(ইসলামী বিশ্বকোষ থেকে হুবহ উদ্বৃত)
অতঃপর জানা গেল যে, শিখ সৈন্যগণ বালাকোট আক্রমণ করিতে পারে। ফলে তিনি ভূগাড়মুঙ্গের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করিয়া নিজে বালাকোট চলিয়া আসিলেন। সেই সময়ে শের সিং-এর শিবির কুনহার নদীর পূর্ব তীরে অবস্থিত শোহাল নাজাফ খান গ্রামের সম্মুখে ময়দান নামক স্থানে স্থাপিত ছিল। শিখ বাহিনীর জন্য বালাকোটে মুসলিম বাহিনীর উপর আক্রমণ চালাইবার বাহ্যত দুইটি পথ ছিল। প্রথম পথ এই যে, তাহারা কুনহার নদীর পূর্ব তীর বরাবর উত্তর দিকে অগ্রসর হইবার পর নদী পার হইয়া বালাকোটে পৌঁছিত। দ্বিতীয় পথ এই যে, তাহারা ভূগাড়মুঙ্গ গিরিপথের মধ্য দিয়া বালাকোটে পৌঁছিত। বস্তুতঃ বালাকোটে পৌঁছিবার জন্য তাহাদের সম্মুখে কোনও সোজা পথ বর্তমান ছিল না।
কয়েক দিন অপেক্ষা করিবার পর শিখ শিবিরে অগ্রযাত্রার তৎপরতার চিহ্ন লক্ষ্য করা গেল। তাহারা নিকটেই নদীর উপর কাঠের পুল নির্মিত করিয়া রাখিয়াছিল। উক্ত পুলের উপর দিয়া শিখ সৈন্যগণ নদী পার হইল। অনুমিত হইল যে, তাহারা হয় ভূগাড়মুঙ্গ গিরিপথের দিকে অগ্রসর হইয়াছে অথবা ফিরিয়া যাইবার সিদ্ধান্ত করিয়াছে। প্রকৃত ঘটনা ছিল এই যে, শিখ সৈন্যগণ পার্বত্য বক্র পথ দিয়া মেট্টী কোটে পৌঁছিবার সিদ্ধান্ত করিয়াছিল। উল্লেখ্য যে, তাহাদের ঐরূপ করিবার সম্ভাবনা বাহ্যত খুবই কম ছিল। যাহা হউক শিখগণ সোহাল নাজাফ খান গ্রামের দক্ষিণ দিক দিয়া এবং সোহাল পশ্চাতে পৌঁছিয়াছিল। হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বালাকোটের কয়েকটি স্থানে প্রতিরক্ষামূলক উদ্দেশ্যে সৈন্য মোতায়েন করিয়া রাখিয়াছিলেন। যেমন তিনি বালাকোটের দক্ষিণাংশে খাড়িয়ানের কাছে এবং পূর্বদিকে পুলের কাছে সৈন্য মোতায়েন করিয়া রাখিয়াছিলেন। এইরূপে তিনি মেট্টী কোটে ও উহার পাহাড়ী রাস্তায়ও একেকটি করিয়া সামরিক চৌকি বসাইয়া রাখিয়াছিলেন। সেই দিকের সর্বাগ্রে স্থাপিত চৌকির নেতা ছিলেন মীর্যা আহমদ বেগ খান। অকস্মাৎ তাহার চৌকির দিক হইতে গুলির শব্দ শোনা গেল। জানা গেল যে, শিখ সৈন্যগণ সেই দিক দিয়া বালাকোটের দিকে অগ্রসর হইতেছে।
মীর্যা আহমদ বেগ ও তাহার বাহিনীর মুজাহিদগণ বীরত্বের সহিত শিখদের মুকাবিলা করিলেন। মুজাহিদগণ উনাদের একাংশ শাহাদাত লাভ করিলেন। এবং অবিশিষ্টাংশ পশ্চাদপসরণ করিতে বাধ্য হইলেন। মেট্টী কোটে স্থাপিত চৌকির মুজাহিদদিগকে উক্ত পথ দিয়া শিখ সৈন্যদের আক্রমণের সংবাদ জানাইয়া দেওয়া হইল। উক্ত সংবাদ বালাকোটেও পৌঁছাইয়া দেওয়া হইল। সেই স্থানে মীর্যা আহমদ বেগ খানের নেতৃত্বাধীন চৌকি স্থাপিত ছিল। বর্তমানে উহা শহীদ গলি নামে পরিচিত। উক্ত স্থানে কয়েক জন শহীদের কবরও বর্তমান রহিয়াছে। যাহা হউক, ইতিমধ্যে বিপুল সংখ্যক শিখ সৈন্য মেট্টী কোটে পৌঁছাইয়া গেল। সেইখানেও কোনরূপ কার্যকরী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হইল না।
বালাকোট অঞ্চলে একটি প্রবাদ প্রচলিত রহিয়াছেঃ “মেট্টী কোট যাহার অধিকারে আসিবে, বালাকোটও তাহারই অধিকারে আসিবে।” শিখগণ উক্ত প্রবাদবাক্য অনুসারেই মেট্টী কোট অধিকার করিয়া লইল। উহার ফলে হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার জন্য মুজাহিদদের সংখ্যা স্বল্পতা, রসদ ও সমরাস্ত্রের অপ্রতুলতা সত্ত্বেও বালাকোটের পশ্চিমাংশে অবস্থিত প্রান্তরে শিখদের বিরুদ্ধে লিপ্ত হওয়া ছাড়া গত্যন্তর রহিল না।
-মুহম্মদ নূরুল আলম, ঢাকা।
ইসলামী বিশ্বকোষের আলোকে বালাকোট যুদ্ধের ইতিহাস- (৪)