতাব আছে কি-না? এবং তাতে কোন কুফরী বক্তব্য আছে কি-না? দয়া করে দলীল-আদিল্লার দ্বারা জবাব দিয়ে আমাদের ঈমান হিফাযতে সাহায্য করবেন।

জাওয়াবঃ  সত্যের সওগাত, হক্বের ঝান্ডা বুলন্দকারী, অসত্য, বদদ্বীন ও বাতিলের কক্তরোধকারী মাসিক আল বাইয়্যিনাত পত্রিকায় দীর্ঘ দিন থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দির মুজাদ্দিদ ও মুজাহিদে মিল্লাত মুজাহিদে আজম, খলীফাতুল্লাহ্ আমিরুল মু’মিনীন সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ) ও তাঁর তরিকায়ে মুহম্মদীয়া সম্পর্কে এই ধরণের একটি সুওয়াল আমাদের সুওয়াল-জাওয়াব বিভাগে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে যেমন, মাদ্রাসা, খানকা, অফিস-আদালত হতে আসছে এবং আমাদেরকে বারবার বিশেষ অনুরোধ করা হচ্ছে যাতে আমরা সত্য প্রকাশে কুক্তাবোধ না করি এবং নির্ভরযোগ্য দলীল-আদিল্লাহ্সহ এর যথাযথ, সঠিক ও নির্ভুল জাওয়াব দিতে বাধ্য হই।

          হযরত সাইয়্যিদ আহমদ বেরেলভী (রঃ)কে কেউ ওহাবী, কাফির, ইংরেজদের দালাল, মুসলমানদের বিপক্ষ অবলম্বনকারী, আব্দুল ওহ্হাব নজদীর শিষ্য, ওহাবী মতবাদ প্রচারকারী ইত্যাদি ইত্যাদি বলছে। সত্যিকার অর্থে তিনি কি ওহাবী, কাফির ছিলেন? ইংরেজদের থেকে উৎকোচ গ্রহণ করে মুসলমানদের বিপক্ষ অবলম্বন করেছেন এবং তার কোন লিখিত কিতাব আছে কি ও তাতে আপত্তিকর কুফরীমূলক বক্তব্য পরিলক্ষিত হয় কি-না?

          এর জবাবে আমরা বলি এই উপমহাদেশের কেবলমাত্র একটি সংখ্যালঘু জামায়াত, গুটি কতক ইউরোপীয় খৃষ্টান লেখক এবং কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ ও তাসাউফের ইল্মে অন্তসারশুন্য কিছু সাধারণ মানুষ ব্যতীত আর কেউই এ কথায় বিশ্বাসী নয়।

          আমরা আশ্চর্য ও বিস্মিত হয়ে যাই, এই সংখ্যালঘু জামায়াতের প্রধান মুসলমানদের মধ্যে আলা হযরত নামধারী আহমদ রেযা খান সাহেব ও তার অনুসারীরা দীর্ঘ প্রায় সোয়া’শ বছর ধরে হযরত সাইয়্যিদ আহ্মদ শহীদ বেরেলভী (রঃ) ও তাঁর অনুসারীদেরকে ওহাবী, কাফির ফতওয়া দিয়ে যাচ্ছে।

          এখানে প্রথমেই উল্লেখ্য যে, আহমদ রেযা খান সাহেব কোন যোগ্যতাধারী ব্যক্তিত্ব যে, উনি হযরত সাইয়্যিদ আহমদ বেরেলভী (রঃ)কে নাহক্ব বলতে পারেন?

          আর আহমদ রেযা খান সাহেব কাউকে হক্ব বললেই তিনি হক্ব আর না হক্ব বললেই না হক্ব সেটা কুরআন-সুন্নাহ্র কোথায় আছে?

          উপরন্ত আরো প্রশ্ন যে, আহমদ রেযা খান সাহেব নিজেই যে হক্ব তারই বা দলীল কুরআন-সুন্নাহ্ কোথায় আছে?

          অথচ আহ্লে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের সকল আলেম, ফাযেল, মুফাস্সির, মুহাদ্দিস, ফক্বীহ, সূফী, দরবেশ ও সাধারন মানুষ সকলেই হযরত সাইয়্যিদ আহমদ বেরেলভী (রঃ)-এর ইমামত, খিলাফত, ইল্ম, আমল-আখলাক, তাকওয়া-পরহেযগারী ও তাঁর ত্বরিকার প্রতি নির্দ্বিধায় এখনও এক বাক্যে সম্মান প্রদর্শন করে যাচ্ছে ও তাঁর ত্বরিকায় দাখিল হচ্ছে। ত্রিশ লক্ষের অধিক যার মুরীদের সংখ্যা, চল্লিশ হাজার বিধর্মী যার হাতে মুসলমান হয়েছে, মক্কা শরীফ, মদীনা শরীফ, মিশর, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ভারত, বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যার খলীফার সংখ্যা হাজার হাজার, লক্ষাধিক জ্বীন ও রেযালুল গায়েব যার আনুগত্য করতো, শত সহস্র আলেম, ফাযেল, গাউস, কুতুব, আবদাল, নজীব যার সিলসিলা থেকে কামালিয়ত হাছিল করেছেন, যিনি ত্রয়োদশ শতাব্দীর ঝিমিয়ে পড়া ও নূয়ে পড়া দ্বীনকে পূনরুজ্জীবিত  করেছেন, জমিন থেকে র্শিক, বিদ্য়াত, কূফরী দুর করে দ্বীনের মজবুত খুঁটি গেড়েছেন, যাঁর দ্বারা বন্ধ হয়ে যাওয়া বহু মসজিদ, খানকা, জুমুয়া, জামায়াত, কুরবানী, তারাবীহ্ চালু হয়েছিল।

          বহু কামিল মুর্শিদগণ খলীফাসহ নিজস্ব খানকা শরীফ ত্যাগ করে যার হাতে বাইয়াত হয়েছেন, যিনি হুজুর পাক সালাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সুন্নতকে সঠিকভাবে আঁকড়ে ধরে রেখেছিলেন। উপমহাদেশের মশহুর ত্বরিকাগুলো যেমন, কাদেরীয়া, চিশ্তিয়া, নকশ্বন্দীয়া, মুজাদ্দেদীয়া, সোহ্রাওয়ার্দীয়া তরীকার ভক্ত ও সালেকগণ যাঁর তরিকা ও সিলসিলার অন্তর্ভূক্ত, এমনকি হিংসুক ও তাঁর বিরুদ্ধে ওহাবী, কাফির ফতওয়া লেপনকারী বিরুদ্ধবাদীরা ও তাদের পূর্বপুরুষরা যাঁর ত্বরিকা থেকে ফায়দা হাছিল করে যাচ্ছে। যদিওবা তারা প্রকাশ্যে এ কথা স্বীকার করতে নারাজ। এখন তিনি যদি কাফির হন তবে জমিনে মুসলমান কে? আমিরুল মু’মিনীন সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ) ও তাঁর খলিফা এবং অনুসারীদের দ্বারা অত্র এলাকায় দ্বীন ইসলামের যে খিদমত ও উপকার সাধিত হয়েছে তাঁর শত সহস্র ভাগের এক ভাগও কি এই রেযা খানীদের দ্বারা হয়েছে? যেমন, হযরত সাইয়্যিদ আহমদ রেরেলভী (রঃ)-এর আকাবির খলিফাদের মধ্যে ইমামুল হুদা হযরত মাওলানা আব্দুল হাই (রঃ) (ইনি হযরত শাহ্ আব্দুল আজীয মুহাদ্দিস দেহলবী (রঃ)-এর জামাতা ছিলেন) হযরত মাওলানা বেলায়েত আলী আযিমাবাদী (রঃ), হযরত মাওলানা মুহম্মদ রামপুরী (রঃ), হযরত খোদা বখ্স (রঃ) (মিরাট), হযরত মাওলানা ইয়াকুব (রঃ) (দিল্লী), হযরত মাওলানা ইসহাক (রঃ) (দিল্লী), হযরত মাওলানা মুরতাযা খাঁ রামপুরী  (রঃ) (উত্তর প্রদেশ), হযরত মাওলানা আব্দুল হাকিম (রঃ) (বোম্বে), হযরত মাওলানা আব্দুল্লাহ্ (রঃ) (বেনারস), হযরত সাইয়্যিদ কাসেম সাহেব নাছিরাবাদী (রঃ) (অযোধ্যা), হযরত মাওলানা শিহাবুদ্দীন বাটালবী (রঃ) (পাঞ্জাব), হযরত মাওলানা আব্দুল কুদ্দুস (রঃ) (কাশ্মীর), হযরত মাওলানা মিয়াঁ ফজল (রঃ) (শিয়াল কোর্ট পাকিস্তান), হযরত মাওলানা মুহম্মদ আজিম (রঃ) (পেশওয়ার আফগানিস্তান), হযরত মাওলানা আব্দুল্লাহ্ (রঃ) (গজনী, আফগানিস্তান), হযরত মিয়াজী নূর মুহম্মদ (রঃ) (ইনি হযরত খাজা হাজী এমদাদুল্লাহ্ মুহাজেরে মক্কী (রঃ)-এর পীর সাহেব), হযরত কাজী ইউসুফ মুরকী (রঃ) (মহারাষ্ট্র), হযরত মাওলানা মির আহমদ আলী সাহেব (রঃ) (মাদ্রাজ), হযরত সাইয়্যিদ মুহম্মদ হামজা (রঃ) (বার্মা), হযরত মাওলানা সাইয়্যিদ মুহম্মদ হুসাইন (রঃ) (উত্তর প্রদেশ), হযরত মাওলানা চিশ্তী (রঃ) (কান্দলা), হযরত মাওলানা হায়দার আলী (রঃ) (হুশিয়ারপুর), হযরত মাওলানা সূজাত আলী (রঃ) (আজিমাবাদ),

          হযরত মাওলানা আব্দুর রহীম বেলায়েতি (রঃ) (ইনি হাজী এমদাদুল্লাহ্ মুহাজেরে মক্কী (রঃ)-এর দাদা পীর সাহেব ছিলেন), হযরত মাওলানা সাইয়্যিদ আওলাদ হাসান (রঃ) (কান্নোজ), হযরত মাওলানা সাইয়্যিদ নেসার আলী ওরফে তিতুমীর (রঃ) (পশ্চিম বঙ্গ), হযরত হাফেজ মাওলানা জামালুদ্দীন (রঃ) (পশ্চিম বঙ্গ), হযরত নিযামুদ্দীন (রঃ) (দিল্লী), হযরত মাওলানা ইকরামুদ্দীন (রঃ) (দিল্লী), হযরত মাওলানা ইমামুদ্দীন (রঃ) (বাংলাদেশ), হযরত মাওলানা রমিজুদ্দীন (রঃ) (বাংলাদেশ), হযরত মাওলানা শাহ্ সূফী নূর মুহম্মদ নিযামপূরী (রঃ) (বাংলাদেশ), হযরত মাওলানা শায়খুল উলামা শায়খ মুস্তফা মিরদাদ (রঃ) (ইনি মক্কা শরীফের হানাফী মুসাল্লার ইমাম ছিলেন), হযরতুল আল্লামা খাজা আল মাস (রঃ) (ইনি পবিত্র মদীনা শরীফের গাউস ও প্রধান ওলী ছিলেন), হযরত শামসুদ্দীন শায়খ আতা মিসরী (রঃ) (ইনি মিশরের বুজুর্গ ছিলেন), হযরত সাইয়্যিদ হামজা (রঃ) ও হযরত সাইয়্যিদ আকিল (রঃ) (মক্কা শরীফ) এই দুই বুজুর্গ কাশ্ফ ও ইলহাম যোগে তাঁর কামালত বেলায়েতের দরজা অবগত হয়ে তাঁর নিকট বাইয়াত হয়েছেন), হযরত শাইখুল আল্লামা শায়খ মুহম্মদ আলী হিন্দী (রঃ) (এই মহান ওলী বাইতুল্লাহ্ শরীফের মুর্দারেছ ছিলেন), হাফেজ মাগরিবী শায়খ আহমদ বিন ইদরীস (রঃ) (ইনি মাগরীব দেশের সুলতানের উজির ছিলেন এবং সহীহ্ বুখারী শরীফও তাঁর হিফ্জ ছিলো), হযরত শায়খ ওমর বিন আব্দুর রসূল (রঃ) (প্রসিদ্ধ ওলী ও হানাফী মুহাদ্দিস), হযরত শায়খ বোখরামী (রঃ) (ইনি মদীনা শরীফে মুর্দারিস ছিলেন), ক্বাজিউল কুজাত হযরত মাওলানা ফজলুর রহমান (রঃ)(কলিকাতা), কাজী মাওলানা আব্দুল বারী (রঃ) (কলিকাতা), হযরত শাহ্ আহমদ (রঃ) (ইউপি) আরও অন্যান্য খলীফা যারা তৎকালে আরব আজমের বিভিন্ন মূলকে ছড়িয়ে পড়েছিলেন দ্বীনের দাওয়াত দেয়ার জন্য। তাঁরা গাফেল ও অলস জাতিকে জাগ্রত করেছেন। দ্বীন ইসলামের মাঝে পুঞ্জীভূত বিদ্য়াত, বেশরাকে বিদূরীত করে তারা হক্ব-মত পথকে নতুন করে সঞ্জীবিত করেছেন। মানুষকে দ্বীনের সহীহ্ বুঝ দিতে গিয়ে তারা যারপর নেই কষ্ট ও তাক্লীফ বরদাশ্ত করেছেন। পরবর্তীতে তাঁরই খলীফা ও অনুসারী হযরত শাহ্ নূর মুহম্মদ নিযামপূরী (রঃ), কুতুবুল ইরশাদ সূফী ফতেহ আলী বর্ধমানী (রঃ), হযরত ইকরামুল হক মুর্শিদাবাদী (রঃ), মুহিয়্যূস্সুন্নাহ্, মুজাদ্দিদুয্যামান, হযরত আবূ বকর সিদ্দীকী ফুরফুরাবী (রঃ), হাফেজে হাদীস আল্লামা রুহুল আমীন (রঃ), হযরত মাওলানা নেছারুদ্দীন (রঃ), হযরত আল্লামা সূফী তোজাম্মেল হোসেন (রঃ), হযরত আব্দুল হাই সিদ্দীকী ফুরফুরাবী (রঃ), হযরত নাজমুস সা’দাত সিদ্দীকী ফুরফুরাবী (রঃ), হযরত শায়খ বোরহানুদ্দীন (রঃ), হযরত সূফী সদরুদ্দীন (রঃ), হযরত আব্দুল খালেক (রঃ), ঢাকা আলীয়া মাদ্রাসার মুফাস্সির হযরত শাইখুল আল্লাম, হযরত মাওলানা ওয়াজিহুল্লাহ্ নানুপুরী (রঃ) ও তাঁর একমাত্র সুযোগ্য ও প্রধান খলীফা পঞ্চদশ শতাব্দীর মুজাদ্দিদ, ইমামুল আইম্মা, মুহিয়্যূস্সুন্নাহ্, কুতুবুল আলম, মুজাদ্দিদুয্যামান, ঢাকা, রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর সাহেব ক্বিবলা মুদ্দাজিল্লুহুল আলী-এর রুহানী ফয়েজ, তাঁর কলমী জিহাদ, লিখনী, ওয়াজ-নসিহত দ্বারা উম্মতে মুহম্মদী আজ যে ফায়দা ও উপকার পাচ্ছে তা-কি রেযাখানীদের দ্বারা পাচ্ছে?

          বর্তমানে একমাত্র রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর সাহেব ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলী  দ্বীনের যে হাক্বীকী দাওয়াত ও তাজদীদের ডাক দিচ্ছেন, তাতে বিদ্য়াতী, দুনিয়াদার আলেম ও সরকার পোষ্য বেতনভোগী মাওলানাদের পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাচ্ছে।  হযরত পীর সাহেব ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলী-এর মাধ্যমে দ্বীনের ডাক আজ বাংলার আনাচে-কানাচে, গ্রামে-গঞ্জে, শহরে এমনকি বহিঃ বিশ্বের বিভিন্ন মহাদেশে বিদ্যুতের ন্যায় ছড়িয়ে যাচ্ছে। এটা তো এমন যেমন মেঘে ঢাকা কুয়াশাচ্ছন্ন আকাশ থেকে একটা দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত  হবার পর আবার সূর্য তার  আলো ছড়িয়ে দেয়ার জন্য পূর্ব আকাশে উদিত হয়েছে। রেযা খান সাহেব ও তার অনুসারীদের মতে তারাও ওহাবী ও কাফিরদের মধ্যে গণ্য। কেননা সে বলেছে, তাঁকে যারা ওহাবী বা কাফির না জানবে তারাও কাফির। (নাউযুবিল্লাহ্)

          এখন প্রশ্ন হচ্ছে- ত্রয়োদশ শতাব্দী হতে বিশেষ করে ১৮৩১ সালে বালা কোটের জিহাদের পর হতে আজ প্রায় পৌঁনে দু’শো বছর হতে চললো। এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে উপমহাদেশে হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী(রঃ)-এর সিলসিলায় যে সমস্ত আলেম, ফাযেল, গাউস, কুতুব-দরবেশ এসেছেন তাঁরা কি সবাই কাফিরের ঘরে জন্মগ্রহণ করেছেন? এবং মক্কা শরীফ, মদীনা শরীফ, মিসর, আফ্রিকাসহ বিশ্বের যে সমস্ত এলাকায় তাঁর সিলসিলাভুক্ত অনুসারীরা ছড়িয়ে আছেন তাঁরাও  কি সবাই কাফির ছিলেন? বিদ্য়াতিদের এ উদ্ভট যুক্তি কোন ঈমানদার মুসলমান স্বীকার করে নিবে কি?

          মায়াজাল্লাহু আসতাগ্ফিরুল্লাহ্! কত বড় ধৃষ্টতা ও দুঃসাহস থাকলে এ ধরণের কথা বলা সম্ভব?

          “ঈমানদার ও কামিল মুসলমানদের কষ্ট দেয়া ও কাফির বলা যে কত জঘণ্য ও অমার্জনীয় অপরাধ এই  রেযা খানীর জামায়াত কি তা ভুলে গেছে? কথিত আলা হযরত সাহেব এই সম্পর্কে কি আল্লাহ্ পাক-এর ধমকীসূলভ ও ভীতিমূলক আয়াত ও হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদীস শরীফ শ্রবণ করেনি?

          এই সম্পর্কে আল্লাহ্ পাক কালামুল্লাহ্ শরীফে এরশাদ করেন,

والذين يؤذون المؤمنين والمؤمنت بغير ما اكتسبوا فقد احتملوا بهتانا و اثما مبينا.

অর্থঃ- “যারা বিনা অপরাধে মু’মিন পুরুষ ও মু’মিন নারীদের কষ্ট দেয়, তারা মিথ্যা অপবাদ ও প্রকাশ্যে পাপের বোঝা বহণ করে।” (সূরা আহযাব/৫৮)

          অন্যত্র আল্লাহ্ পাক বলেন,

ومن يكسب خطيئة او اثما ثم يرم به بريئا فقد احتمل بهتانا و اثما مبينا.

অর্থঃ- “যে ব্যক্তি ভুল বা গুণাহ্ করে অতঃপর কোন নিরপরাধের উপর অপবাদ আরোপ করে, সে নিজের মাথায় বহণ করে জঘন্য মিথ্যা ও প্রকাশ্য গুণাহ্। (সূরা আন নিসা/১১২)

           হাদীস শরীফে আছে,

وعن ابى ذر قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم لايرمى رجل رجلا بالفسوق ولايرميه بالكفر الا ارتدت عليه ان لم يكن صاحبه كذلك.

অর্থঃ- হযরত আবূ যর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “কোন  ব্যক্তি অপর ব্যক্তিকে ফাসিক বলবে না এবং কুফরীর অপবাদও দিবে না। কেননা সেই ব্যক্তি প্রকৃত পক্ষে সেরূপ না হলে তবে তার অপবাদ নিজের উপরই বর্তাবে।” (বুখারী)

          অন্য হাদীস শরীফে আছে,

وعن ابى ذر قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم من دعا رجلا بالكفر او قال عدو الله وليس كذلك الا حار عليه.

অর্থঃ- হযরত আবূ যার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি কাউকে কাফির বলে ডাকে অথবা আল্লাহ্ পাক-এর দুশমন বলে অথচ যাকে বলা হয়েছে সে তা নয় তখন উক্ত বাক্যটি তার নিজের উপরই প্রত্যাবর্তন করবে।” (বুখারী, মুসলিম)

          ফিক্বাহ্র বিখ্যাত কিতাব “বাহরুর রায়েকে” উল্লেখ আছে, “যে ব্যক্তি কোন আলেম কিংবা ফক্বীহ্কে বিনা কারণে গালি দেয় তার উপর কুফরের আশংকা করা হবে।”

          “মাজমাউল আনহারে” কিতাবে লিখিত আছে, “যে ব্যক্তি কোন আলেমকে ইন্কার করে তার কাফির হওয়ার ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই।”

          এখন উপরোল্লিখিত আয়াত শরীফ ও হাদীস শরীফ দ্বারা এবং ফিক্বাহ্র বিশুদ্ধ কিতাব দ্বারা বুঝা গেল বিনা কারণে কোন মুসলমানকে কাফির বললে তা নিজের উপর বর্তায়। রেযা খানীগণ কি এই শক্ত মজবুত দলীল থেকে ছল-চাতুরী করে পালিয়ে যেতে পারবে? সম্ভবতঃ রেযা খান সাহেব অন্য মনস্ক হয়ে বহু সময় ব্যয় করে অযথা কিতাবের সংখ্যা বৃদ্ধি করেছে। মুসলমান হক্কানী-রব্বানী আলেম সমাজকে কাফির ফতওয়া দেয়া তার স্বভাবে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। আশেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দাবীদার আলা হযরত সাহেব হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মকবুল উম্মতদের উপর কুফরীর ফতওয়া দিয়ে নিজে কামিল ঈমানদার সাজতে চাচ্ছে? এই রেযা খান সাহেব ভুলে গেছে  যে, অপরের জন্য গর্ত খুড়লে সে গর্তে নিজেকেই পড়তে হয়।

          হযরত শহীদে আযম (রঃ)-এর উপর কুফরী ফতওয়া দিয়ে সে যে অমার্জনীয় অপরাধ ও ত্রুটি করেছে তা কস্মিনকালেও ক্ষমার যোগ্য নয়।  সে ও তার অনুসারীদের দ্বারা লিখিত কিতাবাদি থেকেও আলেমগণ র্শিক ও কুফরীমূলক বাক্য উদ্ঘাটন করেছে, তা-কি তারা একেবারে ভুলতে বসেছে?

          তাদের লিখিত কিতাবাদি যেমন, হাদায়েকে বখশীস, নুগমাতুর রূহ, মাল ফুজাতে আলা হযরত, হাফতে আকতাব, আল জুন্নাতু লি আহ্লিস সুন্নাহ্, হায়াতে আহম্মদ রেযা খান, ফতওয়ায়ে রিজভীয়া, ফাওয়াদে ফরীদিয়া, জামেউল ফতওয়া, আনোয়ারে শরীয়ত, মাদায়েহ আলা হযরত, তাযকেরায়ে গাউসিয়া, ইরফানে শরীয়ত, মাকাবীসুল মাজালিশ, আনোয়ারে সাতেয়া, ওসায়া ইত্যাদি কিতাবগুলো পড়ে তাদের যে ঈমান আক্বীদার চিত্র পরিস্কার ভাবে ধরা পড়ে তা হচ্ছে- রেযা খানের তাযীম করা হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর তাযীম করার মত। (নাউযুবিল্লাহ্)

          তার পীর ভাইয়ের কবরের খুশবু হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর রওজা শরীফের খুশবুর সমান।(নাউযুবিল্লাহ্)

          হাশরের ময়দানে রেযা খান আল্লাহ্ পাক-এর আরশের একমাত্র ছায়া এবং হাউজে কাওসারের অধিকারী। কবরে মুনকির-নকির এসে যখন জিজ্ঞাসা করবে তুমি কার হও? (অর্থাৎ তোমার রব ও রাসূল কে?) তখন আদবের সাথে মাথা নত করে আহমদ রেযা খানের নাম নিবে। আল্লাহ্ পাককে হাজির-নাজির মানা বেদ্বীনি, বদ্দ্বীনি। সকল জায়গায় তার উপস্থিতি বেদ্বীনি, হযরত আম্বিয়া-ই-কিরাম (আঃ) হাজির-নাজির, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ্ পাক-এর জাতের নূর থেকে তৈরী, তিনি যেমার সময় হাজির হয়ে থাকেন। (নাউযুবিল্লাহ্)

          “নূগমাতুর রূহ” কিতাবে তার এক সাগরিদ বলেছে যে, “তোমার আমার সকলের খোদা আহম্মদ রেযা খান।” (নাউযুবিল্লাহ্) হযরত জিব্রাঈল (আঃ) সমস্ত ফেরেশ্তাদের পীর, খোদা নবীর মনসা। হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পর যদি কেউ নবী হতো তবে কাজী মুহম্মদ আকীল নবী হতো।” (নাউযুবিল্লাহ্)

          মুত্যুর কিছু সময় আগে আহম্মদ রেযা খান সাহেব বলেছে, “আমার মাযহাব, দ্বীনকে শক্ত ও মজবুতভাবে ধরে রাখা সকল ফরজের চেয়ে অধিক ফরজ।” নিজের ফাতেহা সম্পর্কে আহমদ রেযা খান সাহেব বলেন, “আমার মৃত্যুর পর সপ্তাহে দু’তিনবার নিম্নে বর্ণিত বস্তুসমূহ আমার কবরের নিকট ফাতেহার জন্য প্রেরণ করবে- গৃহ নির্মিত আইসক্রীম, মোরগের বিরিয়ানী, মোরগের পোলাও, শামী কাবাব, পরোটা, মাহাত, ফির্নি, ডাল-গোশ্তের খিচুরী, ফলের রস, ডালিমের রস, সোডার বোতল ইত্যাদি ইত্যাদি।” আহম্মদ রেযা সাহেবের অনুসারীরা তার উপর দরুদ শরীফ পড়া ওয়াজিব ধরে নিয়েছে, তাকে কেউ নবী, কেউ খোদার আসনে বসিয়েছে। তাদের মতে, মক্কা শরীফ ও মদীনা শরীফের আলেমগণ কাফির।

          মুরীদের মৃত্যুর পর পীরেরা কবরে এসে তাদের সুওয়াল-জাওয়াবের উত্তর দিয়ে থাকে; কিন্তু ভন্ড পীরগণও কি এ ক্ষমতা রাখে? তাদের ধারণা তারা ব্যতীত আর সকলেই কাফির।

          বলার অপক্ষো রাখেনা যে, এগুলো শিয়া আক্বীদার ন্যায়। কেননা, শিয়ারা হযরত আলী (রাঃ)-এর প্রতি মুহব্বত দেখাতে গিয়ে প্রথম দু’খলীফাকে গাল-মন্দ করে থাকে। তাদের ধারণা হযরত আলী (রাঃ)-এর মর্যাদা নবী-রাসূল(আঃ)গণেরও উর্ধ্বে ইত্যাদি ইত্যাদি। (নাউযুবিল্লাহ্) আর এই সমস্ত বিভ্রান্তি ও আপত্তিকর কথা-বার্তা তো ঐ সমস্ত ব্যক্তিরাই বলে, যারা জ্ঞানশুণ্য হয়ে কলম চালায়। ফলে বাধ্য হয়ে রেযা খানীদেরকে আলেমগণ শিয়া, রাফেজী, কাদিয়ানী, গোমরাহ্ ফিরকা বলে সাব্যস্ত করে থাকে।

          আমীরে মুজাহিদে আযম (রঃ)-এর প্রতি রেযা খান সাহেব একবার কুফরীর ফতওয়া দেয়ায় আজ শত সহস্র কুফরীর ফতওয়া তার ও তার অনুসারীদের উপর ঝুলছে। মূলতঃ আল্লাহ্ পাক-এর রাস্তায় যাদের পায়ে একটি কাটাও ফুটেনি, জিহাদের ময়দানে যারা হাজিরাই দেয়নি, ইসলামের সত্যিকার খিদমত করতে গিয়ে যাদের শরীর থেকে এক ফোটা ঘাম ও রক্ত ঝরেনি তাদের পক্ষেই হযরত সাইয়্যিদ আহমদ বেরেলভী (রঃ)কে কাফির বলা সম্ভব।

          এবার আমরা আহ্লে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের আকাবিরে দ্বীন, হক্বানী-রব্বানী আলেমদের দ্বারা লিখিত নির্ভরযোগ্য ও মশহুর কিতাব দ্বারা ত্রয়োদশ শতাব্দীর মুজাদ্দিদ হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরলভী (রঃ)-এর সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরবো যাতে মানুষ তাঁর সত্যিকার হাক্বীক্বী পরিচয় পায় এবং বিদ্য়াতী, গোমরাহ্, অসৎ লোকদের সংসর্গ থেকে দূরে থেকে ঈমান হিফাজত করতে পারে।

          হযরত সাইয়্যিদ আহ্মদ শহীদ বেরেলভী (রঃ)-এর জন্ম মোবারক

সাইয়্যিদুল আওলিয়া, দলিলুল আরেফিন, মাখজানে মারিফাত, রুহুল হাক্কে, সিরাজুল উম্মত, আসাদুল্লাহ্, সাহিবুল আসরার, সাইয়্যিদুল আবেদীন, মুহিয়্যূস্সুন্নাহ্, দাফিউল বিদ্য়াত, মুজাদ্দিদে মিল্লাত, খলিফাতুল্লাহ্ ফিল আরদ, আমিরুল মু’মিনীন, আওলাদে রাসূল, হযরত সাইয়্যিদ আহ্মদ শহীদ বেরলভী (রঃ) ১২০১ হিজরী শতকের সফর মাসে ইংরেজী ১৭৮৬ সালের ২৯ নভেম্বর সোমবার ভারতের উত্তর প্রদেশের রায় বেরেলী শহরের বিখ্যাত সম্ভ্রান্ত সাইয়্যিদ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

নসবনামা

তাঁর নসব নামা সম্পর্কে “মাখজানে আহম্মদী” কিতাবের ৭১২ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে এভাবে … সাইয়্যিদ আহমদ বিন সাইয়্যিদ মুহম্মদ ইরফান বিন সাইয়্যিদ মুহম্মদ নূর বিন সাইয়্যিদ হুদা বিন সাইয়্যিদ বিন সাইয়্যিদ মুহম্মদ ইলমুল্লাহ্ বিন সাইয়্যিদ মুহম্মদ ফুযাইল বিন সাইয়্যিদ মুহম্মদ মুয়াজ্জিম বিন সাইয়্যিদ আহম্মদ বিন কাজী সাইয়্যিদ মুহম্মদ বিন সাইয়্যিদ আলাউদ্দিন বিন সাইয়্যিদ কুতুবুদ্দীন মুহম্মদ সানী বিন সাইয়্যিদ মুহম্মদ সানী ছদরুদ্দীন বিন সাইয়্যিদ যইনুদ্দীন বিন সাইয়্যিদ আহম্মদ বিন সাইয়্যিদ আলী বিন সাইয়্যিদ  কিয়ামুদ্দীন বিন সাইয়্যিদ সদরুদ্দীন বিন সাইয়্যিদ কাজী রুকুনুদ্দীন বিন সাইয়্যিদ আমীর নিযামুদ্দীন আমীর সাইয়্যিদ কুতুবুদ্দীন মুহম্মদ আল হাসানী  ওয়াল হুসাইনী আল মাদানী আল কাড়দী বিন সাইয়্যিদ রশীদুদ্দীন আহমদ মাদানী বিন সাইয়্যিদ ইউসুফ বিন সাইয়্যিদ ঈসা বিন সাইয়্যিদ হাসান বিন সাইয়্যিদ আবুল হাসান আলী বিন আবি জাফর মুহম্মদ বিন কাশিম বিন আবি মুহম্মদ আব্দুল্লাহ্ বিন সাইয়্যিদ হাসান আওরাজুল জাওয়াদ নাকিব কুফা বিন সাইয়্যিদ মুহম্মদ সানি বিন আবি মুহম্মদ সাহিবুন নাফসে যাকিয়া বিন আব্দুল্লাহ্ মাহদ বিন হাসান মুসান্না বিন ইমাম হাসান বিন  আমিরুল মু’মিনীন সাইয়্যিদিনা হযরত আলী (রাঃ)।

          হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ)-এর পিতার নাম সাইয়্যিদ মুহম্মদ ইরফান (রঃ) এবং দাদার নাম সাইয়্যিদ মুহম্মদ নূর (রঃ)। তাঁর চতুর্থ পূর্ব পুরুষ সাইয়্যিদ মুহম্মদ ইলমুল্লাহ্ (রঃ), হযরত মুজাদ্দিদে আল্ফে সানী (রঃ)-এর প্রধান খলীফা হযরত শায়খ আদম বিননূরী (রঃ)-এর আকাবিরে খলিফাদের মধ্যে গণ্য।

মাতৃগর্ভেই বিলায়েতের পূর্বাভাস

তাজকেরা নামক কিতাবে বর্ণিত আছে, হযরত সাইয়্যিদ শহীদ আহমদ (রঃ) মাতৃগর্ভে থাকাকালীন সময় একদিন তার পবিত্র মাতা সাহেবানী (রঃ) স্বপ্ন দেখেন, তার রক্ত দ্বারা এক খন্ড কাগজে কিছু লিখা হলো এবং পরক্ষণেই উক্ত কাগজখন্ড সারা পৃথিবীতে উড়তে লাগলো।” তিনি জাগ্রত হয়ে এ স্বপে¦র ব্যাখ্যা তাঁর জামাতা সাইয়্যিদ আব্দুস সুবহান (রঃ)-এর নিকট জিজ্ঞাসা করেন, তিনি বলেন- আপনার গর্ভস্থ সন্তানটি ভূমিষ্ট হয়ে কালক্রমে সারা পৃথিবীতে প্রসিদ্ধি লাভ করবেন এবং উচ্চ মর্যাদার অধিকারী হবেন। মূলতঃ এ ধরণের বহু ঘটনা আউলিয়া-ই-কিরাম (রঃ)-এর জীবনীতে উল্লেখ আছে যে তাঁরা মাতৃগর্ভ থেকেই বিলায়েতের সুধা পান করে থাকেন।

          “সাওয়ানেহ আহমদী, মাখজানে আহ্মদী, সীরতে সাইয়্যিদে আহ্মদ শহীদ, তারিখে মাশায়েখে চিশ্ত, যব ঈমান কি বাহার আই” গ্রন্থে লিখা আছে, চার বৎসর বয়সে তাঁকে মক্তবে পাঠানো হয়। মক্তবের পাঠ শেষ করার পর পরিণত বয়সে তিনি হযরত শাহ ইসহাক দেহলভী (রঃ)-এর নিকট তা’লিম নিয়ে কাফিয়া ও মেশকাত শরীফ পর্যন্ত পড়েছিলেন। এ সম্পর্কে ‘আমিরুর রেওয়াত’ গ্রন্থে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, হযরত নূর মুহম্মদ মিয়াজী ঝানঝানবী (রঃ) বলেন, আমি শাহ ইসহাক (রঃ) এর নিকট কাফিয়া পড়তে ছিলাম। আর হযরত সাইয়্যিদ সাহেব (রঃ) যখন তাশরীফ আনেন তখন তিনি তাঁর নিকট মিজান পড়া আরম্ভ করেন। তার পড়া-লিখা এত দ্রুত উন্নতি লাভ করলো যে, তিনি মিযানের অর্ধাংশ পড়ার পূর্বেই আমার সাথে কাফিয়ার মধ্যে যোগ দিলেন। আর কাফিয়া পড়া অবস্থায় তিনি শাহ সাহেবের নিকট মেশকাত শরীফ পড়া শুরু করেন।

বাল্যকাল

যে বয়সে বালকগণ খেলাধুলা, আমোদ-আহলাদে মত্ত থাকে তিনি সে বয়স থেকে নির্জনতা অবলম্বন এবং কাফির মুশরিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করার চিন্তা-ভাবনা করতেন। তাঁর শৈশব কাল সম্পর্কে “সাওয়ানেহ্ আহম্মদী” কিতাবে তিনি নিজেই বলেন, বাল্যকাল হতেই আমার মনে এই ধারণা বা ভাব উদয় হতো যে, একদিন আমি কাফিরদের বিরুদ্ধে জিহাদ করবো। তাই শৈশবেই দেখা যায় তিনি তার সঙ্গী-সাথীদের দুই দলে বিভক্ত করে দু’টি পরস্পর সৈন্যবাহিনী দাঁড় করিয়ে দিতেন। একটি দলের আমির হয়ে তিনি তার নাম দিতেন “মুজাহীদে ইসলাম” অন্য দলটির নাম দেওয়া হতো “কাফির বাহিনী।”   এইভাবে দু’টি দলের মধ্যে যুদ্ধ লেগে যেত। যুদ্ধে যখন “মুজাহিদে ইসলাম” বাহিনী জয় লাভ করতো তখন তিনি ও তার সঙ্গীগণ খুব জোরে শোরে তাকবীর ধ্বনি দিতেন। আর এটা হবে না-ই বা কেন? তিনি যে আসাদুল্লাহিল গালিব হযরত সাইয়্যিদানা আলী (রাঃ)-এর আওলাদদের অন্তর্ভূক্ত। হযরত আলী (রাঃ) জিহাদের ময়দানে কাফিরদের বিরুদ্ধে সিংহের মত গর্জে উঠতেন। জিহাদের ময়দানে তার ডান পার্শ্বে  সাহায্যকারী হিসেবে থাকতেন হযরত জিব্রাইল (আঃ) আর বাম পার্শ্বে থাকতেন হযরত মিকাইল (আঃ)। হযরত আলী (রাঃ) এর পবিত্র রক্তধারা যে তাঁর জিসম মোবারকে মিশে আছে। কাফির-মুশরিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা যে তার বংশগত ঐতিহ্য। এই জন্যই দেখা যায়, তাঁর জীবনের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত তিনি কাফির-মুশরিকদের বিরুদ্ধে বহু জিহাদ করেছেন। ভারতবর্ষ থেকে কাফিরদের অস্তিত্ব তুলে দেয়ার জন্য তিনি আকোড়ার যুদ্ধ, শিধূর যুদ্ধ, উতমান জাইর যুদ্ধ, পানজ্তার যুদ্ধ, ফুলড়ার যুদ্ধ, মর্দান যুদ্ধ, মায়ার যুদ্ধসহ আরো অনেক যুদ্ধ ক্ষেত্রে তিনি কাফিরদের মোকাবিলায় তরবারী পরিচালনা করেছিলেন। অবশেষে ১৮৩১ সালে বালাকোটে শিখ,  খৃষ্টান ও মুনাফিক সীমান্ত সরদারদের বিরুদ্ধে জিহাদ করতে গিয়ে শাহাদত বরণ করেছেন।

          দিল্লী সফর, বাইয়াত ও খিলাফত লাভ

 “মাখজানে আহম্মদী ১৮ পৃষ্ঠায়, সাওয়ানেহ আহম্মদী, সীরাতে সাইয়্যিদ আহম্মদ শহীদ” করাচী ছাপা ৯০ পৃষ্ঠায় লিখা আছে, হযরত সাইয়্যিদ আহম্মদ শহীদ (রঃ) রায় বেরেলী থেকে দিল্লী এলেন সিরাজুল হিন্দ, ইমামুল মুহাদ্দিস হযরত শাহ আব্দুল আজীজ মুহাদ্দিস দেহলভী (রঃ)-এর সাক্ষাত ও সোহবত লাভের জন্য। প্রথমেই তিনি তাঁকে সুন্নাত ত্বরীকা মুতাবিক সালাম পেশ করলেন এবং তার সাথে মুসাফা করলেন। হযরত শাহ সাহেব (রঃ) তাঁর সালাম দেয়ার সুন্নাত তরীকা ও আদব কায়দা দেখে জিজ্ঞেস করলেন, কি কারণে এলেন? জবাবে তিনি বললেন আল্লাহ পাক-এর মুহব্বত-মারিফত হাসিলের জন্য। শাহ সাহেব (রঃ) এরপর জিজ্ঞেস করলেন, কোন বংশের? তিনি বললেন, সাইয়্যিদ বংশের। তখন হযরত শাহ আব্দুল আযীয (রঃ) খুশী হয়ে বললেন, এটা তো আপনারই বংশগত মিরাসী হক। আল্লাহ্ পাক-এর ফযল-করম আপনিও তা অর্জন করতে পারবেন। এরপর তিনি তাঁকে চার তরীকায় বাইয়াত করালেন এবং হযরত শাহ্ সাহেব(রঃ)-এর নেক সোহবতের কারণে তিনি অতি অল্প সময়ের মধ্যে সুলুকের রাস্তা অতিক্রম করে মনজিলে মাকসুদে পৌঁছে গেলেন। হযরত শাহ সাহেব (রঃ) স্বল্প সময়ে আপন মুরীদের এহেন তরক্কী ও উন্নতী দেখে অত্যন্ত খুশী হলেন এবং তার গোটা খান্দানের নামজাদা আলেমদেরকে তার কাছ থেকে ফয়েজ হাসিল ও তা’লিম নেয়ার জন্য বিশেষ তাগিদ দিলেন। অতঃপর তাঁকে খিলাফতের খিরকা পরিধানে ভূষিত করে বিদায় দিলেন।

          হযরত শাহ আব্দুল আজীজ মুহাদ্দিস দেহলভী (রঃ)-এর স্বপ্ন

আল্লামা রুহুল আমীন বশীর হাটি (রঃ) তাঁর “কারামতে আহমদী” পৃঃ ২৭ হযরতুল আল্লামা জাফর থানেশ্বরী (রঃ) প্রণীত “তাওয়ারীখে আজীবা” ১১ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে, “হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ) দিল্লী পৌঁছার সাত দিন আগে হযরত শাহ আব্দুল আজীজ (রঃ) হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে স্বপ¦ দেখেন যে, তিনি দিল্লীর জামে মসজিদে তাশরীফ এনেছেন। চারদিক থেকে লোক তাঁর যিয়ারতের জন্য আসছে। তখন হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি লাঠি হযরত শাহ্ সাহেব (রঃ)কে দিয়ে বললেন, তুমি এটি নিয়ে মসজিদের দরজায় বস আর যে আমার সাক্ষাতের জন্য আসে তার পরিচয় আমাকে জানাও। আমি যাকে অনুমতি দিব তাকে তুমি আমার সাক্ষাতে নিয়ে আসবে আর যাকে নিষেধ করবো তাকে আনবেনা। অতঃপর তিনি লাঠি খানা নিয়ে মসজিদের দরজায় দাঁড়ালেন এবং হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদেশ মত কাজ করলেন। হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অনুমতি সাপেক্ষে বহু লোক এই ভাবে তাঁর জিয়ারত লাভে ধন্য হলো। সকাল বেলা হযরত শাহ সাহেব (রঃ) এই স্বপে¦র ব্যাখ্যার জন্য সেই জামানার বিখ্যাত বুযুর্গ হযরত শাহ গোলাম আলী দেহলভী (রঃ)-এর নিকট জানতে গেলেন। তিনি বললেন, এর ব্যাখ্যা হলো- হযরত সাইয়্যিদ হাসান (রঃ) যিনি মুরীদানদেরকে রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যিয়ারত করিয়ে দিতেন। আজ দেড়শত বৎসর হতে তা বন্ধ। তখন হতে হিদায়েতের জন্য হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর তাওয়াজ্জোহ রহিত হয়ে গিয়েছে। আমার মনে হচ্ছে, আপনার কোন উপযুক্ত মুরীদ দ্বারা তা আবার চালু বা প্রসারিত হবে। হযরত শাহ্ সাহেব (রঃ)-এর এই স্বপ¦  দেখার সাত দিন পর রঈসুল আউলিয়া হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ (রঃ) দিল্লী পৌঁছে তার নিকট বাইয়াত হন।

তরীকা মশক করা ও নিছবত হাসিল

হযরত শাহ সাহেব (রঃ)-এর নিকট বাইয়াত হয়েই তিনি কঠিন রিয়াজত ও মুশাক্কাতে কোমর বেঁধে নিলেন।  এ সম্পর্কে           “ওয়াসীলে ওয়াজীর আলা তরীকুল বাশীর ওয়ান নাজির” এবং “সাওয়ানেহ আহম্মদী” কিতাবের ৫৮ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে, এই সময় হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ (রঃ) কঠিন রিয়াজত ও মুশাক্কাতের মধ্যে দিন কাটাচ্ছিলেন। বছরের পর বছর এক ওজুতে এশা ও ফজর নামাজ আদায় করতেন অর্থাৎ সারা রাত বিনিদ্র অবস্থায় ইবাদত-বন্দেগী করতেন। এমনকি রাতের নামাজে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে তাঁর পা মোবারক ফুলে  যেতো।

          তাঁর ত্বরীকার নিসবত হাছিল সম্পর্কে আল্লামা রুহুল আমীন (রঃ) এর একখানা ‘বিজ্ঞাপন রদ’ কিতাবের ২৫ পৃষ্ঠায় ও হযরত কারামত আলী জৈনপুরী (রঃ) এর “যাদুত তাকওয়া” কিতাবে উল্লেখ করেছেন, হযরত আব্দুল আজীজ মুহাদ্দিস দেহলভী (রঃ)-এর ফয়েজের বরকতে হযরত গাউসে সাকালাইন হযরত বড় পীর সাহেব (রঃ) ও হযরত বাহাউদ্দীন নকশবন্দী বোখারী (রঃ) এই দুই বুযুর্গের রূহ মোবারক বাতেনী ভাবে তার তর্বিয়তের জন্য প্রকাশিত হলেন এবং একমাস পর্যন্ত এই দুইজন তরীকার ইমাম তাঁকে সম্পূর্ণ ভাবে নিজেদের তরীকার দিকে নিসবত দিলেন। এক দিন উভয় রূহ মোবারক তাঁর নিকট প্রকাশিত হয়ে এক প্রহর পর্যন্ত তাঁর নফসের উপর সজোরে তাওয়াজ্জুহ্ দিলেন। এতে দুই খান্দানের নিসবত তিনি পেলেন। চিশ্তীয়া তরীকার নিসবত হাসিল সম্পর্কে উক্ত কিতাবের ২৬ পৃষ্ঠায় বর্ণিত আছে, একবার তিনি খাজা কুতুবুদ্দীন বখতিয়ার কাকী (রঃ) এর মাযার মোবারকে মোরাকাবায় বসলেন এবং মোরাকাবা হালতে তিনি তাঁর নিকট থেকে চিশতীয়া খান্দানের নিয়ামত লাভ করেন। এই ভাবে মোজাদ্দেদীয়া, শাজালিয়া তরীকার নিসবতও তার হাসিল হয়।

          কামালতে নুবুওওয়াতের মাকাম হাসিল

“সিরাতুল মুস্তাকিম” ১৪৯-১৫২ পৃষ্ঠা, “তাওয়ারিখে আজিবা” ১০/১১ পৃষ্ঠায়, “কারামতে আহম্মদী” ২৩ পৃষ্ঠা হতে জানা যায়, আফজালুল আওলিয়া, হযরত সাইয়্যিদ আহম্মদ শহীদ বেরেলভী (রঃ) কামালতে নুবুওওয়াত তবকার ওলী ছিলেন। রাসূল পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও হযরত আলী (রাঃ) তাঁকে স্বপে¦ সাক্ষাত দিলেন। তিনি স্বপ্নে দেখেন যে, রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনটি খোরমা নিজের হাতে নিয়ে তাঁর মুখে দিচ্ছেন। জাগ্রত হওয়ার পর উক্ত স্বপ¦ তিনি নিজের মধ্যে স্থায়ী পেলেন।

          এরপর একদা আরো তিনি স্বপে¦ দেখেন- হযরত আলী (রাঃ) ও হযরত ফাতিমা (রাঃ) স্বপে¦ তাঁকে গোসল করিয়ে নিজের সন্তানের মত মূল্যবান নতুন কাপড় পরিধান করালেন। এই স্বপে¦র ঘটনার পর হতে কামালতে নুবুওওয়াতের নিসবত তার মধ্যে সম্পূর্ণ ভাবে বিকশিত হতে লাগলো।

মুজাহীদে মিল্লাত, খলীফাতুল্লাহ্, হযরত আমিরুল মু’মিনীন (রঃ) ইল্মে লাদুন্নী প্রাপ্ত আল্লাহ্ পাক-এর  খাছ ওলী ছিলেন

          যে সমস্ত আওলিয়া-ই-কিরাম (রঃ) আল্লাহ্ পাক-এর তরফ হতে খাস ভাবে ইলমে লাদুন্নী প্রাপ্ত হয়েছেন তিনিও তাদের মধ্যে একজন। তাঁর ইল্মে লাদুন্নীর শক্তি ও ক্ষমতা এত বেশী ছিল যে, এ সম্পর্কে “তাওয়ারিখে আজীবা” কিতাবের ৪০-৪১ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে, তিনি জাগ্রত অবস্থায়ই হযরত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাক্ষাত লাভ করতে পারতেন এবং কাশ্ফের শক্তি বলে হযরত ইমাম আ’যম আবু হানীফা (রঃ)-এর সাথে সাক্ষাত করতেন। এতে শরীয়তের জটিল মাসয়ালা অবগত হওয়া তাঁর নিকট সহজ ছিল। (সুবহানাল্লাহ্)

          উক্ত কিতাবের ৩৬ পৃষ্ঠায় আরো বর্ণিত আছে, তিনি যখন সিরাজুল উম্মত হযরত মাওলানা শাহ্ আব্দুল আজীজ মুহাদ্দীস দেহলভী (রঃ)-এর নিকট জাহেরী ইল্ম-এর তালীম নিচ্ছিলেন, একদিন দেখতে পেলেন কিতাবের কালো অক্ষর তাঁর নিকট থেকে উধাও হয়ে যাচ্ছে। তিনি সাদা পৃষ্ঠা ব্যতীত আর কিছুই দেখতে পাচ্ছেন না। এই অবস্থা তিনি পীর সাহেবকে জানালেন। তিনি বললেন, শুধুমাত্র কিতাব পড়ার বেলায়ই কি এরূপ হয়ে থাকে? জবাবে আমিরুল মু’মিনীন(রঃ) বললেন হ্যাঁ, শুধু কিতাব পড়ার সময়ই এরূপ হয়ে থাকে। এটা শুনে পীর সাহেব তাঁকে বললেন, আপনি কিতাব রেখে দিন। আল্লাহ্ পাক আপনাকে অন্য কাজের জন্য পয়দা করেছেন। বিনা মধ্যস্থতায় আপনি আল্লাহ্ পাক হতে ইল্ম ও হিকমত লাভ করবেন।

          “কারামতে আহম্মদী” কিতাবে আরো উল্লেখ আছে যে, হযরত শাহ্ আব্দুল আজিজ মুহাদ্দেস দেহলভী (রঃ) তাঁর মুরীদানদেরকে বলতেন, এখন হতে যা কিছু হবে হযরত সাইয়্যিদ সাহেব (রঃ)-এর মাধ্যমে হবে। লোকেরা তাঁর নিকট মুরীদ হতে এলে তিনি তাঁর নিকট পাঠিয়ে দিতেন।

          এক বর্ণনায় রয়েছে, হযরত শাহ্ সাহেব (রঃ) বলেন, আমার নিকট ১৫ বছরে যা হাছিল হবে হযরত সাইয়্যিদ সাহেবের নিকট ১৫ দিনে তা হাছিল হবে। (সুবহানাল্লাহ্) “সাওয়ানেহ আহম্মদী” কিতাবে বর্ণিত আছে, হযরত শাহ্ সাহেব (রঃ) বললেন, আমার নিকট বার বৎসরে যা না হবে রঈসুল আওলিয়া, হযরত সাইয়্যিদ সাহেব(রঃ)-এর নিকট বার দিনে তা হবে।  (সুবহানাল্লাহ্)

          এমনকি হযরত শাহ্ আব্দুল আজীজ মুহাদ্দিস দেহলভী (রঃ) জগত বিখ্যাত আলেম মুফতি, মুফাস্সির, মুহাদ্দিস ও রঈসুল আউলিয়া হওয়া সত্ত্বেও নিজের মুরীদ ও খলিফা হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ)-এর নিকট বাইয়াত হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। একথা একখানা “বিজ্ঞাপন রদ” কিতাবের ৮৪ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে।

          একবার পরীক্ষা করার জন্য তিনজন আলেম তাঁকে নির্জনে সূরা ফাতিহার তাফসীর জিজ্ঞাসা করলেন। তিনি সূরা ফাতিহার তাফসীর এমন সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করলেন যে, উক্ত আলেম তিনজন আশ্চর্য হয়ে গেলেন এবং শেষ পর্যন্ত তাঁর নিকট ক্ষমা চেয়ে মুরীদ হয়ে গেলেন। “তাওয়ারিখে আজিবার” ৩৮ পৃষ্ঠায় একথা উল্লেখ আছে।

          “সাওয়ানেহ আহ্মদী, সীরাতে সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ ১ম খন্ড, “তাওয়ারীখে আযীবা” কিতাবের ৯-১০ পৃষ্ঠায় বর্ণিত আছে, “পবিত্র রমজান মাসের ২১ রাত্রিতে সাইয়্যিদুল আবেদীন, হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ (রঃ) হযরত মাওলানা শাহ্ আব্দুল আজীজ মুহাদ্দিস দেহলভী (রঃ)-এর নিকট উপস্থিত হয়ে বললেন, হুজুর! এই ১০ রাত্রির কোন রাত্রিতে শবে ক্বদর পাওয়ার চেষ্টা করবো? হযরত শাহ্ সাহেব (রঃ) হেসে বললেন, হে প্রাণাধিক পুত্র! যেরূপ আপনি সর্বদা রাত্রি জাগরণ করে থাকেন এই রাত সমূহেও সেরূপ নিয়মিত জাগরণ করতে থাকুন। ২৭ রাত্রিতে হযরত আমীরুল মু’মিনীন (রঃ) রাত্রি জাগরণের ইচ্ছা করলেন, কিন্তু সেই রাত্রে এশার নামাজের পর তাঁর নিদ্রা এত প্রবল হলো যে, দু’চার রাকায়াত নফল নামাজ ছাড়া আর কিছুই আদায় করতে পারলেননা। রাত্রির শেষ তৃতীয়াংশ বাকি থাকতে দু’জন লোক এসে তাঁর হাত ধরে জাগিয়ে দিলেন। তিনি স্বপে¦ দেখলেন যে, তার ডান দিকে রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও বাম দিকে হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) বসে বলছেন, হে আহমদ! তাড়াতাড়ি উঠে গোছল কর। হযরত আমীরুল মু’মিনীন (রঃ) চৈতন্য লাভ করে তাদেরকে দেখে লজ্জিত অবস্থায় হাউজের নিকট গোছল করে নিলেন। যখন তিনি গোছল করছিলেন তখন তিনি হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ)কে সে স্থানে বসে থাকতে দেখেছেন। গোছল করার পর তিনি তাঁদের নিকট উপস্থিত হলেন। হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আজ শবে ক্বদর। তুমি দোয়া, মুনাজাত ও যিকিরে মশগুল হও। (সুবহানাল্লাহ্)

          “কারামতে আহম্মদী” কিতাবে লিখা আছে, একবার তিনি নদীর ধারে ভ্রমণ করছিলেন। একজন পাদরী অগ্রসর হয়ে তাঁকে বললো আমি আপনার নিকট কিছু শুনতে চাই। পাদরী জ্যামিতি বিষয় সম্পর্কে জানতে চাইলো। অথচ তিনি এ বিষয় সম্পর্কে তেমন কিছুই জানতেন না। তখন আল্লাহ্ পাক-এর পক্ষ হতে তিনি এ বিষযে এরূপ তত্ত্ব লাভ করলেন যে, স্বয়ং (জ্যামিতি) বিজ্ঞানী ইউক্লিড যদি জীবিত থাকতো তবে তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করতে বাধ্য হতো। পাদরী তাঁর জ্যামিতিক জ্ঞান দেখে বললো, এই হযরতের নিকট আমাদের জ্যামিতি জ্ঞান একেবারে বাতিল। (সুবহানাল্লাহ্)

মাশায়েখে আকবর, সুলতানুল আরিফীন, খলীফাতুল্লাহ্, হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ)-এর কারামতসমূহ

“তাওয়ারীখে আযীবা” কিতাবের ২০/২১ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে, এক সময় জনাব হযরত আমিরুল মু’মিনীন আপন হুজরায় শয়ন অবস্থায় চিন্তা করতেছিলেন, না জানি এই জামানার কুতুবুল আকতাব (গাওস) কে? তখন তিনি আল্লাহ্ পাক-এর নিকট উক্ত কুতুবুল আকতাবের যিয়ারতের জন্য আরজু করলেন। এই দোয়া করা মাত্র তা কবুল হয়। আল্লাহ্ পাক বাতাসকে হুকুম দিলেন যে, বিছানাসহ হযরত আমীরুল মু’মিনীনকে কুতুবুল আকতাব-এর নিকট পৌঁছে দিতে। তিনি অনেক দেশ, পাহাড় ও বন-জঙ্গল দেখতে দেখতে অল্প সময়ের মধ্যে শাম দেশে (সিরিয়া) উপস্থিত হলেন। তিনি তখন দেখলেন উক্ত কুতুবুল আকতাব একজন সুন্দর যুবক। তাঁর চেহারা অনেক নূরানী, বংশ সাইয়্যিদ, হোসাঈনী। নদীর উপকূলে মুরীদানদের সাথে বসে আছেন। প্রকাশ্যভাবে তিনি আদৌ আমিরুল মু’মিনীনের দিকে দৃষ্টিপাত করলেন না। তখন হযরত সাইয়্যিদ সাহেব (রঃ) তাঁকে বললেন, আল্লাহ্ পাক-এর সন্তুষ্টি লাভ ব্যতীত আপনার সাক্ষাতে আমার অন্য কোন উদ্দেশ্য নেই। কিন্তু তা সত্বেও তিনি তাঁর দিকে লক্ষ্য করলেন না। এতে তাঁর অন্তরে এক প্রকার কষ্ট অনুভূত হলো। কিন্তু আল্লাহ্ পাক-এর বদৌলতে তাঁকে একটি নিয়ামত ও কারামত দান করলেন। যে চল্লিশজন রেজালুল গায়েব কুতুবুল আকতাবের জন্য নিয়োজিত করা হয়, তাঁেদরকে হযরত আমিরুল মু’মিনীন(রঃ)-এর জন্য নিয়োজিত করা হয়। যা হোক এই নতুন পুরস্কারের পরে আল্লাহ্ পাক তাঁকে যেমন শাম দেশে নিয়ে গিয়েছিলেন সেরূপভাবে তাঁকে তাঁর স্থানে পৌঁছে দিলেন। কিছু দিন পরে পুনরায় আল্লাহ্ পাক তাঁকে উক্ত নিয়ামতসহ ঐ কুতুবুল আকতাবের নিকট পৌঁছে দিলেন, এবার আল্লাহ্ পাক কুতুবুল আকতাবকে জানিয়ে দিলেন তারপরে উক্ত মাকাম হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ) প্রাপ্ত হবেন। এজন্য এবার সেই “গাউস” তার সাথে অত্যন্ত ভদ্রতা ও নম্রতার সাথে সাক্ষাত করলেন। এ ঘটনা ঘটবার কয়েক বছর পর যে সময় তিনি খোরাসানে উপস্থিত হয়েছিলেন। (তখন তিনি বলেছিলেন) আমি ইতোপূর্বে এই পাহাড় ও ময়দানগুলোর উপর দিয়ে শাম দেশে গিয়েছি। (সুবহানাল্লাহ্)

          “ওয়াসীলে ওয়াজীর, মাখজানে আহম্মদী ও তাওয়ারিখে আযীবা” কিতাবের ৫৬, ৫৭ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে, শ্রীহট্টে একজন বড় অর্থশালী হিন্দু বাস করতো। এক রাত্রে সে স্বপে¦ দেখলো যে, একটা বড় লম্বা সিঁড়ি আসমান হতে নেমে আসছে। সে ব্যক্তি উক্ত সিঁড়িতে আরোহণ করে আসমানের উপর চলে গেলো। একটি দরজা দিয়ে আসমানে প্রবেশ করে একজন উৎকৃষ্ট পরিচ্ছদধারী খুব সূরতওয়ালা লোককে কুরসির উপর বসা দেখলো। ঐ ব্যক্তি তাঁর নিকট উপস্থিত হয়ে আদবের সাথে সালাম করলো এবং জিজ্ঞাসা করলো, হুজুরের নাম (মোবারক) কি? তাঁর উত্তরে তিনি বললেন, আমি সমস্ত মানুষের পিতা হযরত আদম (আঃ)। তারপর সেই ব্যক্তি তাঁর বাম দিকে দোযখের ভীষণ যন্ত্রণা ও আযাব দেখে জ্ঞান হারা হয়ে পড়লো। এতে হযরত আদম (আঃ) একজন লোকলে বললেন, একে ডান দিকে নিয়ে যাও। তখন ঐ ব্যক্তি সেখানকার জান্নাতের অতুলনীয় সুখ শান্তি দেখে আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে গেল। ঐ ব্যক্তি হযরত আদম (আঃ)কে এই দু’স্থানের কথা জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, জান্নাত ঈমানদারদের স্থান এবং দোযখ পৌত্তলিক, মুশরিক ও রাসূল অমান্যকারীদের স্থান। তুমি মুশরিকদের দলে। যদি মারা যাও এই অবস্থায় দোযখে যাবে। তারপর তিনি বললেন, এই সময় হযরত সাইয়্যিদ আহমদ নামীয় একজন আল্লাহ্ওয়ালা, হাদী কলকাতায় অবস্থান করছে তুমি সত্ত্বর তাঁর নিকট উপস্থিত হয়ে বাইয়াত গ্রহণ করে নিজের স্থান জান্নাতে করে নাও। ঐ ব্যক্তি (এইসব শুনার পর) কলকাতায় গিয়ে হযরত  আমিরুল মু’মিনীনের নিকট এই সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করে তার নিকট মুসলমান হয়ে মুরীদ হয়ে গেল। (সুবহানাল্লাহ্)

          “কারামতে আহম্মদী” কিতাবের ৪৫ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে, তাজুল আউলিয়া, হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ (রঃ) হজ্বে যাওয়ার সময় সমুদ্রের মধ্যে ষ্টিমারে মিষ্টি পানি শেষ হয়ে গিয়েছিল। জাহাজের পরিচালকরা তা সাইয়্যিদ সাহেব (রঃ)কে অবগত করলে তিনি আল্লাহ্ পাক-এর নিকট দোয়া করতে বসে গেলেন। দোয়ার সময় তাঁর নিকট ইল্হাম হলো যে, আল্লাহ্ পাক এই স্থানের সমুদ্রের পানি মিষ্টি করে দিয়েছেন। যে পরিমাণ পানি ইচ্ছা হয় জাহাজে পূর্ণ করে নেয়া যাবে। তখন তিনি জাহাজের পরিচালকগণকে এই সুসংবাদ জানিয়ে দিলেন। তারা সাথে সাথে আবশ্যক মত মিষ্টি পানি সমুদ্র হতে তুলে জাহাজ পূর্ণ করে নিলেন। (সুবহানাল্লাহ্)

          “একখানা বিজ্ঞাপন রদ” কিতাবের ৪৭ পৃষ্ঠায়, “তাওয়ারিখে আযীবা” কিতাবের ৬৬ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে, কলকাতার একজন নামজাদা আলেম আমিরুল মু’মিনের প্রতি অভক্তি প্রকাশ করত। একদিন মৌলভী আশরাফ আলী সাহেব তাকে হযরত সাইয়্যিদ আহমদ বেরেলভী(রঃ)-এর নিকট নিয়ে গেলেন। তিনি সেই সময় আহার করতেছিলেন। উক্ত দু’জনকে দেখে তাদেরও আহার করার জন্য তিনি অনুরোধ জানালেন এবং উক্ত নামজাদা আলেমের হাত ধরে বললেন, আপনি হাত ধুয়ে শরীক হয়ে যান। হাত ধরা মাত্র উক্ত আলেম সাহেব অচৈতন্য হয়ে তওবা করতঃ তাঁর কাছে মুরীদ হয়ে গেলেন। তিনি বলেন, যখন আমিরুল মু’মিনীন হযরত সাইয়্যিদ সাহেব (রঃ) আমার হাত ধরেছিলেন তখনই আল্লাহ্ পাক-এর রহমতের ফয়েজ প্রাপ্তির প্রতিবন্ধক স্বরূপ মানতেক, হিকমাত ইত্যাদি নাপাক ইল্মগুলো আমার অন্তর হতে বিলুপ্ত হয়ে গেলো এবং আল্লাহ্ প্রাপ্তির পথ আমার জন্য সহজ হয়ে গেল।  (সুবহানাল্লাহ্)

          “তাওয়ারীখে আযীবা” কিতাবের ৫০ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে, একবার তিনি “কুএল” নামক স্থানে ছিলেন। এমতাবস্থায় আকবর আলি খাঁ নামক একজন লোক তাঁকে হত্যা করার ইচ্ছায় অস্ত্রসহ সেখানে উপস্থিত হলো। তিনি ইল্হাম কর্তৃক অবগত হয়ে  তার সাথীদেরকে বললেন, এরূপ নামধারী এক ব্যক্তি আমার নিকট আসতেছে তাকে ভিতরে আসতে বাধা দিওনা। একটু পরে সেই অস্ত্রধারী লোকটি তাঁর সম্মুখে এসে বসে গেল এবং বললো, আপনার নিকট আমার কিছু জিজ্ঞাসা করার আছে। সাইয়্যিদুল আউলিয়া, হযরত সাইয়্যিদ সাহেব (রঃ) বললেন, আগ্রহ সহকারে জিজ্ঞাসা কর। ইহা বলা মাত্র তার সর্ব শরীরে কম্পন উপস্থিত হলো। তিনি বললেন, খাঁ সাহেব ভালতো? এতে তার শরীরের কম্পন আরোও বেড়ে গেল। অবশেষে অস্ত্রসস্ত্র খুলে ফেলে হাত লম্বা করে তাঁর নিকট মুরীদ হয়ে গেলো এবং প্রকাশ করলো হুজুর! আমি আপনার প্রাণ হত্যা করতে এসেছিলাম। কিন্তু আপনার সামনে বসলে আমার ইচ্ছার পরিবর্তন হয়ে যায়। (সুবহানাল্লাহ্)

          কিতাবে আরো বর্ণিত আছে, একবার কিছু শিয়া ও বিদ্য়াতী লোক অসৎ উদ্দেশ্য প্রণোদিত হয়ে আমীরুল মু’মিনীন, হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ)-এর নিকট কিছু প্রশ্ন নিয়ে এলো। তাদের ধারণা ছিল যে, তাদের প্রশ্নগুলোর জবাব তিনি দিতে পারবেন না। বলা প্রয়োজন যে, বিদ্য়াতীদের উক্ত প্রশ্নগুলোর জবাব আমিরুল মু’মিনীন, হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ)-এর মুরীদগণই দিতে চাইলেন। কিন্তু বিদ্য়াতীরা তাঁদের একথায় রাজি হলোনা। তাদের ধারণা ছিল পীর সাহেব যেহেতু মাদ্রাসায় লেখাপড়া করেননি তাই তাদের এ প্রশ্নগুলোর জবাব নির্ঘাত তিনি দিতে পারবেননা। এমনকি মুজাহিদে মিল্লাত, আমিরুল মু’মিনীন, হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ)-এর নিজের মুরীদানগণের মধ্য হতেও কেউ কেউ উক্ত সন্দেহের দোলায় দুলছিলেন, তখন হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ) কাশ্ফের মাধ্যমে আপন মুরীদানদের অন্তরের এহেন অবস্থা জেনে নিলেন। তিনি বললেন, ঠিক আছে সরাসরি তাদেরকে আমার কাছে নিয়ে আস। আমিই তাদের এ প্রশ্নের জবাব দিব। তখন উক্ত বিদ্য়াতীরা তাঁর সামনে এসে নতজানু হয়ে তাঁকে কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ, ফিক্বাহ্ ও মানতেক থেকে কিছু প্রশ্ন করলো। মুজাহিদে আজম, হযরত সাইয়্যিদ আহমদ বেরেলভী (রঃ) তাদের প্রশ্নগুলোর জবাব অত্যন্ত সুন্দর ও নিখূঁতভাবে দিলেন যা তারা কল্পনা করতে পারেনি। এতে তারা যার পর নেই বিস্মিত ও অবাক হয়ে সন্তুষ্টচিত্তে চলে গেলো।

          যখন বিদ্য়াতীরা তাদের প্রশ্নের জবাব পেয়ে চলে গেল তখন কিছু মুরীদান তাকে জিজ্ঞাসা করলো, আচ্ছা, হুজুর ক্বিবলা! আমরা আপনাকে দেখলাম আপনি যখন কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ ও ফিক্বাহ্ থেকে তাদের প্রশ্নের জবাব দিলেন তখন আপনার মধ্যে স্বাভাবিক অবস্থা লক্ষ্য করা গেল। কিন্তু আপনি যখন তাদের মানতেকের প্রশ্নগুলোর জবাব দিচ্ছিলেন তখন আপনার শরীর মোবারক থেকে ঘাম ঝরছিলো, এর কারণ কি?

          খলীফাতুল্লাহ্ ফিল্ আরদ, হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ) মুরীদানদের প্রশ্নের জবাবে বললেন, তারা যখন আমাকে কুরআন শরীফ থেকে প্রশ্ন করলো, তখন আমি সরাসরি আল্লাহ্ পাক থেকে এর উত্তর জেনে তাদের জবাব দিয়েছি। যখন তারা হাদীস শরীফ থেকে প্রশ্ন করলো, তখন হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে সাক্ষাত করে তার উত্তর জেনে নিয়ে তাদের উত্তর দিয়েছি। যখন তারা ফিক্বাহ্ সম্পর্কিত প্রশ্ন করলো, তখন আমি হযরত ইমাম আযম আবূ হানিফা (রঃ)-এর সাথে সাক্ষাত ও  যোগাযোগ করে এর জবাব দিয়েছি। আর যখন তারা আমাকে মানতেক সম্পর্কে কিছু মাসয়ালা জিজ্ঞেস করলো, তখন আমি মানতেকের বড় বড় ইমামদের খুঁজতে লাগলাম, তাদেরকে জান্নাতে খুঁজে না পেয়ে অবশেষে জাহান্নামে তাদের পেলাম। আমি জাহান্নামে প্রবেশ করে তাঁদের কাছ থেকে সরাসরি ঐ মাসয়ালার জবাব নিয়ে প্রত্যাবর্তন করি। জাহান্নামে প্রবেশ করার কারণে তার প্রচন্ড আগুণের তাপে আমার শরীর ঘেমে গেছে যা তোমরা দেখতে পাচ্ছো।

          “তাওয়ারিখে আযীবা” কিতাবের ২৪ পৃষ্ঠায়, “কারামতে আহম্মদী” কিতাবের ৫৬ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে, হিন্দুস্থানে যে সময় দুর্ভিক্ষের জন্য মানুষ নিজেদের সন্তানদেরকে বিক্রয় করতে বাধ্য হতো সেই সময় হযরত আমিরুল মু’মিনীন (রঃ)-এর সাথে শতাধিক লোক প্রতিদিন সন্ধায় আহার করতো। তাঁর খাদ্য ভান্ডারের জিম্মাদার মৌলভী মুহম্মদ ইউসুফ সাহেবের প্রতি তিনি হুকুম করেছিলেন, সকল লোকের জন্য একই প্রকার খাদ্য প্রস্তুত হবে আর খাদ্য প্রস্তুত হলে বড় বড় ডেকচিতে রেখে চাদর দিয়ে যেন ঢেকে রাখা হয়। তারপর হযরত আমিরুল মু’মিনীন (রঃ) সেখানে উপস্থিত হয়ে খাদ্যবস্তুকে হাত দ্বারা স্পর্শ করে এই দোয়া পড়তেন, আয় আল্লাহ্ পাক! ইহা বেশী করে দিন এবং এতে বরকত দিন। অবশেষে দশ দশ কিংবা বিশ বিশ জনকে একত্রে বসিয়ে বড় বড় পাত্রে ভক্ষণ করানো হতো। যদিও দুর্ভিক্ষের জন্য খাদ্য অল্প পরিমাণ প্রস্তুত করা হতো অথচ এতে এতো বরকত হতো যে, সমস্ত কাফেলার লোক তা ভক্ষণ করে তৃপ্তি লাভ করতো এমনকি কখনো কখনো কিছু খাদ্য বেশী হয়ে যেতো।

          “তাওয়ারিখে আযীবা” কিতাবের ৫৩ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে, সাহিবুল আসরার, রঈসুল আওলিয়া, হযরত সাইয়্যিদ সাহেব (রঃ) আপন বোনকে একটা টাকা বরকতের জন্য দিয়েছিলেন। তিনি উক্ত টাকাটি একটা সিন্ধুকে রেখে দিয়েছিলেন। তার যত টাকার দরকার হতো তিনি উক্ত সিন্দুক হতে বের করে ব্যয় করতেন কখনও তাঁর টাকার অভাব হতো না।

          উক্ত কিতাবের ৫৩ পৃষ্ঠায় আরো উল্লেখ আছে, কলকাতা শহরে একজন অর্থশালী লোক ছিল। সে সর্বদা মদপান করতো। সেই লোকটি এক দিন রঈসুল আওলিয়া, হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ)-এর খেদমতে উপস্থিত হয়ে বলতে লাগলো, হুজুর! আমি মদ পান করতে এরূপ অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি যে, আমি তা করা ব্যতীত বেঁচে থাকতে পারিনা। আমি আপনার নিকট সমস্ত গুণাহ্ হতে তওবা করতে পারি কিন্তু মদ পান ত্যাগ করতে পারবনা। তিনি বললেন, আচ্ছা বাবা! তাই করো। কিন্তু আমার সাক্ষাতে মদ পান করো না। সে ব্যক্তি শর্ত স্বীকার করে তাঁর নিকট বাইয়াত হলো। বাড়িতে উপস্থিত হয়ে তার মদ পানের ইচ্ছা প্রবল হলে  খাদেমের নিকট মদ চাইলো। খাদেম পিয়ালায় মদ ঢেলে তার নিকট আনল। যখনই সে ব্যক্তি পিয়ালাটি মুখের নিকট আনলো তখনই দেখতে পেলো যে, আমিরুল মু’মিনীন (রঃ) দাঁতে অঙ্গুলি দিয়ে তার সম্মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। তৎক্ষনাৎ সে ব্যক্তি মদের পিয়ালাটি নিক্ষেপ করে তওবা করে দাঁড়িয়ে পড়লো কিন্তু তারপরে আর তাঁকে তথায় দেখতে পেল না। এতে সে বুঝল যে, হয়তো তার ভুল হয়েছে। হযরত আমীরুল মুমিনীন (রঃ) এখানে কিভাবে আসবেন? দ্বিতীয়বার সে ব্যক্তি খাদেমকে হুকুম  দিল যে, অন্য একটি পিয়ালায় করে মদ আনো। খাদেম মদ আনলো। সে ব্যক্তি মদের পিয়ালা হাতে নিয়ে পান করার ইচ্ছা করল, অমনি পূর্বের ন্যায় এবারও সে তাঁকে দন্ডায়মান দেখে পিয়ালাটি ফেলে দিলো ও হুজুর বলে সে দিকে ধাবিত হলো। (কিন্তু এবারও) তথায় কাউকে দেখতে পেলনা। তারপরে সে ব্যক্তি একটি কামরায় প্রবেশ করে দরজা বন্ধ করে মদের পিয়ালা মুখের নিকট নেয়া মাত্র আমিরুল মুমিনীন (রঃ)কে সম্মুখে দেখতে পেয়ে তৎক্ষনাত পিয়ালাটি ফেলে দিল এবং তাঁকে অনুসন্ধান করতে লাগলো। কিন্তু তাঁর কোন চিহ্ন পাওয়া গেল না। অবশেষে নিরুপায় হয়ে পায়খানার মধ্যে মদ পান করার ইচ্ছা করা মাত্র উক্ত ব্যক্তি হযরত সাইয়্যিদ সাহেব (রঃ)কে সম্মুখে দন্ডায়মান দেখে মদ পান হতে তওবা করলো এবং সমস্ত শরাবের পাত্র ভেঙ্গে ফেললো।

          “তাওয়ারিখে আযীবা” কিতাবের ৫৪-৫৫ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে, মৌলভি মুহম্মদ আলী রামপুরী সাহেব লিখেছেন যে, কলকাতায় গোলাম হুসাইন নামক একজন বড় অর্থশালী দালাল ছিল। তার ৯০ লক্ষ টাকা ছিল। কোটি টাকা পূর্ণ করার জন্য দিবা-রাত্রি তার আকাঙ্খা ছিল। ঐ ব্যক্তি বড় মদখোর, বদ্কার ছিল। হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ)-এর সাথে তার অতিশয় শত্রুতার সৃষ্টি হয়েছিল, যেহেতু তিনি নৃত্যাগীত, মদপান ইত্যাদি আমোদ-প্রমোদের বিষয়গুলো নিষেধ করতেন। হযরত সাইয়্যিদ সাহেব (রঃ) তার অবাধ্যতা অবগত হয়ে কিছুই বলতেন না। একদিন তিনি আছরের নামাজ পরে এক ময়দানে ভ্রমণ করছিলেন। সেই সময় তিনি হঠাৎ মাথা হতে টুপি খুলে বললেন, গোলাম হুসাইন দালালের উপর এখনই আল্লাহ্ পাক-এর গযব নাযিল হলো। তারপরে তিনি শহরে পৌঁছে শুনলেন যে, উক্ত দালাল ঠিক সেই সময় উম্মাদ হয়ে গিয়েছে। যখন তার চৈতন্য লাভ হত তখন সে চিৎকার করে বলতো যে, হয় হযরত সাইয়্যিদ সাহেব (রঃ)কে আমার নিকট আনয়ণ কর, না হয় আমাকে তাঁর নিকট নিয়ে যাও। লোকেরা তাকে খলীফাতুল মুসলিমীন (রঃ)-এর নিকট নিয়ে গেলে সে একটু আরোগ্য লাভ করতো এবং তথা হতে প্রত্যাবর্তন করলে পুনরায় উম্মাদ হয়ে যেত। অবশেষে ঐ অবস্থায় বিষয় সম্পত্তি ত্যাগ করে মারা যায়।

          “তাওয়ারিখে আযীবা” কিতাবের ৫৯ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে, হযরত সাইয়্যিদ আহমদ বেরেলভী (রঃ) হজ্বে যাওয়ার সময় আদন বন্দরে উপস্থিত হলে তিনি কয়েকজন লোকসহ একটি নৌকায় উঠে বন্দরে নামলেন। শহরটি বন্দর হতে দূরে অবস্থিত। এদিকে সুর্যের এত প্রচন্ড তাপ যে এক পাও চলা কঠিন। তথায় উট ইত্যাদি কোন প্রকার যানবাহন ছিলনা। আবার কারো পায়ে জুতা ছিলনা। অনুসন্ধানে অবগত হওয়া গেলো যে, সম্মুখে পাহাড়ে ভাড়াটিয়া উট পাওয়া যায়। কিন্তু উক্ত প্রচন্ড সূর্যের তাপে পাহাড় পর্যন্ত গিয়ে উট নিয়ে আসা সাধ্যাতীত ছিল। তখন সঙ্গীরা নিরুপায় হয়ে হযরত সাইয়্যিদ আহমদ বেরেলভী(রঃ)-এর নিকট আবেদন করলেন। এতে তিনি বললেন, তোমরা চিন্তা করোনা, আল্লাহ্ পাক আমাদের আবশ্যকীয় বিষয় আমাদের জন্য সংগ্রহ করে দিবেন। তারপর তিনি সকলকে সাত সাতবার সূরা ফাতিহা শরীফ পড়তে বললেন। তাদের উক্ত সূরা পড়া শেষ হতে না হতেই পাহাড়ের দিক হতে কয়েকটি উট সোজাভাবে তাঁদের নিকট এসে উপস্থিত হলো এবং তাঁদেরকে উটের পরিচালকরা তাদের উটের উপর উঠিয়ে আদন শহরে পৌঁছে দিল। শহরে পৌঁছে দেয়ার পরে উটগুলো ও তৎসমূদয়ের পরিচালকগণ অদৃশ্য হয়ে গেল। বেতন দেয়ার উদ্দেশ্যে তাঁদেরকে খোঁজা হলো কিন্তু তাঁদের সন্ধান পাওয়া গেল না। শহরের কাজির নিকট উট পরিচালকগণের রূপ ও চেহারার কথা প্রকাশ করা হলো ও তাঁর নিকট তাঁদের বেতন গচ্ছিত রাখার প্রস্তাব করা হলো। কিন্তু কাজী সাহেব বললেন, এরূপ চেহারার উট পরিচালকরা এখানে নাই। কোন গায়েবী সাহায্য আপনাদের নিকট পৌঁছেছিল, যদি আপনারা এই প্রচন্ড তাপে উক্ত সাহায্য প্রাপ্ত না হতেন তবে আপনারা বিনষ্ট বা ধ্বংস হয়ে যেতেন।

          ত্রয়োদশ শতাব্দীর মুজাদ্দিদুয্যামান খলীফাতুল মুসলিমীন, হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ)

 হাদীস শরীফে রয়েছে,

ان الله يبعث لهذه الامة على رأس كل مأة سنة من يجددلها دينها.

অর্থঃ- প্রত্যেক শতাব্দীর শুরু অথবা শেষভাগে এরূপ লোক পয়দা হবে যিনি তাদের জন্য তাদের দ্বীনকে সংস্কার করবেন। এই হাদীস শরীফের ব্যাখ্যায় ফকিহুল উম্মত আল্লামা রুহুল আমীন (রঃ) তাঁর একখানা “বিজ্ঞাপন রদ” কিতাবের ৫-৬ পৃষ্ঠায় বলেছেন, একাদশ শতাব্দীর মুজাদ্দিদ ইমামে রব্বানী মুজাদ্দিদে আল্ফে সানী (রঃ), দ্বাদশ শতাব্দীর মুজাদ্দিদ হযরত শাহ্ ওয়ালী উল্লাহ্ মুহাদ্দিস দেহলভী (রঃ) এবং ত্রয়োদশ শতাব্দীর মুজাদ্দিদ আমিরুল মু’মিনীন হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ)। আলিম কুল শিরমণি হাদীয়ে জামান আল্লামা কারামত আলী জৈনপুরী (রঃ) তার “মুকাশিকাতে রহমত” কিতাবে এ সম্পর্কে বলেন, প্রকৃতপক্ষে আমিরুল মু’মিনীন, হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ) এই জামানার প্রত্যেক লোকের মুর্শিদ, কেউ ইহা অবগত হোক অথবা না হোক, মান্য করুক অথবা না করুক তিনি ত্রয়োদশ শতাব্দীর মুজাদ্দিদ। যাঁকে আল্লাহ্ পাক মুজাদ্দিদ করেছেন তার ত্বরিকায় দাখিল হওয়া দ্বীনের দৃঢ়তার লক্ষণ। যেহেতু তাঁর ত্বরিকায় সুন্নতের পায়রবি করা হয়।

তৎকালে ভারতবর্ষে মুসলমানদের অবস্থা

          আলামুল হুদা, হযরতুল আল্লাম হযরত কারামত আলী জৈনপুরী (রঃ) তাঁর বিখ্যাত “মুকাশিফাতে রহমত” কিতাবে তৎকালে ভারতবর্ষে মুসলমানদের অবস্থা সম্পর্কে বর্ণনা করেন এইভাবে- “মানুষ তাদের ভাল অবস্থা ও চরিত্রকে অসৎ চরিত্র দ্বারা কলঙ্কিত করে ফেললো। বিদ্য়াত ও কুফরী চাল-চলন, প্রতিমা পুজা, মুর্তি বানানো, নাচ-গান, ঢাক-ঢোল, তানপুরা ইত্যাদি শরীয়ত গর্হিত কাজে রত হলো হিন্দুদের রথযাত্রা, দোলযাত্রায় অংশ নিত। কিছু লোক পাদরি গোশাইর চালচলনে চলতো। কলেমা তাইয়্যিবার মর্ম না বুঝার দরুন র্শিক করতো। নামাজ, রোজা, হজ্ব, যাকাত, কুরবানী, সদকা, ফিতরা, জুমা, জামায়াত, দু’ঈদ এবং নামাজ একেবারে ছেড়ে দিয়েছিল। তাদের মধ্যে দাড়ি মুন্ডানোর রীতি ছিল। হিন্দু-মুসলমান চিনা যেতনা। কতক লোক রোজা রাখত কিন্তু ইফতার করা ও সেহ্রী খাওয়ার সময় সম্পর্কে জ্ঞান রাখতো না। সুবহি সাদিক হলেও পানাহার করতো। নিজেদের সাধ্যমত মোহর ধার্য করতো। কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ, ওয়াজ-নসীহত শ্রবণ করা একেবারে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আযানের শব্দ শুনা যেত না। কুরআন শরীফ পাঠের বদলে বালকদেরকে ফার্সি শিক্ষা দেয়া উত্তম মনে করতো। নামাজ, রোজা, হায়েজ-নিফাসের মাসয়ালা একে বারে মানতো না। এমনকি স্ত্রী লোকেরা বেপর্দা হতো এবং কতক স্ত্রী লোক রাত্রি বেলায় সজ্জিত হয়ে মেলায় যেতো। দ্বীনের এই করুণ অবস্থায় আল্লাহ্ পাক খলীফাতুল মুসলিমীন, হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ (রঃ)কে মুজাদ্দিদ রূপে প্রেরণ করেন। তিনি দ্বীনের সংস্কার করেন। যিকির-ফিকির, মুরাবাকার মাধ্যমে অসাবধান লোকদেরকে সতর্ক করে তোলেন। তাঁর আগমণে বহু বছরের কুপ্রথা, র্শিক, বিদ্য়াত-বেশরার উচ্ছেদ ঘটে। পুনরায় হাক্বীক্বী দ্বীনি প্রথা চালু হলো। কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ শিক্ষা, নামাজ, রোজা, হজ্ব, যাকাত, তারাবীহ্, জুমা, জামায়াত, আযান, পুনরায় পূর্ণ্যদমে চালু হলো। তাঁর আলেম খলিফাগণ কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ, আকাঈদ, তাসাউফ, ফিক্বাহ্র কিতাব থেকে মানুষকে নতুনভাবে তালিম দিতে লাগলেন।

হজ্বে বাইতুল্লাহ্ শরীফ ও

মদীনা শরীফ জিয়ারত

১২৩৬ হিজরী মোতাবেক, ইংরেজী ১৮২১ সালে তিনি এক বিশাল কাফেলাসহ হজ্বের জন্য হারামাইন শরীফের উদ্দেশ্যে গৃহ ত্যাগ করেন। পথের বিভিন্ন জায়গা যেমন ইলাহাবাদ, বেনারস, মির্জাপুর, চুনারগড়, গাজীপুর, দানাপুর, ফুলওয়ার শরীফ, আযিমাবাদ, কলিকাতা, তিব্বত প্রভৃতি জায়গা হতে তাঁর নিকট হাজার হাজার লোক এসে বাইয়াত হয়ে তাঁর কাফেলায় শরীক হয়। ১৮২২ সালের ১৬ মে তিনি পবিত্র হেরেম শরীফে প্রবেশ করেন। এই সময় পবিত্র হারাইন শরীফের মাশাইখ-ই-কিরাম (রঃ) তাঁর নিকট বাইয়াত হওয়ার জন্য দ্রুত ছুটে আসেন। যেমন, শায়খ মুহম্মদ ওমর (রঃ) (হানাফী মুসাল্লার ইমাম) শায়খ মুস্তফা মিরদাদ (রঃ), হযরত শায়খ আতা মিছরী (রঃ), শায়খ মুহম্মদ আলী হিন্দী (রঃ), সাইয়্যিদ আকিল (রঃ), সাইয়্যিদ হামযা খাজা আলমাস (রঃ) শায়খ আহমদ বিন ইদ্রিস (রঃ) শায়খ বোখারামী (রঃ) শায়খ হাসান আফেন্দী (রঃ), শায়খ শামসুদ্দীন (রঃ) ও প্রমূখ হারামাইন শরীফের মাশাইখ-ই-কিরাম (রঃ) কেউ সরাসরি কেউ কাশ্ফের মাধ্যমে অবগত হয়ে তার নিকট এসে বাইয়াত হন। একথা “মাখজানে আহম্মদী, সীরাতে সাইয়্যিদ আহ্মদ শহীদ, সাওয়ানে আহ্মদী, কারামতে আহমদী” কিতাবে বর্ণিত আছে।     পবিত্র মক্কা শরীফের হজ্ব পর্ব সমাপনের পর তিনি মদীনা শরীফের দিকে রওয়ানা হন। এখানে তিনি সরকারে দো আলম হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর রওজায়ে আকদাস জিয়ারত করেন। বাতেনী ভাবে তিনি তাঁর নিকট থেকে প্রচুর নিয়ামত লাভ করেন। এখানেও মদীনা শরীফের বহু শায়খ তাঁর নিকট বাইয়াত হন। পবিত্র মক্কা শরীফ ও মদীনা শরীফের যে সমস্ত জায়গা তিনি যিয়ারত করেন তা হচ্ছে- জান্নাতুল মুয়াল্লা, আকাবার প্রান্তর, হুদাইবিয়া, জান্নাতুল বাকী, ওহুদ প্রান্তর, মসজিদে কুবা, মসজিদে ক্বিবলাতাইন, মসজিদে খায়েফ, বাইয়াতে রিদওয়ান, ওয়াদীয়ে ছোগরা (যেখানে বদরী সাহাবী হযরত আবূ উবাইদা বিন হারিস (রাঃ) সমাহিত আছেন)। তিনি এ সমস্ত বরকতময় ও পবিত্র জায়গা জিয়ারত করেন।

তরীকায়ে মুহম্মদিয়া বা

আওর মুহম্মদিয়া তরীকার সংস্কার

ত্বরীকায়ে মুহম্মদিয়া বা আওর মুহম্মদিয়া ত্বরীকা কোন নতুন তরীকা নয়। বরং পাক ভারত উপমহাদেশে মশহুর ত্বরীকাগুলোর যেমন, কাদেরীয়া, চিশ্তিয়া, নকশ্বন্দীয়া, মুজাদ্দেদীয়া, সোহ্রাওয়ার্দীয়া তরিকাগুলোর নির্যাসমাত্র। এই তরিকায় নতুন কোন সবক সন্নিবেশিত করা হয়নি। বরং হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সূক্ষ্মতিসূক্ষ্ম সুন্নত অনুসরণই হচ্ছে- এই তরীকার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেমন, কাফির, মুশরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ-জিহাদ করেছেন, দ্বীনের দাওয়াত দিয়েছেন, হিজরত করেছেন, বিধবা বিবাহ্ করেছেন, সবার আগে সালাম দিয়েছেন, দুস্থঃ ও ইয়াতিমদের মাথায় হাত বুলিয়েছেন, জানাযার নামাজ ও রোগীদের খবরা-খবর নিয়েছেন, শত্রু কর্তৃক বিষপানে আক্রান্ত হয়েছেন ইত্যাদি ইত্যাদি সুন্নতগুলো আল্লাহ্ পাক-এর খাছ ওলী হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ)-এর জীবন মোবারকেও দেখতে পাওয়া যায়। বাংলার বুকে ৫৫ বছর হিদায়াতকারী আলামুল হুদা হযরত মাওলানা কারামাত আলী জৈনপুরী (রঃ) তাঁর “যাদুত তাকওয়া” কিতাবের ১২৭-১২৮-১২৯ পৃষ্ঠায় এ সম্পর্কে বলেন, আমিরুল মু’মিনীন হযরত মুর্শিদে বরহক (কোঃ সেঃ আঃ)-এর তরীকার নাম তরিকায়ে মুহম্মদিয়া বা আওর মুহম্মদিয়া রাখার কারণ এই যে, আউলিয়া-ই-কিরাম (রঃ) রূহানীভাবে কোন না কোন নবী (আঃ)-এর অধীনে থেকে ত্বরক্কীলাভ করেন। যে ওলী যে নবীর অধীনে থাকেন, সে ওলীর জন্য সেটাই মাশরাব। আমার মুর্শিদে বরহক হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অধীনে অর্থাৎ (মুহম্মদি উল মাশরাবের অন্তর্ভূক্ত) ছিলেন। এই জন্য নিজের তরীকার নাম তরীকায়ে মুহম্মদিয়া রেখেছেন। কলকাতার মাওলানা হযরত গোলমি সুবহান মুর্শিদ ক্বিবলাকে “তরীকায়ে মুহম্মদিয়া” নাম রাখার কারণ জিজ্ঞেস করলে, জাওয়াবে তিনি বলেন, মনে কর যেমন, এক বাদশাহ্ কোন শহরে ছিল। ঐ বাদশাহ্র নানা প্রকার কারিগরি এবং শিল্পের প্রতি খুব আগ্রহ। এই কারণে ঐ শহরের যত কারিগর আছে সকলেই নিজ নিজ কারিগরী ও শিল্প কার্যানুযায়ী বাদশাহ্কে সন্তুষ্টি করে এবং এর দ্বারা বাদশাহ্র নৈকট্য পদ মর্যাদা লাভ করে। এই ভাবে প্রত্যেকেই নিজের কারিগরী নৈপুণ্যতা দ্বারা বাদশাহ্র নৈকট্য লাভ করে। তারা সবাই বাদশাহ্র প্রিয় পাত্র। তাদের মধ্যে কোন ব্যক্তি এমন করতে থাকেন যে, তিনি সমস্ত প্রকার কারিগরী ও শিল্প কাজ সম্বন্ধে অভিজ্ঞ এবং সে বাদশাহ্র নিকটতম ব্যক্তি। আর সে ব্যক্তি সর্বদাই বাদশাহ্র নিকটে থাকে যাতে বাদশাহ্ প্রয়োজন মত তার দ্বারা যে সময় যে কাজের দরকার সে কাজ করাতে পারেন। অতএব এ থেকে বুঝে নিবে আমাদের দ্বীনের যত ধর্মীয় আমির অতিবাহিত হয়েছেন। যেমন, হযরত গাউসুল আযম বড় পীর সাহেব (রঃ), হযরত খাজা মুঈনুদ্দীন চিশ্তী (রঃ), হযরত খাজা বাহাউদ্দীন নক্শবন্দ (রঃ) তাঁরা সকলেই ছিলেন আমাদের দ্বীনের (ইল্মে শরীয়ত ও তরীকতের) ইমাম। আর এই সমস্ত বুযুর্গানে দ্বীনের তরীকায় আমি বাইয়াত হয়েছি। আমি দাবি করিনা যে, আমি তাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। কিন্তু আমাকে তাদের তরীকায় চলার দরুণ আল্লাহ্ পাক এমন যোগ্যতা দান করেছেন, যার জন্য যিকির শোগলের মধ্যে মশগুল থাকি এবং আল্লাহ্ পাক হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে খাছ করে যে নিয়ামত দান করেছেন তা হতে উম্মত হিসেবে এই অধম বান্দাকেও সামান্য কিছু দান করেছেন। তাহলো- জিহাদের হুকুম (শরীয়তের নির্দিষ্ট হুকুম) জারী এবং ক্বিসাস (প্রতিশোধ গ্রহণের আইন) চালু এবং শিরক ও বিদ্য়াতের প্রতিরোধ করা ইত্যাদি। মহা মহিমান্বিত আল্লাহ্ পাক-এর মেহেরবানীতে নিজের মধ্যে এই সমস্ত কাজ চালু করার যোগ্যতা ও ক্ষমতা পাচ্ছি। আর আল্লাহ্ পাক  আয্যা ওয়া জাল্লাহ হক সুবহানাল্লাহু তা’আলা আমাকে এমন ক্ষমতা দান করেছেন, যার ফলে আমি এমন ধারণা ও ইচ্ছা পোষণ করছি যে, কাফিরদের মোকাবিলায় ঘোড়ায় চড়ে যুদ্ধের অস্ত্র, তলোয়ার, তীর, নেজা, কামান বন্ধুক ইত্যাদি নিয়ে যুদ্ধের পোষাক পরিধান করে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলইহি ওয়া সাল্লাম-এর কালিমার আওয়াজ বুলন্দ করার মানসে ঐ কাফিরদের সঙ্গে জিহাদ করবো। আল্লাহ্ প্রদত্ত ক্ষমতায় নিজের হাতে পরিখা খনন করবো, কুঠার নিয়ে লাকড়ি ফাড়বো এবং হুদুদ কিসাস জারী করতে পারবো। অতএব এই বিশেষ নিয়ামতের বদৌলতে আনন্দচিত্তে নিজের তরীকার নাম তরিকায়ে মুহম্মদিয়া রেখেছি।” অতএব বুঝা গেল, এই “তরীকায়ে মুহম্মদিয়া” নজদের শায়খ আব্দুল ওহাব নজ্দীর প্রবর্তিত “মুহম্মদী আন্দোলন” -এর সাথে কোনই সম্পর্ক নেই।

হযরত শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্ মুহাদ্দিস দেহলভী (রঃ), হযরত শাহ্ আব্দুল আজিজ মুহাদ্দিস দেহলভী (রঃ), হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ) ও মুহম্মদ ইবনে আব্দুল ওহাব নজদীর সময়কালের পার্থক্য ও প্রাসঙ্গিক কিছু কথা

ভারতীয় উপমহাদেশে ইমামুল হিন্দ হযরত শাহ্ ওয়ালী উল্লাহ্ মুহাদ্দিস দেহলভী (রঃ)-এর সময়কাল হচ্ছে- ১১১৪ থেকে ১১৭৬ হিজরী। আর সিরাজুল হিন্দ হযরত শাহ্ আব্দুল আজীজ মুহাদ্দিস দেহ্লভী (রঃ)-এর সময়কাল ১১৫৯ থেকে ১২৩৯ হিজরী পর্যন্ত। হযরত সাইয়্যিদ আহমদ বেরেলভী (রঃ)-এর সময় হচ্ছে ১২০১ থেকে শুরু এবং ১২৪৬ এ গিয়ে তাঁর সময় শেষ হয়েছে। হযরত শাহ্ ওয়ালী উল্লাহ্ মুহাদ্দেস দেহলভী (রঃ)-এর সাথে তাঁর সময়ের পার্থক্য হচ্ছে তিনি যখন দুনিয়া থেকে বিদায় নেন অর্থাৎ তার ইন্তিকালের পঁচিশ বছর পর হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ) জন্মগ্রহণ করেন। হযরত শাহ্ আব্দুল আজীজ মুহাদ্দিস দেহলভী (রঃ)-এর জন্মের বিয়াল্লিশ বছর পর হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ) জন্মগ্রহণ করেন এবং হযরত শাহ্ আব্দুল আজীজ মুহাদ্দেস দেহলভী (রঃ) যখন ১২৩৯ সালে এই ফানী দুনিয়া থেকে ইন্তিকাল করেন তারও সাত বছর পর পর্যন্ত তিনি জীবিত ছিলেন। অর্থাৎ আমিরুল মু’মিনীন (রঃ)-এর জীবিত অবস্থাতেই হযরত শাহ্ আব্দুল আজীজ মুহাদ্দেস দেহলভী (রঃ) ইন্তিকাল করেন। এখন একটি প্রশ্ন উঠতে পারে, হযরত শাহ্ আব্দুল আজীজ মুহাদ্দেস দেহলভী (রঃ) যাঁকে দুনিয়ার সকল আলেম, ফাযেল, সূফী-দরবেশ, মুহাদ্দেস, মুফাস্সীর সকলেই একবাক্যে চিনে এবং যার সীলসীলা উপমহাদেশে অত্যান্ত মকবুল ও মশহুর। আর তারই সুযোগ্য এবং প্রধান খলীফা হচ্ছেন, আমিরুল মু’মিনীন হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ)। যাঁর কামালত বেলায়েত বুযুর্গী ও কাশ্ফ কারামতের কথা বলার অপেক্ষা রাখেনা। যার বাতিনী নিয়ামতের কাছে হযরত শাহ্ ওয়ালী মুহাদ্দেস দেহলভী (রঃ)-এর গোটা খানদানই সম্পূর্ণরূপে ঝুকে গিয়েছিলো। হযরত শাহ্ আব্দুল আজীজ মুহাদ্দেস দেহলভী সাহেব (রঃ) আপন প্রধান খলীফা ও মুরীদের চরম উন্নতি দেখে যার নিকট বাইয়াত হওয়ার কথা পর্যন্ত চিন্তা করেছিলেন। এখন তিনি যদি এই ধরণের আপত্তিকর ত্রুটি ও গলদ করতেন তাহলে হযরত শাহ্ সাহেব (রঃ) জীবিত থাকা অবস্থায় তাকে কি শুধুরিয়ে দিতেন না? অথবা হযরত শাহ্ সাহেব (রঃ)-এর তা’লীম তরবীয়ত ও ইসলাহের পদ্ধতির মধ্যে কি এ ধরণের জঘন্য ত্রুটি প্রচ্ছন্ন বা লুক্কায়িত ছিল? যা প্রকাশ ঘটেছে হযরত সাইয়্যিদ সাহেবের মাধ্যমে। (নাউযুবিল্লাহ্ মিন যালিক)

          একমাত্র গোমরাহ্ সম্প্রদায় ব্যতীত হযরত শাহ্ আব্দুল আজীজ মুহাদ্দিস দেহলভী (রঃ)-এর প্রতি এই ধরণের কুটক্তি বা বদ্গুমানী কেহই অন্তরে স্থান দিবেনা।

          অপরদিকে হযরত শাহ্ ওয়ালী উল্লাহ্ মুহাদ্দেস দেহলভী (রঃ)-এর সময়ের সাথে(১১১৪-১১৭৬) মুহম্মদ ইবনে আব্দুল ওহাব নজ্দীর সময়ের পার্থক্য হচ্ছে (১১১১-১২০৩)। অর্থাৎ হযরত শাহ্ ওয়ালী উল্লাহ্ মুহাদ্দেস দেহলভী (রঃ) ও নজ্দের মুহম্মদ বিন আব্দুল ওহাব নজ্দী একই সময়কালের। যদিও হযরত শাহ্  সাহেব (রঃ) মুহম্মদ বিন আব্দুল ওহাব নজ্দীর তিন বছর পর জন্মগ্রহণ করেন। আর নজ্দীর মৃত্যুর ২৭ বছর আগেই দুনিয়া থেকে রোখসত নেন। আর হযরত শাহ্ আব্দুল আজিজ (রঃ) নজ্দীর জন্মের ৪৮ বছর পর জন্মগ্রহণ করেন এবং নজ্দীর মৃত্যুর ৩৬ বছর পর ইন্তিকাল করেন। এবং হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ) (১২০১-১২৪৬) ও নজ্দীর সময় (১১১১-১২০৩) কালের পার্থক্যের মধ্যে ব্যবধান হচ্ছে, মুহম্মদ ইবনে আব্দুল ওহাব নজ্দী যখন দুনিয়া থেকে বিদায় নেয় তখন হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ) ছিলেন প্রায় দুই বছরের শিশু এবং এটাই ঐতিহাসিক বিশুদ্ধ রেওয়াত।

          তাহলে সাধারণ আক্বলের প্রশ্ন, (প্রায়) দুই বছরের এই শিশু হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ) মুহম্মদ ইবনে আব্দুল ওহাব নজ্দীর ছাত্র, শিষ্য অনুসারী হতে পারে? এটা পাগলের প্রলাপ বৈঃ নয়।

          যদি তরীকায়ে মুহম্মদীয়ার মাধ্যমে দাওয়াত দিলেই  মুহম্মদ ইবনে আব্দুল ওহাব নজ্দীর শিষ্য, ছাত্র, অনুসারী হয়ে যায় তাহলে বিরুদ্ধবাদী ও বিদ্বেষ পোষণকারীদের সূত্রানুযায়ী হযরত শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্ মুহাদ্দিস দেহলভী (রঃ) ও তাঁর সাগরীদগণ তারপর হযরত শাহ্ আব্দুল আজীজ মুহাদ্দেস দেহলভী (রঃ) ও তাঁর সাগরীদগণ মুহম্মদ ইবনে আব্দুল ওহাব নজ্দীর শিষ্য হওয়ার কথা। (নাউযুবিল্লাহি মিন যালিক)

          কেননা হযরত শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্ মুহাদ্দেস দেহলভী (রঃ) ও হযরত শাহ্ আব্দুল আজীজ মুহাদ্দেস দেহলভী (রঃ)ও  এই তরিকার কাজ করেছেন। আর এই তরীকা কোন নতুন তরীকা নয় বরং পাক ভারত উপমহাদেশে মশহুর তরীকাগুলোর নির্যাসমাত্র। হযরত শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্ মুহাদ্দিস দেহলভী (রঃ) ও হযরত শাহ্ আব্দুল আজীজ মুহাদ্দেস দেহলভী (রঃ)-এর পর এ তরীকার প্রচার-প্রসারের দায়িত্ব এসে যায় আমীরুল মু’মিনীন হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ)-এর উপর। তবে বিশেষ করে এবং খাছ ভাবে আল্লাহ্ পাক ও হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পক্ষ থেকে এই তরীকায়ে মুহম্মদিয়ার খাছ কামালত ও বেলায়েত দান করেন হযরত সাইয়্যিদ সাহেব (রঃ)কে এবং এই তরীকার ইমাম হিসেবে তাঁকে মনোনীত করেন তিনি স্বয়ং নিজেই। এ সম্পর্কে বলেন, “আমি আল্লাহ্ পাক-এর রাসূল হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাতে হাত দিয়ে বাইয়াত হয়েছি। অতঃপর তিনি আমাকে তরীকা দিলেন। আর আমার ত্বরীকার নাম দিলেন বা রাখলেন- “তরীকায়ে মুহম্মদিয়া।”

          যদিও তিনি হযরত শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্ মুহাদ্দেস দেহলভী (রঃ) ও হযরত শাহ্ আব্দুল আজীজ মুহাদ্দেস দেহলভী (রঃ)-এর উত্তরসূরী হিসেবে এই তরীকা প্রচার-প্রসারের মাধ্যমে মানুষদেরকে দাওয়াত দিয়েছেন। কিন্তু সত্যিকারভাবে মূলতঃ তিনিই হচ্ছেন এই তরীকার ইমাম।

          কাজেই এই মুহম্মদিয়া ত্বরীকার প্রচার-প্রসারের জন্য যদি তাঁকে ওহাবী বলা হয় এবং তাঁর উপর  অপবাদ ও তোহ্মত  দেয়া হয় তবে হযরত শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্ মুহাদ্দেস দেহলভী (রঃ) ও হযরত শাহ্ আব্দুল আজীজ মুহাদ্দেস দেহলভী (রঃ)কে কেন ওহাবী বলা হবেনা? এবং তাঁদের উপরও কোন মিথ্যা তোহ্মত দেয়া হলোনা? মূলতঃ ইহা এক বিরাট ষড়যন্ত্র ও মিথ্যার সংমিশ্রণ ইতিহাসের প্রতি অন্যায় ও অসদ্বাচরণ। আর এর জন্য দায়ী বৃটিশ বেনিয়া ইংরেজ জাতি এবং আহমদ রেযা খান সাহেব ও তার অনুসারীরা। কারণ তারাই বৃটিশদের সাথে তাল মিলেয়ে  অপবাদ ছড়িয়েছে।

মুহম্মদ ইবনে আব্দুল ওহাব নজ্দীর সংক্ষিপ্ত পরিচয় ও তার আক্বীদা

 মুহম্মদ ইবনে আব্দুল ওহাব নজদীর পরিচয় সম্পর্কে ফতওয়ায়ে “শামী, ইশয়াতে হক্ব, ওহাবীদের ইতিহাস, ওহাবীদের উৎপত্তি, সাইফুল মাযহাব, মাযহাব কি ও কেন, সাইফুল জাব্বার” ইত্যাদি কিতাবে মুহম্মদ ইবনে আব্দুল ওহাব নজদীর পরিচয় সম্পর্কে এইভাবে বর্ণিত আছে,  মুহম্মদ ইবনে আব্দুল ওহাব নজদী ১১১১ হিজরী মোতাবেক ইংরেজী ১৭০৩ সালে আরবের নজ্দ প্রদেশে জন্মগ্রহণ করে। তার পিতার নাম আব্দুল ওহহাব। তার বড় ভাই এর নাম সুলায়মান। পিতা ও ভ্রাতা দু’জনই তৎকালে দেশে হক্কানী বিজ্ঞ আলেম নামে খ্যাত ছিলেন। কিন্তু আব্দুল ওহাবের কণিষ্ঠ পুত্র “মুহম্মদ ইবনে আব্দুল ওহহাব” অত্যন্ত উদাসীন ও গোঁড়ামী চরিত্রের অধিকারী ছিল। তাই সে তার পিতা ও ভ্রাতার মতের বিপরীত চলতো এবং প্রায়ই তাদের বিরূদ্ধচারণ করতো এবং মনগড়া নতুন মত প্রচার করে ফিৎনা পয়দা করতো। তার ভ্রান্ত আক্বীদাগুলির সাথে সেই জামানার হক্কানী-রব্বানী আলেমগণ একমত হতে পারেননি। ফলে সে বহু আলেম, সূফী, দরবেশ, মুত্তাকীদের উপর ষ্টিম রোলারের ন্যায় অত্যাচার চালায় এবং তাঁদের অনেককে সে হত্যা করে ফেলে।

নজ্দ প্রদেশ সম্পর্কে হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ভবিষ্যৎবাণী

আব্দুল ওহাব নজ্দীর ফিৎনা সম্পর্কে হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভবিষ্যৎবাণী করেছেন এভাবে,

 عن ابن عمر قال قال النبى صلى الله عليه وسلم اللهم بارك لنا فى شامنا اللهم بارك لنا فى يمننا قالوا يا رسول الله صلى الله عليه وسلم وفى نجدنا قال اللهم بارك لنا فى شامنا اللهم بارك لنا فى يمننا قالوا يا رسول الله صلى الله عليه وسلم وفى نجدنا فاظنه قال فى الثالثة هناك الزلازل والفتن وبها يطلع قرن الشيطان.

অর্থাৎ- হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে ওমর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দোয়া করলেন। আয় আল্লাহ্ পাক! আমাদের শ্যাম ও ইয়েমেন দেশে বরকত দিন। তখন সাহাবা-ই-কিরাম (রাঃ) আরজু করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্ সাাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমাদের নজ্দের জন্য দোয়া করুন। হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবার শ্যাম ও ইয়েমেনের জন্য বরকতের দোয়া করলেন। আবার তাঁরা বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমাদের নজ্দের জন্য বরকতের দোয়া করুন। তবুও হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নজদের জন্য দোয়া অস্বীকার করে বললেন, আমি নজ্দের জন্য কি করে দোয়া করবো? কারণ নজ্দে তো ভূমিকম্প ও ফিৎনার সৃষ্টি হবে এবং তথায় শয়তানী দলের উৎপত্তি হবে। (বুখারী  শরীফ ২য় খন্ড পৃষ্ঠা ১০৫১, মিশকাত শরীফ ৫৮২ পৃষ্ঠা)

          রাসূল পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ভবিষ্যৎবাণীর ফলে ১১১১ হিজরীতে নজ্দে আব্দুল ওহাবের ঘরে মুহম্মদ ইবনে আব্দুল ওহাবের জন্ম হয়। ১১৪০ হিজরী হতে এই মুহম্মদ ইবনে আব্দুল ওহাব নজ্দীর ফিৎনা সৃষ্টি হয়। সে আহ্লে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের বিরুদ্ধে দল তৈরী করে খাঁটি মুসলমানদেরকে পাইকারীহারে হত্যা করতে থাকে। এমনকি মক্কা শরীফ ও মদীনা শরীফের সম্মানিত স্ত্রী ও কুমারীদের সহিত ব্যভিচারে লিপ্ত হয় এবং তাদের দাস-দাসী বানায়। মসজিদে নববীর মূল্যবান বিছানা ও বাতিগুলো নজ্দে নিয়ে যায়। হযরত সাহাবা-ই-কিরাম (রাঃ) ও হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর খান্দানের মাজার শরীফগুলো চুরমার করে দেয়। এমনকি হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর রওজা শরীফ ভেঙ্গে দেয়ার জন্যও একদল (নজ্দীর অনুসারী) উদ্যত হলে মহান আল্লাহ্ পাক এক সাপ পাঠিয়ে তাদের হত্যা করলেন।

          মুহম্মদ ইবনে আব্দুল ওহাব নজ্দী ও তার অনুসারীদের আক্বীদাগুলো নিম্নরূপ- (১) সে বলেছে, ৬০৬ হিজরী হতে তার সময় কাল পর্যন্ত সমস্ত উম্মতগণ কাফির।

(২) যে ব্যক্তি তার মতাবলম্বী হবে সে মু’মিন। আর যে তার মতাবলম্বী হবে না সে বড় মুত্তাকী হলেও কাফির-মুশরিক।

(৩) হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রকৃত পক্ষে রাসূল ছিলেন না বরং তারেশ (বাহক) ছিলেন। (নাউযুবিল্লাহ্)

(৪) হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি দরুদ পড়া মাকরূহ। সে আরো বলে নবীর প্রতি দরূদ পাঠকারী ব্যক্তির চেয়ে জেনাকারিনী বেশ্যা কম পাপী। (আসতাগফিরুল্লাহ্)

(৫) সাহাবা, তাবেঈন, ইমাম-মুজতাহীদগণ কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াস হতে যে মাসয়ালা বের করেছেন সে তা মানতে নারাজ।

(৬) তার মতে চার ইমামের অধিকাংশ কথাই ভূয়া। তা শরীয়তের কথা নয়। তারা ভ্রষ্ট ছিলেন এবং মানুষদেরকেও ভ্রষ্ট করেছেন।

(৭) সে জুমুয়ার দিনে মসজিদে খুৎবার সময় খোঘণা দিত, যারা নবীর উসীলা ধরে তারা অবশ্যই কাফির।

(৮) নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর রওজা শরীফ যিয়ারত করা নিষেধ।

(৯) নবী, ওলী, সূফী, বুযুর্গ কারো উসীলা দিয়ে যে দোয়া করবে সে মুশরিক।

(১০) তার মতে ঈমানের ভিত্তি ৬টি। কলিমা, নামায, রোজা, হজ্ব, যাকাত ও তার অনুগামী হওয়া।

(১১) নফল নামাজ, যিকির, তাসবীহ্, অযিফা, দরূদ, মীলাদ শরীফ ইত্যাদি পড়া সম্পূর্ণ নিষেধ।

(১২) নবী (আঃ)গণ ওফাতের পর কবরে জীবিত নন।

(১৩) দালায়েলুল খায়রাত, কাসিদায়ে বুরদা এবং এই জাতীয় দরুদ শরীফের কিতাবগুলি তারা বিদ্য়াত বলে জ্বালিয়ে দিয়েছে।

(১৪) তার অনুসারীরা নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর রওজা শরীফ জিয়ারত করতে নিষেধ করে থাকে।

(১৫) তারা বলে থাকে আমরা কুরআন হাদীস ছাড়া আর কোন কিছু মানবনা। এবং কেউ যদি বলে আমি মিছরী, শামী, হিন্দী, শাফী, হানাফী ইত্যাদি তা মানিনা। আমরা কোন ইমাম বা আলেমের ইক্তেদা ও তাকলীদ করবনা। ইত্যাদি ইত্যাদি।

          বলা জরুরী যে, নজ্দ প্রদেশের এই মুহম্মদ ইবনে আব্দুল ওহাব নজ্দী এবং তার দল ও দেশ সম্পর্কে যেখানে রাসূল পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দোয়া করেননি যার আমল-আক্বীদার সাথে পৃথিবীর আহ্লে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের কোন আলেম, ফাযেল, ফক্বীহ্, সূফী, মুহাদ্দিস, মুফাস্সিরগণ একমত নয় সেখন এই রেযা খানী মাযহাবীগণ কি করে কুটচালে আমীরে মুজাহিদ, শহীদে আযম (রঃ)-এর গোটা জামায়াতকে তার দলের সাথে সামাজস্যপূর্ণ বা ওহাবী বলে আখ্যা দিলো?

          মূলতঃ যাদের আক্বীদা, চিন্তা-চেতনার মধ্যে ত্রুটি ও গন্ডগোল রয়েছে তাদের পক্ষেই এই কারসাজী ও ছলছাতুরী করা সম্ভব।

হিন্দুস্থানের আকাবিরে উলামায়-ই-কিরাম ও পীর-মাশায়েখ (রঃ)গণের বাইয়াত গ্রহণ

          খলীফাতুল মুসলিমীন, আমিরুল মু’মিনীন, হযরত সাইয়্যিদ আহম্মদ শহীদ (রঃ)-এর শোহ্রত ও খ্যাতি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়লো। তাঁর এক দৃষ্টি বা সামান্য সোহ্বতে বহু সাধনার কষ্ট লাঘব হতে লাগলো। সমস্ত সৃষ্টি তাঁর দিকে ঝুকে পড়লো। বিশেষ করে হিন্দুস্থানের আকাবিরে আলেম সমাজ ও পীর-মুর্শিদগণ তার সোহ্বতে থেকে ফয়েজ হাসিল করার জন্য তার দরজায় ধরা দিলেন। তাঁর দরবারে হাজির হয়ে সকলেই নিজেকে ধন্য মনে করলেন। এদের মধ্যে ইমামুল হুদা হযরত মাওলানা কারামত আলী জৈনপুরী (রঃ), হযরত মাওলানা আব্দুর রহীম বেলায়েতী (রঃ,) হযরত মাওলানা আব্দুল হাই (রঃ) (হযরত শাহ আব্দুল আজীজ মুহাদ্দিস দেহলভী (রঃ)-এর জামাই), হযরত শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলভী (রঃ)-এর পৌত্র হযরত মাওলানা ইসমাঈল শহীদ (রঃ), হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজেরে মক্কী (রঃ)-এর পীর সাহেব হযরত নূর মুহম্মদ মিয়াঁজী (রঃ), হযরত মাওলানা হাফেজ জামাল উদ্দীন (রঃ), কাজিউল কুজাত মাওলানা আব্দুল বারী (রঃ), মাওলানা আব্দুল হাকিম (রঃ) মাওলানা শিহাবুদ্দীন শিয়ালকোর্ট (রঃ), হযরত মাওলানা শুজাত আলী রামপুরী (রঃ) প্রমুখ নামজাদা আলেমগণ তাঁদের সমস্ত অস্তিত্ব বিলীন করে তাঁর থেকে বাইয়াত হয়ে ফয়েজ হাছিল করে নিজেকে ধন্য মনে করলেন। যখন আলেম কুল শিরোমনি হযরত মাওলানা আব্দুল হাই (রঃ) তাঁর নিকট বাইয়াত হলেন, তখন দিল্লীতে একটা সাড়া পড়ে গেলো। কেউ বললো, আপনি এত বড় আলেম, ফাযিল হওয়া সত্বেও তাঁর নিকট বাইয়াত হওয়ার কি দরকার ছিলো? জবাবে তিনি বলেন আমি হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ)-এর নিকট বাইয়াত হয়ে তাঁর পিছনে মুক্তাদি হিসেবে দু’রাকাত নামাজ পড়েছি। ঐ দু’রাকাত নামাজে আমার যা কিছু হাসিল হয়েছে তা সারাজীবনেও হয়নি। ঐ দু’রাকায়াত নামাজে তাঁর নিকট সালাতের হাক্বিকত জাহির হয়েছিল। তিনি নামাজে সরাসরি কাবাঘর দেখতে পেয়েছিলেন। তিনি আরো বলেন, আমি সাইয়্যিদ সাহেব(রঃ)-এর পিছনে হযরত সাহাবা-ই-কিরাম (রাঃ)গণের ন্যায় নামাজ পড়ার স্বাদ পেয়েছি। হযরত শায়েখ আব্দুর রহীম বেলায়েতী (রঃ) যাঁর হাজার হাজার মুরীদ ছিল। যিনি হাজী এমদাদুল্লাহ্ মুহাজিরে মক্কী (রঃ)-এর দাদা পীর সাহেব। তিনি সব ত্যাগ করে তাঁর নিকট বাইয়াত হয়েছিলেন। তিনি বলেন, সুলুকের রাস্তায় চলতে কারো নিকট বাইয়াত হওয়ার প্রয়োজন নেই আমার। কিন্তু সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী(রঃ)-এর হাতে বাইয়াত হয়ে যাওয়ার ব্যাপারে রাসূল পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সন্তুষ্টি নিহীত রয়েছে বলে আমার বিশ্বাস।

হিজরত ও শিখদের বিরুদ্ধে

জিহাদ ঘোষণা

মুঘল সাম্রাজ্য পতনের পর ভারত বিবিধ সমস্যার সম্মুখীন হয়ে পড়ে। আওরঙ্গজেব (রঃ)-এর পরবর্তী অধিকাংশ শাসকগণ ছিল বিলাস প্রিয় জীবনে অভ্যস্ত ও দেশ পরিচালনায় অনুপযুক্ত। ফলে বিদেশী শক্তি তাদের উপর চেপে বসে। প্রথমতঃ যেমন ইংরেজ শক্তি বাণিজ্য করার নামে উপমহাদেশের বিপুল সম্পদ কুক্ষিগত করার জন্য মুঘল শাসন পতনের অপেক্ষায় ছিল। এছাড়া ইরানের নাদীর শাহ, আফগানিস্থানের আহম্মদ শাহ আবদালীর আগমণ বিবিধ সম্পদ লুক্তন, হত্যা যজ্ঞ কার্য পরিচালনার মধ্য দিয়ে ভারতবর্ষ ধ্বংসের মুখোমুখি হলো। দ্বিতীয়তঃ মারাঠা ও পাঞ্জাব সীমান্তে শিখদের যুলুম অত্যাচার এর মাত্রা এত বৃদ্ধি পেয়েছিল যে, মুসলমানদের শান্তিতে বসবাস করাই অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। সেই সময় শিখদের অত্যাচারে মুসলমানগণ কত যে অসহায় ছিলো তার সত্যিকার পরিচয় মিলে হযরত শাহ আব্দুল আযীয মুহাদ্দিস দেহলভী (রঃ)-এর একটি কবিতার মধ্যে। তিনি তাঁর স্বচক্ষে দেখা শিখদের অত্যাচার সম্পর্কে কাব্যিক ভাষায় বলেন-

আল্লাহ পাক! শিখ ও মারাঠাদের প্রতিশোধ নিন,

তাদের ঘৃণ্য উপদ্রব নিকটে, দূরে নয়।

তারা আমাদের অনেককে হত্যা করেছে।

শীতকাল প্রায় আগত, তাই মন উৎকক্তিত শিখদের ভয়ে, এবং সেই ভয় যথার্থ।

আল্লাহ পাক তাদের এদেশ থেকে উচ্ছেদ করুন!

যেহেতু তারা নিকৃষ্ট শত্রু আর তারা সন্ত্রাসের সমষ্টি।

          হযরত শাহ্ আব্দুল আজীজ মুহাদ্দেস দেহলভী (রঃ)-এর এ কবিতা হতে বুঝা যায় তৎকালে শিখ সম্প্রদায় মুসলমানদের জন্য কত ভয়ের কারণ ছিল। তারা পাঞ্জাবের মুসলমানদের উপর জোর-জুলুম চালাতো। মসজিদ গুলিকে ঘোড়ার ঘর বানিয়েছিল। লাহোরের শাহী মসজিদের হুজরা গুলি শাহী আস্তা বলে পরিণত করেছিল। আজানের উপর নিষেধাজ্ঞা জারী করেছিল। মুসলিম নর-নারীদের মান সম্ভ্রম নষ্ট করতো এবং তাদের দ্বারা দাসীবান্দীর কাজ জোর করে করানো হতো। সীমান্তে মুসলমান কৃষকদের শস্যের ক্ষেতগুলি ও তাদের বাড়ী ঘরে প্রায় সময় আগুন ধরিয়ে দেয়া হতো। অন্যান্য ইসলামী শরীয়ত, হুকুমত সেখানে পালন করা কোন অবস্থাতেই সম্ভবপর ছিল না। মোট কথা সেখানকার সমগ্র মুসলমান হতাশা, বঞ্চনা ও অবমাননাকর অবস্থায় মধ্য দিয়ে দিন গুজরান করছিল। তারা একজন নিঃস্বার্থ ও নিবেদিত মুসলিম আমীরের প্রতীক্ষায় ছিল। যিনি তাদের এহেন অবস্থায় থেকে বিশেষ করে শিখদের কবল থেকে মুক্তি দিতে পারেন।

          মুজাহিদে মিল্লাত, হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ) মুসলমানদের এ অবস্থা লক্ষ্য করে সীমান্তে বিশেষ করে সারা ভারতে তাগুত শক্তির বিরুদ্ধে জিহাদের ডাক দিলেন। এতে তার সঙ্গী-সাথী, খলিফা ও সাধারণ মানুষের মধ্য থেকে বিপুল সাড়া পাওয়া গেল। ইতোমধ্যে তিনি কয়েকবার ভারতবর্ষের এ প্রান্ত থেকে ঐ প্রান্ত পর্যন্ত সফর করে সরে জমিনে মুসলমানদের দুরাবস্থা পর্যবেক্ষন করেছিলেন। ১২৪১ হিজরী ৭ই জমাদিউস্ সানি মোতাবেক ইংরেজী ১৮২৬ সালের ১৭ই জানুয়ারী তিনি তার মাতৃভূমি রায় বেরেলভীর নিজস্ব বাড়ি থেকে স্ত্রী-সন্তান, আত্মীয়-স্বজন ত্যাগ করে সারা জীবনের জন্য  আল্লাহ্ পাক-এর রাস্তায়  বেরিয়ে পড়েন। শাহাদত লাভের আগ পর্যন্ত আর কোন দিন দেশে ফেরেননি। তিনি রাজপুতনা, মারওয়াড়, সিন্ধু, বেলুচিস্থান, আফগানিস্থান ও সীমান্তের বিভিন্ন গিরি পর্বত, বন জঙ্গল, মালভূমি, নদী-নালা অতিক্রম করে শিখদের এলাকায় এসে তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। শিখদের সাথে তাঁর যে সমস্ত যুদ্ধ হয়েছে তার মধ্যে নওশেরার যুদ্ধ, সিদুর যুদ্ধ, আকোড়ার যুদ্ধ, পানজ তারের যুদ্ধ, মায়ার যুদ্ধ, মর্দান যুদ্ধ ও বালাকোটের যুদ্ধ প্রধান।

বালাকোটের জিহাদ ও মুজাহিদে মিল্লাত, আমিরুল মু’মিনীন, হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ)-এর শাহাদত লাভ

          আলামুলহুদা, মুজাহিদে আজম, হযরত সাইয়্যিদ আহমদ বেরেলভী (রঃ)-এর শাহাদত লাভ ও বালাকোটের জিহাদের আলোচনা করার আগে তাঁর আরো একটি আশ্চর্য ও বিস্ময়কর বড় কারামতের আলোচনা না করলে এই সুওয়ালটির দীর্ঘ জবাবই যেন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। আর তা হচ্ছে- একবার তাঁর কিছু খাছ খলীফা ও মুরীদান তাঁকে অত্যন্ত আদরের সহিত জিজ্ঞাসা করলো, হুজুর ক্বিবলা! এই ভারত বর্ষের লোকেরা হচ্ছে, পীর ও মাযার ভক্ত। এদেশে এমন বহু অশিক্ষিত, আনপড়, বিদ্য়াতী, ভন্ড, ফকীর আছে যারা কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ ও শরীয়তের কোন জ্ঞানই রাখেনা। তারা গাইরুল্লাহ্র নামে মানত করে থাকে। মাযার শরীফ যিয়ারতের নামে পুরুষ-মহিলা একত্রে বেপর্দা হয়ে শরীয়তের সীমা লংঘন করে ফেলে। বহু লালসালু জটাধারী ভন্ড ফকীর আছে যারা সর্বক্ষণই হযরত আউলিয়া-ই-কিরাম (রঃ)গণের মাযার মোবারকের আশে-পাশে যেয়ে মদ, গাঁজা খেয়ে ঢোল-তবলা, তানপুরা বাজিয়ে সারাক্ষণ নেশার ঘোরে বিভোর হয়ে থাকে। তাদের ধারণা সর্বক্ষণ তারা মাযারে শায়িত বুযুর্গ (রঃ)-এর পাশে এভাবে থাকতে পারলে তাদের দয়া ও নেক দৃষ্টি লাভ করতে পারবে। এছাড়া আমাদের সমাজে আরো দুনিয়া পূজারী বহু নামধারী ভন্ড পীর, ফকির আছে যারা শরীয়তের কোনই তোয়াক্কা করেনা, সর্বক্ষণই কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফের খেলাফ চলে এবং মানুষকে দ্বীন থেকে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। তাদের দরবারেও বহু মানুষের আনাগোনা রয়েছে। আর আপনি হচ্ছেন এই ভারত বর্ষের হক্কানী-রব্বানী বুযুর্গ পীর সাহেবদের পীর-মুর্শিদ। আপনি যদি ইন্তিকাল করেন তবে তো আপনার কামালত বেলায়েতের সম্মানের দিকে লক্ষ্য করে মানুষ আপনার জিস্ম মোবারক মাটিতে না রেখে মাথায় নিয়ে ঘুরে বেড়াবে। মুরীদানদের এই প্রশ্নের জবাবে, সানদুল আউলিয়া, মাশায়েখে আযম, হযরত সাইয়্যিদ আহমদ বেরেলভী (রঃ) বলেন, তোমরা নিশ্চিত থাক, আল্লাহ্ পাক আমাকে তিনটি ওয়াদা দিয়েছেন। প্রথমতঃ আল্লাহ্ পাক আমাকে ওয়াদা দিয়েছেন, আমিও আমার সাথীরা অর্থাৎ মুজাহিদ বাহিনীরা যেখানেই থাকিনা কেন তিনি সেখানেই কুদরতীভাবে রিযিক পৌঁছাবেন। দ্বিতীয়তঃ আমাকে কোন যাদু-টোনা, বান, বিষপান ইত্যাদি করা হলে সেটার কোন ক্রিয়া করবেনা। আর তৃতীয়তঃ  আমার ইন্তেকালের পরে কেউ আমার লাশ (দেহ মোবারক) খুঁজে পাবে না।

          হযরত খলীফাতুল্লাহ্, রঈসুল আউলিয়া, হযরত সাইয়্যিদ আহমদ বেরেলভী (রঃ)-এর এই তিনটি কথাই পরবর্তীতে হুবহু সত্য পরিণত হয়েছিল। যেমন, রিযিকের ব্যাপারে হযরত মুজাহিদে আজম, হযরত সাইয়্যিদ আহমদ বেরেলভী (রঃ) ও তাঁর মুজাহিদ বাহিনীদের দেখা গেছে, তারা এমন এক জনমানবহীন প্রান্তরে অথবা জঙ্গলে মোরাকাবায় মুশাহেদায় মশগুল আছেন অথবা তিনি তার মুজাহিদ বাহিনীদের যুদ্ধ বিদ্যার প্রশিক্ষণ দিচ্ছিলেন। হঠাৎ দেখা গেল কোথা থেকে অচেনা, অজানা অপরিচিত লোক তাদের সামনে উপাদেয় খাদ্য ভরা পাত্র রেখে চলে গেছেন। এই ধরণের ঘটনা কেবলমাত্র তাঁর জীবনে একবার নয় বরং অসংখ্য ও বহুবার দেখা গিয়েছে।

 সিধুর যুদ্ধে মুনাফিকদের ষড়যন্ত্রে তাঁর খাদ্যের মধ্যে বিষ মিশ্রিত করা হয়েছিল। কিন্তু আল্লাহ্ পাক-এর অশেষ মেহেরবানী ও রহমতের কারণে তিনি সেই বিষ মিশ্রিত খাদ্যভক্ষণ করেও সুস্থতা লাভ করেছেন।

          ১৮৩১ সালে শিখদের সাথে বালাকোটের প্রান্তরে যুদ্ধ করতে গিয়ে তিনি শহীদ হয়েছেন। বড় আশ্চর্য ও বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে- ১৮৩১ সালের পর থেকে আজ ২০০০ সালের মধ্যেও অর্থাৎ এই দীর্ঘ প্রায় পৌণ্য দু’শ বছরের ব্যবধানে আজ পর্যন্ত কেউ তার মাযার শরীফের সন্ধান দিতে পারেনি। এমনকি বালাকোট ফেরত তাঁর বহু মুরীদ, খলীফা, মুজাহিদগণ পর্যন্ত যুদ্ধের ময়দানে শাহাদতের পর তার হুবহু শরীর মোবারক দেখেছেন একথারও কোন প্রমাণ বা স্বাক্ষ্য কোন কিতাবে মিলেনা।  (সুবহানাল্লাহ্)

          এ থেকেইে প্রমাণিত হয় যে, মুজাদ্দিদুয্যামান আমিরুল মু’মিনীন (রঃ) কত বড় আল্লাহ্ পাক-এর ওলী ছিলেন। এ ঘটনা আল্লামা নবাব ওয়াজীরুদ্ দৌল্লা (রঃ) তাঁর “ওয়াসীলে  ওয়াজীর আলা তরীকুল বাশীর ওয়ান নাজীর” কিতাবে, আল্লামা গোলাম রসূল মেহের তাঁর বিশ্ব বিখ্যাত “সাওয়ানে আহমদী” কিতাবে এবং শাইখুল হিন্দ, হযরত মাওলানা সাইয়্যিদ আবুল হাসান নদভী তাঁর সাড়া জাগানো সীরাত গ্রন্থ “সীরাতে সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ” কিতাবে বর্ণনা করেছেন।

          হযরত আমিরুল মু’মিনীন (রঃ)-এর জিহাদী আন্দোলনের দু’টি গতিধারা লক্ষ্য করা যায়। প্রথমতঃ ভারতভূমি হতে চিরতরে ইংরেজ শক্তির মূলোৎপাটন করা। দ্বিতীয়তঃ পাঞ্জাবের সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলো হতে শিখ ও পাঠান মুনাফিক মুসলমান সর্দারদের অস্তিত্ব মিটিয়ে দেয়া।

          কেননা শিখদের সাথে সীমান্তের পাঠান মুনাফিক মুসলমান সর্দারগণও স্বার্থের তাগীদে একত্রিত হয়ে গিয়েছিল। কারণ পূর্বে তারা ছিল স্বাধীন। সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোর দেখাশোনার ভার তাদেরই হাতে ন্যস্ত ছিল। তাই তারা জুলুম করে কৃষকদের ফসলের উপর সীমার অতিরিক্ত উশরের বোঝা চাপিয়ে দিয়েছিল। যদি কোন কৃষক উশর দানে অস্বীকৃতি জানাতো তবে তার বাড়ি-ঘরে হামলা চালানো হতো। এবং জায়গা বিশেষ তাদেরকে শিখদের হাতে তুলে দেয়া হতো। আর শরয়ী হুকুমত বলতে এদেরই নিয়মনীতি চলতো। শরীয়তের কোন আইন-কানুনই নিদিষ্টভাবে এই সমস্ত এলাকায় কখনোই চালু করা সম্ভব ছিলনা। একমাত্র এদের দৌরাত্ম্যের কারণে। অবশেষে আমিরুল মু’মিনীন হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ (রঃ)-এর আগমনের কারণে অত্র অঞ্চলগুলোতে শরীয়তের হুকুমাত পূর্ণভাবে চালু হয়। সাধারন মানুষ, কৃষক, দিন মজুর, ব্যবসায়ী যারা ছিল সর্দারদের হাতের পুতুল তারা হাফ ছেড়ে বাঁচলো। কিন্তু বেঁকে বসলো এই মুনাফিক সর্দারগণ যারা দীর্ঘদিন থেকে এ এলাকার রাজস্ব কর, খাজনা ও উষরের ভাগ  নিজেদের ঝুলিতে রাখত। এখন খলীফা সাহেব (রঃ)-এর আগমণের কারণে সেই অবৈধ বাড়তি সুযোগ-সুবিধা জীবনের তরে বন্ধ হয়ে গেল। তাই ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য তারা মুসলমান হয়েও মুনাফিকদের ভূমিকা পালন করে শিখদের সাথে গোপনে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলো।

          স্মরণ থাকা জরুরী যে, সিদুঁর যুদ্ধে এই মুনাফিক সর্দারদের মধ্যে ইয়ার মুহম্মদ খানের প্ররোচনাই হযরত আমিরুল মু’মিনীন (রঃ)-এর খাদ্যে বিষ মিশ্রিতি করা হয়েছিল। সাম্মাবাসীদের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে সেখানে শত শত মুজাহিদদের অকাতরে প্রাণ দিতে হয়েছিল। তারও একমাত্র কারণ ছিল এই পাঠান মুনাফিক মুসলমান সর্দারগণ। আর ধোকাবাজ সুলতান নজফ খানের কারসাজিতেই শের সিংহ তার বাহিনীসহ বালাকোটে এসে পৌছে। নতুবা কোন অবস্থাতেই বালাকোটে মুজাহিদদের ঘাটি সম্পর্কে তার জানা সম্ভব ছিলনা।

          বালাকোটের পশ্চিমে মাটিকোট টিলার পাশাপাশি শের সিংহ তার বাহিনী নিয়ে যুদ্ধের ছাউনি তৈরী করলো। লাহোরের শিখ সর্দার রনজিৎ সিং এর তরফ থেকে কড়া নির্দেশ ছিল যাতে খলীফা সাহেবের মুজাহিদ বাহিনীর সাথে শের সিং এর সৈন্যরা মরণপণ যুদ্ধ চালিয়ে যায়। ফলে বিশেষভাবে বালাকোটে শিখ সৈন্যদের মাশোহারা বৃদ্ধি করে দেয়া হয়। একদিকে ইংরেজ অপরদিকে এই সীমান্তবর্তী মুনাফিক পাঠান সর্দার যারা প্রত্যেকেই ছিল আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাইর চরিত্রে চরিত্র দুষ্ট। তারাও শিখদের সাথে একত্র হয়ে মুজাহিদের বিপক্ষ অবলম্বন করে। শিখদের মাটিকোট টিলায় আগমনের সংবাদ  শুনে হযরত আমীরুল মু’মিনীন (রঃ) ও তাঁর মুজাহিদ বাহিনীদের বিভিন্ন সারিতে বিভক্ত করেন। এবং প্রত্যেক দলের সাথে একজন আমীর নিয়োগ করে তাদের নির্দিষ্ট জায়গা অনুযায়ী মোতায়েন করে রাখেন। হযরত আমীরুল মু’মিনীন (রঃ)-এর তরফ থেকে ফরমান ছিল শিখ সৈন্যরা যতক্ষণ পর্যন্ত মাটিকোট টিলা অতিক্রম করে সমতল ভূমিতে এগিয়ে না আসবে ততক্ষণ পর্যন্ত মুজাহিদদের তরফ থেকে কোন প্রকার যেন গোলাগুলি ছোড়া না হয়। অবশেষে শিখদের তরফ থেকেই প্রথম আক্রমণ করা হয়। কিন্তু সেটা ছিল অতর্কিত এবং মুনাফিক পাঠান  মুসলমান সর্দারদের সহযোগীতায় অত্যন্ত কূট চালে এ পরিকল্পনা করা হয়। দিনের প্রথম পর্বে বা ভাগে মুজাহিদগণ প্রত্যেকেই তাদের ব্যক্তিগত কাজে ব্যস্ত ছিলেন। যেমন, এ সময় কেউ বিশ্রাম নিচ্ছিলেন, কেউ ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলেন, কেউ কেউ খাদ্য পাকাচ্ছিলেন, কেউবা জরুরতবশতঃ নিজের নির্দিষ্ট স্থান ত্যাগ করে অনত্র গিয়েছিল- অর্থাৎ শিখদের অতর্কিত আক্রমণের সময় মুজাহিদগণ সম্পূর্ণভাবে অপ্রস্তুত ছিলেন। তাদের মধ্যে যারা প্রহরী সৈন্য হিসেবে বিভিন্ন জায়গায় মোতায়েন ছিলেন তারাও হঠাৎ করে  এই ধরণের হামলার কথা কল্পনাও করতে পারেননি। ফলে পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়াই তাড়াহুড়া করে মুসলিম মুজাহিদগণ একত্রিত হয়ে পাল্টা আক্রমণ করার পূর্বেই শিখ সৈন্যরা শাহীন, রাইফেল, মীনজানিকের সাহায্যে তাঁদের উপর গোলাবারুদ নিক্ষেপ করতে থাকে। কার্তুজের ধোঁয়ায় মাটিকোট টিলা, বালাকোটের বস্তিগুলো এবং আকাশ অন্ধকারচ্ছন্ন হয়ে যায়। এ সময়ে মুজাহিদগণ জনে জনে শহীদ হতে লাগলেন। তারা একে অপরের সাহায্য-সহযোগীতা করারও সময়-সুযোগ পেলেননা।

          অবশেষে খলীফাতুল্লাহ্, আমীরুল মু’মিনীন হযরত সাইয়্যিদ আহ্মদ শহীদ বেরেলভী (রঃ) আমীরে মুজাহিদ হযরত মাওলানা ইসমাঈল শহীদ দেহলভী সাহেবও প্রাণপণে কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বহু শিখ সৈন্যদের জাহান্নামে পাঠিয়ে নিজেরাও  শাহাদতের শারাবান তাহুরা পান করলেন। এ যুদ্ধে  শত শত মুজাহিদ বাহিনী শহীদ হয়েছেন। এটা ছিল ১২৪৬ হিজরীর ২৪ জিলক্বদ মোতাবেক ইংরেজী ১৮৩১ সালের ৬ই মের ঘটনা।

          মূলতঃ বালাকোটের প্রান্তরে মুসলিম মুজাহিদদের বিরুদ্ধে যদি ইংরেজ ও মুনাফিক পাঠান সর্দারগণ সীমান্তে সহযোগীতা না করতো তবে মুজাহিদদের সাথে সম্মুখ যুদ্ধে শিখ সৈন্যরা কোন অবস্থাতেই তাদের সাথে মোকাবিলা করার সাহস পেতনা। কারণ রনজিৎ সিং ভাল করেই জানতো যে, খলীফা সাহেবের অল্প সংখ্যক জানবাজ মুজাহিদদের সাথে তার বিশাল ‘খালসা বাহিনী’ পেরে উঠবেনা। এরা আল্লাহ্ পাক-এর রাহের পথিক। মৃত্যু তাদের নিকট শীতল ঠান্ডা পানির চেয়েও অধিক প্রিয়। রাত্রির অন্ধকারে এরা সারারাত খোদার মুহব্বতে রুকু সিজদায় পড়ে থাকে। অথচ দিনের বেলায় যুদ্ধের ময়দানে এদের চেহারা-সূরত অন্যরূপ ধারণ করে। যুদ্ধের ময়দানে এরা একেকজন  মুজাহিদ সিংহের চেয়েও বেশী গর্জনশীল ও অধিক শক্তিশালী। তাই সে মুজাহিদদের দমন করার জন্য ইংরেজ সরকারের সাহায্য নেয় ও সীমান্তবর্তী পাঠান মুনাফিক সর্দারদের বিপুল পরিমাণ উৎকোচ বা ঘুষ দিয়ে তাদেরকে মুজাহিদদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছিলো।

          এ ঘটনা থেকে একথাই পরিস্ফুট হয়ে উঠে যে হযরত আমিরুল মু’মিনীন  (রঃ) ও তাঁর মুজাহিদ বাহিনীগণ শিখ সৈন্যদের সাথে ও তাদের সাথে আতাঁত করা মুসলমানদের চিরশত্রু খ্রীষ্টান ইংরেজদেরও বিরুদ্ধে জিহাদ করেছেন অথচ আহমদ রেযা খান সাহেব ও তার অনুসারীরা অপবাদ ও দূর্ণাম রটনা করেছে এঘটনা থেকে ইহাও প্রমাণিত হয় যে, হযরত সাইয়্যিদ সাহেব (রঃ) খৃষ্টান ও শিখদের সাথে আতাঁত করে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন প্রকৃতপক্ষে ইহা ডাহা মিথ্যা। যদি তিনি ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধই না করতেন তবে বালাকোট যুদ্ধের পর তার অবশিষ্ট মুজাহিদগণ যারা প্রাণে বেঁচেছিল তাঁদের থেকে বেছে বেছে কেন বিট্রিশ রাজশক্তি তাদের ফাসীর হুকুম জারী করলো? এবং আন্দামান দ্বীপপূঞ্জে যাবৎজীবন কারাদন্ড দিলো? ১৮৩১ সালের ২৬ বছর পর অর্থাৎ ১৮৫৭ সালে পুনরায় কেন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের  জোয়ারের গতিধারা সারা উপমহাদেশে ছড়িয়ে পড়েছিল? ১৯৪৭ সালে কেন ইংরেজ খেদাও আন্দোলন? বিলেতি দ্রব্য বর্জন ও দেশ বিভাগের প্রয়োজন দেখা দিলো?

মুজাহিদদেরকে “ওহাবী” আখ্যা দেয়া ইংরেজদের একটি বিরাট কুটচাল ও ষড়যন্ত্র

          হযরত আমিরুল মু’মিনীন, সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ (রঃ)-এর মুজাহিদ বাহিনীর শাহাদতের পর যাঁরা বেঁচে ছিল তাঁরা আবার নব উদ্দ্যেমে নতুন ভাবে জাগ্রত হয়ে উঠলো। এবার সরাসরি তারা বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে ঝাপ দিলো। তাদের আমীর নিযুক্ত হলো হযরত মাওলানা নাসিরুদ্দীন মঙ্গোলরী (রঃ), হযরত মাওলানা বেলায়েত আলী (রঃ) ও মাওলানা  ইনয়েত আলী (রঃ), মাওলানা আহমদুউল্লাহ্ আজিমাবাদী (রঃ), মাওলানা আব্দুর রহীম সাদিকপুরী (রঃ), “তাওয়ারীখে আজীবার” লেখক হযরত মাওলানা জাফর থানেশ্বরী (রঃ) ও অন্যান্য মুজাহিদ যারা জীবন বাজি রেখে ষড়যন্ত্রকারী বৃটিশ বিরোধীতা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন।

          বিদ্রোহের দাবানল আবার দাউ দাউ করে জ্বলে উঠতে দেখে বৃটিশ রাজ শক্তি জনমনে অসন্তোষ সৃষ্টি করার জন্য তাদের “ওহাবী” চিহ্নিত করে ধর-পাকড় শুরু করলো। কাউকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলালো এবং কাউকে সারা জীবন কারাদন্ড দিয়ে তার জীবন শেষ করেদিল। বৃটিশরা ইতিহাসের স্বাভাবিক গতিধারা পাল্টিয়ে দিলো। নির্ভূল নির্ভেজাল সত্যকে অসৎ উদেশ্য প্রণোদিত হয়ে ভারতের স্বাধীন সংগ্রাম আযাদী আন্দোলন এর ইতিহাসে তাঁরা মিথ্যার সংমিশ্রণ ঘটালো।

           যেমন, এ সম্পর্কে কলকাতা থেকে প্রকাশিত “চেপে রাখা ইতিহাস”- কিতাবের ২০৯ পৃষ্ঠায় বর্ণিত আছে, হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ)-এর ওফাত হওয়ার পর যে সব আন্দোলন, বিদ্রোহ বা সংগ্রাম সংগঠিত হয়েছিলো, সেগুলোকে বিকৃত করে (বৃটিশ রাজশক্তি) তাদের নাম পাল্টে কোনটাকে ‘সিপাহী বিদ্রোহ’ কোনটাকে ‘ওহাবী আন্দোলন’ বলেছে।

          উক্ত কিতাবের ২০৫ পৃষ্ঠায় আরো বর্ণিত আছে, আলিগড়ের সৈয়দ আহমদ ও বেরেলীর হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ (রঃ) দু’জনই ইতিহাস প্রসিদ্ধ মানুষ। তবে আলিগড়ের আহমদ সাহেবও পেয়েছেন ইংরেজদের পক্ষ থেকে ‘স্যার’ উপাধী, প্রচুর সম্মান, চাকুরীর পদন্নতি প্রভৃতি। আর বেরেলীর সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ (রঃ) ইংজেদদের পক্ষ থেকে পেয়েছেন অত্যাচার ও আহত হওয়ার উপহার। আর সব শেষে শত্রুদের চরম আঘাতে তাঁকে শহীদ হতে হয়েছে- ভারতবাসীকে শেষ উপহার হিসেবে দিয়ে গেছেন তিনি তাঁর রক্তমাখা কাটা মাথা মোবারক।

          এ সময়ই ধুরন্ধর ও শঠ প্রকৃতির খৃষ্টান লেখক উইলিয়াম হান্টার তার ঞযব ওহফরধহ গঁংষরসং গন্থ রচনা করে। অবশেষে সে স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে এবং বলেছে, “ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের মধ্যে ফাটল সৃষ্টির নিমিত্ত এই অপবাদ (ওহাবী বলা) ভারত বিপ্লবীদের মাথায় সুপরিকল্পিতভাবে আমরাই চাপিয়ে দিয়েছি।”

          সে তার ঞযব ওহফরধহ গঁংষরসং গ্রন্থের ৬৫/৬৬ পৃষ্ঠায় আরো লিখেছে, দেশদ্রোহীদের সকলকে সরকার কারাবাসে আটক রাখতে পারেন কিন্তু সমগ্র বিদ্রোহী দলটাকে কোনঠাসা করার আরও একটা সহজ উপায় আছে, সেটা হলো সাধারণ মুসলমান সমাজ থেকে তাদের আলাদা করে ফেলা। মুজাহিদদের সম্পর্কে মিথ্যা দুর্নাম ছড়িয়ে সে আরো লিখেছে, অসন্তোষের সামান্যতম মনোভাব সৃষ্টির আগেই অবাধ্য শ্রেণীকে (মুজাহিদদেরকে) অবশ্যই আলাদা  করে ফেলতে হবে এবং এটা করতে হবে সম্পূর্ণ ভদ্র প্রক্রিয়ায় অথচ শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে।”

          এই বৃটিশ লেখক মুসলমানদের চির শত্রু হান্টার তার ইতিহাস গ্রন্থে শুধু এতটুকু লিখেই ক্ষান্ত হয়নি বরং আমিরুল মু’মিনীন হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরলভী (রঃ) সম্পর্কে সে লিখিছে, পাঞ্জাব সীমান্তে বিদ্রোহীর শিবিরের পত্তন করে সৈয়দ আহমদ। কুখ্যাত এক দস্যু অশ্বারোহী যে সৈনিক হিসেবে জীবন আরম্ভ করে এবং বহু বছর যাবত মালওয়া অঞ্চলের আফিম সমৃদ্ধ গ্রামসমূহ লুটতরাজ চালায়। (ঞযব ওহফরধহ গঁংষরসং ১২৬)

          শত ধিক ঘৃণ্য  মুসলমানদের চিরশত্রু এই খৃষ্টান লেখক হান্টারকে। আফসোস ঐ সমস্ত রেযাখানী মাযহাবে বিশ্বাসী লোকদের জন্য, যারা হান্টারের ইতিহাস পড়ে মুসলমানকে ওহাবী, কাফির  বলে বেড়ায়।

          কোন মুসলমান আলেম, সূফি ঐতিহাসিদের দ্বারা কি খলীফাতুল্লাহ্, শহীদে আযম (রঃ)-এর  দস্যুবৃত্তি ও লুটতরাজ করার প্রমাণ মিলে? মুসলমানের চির শত্রু একজন খৃষ্টান লেখকের ধোকায় পড়ে এই জামায়াত পুরো আযাদী আন্দোলনের সিপাহ্সালারকে ওহাবী আখ্যা দিয়ে মুসলিম জনসমাজে ফিৎনা সৃষ্টি করে যাচ্ছে। শতধিক আফসুস তাদের জন্য।

হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ (রঃ)কে আহমদরেযা খানের ওহাবী ফতওয়া দানের বিপক্ষে পশ্চিম বঙ্গের আকাবিরে আলেমদের ফতওয়া

(১)

হযরত মাওলানা সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ (রঃ) সালিক ও ওলীগণের আমীর। তিনি সুন্নত জামায়াত ভক্ত ছিলেন। চার মাযহাব সত্য বলে বিশ্বাস  করতেন। তার শিষ্য হযরত মাওলানা কারামত আলী (রঃ) ওহাবী লা-মাযহাবীদের প্রতিবাদ করেছেন। আরব, আযম, হিন্দুস্থান ও বাংলার জাহেরী-বাতেনী কামালতে পূর্ণ বড় বড় অদ্বিতীয় আলেমগণ যাদের দ্বারা র্শিক, বিদ্য়াত দুরিভূত হয়েছে। তাঁরা উক্ত সাইয়্যিদ সাহেব (রঃ)-এর মুরীদ ছিলেন। তাঁরা সকলেই মাযহাব অবলম্বণকারী ছিলেন। হযরত সাইয়্যিদ সাহেব (রঃ) হযরত মাওলানা শাহ আব্দুল আজীজ মুহাদ্দিস দেহলভী (রঃ)-এর খাছ মুরীদ ছিলেন। যে ব্যক্তি এইরূপ তরিকত ও শরীয়তের হাদী, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বংশধর ও কামিল মুর্শিদের উপর অযথা অপবাদ প্রয়োগ করে সে ব্যক্তি গুণাহ্গার, বদ্কার, মিথ্যাবাদী ও অপবাদকারী ব্যতীত আর কিছুই নয়। যে ব্যক্তি এই ধ্রুব সত্যকে অস্বীকার করে তবে সে ব্যক্তি ভ্রান্ত, সত্য পথ ভ্রষ্ট। (সৈয়দ আব্দুর রশীদ (রঃ) ষষ্ঠ মুদাররিস- আলিয়া মাদ্রাসা, কলিকাতা)

(২)

আল্লাহ্ পাক জনাব  সাইয়্যিদ আহমদ (রঃ)-এর দ্বারা বহু মুসলমানকে বিদ্য়াত হতে মুক্ত করে উজ্বল সুন্নতের অনুসারী করেছেন, সত্যপথ প্রাপ্ত হয়েছেন, তাদের মধ্যে একজন হাফেজ, ক্বারী হাজী কারামত  আলী জৈনপুরী (রঃ) দ্বিতীয় হাফেজ, হাজী, গাজী, মাওলানা জামালুদ্দীন সাহেব ছিলেন। যে ব্যক্তি তাঁদের বিরুদ্ধাচরণ করবে এবং তাদের হিদায়তের প্রতি ইন্কার করবে সে ব্যক্তি মেধাহীন ও গোমরাহ্ এবং হিদায়েত ও সত্যপথ ভ্রষ্ট। (হযরত মাওলানা আহম্মদুল্লাহ্ (রঃ) সপ্তম মুদাররিস-আলিয়া মাদ্রাসা কলিকাতা)

(৩)

জনাব সাইয়্যিদ আহমদ (রঃ) ও মাওলানা কারামত আলী (রঃ) ধর্ম ভীরু ও পরহেজগার ছিলেন, তিনি ওহাবী ছিলেন না। (মাওলানা মুহম্মদ ইসমাইল (রঃ) অষ্টম মুদাররিস- আলিয়া মাদ্রাসা কলিকাতা)

(৪)

দ্বীনদার গণের শিরোভূষণ, পরহেজগারদের অগ্রণী, প্রবীন হাদী শ্রেণীর আদর্শ, প্রবীন ওলীগণের নেতা হযরত সাইয়্যিদ আহমদ (রঃ) হানাফী ধর্মভীরু ওলী আল্লাহ্ ও উজ্জ্বল শরীয়তের আলেম ছিলেন। ছোট বড় সকলেই তিনি কর্তৃক সত্য পথ প্রাপ্ত হয়েছেন। (হযরত মাওলানা মুহম্মদ আশরাফ (রঃ), নবম মুদাররিস- আলিয়া মাদ্রাসা কলিকাতা)

(৫)

জনাব হযরত মুজাদ্দিদ সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ সাহেব (রঃ) খাঁটি হানাফি ছিলেন ও তাঁর ত্রিশ লক্ষ হানাফি মুরীদ ছিলো। এক্ষেত্রে যদি মাযহাব বিদ্বেষীদল নিজেদেরকে তার তাবেদার বলে দাবী করেন তবে হযরত সাইয়্যিদ সাহেব (রঃ) কি এই জন্য ওহাবী হবেন? যদি কেউ তার নিকট মুরীদ হয়ে থাকে বা তাঁর সঙ্গ অবলম্বন করে থাকে তবে তিনি কি ওহাবী? হযরত আলী (রাঃ)-এর সঙ্গে কত রাফেজী শিয়ারা থাকতো এবং তার নিকট বাইয়াত হয়েছিল এতে হযরত আলী (রাঃ)কে শিয়া, রাফেজী বলবেন কি? যদি হযরত সাইয়্যিদ সাহেব (রঃ) ওহাবী হতেন তবে মক্কা শরীফ, মদীনা শরীফের গাউস, কুতুব, ওলী, মুদাররিস, মুফতী, ইমাম ও ওয়ায়েজগণ, হিন্দুস্থানের নামজাদা আলেমগণ তাঁর নিকট মুরীদ হতেন না ও  বঙ্গের বড় বড় নামজাদা আলেমগণ তাঁর নিকট মুরীদ হতেন না। আর তিনি তরিকতে হযরত নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কদমের উপর ছিলেন। এইজন্য তিনি নিজ তরিকাকে মুহম্মদীয়া তরিকা বলতেন। ইহা কাদেরীয়া, চিশ্তিয়া, নক্শবন্দীয়া, সোহ্রাওয়ার্দীয়া ইত্যাদি তরিকাগুলোর অন্তর্ভূক্ত। কাজেই লা-মাযহাবীদের ওহাবী হওয়ার দাবী এবং হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ সাহেব(রঃ)-এর ওহাবী হওয়ার দাবি পৃথক পৃথক। হযরত সাইয়্যিদ সাহেব (রঃ)-এর মাযহাব হানাফি এবং তাঁর তরিকার নাম মুহম্মদীয়া। (মাওলানা রুহুল আমীন (রঃ) বশিরহাট)

(৬)

আলী জনাব মায়ালী আলকাব। জাহেরী বাতেনী কামালতের অধিকারী দ্বীনি-দুনিয়াবী গুণাবলীর ভান্ডার, বিদ্য়াত ধ্বংসকারী শরীয়ত প্রচারক জামানার গাওছ, জামানার অদ্বিতীয় ও আল্লাহ্ তায়ালা হতে সাহায্য প্রাপ্ত জনাব সাইয়্যিদ সাহেব (কোঃ সেঃ আঃ) সুন্নি হানাফী ছিলেন। তাঁর খলিফা আলেমে রব্বানী ও অদ্বিতীয় ফাজেল জনাব মৌলভি কারামত আলী (রঃ) মরহুম মগফুর সাহেব ও হানাফী মাযহাব ভুক্ত ছিলেন। কখনও কেউ যেন উক্ত দুই বুযুর্গের সম্বন্ধে বাতিল ধারণা না করেন। (মাওলানা বিলায়েত হুসাইন (রঃ), দ্বিতীয় মুদাররিস, আলিয়া মাদাসা, কলিকাতা)

(৭)

          জনাব হযরত ওলিগণের শিরোভূষন সাইয়্যিদ আহমদ (কোঃ সিঃ আঃ) বড় দলের ওলী ও হানাফি মাযহাব অবলম্বনকারী ছিলেন এই সমুজ্জ্বল সূর্য দ্বারা একটি জগৎ আলোকময় হয়েছে। যে বা যারা তাঁর দুর্নাম ও অপবাদ করে সে ব্যক্তি গোমরাহ্ ও ভ্রান্তকারী। অপবাদকারীকে এইরূপ কুধারণা হতে তওবা করা উচিৎ। (মাওলানা সুলায়মান আব্বাসী (রঃ), চতুর্থ মুদাররিস, আলিয়া মাদ্রাসা, কলিকাতা)

(৮)

জনাব হযরত সাইয়্যিদ আহমদ সাহেব (রঃ) মরহুম মৌলভী কারামত আলী (রঃ) অতিশয় ধর্মভীরু ও পরহেজগার ছিলেন। বহু সহস্র লোক তাঁর সঙ্গ লাভে সত্য প্রাপ্ত হয়েছেন। কেউ যেন কিছুতেই তাঁদের সম্বন্ধে কুধারণা পোষণ না করেন নচেৎ নিজের ক্ষতি সাধন করবে।  (মাওলানা শাহাদত হুসাইন (রঃ), তৃতীয় মুদাররিস, আলিয়া মাদ্রাসা, কলিকাতা)

(৯)

সালেকদের অগ্রণী ও ওলীগণের নেতা হযরত মাওলানা সাইয়্যিদ (রঃ)কে ওহাবী বলা একেবারে মিথ্যা অপবাদ, দ্বীনের বুযুর্গগণের দুর্নাম ও অপবাদ করা অন্যায় আচরণ ও গোমরাহ্ী। (মাওলানা আহমদ (রঃ), প্রথম মুদাররিস, আলিয়া মাদ্রাসা, কলিকাতা)

(১০)

যে ব্যক্তি জামানার ওলী ও জামানার আলেমগণের নেতা হযরত সাইয়্যিদ (রঃ)-এর প্রতি দোষারোপ করে সে ব্যক্তি ভ্রান্ত ও বিভ্রান্তকারী হওয়াতে কোন সন্দেহ নেই। বুযুর্গ লোকদের সম্বন্ধে বে-আদবি পূর্ণ ও অনুপযুক্ত কথা বলা যোগ্যতা আল্লাহ্ পাক-এর অনুগ্রহ লাভ হতে বঞ্চিত থাকার কারণ। (কাজি আব্দুল খালেক, শিয়ালদাহ্, কলিকাতা)

(১১)

হযরত সাইয়্যিদ সাহেব ও মাওলানা কারামত আলী (রঃ) বিনা সন্দেহে আল্লাহ্ পাক-এর ওলী ছিলেন। ওহাবীদের প্রতিবাদ করতেন। তাসাউফের অদ্বিতীয় আলেম, মুহাদ্দিস, তাফসীর, তত্ত্ববিদ ও পরহেজগার ছিলেন। সহস্র সহস্র সুন্নী-এর নেতা এবং বঙ্গ দেশে অদ্বিতীয় আলেম ছিলেন। (মাওলানা আজিজুর রহমান (রঃ), কলিকাতা চাঁদনি বাজার মসজিদের ঈমাম, মাওলানা মুহম্মদ নাছিরুদ্দিন (রঃ), ধর্মতলা মসজিদের ইমাম)

(১২)

বিদ্য়াত ধ্বংসকারী, গোমরাহ্ী মিটানেওয়ালা, হযরত মাওলানা সাইয়্যিদ আহমদ সাহেব (রঃ) একজন আলেম কাশ্ফ শক্তি সম্পন্ন উচ্চ দরজার ওলি ছিলেন। যে ব্যক্তি তাঁর উপর দোষারোপ করে সে সত্য পথ ত্যাগ করতঃ গোমরাহ্ীতে নিমর্জিত আছে।  (মাওলানা মুহম্মদ সিদ্দিক আহমদ, মুদাররিস, হুগলি মাদ্রাসা)

আফজালুল আউলিয়া, মুজাহিদে আযম, আমিরুল মু’মিনীন,  হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ)-এর লিখিত কিতাব সম্পর্কে

সহীহ্ রেওয়াতে ও বিশ্বস্ত বর্ণনা মতে রঈসুল মিল্লাত, আফজালুল আউলিয়া, হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ)-এর স্বহস্তে লিখিত কোন কিতাব নেই। এ কথাটি ঐতিহাসিক সত্য। এ বিষয়ে আমরা নির্দ্বিধায় বলতে পারি যে, আল্লাহ্ পাক-এর জমিনে এমন কোন সন্তান জন্মগ্রহণ করেনি যে প্রমাণ করতে পারবে যে, হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ)-এর রচিত বা লিখিত কোন কিতাব রয়েছে; কিন্তু একটি স্বার্থান্বেষী ও সংখ্যা লঘু জামায়াত নফ্সের তাড়নায় উদ্ভূদ্ধ হয়ে হযরত ইসমাঈল শহীদ দেহলভীর রচিত “সিরাতুল মুস্তাকিম” কিতাবখানা অত্যন্ত কূটচালে তাঁর নামে চালিয়ে দিবার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। তাদের মতে উক্ত কিতাবের বিষয়বস্তু ও আপত্তিকর কথাবার্তা স্বয়ং হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ)-এর নিজের এবং এটাকে কিতাব আকারে রূপ দিয়েছেন হযরত মাওলানা ইসমাঈল শহীদ সাহেব। কিন্তু হিন্দুস্থান ও বাংলাদেশের জমহুর বিখ্যাত ও নামজাদা আলেমগণের বক্তব্যনুযায়ী এ কথা সম্পূর্ণ মিথ্যা যার ঐতিহাসিক কোন প্রমাণ খুঁজে পাওয়া যায় না।

          শ্রদ্ধেয়, বরেণ্য, আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের এই বড় জামায়াতের বক্তব্য ও বর্ণনা থেকে বুঝা যায় বৃটিশ মদদপুষ্ট এক শ্রেণীর হিংসুক, বিরুদ্ধবাদী, ষড়যন্ত্র করে মানুষের নিকট তাঁকে হেয় প্রতিপন্ন করার মানসে তাঁকে ওহাবী বলার সাথে সাথে উক্ত বহুল সমালোচিত “সিরাতুল মুস্তাকিম” কিতাবটিও তাঁর নামে জনসমাজে অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ভাবে ছড়িয়ে দিয়েছে। এই বড় জামায়াতের সাথে আমরাও সম্পূর্ণ একমত। আমাদের মতেও হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ)-এর স্বহস্তে লিখিত বা রচিত কোন কিতাব আল্লাহ্ পাক-এর জমিনে নেই। এবং একথা কেউ দলীল-আদিল্লাহ্ ও সুত্রসহ প্রমাণও করতে পারবে না যে, এটি তারই লিখিত কিতাব।

          মূলতঃ এই কিতাবের লেখক হচ্ছেন, হযরত মাওলানা ইসলামাঈল শহীদ দেহলভী সাহেব।

          আর ইসমাঈল দেহলভী সাহেব যদি তার কিতাবে কিছু আপত্তিকর কথাবার্তা লিখে থাকেন তার জন্য তিনি নিজেই দায়ী হবেন বা তার জবাবদিহী তিনিই করবেন। সেইজন্য রঈসুল আউলিয়া, আমিরুল মু’মিনীন, হযরত সাইয়্যিদ শহীদ আহমদ বেরেলভী (রঃ)কে কোন প্রকারেই দায়ী বা দোষী সাব্যস্ত করা জায়েয নয়।

কারণ আল্লাহ্ পাক বলেন, ولاتزر وازرة وزر اخرى.

অর্থঃ- “এক জনের গুণাহ্রে বোঝা অন্যজন বহন করবেনা।” অর্থাৎ একজনের জন্য অন্যজন দায়ী হবেনা। (সূরা আনআম/১৬৪)

          এরপরও যদি হযরত সাইয়্যিদ শহীদ আহমদ বেরেলভী (রঃ)কে দোষারোপ করা হয় তাহলে তা হবে সম্পূর্ণরূপে কুরআন-সুন্নাহ্র খেলাফ। যা নাজায়েয ও হারাম।

          আর যারা বলেন, “সিরাতুল মুস্তাকীম” কিতাব হচ্ছে, হযরত সাইয়্যিদ শহীদ আহমদ বেরেলভী (রঃ)-এর মুখনিসৃত বাণী বা উনার বয়ান যা শুনে হযরত ইসমাঈল শহীদ সাহেব তা কিতাব আকারে রূপ দিয়েছেন তাহলে ইসমাঈল শহীদ সাহেব কি করে দোষী সাব্যস্ত হবেন? আমাদের জবাব হলো, যে ব্যক্তি  কোন মুহাক্কিক ওলী আল্লাহ্র বয়ান শুনে তা লিপিবদ্ধ করে কিতাবের আকারে রূপ দেয় উক্ত কিতাবের ভুল-ত্রুটির জন্য সংকলকই দায়ী থাকে।

          উল্লেখ্য যে, হাদীস শরীফ সম্বলিত অনেক কিতাব রয়েছে যার মধ্যে মওজু মতরুক অর্থাৎ গায়ের সহীহ্ হাদীস শরীফও রয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে- এ সমস্ত মওজু মতরুকও গায়ের সহীহ্ হাদীস শরীফের জন্য কি স্বয়ং আল্লাহ্ পাক-এর রাসূল হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দায়ী বা দোষী সাব্যস্ত হবেন? না এর সংকলক দায়ী ও দোষী সাব্যস্ত হবেন?

          যদি সংকলক দায়ী ও দোষী বলে সাব্যস্ত হন তাহলে হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ)-এর মুখ নিসৃতবাণী সংকলন করার কারণে তার মধ্যস্থ ভুল-ত্রুটির কারণে একইভাবে সংকলকই দায়ী বা দোষী বলে সাব্যস্ত হওয়ার কথা। তাহলে এ ব্যাপারে কি করে হযরত সাইয়্যিদ আহমদ বেরেলভী (রঃ)কে দোষারোপ করা যেতে পারে?

          জানা আবশ্যক যে, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র হস্ত মোবারকে বাইয়াত হয়ে কত নামধারী কপট মুনাফিক মুসলমান তাঁর সাথে যুদ্ধ-জিহাদ করেছে। তাঁর পিছনে মুক্তাদী সেজে সালাত(নামাজ) আদায় করেছে। সর্বক্ষণই তারা হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর চারপাশে তাঁকে ছায়ার মত ঘিরে থাকতো। অথচ এক সময় এরাই তাঁর পবিত্র সহধর্মিনী (রাঃ)-এর উপর অর্থাৎ উম্মাহাতুল মু’মিনীন (রাঃ)গণের উপর মিথ্যা তোহ্মত, অপবাদ দিয়ে গোটা নবী পরিবারে বিষের আগুণ লাগিয়ে দিয়ে রাহমাতুল্লীল আলামীনকে যারপর নাই তাকলীফ(কষ্ট) দিয়েছে।

          তেমনি পূর্ববর্তী ইহুদী-নাছারাদের নবী-রাসূল (আঃ) যেমন হযরত মূসা (আঃ)-এর উপর তাওরাত শরীফ, হযরত দাউদ (আঃ)-এর উপর যাবুর শরীফ, হযরত ঈসা (আঃ)-এর উপর ইনজিল শরীফ নাযিলকৃত আসমানী কিতাব যা-কিনা তাদের মন মত হয়নি। তাই তারা তাদের চাহিদানুযায়ী উক্ত পবিত্র আসমানী কিতাবগুলোর বিকৃতি ঘটিয়ে অর্থাৎ নিজেদের মনগড়া অভিমত উক্ত পবিত্র গ্রন্থে ঢুকিয়ে মুল আসমানী কিতাবগুলোর অস্তিত্বই নষ্ট করে ফেলেছে। এখন উক্ত চির পথভ্রষ্ট, গোমরাহ্ ইহুদী-নাছারাদের জন্য কি তাদের নবী রাসূল (আঃ)গণকে দোষারোপ করা হবে? (নাউযুবিল্লাহি মিন যালিক)

          হযরত আলী (রাঃ)-এর মুহব্বতের দাবীদার বহু শিয়া, রাফেজী, খারেজী তাঁর জীবিত অবস্থাতেই তাঁকে তাদের ইমাম মানতো এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের প্রথম দু’খলীফাদের চেয়ে তাঁকে শ্রেষ্ঠ মনে করত। যদিও বা হযরত আলী(রাঃ) এটা একদমই পছন্দ করতেন না। এই খারেজী, রাফেজী, শিয়া সম্প্রদায় যারা হযরত আলী (রাঃ)কে সকলের চেয়ে অধিক মুহব্বত করতো বা করে থাকে তাদের ভ্রান্ত ও গোমরাহ্ী আক্বীদার জন্য হযরত আলী (রাঃ)কে কি তাদের পথ প্রদর্শক বা আমীর ধরে নেয়া যাবে? (নাউযুবিল্লাহ্ মিন যালিক)

          তদ্রুপ হযরত আমিরুল মু’মিনীন হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ)-এর উচ্চ কামালত বেলায়েতের দরজা হাছিল হওয়ার সংবাদ শুনে বহু খারেজী, ওহাবী, মুনাফিক, বিদ্য়াতী, লা-মাযহাবী  দল তাঁর হাতে হাত রেখেছে এখন তাদের ভ্রান্ত ও বদ্ আক্বীদার জন্য তো আর তিনি দায়ী নন।

          আর যদি প্রকৃত অর্থেই তাই হয় অর্থাৎ হযরত ইসমাঈল শহীদ দেহলভী সাহেবের জন্য হযরত মুজাহিদে মিল্লাত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ)কে দোষী সাব্যস্ত করা হয় তবে কাবিলের জন্য হযরত আদম (আঃ)কে, কেনানের জন্য হযরত নূহ্ আলাইহিমুস্সালামকে, আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাইর জন্য আল্লাহ্ পাক-এর রাসূল হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এবং ইয়াজিদের ভুল-ত্রুটির জন্য বিরূদ্ধবাদীদের মতে হযরত মুয়াবিয়া (রাঃ) দোষি সাব্যস্ত হবেন।

          নিরেট মূর্খ জাহেল, বিদ্য়াতী, গোমরাহ্, পথভ্রষ্ট সম্প্রদায় ব্যতীত কেউই এ ধরণের আক্বীদা ও চিন্তাভাবনা করবেনা কস্মিলকালেও।

          উপরোক্ত বিস্তৃতি ও তথ্যবহুল সমৃদ্ধ আলোচনা শেষে এই বিদ্য়াতী ফিরকাবন্দীদের  আমরা দ্ব্যর্থহীন ও বলিষ্টকক্তে বলতে চাই যদি তারা সত্যবাদী ও হক্বের অনুসন্ধানকারী হয়ে থাকে তবে তারা যেন মুজাহিদে মিল্লাত, মুহিয়্যূস্ সুন্নাহ্, দাফিউল বিদ্য়াত, রুহুল হাক্কে, সানদোল মাশায়েখ, মুজাহিদে আকবর, ত্রয়োদশ শতাব্দীর মুজাদ্দিদ, খলীফাতুল্লাহ্, আমীরুল মু’মিনীন হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ)-এর স্বরচিত কিতাব থেকে লিখিত কোন আপত্তিকর বাক্য উদ্ঘাটন করে দেখাক যা তার ওহাবী ও কাফির হওয়ার পরিচয় বহন করে। এবং হযরত ইসমাঈল শহীদ দেহলভী সাহেবের রচিত “সীরাতুল মুস্তাকিম” কিতাবের বিভ্রান্তিমূলক বাক্যগুলো যে তারই লিখা তা তারা প্রমাণ করুক। অন্যথায় পৃথিবী বিখ্যাত একজন  আফজালুল ওলী, মুজাদ্দিদুয্যামান-এর বিরুদ্ধে মিথ্যা তোহ্মত, কুফরী ফতওযা বা অপবাদ দেয়ার কারণে উক্ত তোহ্মত বা কুফরী ফতওযা তাদের উপরই বর্তাবে।

          এ প্রসঙ্গে হাদীস শরীফে বর্ণিত রয়েছে-

وعن ابى الدرداء قال سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول ان العبد اذا لعن شيئا صعدت اللعنة الى السماء فتغلق ابواب السماء دونها ثم تهبط الى الارض فتغلق ابوابها دونها ثم تأخذ يمينا شمالا فاذا لم تجد مساغا رجعت الى الذى لعن فان كان لذلك اهلاوالا رجعت الى قائلها رواه ابو داود.

অর্থঃ- হযরত আবূ দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া  সাল্লামকে বলতে শুনেছি তিনি বলেছেন, যখন বান্দাহ কোন বস্তুকে বা কাউকে অভিসম্পাত করে, তখন সে অভিসম্পাত আকাশের দিকে উঠতে থাকে,তখন আকাশের দরজা বন্ধ করে দেয়া হয়। অতঃপর ঐ অভিসম্পাত যমীনের দিকে প্রত্যাবর্তন করে। তখন যমীনের দরজাও বন্ধ করে দেয়া হয়। অতঃপর উহা ডান দিকে ও বাম দিকে যায় এবং সেখানেও যখন কোন রাস্তা না পায়, শেষ পর্যন্ত সেই ব্যক্তি বা বস্তুর দিকে প্রত্যাবর্তন করে যার প্রতি অভিসম্পাত করা হয়েছে। যদি সে অভিসম্পাতের উপযুক্ত হয় তবে তার উপরে আপতিত হয়। অন্যথায় (যদি সেই ব্যক্তি বা বস্তু অভিসম্পাতের উপযুক্ত না হয়) অভিসম্পাতকারীর দিকেই ফিরে আসে।” (আবূ দাউদ শরীফ)

          কাজেই যারা সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ)কে বিনা প্রমাণে কাফির ফতওয়া দেয় বা দিবে তাদের স্মরণ রাখতে হবে যে, হযরত সাইয়্যিদ আহমদ বেরেলভী (রঃ) কোন কুফরী না করার কারণে এই ফতওয়া তাদের উপরই বর্তাবে।

          উল্লেখ্য যে, এমনও হতে পারে উক্ত কিতাবের যেসমস্ত আপত্তিকর বিভ্রান্তমূলক কথা-বার্তা পরিলক্ষিত হয় তা হচ্ছে- হিংসুক ও নিন্দুকের নিন্দার ফসল। অর্থাৎ বৃটিশ সরকার ও তাদের পদলেহী দালালেরা উক্ত কুফরীমূলক বাক্য হযরত ইসমাঈল শহীদ দেহলভী সাহেবের “সিরাতুল মুস্তাকিম” কিতাবে প্রবেশ করিয়ে দিয়েছে। কারণ এই কিতাব ১২৩৩ হিজরীতে লিখিত হয়েছে আর প্রকাশ করা হয়েছে ১৩৩৪ হিজরীতে তখন হযরত শাহ্ আব্দুল আজীজ মুহাদ্দিস দেহলভী (রঃ) জীবিত ছিলেন। যদি সীরাতুল মুস্তাকীম কিতাবে কুফরীমূলক আক্বীদা উল্লেখ থাকতো তাহলে হযরত শাহ্ আব্দুল আজীজ মুহাদ্দিস দেহলভী (রঃ) অবশ্যই তাকে সতর্ক করে শুধরিয়ে দিতেন।

          আরো উল্লেখ্য যে, হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ)কে যদি হযরত ইসমাইল শহীদ দেহলভী সাহেবের জন্য দোষারোপ করতে হয় তবে প্রথম দোষারোপ করতে হবে  ইসমাঈল শহীদ দেহলভী সাহেবের চাচা ও প্রথম পীর সাহেব হযরত শাহ্ আব্দুল আজীজ মুহাদ্দিস দেহলভী (রঃ)কে। কারণ তিনি তার সোহ্বতে থেকে তা’লীম-তরবিয়ত পেয়ে ইল্মে ফিক্বাহ্ ও ইল্মে তাসাউফে পূর্ণতাপ্রাপ্ত হয়ে খিলাফত লাভ করেন।

 তাঁর সম্পর্কে সিরাজুল হিন্দ, হযরত শাহ্ আব্দুল আজীজ মুহাদ্দিস দেহলভী (রঃ) তাঁর এক মাকতুবে তাঁকে হুজ্জাতুল ইসলাম (ইসলামের দলীল), তাজুল মুফাস্সীরিন (মুফাস্সীরগণের মাথার মুকুট), ফখরুল মুহাদ্দিসিন (হাদীস শরীফ বিশারদগণের গৌরব) বলে তাঁর উচ্চ প্রশংসা করেন।”

          পরবর্তীতে হযরত শাহ্ আব্দুল আজীজ মুহাদ্দিস দেহলভী (রঃ) সাহেবের নির্দেশে ইল্মে তাসাউফে আরো তরক্কী হাছিলের জন্য হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ)-এর নিকট বাইয়াত গ্রহণ করেন।

          আর যদি উক্ত কিতাবের বিভ্রান্তি ও আপত্তিকর কথা-বার্তাগুলো সত্যিই হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ)-এর নিজের হতো তবে মক্কা শরীফ, মদীনা শরীফ, মিশর, আফ্রিকা, আফগানিস্থান, ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশসহ বহু দেশের লক্ষ লক্ষ মুরীদ শত শত হাজার হাজার আকাবিরে আলেম মুরীদগণ কি তাঁকে এ ব্যাপারে সচেতন করাতেন না? বাংলা, ভারতসহ মক্কা শরীফ, মদীনা শরীফ ও মিশরের আলেমগণ যারা তাঁর নিকট মুরীদ হয়ে খেলাফত লাভের যোগ্যতা অর্জন করেছিলেন তারা কি এ সমস্ত কথা মেনে নিয়েছিলেন? তারা কি এ সমস্ত আপত্তিকর ও বিভ্রান্তিমূলক বাক্য শ্রবণ করে তাঁর নিকট বাইয়াত হয়েছিলেন? না আল্লাহ্ পাক-এর দরবারে তাঁর মর্যাদা মর্তবা ও উচ্চ বেলায়েতের দরজা হাছিল হবার সুসংবাদ শুনে তাঁর নিকট মুরীদ হয়েছিলেন? হযরত সাইয়্যিদ আহ্মদ বেরেলভী (রঃ)-এর সিলসীলা থেকে ফয়েজপ্রাপ্ত হয়ে শুরু থেকে এ পর্যন্ত লক্ষ লক্ষ গাউস, কুতুব, আবদাল, নুকাবা, নোজাবা ইত্যাদি হয়েছেন এমনকি গত শতকের মুজাদ্দিদ কুতুবুল আলম, কাইউমুয্যামান, মুহিউস্ সুন্নাহ্, মুজাদ্দিদুয্ যামান, হযরত আবু বকর সিদ্দীক ফুরফুরাবী (রঃ)ও ওনার সিলসিলার অন্তর্ভূক্ত। তাহলে তাদের কথামত তিনি যদি কুফরী করে থাকেন, আর যে কুফরী করে সে কাফের হয়। তাহলে একজন কাফেরের সিলসীলা থেকে কি করে লক্ষ লক্ষ গাউস, কুতুব, আবদাল ও মুজাদ্দিদের আবির্ভাব ঘটাতে পারে?

কুরআন-সুন্নাহ্র দলীল ব্যতীত অর্থাৎ বিনা দলীলে একাধিক লোক যদি কাউকে মনগড়া ফতওয়া দিয়ে কাফির সাব্যস্ত করে তাহলে সে কি কাফির হবে?

অতএব, নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত কিতাবসমূহ থেকে উপরোক্ত সংক্তিপ্ত আলোচনা দ্বারা এটাই সাব্যস্ত হলো যে, সাইয়্যিদুল আওলিয়া, দলিলুল আরিফীন, রুহুল হাক্কে, সিরাজুল উম্মত, আসাদুল্লাহ্, সাহিবুল আসরার, সাইয়্যিদুল আবেদীন, মুহিয়্যুস্সুন্নাহ্, দাফেউল বিদ্য়াত, আলামুল হুদা, মুজাদ্দিদে মিল্লাত খলীফাতুল্লাহ্ ফিল আরদ, আওলাদে রাসূল, আমিরুল মু’মিনীন হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী ওয়াল হানাফী ওয়াল কাদেরী ওয়াল চিশ্তী ওয়ান নকশ্বন্দী মুজাদ্দেদী ওয়াল মুহম্মদী (রঃ) ছিলেন ত্রয়োদশ শতাব্দীর মুজাদ্দিদুয্যামান। কাজেই তিনি যদি দলীলবিহীন ফতওয়ার কারণে কাফির সাব্যস্ত হন তাহলে একই কারণে আহমদ রেযা খান সাহেবও তাঁর চেয়েও বড় কাফির বলে গণ্য হবে। কারণ হযরত শহীদে আযম সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ)কে যত লোক কাফির ফতওয়া দিয়েছে তার চেয়ে বেশী লোক আহমদ রেযা খান সাহেবকে কাফির, গোমরাহ্, বিদ্য়াতী, কাজ্জাব, দালাল, কাদিয়ানী, রাফেজী, শিয়া, ধোকাবাজ, ফিৎনাবাজ, বদ্কার, অপবাদকারী, পথভ্রষ্ট, খিনজির ইত্যাদি বলে ফতওয়া দিয়েছে। তার কিছু দলীল নিম্নে পেশ করা হলো-

(১) রেযা খানী মাযহাব, (২) আস সাহাবুল মিদরার, (৩) আল খাতামু আলা  লিসানিল খাসমি, (৪) বাসতুল বানা, (৫) কাতুয়ুল ওয়াতীন, (৬) আত তাজদিকাত লি দাফয়িত তালবীসাত, (৭) আশ শিয়াবুছ ছাকিব আলাল মুস্তাকিল কাযিব, (৮) কারামতে আহম্মদী, (৯) আল জাওয়াবুল মাহ্মুদ আন আকাযীবি রাহতিল হাসুদ, (১০) তাযকেরাতুল খাওয়াতীর, (১১) সাইফে ইয়ামানী বর হলক্বমে রেযা খানী, (১২) খানযারে ইয়ামানী বর গরদানে রেযা খানী, (১৩) আত্ তাছদীকাত লি দফইত তালবীসাত, (১৪) সায়ে কায়ে আসমানী, (১৪) বারাআতুল আবরার, (১৫) তালকিছুল মাকাল, (১৬) মুনকারাতুল কুবুর, (১৭) ইরশাদুল উম্মাহ্ ইলাত তাফরীকাতে বাইনাল বিদ্য়াতে ওয়াস্ সুন্নাহ্, (১৮) আল মঞ্জুমাতুল মুখতাছারা, (১৯) আল বায়ানুল ফাসিল বাইনাল হাক্কি ওয়াল বাতিল, (২০) সুন্নত বিদ্য়াতের পার্থক্য, (২১) সত্যের দিকে করুণ আহবান, (২২) ওহাবীদের ইতিহাস, (২৩) রেজভী ধর্মমতের স্বরূপ, (২৪) প্রকৃত ওহাবী কারা, (২৫) রেজভী ফিৎনা, (২৬) একখানা বিজ্ঞাপন রদ, (২৭) রেজভী ফিৎনার ষ্টাইল ইত্যাদি।

          অতএব, উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা প্রথমতঃ এটাই প্রমাণিত হলো যে, ইমামুল আইম্মা, মুহিউস্ সুন্নাহ্, দাফিউল বিদ্য়াত, কুতুবুল আলম, ক্বাইউমুয্যামান, হুজ্জাতুল ইসলাম, লিসানুল উম্মত, ফখরুল উলামা ওয়াল মাশায়েখ, ছাহেবুল আছরার, আমীরুশ্ শরীয়ত ওয়াত্ ত্বরীকত, আওলাদে রাসূল, আমীরুল মু’মিনীন হযরত সাইয়্যিদ আহ্মদ শহীদ বেরেলভী (রঃ) ছিলেন তাঁর জামানার আল্লাহ্ পাক-এর লক্ষ্যস্থল এবং ত্রয়োদশ শতাব্দীর মুজাদ্দিদ ও ইমাম।

দ্বিতীয়তঃ হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ) তাঁর এ তরীক্বা সম্পর্কে নিজেই বলেন, “আমি সুন্নতের পূর্ণ পায়রবী করে থাকি। তাই স্বয়ং হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম  আমার প্রতি খুশী হয়ে আমাকে বাইয়াত করিয়ে আমার তরীক্বার নাম দিয়েছেন তরীক্বায়ে মুহম্মদীয়া।”

তৃতীয়তঃ আমীরুল মু’মিনীন হযরত সাইয়্যিদ আহ্মদ শহীদ বেরেলভী (রঃ)-এর সাথে মুহম্মদ ইবনে আব্দুল ওহাব নজদীর কোন দিক থেকেই কোন সম্পর্ক ছিল একথাও সম্পূর্ণ মিথ্যা। এরও কোন সহীহ দলীল-প্রমাণ  কেউ পেশ করতে পারবেনা।। আর তিনি ওহাবীও ছিলেননা।

চতুর্থতঃ তারা তাঁকে কাফির বলে থাকে। প্রকৃতপক্ষে  এ কথাও ডাহা মিথ্যা এবং কুফরীমূলক। কারণ এর কোন প্রমাণ নাই।

পঞ্চমতঃ তারা তাঁর সম্পর্কে বলে থাকে যে, তিনি নাকি খ্রীষ্টানদের পক্ষ হয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন ……….. একথাও সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং এরও কোন দলীল প্রমাণ নেই।

ষষ্ঠতঃ আরো বলে থাকে যে তিনি নাকি শিখদের পক্ষ হয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন একথাও সম্পূর্ণ মিথ্যা যার কোন দলীল প্রমাণ নেই।

সপ্তমতঃ তারা বলে থাকে তিনি তার লিখিত কিতাবাদীতে কুফরী আক্বীদামূলক কথাবার্তা লিখেছেন। এটাও সম্পূর্ণ মিথ্যা, কারণ তিনি কোন কিতাবই লিখেননি।

অষ্টমতঃ যদি মুহম্মদি বললে মুহম্মদ বিন আব্দুল ওহাব নজ্দীকে বুঝায় আর আহমদী বললে যদি মির্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীকে বুঝায় তাহলে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বরকতময় নাম মোবারক মুহম্মদ ও আহমদ বাদ দিতে হবে। অথচ এটা চিন্তা করাও কুফরী।

নবমতঃ শরীয়তের উছূল হলো- কাউকে কাফির প্রমাণ করতে হলে কুরআন-সুন্নাহ্র দলীল পেশ করতে হবে। এক্ষেত্রে ইতিহাস গ্রহণযোগ্য নয়। যতক্ষণ পর্যন্ত ইতিহাস কুরআন-সুন্নাহ্ মোতাবেক না হবে।

দশমতঃ প্রমাণিত হলো যে, আহমদ রেযা খান সাহেব ও তার অনুসারীরা তাদের স্বরচিত কিতাবাদী ও পত্রপত্রিকাতে সানদুল আওলিয়া, মাখযানে মারিফাত, খাযিনার্তুরহমা, সাহিবুল আসরার, রুহুল হাক্কে, মুজাহিদে মিল্লাত, খলীফাতুল্লাহ্ ফিল আরদ, আওলাদে রাসূল, আমীরুল মু’মিনীন, হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ) সম্পর্কে যা কিছু লিখেছে ও লিখে যাচ্ছে তা প্রকৃতপক্ষে সম্পূর্ণই অনুমান নির্ভরযোগ্য দলীলবিহীন ও মিথ্যা প্রোপাগান্ডা বৈ অন্য কিছুই নয়।

একাদশতঃ হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ), ইসলামকে বুলন্দ করতে যেয়ে খ্রীষ্টান, শিখ ও সীমান্তের সেনা সর্দারদের বিরুদ্ধে জিহাদ করতে গিয়ে শাহাদত বরণ করেন।

দাদ্বশতঃ হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ)কে ওহাবী ও কাফির বলা কুফরীর অন্তর্ভূক্ত।

          সুতরাং যারা হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ)-এর সম্পর্কে কুফরীমূলক বক্তব্য পেশ করে থাকে তদের উচিৎ এ বিষয়ে আল্লাহ্ পাককে ভয় করে এ সমস্ত কুফরীমূলক বক্তব্য থেকে তওবা ইস্তেগফার করে নিজেদের ঈমানকে হিফাযত করা। কারণ আল্লাহ্ পাক তাঁর ওলীদের সম্পর্কে হাদীসে কুদসীতে এরশাদ ফরমান,

من عادلى وليا فقد اذنته بالحرب.

অর্থাৎ- আমার ওলীদের সাথে যে শত্রুতা বা বিদ্বেষ পোষণ করে আমি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করি। (বুখারী শরীফ)

          দলীলসমূহঃ-(১) বুখারী শরীফ, (২) মুসলিম শরীফ,  (৩) আবূ দাউদ শরীফ, (৫) মেশকাত শরীফ (৬) বাহরুর রায়েক, (৭) শামী, (৮) মাযমাউল আনহোর, (৯) ওকায়ে আহম্মদী,(১০) মনজুরাতুস্ সাদাত ফি আহ্ওয়ালুল গাযা ওয়াশশুহাদা, (১১) ওয়াসিলে ওয়াজীর আলা তরিকুল বাশীর ওয়ান নাযীর, (১২) তাওয়ারীখে আযিবা, (১৩) মাখযানে আহম্মদী, (১৪) মুকাশিফাতে রহমত, (১৫) আমিরুর রেওয়ায়েত, (১৬) নকশে হায়াত, (১৭) জখিরায়ে কারামত, (১৮) নুরুন আলা নূর, (১৯) শাহ্ ওয়ালী উল্লাহ্ আওর উনকি সিয়াসাত, (১৬) কারামতে আহম্মদী, (২০) নুযহাতুল খাওয়াতীর, (২১) উলামায়ে হিন্দ শান দারাজী, (২২) তাহরীকে বালাকোট, (২৩) সাওয়ানেহ আহম্মদী (আল্লামা জাফর থানেশ্বরী (রঃ)-এর কিতাব), (২৪) সীরাতে সাইয়্যিদ আহম্মদ শহীদ (রঃ), (২৫) এহকাকোল হক, (২৬) মুরাদুল মুরিদীন, (২৭) (২৮) যর ঈমান কি বাহার আই, (২৯) কারবালা থেকে বালাকোট, (৩০) আরোয়ায়ে সালাছা, (৩১) তারিখে মাশায়েখে চিশ্ত, (৩২) হেক্বায়েতে আউলিয়া, (৩৩) যাদুদ তাকওয়া, (৩৪) তারিখে নজদওহেজায, (৩৫) সীরাতে শাহ্ আব্দুল আজীজ, (৩৬) তাহ্রীকে দেওবন্দ, (৩৭) বঙ্গ ও আসামের পীর ওলী, (৩৮) রিসালাত ও দাওয়াত, (৩৯) সিরাতে মুস্তাকিম, (৪০) মাকালাতে তরিকত, (৪০) দাফেউল বিদ্য়াত নাফেউল ইবাদ, (৪১) তাসকেরার্তু রশিদ, (৪২) আরগুমানে আহবাব, (৪৩) সিয়ানাতুন্নস, (৪৪) সীরাতে শাহ্ ইসমাঈল দেহলভী, (৪৫) ইশয়াতে হক্ব, (৪৬) জিয়াউল কুলুব, (৪৭) ছাইফূল জব্বার, (৪৮) এশ্কে রাসূল ও উলামা-ই দেওবন্দ, (৪৯) মাকাতিবে শাহ্ ইসমাঈল, (৫০) হায়াতে তাইয়্যিব, (৫১) হায়াতে ওলী, (৫২) মাসিরুল আবরার, (৫৩) রাসায়েলে খোলাফা, (৫৪) আহলে সাদিকপুর, (৫৫) সারে জুয়ুদুল আহরার, (৫৬) আবাই আওর খানদানি হালত কে মা আখাজ, (৫৭)(৫৮) সাইফুল মাযহাব, (৫৯) ইসলামী বিশ্বকোষ, (৬০) পলাশী যুদ্ধোত্তর আযাদী সংগ্রামের পাদপিঠ, (৬১) বাংলাদেশের মুসলমানদের ইতিহাস, (৬২) চেপে রাখা ইতিহাস, (৬৩) তাযকেরাতুল আউলিয়া/৫ম খন্ড, (৬৪) চল্লিশ আউলিয়া কাহিনী, (৬৫)  সাওয়ানেহ্ আহমদী (আল্লামা গোলাম রসূল মেহের কৃত), (৬৫) তাওয়ারীখে হাজেরা, (৬৬) হাজেরা গেজেট, (৬৭)  মুজাহিদ বাহিনীর ইতিবৃত্ত, (৬৮) ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সত্যিকারের ইতিহাস, (৬৯) পাক ভারতে মুসলমানদের ইতিহাস, (৭০) ওহাবীর ইতিহাস, (৭১) রেজভী ফিৎনা, (৭২) প্রকৃত ওহাবীকারা, (৭৩) ওহাবী আন্দোলন, (৭৪) রেজভী ধর্মমতের স্বরূপ, (৭৫) রেজভী ফিৎনার ষ্টাইল, (৭৬) আমরা যাদের উত্তরসূরী, (৭৭) ঈমান ও মুসলিম জাতির হিফাজত, (৭৮) ঞযব ওহফরধহ গঁংষরসং (৭৯) হাদায়ে বশশীশ, (৮০) নুগমাতুর রূহ, (৮১) হাফতে আকতাব, (৮২) আল জুন্নাতু লি আহ্লিস্ সুন্নাহ্, (৮৩) হায়াতে আহমদ রেযা খান, (৮৪) মালফুজাতে আলা হযরত, (৮৫) ফতওয়ায়ে রেজভীয়া, (৮৬) ফাওয়ায়ে ফরীদিয়া, (৮৭) জামেউল ফতওয়া, (৮৮) আনোয়ারে শরীয়ত, (৮৯) মাদায়েয়ে আলা, (৯০) তাযকিরায়ে গাউসিয়া, (৯১) ইরফানে শরীয়ত, (৯১) মাকাবিসুল মাজালিস ইত্যাদি।

          ইনশাআল্লাহ্ হক্বের অতন্ত্র প্রহরী, সত্যের ঝান্ডা বুলন্দকারী, না হক্ব ও বাতিলের মুখোশ উন্মোচনকারী মাসিক আল বাইয়্যিনাত পত্রিকা থেকে অচিরেই ত্রয়োদশ শতাব্দীর মুজাহিদে মিল্লাত, মুজাদ্দিদুয্যামান, মুজাহিদে আযম, আমিরুল মু’মিনীন হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রঃ)-এর উপর ধারাবাহিকভাবে ফতওয়া বের হবে।

সুওয়াল-জাওয়াব

সুওয়াল-জাওয়াব

সুওয়াল-জাওয়াব

সুওয়াল-জাওয়াব বিভাগ

সুওয়াল-জাওয়াব বিভাগ