কুদরতময় আল্লাহ্ পাক-এর জন্য সমস্ত প্রশংসা। যিনি লা-শরীক। তাওহীদের ধারক-বাহক সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি সকল সালাত ও সালাম।
তাওহীদ আর তাসাউফ পরস্পর অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। বিশুদ্ধ তাওহীদ মূলতঃ আল্লাহ্ তায়ালার জাত-পাকের পরিচয় প্রাপ্ত, তাঁর মুহব্বত-মা’রিফাতে সমৃদ্ধ, শুদ্ধতম অন্তরেই সন্নিবেশিত হতে পারে।
কেবলমাত্র ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্’ মুখে বলা এবং সাধারণভাবে অন্তরে বিশ্বাস করাতেই তাওহীদের যথাযথ হক্ব আদায় হয়না। তাসাউফের আলোকে অন্তর্নিহিত গূঢ় রহস্য উপলব্ধিই তাওহীদের আসল মর্ম উদঘাটনে সক্ষম।
‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্’-এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য ও মূল্যায়ণ অতি ব্যাপক। সরাসরিভাবে এর বিপরীত দিকটি হচ্ছে- র্শিক। তাই যেসব ক্ষেত্রে এই কলেমা শরীফের মুল্যায়ণ থাকেনা, অনিবার্যভাবে সেখানে র্শিক স্থান লাভ করে।
র্শিক বলতে প্রকাশ্য র্শিকের প্রতি সাধারণে গুরুত্ব দিয়ে থাকে। কিন্তু সাধারণ মুসলিম জীবনের অন্তরালে অনেক অপ্রকাশ্য র্শিক বা র্শিকে খফীও তাদের ঈমান এবং আমলকে পর্যুদস্ত করে থাকে। হাদীস শরীফে বলা হয়েছে, “আমার উম্মতের মধ্যে র্শিক পাহাড়ের উপর চলন্ত পিঁপড়ার পায়ের শব্দ হতেও অধিকতর সূক্ষ্ম।” আল্লাহ্ পাক এরশাদ ফরমান, “অনেক মানুষ আল্লাহ্ পাক-এর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে কিন্তু সাথে সাথে র্শিকও করে।” (সূরা ইউসুফ/১০৬)
স্বাভাবিকভাবেই মানুষ হিংসা, অহমিকা, রিয়া, ফখর ইত্যাদি মুহলিকাত বা বদ্ খাছলত দ্বারা আবর্তিত থাকে।
আল্লাহ্ পাক কালামে পাকে এরশাদ ফরমান, “ঐ মুছল্লী বা নামাজীর জন্য জাহান্নাম যে মুছল্লী লোক দেখানোর জন্য নামাজ আদায় করে।” (সূরা মাউন/৪-৬)
“যৎকিঞ্চিত রিয়াও শিরকের অন্তর্ভূক্ত,” ইবনে মাযাহ্ শরীফের এই হাদীস শরীফের প্রেক্ষিতে তাই প্রতিভাত হয় মুসলমানই কেবল নয় বরং মুছল্লী হওয়ার পরও খফী র্শিকের পরিণতি শেষ পর্যন্ত তাকে মুশরিক-কাফিরদের মতই জাহান্নামে পর্যবসিত করে।
মূলতঃ মুহলিকাত বা বদ্গুণের প্রেক্ষিতে উদ্ভূত যাবতীয় খফী র্শিক হতে উত্তরণ লাভ করতে হলে তাসাউফের আঙ্গিকে তাওহীদী জজবাকে সমৃদ্ধ করতে হবে। ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্’-এর ‘ইলাহার’ স্থলে আল্লাহ্ তায়ালার সিফতী নাম প্রতিস্থাপিত করে যে কলেমা দাঁড়ায় তাসাউফের তর্জ-ত্বরীকায় মোরাকাবা-মোশাহাদার মাধ্যমে তার নূর অন্তরের অন্তঃস্থলে পৌঁছাতে হবে।
মূলতঃ তাসাউফের আঙ্গিকে তাওহীদী সমঝ সমৃদ্ধ করতে পারেনি বলেই ওলামায়ে “ছূ”রা ইসলামের নামে চরম অনৈসলামিক কাজ ও গায়রুল্লাহ্, বেদ্বীনি আদর্শ তথা বদ্দ্বীনি আমলের সাথে সম্পৃক্ত হচ্ছে।
‘লা-আজিমা ইল্লাল্লাহ্’ আল্লাহ্ ছাড়া কেউ শ্রেষ্ঠ নয়, তাওহীদুল আজমতের এই শিক্ষা থেকে বঞ্চিত থাকার ফলেই তারা কট্টর কমিউনিষ্ট মাওসেতুংকে শ্রেষ্ঠ মনে করে তার প্রবর্তিত লংমার্চ করেছে। ‘লা-হামিদা ইল্লাল্লাহ্’ আল্লাহ্ পাক ব্যতীত কেউ প্রশংসনীয় নয়, তাওহীদুল হামদের এই শিক্ষা থেকে জুদা থাকার ফলেই তারা আল্লাহ্ পাক-এর দেয়া নাম ‘মুসলমান’ বাদ দিয়ে খ্রীষ্টান প্রোটেষ্ট্যান্টদের ‘মৌলবাদ’ নাম ধারণ করাকে প্রশংসাকর মনে করছে। ‘লা-মানা’আ ইল্লাল্লাহ্’ আল্লাহ্ ছাড়া কেউ নিষেধকারী নেই, তাওহীদুল ফায়েলীয়াতের এই শিক্ষা থেকে গাফিল থাকার ফলেই তারা আল্লাহ্ পাক-এর নিষেধ না মেনে কট্টর গান্ধীকে তাদের রব মনে করে, গান্ধী প্রবর্তিত পন্থাকে অনুসরণ করে স্বাভাবিক জীবন যাত্রাকে নিষেধ ঘোষণা করে হরতাল করছে। ‘লা-হাকিমা ইল্লাল্লাহ্’ আল্লাহ্ ছাড়া কোন হুকুমদাতা নেই, তাওহীদুল হুকুমের এই শিক্ষা থেকে গাফিল থাকার ফলেই তারা আল্লাহ্ পাক-এর আইন না চেয়ে ইহুদী-খ্রীষ্টানদের ধর্ম-রক্ষার আইন ব্লাসফেমী চাইছে। ‘লা-ওলীয়া ইল্লাল্লাহ্’ আল্লাহ্ ছাড়া কোন বন্ধু নেই, তাওহীদুল বেলায়েতের এই শিক্ষা থেকে দূরে থাকার ফলেই তারা আজ ইহুদী-খ্রীষ্টানদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করে ইসলামের নামে তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচী গণতন্ত্র, নির্বাচন ইত্যাদি চাইছে ও করছে। অথচ এটা যে তাওহীদের আদর্শ থেকে কত দূরে, সে প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক বলেন, “যদি তারা আল্লাহ্ পাক-এর উপর, তাঁর রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর এবং তাঁর প্রতি অবতীর্ণ কিতাব কুরআন শরীফের উপর ঈমান আনত তবে তাদেরকে (মুশরিকদেরকে) বন্ধুরূপে গ্রহণ করতনা।” (সূরা মায়েদা/৮১)
প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য, অধুনা একটি মহল যদিও একতরফাভাবে সবকিছুতেই র্শিক র্শিক করে বাতাস ভারী করে, পীর সাহেবের হাতে বাইয়াত হওয়া র্শিক বলে আওয়াজ তোলে, মাযার শরীফ জিয়ারত করা র্শিক বলে বিষোদগার জ্ঞাপন করে কিন্তু প্রকৃতপক্ষে হক্কানী-রব্বানী পীর সাহেবের সোহ্বতের মাধ্যমে অন্তর শুদ্ধিকরণ এবং আক্বীদা বিশুদ্ধকরণ তথা ইখলাছ অর্জনের মাধ্যমেই কেবল ‘লা-শরীক আল্লাহ্’ বা ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্’ এই কলেমা শরীফের পূর্ণ প্রতিফলন ঘটানো যায়। এর বিপরীত অন্তর দোষে দুষ্টদের সম্পর্কে আল্লাহ্ পাক বলেন, “আপনি সেই লোকদের দেখেছেন কি? যারা নিজেদের পাশবিক প্রবৃত্তিকে নিজের আল্লাহ্রূপে গ্রহণ করেছে।” (সূরা জাসিয়া/৩২)
কাজেই অন্যকিছুকেই আল্লাহ্ পাক নয়, কেবলমাত্র আল্লাহ্ পাককেই এক আল্লাহ্ পাক রূপে মানার জন্য, তাওহীদের শিক্ষায় সমুজ্জ্বল হওয়ার জন্য তাসাউফের বিকল্প নেই।
মহান আল্লাহ্ পাক আমাদের সকলকে তাসাউফ অর্জনের মাধ্যমে হাক্বীক্বী তাওহীদ উপলদ্ধি করার তাওফিক দান করুন। (আমীন)