কাদিয়ানী রদ! (১)
(পঞ্চম ভাগ)
(মুবাহিছে আযম, বাহরুল উলূম, ফখরুল ফোক্বাহা, রইছুল মোহাদ্দিসীন, তাজুল মোফাসসিরীন, হাফিজে হাদীস, মুফতীয়ে আজম, পীরে কামিল, মুর্শিদে মোকাম্মিল হযরত মাওলানা আল্লামা শাহ্ সূফী মুহম্মদ রুহুল আমিন (রঃ) কর্তৃক প্রণীত “কাদিয়ানী রদ” কিতাবখানা (৬ষ্ঠ খন্ডে সমাপ্ত) আমরা মাসিক আল বাইয়্যিনাত পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করছি। যাতে কাদিয়ানীদের সম্পর্কে সঠিক ধারণাসহ সমস্ত বাতিল ফিরকা থেকে আহ্লে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের অনুসারীদের ঈমান আক্বীদার হিফাযত হয়। আল্লাহ্ পাক আমাদের প্রচেষ্টার কামিয়াবী দান করুন (আমিন)। এক্ষেত্রে তাঁর কিতাব থেকে হুবহু উদ্ধৃত করা হলো, তবে তখনকার ভাষার সাথে বর্তমানে প্রচলিত ভাষার কিছুটা পার্থক্য লক্ষ্যণীয়)।
(ধারাবাহিক)
পাঠক, মির্জ্জা ছাহেবের কথায় বুঝা যায় যে, হজরত নবি (ছাঃ) এর ভবিষ্যদ্বাণী মিথ্যা হইয়াছিল, কিন্তু ইহা মির্জ্জা ছাহেবের বাতীল দাবি, কারণ হজরত একটা স্বপে¦র কথা প্রকাশ করিয়া উহার তা’বির করিয়াছিলেন, তিনি এস্থলে কোন ভবিষ্যদ্বাণী করেন নাই।
মেশকাতের ৩৯৫ পৃষ্ঠায় লিখিত আছে,
عن النبى صلى الله عليه وسلم قال رأيت فى المنام- انى اهاجر من مكة الى ارض بها نخل فذهب وهلى الى انها اليمامة او هجر فاذا هى المدينة يثرب-
‘নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলিয়াছেন, আমি স্বপ¦যোগে দেখিলাম যে, নিশ্চয় আমি মক্কা শরিফ হইতে এরূপ জমির দিকে হেজরত করিব- যাহাতে খোর্ম্মা বৃক্ষ সকল এছ। ইহাতে আমার ধারণা হইয়াছিল যে, উহা ইমামা কিম্বা হাজার হইবে, হঠাৎ বুঝিতে পরিলাম যে, উহা মদিনা-এছরব।’
এই হাদিছে বুঝা যায় যে, হজরত স্বপ¦যোগে উহা মদিনা বলিয়া বুঝিতে পারিয়াছিলেন, যদি ইহাকে মির্জ্জা ছাহেবের মতে ভবিষ্যদ্বাণী বলিয়া ধরিয়া লওয়া হয়, তবে বলি, তিনি মদিনা শরিফে হেজরত করার ভবিষ্যদ্বাণী করিয়াছিলেন, ইহাতে কোথায় তাঁহার ভবিষ্যদ্বাণী ভ্রান্তিমূলক হইল।
১৩। মির্জ্জা ছাহেব এজালাতোল-আওহামের ৩৬৩ পৃষ্ঠায় লিখিয়াছেনঃ-
উর্দূ কম্পোজ করতে হবে
‘যখন হযরত (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর বিবিরা তাঁহার সাক্ষাতে হস্ত মাপিতে আরম্ভ করিলেন, তখন তাঁহাকে এই ভূলের সংবাদ প্রদান করা হইল না, এমনি কি তিনি এন্তেকাল করিয়া গেলেন। ইহাতে স্পষ্ট বুঝা যায় যে, হজরতের মত এই ছিল যে, প্রকৃতপক্ষে যে বিবির হস্ত লম্বা ছিল, তিনিই প্রথমে এন্তেকাল করিবেন। এই হেতু তাঁহার সাক্ষাতে তাঁহারা হস্ত মাপিতে লাগিলেন, কিন্তু তিনি নিষেধ করেন নাই।’ (অসমাপ্ত)
ইসলামী শরীয়ত মোতাবেক পাকিস্তান সুপ্রীম কোর্ট কর্তৃক কাদিয়ানীদের “কাফির” ষোষণা! (২)
-অনুবাদক- আলহাজ্ব মুহম্মদ হাবিবুল হক
(ধারাবাহিক)
ধর্মীয় বিষয়ে ইসলাম শর্তহীন ধৈর্য্যের শিক্ষা দেয় এবং ইসলাম ধর্ম গ্রহণে একজন মানুষের পরিণতীর উপর নির্ভর করে। এ ব্যাপারে কোন জোর-জবর দস্তি ইসলামে গ্রহণীয় নয়। কেউ বিশ্বাস করতে পারে এবং কেউ বিশ্বাস নাও করতে পারে। এমন কি কারো বিশ্বাসে হস্তক্ষেপের ক্ষমতা পবিত্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকেও দেয়া হয়নি, তাঁর দায়িত্ব এতটুকুই যে তিনি সংবাদ অবহিত করবেন এবং ব্যাখ্যা করে দিবেন এবং যদি ঈমান আনে তবে, তিনি জান্নাতের সুঃসংবাদ দিবেন আর যদি অবিশ্বাস করে তবে তাকে জাহান্নামের দুঃসংবাদ জানিয়ে দিবেন। এটাই তাঁর দায়িত্ব।
এ সকল যুক্তি যদিও বড়ো একটা প্রাসঙ্গিক নয় কারণ বিবৃত আইনে কাদিয়ানী বিশ্বাস পরিবর্তন করে ইসলামে ধর্মান্তরিত করার জন্য জবর দস্তি করা হয়নি।
এ প্রসঙ্গের সম্মুখীন হয়ে মিঃ মুজিবুর রহমান অভিযোগ করেন যে, ইসলাম তাদের ধর্ম হিসেবে প্রচারে কাদিয়ানীদের বিরত রাখা হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে তারা মুসলমানও নয় এবং এই বিষয়গুলি ঐ সকল আয়াতের সাথে সংশ্লিষ্টও নয় যা ইকরার (জোর বা হুমকির) নীতির সাথে প্রযোজ্য। আয়াতগুলি অন্য ধর্মাবলম্বীদের ইসলাম গ্রহণে সংশ্লিষ্ট।
মিঃ মুজিবুর রহমান কোরআন শরীফ ও হাদীস শরীফের আলোকে দলিলের শর্ত সমূহের প্রকৃতি নিয়ে আলোচনা করেন। ঐ সকল যুক্তি সম্বন্ধে আলোচনা করার কোন প্রয়োজন নেই। যেহেতু কি করা যাবে বা কি করা যাবে না। এই মর্মে কতৃপক্ষীয় আদেশ রয়েছে এবং ঐ সকল প্রস্তাবনার সত্যতা সম্বন্ধে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। হুদায়বিয়ার সন্ধি যার ঈশ্বর বাদীদের সাথে অবস্থানবত কোনো মুসলমান। তাদের বিনা অনুমতিতে মুসলমানদের নিকট চলে যায় তাকে মক্কাবাসীদের নিকট ফেরত দিতে হবে। এ রকম কয়েকটা ঘটনা ঘটেছে। মক্কাবাসীদের দুর্ব্যাহার ও অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে মক্কা থেকে পলায়ন করে মদীনা শরীফে গিয়েছিলেন কিন্তু হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সন্ধির শর্তানুযায়ী তাদের কে মক্কায় ফিরে যেতে নির্দেশ দেন।
মিঃ মুজিবুর রহমান যুক্তি উপস্থাপন করেন যে, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সময় কায়েদ-ই-আজম ও আহমদীদের মধ্যে একটি আইন সম্মত চুক্তি সম্পাদন করা হয় এবং কায়েদ-ই-আজম ঘোষণা করে যে, মুসলিম ও অমুসলিম সকলেই সমান অধিকার ভোগ করবে। এবং প্রত্যেকই স্বাধীন ভাবে তার নিজ ধর্ম প্রচার ও পালন করতে পারবে। একেও পরোক্ষভাবে চুক্তিনামা বা একরার নামাই বলা যেতে পারে। বিভিন্ন ব্যবস্থায় সন্নিবেশিত হয়েছে সংবিধান পাকিস্থানের সকল নাগরীকদের। তাদের ধর্ম সাধারণ্যে প্রকাশ করা, পালন করা এবং প্রচার করার সম্পূর্ণ নিরাপত্তা বিধান করবে। ১৯৭৪ ঈঃ সাল পযর্ন্ত তারা কাদিয়ানীদের কাফের ঘোষণা করে নি।
কাদিয়ানী সম্প্রদায় এবং কায়েদ-ই-আজমের মধ্যে সম্পাদিত কোন চুক্তিনামা তারা দেখাতে পারে নি যে তাদেরকে মুসলমান হিসাবে গণ্য করতে হবে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সময়ে বা কায়েদ-ই-আজমের জীবদ্বশায়ও এই প্রশ্ন উত্থাপন করা হয় নি। ১৯৫৬ এবং ১৯৬২ সালে সংবিধান এবং ১৯৭৩ সালের মুল সংবিধানের উপর কোনো আস্থা রাখা যাবে না কেননা সংবিধানের সংশোধনের দ্বারা সর্বসম্মত ভাবে গৃহিত হয়ে কাদিয়ানীদের কাফির হয়েছিল পাকিস্তানের মুসলমানদের ধরাবাহিক বিক্ষোভের ফলস্বরূপ। এটা কাদিয়ানীদের কাফের ঘোষণা করেছিল।
এই অধ্যাদেশ প্রবর্তনের প্রয়োজন বুঝার জন্য ১৯৭৪ সালের সংবিধানের সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে হবে। যা দ্বারা কাদিয়ানীদের কাফের ঘোষণা করা হয়েছে। মিঃ মুজিবুর রহমান প্রচন্ডভাবে তার মতামত ব্যক্ত করার সময়ে উল্লেখ করে যে, সংবিধান কাদিয়ানীদের শুধু মাত্র কাফির ঘোষণা করেছে। কিন্তু তাদেরকে কাফের হিসাবে গন্য করার কোনো বাধ্যবাধকতা প্রয়োগ করে নি। জবাবে আমরা তাকে প্রশ্ন করি। পাকিস্তানের কাদিয়ানী নাগরিকদের জন্য সংবিধানের বাধ্যবাধকতা আছে কিনা? তিনি স্বীকার করেন এটা মেনে চলার বাধ্যবাধকতা তাদের উপর প্রযোজ্য সংবিধান এবং আইনানুযায়ী কাদিয়ানীদের কাফির ঘোষণা করা হয়েছে। কাদিয়ানীরা জাতীয় সংসদ ও প্রাদেশিক সংসদের নির্বাচনে অমুসলিমদের জন্য সংরক্ষিত আসনে প্রতিযোগীতা করতে পারবে। মামলা মোকদ্দমায় যেখানে ধর্ম বিশ্বাসের প্রশ্ন থাকবে তারা অবশ্যই সেখানে অমুসলিম উল্লেখ করবে। মুসলমান মনে করে তাদের কোনো আইন সম্মত দাবী গ্রহণযোগ্য নয়। এই মামলার যুক্তি তর্কে তাদের নিজেদেরকে মুসলমান হিসেবে উল্লেখ করা পরিস্কার ভাবে অসংবিধানিক।
অনুচ্ছেদ ২৬০(৩) দ্বারা কাদিয়ানীদের কাফির ঘোষণা করা হয়েছে সংবিধান এবং আইনানুযায়ী। অনুচ্ছেদ ২০-এ পাকিস্তানী নাগরিকদের তাদের নিজ ধর্ম প্রচারের ক্ষমতা সংরক্ষণের নিশ্চয়তা বিধান করে। এই অনুচ্ছেদটির কার্যকারীতা সন্দেহাতীত ভাবে সংবিধানের অন্যান্য বিধির প্রয়োগ সাপেক্ষে। এই বিষয়টি মিঃ মুজিবুর রহমান মেনে নেন। (অসমাপ্ত)