(পঞ্চম ভাগ)
(মুবাহিছে আযম, বাহরুল উলূম, ফখরুল ফোক্বাহা, রইছুল মোহাদ্দিসীন, তাজুল মোফাসসিরীন, হাফিজে হাদীস, মুফতীয়ে আজম, পীরে কামিল, মুর্শিদে মোকাম্মিল হযরত মাওলানা আল্লামা শাহ্ সূফী মুহম্মদ রুহুল আমিন রহমতুল্লাহি আলাইহি কর্তৃক প্রণীত “কাদিয়ানী রদ” কিতাবখানা (৬ষ্ঠ খন্ডে সমাপ্ত) আমরা মাসিক আল বাইয়্যিনাত পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করছি। যাতে কাদিয়ানীদের সম্পর্কে সঠিক ধারণাসহ সমস্ত বাতিল ফিরকা থেকে আহ্লে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের অনুসারীদের ঈমান আক্বীদার হিফাযত হয়। আল্লাহ্ পাক আমাদের প্রচেষ্টার কামিয়াবী দান করুন (আমিন)। এক্ষেত্রে তাঁর কিতাব থেকে হুবহু উদ্ধৃত করা হলো, তবে তখনকার ভাষার সাথে বর্তমানে প্রচলিত ভাষার কিছুটা পার্থক্য লক্ষ্যণীয়)।
(ধারাবাহিক)
পাঠক! হাদিছটি মেশকাতের ১৬৫ পৃষ্ঠায় লিখিত আছেঃ-
عن عائشة ان بعض ازواج النبى صلى الله عليه وسلم قلن للنبى صلى الله عليه وسلم اينا اسرع بك لحوقا؟ قال اطولكن يدا فأخذوا قصبة يذرعونها وكانت سودة اطولهن يدا فعلمنا بعد انما كان طول يدها الصدقة وكانت اسرعنا احوقا به زينب وكانت تحب الصدقة.
‘‘আয়েশা রদিয়াল্লাহু আনহু রেওয়াএত করিয়াছেন, নিশ্চয় নবি (ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কতক বিবি হজরতকে বলিয়াছিলেন, আমাদের মধ্যে কোন্ ব্যক্তি সর্ব্বাগ্রে আপনার সহিত মিলিত হইবেন? হজরত ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলিলেন, তোমাদের মধ্যে যাহার হস্ত বেশী লম্বা হইবে (দাতা হইবে)। তৎপরে তাঁহারা বাঁশ দ্বারা হস্ত মাপিতে লাগিলেন। (হযরত) ছওদার হস্ত সমধিক লম্বা ছিল। তৎপরে আমরা জানিতে পারিলাম যে, হস্ত লম্বা হওয়ার অর্থ দান করা। আমাদের মধ্যে সর্ব্বাগ্রে (হজরত) জয়নব উক্ত হজরতের (ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সহিত মিলিত হইয়াছিলেন, তিনি দান করা পছন্দ করিতেন।’’
এই হাদিছে বুঝা যায় যে, হজরত (ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলিয়াছিলেন যে, যে বিবির হস্ত অধিক লম্বা হইবে, সেই বিবি প্রথমে মরিবেন। ইহার অর্থ এই যে, যে বিবি অধিকতর দানশীলা হইবেন, তিনি বিবিদের মধ্যে সর্ব্বাগ্রে এন্তেকাল করিবেন। বিবিরা উহার প্রকৃত অর্থ না বুঝিয়া নিজেদের হস্ত মাপিয়াছিলেন, কিন্তু হযরত ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে এই ভবিষ্যদ্বাণী বুঝিতে পারেন নাই, ইহা একেবারে বাতীল দাবি। কোন হাদিছে এইরূপ কথা নাই যে, তাঁহারা হজরতের সাক্ষাতে হস্ত মাপিয়াছিলেন।
কাজেই মির্জ্জা ছাহেব নিজের শয়তানি এলহামি ভবিষ্যদ্বাণীগুলির দোষ ঢাকিবার জন্য হজরত ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর এইরূপ মিথ্যা অপবাদ করিতে দ্বিধা বোধ করেন নাই, ইহাতে মির্জ্জা ছাহেবের ইমান ও নবি-ভক্তির নমুনা প্রকাশ হইয়া গেল।(অসমাপ্ত)
ইসলামী শরীয়ত মোতাবেক পাকিস্তান সুপ্রীম কোর্ট কর্তৃক কাদিয়ানীদের “কাফির” ষোষণা! (২)
(ধারাবাহিক)
আর্টিকেল ২৬০ (৩)-এর সাথে পাঠ করলে আর্টিকেল ২০ যে, এটাই বুঝায় যে, কাদিয়ানীরা একেশ্বরবাদ এবং মির্জার নুবুওওয়াত প্রচার করতে পারবে কিন্তু তারা নিজেদেরকে মুসলমান প্রচার করতে পারবে না এবং তাদের বিশ্বাসকে ইসলাম হিসেবে প্রচার করতে পারবে না। সংক্ষিপ্তাদেশে অনিচ্ছাকৃতভাবে কিছু পর্যবেক্ষণ এসে গেছে কিন্তু বিস্তৃত রায়ে বিষয়টি পরিপূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। অতএব, এটা বলা ঠিক নয় যে, সংবিধান তাদের নিজেদেরকে অমুসলিম বলতে বাধ্য করে না।
এই মামলায় বড় সমস্যাটি হয় কাদিয়ানীদের আচরণে। যদিও আইনগত বাধ্যবাধকতা রয়েছে তারা তাদেরকে মুসলমানদাবী করতে পারবে না এবং তাদের বিশ্বাসকে ইসলাম বলতে পারবে না কিন্তু তারা তাদেরকে মুসলিম দাবী এবং তাদেরও ধর্ম প্রচার ইসলামের নামেই করতে থাকে। তাদের উচিত ছিল নিজেদেরকে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে মুসলমান হিসেবে জাহির না করা; কিন্তু সম্পূর্ণ বিপরীতে তারা এক ঘুয়েমী করে,, নিরবচ্ছিন্ন মনোযোগে মুসলিম উম্মাহ্র ধৈর্য্যরে উপর চাপ সৃষ্টি করতে থাকে।
লক্বব ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। কারণ ঐ সকল লক্বব ব্যবহার বৈধ কেবলমাত্র হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর, হযরত সাহাবা-ই-কিরাম রদিয়াল্লাহু আনহু ও উম্মুল মু’মিনীনগণের জন্য। ঐ সকল লক্বব ব্যবহার করে কাদিয়ানীরা পরোক্ষভাবে নিজেদেরকে মুসলমান হিসেবেই জাহির করতে থাকে। উম্মুল মু’মিনীন, আমিরুল মু’মিনীন, খলীফাতুল মুসলিমীন, খলীফাতুল মু’মিনীন (সবই মুসলিম উম্মাহ্র প্রধাণরূপে বুঝায়) লক্ববগুলিতে মু’মিনীন (মুসলমান) বা মুসলিমীন শব্দগুলি জনগণকে প্রতারিত করতে পারে যে, এই সকল লক্ববধারী লোকেরা মুসলমানই হবে। কুরআন শরীফে ‘রদিয়াল্লাহ্ আনহু’ ব্যবহার করা হয়েছে, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সহচরদের প্রতি অথবা বড় জোর মুসলমানদের প্রতি রহমত স্বরূপ। মুসলমানরা “সাহাবী” এবং “আহলে বাইত” লক্বব ব্যবহার করেছেন যথাক্রমে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সহচরদের জন্য এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের জন্য যারা ছিলেন শ্রেষ্ঠ মুসলমান। এই সকল লক্বব মির্জার সহচরদের জন্য ও তার পরিবারের সদস্যদের জন্য ব্যবহার করা অর্থ কাদিয়ানীরা নিজেদেরকে মুসলমান হিসেবে জাহির করা।
অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- মুসলমানদের দৃষ্টিতে কোনই সন্দেহ নেই যে, এই সকল পবিত্র লক্বব মির্জার স্ত্রী, তার পরিবারের সদস্য, সহচর এবং তার স্থলাভিষিক্তদের জন্য ব্যবহার করা বিকৃত করারই শামিল।
একইভাবে আযান দেয়া এবং উপাসনালয়কে মসজিদ বলা হলে, এটাই নিশ্চিতভাবে ধরা যায় যে, যে আযান দেয় এবং যারা ঐ স্থানে মসজিদে উপাসনা করে তারাও মুসলমান।
এই সকল লক্বব এবং অভিব্যক্তি ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার শর্তসমূহ সংবিধানের শর্তসমূহই বাস্তবায়ন এবং একটি পরিণতি বা পূনরাবৃত্তিতে এই অধ্যাদেশের নীতিতে কাদিয়ানীরা নিজেদেরকে মুসলমান বলতে পারবে না এবং প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মুসলমান হিসেবে জাহির করতে পারবে না। অনুরূপ বিবেচনায়, ধর্মপ্রচারে নিষেধাজ্ঞা প্রবর্তন করা হয়েছিল।
প্রথমতঃ পাঞ্জাবেই কাদিয়ানীরা কূট কৌশলের মাধ্যমে নিজেদের মুসলমান হিসেবে প্রচারের দ্বারা কিছু মুসলমানকে প্ররোচিত করতে সক্ষম হয়েছিল। তারা প্রচার করেছিল যে, “আহমদী (কাদিয়ানী) মতবাদ গ্রহণ করলেই তারা ইসলাম থেকে খারিজ বা তারা বিশ্বাসী থেকে অবিশ্বাসীতে পরিণত হবে- এটা মনে করার কারণ নেই বরং তাদেরকে আরও ভাল মুসলমান হওয়ার সুযোগ করে দেয়া হলো।” এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে যথার্থই তারা প্রথমেই তাদের লক্ষ্যস্থল ঠিক করেছিল শিক্ষিত (সাধারণ) মুসলমানদের যারা প্রচন্ড অপছন্দ করত উপদলীয়তা (৭৩ ফিরকা) এবং মাওলানাদের অনমনীয় কঠোরতা এবং ক্রমান্বয়ে আকৃষ্ট করতে থাকে তাদের মতের প্রতি, যেটাকে তারা বলতো ইসলামের মধ্যে উদারতা (কাদিয়ানী মত)।
এই কৌশল তাদেরকে সামান্য কিছু লাভ দিয়েছে যা একটি ব্যবসার সাথে প্রচন্ড সামঞ্জস্যপূর্ণ। যা হলো- কোন নিম্নমানের সামগ্রী সু-পরিচিত উন্নত মানের সামগ্রীর নামে প্রতারণাপূর্বক গছিয়ে দেয়া। যদি কাদিয়ানীরা স্বীকার করে নেয় যে, তারা যে ধর্মে ধর্মান্তরিত করছে তা ইসলাম ব্যতীত অন্য কিছু, তবে মুসলমানদের মধ্যে এমনকি সবচেয়ে অসতর্ক জন ও তার বিশ্বাসকে অবিশ্বাসে পরিণত করতে রাজী হবেনা।
আমরা প্রফেসর তাহির-উল-কাদরীর সাথে একমত যে, কাদিয়ানীরা যদি সাংবিধানিক শর্তসমূহ পালনে পদক্ষেপ গ্রহণ করত তবে এই অধ্যাদেশ ঘোষণার কোন প্রয়োজন ছিলনা। কাদিয়ানীদের ধর্ম প্রচার নিষিদ্ধ করার এটাও একটি কারণ ছিল।
অপর একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল যে, কাদিয়ানীরা নিজেদেরকে মুসলমান হিসেবে জাহির করে প্রত্যেক মুসলমান যার সাথে দেখা হবে তাকেই কাদিয়ানী ধর্মে ধর্মান্তরিত করার কৌশল চালাবে। (অসমাপ্ত)