মতামত বিভাগ

সংখ্যা: ৮২তম সংখ্যা | বিভাগ:

চিরকালই হক্ব প্রতিষ্ঠার নিয়মে ওদের বিরোধীতায় হ্রাস নয়, জোয়ার এসেছে

 

আবুল হাকাম বা জ্ঞানীর পিতা হওয়া সত্বেও তার নাম আবু জেহেল বা মূর্খের পিতা হওয়ার কারণটা কি? জ্ঞানীর পিতা দাবী করেও, আখেরী রাসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অস্বীকার করেই কেবল সে তার জেহালতি প্রকাশ করেনি, বিরোধীতা করে জেহালতির ব্যারোমিটারকে তুঙ্গে তুলেনি বরং তার জেহালতির চূড়ান্ত মাপকাঠি সাব্যস্ত হয়েছে। মেলায় মেলায়, বিভিন্ন স্থানে গিয়ে বিভিন্ন ছল-চাতুরীর দ্বারা মিথ্যা প্রপাগান্ডা করে, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামে অপবাদ গেয়ে একের পর এক জঘণ্য বিরোধীতা করেও সে উপলব্ধি করতে নিদারুণভাবে ব্যর্থ হয়েছে যে, এভাবে বিরোধীতা করে সে যে উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে চেয়েছিল তা বিন্দুমাত্র সফল না হয়ে পুরোমাত্রায় নিস্ফল হয়েছে। অথচ তা সে মৃত্যু মূহুর্তেও হৃদয়ঙ্গম করতে পারেনি।

আর এখানেই মূল্যায়িত হয়, তার প্রতি আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দেয়া আবু জেহেল নামের যথার্থতা। বিরোধীতা করতে চাইলেও তার বিরোধীতার দ্বারা ইসলামের প্রচার-প্রসারই হয়েছে বেশী। সে আল্লাহ্র কুরআনকে ফুৎকারে নিভিয়ে দিতে চেয়েছিল কিন্তু আল্লাহ্ পাক স্বয়ং কুরআন শরীফের জিম্মাদারী নিয়েছেন। সে হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নির্বংশ ভেবে উপহাস করেছিল, খুশী হয়েছিল এই ভেবে যে, অচিরেই তাঁর নাম মুখে উচ্চারণ করার মত কেউই থাকবেনা, কিন্তু জবাবে আল্লাহ্ পাক রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অফুরন্ত কল্যাণ (কাওছার) দান করেছিলেন, এবং পাল্টা ঘোষণা করেছিলেন, “যে আপনার শত্রু সেই তো লেজকাটা নির্বংশ।” (সূরা কাওছার/৩)

বাস্তবিক তাই হয়েছে। হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নির্বংশ বলে উপহাসকারী, আবু জেহেল, আস ইবনে ওয়ায়েল, ওকাবা অথবা কাব  ইবনে আশরাফকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করার গোষ্ঠী আজ পৃথিবীতে নেই, তাদের বংশধরও নেই।

পক্ষান্তরে হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর লক্ষ লক্ষ সাইয়্যিদজাদাগণ তথা আওলাদে রাসূলগণ আজও পৃথিবীতে মওজুদ। মওজুদ কোটি কোটি উম্মতে মুহম্মদীগণ। যারা হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তাদের প্রাণাধিক প্রিয়রূপে মূল্যায়ণ করেন। ঈমানের অঙ্গ বলে গ্রহণ করেন এবং দৈনিক লক্ষ-কোটি বার তাঁর নাম মোবারক শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন, সালাত-সালাম প্রেরণ করেন। কিন্তু এই যে ঈমানের জোয়ার, শত শত বৎসর ধরে পৃথিবী ব্যাপী হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ব্যাপ্তি এটাই কি আবু জেহেল চেয়েছিল? ইসলামের ইতিহাস আমাদের সামনে কি উন্মোচন করে?

আল্লাহ্ পাক বলেন, “হে নবী, আপনার নিকটাত্মীয়দেরকে আল্লাহ্র আযাব সম্পর্কে ভয় প্রদর্শন করুন।”

কুরআন শরীফের এই আয়াত নাযিল হওয়ার পর নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাফা পাহাড়ের ওপর আরোহন করে আওয়াজ দিলেন, হে বণী ফিহ্র, হে বণী আদী, এই আওয়াজ শুনে কুরাঈশদের সকল নেতৃস্থানীয় লোক একত্রিত হলো। যিনি যেতে পারেননি তিনি একজন প্রতিনিধি পাঠিয়েছেন কি ব্যাপার সেটা জানার জন্য। কুরাঈশরা এসে হাযির হলো, আবু লাহাবও তাদের সঙ্গে ছিল। এরপর তিনি বললেন, তোমরা বলো- যদি আমি তোমাদের বলি যে, পাহাড়ের ওদিকের প্রান্তরে একদল ঘোড় সওয়ার আত্মগোপন করে আছে, ওরা তোমাদের ওপর হামলা করতে চায়, তোমরা কি সে কথা বিশ্বাস করবে? সবাই বলল, হ্যাঁ, বিশ্বাস করব, কারণ আপনাকে আমরা কখনো মিথ্যা বলতে শুনিনি। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, শোন, আমি তোমাদেরকে এক ভয়াবহ আযাবের ব্যাপারে সাবধান করার জন্য প্রেরিত হয়েছি। আবু লাহাব বলল, তুমি ধ্বংস হও। তুমি আমাদেরকে একথা বলার জন্য এখানে ডেকেছ?

আবু লাহাবের একথা বলার পর আল্লাহ্ পাক সূরা লাহাব নাযিল করেন। এতে বলা হয়- “আবু লাহাবের দু’হাত ধ্বংস হোক এবং ধ্বংস হোক সে নিজেও।” (সূরা লাহাব/১)

অতঃপর আল্লাহ্ পাক এই আয়াত নাযিল করেন, “আপনাকে যে আদেশ দেয়া হয়েছে, তা খোলাখুলি ঘোষণা করুন এবং মুশরিকদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিন।” (সূরা নহল/৯৪))

এতে রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পৌত্তলিকতার খারাপ দিক সম্পর্কে প্রকাশ্যে তুলে ধরেন এবং মিথ্যার পর্দা উন্মোচিত করেন। কুরাঈশরা তখন কোমর বেঁধে উঠে দাঁড়ালো। কারণ তারা জানতো যে, আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কাউকে মা’বুদ হিসেবে অস্বীকার করা এবং রিসালাত ও আখেরাতের উপর বিশ্বাস স্থাপনের অর্থ হচ্ছে নিজেকে পরিপূর্ণভাবে রিসালতের হাতে ন্যস্ত করা এবং তাঁর কাছে নিঃশর্তভাবে আত্মসমর্পণ করা। এতে করে অন্যদের তো প্রশ্নই আসেনা! নিজের জান-মাল সম্পর্কে পর্যন্ত নিজের কোন স্বাধীনতা থাকেনা। এর অর্থ হচ্ছে যে, আরবের লোকদের ওপর মক্কার লোকদের ধর্মীয় ক্ষেত্রে যে শ্রেষ্ঠত্ব ও কর্তৃত্ব ছিল সেটা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। এর ফলে আল্লাহ্ এবং তাঁর রাসূলের ইচ্ছা ও মর্জিই হবে চূড়ান্ত, নিজেদের ইচ্ছামতো তারা কিছুই করতে পারবেনা। নীচু শ্রেণীর লোকদের ওপর তারা যে অত্যাচার নির্যাতন চালিয়ে আসছিল, সকাল সন্ধ্যা তারা যেসব ঘৃণ্য কাজে লিপ্ত ছিল সে সব থেকে তাদের দূরে থাকতে হবে। কুরাঈশরা এর অর্থ ভালোই বুঝতে পেরেছিল, এ কারণেই তাদের দৃষ্টিতে অবমাননাকর এরূপ অবস্থা তারা মেনে নিতে পারছিলনা। কিন্তু এটা কোন কল্যাণের বা মঙ্গলের প্রত্যাশায় নয় বরং আরো বেশী মন্দ কাজে নিজেদের জড়িত করাই এর উদ্দেশ্য। আল্লাহ্ পাক বলেন, ‘বরং এজন্য যে মানুষ চায় ভবিষ্যতের মন্দ কাজে তারা লিপ্ত হবে।” (সূরা ক্বিয়ামাহ্/৫))

আর মন্দ কাজ চরিতার্থ করার জন্য, ইসলামের বিরোধীতা করার জন্য তারা একের পর এক নিস্ফল তথা জেহালতিপূর্ণ সংকল্প করতে লাগল।

প্রথমতঃ তারা রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে উদ্দেশ্য করে হাসি-ঠাট্টা, বিদ্রুপ-উপহাস করত এবং তাঁকে মিথ্যাবাদী বলে অভিহিত করত। এর উদ্দেশ্য ছিল মুসলমানদের মনোবল নষ্ট করা এবং সমাজে তাঁর ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করা। এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য পৌত্তলিকরা নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অহেতুক অপবাদ এবং গালাগাল দিতে শুরু করে। কখনো তারা হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে পাগল বলতো। যেমন আল্লাহ্ পাক বলেন, “ওসব কাফেররা বলল, যার ওপর কুরআন নাযিল হয়েছে নিশ্চয়ই সে একটা পাগল।” (সূরা হিজর/৬)

কখনো তাঁকে যাদুকর এবং মিথ্যাবাদী হওয়ার অপবাদ দেয়া হতো। যেমন আল্লাহ্ পাক বলেন, “ওরা বিস্ময় বোধ করছে যে, ওদের কাছে ওদেরই মধ্য থেকে একজন সতর্ককারী এলেন এবং কাফেররা বলে এতো এক যাদুকর, মিথ্যাবাদী।” (সূরা ছদ/৪)

কাফেররা আল্লাহ্র রাসূলের সামনে ও পিছন দিয়ে ক্রুদ্ধভাবে চলাচল করতো এবং ক্ষুব্ধ দৃষ্টিতে তাঁর প্রতি তাকাতো। এ সম্পর্কে আল্লাহ্ পাক বলেন, “কাফেররা যখন কুরআন শ্রবণ করে তখন তারা যেন ওদের তীক্ষèদৃষ্টি দ্বারা আপনাকে গ্রাস করতে চায় এবং বলে এতো পাগল।” (সূরা ক্বলম/৫১)

হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন কোথাও যেতেন এবং তাঁর সামনে পিছনে দুর্বল ও অত্যাচারিত সাহাবা-ই-কিরাম (রাঃ) থাকতেন তখন পৌত্তলিকরা ঠাট্টা করে বলতো, “আল্লাহ্ কি তোমাদের ওপর অনুগ্রহ করলেন?” (সূরা আনয়াম/৫৩))

তাদের এ উক্তির জবাবে আল্লাহ্ পাক বলেন, “আল্লাহ্ পাক কি কৃতজ্ঞ লোকদের সম্বন্ধে সবিশেষ অবহিত নন?” (সূরা আনয়াম/৫৩)

সাধারণভাবে কাফেরদের অবস্থা যেরূপ ছিল কুরআনে আল্লাহ্ পাক তার চিত্র এভাবে অঙ্কন করেছেন, “যারা অপরাধী তারা তো মুমিনদের উপহাস করতো এবং ওরা যখন মুমিনদের কাছ দিয়ে যেতো তখন চোখ টিপে ইশারা করতো এবং যখন ওদের আপনজনের কাছে ফিরে আসতো তখন ওরা ফিরতো উৎফুল্ল হয়ে এবং যখন ওদেরকে দেখতো তখন বলতো এরা তো পথভ্রষ্ট। এদেরকে তো তাদের তত্ত্বাবধায়ক করে পাঠানো হয়নি।” (সূরা মুতাফফিফীন/২৯-৩৩))

দ্বিতীয়তঃ এরপর তারা আল্লাহ্র রাসূলের শিক্ষাকে বিকৃত করা, সন্দেহ, অবিশ্বাস সৃষ্টি করা, মিথ্যা প্রপাগান্ডা করা, দ্বীনের শিক্ষা এবং দ্বীন প্রচারকারীদের ঘৃণ্য সমালোচনা করা ইত্যাদিতে ব্যাপৃত হলো। এসব কাজ তারা এতো বেশী করতো যাতে জনসাধারণ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শিক্ষা সম্পর্কে চিন্তা ভাবনা করার সুযোগ না পায়। কাফেররা পবিত্র কুরআন শরীফ সম্পর্কে বলতো, “ওরা বলতো, এগুলোতো সে কালের উপকথা, যা সে লিখিয়ে নিয়েছে, এগুলো সকাল-সন্ধ্যা তার নিকট পাঠ করা হয়।” (সূলা ফুরকান/৫)

কাফেররা বলে, “এটা মিথ্যা ব্যতীত কিছুই নয়, সে এটা উদ্ভাবন করেছে এবং ভিন্ন সম্প্রদায়ের লোক তাঁকে এ ব্যাপারে সাহায্য করেছে।” (সূরা ফুরকান/৪)

পৌত্তলিকরা এ কথাও বলে যে, “তাকে শিক্ষা দেয় এক মানুষ।” (সূরা নহল/১০৩)

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর তাদের এও অভিযোগ ছিল, “ওরা বলে, এ কেমন রাসূল! যে আহার করে এবং হাটে বাজারে চলাফেরা করে?” (সূরা ফুরকান/৭)

তৃতীয়তঃ হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর বর্ণনা থেকে এ কথাও জানা যায় যে, নযর ইবনে হারিস কয়েকজন দাসী ক্রয় করে রেখেছিল। যখন সে শুনতো যে, কোন মানুষ নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে তখন তার ওপর একজন দাসীকে লেলিয়ে দিতো। সেই দাসী সে লোককে পানাহার করাতো, তাকে গান শোনাতো। এক পর্যায়ে সেই লোকের অন্তরে ইসলামের প্রতি কোন আকর্ষণ অবশিষ্ট থাকতোনা। এ সম্পর্কে আল্লাহ্ পাক বলেন, “কিছু লোক এমন রয়েছে যারা ক্রীড়ার কথা-বার্তা ক্রয় করে, যাতে আল্লাহ্র পথ থেকে দূরে সরানো যায়।”

এছাড়া কুরাঈশরা এক পর্যায়ে এ রকম চেষ্টা করেছিল যে, ইসলাম এবং জাহিলিয়াতের মধ্যে একটি আপোষ রফা করবে। অর্থাৎ পরস্পর পরস্পরকে কিছু ছাড় দিবে।

আল্লাহ্ পাক কুরআনে এ সম্পর্কে বলেন, “ওরা চায় যে, আপনি নমনীয় হবেন তাহলে তারাও নমনীয় হবে।” (সূরা ক্বলম/৯)

ইবনে জারির এবং তিবরাণীর একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, পৌত্তলিকরা আল্লাহ্র রাসূলের নিকট এ মর্মে প্রস্তাব দিল যে, “এক বছর আপনি আমাদের উপাস্যদের উপাসনা করুন আর এক বছর আমরা আপনার প্রভুর উপাসনা করবো।” আবদ ইবনে হোমায়েদের একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, পৌত্তলিকরা বলল, আপনি যদি আমাদের উপাস্যদের মেনে নেন তবে আমরাও আপনার খোদার ইবাদত করবো। কিন্তু হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সূরা কাফিরূনের মাধ্যমে স্পষ্টভাবে তা নাকচ করে দেন।

এরপর কাফেররা যখন দেখল হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রচারিত ইসলামকে স্ব-গোত্রে কোনভাবেই প্রতিরোধ করা যাচ্ছেনা, বরং দিন দিন তা বিস্তৃত হচ্ছে তখন গোত্রের বাইরে যাতে ইসলাম প্রচারিত না হয়, বাইরের লোকজন যাতে হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মূল্যায়ণ করতে না পারে বরং পূর্ব থেকেই যাতে তাঁর সম্পর্কে খারাপ ধারণা পায় সে চিন্তায় তারা ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ল।

কারণ তখন অত্যাসন্ন ছিল হজ্বের মৌসুম। কুরাঈশরা জানতো যে, আরবের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিনিধিদল এ সময় মক্কায় আসবে। এ কারণে তারা মনে করলো যে, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে এমন কথা বলবে যাতে আরবের লোকদের মনে আল্লাহ্র রাসূলের দ্বীন প্রচারের কোন প্রভাব না পড়ে।

এ বিষয়ে আলোচনার জন্য তারা ওলীদ ইবনে মুগীরার কাছে গিয়ে একত্রিত হলো। ওলীদ বললো, ‘প্রথমে তোমরা সবাই একমত হবে, একজনের কথা অন্যজন মিথ্যা বলে উড়িয়ে দেবে এমন অবস্থা যেন না হয়। তোমাদের মধ্যে কোন প্রকার মত পার্থক্য থাকতে পারবেনা।’ আগন্তুকগণ বলল, ‘আপনিই আমাদের বলে দিন, আমরা কি বলব।’ ওলীদ বলল, ‘তোমরা বলো, আমি শুনবো।’ এরপর কয়েকজন বলল, ‘আমরা বলবো যে, তিনি একজন জ্যোতিষ।’ ওলীদ বলল, ‘না, তিনি জ্যোতিষ নন, আমি জ্যোতিষদের দেখেছি, তার মধ্যে জ্যোতিষদের মতো বৈশিষ্ট্য নেই, জ্যোতিষরা যেভাবে অন্তসারশুণ্য কথা বলে থাকে তিনি সেভাবে বলেননা।’ একথা শুনে আগন্তুকরা বলল, ‘তাহলে আমরা বলবো যে, তিনি একজন পাগল। ওলীদ বলল, না তিনি পাগলও নন। আমি পাগলও দেখেছি, পাগলের প্রকৃতিও দেখেছি। তিনি পাগলের মতো আচরণও করেননা, পাগলের মতো ওলট-পালট কথাও বলেননা।’ লোকেরা বলল, ‘তাহলে আমরা বলবো যে, তিনি একজন কবি।’ ওলীদ বলল, ‘তিনি কবিও নন। কবিত্বের বিভিন্ন বিষয় আমার জানা আছে। তাঁর কথা কবিতা নয়।’ লোকেরা বলল, ‘তাহলে আমরা বলবো যে, তিনি একজন যাদুকর।’ ওলীদ বললো, ‘না তিনি যাদুকরও নন। আমি যাদুকর এবং তাদের যাদু দেখেছি।’ তিনি ঝাড়-ফুঁক করেননা এবং যাদুটোনাও করেননা। আগন্তুকরা বলল, ‘তাহলে আমরা কি বলবো?’ ওলীদ বললো, আল্লাহ্র শপথ তাঁর কথা বড় মিষ্টি। তার কথার তাৎপর্য অনেক গভীরতাপূর্ণ। তোমরা যে কথাই বলবে শ্রোতারা সবাই মিথ্যা মনে করবে। তবে তাঁর সম্পর্কে একথা বলতে পারো যে, তিনি একজন যাদুকর। তিনি যেসব কথা পেশ করেছেন সেসব কথা স্রেফ যাদু। তাঁর কথা শোনার পর পিতা পুত্রের মধ্যে, ভাই-ভাইয়ের মধ্যে, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে, বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে মত-পার্থক্য দেখা দেয়। পরিশেষে কুরাঈশ প্রতিনিধিদল একথার ওপরেই একমত হয়ে ওলীদের নিকট থেকে ফিরে এলো।

কোন কোন বর্ণনায় একথাও উল্লেখ রয়েছে যে, ওলীদ যখন আগন্তুকদের সব কথা প্রত্যাখ্যান করলো তখন তারা বলল, তাহলে আপনিই সুচিন্তিত মতামত পেশ করুন। একথা শুনে ওলীদ বলল, আমাকে একটুখানি চিন্তা করার সময় দাও। কিছুক্ষণ চিন্তা করার পর ওলীদ উপরোক্ত মন্তব্য করেছিল।

উল্লিখিত ঘটনার প্রেক্ষিতে ওলীদ সম্পর্কে আল্লাহ্ পাক সূরা মুদদাসসিরের ষোলটি আয়াত নাযিল করেন। এসব আয়াতে ওলীদের চিন্তার প্রকৃতির চিত্ররূপ লক্ষ্য করা যায়। আল্লাহ্ পাক বলেন, ‘সে তো চিন্তা করলো এবং সিদ্ধান্ত করলো। অভিশপ্ত হোক সে, কেমন করে সে এ সিদ্ধান্ত করলো! আরো অভিশপ্ত হোক সে, কেমন করে সে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হলো? সে আগে চেয়ে দেখলো। অতঃপর সে ভ্রুকুঞ্চিত করলো এবং মুখ বিকৃত করলো। অতঃপর সে পেছন ফিরলো এবং দম্ভ প্রকাশ করলো এবং ঘোষণা করলো, এটাতো লোক পরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন আর কিছু নয়, এটাতো মানুষেরই কথা।” (সূরা মুদ্দাসসির/১৮-২৫)

উল্লিখিত সিদ্ধান্ত গৃহীত হওয়ার পর এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। কয়েকজন পৌত্তলিক হজ্ব যাত্রীদের আগমণের বিভিন্ন পথে অবস্থান নেয় এবং হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে তাদের সতর্ক করে।

একাজে সবার আগে ছিল আবু লাহাব। হজ্বের সময়ে সে হজ্বযাত্রীদের ডেরায়, ওকায, মাজনা এবং যুলমাযাজের বাজারে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পিছনে লেগে থাকত। নবী পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ্র দ্বীনের প্রচার করতেন, আর আবু লাহাব পিছনে থেকে বলত, তোমরা তাঁর কথা শুনবে না, তিনি হচ্ছেন মিথ্যাবাদী এবং বেদ্বীন।

এ ধরণের ছুটোছুটির ফল এই হলো যে, হজ্বযাত্রীরা ঘরে ফিরে যাওয়ার সময় জানতে পারলো যে, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নুবুওওয়াত দাবী করেছেন। মোটকথা হজ্বযাত্রীদের মাধ্যমে সমগ্র আরব জাহানে আল্লাহ্র রাসূলের আলোচনা ছড়িয়ে পড়লো।

এতক্ষণের আলোচনার পর আজকে প্রায় সাড়ে চৌদ্দশত বছর পর যদি প্রশ্ন করা হয় যে, বর্তমানে আখেরী রাসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রায় হুবহু অনুসরণ-অনুকরণ করে দ্বীন ইসলামের আঞ্জাম কে দিচ্ছেন? সঙ্গতঃ কারণেই তার জবাব হবে, ইমামুল আইম্মা, কুতুবুল আলম, মুজাদ্দিদে যামান, মুহিয়্যুস্ সুন্নাহ্, আওলাদে রাসূল, ঢাকা রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর সাহেব ক্বিবলা মুদ্দাজিল্লুহুল আলী। তার পাশাপাশি তাঁর বিরোধীতা কারা করছে? সেক্ষেত্রে বলার অপেক্ষা থাকেনা যে, এরা সেই আবু জেহেল, আবু লাহাবেরই উত্তরসূরী।

প্রথমতঃ দেখা যায় আবু জেহেল, আবু লাহাব গং আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে উদ্দেশ্য করে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করত, অপবাদ দিতো। ঠিক তেমনি তাদের উত্তর সূরীরা বর্তমানে রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর সাহেব ক্বিবলা মুদ্দাজিল্লুহুল আলী-এর লক্বব নিয়ে ঠাট্টা উপহাস করে, তাঁকে মিথ্যাবাদী, ভন্ড বলে প্রচার করে, রাজারবাগ শরীফের অনুসারীদের প্রতি ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে তাকায়, কুরআন কারীমার ভাষায় কাফেরদের মত মন্তব্য করে, “যখন তাঁদেরকে দেখতো তখন বলতো এরা তো পথভ্রষ্ট।”

আর আল্লাহ্ পাক তার জবাবে বলেন, “এদেরকে তো তাদের তত্ত্বাবধায়ক করে পাঠানো হয়নি।”

দ্বিতীয়তঃ রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর সাহেব ক্বিবলা মুদ্দাজিল্লুহুল আলী-এর অকাট্য তাজদীদ- মৌলবাদ, হরতাল, ব্লাসফেমী আইন, লংমার্চ, কুশপুত্তলিকা দাহ্, ইসলামের নামে গণতন্ত্র, ছবি, রোজা অবস্থায় ইনজেকশন, লাল রুমাল, মহিলা জামায়াত, তাহাজ্জুদের জামায়াত ও আল্লাহ্ পাককে নূর বা আলো বলে অভিহিত করা ইত্যাদির বিরুদ্ধে দলীল নির্ভর ফতওয়া এবং মীলাদ-ক্বিয়াম, কুরআন শরীফ খতম করে উজরত গ্রহণ, ফরজ নামাজের পর হাত তুলে মুনাজাত, জানাযার নামাজের পর মুনাজাত, নিয়ত করে মাজার শরীফ জিয়ারত, অঙ্গুলী চুম্বন, কদমবুছী, ছানী আযান মসজিদের ভিতরে, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নূরের তৈরী, সুন্নতের অনুসরণে লক্বব ব্যবহার এবং চার টুকরা বিশিষ্ট গোল টুপি, সুন্নতি কোর্তাসহ বিবিধ সুন্নত ইত্যাদির পক্ষে অগণিত, অকাট্য দলীলভিত্তিক ফতওয়াকে তারা কাফেরদের মত মনগড়া, দলীলবিহীন ও কুরআন-সুন্নাহ্র খেলাফ পন্থায় অস্বীকার করছে, বিরোধীতা করছে। কাফিররা বলত, “এটা মিথ্যা ব্যতীত কিছুই নয়, সে এটা উদ্ভাবন করেছে এবং ভিন্ন সম্প্রদায়ের লোক তাকে এ ব্যাপারে সাহায্য করেছে।” (সূরা ফুরকান/৪)

আর এর বাস্তব মেছদাক হিসেবে তারা রাজারবাগ শরীফকে ভিন্ন সম্প্রদায় তথা ইহুদী-খ্রীষ্টানদের এজেন্ট বলে অপবাদ দিচ্ছে।

তৃতীয়তঃ কাফেরদের ক্রয় করা দামী নর্তকী দিয়ে আল্লাহ্র রাসূলের বিরোধীতার মত তারা বর্তমানে গুন্ডা, মাস্তান, সন্ত্রাসী ইত্যাদি ভাড়া করে রাজারবাগ শরীফের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিচ্ছে এবং তাদের দ্বারা রাজারবাগ শরীফের মাহফিলকে বানচাল করার অপচেষ্টায় লিপ্ত হচ্ছে।    আর বিশেষভাবে তারা যা করছে তাহলো, হজ্বযাত্রীদের কাফেলায়, ওকায, মাজনা ইত্যাদি মেলায় আবু লাহাব গং, যেমন আগে থেকেই আল্লাহ্র রাসূলের নামে মিথ্যা অপবাদ রটনা করত; ঠিক সে দৃষ্টান্তের অনুসরণ।

বর্তমানে যে স্থানে রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর সাহেব ক্বিবলা মুদ্দাজিল্লুহুল আলী-এর মাহ্ফিল হবে অথবা যেখানে এখনও তিনি যাননি সেখানে আবু লাহাবের উত্তরসূরীরা তাদের গুরু আবু লাহাব গংকে অনুসরণ করে বলে বেড়াচ্ছে যে সাবধান! রাজারবাগ শরীফের পীর সাহেব ক্বিবলার কাছে তোমরা যেয়োনা, তিনি আমাদের প্রচলিত ধর্মের বাইরে, তিনি খোদা দাবী করেছেন, (নাউযুবিল্লাহ্) আল্লাহ্র রাসূলের লক্বব তিনি ধারণ করেছেন (নাউযুবিল্লাহ্), সকল সাহাবা-ই-কিরাম (রাঃ), ইমাম, মুজতাহিদ, আওলিয়া-ই-কিরাম (রঃ)-এর চেয়ে তিনি বেশী মর্যাদা দাবী করেছেন (নাউযুবিল্লাহ্)। তিনি ভন্ড, বিদ্য়াতী, গোমরাহ ইত্যাদি। (নাউযুবিল্লাহ্)

কিন্তু এতে করে আবু জেহেল গং-এর বর্তমান উত্তরসূরীদের হচ্ছেটা কি? তারাও তাদের বংশপতির ন্যায় বুঝতে পারছে না যে, যে উদ্দেশ্যে তারা এই অপবাদ রটনা করছে, অপতৎপরতা চালাচ্ছে এ উদ্দেশ্য আদৌ চরিতার্থ না হয়ে বরং উল্টোটা হচ্ছে। অর্থাৎ রাজারবাগ শরীফের অপপ্রচারের কারণে ক্ষতি না হয়ে লাভটাই হচ্ছে বেশী। এর মধ্যে দু’টো দিক মুখ্য। প্রথমতঃ তারা এ সমালোচনা দ্বারা শহর থেকে শহরে, গ্রাম থেকে গ্রামে, মহল্লা থেকে মহল্লায় এমনকি দেশ থেকে বিদেশে সর্বত্র রাজারবাগ শরীফের নাম সবার মুখে মুখে উচ্চারণ করার কারণ হচ্ছে। অর্থাৎ তারাই ব্যাপক প্রচার-প্রসার করছে।

দ্বিতীয়তঃ তাদের অপপ্রচারে কৌতুহলী মানুষ দিন দিন মৌমাছির ন্যায় ঝাঁকে ঝাঁকে রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর সাহেব ক্বিবলা মুদ্দাজিল্লুহুল আলীকে দেখতে আসছে, তাঁর মাহ্ফিলে বসছে, তাঁর প্রকাশিত আল বাইয়্যিনাত পড়ছে, তাঁর সোহ্বতে থাকছে সর্বোপরি তাঁর সুন্নতী আদর্শ দেখে মোহিত হয়ে তাঁর কাছে বয়াত হচ্ছে এবং তাঁর প্রচারিত সুন্নতী আদর্শের দীপ্ত ও নির্ভীক সৈনিক হচ্ছে, উলামায়ে ছুদের নিপাতকারীরূপে নিশান তুলছে। আর তার কৃতিত্বের মূলে রয়েছে আবু জেহেলের বর্তমান উত্তরসূরী উলামায়ে ছুরা, যে প্রসঙ্গে এরশাদ হয়েছে, “নিশ্চয়ই আল্লাহ্ পাক ফাসিক-ফাজির দ্বারাও এই দ্বীনের খিদমত নিবেন।” কিন্তু আবু জেহেলের উত্তরসূরী বলেই কেবল তারা তা হৃদয়ঙ্গম করতে পারছেনা।

মুহম্মদ ওয়ালীউল্লাহ্, বাসাবো, ঢাকা।

প্রসঙ্গঃ মৌলবাদঃ একটি নিরপেক্ষ ও দলীলভিত্তিক পর্যালোচনা

“আদম সন্তান যখন ঘুম হতে উঠে তখন সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র ও নরম প্রকৃতির একটি অঙ্গের কাছে বড়ই অনুনয় বিনয় করে আকুল আবেদন জানায়। তাদের অনুরোধ, “আমাদের ব্যাপারে তুমি আল্লাহ্কে ভয় কর, কেননা আমরা তোমার সাথে জড়িত। তুমি ঠিক থাকলে আমরাও ঠিক থাকবো, আর তুমি বিশ্বাস ভঙ্গ করলে, বেসামাল হয়ে পড়লে আমরাও বিচ্যুত হবো।

          তিরমিযী শরীফে হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বরাতে একথা আমাদেরকে জানিয়েছেন।”

শরহে সুন্নাহ্, মালেক, তিরমিযী ও ইবনে মাজাহতে এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, “মানুষ মুখ দিয়ে মন্দ কথা বলে, কিন্তু সে জানেনা, তার প্রতিক্রিয়া কতটুকু? আল্লাহ্তায়ালা এই কারণে উক্ত কথার (বক্তার) উপর নিজের ক্রোধ ও অসন্তুষ্টি লিপিবদ্ধ করতে থাকেন সে সময় পর্যন্ত, যতক্ষণ না সে আল্লাহ্তায়ালার সাথে সাক্ষাত করে।

          বোখারী শরীফেও এ প্রসঙ্গে এরশাদ হয়েছে, বান্দা কোন সময় এমন কথা বলে, যাতে আল্লাহ্তায়ালা গভীর অসন্তুষ্ট হন, সে কথা তাকে জাহান্নামের দিকে নিক্ষেপ করে অথচ বান্দা সে বিষয়ে ওয়াকিফহাল থাকেনা।

মুসলমান হয়েও হালে, মুসলমানদেরকে মৌলবাদী হতে বলা অথবা মৌলবাদ প্রতিষ্ঠার কথা একটি মহল হতে যেভাবে বারবার এবং যেরূপ জোরদাররূপে উচ্চারিত হচ্ছে তাতে বর্ণিত হাদীস শরীফের সতর্কবাণীই বিশেষভাবে মূল্যায়িত হয়।

          এই মহলের প্রধান তথাকথিত ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের মুখপাত্র, চরমোনাইর পীর নামধারী ফজলুল করিম বলেছে, ‘যারা মৌলবাদী দাবী করবেনা তারা অবৈধ সন্তান, কাফির, ফাসিক  ইত্যাদি।’

          মৌলবাদ সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিতে আলোচনার শুরুতেই বলতে হয় যে, শব্দটি যতটা ধর্মীয় তার চেয়ে অনেক বেশী রাজনৈতিক তথা ধর্মের নামে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

          যে কারণে এদেশের মুসলমানদের নতুন করে মৌলবাদ শব্দের সাথে পরিচিত হতে হচ্ছে, এ নিয়ে আলোচনা সমালোচনার ঝড় উঠেছে এবং সর্বোপরি মৌলবাদী দাবীদার তথাকথিত মৌলবাদ প্রতিষ্ঠায় শক্ত অপতৎপরতা শুরু করেছে এবং তা অস্বীকারকারীদেরকে অবৈধ সন্তান হবার ভয় দেখিয়ে মৌলবাদ স্বীকার করার জন্য জঘণ্য কায়দায় জুলুম- নিপীড়ন করা হচ্ছে।

কায়দাটা মূলতঃ হুবহু ঐ ভন্ড ফকিরকে অনুসরণ করার মত।

          ভন্ড ফকির নিজের বুজুর্গী জাহির করার জন্য খুবছে ঢাক-ঢোল পেটাল যে, তাকে যদি রাজী করানো যায়   তাহলে সে সকলকে মোরাকাবায় বসিয়ে হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখাতে সক্ষম। মানুষ তার কথায় চমক পেল। অবশেষে সকলেই তাকে হুজুর হুজুর বলে তা’যীম তোয়াজ করে বহুবিধ নজরানা হাদিয়া পেশ করে, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখানোর জন্য রাজী করল। অবশেষে ভন্ড ফকির সকলকে নির্দিষ্ট দিনে, নির্দিষ্ট স্থানে, বিশেষ কায়দায় বসতে বলল। দুরু দুরু বক্ষে, অজানা প্রত্যাশায়, ভীত হরিণ শাবকের ন্যায় সকলে কম্পিত হৃদয়ে মোরাকাবায় আসীন হল। সময় বয়ে যেতে লাগল। বুভূক্ষু মন, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মুখচ্ছবি খোঁজার জন্য কল্পিত অন্ধকার জগতে বহু আকুলি বিকুলি, তালাশ সন্ধান করল। না কারও মনে অনর্থক তার ফুফু, চাচী, মা, বাবা, আমলের স্মৃতি, হাট-বাজার ইত্যাদির চিত্রই কেবল ভাসতে লাগল। এদিকে সময়ের পর সময় ব্যয় হচ্ছিল। অবশেষে কিছু একটা শেষ ফায়সালার জন্য যখন, প্রতিক্ষিত, ব্যাকুল মন অধীর হয়ে উঠছিল তখন যেন গুরুগম্ভীর কক্তে সকলকে উদ্দেশ্য করে ভন্ড পীর হাঁকল, “বাছারা তোমরা সকলে হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখতে পেয়েছ কি? সমস্বরে সকল অনুসন্ধানী মনের বিনীত ভাষণ উচ্চারিত হতে যাচ্ছিল, “হুজুর আমরা তো দেখছিনা, আমাদের দয়া করে দেখানোর ব্যবস্থা করুন। কিন্তু সেই মিনতি, আরজি, কক্তস্বরেই রূপ লাভ করতে পারলনা- জলদগম্ভীর কক্তের অপর হুশিয়ারীতে; সাবধান! যারা এখনও হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখতে পাওনি, বুঝতে হবে তারা অবৈধ সন্তান।”

          হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জিয়ারত লাভে উদগ্র, আগ্রহে ব্যাকুল হৃদয়গুলো মূহুর্তের তরে হতচকিত হয়ে গেল। হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দীদারের উঁচু আশা বাদ দিয়ে এখন ত্রস্ত ব্যস্ত হয়ে নিজের ইজ্জত বাবা-মার সম্মান বাঁচাবার পালা। দ’ু এক জন ভীত বিহবলের কক্তে ততক্ষণে বেরিয়ে গেছে- হাঁ, আমরা হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখেছি। আর যায় কোথায়! গোষ্ঠীর ব্যাপারটা তখন গড়িয়ে গেছে ব্যক্তি পর্যায়ে। হাজার হোক অবৈধ সন্তান চিহ্নিত করার বিড়ম্বনা থেকে হাজিরানে মজলিশে নিজেকে বাঁচাবার তাগিদে অবশেষে ব্যক্তি নির্বিশেষে সকলেই সমস্বরে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশী দ্বীপ্তকক্তে বলে উঠল-হ্যাঁ, আমিও হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখেছি। কারণ এই দ্বীপ্ত উচ্চারণের সাথে সংযুক্ত যে অন্য এক কথা, “আমি হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখেছি। সুতরাং আমি অবৈধ সন্তান নই।”

          ভন্ড পীর এভাবেই অবৈধ সন্তান হওয়ার ফাঁকে ফেলে তার কুউদ্দেশ্য চরিতার্থ করল। মানুষের দুর্বল জায়গায় হাত দেয়ার মত, ভন্ড পীরের ন্যায় সে মোক্ষম সুযোগটিরই ব্যবহার করতে চেয়েছে চরমোনাইর পীর নামধারী ফজলুল করিম। জানা নেই, অজানা নেই, ডান নেই, বাম নেই, দিক নেই দিশা নেই মৌলবাদ স্বীকার না করলে একেবারে সরাসরি অবৈধ সন্তান। কিন্তু ফজলুল করিম তার ন্যায় ভন্ড পীরের খপ্পরে পতিত সরল মনাদের ন্যায় আজকের প্রজন্মের সকলকে বোকা ঠাউরালেও অভিজ্ঞতা মানুষকে অনেক সচেতনতা দিয়েছে।

          আর সচেতনতা ছাড়াও সাধারণ বিবেকেরই প্রশ্ন যে, মৌলবাদ সমর্থন করা বা না করার সাথে বৈধ বা অবৈধ সন্তানের কি সম্পর্ক? কারণ কারো মা যদি সতী সাধ্বী হয়ে থাকে তাহলে সে মহিলা যে সন্তান প্রসব করে তা সম্পূর্ণ বৈধ। যদিও খোদা না করুক সে সন্তান পরবর্তীতে কুফরী করে। অপরদিকে কারো মা যদি চরিত্রহীন হয়ে থাকে তবু সে অবৈধ সন্তান যদিও সে পরবর্তীতে আলেম বা ওলীআল্লাহ্ হোক না কেন? এজন্য ফিক্বাহ্র কিতাবে অবৈধ সন্তানের ক্ষেত্রে আলেম হওয়ার পক্ষেও মত প্রকাশ করা হয়েছে।

          মূলতঃ এ ধরণের কথা বলে চরমোনাইর পীর হাদীস শরীফে বর্ণিত উটের চেয়েও মুর্খ সে বেদুইনের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করেছে। হযরত জুনদুব ইবনে আব্দুল্লাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক যাযাবর বেদুইন আসল, নিজের উটকে বসাল, মসজিদে বসে রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পেছনে নামাজ পড়ল। নামাজের সালাম ফিরানোর পর সে নিজের উটের কাছে এসে তার পা খুলল এবং উটের পিঠে উঠে সশব্দে একথা বলে চলে গেল, “হে আল্লাহ্ তুমি আমাদের ও মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে রহমত কর। আমাদের রহমতে অন্য কারো শরীক করোনা। এটা শুনে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “তোমাদের কি ধারণা? এই বেদুইন লোকটি বেশী মুর্খ? না কি তার উটটি? তোমরা কি শুন নাই লোকটি কি বলল? হযরত সাহাবা-ই-কিরাম (রাঃ) বললেন, জি-হ্যাঁ, শুনেছি। মূলতঃ মূর্খতাসূচক মন্তব্যের জন্য রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই উক্তির মাধ্যমে বেদুইন লোককে উটের চেয়েও বেশী মূর্খ বলে সাব্যস্ত করেছেন।

          আর এ ধারাবাহিকতায় তার চেয়েও বেশী মূর্খ সাব্যস্ত হয় চরমোনাইর ফজলুল করীম।

          কারণ মৌলবাদ স্বীকার-অস্বীকারই যদি বৈধ অবৈধ সম্পর্কের মানদন্ড হয় তাহলে উদাহরণ টানা যায় নব্বই বছরের বৃদ্ধের কথা। গোটা জীবন সে মৌলবাদ অস্বীকার করে আসছে। তাহলে চরমোনাইর পীরের ভাষায় সে নব্বই বছর ধরে অবৈধ সন্তান। কিন্তু এরপরে বৃদ্ধ বয়সে মতিভ্রম হলে অথবা জাহেল পীরের খপ্পরে পড়ে যে মৌলবাদ স্বীকার করল, তাহলে এই দীর্ঘ নব্বই বছর অবৈধ সন্তান থাকার পর, চরমোনাইর পীরের ফতওয়া অনুযায়ী সে বৈধ সন্তান হিসেবে গণ্য হবে। আর এর পরের মূহুর্তে যদি সে মৌলবাদ অস্বীকার করে তবে আবার অবৈধ সন্তান হবে।    আবার একইরূপে নব্বই বছর মৌলবাদ স্বীকার করার পর যদি যে সহীহ্ বুঝ বুঝে মৌলবাদ অস্বীকার করে তাহলে নব্বই বছর বৈধ সন্তান থাকার পর সে অতঃপর চরমোনাইর পীরের কথানুযায়ী অবৈধ সন্তান বলে গণ্য হবে। (নাউযুবিল্লাহ্ মিন যালিক)

          বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, নব্বই বছর জীবন অতিবাহিত করার পর যার ফতওয়া স্বীকার/অস্বীকারের মাধ্যমে মুহুর্তের তরে যেখানে বৈধ বা অবৈধ সন্তান হতে হয় সেখানে এ ফতওয়া দাতা, পীর নামধারী হলেও সে যে হাদীসে বর্ণিত উটের চেয়েও জাহেল তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা।

          মূলতঃ এই জেহালতীই তাকে তার শ্রদ্ধেয় পিতা-মাতার প্রতিও গালি দেয়ার স্পর্ধাজনিত কাজটিতে প্ররোচিত করেছে। হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে, “নিজের পিতা-মাতাকে গালি দেয়া সবচেয়ে জঘণ্য কাজ। হযরত সাহাবা-ই-কিরাম (রাঃ)গণ বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! কেউ কি নিজের পিতা-মাতাকে গালি দিতে পারে? হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, যে ব্যক্তি অপরের পিতা-মাতাকে গালি দেয় সে মূলতঃ তার নিজের পিতা-মাতাকে গালি দেয়।” এখন এই হাদীস শরীফ মোতাবেক ফজলুল করীমের দুটি পথ খোলা আছে। হয় এই হাদীস শরীফ অস্বীকার করে দুনিয়াতেই নিজের স্থান জাহান্নামে নির্ধারণ করা নতুবা নিজের মাকে চরিত্রহীনা বলে অভিযুক্ত করার দায়ভার গ্রহণ করা। তার পাশাপাশি ফজলুল করীমকে আরো অনেক গুরুতর অপরাধ স্বীয় কাঁধে বহণ করতে হবে। কারণ হযরত সুফিয়ান ইবনে আসিদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি যে, তিনি বলেছেন, সবচেয়ে বড় খেয়ানত এই যে, তুমি তোমার কোন মুসলমান ভাইকে কোন কথা বললে, আর সে তা সত্য বলে জানল, অথচ প্রকৃতপক্ষে তুমি তার সাথে মিথ্যা বলেছো। (আবু দাউদ)

          সুতরাং যেখানে মৌলবাদ ইসলামে স্বীকৃত নয় সেখানে তাতেই বিশ্বাসী হবার কথা বলার প্রেক্ষিতে যত লোক মৌলবাদীতে বিশ্বাসী হবে এবং মৌলবাদকে সত্য বলে জানবে তাদের সকলের প্রতি ফজলুল করীম বড় খেয়ানতকারী বলে সাব্যস্ত হবে।

          পাশাপাশি যারা মৌলবাদে বিশ্বাসী নয়, যারা সহীহ্ ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী তাদেরকে গালিগালাজ করার অপরাধেও ফজলুল করীম চরম ফাসেক বলে গণ্য হবে। যেহেতু হাদীস শরীফে আছে, মুসলমানকে গালি-গালাজ করা ফাসেকী। ( বোখারী, মুসলিম)

          অন্য হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে, “এক ব্যক্তি অপর ব্যক্তিকে পাপী বলে অপবাদ দিবেনা। যদি সেই ব্যক্তি এরূপ না হয় তবে তার কথা (অপবাদ) তার দিকেই প্রত্যাবর্তন করবে। (বোখারী)

          কাজেই এই হাদীস শরীফের মূল্যায়ণ মূলতঃ আমাদেরকে ফজলুল করীমের জন্মবৃত্তান্ত সম্পর্কে ভাবিয়ে তোলে। তদুপরি তার পরিণতি সম্পর্কেও আমরা কম শঙ্কিত নই। কারণ যদি কারো মধ্যে দোষত্রুটি থাকে তবে তা বর্ণনা করাই গীবত। আর যদি না থাকে তবে তা অপবাদ।

          গীবতের শাস্তিই যেখানে মৃত ভাইয়ের গোশ্ত খাওয়ার সমতূল্য সেখানে অপবাদ দেয়ার শাস্তি কত গুরুতর হতে পারে? তবে প্রসঙ্গতঃ মুসলিম মহিলাকে অপবাদ দেয়ার একটি জাহেরী শাস্তির মাপকাঠি সূরা নূরের ৪ নং আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। “মৌলবাদী দাবী না করলে তারা অবৈধ সন্তান” এ মর্মে মুসলিম মহিলাদের প্রতি চরিত্রহীনতার অপবাদ দেয়ায় এবং মুসলমান সন্তানদের অবৈধ বলায় শরীয়তের দৃষ্টিতে তার প্রতি কিরূপ শাস্তি নির্ধারিত হয় সে প্রসঙ্গে আঞ্জুমানে আল বাইয়্যিনাতের তরফ থেকে দৈনিক ভোরের কাগজে- ২৯-৪-২০০০ ঈঃ তারিখে এক বিবৃতি প্রদান করা হয়। “আট হাজার কোটি দোররার ফতওয়া” শীর্ষক ঐ বিবৃতিতে বলা হয়-

          মুসলমানদের, বিশেষ করে মহিলাদের প্রতি মর্যাদাহানিকর উক্তি করার দায়ে চরমোনাইর পীর ফজলুল করিমের জন্য কমপক্ষে ৮ হাজার কোটি দোররা বা বেত্রাঘাতের শাস্তি ধার্য করেছেন রাজারবাগের পীর সাইয়্যিদ মুহম্মদ দিল্লুর রহমান। সম্প্রতি চরমোনাইর পীরের যারা মৌলবাদে বিশ্বাসী নয়, তারা জারজ সন্তান’ -এ ধরণের উক্তির পরিপ্রেক্ষিতে রাজারবাগের পীর সাহেব শরীয়ত অনুসরণে এ শাস্তি নির্ধারণ করেন। গতকাল রাজারবাগের পীরের সংগঠন আঞ্জুমানে আল বাইয়্যিনাত কর্তৃক প্রেরিত এক বিবৃতিতে এ কথা জানানো হয়। ঐ বার্তায় বলা হয়, চরমোনাইর ফজলুল করিম তার উক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ তথা পুরো বিশ্বের প্রায় ১২৫ কোটি মুসলমানকে অবৈধ সন্তান বলে গালি দিয়ে আনুমানিক প্রায় ২০ কোটি মহিলাকে চরিত্রহীনা হিসেবে অভিযুক্ত করেছেন। কারণ কাউকে অবৈধ সন্তান বললে তার মায়ের চরিত্র খারাপ বলে সাব্যস্ত করা হয় আর ১২৫ কোটি মুসলমানের মা নিদেনপক্ষে ২০ কোটি মুসলিম মহিলা। রাজারবাগের পীর সাহেব তার যুক্তির সপক্ষে শরিয়তের বিধান উদ্ধৃত করেন। তাতে বলা হয় সূরা নূর এর ৪র্থ আয়াত অনুযায়ী, কোনো মহিলার চরিত্র খারাপ বললে চারজন সাক্ষী পেশ করা বক্তার জন্য ফরজ হয়ে দাঁড়ায়। নতুবা, তার শাস্তি ৮০ দোররা বা বেত্রাঘাত ধার্য হয় এবং মৃত্যু পর্যন্ত ঐ ব্যক্তির সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হয় না।

          পীর সাহেব বলেন, ইসলামের দৃষ্টিতে মৌলবাদ জায়েজ নয়। আর ২০ কোটি মহিলাকে চরিত্রহীন প্রমাণের জন্য ৮০ কোটি সাক্ষী হাজির করার ক্ষমতা ফজলুল করিমের নেই। সুতরাং, বর্তমান বিশ্বে ২০ কোটি মহিলাকে অন্যায়ভাবে চরিত্রহীনা বলার জন্য চরমোনাইর পীর ১৬০০ কোটি দোররা বা বেত্রাঘাত খাওয়ার উপযুক্ত হয়েছে।

          চরমোনাইর পীর এ উক্তির মাধ্যমে অতীতকাল থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত শত শত কোটি মুসলমান মহিলাকে চরিত্রহীনা বলে সাব্যস্ত করেছেন বলে অভিযোগ তোলেন রাজারবাগের পীর সাহেব ক্বিবলা। তিনি প্রতি শত কোটি মুসলমান মহিলাকে চরিত্রহীনা বলার দায়ে চরমোনাইর পীরের জন্য শরিয়ত মোতাবেক ৮ হাজার কোটি বেত্রাঘাতের শাস্তি নির্ধারণ করেন। (দৈনিক ভোরের কাগজ-২৯ এপ্রিল/২০০০ইং)

          এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে চরমোনাইর পীরের মৌলবাদ সমর্থনের পেছনে গ্রহণযোগ্য কোন কারণ নেই। বরং যা রয়েছে তা নেহায়েত তার মনগড়া ব্যাখ্যা।

          মৌলবাদ শব্দটিকে তারা শাব্দিক অর্থে গ্রহণ করতে চাইলেও আসলে মৌলবাদের প্রবর্তন হয়েছে ঐতিহাসিকভাবে।

          এ প্রসঙ্গে বাংলা বিশ্বকোষে লেখা হয়েছে, মৌলিকতাবাদঃ- fundamentalism প্রটেস্ট্যান্ট পন্থী খ্রীষ্টানদের মধ্যে ২০শ শতকের প্রথম দিকে উদ্ভুত গোড়া পন্থী ধর্মীয় মতবাদ। বিজ্ঞানের বিভিন্ন আবিষ্কার সম্ভূত ত্রাসজনক পরিস্থিতিতে (এরা যেমন মনে করত) বাইবেলের প্রাচীন ব্যাখ্যা ও মৌলিক শিক্ষাকে আকঁড়িয়ে ধরে রাখাই ছিল এই মতবাদের লক্ষ্য। মেরীর কুমারী অবস্থায় মাতৃত্ব, খ্রীষ্টের দৈহিক পুনরুত্থান (resurrection) বাইবেলের অকাট্যতা, পরবর্তী প্রায়শ্চিত্ত, substitutional atonement খ্রীষ্ট কর্তৃক অপরের পাপের জন্য স্বয়ং শান্তি গ্রহণ) এবং খ্রীষ্টের দ্বিতীয়বার দৈহিক আগমণ এই পাঁচটি বিষয় মৌলিক মতবাদরূপে নির্দিষ্ট হয়। পাশ্চাত্যের বিভিন্ন দেশের খ্রীষ্টীয় মহলে এই সম্পর্কে তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি হয়। a যে, LEXICON UNIVERSAL ENCYCLOPEDIA তে মৌলবাদ সম্পর্কে উল্লেখ আছে Fundamentalism is a term popularly used to describe strict adherence to Christian doctrines based on literal interpretation of the Bible. This usage derives form a late 19th and early 20th century transdenominational Protestant movement that opposed the accommodation of Christian doctrine to modern scientific theory and philosophy. (Lexicon Universal Encyclopedia) অর্থঃ- Fundamentalism পরিভাষাটি বহুলভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে খ্রীষ্টীয় তত্ত্ব বা মৌলবাদ হিসেবে। এই তত্ত্বে বাইবেলের আক্ষরিক অনুসরণ তথা মূল্যায়ন করা হয়। এর এই ব্যবহারটি উদ্ভূত হয়েছে গত উনবিংশ শতাব্দীর শেষ লগ্নের এবং বিংশ শতাব্দীর শুরুর লগ্নে প্রোটেস্ট্যান্ট আন্দোলন থেকে, যেই মতবাদে আধুনিক বিজ্ঞান ও দর্শনের সাথে খ্রীষ্টীয় তত্ত্বের একটা সমীকরণের প্রয়াসের বিরোধীতা করা হয়। THE WORLD BOOK ENCYCLOPEDIA. তে উল্লেখ আছে Fundamentalism is a broad movement within protestantism in the United States. The fundamentalist movement tries to preserve what it considers the basic ideas of Christianity against criticism by liberal theologians. At the end of the 1800’s many liberal religious scholars challenged the accuracy of the Bible. They also used historical research to question previously accepted Christian beliefs. The liberals attempted to adjust Christian theology to new discoveries in the sciences, particularly in biology and geology. Many Christians believed the work of the liberals threatened the authenticity and even the survival of Christianity. From 1910 to 1915, anonymous authors published 12 small volumes entitled the Fundamentals. Fundamentalism got its name from these booklets. The authors tried to explain what they felt were basic Christian doctrines that should be accepted without question. (Fundamentalist. 483). (The World Book Encyclopedia) অর্থঃ- Fundamentalism এই মৌলবাদ হল প্রোটেস্ট্যান্ট তত্ত্বের আওতাভুক্ত একটি broad movement বা গণআন্দোলন যা যুক্তরাষ্ট্র আমেরিকায় দেখা দেয়। মৌলবাদী আন্দোলন খ্রীষ্টীয় উদার ধর্মতাত্ত্বিকগণের সমালোচনার বিপক্ষে ঐ ধর্মের যা মৌল উপাদান মৌলবাদীগণের দৃষ্টিতে, সেসব কিছু সংরক্ষণে সচেষ্ট। ১৮০০ ঈসায়ী সন শেষ হলে অনেক উদারপন্থী ধর্মতাত্ত্বিক (খ্রীষ্টান) বাইবেলের বিশুদ্ধতার উপর প্রশ্ন তোলেন। তারা ঐতিহাসিক গবেষণা কর্মাবলীকে তুলে ধরেন বিগত সময়ের মান্য খ্রীষ্টীয় বিশ্বাসগুলোকে পরখ করে দেখার জন্য। উদারপন্থীরা প্রয়াস চালায় খ্রীষ্টীয় ধর্মতত্ত্বকে বিজ্ঞানের নব আবিষ্কারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে দেখাবার জন্য বিশেষ করে উদ্ভিদ ও প্রাণী বিজ্ঞানের সাথে। বহু খ্রীষ্টানই বিশ্বাস করে যে উদারপন্থী প্রয়াস খ্রীষ্টানত্ত্বের যথার্থতা, এমনকি এর অস্তিত্বের উপর হুমকীস্বরূপ। ১৯১০ হতে ১৯১৫ সনের মধ্যে কিছু বেনামী লেখকরা ১২ টি পুস্তিকা বের করে, যার সাধারণ শিরোনাম ছিল Fundamentals. ফান্ডামেন্টালিজম শব্দটি এই পুস্তিকাগুলির নাম থেকে গৃহীত। এসবের লেখকরা বুঝাতে চেষ্টা করে যে তারা যা লিখেছে, ভেবেছে সেগুলিই হল খ্রীষ্টীয় ধর্মতত্ত্বের মৌল বিষয় যা প্রশ্নাতীতভাবে সবার মানা উচিত। FUNDAMENTALISM conservative movement among protestants in the United States, which began in the late 19th century. It emphasized as absolutely basic to Christianity the following beliefs: the infallibility of the Bible, the virgin Birth and the deity of Jesus Christ. the sacrifice of Christ on the cross as atonement for the sins of all men, the physical resurrection and Second Coming of Christ, and the bodily resurrection of believers. (FUNK AND WAGNALLS NEW ENCYCLOPEDIA/409)

অর্থঃ- Fundamentalism হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রোটেস্ট্যান্টগণের গোঁড়ামীপূর্ণ আন্দোলন যা উনবিংশ শতাব্দীর শেষদিকে শুরু হয়। এই মতবাদে খ্রীষ্টীয় ধর্মতত্ত্বের মৌলভিত্তি হিসেবে যা গণ্য করা হয়, বাইবেলের প্রামাণ্যতা, মেরী তথা হযরত মরিয়াম (আঃ)-এর কুমারী অবস্থায় হযরত ঈসা (আঃ)-এর জন্মগ্রহণ এবং জিজাস ক্রাইষ্ট তথা যীশু তথা হযরত ঈসা (আঃ)-এর প্রতি দেবত্ব আরোপ (নাউযুবিল্লাহ), বিশ্ব মানবের পাপের প্রায়শ্চিত্ত স্বরূপ যীশুর ক্রুশবিদ্ধ হওয়া, যীশুর শারীরিক পুনরুত্থান এবং দ্বিতীয় দফা আগমন, আর (খ্রীষ্টীয় মৌলবাদে) বিশ্বাসীদের, দৌহিক পুনরুত্থান। (FUNK AND WAGNALLS NEW ENCYCLOPEDIA/409) Fundamentalism (in Christianity), a religious movement which developed in the early 20th century among protestants in the USA. (OXFORD ILLUSTRATED ENCYCLOPEDIA/127) অর্থঃ- এটা খ্রীষ্টীয় ধর্মীয় আন্দোলন যা বিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্নে যুক্তরাষ্ট্র আমেরিকার প্রোটেস্ট্যান্টদের মধ্যে দান্য বেঁধে উঠে। Fundamentalism this term is generally used by and applied to the followers of a movement within American protestantism that arose toward the end of the 19 th c. in reaction against scientific progress. notably an evolutionary understanding not only of life but of the universe it self. (RELIGION AND PHILOSOPHY/265) অর্থঃ- Fundamentalism এই শব্দটি সাধারণভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে আমেরিকার প্রোটেস্ট্যান্ট মতবাদের বিশ্বাসীদের এক বিশেষ আন্দোলনের অনুসারীদের দ্বারা। মানুষ তাদেরকে এই নামে অবহিতও করছে। এটার শুরু গত উনবিংশ শতাব্দীর শেষ লগ্নে বিজ্ঞানের উন্নতির প্রতিপক্ষ স্বরূপ, যে বিজ্ঞান শুধু পার্থিবজীবন নয়, বরং মহা বিশ্ব সম্পর্কে বৈপ্লবিক ধারণার জন্ম দেয়। (Religion And Philosophy/265) Fundamentalism conservative movement in American Protestantism arising out of the millenarian movement of the 19th century and emphasizing as fundamental to Christianity the literal Interpretation and absolute inerrancy of the Scriptures. the imminent and physical Second Coming of jesus Christ. the Virgin Birth. Resurrection. and Atonement. (Britannica/51) অর্থঃ- Fundamentalism গত উনবিংশ শতাব্দীর

হাজার বছরের আন্দোলনের ফসলের অংশ আমেরিকার প্রোটেস্ট্যান্ট তত্ত্বের আওতাভূক্ত গোঁড়ামীপূর্ণ আন্দোলন হল এই মৌলবাদ যাতে খ্রীষ্টীয় ধর্মে মৌল হিসেবে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে, (১) ধর্মীয় পুস্তকগুলির আক্ষরিক মূল্যায়ন এবং প্রশ্নাতীত প্রামাণ্যতাকে, (২) যীশুর অত্যাসন্ন দৈহিক পুনরাগমণকে, (৩) মেরীর (হযরত মরিয়ম আঃ) কুমারী মাতৃত্বকে, (৪) পুনরুত্থান এবং (৫) প্রায়শ্চিত্তকে। Fundamentalism. the opposition. of orthodox churchmen of the teaching of modern science where the latter comes into conflict with the Bible story. Fundamentalism, and science came into collision in the USA in 1925, when john T. Scopes, a young teacher in the high school at Dayton, Tennessee. was arraigned for violating the state law. which forbade the teaching of evolution in state schools. (Everyman’s Encyclopaedia/635) অর্থঃ- Fundamentalism: আধুনিক বিজ্ঞান শিক্ষার বিপক্ষে প্রচলিত খ্রীষ্টীয় ধর্ম বিশ্বাসে বিশ্বাসীদের এক মতবাদ যাহা বাইবেলের কাহিনীর সহিত বিজ্ঞানের বিরোধের প্রেক্ষিতে উদ্ভুত। আমেরিকায় মৌলবাদ ও বিজ্ঞান দ্বান্দিক অবস্থানে এসে পৌঁছে ১৯২৫ সনে যখন জনটি স্কোপস নামে Dayton. Tennessee-এর এক হাই স্কুল শিক্ষককে অভিযুক্ত করা হয় রাষ্ট্রীয় আইন লংঘনের দায়ে, যে আইনে বিবর্তন মতবাদ প্রাদেশিক । স্কুলগুলোতে শিক্ষা দেওয়া নিষিদ্ধ ছিল। (Everyman’s Encyclopedia/635) মূলতঃ মৌলবাদ আমেরিকার প্রোটেস্ট্যান্টদের একটি ব্যাপক আন্দোলনের নাম। মৌলবাদ আন্দোলন স্বাধীন চিন্তাবিদদের বিরুদ্ধে খ্রীষ্টধর্মের তথাকথিত মূল তত্ত্বসমূহকে সংরক্ষণের জন্য হয়েছিল। উনিশ শতকের শেষের দিকে অনেক স্বাধীন বা উদারমনা ধর্মীয় চিন্তাবিদগণ বাইবেলের সঠিকত্ব নিয়ে চ্যালেঞ্জ করে। তারা খ্রীষ্ট মতবাদ বা বিশ্বাসের প্রতি ঐতিহাসিক গবেষণালব্ধ তথ্য দিয়ে প্রশ্নবানে জর্জরিত করে। এই উদারমনাগণ চেয়েছিলেন, খ্রীষ্ট মতবাদ বা বিশ্বাসসমূহকে বিজ্ঞানের নতুন আবিষ্কারের সাথে সমন্বয় করতে। বিশেষ করে জীববিদ্যা ও ভূ-তত্ত্বের ক্ষেত্রে। ! অনেক খ্রীষ্টানরাই মনে করতো যে, উদারমনাদের এসব কাজ খ্রীষ্টানদের খাঁটিত্ব বজায় রাখার এমনকি খ্রীষ্ট মতবাদ বেঁচে থাকার জন্য বিশেষ রকমের হুমকীস্বরূপ। ১৯১২ সালের দিকে কিছু বেনামী লেখক ১২টি ছোট ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভলিউমে “The fundamentais” নামে বই বের করে এবং এই বইয়ের নামকরণ থেকেই এই আন্দোলন Fundamentalist movement বা মৌলবাদী আন্দোলন নামে আখ্যায়িত হয়। লেখকগণ তাদের বইসমূহে এই ব্যাখ্যা দিতে চেষ্টা করেন যে, তারাই যা মনে করছেন, তাই মূল খ্রীষ্টানতত্ত্ব-যা কোনরূপ প্রশ্ন ব্যাতীরেকেই গ্রহণ করতে হবে। এই মতবাদের মধ্যে মূল ছিল পাঁচটি। যথা- (১) বাইবেলের চূড়ান্তরূপে সঠিকত্ব। (২) যীশুর মায়ের কুমারী অবস্থায় তাঁর জন্মগ্রহণ। (৩) যীশুর দেবত্ব। (৪) পৃথিবীর পাপাচারের জন্য যীশুর জীবন উৎসর্গকরণ। (৫) শারীরিকভাবে যীশুর পূণরায় আবির্ভাব। দু’জন ধনী ভ্রাতা Lyman এবং Milton-এর খরচে এসব বই চারিদিকে ছড়ানো হয়। এই মৌলবাদ মতবাদটি উ ৎপত্তির পর থেকে পর্যায়ক্রমে প্রচার-প্রসার লাভ করতে থাকে। এমন কি ১৯৩০ সালের দিকেও এই খ্রীষ্ট মৌলবাদ টিকে ছিল। ১৯৪১ সালে The Aggressive Fundamentalist American Council of Christian Churches. (উগ্র মৌলবাদী আমেরিকান কাউন্সিল অব ক্রীষ্টিয়ান চার্চেস) গঠিত হয়। পরবর্তী বছর অধিকতর মধ্যপন্থীদের নিয়ে Association of Evangelicals গঠিত হয়। এরাও প্রোটেস্ট্যান্টদের একটি সম্প্রদায়। এই সম্প্রদায়ের মৌলবাদীদের রক্ষনশীল ইভানজেলিক্যাল বলা হয়। নব্য মৌলবাদীদের একটি নতুন জাগরণ হয়েছিল ১৯৫০ সালের দিকে। এদের প্রচারের ফলে তা অন্যান্য দেশেও বিস্তার লাভ করে। মুসলমানদেরকে মৌলবাদী বলা যাবে কিনা? কাজেই মুসলমানদেরকে মৌলবাদী বলা বা মুসলমানগণ নিজেদেরকে মৌলবাদী বলে দাবী করা কখনও কোন মতেই শরীয়তসম্মত হবেনা। কারণ যারা বাইবেলের প্রতিটি বিষয়ের যথার্থতায় এবং আক্ষরিক ব্যাখ্যায় যুক্তিবিহীনভাবে যাচাই-বাছাই ব্যতিরেকে ধর্মান্ধ ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন হয়ে চরমপন্থা অবলম্বন করেছিল, তারাই মৌলবাদী, তাদেরই শেয়ার বা চিহ্ন বা আলামত মৌলবাদী। আর যারা বলে থাকে- মূল বা মৌলিক বিষয়ের সাথে যাদের সম্পর্ক রয়েছে, তারা সকলেই মৌলবাদী। তাহলে বলতে হয় ইহুদী-নাছারা, হিন্দু-বৌদ্ধ, মজুসী, মোশরেক-জৈন ইত্যাদি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের কিছু লোক রয়েছে, যারা তাদের ধর্মের মূল বা মৌলিক বিষয়ের সাথে সম্পর্ক রাখে, তাহলে তারাও মৌলবাদী। অর্থাৎ তাহলে খ্রীষ্টান মৌলবাদী, ইহুদী মৌলবাদী, হিন্দু মৌলবাদী, বৌদ্ধ মৌলবাদী, মজুসী মৌলবাদী, জৈন মৌলবাদী ইত্যাদি মৌলবাদীদের মত মুসলমানরাও এক প্রকার মৌলবাদী। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, নাছারা শব্দটি সাধারণতঃ দু’অর্থে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। (১) আভিধানিক, (২) ব্যবহারিক। আভিধানিক অর্থে নাছারা শব্দটির অর্থ হলো-সাহায্যকারী। অর্থাৎ যাহারা সাহায্য করেন। আর ব্যবহারিক বা প্রচলিত অর্থে নাছারা হচ্ছে ঐ সম্প্রদায়ের নাম যারা সারা বিশ্বে খ্রীষ্টান নামে মশহুর। যাদেরকে ঈসায়ী ‘ও’ বলা হয়।

অনুরূপ, শিয়া (شيعة) শব্দটিও সাধারণতঃ দু’অর্থে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। (১) আভিধানিক, (২) ব্যবহারিক।

          আভিধানিক অর্থে শিয়া শব্দটির অর্থ হলো- ফিরক্বা, গোত্র, দল, অনুসারী, সাহায্যকারী ইত্যাদি।

          আর ব্যবহারিক অর্থে শিয়া হচ্ছে- ঐ সম্প্রদায়ের নাম, যারা ইমামিয়া বা রাফেজী ফিরকা নামে মশহুর। যারা হযরত আলী (রাঃ)-এর অনুসরণকারী বলে দাবী করে।

          অনুরূপ আরো একটি শব্দ হচ্ছে- “হিন্দু” এ শব্দটিও সাধারণতঃ দু’অর্থে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। (১) আভিধানিক, (২) ব্যবহারিক।

আভিধানিক অর্থে হিন্দু শব্দের অর্থ হলো চোর, ডাকাত, ছিনতাইকারী, গোলাম, মাশুক, পছন্দনীয়, প্রিয় ইত্যাদি।

          আর ব্যবহারিক অর্থে হিন্দু হচ্ছে ঐ সম্প্রদায়ের নাম, যারা সারা বিশ্বে মুর্তিপূজক হিসেবে মশহুর।

          উল্লেখ্য, কোন মুসলমানকে যদি কেউ নাছারা বলে তাহলে সে তা কবুল বা পছন্দ করবেনা।

আরো উল্লেখ্য, মুসলমান সুন্নী সম্প্রদায়ের কাউকেও যদি কেউ শিয়া বলে সম্বোধন করে তাহলে কোন সুন্নী মুসলমান ব্যক্তি সেটা কবুল করবেনা বা পছন্দ করবেনা। অনুরূপ যদি কোন মুসলমানকে তার কোন আমলের কারণে হিন্দু বলে সম্বোধন করে তাহলে সেটা কোন মুসলমানই কবুল বা পছন্দ করবেনা। অনুরূপ নাছারা শব্দটি কোরআনে কারীমায় থাকার পরও কোন মুসলমান ‘নাছারা’ সম্বোধন গ্রহণ করতে নারাজ। ইহাতে সে ব্যবহারিক বা প্রচলিত খ্রীষ্টান অর্থই গ্রহণ করে চটে যায়। কারণ নাছারারা ইসলামের দৃষ্টিতে বাতিল ধর্মাবলম্বী, চির জাহান্নামী ও কাট্টা কাফেরের অন্তর্ভূক্ত।

          আর شيعة (শিয়াহ্) শব্দটি দল বা সম্প্রদায় অর্থে কোরআন শরীফর প্রায় দশ স্থানে উল্লেখ করা হয়েছে। তা সত্ত্বেও শিয়াহ্্ শব্দটি আহ্লে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের কেউই ব্যবহার করেন না। কেননা শিয়াহ্ শব্দ ব্যবহার করলে আহ্লে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের অন্তর্ভূক্ত থাকা যাবেনা। কারণ হলো- যদিও শিয়াহ্ শব্দটির আভিধানিক অর্থ- দল বা সম্প্রদায়, কিন্তু এ অর্থে শিয়াহ্ শব্দটি মশহুর বা প্রচলিত নয়। বরং শিয়াহ্ শব্দটির মশহুর ও প্রচলিত বা ব্যবহারিক অর্থ হলো- ইমামিয়া বা রাফেজী ফিরকা যারা আহ্লে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের ফতওয়া মোতাবেক মুসলমানের অন্তর্ভূক্ত নয়। আর হিন্দু শব্দের একটি অর্থ মাশুক বা প্রিয় হলেও অর্থাৎ এই অর্থ ইসলামে গ্রহণীয় বা পছন্দনীয় হলেও কোন মুসলমানকে হিন্দু বললে প্রচলিত মুর্তিপূজক অর্থই সে গ্রহণ করে ‘হিন্দু’ হিসেবে স্বীকৃত হতে কবুল বা পছন্দ করো।

          উপরোক্ত আলোচনার দ্বারা সহজেই প্রতিভাত হয় যে, নাছারা শব্দের অর্থ সাহায্যকারী হওয়ার পরও ইসলামী নাছারা শব্দ যেমন- মুসলমানদের কাছে কবুল বা পছন্দনীয় নয়। ‘শিয়া’ শব্দের অর্থ দল বা সম্প্রদায় হওয়ার পরও তার সাথে ইসলামী শব্দ যুক্ত করে ইসলামী শিয়া যেমন- আহ্লে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের কাছে কবুল বা পছন্দনীয় নয়। ‘হিন্দু’ শব্দের একটি অর্থ মাশুক হওয়ার পরও তার সাথে ইসলাম শব্দ যুক্ত করে ইসলামী হিন্দু যেমন কবুল বা পছন্দনীয় নয়, তেমনি মৌলবাদ শব্দের অর্থ মূল হতে আগত মতবাদ হওয়ার পরও তার সাথে ইসলামী শব্দের যোগ সাধনে ইসলামী মৌলবাদ ধারণা বা শব্দ ইসলামে কবুল বা পছন্দনীয় নয়।        মূলতঃ কোন শব্দ পেলেই তা বিনা তাহ্ক্বীক্বে কোন মুসলমানের নামের পিছনে ব্যবহার করা যাবেনা। যা আল্লাহ্ পাক কোরআন শরীফে বলেন,  “তোমরা পরস্পর পরস্পরকে দোষারোপ করোনা এবং পরস্পর পরস্পরকে অশোভনীয় লক্বব (বা উপাধি) দ্বারা সম্বোধন করোনা। (কেননা) ঈমান আনার পর অশ্লীল নাম দ্বারা ডাকা গুণাহ্ এবং যারা এটা হতে তওবা করলো না, তারা জালেমের অন্তর্ভূক্ত।” (সুরা হুজুরাত/১১)

          উপরোক্ত আয়াত শরীফের মধ্যে আল্লাহ্ পাক আমাদের নিজেদেরকে দোষারোপ করতে এবং পরস্পর পরস্পরকে অশ্লীল, বিশ্রী, অশোভনীয়, খারাপ ও শরীয়তবিরোধী লক্বব বা উপাধি দ্বারা সম্বোধন করতে নিষেধ করেছেন। আর আল্লাহ্ পাক এটাও বলেছেন, ঈমান গ্রহণ করার পর কাউকেই কুফরী, ফাসেকী লক্বব (উপাধি) দ্বারা সম্বোধন করা গুণাহ্ এবং নিকৃষ্টতম কাজ। কারণ কাউকে যদি অশালীন, অশোভনীয়, অযৌক্তিক মানহানিকর লক্বব (উপাধি) দ্বারা সম্বোধন করা হয়, তবে স্বভাবতঃই সে মনে কষ্ট পেয়ে থাকে। আর হাদীস শরীফে বলা হয়েছে, “মুসলমানকে কষ্ট দেয়া কুফরী।”

          অন্যত্র বলা হয়েছে, “মুসলমান সেই, যার হাত ও জবান হতে অন্য মুসলমান নিরাপদ থাকে।” (বোখারী)

আরো বলা হয়েছে, মু’মিন সেই, যার কাছ থেকে মানুষ তাদের রক্ত ও মাল- সম্পদের ব্যাপারে নিরাপদ থাকে।”

          সর্বোপরি এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক কোরআন শরীফে বলেন, “যারা কোন মু’মিন পুরুষ ও মু’মিন নারীদের বিনা অপরাধে কষ্ট দেয়, তারা মিথ্যা অপবাদ ও প্রকাশ্য পাপের বোঝা বহন করে।” (সুরা আহ্যাব-৫৮)

          অর্থাৎ আল্লাহ্ পাক মুসলমানদেরকে পরস্পর পরস্পরকে অশ্লীল-বিশ্রী, অশোভনীয়, খারাপ ও শরীয়ত বিরোধী লক্বব বা উপাধি দ্বারা সম্বোধন করতে নিষেধ করেছেন। এমনকি যে শব্দের একাধিক অর্থ রয়েছে যেমন- ভাল ও মন্দ অর্থাৎ ভাল ও মন্দ উভয় অর্থেই ব্যবহৃত হয়, এমন শব্দ দিয়েও সম্বোধন করতে নিষেধ করেছেন। এ প্রসেঙ্গ আল্লাহ্ পাক কোরআন শরীফে বলেন-“হে ঈমানদারগণ তোমরা রঈনা বলোনা উনজুরনা বল এবং শ্রবণ কর (বা শুনতে থাক) আর কাফেরদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি।” (সূরা বাক্বারা/১০৪)

          এ আয়াত শরীফের শানে নুযুলে বলা হয়, ইহুদীরা হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কষ্ট দেয়ার জন্য রঈনা শব্দ ব্যবহার করতো, যার একাধিক অর্থ। একটি অর্থ হলো- আমাদের দিকে লক্ষ্য করুন, যা ভাল অর্থে ব্যবহৃত হয়। আর খারাপ অর্থে- হে মূর্খ, হে মেষ শাবক এবং হিব্রু ভাষায় একটি বদ্ দোয়া। ইহুদীরা হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে রঈনা বলে সম্বোধন করতো। যাতে প্রকৃতপক্ষে তাদের উদ্দেশ্য ছিল খারাপ অর্থের প্রতি ইঙ্গিত করা। অন্যান্য সাহাবা-ই-কিরাম(রাঃ)গণ রঈনা শব্দের ভাল অর্থের প্রতি ইঙ্গিত করে হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্বোধন করলে তখন ইহুদীরা খারাপ অর্থ চিন্তা করে হাসা হাসি করতো। এতে হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কষ্ট পেতেন, তবুও কিছু বলতেন না। কেননা, আল্লাহ্র রাসূল, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওহী ছাড়া কোন কথা বলতেন না। যেমন কোরআন শরীফে বলা হয়েছে, “তিনি (হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ওহী ব্যতীত নিজের থেকে মনগড়া কোন কথা বলেন না।” (সুরা নজম/৩,৪)

          এর ফলশ্রুতিতে আল্লাহ্ পাক কোরআন শরীফের আয়াত নাযিল করে রঈনা শব্দের বদলে উনজুরনা শব্দ ব্যবহার করতে বললেন। কারণ রঈনা শব্দ ভাল খারাপ উভয় অর্থে ব্যবহৃত হলেও উনজুরনা শব্দ শুধুমাত্র ভাল অর্থেই ব্যবহৃত হতো।

          আর হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে, হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আঙ্গুর গাছকে তোমরা ‘কারম’ বলোনা। কারম বলা হয় মুমিনের অন্তরকে। মুসলিম শরীফের অপর বর্ণনায় হযরত ওয়ায়েল ইবনে হুজর হতে বর্ণিত। রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আঙ্গুরকে তোমরা ‘কারম’ বলোনা বরং এনাব ও হাবালা বলো।

          এখানে উল্লেখ্য যে আরবী ভাষায় ‘কারম’ অর্থ আঙ্গুর عنب অর্থও আঙ্গুর। আঙ্গুর হতে শরাব উৎপন্ন হয় এজন্য শরাবকে كرم বলা হয়। তারা ধারণা করত যে শরাব পানকারীকে كرم (দয়া)-এর ওয়ারিস বানায়। শরাব হারাম হওয়ার পর সর্বত্র তা বর্জিত হলো এবং বলা হলো যে, মুমিনের অন্তকরণ হলো কারম যা দয়ার স্থল, পক্ষান্তরে শরাব কারম হতে পারেনা কারণ তা মানুষকে মাতাল করে। সুতরাং শরাব উম্মূল খাবায়েস হতে পারে।  আর মুমিনের অন্তর কারম হতে পারে। তাই যে সকল শব্দ ভাল মন্দ উভয় অর্থেই ব্যবহৃত হয়, সে সকল শব্দের পরিবর্তে উপরোক্ত আয়াত শরীফ ও হাদীস শরীফ মোতাবেক ওটার সমার্থক অর্থবোধক শব্দ ব্যবহার করতে হবে, যা শুধুমাত্র ভাল অর্থেই ব্যবহৃত হয়। অথচ মৌলবাদ শব্দটি ভাল অর্থে ব্যবহৃত হয়না।

          মূলতঃ মুসলমানদের ক্ষেত্রে এটি একটি অপবাদ।

প্রকৃতপক্ষে যারা মৌলবাদী দাবী করে বা মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও মৌলবাদে বিশ্বাসী হওয়ার শর্ত আরোপ করে, তারা নতুন দল, মত, পথ গঠনে ব্যস্ত। যেমন-মির্জা গোলাম আহ্মদ কাদিয়ানী মুসলমানদেরকে মুসলমান নামে পরিচিত না করে কাদিয়ানী নামে পরিচিত করেছে। তদ্রুপ মৌলবাদীরাও মুসলমানদেরকে মুসলমান নামে পরিচিত না করে মৌলবাদী নামে পরিচিত করার কাজে ব্যস্ত যা সম্পূর্ণ কোরআন-সুন্নাহ্র খেলাফ। আল্লাহ্র রাসূল হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “সে আমাদের দলভূক্ত নয় যে কোন বানানো মতবাদের দিকে আহবান করে।” ইতিহাসে রয়েছে মির্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী। তার জীবিতাবস্থায় সে যখন ধারণা করলো, তার দল প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছে, তখন সে ঘোষণা দিল- আদমশুমারী বা লোক গণনার সময় যে ব্যক্তি মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও কাদিয়ানী মতে বিশ্বাসী না হবে ও নামের শেষে কাদিয়ানী শব্দ ব্যবহার না করবে, সে কাফের। সে আরো ঘোষণা করলো- যারা কাদিয়ানী মত বিশ্বাস করবে ও কাদিয়ানী শব্দ নামের শেষে ব্যবহার করবে, তাদের জন্য ঐ সমস্ত ব্যক্তিদের সাথে বিয়ে-শাদী, আত্মীয়তা, খাওয়া-দাওয়া, উঠা-বসা ইত্যাদি সম্পর্ক রাখা সম্পূর্ণ নাজায়েয ও হারাম; যারা মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও কাদিয়ানী মতে বিশ্বাসী নয় ও নামের শেষে কাদিয়ানী শব্দ ব্যবহার করবে না। তদ্রুপ মৌলবাদীরাও যখন ধারণা করল, তাদের দল প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছে তখন তারাও কাদিয়ানীর অনুরূপ ঘোষণা দিল যে, কোন ব্যক্তি মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও মৌলবাদী বলে দাবী না করলে বা মৌলবাদে বিশ্বাসী না হলে সে জারজ সন্তান, সে কাফের, মুশরিক, মুরতাদের অন্তর্ভূক্ত হবে। আর কাদিয়ানীর মত বাকী ঘোষণাটুকুও হয়তঃ অচিরেই দেয়া তাদের জন্য বিচিত্র কিছু নয়। প্রসঙ্গতঃ কাদিয়ানীদের বিবৃতিগুলো তুলে ধরা হলো-

কাদিয়ানীদের মতে মুসলমানেরা কাফের

“যে সকল মুসলমান হজরত মসীহে মওউদের(গোলাম আহমদ কাদিয়ানী) প্রতি আস্থা জ্ঞাপন করে নাই-এমন কি যারা হজরত মসীহে মওউদের (গোলাম আহমদ কাদিয়ানী) নাম পর্যন্ত শুনে নাই তারাও কাফির, ইসলামের বাইরে।” -মির্জা বশীরুদ্দীন মাহমুদ আহমদ প্রণীত আয়নায়ে ছদাকত পুস্তিকার ৩৫ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য।

“যে ব্যক্তি মুসাকে মানে অথচ ঈসাকে মানে না, অথবা ঈসাকে মানে কিন্তু মুহম্মদকে মানে না, কিংবা মুহম্মদকে মানে কিন্তু মসীহে মওউদকে  (গোলাম আহমদ কাদিয়ানীকে) মানে না- সে ব্যক্তি শুধু কাফের নয় বরং পাক্কা কাফের এবং ইসলামের সীমা বহির্ভূত। -মির্জা বশীরুদ্দীন আহমদ প্রণীত কলেমাতুল ফছল হতে উদ্ধৃত রিভিউ অব রিলিজন্জ পত্রিকার ১১০ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য।

“আমরা যেহেতু মির্জা সাহেবকে নবী হিসেবে স্বীকার করি এবং অ-কাদিয়ানীরা তাকে নবী বলে স্বীকার করেনা -এই কারণেই কোরআনে করীমের শিক্ষা অনুযায়ী একজন নবীকেও অস্বীকার করা যদি কুফরী হয়, তবে যারা আহমদী নয়- তাহারাও কাফের। -গুরুদাসপুর সাব জজের এজলাসে মির্জা বশীরুদ্দীন মাহমুদ আহমদ প্রদত্ত বিবৃতিঃ ২৬-২৯শে জুন ১৯২২ প্রকাশিত আল ফজল পত্রিকা দ্রষ্টব্য।

মুসলমানদের সহিত সম্পর্ক ত্যাগ

          কাদিয়ানীরা মুসলমানদের সহিত সকল প্রকার সম্পর্ক ত্যাগ করে একটি আলাদা উম্মত হিসাবে নিজেদের গন্ডীভূক্ত করেছে। এর প্রমাণ হিসাবে কাদিয়ানীদের রচনাবলী যে সাক্ষ্য দেয়, তা নিম্মরূপ-

“হজরত মসীহে মওউদ (আঃ) অত্যন্ত কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন যেন কোন আহমদী অন্যের পিছনে নামাজ না পড়ে। বিভিন্ন স্থান হইতে বহু লোক বার বার এই বিষয়ে জিজ্ঞাসা করতেছে। আমি বলতেছি, তোমরা যতবার জিজ্ঞাসা করবে ততবার আমি এই উত্তর দিব যে, অ-কাদিয়ানীদের পিছনে নামাজ পড়া জায়েজ নাই, জায়েজ নাই, জায়েজ নাই।”

-মির্জা বশীরুদ্দীন মাহমুদ আহমদ খলিফায়ে কাদিয়ানী রচিত আনওয়ারে খেলাফত-৮৯ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য।

“অ-কাদিয়ানীগণকে মুসলমান মনে না করাই আমাদের উচিৎ। তাহাদের পিছনে নামাজ পড়াও আমাদের উচিৎ নাই। কারণ তাহারা খোদাতায়ালার একজন নবীকে অস্বীকার করে।” আনওয়ারে খেলাফত, ৯০ পৃষ্ঠা।

মুসলমান শিশুরাও কাফের

“যদি  অ-কাদিয়ানীর কোন ছোট শিশু সন্তান মারা যায়, তবে তাহার জানাজার নামাজ কন পড়া হইবে না? কারণ শিশুটি ত আর মসীহে মওউদকে (গোলাম আহমদ) অস্বীকার করেনা। আমি এই প্রশ্নকারীটিকে জিজ্ঞাসা করতে চাই যে, যদি এই কথা সত্যই হবে-তবে হিন্দু এবং খৃষ্টান শিশুদের জানাজা পড়া হয়না কেন? অ-কাদিয়ানীদের সন্তানও অ-কাদিয়ানীই সাব্যস্ত হবে। এই কারণেই তাদের জানাজা পড়া উচিৎ নহে।” -আনওয়ারে খেলাফত, ৯৩ পৃষ্ঠা।

কাদিয়ানীদের মুসলমানদের সহিত

বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন

“যে কোন আহমদী নিজের কন্যা অ-কাদিয়ানীর সাথে বিবাহ দিবে, তাহার সম্পর্কে হজরত মসীহে মওউদ (গোলাম আহমদ কাদিয়ানী) অত্যন্ত রুষ্টভাব প্রকাশ করেছেন। এক ব্যক্তি তার কাছে বার বার এ কথা জিজ্ঞাসা করল এবং নানা প্রকার অসুবিধার কথা জানাইল। কিন্তু তিনি সেই লোকটিকে বললেন যে, মেয়েকে বসিয়ে(অবিবাহিত) রাখ, তথাপি অ-কাদিয়ানীর কাছে বিবাহ দিও না। মির্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর মৃত্যুর পরে সেই লোকটি নিজের মেয়েকে অ-কাদিয়ানীর কাছে বিবাহ দিলে প্রথম খলিফা তাহাকে ইমামের পদ হতে অপসারণ করেন, তাকে জামাত হতে খারিজ করিয়া দেন এবং তার খেলাফতের ৬ বৎসর কালের মধ্যে লোকটির তওবা পর্যন্ত কবুল করেন নাই যদিও লোকটি বার বার তওবা করতেছিল।” -আনওয়ারে খেলাফত, ৯৩,৯৪ পৃষ্ঠা।

মূলতঃ মৌলবাদ সম্পর্কে আলোচনায় বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য যে এটা একটা আন্তর্জাতিক চক্রান্ত, সেটা হল কুরআন শরীফের ভাষা হাদীস শরীফের ভাষায় অভিহিত মুসলমান পরিচয়ের অবলুপ্তি ঘটানো।

অথচ হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উম্মতগণকে আল্লাহ্ পাক কোরআন শরীফে হযরত ইব্রাহীম(আঃ)-এর ভাষায় মুসলমান হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ্ পাক এরশাদ করেন, “তিনি তোমাদের নাম রাখলেন- মুসলমান।” (সূরা হজ্ব/৭৮)। আল্লাহ্ পাক আরো উল্লেখ করেন, “তোমরা মৃত্যু বরণ করিওনা মুসলমান না হয়ে।” (সূরা আলে ইমরান/১০২)। আল্লাহ্ পাক আরো বলেন, “তোমরা পেরেশান হয়োনা এবং তোমরা চিন্তিত হয়োনা, তোমরাই কামিয়াবী হাছিল করবে যদি তোমরা মু’মিন হও।” (সূরা আল ইমরান/১৩৯)। আল্লাহ্ পাক আরো বলেন, “হে ঈমানদারগণ! তোমরা ঈমান আন।” (সূরা নেসা/১৩৬)। আল্লাহ্ পাক আরো বলেন, “নিশ্চয়ই তোমাদের মধ্য থেকে আল্লাহ্ পাক-এর নিকট ঐ ব্যক্তি সবচাইতে বেশী সম্মানিত যে বেশী মুত্তাকী বা তাক্বওয়া অবলম্বনকারী।” (সূরা হুজরাত/১৩)

          আল্লাহ্ পাক আরো বলেন-“সাবধান! নিশ্চয়ই আল্লাহ্ পাক-এর ওলীগণের কোন ভয় নেই এবং তারা চিন্তিত হবেননা।” (সূরা ইউনুস/৬২)

          উপরোক্ত আয়াত শরীফ সমূহে স্বয়ং আল্লাহ্ পাক হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উম্মতগণকে মুসলমান নাম দিয়েছেন এবং মুসলমান না হয়ে ইন্তেকাল করতে নিষেধ করেছেন।

          আরো উল্লেখ করেছেন, “হে ঈমানদারগণ! তোমরা খালেছ ঈমান আন, অর্থাৎ ইলমুল ইয়াক্বীন, আইনুল ইয়াক্বীন ও হক্কুল ইয়াক্বীন হাছিল করে প্রকৃত মু’মিন হয়ে যাও, তাহলেই তোমরা কামিয়াবী হাছিল করতে পারবে এবং তোমাদের কোন চিন্তা-পেরেশানীও থাকবেনা।

          আরো উল্লেখ করেছেন যে, তোমরা সতর্ক বা সাবধান হও, যারা প্রকৃত তাক্বওয়া অর্জন করে মুত্তাকী হয়েছে বা আল্লাহ্ পাক-এর খাছ ওলী হয়েছে, নিশ্চয়ই তাদের কোন চিন্তা-পেরেশানী নেই। কারণ তারাই আল্লাহ্ পাক-এর কাছে সবচাইতে বেশী সম্মানিত।

অতএব, মুসলমানগণকে মুসলমান না বলে মৌলবাদী বলা শরীয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ নাজায়েয, হারাম ও কাট্টা কুফরী।

          উল্লেখ্য হাদীস শরীফে বলা হয়েছে, “যদি কেউ অন্য কাউকে কাফের বলে, তবে সে শব্দটি প্রথমে আসমানে উঠতে চায়, কিন্ত তখন আসমানের দরজা বন্ধ করে দেয়া হয়। এরপর তা জমিনে নিপতিত হবার চেষ্টা করে, জমিনের দরজাও তখন বন্ধ করে দেয়া হয়। অতঃপর তা যাকে বলা হয়েছে তার উপর পড়ে যদি সে অনুরূপ হয়। নতুবা যে বলেছে তার উপর গিয়েই পড়ে এবং কাফের অবস্থায়ই তার মৃত্যু হয়।

          কাজেই যারা বলছে মৌলবাদী না হলে অবৈধ সন্তান তথা অমুসলমান বা কাফির হতে উপরোক্ত হাদীস অনুযায়ী তাদের পরিণতি তাদেরই চিন্তা করা উচিৎ।

প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে নব্য মৌলবাদের প্রবক্তা চরমোনাইর ফজলুল করীম মূলতঃ এভাবে মৌলবাদ প্রচার করার মাধ্যমে সনাতন ইসলামকে বাদ দিয়ে বাদশাহ্ আকবরের দ্বীন-ই-ইলাহীর ন্যায় এক নতুন কুফরী ফির্কার প্রবর্তন করছে।

          উল্লেখ্য, মৌলবাদের ন্যায় দ্বীন-ই-ইলাহীর আক্ষরিক অর্থও খারাপ নয়। আর আক্ষরিক অর্থই মূখ্য নয়। যা কুরআন শরীফ হাদীস শরীফে বার বার আলোচনা হয়েছে। আক্ষরিক অর্থের বাইরে দেখতে হয় তার ঐতিহাসিক ও জামানার প্রায়োগিক দিক। যেমন তিরমিযী, বুখারী ও মুসলিম হাদীস শরীফে আরো এসেছে যে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবুল কাশিম নাম রাখতে নিষেধ করেছেন। এটা ছিল তার লক্বব। মুহাদ্দিসে কিরামের অভিমত যে এটা হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যামানার জন্য। কারণ তাতে হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে নামের মিশ্রণের ফলে অসুবিধা হতে পারতো। কিন্তু সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওফাত মোবারকের পর সে আশঙ্কা নাই বিধায় তা জায়েয। সুতরাং একটি দু’টি নয় হাজারো প্রমাণ নথিভূক্ত করা যায় মৌলবাদের আক্ষরিক অর্থ গ্রহণ না করার পক্ষে। যেহেতু আকলমন্দের জন্য ইশারাই যথেষ্ট। কিন্তু তারপরে যারা বুক ফুলিয়ে বলতে চায় আমরা সবাই মৌলবাদী সঙ্গত কারণেই তাদের তুলনা চলে বাদশাহ আকবার দ্বীন-ই-ইলাহীর অনুসারী যাদেরকে বলা হত ‘চেলা’ তাদের সাথে, তার পাশাপাশি কাদিয়ানীদেরও সাথে। মহান আল্লাহ্ পাক এ ফিৎনা হতে হিফাজত করুন।

সাইয়্যিদ শাহীনুল ইসলাম, রামপুরা, ঢাকা।

উলামায়ে “ছু”দের অপবাদ এবং আল বাইয়্যিনাত-এর জবাব- একটি খতিয়ান

“সত্য এসেছে, মিথ্যা দূরীভূত হয়েছে। নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই মিথ্যা দূরীভুত হওয়ার যোগ্য।” যে অবর্ণনীয় মিথ্যাচার করে উলামায়ে ছু গং আল বাইয়্যিনাত ও রাজারবাগ শরীফ সম্পর্কে কুৎসা রটনা করেছিল, আল্লাহ্র রহ্মতে তার প্রায় সবই দীর্ঘদিন ধরে মতামত বিভাগে উদ্ঘাটিত হয়েছে, তাদের জারিজুরি ফাঁস করা হয়েছে। অবিশ্বাস্য মিথ্যাচারিতার কারণে তারা আজ আবু কাজ্জাব গং রূপে চিহ্নিত হয়েছে এবং তাদের কথিত রাহবার গোষ্ঠী, যাবতীয় হারামকে হালাল আর হালালকে হারাম করার প্রেক্ষিতে, দ্বীন বিক্রী করে দুনিয়া হাছিলের প্রবৃত্তির কারণে, ধিকৃত ও লাঞ্ছিত উলামায়ে ‘ছু’ রূপে সাব্যস্ত হয়েছে।

          বলাবাহুল্য, আল বাইয়্যিনাতের এসব লেখনী উক্ত উলামায়ে ‘ছু’দের জন্য যে সীমাহীন মর্মজ্বালা ও যাতনার কারণ হয়েছে, তা তারাও অকপটে স্বীকার করে। এবং কেন বাইয়্যিনাতে এরূপ লেখা হয়, সেজন্য ক্ষুব্ধ হয়ে ফোঁসফাস করে। কিন্তু সে ফোসফাস কেবলই অর্থহীন। কারণ আল বাইয়্যিনাতের পাতায় এসব লেখার সুযোগ করে দেয় ওরাই।

          প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য যে, মাসিক আল বাইয়্যিনাতের নিয়মিত পাঠক হিসেবে আমরা দেখেছি- আল বাইয়্যিনাতের ১৩তম সংখ্যায় মাহিউদ্দীন সম্পর্কে মতামত বিভাগে প্রথম যে লেখা  শুরু হয়, সে লেখাটি ছিল মাহিউদ্দীনেরই লক্বব সম্পর্কীয় কুৎসা রটনার যথোচিত জবাব এবং এরপরে মাহিউদ্দীন আবারও যখন রাজারবাগ শরীফ সম্পর্কে অসত্য ভাষণ দিয়েছে, অন্যায় মন্তব্য করেছে, অপবাদ ও অপপ্রচারণা চালিয়েছে, বাইয়্যিনাতে কেবল তখনি তার দাঁতভাঙ্গা জবাব দেয়া হয়েছে, তার হাক্বীক্বত উন্মোচন করা হয়েছে।

          প্রসঙ্গত স্মরণীয়, আক্রমণ করলেই পাল্টা আক্রমণ অথবা আক্রমণের শুরু বিপরীত পক্ষ থেকে হলেই তারপর তার জবাব দান এটাই রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সুন্নত। এই সুন্নত পালিত হয় বাইয়্যিনাতের লেখার ক্ষেত্রেও। বাইয়্যিনাতের বিরুদ্ধে যারা সম্পূর্ণ মিথ্যাচারের ভিত্তিতে কুৎসা রটনা করেছে, বাইয়্যিনাত অতঃপর আল্লাহ্র রহ্মতে তাদেরই সে কুৎসা রটনার জবাব দিয়েছে এবং এ সুন্নত পালনার্থে বাইয়্যিনাতের পক্ষ থেকে আগামী দিনেও ইন্শাআল্লাহ্ পদক্ষেপ নেয়া হবে।  এ প্রেক্ষিতে উদাহরণ স্বরূপ নিম্নে তা উল্লেখ করা হলো-

**  মাসিক মদীনা, ডিসেম্বর/ ৯৩ইং

** মাসিক আল বাইয়্যিনাত, জানুয়ারী, ফেব্রুয়ারী /৯৪ঈঃ

** মাসিক হক পয়গাম, ফেব্রুয়ারী/৯৪ইং

** মাসিক আল বাইয়্যিনাত, মার্চ,মে/৯৪ঈঃ

** মাসিক হক পয়গাম, জুলাই/৯৪ইং

** মাসিক আল বাইয়্যিনাত, আগষ্ট, সেপ্টেম্বর/৯৪ঈঃ

** মাসিক হক পয়গাম, সেপ্টেম্বর/৯৪ইং

** মাসিক আল বাইয়্যিনাত, অক্টোবর/ ৯৪ঈঃ

** মাসিক আল জামিয়া, আগষ্ট/৯৫ইং

** মাসিক আল বাইয়্যিনাত, অক্টোবর/৯৫ঈঃ

** মাসিক আল জামিয়া, অক্টোবর/৯৪ইং

** মাসিক আল বাইয়্যিনাত, নভেম্বর/৯৪ঈঃ

** মাসিক আল জামিয়া, নভেম্বর/৯৪ইং

** মাসিক আল বাইয়্যিনাত, ডিসেম্বর/৯৪ঈঃ, (অসমাপ্ত)

সাইয়্যিদ মুহম্মদ ইউসুফ, মধ্য বাসাবো, ঢাকা।

বাহাস নয় ছল-চাতুরীই ওদের স্বভাব

কুষ্টিয়ার ভেড়ামারার বাহাসের বিষয়টি লইয়া মাসিক আল বাইয়্যিনাতের পাতায় আলোচনা হইয়াছে ইতোপূর্বেও। ব্যবসায়িক আত্মীয়তা সূত্রে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় যাওয়া, সে সুবাদে সেখানকার লোকজন ও তাদের অবস্থাদি সম্পর্কে অবহিত হওয়া তার পাশাপাশি পারলে কিছু একটা করা, বলা বা লেখার দায় তাই হৃদয়ের তাগিদেই অনুভব করি।

ঘটনাপ্রবাহে সেদিন মাসিক আল বাইয়্যিনাতের কার্যালয়ে ঢুকে কুষ্টিয়া, ভেড়ামারার প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সৌভাগ্য হল, ভেড়ামারা থেকে পাঠানো এক পত্র পাঠের। বিবরণ নিম্নরূপ-

“প্রিয় সম্পাদক সাহেব,

আচ্ছালামুআলাইকুম আলাইকুম, বাদ আরজ এই যে, আমরা ভেড়ামারা থানার আঞ্জুমানে আল বাইয়্যিনাতের সদস্যগণ বিগত ১৯-১০-৯৯ ইং তারিখে মীরপুর থানার সাতগাছা নামক স্থানে এক মাহ্ফিল পরিচালনা কালে সাতগাছার গফুর মৌলভী তার দলবলসহ মীলাদ ক্বিয়াম নাজায়েয় ফতওযা দিয়া মাহ্ফিলে চরম উচ্ছৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টি করে এবং জোরপূর্ব্বক মাহ্ফিল বন্ধ করিয়া দেয়। এহেন পরিস্থিতিতে আমরা মীলাদ ক্বিয়ামের স্বপক্ষে দলীল প্রমাণাদি দেয়া হবে বলে আলোচনার আহবান জানাইলে তাহারা কোন কিছুই মানতে চায়না।

পরবর্তীতে রাজারবাগ শরীফের প্রকাশ্য বাহাছ চ্যালেঞ্জের কথা বলিলে তাহারা তাতে সম্মত হয় এবং বাহাছ গ্রহণ করিতে চায়। এ ব্যাপারে আলোচনাক্রমে প্রয়োজনীয় শর্তসমূহ নির্ধারণ করা হয়।

বিগত ০৪-২-২০০০ ইং তারিখে ভেড়ামারা মধ্যবাজার ওয়াক্তিয়া মসজিদে জনাব এ, কে, এম, হাসানুজ্জামান (কামালহাজী) সাহেবের মধ্যস্থতায় বাহাছের বিষয় ও শর্তসমূহ আলোচনা ও খসড়া লিখিত হয়। যাহাতে উভয় পক্ষ স্বাক্ষর দান করে। ১৮-২-২০০০ ইং তারিখে পূণরায় আলোচনা হয় ও কিছু বিষয় সংশোধন করা হয়। তাতেও উভয় পক্ষ স্বাক্ষর দান করে। ০৩-৩-২০০০ ইং তারিখে বাহাছ সংক্রান্ত বিষয় শর্ত, দিন ও সময় নির্ধারণ চূড়ান্ত করা হয়। ৪ঠা এপ্রিল বাহাছ মাহ্ফিলের সময় নির্ধারিত (প্রাথমিক) থাকিলেও চূড়ান্ত বাহাছ তারিখ ৩রা মে/২০০০ইং নির্ধারিত হয়। এতে উভয় পক্ষের পাঁচজন করিয়া আলেমগণের নাম ঠিকানা লিপিবদ্ধ করা হয়। ২৪-৩-২০০০ইং তারিখে বাহাছের চূড়ান্ত বিষয়াদিসহ সকল বিষয় ১৫০ (একশত পঞ্চাশ) টাকার নন জুডিশিয়াল ষ্ট্যাম্পে লিপিবদ্ধ করা হয়। ৩১/৩/২০০০ইং তারিখে ষ্ট্যাম্পের উপর উভয় পক্ষ স্বাক্ষর দান করেন।

১০-৪-২০০০ইং তারিখে বাহাছ মঞ্চ তৈরী, মাইকিংকরণ পোষ্টার ছাপানো বিলিকরণ কাজের খরচাদির ব্যাপারে আলোচনা করা হয় এবং ষ্ট্যাম্পে লিখিত=৫,০০০/- (পাঁচ হাজার) টাকা করিয়া উভয়পক্ষ মোট=১০,০০০/- (দশ হাজার টাকা) ক্যাশিয়ার জনাব আলহাজ্ব আমিরুল ইসলাম সাহেবের নিকট জমা দেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়। পরবর্তী আলোচনায় দেওয়া হবে মর্মে সিদ্ধান্ত হয়। ১৯/০৪/২০০০ইং তারিখে বাহাছ সংক্রান্ত বিষয়ে ভেড়ামারা জামে মসজিদে পুনরায় আলোচনায় বসা হয় (বাদ এশা)। বাহাছ আলোচনায় উভয়পক্ষের দুইজন করিয়া চারজন বসার কথা থাকিলেও তাহারা পূর্ব পরিকল্পনা করিয়া ২০/৩০ জন লোকসহ আলোচনায় বসেন। বাহাছ গ্রহণকারী দ্বিতীয় পক্ষ মোঃ আফতাবউদ্দিন ও মোঃ বেলালউদ্দিন আলোচনায় বসার জন্য আমরা প্রথম পক্ষ আলহাজ্ব মোঃ আমিরুল ইসলাম ও মোঃ নূরুল ইসলামদ্বয়কে আহবান জানান। জনাব মোঃ বেলালউদ্দিন আলোচনার শুরুতেই পূর্বনির্ধারিত আলোচনা বাদ রাখিয়া নুতনভাবে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য পীড়াপীড়ি করেন। দ্বিতীয়পক্ষ তাদের তরফ থেকে একটি লিফলেট দেখাইয়া সেই বিষয়ে আলোচনা ও নূতনভাবে বাহাছ বিষয় শিখার জন্য জোর দাবী করেন। আমরা প্রথম পক্ষ তাহাতে সম্মত না হইলে তাহারা ক্ষিপ্ত হইয়া উঠেন এবং এক পর্যায়ে মারমুখী হইয়া উঠেন। স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় তাহা আপাততঃ বন্ধ হয়। তারা অশ্লীল কথাবার্তা বলিতে থাকেন। শেষে দ্বিতীয় পক্ষের মোঃ বেলালউদ্দিন “নূতন লিফলেট” অনুযায়ী বাহাছ ষ্ট্যাম্প লিপিবদ্ধ না হইলে বাহাস করা হইবেনা ঘোষণা দেন। তিনি আরো বলেন যেহেতু উপজিলা নির্বাহী অফিসার সাহেব সভাপতিত্ব করিতে রাজী হন নাই সেইহেতু আগের লিখিত ষ্ট্যাম্প বাতিল হইয়া গিয়াছে, আমরা প্রথম পক্ষ তাহাকে পূর্ব লিখিত চুক্তির কথা স্মরণ করিয়া চেয়ারম্যান ভেড়ামারা পৌরসভা/মুহতামিম/হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষককেও প্রয়োজনে সভাপতি করার চুক্তিও রয়েছে জানাইলে তাতেও তারা বাহাছে রাজী হয়না। আমরা প্রথম পক্ষ চেয়ারম্যান সাহেবকে সভাপতিত্ব করার অনুরোধ করিলে তিনি তাহাতে সম্মতি জ্ঞাপন করেন। দ্বিতীয় পক্ষকে এ ব্যাপারে তাহাকে অনুরোধ জানাতে হবে বলে তিনি সিদ্ধান্ত দেন। দ্বিতীয় স্বপক্ষ মাননীয় চেয়ারম্যান সাহেবের সহিত যোগাযোগ করেন এবং বাহাছ করবেনা বলে জানান। তারা তাদের মত ওয়াজ মাহ্ফিল করবেন এবং প্রথম পক্ষকে তাদের মত ওয়াজ মাহফিল করার জন্য বলেন।

বিগত ০১/৫/২০০০ইং তারিখে দ্বিতীয় পক্ষের মোঃ বেলালউদ্দিন প্রথম পক্ষের জনাব আলহাজ্ব মোঃ আমিরুল ইসলাম সাহেবের “সেলিম ষ্টোর” দোকানে বসিয়া বাহাছ করবেন না জানান এবং হাজী সাহেবকে আলাদা আলাদা ওয়াজ মাহফিল করার সিদ্ধান্ত জানান।

বাহাছ ষ্ট্যাম্প লিখিত শর্তের ০৮ নং শর্তানুযায়ী বাহাছ মাহফিলের জন্য স্থানীয় প্রশাসনকে উভয়পক্ষ নিরাপত্তার জন্য আবেদন করিবেন। এ ব্যাপারে দ্বিতীয় পক্ষ নীরব ভূমিকা পালন করে।

০৯ নং শর্তানুযায়ী উভয় পক্ষই বাহাছ বিষয়ের আক্বীদা ও আমলের লিখিত দলীল পেশ করা সিদ্ধান্ত হয়। আমরা প্রথম পক্ষ বাহাছ বিষয়ের আক্বীদাও আমলের দলীল পেশ করতে চাই এবং তাদের নিকট হইতে আক্বীদাও আমলের লিখিত দলীল পেশের আবেদন জানাই। দ্বিতীয় পক্ষ লিখিত দলীল পেশ করতে রাজী হয় নাই এবং পেশ করেন নাই।

          ১০ নং শর্তানুযায়ী উভয় পক্ষের আলেমগণের মধ্য হইতে একজন করিয়া মোট দুইজন বাহাছের বিচারক নির্ধারিত হইবে। তাহারা এই সিদ্ধান্ত না মানিয়া নিরপেক্ষ অন্য একজনকে বিচারক নির্ধারণ করার কথা জানান। তাহাতে প্রথম পক্ষ আমরা রাজী হয় এবং এই নিরপেক্ষ বিচারক কে হবেন তাহা জিজ্ঞাসা করিলে তাহার এ ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্ত না দিয়া নীরব ভূমিকা পালন করেন। ১২নং শর্তানুযায়ী বাহাস মাহফিলের সম্মস্ত খরাচাদি মিটানোর জন্য আপাততঃ ৫,০০০/- (পাঁচ হাজার) টাকা করিয়া সর্বমোট =১০,০০০/- (দশ হাজার) টাকা মাত্র ক্যাশিয়ার মাহফিল এন্তেজামিয়া কমিটি জনাব আলহাজ্ব মোঃ আমিরুল ইসলাম সাহেবের কাছে জমা দেওয়ার সিদ্ধান্ত থাকিলেও দ্বিতীয় পক্ষ তা জমা দেন নাই বা জমা দানে বিরত থাকেন। ১৪নং শর্তানুযায়ী ৩১/৩/২০০০ইং তারিখে উভয় পক্ষের স্বাক্ষরিত আবেদন এ স্থানীয় প্রশাসনের নিকট আবেদনও অনুমতি গ্রহণের সিদ্ধান্ত থাকিলেও এ ব্যাপারে তাহার সহযোগীতা না করিয়া নীরব ভূমিকা পালন করেন। ১৬নং শর্তানুযায়ী উভয়পক্ষই মিলিত হইয়া পুলিশ প্রশাসনকে বাহাছ মাহফিলের নিরাপত্তা বিধানের জন্য আবেদনও অনুমতি গ্রহণের সিদ্ধান্ত থাকিলেও এ ব্যাপারেও তারা ২য় পক্ষ নীরব ভূমিকা পালন করেন। এই সমস্ত নীরব ভূমিকা ও টালবাহানার কারণ জিজ্ঞাসায় জানা যায় তাহারা বাহাছ মাহফিল করিবেনা। দ্বিতীয় পক্ষ তাহারা আলাদা ওয়াজ মাহফিল করিবেন এবং আমরা প্রথম পক্ষকেও আলাদা ওয়াজ মাহ্ফিল করার পরামর্শ দেন যাতে কোনরূপ ফিতনার সৃষ্টি না হয়।

          বাহাস মাহফিলের সার্বিক বিষয় সম্পর্কে বাহাছ মধ্যস্থতাকারী জনাব আলহাজ্ব এ, কে, এম, হাসানুজ্জামান (কামাল) সাহেবকে জানাইলে তিনি আমাদের (১ম পক্ষ)কে জানান তারা অর্থাৎ দ্বিতীয় পক্ষ বাহাছ মাহফিলের ব্যাপারে তাহার সহিত কোনরূপ যোগাযোগ করেননি বা করবেন না। তোমরা প্রথম পক্ষ সম্ভব হইলে কেন্দ্রীয়ভাবে ঢাকাতে বাহাছ মাহ্ফিলের আয়োজন করিয়া বাহাছ বিষয় সমাধান করিতে পার। নতুবা তোমরা তোমাদের মত আলাদা ওয়াজ মাহফিল করিতে পার মর্মে পরামর্শ দেন। এ ব্যাপারে মাননীয় চেয়ারম্যান, ভেড়ামারা পৌরসভা সাহেব, মাননীয় উপজিলা নির্বাহী কর্মকর্তা ভেড়ামারা সাহেবদ্বয়কেও অবহিত করানো হয়। মাননীয় চেয়ারম্যান সাহেব জানান দ্বিতীয় পক্ষ বাহাছ করিবেননা। তাহারা পৃথকভাবে ওয়াজ মাহফিল করিবেন।

          সার্বিক আলোচনায় দেখা যায় দ্বিতীয় পক্ষ বাহাছ না করার সিদ্ধান্ত এ অটল। আমরা প্রথম পক্ষ আলোচনাক্রমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি যে, যেহেতু আমরা প্রথম পক্ষ বাহাছ এ রাজী নয় বা টালবাহানা করিতেছেন এবং আমরা প্রথমপক্ষও আলেমগণকে দাওয়াত দিয়াছি সেইহেতু সকলের পরামর্শক্রমে পৃথক ওয়াজ মাহফিল করা হইবে। সেই আলোকে ৩রা মে/২০০০ইং তারিখ ঠিক রাখিয়া আমরা প্রথম পক্ষে ওয়াজ মাহফিল করার জন্য স্থানীয় হাই স্কুল ফুটবল মাঠ ব্যবহারের লিখিত অনুমতি গ্রহণ করিয়া মাহফিলে নিরাপত্তাসহ সকল প্রকার সম্ভাব্য সহযোগীতা দানের জন্য উপজিলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর আবেদন করি এবং অনুমতি গ্রহণ করিব। যাহার কপি, সহকারী পুলিশ সুপার- ভেড়ামারা, ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ভেড়ামারা থানা ও চেয়ারম্যান ভেড়ামারা, পৌরসভাকেও অবহিত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জ্ঞাপন করা হয়। দ্বিতীয় পক্ষ আমরা প্রথম পক্ষ যাহাতে ওয়াজ মাহফিল করিতে না পারি সেজন্য বিভিন্ন স্থানে জোর তদ্ববির করিতে থাকেন এবং ২/৫/২০০০ইং তারিখে সহসা মাইক যোগে বাহাছ মাহফিলের কথা বলেন। এ ব্যাপারে আমরা প্রথম পক্ষ প্রতিবাদ জানাইলে দ্বিতীয় পক্ষ তাৎক্ষনিক মাইকিং বন্ধ করিয়া পৃথক ওয়াজ মাহফিলের মাইকিং করিতে থাকেন।

কোনরূপ বাধা বিঘ¦ ছাড়াই ০৩/৫/২০০০ইং তারিখে প্রথম পক্ষের ওয়াজ মাহফিল সম্পন্ন হইয়াছে।”

ওয়াস্সালাম-

প্রথম পক্ষ,

১। আলহাজ্ব মোঃ আমিরুল ইসলাম

০৭-৫-২০০০ইং

২। মোঃ নূরুল ইসলাম, বি, কম (অনার্স) এম, কম,

সাং- নওদাপাড়া,  ডাকঘরঃ ভেড়ামারা, জিলা- কুষ্টিয়া

পাঠক! এই মর্মে আল বাইয়্যিনাতে ফেব্রুয়ারী/৯৭তে আমার লেখায় বলা হয়েছিল

          প্রকাশ  কুষ্টিয়ার  ভেড়ামারার জনৈক মাওঃ আব্দুুল বারীর কুতৎপরতায় বেশ কিছু  ওলামায়ে ‘ছু’ সংগঠিত হয়।

তাহারা তৎপরতা চালায় সেখানে হযরত পীর সাহেব ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলী-এর মাহ্ফিলে বাধা দিতে। কিন্তু স্থানীয় সমঝদার সত্যানুসন্ধানী ও মুরীদদের মোকাবিলায় তাহাদের সেই অপচেষ্টা চরমভাবে নস্যাত হয় এবং তাহারা কথা দেয় বাহাসে হাজির হইতে। কিন্তু অত্যন্ত নির্লজ্জভাবেই উক্ত বিদ্য়াতী গোমরাহ্ ওলামায়ে ‘ছু’রা কথিত বাহাসে হাজির হওয়া থেকে বিরত থাকে। সেই প্রেক্ষিতে হযরত পীর সাহেব ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলী-এর উপস্থিতির সামনে সকল উদ্যোক্তা ও সাধারণ লোক তাহাদের এই অনুপস্থিতিকে বাহাসের ভয়ে পলায়ন ও আত্মগোপন বলিয়া অভিহিত করে।

          জনসাধারণ স্পষ্টরূপে বুঝিতে পারে যে, হযরত পীর সাহেব ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলী-এর কাছে অনিবার্যরূপে পরাস্ত ও পর্যুদস্ত হওয়ার আশঙ্কায়ই ওলামায়ে ‘ছু’ দল বাহাসে হাজির হয় নাই।

          উল্লেখ্য যে উক্ত ওলামায়ে ‘ছু’র গোষ্ঠী সেদিন বাহাসে অনুপস্থিত থাকার জন্য ক্রমশঃ জনতার কাছে অভিযুক্ত ও নিন্দিত হইতে থাকিলে, তাহারা তাহাদের সেই অনুপস্থিতির পিছনে নামকাওয়াস্তে খোড়াযুক্তি পেশ করিয়া, তাহার পর আরো একটি তারিখ নির্ধারণ করে এবং সেই তারিখে তাহারা অবশ্যই হাজির হইবে বলিয়া কথা দেয়। কিন্তু হযরত পীর সাহেব ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলীর নাম শ্রবণেই কম্পনকারী ও হক্বের মোকাবিলায় সদা পিছুটানে অভ্যস্ত উক্ত কুলাঙ্গাররা তাহাদের মুখ ইহার পরের বারও দৃশ্যপটে বা জনসম্মুখে হযরত পীর সাহেব ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলী-এর সামনে হাজির করিতে পারে নাই। অর্থাৎ তাহারা পিছনে থাকিয়াই প্রকাশ্যে পরাজয় মানিয়া পলায়ন করিয়াছে। তাই ইহার পরবর্তীতে সচেতন জনগোষ্ঠী রাস্তার মোড়ে মোড়ে হযরত পীর সাহেব ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলী-এর ওয়াজের ক্যাসেট বাজায় এবং ওলামায়ে ‘ছু’দের ধিক্কার দিতে থাকে। উল্লেখ্য, ভেড়ামারায় ওলামায়ে ‘ছু’র গোষ্ঠীরা এখনো সেই ধিকৃত অবস্থায়ই লাঞ্ছিত হইতেছে।

          আর এর কারণ সম্পর্কেও উক্ত লেখার প্রথমেই বলা হয়েছিল – “বসা, সামনাসামনি বসা, তাহাও যদি আবার হয়, যামানার লক্ষ্যস্থল- হক্ব ওলী আল্লাহ্র নাহক্ব বিরোধীতা করিয়া, মহান আল্লাহ্ পাক তাঁহাকে যেই সম্মান দান করিয়াছেন, ওলী আল্লাহ্দের কাতারে তাহাকে যে অনন্য মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করিয়াছেন, লক্বব ব্যবহারের সুন্নতী ধারাবাহিকতায় তাঁহাকে যে অনুপম লক্ববসমূহে ভূষিত করিয়াছেন, তাহা অস্বীকার ও অবজ্ঞা করিয়া তাঁহারই সাথে বসা, তাহা হইলে তাহাতে যে কি নিদারুণ আতঙ্ক ও উদ্বেগজনক অবস্থা তৈয়ারী হয়, উহাতে আত্মা যে, কি প্রবলরূপে অন্তরাত্মাকে খামচাইয়া ধরিয়া রাখিতে চায়, আর আত্মা, অন্তরাত্মায় সবকিছুুতে মিলিয়া মুহুর্মুহু কম্পন অথবা ভূমিকম্পাপেক্ষা সহস্রগুণে কি অধিক বেগে যে অবর্ণনীয় কম্পনের জোয়ার তৈয়ারী হয়, তাহা মর্মে মর্মে খুব ভালভাবে অনেক আগেই উপলব্ধি করিতে পারিয়াছিল ওলামায়ে ‘ছু’দের নেতা তথাকথিত শাইখুল হাদীস, মুফ্তী, মুফাস্সির আর মাওলানা ও পীর সাহেবের ছদ্মাবরাণে কতিপয়  চিহ্নিত গোমরাহ্, জাহিল, বিদ্য়াতী  তথা নিকৃষ্ট ব্যক্তি।”

          বলার অপেক্ষ রাখেনা পত্রে বিবৃত দ্বিতীয় পক্ষ যাদের পরিচয় নিম্নরূপ- তথাকথিত মুফতী গোলাম রহমান, দারুল উলুম খুলনা, মুফতী ওয়াক্কাছ আলী, যশোর, মুফতী মনছুরুল হক, জামেয়া রহমানীয়া,ঢাকা, মাওলানা ইব্রাহীম খরীল কাশেমী, যশোর, ইব্রাহীম খলীল কাশেমী, কুষ্টিয়া।

          এবার ব্যক্তিগত ভাবেই নিজেরাই উপলব্ধি করতি পারিয়াছে যে চাতুরী করা যাইতে পারে কিন্তু রাজারবাগ শরীফের সাথে বাহাসে বসা তাদের কর্ম নয়।

ডাঃ লুৎফর রহমান, ঢাকা।

তস্করের ন্যায় ভূমিকা পালনেই কি তাক্বওয়া

তস্কর শব্দটি এখন আর তেমন ব্যবহৃত হয়না। অধুনা সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, মাস্তান ইত্যাদি বিভিন্ন শব্দ এর স্থান অধিকার করে নিয়েছে। তবে তস্কর শব্দটির চল যখন ছিল তখন তা অধুনা সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজের চেয়েও অপেক্ষাকৃত বেশী বিভীষিকাময় ছিল।

          অধুনা সন্ত্রাসীদের চেয়ে তস্করের দৌরাত্ম আরেকটু রাখ ঢাকের বাইরে ছিল। তস্করেরা এক্ষেত্রে আগাম বার্তা প্রেরণ করত। অবস্থা সম্পন্ন গৃহস্থ তস্করের এইসব পত্রের সাথে পরিচিত ছিল। পত্রের প্রথমে সম্ভাষণ না হলেও সম্বোধন পূর্বক  যা স্রেফ কথায় বলা হত তার সারবত্তা এই যে, “আমরা অমুক তারিখে, যা অতটার সময় তোমার বাড়ীতে আসছি। তুমি আমাদের জন্য এইসব, এতসব অর্থ, সোনা-দানা ইত্যাদি প্রস্তুত রাখবে। এতে সামান্য ব্যত্যয় ঘটলে তোমাকে চরম পরিণতির সম্মুখীন হতে হবে।” পত্রের শেষে পরিচয় থাকতো বটে। তবে তা নামে বা বেনামে নয় বরং বিভীষিকাময় কোন কিছুর বরাতে। যেমন …… কালাপাহাড় বা যমদূত অথবা অন্যকিছু।

          এই সমস্ত তস্কর অধিকাংশ ক্ষেত্রে ছিল অপ্রতিরোধ্য। তৎকালীন প্রশাসনিক দুর্বলতা অথবা বিস্তর যোগাযোগ বিহীন দুর্গম এলাকা সেই সাথে এদের অদম্য সাহসও এদেরকে দুর্দান্ত করে তুলেছিল।

          কালের বিবর্তনে প্রশাসনের ক্ষেত্র বিস্তৃত হয়েছে, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে, দেশ তথা সমগ্র পৃথিবী ছোট হয়ে আসছে, অপরাধীদের শনাক্তকরণের টেকনোলজি উন্নত হয়েছে, ফলশ্রুতিতে অপরাধীদের অপরাধ কর্মকান্ডেও পরিবর্তন হয়েছে। এখন আর তাই আগের মত আগাম বার্তা দিয়ে তস্করের বা দস্যুর ন্যায় কেউ লুটতরাজ করতে আসেনা, মূলতঃ আগের ন্যায় “লুটতরাজের বার্তা পাঠাতে সাহস করেনা।”

          কিন্তু সম্প্রতি ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের মুখপাত্র দাবীদার চরমোনাইর পীর নামধারী ফজলুল করীম এর চ্যূতি ঘটিয়েছে। সে তার স্ব-গোত্রীয় অপর এক পীর সাহেবের দরবারকে পূর্ব হতেই প্রকাশ্যে আক্রমণের ঘোষণা দিয়ে প্রাচীনকালের সেই তস্করের আগাম বারতা দিয়ে লুটতরাজের প্রক্রিয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে।  এটা ঠিক যে, যার দরবার আক্রমণের কথা; সে প্রকাশ্যে অনেক ধন-সম্পত্তির মালিক। সুতরাং তা হস্তগত করার অভিপ্রায়েই যদি তার আক্রমণের বাসনা জেগে উঠে তবে তাকে অস্বীকার করা যায়না। কারণ ইতোপূর্বে আমরা দেখেছি, মৌসুমী কাদিয়ানী বিরোধী আন্দোলনকারীরা কাদিয়ানীদের উপাসনালয় ভাঙ্গার নামে সেখানে লুটতরাজও চালিয়েছিল।

          কিন্তু এর বাইরে যে কথা মূখ্য যে, এভাবে একটি রাষ্ট্র যেখানে আইন-শৃঙ্খলার নামে একটি মেকানিজম বিদ্যমান সেখানে সেটাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর কথা সরবে তুলে ইচ্ছা মাফিক আক্রমণ করা কি আদৌ গ্রহণযোগ্য?

          চরমোনাইর কথিত পীর ফজলুল করীম যদি মনে করে যে, এটা তার তথাকথিত ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের আওতাভূক্ত কাজ তবে পরিস্থিতি জটিল হয়ে দাঁড়ায় আরো বেশী।

          সেক্ষেত্রে প্রথমেই প্রশ্ন উঠে যে, চরমোনাইর ফজলুল করীম কি মনে করে তথাকথিত ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের নামে এখনই সে তার খাহেশ অনুযায়ী ইসলামের নামে যা ইচ্ছা তাই বলবৎ করার ক্ষমতার অধিকারী হয়ে গেছে! অথচ জিহাদের ক্ষেত্রেও  ইসলামে অনেক বিধি-নিষেধ আরোপ করে দেয়া হয়েছে। রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “তোমরা খেয়ানত করোনা, ওয়াদা ভঙ্গ করোনা, কারো নাক, কান কেটে বিকৃত করোনা, শিশু ও নারীদেরকে হত্যা করোনা।” (মুয়াত্তা ইবনে মালিক)

          এ প্রসঙ্গে আরো রেওয়ায়েত হয়েছে যে, হযরত আব্দুর রহমান ইবনে কাব (রাঃ) বলেন, ইবনে আবুল হুকাইককে যারা হত্যা করতে গিয়েছিলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে নারী ও শিশু হত্যা করতে নিষেধ করে দিয়েছিলেন। ইবনে কাব বলেন, ঐ কার্যে নিয়োজিতদের একজন বলেছেন, ইবনে আবুল হুকাইকের স্ত্রী চিৎকার করে আমাদের তৎপরতা ফাঁস করে দিয়েছিল। আমি তাঁকে হত্যা করার জন্য তলোয়ার উঠিয়েছিলাম। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিষেধাজ্ঞা মনে পড়তেই আবার নামিয়ে ফেলেছিলাম। আর তা না হলে তাকেও সেখানে শেষ করে আসতাম।

          হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখনই আমাদেরকে নিয়ে কোন সম্প্রদায়ের সাথে জিহাদ করতে যেতেন, ভোর না হওয়া পর্যন্ত আক্রমণ করতেন না। অপেক্ষা করে যদি আযান শুনতেন তাহলে আক্রমণ হতে বিরত থাকতেন। আর আযান শুনা না গেলে সেখানে আক্রমণ করতেন। খায়বরের যুদ্ধে রওনা হয়ে আমরা রাতের বেলা সেখানে পৌঁছলাম। ভোর হলে আযান শুনা গেলনা। তখন তিনি সওয়ার হলেন এবং আমি আবু তালহার পিছনে সওয়ার হলাম। এতে আমার পা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পা মোবারক প্রায় স্পর্শ করছিল। তখন খায়বরের লোকজন থলে ও কাঁধে কোদাল নিয়ে আমাদের নিকট এসে রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখে বলে উঠল- মুহম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম!) আল্লাহর কসম এ যে-মুহম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম!) তাঁর সেনাবাহিনী এসে গিয়েছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে দেখে বলে উঠলেন-আল্লাহু আকবর! আল্লাহু আকবার! খায়বর ধ্বংস হোক। আমরা যখন কোন জাতির দ্বার প্রান্তে পৌঁছি তখন সতর্ককৃতদের দিনের সূচনা মন্দই হয়ে থাকে। ( বোখারী শরীফ)

          কোন একটি জিহাদে যাওয়ার সময় নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নির্দেশ দিলেন- অমুক এবং অমুককে পেলে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করবে। রওনা হওয়ার প্রাক্কালে তিনি আবার বললেন-আমি অমুক এবং অমুককে অগ্নি দগ্ধ করে মারতে নির্দেশ দিয়েছি কিন্তু আল্লাহ ব্যতীত আর কেউ আগুন দ্বারা শাস্তি দানের অধিকারী নয়। অতএব, তাদেরকে পেলে এমনিভাবে হত্যা করো।

জিহাদ সংক্রান্ত উপরোক্ত হাদীস শরীফের দ্বারা এটাই মালুম হয় যে, জিহাদও অনেক বিধি-বিধান দ্বারা আবর্তিত।

          কিন্তু চরমোনাইর পীরের ঘোষণায় কি সে বিধি-বিধানের কোন ছোঁয়া ছিল? বরং তস্করের ন্যায় আগাম বার্তা দিয়ে আরামবাগ আক্রমণের ঘোষণায় দেশবাসী নব্য তস্করের উত্থানের বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়েছিল। তাদের মনে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছিল যে, তারা কি কোন রাষ্ট্রে বাস করছে? এই রাষ্ট্রে কি আইন শৃঙ্খলা আছে? নাকি তারা নব্য উঠতি বর্বর এক তস্করের অধীনে দিনাতিপাত করছে? কারণ এই তস্করের ডাকুয়া বাহিনী গত ৩রা ডিসেম্বর নারায়ণগঞ্জে তথা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহা সড়কে কি বর্বর কায়দায় নির্মম হত্যাকান্ড, লুটতরাজ, হানাহানি করেছিল তার তিক্ত অভিজ্ঞতা দেশবাসী ইতোমধ্যে লাভ করেছে। সুতরাং সেই জঘণ্য কায়দায় তস্কর বাহিনী আবারো যদি আরামবাগে আক্রমণ চালায়, সে চিন্তায় পুরো এলাকা, শহর তথা দেশে একটা চরম থমথমে, আশঙ্কাজনিত পরিস্থিতি বিরাজ করছিল।

          কিন্তু শেষ পর্যন্ত হলটা কি? চরমোনাইর কথিত বিশাল মর্দে মুজাহিদের বাহিনী গোটা কয়েক পুলিশের চোখ রাঙ্গানিতে ত্রাহি ত্রাহি করে পালালো। কথিত জিহাদ তো দূরের কথা জিহাদের ময়দানেও তারা উপস্থিত হতে পারলোনা। আর তথাকথিত আমীরুল মুজাহিদের অর্থাৎ স্বয়ং চরমোনাইর পীরের অবস্থা তো আরো সঙ্গীণ।

          তাকে কথিত মর্দে মুজাহিদদের যাত্রাকালেই দেখা যায়নি। কারণটা অবশ্য পরে বোঝা গেছে। আসলে বিজ্ঞাপন হিসেবে তিনি তার সাঙ্গ-পাঙ্গদের মর্দে মুজাহিদ দাবী করলেও, কতিপয় পুলিশের চোখ রাঙ্গানিতে ঐসব মর্দে মুজাহিদরা যেভাবে নিথর, নিশ্চল, অথর্ব হয়ে দাঁড়িয়েছিল তাতে করে সেদিন দৈনিক বাংলার মোড়ে যেন পলাশীর অপ্রকাননে মীরজাফরের অধীনে নবাব সিরাজউদ্দৌলার অগণিত সৈন্য সামন্তর নিশ্চল থাকার দৃশ্যই পুনরায় দেখা যাচ্ছিল।

          এবং বোধকরি বিজ্ঞাপিত মর্দে মুজাহিদদের এই হাক্বীক্বত তথাকথিত আমীরুল মুজাহিদীন তথা চরমোনাইর পীরেরও ভাল করেই জানা। অন্তঃসারশুন্য হৃদয়ে কথিত মুজাহিদদের ফাঁকা বুলি আর লম্ফ-ঝম্ফ ছাড়া তেমন কিছুই শিখাতে না পেরে সে, তাদের কাছ থেকে আর কিই বা আশা করতে পারে?

          প্রশ্ন সংযুক্ত হয় আরো অনেক। প্রায় এক যুগ পার হতে চলল, দেওয়ানবাগের কথিত কুফরী আক্বীদাভিত্তিক বই বাজারে চলমান। কিন্তু বিগত প্রায় এগার বছর পর হঠাৎ করে চরমোনাই পীরের দিলের অভ্যন্তরে এই জিহাদী জজবা উথলে উঠল কোন মতলবে? সূত্র জানায় দেওয়ানবাগীর সাথে জমি সংক্রান্ত সদ্য বিরোধ।

          আর এই বিরোধই যে মূল কারণ, দেশের অপরাপর হাজারো কুফরী আক্বীদা সম্বলিত না হক্ব পীরদের বিরুদ্ধে চরমোনাইর পীরের নিস্ক্রীয় ভূমিকা কি সেই অভিযোগকেই সত্য বলে প্রতিপাদন করেনা?   চরমোনাইর পীর নিজেই বলেছে, জামাতে ইসলাম কোন ইসলামী দলই নয়, তারা ইসলামের দুশমন। তাদের কুফরী আক্বীদারও সমালোচনা সে করেছে এবং শাইখুল হদস আজীজুল হক্বও বর্তমানে তার দৃষ্টিতে প্রকাশ্য হাদীসের বিরোধীতা করে নারী নেতৃত্বের আচলে নিজেকে তুলে দিয়েছে এবং গোলাম আযমের ন্যায় তাকেও সে শয়তান ইত্যদি বলেছে। সুতরাং যদি তাই হয় তাহলে এসব ভন্ড ব্যক্তিও জিহাদী দলের প্রতি তার কোনও আওয়াজ নেই কেন?

          তার এই নীরবতা নিস্ক্রীয়তা কি এটাই প্রমাণ করেনা যে, মুখে হক্ব প্রতিষ্ঠার জিহাদ চললেও আসলে তা কায়েমী স্বার্থবাদীদের সন্ত্রাসী অভিযান ছাড়া আর কিছুই না। আগাম বার্তা দিয়ে পুরনো দিনের তস্করের ন্যায় লুটতরাজ চালানোর এক অসভ্য, অনৈতিক আচরণ! ব্যতীত অন্য কিছুই নয়। বিগত ৩রা ডিসেম্বর’ ৯৯ইং তারিখের নারায়ণগঞ্জ সড়কে সন্ত্রাসী তৎপরতা চালানো যার জ্বলন্ত নিদর্শন এবং ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের নামে এসব কিছু করা কেবলি ব্যবসায়ীক বিজ্ঞাপন।

কারণ অগণিত হাজারো অনৈসলামিক কাজ রয়েছে, তার বিরুদ্ধে চরমোনইর পীরের কোন পদক্ষেপ নেই কেন?

          চরমোনাইর পীর নিজেই বলেছে, বর্তমান সংবিধানে শতাধিক অনৈসলামিক আইন রয়েছে। তাহলে সে আরামবাগের ন্যায় সংসদ ভবন, হাইকোর্ট ভবন উড়িয়ে দিতে যায়না কেন?

          সে নিজেই বলেছে, মহিলা আলিয়া মাদ্রাসাগুলো বেশ্যাখানা, তাহলে সেগুলো ভাঙ্গার জন্য তার কোন পদক্ষেপ নেই কেন?

সে বিরোধীদলীয় নেত্রী এবং সরকার দলীয় নেত্রী উভয়ের প্রতি চারিত্রিক অবমাননাকর উক্তি করেছে। তাহলে সে তাদের অবস্থান স্থলের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয় না কেন?

          সে যেখানে থাকে সেখানে, তার আশ-পাশে রয়েছে সিনেমা হল, টিভি, বেহায়া, বেপর্দা-বেশরা, বেদ্বীনি-বদ্দ্বীনি ইত্যাদি, আরামবাগের আস্তানা গুড়িয়ে দেয়ার মত ঐসমস্ত চরম অনৈসলামিক অনৈতিক কাজের ক্ষেত্রে তার মুজাহিদ বাহিনী বীরদর্পে নাঙ্গা তলোয়ার নিয়ে ঝাপিয়ে পড়েনা কেন?

          প্রথম ক্ষেত্রে যদি তাকওয়া অবলম্বনের জন্য অন্যায় প্রতিরোধের হাদীস তাদেরকে উদ্দীপিত করে থাকে তাহলে এসব ক্ষেত্রে কেন তা আলোড়ন জাগায়না? এসব ক্ষেত্রে কি তাহলে তারা তাদের বক্তব্য অনুযায়ী বোবা শয়তানরূপে সাব্যস্ত হয়না? সুতরাং এসব শয়তানদের পক্ষেই সন্ত্রাসী তৎপরতা চালানো, তস্করের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া সহজ এবং সম্ভব বৈকি!

মুহম্মদ তাজুল ইসলাম, সিলেট।

রাজারবাগ শরীফের আক্বীদা নিয়া অপবাদ

উদাহরণটা চালুনী এবং সূঁইয়ের ন্যায় হইলেও চলিত। বাঙ্গালী সংস্কৃতি চালুনীর সহিত পরিচিত। চালুনীর অসংখ্য ছিদ্রের কথা সকলেই অবগত। পক্ষান্তরে সুঁইও তাহার পিছনভাগে একটি ছিদ্রের অধিকারী, তবে তা ব্যবহার্য কারণেই। কিন্তু ঐ এক ছিদ্রের প্রতিই চালুনির যত দৃষ্টিপাত, যত ব্যাঙ্গোক্তি। বিদ্রুপের সূরে সম্বোধন, “সুঁই তোর পিছনভাগে একটি ছিদ্র।”

সমাজেও এ ধরণের ছিদ্রাণে¦ষী লোকের সংখ্যা অপ্রতুল নয়। যাহারা নিজেরা হাজারো দোষে দুষ্ট থাকার পরও পরের ছিদ্রান্বেষণ করে আর উহাই নাকি উহাদের প্রবৃত্তি। এই প্রবৃত্তি অবশেষে উহাদিগকে পরিচালিত করে আরো গর্হীত কাজে। গীবত হইতে উহারা প্রবৃত্ত হয় মিথ্যা তোহমত লেপনে। আর উহাদের এ অপবাদ লেপনের প্রক্রিয়াটিও বেশ কুট কৌশল প্রণোদিত।

          সুঁইয়ের ন্যায় একটি ছিদ্রও যাহাদের ক্ষেত্রে অনুবীক্ষণ যন্ত্রের আতশী গ্লাসের দর্শন প্রক্রিয়ায় ধরা পড়েনা তাহাদেরকেও আর দশটা ভেজাল মালের বিজ্ঞাপনের সাথে এক ফাঁকে অর্ন্তভূক্ত করে অন্য ভেজাল মালের সাথে ভেজাল বলিয়া চালানোর অভিনব প্রতারণা। তথাকথিত আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের একটি বিচ্ছিন্ন দল গত সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জে এক সভায় এই কাজটিই করিয়াছে, সেইখানে যাহারা উপস্থিত হইয়াছিল প্রত্যেকেরই আক্বীদার মধ্যে রহিয়াছে মারাত্মক কুফরী, আমলের মধ্যে রহিয়াছে বেপর্দা হওয়া, খেয়ানত, ছবি তোলাসহ হাজারো হারাম কাজের গলতি।

          পক্ষান্তরে রাজারবাগ শরীফের আমল আক্বীদায় তাহারা আজ পর্যন্ত দলীল ভিত্তিক কোন গলত খুঁজিয়া বাহির করিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হইয়াছে। বিফল মনোরথ হইয়া অবশেষে তাই তাহারা যাহা করিল তাহা নিকৃষ্ট প্রতারণা। চরমোনাই, ওহাবী, কাদিয়ানী, দেওয়ানবাগী, ছয় উছুল ভিত্তিক প্রচলিত তাবলীদি ইত্যাদির সহিত এক ফাঁকে তাহারা রাজারবাগ শরীফের নামটাও ঢুকাইয়া অসৎ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করণের আত্মতৃপ্তির ঢেকুর তুলিয়াছে। কিন্তু এই ঢেকুরের স্বাদ যে ঢেকুর তোলাকালীন স্বল্প সময়ের মতই ক্ষণস্থায়ী।

গাউসুল আযম, সাইয়্যিদুল আওলিয়া হযরত বড় পীর সাহেব (রঃ) বলিয়াছেন, ‘আহার্য বস্তুর স্বাদ জিহবার আগা হইতে মধ্যভাগ পর্যন্ত।’ অতঃপর গলাধঃকরণ এবং সবশেষ। এক্ষণে সেইটা যদি হয় হারাম মাল, তবে তাহার জ্বালা-যন্ত্রণা সীমাহীন। আর ঠিক সেই সীমাহীন জ্বালা-যন্ত্রণাই নিজেদের জন্য সৃষ্টি করিয়াছে তথাকথিত আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের বিচ্ছিন্নতাবাদী জলীল গ্রুপ। রাজারবাগ শরীফের আক্বীদা খারাপ বলার পেছনে তাহার কোন দলীল আজও পর্যন্ত সে পেশ করিতে পারে নাই। অথচ আল্লাহ্ পাক বলেন, “তোমরা যদি সত্যবাদী হইয়া থাক তবে তোমরা দলীল পেশ করো।”

          কাজেই জলীল গ্রুপ যদি সত্যবাদী হইতো তবে তাহারা রাজারবাগ শরীফের পক্ষ হইতে প্রকাশ্য বাহাসের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করিয়া সত্য প্রকাশে সক্ষম হইতে পারিতো। কিন্তু তাহাদের সেই অক্ষমতাই প্রমাণ করে যে তাহারা না হক্ব, মিথ্যাবাদী। আর মিথ্যাবাদীর প্রতি মহান আল্লাহ্ পাক-এর লা’নত।

মুহম্মদ আব্দুল হাফিজ খাঁন,

ইংরেজী (সম্মান), জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

“নব্য মুশাব্বিহা ফিরক্বার স্বরূপ উন্মোচন” সুন্নীবার্তা না কুফরীবার্তা?

মৌলবাদী নাম ধারণই কেবল নয়, ধর্মের নামে চরম অধর্ম আর মসজিদে বর্বরোচিত হামলা করিয়া উহারা যথাযথই নিজেদের মৌলবাদীরূপে প্রতীয়মান করিয়াছে

মাহিউদ্দীনের দেয়া মদনপাল আর প্রিন্সিপালের উপমা কাফিরদেরই উপমার মত ওরা আল্লাহ্ পাক-এর রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উম্মত নয়, আশরাফ আলী থানভীর উম্মত হতে চায়

এ বৎসরের শুরুতে ভারতের কাশ্মীরে মসজিদগুলোতে ব্যক্তিগত ও গোপন তথ্য চেয়ে ফর্ম বিলি পাশাপাশি মুসলিম শিক্ষার্থী বেশি হওয়ায় কাশ্মীরে মেডিকেল কলেজ বন্ধ। ভারতে কাশ্মীরি শিক্ষার্থীদের নির্যাতনের অভিযোগ নতুন নয়। ভারতে কাশ্মিরী শিক্ষার্থীদের উপর নির্যাতনের খবর বিচ্ছিন্ন নয়। অব্যাহত এবং ভয়াবহ কাশ্মীরে স্কুলে বাধ্যতামূলক ‘বন্দে মাতারাম’- চাপানো হচ্ছে হিন্দুত্ববাদ কাশ্মীরি ছাত্রদের বিরুদ্ধে মামলার ঘটনায় জঙ্গিদের হুমকি ভারতে কাশ্মীরি ছাত্রকে মেয়েদের পোশাক পরিয়ে অমানবিক নির্যাতন

মতামত ইরান ফিলিস্তিনে ইসরাইলী হামলার জন্য বিশেষভাবে দায়ী সালাফী-লা মাযহাবী ওহাবী মালানারা কারণ তারাই সৌদি ইহুদী শাসকদের প্রশংসা করে, পৃষ্ঠপোষকতা করে তাদের দোষ-ত্রুটি এবং মুসলমান বিদ্বেষী ও ইসলাম বিরোধী কাজ চুপিয়ে রাখে বাংলাদেশসহ অন্যান্য মুসলিম দেশে তাদের কুফরী আক্বীদা প্রচার করে অথচ সৌদি তথা আরব শাসকরাই ট্রাম্পকে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার সহায়তা দিচ্ছে। আর তা দিয়েই ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলারের ঋণী দেশ- আমেরিকা নিজে বাঁচে কুখ্যাত ট্রাম্প মুসলমানদের শহীদ করার অস্ত্র নিজে বানায় আর ইসরাইলকেও দেয় বিশ্ব মুসলমানের তাই শুধু কুখ্যাত ট্রাম্প আর নিয়াহুর বিদ্বেষী হলেই হবে না পাশাপাশি সৌদি তথা আরবের ইহুদী শাসক সহ সালাফী লা মাযহাবী, ওহাবী মালানাদেরও মূলোৎপাটন করতে হবে ইনশাআল্লাহ!