-মুহম্মদ সিরাজুল ইসলাম আল বায্যাযী
الحمد لله رب العلمين. والصلاة والصلام على سيدنا محمد النبى الاميس ومن يرد الله به خيرففه فى الدين
ত্বাহারাতের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হলো দু’টি। প্রথমতঃ ত্বাহারাতের তারীফ (সংজ্ঞা) ও তাফসীর (ব্যাখ্যা), দ্বিতীয়তঃ ইহার প্রকারভেদ। আভিধানিক ও পরিভাষাগত উভয় অবস্থায়ই ত্বাহারাতের অর্থ হলো পরিচ্ছন্নতা, পাক পবিত্রতা। তবে এ পবিত্রতা জাহেরী ও বাতেনী উভয় ক্ষেত্রেই সমান অর্থবহ। সহীহ হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে হযরত ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার হতে বর্ণিত- নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি কোন এক রোগীকে দেখে বলেছিলেন,
لا بأئس طمور ان شاء الله
ফকিহগণ উনাদের মতে ত্বাহারাতের অর্থ হলো নিম্নরুপঃ-
আয়েম্মায়ে হানাফীদের মতে হদস ও খবছ হতে পাক হওয়াকে ত্বাহারাত বলে। হদস বলতে হদসে আসগর ও হদসে আকবর উভয়ই ইহার অন্তুর্ভূক্ত। যে সমস্ত অপবিত্রতা হতে ওযুর দ্বারা পাক হওয়া যায় তাকে হদসে আসগর বলে, আর যে সমস্ত অপবিত্রতা হতে পাক হওয়ার জন্য গোসলের প্রয়োজন তাকে হদসে আকবর বলে। এ উভয় প্রকার অপবিত্রতাই (হদস ও খবস) জাহেরী যেমন রক্ত, পশ্রাব, পায়খানা এবং বাতেনী যেমন গুনাহ-এর হুকুম রাখে। নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সময়ে ত্বাহারাত শব্দ দ্বারাই উভয়বিদ সমস্যার সমাধান করা হতো কিন্তু উহা ভিন্ন পরিমন্ডলে ভিন্নরূপে বিকশিত হতে থাকে। জাহেরী ত্বাহারাত বিষয়ক মাসআলা মাসায়েলের আলোচনা পর্যালোচনা সমস্যা সমাধান, মীমাংসা ফক্বিহা কর্তৃক সম্পন্ন হলেও বাতেনী বিষয় পরবর্তীতে এ স্রোত দু’ধারায় প্রবাহিত হতে থাকে। যা অদ্যাবদি প্রচলিত বাতেনী অপবিত্রতা যেমন হিংসা-বিদ্বেষ, রিয়া-অহংকার ইত্যাদি অপবিত্রতার আলোচনা, প্রতিকার ও সমাধান অধিকাংশ ক্ষেত্রে সুফীদের দ্বারা হতে থাকে। সুফীগণ মানুষকে সুপ্ত গুনাহ হতে ইসলাহ (সংশোধন) করেন। যাকে শরীয়তের পরিভাষায় ইলমে তাসাউফ বলে। পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে আছে- হযরত আবু মালেক আশআরী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার হতে বর্ণিত- নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলেন, “পবিত্রতা ঈমানের অর্ধেক।”
এখানে পবিত্রতা বলতে জাহেরী ও বাতেনী উভয় নাপাকী হতে পবিত্র হওয়া বুঝানো হয়েছে। যেমন কুরআন শরীফ-এ আছে- “মহান আল্লাহ পাক তিনি তওবাকারীদের ও পবিত্রতা অর্জনকারীদের ভালবাসেন।” এ প্রসংগে হাদীছ শরীফ-এ বর্ণিত আছে- “মহান আল্লাহ পাক তিনি পরিচ্ছন্ন, তিনি ভালবাসেন পরিচ্ছন্নতাকারীকে। এ সমস্ত আয়াত শরীফ ও হাদীছ শরীফ দ্বারা জাহেরী ও বাতেনী ত্বাহারাত বা পবিত্রতায় কুরআনুল কারীমের এ আয়াত শরীফ প্রনিধানযোগ্য- “যে নিজেকে পবিত্র করবে সে সফলকাম হবে।” অন্যত্র আছে- “নিশ্চয়ই সাফল্য লাভ করবে সে, যে পবিত্র।” এ সমস্ত আয়াত শরীফ-এ অন্তুকরণকে সমস্ত কুরিপু হতে যেমন শিরক, কুফরী, বিদআত, রিয়া, অহংকার, পরশ্রীকাতরতা ইত্যাদি। আভন্ত্যুরীন নাপাকী হতে যারা ক্বালবকে সংশোধন করে নিরঙ্কুশভাবে মহান আল্লাহ পাক উনার ইবাদতে নিমগ্ন হবে উনারাই সফলতা লাভ করবে। ত্বাহারাত পরিপূর্ণভাবে করা আবশ্যক, অন্যথায় নামাজে ক্রটি-বিচ্যুতি হতে পারে। যেমন পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে আছে- হযরত শাবীব ইবনে আবু রাওহা নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ছাহাবা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুগণ উনাদের একজন হতে বর্ণনা করেন যে, রসুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ফজরের নামাজ পড়ছিলেন, আর নামাজে সূরা রুম তিলাওয়াত করছিলেন কিন্তু তিলাওয়াতে কিছু খটকা লাগে, তিনি নামাজ শেষ করে বললেন, “তাদের কি হয়েছে যারা আমাদের সাথে নামাজ পড়ে অথচ উত্তমভাবে ত্বাহারাত হাসিল করে না? ইহারাই আমাদের কুরআন তিলাওয়াতে খটকা লাগায়। পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে আছে- “ত্বাহারাত ব্যতীত নামায কবুল হয় না।”
ইমাম শাফেঈ রহমতুল্লাহি আলাইহি ও ইমাম মুহম্মদ ইবনে জরীর রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাদের মতে জানাযর নামায পবিত্রতা ব্যতীত আদায় করলে তা জায়েজ হবে। কেননা ইহা মূলতঃ দোয়া, কিন্তু চারি মাযহাবের ইমামগণ, ছাহাবা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুগণ, তাবেঈন ও মুহাক্কিকিনগণ উনাদের মতে- ফরজ, নফল, জানাযা, সিজদা, তিলাওয়াত-এ কোন অবস্থাতেই পবিত্রতা ব্যতীত নামাজ হবে না। এ প্রসঙ্গে হাদীছ শরীফ-এ বর্ণিত আছে- “তোমাদের কেহ নাপাকী অবস্থায় নামায পড়লে কবুল হবে না, যতক্ষণ না ওযু করে।”
অন্য পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে আছে- “হযরত যাবের রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার হতে বর্ণিত- রসূল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলেন, “নামাজ হলো বেহেস্তের চাবি আর ত্বাহারাত হলো নামাজের চাবি।” এ সমস্ত পবিত্র হাদীছ শরীফ হতে ইবাদতের প্রতিক্ষেত্রেই অবস্থানুযায়ী ত্বাহারাতের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা স্পষ্টই প্রতীয়মান হয়। পবিত্রতা অর্জনে যদি ক্রটি থাকে তাহলে ইবাদতের প্রতিটি পর্যায়েই নিষ্ফল কার্যকারিতা পরিলক্ষিত হবে। মাথা ব্যতীত যেমন মানুষের অস্তিত্বের কথা ভাবা যায় না, তদ্রুপ ত্বাহারাত ব্যতীতও ইসলামের কোন আমলের কথা কল্পনা করা যায় না। তাই ফিক্বাহের কিতাবসমূহের সর্বত্রই ত্বাহারাত (পবিত্রতা)-এর আলোচনা সর্বাগ্রে পরিবেশিত হয়। কিতাবুত্তাহারাতকে প্রারম্ভে বর্ণনার কারণ হলো ইহা নামাজের চাবি।
মহামান্য ইমামগণ উনাদের নীতিকে অনুসরণ করে আমিও ফিক্বহের সম্যক আলোচনায় ব্যপৃত হলাম। এ অধ্যায়ে যে সমস্ত বিষয় আলোচীত হবে- ১। ওযু ওয়াজিব হওয়ার শর্ত। ২। ওযু সহিহ হওয়ার শর্ত। ৩। ওযুর আহকাম। ৪। ওযুর সুন্নতি নিয়ম। ১। ওযু ওয়াজিব হওয়ার শর্তঃ- (ক) মুসলমান হওয়া, কাফিরের উপর ওযু ওয়াজিব নয়। (খ) বালেগ হওয়া নাবালেগের উপর ওযু ওয়াজিব নয়। (গ) জ্ঞানসম্পন্ন হওয়া, পাগলের উপর ওযু ওয়াজিব নয়। (ঘ) পানি ব্যবহারে সক্ষম হওয়া, কেউ যদি পানি ব্যবহার করতে অক্ষম হয়, যেমন- রোগের কারণে তবে তার জন্য ওযু ওয়াজিব নয়। (ঙ) নামাজের এ পরিমাণ সময়ের অবকাশ থাকতে হবে যাতে ওযু করে নামাজের ওয়াক্ত পাওয়া যায়। ওয়াক্ত না পাওয়ার সম্ভাবনা হলে ওযু করা ওয়াজিব নয়। ২। ওযু সহীহ হওয়ার শর্তঃ- (ক) শরীরের যে সমস্ত অঙ্গ ধৌত করা ফরজ তার সর্বত্রই পানি পৌঁছানো, যাতে চুল পরিমাণও শুষ্ক না থাকে। অন্যথায় ওযু হবে না। (খ) ওযুর অঙ্গে এমন জিনিস লাগানো না থাকা যার কারণে পানি পৌঁছাতে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়। যেমন- চর্বি, আঠা, খেযাব, নেইল পলিস, এমন আংটি যা ঘুরানো যায় না। (গ) যে অবস্থায় ওযু চলে যায় বা যে কারণে ওযু টুটে যায়, এ সমস্ত ক্ষেত্রে ওযু হবে না, কিন্তু শর্ত হলো মাযুর না হওয়া। যেমন- হায়েজ নেফাস ওয়ালী মহিলা যদি ওযু করে তবে ওযু হবে না, অপবিত্র ব্যক্তি (যার উপর গোসল ফরজ) যদি ওযু করে তাহলে ওযু হবে না। ৩। ওযুর আহকামঃ- ওযু চার প্রকারের হবে- (ক) ফরজ ওযুঃ নামাজ পড়ার জন্য ওযু করা ফরজ। ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নাত, নফল নামাজ ও তিলাওয়াতে সিজদা ইত্যাদি সবই ফরজ ওযুর অন্তুর্ভূক্ত অর্থাৎ ইত্যাদির কারণে ওযু করা ফরজ। (খ) ওয়াজিব ওযুঃ কাবা শরীফ তওয়াফ করা, কুরআন শরীফ স্পর্শ করার জন্য ওযু করা ওয়াজিব। (গ) সুন্নত ওযুঃ নিদ্রার সময়, গোসলের শুরুতে ওযু করা সুন্নত। (ঘ) মোস্তাহাব ওযুঃ আজানের জন্য খুৎবা দেওয়ার জন্য, বিবাহে খুৎবা হোক বা জুমআর খুৎবা হোক, ইলম শিক্ষার জন্য বা তালিম দেওয়ার জন্য কোন দ্বীনি কিতাব স্পর্শ করার জন্য, মহান আল্লাহ পাক উনার জিকির করার জন্য, ঘুম হতে উঠার পরে, উটের গোশত খাওয়ার পর, মাইয়্যিতের গোসল দেওয়ার পর, জানাজা উঠানোর জন্য, সর্বাবস্থায় ওযু থাকা হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার জিয়ারতের জন্য, আরাফাতের মাঠে অবস্থানের জন্য (আরাফাত ময়দানের নিকট একটি স্থান আছে, হাজিগণ ৯ই জিলহজ্জ সেখানে অবস্থান করেন) ছায়ী করার জন্য, অপবিত্র ব্যক্তির গোসলের পূর্বে খানা খাবার জন্য, স্ত্রীর সহিত সঙ্গমের সময়, হায়েজ-নেফাসওয়ালী আওরাতের জন্য নামাজের ওয়াক্ত সমূহ।
ফিক্বহুস্ সুনান : নামায আদায়ের তরতীব
ফিক্বহুস্ সুনান নামায আদায়ের তরতীব