ঈমান, আমল ও ইখলাসে সুন্নাতের তাৎপর্য

সংখ্যা: ০২তম সংখ্যা | বিভাগ:

-মুহম্মদ সাদী হোসাইন

নাহমাদুহু ওয়ানুসাল্লী আলা রাসুলিহীল কারীম। ইসলাম বিশ্বমানবের জন্যে মহান আল্লাহ পাক উনার মনোনীত এক দ্বীনি ব্যবস্থা, সমুদয় সৃষ্টির উপলক্ষ, আমাদের শাফায়াতের ভরসাস্থল, আল্লাহর প্রিয় হাবীব নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মাধ্যমে ইসলাম পূর্নাঙ্গ ও চুড়ান্তুরূপে আমাদের কাছে এসেছে। আমাদের বিশ্বাস ও বিবেক-বুদ্ধির (প্রেক্ষাপটে জানা ও মানার ক্ষেত্রে ইসলামের তাৎপর্য ও ব্যাখ্যা ব্যক্তি বিশেষে বিভিন্ন হয়ে থাকে। মুক্ত বুদ্ধির বিকাশ ও সুন্নাতের সাথে সামঞ্জস্যহীন ইলম এবং দার্শনিক প্রজ্ঞার ইলামের যে বিশ্লেষন কেউ কেউ করে থাকে তা দেশ কালের গন্ডী পেরিয়ে অনেক সময় সার্বজনীন হয়ে ওঠে। কোন কোন সময় তা “সেক্যুলারিজম” অথবা বিশ্বপ্রেমিকবাদ রূপ লাভ করে। প্রকৃত হিদায়েতহীন মানুষের এই মন-মনন চলে আসছে ইসলাম আবির্ভাবের পর থেকেই। এর বর্তমান অবস্থা তুঙ্গে এ কারণেই তথাকথিত বুদ্ধিজীবি এবং জ্ঞানীমহলে ইসলাম অন্যান্য ধর্মের মতোই অথবা অপেক্ষাকৃত কিছুটা অর্থবহ একটা ধর্ম হিসেবে বিবেচিত। আলেম ব্যক্তির অনুশীলন যেহেতু মানুষের মধ্যে  প্রত্যক্ষ ক্রিয়া করে সেহেতু ইসলামকে মানুষ তাদের (মন্দ আলেম) ধ্যান ধারণা ও আমলের প্রক্রিয়াতেই, ভাবতে শুরু করেছে। এভাবেই নবী (নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আদর্শ বিবর্জিত উপায়ে ইসলামকে সঠিক তাৎপর্য থেকে দুরে সরিয়ে ইচ্ছেমতো অন্যান্য বাতিল মতবাদ ও ধর্মের সাথে প্রতিযোগিতায় নামানো হয়েছে। এই প্রতিযোগীতামুলক চেতানার মূল দু’টি কারনের মধ্যে একটি অজ্ঞতা (সহি সমঝের অভাব) এবং অন্যটি অর্জিত এলেম অনুযায়ী কর্তব্য পালনে অনিহা। যার চূড়ান্ত পরিনতি গোমরাহী। দ্বীন ইসলাম ও ঈমান দু’টি পরিপূরক শব্দ ও বিষয়। ইসলাম মেনে নেয়ার নাম এবং নিজে সঠিকভাবে মানার ও অন্যকে মানাবার নাম। এই মানা যেমন অন্তুরের তেমনি উচ্চারনের এবং পরিশেষে বাস্তব অনুশীলনের। অন্তুর থেকেই বাইরের অনূশীলন প্রেরণা লাভ করে। তাই তাসদীক (অন্তুরের গোপন সত্যায়ন) এবং আকল যে (যে বিবেক ও অনুভুতি ঐকান্তিুক বিশ্বাস থেকে বিচ্যূত হতে দেয় না) এর উপর মানুষের আমল নির্ভরশীল। অনভুতি ও উপলব্ধি যার যতো নির্মল তার কর্মকাণ্ড ও (আমল) ততো অনাবিল। এই মর্মেই ইসলামে  দাখিলের প্রকৃত অর্থ “আনুগত্যতাসহ আত্মসমর্পন পরিপূর্ণ ও স্বার্থক হয়। পাক কুরআন উনার মধ্যে বিষয়টি এভাবে আমাদেরকে জানিয়ে দিয়েছেন”।        

“আরববাসীরা বলে, আমরা ঈমান এনেছি। আপনি বলে দিন, তোমরা ঈমান আনোনি। বরং বল, আমরা ইসলাম গ্রহন করেছি।” এই পবিত্র আয়াত শরীফ থেকে বুঝা যায় যে, ঈমান অর্থ আন্তুরিক স্বীকৃতি এবং ইসলাম অর্থ স্বীকৃতি অনুযায়ী বাহ্যিক আচরন অন্তুরের যোগ না থাকায় বাহ্যিক আমল মানুষকে প্রকৃত মুমিন করেনা। ঈমান এনে মুমিন হলে মানুষের উপর পবিত্র কুরআন শরীফ উনার বিধান এবং মহান আল্লাহ পাক উনার প্রিয় হাবীব নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মুবারক জীবনাদর্শ (সুন্নাহ) পূর্ণাঙ্গভাবে পালনের প্রয়াস ও প্রচেষ্টা চালানো দায়িত্ব অর্পিত হয়। তখন মুমিনসুলভ আচরন ছাড়া তার ব্যক্তি স্বাধীনতা ও সুবিধাবাদ ইসলাম ছিনিয়ে নেয়। অবশেষে বিবেক অর্জিত এলেম ও ইসলাহ ভিত্তিক নির্মল কর্ম সম্পাদন (আমলে ছালেহ) অনুযায়ী সে মানুষ “ওয়ারাসাতুল আম্বিয়া” হয়ে যায়। ওয়ারাসাতুর আম্বিয়া (ওলী আল্লাহ) সম্পর্কে মহান আল্লাহ পাক বিশ্ববাসীকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন- “সাবধান মহান আল্লাহ তায়ালা উনার ওলীগন উনাদের কোন ভয় নেই এবং উনারা চিন্তিুত নন।” কারণ মহান আল্লাহ পাক উনার সন্তুষ্টিলাভের পর বেদনাক্লিষ্ট হবার বিষয় উনাদের কাছে অবান্তুর হয়ে পড়ে। ঈমান এনে মুসলমান হবার জন্যে শুধু মহান আল্লাহ পাক উনার তাওহীদ বিশ্বাস করলেই চলেনা। মহান আল্লাহ পাক উনার প্রিয় হাবীব নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং উনার রিসালতের উপরও বিশ্বাস স্থাপন করতে হয়। মহান আল্লাহ পাক তিনি বলেনঃ “তোমরা যদি মহান আল্লাহ পাক উনার সাথ মধুর সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাও তবে আমার হাবীব নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার অনুসরণ কর। মহান আল্লাহ পাক তোমাদেরকে ভালোবাসবেন”। একান্তু ভাবে মহান আল্লাহ পাক উনার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করলেই উনার প্রেরীত রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার উপর বিশ্বাস স্থাপন হয়ে যাবার কথা ছিল। কিন্তু মহান আল্লাহ পাক জানেন শর্তারোপ ছাড়া মানুষ তাগুতি শক্তির প্রভাবে তাদের সম্প্রদায়ের আরেকজন মানুষকে (ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব এবং রসূল হিসেবে মেনে নেবে না। তাই মানুষকে প্রকৃত তাওহীদবাদী হবার জন্যে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার রিসালতের উপর পরিপুর্ণ বিশ্বাস স্থাপন এবং উনাকে অনুসরণ অপরিহার্য শর্ত অরোপ করা হয়েছে এই বিশ্বাস ও অনুসরণে ইফরাত ও তাফরিত (বাড়তি কমতি) না করার পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে কঠিন নিষেধাজ্ঞা জারী করা হয়েছে। একথা ঠিক যে, আমরা সব মুসলমানই নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং উনার রিসালতের উপর ঈমান এনেছি কিন্তু ভাববার বিষয় এই যে, এলেম অর্জিত হওয়ার পরও (যাদের এলম নেই তাদের পক্ষেত সঠিক অনুসরনের প্রশ্নই উঠে না) ইসলাম পালনে আমাদের জীবনাচারন ও আমলের সকল ক্ষেত্রে সুন্নত কিভাবে এবং কতটুকু পালন করছি। তাওহীদে বিশ্বাস স্থাপনে প্রাথমিক পর্যায়ে মানুষকে জানিয়ে দেওয়ার জন্যে মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে এভাবে ওহী পাঠিয়েছেন- “মহান আল্লাহ পাক উনাকে ভয় করে চলো এবং আমার (নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মানবাত্বা, গোমরাহী ও অবিশ্বাসের অন্ধকারে পংকিলতায় নিমজ্জিত মানসিকতা এবং অংশিবাদী দাসত্ব মোচনের জন্যে প্রেরীত নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মুবারক জীবনের সাথে সংশ্লিষ্ট সকল কর্মই আমাদের জন্য সুন্নত। ইবাদতের গুরুত্ব হিসাবে এ বিষয়ে কর্মগুলির কোনটি আমাদের জন্য ফরয, কোনটি ওয়াজিব, কোনটি সুন্নতে মুয়াক্কাদা অথবা কোনটি সুন্নাতে যায়েদা। নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার কোন কাজই অভ্যাসগত নয়-একান্তুই ওহীর বাণীর নিয়ন্ত্রনাধীনে নেক আমলের অন্তুর্গত, যা আমাদের জন্য মহান আল্লাহ পাক উনার রাহে ইবাদত হিসাবে গন্য। আমরা যখন সুন্নাত পালন করি তখন অবশ্যই তা আমলে রূপ লাভ করে। আর গুরুত্ব অনুধাবনের পরই সুন্নাত আমলে আনা সম্ভব হয়। বাহাদুরতো সেই ব্যক্তি যে সুন্নাত অনুসরণের মাধ্যমে আল্লাহ পাকের বিধান পালনের জন্যে ইবাদতে নিমগ্ন হয়ে পড়ে। কারন সকল নিয়ামতের উৎস ভান্ডার হিসেবে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রেরীত হয়েছেন। রিসালতে পূর্ন বিশ্বাস বির্বজিত এবং সুন্নাত পরিপন্থী সারা জীবনের আমল ও মানুষকে জাহান্নামী করে দেবে।

মহান আল্লাহ পাক তিনি বলেন- “প্রত্যেক ব্যক্তি আপন নিয়ত ও উদ্দেশ্য মতেই কাজ করে থাকে এবং কে সোজা পথে আছে তা মহান আল্লাহ পাক তিনিই উত্তমরূপে অবগত আছেন।” মহান আল্লাহ পাক উনার মত এবং উনার রসূল নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সঠিক ইত্তেবা সম্ভবপর হয়ে উঠে। কেবলমাত্র ইসলামের কোন কাজ করে ফেলার মধ্যেই সফলতা ও স্বার্থকতা নেই। আমল পরিপূর্নতা ও স্বার্থকতা তখনই লাভ করে যখন তা ইসলামের শরীয়ত প্রনেতা এবং আসামানী ওহী তত্ত্বাবধানে আমলের প্রকৃত ও পদ্ধতি নির্দ্ধারক নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সুন্নাহর সাথে সংশ্লিষ্ট হয়ে যায়। উনার সমগ্র রসূল জীবনের আদর্শ, জীবনে প্রতিফলন ঘটানো প্রচেষ্টায় নিবেদিত ও নিয়োজিত থেকে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের প্রয়াস পাওয়াই মুমিনের মুল কর্তব্য। এই কর্তব্য পালনে যেমন আসবে আমাদের  প্রাত্যহিক জীবনাচরন, চিন্তুা-চেতন। তেমনি আসবে পরিবেশ প্রতিবেশ, পরিবার, সমাজ, দেশ, রাষ্ট্র, অর্থনিতি, সমরনীতি, রাজনীতি তথা নিখিল বিশ্ব। এই সব বিষয়গুলো কোন না কোন ভাবে আমাদের সাথে সংশ্লিষ্ট। জীবন জগতের সকল বিষয় ইবাদতমুখী মনযোগ আনতে না পারলে মাহন আল্লাহ পাক তিনি নারাজ হয়ে যান। পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র হাদীছ শরীফ ও দ্বীন ইসলাম উনার ব্যাপকতা বুঝাতে গিয়ে আমরা এই ব্যাপারটিকে সাহেবী কায়দায় “কমপ্লিট কোড অব লাইফ” বলে থাকি। নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার এই ব্যক্তিত্ব বিশ্বব্যাপী। মহান আল্লাহ পাক তাই বলেছেনঃ আমি আপনার আলোচনাকে সমুন্নত করেছি। ইবাদত বন্দেগীর মুল লক্ষ্য হ’ল মহান আল্লাহ পাক উনার সন্তুষ্টি অর্জন। একজন মুমিনের কলেমা, সালাত, সালাম, সিয়াম, হজ, যাকাত, যুদ্ধ-জিহাদসহ জীবন যাপনের সকল বিষয় কর্মই ইবাদতের সাথে সম্পৃক্ত। ইবাদত পালনে মহান আল্লাহ পাক উনার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সুন্নতের অনুসরণ পরিহার্য সাব্যস্ত হওয়ায় নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার জীবনাদর্শ অবহিত হওয়া আমাদের অবশ্য কর্তব্য হিসেবে ধার্য হয়েছে জ্ঞানার্জনকে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ফরয বলা হয়েছে। সুন্নাত অনুসরনের জন্যে তিনটি বিষয় মুখ্য ভুমিকা পালন করে থাকে। সুন্নাত সম্পর্কে জ্ঞান, সুন্নাতের প্রতি মহব্বত ও সুন্নাতের আমল। নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- “ইলম আমলের অবিভাবক”। অবশ্য ইলম কেবলমাত্র কিছু তথ্য ও তত্ত্ব অবহিত হওয়ার নাম নয়। তবে তথ্য ও তত্ত্ব অবগত হওয়া যে ইলমের প্রথম সোপন একথা সর্বজন স্বীকৃত। মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ করেছেন- “একমাত্র আলেমরাই মহান আল্লাহ পাক উনাকে ভয় করে থাকে”। প্রতিনিয়ত মহান আল্লাহ পাক ও উনার রসূল নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে জানার অদম্য আগ্রহ এবং আকাংখা সৃষ্টি করে মানুষকে আমলে নিযুক্ত করে তোলাই ইলমের মূল কাজ। কর্ম বিমুখলুব্ধ তথ্যের ভান্ডার যত সমৃদ্ধই হোক না কেন ইলম হিসেবে বিবেচিত হয় না। তাই আত্মনিবেদনের আরেক নাম ইলম। এই ইলমের শেষ নেই। যেহেতু আত্মনিবেদনের গভীরতার ও প্রান্তু সীমা নেই। বর্ণিত আছে যে, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- “পুর্বাপেক্ষা অধিক ইলম যেদিন আমার অর্জিত না হয় (মহান আল্লাহ পাক উনার সম্পর্কে যেদিন হৃদয়ে সুক্ষ অনুভুতির উন্মেষ না ঘটে) সেদিন যেনো মহান আল্লাহ পাক আমাকে কোন বরকত প্রদান না করেন” জ্ঞান অন্বেষায় অনুক্ষণ ব্যাপৃত থাকার জন্যে মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে  ওহী করেছেনঃ “আপনি বলুন, হে মহান আল্লাহ পাক উত্তরোত্তর আমার প্রজ্ঞার উন্মেষ ঘটাতে থাকুন”। নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো ইরশাদ করেছেন- “হে মহান আল্লাহ পাক আপনার ব্যাপারে আমার বিস্ময়কে আরো বৃদ্ধি করুন”। ইবাদত বন্দেগীতে নিমগ্ন হয়ে মহান আল্লাহ পাক উনার মুহব্বত ও মারিফাত হাছিলের জন্যে মহান আল্লাহ পাক এবং উনার রসূল নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে অধিকতর বিস্ময় সৃষ্টি হওয়াকেই প্রকৃত জ্ঞান বলে। আমলের জন্যে মুহব্বতের প্রাথমিক সম্পর্ক ইলমের সাথেই সম্পৃক্ত। কিন্তু এটাই শেষ নয়, অন্তুরের মুহব্বত, অনুভুতি, জজবা এসব মহান আল্লাহ পাক উনার দেয়া নিয়মত। হৃদয়ের স্বতঃ উৎসারিত ভক্তি- ভালোবাসা, মায়া-মমতা,আবেগ- অনুভতি, আগ্রহ-আকুতি থেকে মুহব্বত জন্ম লাভ করে। কোন ব্যক্তি বা বিষয়ের প্রতি মানুষের এ মুহব্বত সকল ক্ষেত্রেই জ্ঞানাশ্রায়ী না হলেও চলে। মনের ইচ্ছা ও আকর্ষণকে সঠিক পথে (শরীয়ত) পরিচালিত করার জন্যে জ্ঞান (ইলম) অবিভাবকের ভুমিকা পালন করে থাকে। ভক্তি ও প্রভা মিলে মিশে মানুষের মনে বিনয় (ইখলাছ) এনে দেয়। বন্দেগী পালনে বিনয়ের সাথে সুন্নতের সংযোগ ঘটালে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ইত্তেবা করা হয়। এমন ইত্তেবারত মানুষ মহান আল্লাহ পাক উনার প্রিয় হয়ে যায় এবং উনার সন্তুষ্টি লাভে ধন্য হয়। পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে মহান আল্লাহ পাক মানুষকে নির্দেশ করেছেন- মহান আল্লাহ পাক উনার হুকুম পালন কর এবং উনার রসূল নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার অনুসরণ কর”। অনুভুতি ও ইলেমসহ সম্পাদিত আমল সুন্নাতের সাথে সম্পর্কিত না হলে ইলমসহ আলেম ব্যক্তি বিভ্রান্তু ও বাতিল বলে গন্য হয়। নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার হাকিকী দিক উপলব্ধির অভাবে আমরা উনাকে আলাদা আলাদাভাবে দেখি অথচ উনার মুবারক জীবনের সকল কর্মকাণ্ড একই সুত্রে গ্রোথিত। এ ব্যাপারে একটি হাদীছ শরীফ এখানে দৃষ্টান্তুযোগ্যঃ নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একদিন কতিপয় ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুগণ উনাদেরকে হাদীছ শরীফ লিপিবদ্ধ করে রাখার জন্যে নির্দেশ দিলেন। একজন ছাহাবী আরজ করলেন, ইয়া রসূল আল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমরা আপনার কোন বাণী লিপিবদ্ধ করব? খুশি থাকা অবস্থায় না গোস্বা হওয়া অবস্থায় আপনার মুখ নিঃসৃত বাণী?” তিনি জবাব দিলেন, উভয় অবস্থায়ই আমি নবী”।

মহান আল্লাহ পাক উনাকে ইলাহ হিসাবে মেনে নেয়া মানুষের স্বাভাবগত প্রবৃত্তি। মহান আল্লাহ পাক উনাকে উপলব্ধি করার উপকরন মানুষের অন্তুরে রোজ আজলেই অংকিত করে দেয়া হয়েছে। পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে- “যখন আপনার প্রতিপালক আদম সন্তুানদের পৃষ্ঠদেশ থেকে তাদের ব্যাপারে এই মর্মে স্বীকারোক্তি করালেন যে, আমি কি তোমাদের প্রতিপালক নই? তারা স্বীকার করলোঃ হাঁ”। এ স্বীকারোক্তির কারণে মানুষের অন্তুরে তাওহীদ ও রিসালত পরিপন্থী চিন্তুার লালন ও আসমানী বিধান বহির্ভুত কর্ম সম্পাদনের কথা ছিলেনা কিন্তু সকল মানুষই কম-বেশী শয়তানী ওয়াসওয়াসার শিকারে আক্রান্তু হয়। সৃষ্টি লগ্নে মহান আল্লাহ পাক উনাকে প্রদত্ত- ওয়াদা ভুলে যায়। প্রতিপালক মহান আল্লাহ পাক উনার দাসত্ব করার আন্তুরিক স্বীকারোক্তি সত্বেও নফসানিয়তের মুকাবিলায় তার সুকুমার প্রবৃত্তি পরাস্ত হয়। মানুষ নেক কাজে ব্যাপৃত থাকবে- এটা তার নফসের (প্রবৃত্তি) খেলাফ। অত্যল্প বিবেক ও জ্ঞানে প্রবৃত্তি জয়ের মাধ্যমে মহান আল্লাহ পাক উনাকে চিনে ফেলে প্রকৃত মুমিন হয়ে উঠা মানুষের পক্ষে সম্ভব ছিলোনা তাই মুমিনে কামিল হবার জন্যে ইবাদত বন্দেগী পালনসহ জীবনের সকল পর্যায়েই সাইয়্যেদুল বাশার নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার আবেহায়াতের কাছে ফিরে যাবার জন্যে মহান আল্লাহ পাক মানুষকে নির্দেশ দিয়েছেন। মহান আল্লাহ পাক মানুষকে জানিয়ে দিয়েছেনঃ- “নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি তোমাদেরকে যা দিয়েছেন তা অবলম্বন কর এবং যা থেকে তিনি বারন করেছেন তা বর্জন কর।” অন্যত্র মহান আল্লাহ পাক ঘোষণা করেছেন- “যে সব লোক নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিরোধিতা করে তাদের ভীত-সন্ত্রস্ত থাকা আবশ্যক যে, তাদের উপর কোন বিপদ অথবা কোন যন্ত্রনাদায়ক শাস্তি এসে পড়ে কিনা”। আলোচনার গোড়াতে সঠিক ইসলাম উপলব্ধির সংকটের কথা বলা হয়েছে। ওহীর বাণীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রন বিহীন এবং সুন্নতের সাথে সংগতিহীন ইলম ও আমল ব্যক্তি থেকে ব্যাষ্টিতে পরিব্যপ্ত হয়ে ইসলামী হুকমতে প্রতিষ্ঠার অপপ্রয়াস পর্যন্তু বিস্তার লাভ করেছে। আর এটাইতো স্বাভাবিক যে, মানুষ তার অনুভব ও উপলব্ধি অনুযায়ী বিষয় কর্মে নিযুক্ত হবে। এমন কর্মনিযুক্তি স্বেচ্ছাচারিতা ও মহান আল্লাহ পাক উনার বিরোধীতার নামান্তুর। মহান আল্লাহ পাক উনার নিকট ইসলামই একমাত্র মনোনীত ধর্ম। এ ধর্ম জগত-সংসারে টিকে থাকর জন্যে আসছে-বিলুপ্ত বা নিশ্চিহৃ হয়ে যাবার জন্যে নয়। একথাতো অবশ্যই সত্য যে, ইসলামী হুকুমাত কায়েমের প্রচেষ্টা করা মুসলমানের অপরিহার্য কর্তব্য (ফরজে কিফায়া)। এ দায়িত্ব পালনের জন্যে মানুষকে প্রকৃত মুমিন (ওয়ারাসাতুল আম্বিয়া) হতে হয়। ওয়ারাসাতুল আম্বিয়াগণ উনাদেরকেই মহান আল্লাহ পাক খিলাফত দানের ওয়াদা করেছেন- “তোমাদের মধ্যে যারা মুমিন ও নিস্কলুষ আমলকারী (গায়রুল্লাহ বিবর্জিত আমলে ছলেহ) তাদেরকে দুনিয়ার খিলাফত দানের জন্য মহান আল্লাহ পাক ওয়াদা করেছেন।” এখানে খিলাফত দানের অর্থ ইসলামী হুকুমাত প্রতিষ্ঠা এবং তা নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার রীতি এবং নীতি অনুযায়ী পরিচালনা করার দায়িত্ব ও কর্তব্য পর্যন্তু সম্প্রসারিত।

খিলাফত কায়িমে মহান আল্লাহ পাক উনার বিরোধী তাগুতকে অস্বীকার ও উৎখাত করতে হয়। যেমন মহান আল্লাহ পাক বলেছেন- “মহান আল্লাহ পাক উনার দাসত্ব কর এবং তাগুতকে পরিত্যাগ কর।” পরিবার, সমাজ, দেশ ও দশের তাগুত দূর করে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার প্রক্রিয়ায় মহান আল্লাহ পাক উনার বিধান কায়েমের লক্ষ্যে মানুষকে আগে তার ব্যক্তিগত তাগুত থেকে পরিত্রান লাভ করতে হয়। এর জন্যে প্রয়োজন ইসলাহে নফস (অন্তুরের পরিশুদ্ধি)। মহান আল্লাহ পাক বলেন- “মুশরিকরা নাপাক।” এ পবিত্র আয়াত শরীফে তাওহীদে অবিশ্বাস ও অন্তুরে গায়রুল্লাহর আবাদজনিত অপবিত্রতার বিজয় বুজানো হয়েছে। অবিশ্বাস ও অনীহাসহ বিরোধীতা কলুষযুক্ত অন্তুর থেকে উদ্ভব হয়। অনুভূতি ও উপলব্ধির দৈন্যতা মানুষকে তার সময়ের কারাগারে (অজ্ঞতাপূর্ণ স্বেচ্চারিতা) বন্দী রেখে গোমরাহ করে দেয়। কাজেই নাপাকী দূর করে হৃদয়কে সুস্থ্য ও প্রশান্তুময় (ক্বালবীন সালীম) করা প্রত্যেক মানুষের জন্য ফরয। মানুষের হৃদয়ে পবিত্রতা আনয়নকারী নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাবুক যুদ্ধ থেকে ফেরার পথে বলেছেন- “ছোট যুদ্ধ থেকে বড় যুদ্ধের (নফসের সাথো যুদ্ধ) দিকে প্রত্যাবর্তন করছি।” ফাসিক ব্যক্তি দ্বারা তাগুত উৎখাত করার আশা কেবল দুরাশা মাত্র। এ দুরূহ কাজটির বাস্তবায়ন কেবল মাত্র আল্লাহর ওলীগণের (ইবাদত-বন্দেগীসহ জীবনচারণের সকল ক্ষেত্রে সুন্নতের পূর্ণ অনুসারীগণ) দ্বারাই সম্ভব। দুনিয়া আসক্ত মন্দ আলেম ও তাদের অনুসারীদের পক্ষে আদৌ সম্ভব  নয়। এর স্বাক্ষ্য বিধৃত হয়েছে ইতিহাসের পাতায় পাতায়। “দুনিয়ারদার আলেম সবচেয়ে মন্দ ব্যক্তি”-হাদীছ শরীফ।

পবিত্র কালামে পাক উনার সর্বশেষ পবিত্র আয়াত শরীফ উনার মধ্যে মহান আল্লাহ পাক ঘোষণা করেছেন- “আজ আমি তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম এবং আমি তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামতকে পরিপূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম।” মহান আল্লাহ পাক উনার ইচ্ছায় ক্বিয়ামত পর্যন্তু পৃথিবীতে ইসলাম কায়েম থাকবে। এর জন্যে মহান আল্লাহ পাক প্রয়োজনমতো ফাসেক-ফুজ্জার, বেদ্বীনসহ যে কোন মানুষের খিদমত নিয়ে থাকেন। লক্ষ্য করার বিষয় এই যে, ইসলাম পালন ও প্রতিষ্ঠায় মানুষের খিদমতের আঞ্জামটুকু মহান আল্লাহ পাক উনার সন্তুষ্টি লাভের নেক নিয়তে এবং নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সুন্নতের অনুসরণে হলো কিনা। অন্যথায় মানুষের সম্পাদিত আমল ও কাজে ইসলাম ও সমাজ ব্যবস্থায় উপকার সাধিত হলেও অজ্ঞতা, পথভ্রষ্টতা ও ইসলামবিহীন আমলের কারণে মহান আল্লাহ পাক উনার কোপানলে পড়ে মানুষ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে যাবে।

নিদারুন পরিতাপের বিষয় এই যে, সংখ্যাগরিষ্ঠ নিকৃষ্ট দুনিয়াদার আলেম ও তাদের দোসর ব্যক্তিরা অজ্ঞতা ও সুবিধালাভের মোহে পবিত্র আল কুরআন শরীফ উনার বাণী এবং বাণীর ব্যাখ্যাদাতা ও বাস্তব রূপকার নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সুন্নাহ বিবর্জিত পন্থায় মহান আল্লাহ পাক উনার মনোনীত দ্বীন ইসলামের ভুল ও বিকৃত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষনে ব্যাপৃত থেকে নিজেদেরকে ধন্য মনে করছে। এতে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে মানুষের ঈমান, আমল আকিদা ও ইসলামের শাশ্বতরূপ। এসব থেকে পরিত্রানের জন্যে আমরা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন উনার কাছে পানাহ ও মদদ চাই।

তাসাউফ: প্রসঙ্গ: ইখলাছ ও আউলিায়ে কিরমাগণ

আসন্ন সাইয়্যিদু সাইয়্যিদিল আ’দাদ শরীফ পবিত্র ১২ই শরীফ উপলক্ষ্যে বিশ্বের সকল সরকারের দায়িত্ব ও কর্তব্য হলো- ১২টি বিষয় পালন করা ও জারি করা

শুধুমাত্র আরবী জানলেই কুরআন শরীফ বোঝা যায়না

যামানার ইমাম ও মুজতাহিদ, মুজাদ্দিদে আ’যম, ইমামুল আইম্মাহ, কুতুবুল আলম, আওলাদে রসূল রাজারবাগ শরীফের হযরত মুর্শিদ ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলী এর বেমেছাল তাজদীদ সম্পর্কে এবং তাঁর আলোড়ন সৃষ্টিকারী ক্বওল শরীফ সম্পর্কে জানতে হলে নিয়মিত সংগ্রহ করুন দৈনিক আল ইহসান

পবিত্র ১৯ শে রমাদ্বান শরীফ বাংলা ভাষার আজাদী দিবস পালন করা কেন জরুরী