মুহম্মদ মাহবুব আলম
কোনরূপ ভূমিকার অবতারণা না করেই বলা যায় যে, জন্ডিস আমাদের পরিচিত একটি শক্ত রোগ। জন্ডিসের সাধারণ লক্ষণগুলি মধ্যে জ্বর, জ্বর জ্বর ভাব, শরীর ম্যাজ ম্যাজ করা, পাতলা পায়খানা, পেটের ডান দিকে ব্যাথা, ক্ষুধা মন্দা, বমি বমি ভাব ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। আরও গভীরভাবে নিরীক্ষণ করলে দেখা যাবে রোগীর লিভার স্বাভাবিক আকারের চেয়ে বেড়ে গেছে। হাত দিলে ব্যাখ্যা অনুভুত হয়। শিশুদের বেলায় প্লীহা বা নাকিগ্রন্থির ক্ষীততাও থাকতে পারে। জন্ডিসের বিশেষ লক্ষণটি হলো, প্রসাবের রং হলুদ থেকে লাল রং-এর হয়।
জন্ডিসকে পান্ডুররোগও বলা হয়। রক্তে বিলিরুবিনের সঙ্গে এর সম্পর্ক। বিলিরুবিনের পরিমাণ বাড়লেই এটা হয়ে থাকে। তখন সাধারণত চামড়া, ঝিল্লি পর্দা বা ভিতরের গ্রন্থিসমূহ হলুদ রং ধারণ করে। যদি রক্তে এই বিলিরুবিনের পরিমাণ ২ ভাগ কম থাকে তাহলেও হলুদাভ রং চোখে দেখা যায় না। অবশ্য রোগীর রক্ত পরীক্ষা করে রোগ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়।
যকৃতের কোষের সঙ্গে বিলিরুবিনের সম্পর্কের উপর ভিত্তি করে চিকিৎসকগণ জন্ডিসকে সাধারণত তিনভাগে ভাগ করেন। যেমন, ১. অবস্ট্রাকটিভ বা বাধঅগ্রস্ত জন্ডিস ২. ইনফেকটিং বা হেপাটোসেলুলার জন্ডিস এবং ৩. হেমোলাইটিক জন্ডিস।
(১) বাধাগ্রস্থ বা অবষ্ট্রাকটিভ জন্ডিসের ক্ষেত্রে যকৃত থেকে ডুস্তডেনাসে বাইল এর প্রবাহ বাধাপ্রাপ্ত হয় এবং জমাকৃত বাইল পুনরায় রক্তে শোধিত হয়ে বিলিরুবিনের পরিমাণ বৃদ্ধি করে যার ফলে জন্ডিস হয়। যেহেতু বাইল অহজমকৃত চর্বির উপর কাজ করতে পারে না সেজন্য বাধাগ্রস্থ পান্ডুরোগে পায়খানার রং মাটির মত হয়ে থাকে।
(২) ইনফেকটিভ বা হেপাটোসেলুলার জন্ডিস এর কারণসমূহের মধ্যে উল্লেখয্যো হচ্ছে ভাইরাস জনিত প্রদান বা যকৃতের কোষ ও ফলা ধ্বংস করে, ফলে যকৃতের কোষে রক্ত থেকে বিলিরুবিন স্থানান্তরিত হতে পারে না এবং রক্তে বিলিরুবিনের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়।
(৩) হেমোলাইটিক জন্ডিসের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কারণসমূহ হচ্ছে লোহিত কনিকা আরবিসির জন্মগত ক্রুটি যেমন, থ্যালাসেমিয়া, হেমোগ্লোবিনোপ্যাথী, ম্যালেরিয়া জ্বর, প্রদাহ, বিষাক্ত দ্রব্য ও ঔষধ, সাপের কামড়, ভুল রক্ত সঞ্চালন ইত্যাদি প্রধান। এ সমস্ত কারণে রক্তের প্রবাহে অতিরিক্ত কোষ নাশের ফলে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বিলিরুবিন তৈরি হয় এবং যকৃতে স্থানান্তরিত হয়। স্বাভাবিকভাবে যকৃতের একটি ক্ষমতা থাকে বিলিরুবিনকে অস্ত্রে স্থানান্তর করার। এবং এই ক্ষমতার বদৌলতে যকৃত স্বাভাবিকভাবে তৈরি বিলিরুবিনের ৬ গুণ পর্যস্ত স্থানান্তর করতে পারে না ফলে রক্তে বিলিরুবিনের পরিমাণ বেড়ে যায় ও জন্ডিস রোগের সৃষ্টি হয়।
‘লিভার ফাংশন টেস্ট জন্ডিসের সাথে সম্পৃক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তার আগে যকৃতের স্বাভাবিক কাজ সম্পর্কে অবহিত হওয়া দরকার। স্বাভাবিকভাবে যকৃত বাইল তৈরী ও নির্গত করে, আমিষ ও চর্বির বিপাক ক্রিয়ায় অংশ গ্রহণ করে প্লাজামা প্রোটিন তৈরি করে, অনেক বিষাক্ত দ্রব্য এবং বিপাকের দ্রব্য নিষ্ক্রিয় করে ফেলে ভ্রুনের রক্ত তৈরীতে সাহায্য করে, রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণ করে এবং রক্তের ভঞ্জন ক্রিয়াতে সাহায্য করে।
আর ‘লিভার ফাংশন টেস্ট’ এর মাধ্যমে সিরাম বিলিরুবিনের মান, এসজিপিটি, এসজিওটি, এলকালাইন ফসফেটেজ, টোটাল প্রোটিন, এইচবিএসএজি ইত্যাদি নির্ণয় করা যায়। এসব কিছু জন্ডিস রোগ নির্ণয় ও নিরাময়ে কার্যকরী ভূমিকা পালন করে।
জন্ডিসের চিকিৎসাকে মোটামুটি ৪টি স্তরে বিভক্ত করা যেতে পারে। প্রথমতঃ যে কারণে জন্ডিস হয়েছে তাকে নির্মূল করে দেয়া। দ্বিতীয়ত পরিপূর্ণরূপে মানসিক ও শারিরীক বিশ্রাম গ্রহণ করা। আর সহজভাবে বলা যায়, যতদিন পর্যন্ত রোগীর জন্ডিস সম্পূর্ণরূপে ভাল না হয় বা রক্তের লিভার ফাংশন টেস্ট সম্পূর্ণ স্বাভাবিক অবস্থায় না আসে ততদিন পর্যন্ত পূর্ণ বিশ্রাম নেয়া। তৃতীয়ত খাবারের ব্যাপারে বিশেষ দৃষ্টি দেয়া। প্রত্যহ পূর্ন বয়স্ক রোগীর ৩০০০ কিলো ক্যালরী এবং অপ্রাপ্ত বয়স্ক রোগীর ১৫০০ কিলো ক্যালরী খাবার অত্যাবশ্যক। ক্ষুধামন্দা, বমিভাব বা বমির কারণে খাদ্য গ্রহণে অসুবিধা হলে ইনট্রভেনাস ড্রিপ দিয়ে বা বায়ালস টিউব দিয়ে খাওয়ায় ব্যবস্থা করা যেতে পারে। রোগীর পেট ভাল থাকলে রোগী সব ধরনের খাবার খেতে পারবে। তবে সহজে সে খাবার হজম হয় যেমন গ্লোকোজ, কার্বোহাইড্রেট ইত্যাদি এবং গ্লোকোজ এর শরবত, আখের রস, নরম ভাত ইত্যাদি রোগীকে বেশি করে খেতে দেয়া ভালো। বিশেষ করে আমিষ জাতীয় খাবার যেমন মাছ, গোশত, ডাল ইত্যাদি বেশি বেশি করে খেতে উৎসাহিত করতে হবে। সেকেন্ডারী ইনফেকসান যাতে না হয় তার জন্য এন্ডিবায়োটিক গ্রহণ করা যেতে পারে। ফুলমিনেটিং হেপাইটিস হলে রোগীকে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে বিশেষভাবে ব্যবস্থা করতে হবে। বাধাগ্রস্ত বা অবষ্ট্রাকটিভ জন্ডিস হলে সার্জারী ব্যবস্থা অবলম্বনের প্রয়োজন হবে। এছাড়া জন্ডিস রোগের আর যে দুটো বিরূপ প্রতিক্রিয়া আছে তাহলো লিভার সরোসিস এবং যকৃতের ক্যান্সার। এসব কারণে খোদা না করুক রোগী মারাও যেতে পারে।
জন্ডিস প্রসঙ্গে বলা হয় যে, জন্ডিসের চিকিৎসা থেকে জন্ডিস প্রতিরোধে বিশেষভাবে জোর দেয়া উচিত। যেমন পানি ফুটিয়ে পান করবে, যেখানে সেখানে বাসি বা পঁচা খাবার না ফেলা, স্বাস্থ্যসম্মতভাবে শরীরের যথাযথ যত্ম নেয়া এবং বিশেষ করে যেসব খাদ্য ঘাটতির কারণে জন্ডিস হতে পারে সেগুলো ঠিকমত খাওয়ার ব্যবস্থা করা। পূর্ণ বিশ্রাম গ্রহণ শুধু রোগ নিরাময়ের জন্যই নয় বরং ভবিষ্যতের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া মুক্ত হওয়ার জন্যও জরুরী। বর্তমান বাজারে কিছু প্রতিষেধক পাওয়া যাচ্ছে যা গ্রহণ করা যেতে পারে।
আজকাল অনেকেই জন্ডিস রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। বা অনেক স্থানেই জন্ডিস রোগের ব্যাপকতা দেখা দিচ্ছে। এ জন্য যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন করা বাঞ্ছনীয়।
ইতিহাসে হাজ্জাজ বিন ইউসুফের স্থান
জিওগ্রাফি অব বাংলাদেশ (Geography of Bangladesh)
ইস্তিঞ্জা যদি কমাতে চান বেশী করে জাম্বুরা খান
সত্য স্বপ্নে হযরত ইমাম হাসান বসরী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার আরোগ্য লাভ