হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ হয়েছে, আখিরী যামানায় মানুষ নাম পরিবর্তন করে শরাবকে হালাল করে খাবে।”
প্রদত্ত হাদীছ শরীফ উনার উপজীব্য বিষয় এটাই যে, নামকাওয়াস্তে মুসলমান থাকায় ইসলামের অনুশাসনের প্রতি তার দৃশ্যত একটা আনুগত্যতা থাকবে কিন্তু কার্যতঃ সে নফসানিয়তের অনুসরণই করবে। অর্থাৎ হারামই খাবে তবে হালালের নাম করে।
বলা বাহুল্য, ঠিক এ ধরণেরই মনোবৃত্তির প্রতিফলন ঘটেছে মুহম্মদপুর থেকে প্রকাশিত জামেয়া রাহমানিয়ার মুখপত্রে। হরতাল করা সম্পর্কে তাদের স্ব-বিরোধীতা, মুনাফিকী ও জিহালতীর বিভিন্ন দিক নিয়ে এ কলামে আলোকপাত করা হয়েছে।
উল্লেখ করা দরকার হরতাল বিষয়ক তাদের এ জবাবের শেষ পর্যায়েও প্রকাশ পেয়েছে একই প্রকারের কুপমন্ডুকতা। জবাবের শেষ অংশে তারা বলেছে, “কারণ আন্দোলনকারীদের দ্বারা হারাম বা নাজায়েয কাজ প্রকাশ হলে তা আর ইসলামী আন্দোলন থাকবেনা। ঐ আন্দোলনের রূহানিয়ত এবং তাছীর নষ্ট হয়ে যাবে এবং তার দ্বারা বাতিলের উপর কোন প্রভাব পড়বে না। এর দ্বারা আখিরাতেও কামিয়াবী আশা করা যায়না। উক্ত শর্তসমূহ মান্য করা সম্ভব না হলে নাজায়েয হরতাল করে দ্বীনের ক্ষতি না করা জরুরী।”
পাঠক! এ কথার উল্টোপিঠ যা দাঁড়াচ্ছে তাহলো যে, জায়েয হরতালের অস্তিত্ব রয়েছে। আর এ জায়েয এবং নাজায়েযটা মূলতঃ ওদের ইচ্ছের ও ওদের সুবিধার উপর নির্ভর করে।
অথচ হরতাল- যা মূলেই হারাম। যা বিধর্মী মহনদাস করম চাঁদ গান্ধী কর্তৃক প্রবর্তিত ও প্রচলিত। তা ইসলামের দৃষ্টিতে জায়েয হতে পারেনা কখনও।
কারণ ইসলাম পরিপূর্ণ ধর্ম। বিজাতীয়, বিধর্মীয় আদর্শ, কর্মসূচী ইসলামে আদৌ গ্রহণযোগ্য নয়। তদুপরি ইসলাম শান্তির ধর্ম। মুসলিম জীবনে যা অশান্তি, ক্ষতির কারণ তা ইসলামে বর্জনীয়।
আর হরতালে এ উভয় জিনিসটিই থাকে অতি ন্যাক্কারজনকভাবে। জনজীবনে বিশৃঙ্খলা, জানমালের প্রভূত ক্ষতি, এক জনের অন্যায়ের শাস্তি অপরকে দেয়া, হারাম পন্থায় ইসলাম কায়েমের চেষ্টা প্রভূতি নাজায়েয কাজ সাপেক্ষে হরতাল যে কোন দিনই ইসলামিক হতে পারে না অথবা সম্পূর্ণই অনৈসলামিক কাজ তা এ কলাম ছাড়াও মাসিক আল বাইয়্যিনাত-এর ১৬, ৯১ ইত্যাদি সংখ্যায় বিস্তর লেখালেখি হয়েছে।
মোদ্দাকথা মাদকতা ছাড়া যেমন শরাব হয়না তেমনি হারাম অনুষঙ্গ ছাড়াও হরতাল হয়না। তদুপরি হরতাল শব্দটিই ব্যবহার করা নাজায়েয।
এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ পাক তিনি কুরআন শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক করেন, “হে ঈমানদারগণ! তোমরা রঈনা বলোনা, উনজুরনা বল এবং শ্রবণ কর (বা শুনতে থাক) আর কাফিরদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি।” (পবিত্র সূরা বাক্বারা/১০৪)
এ পবিত্র আয়াত শরীফ উনার শানে নুযুলে বলা হয়, ইহুদীরা সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে কষ্ট দেয়ার জন্য “রঈনা” শব্দ ব্যবহার করতো, যার একাধিক অর্থ। একটি অর্থ হলো- “আমাদের দিকে লক্ষ্য করুন,” যা ভাল অর্থে ব্যবহৃত হয়। আর খারাপ অর্থে- “হে মূর্খ, হে মেষ শাবক এবং হিব্রু ভাষায় একটি বদ দোয়া।” ইহুদীরা সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে “রঈনা” বলে সম্বোধন করতো। যাতে প্রকৃতপক্ষে তাদের উদ্দেশ্য ছিল খারাপ অর্থের প্রতি ইঙ্গিত করা। অন্যান্য ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ উনারা “রঈনা” শব্দের ভাল অর্থের প্রতি ইঙ্গিত করে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে সম্বোধন করলে তখন ইহুদীরা খারাপ অর্থ চিন্তা করে হাসা-হাসি করতো। এতে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি কষ্ট পেতেন, তবুও কিছু বলতেন না। কেননা, মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ওহী ছাড়া কোন কথা বলতেন না।
যেমন, কুরআন শরীফ উনার মধ্যে বলা হয়েছে, “তিনি সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওহী ব্যতীত নিজের থেকে মনগড়া কোন কথা বলেন না।” (পবিত্র সূরা নজম মুবারক/৩,৪)
এর ফলশ্রুতিতে মহান আল্লাহ পাক তিনি কুরআন শরীফ উনার পবিত্র আয়াত শরীফ নাযিল করে “রঈনা” শব্দের বদলে “উনজুরনা” শব্দ ব্যবহার করতে বললেন। কারণ “রঈনা” শব্দ ভাল-খারাপ উভয় অর্থে ব্যবহৃত হলেও “উনজুরনা” শব্দ শুধুমাত্র ভাল অর্থেই ব্যবহৃত হতো।
আর হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে, “হযরত আবু হুরায়রা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলেন, আঙ্গুর গাছকে তোমরা ‘কারম’ বলোনা। কারম বলা হয় মুমিনের অন্তরকে।”
মুসলিম শরীফ উনার অপর বর্ণনায় হযরত ওয়ায়েল ইবনে হুযূর হতে বর্ণিত। সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলেছেন, “আঙ্গুরকে তোমরা ‘কারম’ বলোনা বরং এনাব ও হাবালা বলো।”
এখানে উল্লেখ্য যে আরবী ভাষায় ‘কারম’ অর্থ আঙ্গুর … অর্থও আঙ্গুর। আঙ্গুর হতে শরাব উৎপন্ন হয় এজন্য শরাবকে …. বলা হয়। তারা ধারণা করত যে শরাব পানকারীকে ….. (দয়া)-এর ওয়ারিস বানায়। শরাব হারাম হওয়ার পর সর্বত্র তা বর্জিত হলো এবং বলা হলো যে, মু’মিনের অন্তকরণ হলো কারম যা দয়ার স্থল, পক্ষান্তরে শরাব কারম হতে পারে না; কারণ তা মানুষকে মাতাল করে। সুতরাং শরাব উম্মুল খাবায়েস হতে পারে। আর মু’মিনের অন্তর কারম হতে পারে। তাই যে সকল শব্দ ভাল মন্দ উভয় অর্থেই ব্যবহৃত হয়, সে সকল শব্দের পরিবর্তে উপরোক্ত আয়াত শরীফ ও হাদীছ শরীফ উনাদের মুতাবিক ওটার সমার্থক অর্থবোধক শব্দ ব্যবহার করতে হবে, যা শুধুমাত্র ভাল অর্থেই ব্যবহৃত হয়।
অতএব, যতই ইসলামী অনুষঙ্গ যুক্ত করা হোক ইসলামী অনুশাসন মুতাবিক “হরতাল” শব্দ তথা প্রক্রিয়া কোনটাই ইসলামে গ্রহণযোগ্য হতে পারেনা। এটাই ছহীহ মত। যেমন হতে পারেনা হালাল শরাব এরূপ প্রচারণা।
-মুহম্মদ ওয়ালীউল্লাহ, বাসাবো, ঢাকা।
ইসলামী বিশ্বকোষের আলোকে বালাকোট যুদ্ধের ইতিহাস- (৪)