(১) ডঃ মুহম্মদ মঞ্জুরুল করিম, অনুজীব বিভাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
(২) প্রকৌশলী মুহম্মদ হাবিবুল হক, গুলশান, ঢাকা।
(৩) মাওলানা মুহম্মদ আব্দুল হামিদ সর্দার উপাধ্যক্ষ, জুম্মাহাট ফাযিল মাদ্রাসা, উলিপুর, কুড়িগ্রাম।
(৪) মাষ্টার ইমদাদুর রহমান, সুনামগঞ্জ।
(৫) মুহম্মদ ওবাইদুল আযীম, মর্ডান মার্কেট, চাপাইনবাবগঞ্জ।
সুওয়ালঃ আজকাল অনেকে ভোট দেয়া সম্পর্কে নানা কথা বলে থাকে। যেমন, অনেকে বলে থাকে, “ভোট দেয়া ফরজ ও ওয়াজিবের অন্তর্ভূক্ত।” অর্থাৎ ইসলামের নামে ভোট দেয়া ফরজ ও ওয়াজিব। এর কারণ স্বরূপ তারা বলে থাকে, (১) ভোট একটি পবিত্র আমানত, (২) ভোট দেয়া হচ্ছে- স্বাক্ষ্যদান করা, (৩) ভোট দান হচ্ছে- সুপারিশ করা ও (৪) ভোটের দ্বারা প্রতিনিধি বা উকিল নিয়োগ করা হয়। এর দলীল হিসেবে মুফতী শফী সাহেবের লিখিত তাফসীর- “মা’আরিফুল কুরআন” ও কিতাব- “ভোটের ইসলামী শরয়ী বিধান” নামক কিতাবদ্বয় এবং এছাড়া আরো কিছু চটি রেসালা দলীল হিসেবে পেশ করে।
এখন আমার প্রশ্ন হচ্ছে- সত্যিই কি ইসলামের দৃষ্টিতে বা ইসলামের নামে ভোট দেয়া ওয়াজিব? আর সত্যিই কি ভোট পবিত্র আমানত? অথবা স্বাক্ষ্য স্বরূপ? বা সুপারিশ? অথবা উকিল নিয়োগের মাধ্যম? দয়া করে সঠিক জবাব দিয়ে ঈমান হিফাজতে সহায়তা করবেন।
জাওয়াবঃ কুরআন-সুন্নাহ্র দৃষ্টিতে অর্থাৎ ইসলামের নামে ভোট দেয়া ওয়াজিব তো নয়ই বরং কেউ যদি বলে ইসলামের নামে ভোট দেয়া ওয়াজিব তবে সেটা কুফরী হবে। কারণ শরীয়তের দৃষ্টিতে অর্থাৎ ইসলামে ভোট আমানত, স্বাক্ষ্য, শুপারিশ এবং উকিল নিয়োগের মাধ্যম নয়।
ভোট ওয়াজিব হওয়ার কারণ হিসেবে এর সমর্থনকারীরা ভোটকে আমানত, স্বাক্ষ্য, শুপারিশ ও উকিল নিয়োগের মাধ্যম বলে যে দলীল পেশ করে থাকে তা সম্পূর্ণ অশুদ্ধ।
কারণ ভোট প্রথা এসেছে নির্বাচন থেকে। আর নির্বাচন এসেছে গণতন্ত্র থেকে। আর গণতন্ত্র এসেছে ইহুদী-নাছারা তথা বিধর্মীদের থেকে। মূলতঃ গণতন্ত্র হচ্ছে বিধর্মীদের দ্বারা প্রবর্তিত একটি শাসন পদ্ধতি। সুতরাং গণতন্ত্রই ইসলামের নামে করা হারাম। কারণ ইসলাম ও গণতন্ত্র এক বিষয় নয়। নিম্নে সংক্ষেপে তা বর্ণনা করা হলো-
ইসলাম কাকে বলে ?
ইসলাম হচ্ছে আল্লাহ্ পাক-এর তরফ থেকে আল্লাহ পাক-এর রসূল, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি ওহীর মাধ্যমে নাযিলকৃত দ্বীন। যা একমাত্র পরিপূর্ণ ও মনোনীত। যে প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক “সূরা আলে ইমরানের” ১৯নং আয়াত শরীফে বলেন,
ان الدين عند الله الاسلام.
অর্থ ঃ- “নিশ্চয়ই ইসলামই আল্লাহ্ পাক-এর কাছে একমাত্র দ্বীন।”
আর আল্লাহ্ পাক ইসলামকে কামিল বা পরিপূর্ণ করে নাযিল করেছেন এবং তার মধ্যে আল্লাহ্ পাক-এর পূর্ণ সন্তুষ্টি রয়েছে বলে “সূরা মায়েদার” ৩নং আয়াত শরীফে ঘোষণা করেছেন,
اليوم اكملت لكم دينكم واتممت عليكم نعمتى ورضيت لكم الاسلام دينا.
অর্থঃ- “আজ আমি তোমাদের দ্বীনকে (দ্বীন ইসলামকে) কামিল বা পরিপূর্ণ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার নেয়ামত তা’মাম বা পূর্ণ করে দিলাম এবং আমি তোমাদের দ্বীন ইসলামের প্রতি সন্তুষ্ট হলাম।”
আল্লাহ্ পাক দ্বীন ইসলামকে শুধুমাত্র পরিপূর্ণ করেই নাযিল করেননি সাথে সাথে দ্বীন ইসলামকে মনোনীতও করেছেন। তাই দ্বীন ইসলাম ব্যতীত অন্য সমস্ত ধর্ম যা পূর্বে ছিল বর্তমানে রয়েছে এবং ভবিষ্যতে হবে সেগুলিকে তিনি বাতিল ঘোষণা করেছেন।
এ প্রসঙ্গে কালামে পাকে ইরশাদ হয়েছে,
هو الذى ارسل رسوله بالهدى ودين الحق ليظهره على الدين كله وكفى بالله شهيدا محمد رسول الله.
অর্থঃ- “তিনি (আল্লাহ্ পাক) তাঁর রসূল (ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কে হিদায়েত এবং সত্য দ্বীন সহকারে পাঠিয়েছেন সকল দ্বীনের উপর প্রাধান্য দিয়ে (সমস্ত দ্বীনকে বাতিল ঘোষণা করে) এবং আল্লাহ্ পাক-এর সাক্ষ্যই যথেষ্ট। (যার সাক্ষী আল্লাহ্ পাক) আর রসূল হচ্ছেন, মুহম্মদুর রসূলুল্লাহ্ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।” (সূরা ফাতাহ্/২৮,২৯)
অর্থাৎ ইসলাম হচ্ছে- আল্লাহ্ পাক-এর তরফ থেকে আল্লাহ্র রসূল, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি ওহীর মাধ্যমে নাযিলকৃত একমাত্র দ্বীন। যা বাড়ানো-কমানো বা ইফরাত-তাফরীত কোনটিই জায়েয নেই। যে বাড়াবে-কমাবে, সে কাট্টা কাফির ও চির জাহান্নামী হয়ে যাবে।
আল্লাহ্ পাক “সূরা হুদের” ৬নং আয়াত শরীফে বলেন, كل فى كتب مبين.
অর্থঃ- “সমস্ত কিছুই প্রকাশ্য কিতাবে রয়েছে।”
“সূরা আনয়ামের” ৩৮নং আয়াত শরীফে আরো বলেন, ما فرطنا فى الكتب من شىء.
অর্থঃ- “আমি কিতাবে কোন কিছুই তরক করিনি।”
তিনি “সূরা আনয়ামের” ৫৯নং আয়াত শরীফে আরো বলেন, ولا رطب ولا يابس الا فى كتب مبين.
অর্থঃ- “ভিজা এবং শুক্না সব কিছুর বর্ণনাই প্রকাশ্য কিতাবে রয়েছে।
আল্লাহ্ পাক “সূরা আল ইমরানের” ৮৫নং আয়াত শরীফে আরো বলেন,
ومن يبعغ غير الاسلام دينا فلن يقبل منه وهو فى الاخرة من الخسرين.
অর্থঃ- “যে ব্যক্তি দ্বীন ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন ধর্ম (নিয়ম-নীতির) অনুসরণ করে, তার থেকে তা কখনই গ্রহণ করা হবেনা এবং সে পরকালে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভূক্ত হবে।” যার ব্যাখ্যায় হাদীস শরীফে উল্লেখ করা হয়েছে,
وعن جابر عن النبى صلى الله عليه وسلم حين اتاه عمر فقال انا نسمع احاديث من يهود تعجبنا افترى ان نكتب بعضها فقال امتهوكون انتم كما تهوكت اليهود والنصارى لقد جئتكم بها بيضاء نقية ولو كان موسى حيا ماوسعه الا اتباعى.
অর্থঃ- “হযরত জাবির রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হতে বর্ণনা করেন যে, একদিন হযরত ওমর ইবনে খত্তাব রদি¦য়াল্লাহু তায়ালা আনহু হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট এসে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমরা ইহুদীদের থেকে তাদের কিছু ধর্মীয় কথা শুনে থাকি, যাতে আমরা আশ্চর্যবোধ করি, এর কিছু আমরা লিখে রাখবো কি? হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমরাও কি দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছো? যে রকম ইহুদী-নাছারারা দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছে? অবশ্যই আমি তোমাদের নিকট পরিপূর্ণ, উজ্জ্বল ও পরিস্কার দ্বীন নিয়ে এসেছি। হযরত মুসা আলাহিস্ সালামও যদি দুনিয়ায় থাকতেন, তাহলে তাঁকেও আমার অনুসরণ করতে হতো।” (মুসনাদে আহ্মদ, বাইহাক্বী, মিশকাত, মিরকাত, আশয়াতুল লুময়াত, লুময়াত, শরহুত্ ত্বীবী, তা’লীকুছ ছবীহ্ ইত্যাদি)
ওহী
কারণ আল্লাহ্ পাক ইসলাম তথা কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ ওহীর মাধ্যমে নাযিল করেছেন।
আর ওহী সম্পর্কে আল্লাহ্ পাক বলেন,
وما ينطق عن الهوى ان هو الا وحى يوحى.
অর্থঃ- “তিনি ওহী ব্যতীত নিজ থেকে কোন কথা বলেন না।” (সূরা নজম/৩,৪,৫)
ওহী হচ্ছে- দু’প্রকার। (১) ওহীয়ে মাত্লু (২) ওহীয়ে গায়ের মাত্লু।
ওহীয়ে মাত্লু হচ্ছে- যা হুবহু তিলাওয়াত বা পাঠ করতে হয়। যার তাহ্রীফ ও তাবদীল সম্পূর্ণ নাজায়েয ও হারাম। ওহীয়ে মাত্লুর সমষ্টি হচ্ছে- কুরআন শরীফ, যা আল্লাহ্ পাক “সূরা ইউসুফের” ৩নং আয়াত শরীফে উল্লেখ করেন।
اوحينا اليك هذا القران.
অর্থ ঃ- “আমি এই কুরআন শরীফকে আপনার প্রতি ওহী করেছি বা নাযিল করেছি”।
এর মধ্যে দ্বীন ইসলামের বিধি-বিধান, আইন-কানুন, নিয়ম-নীতি ইত্যাদি সন্নিবেশিত করা হয়েছে। যার নাযিলকারী ও সংরক্ষণকারী স্বয়ং আল্লাহ্ পাক। যা “সূরা হিজরের” ৯নং আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে-
انا نحن نزلنا الذكر وانا له لحفظون.
অর্থ ঃ- “নিশ্চয়ই আমিই কুরআন শরীফকে নাযিল করেছি এবং নিশ্চয়ই আমিই এর হিফাযতকারী”।
আর ওহীয়ে গায়রে মাত্লু হচ্ছে- হাদীস শরীফ। যা আল্লাহ্ পাক-এর তরফ থেকে নাযিল হয়েছে কিন্তু তার ভাষা হচ্ছে- স্বয়ং আল্লাহ্ পাক-এর রসূল, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর, যা কুরআন শরীফের ব্যাখ্যা স্বরূপ।
উল্লেখ্য, ওহীয়ে মাত্লু বা কুরআন শরীফের তাহ্রীফ, তাবদীল যেমন নাজায়েয ও কুফরী, তেমনি তাফসীর বির রায় বা মনগড়া তাফসীর বা ব্যাখ্যা করাও নাজায়েয ও কুফরী। আল্লাহ্ পাক-এর রসূল, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
من فسر القران برائه فقد كفر.
অর্থঃ- “যে ব্যক্তি মনগড়া তাফসীর করলো, সে কুফরী করলো।” তিনি আরো বলেন,
من فسر القران برائه فليتبوأ مقعده من النار.
অর্থঃ- “যে ব্যক্তি কুরআন শরীফের মনগড়া তাফসীর করে, সে যেন তার স্থান দুনিয়ায় থাকতেই জাহান্নামে নির্ধারণ করে নেয়।” (ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন)
তিনি আরো বলেন,
من قال فى القران برائه فليتبوأ مقعده من النار.
অর্থঃ- “যে ব্যক্তি কুরআন শরীফ সম্পর্কে মনগড়া কথা বলে বা তাফসীর করে, সে যেন তার স্থান দুনিয়ায় থাকতেই জাহান্নামে নির্ধারণ করে নেয়।” (তিরমিযী, মিশকাত, মায়া’রিফুস্ সুনান, মিরকাত, আশয়াতুল লুময়াত, লুময়াত, শরহুত্ ত্বীবী, উরফুশ্ শাজী, তা’লীকুছ্ ছবীহ্)
তিনি আরো বলেন,
من قال فى القران بغير علم فليتبوأ مقعده من النار.
অর্থঃ- “যে ব্যক্তি ইল্ম ছাড়া কুরআন শরীফের ব্যাখ্যা করে, সে যেন দুনিয়ায় থাকতেই তার স্থান জাহান্নামে নির্ধারণ করে নেয়।” (তিরমিযী, মিশকাত, মায়া’রিফুস্ সুনান, মিরকাত, আশয়াতুল লুময়াত, লুময়াত, শরহুত্ ত্বীবী, উরফুশ্ শাজী, তা’লীকুছ্ ছবীহ্)
আর ওহীয়ে গায়রে মাতলু সম্পর্কে হাদীস শরীফে উল্লেখ করা হয়েছে,
من كذب على متعمدا فليتبوأ مقعده من النار.
অর্থঃ- “যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় আমার সম্পর্কে মিথ্যা বলে, সে যেন দুনিয়ায় থাকতেই তার স্থান জাহান্নামে নির্ধারণ করে নেয়।” (তিরমিযী, ইবনে মাযাহ্, মিশকাত, মিরকাত, আশয়াতুল লুময়াত, লুময়াত, শরহুত্ ত্বীবী, তা’লীকুছ ছবীহ্, উরফুশ শাজী, তুহ্ফাতুল আহওয়াজী, মায়ারিফুস্ সুনান)
মূলতঃ ইসলাম হচ্ছে- আল্লাহ্ পাক-এর তরফ থেকে আল্লাহ্র রসূল, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি ওহীর মাধ্যমে নাযিলকৃত দ্বীন, যা বাড়ানো-কমানো বা ইফরাত-তাফরীত যেমন কুফরী তেমনি তার মনগড়া তাফসীর বা ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ এবং হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নাম মোবারকে মিথ্যারোপ করাও কুফরীর অন্তর্ভূক্ত।
তার মেছাল বা উদাহরণ হচ্ছে- কাদিয়ানী সম্প্রদায়। কাদিয়ানীরা কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ, ইজ্মা ও ক্বিয়াস সবই মানে এবং তা স্বীকারও করে থাকে। এমনকি কাদিয়ানীরাخاتم النبيين. (খতামুন্নাবিয়্যীন) এ রহ্মতপূর্ণ ও বরকতপূর্ণ বাক্যাংশটিও তারা শব্দগতভাবে অস্বীকার করে না কিন্তু নিজেদের ইচ্ছানুযায়ী মনগড়া অর্থ করে। আহ্লে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের আক্বীদা মোতাবেক খতামুন্নাবিয়্যীন-এর অর্থ হচ্ছে- শেষ নবী। হাদীস শরীফে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, لا نبى بعدى.
অর্থঃ- “আমার পরে কোন নবী নেই, অর্থাৎ আমিই শেষ নবী।” (হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শেষ নবী)।
কাদিয়ানীরা আল্লাহ্ পাক-এর রসূল, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নবীও স্বীকার করে এবং মানেও কিন্তু খতামুন্নাবিয়্যীন-এর অর্থ করে, তিনি নবী সত্য তবে শেষ নয়, নবীদের মোহর। (নাউযুবিল্লাহ্) অর্থাৎ কাদিয়ানী সম্প্রদায় ইসলামের সমস্ত কিছু মানা সত্বেও এমনকি কুরআন শরীফের রহ্মত ও বরকতপূর্ণ বাক্যাংশ খতামুন্নাবিয়্যীন শব্দগতভাবে মানা সত্বেও অর্থের দিক থেকে শুধু মাত্র “খতম” শব্দের অর্থ শেষ না করে মোহর করার কারণে কাট্টা কাফির ও চির জাহান্নামী হয়েছে।
তাহলে বুঝা যাচ্ছে- আল্লাহ্ পাক-এর তরফ থেকে আল্লাহ্ পাক-এর রসূল, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি ওহীর মাধ্যমে নাযিলকৃত দ্বীন, ইসলামের কোন বিষয় বাড়ানো-কমানো বা ইফরাত-তাফরীত করা বা কুরআন শরীফের কোন শব্দের তাহ্রীফ-তাবদীল করা অথবা মনগড়া তাফসীর ইত্যাদি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ যা নাজায়েয, হারাম ও কুফরী। যারা বাড়াবে ও কমাবে বা তাহ্রীফ-তাবদীল অথবা মনগড়া তাফসীর ইত্যাদি করবে তারাও কাফির হয়ে যাবে। যেমন কাদিয়ানী সম্প্রদায় কাফির হয়ে গিয়েছে।
উপরোক্ত আয়াত শরীফ এবং হাদীস শরীফের মাধ্যমে এটাই প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ্ পাক দ্বীন ইসলামকে মনোনীত ও পরিপূর্ণ করে নাযিল করেছেন। এবং পূর্ববর্তী সমস্ত ধর্ম, নিয়মনীতি, আইন-কানুন, তর্জ-তরীকা বাতিল ঘোষণা করে ইসলাম নাযিল করেছেন। যাতে আইন-কানুন, নিয়মনীতি, তর্জ-তরীকা ইত্যাদি নতুন করে দেয়া হয়েছে যা ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ইত্যাদি প্রতিক্ষেত্রেই পালনীয় যা ক্বিয়ামত পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। যার কারণে মুসলমানগণকে অন্য কোন ধর্ম বা সম্প্রদায় থেকে কোন নিয়ম-নীতি, তর্জ-তরীক্বা, আইন-কানুন কর্জ করতে হবেনা। বরং ইসলাম থেকেই সকলকে কর্জ করতে হবে।
গণতন্ত্র কাকে বলে?
গণতন্ত্র হচ্ছে- মানব রচিত শাসন ব্যবস্থা, যার আইন-কানুন, নিয়ম-নীতি, তর্জ তরীক্বা মানুষের দ্বারা রচিত। মূলতঃ গণতন্ত্র শুধু মানব দ্বারাই রচিত নয় বরং তা বিধর্মীদের দ্বারা বিশেষ করে ইহুদীদের দ্বারা উদ্ভাবিত ও প্রবর্তিত, আর খৃষ্টানদের দ্বারা সংস্কারকৃত শাসন পদ্ধতি। যা আল্লাহ্ পাক-এর তরফ থেকে ওহীর দ্বারা নাযিলকৃত নয়। বরং পূর্ববর্তী জামানায় আল্লাহ্ পাক-এর তরফ থেকে নাযিলকৃত আসমানী কিতাব বিকৃত হওয়ার অথবা নফসানিয়াতের দরুন উক্ত কিতাব বিকৃতি বা পরিত্যাগ করার পর বিধর্মীরা তাদের দেশ পরিচালনা করার জন্য, খোদায়ী আইনের পরিবর্তে নিজেরা যে সব আইন প্রণয়ণ করেছিল, পরবর্তী সময় সেগুলো বিভিন্ন নামে পরিচিতি লাভ করে। তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে গণতন্ত্র, যা খ্রীষ্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে গ্রীসে উৎপত্তি লাভ করেছে এবং বর্তমান বিশ্বে ব্যাপক প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে।
গণতন্ত্রের ইংরেজী হচ্ছে- Democracy। যা এসেছে গ্রীক ‘Demos’ এবং ‘Kratos’ থেকে। ‘Demos’ অর্থ জনগণ এবং ‘Kratos’ অর্থ শাসন। পলিটিক্যাল সাইন্স বা রাষ্ট্র বিজ্ঞান বইয়ে উল্লেখ করা হয়েছে যে, গণতন্ত্র শব্দের অর্থ হচ্ছে- ‘গণ’ অর্থ জনগণ, আর ‘তন্ত্র’ অর্থ নিয়ম-নীতি বা পদ্ধতি। অর্থাৎ গণতন্ত্রে জনগণের নিয়ম-কানুন বা পদ্ধতি অনুযায়ী শাসন ব্যবস্থা বা সরকার পরিচালনা করা হয়। এক্ষেত্রে গণতন্ত্রের প্রবক্তা আব্রাহাম লিঙ্কনের উক্তি উল্লেখ্য। তার ভাষায়- “Democracy is a Government of the people, by the people and for the people” যার অর্থ হলো- গণতান্ত্রিক সরকার জনগণের, জনগণের দ্বারা ও জনগণের জন্য।
তাই গণতন্ত্রে সার্বভৌমত্ব ক্ষমতার মালিক বা সকল ক্ষমতার উৎস হচ্ছে একমাত্র জনগণ। আর এই সার্বভৌম ক্ষমতা বা সমস্ত ক্ষমতার মালিক হওয়ার কারণেই গণতন্ত্রীরা নিজেরাই নিজেদের জন্য আইন-কানুন, তর্জ-তরীকা, নিয়ম-নীতি ইত্যাদি প্রণয়ন করে থাকে। অর্থাৎ গণতন্ত্রে জনপ্রতিনিধিরা একমাত্র আইন প্রণেতা। তাই গণতান্ত্রিক আইন সভায় যদি কোন কুরআন-সুন্নাহ্র অর্থাৎ শরয়ী কোন আইন পেশ করা হয় আর যদি সেটা তাদের গণতান্ত্রিক ধ্যান-ধারণার খেলাফ হয় বা মনোপুত না হয় তাহলে সে সব শরয়ী আইন সেখানে উপেক্ষিত হয় বা আদৌ গৃহীত হয়না। কারণ গণতান্ত্রিক বিধিঅনুযায়ী তাদের অধিকাংশ আইন প্রণেতা যে বিষয় একমত পোষণ করবে সেটাই আইন হিসেবে গৃহীত হবে।
অর্থাৎ ‘ইসলাম আল্লাহ্ পাক-এর তরফ থেকে আল্লাহ্ পাক-এর রসূল, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি ওহীর মাধ্যমে নাযিলকৃত দ্বীন। তার সাথে গণতন্ত্রের কোনই সম্পর্ক নেই। কারণ ইসলামের আইন-কানুন, নিয়ম-নীতি ও তর্জ-তরীক্বা, আল্লাহ্ পাক-এর তরফ থেকে নাযিল করা হয়েছে। আর গণতন্ত্রের যে আইন-কানুন, নিয়ম-নীতি ও তর্জ-তরীক্বা, তা মানুষের দ্বারা তৈরী করা হয়েছে বা হয়। যার সাথে আল্লাহ্ পাক-এর কোন সম্পর্ক নেই, আল্লাহ্ পাক-এর রসূল, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কোন সম্পর্ক নেই, ওহীর কোন সম্পর্ক নেই। এক কথায় ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই।
উল্লেখ্য গণতন্ত্রীরা যে আইন প্রণয়ণ করেছে তা আল্লাহ্ পাক ও তাঁর রসূল সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রদত্ত আইনের খেলাফ হওয়া সত্ত্বেও তাদের কাছে তা গৃহীত হয়েছে এবং তা বাস্তবায়িত করার জন্য তারা সর্বপ্রকার ব্যবস্থাও গ্রহণ করেছে।
শুধু তাই নয় তাদের ভাষায় ইসলামী আইন-কানুন যা আল্লাহ্ পাক ও তাঁর রসূল সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর তরফ থেকে প্রদত্ত হয়েছে তা থেকে অনেক আইন কানুনই পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও সংস্কার করতে হবে এবং করতে শুরুও করেছে। নিম্নে তার উদাহরণ পেশ করা হলো-
ওয়ারিছ সত্ত্বের ক্ষেত্রে
কুরআন-সুন্নাহ্ অনুযায়ী শরীয়তের ফতওয়া হলো- দাদা জীবিত থাকতে পিতা ইন্তিকাল করলে নাতি ওয়ারিছ হবেনা। যা আল্লাহ্ পাক কুরআন শরীফে সূরা নিসার ১১-১২নং আয়াত শরীফে উল্লেখ করেন।
অথচ ১৯৬১ সনে প্রেসিডেন্ট আইউব খানের কথিত গণতান্ত্রিক সরকার কুরআন-সুন্নাহ্ অনুযায়ী শরীয়তের উক্ত ফতওয়াকে ইয়াতিমের জন্য ক্ষতিকারক বলে রদ বা বাতিল ঘোষণা করে। অতঃপর উক্ত কথিত গণতান্ত্রিক সরকার কথিত গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতায় ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক অধ্যাদেশ জারী করে কুরআন-সুন্নাহ্র মনগড়া পরিবর্তন, পরিবর্ধন, সংশোধন ও সংযোজনের মাধ্যমে নতুন আইন জারী করে যে, দাদা জীবিত থাকতে পিতা ইন্তিকাল করলেও নাতি ওয়ারিছ হবে, যা উক্ত অধ্যাদেশের ৪নং ধারায় বলা হয়েছে- “যাহার সম্পত্তি মিরাসে বন্টন হইবে, তাহার পূর্বে তাহার কোন পুত্র বা কন্যা মারা গেলে এবং উক্ত ব্যক্তির মৃত্যুর পর তাহার সম্পত্তি বন্টনের সময় উক্ত পুত্র বা কন্যার কোন সন্তানাদি জীবিত থাকলে তাহারা প্রতিনিধিত্বের হারে সম্পত্তির ঐ অংশ পাইবে যাহা তাহাদের পিতা অথবা মাতা জীবিত থাকলে পাইতো।” যা শরীয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ নাজায়েয, হারাম ও কুফরী।
এক্ষেত্রে কুরআন-সুন্নাহ্র ফায়সালা হলো, “দাদা জীবিত থাকতে পিতা ইন্তিকাল করার কারণে যে নাতি-নাতিনী ইত্যাদি যারা লা ওয়ারিছ হয়, তাদের জন্য দাদার পক্ষ থেকে সম্পূর্ণ সম্পত্তির এক তৃতীয়াংশ পর্যন্ত ওছিয়ত করার নির্দেশ রয়েছে। যদি কেবল দাদার গাফলতীর কারণে ওছিয়ত না করার জন্য লা ওয়ারিছ নাতি-নাতিনীরা কষ্টের স্বীকার হয়, তাহলে উক্ত দাদা কবীরা গুণাহে গুণাহ্গার হবে।
উল্লেখ্য যে, কুরআন-সুন্নাহ্তে ওছিয়ত করার যে নির্দেশ রয়েছে, তা একমাত্র যারা লা ওয়ারিছ বা ওয়ারিছ নয়, তাদের জন্যই। কেননা যারা ওয়ারিছ, তাদের জন্য ওছিয়ত করা নাজায়েয ও হারাম।
স্মর্তব্য যে, কুরআন-সুন্নাহ্তে যেরূপ নাতি দাদার ওয়ারিছ নয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে, তদ্রুপ কুরআন-সুন্নাহ্তেই অভাবগ্রস্থ নাতির জন্য দাদার ওছিয়ত করা অবশ্যই কর্তব্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
কুরআন-সুন্নাহ্ সম্পর্কে অজ্ঞতা, জেহালত ও মূর্খতার কারণেই কথিত গণতন্ত্রীরা আল্লাহ্ পাক-এর এ আদেশকে ইয়াতিমের জন্য ক্ষতিকারক বলে উল্লেখ করেছে। শরীয়তের দৃষ্টিতে যা সম্পূর্ণ নাজায়েয, হারাম ও কুফরী।
বিয়ের বয়সের ক্ষেত্রে
কুরআন-সুন্নাহ্ অনুযায়ী ছেলে ও মেয়েকে বিয়ে করার ও বিয়ে দেয়ার জন্য কোন বয়স নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়নি। অর্থাৎ ৫, ১০, ১৫ ইত্যাদি বছরের কমে অথবা ৪০, ৬০, ৮০ ইত্যাদি বছরের চেয়ে বেশী বয়সে বিয়ে করা যাবে বা যাবেনা, এমন কোন শর্ত-শারায়েত বর্ণনা করা হয়নি।
কিন্তু গণতান্ত্রিক সরকার তাদের গণতান্ত্রিক নিয়ম-নীতি অনুযায়ী কোন মেয়ের বিয়ে বসা বা বিয়ে দেয়ার জন্য কমপক্ষে ১৮ বছর বয়স হওয়ার আইন বা শর্ত করে দিয়েছে এবং ১৮ বছর বয়সের নীচে কোন মেয়েকে বিয়ে দেয়া, বিয়ে করা বা কোন মেয়ের জন্য বিয়ে বসা দন্ডনীয় অপরাধ বলে সাব্যস্ত করা হয়েছে। যেমন- এ প্রসঙ্গে ১৯২৯ সালের বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনের ২এর (ক) উপধারায় বলা হয়েছে- “শিশু বা নাবালক বলিতে ঐ ব্যক্তিকে বুঝাইবে, যাহার বয়স পুরুষ হইলে একুশ বছরের নীচে এবং স্ত্রী হইলে আঠার বছরের নীচে হইবে।”
আর এরূপ নাবালকের বিয়ের শাস্তি প্রসঙ্গে এই আইনের ৪ ধারায় বলা হয়েছে- “একুশ বৎসরের অধিক বয়স্ক কোন পুরুষ বা আঠার বৎসরের অধিক বয়স্কা কোন মহিলা কোন শিশুর সহিত বিবাহের চুক্তি সম্পাদন করিলে, তাহার একমাস পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদন্ড কিংবা এক হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় প্রকারের দন্ডই হতে পারে।”
উল্লেখ্য, এ আইনের ৫ ও ৬ ধারায় এরূপ বিবাহ সম্পন্নকারী ও অভিভাবকের জন্যও একই শাস্তির কথা উল্লেখ করা হযেছে।
এক্ষেত্রে স্মরনীয় যে, যিনি সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, তিনি স্বয়ং নিজেই হযরত আয়েশা ছিদ্দীকা রদিয়াল্লাহু আনহাকে ৬ বছর বয়সে বিয়ে করেছিলেন ও ৯ বছর বয়সে ঘরে তুলে নিয়েছিলেন। তাহলে কি আল্লাহ্ পাক-এর রসূল, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং হযরত আয়েশা ছিদ্দীকা রদিয়াল্লাহু আনহা-এর পিতা হযরত আবূ বকর ছিদ্দীক রদিয়াল্লাহু আনহু তাদের গণতান্ত্রিক নিয়ম-নীতি অনুযায়ী দন্ডনীয় হবেন? (নাউযুবিল্লাহ্ মিন যালিক)। যা কেউ কল্পনা করলেও কাট্টা কাফির ও চির জাহান্নামী হবে।
উল্লেখ্য, ইসলামে ছেলে ও মেয়ে উভয়ের জন্য বিয়ের বয়স নির্ধারণ করে দেয়া হয়নি, তার শত-সহস্র কারণ রয়েছে। বিয়ে করা সাধারণভাবে সুন্নাত আর ক্ষেত্র বিশেষে ফরজ ও হারাম। হাদীস শরীফে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, النكاح من سنتى.
অর্থঃ- “বিয়ে করা হলো আমার সুন্নত।”
“যে ব্যক্তির জন্য বিয়ে করা ফরজও নয় এবং হারামও নয়, তার জন্য বিয়ে করা হচ্ছে সুন্নত।”
“আর যে ব্যক্তির পাপ কাজে লিপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, অথচ বিয়ে করার সামর্থ্য রয়েছে, এরূপ ব্যক্তির জন্য বিয়ে করা ফরজ।”
“আর যে ব্যক্তি বিয়ে করলে তার পক্ষে বিয়ের হক্ব পুরোপুরিভাবে আদায় করা সম্ভব নয়, তার জন্য বিয়ে করা হারাম।” এ প্রকার লোকদেরকে (অন্যায়-অসৎ কাজে লিপ্ত হওয়ার সম্ভাবনায়) হিফাযত করার জন্য আল্লাহ্ পাক-এর রসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রোজা রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। তাই যদি কেউ বিয়ের বয়স নির্ধারণ করে দেয়, তবে সেটা সম্পূর্ণ নাজায়েয হারাম ও কুফরী হবে। এছাড়া আরো অনেক আইন পরিবর্তন করেছে ও করছে।
মূলতঃ যে কোন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সংবিধানের প্রস্তাবনা, মৌলিক অধিকার, শাসন বিভাগ, বিচার বিভাগ তথা দেওয়ানী ও ফৌজদারী দন্ডবিধি ইত্যাদি বিষয়ে অনেক অনেক অনৈসলামিক আইন তথা আইনের উৎস সম্পৃক্ত থাকে যার প্রেক্ষিতে দৈনন্দিন জীবনের প্রায় সব ক্ষেত্রেই অনৈসলামিক আইন ও প্রবাহ সূচিত হয় এবং কথিত গণতান্ত্রিক আবহে তার নিরসন কখনও সম্ভব নয়।
প্রাচীন গ্রীসে খ্রীষ্টপূর্ব পঞ্চম এবং ষষ্ঠ শতাব্দীতে নির্বাচন প্রথা চালু ছিল। এছাড়া রোমান সিনেটেও এ পদ্ধতি চালু ছিল। Election সম্পর্কে ধর্ম, মিথলজি বিষয়ক Encyclopedia Man, Myth’s Magic বলা হয়েছে-Election, the world is derived from the Greek word eloge (choice). The idea is basic to the traditional structure of Christian theology. অর্থাৎ ইলেকশন বা নির্বাচন শব্দটি উৎসরিত হয়েছে বা উৎপত্তি লাভ করেছে গ্রীক শব্দ Eloge হতে যার অর্থ ছিল পছন্দ। নির্বাচনের ধারণা প্রাচীন খ্রীষ্টীয় ধর্মতত্ত্বের ব্যাখ্যার উপর প্রতিষ্ঠিত। এ ব্যাখ্যাটি এরূপ যে, তাদের God নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তিবর্গ অথবা জাতিকে বিশেষভাবে পছন্দ করতেন তার রাজত্বে বিশেষ কিছু ভূমিকা পালনের জন্য, যাকে বলা হত নির্বাচন। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে, The idea that God specially choses certain individuals or nations for some peculiar role in the scheme of his providence is khown as election. উল্লেখ্য, খ্রীষ্টান ধর্মতত্ত্বে নির্বাচনের ধারণাটি অদৃষ্টবাদ থেকে এসেছে। এ সম্পর্কে বলা হয়েছেঃ In Christian theology the idea of election became associated with predestination, খ্রীষ্টানদের আরো ধারণা যে, তাদের খোদার পছন্দনীয় বা elected অবশ্যই স্বল্প হবে। Many are called buf few are chosen (Mathew- 22-14) মূলকথা হচ্ছে নির্বাচন খ্রীষ্টীয় ধর্মতত্ত্বের সাথে বিশেষভাবে সম্পৃক্ত একটি বিষয়। এ বিষয়ে Man, Myth & Encyclopedia Magic, আরো বলা হয়েছে, “However that the doctrine of election found its most notable expression in Christianity.
আধুনিক কালের ইতিহাস
তবে আধুনিক ভোটদান ব্যবস্থার সূত্রপাত ঘটে ইংল্যান্ডে ১৬৮৮ সালে। ইংল্যান্ডে ১৬৮৮ সালে বিপ্লবের পর রাজনৈতিক ক্ষমতা পার্লামেন্টের হাতে চলে যায়। পার্লামেন্ট ১৮৩২ সালে প্রথম সংস্কার আইনে সমস্ত মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে ভোটাধিকার দেয়। এরপর পর্যায়ক্রমে ১৮৬৭ সালে কারখানার শ্রমিকদের, ১৮৮৪ সালে কৃষি মজুরদের, ১৯১৮ সালে সীমিত সংখ্যক নারীদের এবং ১৯২৮ সালে সকল নারীদের ভোটাধিকার দেয়া হয়। ১৯১৮ সালের পূর্বে বৃটেনে বিশ্ব বিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েটরা সাধারণ কেন্দ্র ও বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্র এ দু’টি কেন্দ্রের ভোটাধিকারী ছিল। পরবর্তীতে অর্থাৎ ১৯৪৮ সালে এ সকল পদ্ধতির সমাপ্তি ঘটিয়ে একুশ বছর বা তদুর্ধ বয়সের সকল সম্প্রদায়ের জন্য সার্বজনীন ভোটাধিকার দেয়া হয়।
অপরদিকে আমেরিকায় ১৮৭০ খৃষ্টাব্দে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে বলা হয় যে, কোন ব্যক্তিকে তার জাতি, ধর্ম অথবা পূর্ব দাসত্বের জন্য ভোটদানের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবেনা। ১৯৩৩ সালে সপ্তদশ সংশোধনীতে সিনেট সদস্যদের, জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হয়। ১৯২০ সালে মহিলা ভোটাধিকার স্বীকৃত হয়। ১৯৭১ সালে ভোটারদের বয়স সীমা কমিয়ে ১৮ বছরে আনা হয়।
ভোটের প্রকারভেদ ও ব্যালট প্রথা
উল্লেখ্য, ভোট হলো দু’প্রকার- (১) প্রকাশ্য ভোটদান, (২) গোপনে ভোটদান।
প্রকাশ্য ভোটদান ব্যবস্থায় ভোটদানকারীরা বিপরীত পক্ষীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তাই এটি সর্বত্রই পরিত্যক্ত হয়েছে।
আর গোপনে ভোটদান ব্যবস্থায় ভোটদানকারীরা কারো দ্বারা কোন প্রকার ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার সম্ভাবনা থাকেনা, তারা তাদের ভাষায় নির্ভয়ে ও স্বাধীনভাবে ভোট প্রদান করতে পারে। তাই ব্যালট পেপারের মাধ্যমে এ ব্যবস্থা প্রায় সর্বত্রই চালু রয়েছে।
ব্যালট
ব্যালট হচ্ছে একটি কাগজের শীট, যার দ্বারা গোপন ভোট প্রদান করা হয়। ইধষষড়ঃ শব্দটি এসেছে ইটালী ব্যালোটা ইধষষড়ঃরধ হতে। যার অর্থ হচ্ছে- ছোট বল। এটি এভাবে উৎপত্তি হয়েছে যে, প্রাচীনকালে এর দ্বারা ভোট গ্রহণ করা হতো এবং গ্রীসে এই পদ্ধতির প্রচলন ছিল। জনতার দরবারে অথবা আইন সভায় খ্রীষ্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে এবং কখনো কখনো রোমান সিনেটে এই পদ্ধতি চালু ছিল। সাধারণতঃ সাদা এবং কালো বল হ্যাঁ এবং না বোধক ভোটে ব্যবহৃত হতো।
অপরদিকে আমেরিকায় উপনিবেশিক কালের শুরুতে সীম শস্যকণা ব্যালট হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
উল্লেখ্য, কোন কোন সংগঠন এখনো নতুন সদস্য গ্রহণে ভোটাভুটিতে সাদা এবং কালো বলের ব্যবহার করে থাকে।
বর্তমানে গণতান্ত্রিক দেশসমূহে কাগজের ব্যালট বা ব্যালট পেপার নির্বাচনে ভোটারদের ছদ্মনাম হিসেবে কাজ করে এবং এভাবেই অধিকাংশ ভোটারের ইচ্ছা প্রকাশ পায়।
গোপন ভোটদানের পদ্ধতি হিসেবে ব্যালট পেপার ব্যবহারের প্রথম প্রামাণিক ঘটনা ঘটে ১৬২৯ সালে আমেরিকার চার্চে। অতঃপর আমেরিকান ঔপনিবেশে এই ব্যালট পেপারের প্রচলন ছড়িয়ে পড়ে। এরপরে ধীরে ধীরে ব্যালট পেপারের অনেক সংস্কার হয় এবং পরবর্তীতে একই কলামে বিভিন্ন দলের প্রতীক সংযুক্ত হয়, যা সাধারণতঃ বর্ণমালা অনুযায়ী সংযুক্ত হয়।
উল্লেখ্য, ১৯৫০ সালের মধ্যে এই ব্যালট প্রথা প্রায় সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে।
ইসলামের দৃষ্টিতে নির্বাচন ও ভোট
সাধারণভাবে নির্বাচন বলতে বুঝায়, “একাধিক পদপ্রার্থী থেকে ভোটদানের মাধ্যমে একজনকে নির্বাচিত করা।” যে বা যারা পদের মুখাপেক্ষী তারা তাদের পদের জন্য মানুষের নিকট তাদের মুখাপেক্ষীতা প্রকাশ করে থাকে তখন মানুষ তাদের বিবেচনায় যাকে উপযুক্ত মনে করে তাকেই ভোট দিয়ে নির্বাচিত করে। উল্লেখ্য, নির্বাচিত ব্যক্তি পদের মুখাপেক্ষী, পদ নির্বাচিত ব্যক্তির মুখাপেক্ষী নয়।
আর ভোট হচ্ছে এমন একটি সিদ্ধান্ত নেয়ার পদ্ধতি যাতে প্রত্যেক ব্যক্তি পারে তার পছন্দনীয়কে চিহ্নিত করতে বা প্রকাশ করতে এবং যে পছন্দের সংখ্যা বেশী হয়, তাই গ্রহণযোগ্য হয়।
উল্লেখ্য, সংবিধানে ভোটদানের জন্য কিছু শর্ত-শারায়েত করা হয়েছে। সেগুলো হচ্ছে- দু’টি। (১) বাংলাদেশের নাগরিক হওয়া, (২) ভোটদাতার বয়স আঠারো বছরের কম নয়।
আর এক্ষেত্রে যে অযোগ্যতা, তা হলো- (১) কোন যোগ্য আদালত তাকে অপ্রকৃতিস্থ বলে ঘোষণা করেনি। (২) ১৯৭২ সালের বাংলাদেশে যোগসাজসকারী (বিশেষ ন্যায় পীঠ) আদেশের অধীন কোন অপরাধের জন্য দন্ডিত হননি। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এসব শর্ত দ্বারা ইসলাম পালিত হয় না।
প্রকৃতপক্ষে নির্বাচন হচ্ছে গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি। কেননা নির্বাচনের মাধ্যমেই গণতন্ত্র বাস্তবায়িত হয়। আর নির্বাচনের প্রয়োজন তখনই হয় যখন কোন পদে একাধিক ব্যক্তি প্রার্থী হয়। একাধিক প্রার্থীর মধ্যে উক্ত পদ একজনকে দেয়ার লক্ষ্যেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আর উক্ত নির্বাচন ভোট প্রয়োগের মাধ্যমেই বাস্তবায়িত হয়।
উল্লেখ্য, বর্তমান গণতান্ত্রিক নির্বাচন, তার পদপ্রার্থী হওয়া ও পদপ্রার্থীকে ভোট দেয়া ইত্যাদি কাজগুলিকে ইসলামের নামে ফরজ-ওয়াজিব হিসেবে উল্লেখ করা নাজায়েয ও হারাম।
আরো উল্লেখ্য, গণতন্ত্রের মূল বিষয় বা ভিত সমূহের মধ্যে অন্যতম হলো সার্বভৌমত্ব জনগণের। অর্থাৎ জনগণই হচ্ছে গণতন্ত্রের মূল অথবা গণতন্ত্রে জনগণই সকল সার্বভৌমত্বের মালিক।
স্মরণীয়, আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র যেহেতু বিশাল এলাকা ও জনগোষ্ঠীর সমন্বয়ে গঠিত সেহেতু জনসাধারণের পক্ষে সরকার পরিচালনায় প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ সম্ভব নয়। তাই জনগণ ভোটদানের মাধ্যমে তাদের সার্বভৌম ক্ষমতা ব্যবহার করে প্রতিনিধি নির্বাচন করে পরোক্ষভাবে সরকার পরিচালনায় অংশগ্রহণ করে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে- এরূপ ভোট শরীয়তসম্মত কিনা? যদি শরীয়তসম্মত না হয়, তাহলে কেন বা কি কারণে শরীয়তসম্মত নয়?
গণতন্ত্রে সার্বভৌমত্ব জনগণের কিন্তু ইসলামে সার্বভৌমত্ব আল্লাহ্ পাক-এর
উল্লেখ্য, পূর্বেই আলোচনা করা হয়েছে গণতন্ত্রের মূল বিষয় বা ভিত্তিসমূহের মধ্যে অন্যতম হলো সার্বভৌমত্ব জনগণের। অর্থাৎ জনগণই হচ্ছে গণতন্ত্রের মূল। অথচ আল্লাহ্ পাক “সূরা মায়েদার” ১২০নং আয়াত শরীফে বলেন,
لله ملك السموت والارض وما فيهن وهو على كل شئ قدير.
অর্থঃ- “আসমান ও জমিন এবং এর মধ্যে যা কিছু রয়েছে, সমস্ত কিছুরই মালিক আল্লাহ্ পাক। আর তিনিই সমস্ত কিছুর উপর ক্ষমতাবান।”
পবিত্র কালামুল্লাহ্ শরীফে ইরশাদ হয়েছে,
هو الله الخالق البارئ المصورله الاسماء الحسنى يسبح له ما فى السموت والارض وهو العزيز الحكيم.
অর্থঃ- “তিনিই আল্লাহ্ তায়ালা, স্রষ্টা, উদ্ভাবক, রূপদাতা, উত্তম নামসমূহ তারই। নভোমন্ডলে ও ভূমন্ডলে যা কিছু আছে সবই তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করে। তিনি পরাক্রান্ত প্রজ্ঞাময়।” (সূরা হাশর/২৪) অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে,
قل اللهم ملك الملك تؤتى الملك من تشاء وتنزع الملك ممن تشاء وتعز من تشاء وتذل من تشاء بيدك الخير انك على كل شئ قدير.
অর্থঃ- “বলুন, {হে মুহম্মদ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম} আয় আল্লাহ্ পাক! সমগ্র রাজ্যের মালিক আপনি। আপনি রাজ্য যাকে ইচ্ছা প্রদাণ করেন এবং যার হতে ইচ্ছা করেন রাজ্য ছিনিয়ে নেন। আর যাকে ইচ্ছা সম্মান দান করেন আর যাকে ইচ্ছা অপমানে পতিত করেন। আপনারই হাতে রয়েছে যাবতীয় কল্যাণ। নিশ্চয়ই আপনি সর্ব বিষয়ে ক্ষমতাশীল।” (সূরা আলে ইমরান/২৬) অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে,
ولله ما فى السموت وما فى الارض يغفر لمن يشاء ويعذب من يشاء والله غفور رحيم.
অর্থঃ- “আর যা কিছু আসমান ও জমিনে রয়েছে, সে সবই মহান আল্লাহ্ পাক-এর। তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করবেন, যাকে ইচ্ছা আযাব দান করবেন। আর আল্লাহ্ পাক হচ্ছেন, ক্ষমাকারী, করুণাময়।” (সূরা আলে ইমরান/১২৯)
এছাড়া অনুরূপ আয়াত “সূরা আনয়াম/১৭,৫৭, সূরা ফাতির/১০, সূরা বাক্বারা/১১৭, সূরা শুরা/৭৩, সূরা আনয়াম/৯৫, সূরা মু’মিন/৬৮, সূরা আল ফুরকান/২, সূরা হাদীদ/৩, সূরা আছা ছাফফাত/১৮০-১৮২, সূরা জাছিয়াত/৩৬-৩৭ সহ আরো অনেক আয়াত শরীফে মহান আল্লাহ্ পাক-এর সার্বভৌমত্বের কথা লিপিবদ্ধ রয়েছে।
কাজেই “সার্বভৌমত্ব জনগণের” একথা বলা ও মানা কুফরী। অবশ্য যদিও কেউ কেউ বলে থাকে যে, “সার্বভৌমত্ব জনগণের” এটা আমরা মানিনা, অথচ তারা পূর্ণরূপেই ইসলামের নামে গণতন্ত্র মানে ও করে। তাদের জন্য আফসোস, তারা এত অজ্ঞ যে, তারা গণতন্ত্র ও সার্বভৌমত্বের সাথে যে কি সম্পর্ক এবং সার্বভৌমত্বই বা কাকে বলে সে বিষয়ে তাদের বিন্দুতম জ্ঞান নেই বললেই চলে।
কারণ গণতন্ত্রে জনগণকে যে সার্বভৌমত্বের অধিকারী বলা হয়েছে, সে সার্বভৌমত্বের বহিঃপ্রকাশই ঘটে ভোট প্রয়োগের মাধ্যমে। অর্থাৎ গণতন্ত্রে জনগণ ভোট দেয়ার ব্যাপারে কারো মুখাপেক্ষী নয় এবং সে ভোট কাকে দেবে বা দেবেনা, সে বিষয়েও কারো কাছে তাকে জবাবদিহী করতে হয়না।
অতএব, যারা নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করে বা তা সমর্থন করে, তারা সার্বভৌমত্ব যে জনগণের, আল্লাহ্ পাক-এর নয়, তা ইচ্ছায় হোক, অনিচ্ছায়ই হোক মেনে নেয় এবং ভোট দানের মাধ্যমে তার বহিঃপ্রকাশ ঘটায়।
উপরোক্ত আলোচনা থেকে এ কথাই স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হচ্ছে যে, “নির্বাচন” যার ইংরেজী হচ্ছে “ইলেকশন” (ঊষবপঃরড়হ) যা গ্রীক “এ্যালোজি” (ঊষড়মব) শব্দ থেকে উৎসারিত বা উৎপত্তি লাভ করেছে। যা পরবর্তীতে খ্রীষ্ট ধর্মের সাথে বিশেষভাবে সম্পৃক্ত হয়ে খ্রীষ্ট ধর্মের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। যার সাথে ইসলামের কোন দিক থেকে কোন প্রকার সম্পর্ক নেই। বরং যা জনগণকে সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক বলে প্রতিপন্ন করে আর এই ভোট পদ্ধতি ইসলামের শুরা বা পদ্ধতি থেকেও অংকুরিত হয়নি। বরং এর প্রতিটি অনুষঙ্গ যথা সার্বজনীন ভোটাধিকার, প্রার্থী হওয়া, ব্যালট প্রথা, গননা ও মূল্যায়ন ইত্যাদি সবকিছুই এসেছে ইহুদী-নাছারাদের থেকে। আর হাদীস শরীফে এসেছে,
من تشبه بقوم فهو منهم.
অর্থঃ- “যে যে জাতির সাথে মিল বা তাশাব্বু রাখে তার হাশর-নশর তার সাথে হবে।”
তাই এই ভোটের রাজনীতি ইসলামের নামে করা শুধু অবৈধই নয় বরং একে ইসলামের নামে বৈধ বলাও কুফরীর অন্তর্ভূক্ত।
তাহলে গণতন্ত্রই যদি ইসলামে নাজায়েয হয় অর্থাৎ ইসলামের নামে গণতন্ত্র করা হারাম হয়। আর নির্বাচন পদ্ধতিও যদি ইসলামে গ্রহণযোগ্য না হয়। অর্থাৎ ইসলামের নামে নির্বাচন করাও নাজায়েয হয় তাহলে ভোট প্রথা কি করে ইসলামসম্মত হতে পারে? অর্থাৎ ভোট প্রথা ইসলামের নামে করা সম্পূর্ণ নাজায়েয ও হারাম। শরীয়তের মাসয়ালা হলো, হারামকে হালাল বলা ও হালালকে হারাম বলা কুফরী। তাহলে যা নাজায়েয ও হারাম তা কি করে ওয়াজিব হতে পারে? বরং ইসলামের নামে ভোট প্রথা সম্পূর্ণই নাজায়েয ও হারাম।
ভোট আমানত নয়
অতএব ভোট প্রথা ওয়াজিব বলার প্রশ্নই আসেনা বরং শুধু ইসলামে জায়েয বলাটাও কুফরীর অন্তর্ভূক্ত। আর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ভোট প্রদান হচ্ছে কথিত সুনাগরিকের প্রধান দায়িত্ব ও কর্তব্য। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে ভোটকে আমানত হিসেবে উল্লেখ করা হয় না। কারণ ভোটদাতাকে যদি আমানতদার বলা হয় তবে প্রশ্ন উঠে, তাকে এ আমানত দিল কে?
যারা ভোটকে আমানত বলে উল্লেখ করে থাকে তারা নিম্নের আয়াত শরীফকে দলীল হিসেবে উল্লেখ করে থাকে। অথচ নিম্নের আয়াত শরীফের সাথে ভোটের কোনই সম্পর্ক নেই।
আমানত সংক্রান্ত আয়াত শরীফ, তার অর্থ, শানে নুযূল ও ব্যাখ্যা
উল্লেখ করা হলো-
ان الله يأمركم ان تودوا الامنت الى اهلها واذا حكمتم بين الناس ان تحكموا بالعدل ان الله نعما يعظكم به ان الله كان سميعا بصيرا.
অর্থঃ- “নিশ্চয়ই আল্লাহ্ পাক তোমাদেরকে আদেশ করেন যে, তোমরা আদায় করে দাও আমানত সমূহকে তার হকদারদেরকে এবং যখন তোমরা মানুষের মধ্যে ফায়সালা বা বিচার করবে, তখন ন্যায়ের সাথে বিচার করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ পাক তোমাদেরকে উত্তম উপদেশ দান করেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ পাক সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা।” (সূরা নিসা/৫৮)
শানে নুযুলঃ হিজরতের পূর্বে জাহেলিয়াতের যুগে, সপ্তাহে দু’দিন সোমবার ও বৃহস্পতিবার কা’বা শরীফের দরজা খোলা হতো। যাতে যারা কা’বা শরীফে প্রবেশ করতে ইচ্ছুক, তাঁরা যেন প্রবেশ করতে পারে। এবং উক্ত ঘরের চাবীর জিম্মাদার ছিলেন উসমান বিন তাল্হা।
একদা কা’বা শরীফের দরজা খোলার পর আল্লাহ্ পাক-এর রসূল, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কিছু সংখ্যক হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদিয়াল্লাহু আনহুমগণকে নিয়ে প্রবেশ করতে আসলে, তখন সে বাঁধা প্রদান করে এবং কিছু কটু কথা বলে। এ সকল অশালীন ও অশোভনীয় আচরন লক্ষ্য করে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “হে উসমান! এমন একদিন আসবে, যেদিন তুমি এ কা’বা ঘরের চাবি আমার হাতে দেখতে পাবে এবং এ চাবি যাকে ইচ্ছা তাকে দেয়ার অধিকারও আমার থাকবে।” ইত্যাদি আরো কিছু কথা বলে হুজুর পাক ছল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যিয়ারত করে চলে গেলেন। পরবর্তীতে যখন মক্কা শরীফ বিজয় হলো, তখন হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা শরীফে কা’বা ঘরের চাবি উসমান বিন তালহার কাছ থেকে নিয়ে কা’বা শরীফ খুলে তার মধ্যে প্রবেশ করে দু’রাকায়াত নামায পড়লেন। অতঃপর যখন বের হলেন, তখন হযরত আব্বাস রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ্ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমরা তো পানি পান করানোর জিম্মাদারীতে আছি, সুতরাং আমাদেরকে কা’বা ঘরের চাবিরও জিম্মাদারী করে দিন।
এখন কাকে চাবি দেয়া হবে, তা উক্ত আয়াত শরীফ নাযিল করে তার মাধ্যমে আল্লাহ্ পাক জানিয়ে দিলেন, তখন হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উসমান বিন তালহাকে ডেকে বললেন, “তোমার কি সেই কথা স্মরণ আছে যে, আমি বলেছিলাম কাবা ঘরের চাবি আমার হাতে আসবে এবং যাকে ইচ্ছা তাকে দেয়ার অধিকার আমার থাকবে।” অতঃপর তার নিকট চাবি অর্পণ করলেন এবং বলেলন, এ চাবি ক্বিয়ামত পর্যন্ত তোমার বংশধরগণের নিকট থাকবে, যে এটি নিবে সে জালিমের অন্তর্ভূক্ত হবে।
আল্লাহ্ পাক-এর রসূল, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উক্ত ভবিষ্যৎবাণী সত্যে বাস্তবায়িত হওয়া দেখে তাঁর ইসলাম গ্রহণের পূর্ব সূক্ষ্ম আকাংখা প্রবল হয়ে উঠল এবং সে ইসলাম গ্রহণ করলো।
ব্যাখ্যাঃ উপরোক্ত আয়াত শরীফে আল্লাহ্ পাক আমানত সমূহের হকদার কে, তার প্রতিই তার (প্রাপ্ত আমানত আদায় করার জন্য) আদেশ করেছেন। এখন আমানত কাকে বলে এবং তা কি কি? এ প্রশ্নের জবাবে হযরত মুফাস্সিরীন-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিগণ উল্লেখ করেন, আমানত সমূহ প্রধানতঃ তিন প্রকার-
(১) الامانة فى عبادة الله.
অর্থঃ- “আল্লাহ্ পাক- এর ইবাদত সম্পর্কে আমানত।”
(২) الامانة مع النفس.
অর্থঃ- “নফ্সের আমানত।”
(৩) امانة العبد مع سائرعباد الله.
অর্থঃ- “বান্দার উপর অন্যান্য সকল আমানত সমূহ।”
অর্থাৎ (১) আল্লাহ্ পাক-এর আদেশ ও নিষেধ সমূহ, যেমন- ওযু, গোছল, জানাবাত, নামায, রোযা, যাকাত ইত্যাদি ইবাদতসমূহ আদায় করা এবং এর থেকে বিরত না হওয়া।
(২) আল্লাহ্ পাক বান্দাদেরকে যে সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দান করেছেন, যেমন- জিহ¡াকে হিফাযত করা, মিথ্যা, গীবত, চোগলখুরী থেকে, চক্ষুকে হারাম দৃষ্টি থেকে, কানকে গান-বাজনা, অশ্লীল বা ফাহেশা কথা-বার্তা শোনা থেকে বিরত রাখা।
(৩) আল্লাহ্ পাক বান্দাদের পরস্পর পরস্পরের মধ্যে যে হক্ব দিয়েছেন। যেমন- মুয়ামেলাত, মুয়াশেরাত ইত্যাদি যথাযথভাবে আদায় করা।
হযরত আনাস রদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত রয়েছে, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
لا ايمان لمن لا امانة له ولا دين لمن لاعهد له.
অর্থঃ- “যার আমানত নেই, তার ঈমানও নেই এবং যার ওয়াদা ঠিক নেই, তার দ্বীনও নেই।” অর্থাৎ যে আমানত খেয়ানত করবে, সে খালিছ ঈমানদার হতে পারবেনা। আর যে ওয়াদার খেলাফ করবে, সে খালিছ দ্বীনদার হতে পারবেনা।
এ ছাড়াও কুরআন শরীফে “সূরা বাক্বারার” ২৮৩ নং আয়াত শরীফে লেন-দেন প্রসঙ্গে আমানতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। “সূরা আনফালের’’ ২৭ নং আয়াত শরীফে জিহাদ প্রসঙ্গে, “সূরা আহযাবের” ৭২ নং আয়াত শরীফে কুরআন শরীফ ও ইসলাম সম্পর্কে, “সূরা মু’মিনুন” ৮ নং আয়াত শরীফে, “সূরা মায়ারিজের” ৩২ নং আয়াত শরীফে, মু’মিনের চরিত্র প্রসঙ্গে আমানতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
অতএব প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর দায়িত্ব ও কর্তব্য হচ্ছে, সে যেন কোন অবস্থাই আমানতের খেয়ানত না করে।
উল্লেখ্য, কুরআন শরীফের কোথাও ভোটকে আমানত বলে উল্লেখ করা হয়নি। শুধু তাই নয়, হাদীস শরীফ, ইজ্মা ও ক্বিয়াসের কোথাও আমানত বলে উল্লেখ করা হয়নি। কারণ ভোট প্রথা ইসলামের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়। অর্থাৎ ইসলামের নামে করা সম্পূর্ণই হারাম।
যা ইসলামের নামে করা জায়েয নেই তা কি করে ঈমানদারদের জন্য আমানত বলে সাব্যস্ত হতে পারে?
ভোটকে ইসলামের দৃষ্টিতে ও ইসলামের নামে আমানত বলা সম্পূর্ণ কুফরী।
ইসলামের দৃষ্টিতে ভোট সাক্ষ্য নয়
সাক্ষী প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক কুরআন শরীফে উল্লেখ করেন,
يايها الذين امنوا كونوا قوامين بالقسط شهداء لله ولو على انفسكم اوالوالدين والاقربين ان يكن غنيا او فقيرا فالله اولى بهما فلا تتبعوا الهوى ان تعدلوا وان تلوا او تعرضوا فان الله كان بما تعملون خبيرا.
অর্থঃ- “হে ঈমানদারগণ! তোমরা ইনছাফের উপর কায়েম থাক, আল্লাহ্ পাক-এর জন্য সাক্ষ্য দেয়ার ব্যাপারে। যদি তা তোমাদের নিজেদের, পিতা-মাতার ও নিকট আত্মীয়দের বিরুদ্ধে হয়। হোক চাই সে ধনী বা দরিদ্র হোক। অতঃপর আল্লাহ্ পাকই তাদের প্রতি অধিক কল্যাণকামী। তোমরা ইনছাফ করতে গিয়ে নফ্সের অনুসরণ করোনা। আর যদি তোমরা বর্ণনায় বক্রতা অবলম্বন কর অথবা সঠিক সাক্ষ্য দেয়া হতে বিরত থাক, তবে নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তায়ালা তোমাদের কাজ সম্পর্কে সমধিক জ্ঞাত।” (সূরা নিসা/১৩৫)
يايها الذين امنوا كونوا قوامين لله شهداء بالقسط ولايجرمنكم شنان قوم على الا تعدلوا اعدلوا هو اقرب للتقوى واتقوا الله ان الله خبير بما تعملون.
অর্থঃ- “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ্ পাক-এর জন্য সঠিক সাক্ষ্য দেয়ার ব্যাপারে ইন্ছাফের উপর কায়েম থাক এবং কোন সম্প্রদায়ের শত্রুতা যেন তোমাদেরকে ন্যায় বিচার করা হতে বিরত না রাখে, তোমরা ন্যায় বিচার কর। এটি তাক্বওয়া বা আল্লাহ্ ভীতির অধিক নিকটবর্তী এবং তোমরা আল্লাহ্ পাককে ভয় কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ পাক তোমাদের কাজ সম্পর্কে সমধিক অবহিত।” (সূরা মায়েদা/৮)
শানে নুযুলঃ একদা একজন ধনী ও একজন গরীব লোক আল্লাহ্ পাক-এর রসূল, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট এসে পরস্পর পরস্পরকে অপরাধের জন্য দোষারোপ করতে লাগলো। অতঃপর হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম গরীবকে হক্বের উপর দেখে তার পক্ষে রায় দিলেন। তখন আল্লাহ্ পাক উপরোক্ত আয়াত শরীফ নাযিল করলেন।
কারো মতে ত্ব’মা ইবনে আবরাক্ব নামক এক ব্যক্তির পক্ষে তার সম্প্রদায়ের লোকেরা তার বিরুদ্ধবাদীদের বিপক্ষে মিথ্যা ও বাতিল সাক্ষী দিয়েছিল। তাদের সম্পর্কে উপরোক্ত আয়াত শরীফ নাযিল হয়।
ব্যাখ্যাঃ উপরোক্ত আয়াত শরীফে আল্লাহ্ পাক প্রতিক্ষেত্রে, সর্ববস্থায়, সকলের জন্যই, চাই সে আত্মীয় বা অনাত্মীয়, শত্রু বা মিত্র, নিকটবর্তী বা দূরবর্তী যে কেউ হোক না কেন, এমন কি নিজের বিরূদ্ধে হলেও ইন্ছাফের সাথে সাক্ষ্য প্রদান করার জন্য আদেশ করেছেন। অনুরূপ “সূরা মায়েদার” ৮নং আয়াত শরীফেও সঠিক বা ইন্ছাফের সাথে সাক্ষ্য প্রদান করার জন্য আল্লাহ্ পাক নির্দেশ করেছেন।
সংজ্ঞাঃ আর সাধারন সাক্ষ্য হলো, অতীতের কোন সুনির্দিষ্ট কার্যাবলীর উপর বিবরণ পেশ করা। যার সাথে ভোট প্রথার মিল নেই। ভোটকে স্বাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করলে কুরআন শরীফকে অস্বীকার করা হয়। আল্লাহ্ পাক “সূরা বাক্বারার” ২৮২ নং আয়াত শরীফে বলেন,
واستشهدوا شهيدين من رجالكم فان لم يكونا رجلين فرجل وامراتن.
অর্থঃ- “তোমাদের পুরুষদের মধ্য হতে দু’জন স্বাক্ষী দাঁড় করাও। যদি দু’জন পুরুষ না পাওয়া যায় তাহলে একজন পুরুষ ও দু’জন মহিলার স্বাক্ষ্য গ্রহণ কর।” অর্থাৎ ইসলামে দু’জন মহিলার স্বাক্ষ্য একজন পুরুষের সমান।
আর ভোট প্রথায় একজন মহিলা একজন পুরুষের সমান যা কুরআন শরীফের আয়াতের খেলাফ। তাহলে ভোট প্রথা কি করে ইসলামের দৃষ্টিতে স্বাক্ষ্য বলে গণ্য হতে পারে?
ভোট প্রথাকে স্বাক্ষ্য হিসেবে হুকুম দেয়া বা বলা সম্পূর্ণ নাজায়েয ও হারাম।
ভোট সুপারিশ নয়
সুপারিশ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক বলেন-
من يشفع شفاعة حسنة يكن له نصيب منها ومن يشفع شفاعة سيئة يكن له كفل منها وكان الله على كل شىء مقيتا.
অর্থঃ- “যে ব্যক্তি সুপারিশ করবে কোন নেক কাজের জন্য, সে এর দরুন (সওয়াবের) একটা অংশ পাবে। আর যে ব্যক্তি সুপারিশ করবে কোন পাপ কাজের জন্য, সে এর দরুন (গুণাহ্র) একটা অংশ পাবে এবং আল্লাহ্ তায়ালা সর্ব বিষয়ে ক্ষমতাশীল।” (সূরা নিসা/৮৫)
শানে নুযুলঃ উল্লিখিত আয়াত শরীফ পরস্পর পরস্পরের মাঝে সুুপারিশ করার প্রসঙ্গে নাযিল হয়েছে। আয়াত শরীফের ব্যাখ্যায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, কেউ যদি শরীয়তসম্মত কোন নেক কাজের সুপারিশ করে, সে নেক কাজ সংঘটিত হোক বা না হোক সে নেকী লাভ করবে। তদ্রুপ কেউ যদি কোন পাপ কাজের সুপারিশ করে, তাহলে এর জন্য যা গুণাহ্ হবে, তার একটা অংশ তার উপর বর্তাবে।
উল্লেখ্য, শুপারিশ করাই শর্ত নয়। বরং যদি কেউ কোন নেক কাজের সমর্থন করে তাতে সে নেকী লাভ করে থাকে। আর যে পাপ কাজের সমর্থন করবে তাতে তার উপর গুণাহ্ বর্তাবে।
এ প্রসঙ্গে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
اذا عملت الخطيئة فى الارض من شهدها فكرهها كان كمن غاب عنها ومن غاب فرضيها كان كمن شهدها.
অর্থঃ- “জমিনে যখন কোন পাপ বা অন্যায় অর্থাৎ খেলাফে শরা কাজ সংঘটিত হয় কোন ব্যক্তি সেখানে উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও সেটাকে অপছন্দ করে তাহলে সে যেন সেখানে উপস্থিত ছিলনা।” (উল্লিখিত পাপে সে দোষী সাব্যস্ত হবেনা) আর যদি কোন ব্যক্তি উপস্থিত না থাকা সত্ত্বেও উক্ত খেলাফে শরা কাজের প্রতি সন্তুষ্ট থাকে তাহলে সে যেন সেখানে উপস্থিত ছিল। অর্থাৎ সে উল্লিখিত পাপে পাপী বলে সাব্যস্ত হবে। (আবূ দাউদ)
অতএব, ভোট প্রথাই যেখানে ইসলামে গ্রহণযোগ্য নয় সেখানে ইসলামের দৃষ্টিতে তার জন্য শুপারিশ কি করে গ্রহণযোগ্য হতে পারে? মূলতঃ ইসলামের নামে এরূপ শুপারিশ করা বা ভোট দেয়া জায়েয নেই।
ভোট উকিল বা প্রতিনিধি নিয়োগ নয়
উকিল বা প্রতিনিধি নিয়োগ করা প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক বলেন-
ارأيت من اتخذ الهه هواه افانت تكون عليه وكيلا.
অর্থঃ- “আপনি কি লক্ষ্য করেননি? যে ব্যক্তি তার নফ্স বা প্রবৃত্তিকে ইলাহ্ (উপাস্য) হিসেবে গ্রহণ করে, এরপরও কি আপনি তার উকিল হবেন?” (সূরা ফুরক্বান/৪৩)
শানে নুযূলঃ নজর বিন হারেস ও তার সঙ্গী-সাথীরা নফ্সের চাহিদা মোতাবেক কোন বড় ও সুন্দর ধরণের পাথর বা অন্য কিছু দেখতো, তখন সেটিকে উপাস্য হিসেবে গ্রহণ করে নিত। আবার পরবর্তীতে তার চাইতে আরো বড় ও সুন্দর ইত্যাদি আকৃতির কোন কিছু দেখলে প্রথমটি বাদ দিয়ে পরবর্তীটিকে উপাস্য হিসেবে গ্রহণ করতো।
ব্যাখ্যাঃ যারা নফ্স বা প্রবৃত্তিকে উপাস্য হিসেবে গ্রহণ করে, কিম্বা নফ্সের অনুসরণে শরীয়তের তথা কোরআন-সুন্নাহ্র খেলাফ কাজ করে বা তাতে অংশ গ্রহণ করে, শরীয়তের দৃষ্টিতে তাদের উকিল হওয়া সম্পূর্ণভাবে নাজায়েয ও হারাম। কেননা নফ্সের অনুসরণকারী ব্যক্তি আল্লাহ্ পাক-এর নাফরমানীতে লিপ্ত। অর্থাৎ তারা সর্বদা কুফরী, শেরেকী, হারাম ও নাজায়েয কাজে মশগুল। সে কারণেই আল্লাহ্ পাক নফ্সের অনুসরণ করতে নিষেধ করেছেন। ইরশাদ হয়েছে,
ولئن اتبعت اهوائهم بعد الذى جائك من العلم مالك من الله من ولى ولا نصير.
অর্থঃ- “আপনার নিকট সুস্পষ্ট প্রমাণাদি আসার পর আপনি যদি তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করেন তাহলে আল্লাহ্ পাক-এর পক্ষ হতে আপনার জন্য কোন অভিভাবক ও সাহায্যকারী থাকবে না।”
উল্লেখ্য, উকিল বা প্রতিনিধি নির্ধারণ করতে হলে নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে। আর ইসলামের নামে নির্বাচন যেহেতু হারাম। কাজেই সে হারাম কাজের জন্য উকিল মনোনীত হতে চাওয়া অথবা মনোনীত করা কোনটিই জায়েয নেই।
নির্বাচন যে ইসলামের দৃষ্টিতে ও ইসলামের নামে কখনোই গ্রহণযোগ্য নয় সে প্রসঙ্গে স্বয়ং হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন,
والله لانولى على هذا العمل احدا ساله ولا احدا حرص عليه.
অর্থঃ- “এই কাজে (শাসক পদে) যারা পদপ্রার্থী হয় বা পদের আকাঙ্খা করে আমরা তাদের পদ দেই না।” (বুখারী, মুসলিম)
যেখানে স্বয়ং হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নির্বাচন পদ্ধতি শুধু অপছন্দই করেননি সাথে সাথে নিষেধও করেছেন। তাহলে ইসলামের নামে নির্বাচন জায়েয কি করে বলা যেতে পারে? তাই ইসলামের নামে নির্বাচন জায়েয বলা কুফরী।
উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা এটাই সাব্যস্ত হলো যে, ইসলামের নামে ভোট দেয়া ওয়াজিব বলা কুফরীর অন্তর্ভূক্ত। আরো সাব্যস্ত হলো, ভোটকে ইসলামের নামে আমানত, স্বাক্ষ্য, শুপারিশ এবং উকিল বা প্রতিনিধি নিয়োগের মাধ্যম বলাও সম্পূর্ণ কুফরীর অন্তর্ভূক্ত।
অতএব দেখা যাচ্ছে যে, এ ভোটদান সম্পূর্ণরূপে ইহুদী-খ্রীষ্টানদের রীতি হওয়ায় এবং ইসলামের কোন শর্ত শারায়েতের আলোকে না হওয়ায় তা সম্পূর্ণরূপে হারামের পর্যায়েই পড়ে।
উল্লেখ্য, গণতন্ত্র ও তা বাস্তবায়িত করার মাধ্যম হচ্ছে নির্বাচন। আর র্নিাচনের মূল হচ্ছে ভোট প্রদান। এ প্রত্যেকটি ইহুদী-নাছারাদের দ্বারা উদ্ভাবিত ও প্রবর্তিত। যা অনুসরণ, অনুকরণ ও আমল করা আল্লাহ্ পাক সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করেছেন। যা সমগ্র কুরআন শরীফ ও হাদীস শরীফে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষভাবে সূরা ফাতিহাতে বলা হয়েছে, “তোমরা দোয়া কর।” যা আমরা দোয়া করে থাকি নামাযের প্রত্যেক রাকায়াতে রাকায়াতে-
اهدنا الصراط المستقيم.
অর্থঃ- “(আল্লাহ্ পাক) আমাদের সরলপথ প্রদর্শন করুন।
কোন সরল পথ? বলা হয়েছে-
صراط الذين انعمت عليهم.
অর্থঃ- “যাদেরকে নিয়ামত দেয়া হয়েছে তাঁদের পথ।
কাদেরকে নিয়ামত দেয়া হয়েছে? এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক অনত্র বলেন,
انعم الله عليهم من النبين والصديقين والشهداء والصلتين وحسن اولئك رفيقا.
অর্থঃ- “আল্লাহ্ পাক নিয়ামত দিয়েছেন যাঁরা নবী, ছিদ্দীক, শহীদ ও ছলেহ্ তাঁদেরকে এবং তাঁরাই উত্তম বন্ধু বা সঙ্গী।” (সূরা নিসা/৬৯)
অর্থাৎ আল্লাহ্ পাক বান্দাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন তারা যেনো নবী, ছিদ্দীক, শহীদ ও ছলেহ্গণের পথ তলব করে এবং তাঁরাই সকলের জন্য উত্তম সঙ্গী বা বন্ধু।
এরপর আল্লাহ্ পাক বলেন, তোমরা বলো-
غير المغضوب عليهم ولا الضالين.
অর্থঃ- “আল্লাহ্ পাক আমাদের তাদের পথ দিবেন না, যারা গযবপ্রাপ্ত ও পথহারা, (ইহুদী-নাছারা) অর্থাৎ বিশেষভাবে ইহুদী-নাছারা, খৃষ্ঠান, আর সাধারনভাবে হিন্দু, বৌদ্ধ, মজুসী (অগ্নী উপাসক, মুশরিক, বেদ্বীন, বদ্ দ্বীন, বিদ্য়াতী, বেশরা, গোমরাহ্ ইত্যাদি সর্বপ্রথম পথহারা গযবপ্রাপ্ত লোকদের পথ আমাদের দান করবেন না।
উল্লেখ্য, উপরোক্ত আয়াত শরীফে আল্লাহ্ পাক শুধু মাত্র নবী, ছিদ্দীক, শহীদ, ছলেহ্গণের পথই তলব করতে বলেছেন এবং তাঁদেরকেই অনুসরণ-অনুকরণ করে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করতে বলেছেন।
আর যারা ইহুদী-নাছারা, হিন্দু, বৌদ্ধ, মজুসী, মুশরিক ইত্যাদি পথহারা ও গযবপ্রাপ্ত তাদের পথ থেকে পানাহ্ তলব করতে বলেছেন। এবং তাদের সঙ্গী না হওয়ার জন্য আদেশ করেছেন।
অথচ গণতন্ত্র ও তা বাস্তবায়িত করার মাধ্যম নির্বাচন ও তার মূল ভোট প্রদান ইত্যাদি প্রত্যেকটিই ইহুদী-নাছারাদের দ্বারা উদ্ভাবিত ও প্রবর্তিত। তাহলে আল্লাহ্ পাক যেখানে বলেছেন যে, ইহুদী-নাছারা ইত্যাদির পথ তলব করো না, তাদের অনুসরণ-অনুকরণই সঙ্গী বা বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করো না। যা আমরা নামাযের প্রতিই রাকায়াত বলে থাকি এবং কুরআন তিলওয়াতের শুরুতে বলে থাকি। তাহলে এরপরও কিভাবে আমরা ইসলামের নামে গণতন্ত্র, নির্বাচন, ভোট ইত্যাদি করতে পারি?
এরপরেও দেখা যায়, অনেকেই তাদের কম ইল্ম, কম বুঝের কারণে এ ভোট দেয়াকে ফরজ-ওয়াজিব বলে থাকে, তারা তার কারণ স্বরূপ বলে যে, ভোট হচ্ছে- (১) একটি পবিত্র আমানত, (২) ভোট দেয়া হচ্ছে- সাক্ষ্যদান করা, (৩) ভোটদান হচ্ছে, শুপারিশ করা, (৪) ভোটদানে প্রতিনিধি বা উকিল নিয়োগ করা।
তাদের উপরোক্ত কথা সম্পূর্ণ অশুদ্ধ নাজায়েয, হারাম ও কুফরীর শামীল। কেননা গণতন্ত্রই যেখানে শরীয়তসম্মত নয় এবং শরীয়তের দৃষ্টিতে ইসলামের নামে গণতন্ত্র করা যেখানে হারাম ও কুফরী সেখানে শরীয়তের দৃষ্টিতে ইসলামের নামে কি করে ভোট পবিত্র আমানত, সাক্ষী, সুপারিশ ও উকিল নিয়োগের মাধ্যম হতে পারে?
{দলীলসমূহঃ- (১) তাফসীরে আহ্কামুল কুরআন- লিল জাস্সাস, (২) কুরতুবী, (৩) বায়যাভী, (৪) রুহুল মায়ানী, (৫) খাযিন, (৬) ইবনে কাছীর, (৭) বাগবী, (৮) মাদারিক, (৯) ফতহুল ক্বাদীর, (১০) রুহুল বয়ান, (১১) মাযহারী, (১২) কবীর, (১৩) দুররে মনসুর, (১৪) তাফসীরে তাবারী, (১৫) বুখারী, (১৬) মুসলিম, (১৭) তিরমিযী, (১৮) ইবনে মাযাহ, (১৯) আবু দাউদ, (২০) বাইহাক্বী, (২১) কানযুল উম্মাহ্, (২২) মসনদে আহমদ, (২৩) মিশকাত, (২৪) ফতহুল বারী, (২৫) উমদাতুল ক্বারী, (২৬) শরহে নববী, (২৭) উরফুশ শাজী, (২৮) বজলুল মাযহুদ, (২৯) আউনুল মা’বুদ, (৩০) মিরকাত, (৩১) আশয়াতুল লুময়াত, (৩২) লুময়াত, (৩৩) শরহুত্ ত্বীবী, (৩৪) তা’লীকুছ ছবীহ, (৩৫) মুযাহিরে হজ্ব, (৩৬) সীরাতুন্নবী (ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম), (৩৭) সীরাতে হালুবী, (৩৮) যা’দুল মায়াদ, (৩৯) মাদারিজুন্ নুবুওয়াহ্ (80) মাওয়াহিবুল্লাদুন্নিয়াহ, (৪১) মিরআতুল মানাজীহ, (৪২) মাবদ্ভুত, (৪৩) বাহরুর রায়েক, (৪৪) ফতহুল কাদীর, (৪৫) আলমগীরী, (৪৬) শামী, (৪৭) রদ্দুল মুহতার, (৪৮) দুরুল মুহতার, (৪৯) কাজীখান, (৫০) আইনুল হেদায়া, (৫১) এনায়া, (৫২) নেহায়া, (৫৩) শরহে বেদায়া, (৫৪) আল ফিকুহু আলা মাযাহিবুল আরবায়া, (৫৫) সিরাজী, (৫৬) ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন, (৫৭) কানুনে ওয়াবাসাত, (৫৮) মুফিদুল ওয়াবেছীন, (৫৯) তামহীলুল ফারায়েজ (৬০) জুবদা, (৬১) শরহে সিরাজী (৬২) মুয়াত্তা, (৬৩) বযলুল মাজহুদ, (৬৪) হুজ্জাতুল্লাহিল বালেগা, (৬৫) ইযালাতুল খাফা, (৬৬) বাংলাদেশ সংবিধান, (৬৭) বাংলা একাডেমী বিশ্বকোষ, (৬৮) বাংলাদেশ সংবিধানের ভাষ্য, (৬৯) রাষ্ট্র বিজ্ঞান, সৈয়দ মকসুদ আলী, (৭০) Encyclopeadia Britannica, (৭১) Encyclopeadia Americana. (৭২) world book, (৭৩) Man Myths Magic, (৭৪) Lexicon Encyclopedia, (৭৫) Macmillan Encyclopedia, (৭৬) New book of knowledge, (৭৭) Groller Encyclopedia, (৭৮) Fank and Wagnalls Encyclopedia, (৭৯) Wordsworth Encyclopedia, (৮০) Encyclopedia of Democracy, (৮১) Political Parties: Their Organization and Activity in the Modern state Duverger, Maurice, (৮১) After Two Centurics, Should Condorcet’s voting procedure Be Implemented Felsenthal Dan (৮৩) Electoral laws and Their Political consequences. Grofman, Bernard and Arend Lijp hart, eds (৮৪) Democracy or Anarchy? A study of proportional Representation, notre Dame. University of notre Dame Press, 1941. (৮৫) The political consequences of Electoral Laws in Latin America and the Caribbean. (৮৬) Constitutional Choices for New Democracies, (৮৭) Compariny Voting System. Nurmi Hannu. (৮৮) Seats and Votes: The Effcets and Determinates of Electoral System. Taagepera Rein, (৮৯) Fresidents and Assemblies. Constitutional Design and Electoral Dynamics. (৯০) The Case against Direct Election of the President. Best Judith. (৯১) Report of the Twentieth Century Fund Task Force on Reform of the presidential Election Process. William R. Keech (৯২) The Politics of Electoral college Reform. yale university press-1975. (৯৩) Charnwood, Abraham Lincon. (৯৪) The Moderm. Dempcracies, Lord Bryce. (৯৫) Tho Peloponnesion War, Thosydides. (৯৬) Constitutional Democray, John Mac Murray, (৯৭) Palitical Ideas in the Modern World. (৯৮) The Conemporary Review, Hearushaw. (৯৯) Denocracy and the Individual, Carleton Kemp Allen. (১০০) Constructive Democracy, Johan Mac Murray. (১০১) Democracy at the Crossways, Hearn shaw. (৯৯) The Modern Democracies, Bryce. (১০২) The Essence of Democracy. Phonix, Maurice Cranston. (১০৩) Leberal Democracy, Pall Mall. Massimo Salvadori. (১০৪) The origins of
Totalitarian Democracy, Secker & Warburg, J.L.Talmon. (১০৫) Political Ideas in the Modern World, D.B. Heater. (১০৬) The Future of Democracy & Other Essays, D.N.Banerjee. (১০৭) The Prospects of Dimocracy, Alfred Zimmern. (১০৮) The Modern State, Maciver (১০৯) Government of the U.S.A.Munro (১১০) Political Ideals, C.D.Burns ইত্যাদি।
বিঃ দ্রঃ অতি শীঘ্রই মাসিক আল বাইয়্যিনাতে ইসলামের নামে গণতন্ত্র করা হারাম ও খিলাফত সম্পর্কে বিস্তারিত ফতওয়া দেয়া হবে ইনশাআল্লাহ্।
সাইয়্যিদ মুহম্মদ মোক্তাদুল ইসলাম (মিলন)
সুবহানী ঘাট, সিলেট।
সুওয়ালঃ- রেযাখানী মাযহাবের মূখপত্র ডিসেম্বর/২০০০ঈঃ সংখ্যায় তাফসীরে রুহুল বয়ান, বুখারী, গুনিয়াতুত তালিবীন, রেজভীয়া কিতাবের বরাত দিয়ে বলেছে, “সহীহ্ মুসলিম শরীফ সহ অনেক নির্ভর যোগ্য কিতাবে নফল নামায বিশেষতঃ ক্বদর ও বরাতের নফল নামায জামাত সহকারে আদায় করা বৈধ…….।”
আর আপনারা মাসিক আল বাইয়্যিনাতে লিখেছেন তারাবীহ, ছলাতুল কুছুফ, (সূর্য গ্রহণের নামায) ছলাতুল ইস্তেস্কা, (বৃষ্টির নামায) এইতিন প্রকার নামায ব্যতীত যেমন লাইলাতুল ক্বদর, লাইলাতুল বরাত, তাহাজ্জুদ, চাশ্ত, আওয়াবীন ইত্যাদি নফল নামায সমূহ ইমামের সহিত চারজন মুক্তাদীসহ জামায়াতে আদায় করা মাকরূহ তাহ্রীমী ও বিদ্য়াতে সাইয়্যিয়াহ্। কোনটি সঠিক? আর বুখারী, মুসলিম শরীফে কি ক্বদর ও বরাতের নফল নামায জামায়াতের সাথে আদায় করার কথা উল্লেখ আছে? দয়া করে জানাবেন।
জাওয়াবঃ- নফল নামায জামায়াতের সাথে আদায় করা সম্পর্কে মাসিক আল বাইয়্যিনাতের মাধ্যমে যা জানতে পেরেছেন তাই সঠিক, দলীল ভিত্তিক, গ্রহণযোগ্য ও ফতওয়াগ্রাহ্য মত। নফল নামায বিশেষতঃ শবে বরাত, শবেক্বদরের নামায জামায়াতে আদায় করা সম্পর্কে রেযাখানী মুখপত্রের উক্ত বক্তব্য অশুদ্ধ, মিথ্যা প্রতারণা মূলক, জালিয়াতি, ধোকাপূর্ণ, নিজহাতে ইবারত লিখে কিতাবের নামে চালিয়ে দেয়া, অনুবাদে ভুল ইত্যাদি ক্রটিতে ক্রটিপূর্ণ থাকায় মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়।”
ইতোপূর্বে রেযাখানী মুখপত্রের বক্তব্যকে আমরা ৭৬টি নির্ভরযোগ্য বিশ্বখ্যাত ফতওয়ার কিতাবের উদ্ধৃতি দিয়ে দলীলের মাধ্যমে খন্ডন করে দিয়েছি। কিন্তু আমাদের উক্ত খন্ডনের জবাবে তারা কিছুই লিখতে পারেনি। বরং তারা আবারো কিছু কিতাবের বরাত দিয়ে বক্তব্য পেশ করেছে অথচ উক্ত কিতাবগুলোতে আযান ইক্বামত ছাড়া ইমাম ব্যতীত চারজন মুক্তাদী সহ শবে বরাত, শবে ক্বদর, তাহাজ্জুদ, চাশ্ত, আওয়াবীন ইত্যাদি নফল নামায সমূহ জামায়াতে আদায় করা বৈধ বলা হয়নি। আর বুখারী, মুসলিম শরীফে শবে ক্বদর, শবে বরাতের নফল নামায জামায়াতের সাথে আদায় করার প্রশ্নই আসে না। পর্যায়ক্রমে উক্ত কিতাবের বক্তব্য খন্ডন করা হচ্ছে-
নিম্নে তাফসীরে রুহুল বয়ানের বক্তব্য পর্যালোচনা করা হলো
তাফসীরে রুহুল বয়ানে শরহে নেক্বায়া কিতাবের বরাত দিয়ে আযান ইক্বামত ছাড়া নফল নামায জামায়াতের সহিত আদায় করা যে জায়েয বলা হয়েছে তা তারাবীহ, ছলাতুল কুছূফ,(সুর্যগ্রহণের নামায), ছলাতুল ইস্তেস্কা (বৃষ্টির নামায)। “শরহে নেক্বায়া” কিতাবের ‘১ম খন্ডের ২৪২ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,
ان التطوع بالجماعة انما يكره اذا كان على سبيل التداعى اما لو اقتدى واحد بواحد او اثنان بواحد لايكره وان اقتدى ثلثة بواحد اختلف فيه- وان اقتدى اربعة بواحد كره اتفاقا.
অর্থঃ- “নিশ্চয় নফল নামায জামায়াতে পড়া মাকরূহ্ তাহ্রীমী, যখন ঘোষণা দিয়ে পড়া হবে। সুতরাং যদি ইমামের সাথে একজন অথবা দু’জন মুক্তদী ইক্তিদা করে, তবে মাকরূহ্ হবেনা, আর যদি ইমামের সহিত তিনজন মুক্তাদী ইক্তিদা করে তাহলে মাকরুহ হওয়ার মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে, অর্থাৎ কেউ কেউ বলেছেন মাকরূহ। আর কেউ কেউ বলেছেন মাকরূহ নয়। তবে যদি ইমামের সহিত চারজন মুক্তাদী ইক্তিদা করে তাহলে সকল ইমাম ও ফুক্বাহা-ই- কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণের সর্বসম্মত মত হলো নফল নামায জামায়াতে পড়া মাকরূহ তাহমী।
উপরোক্ত বর্ণনার ভিত্তিতে এটাই দিবালোকের ন্যায় সুস্পষ্ট ভাবে প্রমাণিত হলো যে, রেযাখানী মাযহাবের মুখপত্র ওয়ালাদের বক্তব্য ভুল। কারণ তারা তাফসীরে রুহুল বয়ানের বরাত দিয়ে আযান-ইক্বামত ছাড়া শবে বরাত, শবে ক্বদরের নফল নামায জামায়াত সহকারে আদায় করা বৈধ বলেছে। তারা প্রথম দলীল দিয়েছে শরহে নেক্বায়া কিতাবের। অথচ শরহে নিক্বায়া কিতাবে আযান-ইক্বামত ছাড়া শবে বরাত, শবে ক্বদরের নফল নামায জামায়াতের সহিত আদায় করা বৈধ তো দূরের কথা উক্ত নামায সম্পর্কে কোন বর্ণনাই উল্লেখ নেই। কারণ কিতাবে উল্লেখ থাকলে বৈধ অবৈধের প্রশ্ন আসে যেহেতু শরহে নেক্বায়া কিতাবে শবে বরাত, শবে ক্বদরের নামায সম্পর্কে কোন বর্ণনাই নেই সেখানে বৈধ হওয়ার প্রশ্ন আসে কি করে? অতএব প্রমাণিত হলো যে, তাফসীরে রুহুল বয়ানে শরহে নেক্বায়া কিতাবের বরাত দিয়ে আযান ইক্বামত ছাড়া নফল নামায জামায়াতের সহিত আদায় করা যে জায়েয বলা হয়েছে তা দ্বারা নফল নামায বিশেষতঃ শবে বরাত, শবে ক্বদরের নামাযকে বুঝানো হয়নি। সুতরাং রেযাখানী মাযহাবের মুখপত্র ওয়ালারা তাফসীরে রুহুল বয়ানের বরাত দিয়ে আযান-ইক্বামত ছাড়া শবে বরাত, শবে ক্বদরের নফল নামায জামায়াত সহকারে আদায় করা যে বৈধ বলেছে, তা ভুল বলেই প্রমাণিত হলো। (চলবে)
মুহম্মদ মশীউজ্জামান
পানি উন্নয়ন বোর্ড, চট্টগ্রাম
সুওয়ালঃ “মাসিক আল বাইয়্যিনাত” ৮৫তম সংখ্যায় “সুওয়াল-জাওয়াব” বিভাগে এক জাওয়াবের পরিপ্রেক্ষিতে রেযাখানী মাযহাবের মূখপত্রের সেপ্টেম্বর/২০০০ ঈঃ সংখ্যায় প্রশ্নোত্তর বিভাগে নামাযে দু’সিজদার মধ্যে দোয়া পাঠ করা সম্পর্কে যে বক্তব্য প্রদান করেছে তা কতটুকু সত্য? দয়া করে জানিয়ে বাধিত করবেন।
জাওয়াবঃ রেযাখানী মাযহাবের মূখপত্রের উক্ত উত্তরটি সম্পূর্ণ অশুদ্ধ, মিথ্যা, প্রতারণামূলক, জালিয়াতি, ধোকাপূর্ণ, ইবারতচুরি, অনুবাদে ভুল এবং এ ধরণের “প্রায় ৩৫টি ত্রুটিতে ত্রুটিপূর্ণ থাকায় মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়।”
উক্ত বিবিধ ত্রুটিপূর্ণ উত্তরটি নির্ভরযোগ্য দলীলের ভিত্তিতে খন্ডন করে তার সহীহ জাওয়াব ধারাবাহিকভাবে পেশ করা হচ্ছে।
(ধারাবাহিক)
২৭. তারা বলেছে- “ইমাম ইবনে আবেদীন শামী (রহঃ) ফরজ নামাযের ক্ষেত্রে দুই সিজদার মাঝখানে …..মাগফিরাতের দোয়া করাকে বৈধ প্রমাণ করেছেন।”
অথচ ইবনে আবেদীন শামী রহমতুল্লাহি আলাইহি মাগফিরাতের দোয়া বলতে শুধুমাত্র اللهم اغفرلى পড়া ফরয নামাযে বৈধ প্রমাণ করেছেন। তিনি মাগফিরাতের দোয়া দ্বারা কি রেযাখানী মাযহাবের মূখপত্রে উল্লিখিত “আল্লাহুম্মার যুকনী ওয়ারহামনী ওয়াশ্ফাআনী ওয়াহ্দিনী” এই সম্পূর্ণ দোয়াটি ফরয নামাযে বৈধ প্রমাণ করেছেন? কখনোই নয়। যদি করে থাকেন তাহলে তরজুমান গংরা যেন কিতাবের ইবারত সহ দলীল পেশ করে।
পরিশেষে রেযাখানী মাযহাবের মুখপত্রগংরা মাগফিরাতের দোয়া বলে যে জালিয়াতি করেছে। তা তাদের ২৭তম জালিয়াতি ও প্রতারণা।
২৮. তারা বলেছে- “ইবনে আবেদীন শামী (রহঃ) …… রুকু থেকে দাঁড়ানোর পর মাগফিরাতের দোয়াকে বৈধ প্রমাণ করেছেন। (রাদ্দুল মুখতার ১ম খন্ড ৫০৬ পৃষ্ঠা)
অথচ এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা। কারণ রুকু থেকে দাঁড়ানোর পর মাগফিরাতের দোয়া নয় বরং রুকু থেকে দাঁড়ানোর পর ربنا لك الحمد পড়বে এরপর سكت চুপ থাকবে, কিতাবে এটাই বলা হয়েছে।
যদি তাদের কথা সত্যই হয় তাহলে আরবী ইবারতসহ তারা যেন দলীল পেশ করে। আর এটা তাদের ২৮তম জালিয়াতি ও প্রতারণা।
২৯. তারা আবারো কিতাবের নাম লিখেছে, “রাদ্দুল মুখতার ১ম খন্ড ৫০৬ পৃষ্ঠা।”
অথচ “রাদ্দুল মুখতার” বলতে কোন কিতাব নেই। বরং কিতাবের নাম হলো, “রদ্দুল মুহ্তার, আর “রদ্দুল মুহ্তার” কিতাবের ১ম খন্ডের ৫০৬ পৃষ্ঠায় রুকু থেকে দাঁড়ানোর পর মাগফিরাতের দোয়া বৈধ এ ধরণের কোন বর্ণনা উল্লেখ নেই। যদি থাকে তাহলে যেন কিতাবের ইবারতসহ দলীল পেশ করে। এটা তাদের ২৯তম জালিয়াতি ও প্রতারণা।
৩০. তারা বলেছে, “মেরাত শরহে মেশকাত” ২য় খন্ডে উল্লেখ করা হয়েছে যে, দুই সিজদার মাঝখানে মাগফিরাতের দোয়া প্রিয় রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নফল নামাজ সমূহে প্রায় সময় আর ফরজ নামাজেও কোন কোন সময় পড়তেন।”
অথচ আবারও তারা মাগফিরাতের দোয়ার দোহাই দিয়ে কূট-কৌশলে তাদের রেযাখানী মাযহাবের মুখপত্রে উল্লেখিত
اللهم اغفرلى وارحمنى واهدنى وعافنى وارزقنى.
এই সম্পূর্ণ দোয়াটি ফরয নামাযে দুই সিজদার মাঝখানে বৈধ করার অপপ্রয়াস চালিয়েছে। এটা তাদের ৩০ তম জালিয়াতি ও প্রতারণা।
৩১. তারা “মেরাত শরহে মেশকাত” ২য় খন্ডের ৮৬ পৃষ্ঠার বরাত দিয়ে বলেছে, “দুই সিজদার মাঝখানে মাগফিরাতের দোয়া প্রিয় রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম….ফরজ নামাযেও কোন কোন সময় পড়তেন।”
অথচ “মেরাত শরহে মিশকাত” কিতাবের উক্ত পৃষ্ঠায় পরবর্তী ইবারতে বলা হয়েছে ফরয নামাযে সংক্ষিপ্ত অর্থাৎ শুধুমাত্র اللهم اغفرلى এই বাক্যটি ফরয নামাযের দুই সিজদার মাঝখানে পড়বে। আর নফল নামাযে পুরা দোয়াটি অর্থাৎ
اللهم اغفرلى وارحمنى واهدنى وعافنى وارزقنى.
পড়বে। নফল নামাযের দোয়াটি মাগফিরাতের দোহাই দিয়ে ফরয নামাযের দুই সিজদার মাঝখানে চালিয়ে দেয়া, এটা তাদের ৩১তম জালিয়াতি ও প্রতারণা।
৩২. তারা বলেছে, “ফরজ নামায সমূহের ক্ষেত্রে হাদীসে বর্ণিত মাগফিরাতের দোয়া চুপে চুপে পড়া নাজায়েয বা মাকরূহ নয় …….।”
অথচ মাগফিরাতের দোয়া বলতে শুধুমাত্র اللهم اغفرلى আর শুধুমাত্র اللهم اغفرلى ফরয নামাযের দুই সিজদার মাঝখানে পড়া আমরাও নাজায়েয বা মাকরূহ বলিনি। বরং আমরা আমাদের “মাসিক আল বাইয়্যিনাতে” ৮৫তম সংখ্যায় উল্লেখ করেছি, “রেযাখানী মাযহাবের মুখপত্রে জুলাই-আগষ্ট ২০০০ ঈসায়ী সংখ্যায় উল্লেখিত “আল্লাহুম্মার যুকনী ওয়ারহামনী ওয়াশ্ফাআনী ওয়াহ্দিনী” এই দোয়াটি আমাদের হানাফী মাযহাব মোতাবিক ফরয নামাযের দুই সিজদার মাঝে পড়া যাবেনা। কারণ এই দোয়াটি মাগফিরাতের দোয়া নয় বরং মারযিক্বাতের বা রিযিক প্রাপ্তির দোয়া। মাগফিরাতের দোহাই দিয়ে হাদীসে বর্ণিত সমস্ত দোয়া গুলো ফরয নামাযে চালিয়ে দেয়া।” এটা তাদের ৩২তম জালিয়াতি ও প্রতারণা।
৩৩. তারা আরো বলেছে, “ফরজ নামায সমূহে দুই সিজদার মাঝখানে উপরোক্ত মাগফিরাতের দোয়া চুপে চুপে পড়তে পারবেনা বলা …..।”
অথচ রেযাখানী মাযহাবের মুখপত্রগংদের উক্ত বক্তব্য সম্পূর্ণ ডাহা মিথ্যা। কারণ আমরা একথা বলিনি যে, ফরয নামাযের দুই সিজদার মাঝে মাগফিরাতের দোয়া অর্থাৎ শুধুমাত্র اللهم اغفرلى পড়তে পারবেনা। বরং আমরাও বলে থাকি যে, ফরয নামাযের দুই সিজদার মাঝে শুধুমাত্র اللهم اغفرلى এই বাক্যটি পড়া যাবে। এটা তাদের ৩৩তম জালিয়াতি ও প্রতারণা। (চলবে)
মুহম্মদ মুহ্সীন, ভোলাহাট, চাপাইনবাবগঞ্জ।
সুওয়ালঃ মাসিক মদীনা ডিসেম্বর ২০০০ঈঃ সংখ্যায় প্রশ্নোত্তর বিভাগে নিম্নোক্ত প্রশ্নোত্তর ছাপা হয়।
প্রশ্নঃ বেতের নামাযের পর যে দুই রাকাত নফল নামায পড়া হয় সেটা বসে পড়লে সওয়াব বেশি হয়, না দাঁিড়য়ে পড়লে?
উত্তরঃ সবধরনের নফল নামাযই দাঁড়িয়ে পড়া উত্তম এবং তাতে পরিপূর্ণ সওয়াব পাওয়া যায়। নফল বসে পড়ারও অনুমতি আছে। তবে তাতে সওয়াব অর্ধেক পাওয়া যায়।
এখন আমার সুওয়াল হলো- মাসিক মদীনার উক্ত বক্তব্য সঠিক হয়েছে কি? দলীল সহ জানাবেন।
জাওয়াবঃ না, মাসিক মদীনার উক্ত বক্তব্য সঠিক হয়নি বরং ভুল ও অশুদ্ধ হয়েছে। কেননা সবধরণের নফল নামায দাঁড়িয়ে পড়া উত্তম এবং পরিপূর্ণ ছওয়াব হলেও বিত্রের পর দুই রাকায়াত নফল নামায অন্যান্য নফল নামায থেকে সম্পূর্ণ বিপরীত ও ব্যতিক্রম। কারণ বিত্রের নামাযের পর যে দুই রাকায়াত নফল নামায পড়া হয় এই দুই রাকায়াত নফল নামায বসে পড়াই সুন্নত, পূর্ণ ছওয়াব ও অধিক ফযীলতের কারণ। এছাড়া বাকী অন্যান্য নফল নামায দাঁড়িয়ে পড়লে পূর্ণ ছওয়াব এবং বসে পড়লে অর্ধেক ছওয়াব। কেননা বিত্রের পর এই দুই রাকায়াত নফল নামায হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বসেই আদায় করেছেন। যেমন, হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে,
عن ام سلمة رضى الله تعالى عنها ان النبى صلى الله عليه وسلم كان يصلى بعد الوتر ركعتين خفيفتين وهو جالس.
অর্থঃ- “উম্মুল মু’মিনীন হযরত উম্মে সালমা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নিশ্চয়ই হযরত নবী করীম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওযা সাল্লাম বিত্রের পর দু’রাকায়াত নফল নামায সংক্ষিপ্তভাবে বসেই আদায় করতেন।” (ইবনে মাযাহ্ শরীফ)
আর বিত্রের পর এই দুই রাকায়াত নফল নামায যেহেতু হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বসে সংক্ষিপ্তভাবে আদায় করেছেন তাই এই দুই রাকায়াত নফল নামাযকে হাল্কী নফলও বলা হয়। সুতরাং বিত্রের পর দুই রাকায়াত হাল্কী নফল নামায বসে পড়লে সুন্নতের কারণে পূর্ণ ছওয়াব ও অধিক ফযীলতের কারণ।
অতএব, মাসিক মদীনার বক্তব্য ভুল ও দলীলবিহীন বলেই প্রমাণিত হলো।
{দলীলসমূহঃ (১) ইবনে মাযাহ্, (২) আহমদ, (৩) আশয়াতুল লুময়াত, (৪) লুময়াত, (৫) তা’লীকুছ্ ছবীহ্, (৬) শরহুত্ ত্বীবী, (৭) মোযাহেরে হক্ব, (৮) মিরআতুল মানাযীহ্, (৯) আকাবির কা রমাদ্বান, (১০) মালাবুদ্দা মিনহু, (১১) মিফতাহুল জান্নাহ্, (১২) হাদিয়াতুল মুছল্লীন, (১৩) বাজ্জার ইত্যাদি।}
এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হলে মাসিক আল বাইয়্যিনাত এর ৫৮,৭০ ও ৭৮তম সংখ্যা পাঠ করুন।
সাইয়্যিদ মুহম্মদ আলমগীর হুসাইন
মালিবাগ, ঢাকা।
সুওয়ালঃ মৌলভী আজিজুল হকের অখ্যাত পত্রিকার নভেম্বর/২০০০ ঈঃ সংখ্যায় জিজ্ঞাসার জবাব বিভাগে ৬৮৪নং জিজ্ঞাসার জবাবে বলা হয়েছে “খত্মের বিনিময় দেয়ানেয়া সকল মাযহাবে হারাম।”
আর হাটহাজারী মাদ্রাসা থেকে মৌলভী আহ্মদ শফীর সম্পাদনায় প্রকাশিত অখ্যাত পত্রিকার ডিসেম্বর ২০০০ঈঃ সংখ্যায় জিজ্ঞাসা-সমাধান বিভাগে ৩১৩৩নং জিজ্ঞাসার-সমাধানে বলা হয়েছে, “খত্মে তারাবীহ্র বিনিময় গ্রহণ ও প্রদান দু’টোই হারাম।”
এখন আমার সুওয়াল হলো- খত্মে তারাবীহ্র বিনিময় দেয়া নেয়া সম্পর্কে উক্ত অখ্যাত পত্রিকাদ্বয়ের বক্তব্য কতটুকু সঠিক ও শরীয়তসম্মত?
জাওয়াবঃ খত্মে তারাবীহ্র বিনিময় দেয়া ও নেয়া সম্পর্কে উক্ত অখ্যাত পত্রিকাদ্বয়ের উক্ত বক্তব্য সম্পূর্ণই অশুদ্ধ, বিভ্রান্তিকর ও অনুসরণীয় সকল উলামা-ই-মুতাআখ্খেরীন, ইমাম মুজতাহিদ ও ফক্বীহ্গণের ফতওয়াগ্রাহ্য মতের বিপরীত। আর উক্ত মৌলভী ছাহেবরা কিতাবের মাফহুম যেমন বুঝতে পারেনি একইভাবে উলামা-ই-মুতাকাদ্দিমীন এবং উলামা-ই-মুতাআখ্খেরীন-এর পার্থক্যও করতে অপারগ। তাই তারা খত্মে তারাবীহ্র বিনিময় দেয়া নেয়া সম্পর্কে এ ধরণের বক্তব্য পেশ করে থাকে। সুতরাং যে সমস্ত মৌলভী, মাওলানা ছাহেবরা কিতাবের মাফহুম বুঝে না এবং উলামা-ই-মুতাকাদ্দিমীন ও উলামা-ই-মুতাআখ্খেরীন-এর পার্থক্য করতেও তারা অপারগ তাদের জন্য ইখতিলাফী বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া দেয়া শরীয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ নাজায়েয ও হারাম।
এই মাসয়ালাটি সম্পর্কে উলামা-ই-মুতাকাদ্দিমীন ও উলামা-ই-মুতাআখ্খেরীনগণ ইখতিলাফ করেছেন। যেমন, উলামা-ই-মুতাকাদ্দিমীনগণ বলেছেন, “সর্বপ্রকার ইবাদতের বিনিময় গ্রহণ করা বাতিল তথা নাজায়েয।” আর উলামা-ই-মুতাআখ্খেরীনগণ বলেছেন, “সর্বপ্রকার ইবাদতের বিনিময় গ্রহণ করা জায়েয তবে তা শর্ত সাপেক্ষে।” আর উলামা-ই-মুতাআখ্খেরীনগণ সে শর্তগুলো উল্লেখ করে বলেন যে, “সময় বা স্থান নির্ধারণ করার শর্তে কুরআন শরীফ খত্ম করা তথা খ্ত্মে তারাবীহ ও সূরা তারাবীহ্সহ সকল প্রকার ফরয, ওয়াজিব ও সুন্নাতে মুয়াক্কাদা ইত্যাদি সর্বপ্রকার ইবাদতের বিনিময়ে পারিশ্রমিক দেয়া নেয়া জায়েয ও শরীয়তসম্মত।” এটাই গ্রহণযোগ্য মত এবং এ মতের উপরই ফতওয়া। এর বিপরীত ফতওয়া দেয়া নাজায়েয ও হারাম।
এ প্রসঙ্গে ফিক্বাহ্র বিশ্ববিখ্যাত ও নির্ভরযোগ্য কিতাব “জামিউর রুমুজে” উল্লেখ আছে যে,
تبطل الاجارة عند المتقدمين للعبادات كالاذان والامامة والتذكير والتدريس والحج والغزو وتعليم القران والفقه وقرأتهما ويفتى اليوم اى يفتى المتأخرون بصحتها اى الاجارة لهذا العبادات.
অর্থঃ- “উলামায়ে মুতাকাদ্দিমীনগণের অর্থাৎ পূর্ববর্তী আলিমগণের মতে আযান, ইমামতী, যিকির, শিক্ষকতা, হজ্জ্ব, জ্বিহাদ, কুরআন শরীফ ও ফিক্বাহ্ শিক্ষা দিয়ে এবং ফিক্বাহ্ ও কুরআন শরীফ পাঠ করে উজরত বা পারিশ্রমিক গ্রহণ করা নাজায়েয ও বাতিল। আর বর্তমানে ফতওয়া হলো- অর্থাৎ উলামায়ে মুতাআখ্খেরীনগণের (পরবর্তী আলিম) ফতওয়া মোতাবিক উল্লিখিত ইবাদতসমূহের বিণিময়ে উজরত বা পারিশ্রমিক গ্রহণ করা জায়েয ও ছহীহ্।” অনুরূপ “তাফসীরে রুহুল বয়ান” ও “মূলতাকার হাশিয়াতে”ও উল্লেখ আছে।
আর উলামা-ই-মুতাআখ্খিরীন-এর মত প্রসঙ্গে “বাহ্রুর রায়েক” কিতাবে উল্লেখ করা হয় যে,
ان المفتى به جواز الاخذ على القرائة.
অর্থঃ- “কুরআন শরীফ পাঠ করে উজরত গ্রহণ করা জায়েয, এটা ফতওয়া গ্রাহ্যমত।”
এ প্রসঙ্গে “ফতওয়ায়ে আলমগীরী” কিতাবে উল্লেখ আছে,
اختلفوا فى الاستيجار على قراة القران عند القبر مدة معلومة قال بعضهم يجوز وهو المختار كذا فى سراج الوهاج.
অর্থঃ- “কোন নির্দিষ্ট সময়ে কবরের নিকট কুরআন শরীফ পড়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করার ব্যাপারে আলিমগণের মধ্যে মতানৈক্য আছে, কতক বলেছেন, এটা জায়েয। আর এটাই ফতওয়াগ্রাহ্য মত।” “সিরাজুল ওহ্হাজ” কিতাবেও অনুরূপ মত রয়েছে।
“তাহ্তাবী” কিতাবে উল্লেখ আছে,
المختار جواز الاستيجار على قرأة القران- الخ.
অর্থঃ- “কুরআন শরীফ তিলাওয়াত করে উজরত গ্রহণ করা জায়েয হওয়াই (ফক্বীহ্গণের) মনোনীত মত।”
আর ফিক্বাহ্ শাস্ত্রের উসূল বা নিয়ম হলো- মতভেদযুক্ত মাসয়ালায় যে মতটাকে وبه بفتى – وهو المختار – عليه الفتاوى ইত্যাদি শব্দ দ্বারা ترجيح বা প্রাধান্য দেয়া হবে, সে মতটিই গ্রহণযোগ্য হবে। প্রাধান্যপ্রাপ্ত মাসয়ালার বিপরীত ফতওয়া দেয়া সম্পূর্ণই নাজায়েয ও হারাম।
এ প্রসঙ্গে কিতাবে উল্লেখ করা হয় যে,
ابن حجر المكى قال لايحل لهما الحكم والا فتاء بغير الراجح لانه اتباع للهواء وهو حرام اجماعا.
অর্থঃ- “মুহাক্কিক ইবনে হাজর মক্কী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ইখ্তিলাফযুক্ত মাসয়ালায় প্রাধান্যপ্রাপ্ত মাসয়ালার বিপরীত ফতওয়া দেয়া বা আমল করা সর্বসম্মতিক্রমে হারাম। কেননা এটা নফসের অনুসরণ।” এটা “ফতওয়ায় কোবরাতে”ও উল্লেখ আছে। (উকুদে রস্মুল মুফ্তী পৃষ্ঠা-৩)
অতএব, যে বিষয়গুলো অসংখ্য অকাট্য দলীল দ্বারা হালাল বা জায়েয প্রমাণিত, সে বিষয়গুলোকে নাজায়েয, হারাম ও বিদ্য়াত বলা সম্পূর্ণরূপে গোমরাহীর নামান্তর। আর এদের প্রসঙ্গেই আল্লাহ্ পাক তাঁর কালামে পাকে ইরশাদ করেন,
يايها الذين امنوا لاتحرموا طيبت ما احل الله لكم ولا تعتدوا ان الله لا يحب المعتدين.
অর্থঃ- “হে ঈমানদারগণ! আল্লাহ্ পাক তোমাদের জন্যে পবিত্র বস্তু হতে যা হালাল করেছেন, তোমরা তা হারাম করোনা আর (এ ব্যাপারে) সীমালঙ্ঘন করোনা। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ পাক সীমালঙ্ঘনকারীকে ভালবাসেন না।” (সূরা মায়িদা/৮৭)
অথচ অখ্যাত পত্রিকার মৌলভী ছাহেবরা কিতাবের মাফহুম এবং উলামা-ই-মুতাকাদ্দিমীন ও উলামা-ই-মুতাআখ্খেরীন গণের পার্থক্য বুঝতে না পেরে যে বক্তব্য পেশ করেছে তা মোটেই গ্রহণযোগ্য ও শরীয়ত সম্মত নয়। সুতরাং খতম তারাবীহ বিনিময় দেয়া নেয়া সম্পর্কে মৌলভীদের উক্ত বক্তব্য ভুল।
(বিঃ দ্রঃ এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে হলে মাসিক আল বাইয়্যিনাত-এর ২৩ ও ২৪তম এবং বিশেষ করে ৫৯, ৬০, ৬১, ৬২, ৬৩, ৬৪, ৬৫, ৬৬, ৬৭, ৬৮, ৭৭ এবং ৬৯তম সংখ্যার মতামত বিভাগের উজরত সম্পর্কে “ভন্ডামী ফাঁস” মতামতটি পাঠ করুন।)