(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
কিতাবুল জামে
নিয়ত আর আমল ওতপ্রোতভাবে জড়িত। নিয়তের প্রতিফলন আমলে প্রকাশ পায় বটে; কিন্তু সুক্ষাতিসুক্ষ আমলের ক্ষেত্রে ফাঁক থেকে গেলে তা হতে রক্ষা পাওয়া যাবে না। এজন্যই আউলিয়া কিরামগণ অনেক কাজ হালাল ও জায়িয থাকা সত্ত্বেও সন্দেহের সৃষ্টি হতে পারে এমন সব বিষয় পরিত্যাগ করেছেন। যারা তাছাউফের নূর হতে মাহরূম তাদের নিকট এটা তুচ্ছ মনে হলেও সূফীগণ একে ব্যাপক অর্থেই গ্রহণ করে থাকেন।
হযরত উমর ইবনুল খত্তাব আলাইহিস সালাম বলেছেন, “আমি দশটি হালাল কাজের নয়টি এ আশঙ্কায় ত্যাগ করেছি যে, পাচ্ছে হারাম কাজে লিপ্ত হয়ে যাই।”
অনুরূপ হযরত আবু বকর ছিদ্দীক্ব আলাইহিস সালাম তিনি বলেছেন, আমি সত্তরটি মুবাহ এ আশঙ্কায় ছেড়ে দিয়েছি যে, পাচ্ছে হারাম কাজে লিপ্ত হয়ে পড়ি।” যার নিয়ত যত শুদ্ধ হবে, তার ইবাদত তত বেশি নিষ্কলুষ হবে।
গাউসুল আ’যম মহিউদ্দীন হযরত আব্দুল কাদির জ্বিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন, পরকালের জন্য কোন আমল করা হলো মহান আল্লাহ তায়ালা উনার আনুগত্য করা, কারণ নিয়ত হলো ইবাদতের দেহ ও প্রাণতুল্য।” (ফতহুল গযব)। তাই পরকাল অর্থাৎ মহান আল্লাহ পাক উনার সন্তুষ্টি হাছিলের উদ্দেশ্য ব্যতীত আমল হলো অন্তসারশুণ্য দেহের মতো যা নিস্ফল।
নিয়ত আমলের অর্ধেক অংশ। আব্দুর রহমান ইবনে মেহেদী ও ইমাম শাফেই রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার বর্ণনা নকল করে ইমাম সুয়ুতী রহমতুল্লাহি আলাইহি এবং আহম্মদ ইবনে হাম্বরল ও আলী ইবনে মদীনা, ইমাম আবু দাউদ, ইমাম তিরমিযী, দারুকুত্বনী ও হামজাতুল কানাই রহমতুল্লাহি উনার মতে এটা (নিয়ত) ইসলামের এক তৃতীয়াংশ। কারো কারো মতে এক চতুর্থাংশ। আব্দুর রহমান মেহেদী রতহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, পবিত্র হাদীছ শরীফটি প্রত্যেক (পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার) অধ্যায়ের মূল। অর্থাৎ প্রতিটি হাদীছ যে করেই আলোচনা ও আমলে আনা হোক না কেন তাতে যদি সহিহ নিয়ত না থাকে তাহলে তা নিষ্ফল হিসেবে পরিগণিত হবে।
পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে আছে- মুমিনের নিয়ত তার আমল হতে উত্তম। পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে আরো আছে বণি ইসরাঈলের যুগে কোন এক স্থানে একজন বুজুর্গ বসবাস করতেন। একবার সে স্থানে একজন বুজুর্গ ব্যক্তি বসবাস করতেন। একবার সে স্থানে প্রচণ্ড দুর্ভিক্ষ দেখা দিল। তখন লোকজন ঐ স্থান ত্যাগ করে অন্যত্র চলে যেতে লাগল। এক সময় সেই বুজুর্গ ব্যক্তিও সপরিবারে সে স্থান ত্যাগ করে চলে যেতে লাগলেন। পথে একটি বিরাট বালুর পাহাড় পড়লো। তিনি মনে মনে ভাবলেন, যদি এই বালুর পাহাড়টা খাদ্যের পাহাড় হতো অথবা যদি আমার এই বালুর পাহাড় পরিমান খাদ্য থাকত তবে আমি সে খাদ্য লোকজনের মধ্যে বিলিয়ে দিতাম, ফলে দুর্ভিক্ষ দূর হয়ে যেত। এই খেয়াল করার পর পরই মহান আল্লাহ পাক সে যুগের নবী আলাইহিস সালাম উনার উপর ওহী প্রেরণ করেন, হে নবী আলাইহিস সালাম, আপনি ঐ বুজুর্গ ব্যক্তিকে জানিয়ে দিন এক পাহাড় পরিমান খাদ্য দান করলে যে পরিমান সওয়াব হাছিল হত তাকে সে পরিমান নেকী দান করলাম।
মুমিনের নিয়ত তার আমল হতে উত্তম হওয়ার কারণ হলো নিয়ত করা বান্দার কাজ, আর তা আমলে পরিণত করা মহান আল্লাহ তায়ালা উনার দায়িত্বে। যদি কোন মুমিন ব্যক্তি নিয়ত করার পর আমল নাও করতে পারে তথাপি তার নেক নিয়তের কারণে সুফল পেতে থাকবে।
পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে আরো আছে যদি কোন ব্যক্তি পবিত্র কুরআন শরীফ হিফজ করার নিয়ত করে কিন্তু সে হিফজ করতে না পারে তাহলে মৃত্যুর পর মহান আল্লাহ পাক উনাকে হাফিজ বানিয়ে হাফিজদের কাতারে স্থান দিবেন, আর এটা হলো তার খালেছ নিয়তের কারণে। মহান আল্লাহ পাক আমাদেরকে প্রতিটি আমলই সহিহ নিয়ত অনুযায়ী সম্পন্ন করার তৌফিক দান করুন। আমীন!
ফিক্বহুস সুনান: কিতাবুত্তাহারাত