(দু’একটি বিষয়ে আলোকপাত)
-মুহম্মদ সাদী
একজন মানুষের জীবনের বৈশিষ্ট্য তার লালিত আদর্শ, সমাজ-সংসারের কল্যানে তার কর্মাবদান, অনুপম চরিত্র মাধুর্য, আচার-আচরনের আন্তরিকতা, মুক্তবুদ্ধির বিকাশ, ইত্যাদি সদগুনের প্রেক্ষাপটে বিচার্য হয়ে থাকে। মানুষের মনোজগত আমাদের অগম্য। তাই ব্যক্তি, ব্যাষ্টি ও সমষ্টিগত পরিম-লে তার সমকালীন ভূমিকা ও অবদানকে তারই অন্তর্জগতের বহি:প্রকাশ বলে ধরে নেয়া হয়। অবশ্য হৃদয়ের অদৃশ্য অনুভব ও আলোই তার দৃশ্যমান কর্মজীবনের পাথেয়। এভাবেই একজন মানুষ অতিমানুষ এবং ক্ষেত্রভেদে মহামানুষ হয়ে উঠেন। মহামানবের জীবনের আয়োজন, সাধনা ও সিদ্ধিলাভের পন্থাও তাই ব্যাপকতর। সিদ্ধপুরুষের আপাত: দেহগত তিরোধান উনাকে কেবল মহত্বের দুয়ারে পৌঁছে দেয়। কিন্তু একান্তভাবে স্বগীয় মহিমায় ভরপুর নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পূন্যতম জীবন বিধান, দর্শন ও কর্মকাণ্ড এতো বেশি ব্যাপকতর যে, যুগ ও সমায়োক্তীর্ন উনার সর্বকালীন অবস্থান আমাদের সিদ্ধান্তগত মহামানবের সীমাহীন উর্দ্বে। কাজেই উনার মুবারক জীবন পরিক্রমার যে কোন বিষয় ও দিকই বর্ণনার মাধ্যমে তুলে ধরা শুধু কষ্টসাধ্য নয়, একান্তই অসাধ্য।
মহান আল্লাহ পাক পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে উনার হাবীব নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার শান মুবারক-এ ইরশাদ মুবারক করেছেন: “আমি আপনার আলোচনাকে সমুন্নত” অর্থ ব্যাপক নয়, অফুরন্ত। পবিত্র হাদীছে কুদসী শরীফ থেকে আমরা জানতে পাই যে, মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন গোপন রহস্য ছিলেন। নিজেকে প্রকাশ করার ইচ্ছে হল, প্রকাশের এই পরম লক্ষ্যে তিনি উনার প্রিয়তম হাবীব সাইয়্যিদুল বাশার, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে সর্বপ্রথম সৃষ্টি করেছেন এবং সৃষ্টির আগেই উনাকে নবী মনোনীত করেছেন। সমুদয় সৃষ্টি ইচ্ছা-অনিচ্ছায় শাফিউল মুজনবীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার আবেহায়াতের প্রত্যাশী। নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “হযরত আদম আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার দেহে যখন প্রাণের সঞ্চার হয়নি তখন আমার নিকট থেকে মহান আল্লাহ পাক নবুয়তের শপথ নিয়েছেন।” রিসালত প্রাপ্তির আনুষ্ঠানিকতা চল্লিশ বছর বয়সে সংঘটিত হলেও উনার আল আমীন মানস ও নবুয়ত লাভোক্তর রসূল মানসে কোন বিভেদ নেই। তাওহিদ বিরোধী মানসিকতার ঘোর দুর্দিন এবং নৈতিক অধঃপতনের এক চরম সঙ্কটকালে মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সৃষ্টির স্বাভাবিক ধারায় দুনিয়ায় ইলেন। নাম মুবারক নির্বাচিত হল মুহম্মদ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, অর্থাৎ প্রশংসিত এবং আহমদ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালাম অর্থাৎ প্রশংসাকারী। মূলত সৃষ্টিলগ্নের পূর্ব থেকেই তিনি প্রশংসিত এবং অত:পর প্রশংসাকারী।
ওহী, প্রাপ্তির পূর্বে সুদীর্ঘ চল্লিশ বছর বিশ্বনিয়ন্তা মহাপ্রভু উনার হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে দুঃখ-বেদনা, আনন্দ-বিশ্বাদ, দ্বন্ধ-সংঘাত, দারিদ্র্য-প্রাচর্য, ত্যাগ-তিতিক্ষা, তধৈর্য-স্বস্তি, যন্ত্রনা-সান্ত¦না, বিবেক-প্রজ্ঞা ইত্যাদি সকল জাগতিক ও আধ্যাত্মিক বিষয়ে প্রশিক্ষিত করেছেন। পৃথিবীর নির্যাতিত মানবতা ও মানবাত্মার মুক্তিদুত আরবের মরুর দুলাল নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পৃথিবীতে আগমনকালেই ইয়াতিম হয়েছেন। ইনসাফ পতিষ্ঠা, পারস্পরিক ভাব বিনিময়, অনুপম চরিত্র মাধুর্য, ব্যক্তিত্বের মধুময় প্রতীতি, হিকমত-পূর্ণ বাক্যালাপ, ওয়াদাভিত্তিক লেনদেন, আমানত সংরক্ষণ, পরিমিতিবোধ, সহজ-সরল ও সৎজীবন-যাপন এবং সর্বোপরি কমলান্তকরনময়তার কারনে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরববাসীদের কাছে মহামানব বলে স্বীকৃতি পান। হযরত আবু বকর ছিদ্দীক্ব আলাইহিস সালাম উনার মতো সত্য অন্বেযায় ব্যাপত স্বল্প সংখ্যক মানুষতো বটেই, এমনকি গায়রুল্লাহ পন্থী বকট্রর কাফির সম্প্রদায়ের সকলেই উনাকে আল আমীন হিসেবে মেনে নেয়।
শিশুকাল থেকেই চিন্তা ও ধ্যান নিমগ্ন থাকা ছিল সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার চরিত্র মুবারকের অন্যতম দিক। ভাবনার নিবিষ্টতা ও ধ্যানের তন্ময়তা যেন স্রষ্টার সান্নিধ্য পাবার পরম প্রত্যাশা এবং বেদনা-বিমুগ্ধ মানসিকতায় ওহী ও রিসালতের পূণ্যতম দায়িত্ব পালনের পূর্ব প্রস্তুতি। আল্লাহ পাক উনার হাওহীদ এবং ইসলামের মর্মবানী প্রকাশ ও প্রচারের নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিলাদত শরীফ অব্যবহিত পরে সিজদানত হয়ে উচ্চারন করেন: রব্বী হাবলী উম্মতি অর্থ : হে মহান আল্লাহ পাক আমার উম্মতদের ক্ষমা করুন। একই কারণে আরবের মরুমাঠে মেঘ ও বকরীর পাল চরাতে গিয়ে ঊর্ধ্বপানে তাকিয়ে তিনি পরম সত্য অন্বেষায় ব্যাপৃত হয়ে যান। এমনি একদিন মহান আল্লাহ পাক উনার বক্ষ মুবারক উন্মোচন (সিনা মুবারক চাক) করেন। অবশ্য সিনা মুবারক চাক এর আগে এবং পরেও হয়েছে। সিনা মুবারক চাকের ব্যাখ্যায় নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, “এটা এক নূর যা” মহান আল্লাহ পাক অন্তরে প্রক্ষিপ্ত করে দিয়ে থাকেন।” এই নূরের নিদর্শনের ব্যখ্যায় তিনি বলেন: “কল্পনার আবেশ (দুনিয়া) থেকে দূরে সরে পড়া এবং চিরস্থায়ী আবাস (আখিরাত) এর প্রতি মনোযোগী হওয়া ও মৃত্যু আসার পূর্বেই মৃত্যুর জন্য তৈরী হয়ে যাওয়া।
অবশেষে হেরা পর্বতের গুহায় ধ্যান নিমগ্ন সৃষ্টির সর্বোত্তম মহামানব সাইয়্যিদুল মুরসালনী, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার কাছে আল্লাহ পাক তিনি ওহী পাঠান: “পড়ুন আপনার সেই প্রভুর নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। যিনি মানুষকে ঘনীভুত রক্তপিন্ড থেকে সৃষ্টি করেছেন। পড়ুন আপনার রব মহামহিমাম্বিত। তিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি মানুষকে শিখিয়েছেন যা সে জানতো না। এসব আলোচনা থেকে আমাদের কাছে পরিস্ফুট হয়ে যায় যে চিন্তা, ধ্যান, তন্ময়তা ও গবেষণাই ছিলো নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার জীবনের প্রথম আমল।
পবিত্র কুরআন পাক উনার মহান আল্লাহ পাক ইরশাদ মুবারক করেন, “তিনিই (মহান আল্লাহ পাক) উনার রসূল নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে প্রেরণ করেছেন হিদায়াত ও সত্য দ্বীনসহ সকল ধর্মের উপর তা’ প্রতিষ্ঠিত করার জন্য, যদিও মুশরিককরা তা অপছন্দ করে।” পবিত্র কুরআনুল কারীম উনার অন্যত্র পবিত্র ইরশাদ মুবারক হয়েছে: “নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ পাক মুমিনগণ উনাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন, যখন তিনি উনাদের নিজেদের মধ্য থেকে একজন রসূল পাঠিয়েছেন, যিনি তাদের নিকট তিলাওয়াত করেন উনার (মহান আল্লাহ পাক উনার) পবিত্র আয়াত শরীফ, তাদের ইছলাহ (অন্তরের পরিশুদ্ধি) করেন এবং প্রশিক্ষণ দেন কিতাব ও হিকমত (প্রজ্ঞা) এবং নিশ্চয়ই এর পূর্বে তারা স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে নিপতিত ছিল।” ওহী প্রাপ্তির প্রাথমিক পর্যায়ে যখন তিনি উদ্বেলিত, তখন মহান আল্লাহ পাক উনার মনে সাহস ও সান্তনা সঞ্চার করেন এভাবে: “হে কমলীওয়ালা নবী, হিদায়াতের বাণী নিয়ে উঠে পড়ুন। মানুষের অন্তরে তর প্রভুর ভয় জাগিয়ে তুলুন।” তিন বছর গোপন প্রচারের পর মহান আল্লাহ পাক তিনি জানিয়ে দিলেন: “আপনাকে যে আদেশ দেয়া হয়েছে তা উদাত্ত কণ্ঠে ঘোষণা করুন।” মহান আল্লাহ পাক আরও জানালেন: “আপনার নিকটতম লোকজনদেরকে মহান আল্লাহ পাক উনার ভয় প্রদর্শন করুন।” নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরাইশ নের্তৃবৃন্দ ও লোকজনকে ডেকে বললেন: “আপনারা সবাই উচ্চারন করুন: লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহম্মদুর রসুলাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।
এতে সবাই কল্যাণের অধিকারী হয়ে যাবেন।” প্রকাশ্যে তওহীদ ও রিসালত প্রচারের এই বিনয় ভাষনে একমাত্র কিশোর বালক হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম তিনি ছাড়া উপস্থিত সবাই নিকৃষ্টতম উক্তি করে এবং প্রতিবাদমুখর হয়ে চলে গেল। (চলবে)
হযরত রসুলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বৈশিষ্ট্য/দু’একটি বিষয়ে আলোকপাত
মহান আল্লাহ পাক উনার জন্য হযরত আবু বকর ছিদ্দীক আলাইহিস সালাম উনার নির্যাতন ভোগ
যমযম কুপের ও ওযুর পানি দাঁড়িয়ে পান করা মোস্তাহাব অন্য কোন পানি বা খাদ্য দাঁড়িয়ে পান করা মাকরূহ