সুওয়াল-জাওয়াব

সংখ্যা: ২৮৩তম সংখ্যা | বিভাগ:

শেখ মুহম্মদ আব্দুর রহমান মা’ছূম

মুহব্বতপুর, বগুড়া

 

সুওয়াল: কেউ কেউ বলে যে, পবিত্র জুমুয়ার দিন একটি রোযা রাখা মাকরূহ, হয় তার আগে অথবা পরে আরেকটি রোযা রাখতে হবে। অথচ আমরা জানি যে, শুধুমাত্র আশূরার রোযা একটি রাখা মাকরূহ।

এখন আমাদের জানার বিষয় হলো তাদের উক্ত বক্তব্য কতটুকু সঠিক ও দলীলভিত্তিক? নির্ভরযোগ্য দলীলের ভিত্তিতে জাওয়াব দিয়ে বাধিত করবেন।

জাওয়াব: সম্মানিত শরীয়ত অর্থাৎ পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র হাদীছ শরীফ, পবিত্র ইজমা শরীফ ও পবিত্র ক্বিয়াস শরীফ ও সম্মানিত হানাফী মাযহাব উনাদের দৃষ্টিতে তাদের উক্ত বক্তব্য সম্পূর্ণই ভুল ও দলীলবিহীন। আর ছহীহ ও গ্রহনযোগ্য ফতওয়া হলো মুহররম মাসের ১০ তারিখ অর্থাৎ পবিত্র আশূরার রোযা ১টি রাখা বা শুধু ১০ তারিখ রোযা রাখা। আর শুধু ইয়াওমুস সাবত বা শনিবার রোযা রাখা মাকরূহ তাহরীমী। বরং এর পূর্বে বা পরে আরেকটি রোযা রাখতে হবে। এর কারণ হলো ইহুদীরাও আশূরার দিন ও ইয়াওমুস সাবত বা শনিবার ১টি রোযা রাখে। ইহুদীদের সাথে যেনো তাশাব্বুহ বা মিল না হয় সেজন্য আগে অথবা পরে আরেকটি রোযা রাখার নির্দেশ মুবারক দেয়া হয়েছে। যেমন এ প্রসঙ্গে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

عَنْ حَضْرَتْ اِبْنِ عَبَّاسٍ رَضِىَ اللهُ تعَالٰى عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ صُوْمُوْا يَوْمَ عَاشُوْرَاءَ وَخَالِفُوْا فِيْهِ الْيَهُوْدَ صُوْمُوْا قَبْلَهٗ يَوْمًا اَوْ بَعْدَهٗ يَوْمًا

অর্থ: হযরত ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, তোমরা আশূরার দিন রোযা রাখ, তবে ইহুদীদের খিলাফ করো, এর পূর্বে অথবা পরে আরেকটি রোযা রাখো।

আর ইয়াওমুস সাবত বা শনিবার ১টি রোযা রাখা মাকরূহ হওয়ার ব্যাপারে কিতাবে উল্লেখ আছে-

وَيُكْرَهُ صَوْمُ يَوْمِ السَّبْتِ بِاِنْفِرَادِهٖ، لِأَنَّهٗ تَشَبُّهٌ بِالْيَهُوْدِ

আর সাবতের দিন (শনিবার) আলাদাভাবে একটি রোযা রাখা ইহুদীদের সাথে তাশাব্বুহ হওয়ার কারণে মাকরূহ হবে। (বাদায়েউচ্ছনায়ে ফী তারতীবিশ শারায়ে ৪/১৫৫)

অতএব, প্রমাণিত হলো যে, সম্মানিত শরীয়তসম্মত কারণেই আশূরার রোযা ও সাবতের রোযা একটি রাখতে নিষেধ করা হয়েছে। কিন্তু জুমুয়ার দিন একটি রোযা রাখা নিষেধ হওয়ার ব্যাপারে শরীয়তসম্মত কোন কারণ পাওয়া যায় না। তাহলে কেনো জুমুয়ার দিন ১টি রোযা রাখা মাকরূহ হবে? মূলত জুমুয়ার দিন ১টি রোযা রাখা শুধু জায়িযই নয় বরং খাছ সুন্নতে রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, সুন্নতে ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম ও সুন্নতে হযরত ইমাম মুজতাহিদ রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনাদের অন্তর্ভুক্ত। সুবহানাল্লাহ!

তবে কেহ কেহ বিনা তাহক্বীক্বে বিপরীত বলে থাকে যা ছহীহ হাদীছ শরীফ উনাদের বিরোধী হওয়ার কারণে সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাজ্য। যেমন-

পবিত্র জুমুয়ার দিন রোযা রাখার ব্যাপারে ফিক্বাহর কিতাবে উল্লেখ করা হয়েছে –

وَكَرِهَ بَعْضُهُمْ صَوْمَ يَوْمِ الْـجُمُعَةِ بِاِنْفِرَادِهٖ، وَكَذَا يَوْمُ الْاِثْنَيْنِ، وَالْـخَمِيْسِ، وَقَالَ عَامَّتُهُمْ إنَّهٗ مُسْتَحَبٌّ لِأَنَّ هٰذِهِ الْأَيَّامَ مِنَ الْأَيَّامِ الْفَاضِلَةِ فَكَانَ تَعْظِيْمُهَا بِالصَّوْمِ مُسْتَحَبًّا، وَيُكْرَهُ صَوْمُ يَوْمِ السَّبْتِ بِاِنْفِرَادِهٖ، لِأَنَّهٗ تَشَبُّهٌ بِالْيَهُوْدِ

অর্থ: কেউ কেউ পবিত্র জুমুয়ার দিন আলাদাভাবে রোযা রাখা মাকরূহ বলেছে। অনুরূপভাবে ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম শরীফ এবং ইয়াওমুল খমীছও আলাদাভাবে রোযা রাখা মাকরূহ বলেছে। তবে সর্বসম্মতিক্রমে উক্ত দিন সমুহে আলাদা আলাদাভাবে রোযা রাখা মুস্তাহাব। কেননা উক্ত দিন সমূহ বিশেষভাবে ফযীলতপূর্ণ দিন। সুতরাং উক্ত দিন সমূহকে তাযীম করে সে দিনে রোযা রাখা মুস্তাহাব। আর সাবতের দিন (শনিবার) আলাদাভাবে একটি রোযা রাখা ইহুদীদের সাথে তাশাব্বুহ হওয়ার কারণে মাকরূহ হবে। (বাদায়েউচ্ছনায়ে ফী তারতীবিশ শারায়ে ৪/১৫৫)

কাজেই, যারা পবিত্র জুমুয়ার দিনে একটি রোযা রাখাকে মাকরূহ বলে এবং এর স্বপক্ষে যে দুই একটি দলীল পেশ করে থাকে তা অসংখ্য অগণিত ছহীহ হাদীছ শরীফ ও নির্ভরযোগ্য ফিক্বাহ ও ফতওয়ার কিতাবের বর্ণনার খিলাফ বা বিপরীত হওয়ার কারণে মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। বরং সম্পূর্ণরূপেই বাতিল ও পরিত্যাজ্য।

পবিত্র জুমুয়ার দিন রোযা রাখার ব্যাপারে বিশ্ববিখ্যাত ফিক্বাহর কিতাব সমূহে শরয়ী ফায়সালা এভাবে এসেছে –

وَمِنْهُ صَوْمُ يَوْمِ السَّبْتِ بِاِنْفِرَادِهٖ لِلتَّشَبُّهِ بِالْيَهُوْدِ بِـخِلَافِ صَوْمِ يَوْمِ الْـجُمُعَةِ فَإِنَّ صَوْمَهٗ بِاِنْفِرَادِهٖ مُسْتَحَبٌّ عِنْدَ الْعَامَّةِ

অর্থ: মাকরূহ রোযা সমূহের মধ্যে অন্যতম একটি হলো আলাদা ভাবে সাবতের দিন (শনিবার) রোযা রাখা। কারণ তাতে ইহুদীদের সাথ তাশাব্বুহ হয়। তবে জুমুয়ার দিনে আলাদা ভাবে রোযা রাখা মাকরুহ নয়। কেননা সর্বসম্মতিক্রমেই পবিত্র জুমুয়ার দিন এককভাবে রোযা রাখা মুস্তাহাব। (বাহরুর রায়েক শরহে কানযুদ্দাকায়েক ২/২৭৮)

জুমুয়ার দিন রোযা রাখার স্বপক্ষে অসংখ্য অগণিত ছহীহ ও নির্ভরযোগ্য দলীল বিদ্যমান রয়েছে। তন্মধ্য হতে কিছু দলীল নিম্নে পেশ করা হলো-

পবিত্র জুমুয়ার দিন রোযা রাখার ফযীলত সম্পর্কে মহাপবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত হয়েছে

عَنْ حَضْرَتْ أَبِـيْ هُرَيْرَةَ رَضِيْ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَنْ صَامَ يَوْمَ الْجُمُعَةِ كَتَبَ اللهُ لَهٗ عَشَرَةَ أَيَّامٍ عَدَدَهُنَّ مِنْ أَيَّامِ الْاٰخِرَةِ لَايُشَاكِلُهُنَّ أَيَّامُ الدُّنْيَا

অর্থ: হযরত আবূ হুরায়রা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বর্ণনা করেন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, যে ব্যক্তি পবিত্র জুমুয়ার দিন একটি রোযা রাখবে, মহান আল্লাহ পাক রব্বুল আলামীন তিনি তাকে দশ দিনের (দুনিয়াবী দশ হাজার বছর) রোযার ফযীলত দান করবেন। যে দশ দিন হবে পরকালীন দশ দিন, যা দুনিয়াবী দিন সমূহ নয়। (শুয়াবুল ঈমান, ফাদ্বায়িলুল আওক্বাত)

পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে আরো বর্ণিত হয়েছে-

عَنْ حَضْرَتْ عَلِيٍّ كَرَّمَ اللهُ وجْهَهٗ عَلَيْهِ السَّلَامُ قَالَ: قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَنْ صَامَ يَوْمَ الْـجُمُعَةِ صَبْرًا وَاِحْتِسَابًا أُعْطِيَ عَشَرَةَ أَيَّامٍ غُرٍّ زُهْرٍ لَاتُشَاكِلُهُنَّ أَيَّامُ الدُّنْيَا

অর্থ: হযরত কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু আলাইহিস সালাম তিনি বর্ণনা করেন, নুরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লøাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, যে ব্যক্তি ধৈর্যের সাথে ও খুলুছিয়াতের সাথে পবিত্র জুমুয়ার দিন একটি রোযা রাখবে, মহান আল্লাহ পাক তিনি তাকে পরকালীন দশ দিন (দুনিয়াবী দশ হাজার বছর) রোযা রাখার ফযীলত দান করবেন। (তাফসীরে রুহুল বয়ান, তাফসীরে হাক্কী, ফয়জুল ক্বদীর শরহে জামেউছ ছগীর, আত তাইসীর বি শরহে জামিয়িছ ছগীর)

উল্লেখ্য যে, পবিত্র কালামুল্লাহ শরীফ উনার পবিত্র আয়াত শরীফ দ্বারা প্রমাণিত যে, পরকালীন একদিন হলো দুনিয়াবী এক হাজার বছরের সমান। সুতরাং দশ দিন হচ্ছে দশ হাজার বছরের সমান। কাজেই কোন ব্যক্তি যদি পবিত্র জুমুয়ার দিন একটি রোযা রাখে মহান আল্লাহ পাক রব্বুল আলমীন তিনি তাকে দশ হাজার বছর রোযা রাখার ফযীলত দান করবেন। সুবহানাল্লাহ!

পবিত্র জুমুয়ার দিন রোযা রাখা সম্পর্কে অন্য পবিত্র হাদীছ শরীফে আরো বর্ণিত রয়েছে-

عَنْ حَضْرَتْ أَبِـىْ سَعِيْدٍ الْـخُدْرِيِّ رَضِيَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ أَنَّهٗ سَـمِعَ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُوْلُ خَـمْسٌ مَنْ عَمِلَهُنَّ فِيْ يَوْمٍ كَتَبَهُ اللهُ مِنْ أَهْلِ الْـجَنَّةِ مَنْ صَامَ يَوْمَ الْـجُمُعَةِ وَرَاحَ إِلَى الْـجُمُعَةِ وَشَهِدَ جَنَازَةً وَأَعْتَقَ رَقَبَةً وَعَادَ مَرِيْضًا

অর্থ: হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বর্ণনা করেন, নিশ্চয়ই তিনি নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে বলতে শুনেছেন, তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, যে ব্যক্তি পাঁচটি আমল করবে মহান আল্লাহ পাক রব্বুল আলামীন তিনি তার জন্য সম্মানিত জান্নাতকে অবধারিত করে দেন। ১। যে ব্যক্তি পবিত্র জুমুয়ার দিন রোযা রাখবেন ২। ছলাতুল জুমুয়া আদায় করবেন ৩। কারো জানাযায় শরীক থাকবেন ৪। কোন গোলাম আজাদ করবেন ৫। রোগীর সেবা করবেন। সুবহানাল্লাহ! (ইবনু হিব্বান, আবু ইয়ালা)

عَنْ حَضْرَتْ أَبِـىْ سَعِيْدٍ الْـخُدْرِيِّ رَضِيَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ أَنَّهٗ سَـمِعَ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُوْلُ مَنْ وَافَقَ صِيَامَهٗ يَوْمَ الْـجُمُعَةِ وَعَادَ مَرِيْضًا وَشَهِدَ جَنَازَةً وَتَصَدَّقَ وَأَعْتَقَ وَجَبَتْ لَهُ الْـجَنَّةُ

অর্থ: হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত, তিনি নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে বলতে শুনেছেন, তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, যে ব্যক্তি পবিত্র জুমুয়ার দিন রোযা রাখবে, রোগীর সেবা করবে, কারো জানাযায় শরীক হবে, কোন দান-ছদক্বা করবে এবং কোন গোলাম আজাদ করবে তার জন্য জান্নাত ওয়াজীব হয়ে যাবে। সুবহানাল্লাহ! (ইবনু হিব্বান, আবু ইয়ালা )

উল্লেখ্য যে, উপরোক্ত প্রত্যেকটি হাদীছ শরীফ নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মহা সম্মানিত মহা পবিত্র ক্বওল শরীফ অর্থাৎ হাদীছ শরীফ উনার অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং মহাসম্মানিত মহা পবিত্র ক্বওলী হাদীছ শরীফ দ্বারা পবিত্র জুমুয়ার দিন রোযা রাখা জায়িয ও সুন্নত প্রমাণিত হলো।

অর্থাৎ স্বয়ং নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি নিজেই শুধুমাত্র জুমুয়ার দিনে একটি রোযা রাখার ব্যাপারে উম্মাহকে উৎসাহিত করেছেন। এখানে আগে বা পরে আরেকটি রোযা রাখার কোনো শর্তারোপ করেননি।

শুধু তাই নয়, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বয়ং নিজেই পবিত্র জুমুয়ার দিনে একটি রোযা মুবারক রেখেছেন। এ প্রসঙ্গে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

عَنْ حَضْرَتْ اِبْنِ مَسْعُوْدٍ رَضِيَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ أَنَّهٗ قَالَ مَا رَأَيْتُ النَّبِـىَّ صَلَّي اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُفْطِرُ يَوْمَ الْـجُمُعَةِ

অর্থ: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে জুমুয়ার দিন রোযা ছাড়তে দেখি নাই। (অর্থাৎ তিনি প্রতি জুমুয়ার দিনই রোযা রাখতেন)। সুবহানাল্লাহ! (শরহে ছহীহিল বুখারী লি ইবনে বাত্তাল)

পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে আরো বর্ণিত হয়েছে-

عَنْ حَضْرَتْ اِبْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ أَنَّهٗ قَالَ مَا رَأَيْتُ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مُفْطِرًا يَوْمَ الْـجُمُعَةِ قَطُّ

অর্থ: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমা তিনি বর্ণনা করেন, আমি কখনোই নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে জুমুয়ার দিন রোযা ছাড়তে দেখি নাই। (অর্থাৎ তিনি প্রতি জুমুয়ার দিনই রোযা রাখতেন)। সুবহানাল্লাহ! (শরহু ছহীহিল বুখারী লি ইবনে বাত্তাল)

পবিত্র হাদীছ শরীফে আরো বর্ণিত হয়েছে-

عَنْ حَضْرَتْ اِبْنِ مَسْعُوْدٍ رَضِيَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ أَنَّهٗ قَالَ قَلَّمَا كَانَ يُفْطِرُ يَوْمَ الْـجُمُعَةِ

অর্থ: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বলেন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি খুব কম সংখ্যক সময়েই জুমুয়ার দিন রোযা ছাড়তেন। সুবহানাল্লাহ! (তুহফাতুল আহওয়াজী, ফয়জুর ক্বদীর শরহে জামিউস সগীর, মিশকাতুল মাছাবীহ, বুসতানুল আহবার, মিরয়াতুল মাফাতীহ, মাছাবীহুত তানবীর)

উপরোক্ত পবিত্র হাদীছ শরীফ নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মহাসম্মানিত মহা পবিত্র ফে’ল শরীফ বা কার্য মুবারক উনার অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং মহাসম্মানিত মহাপবিত্র ক্বওলী ও ফে’লী হাদীছ শরীফ দ্বারাই শুধুমাত্র পবিত্র জুমুয়ার দিন ১টি রোযা রাখা জায়িয ও সুন্নত প্রমাণিত হলো। অর সে কারণেই হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনারা এবং পরবর্তী হযরত ইমাম মুজতাহিদ ও আউলিয়ায়ে কিরাম উনারা পবিত্র জুমুয়ার দিনে রোযা রেখেছেন। এর আগে বা পরে রোযা রাখার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না।

এ প্রসঙ্গে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত রয়েছে-

عَنْ حَضْرَتْ اِبْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ أَنَّهٗ كَانَ يَصُوْمُ يَوْمَ الْـجُمُعِةِ وَيُوَاظِبُ عَلَيْهِ

অর্থ: বিশিষ্ট ছাহাবী হযরত ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত, নিশ্চয়ই তিনি নিয়মিতভাবে প্রতি জুমুয়ার দিন একটি রোযা রাখতেন। (শরহে ছহীহ বুখারী লি ইবনে বাত্তাল, আল ইসতিসগারুল জামি’ লি মাযাহিবি ফুক্বাহায়িল আমছার)।

পাশাপাশি অনুসরণীয় ইমাম-মুজতাহিদ উনারাও শুধুমাত্র জুমুয়ার দিন একটি রোযা রাখা জায়িয ও সুন্নত হওয়ার ব্যাপারে মত পেশ করেছেন। যেমন এ প্রসঙ্গে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার ব্যাখ্যাগ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে-

وَقَالَ حَضْرَتِ الْاِمَامُ الْـمَالِكُ رَحْـمَةُ اللهِ عَلَيْهِ لَـمْ أَسْـمَعْ أَحَدًا مِنْ أَهْلِ الْعِلْمِ وَالْفِقْهِ مِـمَّنْ يُّقْتَدٰى بِهٖ يَنْهٰى عَنْ صِيَامِ يَوْمِ الْـجُمُعَةِ وَصِيَامُهٗ حَسَنٌ، وَقَدْ رَأَيْتُ بَعْضَ أَهْلِ الْعِلْمِ يَصُوْمُهٗ وَأُرَاهُ كَانَ يَتَحَرَّاهُ

অর্থ: হযরত ইমাম মালেক রহমাতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, কোন উলামায়ে কিরাম এবং অনুসরণীয় ফুক্বাহায়ে ইজাম কাউকেই পবিত্র জুমুয়ার দিন রোযা রাখার ব্যাপারে নিষেধ করতে শুনি নাই। সুতরাং জুমুয়ার দিন রোযা রাখাই উত্তম। বরং অনেক অনুসরণীয় উলামায়ে কিরাম উনাদেরকে আনন্দচিত্তে জুমুয়ার দিন রোযা রাখতে দেখেছি। (মুয়াত্তায়ে ইমাম মালিক, আদ্বওয়াউল বয়ান ফী ইদ্বাহিল কুরআন, শরহে ছহীহিল বুখারী লি ইবনে বাত্তাল, উমদাতুল ক্বারী শরহে বুখারী, ইমালুল মুয়াল্লিম শরহে মুসলিম, আল মিনহাজ শরহে মুসলিম, শরহুন নববী আলাল মুসলিম, তুহফাতল আহওয়াজী, তাহযীবু সুনানি আবূ দাঊদ, শরহুয যারকানী আলা মুয়াত্তা)

কিতাবে আরো উল্লেখ করা হয়েছে-

وَقَالَ حَضْرَتِ الْاِمَامُ الشَّافِعِىُّ رَحْـمَةُ اللهِ عِلَيْهِ لَايُبَيِّنُ لِـىْ أَنَّهٗ نَـهٰى عَنْ صِيَامِ يَوْمِ الْـجُمُعَةِ إِلَّا عَلَى الْاِخْتِيَارِ

অর্থ: হযরত ইমাম শাফিয়ী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, এমন কোন বর্ণনা আমার কাছে পৌঁছেনি যে, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি পবিত্র জুমুয়ার দিন রোযা রাখতে নিষেধ করেছেন, তবে যার ইচ্ছা রোযা রাখতেও পারে নাও রাখতে পারে। (শরহে ছহীহ বুখারী লি ইবনে বাত্তাল)

কিতাবে আরো উল্লেখ করা আছে-

وَأَكْثَرُ الْفُقَهَاءِ عَلَى الْأَخْذِ بِأَحَادِيْثِ الْإِبَاحَةِ لِأَنَّ الصَّوْمَ عَمَلٌ بَرٌّ

অর্থ: অধিকাংশ ফুকাহায়ে কিরাম উনারা জুমুয়ার দিন রোযা রাখা বৈধ এ বিষয়ের পবিত্র হাদীছ শরীফ গ্রহণ করে পবিত্র জুমুয়ার দিন রোযা রাখাকে জায়িয বলেছেন। কেননা রোযা একটি বিশেষ নেক কাজের অন্তর্ভূক্ত। (শরহে ছহীহ বুখারী লি ইবনে বাত্তাল)

জুমুয়ার দিন রোযা রাখার ব্যাপারে কিতাবে আরো বর্ণিত রয়েছে,

إِبَاحَتُهٗ مُطْلَقًا مِّنْ غَيْرِ كَرَاهَةٍ وَرُوِيَ ذٰلِكَ عَنْ حَضْرَتْ اِبْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ وَمُـحَمَّدِ بْنِ الْـمُنْكَدِرِ وَهُوَ قَوْلُ حَضْرَتِ الْاِمَامِ الْـمَالِكِ رَحْـمَةُ اللهِ عَلَيْهِ وَحَضْرَتِ الْاِمَامِ أَبِـيْ حَنِيْفَةَ رَحْـمَةُ اللهِ عَلَيْهِ وَحَضْرَتِ الْاِمَامِ مُـحَمَّدِ بْنِ الْـحَسَنِ رَحْـمَةُ اللهِ عَلَيْهِ

অর্থ: সাধারণ ভাবে পবিত্র জুমুয়ার দিন রোযা রাখা জায়েয রয়েছে,ইহা মাকরূহ নয়। ইহা হযরত ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ও মুহম্মদ ইবনে মুনক্বাদির উনাদের থেকে বর্ণিত পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার দ্বারা প্রমানিত। আর ইহাই ইমাম মালেক রহমাতুল্লাহি আলাইহি, ইমামে আ’যম রহমাতুল্লাহি আলাইহি , ইমাম মুহম্মদ ইবনে হাসান রহমাতুল্লাহি আলাইহি উনাদের ফতওয়া।  (উমদাতুল ক্বারী শরহে বুখারী)

কিতাবে আরো উল্লেখ করা হয়েছে-

وَقَالَ بَعْضُهُمْ وَاسْتَدَلَّ الْـحَنَفِيَّةُ بِـحَدِيْثِ حَضْرَتْ اِبْنِ مَسْعُوْدٍ رَضِيَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ كَانَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَصُوْمُ مِنْ كُلِّ شَهْرٍ ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ وَقَلَّمَا كَانَ يُفْطِرُ يَوْمَ الْـجُمُعَةِ

অর্থ: অধিকাংশ ইমাম-মুজতাহিদ উনারা বলেন, হানাফী মাযহাবের ইমাম উনারা হযরত ইবনে মাসঊদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার বর্ণিত পবিত্র হাদীছ শরীফ জুমুয়ার দিন রোযা রাখার দলীল হিসেবে গ্রহণ করেছেন। নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি প্রতি মাসে তিন দিন রোযা রাখতেন এর মধ্যে খুব কম সংখ্যকই জুমুয়ার দিন রোযা ছাড়তেন। সুবহানাল্লাহ! (উমদাতুল ক্বারী শরহে বুখারী)

কিতাবে আরো বর্ণিত রয়েছে-

وَقاَلَ حَضْرَتِ الْاِمَامُ الْـمَالِكُ رَحْـمَةُ اللهِ عَلَيْهِ وَحَضْرَتِ الْاِمَامُ أَبِـيْ حَنِيْفَةَ رَحْـمَةُ اللهِ عَلَيْهِ وَحَضْرَتِ الْاِمَامُ مُـحَمَّدٌ رَحْـمَةُ اللهِ عَلَيْهِ بِالْإِبَاحَةِ مُطْلَقًا مِنْ غَيْرِ كَرَاهِةٍ ذَكَرَهُ الْعَيْنِـيُّ وَاِبْنُ قُدَامَةَ وَالْـحَافِظُ وَاِبْنُ الْـهُمَامِ.

অর্থ: হযরত ইমাম মালেক রহমাতুল্লাহি আলাইহি, হযরত ইমামে আ’যম রহমাতুল্লাহি আলাইহি, হযরত ইমাম মুহম্মদ রহমাতুল্লাহি আলাইহি উনারা বলেন, পবিত্র জুমুয়ার দিন রোযা রাখা মাকরূহ নয় বরং জায়েয। এ বিষয়টি আইনি, ইবনু কুদামা, হাফিজ এবং ইবনুল হুমাম রহমাতুল্লøাহি আলাইহিম উনারাও বর্ণনা করেছেন। (মিরআতুল মাফাতিহ শরহে মিশকাতুল মাসাবীহ)

অতএব, ছহীহ ও গ্রহনযোগ্য ফতওয়া হচ্ছে পবিত্র জুমুয়ার দিনে ১টি রোযা রাখা জায়িয তো অবশ্যই বরং খাছ সুন্নত মুবারক উনার অন্তর্ভুক্ত।

(বিঃ দ্র: এখানে সংক্ষিপ্ত জাওয়াব দেয়া হলো। প্রয়োজনে পরবর্তীতে বিস্তারিত ফতওয়া প্রদান করা হবে ইনশাআল্লাহ)

 

মুহম্মদ আব্দুস সাত্তার

নবাবগঞ্জ, ঢাকা

 

সুওয়াল: জনৈক ব্যক্তির বক্তব্য হচ্ছে, পবিত্র সাইয়্যিদুল আ’ইয়াদ শরীফ পালন করা যে ফরয তা তো মুসলমানদের ১৩০ ফরযের মধ্যে উল্লেখ নেই। এ বিষয়ে সঠিক জাওয়াব দিয়ে উপকৃত করবেন।

জাওয়াব: সম্মানিত দ্বীন ইসলাম সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সাধারণভাবে ইলিম দেয়ার জন্য ১৩০ ফরযের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে উল্লেখিত ফরয বিষয়সমূহ ছাড়াও আরো অনেক ফরয রয়েছে।

উক্ত ১৩০ ফরযসমূহ হচ্ছে মুসলমানের পাঁচ রুকনে ৫ ফরয, চার কুরসীতে ৪ ফরয, চার মাযহাবে ৪ ফরয, পাঁচ ওয়াক্ত নামাযে ৫ ফরয, পাঁচ ওয়াক্ত নামাযে সতের রাকায়াতে ১৭ ফরয, ঈমানের ৭ ফরয, পাঁচ কলেমায় ৫ ফরয, উযূতে ৪ ফরয, গোসলে ৩ ফরয, তায়াম্মুমে ৩ ফরয, নামাযের পূর্বে আরকানে ৬ ফরয, নামাযের ভিতর আহকামে ৭ ফরয, ত্রিশ রোযায় ৩০ ফরয এবং ত্রিশ রোযার নিয়তে ত্রিশ ফরয; এই হলো মোট ১৩০ ফরয।

 

উক্ত ফরযসমূহের বিস্তারিত বর্ণনা

উল্লেখ করা হলো :

v মুসলমানের পাঁচ রোকনে ৫ ফরয:

১। কালিমা

২। নামায

৩। রোযা

৪। হজ্জ

৫। যাকাত।

v চার কুরসীতে ৪ ফরয:

১। সাইয়্যিদুনা হযরত আবদে মানাফ আলাইহিস সালাম উনার আওলাদ সাইয়্যিদুনা হযরত হাশিম আলাইহিস সালাম ।

২। সাইয়্যিদুনা হযরত হাশিম আলাইহিস সালাম উনার আওলাদ সাইয়্যিদুনা হযরত আব্দুল মুতালিব আলাইহিস সালাম।

৩। সাইয়্যিদুনা হযরত আব্দুল মুত্তালিব আলাইহিস সালাম উনার আওলাদ সাইয়্যিদুনা হযরত আব্দুল্লাহ যাবীহুল্লাহ আলাইহিস সালাম।

৪। সাইয়্যিদুনা হযরত আব্দুল্লাহ যাবীহুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার মহাসম্মানিত আওলাদ নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম

v চার মাযহাবে ৪ ফরয:

১। হানাফী মাযহাব

২। মালেকী মাযহাব

৩। শাফিয়ী মাযহাব

৪। হাম্বলী মাযহাব।

v পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের নিয়তে ৫ ফরয:

১। ফজর

২। যুহর

৩। আছর

৪। মাগরিব

৫। ইশা।

v পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের সতের রাকায়াতে ১৭ ফরয:

১। ফজরের ২ রাকায়াত

২। যুহরের ৪ রাকায়াত

৩। আছরের ৪ রাকায়াত

৪। মাগরিবের ৩ রাকায়াত

৫। ইশার ৪ রাকায়াত।

 ঈমানের ৭ ফরয:

১। মহান আল্লাহ পাক উনার উপর ঈমান আনা।

২। মহান আল্লাহ পাক উনার মহাসম্মানিত রসূল নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার উপর ঈমান আনা।

৩। মহান আল্লাহ পাক উনার ফেরেশতা আলাইহিমুস সালাম উনাদের উপর ঈমান আনা।

৪। মহান আল্লাহ পাক উনার কিতাব সমূহের উপর ঈমান আনা।

৫। তাকদীরের উপর ঈমান আনা।

৬। মৃত্যুর পর পুনর্জীবিত হওয়ার উপর ঈমান আনা

৭। ক্বিয়ামত দিবসের উপর ঈমান আনা।

v ওযুতে ৪ ফরয:

১। সমস্ত মুখমন্ডল ধৌত করা

২। উভয় হাত কনুইসহ ধৌত করা

৩। মাথার এক-চতুর্থাংশ মাসেহ করা

৪। উভয় পায়ের গিরাসহ ধৌত করা।

v গোসলে ৩ ফরয:

১। কুলি করা।

২। নাকের ছিদ্রের ভিতরে পানি পৌঁছানো।

৩। সমস্ত শরীর উওমরূপে ধৌত করা।

v পাঁচ কালিমায় ৫ ফরয:

১। কালিমায়ে তইয়িবা

২। কালিমায়ে শাহাদাত

৩। কালিমায়ে তামজীদ

৪। কালিমায়ে তাওহীদ

৫। কালিমায়ে রদ্দে কুফর।

v তায়াম্মুমে ৩ ফরয:

১। নিয়ত করা

২। সমস্ত মুখমন্ডল মাসেহ করা

৩। উভয় হাতের কনুই পর্যন্ত মাসেহ করা।

v নামযের পূর্বে আহকাম ৭ ফরয:

১। শরীর পাক

২। কাপড় পাক

৩। জায়গা পাক

৪। সতর ঢাকা

৫। নামাযের ওয়াক্ত হওয়া

৬। কেবলামুখি হওয়া

৭। নিয়ত করা।

v  নামাযের ভিতর ৬ ফরয:

১। তাকবীরে তাহরীমা বাঁধা

২। ক্বিয়াম করা অর্থাৎ দাঁড়িয়ে নামায পড়া

৩। নামাযের ভিতর কিরাআত পাঠ করা

৪। রুকূতে যাওয়া

৫। সিজদা করা

৬। আখিরি বৈঠক করা।

v ত্রিশ রোযায় ৬০ ফরয:

১। ত্রিশ রোযায় ৩০ ফরয

২। ত্রিশ রোযার নিয়তে ৩০ ফরয।

এই হচ্ছে মোট ১৩০ ফরয।

উপরে উল্লেখিত ফরয বিষয়সমূহ ছাড়াও আরো অনেক ফরয রয়েছে। যেমন পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করা ফরয, উনাদের খিদমত করা ফরয। পর্দা করা ফরয। হালাল কামাই করা ফরয। দাড়ি রাখা ফরয। ক্বলবী যিকির করা ফরয। ইলিম অর্জন করা ফরয। ইলমে ফিক্বাহ ও ইলমে তাছাওউফ অর্জন করা ফরয। ইখলাছ অর্জন করা ফরয। রিয়া, অহংকার, মিথ্যা, গীবত ইত্যাদি বদস্বভাবগুলো দূর করা ফরয। ইহুদী-নাছারা, কাফির-মুশরিকদের কৃষ্টি-কালচার নিয়ম-নীতি, গ্রহণ ও পালন করা থেকে বেঁচে থাকা ফরয। উলামায়ে সূ ও মুনাফিকদের বিভ্রান্তি থেকে বেঁচে থাকাও ফরয। এমনিভাবে আরো অনেক ফরয রয়েছে।

কাজেই হযরত ইমাম-মুজতাহিদ ও ফক্বীহগণ যে সকল বিষয় ফরয হিসেবে বর্ণনা করেছেন তা মু’মিন মুসলমান, জিন-ইনসান, পুরুষ-মহিলা, ছেলে-মেয়ে সকলের জন্য অত্যধিক গুরুত্বপূর্ণ এবং অপরিহার্যরূপে পালনীয়। এ সকল ফরয বিষয় যিনি খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক উনার প্রতি এবং উনার মহাসম্মানিত হাবীব, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার প্রতি আক্বীদা ও হুসনেযন বা সুধারণার সাথে সম্পর্কযুক্ত। একইভাবে মহাসম্মানিত হযরত আহলু বাইতি রসূলিল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, হযরত আম্বিয়ায়ে ইযাম আলাইহিমুস সালাম, হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম এবং হযরত আউলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনাদের প্রতি আক্বীদা ও হুসনেযন বা সুধারণার সাথে সম্পর্কযুক্ত।

যেমন মহান আল্লাহ পাক উনার প্রতি ঈমান আনার সাথে সাথে উনার প্রতি সঠিক আক্বীদা ও সুধারণা পোষণ করতে হবে এবং সেই সাথে উনাকে মুহব্বত করতে হবে, উনাকে সন্তুষ্ট করতে হবে, উনার ছানা-ছিফত করতে হবে, উনার আনুগত্য করতে হবে। একইভাবে উনার মহাসম্মানিত হাবীব নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার প্রতি ঈমান আনার সাথে সাথে উনার প্রতি সঠিক আক্বীদা ও সুধারণা পোষণ করতে হবে এবং উনাকে মুহব্বত করতে হবে, উনাকে সন্তুষ্ট করতে হবে, উনার ছানা-ছিফত মুবারক করতে হবে, উনার আনুগত্য বা অনুসরণ করতে হবে। এ সকল প্রতিটি বিষয়ই ফরযের অন্তর্ভুক্ত।

মূলত মহাসম্মানিত হাবীব নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার প্রতি ঈমান না আনা পর্যন্ত কারো পক্ষে মু’মিন মুসলমান হওয়া কখনোই সম্ভব হবে না। শুধু তাই নয়, মহান আল্লাহ পাক উনাকে মুহব্বত, সন্তুষ্ট ও উনার আনুগত্য করতে হলে উনার মহাসম্মানিত হাবীব, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে মুহব্বত করতে হবে, সন্তুষ্ট করতে হবে এবং উনার আনুগত্য বা অনুসরণ করতে হবে।

এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক করা হয়েছে-

وَاللهُ وَرَسُوْلُهٗۤ أَحَقُّ أَنْ يُّرْضُوْهُ إِنْ كَانُوْا مُؤْمِنِيْنَ

অর্থ: যদি তারা মু’মিন হয়ে থাকে তাহলে তাদের জন্য কর্তব্য হচ্ছে মহান আল্লাহ পাক উনাকে এবং উনার মহাসম্মানিত রসূল নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে সন্তুষ্ট করা। উনারাই সন্তুষ্টি মুবারক পাওয়ার সমধিক হক্বদার। (পবিত্র সূরা তাওবা শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ৬২)

পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে আরো ইরশাদ মুবারক হচ্ছে-

قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُـحِبُّوْنَ اللهَ فَاتَّبِعُوْنِـيْ يـُحْبِبْكُمُ اللهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوْبَكُمْ ۗ وَاللهُ غَفُوْرٌ رَّحِيْمٌ

অর্থ: (আমার মহাসম্মানিত হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম!) আপনি বলে দিন, তোমরা যদি মহান আল্লাহ পাক উনাকে মুহব্বত করে থাক তাহলে আমার অর্থাৎ মহান আল্লাহ পাক উনার মহাসম্মানিত হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ইত্তিবা বা অনুসরণ করো; তবেই মহান আল্লাহ পাক তিনি তোমাদেরকে মুহব্বত করবেন এবং তোমাদের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দিবেন। আর মহান আল্লাহ পাক তিনি হচ্ছেন অতিশয় ক্ষমাশীল ও দয়ালু। (পবিত্র সূরা আলে ইমরান শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ৩১)

অর্থাৎ মহান আল্লাহ পাক উনার মুহব্বত ও সন্তুষ্টি মুবারক পেতে হলে মহান আল্লাহ পাক উনার যিনি মহাসম্মানিত হাবীব নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে মুহব্বত ও সন্তুষ্ট করতে হবে। আর উনাকে সন্তুষ্ট করতে হলে উনার ইত্তিবা বা অনুসরণ করতে হবে। তাহলেই মহান আল্লাহ পাক উনার মুহব্বত মুবারক পাওয়া যাবে, সন্তুষ্টি মুবারক পাওয়া যাবে এবং উনার ক্ষমা ও দয়া মুবারক পাওয়া যাবে।

পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে আরো ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

أَطِيْعُوا اللهَ وَأَطِيْعُوْا الرَّسُوْلَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنْكُمْ

অর্থ: তোমরা মহান আল্লাহ পাক উনার আনুগত্য করো এবং উনার মহাসম্মানিত রসূল, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার আনুগত্য করো এবং উনার যারা ক্বায়িম-মাক্বাম তথা পরিপূর্ণ অনুসারী হযরত উলিল আমর অর্থাৎ হযরত আহলু বাইত শরীফ আলাইহিমুস সালাম, হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম এবং হযরত আউলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনাদের আনুগত্য করো। (পবিত্র সূরা নিসা শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ৫৯)

প্রতিভাত হলো, মহান আল্লাহ পাক উনাকে মুহব্বত করা ফরয, উনাকে সন্তুষ্ট করা ফরয, উনার আনুগত্য করা বা আদেশ-নিষেধসমূহ পালন করা ফরয, উনার প্রতি সঠিক আক্বীদা পোষণ করা ফরয, এবং উনার প্রতি হুসনেযন বা সুধারণা পোষণ করা ফরয।

একইভাবে মহান আল্লাহ পাক উনার মহাসম্মানিত হাবীব নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার প্রতি সঠিক আক্বীদা অর্থাৎ আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াত উনাদের আক্বীদা মুতাবিক আক্বীদা পোষণ করা ফরয এবং উনার প্রতি হুসনেযন বা সুধারণা পোষণ করা ফরয, উনাকে মুহব্বত করা ফরয, উনাকে সন্তুষ্ট করা ফরয, উনার আনুগত্য বা আদেশ-নিষেধ মুবারক সমূহ পালন করা ফরয, উনার ছানা-ছিফত মুবারক করা ফরয, উনার জন্য খরচ করা ফরয।

অনুরূপ উনার মহাসম্মানিত হযরত আহলু বাইত শরীফ আলাইহিমুস সালাম তথা উনার মহাসম্মানিত আব্বা আলাইহিস সালাম ও উনার মহাসম্মানিতা আম্মা আলাইহাস সালাম, হযরত উম্মাহাতুল মু’মিনীন আলাইহিন্নাস সালাম, হযরত আবনাউ রসূলিল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, হযরত বানাতু রসূলিল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, হযরত সিবত্বাতু রসূলিল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, হযরত আসবাতু রসূলিল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং উনার পূর্বপুরুষ পিতা-মাতা আলাইহিমুস সালাম-আলাইহিন্নাস সালাম উনাদের সকলের প্রতি সঠিক আক্বীদা ও হুসনেযন বা সুধারণা পোষণ করা ফরয, উনাদেরকে মুহব্বত করা ফরয, উনাদের ছানা-ছিফত মুবারক করা ফরয।

অনুরূপভাবে হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদেরকেও মুহব্বত করা ফরয, উনাদের প্রতি হুসনেযন ও বিশুদ্ধ আক্বীদা পোষণ করা ফরয এবং উনাদেরকে অনুসরণ করা ফরয।

একইভাবে হযরত আউলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনাদের প্রতিও বিশুদ্ধ আক্বীদা ও সুধারণা পোষণ করা ফরয, উনাদেরকে মুহব্বত করা ফরয এবং উনাদের নিকট বাইয়াত হওয়া ফরয, উনাদের ছোহবত মুবারক ইখতিয়ার করা ফরয এবং উনাদের আদেশ-নিষেধসমূহ পালন করা ফরয। উনাদেরকে অনুসরণ করা ফরয।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র হাবীব নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মহাপবিত্র বিলাদতী শান মুবারক প্রকাশ উপলক্ষে খুশি মুবারক প্রকাশ করা তথা মহাসম্মানিত সাইয়্যিদুল আ’ইয়াদ শরীফ পালন করা ফরয। এ সর্বশ্রেষ্ঠ ফরয ইবাদতের যারা বিরোধিতা করছে তারা না জানার কারণেই বিরোধিতা করছে। এমন অনেক বিষয় রয়েছে, যা পালন করা ফরয কিন্তু তা কিতাবে ফরয হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি, যদিও তা মহান আল্লাহ পাক উনার এবং উনার মহাসম্মানিত রসূল, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার তথা উনাদের আদেশ-নির্দেশ মুবারক উনার ভিত্তিতেই ফরয হিসেবে সাব্যস্ত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ সাধারণভাবে মুসলমানরা মনে করে থাকে, পবিত্র সুন্নত মুবারকসমূহ পালন করা সুন্নত। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সুন্নত মুবারকসমূহ পালন করা ফরয। যেমন এ প্রসঙ্গে বর্ণিত রয়েছে, হাম্বলী মাযহাবের ইমাম হযরত ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি একবার ফতওয়া দিলেন যে, “পবিত্র সুন্নত মুবারকসমূহ পালন করা ফরয।” তিনি যখন এ ফতওয়া দিলেন তখন উনার সময়কার যারা ইমাম, মুজতাহিদ ও ফক্বীহ ছিলেন উনারা উনার সাক্ষাতে আসলেন। এসে বললেন, ‘হে হযরত ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি! আমরা আপনাকে ইমাম, মুজতাহিদ ও ফক্বীহ মনে করি। অথচ আপনি কি করে পবিত্র সুন্নত উনাকে ফরয ফতওয়া দিলেন? এর স্বপক্ষে আপনার কোন দলীল আছে কি? কারণ মহান আল্লাহ পাক তিনি বলেছেন-

هَاتُوْا بُرْهَانَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِيْنَ

অর্থ: “যদি তোমরা সত্যবাদী হও তাহলে দলীল পেশ করো।” (পবিত্র সূরা বাক্বারা শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ১১১)

হযরত ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বললেন, “হ্যা,ঁ এ ব্যাপারে ক্বিত্য়ী বা অকাট্য দলীল রয়েছে। অর্থাৎ পবিত্র কুরআন শরীফ উনার থেকে দলীল রয়েছে। তা হলো, মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

وَمَاۤ اٰتَاكُمُ الرَّسُوْلُ فَخُذُوْهُ وَمَا نَـهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوْا ۚ وَاتَّقُوا اللهَ ۖ إِنَّ اللهَ شَدِيْدُ الْعِقَابِ

অর্থ: আমার মহাসম্মানিত হাবীব নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি তোমাদেরকে যা দিয়েছেন তা আঁকড়ে ধরো তথা পালন করো আর তিনি তোমাদেরকে যা থেকে বিরত থাকতে বলেছেন তা থেকে বিরত থাকো। এ বিষয়ে মহান আল্লাহ পাক উনাকে ভয় করো। নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ পাক তিনি কঠিন শাস্তিদাতা। (পবিত্র সূরা হাশর শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ৭)

এ পবিত্র আয়াত শরীফ উনার দ্বারা মহান আল্লাহ পাক উনার মহাসম্মানিত হাবীব নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র সুন্নত মুবারকসমূহ পালন করা ফরয প্রমাণিত হয়েছে।”

তিনি যখন পবিত্র আয়াত শরীফখানা পেশ করলেন তখন যে সকল ইমাম, মুজতাহিদ ও ফক্বীহ আগমন করেছিলেন উনারা স্বীকার করলেন যে, সত্যিই পবিত্র সুন্নত মুবারকসমূহ পালন করা ফরয।

তদ্রƒপ অত্যধিক গুরুত্বপূর্ণ ও ফযীলতপূর্ণ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ ফরয ইবাদত বা আমল হচ্ছেন মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র সাইয়্যিদুল আ’ইয়াদ শরীফ পালন করা। অর্থাৎ মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র হাবীব, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি যমীনে তাশরীফ নিয়েছেন অর্থাৎ পবিত্র বিলাদতী শান মুবারক প্রকাশ করেছেন সেজন্য খুশি মুবারক প্রকাশ করা। আর এজন্য স্বয়ং যিনি খলিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক তিনিই আদেশ মুবারক করেছেন। যেমন পবিত্র সূরা ইউনুস শরীফ উনার ৫৭ ও ৫৮ নং পবিত্র আয়াত শরীফ উনার মধ্যে মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

يَاۤ أَيُّهَا النَّاسُ قَدْ جَآءَتْكُم مَّوْعِظَةٌ مِّن رَّبِّكُمْ وَشِفَآءٌ لِّمَا فِي الصُّدُوْرِ وَهُدًى وَّرَحْمَةٌ لِّلْمُؤْمِنِيْنَ. قُلْ بِفَضْلِ اللهِ وَبِرَحْمَتِهٖ فَبِذٰلِكَ فَلْيَفْرَحُوْا هُوَ خَيْرٌ مِّـمَّا يَجْمَعُوْنَ

অর্থ: হে মানুষেরা, তোমাদের নিকট মহান আল্লাহ পাক উনার তরফ থেকে মহান নছীহতকারী, অন্তরের মহান শিফা দানকারী, মহান হিদায়েত দানকারী এবং মু’মিনদের জন্য মহান রহমত দানকারী আগমন করেছেন অর্থাৎ আমার মহাসম্মানিত হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি তাশরীফ মুবারক নিয়েছেন। (সুতরাং তাদেরকে) বলে দিন, মহান আল্লাহ পাক উনার মহাসম্মানিত ফদ্বল ও মহাসম্মানিত রহমত মুবারক তথা আপনাকে তারা পেয়েছে এ কারণে তারা যেন অবশ্যই খুশি মুবারক প্রকাশ করে। এটা তাদের সমস্ত নেক আমল বা ইবাদত থেকে শ্রেষ্ঠ।

অর্থাৎ মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র হাবীব, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি যেহেতু কায়িনাতবাসী সকলের জন্যেই মহাসম্মানিত রসূল হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন সেহেতু উনাকে পাওয়ার কারণে মানুষ তো অবশ্যই কায়িনাতবাসী সকলকেই খুশি মুবারক প্রকাশ করতে হবে। কেননা কায়িনাতবাসী তথা মাখলূকাত উনার কারণেই অস্তিত্ব লাভ করেছে অর্থাৎ উনার মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র ওজুদ পাক নূর মুবারক উনার থেকে কুদরতীভাবে সৃষ্টি হয়েছে। সুবহানাল্লাহ!

যার কারণে কায়িনাতবাসী সকলের প্রতি ফরয করে দেয়া হয়েছে যে, তাদের যিনি মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র রসূল, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার তাশরীফ মুবারক আনয়নে তথা মহাপবিত্র বিলাদতী শান মুবারক প্রকাশার্থে অবশ্যই যেন খুশি মুবারক প্রকাশ করে। এই খুশি মুবারক প্রকাশ করার সম্মানিত আমল বা ইবাদত তাদের কৃত সমস্ত আমল বা ইবাদত থেকে শ্রেষ্ঠ। সুবহানাল্লাহ!

উল্লেখ্য, মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র হাবীব নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মহাপবিত্র বিলাদতী শান মুবারক প্রকাশ উপলক্ষে খুশি মুবারক প্রকাশ করা তথা মহাসম্মানিত সাইয়্যিদুল আ’ইয়াদ শরীফ পালন করা সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত এবং সর্বশ্রেষ্ঠ ফরয এই কারণে যে, এই মহাসম্মানিত ইবাদত মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র হাবীব, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাথে নিছবতযুক্ত এবং উনার জন্যেই করা হয়। তাছাড়া স্বয়ং যিনি খলিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক তিনি নিজেই উনার মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র হাবীব, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার জন্য দায়িমীভাবে খুশি মুবারক প্রকাশ করে যাচ্ছেন এবং উনার ছানা-ছিফত মুবারক করে যাচ্ছেন। সুবহানাল্লাহ!

যেমন এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

إِنَّ اللهَ وَمَلآئِكَتَهٗ يُصَلُّوْنَ عَلَى النَّبِيِّ

অর্থ: “নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ পাক তিনি এবং উনার সকল হযরত ফেরেশতা আলাইহিমুস সালাম উনারা মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র হাবীব নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার প্রতি ছলাত শরীফ পেশ করেন অর্থাৎ উনার ছানা-ছিফত মুবারক করেন এবং উনার জন্যে খুশি মুবারক প্রকাশ করেন।” (পবিত্র সূরা আহযাব শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ৫৬)

অতএব, যেখানে স্বয়ং যিনি খলিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক তিনি মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র হাবীব, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার জন্য খুশি মুবারক প্রকাশ করতঃ দায়িমীভাবে উনার ছানা-ছিফত মুবারক করে যাচ্ছেন সেক্ষেত্রে উম্মতের প্রতিও একই কর্তব্য হচ্ছে, মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র হাবীব, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার জন্য দায়িমীভাবে ছানা-ছিফত মুবারক করতঃ খুশি মুবারক প্রকাশ করা।

উক্ত ফরয ইবাদত উম্মত যখন অত্যধিক মুহব্বত ও সাধ্য-সামর্থ্য অনুযায়ী এবং পূর্ণ সাখাওয়াতীর সাথে পালন করবে তখন তাদের পক্ষে সীমাহীন রহমত, বরকত, নিয়ামত, মাগফিরাত, নাজাত ও শাফায়াত মুবারক লাভ করা সহজ ও সম্ভব হবে। সুবহানাল্লাহ!

যেমন এ প্রসঙ্গে মহসম্মানিত ও মহাপবিত্র হাবীব, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক করেন-

مَنْ عَظَّمَ مَوْلِدِىْ وَهُوَ لَيْلَةُ اثْنَـىْ عَشَرَ مِنْ رَّبِيْع الْاَوَّلِ بِاتِّـخَاذِهٖ فِيْهَا طَعَامًا كُنْتُ لَهٗ شَفِيْعًا يَّوْمَ الْقِيَامَةِ

অর্থ: যে ব্যক্তি আমার মহাসম্মানিত বরকতময় বিলাদত শরীফ মহাপবিত্র ১২ই রবীউল আউওয়াল শরীফ মহিমান্বিত রাত (ও দিবস) উনাকে খাদ্য খাওয়ানোর মাধ্যমে যথাযথভাবে সম্মান করবে, আমি ক্বিয়ামতের দিন তার জন্য মহান শাফায়াতকারী হবো। সুবহানাল্লাহ! (নি’মতে কুবরা উর্দূ ১১ পৃষ্ঠা)

সুপ্রসিদ্ধ আন নি’মাতুল কুবরা আলাল আলাম কিতাবে পবিত্র হাদীছ শরীফ বর্ণিত হয়েছে, যে ব্যক্তি মহাসম্মানিত সাইয়্যিদুল আ’ইয়াদ শরীফ পালন করবে মহান আল্লাহ পাক তিনি তার জন্য রহমত মুবারক উনার সমস্ত দরজা খুলে দিবেন, তার জন্য সকল হযরত ফেরেশতা আলাইহিমুস সালাম উনারা ক্ষমা প্রার্থনা করবেন এবং হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদের ন্যায় সে ব্যক্তি নাজাত ও ফযীলত লাভ করবে। সুবহানাল্লাহ!

অতএব, একথা দিবালোকের চেয়েও সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত যে, সম্মানিত দ্বীন ইসলাম সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সাধারণভাবে ইলিম দেয়ার জন্য যে ১৩০টি ফরযের বিষয়ে উল্লেখ করা হয়, সেগুলো ছাড়াও আরো অনেক ফরয রয়েছে। যেগুলো পালন না করা ব্যতীত ঈমানদার থাকা কখনোই সম্ভব নয়। একইভাবে আরো সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত যে, পবিত্র সাইয়্যিদুল আ’ইয়াদ শরীফ পালন করা সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ফরয ইবাদত। সুবহানাল্লাহ!

 

মুহম্মদ মাহবুবুর রহমান

নেত্রকোনা

 

সুওয়াল: কুরবানী করার সুন্নতী পদ্ধতি জানালে খুশি হবো।

জাওয়াব: কুরবানীর পশুর মাথা দক্ষিণ দিকে এবং পা পশ্চিম দিকে রেখে অর্থাৎ ক্বিবলামুখী করে শোয়ায়ে পূর্ব দিক থেকে চেপে ধরতে হবে, তারপর কুরবানী করতে হবে। আর কুরবানী করার সময় খেয়াল রাখতে হবে যে, সীনার উপরে নরম স্থানের উপর থেকে গলার মধ্যে একটি উঁচু হাড় রয়েছে: উভয়ের মাঝামাঝি স্থানে যেন যবেহ করা হয়। আরো উল্লেখ্য যে, গলাতে চারটি রগ রয়েছে, তন্মধ্যে গলার সম্মুখভাগে দুটি- খাদ্যনালী ও শ্বাসনালী এবং দু’পার্শ্বে দুটি রক্তনালী। এ চারটির মধ্যে খাদ্যনালী, শ্বাসনালী এবং দুটি রক্তনালীর মধ্যে একটি অবশ্যই কাটতে হবে। অর্থাৎ চারটি রগ বা নালীর মধ্যে তিনটি অবশ্যই কাটতে হবে, অন্যথায় কুরবানী হবে না। যদি সম্ভব হয়, তবে ছুরি চালানোর সময় বিজোড় সংখ্যার প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে।

কুরবানীর নিয়ত: (যবেহ করার পূর্বে)

إِنِّـيْ وَجَّهْتُ وَجْهِيَ لِلَّذِيْ فَطَرَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ حَنِيْفًا ۖ وَّمَا أَنَا مِنَ الْمُشْرِكِيْنَ. إِنَّ صَلَاتِيْ وَنُسُكِيْ وَمَـحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلّٰهِ رَبِّ الْعَالَمِيْنَ. لَا شَرِيْكَ لَهٗ ۖ وَبِذٰلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا مِنَ الْمُسْلِمِيْنَ. اَللّٰهُمَّ مِنْكَ وَلَكَ.

উচ্চারণ: ইন্নী ওয়াজ্জাহ্তু ওয়াজহিয়া লিল্লাযী ফাত্বারাস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ্বা হানীফাঁওঁ ওয়ামা আনা মিনাল মুশরিকীন। ইন্না ছলাতী ওয়া নুসুকী ওয়া মাহ্ইয়া ইয়া ওয়া মামাতী লিল্লাহি রব্বিল আলামীন। লা শারীকালাহূ ওয়া বি যালিকা উমিরতু ওয়া আনা মিনাল মুসলিমীন। আল্লাহুম্মা মিনকা ওয়া লাকা।

এ দোয়া পড়ে-

بِسْمِ اللهِ اَللهُ اَكْبَرُ

‘বিস্মিল্লাহি আল্লাহু আকবার’ বলে যবেহ করতে হবে।

যবেহ করার পর এ দোয়া পড়বে-

اَللّٰهُمَّ تَقْبَلْهُ مِنِّـىْ كَمَا تَقَبَّلْتَ مِنْ حَبِيْبِكَ سَيِّدِنَا حَبِيْبِنَا نَبِيِّنَا شَفِعِنَا رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَخَلِيْلِكَ سَيِّدِنَا حَضْرَتْ إِبْرَاهِيْمَ عَلَيْهِ السَّلَامُ وَذَبِيْحِكَ سَيِّدِنَا حَضْرَتْ اِسْـمَاعِيْلَ عَلَيْهِ السَّلَامُ

উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা তাক্বাব্বালহু মিন্নী কামা তাক্বাব্বালতা মিন হাবীবিকা সাইয়্যিদিনা হাবীবিনা নাবিয়্যিনা শাফিয়িনা রাসূলিল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও খলীলিকা সাইয়্যিদিনা হযরত ইবরাহীমা আলাইহিস সালাম ও যাবীহিকা সাইয়্যিদিনা হযরত ইসমাইল আলাইহিস সালাম।

যদি নিজের কুরবানী হয়, তবে مِنِّـىْ (মিন্নী) বলতে হবে। আর যদি অন্যের কুরবানী হয়, তবে مِنْ (মিন) শব্দের পর যার বা যাদের কুরবানী, তার বা তাদের নাম উল্লেখ করতে হবে। আর যদি অন্যের সাথে শরীক হয়, তাহলে مِنِّـىْ (মিন্নী)ও বলবে, অতঃপর مِنْ (মিন) বলে অন্যদের নাম বলতে হবে। কেউ যদি উপরোক্ত নিয়ত না জানে, তাহলে যবেহ করার সময় শুধু বিস্মিল্লাহি আল্লাহু আকবার বলে কুরবানী করলেও শুদ্ধ হয়ে যাবে। কারণ নিয়ত অন্তরের সাথে সম্পর্কযুক্ত। তবে অবশ্যই প্রত্যেক যবেহকারীর উচিত উপরোক্ত নিয়ত শিক্ষা করা। কেননা উপরোক্ত নিয়ত পাঠ করে পবিত্র কুরবানী করা সুন্নতের অন্তর্ভুক্ত।

{দলীলসমূহ: মুসনাদে আহমদ, আবূ দাউদ শরীফ, তিরমিযী শরীফ, দারিমী শরীফ, ইবনে মাজাহ শরীফ, মিশকাত শরীফ, বজলূল মযহুদ, মিরকাত, আলমগীরী, শামী, দুররুল মুখতার, আইনুল হিদায়া ও বাহরুর রায়িক ইত্যাদি।}

আহমদ মা’রূফা জান্নাত

নূরানীবাদ

 

সুওয়াল: কুরবানী ওয়াজিব হওয়ার শর্তসমূহ কি?

জাওয়াব: পবিত্র কুরবানী ওয়াজিব হওয়ার জন্য শর্ত হচ্ছে- (১) মুসলমান হওয়া, (২) স্বাধীন হওয়া, (৩) মুক্বীম হওয়া, (৪) বালেগ হওয়া, (৫) মালিকে নিসাব হওয়া, (৬) পাগল না হওয়া অর্থাৎ আক্বলমন্দ হওয়া।

পবিত্র যিলহজ্জ শরীফ মাস উনার ১০ তারিখের ছুবহে ছাদিক হতে ১২ তারিখের সূর্যাস্তের পূর্ব পর্যন্ত সময়ের মধ্যে যদি কেউ মালিকে নিসাব হয় অর্থাৎ হাওয়ায়িজে আছলিয়াহ (নিত্য প্রয়োজনীয় ধন-সম্পদ) বাদ দিয়ে সাড়ে ৭ ভরি স্বর্ণ বা সাড়ে ৫২ ভরি রূপা বা তার সমপরিমাণ মূল্যের মালিক হয়, তাহলে তার উপর পবিত্র কুরবানী ওয়াজিব।

উল্লেখ্য যে, যদি কারো নিকট প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ থাকে এবং তা যদি নিসাব পরিমাণ হয়, যেমন- কারো পাঁচটি ঘর আছে, একটির মধ্যে সে থাকে আর তিনটির ভাড়া দিয়ে সে সংসার চালায় আর একটি অতিরিক্ত, যার মূল্য নিসাব পরিমাণ। এ ক্ষেত্রে তার উপরে পবিত্র কুরবানী ওয়াজিব হবে। (আলমগীরী, শামী, আইনুল হিদায়া, ফতহুল কাদীর, গায়াতুল আওতার, শরহে বিকায়া, বাহর, দুররুল মুখতার, কাজীখান, ইনায়া)

পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

عَنْ حَضْرَتْ اَبِـي هُرَيْرَةَ رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَنْ وَجَدَ سَعَةً فَلَمْ يُضَحِّ فَلَا يَقْرَبَنَّ مُصَلَّانَا.

অর্থ : “হযরত আবূ হুরায়রা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বর্ণনা করেন। নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, সামর্থ থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি কুরবানী করবেনা সে যেনো ঈদগাহের নিকটে না আসে।” (মুসনাদে আহমদ শরীফ)

কাজেই, যাদের উপর কুরবানী ওয়াজিব তাদের উচিত পবিত্র কুরবানী উনার দিন কুরবানী করে মহান আল্লাহ পাক উনার ও উনার হাবীব, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদের সন্তুষ্টি মুবারক ও নৈকট্য হাছিল করা।

পক্ষান্তরে যাদের উপর কুরবানী ওয়াজিব তারা সামর্থ থাকা সত্ত্বেও কুরবানী না করলে সেটা মহান আল্লাহ পাক উনার ও উনার হাবীব, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদের অসন্তুষ্টি কারণ হবে।

পবিত্র কুরবানী ওয়াজিব হওয়ার জন্য ছাহিবে নিসাব হওয়া শর্ত। হারাম উপায়ে অর্জিত মাল যেহেতু উপার্জনকারীর নিজস্ব নয়, তাই তার উপর পবিত্র কুরবানী ওয়াজিব হবে না। বরং তার জন্য প্রধান ফরয হলো- যাদের থেকে হারাম উপায়ে মালগুলো নেয়া হয়েছে, তাদের এ সকল মাল ফেরত দেয়া। (সমূহ ফিক্বাহর কিতাব)

আর যেহেতু কুরবানী ওয়াজিব হওয়ার জন্য অন্যতম শর্ত হচ্ছে মুক্বীম হওয়া, তাই মুসাফিরের উপর কুরবানী করা ওয়াজিব নয়, যদিও সে মালিকে নিসাব হোক না কেন। কিন্তু যদি সে কুরবানী করে, তবে আদায় হয়ে যাবে।

সম্মানিত হানাফী মাযহাব উনার মশহূর ও গ্রহণযোগ্য মতে, “যে ব্যক্তির উপর পবিত্র কুরবানী ওয়াজিব তার পক্ষ থেকেই পবিত্র কুরবানী করতে হবে। ছহিবে নিছাবের পক্ষ থেকে পবিত্র কুরবানী না করে মৃত ব্যক্তি বা অপরের পক্ষ থেকে পবিত্র কুরবানী করা যাবে না, করলে ছহিবে নিছাব ব্যক্তি ওয়াজিব তরকের গুনাহে গুনাহগার হবে।

মূল ফতওয়া হলো, ছহিবে নিছাব ব্যক্তি তার ওয়াজিব কুরবানী আদায় করে সে অন্য যে কোন ব্যক্তি সে মৃত হোক বা জীবিত হোক তাদের পক্ষ থেকে কুরবানী আদায় করতে পারবে।”

 

মুহম্মদ জাহাঙ্গীর হুসাইন

নাটোর

 

সুওয়াল: আনজুমানে মুফিদুল ইসলামে কুরবানীর পশুর চামড়া বা চামড়া বিক্রির অর্থ প্রদান করা জায়িয হবে কি?

জাওয়াব: বর্তমান সময়ে তথাকথিত জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানের একটি হচ্ছে “আনজুমানে মফিদুল ইসলাম”। তারা জনকল্যাণের নামে প্রতিবছর কোটি কোটি টাকার কুরবানী পশুর চামড়া ও চামড়া বিক্রির অর্থ মুসলমানদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে। এই অর্থ তারা আমভাবে খরচ করে থাকে। যেমন রাস্তাঘাট, পানির ব্যবস্থা, বেওয়ারিশ লাশ দাফন করার কাজে; সেটা মুসলমানদেরও হতে পারে আবার বিধর্মীদেরও হতে পারে। অথচ পবিত্র কুরবানীর পশুর চামড়া ও যাকাত-ফিতরা মুসলমান গরিব-মিসকীনদের হক্ব।

তা আমভাবে খরচ করা যাবে না, বরং মুসলমান গরিব-মিসকীনদের মালিক করে দিতে হবে। অর্থাৎ সম্মানিত শরীয়ত উনার নির্ধারিত খাতেই ব্যয় করতে হবে। তাই আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলামে পবিত্র কুরবানীর পশুর চামড়া বা তার মূল্য ও যাকাত-ফিতরা দেয়া হারাম।

শুধু তাই নয়; এদের বিরুদ্ধে টাকা আত্মসাৎ, দুর্নীতি, লাশ গায়েব এবং কঙ্কাল চুরি (কবর থেকে লাশ তুলে কিংবা লাশকে দাফন না করে গরম পানিতে লাশের গোশত ছাড়িয়ে সে লাশের কঙ্কাল উচ্চ দামে বিক্রি করা) ও পাচারকারী দলের সাথে জড়িত থাকার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। যা অনলাইনসহ অনেক মিডিয়াতেই প্রকাশ পেয়েছে। কাজেই, আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামে কুরবানীর পশুর চামড়া বা তার মূল্য ও যাকাত-ফিতরা দেয়ার অর্থ হচ্ছে- টাকা আত্মসাৎ, দুর্নীতি, লাশ গায়েব এবং কঙ্কাল চুরি ও পাচার এসবের মতো হারাম ও গুনাহের কাজে সাহায্য-সহযোগিতা করা। নাউযুবিল্লাহ!

তাছাড়া পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত ৮ খাতের কোনো খাতের মধ্যেই আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলাম পড়ে না। তাই এদেরকে কুরবানীর পশুর চামড়া ও যাকাত, ফিতরা দিলে তা কস্মিনকালেও আদায় তো হবেই না; বরং গুনাহ হবে।

অনুরূপভাবে কোন জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনকেও যাকাত, ফিতরা ও কুরবানী পশুর চামড়া দেয়া জায়িয হবে না। কারণ- (১) তারা তা ধনী-গরীব, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে খরচ করে থাকে। যেমন রাস্তা-ঘাট, পানির ব্যবস্থা, বেওয়ারিশ লাশ দাফন করার কাজে। অথচ কুরবানী পশুর চামড়া মুসলমান গরীব-মিসকীনদের হক্ব। (২) মুসলমান গরীব-মিসকীনদের হক্ব ধনীদেরকে প্রদানের মাধ্যমে তাদের ইবাদত-বন্দেগী বিনষ্ট করছে। নাঊযুবিল্লাহ! (৩) মুসলমান গরীব-মিসকীনদের হক্ব মুসলমানদের শত্রু কাফির-মুশরিকদের উপকারার্থে ব্যবহার করা হচ্ছে। নাঊযুবিল্লাহ! (৪) এ সমস্ত প্রতিষ্ঠান ইসলামী শরীয়ত নির্ধারিত যাকাত, ফিতরা, মানত, কুরবানী পশুর চামড়া বা বিক্রিত অর্থ প্রদানের কোন খাতের আওতাভুক্তই নয়।

মুহম্মদ ফজলে রাব্বী

নূরানীগঞ্জ

 

সুওয়াল: কুরবানীর পশুর বৈশিষ্ট্য কি বা কি ধরণের পশু কুরবানী করতে হবে?

জাওয়াব: পবিত্র কুরবানীর জন্য পশু দোষ-ত্রুটি মুক্ত হওয়া বাঞ্ছনীয়। পশুর ত্রুটিগুলি দু’ভাগে বিভক্ত। (এক) আয়িবে ফাহিশ অর্থাৎ বড় ধরনের দোষ বা ত্রুটি। যার কোন একটি পশুর মধ্যে থাকলে উক্ত পশু দ্বারা কুরবানী শুদ্ধ হবে না। যেমন- এমন দূর্বল পশু, যার হাড়ে মজ্জা বা মগজ শুকিয়ে গেছে। অথবা যে সকল পশু কুরবানীর জায়গা পর্যন্ত হেঁটে যেতে পারেনা। সেসব পশুর একটি পা এরূপ নষ্ট হয়ে গেছে যে, উক্ত পা দ্বারা চলার সময় কোন সাহায্য নিতে পারে না। যে পশুর কান অথবা লেজের তিনভাগের একভাগ কাটা গেছে, যে পশুর শিং-এর গোড়া থেকে ভেঙ্গে গেছে, যে পশুর কান একেবারে গজায় নেই, অর্ধেক দাঁত পড়ে গেছে ইত্যাদি পশু দ্বারা কুরবানী শুদ্ধ হবে না। (দুই) আয়িবে ইয়াসির অর্থাৎ সাধারণ দোষ বা ত্রুটি। যে দোষ-ত্রুটি থাকলে কুরবানী শুদ্ধ হবে। যেমন যে পশুর কোন এক অঙ্গের এক তৃতীয়াংশের কম নষ্ট হলে উক্ত পশু দ্বারা কুরবানী শুদ্ধ হবে। অথবা যে পশুর অর্ধের বেশী যদি দাঁত থাকে, উক্ত পশু দ্বারা কুরবানী জায়িয রয়েছে। অথবা যে পশুর শিং একেবারে উঠেনি, উক্ত পশু দ্বারা কুরবানী শুদ্ধ হবে।

হযরত বারা ইবনে আযিব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত-

اَشَارَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِيَدِه وَيَدِيْ قَصْرٌ مِنْ يَدِه اَرْبَع لَايُضَحّىْ بِـهِنَّ اَلْعَوْرَاء اَلْبَيّنُ عَوْرُهَا وَالْـمَرِيْضَةُ اَلْبَيّنُ مَرْضُهَا وَالْعَرْجَاء اَلْبَيّنُ ظَلْعُهَا وَالْعَجْفَاءَ اَلَّتِيْ لَا تُنْقِي فَقَالُوْا لِلْبَرَاءِ فَاِنـَّمَا نَكَرَهُ النُّقْصَ فِي السّنّ وَالْاُذْنِ وَالذَّنْبِ قَالَ فَاكْرِهُوْا مَا شِئْتُمْ وَلَا تُـحَرّمُوْا عَلٰى النَّاسِ.

অর্থ : “সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি হাত মুবারক দিয়ে ইশারা মুবারক করেন, আমার হাত মুবারক তো উনার হাত মুবারক থেকে ছোট এবং বলেন, ‘চার ধরণের পশু দ্বারা কুরবানী করা যায় না- ১) যে পশুর চোখের দৃষ্টিহীনতা সুস্পষ্ট, ২) যে পশু অতি রুগ্ন, ৩) যে পশু সম্পূর্ণ খোড়া এবং ৪) যে পশু এত জীর্র্ণ-শীর্র্ণ যে তার হাড়ে মগজ নেই।’ হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনারা বললেন, আমরা তো দাঁত, কান ও লেজে ত্রুটিযুক্ত প্রাণী দ্বারাও কুরবানী করা অপছন্দ করি। তিনি বললেন, যা ইচ্ছা অপছন্দ করতে পারেন তবে তা অন্যের জন্য হারাম করবেন না।” (আবূ দাঊদ শরীফ, নাসায়ী শরীফ, তিরমিযী শরীফ)

হযরত ইমামুল আউওয়াল কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম উনার থেকে বর্ণিত-

اَمَرَنَا رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اَنْ نَسْتَشْرِفَ الْعَيْنَ وَالْاُذْنَ وَاَنْ لَّانُضَحِّيَ بِـمُقَابَلَةِ وَلَا مُدَابَرَةِ وَلَا شَرْقَاءَ وَلَا خَرْقَاءَ.

অর্থ : “সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি আমাদের আদেশ মুবারক করেন, আমরা যেন পবিত্র কুরবানী উনার পশুর চোখ ও কান ভালোভাবে লক্ষ্য করি এবং ওই পশু দ্বারা কুরবানী না করি, যার কানের অগ্রভাগ বা পশ্চাদভাগ কর্তিত। তদ্রুপ যে পশুর কান লম্বার ফাঁড়া বা কান গোলাকার ছিদ্রযুক্ত।” (আবূ দাঊদ শরীফ, নাসায়ী শরীফ, তিরমিযী শরীফ, ইবনে মাজাহ শরীফ)

হযরত কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম উনার থেকে আরো বর্ণিত আছে-

نَـهٰى رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اَنْ نُضَحِّى بِاَعْضَبِ الْقَرْنِ وَالْاُذْنِ.

অর্থ : “নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি আমাদের শিং ভাঙ্গা বা কান-কাটা পশু দ্বারা পবিত্র কুরবানী করতে নিষেধ করেছেন।” (ইবনে মাজাহ শরীফ)

অন্যত্র বর্ণিত আছে-

وَلَاتَذْبَـحُوْا عَجْفَاءَ وَلَا عَرْجَاءَ وَلَا عَوْرَاءَ وَلَامَقْطُوْعَةَ الْاُذْنِ وَلَوْ وَاحِدَةً

অর্থ : “তোমরা ক্ষীণ-দুর্বল, পঙ্গু, চক্ষুহীণ ও কান কাটা পশু যদিও একটি কান হয়। এমন পশু কুরবানী করবে না।

অর্থাৎ নিম্নোক্ত দোষ-ত্রুটিযুক্ত পশু কুরবানী করলে কুরবানী ছহীহ হবে না-

(১) শিং ভাঙ্গা (২) কান কর্তিত বা গোলাকার ছিদ্রযুক্ত, (৩) চক্ষুহীন বা দৃষ্টিহীনতা সুস্পষ্ট, (৪) নাক কাটা, (৫) ঠোঁট কাটা বা দাঁত ভাঙ্গা, (৬) পা খোড়া বা পঙ্গু, (৭) লেজ কর্তিত, (৮) খুজলী/পাচড়াযুক্ত (৯) অতি রুগ্ন বা এমন জীর্ণ শীর্ণ যে তার হাড়ে মগজ নেই, (১০) ত্রুটিযুক্ত বাঁট, (১১) পিছন দিক ত্রুটিযুক্ত।

পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ও ফিক্বাহ্র কিতাবে উল্লেখ করা হয়েছে, কোন প্রাণীর কোন এক অঙ্গ যেমন- কান, লেজ ইত্যাদির এক তৃতীয়াংশের বেশী নষ্ট হয়ে গেলে তা দ্বারা কুরবানী করা জায়িয নেই। কোন কোন ক্ষেত্রে যেমন দাঁত অর্ধেকের বেশী যদি থাকে, তাহলে তা দিয়ে কুরবানী করা দুরুস্ত রয়েছে। এ উছূলের উপর ক্বিয়াস করে কোন কোন আলিম নামধারী মূর্খ ও গুমরাহ লোকেরা বলে থাকে যে, খাসী ও বলদ ইত্যাদি প্রাণী দ্বারা কুরবানী করলে নাকি কুরবানী দুরুস্ত হবেনা। নাঊযুবিল্লাহ! অথচ এ ধরণের ক্বিয়াস অশুদ্ধ, নাজায়িয এবং পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার বিরোধী। কেননা স্বয়ং মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি নিজে খাসী কুরবানী করেছেন। যা পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে উল্লেখ রয়েছে-

عَنْ حَضْرَتْ جَابِرٍ رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ قَالَ ذَبَحَ الِنَّبُّى صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمَ الذَّبْحِ كَبْشَيْنِ أَقْرَنَيْنِ اَمْلَحَيْنِ مَوْجَوْئَيْنِ.

অর্থ : “হযরত জাবির রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বর্ণনা করেন। নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি এক কুরবানী উনার দিন সাদা-কালো মিশ্রিত রঙ্গের শিং বিশিষ্ট খাসীকৃত দু’টি তাজা দুম্বা কুরবানী করলেন।” (আবূ দাঊদ শরীফ)

কাজেই, এ পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার দ্বারা এটাই প্রমাণিত হয়, খাসী এবং খাসীকৃত প্রাণী কুরবানী করা জায়িয তো বটেই বরং খাস সুন্নত উনার অন্তর্ভুক্ত। খাসী করার কারণে প্রাণীর মধ্যে ছূরতান (প্রকাশ্য) যে ত্রুটি বা খুঁত হয়, সেটা শরয়ী ত্রুটি বা খুঁতের অন্তর্ভুক্ত নয়।

ইসলামী শরীয়ত উনার দৃষ্টিতে কুরবানী উনার পশুর বয়সের দিকটা খেয়াল রাখা জরুরী। পশুর বয়সের বিষয়টি শুধুমাত্র পবিত্র ঈদুল আযহা উনার কুরবানীর পশুর ক্ষেত্রেই নয় বরং মান্নত, দান, জানের বদলে জানের ছদক্বা, আক্বীক্বার পশুর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

এ প্রসঙ্গে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত রয়েছে-

عَنْ حَضْرَتْ جَابِرٍ رَضِىَ اللهُ تَعَالـٰى عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَا تَذْبَـحُوْا اِلَّا مُسِنَّةً اِلَّا اَنْ يَعْسُرَ عَلَيْكُمْ فَتَذْبَـحُوْا جَذَعَةً مِنَ الضَّأْنِ.

অর্থ : “হযরত জাবির রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার থেকে বর্ণনা করেন, আপনারা মুছিন্না ব্যতীত কুরবানী (যবেহ) করবেন না, তবে সংকটের অবস্থায় ছয় মাস বয়সী ভেড়া-দুম্বা যবেহ করতে পারেন।” (মুসলিম শরীফ, আবূ দাঊদ শরীফ, ইবনে মাজাহ শরীফ, নাসায়ী শরীফ)

মুছিন্না (مُسِنَّة) শব্দের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, উট ৫ বছর হলে, গরু, মহিষ ২ বছর হলে আর খাসী-বকরী, ভেড়া, দুম্বা ইত্যাদি ১ বছর হলে মুছিন্নার হুকুম বর্তায় অর্থাৎ পবিত্র কুরবানী উনার উপযুক্ত হয়। এর কম বয়সের পশুকে কুরবানী করলে কুরবানী হবেনা। তবে শুধুমাত্র ভেড়া ও দুম্বার বেলায় বলা হয়েছে, যদি ৬ মাসের দুম্বা বা ভেড়াকে দেখতে ১ বছরের মত মনে হয় তবে সে দুম্বা বা ভেড়া দিয়ে কুরবানী করলে কুরবানী শুদ্ধ হবে। (কুদূরী, হিদায়া)

মুহম্মদ বদরুল হুদা

কিশোরগঞ্জ

 

সুওয়াল: পবিত্র মীলাদ শরীফ পাঠকালে ক্বিয়াম করার সময় সাধারণত আসসালামু আলাইকুম ইয়া রসূলাল্লাহ, আসসালামু আলাইকুম ইয়া নাবিয়্যাল্লাহ ও আসসালামু আলাইকুম ইয়া হাবীবাল্লাহ বলে সালাম মুবারক পেশ করা হয়। উক্ত নিয়মে সালাম মুবারক পেশ করতে গিয়ে কেউ যদি শুরুতে স্বীয় মুর্শিদ ক্বিবলা আলাইহিস সালাম উনার প্রতি সালাম মুবারক পেশ করার মানসে আসসালামু আলাইকুম ইয়া মুর্শিদ ক্বিবলা বলে এ বিষয়ে ফায়ছালা কি?

জাওয়াব: পবিত্র মীলাদ শরীফ উনার ক্বিয়ামকালে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার প্রতি সালাম মুবারক পেশ করার পূর্বে স্বীয় মুর্শিদ ক্বিবলা আলাইহিস সালাম উনার প্রতি সালাম মুবারক পেশ করাটা শর্ত নয়। তবে কেউ যদি সালাম মুবারক পেশ করে সেটা জায়িয রয়েছে।

কেননা সম্মানিত কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা হচ্ছেন নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পরিপূর্ণ ক্বায়িম-মাক্বাম।

এ প্রসঙ্গে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

اَلشَّيْخُ لِقَوْمِهٖ كَالنَّبِـىِّ فِـىْ اُمَّتِهٖ

অর্থ: সম্মানিত শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা তিনি উনার ক্বওম তথা মুরীদের নিকট তদ্রূপ সম্মানিত ও অনুসরণীয় যেরূপ নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি উনার উম্মতের নিকট সম্মানিত ও অনুসরণীয়। (বায়হাক্বী শরীফ, আল ফিরদাউস লিদ দাইলামী, মাক্বাছিদুল হাসানাহ, তানজিহুশ্ শরীয়াহ্, মিজান, জামিউস্ সগীর লিস্ সুয়ূতী, দুরারুল মুন্তাশিরাহ্ লিস্ সুয়ূতী, মাকতুবাত শরীফ)।

অর্থাৎ যিনি কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা তিনি নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার তরফ থেকে মনোনীত ও নিছবতপ্রাপ্ত খলীফা। আর উনার মাধ্যমেই মুরীদ সমস্ত নিয়ামত মুবারক লাভ করে থাকে। ফলে প্রতিটি নেককাজ সম্পাদনের ক্ষেত্রে সম্মানিত কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনাকে স্মরণ এবং অনুসরণ করাই মুরীদের কর্তব্য।

এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

وَلِكُلٍّ وِّجْهَةٌ هُوَ مُوَلِّيْهَا

অর্থ: প্রত্যেকেরই একটি ক্বিবলা রয়েছে, যেদিকে সে মুখ ফিরায়। (পবিত্র সূরা বাক্বারা শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ১৪৮)

স্মরণীয় যে, ‘ক্বিবলা’ শব্দের আভিধানিক অর্থ জিহাত বা দিক। অনুরূপ কা’বা শব্দের আভিধানিক অর্থ মুরাব্বাউশ শাক্ল বা চতুস্কোণ বিশিষ্ট গৃহ। আর পারিভাষিক অর্থে ক্বিবলা ও কা’বা উভয় শব্দ মুবারক একই অর্থে ব্যবহৃত হয়। আর তা হচ্ছে যার দিকে রুজু বা প্রত্যাবর্তন ও আশ্রয়গ্রহণ করা হয়।

হানাফী মাযহাবের বিখ্যাত ও নির্ভরযোগ্য ফতওয়ার কিতাব ফতওয়ায়ে শামী, দুররুল মুখতার, আইনুল ইয়াক্বীন, আল মাআরিফুল মুহম্মদিয়্যাহ, ক্বলাদাতুল জাওয়াহির, তাহযীবুর রিফাইয়্যাহ, মাওসূআতুর রদ ‘আলাছ ছূফিয়্যাহ ইত্যাদি কিতাবসমূহের মধ্যে উল্লেখ রয়েছে-

اَلشَّيْخُ قِبْلَةُ الْـمُرِيْدِيْنَ وَقِبْلَةُ الْقُلُوْبِ

অর্থাৎ, শায়েখ হচ্ছেন মুরীদগণের ক্বিবলা এবং ক্বলবসমূহের ক্বিবলা।” সুবহানাল্লাহ!

উক্ত বর্ণনার পাশাপাশি আরো উল্লেখ রয়েছে যে, ক্বিবলা পাঁচ প্রকার। যথা-

(১) নামাযের ক্বিবলা- “বাইতুল্লাহ শরীফ।” এজন্য বাইতুল্লাহ শরীফ উনার দিকে মুখ করে পবিত্র নামায আদায় করতে হয়।

(২) দোয়া বা মুনাজাতের ক্বিবলা- “আসমান।” এজন্য হাতের তালুদ্বয় আসমানের দিকে করে মুনাজাত করতে হয়।

(৩) মাখলূক্বাতের ক্বিবলা হচ্ছেন- “সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি।” কেননা তিনি হলেন সৃষ্টির মূল, উনার উসীলাতেই সমস্ত মাখলূক্বাতের সৃষ্টি। সুবহানাল্লাহ!

(৪) সমস্ত ক্বিবলাকে বিলীনকারী ক্বিবলা হচ্ছেন- “স্বয়ং খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক তিনি।” সুবহানাল্লাহ!

(৫) ক্বিবলায়ে কুলূব বা ক্বলবের ক্বিবলা হচ্ছেন- “কামিল শায়েখ বা মুরশিদ ক্বিবলা তিনি।” উনার ফায়িযের মাধ্যমে মহান আল্লাহ পাক উনার ও উনার রসূল, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদের মুহব্বত ও মা’রিফাত লাভ হয় এবং উনার ফায়িযে মুরীদ ফয়যিয়াব বা ফয়েযপ্রাপ্ত হয় এবং ক্বলব ও অন্যান্য লতীফাসমূহে যিকির জারী হয়। অতঃপর ক্বলব (অন্তর)সহ সমস্ত লতীফা পরিশুদ্ধ হয় এবং ইখলাছ পয়দা হয়। আর তখনই মুরীদের পক্ষে গইরুল্লাহ মুক্ত হয়ে একমাত্র মহান আল্লাহ পাক উনার জন্য ইবাদত করা সহজ ও সম্ভব হয়।

শাইখুল মিল্লাত ওয়াদ্ দ্বীন হুজ্জাতুল ইসলাম হযরত ইমাম গাযযালী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, “যদি কোন ব্যক্তি কামিল শায়েখ উনার সন্ধান পায় তখন তার উচিত খানায়ে কা’বা শরীফ উনার ন্যায় উনাকে তা’যীম-তাকরীম করা।” (সিরাতুল মুস্তাকিম)

সুতরাং, নামাযের ক্বিবলা বা কা’বা শরীফ উনার ন্যায় ক্বিবলায়ে কুলূব বা ক্বলবের ক্বিবলার হুরমত রক্ষা করা তথা তা’যীম-তাকরীম করা সর্বাবস্থায় মুরীদের জন্য ফরয উনার অন্তর্ভুক্ত। সেটা উনার উপস্থিতিতে হোক কিংবা অনুপস্থিতিতে হোক, জীবিত অবস্থায় হোক কিংবা ইন্তিকালে হোক।

কেননা, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

بَـجِّلُوا الْـمَشَائِخَ فَاِنَّ تَبْجِيْلَ الْـمَشَائِخِ مِنْ اِجْلَالِ اللهِ عَزَّ وَجَلَّ فَمَنْ لَّـمْ يُبَجِّلْهُمْ فَلَيْسَ مِنَّا.

অর্থ : তোমরা সম্মানিত মাশায়িখগণ উনাদেরকে তা’যীম-তাকরীম করো। কেননা, সম্মানিত মাশায়িখগণ উনাদেরকে তা’যীম-তাকরীম করা মূলতঃ মহান আল্লাহ পাক উনাকেই তা’যীম-তাকরীম করার শামিল। সুতরাং উনাদের তা’যীম-তাকরীম যারা করে না বা উনাদের প্রতি আদব রক্ষা করে না তারা আমাদের দলভুক্ত নয়।” (আত্ তাযকিরাতু ফী আহাদিছীল মুনতাশিরাহ)

হযরত আউলিয়ায়ে কিরামগণ উনারা স্বীয় মুর্শিদ ক্বিবলা উনার প্রতি বিশুদ্ধ আক্বীদা বা বিশ্বাস এবং আদব প্রদর্শনের কারণেই দুনিয়া ও আখিরাতে অমূল্য নিয়ামত ও কামিয়াবী হাছিল করেছেন। সুবহানাল্লাহ!

এ প্রসঙ্গে বর্ণিত হয়েছে, কোন এক কারণে কুদ্ওয়াতুল আরিফীন শায়েখ হযরত আযল তাবরিযী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে কতল (হত্যা) করার জন্য জল্লাদের হাতে অর্পণ করা হয়। জল্লাদ উনাকে কতলের স্থানে নিয়ে ক্বিবলামূখী করে দাঁড় করালো। তখন শায়েখ আযল রহমতুল্লাহি আলাইহি দেখলেন যে, উনার পীর ছাহিবের মাযার শরীফ পিছনে পড়ে। তাই তিনি কা’বা শরীফের দিক হতে মুখ ফিরিয়ে স্বীয় পীর ছাহিব উনার মাযার শরীফের দিকে মুখ করে দাঁড়ালেন। তখন জল্লাদ বললো, ‘আপনি এখন যে অবস্থার সম্মূখীন হয়েছেন তাতে আপনার কা’বা শরীফ উনার দিকেই মুখ করা কর্তব্য।’ শায়েখ আযল রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বললেন, ‘তাতে তোমার মাথা ব্যথা কেন? তোমার কাজ তুমি কর। আমি আমার মুখ নিজ ক্বিবলার দিকেই করে রেখেছি।’ এতে জল্লাদের সাথে তর্ক বেঁধে যায়। আর এরইমধ্যে শাহী দরবার হতে ফরমান (বাদশাহর নির্দেশ) আসে যে, বাদশাহ নিজের ভুল বুঝতে পেরে দরবেশকে কতল করার যে হুকুম দিয়েছিলো তা প্রত্যাহার করেছে। অতএব উনাকে মুক্তি দাও।” (ফাওয়ায়িদুস্ সালিকীন)

আরো বর্ণিত আছে যে, একদা কুতুবুদ্দীন হায়দার রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মুরীদ অতি ক্ষুধার্ত অবস্থায় ইমামুশ শরীয়ত ওয়াত তরীক্বত হুজ্জাতুল ইসলাম হযরত শায়েখ শাহাবুদ্দীন সোহরাওয়ার্দী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার খানকা শরীফে হাযির হয়ে স্বীয় পীর ছাহিবের আবাস স্থলের দিকে মুখ করে প্রার্থনা করতে লাগলেন যে-

يَا قُطُبَ الدِّيْنِ حَيْدَرَ شَيْأً لِلّٰهِ.

অর্থ: “হে কুতুবুদ্দীন হায়দার রহমতুল্লাহি আলাইহি! মহান আল্লাহ পাক উনার উসীলায় আমাকে সাহায্য করুন।” তখন শায়েখ শাহাবুদ্দীন রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার ডাক শুনে নিজ খাদিমকে বললেন, আগন্তুককে আহার করিয়ে উনাকে যেন সংবাদ দেয়া হয়। খাদিম উনাকে আহার করালো। মুরীদ আহার অন্তে পুনরায় স্বীয় পীর ছাহিব উনার আবাস স্থলের দিকে ফিরে উনার শোকর আদায় করে বলতে লাগলেন, “হে কুতুবুদ্দীন হায়দার রহমতুল্লাহি আলাইহি! আমার খুবই উপকার করলেন। আমি এখন পরিতৃপ্ত।” সুবহানাল্লাহ! খাদিম শায়েখ উনাকে এ সংবাদ দিয়ে বললেন যে, এমন অকৃতজ্ঞ লোক আমি কখনও দেখিনি যে, হুযূরের দেয়া খাবার খেয়ে নিজ পীর ছাহিবের কৃতজ্ঞতা জানায়। তখন শায়েখ শাহাবুদ্দীন রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, ঐ ব্যক্তি ছিলেন রিজালুল গায়েব উনাদের অন্তর্ভুক্ত। তোমাদেরকে আদব শিক্ষা দিতে এসেছেন।” সুবহানাল্লাহ! এরূপ অসংখ্য, অগণিত আউলিয়ায়ে কিরাম বিগত হয়েছেন যারা কোন সময় স্বীয় পীর ছাহিবের অবস্থান স্থলের দিকে পা দেয়া তো দূরের কথা পিঠ পর্যন্ত দেননি। এমনকি ইন্তিকালের পরেও উনাদের মাথা মুবারক স্বীয় পীর ছাহিবের অবস্থান স্থলের দিকেই নিবদ্ধ ছিলো। সুবহানাল্লাহ!

কুতুবুল ইরশাদ, হাফিযুল হাদীছ, ফক্বীহুল উম্মত, শাইখুল মিল্লাত, হযরত মাওলানা রূহুল আমীন বশিরহাটী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, আমার পীর ছাহিব ক্বিবলা মুজাদ্দিদুয্ যামান, কুতুবুল আলম, আমিরুশ শরীয়ত ওয়াত্ তরীক্বত হযরত আবু বকর ছিদ্দীক্বী ফুরফুরাবী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনিসহ অনেক মুরীদ-মু’তাক্বিদ আজমীর শরীফ যিয়ারতের উদ্দেশ্যে গেলাম। তারাগড় পাহাড়ে উঠে শহীদগণের মাযার শরীফ যিয়ারত করলাম। সেখানে একটি মাযার শরীফ দেখতে পেলাম যে, উনার মাথা মুবারক স্বীয় পীর ছাহিবের পা মুবারকের দিকে ছিল। বাদশাহ্ আওরঙ্গজেব ২/৩ বার মাযার শরীফটি উত্তর-দক্ষিণ লম্বা করে দিয়েছিলেন আর প্রত্যেকবার মাযার শরীফ হতে আওয়াজ আসত, হে বাদশাহ! হাশরের ময়দানে আমার জাওয়াব আমিই দিব। আপনি কেন আমাকে বিরক্ত করছেন? সুবহানাল্লাহ!

কুতুবুল ইরশাদ, হাফিযুল হাদীছ রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি আরো বলেন, মাহবুবে ইলাহী, সুলত্বানুল আরিফীন, রঈসুল মুহাদ্দিছীন হযরত নিজামুদ্দীন আউলিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মাযার শরীফের পূর্ব দিকে একজন আউলিয়া উনার মাযার শরীফ দেখতে পেলাম, উনার মাথা মুবারকও স্বীয় পীর ছাহিবের পা মুবারকের দিকে পূর্ব-পশ্চিমে রয়েছে।” সুবহানাল্লাহ! (ফুরফুরা শরীফের হযরত পীর ছাহিব ক্বিবলা উনার বিস্তারিত জীবনী ৮২, ৮৩)

এমনকি আমাদের দেশেও এরূপ অনেক ঘটনার অভাব নেই। সিলেটের অদূরে মুরারবন্দ এলাকায় সাইয়্যিদ নাসিরুদ্দীন সিপাহ্সালার রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মাযার শরীফ অবস্থিত। যিনি কুতুবে রব্বানী, সাইয়্যিদুল আউলিয়া, আল্লামাতুল আইয়াম হযরত শাহ্জালাল ইয়ামেনী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার প্রধান খলীফা। উনার মাযার শরীফ পূর্ব-পশ্চিম অবস্থায় আজও বিরাজমান। উল্লেখ্য যে, উনাকেও উত্তর-দক্ষিণ করে কবরে নামানো হলো। কিন্তু রাখার সাথে সাথে পূর্ব-পশ্চিম দিকে হয়ে যায়। অনেক চেষ্টা করেও উত্তর দক্ষিণ দিকে করা সম্ভব হয়নি। অগত্যা উনাকে সেভাবেই রাখা হয়েছে। সুবহানাল্লাহ!

কাজেই, শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা হচ্ছেন ক্বিবলায়ে ক্বল্ব্ তথা অন্তরের ক্বিবলা। নামাযের ক্বিবলার ন্যায় যিনি অন্তরের ক্বিবলা উনার প্রতিও তা’যীম-তাকরীম, আদব বজায় রাখা ফরয। সালিক বা মুরীদ স্বীয় শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার দিকে মুখ করেই যিকির-ফিকির, তাসবীহ-তাহলীল, দোয়া-দুরূদ শরীফ, খানা-পিনা ইত্যাদি সকল কাজ সম্পাদন করবে। মোটকথা, মুরীদের চাওয়া-পাওয়া আপন শায়েখ তিনি। উনার দিকেই অন্তরের রোখকে সবসময় নিবিষ্ট রাখতে হবে।

কাজেই, পবিত্র মীলাদ শরীফ উনার ক্বিয়ামকালে শুরুতে স্বীয় কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনাকে সালাম মুবারক পেশ করে তারপর মহাসম্মানিত হাবীব নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে সালাম মুবারক পেশ করা হলে তরতীব রক্ষার পাশাপাশি নিছবত ও সন্তুষ্টি মুবারক হাছিলের ক্ষেত্রে সহজ হয়। এটা পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র সুন্নাহ শরীফ উনাদের বিধান সম্মত। মূলত নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার প্রতি এবং সম্মানিত কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা আলাইহিস সালাম উনার প্রতি সালাম মুবারক পেশ করার তরতীব একই রকম। এক্ষেত্রে কাছে, দূরে, সম্মুখে বা সাক্ষাতে ও আড়ালে কোনরূপ পার্থক্য নেই।

যেমন নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি যমীনে অবস্থানকালীন উনাকে যেভাবে সালাম মুবারক পেশ করা হতো মহাপবিত্র রওজা শরীফ উনার মধ্যে অবস্থান মুবারক করার পর সেভাবেই সালাম মুবারক পেশ করা হয়ে থাকে। সুবহানাল্লাহ!

তাছাড়া অন্য মু’মিন মুসলমান যমীনবাসী হোন অথবা কবরবাসী হোন উনাদের ক্ষেত্রেও সালাম মুবারক পেশ করার তরতীব একই রকম।

যেমন এ প্রসঙ্গে শরহু ছহীহিল বুখারী লিসসাফারী ১ম খ- ৪০১ পৃষ্ঠায় বর্ণিত হয়েছে-

اِنَّهٗ اِذَا اَتٰى بَابَ اَخِيْهِ اِسْتَأْذَنَ الدُّخُوْلَ عَلَيْهِ، وَلَا يَقُوْمُ قِبَالَةَ الْبَابِ وَيَسْتَأْذِنُ ثَلَاثًا يَقُوْلُ: فِـىْ كُلِّ مَرَّةٍ اَلسَّلَامُ عَلَيْكُمْ يَا اَهْلَ الْبَيْتِ.

অর্থ: যখন কোন ব্যক্তি তার মুসলমান ভাইয়ের ঘরে প্রবেশের জন্য অনুমতি প্রার্থনা করবে তখন সে তার ঘরের দরজা বরাবর দাঁড়াবে না এবং সে তিনবার অনুমতি চাইবে এবং প্রতিবার সে বলবে, “আসসালামু আলাইকুম ইয়া আহলাল বাইত।”

অনুরূপ কবরবাসীকে সালাম দেয়ার ক্ষেত্রে তিরমিযী শরীফ, মিশকাত শরীফ ইত্যাদি হাদীছ শরীফ উনার কিতাবে বর্ণিত হয়েছে-

عَنْ حَضْرَتْ اِبْنِ عَبَّاسٍ رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ قَالَ مَرَّ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِقُبُوْرٍ بِالْمَدِيْنَةِ فَأَقْبَلَ عَلَيْهِمْ بِوَجْهِهٖ فَقَالَ اَلسَّلَامُ عَلَيْكُمْ يَا أَهْلَ الْقُبُوْرِ

অর্থ: হযরত ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বর্ণনা করেন, একবার নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি মদীনা শরীফের কতক কবরের নিকট পৌঁছলেন এবং উনাদের দিকে ফিরে বললেন, আসসালামু আলাইকুম ইয়া আহলাল কুবূর।

উক্ত পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার ব্যাখ্যায় ফতওয়ায়ে আলমগীরী ৫ম খ- ৩৫০ পৃষ্ঠায় উল্লেখ রয়েছে-

فَاِذَا بَلَغَ الْـمَقْبَـرَةَ يَـخْلَعُ نَعْلَيْهِ ثُـمَّ يَقِفُ مُسْتَدْبِرَ الْقِبْلَةِ مُسْتَقْبِلًا لِوَجْهِ الْـمَيِّتِ وَيَقُوْلُ اَلسَّلَامُ عَلَيْكُمْ يَا اَهْلَ الْقُبُوْرِ

অর্থ: যখন কবরস্থানে পৌছবে, সেন্ডেল খুলে নিবে অতঃপর ক্বিবলা পিছন দিকে হলেও মৃত ব্যক্তিকে সম্মুখ দিকে রেখে দাঁড়াবে এবং বলবে, ‘আসসালামু আলাইকুম ইয়া আহলাল কুবূর।’

প্রতিভাত হলো, মুসলমান ব্যক্তি যমীনবাসী হোন অথবা কবরবাসী হোন উনাদেরকে সালাম মুবারক পেশ করার তরতীব একই রকম। আর নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লা উনাকে এবং উনার ক্বায়িম-মাক্বাম কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা আলাইহিস সালাম উনাকে অর্থাৎ উনাদেরকে আসসালামু আলাইকুম বলে উনাদেরকে সম্বোধন করতঃ সালাম মুবারক পেশ করা শুধু জায়িযই নয় বরং সুন্নত মুবারক উনার অন্তর্ভুক্ত।

 

সুওয়াল-জাওয়াব বিভাগ

সুওয়াল-জাওয়াব

বিতির নামায তিন রাকয়াত নাকি এক রাকয়াত?