সব সানা সিফত মহান রাব্বুল আলামীনের। যার সর্বোত্তম সানা-সিফত করেছেন রহমাতুল্লিল আলামীন, মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তিনি বলেন, “আয় আল্লাহ্ পাক, আপনি তো ঐ রকমই যেমনটি নিজেকে নিজে বর্ণনা করেছেন।” আর সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সানা-সিফত সম্পর্কে বলা হয় তিনি তো ঐ রকমই যেমনটি স্বয়ং আল্লাহ্ পাক বর্ণনা করেছেন।
আল্লাহ্ পাক এরশাদ ফরমান, “মুমীনদের প্রতি আল্লাহ্ পাক-এর রহমত যে, তিনি তাদের মধ্য থেকে তাদের জন্য একজন রাসূল প্রেরণ করেছেন, যিনি তাদেরকে আয়াতসমূহ পাঠ করে শুনাবেন, হিকমত শিক্ষা দিবেন এবং তাযকিয়া করবেন।” (সূরা আল ইমরান/১৬৪)
সুন্দর আখলাকের স্ফুরণ ঘটানো, হক্ব দ্বীনকে পরিপূর্ণতা দান এবং উত্তম আদর্শকে বিকশিত করার জন্য সাইয়্যিদুল খালায়েক্ব, সরওয়ারে কাওনাইন, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আবির্ভাব।
মুহব্বতের বিকাশই হুব্বুল আউয়ালীন ওয়াল আখেরীন রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সৃষ্টি রহস্য। হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ্ পাক এরশাদ ফরমান, “আমি একটি গুপ্ত ধন ভান্ডার ছিলাম। আমার ইচ্ছা হল আমি প্রকাশিত হই। তখন আমি (একান্ত মহব্বত করে) নূরে মুহম্মদী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তৈরী করলাম।” এই মহব্বতের অখন্ডতা, প্রাবল্য ও মাহাত্ম বোঝানোর জন্যেই যেন অন্য হাদীসে কুদসীতে এরশাদ হয়েছে, “হে হাবীব আপনাকে সৃষ্টি না করলে আমি আর কিছুই সৃষ্টি করতামনা।”
সকলেই অবগত যে -এ মহান সৃষ্টি অর্থাৎ আক্বরামুল আওয়ালীন ওয়াল আখেরীন, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আগমণের দিন হিসেবে বারই রবিউল আউয়াল সর্বাপেক্ষা অধিক মশহুর। মর্যাদার দিক থেকে যা শবে-বরাতের চেয়ে অনেক বেশী রহমতপূর্ণ, শবে-ক্বদরের চেয়ে অনেক বেশী-ফজীলতযুক্ত এমনকি দু’ঈদের চেয়েও অনেক বেশী ঈদ, যে দিনটিতে সন্নিবেশিত। কুল-মাখলুকাতে ঈদ-ই-মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রূপে; যে দিনটি সর্বাপেক্ষা বেশী সম্মানিত ও সমাদৃত।
হালে রাষ্ট্রীয়ভাবে ঈদ-ই-মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উদযাপন করা হয়। সরকারী ছুটি দেয়া হয়, ভি, আই, পি, রাস্তায় কিছু রঙ্গীন পতাকা, ব্যানার ইত্যাদি টানানো হয়। সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় বিচ্ছিন্নভাবে অন্তসারশুন্য কিছু মাহ্ফিল, সেমিনার ইত্যাদির ব্যবস্থা করা হয় এবং একেই যথেষ্ট বলে মনে করা হয়। অথচ তুলনামূলক তথ্যে দেখা যায় এদেশে রবীন্দ্র, নজরুলের স্মরণ অনুষ্ঠানে যে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয় তার চেয়ে অনেক কম অর্থই কেবল নয় বরং কম উৎসাহ ও কম আয়োজনের দ্বারা যেনোতেনো ভাবে বারই রবিউল আউয়ালের মত পবিত্র দিনটিকে অতিক্রান্ত করা হয়। যা রীতিমত আক্ষেপ ও আফসোস এবং আত্মধিক্কারের বিষয়। অথচ ঈমানের একান্ত দাবীর কারণেই এ মোবারক উপলক্ষ্যটি সরকারী বেসরকারী সর্বমহলে আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা নির্বিশেষে ব্যাপক আয়োজনে, বিপুল উৎসাহে, গভীর মূল্যায়ণে, স্বতস্ফূর্তভাবে পালিত হওয়ার দাবী রাখে।
উল্লেখ আবশ্যক, কুল-মাখলুকাত তথা কাফির-মুশরিকরাও, রউফুর রহীম, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উম্মত। উম্মতে দাওয়াত বলে তারা গণ্য। পক্ষান্তরে মুসলমানরা উম্মতে এজাবত বা কবুলকারী উম্মত হিসেবে অভিহিত। অনেক কাফির মনীষী ফখরে কায়েনাত হুজুর পুর নূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সানা-সিফত বর্ণনায় প্রবৃত্ত হয়েছে। কিন্তু তাঁর আদর্শ গ্রহণ না করে শুধুই মুখরোচক বর্ণনা যে, কেবলই অন্তসারশুন্যতা তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। যদিও কোন কোন মহল এসব বাণীর উদ্ধৃতি দিয়ে, ফখরে বাহার ওয়া বার, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনায় বিশেষ দলীল হিসেবে মূল্যায়ণ করেন। কিন্তু হাক্বীক্বতের বিচারে এ সবই অজ্ঞতা। কারণ আল্লাহ্ পাক-এর নিজ কথা, “আমি আপনার জিকিরকে, সম্মানকে বুলন্দ করেছি।” (সূরা আলাম নাশরাহ্/৪) এটাই মূখ্য বিষয়। কাফির মনীষীদের আপাত সুখ্যাতির মূল্যায়ণ কেবলই অবান্তর।
মূলতঃ এ ধরণের অসার উপলদ্ধিই বর্তমান বিজ্ঞানের শীর্ষ যুগে ছাহেবে ইকরা, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অবদানের মূল্যায়ণ করতে ব্যর্থ হয়।
বিজ্ঞান মানুষকে দিয়েছে বস্তুতান্ত্রিক সভ্যতা। উপযোগগত উপকরণ। উপকরণ মানব-জীবনের সহায়ক হতে পারে কিন্তু নিয়ন্ত্রনকারী হতে পারেনা। বরং উপকরণের যথাযথ ব্যবহারের ব্যর্থতা মানুষকে বল্গাহারা জীবনে প্রবৃত্ত করে অবশেষে অবসাদগ্রস্থ করে। মানুষ একটি হৃদয়ের অধিকারী। এ হৃদয়কে প্রস্ফুটিত করতে পারে আদর্শভিত্তিক আচরণ ও মূল্যবোধ।
আর সে মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণেই আমরা দেখি, অত্যাধুনিক উপকরণ, বহুমূল্য বিলাস-ব্যাসনে ব্যাপৃত থাকার পরও বর্তমান জমিনে তথাকথিত সবচেয়ে শক্তিধর সাম্রাজ্যবাদী দেশের কর্ণধারকে পারিবারিক জীবনে বিপর্যস্থ হতে, চারিত্রিক স্খলনে অপদস্থ
হতে এবং জীবন-সঙ্গীনির কাছে মার খাওয়ার মত নাজুক পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে। আর এ চিত্রটি শুধু সে দেশের উপরওয়ালারই নয় বরং সামগ্রিকভাবে কি ইউরোপ, কি আমেরিকা, গোটা বিশ্বের কাফির দেশেরই।
যদিও তারা দাবী করে থাকে যে, বস্তু তান্ত্রিক উপযোগগত উপকরণের দিক থেকে তারা তৃতীয়-বিশ্বের মুসলিম দেশগুলো থেকে প্রায় শত বর্ষ-এগিয়ে আছে। তারা সী-প্লেনে ভ্রমন করছে, কম্পিউটারাইজড জীবন যাপন করছে কিন্তু সত্যিকার অর্থে তারা রূহের খোরাকের আসল সওগাত থেকে, আদর্শ জীবনবোধ ও তার ব্যবহার থেকে মুসলিম মূল্যবোধের উপলদ্ধি ও প্রাপ্তির তুলনায় হাজার কোটি বছর পিছিয়ে রয়েছে। ঈমানের নূর ছাড়াও তারা বঞ্চিত স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক হক্ব উপলব্ধি ও আদায় থেকে, যে কারণে তাদের মাঝে বিবাহ-বিচ্ছেদ একটি গণ-ব্যধি। পিতা-মাতা এবং সন্তানের হক্ব সর্ম্পকে তারা অজ্ঞ যে কারণে একটা সময়ে তারা উভয়েই বড় অসহায়। প্রতিবেশীর হক্ব সম্পর্কে তারা অবুঝ, যে কারণে বিপদগ্রস্থ এমনকি পার্শ্ববর্তী মৃত প্রতিবেশীর সাহায্যে এগিয়ে আসে প্রতিবেশী নয় পুলিশ। ‘খাও, দাও স্ফুর্তি কর’ এ বল্গাহারা জীবন-দর্শনে তারা ব্যাপৃত। যে কারণে এসব অস্থায়ী উপযোগের নিঃশেষে তাদের জীবনটাও পরিনতিতে হয়ে উঠে বড়ই দুর্দশার।
মাআ’জামা শানুহু হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক তথা খিলাফতের ক্ষেত্রে আমাদেরকে সর্বোত্তম আদর্শ দিয়ে গেছেন। যে আদর্শবোধ সান্তনা দেয় ক্ষুধিতের হৃদয়ে, যে আদর্শ ধৈর্য্য তৈরী করে রোগীর অন্তরে, যে আদর্শ মমতা তৈরী করে স্বামী-স্ত্রীতে, সন্তানে পিতা-মাতায়, যে আদর্শ সামাজিক ভারসাম্য বজায় রাখে, জমীনে খিলাফতের ফজীলত দান করে সর্বোপরি অনন্তকালের জন্য তায়াল্লুক মায়াল্লাহ্ বা খোদা-তায়ালার সাথে রূহানী সর্ম্পক তৈরী করে জীবনকে সর্বোতরূপে সাফল্যমন্ডিত করে।
আর এ অনুপম আদর্শ ও রহমতের উৎসই হচ্ছেন উসওয়ায়ে হাসানা, রাসূলে পানাহ্ হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। সঙ্গতঃ কারণে তাই তাঁর সুন্নত সমূহ যথাযথভাবে পালন আমাদের জন্য একান্ত আবশ্যক। হক্বের অতন্ত্র প্রহরী, বাতিলের আতঙ্ক, তাজদীদী মুখপত্র মাসিক আল বাইয়্যিনাত মূলতঃ সে উপলদ্ধি এবং চেতনাই তার পাতায় পাতায় সফলভাবে প্রস্ফুটন করে থাকে। এ প্রেক্ষিতে পবিত্র রবিউল আউয়ালে মাসিক আল বাইয়্যিনাত প্রকাশের পাশাপাশি, মিথ্যা দূরীভূত করণ এবং সত্য প্রতিষ্ঠাকরণের প্রক্রিয়ায় বেমেছাল ভূমিকা রেখে দশ বছর অতিক্রান্ত করে নতুন বছরে পা রাখতে পেরে আমরা জানাই আল্লাহ্ পাক-এর কাছে অশেষ শুকরিয়া এবং ছহেবে ছালাত ও সালাম হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি বেশুমার দরুদ ও সালাম।
মূলতঃ এ দীর্ঘ সময়ে মাসিক আল বাইয়্যিনাত সব সময়ই তার মূলনীতি সম্বলিত যে হাদীস শরীফের উপর অটল থেকেছে তা হল, “আল্লাহ্ পাক-এর জন্যে মুহব্বত, আল্লাহ্ পাক-এর জন্যে বিদ্বেষ, আল্লাহ্ পাক-এর জন্যে আদেশ, আল্লাহ্ পাক-এর জন্যে নিষেধ।”(আবূ দাউদ, তিরমিযী)
এ প্রেক্ষিতেই মাসিক আল বাইয়্যিনাত, ছত্রিশ বছর যাবৎ তথাকথিত ইসলামী পত্রিকা প্রকাশের দাবীদার কোন সম্পাদকের মিথ্যা সমালোচনা ও রক্তচক্ষুকে ভয় করেনি, বরং হক্ব তালাশী পাঠকের জিজ্ঞাসাকে মূল্যায়ণ করে আল বাইয়্যিনাত গত দশ বছরের মাসিক মদীনার ৯৩টি, মাসিক রাহমানী পয়গামের ৩১ টি, মাসিক মুঈনুল ইসলামের ৩৯টি, আত্ তাওহীদের ১৪টি, মাসিক পৃথিবীর ৭টি, বিশেষ ভুল মাসয়ালার সঠিক জাওয়াব দিয়ে এদেশের ইসলামী প্রকাশনা জগতে একমাত্র নির্ভরযোগ্য দলীল ভিত্তিক পত্রিকা তথা মুসলমানদের ঈমান রক্ষার হাতিয়ার রূপে সাব্যস্ত হয়েছে।
পাশাপাশি আল বাইয়্যিনাত সকল বিদ্য়াতী ও গোমরাহীর বিরুদ্ধে শক্ত লেখনী এবং সমসাময়িক বিষয়ে সূক্ষ্ম ও সঠিক ফায়সালা দিয়ে বর্তমান জামানায় তাজদীদী মুখপত্ররূপে প্রতীয়মান হয়েছে।
আল বাইয়্যিনাত-এর ফতওয়া, সুওয়াল-জাওয়াবের দালীলিক উপস্থাপনা, সমৃদ্ধ রচনা শৈলী, যৌক্তিক কাঠামো সকলকে অভিভূত করেছে।
আর এসবই সম্ভব হচ্ছে মূলতঃ মাসিক আল বাইয়্যিনাত-এর প্রতিষ্ঠাতা ও পৃষ্ঠপোষক ইমামুল আয়িম্মা, কুতুবুল আলম, মুহিয়্যুস্ সুন্নাহ, মুজাদ্দিদে যামান, আওলাদে রাসূল, রাজারবাগ শরীফ-এর হযরত পীর সাহেব ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলী-এর বেমেছাল রূহানী তা’কত ও কুয়তের ফলেই। যে রূহানীয়ত থেকে শুন্য থাকার কারণেই ওদের পত্রিকায় মুসলমানের একান্ত সাধারণ ও জরুরী বিষয়, যথা- ওজু, নামাজ, রোজা, ঈদ ইত্যাদি মাসায়েলের ক্ষেত্রে পর্যন্ত তারা চরম ভুল উত্তর দান করে। ছবি তোলা সহ লংমার্চ, হরতাল, মৌলবাদ, ইসলামের নামে গণতন্ত্র, ব্লাসফেমী ইত্যাদি শত শত হারাম কাজে প্রবৃত্ত করে তারা মানুষকে গোমরাহ্ করে।
স্মর্তব্য যে, হক্ব অলী আল্লাহ্গণকে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রূহানীভাবে হক্ব-মত-পথের ফায়সালা করে দেন। মহান আল্লাহ্ পাক আমাদেরকে হক্ব অলী আল্লাহ্র সোহ্বতের মাধ্যমে প্রাণের আঁকা তাজেদারে মদীনা রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর খাস রূহানী সম্পর্ক নসীব করুন। পবিত্র ঈদ-ই-মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উপলক্ষ্যে সেটাই হোক আমাদের চেতনা ও কামনা। (আমীন)