(পঞ্চম ভাগ)
(মুবাহিছে আযম, বাহরুল উলূম, ফখরুল ফোক্বাহা, রইছুল মোহাদ্দিসীন, তাজুল মোফাসসিরীন, হাফিজে হাদীস, মুফতীয়ে আজম, পীরে কামিল, মুর্শিদে মোকাম্মিল হযরত মাওলানা আল্লামা শাহ্ সূফী মুহম্মদ রুহুল আমিন রহমতুল্লাহি আলাইহি কর্তৃক প্রণীত “কাদিয়ানী রদ” কিতাবখানা (৬ষ্ঠ খন্ডে সমাপ্ত) আমরা মাসিক আল বাইয়্যিনাত পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করছি। যাতে কাদিয়ানীদের সম্পর্কে সঠিক ধারণাসহ সমস্ত বাতিল ফিরকা থেকে আহ্লে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের অনুসারীদের ঈমান আক্বীদার হিফাযত হয়। আল্লাহ্ পাক আমাদের প্রচেষ্টার কামিয়াবী দান করুন (আমিন)। এক্ষেত্রে তাঁর কিতাব থেকে হুবহু উদ্ধৃত করা হলো, তবে তখনকার ভাষার সাথে বর্তমানে প্রচলিত ভাষার কিছুটা পার্থক্য লক্ষ্যণীয়)।
(ধারাবাহিক)
চতুর্থ অধ্যায়
মির্জ্জা ছাহেবের ভিন্ন ভিন্ন মত
কুরআনঃ-
ولو كان من عند غير الله لوجدوا فيه اختلافا كثيرا-
‘আর যদি উক্ত কালামুল্লাহ শরীফ আল্লাহ পাক ব্যতীত অন্য কাহারও পক্ষ হইতে হইত, তবে অবশ্য তাহারা উহাতে বহু মতভেদ পাইতেন।’ (সূরা নিসা/৮২)
আল্লাহ তায়ালা উক্ত আয়াতে সত্য ও মিথ্যা এলহামের দাবিদারগণের চিনিবার বড় নিদর্শন প্রকাশ করিয়াছেন যদি কোন ব্যক্তি নিজের কথাকে আল্লাহ তায়ালার কথা ও এলহাম বলিয়া প্রকাশ করে, কিন্তু সে মিথ্যাবাদী হয়, তবে নিশ্চয় তাহার কথাগুলিতে বিস্তর অনৈক্যভাব পরিলক্ষিত হইবে। তের শতাব্দীর মধ্যে বহু লোক মিথ্যা দাবী ও মিথ্যা এলহাম প্রকাশ করিয়াছিল, কিছুকাল পরে, লাঞ্ছিত ও বিফল মনোরথ অবস্থায় মৃত্যুমুখে পতিত হইয়াছিল।
মির্জ্জা ছাহেবের কেতাবগুলি প্রকাশ্য-দৃষ্টিতে একটু মনোমুগ্ধকর বলিয়া অনুমিত হয়, কিন্তু আল্লাহ তায়ালা যাহাদিগকে সূক্ষ্মদৃষ্টি-শক্তি ও বিবেক দান করিয়াছেন, তাহারা যেরূপ কষ্টি পাথরে খাঁটি সোনা পরীক্ষা করা হয়, সেইরূপ সত্য মিথ্যা প্রভেদ করিয়া লইয়া থাকেন, নিজেও ফাছাদ হইতে নিরাপদে থাকেন এবং লোকদিগকে সত্য পথে পরিচালিত করেন।
মির্জ্জা ছাহেব নিজের কেতাবসমূহে সর্বদা সময় ও সুবিধা বুঝিয়া লিখিয়া থাকেন, তাহাকে এক প্রকার সুবিধাবাদী বলিলেও অত্যুক্তি হয় না, এইহেতু তাহার কথাগুলিতে বহু অনৈক্য দেখা যায়, এই অনৈক্যগুলি সামান্য নহে, বরং মোটামোটি ভাবের অনৈক্য দেখা যায়। যখন কুর-আন কষ্টি আমাদের হাতে রহিয়াছে, তখন কি জন্য মির্জ্জা ছাহেবের শিক্ষাকে অন্যান্য মিথ্যা এলহাম ও রেছালাতের দাবি গণের ন্যায় মিথ্যা বলা হইবে না?
মির্জ্জা ছাহেবের কেতাবসমূহে বহু অনৈক্য সন্নিবেশিত হইয়াছে, এস্থলে কয়েকটির কথা উল্লেখ করিয়া মির্জ্জাভক্তদিগকে চ্যালেঞ্জ দিতেছি, তাহারা যেন নিম্নোক্ত ভিন্ন ভিন্ন মতগুলির মধ্যে সমতা স্থাপন করিয়া দেখান। আর যদি সক্ষম না হন, তবে কুর-আন শরীফের উল্লিখিত স্পষ্ট দলীল ও নুরে-ইমানের প্রতি লক্ষ্য রাখিয়া যথা কর্ত্তব্য স্থির করিয়া লন। (অসমাপ্ত)
ইসলামী শরীয়ত মোতাবেক পাকিস্তান সুপ্রীম কোর্ট কর্তৃক
কাদিয়ানীদের “কাফির” ষোষণা! (২)
(অনুবাদক- আলহাজ্ব মুহম্মদ হাবিবুল হক)
(ধারাবাহিক)
এটা মুসলমানদের মধ্যে অসন্তোষ ও বিরোধ সৃষ্টি করে যা আইন শৃঙ্খলা পরিপন্থীর সমস্যায় পরিণত হয়। নিজেকে প্রতিশ্রুত মসীহ্ ও মাহ্দী দাবীরও তীব্র প্রতিবাদ করা হয়। এটা শুধু একটি দাবীই ছিলনা; কাদিয়ানী সম্প্রদায়ের ইতিহাস থেকেই ইহা পরিস্কারভাবে জানা যায়, প্রকৃতপক্ষে মির্জার লেখা পুস্তকেই আছে যে, মির্জাকে শুধু আলেমদের থেকেই নয়, সাধারণ মুসলমান সম্প্রদায় থেকেও প্রচন্ড বিরোধীতার সম্মুখীন হতে হয়েছে। তার রচনাগুলি তার প্রতিপক্ষের জন্য ছিল খুবই অসম্মানজনক এবং গালিগালাজপূর্ণ। সর্ব সাধারণের প্রতিবাদের অনেক ঘটনাও ঘটেছে। আব্দুল কাদের রচিত “হায়াতে তাইয়্যেবা”র ১২১, ১২৬ এবং ১৪০ পৃষ্ঠা উদাহরণ স্বরূপ দেখা যেতে পারে। মির্জার অধিকাংশ লেখাই তার বিরোধীদের প্রতি ধিক্কারজনক এবং গালিগালাজপূর্ণ। তিনি অবশ্য উল্লেখ করেন যে, মুসলমানরা প্রধানতঃ তার (মির্জা) প্রতিই বিরোধীতা করে। (দেখুন, হাম্মাতুল বুশরা/৩৩, ইজালত-উল-আওহাম/১১)
হাম্মাত-উল-বুশরার ৩৫ পৃষ্ঠায় তিনি লিখেছেন, এটা এই দাবী যে জন্য আমার লোকেরা (মুসলমান, যারা আহমদী নয়) আমার সাথে ঝগড়া করেছে এবং আমাকে (مرتد) স্বধর্ম ত্যাগী বলেছে। তারা কথা বলেছে কিন্তু কোন শ্রদ্ধাবোধ ছিলনা আল্লাহ্ পাক-এর নিকট থেকে ওহী প্রাপ্ত ব্যক্তির প্রতি। তারা তাকে (মির্জা) বলেছে, সে বিশ্বাসঘাতক, মিথ্যাবাদী ও ধর্মত্যাগী (مرتد) কিন্তু তারা যদি শাসকদের তলোয়ারের ভয় না পেত, আমাকে হত্যা করত।”
কিন্তু ঘটনা এরূপ শিহরণ ও প্রচন্ড সংঘর্ষের উৎপত্তি করে যে, মির্জা সাহেবের অনুসারীরা ওদের ভূমিকম্পরূপে আখ্যায়িত করে। সীরাত-ই-মেহদীর সংগ্রাহকের পর পর উল্লেখানুযায়ী অনুরূপ ভূমিকম্পের সংখ্যা ছিল পাঁচটি।
(১) আহমদীদের মধ্যে প্রথম শিহরণ বা কম্পন সৃষ্টি হয় ১৮৮৬ ইং সালে। যখন মির্জার পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণের ভবিষ্যদ্বানী সত্ত্বেও কণ্যা সন্তান জন্মগ্রহণ করে।
(২) দ্বিতীয় শিহরণ ঘটে যখন কণ্যা সন্তানের পর পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করে এবং মৃত্যুবরণ করে।
(৩) তৃতীয়টি ছিল যা ভারতীয় মুসলমানদের হতবুদ্ধি অবস্থার সৃষ্টি করে ছিল, তার (মির্জা) প্রতিশ্রুত মসীহ্ ও মেহদী দাবী। (৪) চতুর্থ শিহরণ অনুভব করে, যখন আথামের মৃত্যুর ভবিষ্যদ্বানী কার্যকর না হয়। (৫) পঞ্চম শিহরণ অনুভব করে, মির্জার মৃত্যুতে (যা ঘটে ছিল মৌলভী সানাউল্লাহ্র মৃত্যুর অনেক পূর্বে এবং এমন একটি ভাগ্যগত রোগে, যাকে কলেরা বলা হয়। মির্জার মতানুযায়ী এই রোগে মৃত্যু হয় তাদের যারা আল্লাহ্ পাক-এর পরিত্যক্ত এবং যারা আল্লাহ্ পাক-এর সম্বন্ধে মিথ্যা কথা আবিস্কার করে। (সীরাত-ই-মেহেদী নং ১১৩, পৃষ্ঠা ৮৬-৯০)
এই তালিকাটি মির্জার ভবিষ্যদ্বানীর ভিত্তিতেই করা হয় বলে কথিত। কিন্তু এই প্রত্যেকটি ঘটনাকে যদি একটি করে ভূমিকম্প হিসেবে ধরা হয় তাহলে ঐ ভবিষ্যদ্বানীর আলোকে তালিকাটি অসম্পূর্ণ।
মুহম্মদী বেগমকে বিবাহ্ করতে মির্জার ব্যর্থতায় তাকে যে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের মুখোমুখি হতে হয়েছে, ভূকম্প বিদ্যানুযায়ী ঐ গুলোর স্থায়ীত্ব ছিল বেশ দীর্ঘ এবং পরপর কয়েকটি কম্পনের সাথে তুলনীয়। এইভাবে মির্জার পয়গম্বর দাবীতে যে বিরোধীতা এবং প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে তার তীব্রতা আজ পর্যন্ত হ্রাস পায়নি। প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম ভূমিকম্প এবং মুহম্মদী বেগমের সুদীর্ঘ কাহিনীর উপাখ্যান মির্জাকে একইভাবে মুসলমান, খৃষ্টান এবং হিন্দুদের নিকট পরিহাস ও ঠাট্টার পাত্রে পরিণত করেছিল। ১৮৯১ সালে প্রতিশ্রুত মসীহ এবং মেহদী দাবী এবং পয়গম্বর হওয়ার দাবী বা পবিত্র রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর গুপ্ত বিষয়াদীর প্রকাশ মুসিলম উম্মাহ্, আলেম ও বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে একইভাবে দীর্ঘস্থায়ী বিরোধীতা, ক্ষোভ, দোষারোপ এবং সমালোচনা বিরাজ করতে থাকে। (সীরাত-ই-মেহেদী, ভলিউম/১ পৃষ্ঠা ৯০, ভলিউম/২ পৃষ্ঠা ৪৪, ৪৬, ৮৭, ভলিউম/৩ পৃষ্ঠা ৯৪)
এটা তার জীবদ্দশায় বারংবার মুসলমানদের উত্যক্ত করার বর্ণনা। পাকিস্তান সৃষ্টির পর ১৯৫৩ সালে সামরিক শাসন জারী, মুনির কমিটি গঠন, ১৯৭৪ সালের সংবিধানের পরিবর্তন প্রমাণ করে মুসলমানদের মধ্যে বিরাজমান চরম অস্থিরতা, মনস্তাপ ও উত্তেজনার। মুসলমানদের মনে আঘাত পায় তেমন কিছু করা, পাকিস্তান সরকারের শাস্তি দান বিধির ১২৯৮ সি সেকশনে নিষিদ্ধ রয়েছে।
(অসমাপ্ত)