তাসাউফ মহান আল্লাহ পাক উনার নৈকট্যে লাভের একটি পথ। যাহারা মহান আল্লাহ পাক উনার সন্তুষ্টি অর্জন করিয়া মহান আল্লাহ পাক উনার দরবারে সম্মান ও মর্যাদা লাভের আশা পোষন করে, এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য তাহাদিগকে তিনটি বিষয় পরিপূর্ণভাবে মানিয়া চলিতে হইবে। তিনটি বিষয় হইল- (১) আক্বায়িদ, (২) ফিক্বাহ এবং (৩) তাছাউফ বা অন্তরের বিভিন্ন অবস্থার জ্ঞান। উপরোক্ত তিনটি বিষয়কে হাদীছে জিবরাইল, যাহাকে উম্মুল হাদীছ ও উম্মুল যাওয়ামে বলা হয় তাহাতে বর্ণনা করা হইয়াছে। পবিত্র হাদীছ শরীফখানা হল- হযরত উমর ফারূক আলাইহিস সালাম তিনি বলেন, একদা আমরা নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালাম উনার নিকট উপবিষ্ট ছিলাম, এমন সময় জনৈক অপরিচিত ব্যক্তি আরবীয় বেশে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার হাঁটুর সহিত হাঁটু মিলাইয়া নিজের দুই হাত নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার উরুর উপর রাখিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! ইসলাম কি? আমাকে বলুন। নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলিলেন, মহান আল্লাহ পাক ভিন্ন কোন মাবুদ নাই এবং মুহম্মদ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার রসূল এই কথার সাক্ষ্য প্রদান করা, নামায কয়িম করা, যাকাত আদায় করা, রমযানের রোযা রাখা এবং শক্তি ও সামর্থ থাকিলে হজ্জ করা, ইহাই ইসলাম। আগন্তুক ব্যক্তি বলিলেন, আপনি সত্য বলিয়াছেন। তিনি আবার প্রশ্ন করিলেন, আমাকে বলুন ঈমান কি? নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উত্তর করিলেন- মহান আল্লাহ পাক উনাকে, উনার হযরত ফিরেশতা আলাইহিমুস সালাম উনাদিগকে, হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালামগণ উনাদেরকে, উনার কিতাবসমূহকে, আখিরাত এবং তকদিরের প্রতি বিশ্বাস করা, ইহাই ঈমান। আগন্তুক পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলেন, ইহসান কি? নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উত্তর করিলেন, এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত কর যেন তুমি উনাকে দেখিতেছ আর যদিও তুমি তাহাকে দেখিতে না পাও তাহা হইলে ধারণা কর মহান আল্লাহ পাক তোমাকে দেখিতেছেন। অতঃপর আগন্তুক প্রস্থান করিলে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদিগকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, হে হযরত উমর ইবনুল খত্তাব আলাইহিস সালাম! প্রশ্নকারীকে চিনিতে পারিয়াছেন কি? তিনি জিবরাইল আলাইহিস সালাম। আপনাদিগকে দ্বীন শিক্ষা দেয়ার জন্য আগমন করিয়াছিলেন। (বুখারী, মুসলিম)
উল্লেখিত পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে মধ্যে হযরত জিবরাইল আলাইহিস সালাম নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে পবিত্র দ্বীন ইসলাম, ঈমান ও ইহসান সম্পর্কে প্রশ্ন করিয়াছিলেন। এই পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পবিত্র দ্বীন ইসলাম, ঈমান ও ইহসান সম্পর্কে যা ইরশাদ করেছেন তার ব্যাখ্যায় হযরত শেখ আব্দুল হক মুহাদ্দিস দেহলবী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলিয়াছেন, তোমরা ভালরূপে জানিয়া রাখ ধর্মের বুনিয়াদ ও উহার সম্পূর্ণতা ফেকাহ, ইলমে কালাম যাহাকে ইলমে আকায়েদ বলে এবং ইলমে তাছাউফের উপর নির্ভর করে। পবিত্র হাদীছ শরীফটিতে এই তিনটি বিষয়ের স্থান নির্দেশ করা হইয়াছে। ইসলাম দ্বারা ইলমে ফিকাহের প্রতি ইঙ্গিত করা হইয়াছে যাহা আমল ও শরীয়তের বিধি বিধানের বর্ণনা করে। ঈমানের দ্বারা ইঙ্গিত করিয়াছেন এতেকাদি বা বিশ্বাস সম্বন্ধীয় মাসআলা সমূহের প্রতি, আর ইহসান দ্বারা ইঙ্গিত করিয়াছেন আহলে তাছাউফের দিকে। কাজেই মহান আল্লাহ তায়ালা উনার নৈকট্য লাভ করতে হলে ফিক্বাহ, আকায়েদ ও তাছাউফ অত্যন্ত জরুরী। একটিকে ছাড়া অন্যটি সম্পূর্ণ হইতে পারে না। তাছাউফ ও ফিক্বাহ ঈমান ব্যতীত সম্পূর্ণ হইতে পারে না। আহকামে এলাহী ফিক্বাহ ছাড়া বুঝা যায় না। আবার ফিক্বাহ তাছাউফ ব্যতীত সম্পূর্ণ হয় না। কারণ আমল খাটি নিয়ত (ইখলাছ) ব্যতীত সম্পূর্ণ হইতে পারে না। আর ইলমে তাছাউফের মাধ্যমে ইখলাছ হাছিল হয়। তাছাউফের গুরুত্ব সর্ম্পকে ইমাম মালেক রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, যে ব্যক্তি ফিক্বাহকে গ্রহন করিল কিন্তু তাছাউফকে গ্রহন করিলনা, নিশ্চয়ই সে ফাসেক (গুনাহগার)। মোল্লা আলী কারী রহমতুল্লাহি আলাইহি স্বীয় অন্যতম গ্রন্থ মিরকাতের প্রথম খণ্ডে বলিয়াছেন যে, ইলমে মারেফাত বা তাছাউফ যথাযথভাবে না শিখিলে শরীয়তের হুকুম আহকাম ঠিকমত আদায় করা যায় না।
অতএব, বলা যায় যে, মহান আল্লাহ পাক উনার নৈকট্য লাভের যে তিনটি উপায় আছে, উহারা পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। একটিকে বাদ দিয়া অন্যটি সম্পূর্ণ হইতে পারে না। আর তাই তাছাউফ মহান আল্লাহ পাক উনার নৈকট্য লাভের উপায়গুলির মধ্যে একটি। ফিক্বাহর প্রত্যেকটি আমলের সাথে তাছাউফ সম্পর্কিত। ফিক্বাহর নির্দেশিত আমলগুলি পালন করার সময় প্রত্যেক আমলকারীকে সে আমলের তাছাউফের দিকও পালন করিতে হইবে। যাহারা এখনও তাছাউফ বুঝে নাই তাহারা পরবর্তী আলোচনা হইতে সহজেই তাছাউফ বুঝিতে পারিবে।
তাসাউফ কাকে বলে : পূর্বের আলোচনা হতে জানা গেল যে মহান আল্লাহ পাক উনার নৈকট্য লাভের উপায়গুলির মধ্যে তাসাউফ একটি উপায় এবং তাছাউফ ছাড়া ফিক্বাহ সম্পূর্ণ হতে পারে না। এখন তাছাউফ কাকে বলে জানা দরকার। তাছাউফ সম্পর্কে নানা জনের নানামত আছে। কারো কারো মতে এই শব্দটির উৎপত্তি হইয়াছে ‘সাউফ’ ধাতু হইতে। শব্দটির বুৎপত্তিগত ধ্বনি তাছাউফ, উহা ক্রিয়া ধাতু বা ক্রিয়া বিশেষ্য। কিন্তু বাংলা ভাষায় শব্দটি তাছাউফ উচ্চারিত হইয়া আসিতেছে। তাছাউফ শব্দটির আভিধানিক অর্থ পশমী পোষাক পরিধান করা। তাছাউফের অনুসারী সুফীগণ পশমী পোষাক পরিমান করিতেন বলিয়া এই সাউফ শব্দ হইতে তাছাউফের উৎপত্তি হইয়াছে। এই হইল এক শ্রেণীর অভিভমত। অপর শ্রেণীর মত হইল তাছাউফ মূলে সাফা অর্থাৎ পবিত্রতা ধাতু হইতে উৎপত্তি হইয়াছেঠ। এই মত আমি নিজেও পোষণ করি। হযরত দাতা গঞ্জে বকস রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার কিতাব কাসফুল মাহযুবে এই মত পোষন করিয়াছেন। তিনি বলেন, তাছাউফ, তরীকত এবং ধর্মে অন্তরঙ্গতা থাকা কোন পোষাকের উপর নির্ভরশীল নয়। উহার ভিত্তি হইল মানুষের আমল এবং তাহার কলব বা অন্তরের অবস্থা। তাহা ছাড়া তাছাউফের পরিভাষিক অর্থ ও সংজ্ঞার সাথে এই সাফা ধাতুর মিল অভ্যন্ত বেশী। তাছাউফ যেই সমস্ত বস্তু নিয়া আলোচনা করে সেইগুলির সাথেও এই সাফা ধাতুর মিল স্পষ্টতঃ লক্ষ্য করা যায়।
তাছাউফ একটি পরিভাষা। উহার পারিভাষিক অর্থ এবং সংজ্ঞা না জানা পর্যন্ত তাছাউফ বুঝা সম্ভব নয়। তাছাউফের সংজ্ঞা বুঝিতে হইলে বিভিন্ন ছুফী ও দার্শনিকগণ কি বলিয়াছেন তাহা জানা দরকার। নি¤েœ তাহার বর্ণনা দেওয়া হইল। তাছাউফের সংজ্ঞা নির্দেশ করিতে গিয়া হযরত মারুফ আল কারখী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলিয়াছেন, আল্লাহর জাতের উপলব্ধিই তাছাউফ। হযরত যুননুন মিশরি রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মতে মহান আল্লাহ পাক ব্যতীত সকল কিছু পরিত্যাগ করাই তাছাউফ। হযরত যুনাইদ বাগদাদী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, জীবন ও মৃত্যুসহ সকল বিষয়ে মহান আল্লাহ পাক উনার উপর পরিপূর্ণ তাওয়াক্কুল বা নির্ভরতাই তাছাউফ। হযরত ঈমাম গাজ্জালী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাছাউফের যে সংজ্ঞা প্রদান করিয়াছেন তাহা অত্যন্ত সুন্দর ও যথার্থ তিনি বলিয়াছেন, আল্লাহ ব্যতীত অপর সব কিছু হইতে হৃদয়কে পবিত্র-করিয়া সতত্য আল্লাহর আরাধনায় নিয়োজিত থাকা এবং সম্পূর্ণরূপে আল্লাহতে নিম্গ হওয়ার নামই তাছাউফ। এইখানে হযরত ইমাম গাজ্জালী রহমতুল্লাহি আলাইহি ইসলামের মর্ম সঠিক উপলব্ধি করিয়া দ্বৈনর বাহ্যিক ও আভ্যন্তরিন দুইদিকের প্রতিই সমান গুরুত্ব আরোপ করয়াছেন। এই ব্যাপারে হযরত আল কুশাইরি রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, জীবনের যাহেরী ও বাতেনী বিশুদ্ধতাই তাছাউফ। এইখানে তিনি জীবনের নৈতিকতা ও আভ্যন্তরিন ইহসানের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করিয়াছেন। হযরত আবুল হোসেন নূরী রহমতুল্লাহি আলাইহি এমনিভাবেই বলেন, ইন্দ্রিয়জ আত্মার সব প্রবৃত্তির বিসর্জনই তাছাউফের মূল। একই সুরের প্রতিধ্বনি শুনা যায় হযরত আবু মুহম্মদ আল যারেনীর ভাষায়। তিনি বলেন, সৎ চরিত্র গঠন ও সমস্ত অনিষ্টকর কামনা বাসনা হইতে দূরে থাকাই তাছাউফ। হযরত আবূ সাহল সালুকি রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, সকল আপত্তিকর বিষয় হইতে নিজকে দূরৈ সরাইয়া রাখার অপর নাম তাছাউফ। হযরত আবূ আলী কাজিনী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, মনোরম আচরণকেই তাছাউফ বলে।
তাছাউফের সংজ্ঞা নির্দেশে শাইখুল ইসলাম হযরত জাকারিয়া আল আনসারী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার অভিজ্ঞতা বাস্তবভিত্তিক ও অনেকাংশে যুক্তিপূর্ণ। তিনি বলেন, তাছাউফ আত্মার সংশোধনের শিক্ষা দান করে। তাহার নৈতিক চরিত্রকে উন্নত করে এবং স্থায়ী নিয়ামতের অধিকার অর্জনের উদ্দেশ্যে মানুষের জীবনের জাহিরী ও বাতেনী দিককে গড়িয়া তুলে। আত্মার পবিত্রতা বিধানই ইহার বিষয়বস্তু এবং ইহার লক্ষ্য চিরন্তন শান্তি। আলী আর রুদবারী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, পার্থিব জগৎকে দুরে নিক্ষেপ করিয়া পছন্দনীয় পূর্ণমানব নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পথ অনুসরন করাই তাছাউফ। অন্যত্র হযরত বায়েজিদ বোস্তামী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলিয়াছেন, আরাম আয়েশ ত্যাগ করা এবং আল্লাহকে পাওয়ার উদ্দেশ্যে দুঃখ-কষ্টকে বরন করাই তাছাউফ।
তাছাউফের বিভিন্ন সংজ্ঞা হইতে ইহাই বুঝা যায় যে, তাছাউফ মূলতঃ অন্তরের বিশুদ্ধতা ও পবিত্রতার উপর সমধিক গুরুত্ব আরোপ করে। এবং অন্তরের পরিশুদ্ধি সাধানার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভের প্রচেষ্টাই তাছাউফ।
ইলমে তাছাউফের প্রমাণ : ইলমে তাছাউফের প্রমাণ মহান আল্লাহ পাক উনার বাণী, পবিত্র হাদীছ শরীফ ও বুজুর্গানেদ্বীনের অনেক মতামতে রহিয়াছে। নিম্নে প্রমানসমূহ পেশ করা হইল মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে বলেন,
(১) “লিকুল্লি উম্মাতিন যাআলনা মিনকুম শিরিয়াতও ওয়ামিন হাযানা”
অর্থ : আমি তোমাদের প্রত্যেক জাতির জন্যই একটি শরীয়ত ব্যবস্থা এবং আর একটি খাছ (বিশেষ) পথ দান করিয়াছি। মিনহাজ শব্দ দ্বারা ইলমে তরিকত, ইলমে তাছাউফ বা ইলমে বাতেন এক কথায় আধ্যঅত্বিক ব্যবস্থার প্রতি নির্দেশ দেয়া হইয়াছে।
(২) “ওয়াল্লাজিনা যাহাদু ফিনালানাহদিইয়ান্নহুম চুবুলানা”
অর্থ : যাহারা আমার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে সাধ্য সাধনা করে আমি অবশ্যই তাহাদিগকে আমার পথ সকল দেখাইব। (সূরা আনকাবুত) (এই আয়াতের ব্যাখ্যায় তফসিরে বয়জবি দ্বিতীয় খণ্ড ১১৪ পৃষ্ঠায়-বলা হইয়াছে, যাহারা জাহিরি কিংবা বাতিনি জ্বিহাদ করে আমি তাহাদিগকে আমার দিকে ভ্রমনের বা আসার পথ সকল দেখাই। এই সম্পর্কে তফসিরেরুহুল বয়ান দ্বিতীয় খণ্ড ৯৯৩ পৃষ্ঠা হইতে ৯৯৯ পৃষ্ঠায় বলা হইয়াছে, জ্বিহাদ দুই প্রকার- প্রথমত: জাহেরি জ্বিহাদ যাহা কাফিরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা। দ্বিতীয়ত: বাতেনি জ্বিহাদ যাহা নফস ও শয়তানের বিরুদ্ধে জ্বিহাদ করা। উক্ত আয়াতের উভয় প্রকার জ্বিহাদ মর্ম করা যাইতে পারে। আর তাছাউফ বাতিনি জ্বিহাদের শিক্ষাই দিয়া থাকে।
(৩) “রব্বানা ওয়াবআছ ফিহিম রসূলাও মিনহুম ইয়াতলু আলাইহিম আয়াতিকা ওয়া ইউআল্লিমু হুমুল কিতাবা ওয়াল হিকমাতা ওয়াইউয়াক্কি হিম ইন্নাকা আনতাল আযিযুল হাকিমা।”
অর্থ : “হে আমার প্রতিপালক! আপনি কাবা বাসীদের মধ্য হইতে তাহাদের জন্য একজন রসূল পাঠান, যিনি আপনার আয়াতসমূহ তাহাদিগকে পাঠ করিয়া শুনাইবেন। এবং অবতীর্ণ গ্রন্থের বিষয়বস্তু ও তৎসম্পর্কিত জ্ঞান-বিজ্ঞান তাহাদিগকে শিক্ষা দিবেন এবং তদ্বারা তাহাদিগকে পুত পবিত্র করিয়া তুলিবেন। নিশ্চয়ই আপনি মহা প্রতাপশালী বিজ্ঞানময়।” উক্ত আয়াতে ইউযাক্কিহিম বা পবিত্রকরন এই শব্দ দ্বারা তাসাউফ শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য্য বলিয়া বিবেচিত হয়। কেননা তাছাউফ ব্যতীত এই পবিত্রকরন কার্য্য সম্ভব নয়। তাছাউফ এই তাজকিয়া বা আত্মা বিশোধন পদ্ধতি শিক্ষা দিয়া থাকে এবং এই আত্মশুদ্ধি লাভের পদ্ধতিই তাছাউফ শিক্ষা।
(৪) “ইয়াওমা লা ইয়ানফাজু মা’লুও ওয়ালা বানুনুন ইল্লামান আতাল্লাহি বিকালবিন ছালিম।”
অর্থ : এমন একটি হিসাবের দিন, কর্মফলের দিন সামনে আসিতেছে, সেইদন কাহারো ধনবল, জনবল সেইখানে কোন কাজ দিবে না। অবশ্য সেইদিন কাজ দিবে একমাত্র রোগমুক্ত দেল বা পবিত্র আত্মা। উক্ত আয়াত দ্বারা ইছলাহে নফসের জরুরত প্রমানিত হয়। আর নফসের ইছলাহের সাধনা ও নিয়ম রীতিহ তাছাউফই আলোচনা করে।
(৫) “কাদ আফলাহা মান তাযাক্কা ওয়াযাকা রছমা রব্বিহি ফাছাল্লা।”
অর্থ : জীবন সাধনায় সিদ্ধি লাভ করিয়াছে তাহারা যাহারা আত্মা শুদ্ধি করিয়াছে। নফসের এছলাহ করিয়াছে আল্লাহর নাম অন্তরের অন্তঃস্থল হইতে স্মরন করিয়াছে কলব ও লেছানের দ্বারা। মহান আল্লাহ পাক উনার যিকির করিয়াছে এবং মহান আল্লাহ পাক উনাকে স্মরন করিয়া নামায পড়িয়াছে। উক্ত আয়াতে তাযাক্কা বা আত্ম শুদ্ধির কথা বলা হইয়াছে। এই আত্মশুদ্ধিত পথই তাছাউফ বাতলাইয়া থাকে।
(৬) মেসকাতুল মাসাবীহের কিতাবুল ঈমানের প্রথম পরিচ্ছেদে হাদীছে জিবরাঈলে আছে যে, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূরে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলিলেন, তুমি এইরূপভাবে মহান আল্লাহ পাক উনার ইবাদত কর যেন মহান আল্লাহ পাক উনাকে দেখিতেছ। আর যদিও তুমি মহান আল্লাহ পাক উনাকে দেখিতে না পার তাহা হইলে ধারনা কর মহান আল্লাহ পাক তোমাকে দেখিতেছেন। এই পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইহসান সম্পর্কে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যাহা ফরমাইয়াছেন তাহার ব্যাখ্যায় শেখ আব্দুল হক দেহলবী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলিয়াছেন ইহসান দ্বারা তাছাউফকে বুঝানো হইয়াছে। ইহসান সম্পর্কে মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার তালিমুদ্দিন কিতাবের দ্বিতীয় খণ্ডে বলেন, ইহসানের কথা বলায় বুঝে আসে যে, এই বাতিনী তরীকাই মকছুদ। কেননা এই তরীকা ব্যতীত এমন হুযূরে কলব কিছুতেই হাছিল হইতে পারে না। মূলত তাছাউফ যে সমস্ত ক্রিয়াকলাপ নিয়া আলোচনা করে তাহার উদ্দেশ্য এই ইহসানের দরজা লাভ করা এবং মহান আল্লাহ পাক উনার সাথে নিছবত কায়িম করা।
(৭) নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, দেহের মধ্যে একটি গোশত পিন্ড আছে, যদি উহা সংশোধিত হয় তবে সমস্ত দেহই সংশোধিত হয়। আর যদি উহা খারাপ হয় তবে সমস্ত দেহই খারাপ হয়। ওই গোশত পিন্ডই হইল দিল বা কলব। এই কলব সঙশোধনের নিয়মাবলী যে ইলেমের দ্বারা জানা যায় সচরাচর তাহাকেই তাছাউফ বলে।
(৮) পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে আছে যে, মহান আল্লাহ তায়ালা তোমাদের ছূরত বা চেহারার দিকে দেখিবেন না বরং তোমাদের দিলের দিকেও দেখিবেন। এই দিলকে পরিশুদ্ধ করিবার শিক্ষাই তাছাউফ দিয়া থাকে।
(৯) তালিম্মুদ্দিন কিতাবের দ্বিতীয় খণ্ডে হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানবী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাছাউফ সত্য হওয়ার দলিল দিতে গিয়া বলেন যে, কোন কোন খুশক আলিম তাছাউফ ইঙ্কার করিয়া থাকেন। এখানে তাহাদেরকে ভাল মত বুঝাইয়া দেওয়া হইবে যে তাছাউফ সত্য। তাছাউফের প্রমান দিতে গিয়া তিনি আরও বলেন যে, তাহা ছাড়া লক্ষ লক্ষ বিশ্বস্ত বুযুর্গ সাক্ষ্য দিতেছেন যে, আহলে বাতেন বুযুর্গদের ছোহবতে বসিলে আকায়েদ ও ফিক্বাহ ছাড়া আরও যে কি এক নতুন হালতের আবিভাব হয়। এই হালতের তাছির এই যে, ইবাদত ও নেক কাজের প্রতি রগবত ও আগ্রহ এবং পাপ কাজের প্রতি ঘৃনা এবং আকায়েদের মধ্যে আরও মজবুতি ও দৃড়তা ক্রমশ বাড়িতে থাকে। এত বহু সংখ্যক পাকবাজ বুযুর্গানে দ্বীনের এই সাক্ষ্য মিথ্যা হইতে পারে না। ইহা কাহারো ধারনায় আসিতে পারে না। সুতরাং এই দলিল আদৌ কমজোর দলিল নয়, নেহায়েত মজবুত দলিল।
(১০) এই সম্পর্কে ইমাম গাজ্জালী রহমতুল্লাহি আলাইহি কিমিয়ায়ে সা’দাত প্রথম খণ্ডে বলেন, ইলমে তাছাউফের আসল পথ এবং সুফীগণের মহত্বে বিশ্বাস স্থাপন কর, তাহাদের প্রতি অবিশ্বাস পোষন করিও না। একালের ভ- সুফীদের ব্যবহার এবং আচরনে অশ্রদ্ধ হইয়া প্রকৃত সুফীদের এবং তাহাদের অনুসৃত পথের প্রতি আস্থাহীন হইবেন। (চলবে)
হযরত রসুলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বৈশিষ্ট্য/দু’একটি বিষয়ে আলোকপাত
মহান আল্লাহ পাক উনার জন্য হযরত আবু বকর ছিদ্দীক আলাইহিস সালাম উনার নির্যাতন ভোগ
যমযম কুপের ও ওযুর পানি দাঁড়িয়ে পান করা মোস্তাহাব অন্য কোন পানি বা খাদ্য দাঁড়িয়ে পান করা মাকরূহ
সর্ব প্রথম সৃষ্টি নূরে হাবীবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম