মহান আল্লাহ পাক উনার কালাম মুবারক হচ্ছেন পবিত্র কুরআন শরীফ। পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে একশত চৌদ্দখানা পবিত্র সূরা শরীফ রয়েছে। পবিত্র কুরআন শরীফ উনার সূরা শরীফগুলো বিভিন্ন সংখ্যার আয়াত শরীফ দ্বারা গঠিত। যার সর্বনিম্ন সংখ্যা ৩ এবং সর্বোচ্চ সংখ্যা ২৮৬। পবিত্র কুরআন শরীফে যা নাযিল হয়েছে তার পুরোটাই সম্পূর্ণ অপরিবর্তিত অবস্থায় আমাদের নিকট পেঁৗছেছে। কোনো প্রকার ইফরাত-তাফরীত বা কম-বেশী হওয়া ব্যতীত। কেউ যদি এই বিষয়ে কোনো প্রকার সন্দেহ করে তাহলে সেটা কুফরী হবে, তার ঈমান নষ্ট হবে। নাঊযুবিল্লাহ!
তবে পবিত্র কুরআন শরীফে মোট কতখানা পবিত্র আয়াত শরীফ রয়েছেন এটা নিয়ে বিভিন্ন মতানৈক্য রয়েছে। আর এই মতানৈক্যের কারণ হলো কেউ ছোট কয়েকখানা আয়াত শরীফ মিলিয়ে বড় একখানা আয়াত শরীফ গণনা করেছেন। আবার কেউ বড় একখানা আয়াত শরীফকে ওয়াক্বফ ও অর্থের দিকে খেয়াল করে একাধিক আয়াত শরীফ গণনা করেছেন। কিন্তু এতে করে নাযিলকৃত পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মাঝে কোনো কম-বেশী হয়নি। পবিত্র আয়াত শরীফ নিয়ে মতানৈক্যের কারণে পবিত্র কুরআন শরীফ পরিবর্তিত ও পরিবর্ধ্বিত হয়েছে এই আক্বীদাহ পোষণ করা কাট্টা কুফরী। নাঊযুবিল্লাহ!
কারণ পবিত্র কুরআন শরীফ হিফাযতের দায়িত্ব স্বয়ং মহান আল্লাহ পাক উনার। মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-
اِنَّا نَحْنُ نَـزَّلْنَا الذِّكْرَ وَاِنَّا لَهٗ لَحَافِظُوْنَ
অর্থ: নিশ্চয়ই আমি পবিত্র কুরআন শরীফ (ধাপে ধাপে বা পর্যর্ায়ক্রমে) নাযিল করেছি এবং আমি নিজেই উনার হিফাযতকারী। সুবহানাল্লাহ! (সম্মানিত ও পবিত্র সূরা হিজর শরীফ : সম্মানিত ও পবিত্র আয়াত শরীফ ৯)
বহুল প্রচলিত, মশহূর এবং সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য-শক্তিশালী মতে পবিত্র কুরআন শরীফ উনার আয়াত শরীফ সংখ্যা ৬,৬৬৬। আর এটা হলো মহাসম্মানিত উম্মুল মু’মিনীন সাইয়্যিদাতুনা হযরত আছ ছালিছাহ ছিদ্দীক্বাহ আলাইহাস সালাম উনার বর্ণনা। আর বর্তমানে আমাদের মাঝে প্রচলিত পবিত্র কুরআন শরীফ রয়েছে সেখানে ৬,২৩৬ খানা আয়াত শরীফ রয়েছে। এটা হচ্ছে কূফী মত। যা মূলত চতুর্থ খলীফা সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুল আউওয়াল কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম উনার ইজতিহাদ ও গণনা।
এখানে একটা বিষয় মনে রাখতে হবে, এই দুটি বর্ণনা ছাড়া আরও যেসব বর্ণনা রয়েছে সেগুলো ঢালাওভাবে ভুল বলার কোনো সুযোগ নেই। কারণ সবগুলো বর্ণনাই কোনো না কোনো হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদের থেকেই বর্ণিত হয়েছে। আর উনাদের কোনো বিষয়কে ভুল বলা ঈমান নষ্ট হওয়ার কারণ।
তবে পরিতাপের বিষয় হলো : অনেক বক্তা ও লেখককে দেখা যায় তারা ৬,৬৬৬ খানা আয়াত শরীফ উনার এই বর্ণনাকে ভুল বলে প্রচার করছে এবং এই সংখ্যাকে অস্বীকার করে বসছে। নাঊযুবিল্লাহ! যা সুস্পষ্ট সত্যকে অস্বীকার করার শামিল।
এখানে একটা বিষয় মনে রাখতে হবে, পবিত্র কুরআন শরীফ উনার আয়াত শরীফ সংখ্যা যেটার উপর ইজমা হয়েছে সেটা হলো ৬,০০০ (ছয় হাজার)। যা হযরত ইমাম জালালুদ্দীন সূয়ূতী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনিসহ আরো অনেকেই বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন-
قَالَ الدَّانِىُّ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ اَجْمَعُوْا عَلٰى اَنَّ عَدَدَ اٰيَاتِ الْقُرْاٰنِ سِتَّةُ اٰلَافِ اٰيَةٍ ثُمَّ اخْتَلَفُوْا فِيْمَا زَادَ عَلٰى ذٰلِكَ
অর্থ: হযরত আবূ আমর আদ দানী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, এ ব্যাপারে সকল ইমামগণ ইজমা করেছেন যে, পবিত্র কুরআন শরীফ উনার আয়াত সংখ্যা ছয় হাজার। অতঃপর (৬,০০০) এর অতিরিক্ত সংখ্যার ব্যাপারে উনারা মতভেদ করেছেন। (আল ইতক্বান ফী উলূমিল কুরআন ১/২৩৩, আল বুরহান ফী উলূমিল কুরআন ১/১৬৮, মিরক্বাতুল মাফাতীহ ৪/১৪৬৯ ইত্যাদি)
যার কারণে হযরত ইমাম-মুজতাহিদ রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনারা কোনো সংখ্যাকেই সরাসরি ভুল বলে আখ্যায়িত করেন নি। যেমনটা বর্তমান সময়ে অনেককে করতে দেখা যায়। অনেকে আবার এই সংখ্যাকে শীয়াদের সাথে নিসবত করতে চায়। যা সম্পূর্ণ ভুল। কারণ এই সংখ্যার পক্ষে হানাফী, মালেকী, শাফেয়ী এবং হাম্বলী অর্থাৎ আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের অনেক ইমাম-মুজতাহিদ উনাদের বক্তব্য রয়ে গেছে। তাহলে উনারা কি শিয়া? নাঊযুবিল্লাহ!
মনে রাখতে হবে ৬,৬৬৬ খানা আয়াত শরীফ উনার বর্ণনা আমাদের নিকট অলৌকিকভাবে এসে পেঁৗছেনি। অন্যান্য বর্ণনার মতো এটাও ধারাবাহিকভাবেই আমাদের নিকট পেঁৗছেছে। এমনকি এটাই সবার মাঝে সর্বাধিক প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। সুবহানাল্লাহ! নিম্নে এ বিষয়ে দলীলভিত্তিক আলোচনা পেশ করা হলো:
গত শতকের মুজাদ্দিদ হযরত আবূ বকর ছিদ্দীক্বী কুরাইশী ফুরফুরাবী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার অন্যতম খলীফা হাফিযুল হাদীছ হযরত মাওলানা রূহুল আমীন বশীরহাটী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনিসহ আরো অনেকেই বর্ণনা করেছেন। যেমন তিনি উনার ‘কেরাত শিক্ষা’ বইয়ের প্রথম ভাগে পবিত্র কুরআন শরীফ উনার আয়াত শরীফ সংখ্যা সম্পর্কে ৭ টি মত উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, পবিত্র কুরআন শরীফ উনার আয়াত শরীফ সংখ্যা কত এতে মতভেদ হয়েছে। যথা:
১. কুফীগণের মতে- ৬,২৩৬
২. বসরীগণের মতে- ৬,২১৬
৩. (কতিপয়) শামীগণের মতে- ৬,২৫০
৪. ইসমাইল মাদানীর মতে- ৬,২১৪
৫. মক্কা শরীফবাসিগণের মতে- ৬,২১২
৬. হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার মতে- ৬,২১৮
৭. উম্মুল মু’মিনীন আছ ছালিছাহ হযরত ছিদ্দীক্বাহ আলাইহাস সালাম উনার মতে- ৬,৬৬৬
শেষোক্ত মতটি সমধিক প্রবল- ৬,৬৬৬। (আল্লামা রূহুল আমীন বশীরহাটী রহমতুল্লাহি আলাইহি রচনাবলী ১১ তম খন্ড, কেরাত শিক্ষা, প্রথম ভাগ ১০১ পৃষ্ঠা)
হযরত ক্বাসিম ইবনে ঈসা ইবনে নাজী তানূখী ক্বিরওয়ানী রহমতুল্লাহি আলাইহি (বিছাল শরীফ: ৮৩৭ হিজরী) তিনি হযরত শায়েখ আবূ ইসহাক্ব ছা’লাবী রহমতুল্লাহি আলাইহি (বিছাল শরীফ: ৪২৭ হিজরী মতান্তরে ৪৩৭ হিজরী) উনার বরাত দিয়ে বর্ণনা করেছেন-
قَالَ الشَّيْخُ اَبُـوْ اِسْحَاقَ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ اَلْقُرْاٰنُ سِتَّةُ اٰلَافِ اٰيَةٍ وَّسِتُّمِائَةٍ وَسِتٌّ وَّسِتُّـوْنَ
অর্থ: হযরত শায়েখ আবূ ইসহাক্ব ছা’লাবী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, পবিত্র কুরআন শরীফ উনার আয়াত শরীফ সংখ্যা হলো ছয় হাজার ছয়শত ছেষট্টি (৬,৬৬৬)। (শরহে ইবনে নাজী তানূখী ১/৩৭, নিহাইয়াতুল ইজায ৪৪০ পৃষ্ঠা)
হযরত জারুল্লাহ যামাখশারী রহমতুল্লাহি আলাইহি (বিছাল শরীফ: ৫৩৮ হিজরী) উনার থেকে বর্ণিত রয়েছে। যা বিশিষ্ট হানাফী ফক্বীহ হযরত ফখরুদ্দীন উছমান ইবনে আলী যাইলায়ী রহমতুল্লাহি আলাইহি (বিছাল শরীফ ৭৪৩ হিজরী) তিনি উনার ‘তাবয়ীনুল হাক্বায়িক্ব’ কিতাবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন-
( قَـوْلُهٗ وَعَدَدُ اَىِ الْقُرْاٰنِ سِتَّةُ اٰلَافِ اٰيَةٍ وَشَىْءٍ) قَالَ صَاحِبُ الْكَشَّافِ جَمِيْعُ الْقُرْاٰنِ سِتَّةُ اٰلَافٍ وَّسِتُّمِائَةٍ وَسِتَّةٌ وَّسِتُّـوْنَ اٰيَةً اَلْفٌ وَعْدٌ وَاَلْفٌ وَعِيْدٌ وَاَلْفٌ اَمْرٌ وَاَلْفٌ نَـهْىٌ وَاَلْفٌ قَصَصٌ وَاَلْفٌ خَبَـرٌ وَخَمْسُمِائَةٍ حَلَالٌ وَّحَرَامٌ وَمِائَةٌ دُعَاءٌ وَتَسْبِيْحٌ وَسِتَّةُ وَّسِتُّـوْنَ نَاسِخٌ وَمَنْسُوْخٌ
অর্থ: (গ্রন্থকারের কথা, আর পবিত্র কুরআন শরীফ উনার আয়াত শরীফ সংখ্যা ছয় হাজার এবং আরো কিছু বেশি।) ছাহিবুল কাশশাফ হযরত জারুল্লাহ যামাখশারী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে মোট ছয় হাজার ছয় শত ছেষট্টি আয়াত শরীফ রয়েছে। তারমধ্যে এক হাজার ওয়াদাপূর্ণ, এক হাজার ভয়সূচক, এক হাজার আদেশসূচক, এক হাজার নিষেধসূচক, এক হাজার ঘটনামূলক, এক হাজার সুসংবাদপূর্ণ, পাঁচশত হালাল-হারাম সম্পর্কিত, এক শত দোয়া ও তাসবীহ সম্পর্কিত আর ছেষট্টিখানা শারেহ-মাশরূহ (নাসেখ-মানসূখ)। (তাবয়ীনুল হাক্বায়িক্ব শরহে কানযুদ দাক্বায়িক্ব ২/৩৫৫ পৃষ্ঠা)
মালেকী মাযহাবের বিশিষ্ট ফক্বীহ, যিনি জামে’ আল আযহার মসজিদের প্রথম ইমাম ছিলেন, হযরত আবূ আব্দিল্লাহ মুহম্মদ ইবনে জামালুদ্দীন খুরাশী মালেকী রহমতুল্লাহি আলাইহি (বিছাল শরীফ: ১১০১ হিজরী) তিনি বলেন-
(فَائِدَةٌ) جُمْلَةُ مَا فِى الْقُرْاٰنِ مِنَ الْآىِ سِتَّةُ اٰلَافٍ وَّسِتُّمِائَةٍ وَّسِتٌّ وَّسِتُّـوْنَ اٰيَةً اَلْفٌ مِنْـهَا اَمْرٌ وَاَلْفٌ مِنْـهَا نَـهْىٌ وَاَلْفٌ مِنْـهَا وَعْدٌ وَاَلْفٌ مِنْـهَا وَعِيْدٌ وَاَلْفٌ مِنْـهَا عِيَادَةُ الْاَمْثَالِ وَاَلْفٌ مِنْـهَا قَصَصٌ وَاَخْبَارٌ وَخَمْسُ مِائَةٍ حَلَالٌ وَّحَرَامٌ وَمِائَةٌ دُعَاءٌ وَتَسْبِيْحٌ وَسِتٌّ وَّسِتُّـوْنَ نَاسِخٌ وَمَنْسُوْخٌ
অর্থ: ফায়েদাহ- পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মোট আয়াত শরীফ সংখ্যা হলো ছয় হাজার ছয় শত ছেষট্টি। তারমধ্যে এক হাজার আদেশসূচক, এক হাজার নিষেধসূচক, এক হাজার ওয়াদাপূর্ণ, এক হাজার ভয়সূচক, এক হাজার উপমাসমূহের পুনরাবৃত্তি, এক হাজার ঘটনা ও সংবাদ সম্বলিত, পাঁচ শত হালাল-হারামের বর্ণনা, এক শত দোয়া ও তাসবীহ সম্পর্কিত, শারেহ-মাশরূহ (নাসেখ-মানসুখ) সম্পর্কিত বাকী ছেষট্টিখানা। (শরহে মুখতাছারে খলীল লিল খুরাশী ২/১১, শরহে খলীল লিল খুরাশী ৪/৩৩৯)
হযরত আহমদ ইবনে মুহম্মদ ইবনে ইসমাইল ত্বাহত্বাভী হানাফী রহমতুল্লাহি আলাইহি (বিছাল শরীফ: ১২৩১ হিজরী) তিনি বলেন-
وَجَمِيْعُ اٰيَاتِ الْقُرْاٰنِ سِتَّةُ اٰلَافٍ وَّسِتُّ مِائَةٍ وَسِتَّةٌ وَّسِتُّـوْنَ اٰيَةً اَلْفٌ وَعْدٌ وَاَلْفٌ وَعِيْدٌ وَاَلْفٌ اَمْرٌ وَاَلْفٌ نَـهْىٌ وَاَلْفٌ قَصَصٌ وَاَلْفٌ خَبَـرٌ وَخَمْسُ مِائَةٍ حَلَالٌ وَحَرَامٌ وَمِائَةٌ دُعَاءٌ وَتَسْبِيْحٌ وَسِتٌّ وَّسِتُّـوْنَ نَاسِخٌ وَمَنْسُوْخٌ كَذَا فِى الشَّعْبِىْ عَنِ الْكَشَّافِ
অর্থ: পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে মোট ছয় হাজার ছয় শত ছেষট্টিখানা আয়াত শরীফ রয়েছে। তারমধ্যে এক হাজার ওয়াদাপূর্ণ, এক হাজার ভয়সূচক, এক হাজার আদেশসূচক, এক হাজার নিষেধসূচক, এক হাজার ঘটনামূলক, এক হাজার সুসংবাদপূর্ণ, পাঁচ শত হালাল-হারাম সম্পর্কিত, এক শত দোয়া ও তাসবীহ সম্পর্কিত আর ছেষট্টিখানা শারেহ-মাশরূহ (নাসেখ-মানসুখ)। যেমনটা শা’বীতে কাশশাফ থেকে বর্ণিত রয়েছে। (হাশিয়াতুত তাহতাভী আলা মারাক্বিইল ফালাহ ৪১৫ পৃষ্ঠা)
মুহম্মদ ইবনে আলী ফারূকী হানাফী তাহানভী রহমতুল্লাহি আলাইহি (বিছাল শরীফ: ১১৫৮ হিজরী) যিনি হিন্দুস্থানের একজন বিশিষ্ট আলিম ও গবেষক ছিলেন। তিনি বলেন-
وَاَمَّا الْمَشْهُوْرُ بَـيْنَ الْحُفَّاظِ وَالْقُرَّاءِ فَـهُوَ الْمَعْرُوْفُ فِىْ بَـيْتِ الشِّعْرِ الْاٰتِىْ وَتَـرْجَمَتُهٗ: اِنَّ عَدَدَ اٰيَاتِ الْقُرْاٰنِ الَّتِىْ تَجْذِبُ الرُّوْحَ سِتَّةُ اٰلَافٍ وَّسِتُّ مِائَةٍ وَسِتَّةٌ وَّسِتُّـوْنَ
অর্থ: আর হাফিয ও ক্বারী ছাহেবদের মাঝে প্রসিদ্ধ মত হলো, যা নিম্নের পরিচিত কবিতার পংক্তিতে বিদ্যমান। তার অনুবাদ- নিশ্চয়ই পবিত্র কুরআন শরীফ উনার আয়াত সংখ্যা, ছয় হাজার ছয়শত ছেষট্টি (৬,৬৬৬) যা আত্মাকে আকর্ষণ করে। (কাশশাফু ইছতিলাহাতিল ফুনূন ওয়াল উলূম ১/৯৯১ পৃষ্ঠা)
হযরত মারয়ী ইবনে ইউসুফ ইবনে আবী বকর কারমী হাম্বলী রহমতুল্লাহি আলাইহি (বিছাল শরীফ: ১০৩৩ হিজরী) তিনি এবং হযরত মুহম্মদ ইবনে আহমদ সালিম সাফারিনী হাম্বলী রহমতুল্লাহি আলাইহি (বিছাল শরীফ: ১১৮৮ হিজরী) তিনি অর্থাৎ উনারা বলেন-
وَعَدَدُ اٰيَاتِهِ سِتَّةُ اٰلَافٍ وَّسِتُّ مِائَةٍ وَسِتَّةٌ وَّسِتُّـوْنَ وَقِيْلَ غَيْـرُ ذٰلِكَ
অর্থ: আর পবিত্র কুরআন শরীফ উনার আয়াত সংখ্যা, ছয় হাজার ছয়শত ছেষট্টি। কেউ কেউ এর ব্যতিক্রমও বলেছেন। (গিযাউল আলবাব ফী শরহে মানযূমাতিল আদাব ১/৪১৫, ক্বালায়িদুল মারজান ফী বায়ানিন নাসিখ ওয়াল মানসূখ ফিল কুরআন ২৩৯ পৃষ্ঠা)
কিতাবে আরো বর্ণিত রয়েছে-
وَعِدَّةُ اٰيَاتِهِ: سِتَّةُ اٰلَافٍ وَسِتُّمِائَةٍ وَسِتَّةٌ وَّسِتُّـوْنَ اٰيَةً
অর্থ: পবিত্র কুরআন শরীফ উনার আয়াত শরীফ সংখ্যা ছয় হাজার ছয়শত ছেষট্টি (৬,৬৬৬)। (মানাহিজুল মুফাসসিরীন ২৯১ পৃষ্ঠা)
আরো বর্ণিত রয়েছে-
تعداد ایات قران: شمار حضرت ام المؤمنین عائشہ علیہا السلام کی مطابق ৬৬৬৬ ہی
অর্থ: ‘পবিত্র কুরআন শরীফ উনার আয়াত শরীফ সংখ্যা: উম্মুল মু’মিনীন হযরত ছিদ্দীক্বাহ আলাইহাস সালাম উনার গণনা অনুযায়ী ৬,৬৬৬ খানা।’ (উলূমুল কুরআন লি শামসিল হক্ব- ১৬০ পৃষ্ঠা)
‘সিরাজুল ক্বারী’ নামক গ্রন্থে বর্ণিত রয়েছে-
اور حضرت عائشہ علیہا السلام چھ ہزار چھ سو چھیاسٹھ (৬৬৬৬) کہتی ہی
অর্থ: হযরত উম্মুল মু’মিনীন আয়েশাহ ছিদ্দীক্বাহ আলাইহাস সালাম উনার গণনা অনুযায়ী (পবিত্র কুরআন শরীফ উনার আয়াত সংখ্যা) ৬,৬৬৬টি।’ (সিরাজুল ক্বারী- ৩২ পৃষ্ঠা)
আরো বর্ণিত রয়েছে-
حضرت عائشہ علیہا السلام کا شمار ৬৬৬৬
অর্থাৎ উম্মুল মু’মিনীন হযরত ছিদ্দীক্বাহ আলাইহাস সালাম উনার গণনা অনুযায়ী (পবিত্র কুরআন শরীফ উনার আয়াত সংখ্যা) ৬,৬৬৬ খাানা।’ (তারীখুল কুরআন লি আব্দিছ ছমাদ ছারিম- ১১৯ পৃষ্ঠা)
বিশিষ্ট হানাফী ফক্বীহ হযরত আবুল লাইস সমরকন্দী রহমতুল্লাহি আলাইহি (বিছাল শরীফ: ৩৭৩ হিজরী)। ইলমে তাছাউফেও উনার সুখ্যাতি রয়েছে। তাছাউফের উপর লিখিত উনার দুটি প্রসিদ্ধ কিতাব হচ্ছে- ‘তাম্বীহুল গাফেলীন’ এবং ‘বুস্তানুল আরেফীন’। তিনি উনার বুস্তানুল আরেফীন কিতাবে পবিত্র কুরআন শরীফ উনার আয়াত সংখ্যার বিষয়ে ১০টি মত উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন-
اِخْتَـلَفَ الْقُرَّاءُ فِىْ عَدَدِ آىِ الْقُرْاٰنِ وَالْمُخْتَارُ مِنَ الْأَقْـوَالِ وَهُوَ عَدَدُ الْكُوفِيِّيْنَ وَهُوَ الْعَدَدُ الْمَنْسُوْبُ اِلَى سَيِّدِنَا حَضْرَتْ عَلِىِّ بْنِ اَبِىْ طَالِبٍ عَلَيْهِ السَّلَامُ اَنَّـهَا سِتَّةُ آلَافٍ وَمِائَـتَانِ وَسِتٌّ وَّثَلَاثُـوْنَ اٰيَةً وَقَدْ قَالُوْا غَيْـرَ هٰذَا وَرُوِىَ عَنْ حَضْرَتْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مَسْعُوْدٍ رَضِىَ اللهُ تَـعَالـٰى عَنْهُ اَنَّهٗ قَالَ اٰيَاتُ الْقُرْاٰنِ سِتَّةُ اٰلَافٍ وَمِائَـتَانِ وَثَـمَانِىَ عَشْرَةَ اٰيَةً. وَرُوِىَ عَنْ حَضْرَتْ اِبْنِ عَبَّاسٍ رَضِىَ اللهُ تَـعَالـٰى عَنْهُ اَنَّهٗ قَالَ جَمِيْعُ الْقُرْآنِ سِتَّةُ اٰلَافٍ وَمِائَتَانِ وَسِتَّ عَشْرَةَ اٰيَةً. وَفِي عَدَدِ اِسْمَاعِيْلَ بْنِ جَعْفَرٍ الْمَدَنِىِّ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ سِتَّةُ اٰلَافٍ وَمِائَـتَانِ وَاَرْبَعَ عَشْرَةَ اٰيَةً. وَفِىْ عَدَدِ الْمَكِّيِّيْنَ سِتَّةُ اٰلَافٍ وَمِائَـتَانِ وَاِثْـنَـتَا عَشْرَةَ اٰيَةً. وَفِىْ عَدَدِ الْبَصْرِيِّيْنَ سِتَّةُ اٰلَافٍ وَمِائَـتَانِ وَأَرْبَعُ اٰيَاتٍ. وَفِىْ عَدَدِ اَهْلِ الشَّامِ سِتَّةُ اٰلَافٍ وَمِائَـتَانِ وَسِتٌّ وَّعِشْرُوْنَ اٰيَةً. وَعَنْ اِبْـرَاهِيْمَ التَّـيْمِىِّ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ اَنَّه قَالَ سِتَّةُ اٰلَافٍ وَتِسْعٌ وَّتِسْعُوْنَ اٰيَةً وَقَالَ بَعْضُ اَهْلِ الشَّامِ سِتَّةُ اٰلَافٍ وَمِائَـتَانِ وَخَمْسُوْنَ اٰيَةً. وَفِىْ قَـوْلِ الْعَامَّةِ سِتَّةُ اٰلَافٍ وَسِتُّ مِائَةٍ وَسِتٌّ وَّسِتُّـوْنَ اٰيَةً
অর্থ: পবিত্র কুরআন শরীফ উনার আয়াত শরীফ সংখ্যার ব্যাপারে ক্বারীগণ মতভেদ করেছেন। আর এই মতগুলোর মধ্যে মুখতার মতটি হলো কুফীগণের গণনা। এটা হলো ঐ গণণা যা ইমামুল আউওয়াল সাইয়্যিদুনা হযরত কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম উনার দিকে নিসবত করা হয়।
(১) আর সেই গণনা অনুযায়ী পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মোট আয়াত সংখ্যা হলো- ছয় হাজার দুই শত ছত্রিশ (৬,২৩৬)। এটা ছাড়াও আরো অনেকে বিভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন। যেমন:
(২) হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত রয়েছে। তিনি বলেন, পবিত্র কুরআন শরীফ উনার আয়াত শরীফ সংখ্যা ছয় হাজার দুই শত আঠারো খানা (৬,২১৮)।
(৩) হযরত ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, পুরো পবিত্র কুরআন শরীফে ছয় হাজার দুই শত ষোলো (৬,২১৬) খানা আয়াত শরীফ রয়েছে।
(৪) হযরত ইসমাঈল ইবনে জা’ফর মাদানী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার গণনা মতে ছয় হাজার দুই শত চৌদ্দ (৬,২১৪) খানা।
(৫) মক্কী গণনা অনুসারে ছয় হাজার দুই শত বারো (৬,২১২)।
(৬) বছরী গণনা মতে ছয় হাজার দুই শত চার (৬,২০৪)।
(৭) শামীদের গণনা অনুযায়ী ছয় হাজার দুইশত ছাব্বিশ (৬,২২৬)।
(৮) হযরত ইবরাহীম তাইমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মতে ছয় হাজার নিরানব্বই (৬,০৯৯)।
(৯) কতিপয় শামীদের মতে ছয় হাজার দুইশত পঞ্চাশ (৬,২৫০)।
(১০) এরপর তিনি সর্বশেষ বলেন-
وَفِىْ قَـوْلِ الْعَامَّةِ سِتَّةُ اٰلَافٍ وَسِتُّ مِائَةٍ وَسِتٌّ وَّسِتُّـوْنَ اٰيَةً
‘আর সর্বাধিক প্রচলিত মতে পবিত্র কুরআন শরীফ উনার আয়াত শরীফ সংখ্যা হলো ছয় হাজার ছয়শত ছেষট্টি (৬,৬৬৬)।’ (বুস্তানুল আরেফীন ৫৪ পৃষ্ঠা, দারুল আরকাম ইবনে আবীল আরক্বাম, বৈরুত, লেবানন থেকে প্রকাশিত।)
উপরোক্ত দলীলভিত্তিক আলোচনা থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত ও প্রতিভাত যে- ৬,৬৬৬ খানা আয়াত শরীফ উনার বিষয়টি পূর্ব থেকেই ছাবিত হয়েছে। এটা নতুন কোনো বিষয় নয়। শুধু তাই নয় এই মতটিই সবচেয়ে অধিক প্রচলিত প্রসিদ্ধ, শক্তিশালী ও বিশুদ্ধ অভিমত। তাই এই সংখ্যাটিকে নিয়ে কোনো প্রকার চূ-চেরা করা এবং মানুষকে বিভ্রান্ত করার সুযোগ নেই।
মহান আল্লাহ পাক তিনি মামদূহ মুর্শিদ ক্বিবলা সাইয়্যিদুনা হযরত সুলত্বানুন নাছীর আলাইহিস সালাম উনার সম্মানার্থে সকলকে সঠিক বুঝ দান করুন। আমীন!
-হাফিয মুহম্মদ ইমামুল হুদা।