সুওয়াল-জাওয়াব বিভাগ

সংখ্যা: ২৮৪তম সংখ্যা | বিভাগ:

মুহম্মদ আনোয়ার হুসাইন

সদর, চাঁদপুর

 

সুওয়াল: পবিত্র কুরআন শরীফ এবং পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদের বর্ণনার আলোকে জানা যায় যে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক  ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ছানা-ছিফত মুবারক দায়িমী করতে হবে। কিন্তু কিভাবে সেটা করা সম্ভব জানিয়ে বাধিত করবেন।

জাওয়াব: নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র সুন্নত মুবারক প্রত্যেক বান্দা-বান্দী, জ্বিন-ইনসান, পুরুষ-মহিলা, ছেলে-মেয়ে, ছোট-বড় সকলের জন্য দায়িমীভাবে অর্থাৎ ২৪ ঘণ্টাই- মাথার তালু থেকে পায়ের তলা, হায়াত থেকে মউত পর্যন্ত পালন করা অপরিহার্য কর্তব্য। আর দায়িমীভাবে মহাসম্মানিত সুন্নত মুবারক পালন করা হলে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার দায়িমী স্মরণ ও ছানা-ছিফত মুবারক করা হয়। যেমন- কেউ দাড়ি রাখলো। দাড়ি রাখা খাছ সুন্নত মুবারক। এর মাধ্যমে তার দায়িমী সুন্নত মুবারক পালন হলো। এছাড়া মানুষ ঘুমায়। সুন্নতী চকিতে ঘুমালে, তার দায়িমী সুন্নত আদায় হবে। খাওয়া-দাওয়া করা সুন্নত। সম্মানিত সুন্নত মুবারক উনার নিয়তে ও নিয়মে খেলেই তার দায়িমী সুন্নত মুবারক পালন হবে। সুবহানাল্লাহ!

আমাদের দৈনন্দিন জীবনে চলা-ফেরা, উঠা-বসা, খাওয়া-দাওয়া, ঘুম-নিদ্রা ইত্যাদি ক্ষেত্রে কি কি পবিত্র সুন্নত মুবারক রয়েছে, সেগুলো জানতে হবে এবং সে অনুযায়ী আমল করতে হবে।

খাওয়া-দাওয়া বা পানাহার বিষয়ে সুন্নত মুবারক:

খাওয়ার পূর্বে প্রস্তুতি: হাত ধোয়া- খাবার শুরুতে হাত ধুতে হবে। হাত ধোয়া যাবে তবে প্লেটে হাত ধৌত করলে শুধু ডান কব্জি পর্যন্ত ধোয়া যাবে। সুন্নতী কাঠের প্লেট-বাটি খাছ করে বাবলা গাছের কাঠের তৈরী প্লেট-বাটি ইত্যাদি। এছাড়া অন্যান্য কাঠের তৈরী প্লেট-বাটি ইত্যাদিও সুন্নাত উনার অন্তর্ভুক্ত হবে।

চামড়ার দস্তরখানা: খাছ করে খাসীর চামড়ার দস্তরখানা ব্যবহার করা খাছ সুন্নত। দুম্বা, ভেড়া, ছাগল, গরু, উট ইত্যাদি পশুর চামড়াও দস্তরখানা হিসেবে সুন্নাত হবে। এবং অন্যান্য কাজে ব্যবহার করাও সুন্নাত হবে।

দস্তরখানা সম্পর্কে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, “যে ব্যক্তি খয়েরী রংয়ের চামড়ার দস্তরখানায় এক লোকমা খাবার খাবে, তার প্রতিটি লোকমার প্রতিদানে তাকে ১০০টি করে ছওয়াব দেয়া হবে। সুবহানাল্লাহ! অন্যত্র ইরশাদ মুবারক হয়েছে, প্রতিটি লোকমার প্রতিদানে তার জন্য ১০০টি জান্নাতের কামরা নির্মাণ ও সুসজ্জিত করা হবে। সুবহানাল্লাহ! আরো ইরশাদ মুবারক হয়েছে, যে ব্যক্তি কোন মেহমানকে খয়েরী রংয়ের চামড়ার দস্তরখানায় খাবার খাওয়াবে, সে প্রতিটি দানার প্রতিদানে ১ হাজার করে নেকী বা ছওয়াব লাভ করবে। সুবহানাল্লাহ!

খাওয়ার শুরুতে: খাদ্যের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বোত্তম হচ্ছে পবিত্র সুন্নতী খাদ্য। এছাড়া খাবারের সুন্নতসমূহ পালন করতে হবে। যেমন- খাসীর চামড়ার খয়েরি রঙয়ের দস্তরখানা বিছিয়ে খাওয়া খাছ সুন্নত। নামায উনার ছূরতে বসে

بِسْمِ اللهِ وَعَلٰى بَـــرَكَةِ اللهِ

অর্থ: “মহান আল্লাহ পাক উনার নাম মুবারকে মহান আল্লাহ পাক উনার বরকতে শুরু করছি” বলে খাওয়া শুরু করা। লবণ দিয়ে খাওয়া শুরু করা।

খাওয়া চলাকালীন: প্লেটের ডান দিকের নিকট অংশ থেকে খাওয়া। মাঝখান থেকে খাবার না নেওয়া। দস্তরখানায় খাবার পড়লে তুলে খাওয়া, শুকনা খাবার হলে ৩ আঙ্গুলে খাওয়া, তরল খাবার হলে স্বাভাবিকভাবে খাওয়া। পেটের ৩ ভাগের ১ ভাগ খাবার, ১ ভাগ পানীয় ও ১ ভাগ খালি রাখা এবং আরো খাওয়া যেত এ অবস্থায় আহার ত্যাগ করা। অতিরিক্ত খাওয়া যাবেনা। তাহলে দিল মুর্দা হয়ে যায় এবং মেধা শক্তি কমে যায়। তরল খাবারে শ্বাস না ফেলা ও ফুঁ না দেয়া, খাবার ভালোভাবে চিবিয়ে খাওয়া। খাবারের মাঝে মাঝে প্রয়োজনমত পানি খাওয়া। কিন্তু বেশি খাওয়া যাবে না। খাবার খাওয়ার মধ্যে মাঝে মাঝে আঙ্গুল চেটে খাওয়া সুন্নাত। তারতীব হলো- নখ কাটার তারতীবে হতে পারে অথবা কনিষ্ঠ আঙ্গুল থেকে বৃদ্ধ আঙ্গুল পর্যন্ত হতে পারে।

খাওয়া শেষে: খাবার শেষে প্লেট ও অঙ্গুলী চেটে খাওয়া ও লবণ দিয়ে খাওয়া শেষ করা, খাওয়া শেষ করে এই দোয়া পড়া-

اَلْـحَمْدُ لِلّٰهِ الّذِىْ اَطْعَمَنَا وَسَقَانَا وَجَعَلَنَا مِنَ الْمُسْلِمِيْـنَ

অর্থ: “সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহ পাক উনার জন্য, যিনি আমাদেরকে খাইয়েছেন, পান করিয়েছেন এবং আমাদেরকে মুসলমানদের অন্তর্ভুক্ত করেছেন।”

যে পাত্রে খাবার খাওয়া হয়েছে, সে পাত্রে হাত না ধোয়া। প্লেট ধুয়ে খেলে গোলাম আযাদের সওয়াব পাওয়া যাবে। খাবার শেষে দাঁত খিলাল করা সম্মানিত সুন্নত মুবারক।

পান করার সুন্নত সমূহ: সুন্নতী কাঠের পেয়ালায় পানি পান করা, তিন শ্বাসে পানি পান করা, ঠান্ডা ও মিষ্টি বা সুস্বাদু পানি পান করা, চামড়ার মশকে পানি রেখে তা হতে সুন্নতী কাঠের পেয়ালায় নিয়ে পানি পান করা খাছ সুন্নত। পানাহারের সময় চেয়ার-টেবিল ব্যবহার করা সুন্নত উনার খিলাফ ও বিদয়াত এবং মাকরূহ তাহরীমি। যা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।

গবেষণায় দেখা গেছে, চেয়ারে বসে খাওয়ার চেয়ে সুন্নতী পদ্ধতিতে মেঝেতে অথবা সুন্নতি চকিতে বসে দস্তরখানায় খাবার রেখে খাওয়ার অনেক স্বাস্থ্য উপকারিতা রয়েছে। এতে হার্ট ভালো থাকা থেকে শুরু করে মানসিক চাপ কমানো, জয়েন্টের ব্যথা, মেরুদন্ডের অসুখের মত কঠিন রোগও সেরে যায়।

কিছু সুন্নতি খাদ্য সামগ্রীর নাম:

* আমিষ জাতীয়: গোশত (দুম্বা, উট, গরু, মহিষ, খাসী, খরগোশ, ভেড়া, মুরগী, পাখি), চর্বি, ছারীদ, শুকনা গোশত, হারীসাহ, মাছ, সামুদ্রীক মাছ, ডিম, পনির, মাখন, কলিজা, কাবাব।

* শর্করা জাতীয়: ভাত, যব, হাইস, ছাতু, যবের রুটি, গমের রুটি, লবণ, ডাল, বীটরুট।

* মিষ্টি জাতীয়: হালুয়া, তালবীনাহ, ফিরনী, পায়েস, ক্ষীর, মিষ্টি।

* পানীয় জাতীয়: পানি, মধু, দুধ, সিরকা, নাবীয, খেজুর চিপা রস ও আঙ্গুরের রসের মিশ্রিত শরবত।

* তেল জাতীয়: জয়তুনের তেল, কালোজিরার তেল, সরিষার তেল, সানূত, হালাল পশুর চর্বি।

* ফল: খেজুর, খুরমা, জয়তুন, ত্বীন, আনার বা ডালিম, তরমুজ, আঙ্গুর, বরই, কলা, আপেল, মান্না,    কুম্বী, সফরজল ও বিভিন্ন জাতের ফল।

* শাক-সবজী: কদু, শশা, ঘৃতকুমারী, মেহেদী, বেগুন, সরিষা, মিষ্টিকুমড়া, মাশরুম, শসা, হেলেঞ্চা শাক, মুলা-গাজর, সোনাপাতা, রায়হান।

* মসলা: পিঁয়াজ, মরিচ, রসুন, আদা, কিশমিশ, বিহিদানা, সিলক, ঘি, মাখন, জুক্বিনি, গোল মরিচ, কুস্ত, মৌরী, ধনিয়া, জিরা, ডালিয়া, বাদাম, আখরোট, খাযীরাহ, সুমাক।

* ঔষধী গাছ: রায়হান, তুলসী, সোনাপাতা, ঘৃতকুমারী, লজ্জাবতী, কালোজিরা, মেথি।

সুন্নতী কতিপয় তৈজসপত্রের প্রয়োজনীয় নাম মুবারক:

১) খাছ সুন্নতী কাঠের পেয়ালা-প্লেট মুবারক।

২) খাছ সুন্নতী বিভিন্ন প্লেট, বাটি ও পানপাত্র মুবারক।

৩) সুফরাহ্ (سُفْرَةٌ) দস্তরখানা মুবারক।

৪) খাবারের জন্য বড় পাত্র মুবারক (قَصْعَةٌ) ক্বছ‘য়াহ্

৫) পানি রাখার বড় মাটির পাত্র ( قُـلَّةٌ) কুল্লাহ্

৬) মাটির ঘড়া-মাটির পাত্র বা মাটির পানির পাত্র মুবারক

৭) নাবীয পাত্র মুবারক (اَلسِّقَاءُ) সিক্বা

৮) পিতলের পাত্র মুবারক (تَـوْرٌ) তাওর

৯) চুলা ও ডেকচি মুবারক (بُـرْمَةٌ) বুরমাহ্

১০) চামড়ার পানপাত্র (ظُرُوْفُ الْاَدَمِ) যুরূফুল আদাম

১১) ঘি রাখার পাত্র (رِقَاقٌ) রিক্বাক্ব

১২) ছুরি মুবারক (اَلسِّكِّيْنُ) সিককীন

আরো বিভিন্ন তৈজসপত্র মুবারকের পবিত্র সুন্নত মুবারক রয়েছে।

দৈনন্দিন কাজ বিষয়ে সুন্নত মুবারক:

* সুন্নতী পদ্ধতিতে শোয়া ও ঘুমানো: চারপায়া বিশিষ্ট কাঠের তৈরী চকি মুবারকে শোয়া সুন্নত মুবারক। শাল, সেগুন, শীল কড়ই কাঠের তৈরী সুন্নতী চকি মুবারক ব্যবহার করা পবিত্র সুন্নত মুবারক। খেজুর পাতার চাটাইতে নামায আদায় ও ঘুমানো সুন্নত মুবারক। এছাড়া চাদর ও কম্বলের মধ্যেও বসা, খাওয়া, নামায পড়া ইত্যাদি প্রত্যেকটি বিষয়ই সুন্নাত মুবারক। উপুড় হয়ে শোয়া হারাম কাজ ও কবীরা গুনাহ্। ঘুমানোর আগে অবশ্যই ওযূ করে শোয়া। ঘুমের আগে বিছানা ঝেড়ে নেয়া। চামড়ার তৈরী (ভেতরে খেজুর গাছের ছালযুক্ত) বালিশে ঘুমানো খাছ সুন্নত। ডান কাত হয়ে ডান হাতের তালুর উপর মুখমন্ডলের অংশ বিশেষ (গালে) রেখে ক্বিবলামুখী হয়ে শয়ন করা খাছ সুন্নত। ঘুমের সময় চাদর গায়ে দেয়া সুন্নত এবং কায়লুলা বা দুপুরের খাবারের পর বিছানায় সামান্য আরাম করা সুন্নত।

ঘুমানোর আগের দুআ’-

اَللّٰهُمَّ بِاسْـمِكَ اَمُوْتُ وَاَحْىٰ

অর্থ: আয় মহান আল্লাহ পাক! আপনার নাম মুবারকে আমি মৃত্যুবরণ করছি এবং পুনরায় জীবিত হবো।

* ঘুম হতে জাগ্রত হওয়ার পর: ঘুম হতে জাগ্রত হওয়ার পর এ দুআ’ পাঠ করা-

اَلْـحَمْدُ لِلّٰهِ الَّذِيْ اَحْيَانَا بَعْدَ مَا اَمَاتَـنَا وَاِلَيْهِ النُّشُوْرَ

অর্থ: ঘুমালে শয়তান ৩টি গিড়া দেয়। তাই জাগ্রত হয়ে বসে (১) যে কোন পবিত্র সূরা শরীফ বা কিছু সংখ্যক পবিত্র আয়াত শরীফ তিলাওয়াত করা এবং (২) বিছানা থেকে উঠে ভালোভাবে ওযূ করে নেয়া। তারপর (৩) ২-৪ রাকাআত নফল নামায আদায় করা। তাহলে গিড়াগুলো ছুটে যায়।

* সুন্নতী পদ্ধতিতে বসা: নামাযের ছূরতে বসা খাছ সুন্নত মুবারক। চারজানু হয়ে বসাও সুন্নত মুবারক।

* সুন্নতী পদ্ধতিতে হাঁটা / চলাচল করা: পশমবিহীন সুন্নতী চামড়ার না’লাইন পরিহিত অবস্থায় হাঁটা এবং পশমবিহীন সুন্নতী চামড়ার মোজা পরিহিত অবস্থায় হাঁটা সম্মাানিত সুন্নত মুবারক। হাঁটার ক্ষেত্রে নীচের দিকে ঝুকে পায়ের দিকে তাকিয়ে হাঁটা সুন্নত মুবারক, যেনো মনে হয় উপর থেকে নিচের দিকে নামা হচ্ছে। প্রতিটি ক্বদম দৃঢ়তা ও দ্রুততার সাথে উঠানোও সম্মানিত সুন্নত মুবারক। কখনো কখনো খালি পায়ে হাঁটাও সম্মানিত সুন্নত মুবারক। চলাচলের জন্য বাহন ব্যবহার করা সম্মানিত সুন্নত মুবারক উনার অর্ন্তভূক্ত।

* সুন্নতী পদ্ধতিতে দাঁড়ানো: সম্মানিত নামায উনার ছূরতে দাঁড়ানো পবিত্র সুন্নত মুবারক উনার অর্ন্তভুক্ত। কোমর ধরে দাঁড়ানো নিষেধ।

* সুন্নতী পদ্ধতিতে হাসি দেয়া: সম্মানিত সুন্নতী তরতীবে হাসি দেয়াকে “তাবাসসুম” তথা মুচকি হাসি বলা হয়। যে হাসিতে কোনো শব্দ নেই, মুখম-ল ও চেহারায় হাসির ভাব পুরোপুরি প্রস্ফুটিত হয়, তবে দাঁত দেখা যায় না। শব্দ করে হাসলে ক্বলব মরে যায়।

* হাঁচি দেয়ার সময়ের সুন্নতী তরতীব: হাঁচি দেয়ার সময় “আলহামদুলিল্লাহ” বলতে হবে এবং শ্রবণকারীগণ “ইয়ারহামুকাল্লাহ” বলবে। হাঁচি দেয়ার সময় যেন বিকট শব্দ না হয় সেজন্য হাত কাপড়সহ বা কাপড় দ্বারা মুখ ঢেকে রাখতে হবে।

* হাই তোলার সুন্নতী তরতীব: যখন হাই তুলবে তখন বাম হাতের পিঠ দ্বারা যথাসম্ভব মুখের গহ্বর ঢেকে রাখবে এবং

لَاحَوْلَ وَلَاقُـوَّةَ اِلَّا بِاللهِ الْعَلِیِّ الْعَظِیْمِ

অর্থ: “মহান আল্লাহ পাক তিনি ব্যতীত কোন শক্তি-সামর্থ নেই।” পাঠ করবে।

পোশাক পরিচ্ছদের সম্মানিত সুন্নত মুবারক:

নতুন কাপড় পরিধান করার দু’আ:

اَلْـحَمْدُ لِلّٰهِ الَّذِىْ كَسَانِـىْ مَا اُوَارِىْ بِهٖ عَوْرَتِىْ وَاَتَجَمَّلُ بِهٖ فِى حَيَاتِىْ

অর্থ: সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহ পাক উনার জন্য যিনি আমাকে কাপড় পরিয়েছেন, যার দ্বারা আমি ইজ্জত-আবরুর হিফাযত করি, আর নিজের জীবনে এর সৌন্দর্য লাভ করি।

কোর্তা বা ক্বমীছ: পুরুষদের সুন্নতি কোর্তা লম্বায় “নিছফু সাক্ব” অর্থাৎ হাঁটু ও গিরার মাঝামাঝি হবে। এবং কোনাবন্ধ ও গোল হতে হবে, কোনা ফাঁড়া হতে পারবে না, কারণ কোনা ফাঁড়া সুন্নত নয়। আস্তিন হবে কব্জি পর্যন্ত। অবশ্য কব্জি থেকে সামান্য লম্বাও সুন্নতের অন্তর্ভুক্ত। এবং গলায় গুট্লী (শুধু কাপড় দিয়ে তৈরী গোলাকৃতি একটি বোতাম যা দ্বারা গলা বন্ধ করা হয়) দেয়া সুন্নত, তবে বোতাম দেয়া সুন্নত নয়। সুন্নতি কোর্তার ক্ষেত্রে সূতি ও মিশরী কাপড় হলো খাছ সুন্নত, অবশ্য মিশরী ব্যতীত অন্য সূতিও খাছ সুন্নত উনার অন্তর্ভুক্ত হবে। নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি খাছ করে সাদা রং পছন্দ করতেন। এছাড়া খয়েরী, সবুজ, ধুসর, ঘিয়া ইত্যাদি রংও সুন্নত উনার অন্তর্ভুক্ত।

মহিলাদের ক্বমীছও লম্বায় “নিছফু সাক্ব” অর্থাৎ হাঁটু ও গিরার মাঝামাঝি হবে। তবে মহিলাদের ক্বামীছ কিছুটা লম্বাও হতে পারে। এবং কোনাবন্ধ ও গোল হতে হবে, কোনা ফাঁড়া হতে পারবে না। তবে পুরুষদের ন্যায় গলায় গুটলী হবেনা বরং ডান কাঁধে, বাম কাঁধে অথবা পিছন দিকে গুটলী দিতে হবে। প্রয়োজনবোধে সামনেও দিতে পারে।

* ইযার বা লুঙ্গি: ইযার তথা সেলাইবিহীন সাদা লুঙ্গি মুবারক পরিধান করা খাছ সুন্নত মুবারক। যার দৈর্ঘ্য সাড়ে চার হাত লম্বা এবং প্রস্থ আড়াই হাত। হাঁটু ও গিরার মাঝামাঝি হবে, একটু লম্বা হতে পারে। কিন্তু গিরার নীচে যে অংশের উপর লুঙ্গি ঝুলবে, সে অংশ দোযখে জ্বলবে। যে ব্যক্তি অহঙ্কার বশত: কাপড় ঝুলিয়ে পরবে, ক্বিয়ামতের দিন মহান আল্লাহ পাক তার প্রতি দৃষ্টিপাত করবেন না। পুরুষদের জন্য কোন অবস্থায়ই কোর্তা, ইযার বা লুঙ্গি ও সেলোয়ার গিরার নীচে নামিয়ে পড়া জায়েয নেই। তবে মহিলাদের প্রয়োজনে যায়েজ রয়েছে।

মহিলাদের জন্য খাছ সুন্নাত হলো ক্বামীছের সাথে সেলোওয়ার পরিধান করা এবং ওড়না পরিধান করা। ওড়নার মাপ হলো (৪.৫) সাড়ে ৪ হাত লম্বা ও (২.৫) আড়াই হাত প্রশস্ত। এছাড়া মহিলাদের পর্দার জন্য বোরকা’ পরিধান করা ফরজ। প্রথম জামানায় পর্দার জন্য বড় চাদর পরিধান করা হতো। চাদরের প্রশস্ততা ছিলো পরিধানকারিনী থেকে দেড়/দুই হাত লম্বা। আর লম্বা ছিলো কমপক্ষে ১২/১৪ হাত। পরবর্তীতে মহিলাদের সুবিধার জন্য ইমাম মুজতাহিদগণ বর্তমান প্রচলিত বোরকা’ প্রচলন করেন। সে হিসেবে বর্তমান বোরকা’ও সুন্নাত। তবে বর্তমানে আহলু বাইতি রসূলিল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, ক্বায়িম মাক্বামে উম্মাহাতুল মু’মিনীন আলাইহিন্নাস সালাম, মুত্বহহার, মুত্বহহির, আছ ছমাদ সাইয়্যিদাতুনা হযরত উম্মুল উমাম ছল্লাল্লাহু আলাইহা ওয়া সাল্লাম তিনি যে বোরকা’র প্রচলন করে যাচ্ছেন সেটাই সর্বোত্তম বোরকা’।

* সুন্নতী টুপি: চার টুকরা বিশিষ্ট সাদা গোল সুতি কাপড়ের এবং মাথার সাথে লেগে থাকে মাথা থেকে উচু হয়ে থাকে না, উপরে এক টুকরা আর চারদিকে তিন টুকরা এমন টুপি পরিধান করা সম্মানিত খাছ সুন্নত মুবারক। কপালের সিজদার স্থান খোলা থাকবে।

* সুন্নতী পাগড়ী: নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি অধিকাংশ সময় যে পাগড়ী মুবারক ব্যবহার করতেন তা ছিল ৭ হাত লম্বা, যা হুজরা শরীফ হতে বের হওয়ার সময় তিনি পরিধান করে বের হতেন। জিহাদের ময়দানেও এ ধরণের পাগড়ী মুবারক ব্যবহার করতেন। হুজরা শরীফ উনার মধ্যে যে পাগড়ী মুবারক ব্যবহার করতেন তা ছিল ৩ হাত লম্বা। ঈদ, জুমুয়া ও বিশেষ মাহফিলে ১২ হাত লম্বা পাগড়ী মুবারক ব্যবহার করতেন। সব ধরণের পাগড়ীর চওড়া কমপক্ষে আধ হাত আর সর্বোচ্চ দুই হাত হতো।

পাগড়ীর রং : নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি কালো, সবুজ, সাদা, ইত্যাদি রং এর পাগড়ী মুবারক পরিধান করতেন। তবে কালো পাগড়ী মুবারক বেশী ব্যবহার করতেন।

* শিমলা: মাথায় পাগড়ী বাধার সময় পাগড়ীর যে অংশটুকু গলার দিকে ঝুলিয়ে রাখা হয় তাকে শিমলা বলা হয়। শিমলা ১ বিঘত থেকে ১ হাত হওয়া বাঞ্চনীয় এবং তা দু’কাঁধের মধ্যখানে ঝুলিয়ে রাখা উত্তম। শিমলা ছাড়া পাগড়ী পরিধার করা বিজাতীয় লক্ষণ।

* সুন্নতী রুমাল: সম্মানিত পাগড়ীর উপর সাদা রুমাল ব্যবহার করা পবিত্র সুন্নত মুবারক। পবিত্র রুমাল পরিধান করার তরতীব হচ্ছে- সুন্নতী পাগড়ী উনার উপর মাঝ বরাবর রাখতে হবে। অতঃপর সুন্নতী রুমাল উনার ডানপাশ বাম কাধেঁর উপর দিয়ে নীচের দিকে নামিয়ে দিতে হবে। যা পিঠের উপর ঝুলন্ত অবস্থায় থাকবে। দুই রকমভাবে পড়া যাবে। যথা- (১) পাগড়ীর সাথে টাইট করে পড়া (২) আলগাভাবে পড়া।

* রুমালের সুন্নতী মাপ: সাধারণত, আড়াই হাত, পৌনে তিন হাত ও তিন হাত বর্গাকৃতি।

* সুন্নতী কেনায়া: সম্মানিত সুন্নতী টুপির নিচে ডিম আকৃতির সাদা সুতি কাপড়ের সুন্নতী কেনায়া পরিধান করা সম্মানিত সুন্নত মুবারক।

* না’লাইন শরীফ বা স্যান্ডেল: দুই পাট বা স্তর বিশিষ্ট দু’খানা ফিতাযুক্ত পশমবিহীন চামড়ার না’লাইন বা স্যান্ডেল ব্যবহার করা সম্মানিত সুন্নত মুবারক। না’লানের ফিতাদ্বয় আড়াআড়ি হওয়া এবং খয়েরী রংয়ের হওয়া খাছ সুন্নত। সুন্নতী না’লাইন পিছন দিকে ফিতা বিশিষ্টও হতে পারে বা ফিতা ছাড়াও হতে পারে।

* না’লাইন পরিধানের নিয়ম: না’লাইন পরিধানের সময় আগে ডান পায়ে পরিধান করতে হবে এবং খোলার সময় আগে বাম পায়ের না’লাইন বা স্যান্ডেল খুলতে হবে।

মসজিদে প্রবেশের সময় বাম পা না’লাইন থেকে খুলে না’লাইনের উপরে রাখতে হবে। এরপর ডান পা খুলে সরাসরি মসজিদে রাখতে হবে। মসজিদ থেকে বের হওয়ার সময় বাম পা দিয়ে বের হয়ে বাম পা না’লাইনে রেখে ডান পায়ে না’লাইন পরতে হবে, অত:পর বাম পায়ে না’লাইন পরতে হবে। আর বাথরুমে প্রবেশের সময় প্রথমে বাম পা প্রবেশ করাতে হবে। তারপর ডান পা বাথরুমে প্রবেশ করাতে হবে।

* চামড়ার মোজা: খয়েরী রংয়ের চামড়ার মোজা ব্যবহার করা খাছ সুন্নত মুবারক উনার অন্তর্ভুক্ত। স্যান্ডেল পরিধানের ন্যায় মোজাও ডানদিক থেকে পরিধান করতে হয় এবং খোলার সময় বামদিক আগে খুলতে হয়। পরিধান করার আগে মোজা ৩ বার ঝেড়ে পরিধান করা সুন্নত।

* হাত রুমাল / গামছা: হাত রুমাল বা গামছা ব্যবহার করা সুন্নত।

* শীতের পোশাক: শীতের পোশাক পরিধান করাও সুন্নত মুবারক উনার অন্তর্ভুক্ত। শীতের সুন্নতী পোশাক হলো- কম্বল, চাদর, শীতের জুব্বা, কানঢাকার অর্থাৎ গরমকালে পুরুষ, মহিলা, ছেলে মেয়েরা যে পাতলা  কাপড় পরিধান  করে। শীতকালে সেই সুন্নতি কাপড়গুলিই মোটা বা পশমী কাপড়ের তৈরী পড়া সুন্নাত।

* চাদর: চাদর পরিধান করা সুন্নত। চাদরের রং হবে কালো, সবুজ, ধুসর, গন্দম ইত্যাদি। তবে পুরুষদের জন্য লাল, হলুদ ও গেরুয়া রংয়ের চাদর ব্যবহার জায়িয নেই। নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি চার হাত দৈর্ঘ্য, আড়াই হাত প্রস্থ, কখনো বা ছয় হাত দৈর্ঘ্য এবং সাড়ে তিন হাত প্রস্থ চাদর মুবারক পরিধান করতেন।

* খিরকা বা জুব্বা: নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি জুম‘আহ্, ঈদ বা বিশেষ মজলিসে ক্বমীছ বা কোর্তা মুবারকের উপরে খিরকা বা জুব্বা মুবারক পরিধান করতেন। কালো ও ধুসর রংয়ের জুব্বা পরিধান করা সুন্নত।

* মহিলাদের কিছু সুন্নতি পোশাক-পরিচ্ছদ: ১. সেলোওয়ার, ২. ক্বমীছ বা কোর্তা, ৩. ওড়না, ৪. বোরকা’, ৫. হাত মোজা, ৬. পা মোজা, ৭. গহনা-অলঙ্কার ইত্যাদি।

ঘর-গৃহস্থলি বিষয়ক সুন্নত মুবারক:

* আসবাবপত্র: আসবাবপত্র শব্দের স্বাভাবিক অর্থ হচ্ছে ঘরের দ্রব্যাদী, ঘরে ব্যবহৃত প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। এক কথায় বলতে গেলে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ও ব্যবহারিক জীবনে সামগ্রিক ভাবে যা ব্যবহার করা হয়ে থাকে, তাকে আসবাবপত্র বলা হয়। যেমন: চকি, চাটাই, তোষক ইত্যাদি।

 

* বিছানা: নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিছানা মুবারক ছিল বিভিন্ন প্রকার। অর্থাৎ কখনো চামড়ার, কখনো চটের, কখনো কম্বলের, কখনো কাপড়ের চাদরের আবার কখনো বা খেজুর পাতার হতো। চামড়ার বিছানা দু’হাত চওড়া এবং চার হাত লম্বা ছিল।

সুন্নতী আসবাবপত্র ও সংশ্লিষ্ট প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদীর কতিপয় নাম মুবারক:

(১) সম্মানিত সুন্নতী বিছানাপত্র মুবারক; (২) চারপায়া বিশিষ্ট চকি মুবারক- বড় চকি: দৈর্ঘ্য ৪.৫ হাত, প্রস্থ ৩.২৫ হাত, উচ্চতা ১ বিঘত; ছোট চকি: দৈর্ঘ্য ৪.৫ হাত, প্রস্থ ২ হাত, উচ্চতা ১ বিঘত (৩) সারীর বা চারপায়া মুবারক (৪) হাছীর বা খেজুর পাতার চাটাই মুবারক (৫) মিসহ্ বা চটের বিছানা মুবারক (৬) পাটের রশি দ্বারা চারপায়া বিশিষ্ট চকি (৭) চামড়ার বালিশ মুবারক (৮) হাতির দাঁতের ও হাতির হাড়ের চিরুণী মুবারক (৯) চিরুনী (১০) আয়না (১১) মিম্বর শরীফ (১২) লাঠি মুবারক।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: বিস্তারিত জানার জন্য উসওয়াতুন হাসানাহ রেসালা মুবারক ৫ম খণ্ড পাঠ করুন।

আল্লামা নূর মুহম্মদ

নওগাঁ

সুওয়াল: নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি পবিত্র হেরা গুহা মুবারকে কি আমল করেছিলেন এবং কত বছর সেখানে অবস্থান মুবারক করেছিলেন? দয়া করে জাওয়াব দানে বাধিত করবেন।

জাওয়াব: মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র হাবীব, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি পবিত্র হেরা গুহা মুবারকে সাধারণত-মুরাকাবা মুশাহাদা মুবারক (ধ্যান) করতেন। মহান আল্লাহ পাক উনার মহাসম্মানিত মহাপবিত্রম ছোহবত মুবারক ইখতিয়ার করতেন। তিনি সুদীর্ঘ প্রায় ছয় বছর পবিত্র হেরা গুহা মুবারকে যাতায়াত করেছেন। ৩ দিন ৫ দিন ৭ দিন ১০ দিন সেখানে অবস্থান মুবারক করেছেন। কখনো বা কম-বেশিও হতো। তবে সর্বোচ্চ ৪০ দিন পর্যন্ত অবস্থান মুবারক করেছেন মর্মে বর্ণনা রয়েছে। সে সময় সাইয়্যিদাতু নিসায়িল আলামীন, আফদ্বালুল উম্মাহাত, আম্মাজান উম্মুল  মু’মিনীন আল ঊলা সাইয়্যিদাতুনা হযরত কুবরা আলাইহাস সালাম তিনি সেখানে খাদ্য-পানীয় মুবারক সরবরাহ করতেন। সুবহানাল্লাহ! যখন নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার দুনিয়াবী বয়স মুবারক ছিলেন ৩৪ বছর। তখন তিনি পবিত্র হেরা গুহা মুবারকে তাশরীফ মুবারক আনেন। আর ৪০ বছর বয়স মুবারকে সর্বপ্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে সেই গুহা মুবারকে মহাসম্মানিত মহাপবিত্র ওহী মুবারক নাযিলের মধ্য দিয়ে তার পরিসমাপ্তি ঘটে।

উল্লেখ্য যে, সেখান থেকে পবিত্র ইলমে তাছাওউফের সিলসিলা জারী হয়। ইমাম-মুজতাহিদ ও আউলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনারা নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সেই সুন্নত মুবারক জারী রেখেছেন। কামিল শায়েখ উনার নিকট বাইয়াত হয়ে উনার ছোহবত মুবারক ইখতিয়ার করেন। আত্মশুদ্ধির (ইছলাহ) জন্য কামিল শায়েখ উনাদের নির্দেশমত নিয়মিত যিকির-ফিকির, মুরাক্বাবা-মুশাহাদা করতে থাকেন। পরিশেষে সেই কামিল শায়েখ ইখলাছ বা পরিশুদ্ধির সত্যায়ন করতঃ খিলাফত মুবারক দান করেন। তখন তিনি নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নায়িব বা স্থলাভিষিক্ত হয়ে দ্বীনের হাদী রূপে হিদায়েতের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। মূলতঃ তিনি নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনারই নায়িব বা প্রতিনিধিত্ব করেন থাকেন। সুবহানাল্লাহ!

আহমাদ মা’রূফা জান্নাত

পলাশ, নূরানীবাদ

 

সুওয়াল: ওযূর বিধান সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে ইচ্ছুক।

জাওয়াব:  ওযূ করা: নামায পড়ার জন্য উযূ করা ফরয। সব সময় উযূ অবস্থায় থাকা মুস্তাহাব। ঘুমানোর সময় উযূ করা সুন্নত। এতে হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের সাথে হাশর-নশর হবে।

ওযূ করার নিয়ম: প্রথমে ওযূর নিয়ত করে ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম’ পাঠ করে ওযূ শুরুকরতে হবে। ওযূর শুরুতে ডান হাত ও বাম হাত তিনবার খিলালের মাধমে কব্জি পর্যন্ত ভালোভাবে ধৌত করতে হবে। অতঃপর ডান হাতে পানি নিয়ে তা মুখে দিয়ে ভালোভাবে গড়গড়াসহ তিনবার কুলি করতে হবে। এরপর ডান হাতে পানি নিয়ে নাকের নরম হাড় পর্যন্ত পানি পৌঁছাতে হবে এবং বাম হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি ও কনিষ্ঠাঙ্গুলি দ্বারা নাকের ভিতর ভালোভাবে পরিষ্কার করতে হবে যেন শুকনো না থাকে। নাকের ভিতর কিছু থাকলে নাক ঝেড়ে নিতে হবে। মহিলাদের ক্ষেত্রে যদি নাকে নাকফুল থাকে তবে তা ভালোভাবে নেড়ে পরিষ্কার করতে হবে এবং তার ভিতরে পানি পৌঁছাতে হবে। এভাবে তিনবার নাক ধৌত করতে হবে এবং প্রতিবারই পরিষ্কার পানি ব্যবহার করতে হবে।

রোযা অবস্থায় কুলি করার ক্ষেত্রে গড়গড়া করা যাবে না; বরং গড়গড়া ছাড়াই কুলি করতে হবে এবং নাকে পানি দেয়ার ক্ষেত্রে ভিতরে নরম হাড় পর্যন্ত পানি পৌঁছাতে হবে না; বরং নাকের ভিতরের কাছাকাছি স্থান ভালোভাবে ধৌত করতে হবে এবং নাকের ভিতরের গভীর অংশ বাম হাতের ভেজা আঙ্গুল দিয়ে যথাসম্ভব ভেজাতে হবে। কেননা গড়গড়াসহ কুলি করতে গেলে এবং নাকের নরম হাড়ে পানি পৌঁছাতে গেলে রোযা ভেঙ্গে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এবারে মুখমন্ডল অর্থাৎ কপালের উপরে যেখান থেকে স্বাভাবিকভাবে মাথার চুল গজায় সেখান থেকে নিয়ে থুতনির নীচ পর্যন্ত এবং এক কানের লতি থেকে অপর কানের লতি পর্যন্ত মধ্যবর্তী স্থান পানি দিয়ে তিনবার ধৌত করতে হবে। দাড়ি পাতলা হলে দাড়ির গোড়ায় পানি পৌঁছাতে হবে আর দাড়ি ঘন হলে তা খিলাল করতে হবে। দাড়ি খিলালের সময় ডান হাতের পিঠ সীনার দিকে থাকবে। এরপর ডান হাত কনুই পর্যন্ত তিনবার ভালোভাবে ধৌত করতে হবে। একইভাবে বাম হাতও তিনবার ধৌত করতে হবে। কারো হাতে আংটি থাকলে খেয়াল রাখতে হবে আংটির নিচেও যেন পানি প্রবেশ করে। নখেও যেন কোন ময়লা না থাকে অর্থাৎ খেয়াল রাখতে হবে নখের ভিতরেও যেন পানি প্রবেশ করে।

মাথা মাসেহ করাটা একটু খেয়াল করে করতে হবে। বৃদ্ধাঙ্গুলি আর শাহাদাত অঙ্গুলি আলাদা রেখে দুই হাতের বাকি তিন আঙ্গুল দিয়ে কপালে চুল শুরু হবার জায়গা থেকে শুরু করে মাথার উপরিভাগ হয়ে পিছনে শেষ পর্যন্ত মাসেহ করতে হবে। তারপর হাতের তালু দ্বারা মাথার ডান ও বাম দিকের অংশ মাথার পিছন থেকে শুরু করে সামনের দিকে টেনে মাসেহ করতে হবে। তারপর শাহাদাত অঙ্গুলি দ্বারা কানের ভিতরের অংশ আর বৃদ্ধাঙ্গুলি দ্বারা কানের বাইরের অংশ মাসেহ করতে হবে। কনিষ্ট অঙ্গুলিদ্বয় কানের ছিদ্রে প্রবেশ  করাতে হবে। বৃদ্ধাঙ্গুলি দ্বারা মাছেহ করার পূর্বেও করা যায় অথবা পরেও করা যায়। এরপর হাতের পিঠের অংশ দিয়ে ঘাড় মাসেহ করতে হবে। ঘাড় মাসেহের সময় হাত ডানে-বামে সোজা টানতে হবে। গলার দিকে হাত টানলে তা বিদ‘আত হবে।

অতঃপর ডান হাত দিয়ে পানি ঢেলে বাম হাত দিয়ে ডান পা টাখনু পর্যন্ত ভালোভাবে ধৌত করতে হবে। একইভাবে বাম পা ধৌত করতে হবে। উভয় পা ধৌত করার সময় পায়ের আঙ্গুলসমূহ নিচের দিক থেকে ভালোভাবে খিলাল করতে হবে যেন কোনোভাবেই শুকনো না থাকে। পাত্রে থাকা ওযূর অবশিষ্ট পানি পান করতে চাইলে তা দাঁড়িয়ে পান করতে হবে। এর মধ্যে রোগের শিফা রয়েছে। ওযূ শেষ করে আকাশের দিকে তাকিয়ে “পবিত্র কালিমায়ে শাহাদাত” পাঠ করা।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: বিস্তারিত জানার জন্য উসওয়াতুন হাসানাহ রেসালা মুবারক ৫ম খণ্ড পাঠ করুন।

 

মুহম্মদ ফরীদ আহমদ

এজিবি কলোনী, ঢাকা

সুওয়াল:  গোসল এবং তার আনুসঙ্গিক বিষয় সম্পর্কিত সুন্নত সমূহ জানিয়ে বাধিত করবেন।

জাওয়াব: গোসল করার সুন্নতী তরতীব: গোসল করার পূর্বে শরীরে যয়তুনের তেল দেয়া এবং না দেয়া উভয়টাই সুন্নত। তবে তেল ব্যবহার করলে তেল লাগানো শেষ হলে মিসওয়াক করে নিতে হবে। অতঃপর ডান হাতে পানি নিয়ে দুই হাত কব্জি পর্যন্ত ধুয়ে নিতে হবে এবং শুধুমাত্র পা ধোয়া ছাড়া নামাযের ওযূর মতো ভালভাবে ওযূ করে নিতে হবে। রোযাদারকে গড়গড়ার সাথে কুলি না করে ও নাকে পানি দেয়ার সময় নাক নিচের দিকে নামিয়ে রাখতে হবে। ওযূ করা শেষ হলে প্রথমে মাথার ডান পার্শে পানি ঢেলে চুলের গোড়া ভালভাবে আঙ্গুল দিয়ে ভিজিয়ে নিতে হবে। পুরুষের বাবরী চুল থাকলে ও মহিলাদের বেনী বা খোঁপা থাকলে চুলের গোড়ায় ভালভাবে পানি পৌঁছাতে হবে। অতঃপর মাথার বাম পার্শে অতঃপর মাথার মধ্যে ঢালবে, তারপর ডান কাঁধে, অতঃপর বাম কাঁধে তিনবার করে এমনভাবে পানি ঢালাবে, যেনো সমস্ত শরীরে পানি বয়ে যায়। নাভি, বগল ও অন্যান্য কুঁচকানো জায়গায় পানি দিয়ে ভালোভাবে ধুতে হবে। হাতে আংটি থাকলে সেখানেও পানি পৌঁছাতে হবে। প্রত্যেক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ধৌত করার সময় ধুন্দলের ছোবড়া ব্যবহার করা এবং না করা উভয়টাই সুন্নত। আর পা ঘষার সময় ঝামা পাথর ব্যবহার করা এবং না করা উভয়টাই সুন্নত। এক মুদ্দ (৬২৫ গ্রাম) পানি দিয়ে ওযূ এবং অনধিক পাঁচ মুদ্দ (৩১২৫ গ্রাম) বা প্রায় সোয়া তিন কেজি পানি দিয়ে গোসল শেষ করা সুন্নত তবে প্রয়োজনে অতিরিক্ত পানি ব্যবহার করা সুন্নত উনার খেলাফ হবে না। তবে অবশ্যই প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি অপচয় করা ঠিক হবে না অর্থাৎ সুন্নত হবে না। সমস্ত শরীরে পানি ঢালা শেষ হয়ে গেলে গোসলের জায়গা থেকে একটু সরে গিয়ে দুই পা ৩ বার ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হবে এবং সারা শরীর মুছতে হবে।

* মিসওয়াক করা: পিলু বা জয়তুনের ডাল ব্যবহার করা খাছ সুন্নত মুবারক। পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায়ের পূর্বে ওযূর সাথে মিসওয়াক করা এবং তাহাজ্জুদ নামায আদায়ের পূর্বেও মিসওয়াক করা সুন্নত। ডান দিক থেকে মিসওয়াক শুরু করা পবিত্র সুন্নত মুবারক। মিসওয়াক শুরুতে প্রত্যেক মিসওয়াককারীর কনিষ্ঠ অঙ্গুলির ন্যায় মোটা হওয়া ও তার হাতের আধ হাত বা এক বিঘৎ পরিমাণ লম্বা হওয়া সুন্নাত। এবং পরবর্তীতে যে পরিমাণ লম্বা থাকলে সুন্নতী তারতীবে ধরা যায় সর্বনিম্ন সে পরিমাণ লম্বা হওয়া সুন্নত মাথা থেকে ৫মি.লি. ১/২ ইঞ্চি বাকলা তুলে নিতে হবে। আর বাকলা তুলে নেয়ার ক্ষেত্রে ছুরি ব্যবহার করা যায়। তাছাড়া বাকলা তুলে নেয়া স্থানটি কয়েকবার মিসওয়াক করলে আঁশ কমে। তখন সে স্থানটি কেটে ফেলে দিয়ে নতুন করে বাকলা তুলে নিয়ে ব্যবহার করা যায়।

* মিসওয়াক ধরার নিয়ম: মিসওয়াক করার সময় মিসওয়াককারী মিসওয়াক এমনভাবে ধরবে যেন মিসওয়াককারীর ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলী মিসওয়াকের নীচ দিয়ে প্রায় পেট বরাবর থাকে। আর কনিষ্ঠা আঙ্গুলী দ্বারা মিসওয়াকের নীচে পিছনের দিকে ধরবে। আর তর্জনী, মধ্যমা ও অনামিকা এ তিন আঙ্গুলী দ্বারা মিসওয়াকের উপরিভাগে ধরবে।

মিসওয়াকের দুআ’-

اَللّٰهُمَّ اجْعَلْ سِوَاكِيْ رِضَاكَ عَنِّيْ وَاجْعَلْهُ طَهُوْرًا وَّتَـمْحِيْصًا وَبَيِّضْ وَجْهِيْ كَمَا تُـبَيِّضُ بِهٖ أَسْنَانِـيْ

অর্থ: “আয় বারে এলাহী, মহান আল্লাহ পাক! আমার মিসওয়াককে আমার পক্ষ থেকে আপনার সন্তুষ্টি মুবারক উনার জন্য ক্ববূল করুন এবং সেটাকে অধিক পবিত্র ও ক্ষমার কারণ হিসেবে ক্ববূল করুন। আর মিসওয়াকের মাধ্যমে আমার দাঁতকে যেমন শুভ্র করা হয়েছে, তেমনই আমার চেহারাকেও শুভ্র করুন।”

দাঁড়ি খিলাল করা: ওযূ করার সময় ৩ বার দাড়ি খিলাল করা এবং আঙ্গুলের ফাঁকসমূহও ৩ বার খিলাল করা।

* চুল, গোঁফ, দাড়ি ও নখ কাঁটা: চুল রাখা এবং চুল কাটার সুন্নতী নিয়ম- সাধারণত প্রাপ্ত বয়স্ক অর্থাৎ যাদের দাড়ী উঠেছে সে সমস্ত পুরুষদের জন্য বাবরী চুল রাখা খাছ সুন্নত মুবারক। যাদের দাড়ী উঠেনি তারা চুল রাখবে ছোট করে। আর মেয়ে ও মহিলারা চুল ছেড়ে দিবে যত লম্বা হতে পারে। তবে, বাবরী চুল তিন তরীক্বায় রাখা সুন্নাত – ১. জুম্মা, ২. লিম্মা, ৩. ওয়াফরা। (১) জুম্মা অর্থাৎ কানের লতি বরাবর। (২) লিম্মা অর্থাৎ কাঁধ ও কানের লতির মাঝামাঝি বরাবর (৩) ওয়াফরা অর্থাৎ, কাঁধের কাছাকাছি পর্যন্ত। অর্থাৎ উক্ত তিন তরীক্বা অনুযায়ী চুল রাখা হচ্ছে খাছ সুন্নত মুবারক উনার অন্তর্ভুক্ত। এছাড়াও নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি মাঝে মধ্যে আরো এক তরীক্বায় চুল মুবারক রেখেছেন, তা হচ্ছে- নিছফু উযনাইন অর্থাৎ কানের মাঝামাঝি করে।

উপরোক্ত চুল রাখার সুন্নতী পদ্ধতি ব্যতীত কাঁধ অতিক্রম করে চুল রাখা সম্পূর্ণরূপে হারাম। হজ্ব ও উমরা ব্যতীত অন্যান্য সময়ে বিনা ওযরে মাথা মু-ন করা সুন্নাত উনার খেলাফ।

গোঁফ রাখা এবং গোঁফ কাটার সুন্নতী নিয়ম- ভ্রু পরিমাণ গোঁফ রাখা এবং অতিরিক্ত অংশ কেটে ফেলা সুন্নত। আবার একবারে চামড়া প্রকাশিত হয় তথা চেছে ফেলা মাকরূহ যা কোন ক্রমেই উচিত নয়।

* নীমদাড়ি: নিচের ঠোঁট ও থুতনীর মধ্যবর্তী ছোট ছোট দাড়িকে নীমদাড়ি বলে। সম্মানিত শরীয়ত উনার হুকুম মুতাবিক উক্ত নীমদাড়ি কাটাও বিদয়াত ও মাকরূহ তাহরীমী।

* দাড়ি রাখা এবং দাড়ি কাটার সুন্নতী নিয়ম: সম্মানিত ইসলামী শরীয়ত উনার দৃষ্টিতে পুরুষের জন্য কমপক্ষে এক মুষ্টি পরিমাণ দাড়ি রাখা ফরয। এক মুষ্টি হওয়ার পূর্বে দাড়ি কাটা বা ছাটা সকলের ঐকমত্যে হারাম ও কবীরা গুনাহ। আর দাড়ি কাটাকে জায়িয মনে করা কুফরী।

* হাতের নখ কাটার সুন্নত তরীকা হলো: প্রথমে ডান হাতের শাহাদাত বা তর্জনী, অতঃপর মধ্যমা, অতঃপর অনামিকা, অতঃপর কনিষ্ঠা অঙ্গুলির নখ কাটা। অতঃপর বাম হাতের কনিষ্ঠা, অতঃপর অনামিকা, অতঃপর মধ্যমা, অতঃপর তর্জনী, অতঃপর বৃদ্ধাঙ্গুল এবং সর্বশেষে ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলের নখ কাটা।

পায়ের নখ কাটার সুন্নত তরীকা হলো- ডান পায়ের কনিষ্ঠাঙ্গুল থেকে শুরু করে পর্যায়ক্রমে বৃদ্ধাঙ্গুলে শেষ করা, অতঃপর বাম পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুুল থেকে শুরু করে ধারাবাহিকরূপে কনিষ্ঠাঙ্গুলে শেষ করা।

জুমু‘আহ্ বার চুল, দাড়ি ও নখ কাটার ফযীলত: সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খ্বতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি প্রত্যেক জুমু‘আহ্ বার উনার মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র নূরুল লিবাস মুবারক এবং মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র গোঁফ মুবারক কাটতেন।

এছাড়াও ইছনাইনিল আযীম শরীফ, ইয়াওমুছ ছুলাছা ও ইয়াওমুল খমীস দিনসমূহেও ইত্যাদি কাঁটা সুন্নাত উনার অন্তর্ভুক্ত।

এছাড়া অতিরিক্ত পশমসমূহ চল্লিশ দিনের মধ্যে কাঁটা সুন্নত। চল্লিশ দিনের অতিরিক্ত হলে তা মাকরূহ হবে।

* চুল, দাড়ি, নখ ও অতিরিক্ত পশম কাটার নিষিদ্ধ দিনসমূহ: পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে, সাবত্ ও আরবিয়ার দিনে নখ কাটা যাবে না, নিশ্চয়ই তা শ্বেতকুষ্ঠ হওয়ার কারণ। পবিত্র হাদীছ শরীফে আরো ইরশাদ মুবারক হয়েছে, “যে ব্যক্তি সাবত্ ও আরবিয়ায় শিঙ্গা লাগাবে, তার শ্বেতকুষ্ঠ রোগ হবে।” অর্থাৎ সাবত্ ও আরবিয়াতে নখ, চুল কাটা এবং শিঙ্গা লাগানো ইত্যাদি নিষেধ। পরিপাটি থাকা সুন্নাত।

* চুল আঁচড়ানোর সুন্নত: মাথার মাঝখানে সিঁথি কাটা সুন্নত। প্রথমত মাথার মধ্য ভাগ হতে ডান দিকে ৩ বার আঁচড়াতে হবে। দ্বিতীয়তঃ মাথার মধ্যভাগ হতে বাম দিকে ৩ বার আঁচড়াতে হবে। পরবর্তীতে পিছনের চুলগুলি ৩ বার আচঁড়াতে হবে। কোনোভাবেই মাথার সামনের দিক হতে পিছনে চুল আঁচড়ানো যাবে না। তা, ইহুদীদের অনুকরণ হওয়ায় হারাম।

মাথায় তেল ব্যবহার করার সুন্নতী নিয়ম: শাহাদাত আঙ্গুল দ্বারা প্রথমে চোখের ডান ভ্রুতে তারপর চোখের বাম ভ্রুতে, তারপর ডান চোখের পাতায়, তারপর বাম চোখের পাতায়। অতপর মাথার ডানদিক হতে প্রয়োজনমতো তেল দেয়া।

* দাড়িতে তেল দেয়ার সুন্নতী নিয়ম: শাহাদাত আঙ্গুল দ্বারা প্রথমে ডান চোখের পাতায় দিতে হবে। তারপর বাম চোখের পাতায় দিতে হবে। অতপর দাড়ির ডান দিক হতে তেল দিতে হবে। তেল দেয়ার সময় সর্বক্ষেত্রে ডান দিকের অংশ আগে শুরু করতে হবে।

* যয়তুন তেল খাওয়া এবং ব্যবহার করা: নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, তোমরা যয়তুন তেল খাও এবং তা শরীরে ব্যবহার করো। কেননা, তা বরকতময় বৃক্ষ হতে উৎপাদিত। তাই, যয়তুন তেল খাওয়া এবং ব্যবহার করা খাছ সুন্নত মুবারক উনার অন্তর্ভূক্ত। যা রহমত-বরকতের কারণ এবং শারীরিক, মানসিক, আত্মিক প্রশান্তির উছিলা।

* ত্বকের যতœ: শরীরের ত্বকের যতœ নেয়া এবং শরীর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা খাছ সুন্নত মুবারক উনার অন্তর্ভূক্ত। ত্বকের যতেœ বিভিন্ন উপাদান ব্যবহার করা যায়। যেমন: যয়তুন তেল, শামউন নহল, আদ্দাহিনু, সিবরযুক্ত ফেইসওয়াশ, মধু, সিরকা, মেহেদী পাতা ইত্যাদি।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: বিস্তারিত জানার জন্য উসওয়াতুন হাসানাহ রেসালা মুবারক ৬ষ্ঠ খণ্ড পাঠ করুন।

 

মুহম্মদ আবুল বাশার আজাদ

বাসাবো, ঢাকা

 

সুওয়াল: মহাপবিত্র ১০ই মুহররম আশূরা শরীফ উপলক্ষে অনেকে আলোচনা করতে যেয়ে মহাসম্মানিত মহাপবিত্র হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের সম্পর্কে এলোমেলো বক্তব্য দিয়ে থাকে। যেমন তারা বলে থাকে, সাইয়্যিদুনা আবুল বাশার হযরত আদম আলাইহিস সালাম তিনি গন্দম খেয়ে ভুল করেছেন কিংবা একটি গুনাহ করেছেন। নাউযুবিল্লাহ! সঠিক জাওয়াব জানিয়ে বাধিত  করবেন।

জাওয়াব:  মহাসম্মানিত আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াত উনাদের আক্বীদা হলো, কোন মহাসম্মানিত মহাপবিত্র হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনারা কখনো ভুল করেননি। ইচ্ছাকৃত তো নয়ই, অনিচ্ছাকৃতও নয়। অর্থাৎ মহাসম্মানিত মহাপবিত্র হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনারা কোন ভুলই করেননি। (শরহে আক্বাইদে নছফী, ফিক্বহে আকবর, তাকমীলুল ঈমান, আক্বাইদে হাক্কাহ)

অর্থাৎ সকল মহাসম্মানিত মহাপবিত্র হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনারা ছিলেন খ্বলিক মালিক রব মহান আল্লাহ পাক উনার খাছ ও মনোনীত বান্দাগণ উনাদের অন্তর্ভুক্ত। উনারা প্রত্যেকেই ছিলেন মহাপবিত্র ওহী মুবারক উনার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। মহাসম্মানিত মহাপবিত্র কুরআন শরীফ উনার একাধিক স্থানে ইরশাদ  মুবারক হয়েছে-

نُوْحِىْۤ اِلَيْهِمْ

অর্থ : “আমি উনাদের (মহাসম্মানিত মহাপবিত্র হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের) প্রতি পবিত্র ওহী মুবারক করতাম।” (মহাপবিত্র সূরা ইউসূফ শরীফ উনার পবিত্র ১০৯ আয়াত শরীফ, মহাসম্মানিত মহাপবিত্র সূরা নহল শরীফ উনার পবিত্র ৪৩ আয়াত শরীফ, মহাসম্মানিত মহাপবিত্র সূরা আম্বিয়া শরীফ উনার ৭ আয়াত শরীফ)

অর্থাৎ মহাসম্মানিত মহাপবিত্র হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের সকল কার্যাবলীই মহাসম্মানিত মহাপবিত্র ওহী মুবারক উনার দ্বারা (খ্বলিক মালিক রব মহান আল্লাহ পাক উনার নির্দেশ মুতাবিক) পরিচালিত হতো। যার পরিপ্রেক্ষিতে আক্বাইদের কিতাবে বর্ণিত হয়েছে-

اَلْأَنْبِيَاءُ عَلَيْهِمُ السَّلَامُ كُلُّهُمْ مَعْصُوْمُوْنَ

অর্থ: “সকল মহাসম্মানিত মহাপবিত্র হযরত আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম উনারা মা’ছূম বা নিষ্পাপ।” (শরহে আক্বাইদে নছফী)

আরও উল্লেখ রয়েছে যে-

اَلْأَنْبِيَاءُ عَلَيْهِمُ السَّلَامُ كُلُّهُمْ مُنَـزَّهُوْنَ عَنِ الصَّغَائِرِ وَالْكَبَائِرِ وَالْكُفْرِ وَالْقَبَائِحِ

অর্থ : “সকল হযরত আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম উনারা ছগীরা, কবীরা, কুফরী এবং অপছন্দনীয় কাজ হতেও পবিত্র।” (আল ফিক্বহুল আকবার লি ইমাম আ’যম আবূ হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি)

অতএব, যারা মহাসম্মানিত মহাপবিত্র হযরত নবী আলাইহিমুস সালাম উনাদের ভুল সম্পর্কে বলে থাকে, আক্বাইদ সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণেই তারা তা বলে থাকে। যেমন তারা বলে থাকে যে, মহাসম্মানিত মহাপবিত্র হযরত আবুল বাশার আলাইহিস সালাম তিনি গন্দম খেয়ে ভুল করেছিলেন। নাঊযুবিল্লাহ!

মূলত তাদের একথা সঠিক নয়। প্রকৃত ঘটনা হলো, খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক তিনি যখন মহাসম্মানিত মহাপবিত্র হযরত আদম আলাইহিস সালাম উনাকে ও মহাসম্মানিত মহাপবিত্র হযরত উম্মুল বাশার আলাইহাস সালাম উনাদেরকে আদেশ মুবারক করেছিলেন যে-

لَا تَـقْرَبَا هٰذِهِ الشَّجَرَةَ

অর্থ : “আপনারা এই (গন্দমের) গাছের নিকটবর্তী হবেন না।” (পবিত্র সূরা বাক্বারা শরীফ উনার পবিত্র আয়াত শরীফ ৩৫)

তখন উনারা খ্বলিক মালিক রব মহান আল্লাহ পাক উনার এ মহাসম্মানিত মহাপবিত্র আদেশ মুবারক অনুযায়ী সে গাছের নিকটবর্তী হননি। বরং উক্ত গাছের অনুরূপ বিপরীত দিকের অন্য একটি গাছ দেখিয়ে ইবলিস শয়তান এসে মহাসম্মানিত মহাপবিত্র হযরত উম্মুল বাশার আলাইহাস সালাম উনাকে মিথ্যা কছম খেয়ে বলেছিল যে, আপনারা যদি এ গাছের ফল খান, তবে আপনারা ফেরেশতা হয়ে যাবেন অথবা স্থায়ীভাবে বেহেশতে বসবাস করতে পারবেন। কোন কোন বর্ণনা মোতাবেক, তখন মহাসম্মানিত মহাপবিত্র হযরত উম্মুল বাশার আলাইহাস সালাম তিনি সে গাছ হতে ফল এনে শরবত বানিয়ে মহাসম্মানিত মহাপবিত্র হযরত আবুল বাশার আলাইহিস সালাম উনাকে খাইয়েছিলেন। অপর বর্ণনায়, ফল কেটে খাইয়েছিলেন। এ ঘটনা মহাসম্মানিত মহাপবিত্র হযরত আবুল বাশার আলাইহিস সালাম উনার অজান্তেই সংঘটিত হয়েছিল। সুতরাং যা অজান্তে সংঘটিত হয়, তা কি করে ভুল বা অপরাধ হতে পারে? বাস্তবিক তা কখনই ভুল  হতে পারেনা। (সমূহ তাফসীরের কিতাব)

এর মেছালস্বরূপ উল্লেখ করা যায়- সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুছ ছানী আলাইহিস সালাম উনার শাহাদাত মুবারক উনার ঘটনা। তিনি যে শাহাদাতী শান মুবারক প্রকাশ করেছিলেন, এ ব্যাপারে কারো দ্বিমত নেই। উনাকে মহাসম্মানিত মহাপবিত্র দ্বীন ইসলাম উনার শত্রুরা শহীদ করার জন্য একে একে পাঁচবার বিষ পান করায়। কিন্তু মহান আল্লাহ পাক উনার রহমতে তিনি প্রত্যেকবারই বেঁচে যান। ষষ্ঠবার উনাকে শহীদ করার জন্য উনার পানির কলসি মুবারক, যে কলসি মুবারক উনার মুখ কাপড় দিয়ে বেঁধে রাখতেন, (যেন তার ভিতর কিছু ফেলা না যায়,) সেই কাপড় মুবারক উনার উপর শত্রুরা মারাত্মক হিরক চূর্ণ বিষ উনার অজান্তে মিশিয়ে দিয়েছিল। তিনি গভীর রাত্রিতে হিরক চূর্ণ বিষ মিশ্রিত পানি কলসি মুবারক থেকে ঢেলে পান করেন, যার ফলশ্রুতিতে তিনি শাহাদাতী শান মুবারক প্রকাশ করেন। যা উনার অজান্তেই সংঘটিত হয়েছিল। (সিররুশ শাহাদাতাইন, শুহাদায়ে কারবালা, সীরতে ইমাম হাসান ও ইমাম হুসাইন আলাইহিমাস সালাম)

এখন প্রশ্ন উঠে, মহাসম্মানিত ইসলামী শরীয়ত উনার দৃষ্টিতে উনার শাহাদাতকে আত্মহত্যা বলতে হবে, না ভুল করার কারণে বিছালী শান মুবারক প্রকাশ করেছেন, তা বলতে হবে?

মূলত উপরোক্ত দুটির কোনটিই বলা যাবেনা। যদি কেউ কোন একটিও বলে, তবে সে মিথ্যা তোহমত দেয়ার গুনাহে গুনাহগার হবে; যা কুফরীর শামিল হবে। তদ্রূপ মহাসম্মানিত মহাপবিত্র হযরত আবুল বাশার আলাইহিস সালাম উনার ঘটনাও। যা উনার অজান্তে সংঘটিত হয়েছে।

অনুরূপ অন্যান্য মহাসম্মানিত মহাপবিত্র হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের ঘটনাও। মানুষ সঠিক ইতিহাস না জানার কারণে এবং মহাসম্মানিত মহাপবিত্র কুরআন শরীফ ও মহাসম্মানিত মহাপবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদের সঠিক ব্যাখ্যা না বুঝার কারণে, মহাসম্মানিত মহাপবিত্র হযরত নবী আলাইহিমুস্ সালাম উনাদের শানে বেয়াদবিমূলক, কুফরী কথাবার্তা বলে থাকে।

পঞ্চম হিজরী শতাব্দীর মুজাদ্দিদ হুজ্জাতুল ইসলাম হযরত ইমাম গাযযালী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি উনার আল মুরশিদুল আমীন কিতাবে উল্লেখ করেন, “একবার মহান আল্লাহ পাক উনার মহাসম্মানিত মহাপবিত্র রসূল, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি পবিত্র হুজরা শরীফ উনার মধ্যে মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র নূরুশ শাফাক্বাতী শান মুবারকে (বসা) ছিলেন। এমতাবস্থায় এক ব্যক্তি এসে মহান আল্লাহ পাক উনার মহাসম্মানিত মহাপবিত্র রসূল, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাথে সাক্ষাৎ করার অনুমতি চাইলেন। এ সংবাদ হযরত উম্মুল মু’মিনীন আছ ছালিছাহ ছিদ্দীক্বা আলাইহাস সালাম তিনি মহাসম্মানিত মহাপবিত্র হাবীব, নূরে মুজাসসাম হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নিকট পৌঁছালেন। তখন মহাসম্মানিত মহাপবিত্র হাবীব, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বললেন যে, সে ব্যক্তিকে অপেক্ষা করতে বলুন। একথা বলে মহাসম্মানিত মহাপবিত্র হাবীব, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি উনার পবিত্র পাগড়ি মুবারক, পবিত্র কোর্তা মুবারক ইত্যাদি গোছগাছ করে নিলেন। এমনকি পবিত্র হুজরা শরীফ থেকে বের হওয়ার মুহূর্তে পানির গামলাতে নিজের মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র নূরুর রহমাহ মুবারক (চেহারা মুবারক) দেখে গুছিয়ে নিচ্ছিলেন। তা দেখে হযরত উম্মুল মু’মিনীন আছ ছালিছাহ ছিদ্দীক্বা আলাইহাস সালাম তিনি বললেন, ইয়া রসূলাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আপনিও কি এরূপ করেন?

তখন মহাসম্মানিত মহাপবিত্র হাবীব, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বললেন, কিরূপ করি? মহাসম্মানিত মহাপবিত্র হযরত উম্মুল মু’মিনীন আছ ছালিছাহ ছিদ্দীক্বা আলাইহাস সালাম তিনি বললেন, এরূপ পরিপাটি। এর জবাবে মহাসম্মানিত মহাপবিত্র হাবীব, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বললেন, হ্যাঁ, আমরা মহান আল্লাহ পাক উনার নবী। আমাদের কোন কাজ কারো অপছন্দ হলে, সে ঈমানহারা হয়ে যাবে।”

অতএব, মহাসম্মানিত মহাপবিত্র হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনারা যে কতটুকু অপছন্দনীয় কাজ থেকে বেঁচে থাকতেন, এ মহাসম্মানিত মহাপবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত ঘটনা তারই প্রমাণ। তাহলে কি করে এ কথা বলা যেতে পারে বা বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে যে, মহাসম্মানিত মহাপবিত্র হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনারা ভুল-ত্রুটি করেছিলেন? বস্তুত এরূপ আক্বীদা পোষণ করা সম্পূর্ণই কুফরী।

তদ্রূপ মহাসম্মানিত মহাপবিত্র হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের সম্পর্কে ও উনাদের মুবারক শানের খিলাফ কোন অর্থ গ্রহণ করা যাবেনা বরং এমন অর্থ ব্যবহার বা গ্রহণ করতে হবে, যাতে উনাদের শান-মান মুবারক সমুন্নত থাকে।

অতএব, কোন লোকের জন্যই মহাসম্মানিত মহাপবিত্র হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের শান মুবারক উনার বিন্দুমাত্র খিলাফ কথাবার্তা বলা যাবেনা। কেউ যদি বলে থাকে, তাহলে তা হবে সম্পূর্ণ নাজায়িয, হারাম ও কুফরী। এ ধরণের কুফরী আক্বীদা থেকে বেঁচে থাকা সমস্ত মুসলমান পুরুষ-মহিলাদের জন্য ফরয।

 

মুহম্মদ ইমামুল হুদা

মাদারীপুর

 

সুওয়াল: সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুছ ছালিছ আলাইহিস সালাম উনার শাহাদাতকে কেন্দ্র করে অনেকে জলীলুল ক্বদর ছাহাবী হযরত মুআবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনাকে দোষারোপ করে থাকে। এটা কতটুকু ঠিক? দয়া করে জানাবেন।

জাওয়াব: কোন মহাসম্মানিত মহাপবিত্র হযরত নবী-রসূল আলাইহিস্ সালাম উনাকে যেমন কোন ব্যাপারে দোষারোপ করা জায়িয নেই। তদ্রূপ কোন ছাহাবী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনাকেও কোন ব্যাপারে দোষারোপ করা জায়িয নেই।

এ বিষয়ে মহান আল্লাহ পাক তিনি উনার মহাসম্মানিত মহাপবিত্র কালাম পাক উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক করেন-

وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِّزْرَ أُخْرٰى

অর্থ: “একজনের পাপের বোঝা অপরজন বহন করবেনা।” (পবিত্র সূরা আনয়াম শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ নং ১৬৪)

এ সম্মানিত  ও পবিত্র আয়াত শরীফ উনার তাফসীরে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সন্তানের অপরাধের জন্য পিতাকে এবং পিতার অপরাধের জন্য সস্তানকে দায়ী করা বৈধ নয়। যেমন, কাবিলের অপরাধের জন্য মহাসম্মানিত মহাপবিত্র হযরত আবুল বাশার আদম আলাইহিস্ সালাম উনাকে, কেনানের অপরাধের জন্য মহাসম্মানিত মহাপবিত্র হযরত নূহ আলাইহিস্ সালাম উনাকে দায়ী করা বৈধ নয়। তেমনি ইয়াযীদের অপরাধের জন্য হযরত মুআবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনাকে দায়ী করাও বৈধ নয়। বরং সম্পূর্ণ নাজায়িয, হারাম ও কুফরীর অন্তর্ভুক্ত।

মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

لِيَغِيْظَبِهِمُ الْكُفَّارَ

অর্থ: “কাফিররাই উনাদের (হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদের) প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে থাকে।” (পত্রি সূরা ফাতহ শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ নং ২৯)

আর পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত রয়েছে-

عَنْ حَضْرَتْ مَالِكِ بْنِ اَنَسٍ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ قَالَ مَنْ غَاظَهٗ أَصْحَابَ مُـحَمَّدٍ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَهُوَ كَافِرٌ

অর্থ: “হযরত মালিক ইবনে আনাস রহমতুল্লাহি আলাইহি বর্ণনা করেন, যে ব্যক্তি মহাসম্মানিত মহাপবিত্র হাবীব, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে, সে কাফির।” (নাসীমুর রিয়াদ্ব)

এখানে একটা বিষয় মনে রাখা দরকার যে, মহান আল্লাহ পাক উনার মহাসম্মানিত মহাপবিত্র রসূল, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার আদরের দৌহিত্র ইমামুছ ছালিছ মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মর্মান্তিক শাহাদাতে মুসলিম উম্মাহ’র অন্তর ব্যথাতুর হবে তা চরম সত্য কথা এবং এটি ঈমান মজবুতীর আলামতও বটে। কিন্তু এজন্য হযরত মুআবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু যিনি মহান আল্লাহ পাক উনার মহাসম্মানিত মহাপবিত্র রসূল, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার জলীলুল ক্বদর ছাহাবী উনাকে দোষারোপ করা কস্মিনকালেও শরীয়ত সম্মত হতে পারে না।

মহাপবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত রয়েছে-

عَنْ حَضْرَتْ اَبِـىْ سَعِيْدِنِ الْـخُدْرِىِّ رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ قَالَ قَالَ النَّبِىُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ‏ لَا تَسُبُّـوْا اَصْحَابِـىْ فَـلَوْ اَنَّ اَحَدَكُمْ اَنْـفَقَ مِثْلَ اُحُدٍ ذَهَبًا مَّا بَـلَغَ مُدَّ اَحَدِهِمْ وَلَا نَصِيْـفَهٗ

অর্থ: “হযরত আবু সায়ীদ খুদ্রী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, মহাসম্মানিত মহাপবিত্র রসূল, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ করেন, তোমরা আমার হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদেরকে গালি দিওনা। কেননা তোমাদের কেউ যদি উহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণ মহান আল্লাহ পাক উনার রাস্তায় দান কর, তবুও হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদের এক মূদ্ (১৪ ছটাক) বা অর্ধ মূদ্ (৭ ছটাক) গম দান করার ফযীলতের সমপরিমাণ ফযীলত অর্জন করতে পারবে না।” (বুখারী শরীফ)

মহাসম্মানিত মহাপবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে আরো ইরশাদ মুবারক হয়েছে যে-

عَنْ حَضْرَتْ عُوَيـْمِرِ بْنِ سَاعِدَةَ رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ اَنَّهٗ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ إِنَّ اللهَ اِخْتَارَنِيْ وَاخْتَارَلِـىْ أَصْحَابًا فَجَعَلَ لِىْ مِنْـهُمْ وُزَرَاءَ وَأَنْصَارًا وَأَصْهَارًا فَمَنْ سَبَّـهُمْ فَـعَلَيْهِ لَعْنَةُ اللهِ وَالْـمَلٰئِكَةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِيْنَ وَلَا يَـقْبَلُ اللهُ مِنْهُمْ صَرْفًا وَّعَدْلًا

অর্থ: “হযরত উয়াইমির ইবনে সায়িদাহ রদ্বিয়াল্লাহ তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত রয়েছে, মহাসম্মানিত মহাপবিত্র রসূল, নূরে মুজাস্সাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ পাক তিনি আমাকে মনোনীত করেছেন এবং আমার হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদেরকে মনোনীত করেছেন এবং উনাদের মধ্য থেকে আমার কার্য সম্পাদনকারী, খিদমতকারী ও বৈবাহিক সূত্রের আত্মীয়বর্গ নির্ধারণ করেছেন। অতএব যারা উনাদেরকে গালি দিবে বা দোষারোপ করবে, তাদের প্রতি মহান আল্লাহ পাক উনার, উনার হযরত ফেরেশ্তা আলাইহিমুস সালাম উনাদের ও মানুষ সকলেরই লা’নত এবং তাদের কোন ফরয ও নফল ইবাদত মহান আল্লাহ পাক তিনি কবুল করবেন না।” (তবারানী শরীফ, হাকিম শরীফ)

স্মরণযোগ্য যে, হযরত মুআবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি মহাসম্মানিত মহাপবিত্র রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন্ নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদের মধ্যে একজন বিশেষ শ্রেণীর ছাহাবী যাকে ‘উলুল আযম বা জলীলুল ক্বদর ছাহাবী বলা হয়। তিনি ছিলেন আমীরুল মু’মিনীন, খলীফাতুল মুসলিমীন, কাতিবীনে ওহীর সদস্য, পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার রাবী, ফক্বীহ ইত্যাদি মর্যাদার অধিকারী। উনার ইলমের পূর্ণতা, হিদায়েতের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকা, উনার দ্বারা লোকদের হিদায়েত লাভ, কিতাব শিক্ষাদান এবং জাহান্নাম থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার ক্ষেত্রে মহাসম্মানিত মহাপবিত্র রসূল, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি মহান আল্লাহ পাক উনার নিকট দোয়া মুবারক করেছেন।

মহাপবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত রয়েছে-

عَنْ حَضْرَتْ أُمِّ حَرَامٍ رَضِىَ اللهُ تَـعَالٰى عَنْـهَا أَنَّـهَا سَـمِعَتِ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَـقُوْلُ‏ أَوَّلُ جَيْشٍ مِّنْ أُمَّتِـىْ يَغْزُوْنَ الْبَحْرَ قَدْ أَوْجَبُـوْا

অর্থ: “হযরত উম্মু হারাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা উনার থেকে বর্ণিত। তিনি মহাসম্মানিত মহাপবিত্র রসূল, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে বলতে শুনেছেন, তিনি বলেন, আমার উম্মতের প্রথম যে দল সমুদ্র পথে জিহাদে অংশগ্রহণ করবেন উনাদের জন্য জান্নাত ওয়াজিব।” (বুখারী শরীফ)

হযরত ইমাম তাবারী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, “হযরত মুআবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি ২৮ হিজরীতে সর্বপ্রথম সমুদ্র পথে জিহাদের মাধ্যমে কাবরাসের উপর আক্রমণ করেন এবং কাবরাস তিনিই বিজয় করেন।”

হযরত মুআবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার মর্যাদা-মর্তবার মধ্যে অন্যতম মর্যাদা হলো, তিনি ছিলেন একজন আদিল বা ইনসাফগার খলীফা। উনার ন্যায় বিচার ও ইনসাফ সম্পর্কে কিতাবে উল্লেখ করা হয় যে, এক ব্যক্তি হযরত মুয়াফা ইবনে ইমরান রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে বললো, ন্যায় বিচারের দিক দিয়ে হযরত মুআবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি ও হযরত উমর ইবনে আব্দুল আযীয রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাদের মধ্যে কে শ্রেষ্ঠ? একথা শুনে তিনি রাগান্বিত হয়ে বললেন, “হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদের প্রতি কোন প্রকার ক্বিয়াস করা যাবে না। হযরত মুআবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি তো মহাসম্মানিত মহাপবিত্র রসূল, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ছাহাবী, কাতিবে ওহী ও মহান আল্লাহ পাক উনার মহাসম্মানিত মহাপবিত্র রসূল, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ‘আমীন’ (আমানতদার)।” সুবহানাল্লাহ!

আমীরুল মু’মিনীন ফিল হাদীছ হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে জিজ্ঞাসা করা হলো যে, “হযরত মুআবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি শ্রেষ্ঠ, না হযরত উমর ইবনে আব্দুল আযীয রহমতুল্লাহি আলাইহি শ্রেষ্ঠ?” তিনি বলেন, “মহান আল্লাহ পাক উনার কছম! হযরত মুআবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি যখন মহাসম্মানিত মহাপবিত্র রসূল, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাথে ঘোড়ায় চড়ে জিহাদে যেতেন, তখন ঘোড়ার নাকে যে ধুলোবালিগুলো প্রবেশ করতো, সেই ধুলোবালিগুলোও হযরত উমর ইবনে আব্দুল আযীয রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার থেকে বহুগুণে শ্রেষ্ঠ।” সুবহানাল্লাহ! (ফতওয়ায়ে হাদীছিয়াহ)

সুতরাং, এত সব মর্যাদা ও মর্তবার পরও যারা হযরত মুআবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে, উনাকে নাক্বিছ বলে গালি দেয়, তাদের জন্যে হযরত ইমাম শিহাবুদ্দীন খাফ্ফাযী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার কথাই অধিক প্রযোজ্য। তিনি বলেন, “যে ব্যক্তি হযরত মুআবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-উনার প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে গালি দেয়, নাকিছ বলে, সমালোচনা করে, সে হাবিয়া দোযখের কুকুরসমূহের মধ্য হতে একটি কুকুর।”

উপরোক্ত সংক্ষিপ্ত বর্ণনা থেকে স্পষ্ট প্রমাণিত হলো যে, হযরত মুআবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি শুধু ছাহাবীই ছিলেন না, বরং উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন, জলীলুল ক্বদর ছাহাবী ও খলীফা ছিলেন। সুতরাং হযরত মুআবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনিসহ সকল হযরত ছাহাবী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদের সম্পর্কে সাবধানে কথা বলতে হবে। মূলত উনাদের সকলের প্রতিই সুধারণা পোষণ করতে হবে, মুহব্বত করতে হবে এবং উনাদেরকে অনুসরণ-অনুকরণও করতে হবে।

কেননা উনারা হলেন মহাসম্মানিত দ্বীন ইসলাম উনার সম্মানিত ইমাম এবং মহাসম্মানিত মহাপবিত্র রসূল, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার আদর্শের বাস্তব প্রতিফলন। এই জন্য উনারা যেভাবে ঈমানের স্বীকৃতি দিয়েছেন এবং আমলে যেভাবে নিজেকে নিয়োজিত করেছেন, ঠিক সেভাবেই ঈমানের স্বীকৃতি দেয়া এবং আমলে নিয়োজিত হওয়া পরবর্তী উম্মতের দায়িত্ব-কর্তব্য।

এ প্রসঙ্গে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

اٰمِنُوْا كَمَاۤ اٰمَنَ النَّاسُ

অর্থ: “তোমরা ঈমান আন যেভাবে অন্যান্য লোক অর্থাৎ হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনারা ঈমান এনেছেন।” (সম্মানিত ও পবিত্র সূরা বাক্বারা শরীফ:  সম্মানিত ও পবিত্র  আয়াত শরীফ নং ১৩)

মহান আল্লাহ পাক হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদের সম্পর্কে ইরশাদ মুবারক করেন-

رَضِيَ اللهُ عَنْهُمْ

“অর্থ: মহান আল্লাহ পাক তিনি উনাদের প্রতি সন্তুষ্ট” (সম্মানিত ও পবিত্র সূরা তওবা শরীফ: সম্মানিত ও পবিত্র আয়াত শরীফ ১০০)

মহান আল্লাহ পাক তিনি আরো ইরশাদ মুবারক করেন-

وَالَّذِيْنَ اتَّـبَـعُوْهُمْ بِاِحْسَانٍ رَّضِىَ اللهُ عَنْهُمْ

অর্থ: “মহান আল্লাহ পাক তিনি ওই সকল বান্দাদের প্রতিও সন্তুষ্ট যারা হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদেরকে উত্তমরূপে অনুসরণ করেন।” (সম্মানিত ও পবিত্র সূরা তওবা শরীফ: সম্মানিত ও পবিত্র আয়াত শরীফ ১০০)

মহাসম্মানিত মহাপবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত হয়েছে-

عَنْ حَضْرَتْ عُمَرِ بْنِ الْـخَطَّابِ عَلَيْهِ السَّلَامُ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَصْحَابِـىْ كَالنُّجُومِ فَبِأَيِّهِمْ اِقْـتَدَيْـتُمْ اِهْتَدَيْـتُمْ

অর্থ: হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম তিনি বর্ণনা করেন, মহাসম্মানিত মহাপবিত্র নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, “আমার হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনারা তারকা সাদৃশ্য। উনাদের যে কাউকে অনুসরণ করলে তোমরা হিদায়েতপ্রাপ্ত হবে।” (মিশকাত শরীফ)

অতএব, মহান আল্লাহ পাক উনার ও উনার মহাসম্মানিত মহাপবিত্র হাবীব, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদের সন্তুষ্টি মুবারক হাছিল করতে চাইলে অবশ্যই হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদেরকে অনুসরণ-অনুকরণ করতে হবে এবং উনাদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা, সমালোচনা করা ও নাক্বিছ বলা হতে বিরত থাকতে হবে। নচেৎ ঈমানহারা হয়ে চির জাহান্নামী হতে হবে।

 

মুহম্মদ জহীরুল ইসলাম

মতলব, চাঁদপুর

 

সুওয়াল: নববর্ষ পালন করা এবং এ উপলক্ষে ভালো খাওয়া-পরার জন্য উৎসাহ দেয়া হয়। এটা কতটুকু শরীয়তসম্মত?

জাওয়াব: মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র দ্বীন ইসলাম উনার দৃষ্টিতে নওরোজ বা যে কোন নববর্ষ পালন করা হারাম ও বিদয়াত।”

কাজেই, নববর্ষ সেটা ফসলী হোক, ইংরেজি হোক, আরবী হোক ইত্যাদি সবই ইহুদী-নাছারা, বৌদ্ধ, মজুসী-মুশরিকদের তর্জ-তরীক্বা; যা পালন করা থেকে বিরত থাকা সকল মুসলমানের জন্য ফরয-ওয়াজিব।

উল্লেখ্য, সাধারণভাবে প্রাচীন পারস্যের শাসক জমশীদ খ্রিস্টপূর্ব ৮০০ সালে এই নওরোজের প্রবর্তন করেছিল এবং এ ধারাবাহিকতায় এখনও পারস্য তথা ইরানে নওরোজ ঐতিহ্যগত নববর্ষের জাতীয় উৎসব হিসেবে পালিত হয়। ইরান থেকেই এটা একটি সাধারণ সংস্কৃতির ধারা বেয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মুসলিম দেশ এবং ভারত উপমহাদেশে প্রবেশ করে।

তাছাড়া ফসলী সনের পহেলা বৈশাখ বা নববর্ষ উপলক্ষে শহরে ও গ্রামে যে ভোজ, মেলা উৎসব হয় তাও ইরানের নওরোজ হতে পরোক্ষভাবে এদেশে এসেছে। মোঘল পূর্ববর্তী আমলে এদেশে নওরোজ বা নববর্ষ পালনের রীতি প্রচলিত ছিল না।

ইতিহাসের তথ্য অনুযায়ী পহেলা বৈশাখ পালনের সংস্কৃতি হিন্দুদের থেকে এসেছে। তবে কথিত বাংলা সন প্রকৃতপক্ষে ফসলী সন বা পহেলা বৈশাখ বাঙালি দ্বারা প্রবর্তিত নয়। মোঘল শাসক আকবর ফসলী সন হিসেবে এর প্রবর্তন করে। আর মোঘল শাসক আকবর ছিল মঙ্গলীয় এবং ফারসী ভাষী। তাহলে এটা কি করে বাঙালি সংস্কৃতি হতে পারে? কাজেই বাঙালিদের জন্য এটা অনুসরণীয় নয়। আর মুসলমানদের জন্য তো এটা অনুসরণ করার প্রশ্নই আসেনা।

হযরত ইমাম আবু হাফছ কবীর রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, “নওরোজ বা নববর্ষ উপলক্ষে যদি কেউ একটা ডিমও দান করে তার ৫০ বৎসরের আমল থাকলেও তা বরবাদ হয়ে যাবে।” অর্থাৎ নওরোজ বা নববর্ষ পালনের কারণে তার জিন্দেগীর সমস্ত আমল বরবাদ হয়ে যাবে। নাউযুবিল্লাহ!

বিশেষত ফসলী নববর্ষ হিন্দুদের খাছ ধর্মীয় উৎসবের দিন। এর আগের দিন তাদের চৈত্র সংক্রান্তি। আর পহেলা বৈশাখ হলো ঘট পূজার দিন। নাউযুবিল্লাহ!

কাজেই, মুসলমানদের জন্য বাংলা নববর্ষসহ যে কোন নববর্ষ পালন করার অর্থ হচ্ছে বিজাতি ও বিধর্মীদের সাথেই মিল রাখা। তাদেরই অনুসরণ অনুকরণ করা। নাঊযুবিল্লাহ!

অথচ মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র কালামুল্লাহ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

اِنَّ شَرَّ الدَّوَابِّ عِنْدَ اللهِ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا فَـهُمْ لَا يـُـؤْمِنُـوْنَ

অর্থ  : “নিশ্চয়ই সমস্ত প্রাণীর মাঝে মহান আল্লাহ পাক উনার নিকট কাফিররাই নিকৃষ্ট, যারা ঈমান আনেনি।” (মহাসম্মানিত সূরা আনফাল শরীফ : মহাপবিত্র আয়াত শরীফ ৫৫)

আরো ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

وَلَا تُطِعِ الْكَافِرِيْنَ وَالْـمُنَافِقِيْنَ

অর্থ : কাফির ও মুনাফিকদের অনুসরণ করো না। (মহাপবিত্র সূরা আহযাব শরীফ: মহাপবিত্র আয়াত শরীফ নং ১)

মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত রয়েছে-

عَنْ حَضْرَتْ عَمْرِو بْنِ شُعَيْبٍ عَنْ اَبِيْهِ عَنْ جَدِّهٖ اَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ لَيْسَ مِنَّا مَنْ تَشَبَّهَ بِغَيْرِنَا

অর্থ :  হযরত আমর ইবনে শুয়াইব রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি উনার পিতা থেকে এবং তিনি উনার দাদা থেকে বর্ণনা করেন, মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র হাবীব, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, “ওই ব্যক্তি আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়, যে বিজাতীয়দের সাথে সাদৃশ্য রাখে।” (মিশকাত শরীফ)

মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে আরো ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

عَنْ حَضْرَتْ اِبْنِ عُمَرَ رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ

অর্থ  :  “হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র হাবীব, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, যে ব্যক্তি যে সম্প্রদায়ের সাথে মিল রাখে, সে তাদের দলভুক্ত অর্থাৎ তার হাশর-নশর তাদের সাথেই হবে।” (সুনানে আহমদ, সুনানে আবূ দাউদ)

অতএব, পহেলা বৈশাখ, পহেলা জানুয়ারি, পহেলা মুহররম ইত্যাদি নববর্ষ পালন করার জন্য উৎসাহিত করা এবং সাথে সাথে ভাল খাওয়া-পরার জন্যও উৎসাহিত করা কাট্টা হারাম ও কুফরী। যা থেকে বিরত থাকা ও বেঁচে থাকা সকল মুসলমানের জন্য ফরয-ওয়াজিবের অন্তর্ভুক্ত।

মুহম্মদ মঞ্জুরুল আনোয়ার

রিয়াদ, সউদী আর

সুওয়াল:  বছরের মধ্যে কি কোন নির্দিষ্ট দিন আছে, যেদিন ভালো খাওয়া-পরার ব্যাপারে ইসলামী শরীয়ত উনার মধ্যে উৎসাহ দেয়া হয়েছে?

জাওয়াব:  হ্যাঁ, রয়েছে। সে দিনটি হচ্ছে মহাপবিত্র দশই মুহররম শরীফ। এ দিনটিতে প্রত্যেক পরিবারের প্রধানকে তার পরিবারের সদস্যদেরকে ভালো খাদ্য খাওয়ানোর জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

খ্বলিক মালিক রব মহান আল্লাহ পাক উনার মহাসম্মানিত মহাপবিত্র হাবীব, নূরে মুজাস্সাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

مَنْ وَّسَّعَ عَلٰى عِيَالِهٖ فِى النَّفَقَةِ يَوْمَ عَاشُوْرَاءَ وَسَّعَ اللهُ عَلَيْهِ سَائِرَ سَنَتِهٖ

অর্থ : “যে ব্যক্তি তার পরিবারবর্গকে মহাপবিত্র আশূরা শরীফ উনার দিন অর্থাৎ পবিত্র দশই মুহররম শরীফ তারিখে ভালো খাদ্য খাওয়াবে, মহান আল্লাহ পাক তিনি তাকে এক বৎসরের জন্য সচ্ছলতা দান করবেন।” সুবহানাল্লাহ! (তবারানী শরীফ, মা-ছাবাতা বিস্সুন্নাহ)

এ প্রসঙ্গে কিতাবে একটি ওয়াক্বিয়া বর্ণিত রয়েছে। এক ব্যক্তি ছিল গরিব ও আলিম। একবার অসুস্থতার কারণে তিনি তিনদিন যাবৎ কোন কাজ করতে পারলেন না। চতুর্থ দিন ছিল মহাপবিত্র আশূরা শরীফ উনার দিন। তিনি মহাপবিত্র আশূরা শরীফ উনার দিনে ভালো খাওয়ার ফযীলত সম্পর্কে জানতেন। তখন ছিল কাজীদের (বিচারক) যুগ। এলাকার কাজী ছাহেব ধনী ব্যক্তি ছিল।

গরিব আলিম ব্যক্তি তিনি কাজী ছাহেবের কাছে মহাপবিত্র আশূরা শরীফ উনার ফযীলতের কথা বলে এবং নিজের অসুস্থতা ও পরিবারের অভুক্ত থাকার কথা উল্লেখ করে ১০ সের আটা, ১০ সের গোশত ও ২ দিরহাম হাদিয়া অথবা কর্জ হিসেবে চাইলেন। কাজী ছাহেব উনাকে যুহরের সময় আসতে বললো। যুহরের সময় কাজী ছাহেব বললো, আছরের সময় আসতে। এরপরে আছরের সময় ইশা এবং ইশার সময় সরাসরি না করে দিল। তখন গরিব আলিম ব্যক্তি বললেন:  হে কাজী ছাহেব! আপনি আমাকে কিছু দিতে পারবেন না সেটা আগেই বলতে পারতেন, আমি অন্য কোথাও ব্যবস্থা করতাম। কিন্তু তা না করে আমাকে সারাদিন ঘুরিয়ে এই শেষ মুহূর্তে নিষেধ করলেন? কাজী ছাহেব সেই গরিব আলিম ব্যক্তির কথায় কর্তপাত না করে দরজা বন্ধ করে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করলো।

মনের দুঃখে গরিব আলিম ব্যক্তি তখন কাঁদতে কাঁদতে বাড়ির দিকে রওয়ানা হলেন। পথে ছিল এক খ্রিস্টানের বাড়ি। একজন বয়স্ক ব্যক্তিকে কাঁদতে দেখে উক্ত খ্রিস্টান কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করলো। কিন্তু বিধর্মী বিধায় খ্রিস্টানকে প্রথমে তিনি কিছু বলতে চাইলেন না। অতঃপর খ্রিস্টানের অধীর আগ্রহের কারণে তিনি মহাপবিত্র আশূরা শরীফ উনার ফযীলত ও উনার বর্তমান অবস্থার কথা ব্যক্ত করলেন। খ্রিস্টান ব্যক্তি তখন উৎসাহী হয়ে আলিম ব্যক্তিকে মহাপবিত্র আশূরা শরীফ উনার সম্মানার্থে ১০ সের আটা, ১০ সের গোশত, ২ দিরহাম এবং অতিরিক্ত আরও ২০ দিরহাম দিল এবং বললো যে, আপনাকে আমি মহাপবিত্র আশূরা শরীফ উনার সম্মানার্থে প্রতিমাসে এ পরিমাণ হাদিয়া দিব। গরিব আলিম তখন তা নিয়ে বাড়িতে গেলেন এবং খাবার তৈরি করে ছেলে-মেয়েসহ আহার করলেন। অতঃপর দোয়া করলেন, “আয় মহান আল্লাহ পাক! যে ব্যক্তি আমাকে সন্তুষ্ট করলো, আমার ছেলে-মেয়েদের মুখে হাসি ফোটালো, মহান আল্লাহ পাক! আপনি তার দিল খুশি করে দিন, তাকে সন্তুষ্ট করে দিন।”

ওই রাতে কাজী ছাহেব স্বপ্ন দেখলো, স্বপ্নে কাজী ছাহেবকে বলা হচ্ছে, হে কাজী ছাহেব! তুমি মাথা উত্তোলন করো। মাথা তুলে কাজী ছাহেব দেখতে পেলো যে, তার সামনে দুটি বেহেশ্তী বালাখানা। একটি স্বর্ণের তৈরী আরেকটি রৌপ্যের তৈরী। কাজী ছাহেব বললো, ‘আয় মহান আল্লাহ পাক! এটা কি?’ গায়িবী আওয়াজ হলো, ‘এ বালাখানা দুটি হচ্ছে বেহেশতী বালাখানা। এ বালাখানা দুটি তোমার ছিল। কিন্তু এখন আর তোমার নেই। কারণ তোমার কাছে যে গরিব আলিম লোকটি মহাপবিত্র আশূরা শরীফ উপলক্ষে সাহায্যের জন্য এসেছিলেন উনাকে তুমি সাহায্য করোনি। এজন্য এ বালাখানা দুটি এখন অমুক খ্রিস্টান লোকের হয়েছে।’ কারণ সে খ্রিস্টান লোকটা আশূরা শরীফ উনার সম্মানার্থে গরিব আলিমকে সাহায্য করেছে। অতঃপর কাজী ছাহেবের ঘুম ভেঙে গেলো। ঘুম থেকে উঠে ওযূ ও নামায আদায় করে সেই খ্রিস্টানের বাড়িতে গেলো। খ্রিস্টান কাজী ছাহেবকে দেখে বিস্ময়াভূত হলো। কারণ কাজী ছাহেব খ্রিস্টানের পড়শি বা প্রতিবেশী হওয়া সত্ত্বেও জন্মের পর থেকে এ পর্যন্ত কোন সময় তার বাড়িতে আসতে দেখেনি।

অতঃপর খ্রিস্টান ব্যক্তি কাজী ছাহেবকে বললো, ‘আপনি এত সকালে কি জন্য এলেন?’ কাজী ছাহেব বললো, ‘হে খ্রিস্টান ব্যক্তি! তুমি গত রাতে যে নেক কাজ করেছ সেটা আমার কাছে এক লাখ দিরহামের বিনিময় বিক্রি করে দাও।’ খ্রিস্টান ব্যক্তি বললো, ‘হে কাজী সাহেব! আপনি কি বলতে চাচ্ছেন আমি বুঝতে পারছি না। আপনি স্পষ্ট করে বলুন।’ তখন কাজী ছাহেব তার স্বপ্নের কথা জানালো এবং বললো, ‘তুমি নিশ্চয়ই সেই গরিব আলিম লোকটিকে সাহায্য করেছ।’ তখন খ্রিস্টান ব্যক্তি তা স্বীকার করলো। কাজী ছাহেব বললো যে, ‘তুমি তো খ্রিস্টান, তুমি তো এই বালাখানা পাবেনা। তোমার এটা নিয়ে কি ফায়দা হবে? তুমি তোমার এই নেক কাজ এক লাখ দিরহামের বিনিময়ে আমার নিকট বিক্রি করে দাও এবং তুমি উনার কাছে প্রত্যেক মাসে যে ওয়াদা করেছ আমি উনাকে তা দিয়ে দিব।’ খ্রিস্টান ব্যক্তি বললো, ‘হে কাজী ছাহেব! আমি যদি মুসলমান হয়ে যাই তাহলে কি সেই বালাখানা পাবো?’ তখন কাজী ছাহেব বললো:  ‘হ্যাঁ, তুমি যদি মুসলমান হও তবে বালাখানা পাবে।’

তখন খ্রিস্টান ব্যক্তি বললো, ‘হে কাজী ছাহেব! আপনি সাক্ষী থাকুন, আমি পবিত্র কালিমা শরীফ পড়ে মুসলমান হয়ে গেলাম।’ অতঃপর সত্যি সেই খ্রিস্টান ব্যক্তি মুসলমান হয়ে গেল। সুবহানাল্লাহ!

অতএব এটা ফিকিরের বিষয় যে, মহাপবিত্র মুহররম শরীফ মাস তথা মহাপবিত্র আশূরা শরীফ উনাকে সম্মান করার কারণে এবং মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র আশূরা শরীফ উনার সম্মানার্থে ভালো খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করে দেয়ার কারণে মহান আল্লাহ পাক তিনি খ্রিস্টান ব্যক্তিকে ঈমান দিয়ে দিলেন। এমনকি জান্নাত নছীব করলেন। সুবহানাল্লাহ!

 

মুহম্মদ ইরফানুল হক

বানারীপাড়া, বরিশাল

 

সুওয়াল: সাম্প্রতিককালে চর্মনাইয়ের নামধারী পীর ফয়জুল করিম তার এক বক্তব্যে বলেছে যে, “ছাহাবীরা মুরতাদ হয়ে গেছে” নাউযুবিল্লাহ! আরো বলেছে, সাইয়্যিদুল মুরসালীন ইমামুল মুরসালীন নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার দ্বিতীয় ও তৃতীয় কন্যার স্বামী মুরতাদ ছিলো। নাউযুবিল্লাহ! অনুরূপ আরো কিছু ভুল বক্তব্য প্রদান করেছে। এসব ভুল বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে বক্তব্যদাতার প্রতি কী হুকুম বর্তাবে?

জাওয়াব: ফার্সি ভাষায় প্রসিদ্ধ একটি প্রবাদ হচ্ছে ‘নীম হেকীম খতরে জান, নীম মোল্লা খতরে ঈমান’ অর্থাৎ আধা কবিরাজ বা ডাক্তার জীবন নষ্ট করে আর আধা মুফতে-মালানা ঈমান নষ্ট করে। চর্মনাইয়ের কথিত পীর ফয়জুল করিমের অবস্থাও সেই নীম মোল্লার মতই। ‘ছাহাবী’র সংজ্ঞাই তার জানা নেই। তাছাড়া যে প্রকৃত আলিম নয়, সে জবানের অধীন হয়ে থাকে। চর্মনাইয়ের কথিত পীরের ক্ষেত্রে সেটাই ফুটে উঠেছে।

সে যে বলেছে, “ছাহাবীরা মুরতাদ হয়ে গেছে” নাউযুবিল্লাহ মিন যালিক! ছাহাবী মুরতাদ হন কিভাবে! ‘ছাহাবী’ তো তিনি যিনি ঈমানের সাথে মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র হাবীব, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে দেখেছেন, উনার ছোহবত মুবারক ইখতিয়ার করেছেন এবং ঈমানের সাথে ইন্তেকাল করেছেন। সুবহানাল্লাহ! এটাই যেহেতু ছাহাবী উনাদের সংজ্ঞা তাহলে ছাহাবী উনাদের শান মুবারকে কি করে মুরতাদ হওয়ার অভিযোগ আসতে পারে? আসলে ‘পাত্রে আছে যা, ঢাললে পড়ে তা’। তার ভিতরে কুফরী থাকার কারণেই কুফরীটা তার মুখ দিয়ে বের হয়েছে। নাউযুবিল্লাহ!

মূর্খ চর্মনাই আরো যে বলেছে, মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র হাবীব, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার দ্বিতীয় ও তৃতীয় কন্যার স্বামী মুরতাদ ছিলো। নাউযুবিল্লাহ! নাউযুবিল্লাহ! নাউযুবিল্লাহ! তার এই বক্তব্যের প্রেক্ষিতে বলতে হয়, প্রকৃতপক্ষে কাফিরেরাই কুফরী করে। এবং মুসলমান নামধারী কেউ কুফরী করলে সে তখন মুরতাদ হয়ে যায়। চর্মনাইয়ের কথিত পীরের অবস্থাও ঠিক তাই। সে নিজেই একটা কাট্টা মুরতাদ, মুনাফিক ও কাফির। তাই তার পক্ষে উল্লেখিত বক্তব্য দেয়া সম্ভব হয়েছে। মূল বিষয় হচ্ছে, মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র হাবীব, সাইয়্যিদুল মুরসালীন ইমামুল মুরসালীন নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি আনুষ্ঠানিক নুবুওওয়াত মুবারক প্রকাশের পূর্বেই উনার মহাসম্মানিতা উক্ত দুই বানাত (মেয়ে) আলাইহিমাস সালাম উনাদেরকে বাল্য অবস্থায় যথাক্রমে উতবা এবং উতাইবা’র সাথে বিবাহের আক্দ্ (চুক্তি) সম্পাদন করেছিলেন। তখন দ্বিতীয় বানাত আলাইহাস সালাম উনার বয়স মুবারক ৭ বছরের কাছাকাছি এবং তৃতীয় বানাত আলাইহাস সালাম উনার বয়স মুবারক ৫ বছরের কাছাকাছি। অতঃপর পবিত্র সূরা মাছাদ (লাহাব) শরীফ নাযিল হলে বাল্য অবস্থাতেই সেই চুক্তি বাতিল বা ছিন্ন করা হয়। ফলে উনাদেরকে আবূ লাহাবের ছেলেদের ঘরে যেতে হয়নি। অতঃপর কিছুদিন অতিবাহিত হওয়ার পর প্রথমে দ্বিতীয় বানাত আলাইহাস সালাম উনাকে এবং উনার পবিত্র বিছালী শান মুবারক প্রকাশের পর তৃতীয় বানাত আলাইহাস সালাম উনাকে আমীরুল মু’মিনীন, খলীফাতুল মুসলিমীন হযরত যুন নূরাইন আলাইহিস সালাম উনার সাথে পবিত্র নিছবাতুল আযীম (বিবাহ) মুবারক সম্পাদন করা হয়। আর এ কারণেই তিনি যূন নূরাইন (দুই নূর মুবারকের অধিকারী) লক্ববে ভূষিত হন। সুবহানাল্লাহ!

মূর্খ চর্মনাই আরো বলেছে, মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র হাবীব, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বড় কন্যা হযরত হাফছা আলাইহাস সালাম। নাউযুবিল্লাহ! নাউযুবিল্লাহ! নাউযুবিল্লাহ! আশাদ্দুদ দরজার জাহিল চর্মনাইয়ের পক্ষেই এ রকম ভুল বক্তব্য দেয়া সম্ভব। মূলত হাফছা নামে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার কোন বানাত বা মেয়ে-ই ছিলেন না। মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র হাবীব, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার প্রথম বানাত আলাইহাস সালাম উনার পবিত্র নাম মুবারক সাইয়্যিদাতুনা হযরত যাইনাব (আন নূরুল ঊলা) আলাইহাস সালাম। উনাকেও অল্প বয়সে পবিত্র নিছবাতুল আযীম মুবারক সম্পাদন করা হয়েছিল উনারই আপন খালাতো ভাই হযরত আবুল আছ (যুন নূর) আলাইহিস সালাম উনার সাথে। অর্থাৎ যিনি হচ্ছেন হযরত উম্মুল মু’মিনীন আল ঊলা কুবরা আলাইহাস সালাম উনার আপন বোনের ছেলে। এবং এ পবিত্র নিছবাতুল আযীম মুবারকও সংঘটিত হয়েছিলো আনুষ্ঠানিক নুবুওওয়াত মুবারক প্রকাশের পূর্বেই।

স্মরণীয় যে, আনুষ্ঠানিক নুবুওওয়াত মুবারক প্রকাশের পর সমস্ত লোক একসাথে ঈমান গ্রহণ করে ছাহাবী হননি। বরং কেউ শুরুর দিকে হয়েছেন, কেউ মাঝামাঝি সময়ে হয়েছেন, কেউ শেষে হয়েছেন। অনেকে হিজরত মুবারক উনার আগে হয়েছেন, অনেকে হিজরত মুবারক উনার পরে হয়েছেন। অনেকে বদর জিহাদ উনার পরে হয়েছেন, অনেকে অন্য জিহাদ উনাদের পরে হয়েছেন, অনেকে পবিত্র মক্কা শরীফ বিজয়ের সময় হয়েছেন, অনেকে পরেও হয়েছেন। অনেকে বিদায় হজ্জ উনার সময় হয়েছেন, অনেকে আবার পবিত্র বিদায়  হজ্জ উনার পরেও হয়েছেন। আর সম্মানিত দ্বীন ইসলাম গ্রহণের বিষয়টি জোর-জবরদস্তিমূলক ছিলো না। বরং প্রত্যেকের ইখতিয়ারাধীন ছিল। যার কারণে হযরত আবুল আছ যুন নূর আলাইহিস সালাম তিনি বদর জিহাদ উনার পূর্বে সম্মানিত দ্বীন ইসলাম গ্রহণের বিষয়টি প্রত্যক্ষভাবে প্রকাশ না করলেও পরবর্তীকালে তা প্রকাশ করেন। আর বদর জিহাদে তিনি স্বেচ্ছায় যাননি বরং কাফির কুরাইশ নেতারা উনাকে বাধ্য করেছে। আর তিনি নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিরোধিতাকারীও ছিলেন না। তাই উনাকে বদর জিহাদে বন্দিদের মধ্যে গণ্য করা হয়েছিল যেমন বন্দিদের মধ্যে গণ্য করা হয়েছিল নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সম্মানিত চাচা হযরত আব্বাস আলাইহিস সালাম উনাকে। সুবহানাল্লাহ! আর মুক্তিপণের শর্তে বন্দিদের ছেড়ে দেয়ার বিষয়টি মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র হাবীব, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনারই মুবারক নির্দেশ অর্থাৎ মহাপবিত্র ওহী মুবারক। তাই হযরত আবুল আছ যুন নূর আলাইহিস সালাম উনার মুক্তিপণ হিসেবে যে হার মুবারক নিয়ে আসা হয়েছিল এটা কষ্টের কারণ ছিল না। তাছাড়া উক্ত হার মুবারক মুক্তিপণ হিসেবে গ্রহণও করা হয়নি। বরং উনাকে বিনা মুক্তিপণে মুক্তি দেয়া হয়েছে। সুবহানাল্লাহ! অতঃপর হিজরী ষষ্ঠ সনে হুদাইবিয়ার সন্ধির পাঁচ মাস পূর্বে তিনি প্রকাশ্যে সম্মানিত দ্বীন ইসলাম গ্রহণ করার বিষয়টি পবিত্র মক্কা শরীফ অধিবাসীদের নিকট প্রকাশ করেন এবং পবিত্র মদীনা শরীফে হিজরত মুবারক করেন। সুবহানাল্লাহ!

মূর্খ চর্মনাই আরো যে বলেছে, গউছুল আ’যম হযরত বড় পীর ছাহেব রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেছেন, “মৃত্যুর পরে মাফ পাওয়ার আগ পর্যন্ত নিজেকে নিজে শুয়রের চেয়ে ভালো মনে করা যাবে না।” নাউযুবিল্লাহ! চর্মনাইর এই বক্তব্যটিও সর্ম্পূণ মিথ্যা ও মনগড়া। নির্ভরযোগ্য কোন জীবনীগ্রন্থে গউছুল আ’যম হযরত বড় পীর ছাহেব রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার থেকে এরূপ কোন বক্তব্য উল্লেখ নেই। আর উক্ত বক্তব্য প্রকারান্তরে পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদেরও খিলাফ বা বিরোধী।

অতএব, চর্মনাইয়ের কথিত পীরের উক্ত শরীয়তবিরোধী কুফরী বক্তব্য থেকে বেঁচে নিজেদের ঈমান-আক্বীদা হিফাযত করা সকলের জন্য অপরিহার্য কর্তব্য। সম্মানিত শরঈ ফায়ছালা হচ্ছে, চর্মনাইয়ের কথিত পীর ফয়জুল করিমকেও তার কুফরী বক্তব্য থেকে খালিছ তওবা করতে হবে। অন্যথায় শরঈ হুকুম মুতাবেক সে তার বক্তব্য অনুযায়ী মুরতাদ হয়ে গিয়েছে। আর মুরতাদের সর্ম্পকে শরঈ হুকুম হলো তওবার জন্য ৩ দিন সময় দেয়া, যদি তওবা করে ভালো। অন্যথায় শরঈ শাস্তি হলো মৃত্যুদণ্ড। এবং মৃত্যুদণ্ডের পর তার উপর মুরতাদের পরিপূর্ণ হুকুম জারী করতে হবে। আর এ অবস্থায় মারা গেলে অর্থাৎ তওবা ব্যতিত মারা গেলে শরঈ ফায়ছালা হলো চির জাহান্নামী হবে। কাজেই সে যদি মুসলমান হয়ে থাকে ও দাবী করে তাহলে তার জন্য তওবা করা ফরয। অন্যথায় সে শরঈ হুকুম মুতাবেক মুরতাদ হিসেবে গণ্য হবে।

 

মুহম্মদ আব্দুল্লাহ

লাখাই, হবিগঞ্জ

 

সুওয়াল: আমাদের এলাকার এক বক্তার ওয়াজের ভিডিও শুনেছি সে বলেছে, মুফাসসিরীনে কিরাম পরিষ্কারভাবে লিখে দিয়েছে, মহাপবিত্র কুরআন শরীফ অথবা মহাপবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে যদি দেখ মহান আল্লাহ পাক উনাকে নূর বলা হয়েছে তখন বুঝে নিও তার অর্থ হলো হিদায়েতের মালিক। আর যদি মহাপবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে অথবা মহাপবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র হাবীব নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে নূর বলা হয় তখন অর্থ হবে হিদায়েতের মাধ্যম। আর যদি বলা হয়, মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র হাবীব নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি নিজেই নূর তা শিরিক।

এ বিষয়ে সঠিক  জাওয়াব আরজি করছি।

জাওয়াব: বক্তার উক্ত বক্তব্য সম্পূর্ণরূপে মিথ্যা, মনগড়া, জালিয়াতীপূর্ণ, বিভ্রান্তিকর, গোমরাহীমূলক ও কাট্টা কুফরীর অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। সে তার নিজের বক্তব্যকে হযরত মুফাসসিরীনে কিরামের বক্তব্য বলে চালিয়ে দিয়েছে। এই শ্রেণীর কাফের অর্থাৎ উলামায়ে ছুদের কোন বিষয়ই গ্রহনযোগ্য নয়। নাউযুবিল্লাহ!

সে বহু সংখ্যক নয় মাত্র একজন অনুসরণীয় মুফাসসিরের কথা বলুক, যিনি মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র হাবীব, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে নূর বলা বা বিশ্বাস করাকে শিরক বলেছেন।

একইভাবে অনুসরণীয় কোন মুফাসসির উনার লিখিত তাফসীরের কিতাবে নূর দ্বারা মহান আল্লাহ উনাকে হিদায়েতের মালিক আর মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র হাবীব নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে হিদায়েতের মাধ্যম বলেছেন সেটা সে উল্লেখ করুক। সৃষ্টির নিকৃষ্ট ও দাজ্জালে কাযযাব তথা চরম মিথ্যাবাদী উক্ত বক্তার পক্ষে তা উল্লেখ করা সম্ভব হয়নি এবং ক্বিয়ামত পর্যন্তও তা সম্ভব হবে না।

জানা আবশ্যক মহাপবিত্র আয়াত শরীফ ও মহাপবিত্র ছহীহ হাদীছ শরীফ দ্বারা প্রমাণিত যে, মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র হাবীব, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি পবিত্র নূর মুবারক উনার সৃষ্টি। সেজন্য উনাকে নূরে মুজাসসাম বলা হয় অর্থাৎ তিনি আপাদমস্তক নূর।

যেমন খ্বলিক মালিক রব মহান আল্লাহ পাক, মহাসম্মানিত সূরা মায়িদা শরীফ উনার ১৫ নং মহাপবিত্র আয়াত শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক করেন-

قَدْ جَآءَكُمْ مِّنَ اللهِ نُـوْرٌ

অর্থ: “নিশ্চয় তোমাদের নিকট মহান আল্লাহ পাক উনার তরফ থেকে ‘ মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র নূর’ এসেছেন।”

অত্র মহাপবিত্র আয়াত শরীফ উনার মধ্যে মহান আল্লাহ পাক “মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র নূর” শব্দ মুবারক দ্বারা মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র হাবীব, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকেই বুঝিয়েছেন, যেহেতু তিনি আপাদমস্তক “নূর বা নূর মুবারক উনার সৃষ্টি।

উক্ত মহাপবিত্র আয়াত শরীফ উনার ব্যাখ্যায় ক্বাজিউল কুজাত হযরত ইমাম আবূ সউদ মুহম্মদ ইবনে মুহম্মদ ইমাদী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার প্রসিদ্ধ তাফসীর গ্রন্থ “তাফসীরে আবী সউদ”-এর ৩য় খণ্ড ১৮ পৃষ্ঠায় লিখেন-

(قَ(قَدْ جَآءَكُمْ مِّنَ اللهِ نُـوْرٌ.) … اَلْـمُرَادُ بِالنُّـوْرِ هُوَ الرَّسُوْلُ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ

অর্থ: বর্ণিত মহাপবিত্র আয়াত শরীফ উনার মধ্যে মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র নূর মুবারক দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছেন- “মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র হাবীব, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালাম।”

এছাড়া মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র হাবীব, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি স্বয়ং নিজেই নিজেকে মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র নূর মুবারক উনার সৃষ্টি বলে উল্লেখ করেছেন। যেমন, মহাপবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত হয়েছে-

عَنْ حَضْرَتْ جَابِرٍ رَضِىَ اللهُ تَـعَالٰى عَنْهُ قَالَ قُـلْتُ يَا رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِاَبِـىْ اَنْتَ وَاُمِّىْ اَخْبِـرْنِـىْ عَنْ اَوَّلِ شَىْءٍ خَلَقَ اللهُ تَـعَالٰى قَـبْلَ الْاَشْيَاءِ قَالَ يَا جَابِرُ اِنَّ اللهَ تَـعَالٰى قَدْ خَلَقَ قَـبْلَ الْاَشْيَاءِ نُـوْرَ نَبِيِّكَ

অর্থ: “হযরত জাবির রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি বললাম, ইয়া রসূলাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য কুরবান হোক, আমাকে জানিয়ে দিন যে, মহান আল্লাহ পাক তিনি সর্বপ্রথম কোন জিনিস সৃষ্টি করেছেন? তিনি বললেন, হে জাবির রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু! নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ পাক তিনি সবকিছুর পূর্বে আপনার যিনি মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র নূর মুবারক সৃষ্টি করেছেন।” (মুসনাদে আব্দির রয্যাক, দালায়িলুন নুবুওওয়াত, মাদারিজুন নুবুওওয়াত ইত্যাদি।)

মহান আল্লাহ পাক তিনি কুল-মাখলূক্বাত সৃষ্টির পূর্বে সর্বপ্রথম যেই মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র নূর মুবারক সৃষ্টি করেন সেই মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র নূর মুবারকই হচ্ছেন মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র হাবীব, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র অজূদ পাক। এবং সেই মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র অজূদ পাক হতে কুল-মাখলূক্বাত সৃষ্টি হয়েছে। সুবহানাল্লাহ!

এ বিষয়ে যামানার তাজদীদী মুখপত্র মাসিক আল বাইয়্যিনাত শরীফ উনার অনেকগুলো সংখ্যায় বিস্তারিত আলোচনা এসেছে। বিশেষ করে এ বিষয়ে ৬০তম সংখ্যা থেকে ৮২তম সংখ্যা পর্যন্ত ২৪১ খানা দলীল-প্রমাণ সাপেক্ষে বিস্তারিত ফতওয়া প্রকাশ করা হয়েছে। উক্ত ফতওয়ার মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে যে,্ একমাত্র হযরত আবুল বাশার আদম ছফিউল্লাহ আলাইহিস সালাম তিনি ব্যতীত আর কেউই মাটি হতে সৃষ্টি নন চাই তিনি মহাসম্মানিত হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনারা হোন কিংবা সাধারণ মানুষ হোন। মূলতঃ মহাপবিত্র কুরআনুল কারীম উনার মধ্যে মানুষ মাটির সৃষ্টি বলে যত মহাপবিত্র আয়াত শরীফ ইরশাদ মুবারক হয়েছে তা দ্বারা শুধুমাত্র হযরত আবুল বাশার ছফিউল্লাহ আলাইহিস সালাম উনাকে বুঝানো হয়েছে। অন্য কেউই নন। যা সমস্ত তাফসীরের কিতাবেই উল্লেখ রয়েছে। যেমন মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

إِذْ قَالَ رَبُّكَ لِلْمَلَآئِكَةِ إِنِّي خَالِقٌ بَشَرًا مِّنْ طِيْنٍ

অর্থ: “যখন আপনার সম্মানিত রব মহান আল্লাহ পাক তিনি হযরত ফেরেশতা আলাইহিমুস সালাম উনাদেরকে বললেন, আমি মানুষ সৃষ্টি করবো মাটি দ্বারা।” (পবিত্র সূরা ছোয়াদ শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ৭১)

অত্র মহাপবিত্র আয়াত শরীফ উনার ব্যাখ্যায় “তাফসীরে সামারকান্দী”-এর ৩য় খণ্ড, ১৪১ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে-

إِنِّـيْ خَالِقٌ بَشَرًا مِّنْ طِيْنٍ) يَعْنِىْ حَضْرَتْ اٰدَمُ عَلَيْهِ السَّلَامُ

অর্থ: “(নিশ্চয়ই আমি বাশার তথা মানুষ সৃষ্টি করবো মাটি থেকে) অর্থাৎ হযরত আবুল বাশার আদম আলাইহিস সালাম উনাকে।”

আরো উল্লেখ্য, হযরত আবুল  বাশার আলাইহিস সালাম তিনি ব্যতীত আর কেউই মাটির দ্বারা সৃষ্টি নন সেটা মহাপবিত্র  কুরআনুল কারীম উনার মধ্যে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়েছে।

যেমন ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

وَبَدَأَ خَلْقَ الْإِنْسَانِ مِنْ طِيْنٍ .‏ ثُمَّ جَعَلَ نَسْلَهٗ مِنْ سُلَالَةٍ مِّنْ مَّاءٍ مَّهِيْنٍ

অর্থ: এবং তিনি (মহান আল্লাহ পাক) মানুষ সৃষ্টির সূচনা করেন মাটি থেকে অতঃপর উনার বংশ বিস্তার করেন স্বচ্ছ বা পবিত্র পানির নির্যাস থেকে। (পবিত্র সূরা সাজদাহ শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ৭, ৮)

উক্ত মহাপবিত্র আয়াতে কারীমা উনার মধ্যে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে যে, শুধুমাত্র হযরত আবুল বাশার আলাইহিস সালাম উনাকে মাটি থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আর উনার যারা আল-আওলাদ অর্থাৎ বংশধর উনাদেরকে বিস্তার করা হয়েছে বা হয়ে থাকে স্বচ্ছ বা পবিত্র পানির নির্যাস থেকে অর্থাৎ সেই স্বচ্ছ বা পবিত্র পানির নির্যাস থেকে মহান আল্লাহ পাক তিনি প্রত্যেক মানুষের দেহ বা আকৃতি কুদরতীভাবে মায়ের রেহেম শরীফে গঠন করে থাকেন। সুবহানাল্লাহ!

যেমন এ প্রসঙ্গে মহাপবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

هُوَ الَّذِيْ يُصَوِّرُكُمْ فِـي الْأَرْحَامِ كَيْفَ يَشَآءُ

অর্থ: তিনি মহান আল্লাহ পাক যিনি মায়ের রেহেমসমূহে তোমাদের আকৃতি গঠন করে থাকেন যেরূপ ইচ্ছা করেন। সুবহানাল্লাহ! (পবিত্র সূরা আলে ইমরান শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ৬)

প্রতিভাত হলো যে, হযরত আবুল বাশার আলাইহিস সালাম তিনি ব্যতীত অন্য কাউকে মাটির সৃষ্টি বলাটা মহাপবিত্র কুরআন শরীফ ও মহাপবিত্র সুন্নাহ শরীফ উনাদের বিরোধী বক্তব্য যা কুফরী।

মোটকথা, সকল মুসলমানকে এ আক্বীদাই রাখতে হবে যে, মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র হাবীব, নুরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র নূর মুবারক উনার সৃষ্টি। এর বিপরীত যাবতীয় আক্বীদা, বক্তব্য, লিখনী সম্পূর্ণরূপে মিথ্যা, মনগড়া, বিভ্রান্তিকর, গোমরাহীমূলক ও কাট্টা কুফরীর অন্তর্ভুক্ত।

মূলত যারা উলামায়ে সূ, সে নামধারী মুফতী হোক, মুহাদ্দিছ হোক, মুফাসসির হোক, ওয়ায়িজ হোক তার কোন ফতওয়া, বক্তব্য, ব্যাখ্যা, ওয়াজ গ্রহণযোগ্য ও আমলযোগ্য নয়। কারণ উলামায়ে সূরা জাহান্নামী। উলামায়ে সূ’দেরকে মহাপবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে কুকুরের সাদৃশ্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আর মহাপবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে দাজ্জালে কাযযাব তথা চরম মিথ্যাবাদী দাজ্জাল, সৃষ্টির নিকৃষ্ট বলে উল্লেখ করা হয়েছে। নাউযুবিল্লাহ!

মহাপবিত্র দ্বীন ইসলাম উনার মধ্যে ছবি তোলা হারাম, বেপর্দা হওয়া হারাম, যে ছবি তোলে এবং যে বেপর্দা হয় উভয়ে জাহান্নামী।

কাজেই, যে বক্তা ছবি তোলে, ওয়াজ ভিডিও করে, বেপর্দা হয়, সে জাহান্নামী। এককথায় আলিম পরিচয় দিয়ে যারা হারাম বা শরীয়তবিরোধী কাজ করে তারাই উলামায়ে সূ’র অন্তর্ভুক্ত। এরা সৃষ্টির নিকৃষ্ট, দাজ্জালে কাযযাব এবং জাহান্নামী। এদের ওয়াজ শোনা, এদের পিছনে নামায পড়া, এদেরকে অনুসরণ করা সম্পূর্ণ হারাম। এদের থেকে দূরে থাকা সম্মানিত শরীয়ত উনার নির্দেশ। অন্যথায় এদেরকে যারা অনুসরণ করবে তারাও জাহান্নামী হয়ে যাবে। নাউযুবিল্লাহ!

 

মুহম্মদ মুস্তাকীমুর রহমান

জয়পুরহাট

 

সুওয়াল: অনেকে বলে থাকে যে, হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার পিতা ছিল মূর্তিপূজক আযর। এ বক্তব্য কতটুকু ঠিক? দলীলসহ জানিয়ে বাধিত করবেন।

জাওয়াব: হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনারা প্রত্যেকেই খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক উনার তরফ থেকে এরূপভাবে মনোনীত যে, উনাদের কারো পিতা-মাতা আলাইহিমাস সালাম উনারা কেউই কাফির কিংবা মুশরিক ছিলেন না। বরং উনাদের মধ্যে অনেকে নবী ও রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন আর যাঁরা নবী ও রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না উনারা ঈমানদার তো অবশ্যই উপরন্তু উনারা ছিলেন উনাদের যুগে মহান আল্লাহ পাক উনার মনোনীত বান্দা ও বান্দী এবং মাহবূব উনাদের অন্তর্ভুক্ত। এটাই হচ্ছে পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র হাদীছ শরীফ, পবিত্র ইজমা ও ক্বিয়াস উনাদের মত এবং আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াত উনাদের মত। এ মতের বিপরীত মত, অর্থ, ব্যাখ্যা, বক্তব্য, লিখনী সবই কুফরীর অন্তর্ভুক্ত।

প্রকৃতপক্ষে খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক উনার নবী ও রসূল হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার পিতা ছিলেন হযরত তারাহ আলাইহিস সালাম, যিনি পরিপূর্ণ দ্বীনদার, পরহেযগার, খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক উনার মত ও পথের পরিপূর্ণ অনুসারী একজন খালিছ ঈমানদার। সর্বোপরি তিনি ছিলেন খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক উনার রুবূবিয়াত প্রকাশের মহানতম ওসীলা। কেননা সমগ্র মাখলূক্বাত বা কায়িনাত সৃষ্টির যিনি মূল উৎস সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র নূরুল কুদরত অর্থাৎ মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র ‘নূর’ মুবারক উনার একজন মহান ধারক-বাহক।

হযরত আদম ছফীউল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার থেকে শুরু করে যে সকল মনোনীত ও সম্মানিত পুরুষ-মহিলা আলাইহিমুস সালাম ও আলাইহিন্নাস সালাম উনাদের মাধ্যমে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র নূরুল কুদরত অর্থাৎ মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র ‘নূর’ মুবারক আবূ রসূলিল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আব্দুল্লাহ যবীহুল্লাহ আলাইহিস সালাম এবং উম্মু রসূলিল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আমিনা আলাইহাস সালাম উনাদের পর্যন্ত পৌঁছেছেন উনারা সকলেই ছিলেন সর্বকালের সর্বযুগের শ্রেষ্ঠতম পবিত্রতম সুমহান ব্যক্তিত্ব। সুবহানাল্লাহ! উনাদের মধ্যে কেউই কাফির, মুশরিক বা বেদ্বীন ইত্যাদি ছিলেননা। উনারা সকলেই ছিলেন খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক উনার মনোনীত সন্তুষ্টিপ্রাপ্ত খাছ বান্দা-বান্দি উনাদের অন্তর্ভুক্ত। সুবহানাল্লাহ!

মূলত যারা হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার সম্মানিত পিতা বা পরিবারকে মূর্তিপূজক হিসেবে অভিহিত করে থাকে তারা পবিত্র হাদীছ শরীফ ও পবিত্র তাফসীর শরীফ সম্পর্কে নেহায়েত অজ্ঞ ও জাহিল হওয়ার কারণেই করে থাকে। এছাড়া তারা মহান আল্লাহ পাক উনার মনোনীত নবী ও রসূল হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার মহানতম ও পবিত্রতম শান, মান, মর্যাদা, মর্তবা সম্পর্কে এবং উনার সুমহান পরিচয় সম্পর্কে চরম অজ্ঞ ও গ- মূর্খ হওয়ার কারণে এবং পবিত্র সূরা আনআম শরীফ উনার ৭৪ নং পবিত্র আয়াত শরীফ উনার মধ্যে ব্যবহৃত لِاَبِيْهِ اٰزَرَ  উনার মূল ও সঠিক অর্থ যা পবিত্র হাদীছ শরীফ ও পবিত্র তাফসীর শরীফ উনাদের মধ্যে বর্ণিত রয়েছে তা গ্রহণ না করে তার বিপরীতে শুধুমাত্র আভিধানিক বা শাব্দিক অর্থের উপর ভিত্তি করে অর্থ ও ব্যাখ্যা গ্রহণ করার কারণেই করে থাকে। যা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়।

যেমন পবিত্র সূরা আনআম শরীফ: ৭৪ নং পবিত্র আয়াত শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

وَاِذْ قَالَ اِبْـرَاهِيْمُ لِاَبِيْهِ اٰزَرَ اَتَـتَّخِذُ اَصْنَامًا اٰلِـهَةً

অর্থ : “আর যখন হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম তিনি স্বীয় চাচা আযরকে বললেন, আপনি কি মূর্তিকে ইলাহ (মা’বুদ) হিসেবে গ্রহণ করছেন?”

এ পবিত্র আয়াত শরীফ উনার ব্যাখ্যায় হযরত ইমাম-মুজতাহিদ ও আউলিয়ায়ে কিরামগণ উনাদের সর্বসম্মত মত হচ্ছে, এখানে اَبِيْهِ শব্দ মুবারক উনার প্রকৃত অর্থ হচ্ছে ‘আযর’ হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম উনার চাচা। অর্থাৎ উদ্ধৃত পবিত্র আয়াত শরীফ উনার মধ্যে اَبٌ (আবুন) শব্দ মুবারক উনার অর্থ পিতা না হয়ে উনার অর্থ হবে চাচা। কারণ, পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার অনেক স্থানেই اَبٌ (আবুন) শব্দটি পিতা ব্যতীত অন্য অর্থেও ব্যবহৃত হয়েছে।

যেমন মহান আল্লাহ পাক তিনি উনার কালাম পাক উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক করেন-

اَمْ كُنْـتُمْ شُهَدَآءَ اِذْ حَضَرَ يَعْقُوْبَ الْمَوْتُ اِذْ قَالَ لِبَنِيْهِ مَا تَـعْبُدُوْنَ مِنْ بَعْدِيْ قَالُوْا نَـعْبُدُ اِلٰـهَكَ وَاِلٰـهَ اٰبَائِكَ إِبْـرَاهِيْمَ وَاِسْـمَاعِيْلَ وَاِسْحَاقَ إِلٰـهًا وَّاحِدًا

অর্থ : “তোমরা কি উপস্থিত ছিলে? যখন হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম উনার বিছাল শরীফ গ্রহণের সময় উপস্থিত হলো তখন তিনি উনার সন্তানগণ উনাদেরকে বললেন, ‘আপনারা আমার পর কার ইবাদত করবেন? উনারা উত্তরে বললেন, ‘আমরা আপনার যিনি রব তায়ালা উনার এবং আপনার পূর্ব পিতা (আপনার দাদা) হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম উনার এবং (আপনার চাচা) হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালাম উনার এবং (আপনার বাবা) হযরত ইসহাক আলাইহিস সালাম উনার একক রব খালিক্ব মালিক মহান আল্লাহ পাক উনার ইবাদত করবো।” (পবিত্র সূরা বাক্বারা শরীফ : পবিত্র আয়াত শরীফ ১৩৩)

উক্ত পবিত্র আয়াত শরীফ উনার মধ্যে اَبٌ (আবুন) দ্বারা দাদা, চাচা ও বাবা সকলকে বুঝানো হয়েছে। যেমন, এ সম্পর্কে বিশ্বখ্যাত তাফসীরগ্রন্থ ‘তাফসীরে মাযহারী’ উনার ৩য় খণ্ডের ২৫৬ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে-

وَكَانَ اٰزَرُ عَلَى الصَّحِيْحِ عَمًّا لِّاِبْـرَاهِيْمَ عَلَيْهِ السَّلَامُ وَالْعَرَبُ يُطْلِقُوْنَ الْاَبَ عَلَى الْعَمِّ كَمَا فِـىْ قَـوْلِهٖ تَعَالٰى نَـعْبُدُ اِلٰـهَكَ وَاِلٰهَ اٰبَآئِكَ اِبْـرَاهِيْمَ وَاِسْـمَاعِيْلَ وَاِسْحَاقَ اِلٰـهَا وَّاحِدًا

অর্থ : “বিশুদ্ধ মতে, আযর ছিলো হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম উনার চাচা। আর আরবরা চাচাকেও اَبٌ (আবুন) শব্দ দ্বারা অভিহিত করে থাকে।” যেমন মহান আল্লাহ পাক তিনি বলেন, আমরা আপনার প্রতিপালক ও আপনার পূর্বপিতা হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম, হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালাম ও হযরত ইসহাক্ব আলাইহিস সালাম উনাদের একক প্রতিপালক মহান আল্লাহ পাক উনার ইবাদত করবো।”

সুতরাং, পবিত্র সূরা আনআম শরীফ উনার ৭৪নং আয়াত শরীফে اَبِيْهِ اٰزَرَ এর অর্থ হলো আযর হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম উনার চাচা। উনার পিতা নন।

এ সম্পর্কে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে এসেছে-

عَنْ حَضْرَتْ اِبْنِ عَبَّاسِ رَضِىَ اللهُ تَـعَالٰى عَنْهُ اَنَّ اَبَا اِبْـرَاهِيْمَ عَلَيْهِ السَّلَامُ لَـمْ يَكُنْ اِسْـمُه اٰزَرَ وَاِنَّـمَا كَانَ اِسْـمُهٗ تَارَحٌ عَلَيْهِ السَّلَامُ

অর্থ : “রঈসুল মুফাসসিরীন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বর্ণনা করেন, নিশ্চয়ই হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম উনার পিতার নাম আযর নয়। বরং উনার পিতার নাম মুবারক হলো হযরত তারাহ আলাইহিস সালাম।” (ইবনে আবি হাতিম শরীফ, ইবনে কাছীর শরীফ- ৩/২৪৮)

এ সম্পর্কে তাফসীরে কবীর শরীফ ১৩/৩৮ পৃষ্ঠায় আরো উল্লেখ রয়েছে-

اِنَّ وَالِدَ اِبْـرَاهِيْمَ عَلَيْهِ السَّلَامُ كَانَ تَارَحٌ عَلَيْهِ السَّلَامُ وَاٰزَرُ كَانَ عَمًّا لَّه وَالْعَمُّ قَدْ يُطْلَقُ عَلَيْهِ اِسْمُ الْاَبِ

অর্থ : “নিশ্চয়ই হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম উনার সম্মানিত পিতা ছিলেন হযরত তারাহ আলাইহিস সালাম। আর আযর ছিলো উনার চাচা। এবং আম্মুন (চাচা) শব্দটি কখনও ‘ইসমুল আব’ অর্থাৎ পিতা নামে ব্যবহৃত হয়।”

মূলতঃ হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম তিনিসহ সকল হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালামগণ উনাদের পিতা-মাতা বা পূর্বপুরুষ ছিলেন পরিপূর্ণ ঈমানদার, খালিছ মু’মিন। কেউই কাফির ছিলেন না।

এ সম্পর্কে কিতাবে বর্ণিত রয়েছে-

اِنَّ اٰبَاءَ الْاَنْبِيَاءِ مَاكَانُـوْا كُفَّارًا وَّيَدُلُّ عَلَيْهِ وُجُوْهٌ مِّنْهَا قَـوْلُهٗ وَتَـقَلُّبَكَ فِـى السَّاجِدِيْنَ

অর্থ : “নিশ্চয়ই সকল হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের পিতা বা পূর্বপুরুষ উনারা কেউই কাফির ছিলেননা। তার দলীল হচ্ছে, খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক উনার এ কালাম শরীফ-

وَتَـقَلُّبَكَ فِى السّٰجِدِيْنَ

অর্থাৎ : “তিনি আপনাকে (আমার হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম!) সিজদাকারীগণ উনাদের মধ্যে স্থানান্তরিত করেছেন।” (পবিত্র সূরা শুয়ারা শরীফ ২১৯, তাফসীরে কবীর- ১৩/৩৮)

প্রকাশ থাকে যে, মহান আল্লাহ পাক উনার জলীলুল ক্বদর নবী ও রসূল হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম তিনি হচ্ছেন সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পূর্বপুরুষ।

এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

مِلَّةَ أَبِيْكُمْ إِبْـرَاهِيْمَ ۚ هُوَ سَـمَّاكُمُ الْمُسْلِمِيْنَ

অর্থাৎ- “তোমরা তোমাদের পিতৃপুরুষ হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম উনার পবিত্র দ্বীন উনার উপর কায়িম থাক। তিনি তোমাদের নাম রেখেছেন মুসলমান।” (পবিত্র সূরা হজ্জ শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ৭৮)

কাজেই, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি যাঁদের মাধ্যমে যমীনে তাশরীফ এনেছেন অর্থাৎ হযরত আদম ছফীউল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার থেকে শুরু করে আবূ রসূলিল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত যবীহুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার পর্যন্ত উনারা সকলেই ছিলেন সিজদাকারী। অর্থাৎ সকলেই নামায-কালাম, যিকির-আযকার, ইবাদত-বন্দিগীতে মশগুল ছিলেন। উনারা সকলেই পূর্ণ পরহেযগার, মুত্তাক্বী ও দ্বীনদার ছিলেন।

এ সম্পর্কে তাফসীরে কবীর ১৩ যিলদ ৩৮ পৃষ্ঠা উনার মধ্যে আরো বর্ণিত রয়েছে-

فَالْاٰيَةُ دَالَّةٌ عَلٰى اَنَّ جَـمِيْعَ اٰبَاءِ مُـحَمَّدٍ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانُـوْا مُسْلِمِيْنَ وَحِيْـنَئِذٍ يـَجِبُ الْقَطْعُ بِاَنَّ وَالِدَ اِبْـرَاهِيْمَ عَلَيْهِ السَّلَامُ كَانَ مُسْلِمًا

অর্থ : “উপরোক্ত পবিত্র আয়াত শরীফ উনার দ্বারা এটাই ছাবিত বা প্রমাণিত যে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পূর্বপুরুষ উনারা সকলেই পূর্ণ মুসলমান ছিলেন। এ থেকে অকাট্যভাবে প্রমাণিত বা সাব্যস্ত যে, নিশ্চয়ই হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম উনার পিতা মুসলমান ছিলেন।” (তাফসীরে কবীর শরীফ- ১৩/৩৮)

পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

لَـمْ اَزَلْ اَنْـقُلُ مِنْ اَصْلَابِ الطَّاهِرِيْنَ اِلٰى اَرْحَامِ الطَّاهِرَاتِ

অর্থ : “আমি সর্বদা পূত-পবিত্র মহিলা ও পুরুষ উনাদের মাধ্যমেই স্থানান্তরিত হয়েছি।” সুবহানাল্লাহ! (তাফসীরে কবীর- ১৩/৩৯)

তিনি আরো ইরশাদ মুবারক করেন-

لَـمْ يَلْتَقِ اَبَوَاىَ قَطُّ عَلٰى سِفَاحٍ

অর্থ : “আমার পিতা-মাতা (পূর্বপুরুষ) কেউই কখনও কোন অন্যায় বা অশ্লীল কাজে জড়িত হননি।” (কানযুল উম্মাল শরীফ, ইবনে আসাকীর, বারাহিনে  কাতিয়াহ)

পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে আরো বর্ণিত হয়েছে, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

بُعِثْتُ مِنْ خَيْرِ قُـرُوْنِ بَنـِىْ اٰدَمَ قَـرْنًا فَقَرْنًا حَتّٰـى بُعِثْتُ مِنَ الْقَرْنِ الَّذِىْ كُنْتُ فِيْهِ

অর্থ : “আমি হযরত আদম আলাইহিস সালাম উনার সন্তানগণ উনাদের মধ্যে সর্বোত্তম সম্প্রদায়ের মধ্যেই সর্বদা প্রেরিত হয়েছি। এমনকি আমি যে (কুরাইশ) সম্প্রদায়ের মধ্যে ছিলাম সেটিই ছিলো সর্বোত্তম সম্প্রদায়।” সুবহানাল্লাহ! (বুখারী শরীফ, তাফসীরে মাযহারী শরীফ ৪র্থ খণ্ড ৩০৮ পৃষ্ঠা)

উক্ত পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার ব্যাখ্যায় কিতাবে বর্ণিত হয়েছে-

فَلَا يـُمْكِنُ اَنْ يَّكُوْنَ كَافِرًا فِـىْ سِلْسِلَةِ اٰبَائِهٖ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ

অর্থ : “নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পিতা (পূর্ব পুরুষ) উনাদের সিলসিলার মধ্যে কেউই কাফির হওয়া সম্ভব নয়।” (তাফসীরে মাযহারী ৪র্থ খণ্ড ৩০৮ পৃষ্ঠা)

এ সম্পর্কে তাফসীরে কবীর- ১৩ খণ্ড ৩৯ পৃষ্ঠায় আরো বর্ণিত হয়েছে-

اِنَّ اَحَدًا مِّنْ اَجْدَادِهٖ مَا كَانَ مِنَ الْـمُشْرِكِيْنَ

অর্থ : “নিশ্চয়ই নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বাপ-দাদাগণ উনারা কেউই মুশরিক ছিলেননা।”

উপরোক্ত দলীলভিত্তিক সংক্ষিপ্ত আলোচনা দ্বারাই সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, মহান আল্লাহ পাক উনার সম্মানিত নবী ও রসূল হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার পিতা ছিলেন হাক্বীক্বী পরহেযগার, মুত্তাক্বী, পরিপূর্ণ ঈমানদার ও মুসলমান। উনার নাম মুবারক হচ্ছেন হযরত তারাহ আলাইহিস সালাম। আর আযর নামক ব্যক্তি ছিল উনার চাচা। আরো প্রমাণিত হয়েছে যে, পূর্ববর্তী সকল হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের পূর্বপুরুষগণ এবং সর্বোপরি সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পূর্বপুরুষগণ হযরত আদম ছফিউল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার থেকে শুরু করে আবূ রসূলিল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত যবীহুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার পর্যন্ত সকলেই ছিলেন পূত-পবিত্র চরিত্র মুবারক উনার অধিকারী, পূর্ণ দ্বীনদার ও পরিপূর্ণ মুসলমান।

অতএব, যে ব্যক্তি খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক উনার সম্মানিত নবী ও রসূল হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার সম্মানিত পিতা ও পরিবার সম্পর্কে কুফরীমূলক আক্বীদা রাখবে ও বক্তব্য-লিখনী প্রকাশ করবে পবিত্র ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী তার উপরে মুরতাদের হুকুম বর্তাবে। অর্থাৎ সে ইসলাম বা মুসলমান থেকে খারিজ হয়ে যাবে। পবিত্র ইসলামী খিলাফত থাকলে তাকে তিনদিন সময় দেয়া হতো তওবা করার জন্য। তিনদিনের মধ্যে তওবা না করলে তার শাস্তি হতো মৃত্যুদণ্ড। সে মারা গেলে তার জানাযা পড়া জায়িয হবে না। তাকে মুসলমানদের কবরস্থানে দাফন করাও যাবে না; বরং তাকে মৃত কুকুর-শৃগালের মত মাটিতে পুঁতে রাখতে হবে। তার জীবনের সমস্ত নেক আমল বাতিল হয়ে যাবে। বিয়ে করে থাকলে তার স্ত্রী তালাক হয়ে যাবে এবং সে হজ্জ করে থাকলে তা বাতিল হয়ে যাবে। সে ওয়ারিছসত্ব থেকেও বঞ্চিত হবে।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হলে মাসিক আল বাইয়্যিনাত শরীফ ২৪০তম সংখ্যা পাঠ করুন।

 

মুহম্মদ আবুল হায়াত

পলাশ, নূরানীবাদ

সুওয়াল: আমাদের এলাকায় এক মালানা বলে যে, নবীজী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি যে মাটির তৈরি তা কুরআন শরীফে আছে। কাজেই উনাকে মাটির তৈরি অস্বীকার করলে কুরআন শরীফই অস্বীকার করা হয়।

এখন আমার জানার বিষয় হলো, সত্যিই কি কুরআন শরীফে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে মাটির তৈরী বলা হয়েছে? জানিয়ে বাধিত করবেন।

জাওয়াব: পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে কোথাও নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে মাটির তৈরী বা মাটির সৃষ্টি বলা হয়নি। এটা শুধু আপনাদের এলাকার একজন মালানা কেন সারা পৃথিবীর সকল মালানাও যদি একত্রিত হয় তবুও পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে তারা বের করতে বা প্রমাণ করতে পারবে না যে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি মাটির সৃষ্টি। বরং পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে যে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি হচ্ছেন নূর অর্থাৎ মহাসম্মানিত নূর মুবারক উনার সৃষ্টি। যেমন পবিত্র সূরা মায়িদা শরীফ উনার ১৫নং পবিত্র আয়াত শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

قَدْ جَآءَكُمْ مِّنَ اللهِ نُـوْرٌ وَّكِتَابٌ مُّبِيْـنٌ

অর্থ: অবশ্যই তোমাদের নিকট তাশরীফ মুবারক এনেছেন মহান আল্লাহ পাক উনার পক্ষ থেকে একজন মহাসম্মানিত নূর অর্থাৎ নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি এবং এক সুস্পষ্ট কিতাব পবিত্র কুরআন শরীফ। সুবহানাল্লাহ!

কাজেই, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি হচ্ছেন মহাসম্মানিত নূর মুবারক উনার সৃষ্টি। এটাই সত্য, সঠিক ও দলীলসম্মত বক্তব্য ও আক্বীদা।

এ বিষয়ে যামানার তাজদীদী মুখপত্র মাসিক আল বাইয়্যিনাত শরীফ উনার একাধিক সংখ্যায় বিস্তারিত আলোচনা এসেছে। বিশেষ করে এ বিষয়ে ৬০তম সংখ্যা থেকে ৮২তম সংখ্যা পর্যন্ত বিস্তারিত ফতওয়া প্রকাশ করা হয়েছে। উক্ত ফতওয়ার মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে যে,্ একমাত্র হযরত আবুল বাশার আদম আলাইহিস সালাম তিনি ব্যতীত আর কেউই মাটি হতে সৃষ্টি নন। চাই তিনি হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনারা হোন কিংবা সাধারণ মানুষ হোন। মূলতঃ পবিত্র কুরআনুল কারীম উনার মধ্যে মানুষ মাটির তৈরি বলে যত পবিত্র আয়াত শরীফ ইরশাদ মুবারক হয়েছে তা দ্বারা শুধুমাত্র হযরত আবুল বাশার আলাইহিস সালাম উনাকে বুঝানো হয়েছে। অন্য কেউ নন। যা সমস্ত তাফসীরের কিতাবেই উল্লেখ রয়েছে। যেমন মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

اِذْ قَالَ رَبُّكَ لِلْمَلَآئِكَةِ إِنِّيْ خَالِقٌ بَشَرًا مِّنْ طِيْنٍ

অর্থ: “যখন আপনার পালনকর্তা মহান আল্লাহ পাক তিনি হযরত ফেরেশতা আলাইহিমুস সালাম উনাদেরকে বললেন, আমি মানুষ সৃষ্টি করবো মাটি দ্বারা।” (পবিত্র সূরা ছোয়াদ শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ৭১)

উক্ত পবিত্র আয়াত শরীফ উনার ব্যাখ্যায় “তাফসীরে সামারকান্দী”-এর ৩য় খণ্ড, ১৪১ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে-

إِنِّيْ(اِنِّـىْ خَالِقٌ بَشَرًا مِّنْ طِيْنٍ) يَعْنِـىْ حَضْرَتْ اٰدَمُ عَلَيْهِ السَّلَامُ

অর্থ: “(নিশ্চয়ই আমি সৃষ্টি করবো বাশার মাটি থেকে) অর্থাৎ হযরত আদম আলাইহিস সালাম উনাকে।”

আরো উল্লেখ্য, হযরত আবুল বাশার আলাইহিস সালাম তিনি ব্যতীত আর কেউই মাটির দ্বারা সৃষ্টি বা তৈরি নন সেটা স্পষ্টভাবে পবিত্র কুরআনুল কারীম উনার মধ্যে ঘোষণা করা হয়েছে।

ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

وَبَدَاَ خَلْقَ الْاِنْسَانِ مِنْ طِيْنٍ ثُـمَّ جَعَلَ نَسْلَهٗ مِنْ سُلٰلَةٍ مِّنْ مَّآءٍ مَّهِيْنٍ

অর্থ: এবং তিনি অর্থাৎ মহান আল্লাহ পাক তিনি মানুষ সৃষ্টির সূচনা করেন মাটি থেকে অতঃপর উনার বংশ বিস্তার করেন স্বচ্ছ বা পবিত্র পানির নির্যাস থেকে। সুবহানাল্লাহ! (পবিত্র সূরা সাজদাহ শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ৭, ৮)

এ পবিত্র আয়াতে কারীমা উনার মধ্যে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে যে, শুধুমাত্র হযরত আবুল বাশার আলাইহিস সালাম উনাকে মাটি থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আর উনার যারা আল আওলাদ অর্থাৎ বংশধর উনাদেরকে বিস্তার করা হয়েছে বা হয়ে থাকে স্বচ্ছ বা পবিত্র পানির নির্যাস থেকে। অর্থাৎ সেই স্বচ্ছ বা পবিত্র পানির নির্যাস থেকে মহান আল্লাহ পাক তিনি প্রত্যেক মানুষের দেহ বা আকৃতি কুদরতীভাবে মায়ের রেহেম শরীফে গঠন করে থাকেন। সুবহানাল্লাহ!

যেমন পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

هُوَ الَّذِيْ يُصَوِّرُكُمْ فِي الْأَرْحَامِ كَيْفَ يَشَآءُ

অর্থ: তিনি মহান আল্লাহ পাক যিনি মায়ের রেহেমসমূহে তোমাদের আকৃতি গঠন করে থাকেন যেরূপ ইচ্ছা করেন। সুবহানাল্লাহ! (পবিত্র সূরা আলে ইমরান শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ৬)

প্রতিভাত হলো যে, হযরত আবুল বাশার আলাইহিস সালাম তিনি ব্যতীত অন্য কাউকে মাটির সৃষ্টি বলাটাই পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র সুন্নাহ শরীফ বিরোধী বক্তব্য যা কুফরী। আর যিনি হযরত আবুল বাশার আলাইহিস সালাম তিনি ব্যতিত সমস্ত হযরত নবী ও রসূল আলাইহিমুস সালাম উনারা কুদরতময় সৃষ্টি। এছাড়া সমস্ত জিন-ইনসানও কুদরতময় সৃষ্টি। আর সমস্ত সৃষ্টি-কায়িনাতের যিনি মহাসম্মানিত মহাপবিত্র নবী ও রসূল নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনিই তো সর্বপ্রথম সৃষ্টি মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র নূর মুবারক উনার কুদরতময় সৃষ্টি উনার রহস্য তো সম্পূর্ণই আলাদা। সুবহানাল্লাহ! তাহলে উনাকে মাটির সৃষ্টি বলাটা কত মারাত্মক কুফরী তা বলার অপেক্ষা রাখে না। মহাসম্মানিত হাবীব নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার যারা দুশমন কেবল তারা ব্যতীত আর কেউই উক্ত কুফরী আক্বীদা পোষণ করতে পারে না।

মুহম্মদ মুশাররফ হুসাইন

সিঙ্গাপুর

সুওয়াল: আপনারা সম্মানিত মীলাদ শরীফ পাঠকালে ছলাত শরীফ বলার সময় নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নাম মুবারক না বলে লক্বব মুবারক যথা রসূলিল্লাহ ও হাবীবিল্লাহ বলে থাকেন। আর অন্য যারা মীলাদ শরীফ পড়েন উনারা সরাসরি নাম মুবারক বলেন।

আবার সালাম পেশ করার সময় আপনারা আসসালামু আলাইকুম ইয়া রসূলাল্লাহ, আসসালামু আলাইকুম ইয়া নাবিয়্যাল্লাহ, আসসালামু আলাইকুম ইয়া হাবীবাল্লাহ বলেন। আর অন্যরা ইয়া নাবী সালামু আলাইকা, ইয়া রসূল সালামু আলাইকা, ইয়া হাবীব সালামু আলাইকা বলে থাকেন।

সম্মানিত মীলাদ শরীফ পাঠের উক্ত দুই নিয়মের মধ্যে কোন নিয়মটি উত্তম? দলীলসহ জানিয়ে বাধিত করবেন।

জাওয়াব: রাজারবাগ শরীফ উনার যিনি সম্মানিত মুর্শিদ ক্বিবলা আলাইহিস সালাম তিনি হচ্ছেন বর্তমান যামানার লক্ষ্যস্থল ওলীআল্লাহ এবং শ্রেষ্ঠ ইমাম ও সুমহান মুজাদ্দিদ। কাজেই উনার প্রদত্ব ফতওয়া, মাসয়ালা ও আমল মুবারকই সম্মানিত সুন্নত মুয়াফিক, দলীলসমৃদ্ধ, সর্বাধিক আদবপূর্ণ ও উত্তম। কাজেই, তিনি যেসব আমল করেন এবং যেভাবে করেন সেটাকেই অনুসরণ করতে হবে।

উল্লেখ্য, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি হচ্ছেন আখিরী নবী ও রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। উনার আনুষ্ঠানিক সম্মানিত নুবুওওয়াতী ও সম্মানিত রিসালাতী শান মুবারক প্রকাশের পর অতীতের সম্মানিত হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের প্রতি ওহী মুবারক দ্বারা নাযিলকৃত দ্বীনসমূহেরও হুকুম রহিত হয়ে গেছে। ফলে, আখিরী উম্মতের জন্য উক্ত দ্বীনসমূহের হুকুম অনুসরণ করা বা মান্য করা নিষিদ্ধ হয়ে গেছে। তবে অতীতের সম্মানিত হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের দ্বীনসমূহের যেসমস্ত হুকুম সম্মানিত দ্বীন ইসলাম উনার মধ্যেও বলবৎ রয়েছে বা একই রকম রয়েছে তা যথার্থভাবেই অনুসরণ ও পালন করতে হবে। আর তা নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে অনুসরণ করেই পালন করতে হবে। তিনি যেভাবে পালন করেছেন বা যেভাবে পালন করতে বলেছেন, তিনি যা করতে বলেছেন এবং যা করতে নিষেধ করেছেন, হুবহু অনুসরণ করতে হবে।

অতঃপর উনার বিছালী শান মুবারক প্রকাশের পর উনার সম্মানিত হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদেরকে অনুসরণ করতে হবে। কেননা নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার স্থলাভিষিক্ত খলীফা বা প্রতিনিধি হচ্ছেন খাছভাবে হযরত খুলাফায়ে রাশিদীন আলাইহিমুস সালাম উনারা। উনাদেরকে অনুসরণ করার ব্যাপারে স্বয়ং নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

عَلَيْكُمْ بِسُنَّتِـىْ وَسُنَّةِ الْـخُلَفَاءِ الرَّاشِدِيْنَ الْـمَهْدِيِّيـْنَ تَـمَسَّكُوْا بِـهَا وَعَضُّوْا عَلَيْهَا بِالنَّـوَاجِذِ

অর্থ: আমার সুন্নত এবং সর্বাধিক সঠিকপথপ্রাপ্ত হযরত খুলাফায়ে রাশিদীন আলাইহিমুস সালাম উনাদের সুন্নত পালন করা তোমাদের জন্য ফরয ওয়াজিব। উক্ত সুন্নতসমূহ তোমরা মাড়ির দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরার মতো শক্ত করে আঁকড়ে থাকবে। (মুসনাদে আহমদ শরীফ, আবূ দাউদ শরীফ, তিরমিযী শরীফ, ইবনে মাজাহ শরীফ, মিশকাত শরীফ)

আর আমভাবে সকল হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ উনারা। উনাদেরকে অনুসরণ করার ব্যাপারে স্বয়ং নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

أَصْحَابـِىْ كُلُّهُمْ كَالنُّجُوْمِ فَبِاَيِّهِمْ اِقْـتَدَيْـتُمْ اِهْتَدَيْـتُمْ

অর্থ: আমার সম্মানিত ছাহাবীগণ উনারা প্রত্যেকে আসমানের নক্ষত্রসমূহের মতো। উনাদের যে কাউকে তোমরা অনুসরণ করবে, হিদায়েত লাভ করবে। সুবহানাল্লাহ! (মিশকাত শরীফ)

অতঃপর হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদের পর নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার খাছ খলীফা বা প্রতিনিধি হচ্ছেন যামানার সুমহান মুজাদ্দিদ আলাইহিমুস সালাম উনারা। আর আম প্রতিনিধি হচ্ছেন সকল উলামায়ে হক্কানী-রব্বানী, আউলিয়ায়ে কিরামগণ উনারা। যেমন খাছ খলীফা বা প্রতিনিধি উনাদের সম্পর্কে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত রয়েছে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

اِنَّ اللهَ يَبْعَثُ لِـهٰذِ الْاُمَّةِ عَلٰى رَأْسِ كُلِّ مِأَةِ سَنَةٍ مَنْ يـُّجَدِّدُ لَـهَا دِيْنَهَا

অর্থ: নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ পাক তিনি এই উম্মতের (হিদায়েতের) জন্য প্রত্যেক হিজরী শতকের মাথায় এমন একজন সুমহান ব্যক্তি উনাকে প্রেরণ করবেন যিনি সম্মানিত দ্বীন ইসলাম উনার তাজদীদ করবেন। অর্থাৎ তিনিই হচ্ছেন যামানার সুমহান মুজাদ্দিদ। (আবূ দাউদ শরীফ, মিশকাত শরীফ)

পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে অন্যত্র বর্ণিত হয়েছে-

مَنْ لَّـمْ يَعْرِفْ اِمَامَ زَمَانِهٖ فَـقَدْ مَاتَ مَيْـتَةَ الْـجَاهِلِيَّةِ

অর্থ: যে ব্যক্তি যামানার যিনি সম্মানিত ইমাম উনাকে চিনলো না, সে

জাহিলী যুগের মৃতদের ন্যায় মৃত্যুবরণ করবে। অর্থাৎ তার মৃত্যু হিদায়েতের উপর হবে না। নাউযুবিল্লাহ! (মুসলিম শরীফ)

আর আম প্রতিনিধি উনাদের সম্পর্কে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

اِنَّ الْعُلَمَاءَ وَرَثَةُ الأَنْبِيَاءِ

অর্থ: নিশ্চয়ই আলিমগণ (হক্কানী-রব্বানী) হচ্ছেন হযরত আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম উনাদের ওয়ারিছ বা উত্তরাধিকারী। (মিশকাত শরীফ)

কাজেই, পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র হাদীছ শরীফ নিজে পড়ে পড়ে আমল করলে, তা কখনই শুদ্ধ দহবে না। যদি হতো তাহলে হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের আগমনের প্রয়োজন ছিল না। মহান আল্লাহ পাক তিনি সরাসরি কিতাব নাযিল করে দিতে পারতেন। কিন্তু তা করেননি। বরং কিতাব বা হুকুম-আহকাম নাযিল করার আগেই হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদেরকে পাঠিয়েছেন। অতঃপর আখিরী নবী ও রসূল, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিছালী শান মুবারক প্রকাশের পর হযরত খুলাফায়ে রাশিদীন আলাইহিমুস সালাম এবং হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদেরকে অতঃপর উনাদের পর পর্যায়ক্রমে হযরত তাবিয়ীনে কিরাম, হযরত তাবে তাবিয়ীনে কিরাম, ইমাম-মুজতাহিদ আউলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনাদেরকে অনুসরণ অনুকরণ করতে হবে।

স্মরণীয় যে, হযরত তাবিয়ীনে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম  উনাদের যামানা বা যুগ থেকেই হযরত মুজাদ্দিদ আলাইহিমুস সালাম উনাদের আগমনের ধারা শুরু। যিনি প্রথম মুজাদ্দিদ তিনি হচ্ছেন হানাফী মাযহাবের যিনি সম্মানিত ইমাম, যিনি ইমামে আ’যম হিসেবে সারাবিশ্বে মশহূর। তিনি সম্মানিত তাবিয়ী ছিলেন। সুবহানাল্লাহ! উনার সময়কাল হচ্ছে দ্বিতীয় শতাব্দী। আর বর্তমান সময়কাল হচ্ছে পঞ্চদশ শতাব্দী। এ শতাব্দীকালে সুমহান মুজাদ্দিদ হচ্ছেন পবিত্র রাজারবাগ শরীফ উনার সম্মানিত মুর্শিদ ক্বিবলা আলাইহিস সালাম তিনি। যিনি সম্মানিত আহলে বাইত ও আওলাদে রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার অন্তর্ভুক্ত। সুবহানাল্লাহ!

কাজেই, হাল যামানার যিনি সম্মানিত মুজাদ্দিদ তিনি বিগত সম্মানিত মুজাদ্দিদ আলাইহিমুস সালাম উনাদের বিলায়েত ও মুজাদ্দিদিয়াত উনার সত্যায়নকারী এবং তিনি সমসাময়িক সকল হক্কানী-রব্বানী আলিম এবং আউলিয়ায়ে কিরাম উনাদের মধ্যে সম্মানিত দ্বীন ইসলাম তথা পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যাখ্যাদানকারী।

উল্লেখ্য, সাধারণত মুজাদ্দিদে আ’যম সাইয়্যিদুনা ইমাম রাজারবাগ শরীফ উনার সম্মানিত মুর্শিদ ক্বিবলা আলাইহিস সালাম উনার কোন ফতওয়া, কোন মাসয়ালা, কোন তাজদীদ, কোন আমল মুবারক অতীতের কোন সম্মানিত মুজাদ্দিদ আলাইহিমুস সালাম উনাদের ফতওয়া, মাসয়ালা, আমল বা তাজদীদ মুবারক উনার ব্যতিক্রম হওয়ার কথা নয়। তবে সম্মানিত মাযহাব ভেদে ব্যতিক্রম হতে পারে। কিন্তু একই মাযহাব হওয়া সত্ত্বে ব্যতিক্রম হলে বুঝতে হবে অতীতের সম্মানিত মুজাদ্দিদ আলাইহিমুস সালাম উনাদের ফতওয়া, মাসয়ালা, আমল ও তাজদীদ মুবারকসমূহের চূড়ান্ত বা পূর্ণাঙ্গরূপ হচ্ছে বর্তমান যামানার সম্মানিত মুজাদ্দিদে আ’যম আলাইহিস সালাম উনার ফতওয়া, মাসয়ালা, তাজদীদ ও আমল মুবারকসমূহ। সুবহানাল্লাহ!

উদাহরণস্বরূপ হানাফী মাযহাবের অতীতের অনেক সম্মানিত ইমাম ও মুজতাহিদ উনারা ফতওয়া দিয়েছেন যে, মহিলাদের জন্য মসজিদে গিয়ে জামায়াতে নামায পড়া মাকরূহ তাহরীমী।

কিন্তু মুজাদ্দিদে আ’যম সাইয়্যিদুনা ইমামুল উমাম ইমাম রাজারবাগ শরীফ উনার সম্মানিত মুর্শিদ ক্বিবলা আলাইহিস সালাম তিনি উক্ত ফতওয়ার চূড়ান্ত রূপ প্রকাশ করে ফতওয়া প্রকাশ করেছেন যে, মহিলাদের জন্য মসজিদে গিয়ে জামায়াতে নামায পড়া মাকরূহ তাজরীমী; এটা হচ্ছে আম ফতওয়া। কিন্তু খাছ বা মূল ফতওয়া হচ্ছে, মহিলাদের জন্য মসজিদে গিয়ে জামায়াতে নামায পড়া কুফরী। কেননা, মহিলারা মসজিদে গিয়ে জামায়াতে নামায পড়ার  দ্বারা হযরত উম্মুল মু’মিনীন আছছালিছাহ ছিদ্দীক্বাহ আলাইহাস সালাম উনার সম্মানিত মতকে অমান্য করা হয়। অমান্য করা হয় হযরত খুলাফায়ে রাশিদীন আলাইহিমুস সালাম উনাদের দ্বিতীয় ব্যক্তিত্ব আমীরুল মু’মিনীন হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম উনার আদেশ মুবারককে এবং অনুসরণীয় হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদের ইজমায়ে আযীমতকে, যা প্রকাশ্য কুফরীর অন্তর্ভুক্ত।

তদ্রূপ আলোচ্য পবিত্র মীলাদ শরীফ পড়ার মাসয়ালার ক্ষেত্রেও তাই।

প্রকাশ থাকে যে, সম্মানিত মীলাদ শরীফ পাঠ করা হয় সাইয়্যিদুল আম্বিয়া ওয়াল মুরসালীন, ইমামুল আম্বিয়া ওয়াল মুরসালীন, রহমাতুল্লিল আলামীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সুমহান শান-শুয়ূনাত মুবারক বর্ণনা করা, ছানা-ছিফত মুবারক বর্ণনা করা, খিদমত মুবারক উনার আঞ্জাম দেয়া ইত্যাদির উদ্দেশ্যে।

যেমন এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ পাক তিনি আদেশ মুবারক করেন-

وَتُـعَزِّرُوْهُ وَتُـوَقِّرُوْهُ وَتُسَبِّحُوْهُ بُكْرَةً وَّأَصِيْلًا

অর্থাৎ নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার খিদমত মুবারক করো, তা’যীম-তাকরীম বা সম্মান মুবারক করো এবং সকাল-সন্ধ্যা তথা সদাসর্বদা উনার ছানা-ছিফত মুবারক বর্ণনা করো। (পবিত্র সূরা ফাত্হ শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ নং ৯)

কাজেই, সম্মানিত মীলাদ শরীফ পাঠকালে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ছানা-ছিফত মুবারক বর্ণনার উদ্দেশ্যে বসা অবস্থায় ছলাত শরীফ পাঠ করা হয়। উক্ত ছলাত শরীফ স্বয়ং যিনি খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক তিনি নিজেই উনার সকল হযরত ফেরেশতা আলাইহিমুস সালাম উনাদেরকে নিয়ে অনবরত পাঠ করেন। সুবহানাল্লাহ! এবং তিনি আমাদেরকেও পাঠ করার জন্য আদেশ মুবারক করেন। অতঃপর উক্ত ছলাত শরীফ পাঠ করার পাশাপাশি তিনি আমাদেরকে যথাযথ সম্মানে সালাম মুবারক পেশ করার জন্যও আদেশ মুবারক করেন। যার কারণে দাঁড়িয়ে সালাম দেয়া হয় বা পেশ করা হয়। সুবাহনাল্লাহ!

যেমন এ প্রসঙ্গে পবিত্র আয়াত শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

اِنَّ اللهَ وَمَلَآئِكَتَهٗ يُصَلُّوْنَ عَلَى النَّبِيِّ ۚ يَاۤ أَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُـوْا صَلُّوْا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوْا تَسْلِيْمًا

অর্থ: নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ পাক তিনি এবং উনার ফেরেশতা আলাইহিমুস সালাম উনারা নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সুমহান শান মুবারকে ছলাত শরীফ পেশ করেন। হে ঈমানদারগণ! নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সুমহান শান মুবারকে আপনারাও ছলাত শরীফ পেশ করুন এবং উনার সুমহান শান মুবারকে যথাযথ সম্মানে সালাম মুবারক পেশ করুন। (পবিত্র সূরা আহযাব শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ নং ৫৬)

স্মরণীয় যে, কুল-মাখলূক্বাতের সম্মানিত নবী ও রসূল, সাইয়্যিদুল আম্বিয়া ওয়াল মুরসালীন, ইমামুল আম্বিয়া ওয়াল মুরসালীন, রহমাতুল্লিল আলামীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাথে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি বিষয়ে আদব ও সম্মান বজায় রাখা উম্মতের জন্য ফরয। এটা মহান আল্লাহ পাক উনারই নির্দেশ মুবারক।

যেমন এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

لَا تَجْعَلُوْا دُعَآءَ الرَّسُوْلِ بَـيْـنَكُمْ كَدُعَآءِ بَعْضِكُمْ بَعْضًا

অর্থ: তোমরা পরস্পর পরস্পরকে যেভাবে সম্বোধন করে থাকো সেভাবে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে সম্বোধন করো না। (পবিত্র সূরা নূর শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ নং ৬৩)

অর্থাৎ মানুষেরা একজন আরেকজনকে যেভাবে সম্বোধন করে থাকে বা ডেকে থাকে হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদেরকে সর্বোপরি নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে সেভাবে সম্বোধন করা জায়িয নেই।

কাজেই, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সম্মানিত নাম মুবারক লেখা, বলা বা উচ্চারণ করার ক্ষেত্রে আদব ও সম্মান রক্ষা করার বিষয় রয়েছে। যদি উনার সম্মানিত নাম মুবারক লেখা, বলা বা উচ্চারণের ক্ষেত্রে আদব ও সম্মানের ত্রুটি বা খিলাফ হয়ে যায় তাহলে সেটা কুফরী হবে এবং ঈমান নষ্টের কারণ হবে। নাউযুবিল্লাহ!

নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক  ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সম্মানিত নাম মুবারক লেখা, বলা বা উচ্চারণ করার ক্ষেত্রে আদব হলো, যেখানে উনার সম্মানিত নাম মুবারক না লিখে, না বলে বা উচ্চারণ না করে কেবল উনার সম্মানিত লক্বব মুবারক লিখা, বলা বা উচ্চারণ করাই যথেষ্ট হয় সেক্ষেত্রে উনার সম্মানিত লক্বব মুবারক লেখা, বলাই বা উচ্চারণ করাই আদব।

এক্ষেত্রে উল্লেখ্য, যেই পবিত্র আয়াত শরীফ উনার দ্বারা সম্মানিত ছলাত শরীফ পাঠের আদেশ মুবারক দেয়া হয়েছে, উক্ত পবিত্র আয়াত শরীফ উনার মধ্যেই নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সম্মানিত নাম মুবারক উল্লেখ না করে সম্মানিত লক্বব মুবারক উল্লেখ করা হয়েছে। সুবহানাল্লাহ!

অতএব, মুজাদ্দিদে আ’যম সাইয়্যিদুনা ইমামুল উমাম ইমাম রাজারবাগ শরীফ উনার সম্মানিত মুর্শিদ ক্বিবলা আলাইহিস সালাম তিনি উক্ত পবিত্র আয়াত শরীফ উনার আলোকে পবিত্র মীলাদ শরীফ পাঠকালে ছলাত শরীফ পড়ার সময় নাম মুবারক না বলে লক্বব মুবারক উচ্চারণ করার অনবদ্য তাজদীদ মুবারক প্রকাশ করেন। সুবহানাল্লাহ!

উনার প্রকাশিত তাজদীদ মুবারক হচ্ছেন-

اَللّٰهُمَّ صَلِّ عَلٰى سَيِّدِنَا مَوْلَانَا رَسُوْلِ اللهِ (صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ)

وَعَلٰى اٰلِ سَيِّدِنَا مَوْلَانَا حَبِيْبِ اللهِ (صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ)

“আল্লাহুম্মা ছল্লি ‘আলা সাইয়্যিদিনা মাওলানা রসূলিল্লাহ (ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)। ওয়া ‘আলা আলি সাইয়্যিদিনা মাওলানা হাবীবিল্লাহ (ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)”

অর্থাৎ সম্মানিত নাম মুবারক উনার স্থানে প্রথমে রসূলিল্লাহ এবং পরে হাবীবিল্লাহ সম্মানিত লক্বব মুবারক দুখানা উল্লেখ করেছেন।

আরো উল্লেখ্য, পবিত্র কুরআন শরীফ হচ্ছেন ওহীয়ে মাতলূ’ অর্থাৎ হুবহু তিলাওয়াত করতে হয়, আর পবিত্র হাদীছ শরীফ যদিও ওহী কিন্তু তা ওহীয়ে গইরে মাতলূ’ হওয়ার কারণে হুবহু তিলাওয়াত বা পাঠ করতে হয় না। কাজেই, পবিত্র কুরআন শরীফ উনার তিলাওয়াতের ক্ষেত্রে যেখানে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সম্মানিত নাম মুবারক উল্লেখ রয়েছে সেখানে নাম মুবারক বলা বা উচ্চারণ করা সম্মানিত শরীয়ত উনার মুবারক নির্দেশ। এছাড়া সম্মানিত আযান, ইক্বামত ও নামায উনার মধ্যে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সম্মানিত নাম মুবারক উচ্চারণ করতে হয় এবং পবিত্র কালিমা শরীফ, পবিত্র খুতবাহ শরীফ এরূপ কতক নির্দিষ্ট স্থান ব্যতীত বাকী অন্যান্য সমস্ত ক্ষেত্রে সম্মানিত লক্বব মুবারক উচ্চারণ করাটাই সম্মান ও আদবের অন্তর্ভুক্ত।

এক্ষেত্রে একটা উল্লেখযোগ্য কারণ হচ্ছে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নিকট কায়িনাতের সবকিছুই দৃশ্যমান অর্থাৎ তিনি দেখে থাকেন। যেমন এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

اِنَّۤا اَرْسَلْنَاكَ شَاهِدًا

অর্থ: নিশ্চয়ই আমি আপনাকে (আমার হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাক্ষ্যদানকারী বা প্রত্যক্ষকারী হিসেবে প্রেরণ করেছি। (পবিত্র সূরা ফাতহ শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ৮)

পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

اِنَّ اللهَ قَدْ رَفَعَ لِـى الدُّنْـيَا فَأَنَا اَنْظُرْ إِلَيْهَا وَإِلَـى مَا هُوَ كَائِنٌ فِيْهَا اِلٰـى يَـوْمِ الْقِيَامَةِ كَاَنَّـمَا اَنْظَرُ اِلٰـى كَفِّىْ هٰذِهٖ

অর্থ: “নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ পাক তিনি পৃথিবীকে আমার সামনে এরূপভাবে রেখেছেন যে, আমি এ সমগ্র পৃথিবীকে এবং ক্বিয়ামত পর্যন্ত তার মধ্যে যা কিছু সৃজিত বা সংঘটিত হবে তদসমূহকে ওইরূপভাবে দেখি যেরূপ আমার হাত মুবারকের তালু মুবারক দেখে থাকি।” সুবহানাল্লাহ! (তবারানী শরীফ)

অর্থাৎ নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি কোনকিছু দেখার জন্য, জানার জন্য বা শোনার জন্য কোথাও যাওয়ার মোটেই প্রয়োজন নেই। পবিত্র রওজা শরীফ উনার মধ্যে অবস্থান মুবারক করেই সারা কায়িনাতের সমস্ত সংবাদ নিতে পারেন ও নিয়েও থাকেন। এটা উনার সম্মানিত ইলিম ও সম্মানিত মু’জিযা শরীফ উনার অন্তর্ভুক্ত। যেরূপ খ্বলিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক তিনি সম্মানিত ইলিম ও সম্মানিত কুদরত মুবারকের মাধ্যমে সারা কায়িনাতের সমস্ত সংবাদ জেনে থাকেন ও নিয়ে থাকেন।

তাহলে আমরা যা করছি, যা পড়ছি তা যদি উপস্থিত ব্যক্তির মতো নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি দেখেন তাহলে উনার নাম মুবারক কি করে উচ্চারণ করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে উনার লক্বব মুবারক উচ্চারণ করা ব্যতীত কোন উপায় আছে কি? পিতার উপস্থিতিতে কোন সন্তান পিতার নাম উচ্চারণ করে না। যদি তাই হয় তাহলে যিনি সমস্ত পিতারও সম্মানিত পিতা, সমস্ত কায়িনাতের যিনি সম্মানিত পিতা উনার উপস্থিতিতে কিভাবে উনার নাম মুবারক উচ্চারণ করা যাবে? উনার সম্মানিত নাম মুবারক উচ্চারণ করলে আদব হবে কি, না চরম বেয়াদবী হবে? আর উনার সুমহান শানে বেয়াদবী হলে ঈমান থাকবে কি? কখনই ঈমান থাকবে না।

মোটকথা, যেসব স্থানে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি উনার সম্মানিত নাম মুবারক উচ্চারণ করেছেন কেবল সেসব স্থানেই উনার সম্মানিত নাম মুবারক উচ্চারণ করা যাবে বা করতে হবে আর অন্যসব স্থানে উনার সম্মানিত লক্বব মুবারক উচ্চারণ করতে হবে। এমনকি সম্মানিত নাম মুবারক উনার অর্থ ও ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে সম্মানিত নাম মুবারক লেখা বা বলার কোনই প্রয়োজন নেই। সেক্ষেত্রে লক্বব মুবারক লেখা বা বলাই যথেষ্ট এবং সম্মান ও আদবের অন্তর্ভুক্ত।

বলার অপেক্ষা রাখে না, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সুমহান পরিচয় মুবারক এবং বুলন্দ শান মুবারক প্রকাশের জন্য যথাক্রমে

اَلنَّبِـىُّ (صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ

বা

نَبـِىُّ اللهِ

 (صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ) رَسُوْلُ اللهِ (صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ)

حَبِيْبُ اللهِ (صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ)

উক্ত সম্মানিত লক্বব মুবারকত্রয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

যার কারণে পবিত্র মীলাদ শরীফ উনার মধ্যে উক্ত সম্মানিত তিনখানা লক্বব মুবারক উল্লেখ করা হয়েছে।

সম্মানিত نَبِـىُّ اللهِ লক্বব মুবারক হতে অতি খাছ লক্বব মুবারক হচ্ছেন সম্মানিত رَسُوْلُ اللهِ লক্বব মুবারক। আর حَبِيْبُ اللهِ লক্বব মুবারক হচ্ছেন সর্বাধিক খাছ লক্বব মুবারক। উক্ত সম্মানিত হাবীবুল্লাহ লক্বব মুবারকখানি হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের মধ্যে শুধুমাত্র নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকেই হাদিয়া মুবারক করা হয়েছে। সুবহানাল্লাহ!

আর তাই পবিত্র ছলাত শরীফ পাঠ করার সময় ‘আলা শব্দ মুবারক উনার পর যথাক্রমে রসূলিল্লাহ এবং হাবীবিল্লাহ লক্বব মুবারকদ্বয় উল্লেখ করা হয়েছে। আর পবিত্র সালাম মুবারক পেশ করার সময় ইয়া শব্দ মুবারক উনার পর যথাক্রমে রসূলাল্লাহ, নাবিয়্যাল্লাহ ও হাবীবাল্লাহ লক্বব মুবারকত্রয় উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি “রসূলুল্লাহ” লক্বব মুবারক উনার ব্যবহার সবচেয়ে বেশি ও ব্যাপক হওয়ায় ছলাত শরীফ ও সালাম মুবারক উভয় স্থানে প্রথমেই উক্ত রসূলুল্লাহ লক্বব মুবারক উল্লেখ করা হয়েছে।

আর সালাম মুবারক পেশ করার যে নিয়ম ও আদব তা হচ্ছে, প্রথমেই اَلسَّلَامُ عَلَيْكُمْ (আসসালামু ‘আলাইকুম) বাক্য মুবারক বলতে হবে। তারপর সম্বোধনসূচক বাক্য মুবারক উল্লেখ করতে হবে। সেটাই পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার দ্বারা প্রতিভাত। এমন বর্ণনা বুখারী শরীফ, মুসলিম শরীফ, মুয়াত্তা মালিক শরীফ, বায়হাক্বী শরীফ, মিশকাত শরীফ ইত্যাদি পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার কিতাবসমূহে উল্লেখ রয়েছে।

বর্ণিত রয়েছে, মহান আল্লাহ পাক তিনি আবুল বাশার হযরত আদম ছফিউল্লাহ আলাইহিস সালাম উনাকে সৃষ্টি করে হযরত ফেরেশতা আলাইহিমুস সালাম উনাদের একটি দলের নিকট গিয়ে সালাম দেয়ার জন্য বললেন এবং আরো বলে পাঠালেন যে, আপনার সালামের জাওয়াবে উনারা কি বলেন তা শ্রবণ করুন। কেননা সেটাই হবে আপনার এবং আপনার সন্তানদের সালাম। তখন তিনি গিয়ে “আসসালামু আলাইকুম” বলে সালাম প্রদান করলেন। (বুখারী শরীফ, মুসলিম শরীফ,  মিশকাত শরীফ)

কাজেই, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে সালাম পেশ করার ক্ষেত্রেও অবশ্যই সর্বোচ্চ আদব বজায়ে পেশ করতে হবে।

اَلسَّلَامُ عَلَيْكَ না বলে  اَلسَّلَامُ عَلَيْكُمْ বলে সালাম পেশ করা হলে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাথে উনার সম্মানিত আহলু বাইত শরীফ আলাইহিমুস সালাম উনাদেরকেও সালাম পেশ করা হয়। তাছাড়া অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তি একক হওয়া সত্বে উনার জন্য বহুবচন ক্রিয়া বা সর্বনাম ব্যবহার করা হয় সুমহান সম্মান-মর্যাদা বুঝানোর জন্য। সুবহানাল্লাহ!

অতএব, নিম্নোক্ত তরতীবে সালাম মুবারক পেশ করতে হবে। যথা-

اَلسَّلَامُ عَلَيْكُمْ يَا رَسُوْلَ اللهِ

اَلسَّلَامُ عَلَيْكُمْ يَا نَبِـىَّ اللهِ

اَلسَّلَامُ عَلَيْكُمْ يَا حَبِيْبَ اللهِ

صَلَوَاتُ اللهِ عَلَيْكُمْ

স্মরণীয় যে, শুরুতেই সম্বোধন করে কাউকে সালাম দেয়া কখনোই সম্মানিত শরীয়ত ও সম্মানিত সুন্নত উনার অন্তর্ভুক্ত নয় এবং আদব মুবারক উনারও অন্তর্ভুক্ত নয়।

কেননা পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

اَلسَّلَامُ قَبْلَ الْكَلَامِ কথার আগেই সালাম পেশ করবে। (তিরমিযী শরীফ)

যার কারণে মুজাদ্দিদে আ’যম সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুল উমাম ইমাম রাজারবাগ শরীফ উনার সম্মানিত মুর্শিদ ক্বিবলা আলাইহিস সালাম তিনি পবিত্র মীলাদ শরীফ পাঠকালে সালাম পেশ করার পূর্বের নিয়ম পরিবর্তন করে বর্তমানে পঠিত নিয়ম মুবারক প্রবর্তন ও প্রচলন করেন। সুবহানাল্লাহ!

কাজেই, মুজাদ্দিদে আ’যম সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুল উমাম ইমাম রাজারবাগ শরীফ উনার সম্মানিত মুর্শিদ ক্বিবলা আলাইহিস সালাম তিনি সম্মানিত মীলাদ শরীফ পাঠ করার ক্ষেত্রে যে তাজদীদ মুবারক করেছেন সেটাই উত্তম এবং সেটাই সকলের জন্য অনুসরণীয় ও অনুকরণীয়। মহান আল্লাহ পাক তিনি সকলকে উক্ত সম্মানিত তাজদীদ মুবারক অনুযায়ী পবিত্র মীলাদ শরীফ পাঠ করার তাওফীক দান করুন। আমীন।

 

আহমদ ফাহমিদা জান্নাত

পলাশ, নূরানীবাদ

 

সুওয়াল: হযরত উম্মাহাতুল মু’মিনীন আলাইহিন্নাস সালাম উনাদের সংখ্যা নিয়ে ইখতিলাফ বা মতবিরোধ দেখা যায়। প্রকৃতপক্ষে উনারা কতজন ছিলেন? এ ব্যাপারে সঠিক তথ্য বা জাওয়াব জানালে উপকৃত হবো।

জাওয়াব: সম্মানিত দ্বীন ইসলাম উনার অনেক বিষয়ে ও অনেক মাসয়ালার ক্ষেত্রে ইখতিলাফ রয়েছে। এর বহুবিধ কারণও রয়েছে। একটি অন্যতম কারণ হচ্ছেন বর্ণনাকারী। যার কাছে যেভাবে বর্ণনা পৌঁছেছে তিনি সেভাবে বর্ণনা করেছেন। উনাদের মধ্যে কেউ কেউ কম তাহক্বীক্ব করেছেন আবার কেউ কেউ একটু বেশি তাহক্বীক্ব করেছেন, একাধিক বর্ণনার মধ্য থেকে যাছাই বাছাই করে বর্ণনা করার চেষ্টাও করেছেন। কিন্তু তারপরও সঠিক বর্ণনা উপস্থাপনের ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারেননি।

মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

وَمَاۤ أُوْتِيْـتُمْ مِّنَ الْعِلْمِ إِلَّا قَلِيْلًا

অর্থ: তোমাদের অল্প ব্যতীত ইলিম দেয়া হয়নি। (পবিত্র ইসরা শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ৮৫)

যার কারণে মানুষের বর্ণনা ও ব্যাখ্যার মধ্যে পরিপূর্ণ, চূড়ান্ত ও নির্ভুল বর্ণনা খুব অল্পই পরিলক্ষিত হয়েছে। তদ্রূপ একটি বিষয় হচ্ছে হযরত উম্মাহাতুল মু’মিনীন আলাইহিন্নাস সালাম উনাদের সংখ্যা মুবারক সংক্রান্ত বর্ণনা। বর্ণনাকারীগণ হযরত উম্মাহাতুল মু’মিনীন আলাইহিন্নাস সালাম উনাদের সর্বাধিক সংখ্যা ১৯ জন পর্যন্ত বর্ণনা করেছেন। আর সর্বনিম্ন সংখ্যা বর্ণনা করেছেন ৯ জন। তবে বিশুদ্ধ বর্ণনা মতে, হযরত উম্মাহাতুল মু’মিনীন আলাইহিন্নাস সালাম উনাদের সংখ্যা ১৩ জন।

স্মরণীয় যে, সাইয়্যিদুল আম্বিয়া ওয়াল মুরসালীন, রহমাতুল্লিল আলামীন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি যেমন মনোনীত তেমনি হযরত উম্মাহাতুল মু’মিনীন আলাইহিন্নাস সালাম উনারাও মনোনীত।

নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি যেরূপ অন্য কোনো মানুষের মতো নন তদ্রূপ হযরত উম্মাহাতুল মু’মিনীন আলাইহিন্নাস সালাম উনারাও অন্য কোনো মহিলা বা পুরুষ কারো মতো নন। উনাদের মেছাল উনারা নিজেই। যেমন এ প্রসঙ্গে খলিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক তিনি পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক করেন-

يَا نِسَآءَ النَّبِيِّ لَسْتُنَّ كَأَحَدٍ مِّنَ النِّسَآءِ

অর্থ: নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সম্মানিতা আযওয়াজে মুতহ্হারাত অর্থাৎ হযরত উম্মাহাতুল মু’মিনীন আলাইহিন্নাস সালাম! আপনারা অন্য কোনো মহিলাদের মতো নন। (পবিত্র সূরা আহযাব শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ৩২)

পবিত্র আয়াত শরীফ উনার মধ্যে আরো ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

النَّبِيُّ أَوْلٰى بِالْمُؤْمِنِيـْنَ مِنْ أَنفُسِهِمْ ۖ وَأَزْوَاجُهٗ أُمَّهَاتُـهُمْ

অর্থ: “নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি এবং হযরত উম্মাহাতুল মু’মিনীন আলাইহিন্নাস সালাম উনারা হচ্ছেন মু’মিনদের নিকট তাদের জীবনের চেয়ে অধিক প্রিয়। (আর নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি হচ্ছেন মু’মিনদের পিতা) এবং হযরত উম্মাহাতুল মু’মিনীন আলাইহিন্নাস সালাম উনারা হচ্ছেন মু’মিনদের মাতা।” (পবিত্র সূরা আহযাব শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ৬)

উক্ত পবিত্র আয়াত শরীফ উনার দ্বারা প্রতিভাত হয়েছে যে, খ্বলিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক তিনি এবং উনার হাবীব নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনারা ব্যতীত কায়িনাতবাসী সকলেরই মা হচ্ছেন হযরত উম্মাহাতুল মু’মিনীন আলাইহিন্নাস সালাম উনারা। আর মহান আল্লাহ পাক তিনি ব্যতীত এবং হযরত উম্মাহাতুল মু’মিনীন আলাইহিন্নাস সালাম উনারা ব্যতীত কায়িনাতবাসী সকলের পিতা হচ্ছেন নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি।

কাজেই, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি যেরূপ মনোনীত তদ্রূপ উনার সম্মানিতা ও পবিত্রা আযওয়াজ হযরত উম্মাহাতুল মু’মিনীন আলাইহিন্নাস সালাম উনারাও মনোনীত। ফলে উনাদের প্রকৃত সংখ্যা মুবারক কত বা উনারা কতজন সেটাও মহান আল্লাহ পাক উনার সম্মানিত ইলমি খাযীনায় এবং উনার মনোনীত হাবীব নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সম্মানিত ইলমি ভা-ারে মওজুদ রয়েছে।

জানা আবশ্যক, মহান আল্লাহ পাক উনার কাছে অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ বলতে কিছু নেই। উনার নিকট অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সব সমান। পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

إِنَّـمَا الْعِلْمُ عِنْدَ اللّٰـهِ

অর্থ: নিশ্চয়ই সমস্ত ইলিম মহান আল্লাহ পাক উনার নিকট। (পবিত্র সূরা আহক্বাফ শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ২৩)

মহান আল্লাহ পাক তিনি আবার সমস্ত প্রকার ইলিম মুবারক হাদিয়া মুবারক করেছেন উনার যিনি সম্মানিত হাবীব নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে। যেমন এ সম্পর্কে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

اُعْطِيْتُ جَوَامِعَ الْكَلِمِ

অর্থ: আমাকে সমস্ত ইলিম হাদিয়া মুবারক করা হয়েছে। (মুসলিম শরীফ, মিশকাত শরীফ)

অতএব, মহান আল্লাহ পাক উনার সাথে এবং উনার হাবীব নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাথে যিনি যতখানি বা যত বেশি মুহব্বত-মা’রিফাত, তায়াল্লুক-নিসবত হাছিল করতে সক্ষম হয়েছেন সেই অনুপাতে তিনি ততখানি বা তত বেশি ইলমে লাদুন্নী লাভ করেন। সুবহানাল্লাহ!

বলার অপেক্ষা রাখে না, সাইয়্যিদুল আউলিয়া ওয়াল মুজাদ্দিদীন, মুজাদ্দিদে আ’যম, আহলে বাইতে রসূল, নূরে মুকাররম, সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুল উমাম আলাইহিস সালাম তিনি মহান আল্লাহ পাক উনার ও উনার হাবীব নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদের গভীর মুহব্বত-মা’রিফাত, তায়াল্লুক-নিসবত উনার বদৌলতে বেমেছাল ইলমে লাদুন্নী লাভে ধন্য হয়েছেন। যার কারণে শুধু হযরত উম্মাহাতুল মু’মিনীন আলাইহিন্নাস সালাম উনাদের সংখ্যা মুবারকই নয় বরং উনারা কখন বিলাদতী শান মুবারক প্রকাশ করেছেন, উনারা কে কোন বংশের ছিলেন, উনারা কত বছর যমীনে অবস্থান মুবারক করেছেন, উনারা কে কখন নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার খিদমত মুবারকে তাশরীফ মুবারক নিয়েছেন অর্থাৎ নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাথে উনাদের কখন বা কোন তারিখ ও কোন দিনে নিসবতে আযীমাহ মুবারক সংঘটিত হয়েছে এবং উনারা কে কখন বিছালী শান মুবারক প্রকাশ করেছেন ইত্যাদি সমস্ত বিষয় পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে প্রকাশ করেছেন। সুবহানাল্লাহ!

উদাহরণ স্বরূপ সাইয়্যিদাতুন নিসা হযরত উম্মুল মু’মিনীন আছছালিছাহ আশার আলাইহাস সালাম উনার বিষয়টি পেশ করা হলো। অর্থাৎ যিনি উম্মুল মু’মিনীন হিসেবে ১৩তম বা সর্বশেষে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সুমহান খিদমত মুবারকে তাশরীফ নিয়েছেন তিনি হচ্ছেন হযরত মাইমূনা বিনতে হারিছ আলাইহাস সালাম। তিনি বনু হিলাল গোত্রের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক  ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার আনুষ্ঠানিক সম্মানিত নুবুওওয়াত-রিসালাত মুবারক প্রকাশের ৩১ বছর পূর্বে তিনি বিলাদতী শান মুবারক প্রকাশ করেন। দিনটি ছিল পবিত্র রজবুল হারাম শরীফ মাসের ৩ তারিখ ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম শরীফ (সোমবার)।

হিজরী ৭ম সনে পবিত্র যিলক্বদ শরীফ মাসের ১৬ তারিখ ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম শরীফ নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাথে যখন উনার নিসবতে আযীমাহ মুবারক সংঘটিত হয় তখন উনার বয়স মুবারক ছিল ৫০ বছর ৪ মাস ১৩ দিন। সুবহানাল্লাহ! আর তিনি ৫১ হিজরী সনে ১৯শে যিলহজ্জ শরীফ ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম শরীফ যখন বিছালী শান মুবারক গ্রহণ করেন তখন উনার বয়স মুবারক হয়েছিল ৯৪ বছর ৫ মাস ১৬ দিন। সুবহানাল্লাহ!

এমনিভাবে প্রত্যেক হযরত উম্মুল মু’মিনীন আলাইহাস সালাম উনাদের বিলাদতী শান মুবারক, বিছালী শান মুবারক, নিসবতে আযীমাহ শান মুবারকের দিন, তারিখ, বছর ইত্যাদি যাবতীয় বিষয়সমহূ সঠিকভাবে প্রকাশ করেন। সুবহানাল্লাহ! যা কায়িনাতবাসীর জন্য অমূল্য নিয়ামত।

মোট কথা, আহলে বাইতে রসূল, নূরে মুকাররম, সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুল উমাম আলাইহিস সালাম উনার উক্ত তাজদীদ মুবারকের ফলে হযরত উম্মাহাতুল মু’মিনীন আলাইহিন্নাস সালাম উনাদের সম্পর্কে সমস্ত প্রকার ইখতিলাফ বা মতবিরোধের অবসান ঘটেছে।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, কথিত রয়েছে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি যখন বিছালী শান মুবারক প্রকাশ করেন তখন নাকি ৯ জন হযরত উম্মাহাতুল মু’মিনীন আলাইহিন্নাস সালাম উনারা হায়াত মুবারকে ছিলেন। অথচ এটা সম্পূর্ণ ভুল বর্ণনা। বরং বিশুদ্ধ বর্ণনা হচ্ছে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি পবিত্র বিছালী শান মুবারক প্রকাশের পূর্বেই ৩ জন হযরত উম্মাহাতুল মু’মিনীন আলাইহিন্নাস সালাম  উনার বিছালী শান মুবারক প্রকাশ করেন। উনারা হচ্ছেন যথাক্রমে হযরত উম্মুল মু’মিনীন আল ঊলা কুবরা আলাইহাস সালাম, হযরত উম্মুল মু’মিনীন আল খ্বমিসাহ আলাইহাস সালাম এবং হযরত উম্মুল মু’মিনীন আততাসিআহ আলাইহাস সালাম।

অতএব, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিছালী শান মুবারক প্রকাশের সময় ১০ জন হযরত উম্মুল মু’মিনীন আলাইহিন্নাস সালাম উনারা যমীনে অবস্থান মুবারক করেছিলেন। এটাই সঠিক বর্ণনা হিসেবে বিশ্বাস করতে হবে। অন্যথায় এ বর্ণনার বিপরীত বলতে চাইলে তাকে স্পষ্ট করে সকল হযরত উম্মুল মু’মিনীন আলাইহিন্নাস সালাম উনাদের বিলাদতী শান মুবারক,  বিছালী শান মুবারকের দিন তারিখসহ বর্ণনা দিতে হবে। অন্যথায় তা গ্রহণযোগ্য হবে না।

মুহম্মদ শাফায়াত হুসাইন

বালুবাড়ি, দিনাজপুর

সুওয়াল: জনৈক ওহাবী মালানার বক্তব্য হচ্ছে, দিবস পালন করা জায়িয নেই। এ বক্তব্য কতটুকু শরীয়ত সম্মত?

জাওয়াব: তার উক্ত বক্তব্য সম্পূর্ণরূপে মনগড়া, মিথ্যা, দলীলবিহীন ও সম্মানিত শরীয়ত তথা সম্মানিত দ্বীন ইসলাম উনার খিলাফ বা বিরোধী। যার কারণে তা হারাম ও কুফরীর অন্তর্ভুক্ত।

যিনি খ্বলিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক তিনি দিবস পালন সম্পর্কে পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক করেন-

وَذَكِّرْهُمْ بِأَيَّامِ اللهِ إِنَّ فِيْ ذٰلِكَ لَاٰيَاتٍ لِّكُلِّ صَبَّارٍ شَكُوْرٍ

অর্থ: (সম্মানিত রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার!) আপনি উম্মতদেরকে মহান আল্লাহ পাক উনার বিশেষ দিন বা দিবসসমূহ স্মরণ করিয়ে দিন। নিশ্চয়ই উক্ত দিনসমূহ স্মরণ বা পালন করার মধ্যে ছবরকারী ও শোকরকারী সকল বান্দা-বান্দীদের জন্য নিদর্শনাবলী রয়েছে। (পবিত্র সূরা ইবরাহীম শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ৫)

স্মরণীয় যে, খ্বলিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক তিনি যে সমস্ত দিনে খাছ রহমত ও নিয়ামত মুবারক নাযিল করেন এবং যে সমস্ত দিনে ছাহিবে নিয়ামত ও রহমত উনারা বিলাদতী শান মুবারক প্রকাশ করেন, নিসবতে আযীমাহ শান মুবারক প্রকাশ করেন এবং অন্য কোন বিশেষ শান মুবারক প্রকাশ করেন উক্ত দিনসমূহ মহান আল্লাহ পাক উনার দিন তথা আইয়্যামুল্লাহ শরীফ উনার অন্তর্ভুক্ত।

অতএব, বলার অপেক্ষা রাখে না যে, যেই মহান দিনে রহমাতুল্লিল আলামীন, নিয়ামতে উযমা, সাইয়্যিদুল আম্বিয়া ওয়াল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি যমীনে তাশরীফ মুবারক আনেন উক্ত মহান দিন হচ্ছেন সর্বশ্রেষ্ঠ আইয়্যামুল্লাহ শরীফ উনার অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া উনার রগায়িবী শান মুবারক প্রকাশ দিবস, আনুষ্ঠানিক নুবুওওয়াতী ও রিসালতী শান মুবারক প্রকাশ দিবস, মি’রাজী শান মুবারক প্রকাশ দিবস, নিসবতে আযীমী শান মুবারক প্রকাশ দিবস, হিজরতী শান মুবারক প্রকাশ দিবস, বিছালী শান মুবারক প্রকাশ দিবস ইত্যাদি শান মুবারক প্রকাশিত হওয়ার মহান দিনসমূহ সর্বশ্রেষ্ঠ আইয়্যামুল্লাহ শরীফ উনার অন্তর্ভুক্ত। সুবহানাল্লাহ!

অতঃপর উনার পুতঃপবিত্র ও সম্মানিত আহলু বাইত শরীফ আলাইহিমুস সালাম উনারা যেসব মহান দিনে তাশরীফ মুবারক আনেন এবং বিছালী শান মুবারক প্রকাশ করেন এবং উনাদের নিসবতে আযীমাহ মুবারক সংঘটিত হয় এবং উনাদের অন্য বিশেষ শান মুবারক প্রকাশিত হয় উক্ত দিনসমূহও আইয়্যামুল্লাহ শরীফ উনার অন্তর্ভুক্ত। সুবহানাল্লাহ! অতঃপর পর্যায়ক্রমে হযরত আম্বিয়ায়ে কিরাম আলাইহিমুস সালাম, হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম এবং হযরত আউলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনাদের বিলাদতী শান মুবারক, বিছালী শান মুবারক, নিসবতে আযীমাহ শান মুবারক এবং অন্যান্য বিশেষ শান মুবারক প্রকাশিত হওয়ার দিনসমূহ সম্মানিত আইয়্যামুল্লাহ শরীফ উনার অন্তর্ভুক্ত। সুবহানাল্লাহ!

উল্লেখ্য, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম, ইয়াওমু আশূরা, ইয়াওমুল জুমুয়াহ, ইয়াওমু আরাফাহ, আইয়্যামু তাশরীক্ব, ইয়াওমুল ফিতর, ইয়াওমুল আদ্বহা ইত্যাদি দিনসমূহ বিশেষ আইয়্যামুল্লাহ শরীফ উনার অন্তর্ভুক্ত। অনুরূপ আউওয়ালু লাইলাতিম মির রজব, লাইলাতুর রগায়িব, লাইলাতুল মি’রাজ, লাইলাতুন নিছফি মিং শা’বান, লাইলাতুল ক্বদর, লাইলাতাল ঈদাইন, লাইলাতুল জুমুআ ইত্যাদি রাতসমূহও আইয়্যামুল্লাহ শরীফ উনার অন্তর্ভুক্ত।

মোটকথা, মহান আল্লাহ পাক উনার মনোনীত বান্দা-বান্দী উনাদের সৃষ্টি মুবারক, বিলাদতী শান মুবারক, বিছালী শান মুবারক, নিসবতে আযীমাহ মুবারকসহ অন্যান্য বিশেষ শান মুবারক প্রকাশিত হওয়ার দিন ও রাতসমূহ সম্মানিত আইয়্যামুল্লাহ শরীফ উনার অন্তর্ভুক্ত। সুবহানাল্লাহ!

উক্ত দিনসমূহ স্মরণ তথা পালন করার মধ্যে বান্দা-বান্দী উম্মতের জন্য রহমত, বরকত, নিয়ামত, নাজাত, সাকীনা, সালাম, রেযামন্দী ও কামিয়াবী হাছিলের বিষয় নিহিত রয়েছে। সুবহানাল্লাহ!

যেমন রহমাতুল্লিল আলামীন নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সুমহান বিলাদতী শান মুবারক প্রকাশ দিবস পালন করার ফযীলত সম্পর্কে মহান আল্লাহ পাক তিনি পবিত্র সূরা ইউনুস শরীফ উনার ৫৮ নং পবিত্র আয়াত শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক করেন-

هُوَ خَيْــرٌ مِّـمَّا يـَجْمَعُوْنَ

অর্থ: জিন-ইনসান তথা কায়িনাতবাসীর সমস্ত ইবাদত অপেক্ষা তা শ্রেষ্ঠ। সুবহানাল্লাহ!

এ প্রসঙ্গে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত রয়েছে-

عَنْ حَضْرَتْ اَبِى الدَّرْدَاءِ رَضِىَ اللهُ تَـعَالٰى عَنْهُ اَنَّهٗ مَرَّ مَعَ النَّبِىّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اِلٰى بَـيْتِ عَامِرِ الْاَنْصَارِىِّ رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ وَكَانَ يُعَلِّمُ وَقَائِعَ وِلَادَتِهٖ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِاَبْـنَائِهٖ وَعَشِيْـرَتِهٖ وَيَـقُوْلُ هٰذَا الْيَـوْمَ هٰذَا الْيَـوْمَ فَـقَالَ عَلَيْهِ الصَّلٰوةُ وَالسَّلامُ اِنَّ اللهَ فَــتَحَ لَكَ اَبْـوَابَ الرَّحْـمَةِ وَالْمَلَائِكَةُ كُلُّهُمْ يَسْتَغْفِرُوْنَ لَكَ مَنْ فَـعَلَ فِعْلَكَ نَـجٰى نَـجٰتَكَ

অর্থ : “হযরত আবূ দারদা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত আছে যে, একদা তিনি নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাথে হযরত আমির আনছারী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার গৃহে উপস্থিত হয়ে দেখতে পেলেন যে, তিনি উনার সন্তান-সন্ততি এবং আত্মীয়-স্বজন, জ্ঞাতি-গোষ্ঠী, পাড়া-প্রতিবেশী উনাদেরকে নিয়ে আখিরী রসূল, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র বিলাদতী শান মুবারক প্রকাশ সম্পর্কিত মুবারক ঘটনাসমূহ শুনাচ্ছেন এবং বলছেন, এই দিবস; এই দিবস (অর্থাৎ এই দিবসে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি যমীনে তাশরীফ মুবারক এনেছেন এবং ইত্যাদি ইত্যাদি ঘটেছে)। এতদশ্রবণে মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি খুশী মুবারক প্রকাশ করে ইরশাদ মুবারক করেন, “নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ তায়ালা তিনি উনার মুবারক রহমত উনার দরজা মুবারকসমূহ আপনার জন্য উম্মুক্ত করেছেন এবং সমস্ত হযরত ফেরেশতা আলাইহিমুস সালাম উনারা আপনার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করছেন এবং যে কেউ আপনার মত এরূপ কাজ করবে, তিনিও আপনার মত নাজাত (ফযীলত) লাভ করবেন।” সুবহানাল্লাহ! (আত তানউইর ফী মাওলিদিল বাশীর ওয়ান নাযীর, মাওলূদুল কাবীর, দুররুল মুনাযযাম, সুবুলুল হুদা ফী মাওলিদিল মুস্তফা ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, ইশবাউল কালামি ফী ইছবাতিল মাওলিদি ওয়াল ক্বিয়ামি, হাক্বীক্বতে মুহম্মদী মীলাদে আহমদী)

পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে আরো ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

عَنْ حَضْرَتْ اِبْنِ عَبَّاسٍ رَضِىَ اللهُ تَـعَالٰى عَنْهُ اَنَّهٗ كَانَ يُـحَدِّثُ ذَاتَ يَـوْمٍ فِىْ بَـيْتِهٖ وَقَائِعَ وِلَادَتِهٖ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِقَوْمٍ فَـيَسْتَـبْشِرُوْنَ وَيُـحَمِّدُوْنَ اللهَ وَيُصَلُّوْنَ عَلَيْهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَاِذَا جَاءَ النَّبِىُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ حَلَّتْ لَكُمْ شَفَاعَتِىْ

অর্থ : “হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি একদা উনার নিজগৃহে সমবেত হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদেরকে মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র বিলাদতী শান মুবারক প্রকাশ সম্পর্কিত মুবারক ঘটনাসমূহ শুনাচ্ছিলেন। এতে শ্রবণকারী উনারা আনন্দ ও খুশি প্রকাশ করছিলেন এবং মহান আল্লাহ পাক উনার প্রশংসা তথা তাসবীহ-তাহলীল মুবারক পাঠ করছিলেন এবং মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার প্রতি (পবিত্র ছলাত শরীফ-পবিত্র সালাম শরীফ) পবিত্র দুরূদ শরীফ পাঠ করছিলেন। এমন সময় নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি তথায় তাশরীফ মুবারক নেন এবং (পবিত্র মীলাদ শরীফ পাঠের অনুষ্ঠান দেখে) খুশী মুবারক প্রকাশ করে ইরশাদ মুবারক করলেন, আপনাদের জন্য আমার শাফায়াত মুবারক ওয়াজিব।” সুবহানাল্লাহ! (আত তানউয়ীর ফী মাওলিদিল বাশীর ওয়ান নাযীর, মাওলূদুল কাবীর, দুররুল মুনাযযাম, সুবুলুল হুদা ফী মাওলিদিল মুস্তফা ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, ইশবাউল কালামি ফী ইছবাতিল মাওলিদি ওয়াল ক্বিয়ামি, হাক্বীক্বতে মুহম্মদী মীলাদে আহমদী)

উক্ত পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদের বর্ণনার দ্বারা প্রতিভাত হয়েছে যে, হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনারা নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সুমহান বিলাদতী শান মুবারক প্রকাশের দিবস উপলক্ষে খুশি প্রকাশ করে মাহফিলের ইন্তেজাম করেছেন এবং স্বয়ং নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি উক্ত মাহফিলে তাশরীফ মুবারক নিয়ে খুশী মুবারক প্রকাশ করে সুসংবাদ প্রদান করে ইরশাদ মুবারক করেন যে, মহান আল্লাহ পাক তিনি আপনাদের জন্য সমস্ত রহমত মুবারকের দরজা খুলে দিয়েছেন, সকল হযরত ফেরেশতা আলাইহিমুস সালাম উনারা আপনাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করছেন। শুধু তাই নয়, আপনাদের মতো (ক্বিয়ামত পর্যন্ত) যারাই এরকম মাহফিলের ইন্তেজাম করবেন তিনিও আপনাদের ন্যায় ফযীলত ও নাজাত লাভ করবেন। আর হযরত ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার বর্ণিত হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে খুশী মুবারক প্রকাশ করে এই বলে সুসংবাদ প্রদান করেন যে, আপনাদের জন্য আমার সুপারিশ ওয়াজিব বা অপরিহার্য করে দেয়া হলো। সুবহানাল্লাহ!

পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে আরো বর্ণিত হয়েছে-

عَنْ حَضْرَتْ اَوْسِ بْنِ اَوْسٍ رَضِىَ اللهُ تَـعَالٰى عَنْهُ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ‏ اِنَّ مِنْ اَفْضَلِ اَيَّامِكُمْ يَـوْمَ الْـجُمُعَةِ فِيْهِ خُلِقَ حَضْرَتْ سَيّدُنَا اٰدَمُ عَلَيْهِ السَّلَامُ وَفِيْهِ قُبِضَ.‏

অর্থ : “হযরত আউস ইবনে আউস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত। নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, আপনাদের দিনগুলোর মধ্যে উত্তম দিন হচ্ছেন পবিত্র জুমুআ উনার দিন। এ দিনে আবুল বাশার হযরত ছফিউল্লাহ আলাইহিস সালাম তিনি সৃষ্টি হয়েছেন এবং এ দিনেই তিনি পবিত্র বিছালী শান মুবারক প্রকাশ করেছেন।” (নাসায়ী শরীফ শরীফ : কিতাবুল জুমুয়া : হাদীছ শরীফ নং ১৩৮৫, মুসলিম শরীফ : কিতাবুল জুমুয়া, হাদীছ শরীফ নং ৮৫৫, তিরমিযী শরীফ : হাদীছ শরীফ নং ৪৯১, মুসনাদে আহমদ শরীফ : হাদীছ শরীফ নং ৮৯৫৪, ইবনে মাজাহ শরীফ : হাদীছ শরীফ ১৭০৫, আবূ দাঊদ শরীফ : কিতাবুছ ছলাত, হাদীছ শরীফ নং ১০৪৭, ইবনে খুজায়মা শরীফ : হাদীছ শরীফ নং ১৬৩২)

অন্য এক পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

عَنْ حَضْرَتْ اِبْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اِنَّ هٰذَا يَـوْمُ عِيْدٍ جَعَلَهُ اللهُ لِلْمُسْلِمِيْنَ فَمَنْ جَاءَ اِلَى الْـجُمُعَةِ فَـلْيَغْتَسِلْ وَاِنْ كَانَ طِيْبٌ فَـلْيَمَسَّ مِنْهُ وَعَلَيْكُمْ بِالسِّوَاكِ‏.‏

অর্থ : “হযরত ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত। নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ পাক তিনি এই দিনকে মুসলমান উনাদের জন্য পবিত্র ঈদ উনার দিনরূপে নির্ধারণ করেছেন। অতএব যে ব্যক্তি পবিত্র জুমুআ উনার নামায আদায় করতে আসবে, তিনি যেন গোসল করেন এবং সুগন্ধি থাকলে তা শরীরে লাগান। আর মিসওয়াক করাও কর্তব্য।” (ইবনে মাজাহ শরীফ : হাদীছ শরীফ নং ১০৯৮, আল্ মু’জামুল আওসাত লিত্ ত্ববারানী শরীফ : হাদীছ শরীফ নং ৭৩৫৫)

উক্ত পাবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদের মধ্যে পবিত্র জুমুআ উনার দিবসকে সম্মানিত মুসলমান উনাদের জন্য ঈদের দিন হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। তাই উক্ত দিন উনার সম্মানার্থে বা পালনার্থে মিসওয়াক করার জন্য, গোসল করার জন্য ও সুগন্ধি ব্যবহার করার জন্য বলা হয়েছে। সুবহানাল্লাহ!

পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে আরো ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

عَنْ حَضْرَتْ اِبْنِ عَبَّاسٍ رَضِىَ اللهُ تَـعَالٰى عَنْهُ قَالَ قَدِمَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْمَدِيْـنَةَ فَـرَاَى الْيَهُوْدَ تَصُوْمُ يَـوْمَ عَاشُوْرَاءَ فَـقَالَ مَا هٰذَا‏‏.‏ قَالُوْا هٰذَا يَوْمٌ صَالِحٌ هٰذَا يَوْمٌ نَـجَّى اللهُ بَنِـيْ اِسْرَائِيْلَ مِنْ عَدُوِّهِمْ فَصَامَهٗ مُوْسٰى عَلَيْهِ السَّلَامُ‏.‏ قَالَ‏ فَاَنَا اَحَقُّ بِـمُوْسٰى عَلَيْهِ السَّلَامُ‏ مِنْكُمْ (نَـحْنُ اَحَقُّ بِـمُوْسٰى عَلَيْهِ السَّلَامُ‏ مِنْكُمْ.) فَصَامَهٗ وَاَمَرَ بِصِيَامِهٖ.‏

অর্থ : “হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বলেন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি যখন পবিত্র মদীনা শরীফ উনার মধ্যে তাশরীফ মুবারক নিয়ে দেখতে পেলেন যে, ইয়াহুদীরা পবিত্র আশূরা শরীফ উনার দিন রোযা রেখে থাকে। তিনি উম্মতকে তা’লীম প্রদানের জন্য তাদেরকে এর কারণ জিজ্ঞাসা করলেন। তখন ইয়াহুদীরা বললো, এই দিন হচ্ছে একটি নেক কাজের দিন। এই দিনে (ফির‘আঊন ও তার সৈন্যবাহিনী পানিতে ডুবে ধবংসপ্রাপ্ত হয়েছিলো। আর) হযরত কালীমুল্লাহ আলাইহিস সালাম তিনি ও উনার সঙ্গী-সাথিরা উনাদের শত্রুদের যুল্ম-নির্যাতন থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন। এজন্য আমরা মহান আলাহ পাক উনার কৃতজ্ঞতা প্রকাশার্থে রোযা পালন করি। তখন নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, হযরত কালীমুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার ব্যাপারে তোমাদের চেয়ে আমিই বেশি হক্বদার। (ইবনে মাজাহ শরীফ উনার রেওয়াতে- তোমাদের চেয়ে আমরাই বেশি হক্বদার।) অতঃপর নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি স্বয়ং পবিত্র আশূরা শরীফ উনার দিন রোযা রাখলেন এবং এই মুবারক দিনে সবাইকে রোযা রাখার হুকুম মুবারক দিয়েছেন।” (বুখারী শরীফ : কিতাবুছ্ ছওম : বাবু ছিয়ামি ইয়াউমি আশূরা : হাদীছ শরীফ নং ২০০৪, ইবনে মাজাহ শরীফ : কিতাবুছ্ ছওম : বাবু ছিয়ামি ইয়াওমি আশূরা : হাদীছ শরীফ নং ১৭৩৪)

উক্ত পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে পবিত্র আশূরা শরীফ দিবসকে পূণ্যের দিন, মহান দিন বলে ঘোষণা করা হয়েছে এবং উক্ত দিবস পালনার্থে স্বয়ং নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি রোযা রেখেছেন এবং উনার উম্মত আমাদেরকেও রোযা রাখার জন্য আদেশ মুবারক করেছেন। সুবহানাল্লাহ!

পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে আরো ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

عَنْ حَضْرَتْ اُمِّ الْمُؤْمِنِيْنَ الثَّاِلثَةِ الصِّدِّيْـقَةِ عَلَيْهَا السَّلَامُ قَالَتْ كَانَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُـجَاوِرُ فِي الْعَشْرِ الْاَوَاخِرِ مِنْ رَّمَضَانَ وَيَقُوْلُ‏ تَـحَرَّوْا لَيْلَةَ الْقَدْرِ فِي الْعَشْرِ الْاَوَاخِرِ مِنْ رَّمَضَانَ‏‏.‏

অর্থ : “উম্মুল মু’মিনীন আছ ছালিছা হযরত ছিদ্দীক্বা আলাইহাস সালাম উনার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি পবিত্র রমাদ্বান শরীফ মাস উনার শেষ দশকে ইতিকাফ করতেন এবং বলতেন, তোমরা পবিত্র রমাদ্বান শরীফ মাস উনার শেষ দশকে পবিত্র লাইলাতুল ক্বদর শরীফ তালাশ করো।” (বুখারী শরীফ : কিতাবু ফাদ্বলিল লাইলাতুল ক্বদরি : বাবু তার্হারী লাইলাতিল ক্বদরি ফিল উইতরি মিনাল আশরি আওয়াখিরি : হাদীছ শরীফ নং ২০২০)

উক্ত পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে যে, স্বয়ং নূরে মুজাসসাম  হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি পবিত্র রমাদ্বান শরীফ উনার শেষ দশকের দিনসমূহে ই’তিকাফ করতেন এবং বিজোড় রাত্রিসমূহে সজাগ থেকে লাইলাতুল ক্বদর তালাশ করতেন এবং উম্মতওে তালাশ করার জন্য আদেশ মুবারক করেছেন। সুবহানাল্লাহ!

উপরোক্ত বর্ণনাসমূহ ছাড়াও আরো অনেক বর্ণনা রয়েছে যা দ্বারা প্রতিভাত হয়েছে যে, দিবস পালন করা সম্মানিত দ্বীন ইসলাম সম্মত তথা ফরয ওয়াজিব উনার অন্তর্ভুক্ত এবং রহমত, নিয়ামত, মাগফিরাত, শাফায়াত, নাজাত ও কামিয়াবী হাছিলের কারণ। সুবহানাল্লাহ!

সুওয়াল-জাওয়াব

সুওয়াল-জাওয়াব

সুওয়াল-জাওয়া বিভাগ

সুওয়াল-জাওয়াব বিভাগ