অধ্যাপক মওলানা নুরুজ্জামান
পবিত্র দ্বীন ইসলাম উনার প্রাথমিক অবস্থায় কেউ দ্বীন ইসলাম গ্রহণ করিলে তিনি যথা সম্ভব উহাকে গোপন রাখিবার চেষ্টা করিতেন। কাফিরদের পক্ষ হইতে কোন নির্যাতন পৌঁছে এই ভয়ে স্বয়ং নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনিও গোপন রাখিবার জন্য পরামর্শ দিতেন। মুসলমানদের সংখ্যা যখন উনচল্লিশ দাঁড়ায়, তখন হযরত সিদ্দীকে আকবর আলাইহিস সালাম তিনি প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচার করিবার অনুমতি প্রার্থনা করেন। প্রথমে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি অনুমতি মুবারক দেননি। অবশ্য পরে সিদ্দীকে আকবর হযরত আবু বকর ছিদ্দীক আলাইহিস সালাম উনার বারংবার অনুরোধে সম্মত হন। নব দীক্ষিত সবাইকে নিয়ে পবিত্র কা’বা শরীফ গৃহে হাজির হইলেন। হযরত আবু বকর ছিদ্দীক আলাইহিস সালাম তিনি দাওয়াতী খুৎবা আরম্ভ করেন। পবিত্র দ্বীন ইসলাম উনার উপর ইহাই প্রথম ভাষণ। সেইদিন নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার চাচা হযরত হামজা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি পবিত্র ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তার তিনদিন পর হযরত উমর ফারুক আলাইহিস সালাম তিনিও পবিত্র ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হন। খুৎবা শুরু হইতেই চতুর্দিক হইতে কাফিরগণ মুসলমানদের উপর ঝাপাইয়া পড়িল। পবিত্র মক্কা শরীফ নগরীতে হযরত আবু বকর ছিদ্দীক আলাইহিস সালাম তিনি যথেষ্ট প্রভাব প্রতিপত্তিশালী হওয়া সত্বেও কাফিরেরা উনাকে এমন বেদম মারধর করে যে, উনার চেহারা এবং নাক, কান মুবারক সবকিছু রক্তে রঞ্জিত হইয়া যায়। হরেক রকমের আঘাতের কারণে তিনি একদম বেহুশ হইয়া পড়েন।
এই খবর শুনিয়া বনী তাইমের লোক আসিয়া হযরত আবু বকর ছিদ্দীক আলাইহিস সালাম উনাকে লইয়া গেলেন। কাহারো ধারণা ছিল না যে, তিনি আর বাঁচিতে পারিবেন। বনী তাইম হারাম শরীফ উনার মধ্যে দাঁড়াইয়া ঘোষণা করিলেন যে, এই দুর্ঘটনায় হযরত আবু বকর ছিদ্দীক আলাইহিস সালাম তিনি যদি ইন্তিকাল করেন তবে আমরা উহার প্রতিশোধ স্বরূপ উতবা ইবনে রাবিয়াকে হত্যা করিব। যেহেতু তাহাকে মারধরের ব্যাপারে উতবার ভূমিকা ছিল সবচেয়ে বেশী। সন্ধ্যা পর্যন্ত হযরত আবু বকর ছিদ্দীক আলাইহিস সালাম তিনি অচেতন অবস্থায় ছিলেন। সন্ধ্যার সময় উনার হুশ হওয়ার পর সর্ব প্রথম উনার কথা ইহাই ছিল যে, ‘আমার প্রিয় নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি কি অবস্থায় আছেন?’ উপস্থিত লোকজন উনাকে এই বলিয়া ভাল-মন্দ বলিতে লাগিল যে, ‘তাহার দরুন তোমার এই করুন অবস্থা এবং সারাদিন মৃত্যুর মুখে থাকিয়া যখন জ্ঞানশক্তি আসিল তখন আবার সেই নবীর নাম।’ হযরত আবু বকর ছিদ্দীক আলাইহিস সালাম উনার মাতা উম্মুল খায়ের কিছু খানা তৈয়ার করিয়া খাইতে বলিলেন, কিন্তু নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার প্রেমিক হযরত আবু বকর ছিদ্দীক আলাইহিস সালাম উনার মুখে শুধু একই আওয়াজ, আমার প্রিয় নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার অবস্থা কি? উনি কেমন আছেন? তিনি কি ভাল আছেন? উনার মা বলিলেন, বাবা আমি জানি না তিনি কি অবস্থায় আছেন? তিনি বলিলেন, হযরত ওমর ফারুক আলাইহিস সালাম উনার ভগ্নী উম্মে জামীলের নিকট গিয়ে জানিয়া আস। মা- ছেলের দুঃখ কষ্ট সহ্য করিতে না পারিয়া উম্মে জামীলের নিকট গিয়া নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার হালত জিজ্ঞাসা করিলেন। উম্মে জামীল সাধারণ নিয়মানুসারে নিজের ঈমানকে কঠোরভাবে গোপন রাখিয়া বলিলেন, আমি কি জানি কে মুহম্মদ, আর কে আবু বকর। তবে তোমার ছেলের মারধরের কথা শুনিয়া আমি বড় দুঃখিত হইয়াছি। উনাকে দেখার জন্য আমাকে নিয়ে চল। উম্মুল খায়ের উনাকে নিয়া আসিলেন। তিনি হযরত আবু বকর ছিদ্দীক আলাইহিস সালাম উনার মর্মান্তিক অবস্থা দেখিয়া কান্নায় ভাঙ্গিয়া পড়িলেন। কাফিররা উনাকে কিরূপ আঘাত করিয়াছে? আল্লাহ্ তায়ালা তিনি তাহাদিগকে ইহার শাস্তি প্রদান করুক।
হযরত আবু বকর ছিদ্দীক আলাইহিস সালাম তিনি বলিলেন, বলেন তো- আমার মাহবুব উনার অবস্থা কি? তিনি কেমন আছেন, উম্মে জামীল উনার মায়ের দিকে ইশারা করিয়া বলিলেন, আপনার মা শুনিতে পারেন। হযরত আবু বকর ছিদ্দীক আলাইহিস সালাম তিনি বলিলেন, উনার বিষয় কোন ভয় করিয়েন না। উম্মে জামীল বলিলেন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ভাল আছেন এবং হযরত আরকাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার ঘরে আছেন। হযরত সিদ্দীকে আকবর আলাইহিস সালাম তিনি বলিলেন, মহান আল্লাহ পাক উনার কছম! আমি ঐ পর্যন্ত কিছুই খাইব না, পানও করিব না, যেই পর্যন্ত নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাক্ষাৎ না হয়। কসম শুনিয়া উম্মুল খায়ের আরও ব্যস্ত হইয়া পড়িলেন, কেননা নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাক্ষাতের পূর্বে তিনি কিছুই খাইবেন না। বাধ্য হইয়া তিনি ব্যবস্থা করিলেন, লোকে দেখিয়া ফেলে নাকি এই ভয়ে রাত্রি গভীর হওয়ার অপেক্ষা করিল। যখন লোক চলাচল বন্ধ হইয়া গেলে তখন তিনি হযরত আবু বকর ছিদ্দীক আলাইহিস সালাম উনাকে লইয়া হযরত আরকাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার ঘরে পৌঁছিলেন।
প্রিয় নবীজী, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে দেখিয়া হযরত আবু বকর ছিদ্দীক আলাইহিস সালাম তিনি জড়াইয়া ধরিলেন। নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনিও উনাকে জড়াইয়া ধরিয়া কাঁদিতে লাগিলেন এবং সকল মুসলমান কাঁদিতে লাগিলেন। হযরত আবু বকর ছিদ্দীক আলাইহিস সালাম তিনি বলিলেন, হুযূর! ইনি আমার মা, আমার মাকে ঈমানের দাওয়াত দিন এবং হিদায়াতের জন্য দোয়া করুন। নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ঈমানের দাওয়াত দিলেন ও দোয়া করিলেন সঙ্গে সঙ্গে ঈমান কবুল করে মুসলমান হইলেন।
বস্তুতঃ এই ছিল প্রকৃত প্রেমিকের নিদর্শন, সুখ, শান্তি ও আরাম আয়েশের সময় মুহব্বতের দাবীদার শত-সহস্র দেখা যায়। অথচ বিপদে ও মছিবতের সময় যাহা বাকি থাকে উহাই প্রকৃত ভালবাসা। দ্বীনি দাওয়াতের জজবা সর্ব অবস্থাতেই উনাদের মধ্যে ছিলো। কি করে একজন লোককে জাহান্নামের পথ থেকে জান্নাতের পথে আনা যায়। আমরাও যদি সত্যিকারে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে ভালবাসি তবে হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ উনাদের পথকে অনুসরণ করতে হইবে।
হযরত রসুলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বৈশিষ্ট্য/দু’একটি বিষয়ে আলোকপাত
যমযম কুপের ও ওযুর পানি দাঁড়িয়ে পান করা মোস্তাহাব অন্য কোন পানি বা খাদ্য দাঁড়িয়ে পান করা মাকরূহ
সর্ব প্রথম সৃষ্টি নূরে হাবীবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম